📄 ওস্তায় ছেড়ে কেবল কিতাবের উপর ভরসা
কতক তালেবে ইল্ম আছে যারা নিজের উপর এমন বিশ্বাস রাখে যে, তারা মনে করে, বিনা কোন আলেম বা ওস্তাদে কেবল মাত্র বই-পুস্তক পাঠ করেই আলেম হয়ে যাবে। কিন্তু এ ধারণা তাদের খাঁটি ভ্রান্ত। যেহেতু তাতে সে প্রকৃত ইল্মের নাগাল পাবে না। আসল শরয়ী জ্ঞানের তথ্য উদ্ধার করতে সক্ষম হবে না। তাদের ঐ জ্ঞানে থাকবে অগণিত ভ্রম, থাকবে পরস্পর-বিরোধিতা, আমলে থাকবে বিত্তত এবং ফতোয়ায় থাকবে ভ্রষ্টতা।
ইমাম শাফেয়ী (রঃ) বলেন, 'যে ব্যক্তি শুধুমাত্র কিতাবের উদর হতে জ্ঞান অন্বেষণ করবে (ও শরয়ী আলেম হতে চাইবে) সে সমস্ত আহকামকে ধ্বংস করে ফেলবে।'
তাদের কেউ কেউ বলতেন, 'দ্বীনের জন্য বড় আপদ তারা যারা কিতাব-পত্রকে নিজেদের শায়খ বা ওস্তাদ বানিয়ে আলেম হয়।' (তাযকেরাতুস সা-মে' অল মুতাকাল্লিম ৮৭পৃঃ)
ফকীহ সুলাইমান বিন মুসা বলেন, 'বলা হত, কুরআনের নকল নবীশ (যারা লিখে গ্রন্থাকারে প্রকাশ করে তাদের কাছে কুরআন শিখতে যেও না এবং ইলমের নকল নবীশদের নিকটও ইল্ম শিখতে যেও না।' (যেহেতু তারা লিখতে জানলেও কি লিখছে তার সবটা বুঝে না। যেমন একজন হাফেয যদি আলেম বা ক্বারী না হয় তবে তার নিকট কুরআনের তর্জমা বা তফসীর অথবা ক্বিরাত শিখতে যাওয়া নিহাতই ভ্রষ্টতার কারণ।)
ইমাম সাঈদ বিন আব্দুল আযীয তনুখী (যিনি আওযায়ীর সমতুল্য আলেম ছিলেন তিনি) ও ঐ একই কথা বলেন। যেমন পূর্বে বলা হত যে, 'কিতাবই যার ওস্তাদ হয়, তার ঠিকের চেয়ে ভুলের ভাগই বেশী হয়।'
আবু হাইয়ান নহবী বলেন, 'অনেক অবুঝ লোকের ধারণা যে, কেবল মাত্র বই-পত্র পড়েই ইল্ম (জ্ঞান) অর্জন করা যায় এবং ইচ্ছা করলে সবকিছু বোঝা যায়। কিন্তু জাহেল জানে না যে, তার মধ্যে এমন বাক্য ও কথা থাকবে যা তার বোধগম্য নয় বা সহজে উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। তাই যদি তুমি বিনা ওস্তাদে ইল্ম লাভ করার আশা রাখ তবে সঠিক পথ হতে অবশ্যই ভ্রষ্ট হয়ে যাবে। আর সমস্ত বিষয় তোমার মস্তিষ্কে তালগোল পাকিয়ে তুলবে এবং ধর্মের পথে অধিক ভ্রান্ত হবে তুমিই।' (যেহেতু নিম হাকীমে জানের খতরা এবং নিম আলেমে ঈমানের খতরা থাকে। আর অল্প বিদ্যা ভয়ঙ্করী।)
কিন্তু তালেবে ইলমকে কেন ওলামাদের নিকট বসে তাদের মুখামুখি ইল্ম অর্জন করতে জরুরী বলা হয়েছে? জ্ঞানীরা এই কথার ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
ইবনে বাত্তাল বলেছেন, 'কিতাবে এমন কতক ভ্রান্তকর (সন্দিগ্ধ) জিনিস থাকে যার কারণে মূল বক্তব্য স্পষ্টভাবে বুঝা যায় না। কোন আলেম বা ওস্তাদের নিকট পড়লে তা ধরা পড়ে বা সে ভ্রান্তি হয় না। যেমন, মুদ্রাকর-প্রমাদ বা ছাপায় ভুল, দৃষ্টি প্রমাদে পড়ায় ভুল, এ'রাব (আরবীতে কোথায় জের, জবর বা পেশ হবে তার) ভুল, (এই ভুলে কর্তাকে কর্মকারক এবং মানুষকে পশু বানিয়ে দেওয়া হয় এবং এইমত আরো কতশত ভুল হয়ে থাকে এই এ'রাব না জানার কারণে।) বিরাম বা থামার স্থান না জানায় ভুল, (বিশেষ করে সেই সব কিতাবে যাতে যতিচিহ্ন ব্যবহৃত হয়নি।) পুস্তকের পরিভাষা না জানায় ভুল, (নাসেখ- মানসূখ, সহীহ-যয়ীফ, আদেশ-উপদেশ প্রভৃতি না জানার প্রমাদ) ইত্যাদি।' (শারহু ইহয়্যায়ি উলুমিদ্দীন ১/৬৬)
ডাক্তারের বিনা পরামর্শে কেবল বই পড়ে ওষুধ ব্যবহার করলে যেমন অনেক সময় বিপদে পড়তে হয় ঠিক তেমনিই কোন ওস্তাদ বিনা কেবল বই পড়ে আলেম হতে চাইলে একই অবস্থা হওয়ার আশঙ্কা থাকে। সুতরাং বাড়িতে বসে নিজে নিজে পড়ে কিছু শিক্ষার চেয়ে কোন আলেম ও ওস্তাদের নিকট বসে তা পড়া ও শিক্ষা করাই উচিত। অনুরূপ মুখস্ত করে ইল্ম হৃদয়ে স্থান না দিয়ে যদি কিতাবেই রেখে দেওয়া হয় তবে সে ইল্মেও তালেবে ইল্ম উপকৃত হতে পারে না। পুঁথিগত বিদ্যা সময়ে কাজে দেয় না।
'গ্রন্থ-বিদ্যা আর পর হস্তে ধন, নহে বিদ্যা নহে ধন হলে প্রয়োজন।'
প্রকাশ থাকে যে, ধর্মীয় বা পাঠ্য বিষয় ছাড়া কোন গায়বী খবর জানা, আরোগ্যলাভ, সন্তানলাভ, বর্কতলাভ, বিনা আমলে মুক্তিলাভ প্রভৃতির উদ্দেশ্যে ওস্তাদ বা গুরু ধরা ঐ পর্যায়ে পড়েনা। নযর-নিয়ায পেশ করে ঐসব উদ্দেশ্য সাধনের জন্য অথবা কিয়ামতে পারের জন্য কাউকে ওস্তাদ বা গুরু মনে করা শির্ক।
📄 ছোটদের নিকট ইলম্ তলব করা
এ যুগে এক সমস্যা দেখা দিয়েছে যে, তালেবে ইলমদেরকে অনেক ক্ষেত্রে (স্বেচ্ছায় বা অনিচ্ছায়) বড়দের পরিহার করে ছোটদের নিকট ইলম শিক্ষা করতে হয়। প্রকৃতপক্ষে এই সমস্যা শিক্ষার পথে এক বাধা, যথার্থ জ্ঞানান্বেষণের পথে একপ্রকার কাঁটা, তালেবে ইলমের এক মানসিক রোগ যার দ্বারা সে ইলম অর্জনে হীনমনা হয়ে যায়। যেহেতু বড় ও অভিজ্ঞ আলেম থাকতে যাঁরা বয়সে ছোট; যাঁদের ইলমী অভিজ্ঞতা কম তাঁদের নিকট ইলম শিক্ষায় শিক্ষার্থী নিজেকে ধোকা দেয়। কারণ, তাতে প্রাথমিক শিক্ষার্থীর শিক্ষার বুনিয়াদ কাঁচা হয়ে থাকে, ইলমী বিকলাঙ্গের নিকট থেকে সেও ঐরূপ বিকলাঙ্গ হয়ে যায়। বড় ও অভিজ্ঞ ওলামাগণের অভিজ্ঞতা ও দীর্ঘ ইলমীচর্চায় প্রাপ্ত আদর্শ ও চরিত্র হতে বঞ্চিত থেকে যায়।
