📄 হীনম্মন্যতা
শিক্ষিত ও আলেম সমাজে এমন অনেক মানুষ নজরে পড়েন, যাঁরা অসাধারণ প্রতিভার মালিক, অগাধ পান্ডিত্য এবং অনল্প ইল্মী শক্তির অধিকারী যা তাঁদেরকে জ্ঞানপতি হবার যোগ্য করে তুলে। কিন্তু হেয় মন্যতায় তাঁদের সে প্রতিভার আভা ও আলোক বিলীন হয়ে যায় এবং তেজস্বান শক্তিকে ক্ষীয়মান ও নিষ্ক্রিয় করে ফেলে। তাই তো স্বল্প ইল্ম আলোচনায় তাঁদের জ্ঞান-পিপাসা মিটে যায়। অধিক অধ্যয়ন ও বাড়তি পড়াশুনা করায় বিরাগী হন এবং ইল্মী কাজ ছেড়ে সাধারণতঃ পার্থিব কোন কাজে অধিক মনোযোগী হন। তাঁদের অনেককে (বক্তৃতা লেখনী বা অন্যান্য) দাওয়াতী কাজে নামতে অনুরোধ করলে 'আমার যোগ্যতা নেই' বলে ওজর পেশ করেন। তাঁরা মুখে বিনয় প্রকাশ করেন এবং কাজেও। অথচ কাজে তা প্রকাশ করা আদৌ উচিত নয়।
তাই তো এমন মানুষদের প্রতিভা ও শক্তি খুব সত্বর ছিনিয়ে নেওয়া হয় এবং তাঁদের সময়ের বর্কত তুলে নেওয়া হয়। যেহেতু অকৃতজ্ঞতা ও অবহেলার ফলে সম্পদ লয় ও ক্ষয়প্রাপ্ত হয়; যেমন কৃতজ্ঞতা ও মর্যাদাদানে সম্পদ বর্ধমান হয়।
ফারা (রঃ) বলেন, 'দুই ব্যক্তির মত অপর কাউকে আমি দয়া প্রদর্শন করি না। এক ব্যক্তি, যে ইলম তলব করে; কিন্তু তার মেধা বা বুঝশক্তি নেই। দ্বিতীয় ঐ ব্যক্তি, যে মেধাবী ও বুঝ শক্তিসম্পন্ন; অথচ ইলম তলব করে না। আর আমি আশ্চর্যান্বিত ও বিস্মিত হই এমন লোকের উপর যার ইল্ম অর্জন (ও প্রচার) করার ক্ষমতা আছে; অথচ তা করে না।' মুতানাব্বী বলেন, মানুষের সবচেয়ে বড় ত্রুটি এই যে, পূর্ণতা লাভের সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও সে অপূর্ণ থেকে যায়।
এর টীকায় ইবনুল জওযী (রঃ) বলেন, 'জ্ঞানীর উচিত, যথাসম্ভব (কল্যাণমূলক) পরিপূর্ণতার সর্বশেষ মঞ্জিলে পদার্পণ করা। তাই যদি কোন মানুষ আকাশে চড়ার পরিকল্পনা করে (এবং তার দ্বারা তা সম্ভব হয়) তবে মাটিতে বসে থাকা তার সবচেয়ে বড় আয়েব ও ত্রুটি হবে। নবুয়ত যদি ইজতেহাদ ও প্রচেষ্টার দ্বারা লাভ করা সম্ভব হত তবে অলস ব্যক্তিকেও তা লাভ করার প্রচেষ্টায় বড় মজবুত দেখা যেত। (অর্থাৎ কেবল বেলায়ত নিয়ে সন্তুষ্ট থাকা তার জন্য সমীচীন হত না।) জ্ঞানী ও পন্ডিতদের এক সদাচরণ হল, ইল্ম ও আমলে যথাসম্ভব পরিপূর্ণতার সর্বশেষ মঞ্জিলকে আত্মর জয়লাভ করা।'
তিনি আরো বলেন, 'মোটকথা, যে কল্যাণ ও মর্যাদা লাভ করা মানুষের পক্ষে সম্ভব তা লাভ ও অর্জন না করে ক্ষান্ত হওয়া উচিত নয়। কারণ (এ বিষয়ে) স্বল্পতে তুষ্ট হওয়া নীচ, তুচ্ছ ও অলস মানুষের কাজ। অতএব এমন মানুষ হওয়া দরকার যার পা মাটিতে থাকলেও আকাশে ও গ্রহ-উপগ্রহে তার হিম্মত ও উঁচু অভিপ্রায় থাকে। যদি প্রত্যেক আলেম ও আবেদের নিকট যাওয়া সম্ভব হয় তো যাও। তাঁদের নিকট সবক শিখ। তাঁরা মানুষ, তুমিও মানুষ। যা তাঁদের দ্বারা সম্ভব হয়েছে তা তোমার দ্বারাও সম্ভব হতে পারে। কিন্তু যে বসে পড়ে, সে হীনম্মন্যতার ও হিম্মত হারানোর ফলেই বসে পড়ে।
তুমি নিজেকে কোন প্রতিযোগিতার ময়দানে ভাব। সময় আপন গতিবেগে চলতে আছে। সে তোমার অপেক্ষা করবে না। অতএব আলস্য ছাড়, দীর্ঘসূত্রতার জড়তায় পড়োনা। জেনে রেখো, যার যা হারিয়ে যায় তা তার নিজের অবহেলা ও অলসতার কারণেই যায় এবং যে যা পায় সে তার নিজের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা, হিকমত ও যত্নের কারণেই পায়।' (সাইদুল খাতের ১৫৯-১৬১পৃঃ)
উল্লেখ্য যে, তকদীর সত্য; তবে তকদীরের দোহাই দিয়ে তদবীর ছেড়ে বসে যাওয়া জ্ঞানী মুসলিমের কাজ নয়। কারণ, তকদীরের সাথে তদবীরও জরুরী।
'অদৃষ্টেরে শুধালাম, চিরদিন পিছে
অমোঘ নিষ্ঠুর বলে কে মোরে ঠেলিছে?'
