📄 শিক্ষায় পর্যায়ক্রমহীনতা
ইলম শিক্ষায় ক্রমবর্ধমানতা ও ক্রমান্বয় জরুরী হওয়ার প্রসঙ্গে ওলামাগণ সকলেই একমত। যেহেতু ধীরে ধীরে স্বল্পাকারে অর্জন করা এবং এইভাবে কিছু সময় ধরে ইল্মে উদ্দিষ্ট বিষয় পূর্ণ করা ইল্ম শিক্ষার এক সুন্দরতম যুক্তিযুক্ত পদ্ধতি। এ পদ্ধতিটি কালাম মাজীদ হতে গৃহীত হয়েছে। আল্লাহ আয্যা অজাল্ল বলেন, অর্থাৎ, আমি খন্ড-খন্ডভাবে কুরআন অবতীর্ণ করেছি; যাতে তুমি তা মানুষের নিকট ক্রমে ক্রমে পাঠ করতে পার। আর আমি তা যথাযথভাবে অবতীর্ণ করেছি। (কুঃ ১৭/১০৬)
তিনি আরো বলেন, "কাফেররা বলে, 'সমগ্র কুরআন তার নিকট একেবারে অবতীর্ণ হল না কেন?' এ আমি তোমার নিকট এভাবেই অবতীর্ণ করেছি এবং ক্রমে ক্রমে স্পষ্টভাবে আবৃত্তি করেছি তোমার হৃদয়কে শক্ত ও দৃঢ় করার জন্য।” (কুঃ ২৫/৩২)
যুবাইদী বলেন যে, '(একটির পর একটি বিষয়ে জ্ঞানচর্চা কর্তব্য।) বর্তমান বিষয়ে দক্ষতা লাভ না করা এবং তা হতে প্রয়োজন না মিটবার পূর্বে পরবর্তী দ্বিতীয় কোন বিষয়ে জ্ঞানচর্চায় ধ্যান না দেওয়াই উচিত। কারণ একই কর্ণকুহরে (একই সময়) বিভিন্ন বিষয়ের ইলমের ভিড় মস্তিষ্ক ও বুদ্ধিমত্তাকে ভ্রান্ত ও বিক্ষিপ্ত করে ফেলে।
এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা ইঙ্গিত করেন, "যাদেরকে কিতাব দান করেছি তারা যথাযথভাবে তা পাঠ করে----।” (কুঃ ২/১২১) অর্থাৎ, তারা কিতাবের কোন বিষয় অতিক্রম করা না যতক্ষণ পর্যন্ত না তা সূক্ষ্ম ও সুন্দরভাবে শিক্ষা করে এবং সেইমত যথাযথরূপে আমল করে। (এবং এটাই হচ্ছে তেলায়তের হক বা যথার্থরূপে তেলায়ত করা।) কিন্তু দুঃখের বিষয় যে, আমরা কুরআনী চিনির আমল করি অথচ তার মিষ্টতা বুঝি না। সুরলহরীতেই তন্ময় হই। কিন্তু তা উপলব্ধি ও আমল করাতে যত্নবান নই।
অতএব শিক্ষার্থীর উচিত, প্রথম তাই দিয়ে শুরু করা যা তার জন্য একান্ত জরুরী। আর ধীরে ধীরে সেই দিকে অগ্রসর হওয়া যা অপেক্ষাকৃত কম জরুরী। তবে খেয়াল রাখতে হবে, যাতে এই জরুরী পর্যায় নিরূপণে কোন প্রকার ত্রুটি না ঘটে।
এই সূত্র ও নিয়ম-মাফিক না চলার কারণে বহু শিক্ষার্থী (চেষ্টা সত্ত্বেও) গন্তব্যস্থলে পৌঁছতে পারেনি। যেখানে তার উচিত ছিল, এক বিষয়ে যোগ্যতা লাভ করার পর অন্য বিষয়ের প্রতি ধাপে ধাপে আগে বাড়া। আর এইরূপে এক সমাপ্তিতে পৌঁছে যাওয়া। (শারহুল ইহয়্যা' ১/৩৩৪)
এই ক্রমোন্নতি দুটি ক্ষেত্রে হয়ে থাকে। কতকগুলি বিষয়ের মাঝে ক্রমোন্নয়ন অথবা কেবল মাত্র একটি বিষয়ের মাঝেই ক্রমোন্নয়ন। এই দুই ক্ষেত্রেই দুই ইলমী ক্রমবর্ধমানতা শিক্ষক ও কালপাত্র অনুসারে বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে। এখানে আমরা পাঠকের জন্য ওলামাগণের কয়েকটি নির্দেশ পেশ করব। যেটা তালেবের জন্য সহজ ও সুবিধা হবে ওস্তাদের সম্মতিক্রমে সেই নির্দেশে নিজের পাঠ্যজীবন এবং ইল্ল্মী সফর শুরু করবেন।
ইবনে জুরাইয বলেন, আমি আতার কাছে এলাম। আমার ইচ্ছা ইলম শিখব। দেখি তাঁর নিকট আব্দুল্লাহ বিন উবাইদ বিন উমাইর রয়েছেন। আমার প্রতি লক্ষ্য করে ইবনে উমাইর বললেন, 'তুমি কুরআন পড়েছ?' আমি বললাম, 'না।' তিনি বললেন, 'তবে যাও, কুরআন পড়। অতঃপর (অন্যান্য) ইলম অন্বেষণ কর।' আমি সেখান হতে চলে গিয়ে কিছুদিন ধরে কুরআন পড়লাম। অতঃপর আতার নিকট আবার এলাম। দেখি তাঁর নিকট আব্দুল্লাহ (ইবনে উমাইর) রয়েছেন। তিনি আমার উদ্দেশ্যে বললেন, 'ফারায়েয পড়েছ?' আমি বললাম, 'না'। তিনি বললেন, 'ফারায়েয শিখে ইলম তলব কর।' অতঃপর আমি ফারায়েয শিক্ষা করলাম তারপর তাঁর নিকট এলাম। তিনি বললেন, 'এবারে তুমি ইলম শিখ।' (আসিয়ার ৬/৩২৭)
আবুল আইনা বলেন, আমি আব্দুল্লাহ বিন দাউদের নিকট উপস্থিত হলাম। তিনি প্রশ্ন করলেন, 'কি উদ্দেশ্যে আসা হল?' আমি বললাম, '(হাদীস) শিখব।' তিনি বললেন, 'যাও আগে কুরআন হিফ্য কর।' আমি বললাম, 'কুরআন হিফ্য করেছি।' তিনি বললেন, 'পড়, আমি এক দশমাংশ পড়ে শেষ করলাম। অতঃপর তিনি আমাকে বললেন, 'এখন যাও ফারায়েয শিখে এস।' আমি বললাম, 'সুল্ব (ঔরষজাত সন্তান) জাদ্দ (পিতামহ, মাতামহ প্রভৃতি) এবং কুর (নিকটাত্মীয়) এর আহকাম শিখেছি।' তিনি প্রশ্ন করলেন, 'তবে তোমার ভাইপো ও তোমার চাচার মধ্যে কে তোমার অধিক নিকটবর্তী?' আমি বললাম, 'ভাইপো।' তিনি বললেন, 'তা কেন?' আমি বললাম, 'কারণ, আমার ভাই আমার মা হতে এবং চাচা আমার দাদা হতে। (আর দাদা হতে মা নিকটের।)' বললেন, 'যাও এখন আরবী ভাষা শিখ।' বললাম, 'আরবী তো ঐদুয়ের পূর্বেই শিখেছি।'
তিনি প্রশ্ন করলেন, 'হযরত উমর (রাঃ) কে যখন ছুরিকাঘাত করা হল তখন 'ইয়া লাল্লাহি অলিল মুসলিমীন!' কেন প্রথমটায় লামে যবর এবং দ্বিতীয়টায় যের দিয়ে বলেছিলেন?' বললাম, 'প্রথম লামটায় যবর দিয়েছেন; কারণ তা দুআ। আর দ্বিতীয়টায় যের দিয়েছেন কারণ তা ইস্তিগাসা এবং ইস্তিনসার।'
অতঃপর তিনি বললেন, 'যদি কাউকে হাদীস বর্ণনা করি তো তোমাকে অবশ্যই করব।' (আসিয়ার ৯/৩৫১)
ইবনে আব্দুল বার বলেন, 'ইল্ম তলবের ধাপ, পর্যায় ও অনুক্রম আছে যা উল্লংঘন ও অতিক্রম করা উচিত নয়। যে একেবারে উল্লঙ্ঘন করে আগে বাড়তে চায় সে সলফে সালেহীনদের পথ অতিক্রম করে চলে। আর যে ইচ্ছাকৃত তাঁদের পথ অতিক্রম করে সে পথভ্রষ্ট হয় এবং সে অনিচ্ছায় উত্তম ভেবে তা করে তার পদস্খলন ঘটে।' (আল জামে' ২/১৬৬)
ইউনুস বিন ইয়াযিদকে উদ্দেশ্য করে যুহরী বলেছেন, 'ইলমের ব্যাপারে অবিমৃশ্যকারী হয়োনা। কারণ, ইল্ম বহু উপত্যকার মত। যেখান দিয়ে চলতে শুরু করবে সমাপ্তির পূর্বেই তুমি নিজে হারিয়ে যাবে। তবে দিবা-রাত্রে কিছু কিছু করে গ্রহণ কর। একই সাথে সর্বপ্রকার ইল্ম শিক্ষা করার অপচেষ্টা করো না। কারণ যে একই সাথে সর্বপ্রকার ইলম সঞ্চয় করার ইচ্ছা করে তার সবটাই বিসস্মৃত হয়ে যায়। তাই একটার পর একটা বিষয়ে দীর্ঘকাল ধরে শিক্ষা কর।' (ঐ১/১০৪)