হযরত ইবনে মসউদ (রাঃ) এর উক্তি এই কথার প্রতিই ইঙ্গিত বহন করে। তিনি বলেন, 'মানুষ ততকাল অবধি কল্যাণে থাকবে যতকাল তারা (তালেবে ইল্মরা) তাদের বড় ও বুযুর্গ আমানতদার (ও পরহেযগার বাআমল) ওলামাদের নিকট ইলম তলব করবে। যখনই তারা ছোট বেআমল ও অসৎ আলেমের নিকট ইলম শিক্ষা করবে তখনই তারা ধ্বংস হবে।'
আল্লাহর রসূল বলেন, "কিয়ামতের এক লক্ষণ এই যে, ছোটদের নিকট ইল্ম অনুসন্ধান করা হবে।”
এখানে 'ছোট' এর ব্যাখ্যা নিয়ে ওলামাদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। এ ব্যাপারে ইবনে আব্দুল বার (রঃ) (জামে' ১/১৫৭ তে) এবং শাত্মবী (রঃ) (ই'তিসাম ২/৯৩ তে) অনেক উক্তির উল্লেখ করেছেন।
ইবনে কুতাইবা (রঃ) বলেন, 'ছোট বলতে যারা বয়োকনিষ্ঠ।' আর পূর্বোক্ত ইবনে মসউদের উক্তির টীকায় বলেন, 'তাঁর বলার উদ্দেশ্য এই যে, মানুষ ততকাল অবধি কল্যাণে থাকবে যতকাল অবধি তাদের ওলামাগণ বয়োজ্যেষ্ঠ ও বুযুর্গ হবেন। আর বয়োকনিষ্ঠ ও কাঁচা যুবক হবেন না। কারণ, বুযুর্গ ও বৃদ্ধ তিনিই, যাঁর যৌনজ্বালা উপশমিত হয়ে গেছে, দীর্ঘ সময় ধরে বহু অভিমত ও পরিপক্কতা লাভ করেছেন। যাঁর ইলম ও জ্ঞানে কোন সন্দেহ ও সংশয় থাকবে না। যাঁর উপর তার প্রবৃত্তি বিজয়ী হতে পারবে না। যাঁকে কোন লালসা অবনমিত করতে পারবে না। সদ্য যুবকদের মত শয়তান যাঁর পদস্খলন ঘটাতে পারবে না। বয়সাধিক্যের সাথে যার গাম্ভীর্য, প্রতিভা, বিচক্ষণতা, সৌম্যতা ও মননশীলতা ইত্যাদি থাকবে।
কিন্তু তরুণ উদীয়মান আলেমদের মধ্যে হয়তো তা অনুপ্রবেশ করতে পারে যা বুযুর্গদের মধ্যে প্রবেশ করতে পারে না। অতএব যদি তুমি ঐ নব যুবকের নিকট জ্ঞান অন্বেষণ করতে যাও এবং সে ঐ কাঁচা অবস্থায় তোমাকে তা'লীম ও ফতোয়া দেয় তবে সে নিজে ধ্বংস হবে এবং তুমিও।' (নসীহাতু আহলিল হাদীস, খতীব ১৬পৃঃ)
ইবনে আব্দুল বার (রঃ) হযরত উমর (রাঃ) হতে একটি বর্ণনা নকল করেছেন, তিনি বলেন, 'কখন মানুষের শান্তি ও কল্যাণ হবে এবং কখন তাদের অশান্তি ও বিঘ্ন আসবে তা আমি অবশ্যই জানি; কোন বয়োকনিষ্ঠের নিকট হতে যখন ফতোয়া ও ফিক্হ আসবে বড় তখন তা অমান্য ও অগ্রাহ্য করবে। (তখনই তাদের মধ্যে বিঘ্ন সৃষ্টি হবে) এবং যখন কোন বড়র নিকট হতে ফিক্হ আসবে আর ছোট তার অনুসরণ ও মান্য করবে তখন দুজনেই সুপথপ্রাপ্ত হবে। (এবং শান্তি ও কল্যাণ বিরাজিত হবে।)'
হযরত ইবনে মসউদ (রাঃ) বলেন, 'তোমরা ততক্ষণ মঙ্গলে থাকবে যতক্ষণ তোমাদের ইল্ম থাকবে তোমাদের বড়দের কাছে। যখন ইলম তোমাদের ছোটদের কাছে থাকবে তখন বড় ছোটকে (না মেনে) বেওকুফ ও অপক্ক ভাববে।'
অতএব এই দু'টি বর্ণনায় ছোটদের নিকট ইল্ম না শিখার কারণ যা ইবনে কুতাইবাহ দর্শিয়েছেন তা থেকে ভিন্ন ব্যক্ত করা হয়েছে। আর তা হল কোন ছোটর নিকট হতে ইল্ম বা ফতোয়া এলে তা অমান্য ও অগ্রাহ্য করার ভয়। মোটকথা 'ছোট' শব্দটি সাধারণ যা বাহ্যিক ও আভ্যন্তরিক সকল প্রকার ছোটকেই বুঝায়।
তবে একথাটি যে সবার জন্য সর্বাবস্থায় সঠিক তা নয়। কারণ, ছোট সাহাবী ও তাবেয়ীগণের এক জামাআত তাঁদের বয়োজ্যেষ্ঠ থাকতে তাঁদের সামনেই ফতোয়া ও দর্স দান করেছেন। তবে তাঁদের কথা অবশ্যই ভিন্ন। কারণ, তাঁরা ছোট হলেও তাঁদের মত প্রতিভাবান ব্যক্তিত্ব তাঁদের পরের যুগে সত্যই বিরল। পক্ষান্তরে যদি প্রায় সেই রকম কোন ছোট আলেম পাওয়া যায়, তাঁর পরিপক্কতা ও যোগ্যতা প্রসিদ্ধ হয়, তাঁর ইল্ম, দর্স ও তদরীসে প্রকৃত পরিপক্কতা ও সঠিক সফলতা প্রকাশ পায় এবং ঐরূপ কোন বুযুর্গ অভিজ্ঞ আলেম যদি না পাওয়া যায় আর যদি কোন বিঘ্ন না দেখা যায় তবে ঐ ছোটর নিকটই ইলম অর্জন করা প্রয়োজন।
আবার এই আলোচনার উদ্দেশ্য এই নয় যে, বড়রা থাকতে ছোটদের ইল্মের প্রতি ভ্রূক্ষেপ করা হবে না বা ছোটদের নিকট শিখা যাবে না। বরং উদ্দেশ্য এই যে, সকলকে নিজ নিজ উপযুক্ত স্থান ও পদ দান করতে হবে। অতএব যারা ছোট হবেন প্রাথমিক শিক্ষা তাঁদের নিকট শিখতে হবে। বা যতটা শিক্ষাদান তাঁর পক্ষে সম্ভব হবে ততটা শিখা হবে; তার বেশী নয়। তাছাড়া তাঁর নিকট হতে ফতোয়া চাওয়া, কোন সমস্যার সমাধান চাওয়া ইত্যাদি উচিত নয়। কারণ, এটা তাঁর জন্য ও সকলের জন্য ধ্বংসের হেতু।