সে কহিল, 'ফিরে দেখ।'
দেখিলাম থামি,
সম্মুখে ঠেলিছে মোরে পশ্চাতের আমি।'
সুতরাং তুমি যদি তোমার মধ্যে বুদ্ধিমত্তা ও বুঝশক্তি আছে অনুভব কর তবে ইল্ম ও অধ্যয়নের বিকল্প অন্য কিছুকে মনে করোনা এবং দর্স ও তদরীস ব্যতীত অন্য কোনও কাজে লিপ্ত হয়ে যেওনা। যদি তা তুমি মানতে না চাও তবে এ তোমার ও মুসলমানদের পক্ষে এক মহাবিপদ ও বড় নোকসান!
ধনলোভীর নিকট ধন ঈপ্সিত, মান ঈপ্সিত নয়। প্রজাপতির নিকট ফুল প্রিয়, ফল প্রিয় নয়। মাতালের কাছে মদই শ্রেষ্ঠ, দুধ শ্রেষ্ঠ নয়। অনুরূপ একজন আলেমের নিকট ইল্মই প্রিয় ও নেশার বস্তু হওয়া উচিত, অন্য কিছু নয়।
হে তালেবে ইল্ম! তোমার ঐ পথে চলতে বিভিন্ন বাধা পাবে, পদার্পণে কাঁটা পাবে, (অধার্মিকদের নিকট হতে) সম্মানের অভাব পাবে, আত্মীয়তা ছিন্ন হবে, 'ফকীরী বিদ্যা' বলে নাকসিটকানি শুনবে, দারিদ্র্য ও উত্তম খাদ্যাভাব দেখা দেবে, আমলের পথে লোকারণ্যেও নিজেকে নিঃসঙ্গ ও অসহায় পাবে। তবুও তোমাকে ঐ পথে চলতে হবে।
'কাঁটা হেরি ক্ষান্ত কেন কমল তুলিতে,
দুখ বিনা সুখ লাভ হয় কি মহীতে।'
ধৈর্য ধরলে তার ফল মিষ্ট পাবে। যদি তুমি প্রকৃত তালেবে ইল্ম হও তবে তোমার চলার পথে পদতলে ফিরিশতা পক্ষ বিছিয়ে যাবেন। তুমিই হবে প্রকৃত সুখী ও সম্মানী। যেহেতু যে রত্নের খোঁজে বের হবে সে রত্ন! নবুয়তের রত্ন। আর তার চেয়ে মূল্যবান রত্ন আর কি আছে? আসুক শত বাধা, শত ঝঞ্চা, শত অপমান, তা তুচ্ছজ্ঞান করে চল। আর মনে রেখো, যাদের কোন মান নেই সাধারণত তারাই জ্ঞানীদের অপমান করে। আবার যাদের কোন মানই নেই তাদের আবার অপমান কিসের? অতএব যদি তুমি দ্বীন ও নবুওত থেকে মান কুড়াতে না পার তবে অপমান আর কি? যদি মানের আশা কর তবে আল্লাহর কাছে, ধর্মপ্রাণ মুমিন মানুষ, জ্ঞানী ও সম্মানী লোকদের নিকট আশা কর। কাফের ও মূর্খদের তরফ হতে মানের আশা করো না। তাদের নিকট হতে তো মানের আকাঙ্খা করাই ভুল।
চল ঐ পথে বুক ফুলিয়ে, মাথা উঁচু করে, হিম্মত বড় করে। সেই কাজ ও আচরণ অবলম্বন কর যাতে তোমার হিম্মত বাড়তে থাকে। আশাকে বড় কর। সর্বদা ধ্যানে রেখো যে, তোমাকে বড় একটা কিছু হতেই হবে। ছোট আশা কোন সময় করো না। আল্লাহর নিকট চাইলে বড় কিছু চাও। 'কিছু না পারি তো মসজিদের ইমামতি করব' এমন ছোট খেয়াল মনে রেখো না।** যেখানে চাইলে গোটা ফুলবাগান পেতে পার সেখানে দু'টি ফুল চেয়ে ও পেয়ে সন্তুষ্ট হওয়া বুদ্ধিমানের কাজ নয়।
'মূর্খ তুমি গোটা কতক ফুলেই তোমার ভরল প্রাণ,
চাইতে যদি মিলত তোমায় সবটুকু এই ফুল বাগান।'
আশা করলে উচ্চ আশাই করতে হয়। কথায় বলে 'আশা আর বাসা ছোট করতে নেই।' অন্যথা যাদের মন ছোট কেবল তারাই ছোট আশা করে এবং নগণ্য নিয়ে সন্তুষ্ট হয়। চাও আল্লাহর কাছে বড় কিছু। যিনি তোমার চাওয়া ছোট কিছু দিতে পারবেন তিনি বড়টাও দিতে পারবেন। চাও এই বলে:-
হিম্মত উঁচু করার যে সমস্ত উপায়-উপকরণ আছে, তার মধ্যে সাহাবা ও সালেহীন (রাঃ)দের জীবনী পড়া অন্যতম। যেহেতু তাঁদের জীবন ইলম ও আমলে পরিপূর্ণ। তাঁদের অবস্থা জানার পর শিক্ষার্থী নিজেকে অনেক ছোট ভাববে এবং তার চোখেই তার ইলম ও আমল খুবই নগণ্য পরিদৃষ্ট হবে। ফলে তাঁদের নাগাল পাবার প্রচেষ্টা করবে এবং তাঁদের অনুকরণ ও সাদৃশ্যলাভ করার প্রয়াসী হবে। আর “যে ব্যক্তি যে সম্প্রদায়ের অনুকরণ ও সদৃশতা অবলম্বন করে সে তাদেরই দলভুক্ত।”
ইবনুল জওযী বলেন, 'আল্লাহ আল্লাহ! তোমরা সলফের জীবনেতিহাস আলোচনা কর। তাঁদের লেখনী ও সংবাদ পড়। কারণ, তাঁদের বই-পুস্তক অধিক অধ্যয়ন করা, তাঁদেরকে দর্শন করার শামিল।'