অতএব প্রথম ইলম, আল্লাহর কালাম কুরআন কারীম হিয্য করা তা বুঝা এবং তা বুঝতে যে ইল্ম সাহায্য করে (যেমন আরবী ভাষা, নহু, সর্ফ, তফসীর ইত্যাদি) তা শিক্ষা করা ওয়াজেব।
অবশ্য বলছি না যে, পুরো কুরআনই হিফ্য করা সকলের জন্য জরুরী। কিন্তু বলছি যে, যে ব্যক্তি (আলেমের মত) আলেম হতে চায় তার জন্য হিফ্য করা নিশ্চয় ওয়াজেব। তবে আল্লাহর তরফ হতে ফরয নয়।
সুতরাং যে কেউ সাবালক হওয়ার পূর্বেই কুরআন হিফ্য করে নেবে এবং তার পর তা বুঝার জন্য অন্যান্য জরুরী ইল্মের প্রতি অগ্রসর হবে তার জন্য পরবর্তী ধাপে কুরআনী উদ্দেশ্য এবং হাদীসের মমার্থ বুঝতে বড় সহায়তা ও সহযোগিতা লাভ হবে।
অতঃপর কুরআনের নাসেখ-মনসূখ (কোন আয়াত রহিত ইত্যাদি), তার আহকাম (আদেশ ও নিষেধ) এর বিষয়ে জ্ঞানার্জন করবে। কোনও বিষয়ে ওলামাগণের মতানৈক্য বা ঐক্য থাকলে তা ভালোরূপে জানবে। আর এরূপ যার জন্য আল্লাহ সহজ করেন তার জন্য খুবই সহজ। অতঃপর সহীহ ও (শুদ্ধ এবং হাসান) হাদীস অধ্যয়ন করবে। যার দ্বারায় কুরআনের ব্যাখ্যা ও মর্মার্থ প্রস্ফুটিত হয়ে উঠবে। বিশেষ করে হাদীস শরীফে বহু স্থানে কুরআনী অনেক বিষয় মনসূখ (রহিত) হওয়ার ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে তা জানা যাবে।
যে হাদীস পড়তে চাইবে তার উচিত, প্রসিদ্ধ ইমামগণের (যেমন বুখারী, মুসলিম ইত্যাদি) হাদীস গ্রন্থের উপর নির্ভর করা। সুতরাং সবকিছুর আগে তালেবে ইল্ম হাদীস শাস্ত্রে মনোযোগ দেবে, কুরআনী আহকাম আয়ত্ত করবে এবং ফকীহ ও ইমামগণের উক্তিসমূহ জেনে তা নিজের ইজতেহাদের সহযোগী করবে এবং গবেষণা ও আলোচনা- দ্বারের চাবি করবে, যে হাদীসের একাধিক অর্থ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে সে হাদীসের যথার্থ ব্যাখ্যা খোঁজার চেষ্টা করবে। ইমামগণের কারো এমন তকলীদ করবে না যেমন সুন্নাহ (হাদীস) এর করা হয়; যার অনুসরণ ও তকলীদ করা বিনা দ্বিধা ও ভাবা-চিন্তায় সর্বাবস্থায় জরুরী। বিগত উলামাগণের মত সুনান (হাদীস) সস্মৃতিস্থ রেখে তার উপর বিভিন্ন গবেষণা করবে। ঐ চিন্তা-গবেষণায় ও কোন সমস্যার সমাধানের খোঁজে তাঁদের অনুসরণ করবে। ঐ দ্বার উদ্ঘাটনের জন্য, তাঁদের দ্বীনী খিদমতের শত প্রচেষ্টার জন্য এবং তাঁদের দ্বারা নিজে উপকৃত হওয়ার জন্য তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করবে। তাঁদের সঠিক নির্দেশ ও সমাধানের উপর -যা তাঁদের উক্তির অধিকাংশেই বিদ্যমান- প্রশংসা করবে। অবশ্য তাঁদের পদস্খলন বা ভুল-ত্রুটি যে হয়নি তা মনে করবে না। যেমন সে নিজেকেও এ ব্যাপারে ত্রুটি-বিচ্যুতিমুক্ত ধারণা করবে না। এই শিক্ষার্থীই প্রকৃতপক্ষে সলফের অনুগামী হবে। আর সে-ই ইল্মের যথেষ্ট অংশ লাভ করবে, সুপথ ও সুমতের অধিকারী হবে। প্রিয় নবী এর নির্দেশ ও সাহাবায়ে কেরামের আদর্শের অনুবর্তী হবে।
ইবনুল জওযী বলেন, 'সকলের জানা আছে যে, সকলের বয়স স্বল্প! এবং ইল্ম কত বেশী। তাই শিক্ষার্থীর উচিত, প্রথমতঃ কুরআন পড়া ও হিফ্য করা দিয়ে ইল্ম আরম্ভ করা। তফসীরের প্রতি এমন মধ্যম দৃষ্টি দেওয়া যাতে কোন বিষয় অস্পষ্ট থেকে না যায়। ঐ সাথে সাবআ ক্বিরাআত এবং আরবী সাহিত্য ও ব্যাকরণের বই পড়াও সঠিক।
অতঃপর হাদীসের মূল গ্রন্থগুলি পড়তে শুরু করবে, যেমন সিহাহ! (বুখারী, মুসলিম) মাসানীদ (মুসনাদে আহমদ, মুসনাদে আবী য়্যা'লা)! সুনান (আবু দাউদ, তিরমিযী, নাসায়ী, ইবনে মাজাহ) ইত্যাদি। আর সাথে সাথে ইল্মে মুস্তালাহুল হাদীস বা ওসূলে হাদীস (যার দ্বারা হাদীসকে যয়ীফ ও জাল হতে পৃথক করা সম্ভব হয় তা) পড়বে। যয়ীফ ও তদপেক্ষা নিম্নমানের বর্ণনাকারীদেরকে চিহ্নিত করার জন্য রেজালশাস্ত্র পড়বে; যা ওলামাগণ এমনভাবে সুসজ্জিত ও গচ্ছিত করে গ্রন্থাকারে প্রকাশ করেছেন যাতে শিক্ষার্থীকে এমন কোন বেশী কষ্ট স্বীকার করতে হবে না।
তারীখ বা ইসলামী ইতিহাস ততটুকু পড়বে যতটুকু জানা একান্ত দরকার। যেমন প্রিয় নবী এর বংশ, আত্মীয়-স্বজন ও পত্নীগণের অবস্থা সম্পর্কে অনেক কিছু জানবে। অতঃপর ইলমে ফিক্ এর প্রতি অগ্রসর হবে। মযহাব ও মতানৈক্যের বিষয়ে গবেষণা করবে। যে সব সমস্যায় মতভেদ আছে সে সবেই অধিক ধ্যান দেবে। সমস্যাটিতে কেন এত মতভেদ দেখা দিল তার কারণ খোঁজার চেষ্টা করবে এবং তার মূল উৎস থেকে প্রকৃত সমাধান জানার প্রচেষ্টা চালাবে। যেমন আয়াতের তফসীর, হাদীসের ব্যাখ্যা এবং শব্দার্থ জানার জন্য বিশেষ অভিধান ব্যবহার করবে।
ওসুলে ফিক্হ (সমস্যার সমাধানে সঠিক জ্ঞানলাভের নিয়মনীতি) এবং ফারায়েয পড়বে। আর মনে রাখবে যে, সমস্ত ইলমের নির্ভরস্থল হচ্ছে ফিকহ।'
ওলামাদের তরফ থেকে আমাদের জন্য এ কয়টি ইল্ম তলবের নির্দেশনামার স্বর্ণখন্ড ছিল। যা আমাদের সময় বাঁচাবার উদ্দেশ্যে। আমাদেরকে তাঁরা উপহার দিয়ে গেছেন; যা তাঁদের জীবনে এক অভিজ্ঞতা ছিল। যাতে আমরা আমাদের ইল্ম ও জ্ঞানের বুনিয়াদ শক্ত ভূমিতে বদ্ধমূল করতে পারি। আর যথাসম্ভব ইল্মী স্বর্ণসৌধ নির্বিঘ্নে নির্মাণ করতে পারি। তাই তো আমাদের উচিত, আমরা যেন তাঁদের নির্দেশিত পথ হতে দূরে চলে না যাই। নচেৎ আমাদের ইল্মী পথে নানান বাধা, বিপত্তি ও বন্ধুরতা পরিদৃষ্ট হবে।