অতএব তালেবে ইল্মের উচিত বুযুর্গ ও অভিজ্ঞ আলেমের নিকট শিক্ষা গ্রহণ করা, যাঁর বিগত আয়ু ইল্মেই ব্যয় হয়েছে। ইল্মী মসনদে যাঁর বার্ধক্য এসেছে। তাঁকে হারিয়ে ফেলার পূর্বে তাঁর শিষ্যত্ব ও সাহচর্য গ্রহণ করা। তাঁর ইল্মী গুপ্তখনির দ্বার উদ্ঘাটন করা কর্তব্য।
দুঃখের বিষয় যে, এ যুগের অধিকাংশ সাধারণ মানুষ প্রকৃত ওলামাদের মূল্যায়ন করতে এবং সঠিক যোগ্য আলেম চিহ্নিত করতে খুবই ভুল করে থাকে। তাই যদি কারো নিকট কোন জালসা মহফিলে বা মসজিদে সাহিত্য বাগাড়ম্বরপূর্ণ বক্তৃতা অথবা মর্মস্পর্শী ওয়ায শোনে অথবা কাউকে লম্বা আলখাল্লা বা জুব্বা পরা ও পাগড়ী বাঁধা দেখে তবে তাকেই প্রকৃত আলেম বলে ধারণা করে বসে এবং তাকে নানা ফতোয়া ও সমস্যার কথা জানিয়ে উত্তরের আশা করে।
অথচ এটা এক বেদনাদায়ক বিপদ এবং ভয়ানক মসীবত যা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি হতে চলেছে। অর্থাৎ অযোগ্য আলেমের উপর ইল্ল্মী ভরসা বেড়ে চলেছে। আর যখন অযোগ্য লোকের উপর কোন যোগ্য কাজ সমর্পণ করা হবে তখনই কিয়ামতের অপেক্ষার সময়।
অতএব তালেবে ইল্ম (প্রতি মুসলিম) এর উচিত ওঁদের নিকট হতে কোন ধর্মীয় সমাধান বা ইল্ম না নেওয়া। ইল্ম নেবে তাঁদের নিকট যাঁরা ইল্মে পরিচিত ও প্রসিদ্ধ। কেউ ভালো বক্তৃতা বা ওয়ায করতে পারলেই আলেম হয়ে যায় না। দেখতে আবেদ হলে, লোকে তার খিদমত করলে, তার অসংখ্য ভক্তদল হলে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির তালে তাল মিলিয়ে কথা বললে বা তর্কশাস্ত্রে পারদর্শী হলেই দ্বীনী আলেম হয়ে যায় না। প্রকৃত আলেম চেনার কষ্টিপাথর আছে ভিন্ন।
পূর্বালোচনার অর্থ এই নয় যে, তাঁদের বক্তৃতা শোনা হবে না বা তাঁদের নিকট পড়া হবে না যেমন অনেকে মনে করতে পারে। বরং তার অর্থ এই যে, কোন জটিল বিষয়ে ফতোয়া বা ইলম তাঁদের নিকট গ্রহণ করা যাবে না এবং তাঁদেরকে ঐ রব্বানী ওলামাগণের আসনে বসানো যাবে না।
📄 শিক্ষায় পর্যায়ক্রমহীনতা
ইলম শিক্ষায় ক্রমবর্ধমানতা ও ক্রমান্বয় জরুরী হওয়ার প্রসঙ্গে ওলামাগণ সকলেই একমত। যেহেতু ধীরে ধীরে স্বল্পাকারে অর্জন করা এবং এইভাবে কিছু সময় ধরে ইল্মে উদ্দিষ্ট বিষয় পূর্ণ করা ইল্ম শিক্ষার এক সুন্দরতম যুক্তিযুক্ত পদ্ধতি। এ পদ্ধতিটি কালাম মাজীদ হতে গৃহীত হয়েছে। আল্লাহ আয্যা অজাল্ল বলেন, অর্থাৎ, আমি খন্ড-খন্ডভাবে কুরআন অবতীর্ণ করেছি; যাতে তুমি তা মানুষের নিকট ক্রমে ক্রমে পাঠ করতে পার। আর আমি তা যথাযথভাবে অবতীর্ণ করেছি। (কুঃ ১৭/১০৬)
তিনি আরো বলেন, "কাফেররা বলে, 'সমগ্র কুরআন তার নিকট একেবারে অবতীর্ণ হল না কেন?' এ আমি তোমার নিকট এভাবেই অবতীর্ণ করেছি এবং ক্রমে ক্রমে স্পষ্টভাবে আবৃত্তি করেছি তোমার হৃদয়কে শক্ত ও দৃঢ় করার জন্য।” (কুঃ ২৫/৩২)
যুবাইদী বলেন যে, '(একটির পর একটি বিষয়ে জ্ঞানচর্চা কর্তব্য।) বর্তমান বিষয়ে দক্ষতা লাভ না করা এবং তা হতে প্রয়োজন না মিটবার পূর্বে পরবর্তী দ্বিতীয় কোন বিষয়ে জ্ঞানচর্চায় ধ্যান না দেওয়াই উচিত। কারণ একই কর্ণকুহরে (একই সময়) বিভিন্ন বিষয়ের ইলমের ভিড় মস্তিষ্ক ও বুদ্ধিমত্তাকে ভ্রান্ত ও বিক্ষিপ্ত করে ফেলে।
এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা ইঙ্গিত করেন, "যাদেরকে কিতাব দান করেছি তারা যথাযথভাবে তা পাঠ করে----।” (কুঃ ২/১২১) অর্থাৎ, তারা কিতাবের কোন বিষয় অতিক্রম করা না যতক্ষণ পর্যন্ত না তা সূক্ষ্ম ও সুন্দরভাবে শিক্ষা করে এবং সেইমত যথাযথরূপে আমল করে। (এবং এটাই হচ্ছে তেলায়তের হক বা যথার্থরূপে তেলায়ত করা।) কিন্তু দুঃখের বিষয় যে, আমরা কুরআনী চিনির আমল করি অথচ তার মিষ্টতা বুঝি না। সুরলহরীতেই তন্ময় হই। কিন্তু তা উপলব্ধি ও আমল করাতে যত্নবান নই।
অতএব শিক্ষার্থীর উচিত, প্রথম তাই দিয়ে শুরু করা যা তার জন্য একান্ত জরুরী। আর ধীরে ধীরে সেই দিকে অগ্রসর হওয়া যা অপেক্ষাকৃত কম জরুরী। তবে খেয়াল রাখতে হবে, যাতে এই জরুরী পর্যায় নিরূপণে কোন প্রকার ত্রুটি না ঘটে।
এই সূত্র ও নিয়ম-মাফিক না চলার কারণে বহু শিক্ষার্থী (চেষ্টা সত্ত্বেও) গন্তব্যস্থলে পৌঁছতে পারেনি। যেখানে তার উচিত ছিল, এক বিষয়ে যোগ্যতা লাভ করার পর অন্য বিষয়ের প্রতি ধাপে ধাপে আগে বাড়া। আর এইরূপে এক সমাপ্তিতে পৌঁছে যাওয়া। (শারহুল ইহয়্যা' ১/৩৩৪)
এই ক্রমোন্নতি দুটি ক্ষেত্রে হয়ে থাকে। কতকগুলি বিষয়ের মাঝে ক্রমোন্নয়ন অথবা কেবল মাত্র একটি বিষয়ের মাঝেই ক্রমোন্নয়ন। এই দুই ক্ষেত্রেই দুই ইলমী ক্রমবর্ধমানতা শিক্ষক ও কালপাত্র অনুসারে বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে। এখানে আমরা পাঠকের জন্য ওলামাগণের কয়েকটি নির্দেশ পেশ করব। যেটা তালেবের জন্য সহজ ও সুবিধা হবে ওস্তাদের সম্মতিক্রমে সেই নির্দেশে নিজের পাঠ্যজীবন এবং ইল্ল্মী সফর শুরু করবেন।