অন্যত্র তিনি বলেন, 'অধিক পাঠ্যালোচনা ও বাড়তি পড়াশুনা করা উচিত। কারণ, তাতে (জ্ঞানী) সম্প্রদায়ের ইলম ও উঁচু হিম্মত পরিদর্শন করা যাবে; যাতে শিক্ষার্থীর মনোবল দৃঢ় হবে। আর তার ইচ্ছা ও আশা অধিক প্রয়াসের জন্য প্রবল বেগে আন্দোলিত হবে। (সাইদুল খাতের ৪৪০পৃঃ)
টিকাঃ
**এখানে মসজিদের ইমামতিকে ছোট কাজ হিসাবে দেখানো উদ্দেশ্য নয়। উদ্দেশ্য, যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও দর্স ও তাদরীস থেকে মুখ ফিরিয়ে কেবল ইমামতি নিয়ে সন্তুষ্ট থাকা অনুচিত।
📄 দীর্ঘসূত্রতা ও সাধ
গয়ংগচ্ছভাব ও সাধ-এই দু'টিই হল মারাত্মক ব্যাধি। যা হৃদয় ও সময়কে ধ্বংস করে এবং মানুষকে স্বপ্ন ও কল্পনার জগতে উড়িয়ে নিয়ে যায়।
দীর্ঘসূত্রতা হল কাণ্ডজ্ঞান, অনুভূতি ও পরোয়াহীন মানুষের বদগুণ। তাই তো এমন মানুষের মন যখন কোন ভালো কাজের ইচ্ছা করে তখনই দীর্ঘসূত্রতা তাকে বলে, 'এই করব, এখনি যাচ্ছি, এখনি যাব, এখনো অনেক সময়' ইত্যাদি। কিন্তু পরিশেষে যখন অকস্মাৎ জীবনের দুয়ারে মৃত্যু এসে উপস্থিত হয় তখন সে বলে, 'হে আমার প্রতিপালক! আমাকে আরও কিছুকালের জন্য অবকাশ দিলেন না কেন?' (কুঃ ৬৩/১০) সুতরাং তালেবে ইল্মের উচিত, এই অপগুণ হতে বেঁচে থাকা। আজকের কাজ কালকের জন্য রেখে না দিয়ে স্বকর্তব্যের প্রতি যথার্থ যত্নবান হওয়া এবং ভালো ও শুভকাজে দেরী না করা। মহান আল্লাহ বলেন, "তোমরা সৎকার্যে প্রতিযোগিতা কর।” (কুঃ ৫/৪৮) তিনি অন্যত্র বলেন, অর্থাৎ, তোমরা প্রতিযোগিতা (ত্বরা) কর, তোমাদের প্রতিপালকের নিকট থেকে ক্ষমা এবং জান্নাতের জন্য; যার প্রস্থ আকাশ ও পৃথিবীর সমান। যা মুত্তাকীদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। (কুঃ ৩/১৩৩)
যে চট্পট্ করে নৈপুণ্যের সাথে কাজ সারতে পারে প্রকৃতপক্ষে সেই সময়ের কদর ও মূল্য বোঝে এবং সময়কে যথাযোগ্য ব্যবহার করে তদ্দ্বারা উপকৃত ও লাভবান হয়ে থাকে। আল্লাহর নবী আব্দুল্লাহ বিন উমর (রাঃ) কে বলেছিলেন, “তুমি এমন ভাবে দুনিয়ায় অবস্থান কর যেন তুমি একজন প্রবাসী অথবা পথিক।” আর ইবনে উমর (রাঃ) বলতেন, 'সন্ধ্যা হলে সকালের প্রতীক্ষা (বা আশা) করো না। আর সকাল হলে সন্ধ্যার অপেক্ষা (বা আশা) করো না। তোমার অসুস্থতার পূর্বে সুস্থতার এবং মৃত্যুর পূর্বে জীবনের সুযোগ গ্রহণ কর।' (বুখারী, তিরমিযী, মিশকাত ১৬০৪নং)
ইবনুল জওযী বলেন, 'যে ব্যক্তি নিজের অন্তস্তলে জান্নাতের স্মরণ আবর্ত করবে, যেথায় কোন মৃত্যু নেই, কোন পীড়া নেই, নিদ্রা ও কোন চিন্তা নেই। যার বিলাস-সুখ নিরন্তর স্থায়ী ও অবিনাশী। এবং যেখানকার সুখের আতিশয্য এখানকার প্রয়াস ও পরিশ্রমের আধিক্যানুসারে হবে। সে ব্যক্তি এই সময়কে অতিমূল্যবান বলে মনে করবে। ফলে প্রয়োজনের অধিক ঘুমাবে না এবং কর্তব্যে উদাসীন হবে না।' (সাইদুল খাতের ৩২৩পৃঃ)
হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) কিশোর অবস্থা থেকেই ইল্ম ও সময়ের এমন কদর করেছিলেন যে, পরবর্তীকালে তাকে ইল্মের দরিয়া ও উম্মতের পন্ডিত বলা হয়েছিল। একদা তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হল যে, 'কিভাবে আপনি এত ইলমের অধিকারী হলেন?' তিনি বললেন, 'প্রশ্নকারী জিহ্বা, সমঝদার অন্তর এবং বিশ্রামহীন শরীর দ্বারা ইল্ম পেয়েছি।'
সাধ ও কামনা -যার কিছু প্রশংসার্হ এবং কিছু নিন্দনীয়। প্রশংসার্হ সাধ হল, সৎ ও উত্তম কার্যের অভিলাষ করা এবং তা করতে সক্ষম না হওয়া; যার তিনটি শর্ত রয়েছে। সেই কর্ম করার জন্য পাক্কা সংকল্প রাখা, যখনই তা করা সম্ভবপর হবে তখনই করার পূর্ণ ইচ্ছা রাখা। তা শরয়ী (ধর্মীয়) গন্ডীভুক্ত হতে হবে। যেমন মসজিদ নির্মাণের কামনা করা। তা যেন মানুষের স্বভাব ও অভ্যাস না হয়।