আল্লাহ তাআলা ইবনে আব্দুল বার এর উপর রহম করেন তিনি তাঁর যুগের শিক্ষার্থীদের প্রতি আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, 'আমাদের এ যুগের ও এই দেশের শিক্ষার্থীরা তাদের সলফে সালেহীনদের পথ হতে দূরে সরে পড়েছে এবং ইল্ম অন্বেষণে এমন পথ অবলম্বন ও পছন্দ করেছে যা তাদের ইমামগণ জানতেন না। আর এ বিষয়ে বহু কিছু নতুন করে রচনা করেছে যার দ্বারায় তাদের মূর্খতাই প্রকাশিত হয়েছে এবং প্রকৃত ওলামাদের মর্যাদা হতে তারা বহু নিম্নে রয়ে গেছে।' (জামে' ২/১৬৯)
ইবনুল জওযী (রঃ) শিক্ষার্থীদের জন্য এক পাঠ্যসূচী নির্দিষ্ট করে বলেন, 'শিক্ষার্থীর শৈশবে প্রথমতঃ তাকে যে ভার দেওয়া হবে তা হচ্ছে, পাকাপোক্তভাবে কুরআন হিফ্য করা। কারণ, ঐ সময় হিফ্য তার রক্তে- মাংসে সংমিশ্রিত হয়ে চিরস্থায়ী হয়ে যাবে। অতঃপর নহু (আরবী ব্যাকরণ), অতঃপর মযহাব ও মতানৈকের উপর ফিক্হ্ন। আর এরপর যা তার দ্বারা হিফ্য করা সম্ভব তা করলে খুবই উত্তম।' (সাইদুল খাতের ২৪৪পৃঃ) এই সূচীর উপর হাদীস ও তার মুস্তালাহর ইল্মকে যোগ করা যায়। যাতে তার ফিক্হ্ন (ধর্মীয় জ্ঞান) কুরআন ও সহীহ হাদীসের উপর ভিত্তি করে পূর্ণতা ও বিশুদ্ধতাপ্রাপ্ত হয় এবং তার সাহায্যে শিক্ষার্থী মর্যাদার সমুচ্চ শিখরে আসীন হতে পারে।
শায়খ আব্দুর রহমান সা'দী (রঃ) বলেন, 'ফলপ্রসূ ইলম; যে ইলম হৃদয় ও আত্মকে পবিত্র করে, ইহ-পরকালের সুফল দান করে - তা হচ্ছে আল্লাহর রসূল এর বর্ণিত হাদীস, তফসীর, ফিকহ এবং মানুষের কালপাত্র ভেদে সেই সমস্ত আরবী (বা অন্যান্য ভাষায়) ইল্ল্ম যা কুরআন, হাদীস প্রভৃতি বুঝতে সহায়ক হয়।
কিন্তু কোন্ কোন্ বই-পুস্তকের সাহায্যে ইলম অর্জন সহজ হবে তা নির্দিষ্ট করা অবস্থা ও দেশ অনুপাতে ভিন্ন হতে পারে। আমাদের ধারণায় একটা মোটামুটি নির্দেশসূচী এই যে, শিক্ষার্থীর উচিত প্রতি ইলমের সংক্ষিপ্তসার প্রথমতঃ হিফ্য করার প্রচেষ্টা করা। যদি শাব্দিকভাবে স্মৃতিস্থ করতে অক্ষম হয় তবে তার উচিত, তা বারবার এমনভাবে পড়া যাতে তার মূল অর্থ হৃদয়ে গাঁথা যায়। এই সংক্ষিপ্তসার মুখস্থের পর অন্যান্য কিতাব-পত্র যেমন, ব্যাখ্যা ও টিপ্পনী পুস্তক পড়বে; যা ঐ সংক্ষিপ্তকে বিশদরূপে হৃদয়ে বিকশিত করে তুলবে। (এবং এইভাবে মূলের সঙ্গে ব্যাখ্যার সম্পর্ক রেখে পড়লে ইল্ম স্মৃতিস্থ করা খুবই সহজ হবে।)
অতএব যদি শিক্ষার্থী আকিদায় আকীদাহ ওয়াসেতিয়াহ, সালাসাতুল ওসূল, কিতাবুত তাওহীদ ও আকীদাহ তাহাবীয়াহ যেমন ছোট ছোট কিতাব মুখস্থ করে, ফিকহে মুখতাসারুদ দলীল, মুখতাসারুল মুকনে', হাদীসে বুলুগুল মারাম, নহুতে আল আজরুমিয়াহ (বা হেদায়াতুন নহু)। ইত্যাদি মুখস্থ করে এবং ঐ সমস্ত কিতাবের মূল বক্তব্য বুঝার চেষ্টা করে আর তার উপর ঐ সবের ব্যাখ্যা পুস্তক অথবা ঐ বিষয়ক কোন সাধারণ পুস্তক পাঠ করে তবে তার জন্য সব সহজ হয়ে যাবে। কারণ, তালেবে ইলম যখন ওসূল (মূল) মুখস্ত করে এবং তা বুঝতে যদি সক্ষমতা লাভ করে তবে তার জন্য ঐ বিষয়ক ছোট বড় কোনও কিতাব পড়তে বা বুঝতে কোনই অসুবিধা হয় না। আর যে মূল হারাবে সে সফলকাম হবে না।
অতএব যে ব্যক্তি দ্বীনী ফলপ্রসূ ইলমের প্রতি লোভ রাখে এবং তার সন্ধানে আল্লাহর সাহায্য নেয়; আল্লাহ তাকে সাহায্য করেন এবং তার ইলমে ও চলার পথে বর্কত দান করেন। আর যে ব্যক্তি ইলমের সন্ধানে উপকারী পথ ত্যাগ করে অন্য পথে চলে, তার কেবল সময়ই বরবাদ হয় এবং কষ্ট ব্যতীত অন্য কিছু লাভ হয় না। যেমন সকলের অভিজ্ঞতা ও প্রত্যক্ষে তা বিদিত।' (ফাতওয়া সা'দিয়াহ ৩০-৩১পৃঃ)
শায়খ (রঃ) এর তরফ হতে এটি একটি সুচিন্তিত অভিমত যা যত্ন ও মান্য করার উপযুক্ত। ওলামাদের জীবনী পড়লেও দেখা যায় তাঁরা এই পথ হতে কেউই বিচ্যুত হননি; যে পথে তাঁরা মর্যাদার শেষ মঞ্জিলে পৌঁছে গিয়েছিলেন।
এখানে তালেবে ইলমকে জেনে রাখা উচিত যে, ফিকহের উপর ঐ কিতাব মুখস্থ করায় আমাদের উৎসাহ দান নিন্দিত অন্ধানুকরণ বা তকলীদের প্রতি আহ্বান নয়। বরং আমাদের ঐ অনুপ্রেরণা দান কয়েকটি লাভের জন্য। যেমন, ঐ হিফ্যে শিক্ষার্থী ঐ সকল গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে একটা শক্ত বুনিয়াদের মালিক হবে। এবং ঐ সংক্ষিপ্ত পুস্তিকায় লিখিত সমস্ত মাসআলা (সমস্যা) তার সস্মৃতিস্থ হবে। যাতে ভবিষ্যতে অন্যান্য মাসায়েল তার নিকট তালগোল খেয়ে না যায় এবং প্রত্যেক আহকামের মধ্যে পার্থক্য নির্বাচন করতেও সক্ষম হয়। যেমন, পর্যায়ক্রমে ধীরে ধীরে ইজতেহাদী মর্যাদায় উন্নত হতে সে প্রচেষ্টা করবে। আর এই সব সংক্ষিপ্ত পুস্তিকা সেই সুউচ্চ আশার প্রতি সোপানাবলীর প্রথম সোপান।
আবার ঐগুলি মুখস্থ করার অর্থ, তার সবটার দ্বারা আমল করাও নয়। যেহেতু তা পড়ার জন্য ওস্তাযের একান্ত প্রয়োজন; যিনি কঠিনকে সহজ করে বুঝিয়ে দেবেন। অস্পষ্ট বাক্যকে ব্যাখ্যা করে স্পষ্ট করে দেবেন। বিভিন্ন মতানৈক্যের মাঝে কোন্ মতটি সঠিক তা কিতাব, সুন্নাহ ও যুক্তির আলোকে পরিস্ফুটিত করে তুলবেন। অনেকে তো নিজেদের ফিক্হের আলোকে হাদীসের দূর-ব্যাখ্যা করেন অথবা খণ্ডন করেন। কিন্তু ঐ সালাফী ওস্তায (সহীহ) হাদীসের আলোকেই ফিক্হ ও রায়ের খণ্ডন করবেন।
অবশ্য এই বিতর্ক ও আলোচনায় প্রবেশ করলে খুবই দীর্ঘতায় পড়ে যাব; যা আমরা চাইনা। তবে এই মর্মে মহান সুলেখক, সম্মানিত মুরব্বী, আল্লামাহ যাহাবী (রঃ) এর কতক উক্তি নকল করছি। যিনি প্রত্যেক মানুষকে তার সঠিক মর্যাদা দিয়ে বলেছেন, 'যে ব্যক্তি ইজতেহাদের মর্যাদায় পৌঁছে যাবে এবং এর উপর তার জন্য কয়েকজন ইমাম সাক্ষি দিবেন তার জন্য তকলীদ বৈধ নয়। যেমন, যে ব্যক্তি ফিকহ পড়তে শুরু করেছে এবং যে সাধারণ ব্যক্তি পুরা অথবা কিছু কুরআন হিফ্য করেছে তার জন্য ইজতেহাদ আদৌ বৈধ নয়। সে কেমন করে ইজতেহাদ করতে পারে? কি বলবে সে? কার উপর ভিত্তি করবে? কেমন করে উড়বে সে, যার এখনো ডানা গজায়নি?