ইবনে জুরাইয বলেন, আমি আতার কাছে এলাম। আমার ইচ্ছা ইলম শিখব। দেখি তাঁর নিকট আব্দুল্লাহ বিন উবাইদ বিন উমাইর রয়েছেন। আমার প্রতি লক্ষ্য করে ইবনে উমাইর বললেন, 'তুমি কুরআন পড়েছ?' আমি বললাম, 'না।' তিনি বললেন, 'তবে যাও, কুরআন পড়। অতঃপর (অন্যান্য) ইলম অন্বেষণ কর।' আমি সেখান হতে চলে গিয়ে কিছুদিন ধরে কুরআন পড়লাম। অতঃপর আতার নিকট আবার এলাম। দেখি তাঁর নিকট আব্দুল্লাহ (ইবনে উমাইর) রয়েছেন। তিনি আমার উদ্দেশ্যে বললেন, 'ফারায়েয পড়েছ?' আমি বললাম, 'না'। তিনি বললেন, 'ফারায়েয শিখে ইলম তলব কর।' অতঃপর আমি ফারায়েয শিক্ষা করলাম তারপর তাঁর নিকট এলাম। তিনি বললেন, 'এবারে তুমি ইলম শিখ।' (আসিয়ার ৬/৩২৭)
আবুল আইনা বলেন, আমি আব্দুল্লাহ বিন দাউদের নিকট উপস্থিত হলাম। তিনি প্রশ্ন করলেন, 'কি উদ্দেশ্যে আসা হল?' আমি বললাম, '(হাদীস) শিখব।' তিনি বললেন, 'যাও আগে কুরআন হিফ্য কর।' আমি বললাম, 'কুরআন হিফ্য করেছি।' তিনি বললেন, 'পড়, আমি এক দশমাংশ পড়ে শেষ করলাম। অতঃপর তিনি আমাকে বললেন, 'এখন যাও ফারায়েয শিখে এস।' আমি বললাম, 'সুল্ব (ঔরষজাত সন্তান) জাদ্দ (পিতামহ, মাতামহ প্রভৃতি) এবং কুর (নিকটাত্মীয়) এর আহকাম শিখেছি।' তিনি প্রশ্ন করলেন, 'তবে তোমার ভাইপো ও তোমার চাচার মধ্যে কে তোমার অধিক নিকটবর্তী?' আমি বললাম, 'ভাইপো।' তিনি বললেন, 'তা কেন?' আমি বললাম, 'কারণ, আমার ভাই আমার মা হতে এবং চাচা আমার দাদা হতে। (আর দাদা হতে মা নিকটের।)' বললেন, 'যাও এখন আরবী ভাষা শিখ।' বললাম, 'আরবী তো ঐদুয়ের পূর্বেই শিখেছি।'
তিনি প্রশ্ন করলেন, 'হযরত উমর (রাঃ) কে যখন ছুরিকাঘাত করা হল তখন 'ইয়া লাল্লাহি অলিল মুসলিমীন!' কেন প্রথমটায় লামে যবর এবং দ্বিতীয়টায় যের দিয়ে বলেছিলেন?' বললাম, 'প্রথম লামটায় যবর দিয়েছেন; কারণ তা দুআ। আর দ্বিতীয়টায় যের দিয়েছেন কারণ তা ইস্তিগাসা এবং ইস্তিনসার।'
অতঃপর তিনি বললেন, 'যদি কাউকে হাদীস বর্ণনা করি তো তোমাকে অবশ্যই করব।' (আসিয়ার ৯/৩৫১)
ইবনে আব্দুল বার বলেন, 'ইল্ম তলবের ধাপ, পর্যায় ও অনুক্রম আছে যা উল্লংঘন ও অতিক্রম করা উচিত নয়। যে একেবারে উল্লঙ্ঘন করে আগে বাড়তে চায় সে সলফে সালেহীনদের পথ অতিক্রম করে চলে। আর যে ইচ্ছাকৃত তাঁদের পথ অতিক্রম করে সে পথভ্রষ্ট হয় এবং সে অনিচ্ছায় উত্তম ভেবে তা করে তার পদস্খলন ঘটে।' (আল জামে' ২/১৬৬)
ইউনুস বিন ইয়াযিদকে উদ্দেশ্য করে যুহরী বলেছেন, 'ইলমের ব্যাপারে অবিমৃশ্যকারী হয়োনা। কারণ, ইল্ম বহু উপত্যকার মত। যেখান দিয়ে চলতে শুরু করবে সমাপ্তির পূর্বেই তুমি নিজে হারিয়ে যাবে। তবে দিবা-রাত্রে কিছু কিছু করে গ্রহণ কর। একই সাথে সর্বপ্রকার ইল্ম শিক্ষা করার অপচেষ্টা করো না। কারণ যে একই সাথে সর্বপ্রকার ইলম সঞ্চয় করার ইচ্ছা করে তার সবটাই বিসস্মৃত হয়ে যায়। তাই একটার পর একটা বিষয়ে দীর্ঘকাল ধরে শিক্ষা কর।' (ঐ১/১০৪)
অতএব প্রথম ইলম, আল্লাহর কালাম কুরআন কারীম হিয্য করা তা বুঝা এবং তা বুঝতে যে ইল্ম সাহায্য করে (যেমন আরবী ভাষা, নহু, সর্ফ, তফসীর ইত্যাদি) তা শিক্ষা করা ওয়াজেব।
অবশ্য বলছি না যে, পুরো কুরআনই হিফ্য করা সকলের জন্য জরুরী। কিন্তু বলছি যে, যে ব্যক্তি (আলেমের মত) আলেম হতে চায় তার জন্য হিফ্য করা নিশ্চয় ওয়াজেব। তবে আল্লাহর তরফ হতে ফরয নয়।
সুতরাং যে কেউ সাবালক হওয়ার পূর্বেই কুরআন হিফ্য করে নেবে এবং তার পর তা বুঝার জন্য অন্যান্য জরুরী ইল্মের প্রতি অগ্রসর হবে তার জন্য পরবর্তী ধাপে কুরআনী উদ্দেশ্য এবং হাদীসের মমার্থ বুঝতে বড় সহায়তা ও সহযোগিতা লাভ হবে।
অতঃপর কুরআনের নাসেখ-মনসূখ (কোন আয়াত রহিত ইত্যাদি), তার আহকাম (আদেশ ও নিষেধ) এর বিষয়ে জ্ঞানার্জন করবে। কোনও বিষয়ে ওলামাগণের মতানৈক্য বা ঐক্য থাকলে তা ভালোরূপে জানবে। আর এরূপ যার জন্য আল্লাহ সহজ করেন তার জন্য খুবই সহজ। অতঃপর সহীহ ও (শুদ্ধ এবং হাসান) হাদীস অধ্যয়ন করবে। যার দ্বারায় কুরআনের ব্যাখ্যা ও মর্মার্থ প্রস্ফুটিত হয়ে উঠবে। বিশেষ করে হাদীস শরীফে বহু স্থানে কুরআনী অনেক বিষয় মনসূখ (রহিত) হওয়ার ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে তা জানা যাবে।