নিন্দনীয় বাসনা প্রসঙ্গে ইবনুল কাইয়্যেম (রঃ), শাইখুল ইসলাম আবু ইসমাইল হারাবীর অন্তর নষ্ট হওয়ার বিষয় সম্পর্কিত কথার ব্যাখ্যায় বলেন, ‘চিত্ত বিনষ্টকারী দ্বিতীয় বিষয় হল, বাসনার সমুদ্রে হৃদয়ের সন্তরণ করা, যে সমুদ্রের কোন কূল-কিনারা নেই। যে সমুদ্রে পৃথিবীর নিঃস্ব ও দরিদ্ররা সাঁতার কেটে বেড়ায়। যেহেতু নিঃস্বদের কেবল কামনাটাই সম্বল ও পণ্যদ্রব্য। শয়তানের প্রতিশ্রুতি ও প্রলোভন এবং অবাস্তব কল্পনা ও অলীক খেয়াল। যাদের সকল আশাই দুরাশা। মিথ্যা বাসনার তরঙ্গমালা এবং অমূলক কল্পনার ক্ষিপ্ত ঢেউ যাদেরকে নিয়ে খেলতে থাকে, যেমন কুকুর খেলে থাকে কোন পশুর শবদেহ নিয়ে। আর ঐ পণ্যদ্রব্য প্রত্যেক নিকৃষ্ট, দীন-হীন-ক্ষীন মানুষেরই যার এমন কোন হিম্মত ও উদ্যম থাকে না যদ্বারা সে বাইরের বাস্তবতাকে ধারণ করতে পারে। বরং তার পরিবর্তে কেবল নিকৃষ্ট কামনাই সদা জাগরিত রাখে। বাসনাকারী অভিলষিত বস্তুর ছবি নিজ মানসপটে অঙ্কন করে থাকে। কখনো বা কল্পনাকে বাস্তবজ্ঞান করে তার সাক্ষাৎলাভ করে থাকে এবং তা মনে মনে অর্জনও করে থাকে। তা নিয়ে সুখ আস্বাদন করে থাকে, আর মনের সাধও মিটিয়ে থাকে। কিন্তু এই ভাবোচ্ছ্বাস ও তন্ময়তায় কিছুকাল থাকার পর যখন তার ঘোর অথবা নিদ্রা ভঙ্গ হয় তখন হাত শূন্য দেখে এবং নিজেকে দেখে সেই জীর্ণশীর্ণ পাতার কুটীরে চাটাই এর বিছানায়।’ (মাদারেজুস সালেকীন ১/৪৫৬)
আবু তামাম কি সুন্দরই না বলেছেন, ‘যার ভাবনা, চিন্তা, কল্পনা ও ইচ্ছার চারণভূমি কামনা ও বাসনার উদ্যান হয় সে সর্বদা উপহাস্য থাকে।’
কোন পন্ডিতকে জিজ্ঞাসা করা হল, ‘সবচেয়ে দুরবস্থাগ্রস্ত মানুষ কে?’ তিনি বললেন, ‘যার হিম্মত ভেঙ্গে গেছে, বাসনার গৃহ প্রশস্ত হয়েছে, উপকরণ হারিয়ে গেছে এবং সামর্থ্য কমে গেছে।’
অন্য এক জ্ঞানী বলেন, ‘কামনা হতে দূরে থাক। কারণ কামনা তোমাদের মালিকানাভুক্ত বস্তুর সৌন্দর্য অপসারিত করে। আর তারই কারণে তোমাদের উপর আল্লাহ নেয়ামতকে তুচ্ছ ও ছোট জ্ঞান কর। (আদাবুদ দুনয়্যা অদ্দীন ৩০৮ পৃঃ)
লোভ-লালসা ও কামনা-বাসনার তীব্রতা হল ইল্ম ও জ্ঞানশিক্ষার পরিপন্থী। পড়ার জীবনেই যদি চাকরীর ধান্দা থাকে, অর্থ উপার্জনের ফিকির-ফন্দী থাকে তাহলে পড়াশুনা আর হবে না। অর্থের চিন্তা-ভাবনা ও টাকা-পয়সা অর্জনের লোভই তালেবের অধ্যয়নের উদ্যম নষ্ট করে ছাড়বে। কারণ, এ শ্রেণীর পার্থিব কামনা ও লালসায় মানসিক যন্ত্রণা বৃদ্ধি পাবে, পড়াশুনায় চরম ব্যাঘাত ঘটবে এবং স্মরণশক্তির মারাত্মক ক্ষতি হবে। আর কথায় বলে, 'লোভেই পাপ, পাপেই মৃত্যু।'
সুতরাং এই পীড়া হতে বেঁচে থাকা তালেবে ইল্মের একান্ত কর্তব্য। সাবধান হওয়া উচিত, যাতে ঐ রোগের জীবাণু তার দেহে সংক্রমণ না করে বসে। যেহেতু এ ধরনের সাধ দুরারোগ্য ক্যানসার। আর খুব কম মানুষই ঐ রোগের হাত হতে রক্ষা পেয়ে থাকে। শত চিকিৎসা সত্ত্বেও তার করাল কবল হতে রোগীকে বাঁচানো সম্ভব হয় না।
আল্লাহ আমাদের সকলকে ঐ ব্যাধি হতে রক্ষা করুন। আর মিথ্যা বাসনা হতে দূরে রেখে কল্পনার জগৎ হতে অপসারিত করে বাস্তব জগতে সৎকর্ম করার অনুপ্রেরণা, প্রয়াস ও ব্যাপৃতি দান করুন। আমীন।
📄 ধৈর্যহীনতা
ধৈর্য হল তিন প্রকার; আগত বিপদে ধৈর্য, আল্লাহর নির্দেশিত ফরয পালনে ধৈর্য এবং তাঁর নিষিদ্ধ কর্ম বর্জন করার উপর ধৈর্য। মানুষ তার জীবনে এ তিন প্রকার ধৈর্য ধারণ করলে মিঠা ফল লাভ করতে পারে। বিভিন্ন আপদে, বিপদে, আঘাতে, বাধাতে সবর করলে অবশ্যই মেওয়া ফলবে। ইবনে হিশাম নহবী বলেন, অর্থাৎ, যে ব্যক্তি ইল্মের খাতিরে ধৈর্যশীলতার পথ অবলম্বন করে সে তা অর্জন করতে সফলকাম হয়। কারণ, যে সুন্দরীকে বিবাহ করতে চায় তাকে বহু (মোহর ব্যয়ে ধৈর্য) ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। আর যে ব্যক্তি ইল্ম অর্জনের পথে নিজে সামান্য লাঞ্ছনা স্বীকার করে না সে সুদীর্ঘ দিন ধরে লাঞ্ছিত হয়েই বাস করে।