আর তৃতীয় প্রকার মানুষ, যিনি ফিক্হ্ন পড়ে শেষ করেছেন, সজাগচিত্ত ও সমঝদার মুহাদ্দিস মানুষ, যিনি ফরু' (গৌণ আহকামের) সংক্ষিপ্ত পুস্তকাদি এবং ওসূল (মুখ্য)-এর নিয়মনীতি হিফ্য করেছেন, নহু পড়েছেন, ফাযায়েলে শরীক হয়েছেন এবং সাথে সাথে কুরআন মাজীদ হিফ্য করেছেন, তার তফসীর ও ভাবালঙ্কার অধ্যয়নে রত হয়েছেন তিনিই এক নির্দিষ্ট ইজতেহাদের মর্যাদায় উন্নীত হয়েছেন। তিনিই ইমামগণের দলীলসমূহের উপর চিন্তা-গবেষণা ও বিচার-বিবেচনা করার উপযুক্ত হয়েছেন। তাই যখনই কোন মাসআলায় (সমস্যায়) তাঁর নিকট হক ও সঠিকতা পরিস্ফুটিত হয়ে উঠবে এবং তাতে নস্ (পাকা, স্পষ্ট ও অকাট্য দলীল) প্রমাণিত হবে এবং প্রসিদ্ধ ইমামদের মধ্যে কেউ তার উপর আমল করে থাকবেন---- তখনই তার অনুসরণ করবেন, আর সেটাই সঠিক। ফাঁক খোঁজার পথে চলবেন না। (অর্থাৎ যে বিষয় করতে হবে বলে প্রমাণিত সে বিষয়ে কারো মতানুযায়ী না করার ছাড় বা অনুমতি থাকলে তা গ্রহণ করবেন না।) আর সংযমশীলতা অবলম্বন করবেন। এ ক্ষেত্রে তাঁর নিকট দলীল স্পষ্ট ও প্রমাণিত হবার পর তাঁর জন্য আর কারো তকলীদ (অন্ধানুকরণ) করার প্রশস্ততা নেই।'
অতএব আল্লাহ তাঁকে রহম করেন; যিনি নিজের আত্মার কদর জেনেছেন এবং তাকে তার নির্দিষ্ট মর্যাদাধাপের ঊর্ধ্বে উত্তোলন করেননি। যিনি সলফে-সালেহীনদের পথ ও পদ্ধতিমতে ইল্ম অনুসন্ধান করেছেন। তিনিই সকলকাম ইনশা-আল্লাহ।
অবশ্য ইলমের এই লম্বা ফিরিস্তি দেখে তালেবে ইলমের ঘাবড়ে যাওয়া উচিত নয়। কারণ:-
'এক পা দুই পা করি ধীরে ধীরে অগ্রসরি
করে নর অতি উচ্চ গিরি উল্লঙ্ঘন।'
তাছাড়া মাদ্রাসার সিলেবাসে এ ধরনের সিস্টেম না থাকলেও মান্তেক, ফালসাফা প্রভৃতির উপর বৃথা সময় ব্যয় না করে অন্যান্য তফসীর ও হাদীস বিষয়ক পাঠ্যসূচীর প্রতি বিশেষ দৃষ্টি রেখে উপরোক্ত ফিরিস্তি অনুযায়ী চলতে পারলে ইনশাআল্লাহ বড় আলেম হওয়ার স্বপ্ন বাস্তবে পরিণত হবে।
📄 অহংকার ও গর্ববোধ
পাপ ও আল্লাহ তাআলার অবাধ্যতা শরয়ী ইলমের পথে এক প্রতিবন্ধক। যেহেতু ইলম আল্লাহর নূর (জ্যোতি)। তিনি যার হৃদয়ে ইচ্ছা সেই নূরকে বিচ্ছুরিত করে থাকেন। পরন্তু পাপ অন্ধকার। আর আলো ও অন্ধকার একই স্থানে, একই হৃদয়ে একত্রিত হতে পারে না। এই জন্যই হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন, 'আমার ধারণা যে, কোন কৃতপাপের ফলেই মানুষের জ্ঞাত ও অর্জিত ইলম বিস্মৃত হয়ে যায়।' (জামে' ১/১৯৬)
ইমাম শাফেয়ী বলেন, 'আমি (আমার ওস্তাদ) অকী' (রঃ) এর নিকট স্মরণশক্তির স্বল্পতার অভিযোগ করলাম, তিনি আমাকে পাপকর্ম (সর্ব প্রকার ধর্মীয় অবাধ্যতা) ত্যাগ করতে নির্দেশ দিলেন এবং আমাকে জানালেন যে, ইলম আল্লাহর নূর। আর আল্লাহর নূর কোন অবাধ্য গোনাহগারকে উপহার দেওয়া হয় না।
পাপের সবটাই নিকৃষ্ট। তন্মধ্যে তালেবে ইলম, শিক্ষার্থী বা আলেমরা অধিক যে নিকৃষ্ট পাপে জড়িত তা হচ্ছে, অপরকে ক্ষুদ্র ও তুচ্ছজ্ঞান, অহংকার, আত্মগর্ব ও হামবড়াই। তাই তো অনেকে 'বড়াই' এর ময়দানে নিজেকে অপ্রতিদ্বন্দ্বী মনে করেন এবং তাঁর মন অথবা অবস্থা বলে, 'হাম জ্যায়সা কোঈ নেহী!' এইভাবে লেবাসে, আচরণে, চলনে, বলনে, ভাবে, ভঙ্গিমায় নিজের আত্মম্ভরিতা প্রকাশ করে তোলেন। যা আল্লাহ পাক কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেন, অর্থাৎ, অহংকারবশে তুমি মানুষকে অবজ্ঞা করো না এবং পৃথিবীতে উদ্ধতভাবে বিচরণ করো না। কারণ, আল্লাহ কোন উদ্ধত, অহংকারীকে ভালোবাসেন না। (কুঃ ৩১/১৮ আয়াত) অন্যথায় বলেন, "এ পরলোক যা আমি নির্ধারিত করি তাদের জন্য! যারা এ পৃথিবীতে উদ্ধত হতে ও বিপর্যয় সৃষ্টি করতে চায় না। মুত্তাকী (সাবধানী) দের জন্য শুভপরিণাম।” (কুঃ ২৮/৮৩)
সহীহায়নে আবুহুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, আল্লাহর রসূল বলেন, “কোন এক সময়ে এক ব্যক্তি (এক প্রকার সুন্দর) জামা পরিধান করে (কোন পথে) চলছিল। যাতে সে মনে মনে বড় গর্ব অনুভব করছিল। যার মাথার কেশ ছিল বিন্যস্ত। চলনে ছিল অহংকার। এমতাবস্থায় আল্লাহ পাক তাকে নিয়ে ভূমি বিধ্বস্ত করলেন। সে কিয়ামত অবধি ঐ ভূমি নীচে প্রবিষ্ট হতেই থাকবে।” (বুখারী, মুসলিম প্রমুখ)
ইবনুল জওযী বলেন, 'ইল্ল্ম অধিক অধিক বর্ধিত করা উত্তম কাজ। কারণ, যে ব্যক্তি মনে করে যে, সে যা শিখেছে তাই যথেষ্ট, সে নিজেরই রায় ও অভিমতকে সঠিক ও অদ্বিতীয় মনে করবে। তখন সে নিজেকেই বড় ভাববে এবং ঐ ভাবনা অন্যান্য ইল্মী উপকার লাভ করা হতে বাধ সাধবে। আবার প্রকৃত সঠিকতা ও শুদ্ধতা হতে বঞ্চিত হবে ওই অহম্ চিন্তায়।'
আলী বিন সাবেত সত্যই বলেছেন, 'ইলমের আপদ অহংকার ও ক্রোধ এবং সম্পদের আপদ অপচয় ও অযথা ব্যয়।'
মুজাহিদ বলেন, 'লাজুক ও অহংকারী ইল্ম লাভ করতে পারে না।' (বুখারী, দারেমী)
আইয়ুব সখতিয়ানী বলেন, 'আলেমের জন্য উচিত, আল্লাহর জন্য বিনয় প্রকাশ করে মাথার উপর মাটি রাখা।'
অনেকে বলেছেন, 'নম্র ও বিনয়ী শিক্ষার্থী (তালেবে ইল্ম) এরই অধিক ইল্ম থাকে। যেমন অন্যান্য জমি হতে নিচু জমিতেই পানি অধিক থাকে।'
একজন হাকীম (বিজ্ঞলোক) কে প্রশ্ন করা হল, এমন কোন্ সম্পদ আছে যার উপর তার মালিকের প্রতি কেউ হিংসা করে না? তিনি বললেন, 'বিনয়।' প্রশ্ন করা হল, 'এমন কোন বালা আছে যার উপর বালাগ্রস্তকে দয়া প্রদর্শন করা হয় না?' তিনি উত্তরে বললেন, 'অহংকার।'