যে হাদীস পড়তে চাইবে তার উচিত, প্রসিদ্ধ ইমামগণের (যেমন বুখারী, মুসলিম ইত্যাদি) হাদীস গ্রন্থের উপর নির্ভর করা। সুতরাং সবকিছুর আগে তালেবে ইল্ম হাদীস শাস্ত্রে মনোযোগ দেবে, কুরআনী আহকাম আয়ত্ত করবে এবং ফকীহ ও ইমামগণের উক্তিসমূহ জেনে তা নিজের ইজতেহাদের সহযোগী করবে এবং গবেষণা ও আলোচনা- দ্বারের চাবি করবে, যে হাদীসের একাধিক অর্থ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে সে হাদীসের যথার্থ ব্যাখ্যা খোঁজার চেষ্টা করবে। ইমামগণের কারো এমন তকলীদ করবে না যেমন সুন্নাহ (হাদীস) এর করা হয়; যার অনুসরণ ও তকলীদ করা বিনা দ্বিধা ও ভাবা-চিন্তায় সর্বাবস্থায় জরুরী। বিগত উলামাগণের মত সুনান (হাদীস) সস্মৃতিস্থ রেখে তার উপর বিভিন্ন গবেষণা করবে। ঐ চিন্তা-গবেষণায় ও কোন সমস্যার সমাধানের খোঁজে তাঁদের অনুসরণ করবে। ঐ দ্বার উদ্ঘাটনের জন্য, তাঁদের দ্বীনী খিদমতের শত প্রচেষ্টার জন্য এবং তাঁদের দ্বারা নিজে উপকৃত হওয়ার জন্য তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করবে। তাঁদের সঠিক নির্দেশ ও সমাধানের উপর -যা তাঁদের উক্তির অধিকাংশেই বিদ্যমান- প্রশংসা করবে। অবশ্য তাঁদের পদস্খলন বা ভুল-ত্রুটি যে হয়নি তা মনে করবে না। যেমন সে নিজেকেও এ ব্যাপারে ত্রুটি-বিচ্যুতিমুক্ত ধারণা করবে না। এই শিক্ষার্থীই প্রকৃতপক্ষে সলফের অনুগামী হবে। আর সে-ই ইল্মের যথেষ্ট অংশ লাভ করবে, সুপথ ও সুমতের অধিকারী হবে। প্রিয় নবী এর নির্দেশ ও সাহাবায়ে কেরামের আদর্শের অনুবর্তী হবে।
ইবনুল জওযী বলেন, 'সকলের জানা আছে যে, সকলের বয়স স্বল্প! এবং ইল্ম কত বেশী। তাই শিক্ষার্থীর উচিত, প্রথমতঃ কুরআন পড়া ও হিফ্য করা দিয়ে ইল্ম আরম্ভ করা। তফসীরের প্রতি এমন মধ্যম দৃষ্টি দেওয়া যাতে কোন বিষয় অস্পষ্ট থেকে না যায়। ঐ সাথে সাবআ ক্বিরাআত এবং আরবী সাহিত্য ও ব্যাকরণের বই পড়াও সঠিক।
অতঃপর হাদীসের মূল গ্রন্থগুলি পড়তে শুরু করবে, যেমন সিহাহ! (বুখারী, মুসলিম) মাসানীদ (মুসনাদে আহমদ, মুসনাদে আবী য়্যা'লা)! সুনান (আবু দাউদ, তিরমিযী, নাসায়ী, ইবনে মাজাহ) ইত্যাদি। আর সাথে সাথে ইল্মে মুস্তালাহুল হাদীস বা ওসূলে হাদীস (যার দ্বারা হাদীসকে যয়ীফ ও জাল হতে পৃথক করা সম্ভব হয় তা) পড়বে। যয়ীফ ও তদপেক্ষা নিম্নমানের বর্ণনাকারীদেরকে চিহ্নিত করার জন্য রেজালশাস্ত্র পড়বে; যা ওলামাগণ এমনভাবে সুসজ্জিত ও গচ্ছিত করে গ্রন্থাকারে প্রকাশ করেছেন যাতে শিক্ষার্থীকে এমন কোন বেশী কষ্ট স্বীকার করতে হবে না।
তারীখ বা ইসলামী ইতিহাস ততটুকু পড়বে যতটুকু জানা একান্ত দরকার। যেমন প্রিয় নবী এর বংশ, আত্মীয়-স্বজন ও পত্নীগণের অবস্থা সম্পর্কে অনেক কিছু জানবে। অতঃপর ইলমে ফিক্ এর প্রতি অগ্রসর হবে। মযহাব ও মতানৈক্যের বিষয়ে গবেষণা করবে। যে সব সমস্যায় মতভেদ আছে সে সবেই অধিক ধ্যান দেবে। সমস্যাটিতে কেন এত মতভেদ দেখা দিল তার কারণ খোঁজার চেষ্টা করবে এবং তার মূল উৎস থেকে প্রকৃত সমাধান জানার প্রচেষ্টা চালাবে। যেমন আয়াতের তফসীর, হাদীসের ব্যাখ্যা এবং শব্দার্থ জানার জন্য বিশেষ অভিধান ব্যবহার করবে।
ওসুলে ফিক্হ (সমস্যার সমাধানে সঠিক জ্ঞানলাভের নিয়মনীতি) এবং ফারায়েয পড়বে। আর মনে রাখবে যে, সমস্ত ইলমের নির্ভরস্থল হচ্ছে ফিকহ।'
ওলামাদের তরফ থেকে আমাদের জন্য এ কয়টি ইল্ম তলবের নির্দেশনামার স্বর্ণখন্ড ছিল। যা আমাদের সময় বাঁচাবার উদ্দেশ্যে। আমাদেরকে তাঁরা উপহার দিয়ে গেছেন; যা তাঁদের জীবনে এক অভিজ্ঞতা ছিল। যাতে আমরা আমাদের ইল্ম ও জ্ঞানের বুনিয়াদ শক্ত ভূমিতে বদ্ধমূল করতে পারি। আর যথাসম্ভব ইল্মী স্বর্ণসৌধ নির্বিঘ্নে নির্মাণ করতে পারি। তাই তো আমাদের উচিত, আমরা যেন তাঁদের নির্দেশিত পথ হতে দূরে চলে না যাই। নচেৎ আমাদের ইল্মী পথে নানান বাধা, বিপত্তি ও বন্ধুরতা পরিদৃষ্ট হবে।
আল্লাহ তাআলা ইবনে আব্দুল বার এর উপর রহম করেন তিনি তাঁর যুগের শিক্ষার্থীদের প্রতি আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, 'আমাদের এ যুগের ও এই দেশের শিক্ষার্থীরা তাদের সলফে সালেহীনদের পথ হতে দূরে সরে পড়েছে এবং ইল্ম অন্বেষণে এমন পথ অবলম্বন ও পছন্দ করেছে যা তাদের ইমামগণ জানতেন না। আর এ বিষয়ে বহু কিছু নতুন করে রচনা করেছে যার দ্বারায় তাদের মূর্খতাই প্রকাশিত হয়েছে এবং প্রকৃত ওলামাদের মর্যাদা হতে তারা বহু নিম্নে রয়ে গেছে।' (জামে' ২/১৬৯)
ইবনুল জওযী (রঃ) শিক্ষার্থীদের জন্য এক পাঠ্যসূচী নির্দিষ্ট করে বলেন, 'শিক্ষার্থীর শৈশবে প্রথমতঃ তাকে যে ভার দেওয়া হবে তা হচ্ছে, পাকাপোক্তভাবে কুরআন হিফ্য করা। কারণ, ঐ সময় হিফ্য তার রক্তে- মাংসে সংমিশ্রিত হয়ে চিরস্থায়ী হয়ে যাবে। অতঃপর নহু (আরবী ব্যাকরণ), অতঃপর মযহাব ও মতানৈকের উপর ফিক্হ্ন। আর এরপর যা তার দ্বারা হিফ্য করা সম্ভব তা করলে খুবই উত্তম।' (সাইদুল খাতের ২৪৪পৃঃ) এই সূচীর উপর হাদীস ও তার মুস্তালাহর ইল্মকে যোগ করা যায়। যাতে তার ফিক্হ্ন (ধর্মীয় জ্ঞান) কুরআন ও সহীহ হাদীসের উপর ভিত্তি করে পূর্ণতা ও বিশুদ্ধতাপ্রাপ্ত হয় এবং তার সাহায্যে শিক্ষার্থী মর্যাদার সমুচ্চ শিখরে আসীন হতে পারে।