পূর্বে যা কিছু কর্তব্যরূপে আলোচিত হয়েছে তা কর্মক্ষেত্রে বাস্তবায়ন করতে হলে বিপুল ধৈর্য ও সহ্যের প্রয়োজন। ধৈর্য সহকারে উল্লেখিত বিষয় সমূহের সঠিক খেয়াল না রাখলে ইল্মলাভ সম্ভব নয়। প্রকারান্তরে আমাদের দেশের যে পরিস্থিতি সেখানে অতিরিক্ত আরো কিছু ধৈর্যের দরকার। দ্বীনী শিক্ষার সদিচ্ছা হলে ঘর-বাড়ি, সংসার, পিতামাতা, ভাই-বোন, স্ত্রী-পুত্র প্রভৃতির মায়াবন্ধন ছিন্ন করে কোন প্রতিষ্ঠানে যেতে হবে। যেখানে পিতৃস্নেহ বিরল। সমব্যথী ও সহানুভূতিশীল শুভানুধ্যায়ী নিতান্তই কম। আরামের আহার-বিহার নেই। আর্থিক অভাবের ফলে মাদ্রাসা কমিটি ছাত্রদেরকে কেবল এক তরকারী; তাতে কখনো কেবল 'আমড়ার আঁটি বা পুঁয়ের ডাঁটি' দিয়েই ভাত দিতে রেজুলেশন পাশ করেন। তাই কাঁচা মরিচ বা পিঁয়াজ কামড়ে কিছু খেতে ও কিছু ফেলতে হয় অথবা নাস্তার জন্য রেখে নিতে হয়!!
কোন মাসে খরচ বেশী হলে কর্তৃপক্ষের শাসানী শুনতে হয় বোর্ডিং সুপারকে। তাই তিনিও বেশ কড়া নজরে তেল-মসলা ও ডালের পরিমাণ যাতে আরো কম হয় সেই চেষ্টাই করেন। যার ফলে গরীব ছাত্রদের খাওয়া-দাওয়ার অবস্থা যে শোচনীয় হয় তা বলাই বাহুল্য।
রুম অভাবে শয়নের এত কষ্ট হয় যে, কোন কোন স্থানে পাশ ফিরারও উপায় নেই। প্রচন্ড গরম ও শীত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার অভাবে নিদ্রায় মধুরতা নেই।
স্বগৃহে থাকতে নিজেদের পরিবেশ অনুসারে ইসলামী পোশাক পরিধান করে থাকলেও মাদ্রাসায় এসে হাঁটুর নিচে অবধি লম্বা ও ঢিলা পাঞ্জাবী হতেই হবে, বেশী চক্চকে হলে চলবে না। মাথায় সর্বদা টুপি রাখতেই হবে, চুল এত ছোট করতেই হবে যেন আঙ্গুল দ্বারা ধরা না যায় ইত্যাদি অতিরঞ্জিত বাধ্য-বাধকতার কানুনে বহু ছাত্রের মনে এই ইলমের প্রতি 'নফ্রত' সৃষ্টি হয়।
কোন কোন প্রতিষ্ঠানে সপ্তাহে অথবা মাসান্তে একবার মুষ্ঠি আদায় করতেই হবে। দ্বীনের জন্য হাত পাততে বা সাহায্য চাইতে কোন লজ্জা না থাকলেও (গর্ব থাকলেও) পরিবেশ গুণে তা ঘৃণাহ ও লজ্জার কাজ। যার ফলে সংকোচ ও অপমান যেন গ্রাস করে ফেলে। ছাত্র গৃহিণীর কাছে ভর্ৎসনামূলক জবাব, দূর-দূরান্ত পথ পায়ে হেঁটে কায়িক পরিশ্রম, আত্মীয়-স্বজনের নিকট থেকে এ মর্মে লজ্জাকর কথা এবং সাধারণ বহু লোকের নিকট থেকেও টিপ্পনী শুনে মনকে ধরে রাখা নেহাতই কঠিন হয়ে পড়ে।
পক্ষান্তরে এ শিক্ষা ব্যাপক করতে সমাজের পূর্ণ সহায়তার প্রয়োজন। কারণ, ধর্মহীন সরকারের নিমগাছ থেকে আঙ্গুরের আশা করা যায় না। কিন্তু যাকাত না দিয়ে (নিজের নয় বরং) আল্লাহর প্রদত্ত ও আল্লাহর প্রাপ্য হক সমাজের মানুষের নিকট চাইতে গেলে তারা তা ভিক্ষা করা বলে। যা দেওয়া তাদের উপর ফরয এবং কেউ চাইতে না গেলে ঐ ভিক্ষাভান্ডের মাল তারা নিজেদের উদরসাৎ করে। যা ব্যয় করলে প্রকৃতপ্রস্তাবে নষ্ট হয়ে পায় না; বরং তার দুঃসময় ও দুর্দিনে উপকারার্থে জমা, গচ্ছিত ও বর্ধনশীল থাকে। সেই মাল আদায় করতে গেলে দ্বীনী প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের প্রতি ভ্রুকুটি হেনে কত গঞ্জনা, ভর্ৎসনা ও তিরস্কার শুনিয়ে থাকে। (যেমন, ভিক্ষাবৃত্তিতে সমাজের কি উপকার? মাদ্রাসায় ভিক্ষা পেশা শিক্ষা দেওয়া হয়, এসব পেট চালানোর বুদ্ধি, চাষ করে গিয়েছিল তাই দিতে হবে! ইত্যাদি।) অথচ মুসলিম হিসেবে মুসলিমের উচিত হল, যাকাৎ, ওশর, ফেৎরা ইত্যাদি দ্বারা নয় বরং নিজস্ব খাস অর্থ দ্বারা ঐসব প্রতিষ্ঠান চালানো।