সুতরাং তালেবে ইল্মের ও আলেমের উচিত, নিজ ইল্ম নিয়ে কোন প্রকারের গর্ব ও অহংকার না করা। যেহেতু তা এমন এক নিকৃষ্টতম আচরণ যার ফলে আল্লাহ ক্রোধান্বিত হন, মুমিনরাও রাগান্বিত হয়। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য নম্র ও বিনয়ী হবে আল্লাহ তাকে উন্নীত করবেন। পক্ষান্তরে যে তাঁর জন্য বিনয়ী হবে না তাকে তিনি অবনমিত করবেন।'
যদি এ ধরনের কোন গর্ব-চিন্তা কারো মনে জাগরিত হয় তবে তাকে তার পরিণাম ও কুফল স্মরণ করা উচিত এবং ভাবা উচিত যে, তার থেকে কত বয়োকনিষ্ঠ আছে যারা তার চেয়ে ইলমে অনেক বড়।
এযুগে কিছু লোকের এমন বিপত্তি প্রকাশিত হয়েছে যারা একটি বা দু'টি কিতাব (উর্দু ফিক্হ বা অন্য কোন কিতাব) পড়ে নিয়েছে, কিছু মসআলা হিফ্য করেছে, তারপর দু'দিন পরেই মুজতাহিদ হয়ে ফতোয়া দিতে শুরু করেছে। আবার এই নীচ খেয়াল হতেই শেষ নয়; বরং তারা প্রকৃত ওলামাদের চেয়ে নিজেদেরকে বড় ও অধিক জ্ঞানী ভাবতে বসেছে এবং নিজ দ্বারাই নিজেকে সবার চেয়ে উঁচু আসনে আসীন করেছে। যে আসন তার ধারণায় অন্য কেউ পাবার যোগ্য নয়। যে মনোভাব তাদের লেবাসে-পোশাকে, চলনে-বলনে ও ধর্মীয় বিতর্ক লুফায় প্রকাশ পায়। যেখানে প্রকৃত আলেম চুপ থাকেন সেখানে তাদের অনেকেই ফতোয়ার মুখে খই ফুটিয়ে থাকে। (ইন্না লিল্লাহি অইন্না ইলাইহি রাজেউন)।
এমন মুন্শীদের দ্বারা কত যে ক্ষতি হতে পারে, এবং কোন লাভ যে হতেই পারে না তাছাড়া তারা যে কত মূর্খ তা বলাই বাহুল্য। আল্লাহ যেন তাদেরকে সুপথ প্রদর্শন করেন। আমীন।
ঐ প্রকৃতি ও আচরণের নীম আলেমদের প্রতি ইঙ্গিত করে আল্লামা ইবনুল জওযী (রঃ) বলেন, 'বহু ওলামা ও আবেদের উপর সমালোচনা করা হয়েছে যে, তারা অহংকার গুপ্ত রাখে (তারা মনে মনে গর্বিত)। কেউ নিজকে উচ্চপদস্থ ভাবে এবং তার থেকে কেউ বড় হোক তা চায় না। কেউ আবার দরিদ্র রোগীর অবস্থা জিজ্ঞাসা করে না। মনে করে সে তার চেয়ে অনেক উত্তম। এদের অধিকাংশই অহংকারী। কিন্তু বিস্ময়ের বিষয় যে, তারা গর্ব করে কি নিয়ে?
যদি ইলম নিয়ে করে, তবে তার থেকে কত বড় আলেম অগ্রগামী আছেন। আর যদি ইবাদত নিয়ে করে তবে তার চেয়ে কত বড় আবেদও অগ্রণী আছেন। পরন্তু যে ব্যক্তি নিজের আচরণ ও পাপ পরিদর্শন করে থাকে সে জানতে পারবে যে, নিঃসন্দেহে সে পাপ ও ঔদাস্যে বাস করে। আর সে অপরের অবস্থা সম্পর্কে সন্দিহান থাকবে।'
অতএব সতর্কতার বিষয় যে, আত্মগর্বানুভব করা এবং পরকালের বিষয়ে নিজেকে অগ্রগামী ভাবা অত্যন্ত নিন্দনীয় ও সর্বনাশী জিনিস। সেহেতু প্রকৃত মুমিন এসব বিষয়ে নিজেকে তুচ্ছ মনে করে।
ওমর বিন আব্দুল আযীয (রঃ) কে বলা হল, 'আপনার ইন্তেকাল হলে আপনাকে রসূল এর হুজরায় সমাধিস্থ করব কি?' তিনি বললেন, 'আমি নিজেকে তার উপযুক্ত মনে করার (পাপের) চেয়ে শির্ক ব্যতীত সর্বপ্রকার গোনাহ নিয়ে আল্লাহর সহিত সাক্ষাৎ করা আমার নিকট পছন্দনীয়।' (সাইদুল খাতের ২৮২পৃঃ)
'তাহযীবুল ইহয়্যা'তে বলা হয়েছে, 'ইল্ম নিয়ে অহংকার ও ফখর সব চেয়ে বড় আপদ এবং মারাত্মক ব্যাধি; যাতে অত্যন্ত প্রচেষ্টা ও কঠিন পরিশ্রম ব্যতীত কোন চিকিৎসাই ফলপ্রসূ হয় না। কারণ, ইলমের কদর ও মর্যাদা আল্লাহর নিকট বিরাট বড়। আর মানুষের নিকটেও ধন-দৌলত ও রূপ-সৌন্দর্য অপেক্ষা ইল্ল্মই উৎকৃষ্টতম।'
দু'টি জিনিস জানা ছাড়া কোন আলেমই মন হতে গর্ব ও অহংকার মুছে ফেলতে পারেন না। প্রথমতঃ- জানা উচিত যে, আহলে ইলমের উপর আল্লাহর হুজ্জত (শাস্তির প্রমাণ) অধিক শক্ত। তিনি জাহেলদের ব্যাপারে যা সহ্য করবেন তার এক দশমাংশ আলেমদের ব্যাপারে সহ্য করবেন না। কারণ, জেনেশুনে আল্লাহর অবাধ্যতা করে যে- সে জ্ঞানপাপীর অপরাধ অধিক গুরুতর ও নিকৃষ্টতর। যেহেতু আল্লাহর প্রদত্ত ইল্মী নেয়ামতের কদর সে করে না।
দ্বিতীয়তঃ জানা উচিত যে, গর্ব আল্লাহ ব্যতীত কারো জন্য উপযুক্ত নয়। তিনি ছাড়া কেউ গরিমার যোগ্যও নয়। তাই যদি সে গর্ব করে তবে আল্লাহর নিকট অবশ্যই সে ঘৃণ্য ও ক্রোধের পাত্র হয়ে যাবে। প্রিয় নবী বলেন, "আল্লাহ বলেন, 'সম্ভ্রম, ইজ্জত ও বিজয় আমার পরিধেয় বস্ত্র, গৌরব গরিমা আমার চাদর, অতএব (এতে) যে আমার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চাইবে আমি তাকে শাস্তি দেব।” (মুসলিম)
আল্লাহর রসূল আরো বলেন, “সে ব্যক্তি বেহেশতে যাবে না যার হৃদয়ে ধূলিকণা পরিমাণও অহংকার থাকবে।” তখন এক ব্যক্তি বলে উঠল, 'যদি কোন মানুষ চায় যে, তার পোশাক সুন্দর হোক, তার জুতা সুন্দর হোক তাহলে?' তিনি বললেন, "আল্লাহ সুন্দর, সৌন্দর্য পছন্দ করেন। অহংকার হল হক (ন্যায় ও সত্য)কে প্রত্যাখ্যান করা এবং মানুষকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য (ও ঘৃণা) করার নামান্তর।” (মুসলিম, প্রমুখ)
📄 ফললাভে শীঘ্রতা
কিছু তালেবে ইল্ম মনে করে যে, ইল্ম যেন 'ভাতের থাবা বা পানির ঢোক'; যা সহজেই গিলে ফেলা যায়। অতিশীঘ্রই ইল্ম ফল দান করে এবং তার বিভিন্ন উপকার পরিদৃষ্ট হয়।
তাই মনে মনে ধারণা রাখে যে, এক বছর বা তার কিছু কম-বেশী সময়ের মধ্যেই সে একজন বড় আলেম হয়ে যাবে। অথচ এমন ধারণা ও চিন্তাধারা সত্যই ভ্রান্ত এবং অমূলক কল্পনা, অবান্তর আশা ও অবাস্তব স্বপ্ন; যার ক্ষতি অতি ভয়ঙ্কর এবং বিঘ্ন অতি বড়।
