📄 গ্রহণযোগ্য বক্তব্য
এক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য মত হল, ফটোগ্রাফি জায়েয। দুটি কারণে এটি নিষিদ্ধতার হাদিসের আওতায় পড়ে না।
এক, হাকিকতের বিবেচনায়। হাদিসসমূহে যে ছবির কথা বলা হয়েছে, তা হল আল্লাহর সৃষ্টির অবিকল আকৃতি তৈরি করা। ফটোগ্রাফির মাধ্যমে আল্লাহর সৃষ্টির নকল তৈরি করা হয়।
ফটোগ্রাফি একটি প্রচলিত পরিভাষা। শরয়ি কোন পরিভাষা নয়। শরয়ি পরিভাষাকে প্রচলিত পরিভাষার ওপর প্রয়োগ বৈধ নয়।
দুই, ইল্লতের বিবেচনায়। ছবি হারাম হওয়ার ইল্লত যা হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, তা হচ্ছে 'মুদাহাত' বা সামঞ্জস্যতা। ফটোগ্রাফির মধ্যে এ ইল্লতটি পাওয়া যায় না।
সহিহ বুখারির একটি হাদিসের ভাষ্য এমন :
وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنْ ذَهَبَ يَخْلُقُ كَخَلْقِي.
ওই ব্যক্তির চেয়ে বেশি অত্যাচারী আর কে, যে আমার সৃষ্টি সদৃশ কোন কিছু সৃষ্টি করতে চায়।¹
ফটোগ্রাফির মধ্যে এ ইল্লত বা কারণটি অনুপস্থিত।
📄 যারা ছবি মাত্রই শিরকের মাধ্যম হওয়ার কথা বলেন তাদের জবাব
ছবি মাত্রই সেটি শিরক পর্যন্ত পৌঁছে দেবে, ব্যাপারটি তেমন নয়। তবে কিছু কিছু ছবি মানুষকে শিরক পর্যন্ত পৌঁছে দেয়। ছবি মাত্রই যে সেটি শিরক পর্যন্ত পৌঁছে দেয় না, এ বিষয়ে আমরা ওই হাদিসটি দলিল হিসেবে পেশ করতে পারি, যে হাদিসে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বালিশে থাকা ছবির অনুমতি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন:
إِلَّا رَقْمًا فِي ثَوْبٍ.
তবে কারুকাজ করা কাপড় বাদে।²
সুতরাং এ হাদিস থেকে প্রমাণ মেলে, কেবল ওই ছবিই মানুষকে শিরক পর্যন্ত পৌঁছে দেয়, যাতে তাযিম করার বিষয় থাকে। এটি সর্বসম্মতভাবে হারাম।
ক্যামেরার ছবি যখন নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়লো না, হাকিকিভাবেও না, ইল্লতের দিক দিয়েও না, তখন সেটি জায়েয হবে বৈকি! তখন এটি এই মূলনীতির অন্তর্গত হয়ে যাবে :
الأَصْلُ فِي الأَشْيَاءِ الإِبَاحَةُ، إِلَّا مَا دَلَّ الدَّلِيلُ عَلَى تَحْرِيمِهِ.
বস্তুরাজি মৌলিকভাবে বৈধ হওয়াই বিধান, তবে যখন সেটি হারাম হওয়ার বিষয়ে কোন প্রমাণ পাওয়া যাবে। তখন হারাম সাব্যস্ত হবে।
আর এখানে এমন কোন প্রমাণ বিদ্যামান নেই, যার দরুণ এই মূলনীতি থেকে সরে আসা যায়। আল্লাহ তায়ালা সর্বজ্ঞ।
টিকাঃ
¹. সহীহ বুখারী: ৫৯৫৩।
². সহীহ বুখারী: ৫৯৫৮, সহীহ মুসলিম: ২১০৬।
📄 সেলফি ও নারী-ছবির বিধান
জেনে রাখা ভালো, কোন কিছু হালাল হওয়ার জন্য তার মাঝে হারাম কোন বিষয়ের সংমিশ্রণ না থাকা শর্ত। বৈধ জিনিসও যখন মানুষকে হারাম কাজ পর্যন্ত পৌঁছে দেয়, সেটিও হারাম হয়ে যায়। কারণ উপায় উপকরণের হুকুমও মূল বস্তুর হুকুমের মতোই হয়।
অতএব :
