📄 ফটোগ্রাফি বা আলোকচিত্রের বিধান
ফটোগ্রাফি বা আলোকচিত্র একটি আধুনিক মাসআলা। নবউদ্ভাবিত বিষয়। তাই এর বিধান জানতে প্রথমে জানতে হবে এ বিষয়ে প্রাজ্ঞ ব্যক্তিদের অভিমত।
ছবি সম্পর্কে প্রাজ্ঞ ব্যক্তিগণ বলেন: নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় আলোকে ব্যবহার করা। যারফলে বস্তুর ছায়া প্রতিফলিত হয়। অতঃপর ফিল্মের ভেতর যাকে সংরক্ষণ করা হয়। আলোক চিত্রও বলা হয় এটিকে।
সুতরাং ছবি হল আলোর প্রতিফলন, যাকে ফিল্মের ভেতর সংরক্ষণ করা হয়।
এ হচ্ছে ফটোগ্রফি বা ছবির রহস্য। এর কিছু বিধানের ক্ষেত্রে সকলেই একমত, আর কিছু বিধান আছে এমন যেগুলোতে কেউ কেউ দ্বিমত পোষণ করে থাকেন।
যে বিষয়গুলোতে সবাই একমত :
১। প্রয়োজনে ছবির ব্যবহার জায়েয। যেমন পাসপোর্ট ইত্যাদি প্রয়োজনে ছবি তোলা।
২। হারাম জিনিসের ছবিও হারাম। যেমন সম্মানের জন্য ছবি। অথবা পর-নারীর ছবি। ইত্যাদি।
৩। যে জিনিসের প্রাণ নেই, সেটির ছবি তোলা জায়েয। যেমন গাছ। তবে এ বিষয়ে সামান্য মতানৈক্য আছে।
যে বিষয়গুলোতে দ্বিমত আছে :
উল্লেখিত সুরত ছাড়া বাকি সুরতগুলোতে। এক্ষেত্রে সমকালীন ফুকাহায়ে কেরামের দুটি বক্তব্য পরিলক্ষিত হয়।
প্রথম বক্তব্য: ফটোগ্রাফি হারাম। তাঁদের দলিলগুলো নিম্নরূপ:
১। আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি:
مَنْ صَوَّرَ صُورَةً فِي الدُّنْيَا كُلِّفَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَنْ يَنْفُخَ فِيْهَا الرُّوْحَ، وَلَيْسَ بِنَافِحْ.
যে ব্যক্তি দুনিয়াতে কোন প্রাণীর ছবি তৈরি করে, কিয়ামত দিবসে তাকে কঠোরভাবে হুকুম দেয়া হবে, ওই ছবিতে জীবন দান করতে বলা হবে। কিন্তু সে জীবন দান করতে সক্ষম হবে না।¹
২। আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (তাবুক যুদ্ধের) সফর থেকে ফিরে আসলেন। আমি আমার কক্ষে পাতলা কাপড়ের পর্দা টাঙিয়েছিলাম। তাতে ছিল (প্রাণীর) অনেকগুলো ছবি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন এটি দেখলেন, তখন তা ছিঁড়ে ফেললেন এবং বললেন:
أَشَدُّ النَّاسِ عَذَاباً يَوْمَ الْقِيَامَةِ الَّذِيْنَ يُضَاهُوْنَ بِخَلْقِ اللَّهِ.
কিয়ামতের দিন সেসব লোকের সব চেয়ে শক্ত আযাব হবে, যারা আল্লাহর সৃষ্টির (প্রাণীর) সদৃশ তৈরি করবে।
আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, এরপর আমরা ওটা দিয়ে একটি বা দুটি বসার আসন তৈরি করি।'
এছাড়াও তাঁরা আরো অনেক দলিল পেশ করে থাকেন। যেগুলোর বক্তব্যের ব্যাপকতা থেকে ছবি হারাম হওয়া বুঝা যায়।
দ্বিতীয় বক্তব্য : ফটোগ্রাফি জায়েয। তাঁদের দলিলগুলো নিম্নরূপ :
১। তাঁরা এটিকে আয়নার সাথে তুলনা করে থাকেন। প্রতিফলনের দিক দিয়ে।
২। ফটোগ্রাফির মধ্যে সাদৃশ্যের কারণ অনুপস্থিত।
টিকাঃ
1. সহীহ বুখারী: ৫৯৬৩, সহীহ মুসলিম: ২১১০।
📄 গ্রহণযোগ্য বক্তব্য
এক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য মত হল, ফটোগ্রাফি জায়েয। দুটি কারণে এটি নিষিদ্ধতার হাদিসের আওতায় পড়ে না।
এক, হাকিকতের বিবেচনায়। হাদিসসমূহে যে ছবির কথা বলা হয়েছে, তা হল আল্লাহর সৃষ্টির অবিকল আকৃতি তৈরি করা। ফটোগ্রাফির মাধ্যমে আল্লাহর সৃষ্টির নকল তৈরি করা হয়।
ফটোগ্রাফি একটি প্রচলিত পরিভাষা। শরয়ি কোন পরিভাষা নয়। শরয়ি পরিভাষাকে প্রচলিত পরিভাষার ওপর প্রয়োগ বৈধ নয়।
দুই, ইল্লতের বিবেচনায়। ছবি হারাম হওয়ার ইল্লত যা হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, তা হচ্ছে 'মুদাহাত' বা সামঞ্জস্যতা। ফটোগ্রাফির মধ্যে এ ইল্লতটি পাওয়া যায় না।
সহিহ বুখারির একটি হাদিসের ভাষ্য এমন :
وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنْ ذَهَبَ يَخْلُقُ كَخَلْقِي.