যেহেতু এমন অবস্থায় সে এমন কাজ করবে যার পরিণাম অতি নিন্দনীয়। যেমন, বিনা ইল্মে আল্লাহর উপর কথা বলবে, (আল্লাহ যা নন, যা বলেননি তা বলবে), নিজের উপর অন্ধবিশ্বাসী ও অসমীচীন নির্ভরশীল হয়ে বসবে, সম্মান ও নেতৃত্ব পছন্দ করতে লাগবে এবং এতটুকুতেই ক্ষান্ত শান্ত হয়ে ইল্ম ও আহলে ইল্মদের সহিত সম্পর্ক ছিন্ন করে বসবে।
একদা এক মসজিদে জামাআতে উপস্থিত হলাম। নামায শুরু হতে যাবে এমন সময় পাকা মেঝের উপর কিছু বিছিয়ে নামায পড়তে হবে কি না তা নিয়ে মুসল্লীদের মাঝে মতভেদ দেখা দিল। একদল বলল, 'বিছাতে হবে।' অপর দল বলল, 'দরকার নেই।' এমন সময় ঐ গ্রামের একজন চট্ করে বলে উঠলেন, 'মুসাল্লা বিছিয়ে নামায পড়তে হবে!'
এই প্রকারের তালেবে ইল্ম ও আলেমদের প্রতি বিদ্রূপ করে মামুন বলেন, 'ওদের কেউ কেউ তিন দিন হাদীস সন্ধান করে (পড়ে) এবং তার পরই বলে আমি আহলে হাদীস!' (সিয়ার ১০/৮-৭৬)
সলফে সালেহীনদের জীবনী পাঠককে বিদ্যার্জনের উপর তাঁদের অসীম ধৈর্য ও দীর্ঘ প্রয়াস দেখে সত্যই বিস্মিত হতে হয়। যাঁদের জ্ঞানের পথের কোন শৈথিল্য ও বিশ্রাম নেই এবং না তাঁরা গভীর পান্ডিত্যের উপর কোন প্রকার গর্ব বোধ বা প্রকাশ করেন। তাঁদের এই অবিরাম বিদ্যালোচনার শ্লোগান যেন, 'ক্রোড় হতে গোর পর্যন্ত জ্ঞান অর্জন কর।'
ইমাম ইবনুল মাদীনী (রঃ) কে জিজ্ঞাসা করা হল, 'এত সমস্ত ইল্ম আপনি কেমন করে সঞ্চয় করলেন?' তিনি উত্তরে বললেন, (মিথ্যা) ভরসা ছেড়ে, দেশ বিদেশে সফর করে, জড়ের ধৈর্যের ন্যায় ধৈর্য ধরে! এবং কাকের ন্যায় কাকভোরে বাসা ছেড়ে।' (তাযকিরাহ)
ইমাম শাফেয়ী (রঃ) বলেন, 'কোন ব্যক্তিই এ বিষয়ে ততক্ষণ সফলতায় পৌঁছতে পারে না যতক্ষণ না সে দারিদ্র্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং তার (ইলমের সন্ধান) তার সবকিছুকে প্রভাবান্বিত করে ফেলেছে।' (আসিয়ার ১০/৮৯)
ইমাম হামযা বলেন, 'ইমাম হাফেয ইয়াকুব বিন সুফিয়ান আমাকে বলেছেন, ইল্ম সন্ধানের সফরে আমি ত্রিশ বছর কাটিয়েছি।' (তাযকিরাহ)
ইয়াহয়্যা বিন আবী কাসীর বলেন, 'দৈহিক আরামে ইল্ম হাসিল হয় না।' (জামে' ১/৯৯)
ইবনুল হাদ্দাদ মালেকী বলেন, 'বিলাস শয্যার সাথে আলেমের সম্পর্ক কি?' (আসিয়ার ১৪/২০৬)
এ বিষয়ে হযরত মূসা (আঃ) এর ইল্মী সফরের কথা উল্লেখ্য; যাতে সময় দৈর্ঘ্যতা, কষ্ট ও ধৈর্যের সাথে ইল্ম অর্জন করার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। যখন হযরত মূসা (আঃ)কে আল্লাহ পাক নির্দেশ করেছিলেন যে, সমুদ্র সঙ্গমস্থলে এক বড় আলেম বান্দা আছে তার নিকট উপস্থিত হয়ে ইল্ম অনুসন্ধান কর। হযরত মূসা (আঃ) তাঁর সন্ধানে বের হলেন। সফরে সঙ্গীকে বললেন, 'দুই সমুদ্রের মধ্যস্থলে না পৌঁছে আমি থামব না, আমি যুগ যুগ ধরে চলতে থাকব।' (কুঃ ১৮/৬০)
সে ইলম সফরে তাঁরা পরিশ্রান্ত হয়ে পড়লেন এবং এক স্থানে সাথীকে বললেন, 'আমাদের নাস্তা আন, আমরা তো আমাদের এ সফরে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি।' (ঐ ১৮/৬২)
অতঃপর অনুসন্ধানের পর যখন ওস্তাদের সাক্ষাৎ পেলেন তখন তাঁকে বললেন, 'সত্য পথের যে জ্ঞান আপনাকে দান করা হয়েছে তা হতে আমাকে শিক্ষা দেবেন এই শর্তে আমি আপনার অনুসরণ করব কি?' তিনি তাঁকে ধৈর্যের উপর সতর্ক করে বললেন, 'তুমি কিছুতেই আমার সঙ্গে ধৈর্য ধারণ করে থাকতে পারবে না----।' (ঐ ৬৬-৮-২ আয়াত)
অতএব তালেবে ইলমের উচিত, ঐ সমস্ত ইমামগণের অনুসরণ করা। ইল্মী সফরে তাঁদের ধৈর্য ও সহ্যের কথা স্মরণ করে নিজেকে সান্ত্বনা দিয়ে ঐরূপ ইল্ম তলব করা, যাতে সে তাতে সফল মনোরথ হতে পারে। যেহেতু তাঁদের অধ্যয়ন নীতি ছিল অভ্রান্ত, বিদ্যার্জনের পদ্ধতি ছিল উত্তম। তাঁদের যে সুনাম হয়েছে এবং মুসলমানদের যে চির উপকার ও মঙ্গল সাধিত হয়েছে তা কেবলমাত্র জ্ঞানার্জনের পথে। অনল্প সময় ও অর্থ ব্যয়কে তুচ্ছজ্ঞান করারই ফলশ্রুতি।
পরিশেষে একটি আলাপন নোট করছি যদ্দ্বারা ইলমের মূল্যমান, তার সুউচ্চ মর্যাদা এবং তা সেই ব্যক্তিই অর্জন করতে সক্ষম হয় যে তার পথে সবকিছু উৎসর্গ করে-সে সব কথা আমরা জানতে পারব। যেমন বলা হয়, 'ইল্মকে তুমি তোমার সবকিছু দাও তবে সে তোমাকে তার কিছু অংশ দেবে।'
আলাপনটি নিম্নরূপ:-
এক ব্যক্তি অপরকে জিজ্ঞাসা করল, 'কি ভাবে ইল্ম অর্জন করেছ?' দ্বিতীয় লোকটি উত্তরে বলল, 'অধ্যয়ন শুরু করলাম, দেখলাম তা (ইল্ম) আশা হতে বহু দূরে; যা তীর দ্বারা শিকারও করা যায় না, স্বপ্নেও দেখা যায় না। পিতা-পিতৃব্য হতে তার ওয়ারিসও হওয়া যায় না। অতঃপর তার জন্য দেশ-বিদেশ ভ্রমণ করলাম, পাথরে হেলান দিয়ে অবিরাম রাত্রি জাগরণ করলাম, বহু দৃষ্টি, স্মৃতি ও চিন্তাশক্তি ব্যয় করলাম, একের পর আর এক সফর করলাম, বহু বিপদের সম্মুখীন হলাম এবং তার কিছু মাত্র অর্জন করলাম; যা কেবল গোড়াপত্তনের যোগ্য! যদ্বারা (ইলমের বীজ) বপন করা যায়; যা হৃদয়েই বপন করতে হয় এবং দর্স ও অনুশীলন দ্বারা তার সিঞ্চন করতে হয়। তুমি কি মনে কর, যে দিবসে বন্ধু-বান্ধবের সহিত জমায়েতে মশগুল থাকে, রজনীতে স্ত্রী সংসর্গে উন্মত্ত থাকে সে কি ফকীহ হতে পারবে? আল্লাহর কসম! কোন দিন না। ইল্ম তারই হতে পারে যে খাতা-কলম সাথে করে সফর করে এবং অর্জনের পথে দিবারাত্র নিরলস প্রচেষ্টা জারী রাখে।' (মাকামাত বদী') কারণ, ইল্ম হল (পলায়নরত) শিকারের ন্যায়। আর লিখে নেওয়া হল তার বেড়ি স্বরূপ।