কিন্তু আলহামদু লিল্লাহ, এসব কথা তারাই বলে থাকে যারা আল্লাহ ও পরকালে এবং দ্বীনের উপর পূর্ণ বিশ্বাস ও জ্ঞান রাখে না অথবা দ্বীনী শিক্ষা ও দরিদ্রের প্রতি কোন দরদ রাখে না। তাই অনেক ক্ষেত্রে তা মাতালের গালি বা পাগলের প্রলাপ মনে করে উপেক্ষা করে চলতে মাদ্রাসাকর্মীদের ধৈর্য হয়। অথচ প্রকৃতপক্ষে ভিক্ষাবৃত্তির পথ ওরাই প্রদর্শন করেছে। কারণ, ওরা যদি দ্বীনের কর্তব্য মনে করে 'ফান্ড বা চাঁদার' নামে অর্থ সাহায্য দিয়ে ঐ সব প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করার ব্যবস্থা করত তাহলে আর সেই শিক্ষাকে 'ভিখিরি বিদ্যা' বলে নাক সিঁটকে ঘৃণা করত না; যাকে ঘৃণা করলে এবং যা থেকে বিমুখ হলে 'কাফের' হতে হয়। এ তো চরম অন্যায় বিচার ও দৃষ্টিভঙ্গি যে, পার্টি বা অন্যান্য পার্থিব প্রতিষ্ঠান অথবা গান-বাজনা প্রভৃতির আসর পরিচালনা করতে যে অর্থ সংগ্রহ করা হয় তা হল 'চাঁদা' দেওয়া ও তোলা। আর দ্বীনী প্রতিষ্ঠানের উন্নতিকল্পে অর্থ সংগ্রহ করার নাম হল 'ভিক্ষা' করা ও দেওয়া! এমন বিচারে যে ঐ শ্রেণীর নিকৃষ্ট মানুষের দ্বীনের প্রতি চরম অনীহা ও বিদ্বেষ রয়েছে তা হয়তো তারা নিজেরাই অনুধাবন করে না!
অন্যদিকে এ এমন শিক্ষা যাতে পার্থিব বিলাস-ব্যসনে কোন লাভ নেই, ধর্মহীন দেশে কোন চাকুরী নেই। বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে চাকুরী পেলেও তেমন উল্লেখযোগ্য বেতন ও পারিশ্রমিক নেই। (অবশ্য এসব উদ্দেশ্যে দ্বীনী শিক্ষা বৈধ নয়।) তাতেও আদায় ঠিক মত না করতে পারলে চাকুরীর স্থায়ীত্ব ও নিশ্চয়তা নেই। যার ফলে এঁরা এক প্রকার সমাজের বোঝা! কেউ তো নিরুপায় হয়ে নিজের জন্য যাজ্ঞাকে অভ্যাস বানিয়ে নেন। যার ফলে সমাজে আরো ঘৃণার্হ হয় এই শিক্ষা।
এই সব অবস্থা দেখে আর সহজে কেউ মাদ্রাসায় ছেলে পাঠায় না। ছেলের মনে দ্বীনী স্পৃহা জন্ম নিলেও অভিভাবক বাধা প্রদান করে। যাতে অধিকাংশ ক্ষেত্রে শিক্ষার অবস্থা এই যে, একান্ত গত্যন্তরহীন গরীব, অধম ও অক্ষম ছেলে ছাড়া অন্য ছেলেরা খুব কম সংখ্যকই দ্বীনী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দ্বীন ও চরিত্র শিক্ষা করতে যায়।
বহু প্রতিষ্ঠানে সহশিক্ষার ফলে অথবা (জায়গিরী ব্যবস্থার দরুন) ঘরোয়া পরিবেশের সহিত অধিক মিলামিশার কারণে কিশোর-কিশোরী বা তরুণ-তরুণীর অবৈধ সম্পর্ক অলক্ষ্যে গড়ে উঠে। যাতে অনেকে ফেঁসে গিয়ে শিক্ষা থেকে হাত ধুয়ে ফেলে।
এত সবকিছুকে উল্লঙ্ঘন করে চলতে হবে। ঐসব সমস্যার সমাধান বের করে শিক্ষা ব্যবস্থাকে উন্নততর করার লক্ষ্যে সমাজের সহযোগিতা না পেলেও তাতে ধৈর্য ধারণ করতে হবে। নচেৎ এ সবে ধৈর্যহীনতা ইল্মের পথে বাধা হয়ে তালেব তথা সমাজকে জাহেল করেই রেখে দেবে।
আল্লাহ যেন সমাজে সেই সংস্কার দান করেন; যাতে দ্বীনী শিক্ষার পরিপূর্ণ অভ্যুদয় ঘটে এবং এমন উলামা তৈরী হন; যাঁরা তাঁর পথে ধৈর্যশীলতার সহিত দ্বীন ও সমাজের নিঃস্বার্থ সেবা করতে পারেন। আল্লাহুম্মা আমীন।
📄 ইলম্ তলবের পথে উলামাগণের উল্লেখযোগ্য সাধনা ও কষ্ট স্বীকার
হযরত যাবের (রাঃ) মাত্র একটি হাদীস শিক্ষা করার জন্য এক মাসের পথ শাম সফর করেছিলেন। হযরত আবু আইয়ুব আনসারী (রাঃ) মাত্র একটি হাদীস শ্রবণ করার জন্য মদীনা থেকে মিসর সফর করেছিলেন। (আল ইলমু যরুরাতুন শারইয়াহ ১৯পৃঃ)
মুহাম্মাদ বিন ইসহাক ১৭০০ উস্তাযের নিকট থেকে ইল্ম গ্রহণ করেছিলেন। যখন তিনি ইল্ম তলবের জন্য ঘর ছেড়ে বের হয়ে যান তখন তাঁর বয়স ছিল ২০ বছর। আর যখন ফিরে আসেন তখন তাঁর বয়স হয় ৬৫ বছর।