শায়খ আব্দুর রহমান সা'দী (রঃ) বলেন, 'ফলপ্রসূ ইলম; যে ইলম হৃদয় ও আত্মকে পবিত্র করে, ইহ-পরকালের সুফল দান করে - তা হচ্ছে আল্লাহর রসূল এর বর্ণিত হাদীস, তফসীর, ফিকহ এবং মানুষের কালপাত্র ভেদে সেই সমস্ত আরবী (বা অন্যান্য ভাষায়) ইল্ল্ম যা কুরআন, হাদীস প্রভৃতি বুঝতে সহায়ক হয়।
কিন্তু কোন্ কোন্ বই-পুস্তকের সাহায্যে ইলম অর্জন সহজ হবে তা নির্দিষ্ট করা অবস্থা ও দেশ অনুপাতে ভিন্ন হতে পারে। আমাদের ধারণায় একটা মোটামুটি নির্দেশসূচী এই যে, শিক্ষার্থীর উচিত প্রতি ইলমের সংক্ষিপ্তসার প্রথমতঃ হিফ্য করার প্রচেষ্টা করা। যদি শাব্দিকভাবে স্মৃতিস্থ করতে অক্ষম হয় তবে তার উচিত, তা বারবার এমনভাবে পড়া যাতে তার মূল অর্থ হৃদয়ে গাঁথা যায়। এই সংক্ষিপ্তসার মুখস্থের পর অন্যান্য কিতাব-পত্র যেমন, ব্যাখ্যা ও টিপ্পনী পুস্তক পড়বে; যা ঐ সংক্ষিপ্তকে বিশদরূপে হৃদয়ে বিকশিত করে তুলবে। (এবং এইভাবে মূলের সঙ্গে ব্যাখ্যার সম্পর্ক রেখে পড়লে ইল্ম স্মৃতিস্থ করা খুবই সহজ হবে।)
অতএব যদি শিক্ষার্থী আকিদায় আকীদাহ ওয়াসেতিয়াহ, সালাসাতুল ওসূল, কিতাবুত তাওহীদ ও আকীদাহ তাহাবীয়াহ যেমন ছোট ছোট কিতাব মুখস্থ করে, ফিকহে মুখতাসারুদ দলীল, মুখতাসারুল মুকনে', হাদীসে বুলুগুল মারাম, নহুতে আল আজরুমিয়াহ (বা হেদায়াতুন নহু)। ইত্যাদি মুখস্থ করে এবং ঐ সমস্ত কিতাবের মূল বক্তব্য বুঝার চেষ্টা করে আর তার উপর ঐ সবের ব্যাখ্যা পুস্তক অথবা ঐ বিষয়ক কোন সাধারণ পুস্তক পাঠ করে তবে তার জন্য সব সহজ হয়ে যাবে। কারণ, তালেবে ইলম যখন ওসূল (মূল) মুখস্ত করে এবং তা বুঝতে যদি সক্ষমতা লাভ করে তবে তার জন্য ঐ বিষয়ক ছোট বড় কোনও কিতাব পড়তে বা বুঝতে কোনই অসুবিধা হয় না। আর যে মূল হারাবে সে সফলকাম হবে না।
অতএব যে ব্যক্তি দ্বীনী ফলপ্রসূ ইলমের প্রতি লোভ রাখে এবং তার সন্ধানে আল্লাহর সাহায্য নেয়; আল্লাহ তাকে সাহায্য করেন এবং তার ইলমে ও চলার পথে বর্কত দান করেন। আর যে ব্যক্তি ইলমের সন্ধানে উপকারী পথ ত্যাগ করে অন্য পথে চলে, তার কেবল সময়ই বরবাদ হয় এবং কষ্ট ব্যতীত অন্য কিছু লাভ হয় না। যেমন সকলের অভিজ্ঞতা ও প্রত্যক্ষে তা বিদিত।' (ফাতওয়া সা'দিয়াহ ৩০-৩১পৃঃ)
শায়খ (রঃ) এর তরফ হতে এটি একটি সুচিন্তিত অভিমত যা যত্ন ও মান্য করার উপযুক্ত। ওলামাদের জীবনী পড়লেও দেখা যায় তাঁরা এই পথ হতে কেউই বিচ্যুত হননি; যে পথে তাঁরা মর্যাদার শেষ মঞ্জিলে পৌঁছে গিয়েছিলেন।
এখানে তালেবে ইলমকে জেনে রাখা উচিত যে, ফিকহের উপর ঐ কিতাব মুখস্থ করায় আমাদের উৎসাহ দান নিন্দিত অন্ধানুকরণ বা তকলীদের প্রতি আহ্বান নয়। বরং আমাদের ঐ অনুপ্রেরণা দান কয়েকটি লাভের জন্য। যেমন, ঐ হিফ্যে শিক্ষার্থী ঐ সকল গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে একটা শক্ত বুনিয়াদের মালিক হবে। এবং ঐ সংক্ষিপ্ত পুস্তিকায় লিখিত সমস্ত মাসআলা (সমস্যা) তার সস্মৃতিস্থ হবে। যাতে ভবিষ্যতে অন্যান্য মাসায়েল তার নিকট তালগোল খেয়ে না যায় এবং প্রত্যেক আহকামের মধ্যে পার্থক্য নির্বাচন করতেও সক্ষম হয়। যেমন, পর্যায়ক্রমে ধীরে ধীরে ইজতেহাদী মর্যাদায় উন্নত হতে সে প্রচেষ্টা করবে। আর এই সব সংক্ষিপ্ত পুস্তিকা সেই সুউচ্চ আশার প্রতি সোপানাবলীর প্রথম সোপান।
আবার ঐগুলি মুখস্থ করার অর্থ, তার সবটার দ্বারা আমল করাও নয়। যেহেতু তা পড়ার জন্য ওস্তাযের একান্ত প্রয়োজন; যিনি কঠিনকে সহজ করে বুঝিয়ে দেবেন। অস্পষ্ট বাক্যকে ব্যাখ্যা করে স্পষ্ট করে দেবেন। বিভিন্ন মতানৈক্যের মাঝে কোন্ মতটি সঠিক তা কিতাব, সুন্নাহ ও যুক্তির আলোকে পরিস্ফুটিত করে তুলবেন। অনেকে তো নিজেদের ফিক্হের আলোকে হাদীসের দূর-ব্যাখ্যা করেন অথবা খণ্ডন করেন। কিন্তু ঐ সালাফী ওস্তায (সহীহ) হাদীসের আলোকেই ফিক্হ ও রায়ের খণ্ডন করবেন।
অবশ্য এই বিতর্ক ও আলোচনায় প্রবেশ করলে খুবই দীর্ঘতায় পড়ে যাব; যা আমরা চাইনা। তবে এই মর্মে মহান সুলেখক, সম্মানিত মুরব্বী, আল্লামাহ যাহাবী (রঃ) এর কতক উক্তি নকল করছি। যিনি প্রত্যেক মানুষকে তার সঠিক মর্যাদা দিয়ে বলেছেন, 'যে ব্যক্তি ইজতেহাদের মর্যাদায় পৌঁছে যাবে এবং এর উপর তার জন্য কয়েকজন ইমাম সাক্ষি দিবেন তার জন্য তকলীদ বৈধ নয়। যেমন, যে ব্যক্তি ফিকহ পড়তে শুরু করেছে এবং যে সাধারণ ব্যক্তি পুরা অথবা কিছু কুরআন হিফ্য করেছে তার জন্য ইজতেহাদ আদৌ বৈধ নয়। সে কেমন করে ইজতেহাদ করতে পারে? কি বলবে সে? কার উপর ভিত্তি করবে? কেমন করে উড়বে সে, যার এখনো ডানা গজায়নি?