আশা করি যে, এই ছোট মূল্যবান আলাপনে সেই সমস্ত তালেবে ইলমদের ভুল ধারণা ভেঙ্গে যাবে যারা মনে করে, অল্প কিছু দিনের মধ্যেই সে সব ইলম (অন্ততঃপক্ষে পেট চালানোর মত!) হাসিল করে ফেলবে। ফলে চেষ্টা তো করে যায় কিন্তু সাধনাকে তুচ্ছজ্ঞান করে। আর মনে করে, এর পরই আল্লাহ তাদের জন্য ইলম ও মা'রেফাতের দরজা সম্পূর্ণ খুলে দেবেন এবং তারা ইলম ও হেদায়েতের (নাকি শুধু মসজিদের) ইমাম হয়ে উঠবে! অথচ কবি বলেন, অর্থাৎ, ইল্ম তলবে ছয়টি জিনিস অবশ্যই জরুরী; বুদ্ধিমত্তা, আগ্রহ ও আসক্তি, প্রচেষ্টা, প্রয়োজনীয় রসদ, ওস্তাদের সাহচর্য এবং দীর্ঘ সময়।
অন্য এক কবি বলেন,
অর্থাৎ, মেহনত অনুপাতে মর্যাদা লাভ হয়ে থাকে। আর যে ব্যক্তি উন্নতি খোঁজে তার উচিত, রাত্রি জাগরণ করা। যে ব্যক্তি বিনা পরিশ্রমে উন্নতি কামনা করে সে তো দুর্লভ বস্তুর সন্ধানে আয়ু ক্ষয় করে। তুমি ইজ্জত চাইবে অথচ রাত্রে ঘুমিয়ে থাকবে (এ তো হতে পারে না)। কারণ, যে মণি-মুক্তা পেতে চায় তাকে তো সমুদ্রে ডুব দিতে হবে। হে আমার প্রতিপালক! আমি তোমার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে রাত্রিসমূহে নিদ্রা বর্জন করেছি হে সকল প্রভুদের প্রভু! তাই আমাকে ইল্ম অর্জন করার প্রেরণা দান কর এবং মর্যাদার শেষ চূড়ায় পৌঁছে দাও।
আর দীর্ঘ সময় বা পথ দেখে পিছপা হওয়া উচিত নয়। 'কেন পান্থ ক্ষান্ত হও হেরি দীর্ঘ পথ, উদ্যম বিহনে কার পুরে মনোরথ?'
📄 হীনম্মন্যতা
শিক্ষিত ও আলেম সমাজে এমন অনেক মানুষ নজরে পড়েন, যাঁরা অসাধারণ প্রতিভার মালিক, অগাধ পান্ডিত্য এবং অনল্প ইল্মী শক্তির অধিকারী যা তাঁদেরকে জ্ঞানপতি হবার যোগ্য করে তুলে। কিন্তু হেয় মন্যতায় তাঁদের সে প্রতিভার আভা ও আলোক বিলীন হয়ে যায় এবং তেজস্বান শক্তিকে ক্ষীয়মান ও নিষ্ক্রিয় করে ফেলে। তাই তো স্বল্প ইল্ম আলোচনায় তাঁদের জ্ঞান-পিপাসা মিটে যায়। অধিক অধ্যয়ন ও বাড়তি পড়াশুনা করায় বিরাগী হন এবং ইল্মী কাজ ছেড়ে সাধারণতঃ পার্থিব কোন কাজে অধিক মনোযোগী হন। তাঁদের অনেককে (বক্তৃতা লেখনী বা অন্যান্য) দাওয়াতী কাজে নামতে অনুরোধ করলে 'আমার যোগ্যতা নেই' বলে ওজর পেশ করেন। তাঁরা মুখে বিনয় প্রকাশ করেন এবং কাজেও। অথচ কাজে তা প্রকাশ করা আদৌ উচিত নয়।
তাই তো এমন মানুষদের প্রতিভা ও শক্তি খুব সত্বর ছিনিয়ে নেওয়া হয় এবং তাঁদের সময়ের বর্কত তুলে নেওয়া হয়। যেহেতু অকৃতজ্ঞতা ও অবহেলার ফলে সম্পদ লয় ও ক্ষয়প্রাপ্ত হয়; যেমন কৃতজ্ঞতা ও মর্যাদাদানে সম্পদ বর্ধমান হয়।
ফারা (রঃ) বলেন, 'দুই ব্যক্তির মত অপর কাউকে আমি দয়া প্রদর্শন করি না। এক ব্যক্তি, যে ইলম তলব করে; কিন্তু তার মেধা বা বুঝশক্তি নেই। দ্বিতীয় ঐ ব্যক্তি, যে মেধাবী ও বুঝ শক্তিসম্পন্ন; অথচ ইলম তলব করে না। আর আমি আশ্চর্যান্বিত ও বিস্মিত হই এমন লোকের উপর যার ইল্ম অর্জন (ও প্রচার) করার ক্ষমতা আছে; অথচ তা করে না।' মুতানাব্বী বলেন, মানুষের সবচেয়ে বড় ত্রুটি এই যে, পূর্ণতা লাভের সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও সে অপূর্ণ থেকে যায়।
এর টীকায় ইবনুল জওযী (রঃ) বলেন, 'জ্ঞানীর উচিত, যথাসম্ভব (কল্যাণমূলক) পরিপূর্ণতার সর্বশেষ মঞ্জিলে পদার্পণ করা। তাই যদি কোন মানুষ আকাশে চড়ার পরিকল্পনা করে (এবং তার দ্বারা তা সম্ভব হয়) তবে মাটিতে বসে থাকা তার সবচেয়ে বড় আয়েব ও ত্রুটি হবে। নবুয়ত যদি ইজতেহাদ ও প্রচেষ্টার দ্বারা লাভ করা সম্ভব হত তবে অলস ব্যক্তিকেও তা লাভ করার প্রচেষ্টায় বড় মজবুত দেখা যেত। (অর্থাৎ কেবল বেলায়ত নিয়ে সন্তুষ্ট থাকা তার জন্য সমীচীন হত না।) জ্ঞানী ও পন্ডিতদের এক সদাচরণ হল, ইল্ম ও আমলে যথাসম্ভব পরিপূর্ণতার সর্বশেষ মঞ্জিলকে আত্মর জয়লাভ করা।'
তিনি আরো বলেন, 'মোটকথা, যে কল্যাণ ও মর্যাদা লাভ করা মানুষের পক্ষে সম্ভব তা লাভ ও অর্জন না করে ক্ষান্ত হওয়া উচিত নয়। কারণ (এ বিষয়ে) স্বল্পতে তুষ্ট হওয়া নীচ, তুচ্ছ ও অলস মানুষের কাজ। অতএব এমন মানুষ হওয়া দরকার যার পা মাটিতে থাকলেও আকাশে ও গ্রহ-উপগ্রহে তার হিম্মত ও উঁচু অভিপ্রায় থাকে। যদি প্রত্যেক আলেম ও আবেদের নিকট যাওয়া সম্ভব হয় তো যাও। তাঁদের নিকট সবক শিখ। তাঁরা মানুষ, তুমিও মানুষ। যা তাঁদের দ্বারা সম্ভব হয়েছে তা তোমার দ্বারাও সম্ভব হতে পারে। কিন্তু যে বসে পড়ে, সে হীনম্মন্যতার ও হিম্মত হারানোর ফলেই বসে পড়ে।
তুমি নিজেকে কোন প্রতিযোগিতার ময়দানে ভাব। সময় আপন গতিবেগে চলতে আছে। সে তোমার অপেক্ষা করবে না। অতএব আলস্য ছাড়, দীর্ঘসূত্রতার জড়তায় পড়োনা। জেনে রেখো, যার যা হারিয়ে যায় তা তার নিজের অবহেলা ও অলসতার কারণেই যায় এবং যে যা পায় সে তার নিজের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা, হিকমত ও যত্নের কারণেই পায়।' (সাইদুল খাতের ১৫৯-১৬১পৃঃ)
উল্লেখ্য যে, তকদীর সত্য; তবে তকদীরের দোহাই দিয়ে তদবীর ছেড়ে বসে যাওয়া জ্ঞানী মুসলিমের কাজ নয়। কারণ, তকদীরের সাথে তদবীরও জরুরী।
'অদৃষ্টেরে শুধালাম, চিরদিন পিছে
অমোঘ নিষ্ঠুর বলে কে মোরে ঠেলিছে?'