বাকী' বিন মাখলাদ ইমাম আহমদের নিকট ইল্ম শিক্ষার জন্য দুবছর ধরে পায়ে হেঁটে শামে যখন পৌঁছলেন তখন ইমাম কারাগারে বন্দী। খবর শুনে তিনি কেঁদে ফেললেন; বললেন, 'আমি যাঁর জন্য দুটি বছর ধরে হেঁটে সফর করে এলাম তিনি এখন জেলে!' পরে তিনি কোন প্রকারে ইমামের সহিত জেলে সাক্ষাৎ করলেন। উভয়ে স্থির করলেন যে, ভিখারীর বেশে বাকী' জেলখানায় আসবেন এবং আস্তিনের ভিতর কাগজ-কলম-কালি লুকিয়ে নিয়ে এসে হাদীস লিখবেন। সুতরাং ইমাম সাহেবের মুক্তি পর্যন্ত বাকী' ঐভাবেই জেলে গিয়ে ইল্ম শিখেছিলেন।
আবু হাতেম রাযী বলেন, প্রথম সফরে আমি সাত বছর কাটাই। ১০০০ ফরসখ (প্রায় ৩০০০ মাইল) এরও বেশী পথ পায়ে হেঁটে অতিক্রম করি। অতঃপর বাহরাইন থেকে মিসর পায়ে হেঁটেই যাত্রা করি। সেখান থেকে রান্না অতঃপর তুরসূস যাই। আমার বয়স তখন ২০ বছর। (তাযকিরাতুল হুফ্ফায ২/২৩৩)
ইবনুল জওযী বলেন, 'আমি ছোটবেলায় কিছু রুটি সঙ্গে নিয়ে ইল্ম তলবের জন্য বের হয়ে যেতাম। পরে রুটি শুকিয়ে যেত। শেষে এক লোকমা রুটি খেতাম ও তার সঙ্গে পানি পান করতাম। ইল্ম তলবের যে উদ্যম ছিল কেবল তারই ফলশ্রুতিতে এত কষ্ট বরণ করতে আমি মিষ্ট স্বাদ পেয়েছি।' (সাইদুল খাতের ২৩৫পঃ)
ইবনে আবী হাতেম বলেন, 'ইল্মের পথে আমরা মিসরে সাত মাস অবস্থান করি এর মধ্যে একটা দিনও রান্না করা তরকারী খায়নি। দিনের বেলায় উস্তাযদের নিকট কাটাতাম। আর রাতের বেলায় নোট করতাম ও সংশোধন করতাম। একদিন আমার সহপাঠী সহ এক উস্তাযের নিকট এলাম। শুনলাম তিনি অসুস্থ। ফেরার পথে একটা মাছ দেখে আমাদের পছন্দ হল। (ভাবলাম, বাসায় ফিরে পাকিয়ে খাব।) কিন্তু যখন বাসায় ফিরলাম তখন অন্য এক উস্তাযের নিকট হাযীর হওয়ার সময় হয়ে গেল। মাছ থাকল পড়ে। পাকানো আর হল না। পরিশেষে যখন পঁচে যাওয়ার কাছাকাছি হল তখন তা কাঁচাই ভক্ষণ করলাম! আর সত্য কথা যে, শরীরকে আরাম দিয়ে ইল্ম লাভ হয় না।' (তাযকিরাতুল হুফফায ৩/৮৩০)
ইবনে খারাশ বলেন, 'আমি ইল্ম ও হাদীস তলবের পথে ৫ বার (পিপাসায়) নিজের পেশাব নিজেই খেয়েছি!' (উলুউবুল হিম্মাহ ১৬৩পৃঃ)
আবু আব্দুল্লাহ হাকেম বলেন, 'একদিন আবুল আব্বাসের মসজিদে গেলাম। তিনি আসরের আযান দেওয়ার জন্য মিনারে খাড়া হলেন। কিন্তু আযানের পরিবর্তে উচ্চ শব্দে ‘আখবারানার রাবীউন্মু সুলাইমান, আখবারানাশ শাফেয়ী---’ বলতে লাগলেন! এ শুনে সকলেই হেঁসে উঠল। পরে তিনি আযান দিলেন। (আল আনসাব ১/২৯৭, আসিয়ার ১৫/৪৫৮)
একদা আবু বাক্স ইবনুল বাগেন্দী নামায পড়তে দাঁড়ালেন। তকবীর দিয়ে পড়তে শুরু করলেন, ‘হাদ্দাসানা মুহাম্মাদুবনু সুলাইমান----।’ লুকমাহ দেওয়া হলে তবেই তিনি সূরা ফাতিহা ধরলেন! অনুরূপ ঘুমের ঘোরেও কখনো কখনো তিনি হাদীস মুখস্থ পড়তেন। (উলুউবুল হিম্মাহ ১৮৫ পৃঃ)
আস্সাহেব খুব কিতাব ভালোবাসতেন। কিতাব কিনতে কিনতে এমন অবস্থা হয়েছিল যে, তা কোথাও বহন করার দরকার হলে ৪০০ উট লাগত। (আসিয়ার ১৬/৫১৩)
শায়খ আহমদ হাজ্জার কিতাব ভালোবাসতেন খুব। একদিন এক জায়গায় একটি কিতাব বিক্রি হতে দেখলেন। কিন্তু তাঁর নিকট দিরহাম ছিল না। তাঁর দেহে যে লেবাস ছিল তার কিছু বিক্রি করে সাথে সাথে সে কিতাবটি খরীদ করেছিলেন! (উলুউবুল হিম্মাহ ১৯১পৃঃ)
ইল্ম তলবের পথে ইমাম মালেকের অর্থের দরকার হলে তিনি নিজের ঘরের চালের কাঠ বিক্রয় করেছিলেন। (তারতীবুল মাদারিক ১/১৩০)
খতীব বাগদাদী যখন শামদেশ সফর করেন তখন তিনি তিন মাসের ভিতরে টীকা লেখা সহ ১০০ জিন্দ কিতাব পড়েন।
আল্লামা আলবানী নিজের দোকান বন্ধ করে যাহেরিয়া পাঠাগারে ১২ ঘন্টা কিতাব মুতালাআহ করতেন। (ইতহাফুল ইখওয়ান বিআহাম্মিয়াতিল ক্বিরাআহ ১২-১৪পৃঃ)