ওই ব্যক্তির চেয়ে বেশি অত্যাচারী আর কে, যে আমার সৃষ্টি সদৃশ কোন কিছু সৃষ্টি করতে চায়।¹
ফটোগ্রাফির মধ্যে এ ইল্লত বা কারণটি অনুপস্থিত।
📄 যারা ছবি মাত্রই শিরকের মাধ্যম হওয়ার কথা বলেন তাদের জবাব
ছবি মাত্রই সেটি শিরক পর্যন্ত পৌঁছে দেবে, ব্যাপারটি তেমন নয়। তবে কিছু কিছু ছবি মানুষকে শিরক পর্যন্ত পৌঁছে দেয়। ছবি মাত্রই যে সেটি শিরক পর্যন্ত পৌঁছে দেয় না, এ বিষয়ে আমরা ওই হাদিসটি দলিল হিসেবে পেশ করতে পারি, যে হাদিসে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বালিশে থাকা ছবির অনুমতি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন:
إِلَّا رَقْمًا فِي ثَوْبٍ.
তবে কারুকাজ করা কাপড় বাদে।²
সুতরাং এ হাদিস থেকে প্রমাণ মেলে, কেবল ওই ছবিই মানুষকে শিরক পর্যন্ত পৌঁছে দেয়, যাতে তাযিম করার বিষয় থাকে। এটি সর্বসম্মতভাবে হারাম।
ক্যামেরার ছবি যখন নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়লো না, হাকিকিভাবেও না, ইল্লতের দিক দিয়েও না, তখন সেটি জায়েয হবে বৈকি! তখন এটি এই মূলনীতির অন্তর্গত হয়ে যাবে :
الأَصْلُ فِي الأَشْيَاءِ الإِبَاحَةُ، إِلَّا مَا دَلَّ الدَّلِيلُ عَلَى تَحْرِيمِهِ.
বস্তুরাজি মৌলিকভাবে বৈধ হওয়াই বিধান, তবে যখন সেটি হারাম হওয়ার বিষয়ে কোন প্রমাণ পাওয়া যাবে। তখন হারাম সাব্যস্ত হবে।
আর এখানে এমন কোন প্রমাণ বিদ্যামান নেই, যার দরুণ এই মূলনীতি থেকে সরে আসা যায়। আল্লাহ তায়ালা সর্বজ্ঞ।
টিকাঃ
¹. সহীহ বুখারী: ৫৯৫৩।
². সহীহ বুখারী: ৫৯৫৮, সহীহ মুসলিম: ২১০৬।
📄 সেলফি ও নারী-ছবির বিধান
জেনে রাখা ভালো, কোন কিছু হালাল হওয়ার জন্য তার মাঝে হারাম কোন বিষয়ের সংমিশ্রণ না থাকা শর্ত। বৈধ জিনিসও যখন মানুষকে হারাম কাজ পর্যন্ত পৌঁছে দেয়, সেটিও হারাম হয়ে যায়। কারণ উপায় উপকরণের হুকুমও মূল বস্তুর হুকুমের মতোই হয়।
অতএব :
১। মানুষ যখন ছবির ব্যবহার করবে, তাকে অবশ্যই সেসব চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ধরে রাখতে হবে, যেগুলোর মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা তাকে মহিমান্বিত করেছেন। ওসব অভদ্র কাজ, এক শ্রেণির মানুষ যাকে সেলফি নাম দিয়েছে, বর্জন করতে হবে। কারণ, এটি এমন একটি কাজ, সুস্থ কোন বিবেক যাকে গ্রহণ করতে পারে না। চির আধুনিক কোন ধর্মীয় দৃষ্টিকোন তো বাদই দিলাম। কেননা সেটি তো মহান রবের ধর্ম। যিনি মহা সম্মানিত, মর্যাদাবান।
এটি তো জানা কথা, সেলফিতে নিজের ছবি নিজেই তোলা হয়। এতে আবার হারাম বা নিন্দার কি আছে? নিন্দার ব্যাপার তো হল, যিনি সেলফি ওঠান, তার উদ্ভট অঙ্গভঙ্গি। শরিয়ত যা ঘৃণা করে।
২। পেইজে শুধুমাত্র পুরুষের ছবি ব্যবহার জায়েয। তাও শর্ত হল নারীদের ফিতনা থেকে নিরাপদ থাকা। আর নারীদের ক্ষেত্রে কথা হচ্ছে, কোন মুসলিম সচ্চরিত্রবান পুতপবিত্র নারীর জন্য কখনোই ফেইসবুক পেইজে ছবি দেয়া জায়েয নেই। নিশ্চয় এটি রূপ সৌন্দর্য প্রদর্শন বলে গণ্য। যুবক ও দ্বীনদার শ্রেণিকে ফিতনায় ফেলার মাধ্যম। আল্লাহ তায়ালা মুমিন নারীদেরকে নির্দেশ দিয়ে বলেছেন :
وَقَرْنَ فِي بُيُوتِكُنَّ وَلَا تَبَرَّجْنَ تَبَرُّجَ الْجَاهِلِيَّةِ الْأُولَى.
আর তোমরা নিজ নিজ গৃহে অবস্থান করো এবং প্রাক-জাহেলী যুগের মত সৌন্দর্য প্রদর্শন করো না।¹
টিকাঃ
¹. সূরা আহযাব, আয়াত : ৩৩।