আর তৃতীয় প্রকার মানুষ, যিনি ফিক্হ্ন পড়ে শেষ করেছেন, সজাগচিত্ত ও সমঝদার মুহাদ্দিস মানুষ, যিনি ফরু' (গৌণ আহকামের) সংক্ষিপ্ত পুস্তকাদি এবং ওসূল (মুখ্য)-এর নিয়মনীতি হিফ্য করেছেন, নহু পড়েছেন, ফাযায়েলে শরীক হয়েছেন এবং সাথে সাথে কুরআন মাজীদ হিফ্য করেছেন, তার তফসীর ও ভাবালঙ্কার অধ্যয়নে রত হয়েছেন তিনিই এক নির্দিষ্ট ইজতেহাদের মর্যাদায় উন্নীত হয়েছেন। তিনিই ইমামগণের দলীলসমূহের উপর চিন্তা-গবেষণা ও বিচার-বিবেচনা করার উপযুক্ত হয়েছেন। তাই যখনই কোন মাসআলায় (সমস্যায়) তাঁর নিকট হক ও সঠিকতা পরিস্ফুটিত হয়ে উঠবে এবং তাতে নস্ (পাকা, স্পষ্ট ও অকাট্য দলীল) প্রমাণিত হবে এবং প্রসিদ্ধ ইমামদের মধ্যে কেউ তার উপর আমল করে থাকবেন---- তখনই তার অনুসরণ করবেন, আর সেটাই সঠিক। ফাঁক খোঁজার পথে চলবেন না। (অর্থাৎ যে বিষয় করতে হবে বলে প্রমাণিত সে বিষয়ে কারো মতানুযায়ী না করার ছাড় বা অনুমতি থাকলে তা গ্রহণ করবেন না।) আর সংযমশীলতা অবলম্বন করবেন। এ ক্ষেত্রে তাঁর নিকট দলীল স্পষ্ট ও প্রমাণিত হবার পর তাঁর জন্য আর কারো তকলীদ (অন্ধানুকরণ) করার প্রশস্ততা নেই।'
অতএব আল্লাহ তাঁকে রহম করেন; যিনি নিজের আত্মার কদর জেনেছেন এবং তাকে তার নির্দিষ্ট মর্যাদাধাপের ঊর্ধ্বে উত্তোলন করেননি। যিনি সলফে-সালেহীনদের পথ ও পদ্ধতিমতে ইল্ম অনুসন্ধান করেছেন। তিনিই সকলকাম ইনশা-আল্লাহ।
অবশ্য ইলমের এই লম্বা ফিরিস্তি দেখে তালেবে ইলমের ঘাবড়ে যাওয়া উচিত নয়। কারণ:-
'এক পা দুই পা করি ধীরে ধীরে অগ্রসরি
করে নর অতি উচ্চ গিরি উল্লঙ্ঘন।'
তাছাড়া মাদ্রাসার সিলেবাসে এ ধরনের সিস্টেম না থাকলেও মান্তেক, ফালসাফা প্রভৃতির উপর বৃথা সময় ব্যয় না করে অন্যান্য তফসীর ও হাদীস বিষয়ক পাঠ্যসূচীর প্রতি বিশেষ দৃষ্টি রেখে উপরোক্ত ফিরিস্তি অনুযায়ী চলতে পারলে ইনশাআল্লাহ বড় আলেম হওয়ার স্বপ্ন বাস্তবে পরিণত হবে।
📄 অহংকার ও গর্ববোধ
পাপ ও আল্লাহ তাআলার অবাধ্যতা শরয়ী ইলমের পথে এক প্রতিবন্ধক। যেহেতু ইলম আল্লাহর নূর (জ্যোতি)। তিনি যার হৃদয়ে ইচ্ছা সেই নূরকে বিচ্ছুরিত করে থাকেন। পরন্তু পাপ অন্ধকার। আর আলো ও অন্ধকার একই স্থানে, একই হৃদয়ে একত্রিত হতে পারে না। এই জন্যই হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন, 'আমার ধারণা যে, কোন কৃতপাপের ফলেই মানুষের জ্ঞাত ও অর্জিত ইলম বিস্মৃত হয়ে যায়।' (জামে' ১/১৯৬)
ইমাম শাফেয়ী বলেন, 'আমি (আমার ওস্তাদ) অকী' (রঃ) এর নিকট স্মরণশক্তির স্বল্পতার অভিযোগ করলাম, তিনি আমাকে পাপকর্ম (সর্ব প্রকার ধর্মীয় অবাধ্যতা) ত্যাগ করতে নির্দেশ দিলেন এবং আমাকে জানালেন যে, ইলম আল্লাহর নূর। আর আল্লাহর নূর কোন অবাধ্য গোনাহগারকে উপহার দেওয়া হয় না।
পাপের সবটাই নিকৃষ্ট। তন্মধ্যে তালেবে ইলম, শিক্ষার্থী বা আলেমরা অধিক যে নিকৃষ্ট পাপে জড়িত তা হচ্ছে, অপরকে ক্ষুদ্র ও তুচ্ছজ্ঞান, অহংকার, আত্মগর্ব ও হামবড়াই। তাই তো অনেকে 'বড়াই' এর ময়দানে নিজেকে অপ্রতিদ্বন্দ্বী মনে করেন এবং তাঁর মন অথবা অবস্থা বলে, 'হাম জ্যায়সা কোঈ নেহী!' এইভাবে লেবাসে, আচরণে, চলনে, বলনে, ভাবে, ভঙ্গিমায় নিজের আত্মম্ভরিতা প্রকাশ করে তোলেন। যা আল্লাহ পাক কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেন, অর্থাৎ, অহংকারবশে তুমি মানুষকে অবজ্ঞা করো না এবং পৃথিবীতে উদ্ধতভাবে বিচরণ করো না। কারণ, আল্লাহ কোন উদ্ধত, অহংকারীকে ভালোবাসেন না। (কুঃ ৩১/১৮ আয়াত) অন্যথায় বলেন, "এ পরলোক যা আমি নির্ধারিত করি তাদের জন্য! যারা এ পৃথিবীতে উদ্ধত হতে ও বিপর্যয় সৃষ্টি করতে চায় না। মুত্তাকী (সাবধানী) দের জন্য শুভপরিণাম।” (কুঃ ২৮/৮৩)
সহীহায়নে আবুহুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, আল্লাহর রসূল বলেন, “কোন এক সময়ে এক ব্যক্তি (এক প্রকার সুন্দর) জামা পরিধান করে (কোন পথে) চলছিল। যাতে সে মনে মনে বড় গর্ব অনুভব করছিল। যার মাথার কেশ ছিল বিন্যস্ত। চলনে ছিল অহংকার। এমতাবস্থায় আল্লাহ পাক তাকে নিয়ে ভূমি বিধ্বস্ত করলেন। সে কিয়ামত অবধি ঐ ভূমি নীচে প্রবিষ্ট হতেই থাকবে।” (বুখারী, মুসলিম প্রমুখ)
ইবনুল জওযী বলেন, 'ইল্ল্ম অধিক অধিক বর্ধিত করা উত্তম কাজ। কারণ, যে ব্যক্তি মনে করে যে, সে যা শিখেছে তাই যথেষ্ট, সে নিজেরই রায় ও অভিমতকে সঠিক ও অদ্বিতীয় মনে করবে। তখন সে নিজেকেই বড় ভাববে এবং ঐ ভাবনা অন্যান্য ইল্মী উপকার লাভ করা হতে বাধ সাধবে। আবার প্রকৃত সঠিকতা ও শুদ্ধতা হতে বঞ্চিত হবে ওই অহম্ চিন্তায়।'