১। মানুষ যখন ছবির ব্যবহার করবে, তাকে অবশ্যই সেসব চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ধরে রাখতে হবে, যেগুলোর মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা তাকে মহিমান্বিত করেছেন। ওসব অভদ্র কাজ, এক শ্রেণির মানুষ যাকে সেলফি নাম দিয়েছে, বর্জন করতে হবে। কারণ, এটি এমন একটি কাজ, সুস্থ কোন বিবেক যাকে গ্রহণ করতে পারে না। চির আধুনিক কোন ধর্মীয় দৃষ্টিকোন তো বাদই দিলাম। কেননা সেটি তো মহান রবের ধর্ম। যিনি মহা সম্মানিত, মর্যাদাবান।
এটি তো জানা কথা, সেলফিতে নিজের ছবি নিজেই তোলা হয়। এতে আবার হারাম বা নিন্দার কি আছে? নিন্দার ব্যাপার তো হল, যিনি সেলফি ওঠান, তার উদ্ভট অঙ্গভঙ্গি। শরিয়ত যা ঘৃণা করে।
২। পেইজে শুধুমাত্র পুরুষের ছবি ব্যবহার জায়েয। তাও শর্ত হল নারীদের ফিতনা থেকে নিরাপদ থাকা। আর নারীদের ক্ষেত্রে কথা হচ্ছে, কোন মুসলিম সচ্চরিত্রবান পুতপবিত্র নারীর জন্য কখনোই ফেইসবুক পেইজে ছবি দেয়া জায়েয নেই। নিশ্চয় এটি রূপ সৌন্দর্য প্রদর্শন বলে গণ্য। যুবক ও দ্বীনদার শ্রেণিকে ফিতনায় ফেলার মাধ্যম। আল্লাহ তায়ালা মুমিন নারীদেরকে নির্দেশ দিয়ে বলেছেন :
وَقَرْنَ فِي بُيُوتِكُنَّ وَلَا تَبَرَّجْنَ تَبَرُّجَ الْجَاهِلِيَّةِ الْأُولَى.
আর তোমরা নিজ নিজ গৃহে অবস্থান করো এবং প্রাক-জাহেলী যুগের মত সৌন্দর্য প্রদর্শন করো না।¹
টিকাঃ
¹. সূরা আহযাব, আয়াত : ৩৩।
📄 প্রোফাইলে শিশুদের ছবি দেয়া
শিশুদের ছবি প্রোফাইল পিকচারে দেয়া থেকে বিরত থাকতে আমরা সকল বাবাদেরকে উৎসাহিত করি। বিশেষকরে দুগ্ধপোষ্য শিশুদের ছবি। এ কাজটি মানুষের মাঝে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। আমি মনে করি সন্তানদের প্রতি মমতাবোধ থেকেই এ কাজ থেকে বিরত থাকা উচিত। এতে শিশু বদনজর এবং হিংসা থেকে হিফাযতে থাকবে। হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালাম তার ছেলেদের যেমন বলেছিলেন:
يُبَنِيَّ لَا تَدْخُلُوا مِنْ بَابٍ وَاحِدٍ وَادْخُلُوا مِنْ أَبْوَابٍ مُتَفَرِّقَةٍ
হে আমার পুত্রগণ! তোমরা একই দ্বার দিয়ে প্রবেশ করো না। ভিন্ন ভিন্ন দ্বার দিয়ে প্রবেশ করবে।²
অর্থাৎ, যাতে তোমাদের বদনজর না লাগে। কেননা বদনজর ক্ষতির কারণ হয়ে থাকে।
এ নিষেধাজ্ঞা আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করে সতর্ক থাকা মাত্র। তাই উপরোক্ত কথার পরেই ইয়া'কুব আলাইহিস সালাম বলেন :
وَمَا أُغْنِي عَنْكُمْ مِّنَ اللهِ مِنْ شَيْءٍ إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَعَلَيْهِ فَلْيَتَوَكَّلِ الْمُتَوَكَّلُونَ
আল্লাহর বিধানের বিরুদ্ধে আমি তোমাদের জন্য কিছু করতে পারব না। বিধান আল্লাহরই। আমি তার ওপরই নির্ভর করি এবং যারা নির্ভর করতে চায়, তারা আল্লাহর ওপরই নির্ভর করুক।¹ অর্থাৎ, আমার এ নির্দেশনার মাধ্যমে তোমাদেরকে আমি বিন্দুমাত্র তা থেকে রক্ষা করতে পারব না, যার ফায়সালা আল্লাহ তোমাদের ব্যাপারে করে রেখেছেন। এটা তোমাদের প্রতি আমার মমতাবোধ থেকে বললাম।
টিকাঃ
². সূরা ইউসুফ, আয়াত : ৬৭।
1. সূরা ইউসুফ, আয়াত: ৬৭।