সে কহিল, 'ফিরে দেখ।'
দেখিলাম থামি,
সম্মুখে ঠেলিছে মোরে পশ্চাতের আমি।'
সুতরাং তুমি যদি তোমার মধ্যে বুদ্ধিমত্তা ও বুঝশক্তি আছে অনুভব কর তবে ইল্ম ও অধ্যয়নের বিকল্প অন্য কিছুকে মনে করোনা এবং দর্স ও তদরীস ব্যতীত অন্য কোনও কাজে লিপ্ত হয়ে যেওনা। যদি তা তুমি মানতে না চাও তবে এ তোমার ও মুসলমানদের পক্ষে এক মহাবিপদ ও বড় নোকসান!
ধনলোভীর নিকট ধন ঈপ্সিত, মান ঈপ্সিত নয়। প্রজাপতির নিকট ফুল প্রিয়, ফল প্রিয় নয়। মাতালের কাছে মদই শ্রেষ্ঠ, দুধ শ্রেষ্ঠ নয়। অনুরূপ একজন আলেমের নিকট ইল্মই প্রিয় ও নেশার বস্তু হওয়া উচিত, অন্য কিছু নয়।
হে তালেবে ইল্ম! তোমার ঐ পথে চলতে বিভিন্ন বাধা পাবে, পদার্পণে কাঁটা পাবে, (অধার্মিকদের নিকট হতে) সম্মানের অভাব পাবে, আত্মীয়তা ছিন্ন হবে, 'ফকীরী বিদ্যা' বলে নাকসিটকানি শুনবে, দারিদ্র্য ও উত্তম খাদ্যাভাব দেখা দেবে, আমলের পথে লোকারণ্যেও নিজেকে নিঃসঙ্গ ও অসহায় পাবে। তবুও তোমাকে ঐ পথে চলতে হবে।
'কাঁটা হেরি ক্ষান্ত কেন কমল তুলিতে,
দুখ বিনা সুখ লাভ হয় কি মহীতে।'
ধৈর্য ধরলে তার ফল মিষ্ট পাবে। যদি তুমি প্রকৃত তালেবে ইল্ম হও তবে তোমার চলার পথে পদতলে ফিরিশতা পক্ষ বিছিয়ে যাবেন। তুমিই হবে প্রকৃত সুখী ও সম্মানী। যেহেতু যে রত্নের খোঁজে বের হবে সে রত্ন! নবুয়তের রত্ন। আর তার চেয়ে মূল্যবান রত্ন আর কি আছে? আসুক শত বাধা, শত ঝঞ্চা, শত অপমান, তা তুচ্ছজ্ঞান করে চল। আর মনে রেখো, যাদের কোন মান নেই সাধারণত তারাই জ্ঞানীদের অপমান করে। আবার যাদের কোন মানই নেই তাদের আবার অপমান কিসের? অতএব যদি তুমি দ্বীন ও নবুওত থেকে মান কুড়াতে না পার তবে অপমান আর কি? যদি মানের আশা কর তবে আল্লাহর কাছে, ধর্মপ্রাণ মুমিন মানুষ, জ্ঞানী ও সম্মানী লোকদের নিকট আশা কর। কাফের ও মূর্খদের তরফ হতে মানের আশা করো না। তাদের নিকট হতে তো মানের আকাঙ্খা করাই ভুল।
চল ঐ পথে বুক ফুলিয়ে, মাথা উঁচু করে, হিম্মত বড় করে। সেই কাজ ও আচরণ অবলম্বন কর যাতে তোমার হিম্মত বাড়তে থাকে। আশাকে বড় কর। সর্বদা ধ্যানে রেখো যে, তোমাকে বড় একটা কিছু হতেই হবে। ছোট আশা কোন সময় করো না। আল্লাহর নিকট চাইলে বড় কিছু চাও। 'কিছু না পারি তো মসজিদের ইমামতি করব' এমন ছোট খেয়াল মনে রেখো না।** যেখানে চাইলে গোটা ফুলবাগান পেতে পার সেখানে দু'টি ফুল চেয়ে ও পেয়ে সন্তুষ্ট হওয়া বুদ্ধিমানের কাজ নয়।
'মূর্খ তুমি গোটা কতক ফুলেই তোমার ভরল প্রাণ,
চাইতে যদি মিলত তোমায় সবটুকু এই ফুল বাগান।'
আশা করলে উচ্চ আশাই করতে হয়। কথায় বলে 'আশা আর বাসা ছোট করতে নেই।' অন্যথা যাদের মন ছোট কেবল তারাই ছোট আশা করে এবং নগণ্য নিয়ে সন্তুষ্ট হয়। চাও আল্লাহর কাছে বড় কিছু। যিনি তোমার চাওয়া ছোট কিছু দিতে পারবেন তিনি বড়টাও দিতে পারবেন। চাও এই বলে:-
হিম্মত উঁচু করার যে সমস্ত উপায়-উপকরণ আছে, তার মধ্যে সাহাবা ও সালেহীন (রাঃ)দের জীবনী পড়া অন্যতম। যেহেতু তাঁদের জীবন ইলম ও আমলে পরিপূর্ণ। তাঁদের অবস্থা জানার পর শিক্ষার্থী নিজেকে অনেক ছোট ভাববে এবং তার চোখেই তার ইলম ও আমল খুবই নগণ্য পরিদৃষ্ট হবে। ফলে তাঁদের নাগাল পাবার প্রচেষ্টা করবে এবং তাঁদের অনুকরণ ও সাদৃশ্যলাভ করার প্রয়াসী হবে। আর “যে ব্যক্তি যে সম্প্রদায়ের অনুকরণ ও সদৃশতা অবলম্বন করে সে তাদেরই দলভুক্ত।”
ইবনুল জওযী বলেন, 'আল্লাহ আল্লাহ! তোমরা সলফের জীবনেতিহাস আলোচনা কর। তাঁদের লেখনী ও সংবাদ পড়। কারণ, তাঁদের বই-পুস্তক অধিক অধ্যয়ন করা, তাঁদেরকে দর্শন করার শামিল।'
অন্যত্র তিনি বলেন, 'অধিক পাঠ্যালোচনা ও বাড়তি পড়াশুনা করা উচিত। কারণ, তাতে (জ্ঞানী) সম্প্রদায়ের ইলম ও উঁচু হিম্মত পরিদর্শন করা যাবে; যাতে শিক্ষার্থীর মনোবল দৃঢ় হবে। আর তার ইচ্ছা ও আশা অধিক প্রয়াসের জন্য প্রবল বেগে আন্দোলিত হবে। (সাইদুল খাতের ৪৪০পৃঃ)
টিকাঃ
**এখানে মসজিদের ইমামতিকে ছোট কাজ হিসাবে দেখানো উদ্দেশ্য নয়। উদ্দেশ্য, যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও দর্স ও তাদরীস থেকে মুখ ফিরিয়ে কেবল ইমামতি নিয়ে সন্তুষ্ট থাকা অনুচিত।