জাহেযের হাতে কোন কিতাব পড়লে তিনি তা না পড়ে ছাড়তেন না। কাতেবদের দোকান শুধু তাদের লিখিত কিতাব মুতালাআর জন্য ভাড়া নিতেন। (কিতাবুল হাইওয়ান, মুকাদ্দামাহ ৫পৃঃ)
তাঁর অতিরিক্ত ইল্ম ও আদব আসক্তির ফলে তিনি তিন-তিনবার নিজের উপনাম ভুলে গিয়েছিলেন! (তারীখুল বাগদাদ ১২/২১৪, মু'জামুল উদাবা' ৬/৫৬)
আবু অলীদ বাজী পাহারাদারদের মশালের ধারে বসে বই মুতালাআহ করতেন! (উলুউবুল হিম্মাহ ৩৮-৭পৃঃ)
ইমাম বুখারী রাতে শয়নাবস্থায় কোন জরুরী কথা মনে উদ্রেক হলে উঠে বাতি জ্বালিয়ে তা নোট করে নিতেন। পুনরায় বাতি নিভিয়ে শুয়ে আবার কিছু মনে পড়লে আবার উঠতেন ও বাতি জ্বালিয়ে লিখে নিতেন। এইরূপ কোন কোন রাতে তিনি ২০বার পর্যন্ত উঠতেন ও শয়ন করতেন! (আল বিদায়াহ অগ্নিহায়াহ ১১/১৫)
আবু যুরআহ বলতেন, 'লোকেরা যেমন 'কুল হুঅল্লাহু আহাদ' মুখস্থ রেখেছে তেমনি আমি দুলাখ হাদীস মুখস্থ রেখেছি। এছাড়া আমার মোট হাদীস স্মৃতিস্থ আছে তিন লাখ!' (সিফাতুস সাফওয়াহ ৪/৮৮)
ইমাম আহমদ উস্তায বাক্স বিন আইয়্যাশের দর্সে উপস্থিত হওয়ার জন্য ফজরের পূর্বে বাড়ি হতে বের হতেন। এ দেখে কোন অমঙ্গলের আশঙ্কায় তাঁর মা তাঁর জামা কাপড় লুকিয়ে দিতেন এবং বলতেন, 'বেটা আযান হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা কর।' (ইতহাফুল ইখওয়ান)
আবু মুহাম্মাদ ইবনুল আকফানী ইল্ম ও উলামার পথে ১লাখ দীনার ব্যয় করেছিলেন। (তারীখুল বাগদাদ ১০/১৪১, আআনসাব ১/৩৩৯, আসিয়ার ১৭/১৫২)
একদা আবু নাত্র সাজ্যীর নিকট এক মহিলা ১ হাজার দীনার পেশ করে বলল, 'আপনি এ অর্থ যেখানে খুশী সেখানে ব্যয় করুন।' তিনি অর্থের থলে নিয়ে বললেন, 'তোমার কোন প্রয়োজন আছে কি?' মহিলাটি বলল, 'আমার ইচ্ছা যে, আপনি আমার স্বামী হন। অবশ্য আমার স্বামীর প্রয়োজন আছে এমন নয়। (কারণ, আমি তো বৃদ্ধা মানুষ।) তবুও আমি আপনার খিদমত করব।' তিনি তার আবেদন না-মঞ্জুর করে বললেন, 'আমি সাজিস্তান থেকে ইল্ম তলবের নিয়ত করে বের হয়েছি। আর ইলমের সওয়াবের উপর অন্য কিছুকে প্রাধান্য দেব না।' (তাযকিরাতুল হুফফায ৩/১১৯, আসসিয়ার ১৭/৬৫৫)
হুমাইদীর জ্ঞানচর্চার আগ্রহ এত বেশী ছিল যে, তিনি গ্রীষ্মকালে রাত্রিবেলায় যখন ইল্ম নোট করতেন তখন গরমের হাত থেকে বাঁচার জন্য বড় পাত্রে পানি রেখে তার মাঝে বসে লিখতেন! (আসিয়ার ১৯/১২২)
জা'ফর ইবনুল মারাগী বলেন, একদা আমি তস্তরের কবরস্থানে প্রবেশ করে উচ্চ শব্দ শুনতে পেলাম, 'অলআ'মাশ, আন আবী সালেহ, আন আবী হুরাইরাহ। অল আ'মাশ, আন আবী সালেহ, আন আবী হুরাইরাহ----।' অনেক্ষণ ধরে এ শব্দ শোনার পর খোঁজ নিয়ে দেখলাম তো ইবনে যুহাইর এক স্থানে বসে হাদীস মুখস্থ করছেন।' অনেকে তাহাজ্জুদ পড়তে উঠে কিছু নামায পড়ার পর হাদীস মুখস্থ করতেন।
উলামাদের নিকট সময়ের মূল্য ছিল অনেক। কোন সময় ইল্মী চর্চা ছাড়া ফালতু যাক্ এ তাঁরা চাইতেন না। আমার এক আদর্শ উস্তাযকে বলতে শুনেছি যে, পড়ার জীবনে তাঁরা পায়খানা করার সময়টুকুও নষ্ট হতে দেননি! মীযানের 'ফাআলা-ফাআলা-ফাআলু' প্রভৃতি গর্দান (সূত্র) সেই সময় পুনরাবৃত্তি করতেন।
কারণ, যে সময় চলে যায় তা আর ফিরে আসে না। সুতরাং সুযোগের সদ্ব্যবহার করাই হল জ্ঞানীর কাজ। সময় হল তরবারীর মত। মানুষ সতর্ক না হলে তার সমুদয় কল্যাণ কেটে ধ্বংস করে। 'সময় চলিয়া যায়, নদীর স্রোতের প্রায়' কেউ তাকে ধরে রাখতে পারে না। সবচাইতে সত্বর ও সহজে যে জিনিস হাতছাড়া হয় তা হল মানুষের সময়। তাই তালেবে ইলমের নিকট সময় অধিক ও বিশেষভাবে যত্ন পাওয়ার যোগ্য।