আলী বিন সাবেত সত্যই বলেছেন, 'ইলমের আপদ অহংকার ও ক্রোধ এবং সম্পদের আপদ অপচয় ও অযথা ব্যয়।'
মুজাহিদ বলেন, 'লাজুক ও অহংকারী ইল্ম লাভ করতে পারে না।' (বুখারী, দারেমী)
আইয়ুব সখতিয়ানী বলেন, 'আলেমের জন্য উচিত, আল্লাহর জন্য বিনয় প্রকাশ করে মাথার উপর মাটি রাখা।'
অনেকে বলেছেন, 'নম্র ও বিনয়ী শিক্ষার্থী (তালেবে ইল্ম) এরই অধিক ইল্ম থাকে। যেমন অন্যান্য জমি হতে নিচু জমিতেই পানি অধিক থাকে।'
একজন হাকীম (বিজ্ঞলোক) কে প্রশ্ন করা হল, এমন কোন্ সম্পদ আছে যার উপর তার মালিকের প্রতি কেউ হিংসা করে না? তিনি বললেন, 'বিনয়।' প্রশ্ন করা হল, 'এমন কোন বালা আছে যার উপর বালাগ্রস্তকে দয়া প্রদর্শন করা হয় না?' তিনি উত্তরে বললেন, 'অহংকার।'
সুতরাং তালেবে ইল্মের ও আলেমের উচিত, নিজ ইল্ম নিয়ে কোন প্রকারের গর্ব ও অহংকার না করা। যেহেতু তা এমন এক নিকৃষ্টতম আচরণ যার ফলে আল্লাহ ক্রোধান্বিত হন, মুমিনরাও রাগান্বিত হয়। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য নম্র ও বিনয়ী হবে আল্লাহ তাকে উন্নীত করবেন। পক্ষান্তরে যে তাঁর জন্য বিনয়ী হবে না তাকে তিনি অবনমিত করবেন।'
যদি এ ধরনের কোন গর্ব-চিন্তা কারো মনে জাগরিত হয় তবে তাকে তার পরিণাম ও কুফল স্মরণ করা উচিত এবং ভাবা উচিত যে, তার থেকে কত বয়োকনিষ্ঠ আছে যারা তার চেয়ে ইলমে অনেক বড়।
এযুগে কিছু লোকের এমন বিপত্তি প্রকাশিত হয়েছে যারা একটি বা দু'টি কিতাব (উর্দু ফিক্হ বা অন্য কোন কিতাব) পড়ে নিয়েছে, কিছু মসআলা হিফ্য করেছে, তারপর দু'দিন পরেই মুজতাহিদ হয়ে ফতোয়া দিতে শুরু করেছে। আবার এই নীচ খেয়াল হতেই শেষ নয়; বরং তারা প্রকৃত ওলামাদের চেয়ে নিজেদেরকে বড় ও অধিক জ্ঞানী ভাবতে বসেছে এবং নিজ দ্বারাই নিজেকে সবার চেয়ে উঁচু আসনে আসীন করেছে। যে আসন তার ধারণায় অন্য কেউ পাবার যোগ্য নয়। যে মনোভাব তাদের লেবাসে-পোশাকে, চলনে-বলনে ও ধর্মীয় বিতর্ক লুফায় প্রকাশ পায়। যেখানে প্রকৃত আলেম চুপ থাকেন সেখানে তাদের অনেকেই ফতোয়ার মুখে খই ফুটিয়ে থাকে। (ইন্না লিল্লাহি অইন্না ইলাইহি রাজেউন)।
এমন মুন্শীদের দ্বারা কত যে ক্ষতি হতে পারে, এবং কোন লাভ যে হতেই পারে না তাছাড়া তারা যে কত মূর্খ তা বলাই বাহুল্য। আল্লাহ যেন তাদেরকে সুপথ প্রদর্শন করেন। আমীন।
ঐ প্রকৃতি ও আচরণের নীম আলেমদের প্রতি ইঙ্গিত করে আল্লামা ইবনুল জওযী (রঃ) বলেন, 'বহু ওলামা ও আবেদের উপর সমালোচনা করা হয়েছে যে, তারা অহংকার গুপ্ত রাখে (তারা মনে মনে গর্বিত)। কেউ নিজকে উচ্চপদস্থ ভাবে এবং তার থেকে কেউ বড় হোক তা চায় না। কেউ আবার দরিদ্র রোগীর অবস্থা জিজ্ঞাসা করে না। মনে করে সে তার চেয়ে অনেক উত্তম। এদের অধিকাংশই অহংকারী। কিন্তু বিস্ময়ের বিষয় যে, তারা গর্ব করে কি নিয়ে?
যদি ইলম নিয়ে করে, তবে তার থেকে কত বড় আলেম অগ্রগামী আছেন। আর যদি ইবাদত নিয়ে করে তবে তার চেয়ে কত বড় আবেদও অগ্রণী আছেন। পরন্তু যে ব্যক্তি নিজের আচরণ ও পাপ পরিদর্শন করে থাকে সে জানতে পারবে যে, নিঃসন্দেহে সে পাপ ও ঔদাস্যে বাস করে। আর সে অপরের অবস্থা সম্পর্কে সন্দিহান থাকবে।'
অতএব সতর্কতার বিষয় যে, আত্মগর্বানুভব করা এবং পরকালের বিষয়ে নিজেকে অগ্রগামী ভাবা অত্যন্ত নিন্দনীয় ও সর্বনাশী জিনিস। সেহেতু প্রকৃত মুমিন এসব বিষয়ে নিজেকে তুচ্ছ মনে করে।
ওমর বিন আব্দুল আযীয (রঃ) কে বলা হল, 'আপনার ইন্তেকাল হলে আপনাকে রসূল এর হুজরায় সমাধিস্থ করব কি?' তিনি বললেন, 'আমি নিজেকে তার উপযুক্ত মনে করার (পাপের) চেয়ে শির্ক ব্যতীত সর্বপ্রকার গোনাহ নিয়ে আল্লাহর সহিত সাক্ষাৎ করা আমার নিকট পছন্দনীয়।' (সাইদুল খাতের ২৮২পৃঃ)
'তাহযীবুল ইহয়্যা'তে বলা হয়েছে, 'ইল্ম নিয়ে অহংকার ও ফখর সব চেয়ে বড় আপদ এবং মারাত্মক ব্যাধি; যাতে অত্যন্ত প্রচেষ্টা ও কঠিন পরিশ্রম ব্যতীত কোন চিকিৎসাই ফলপ্রসূ হয় না। কারণ, ইলমের কদর ও মর্যাদা আল্লাহর নিকট বিরাট বড়। আর মানুষের নিকটেও ধন-দৌলত ও রূপ-সৌন্দর্য অপেক্ষা ইল্ল্মই উৎকৃষ্টতম।'
দু'টি জিনিস জানা ছাড়া কোন আলেমই মন হতে গর্ব ও অহংকার মুছে ফেলতে পারেন না। প্রথমতঃ- জানা উচিত যে, আহলে ইলমের উপর আল্লাহর হুজ্জত (শাস্তির প্রমাণ) অধিক শক্ত। তিনি জাহেলদের ব্যাপারে যা সহ্য করবেন তার এক দশমাংশ আলেমদের ব্যাপারে সহ্য করবেন না। কারণ, জেনেশুনে আল্লাহর অবাধ্যতা করে যে- সে জ্ঞানপাপীর অপরাধ অধিক গুরুতর ও নিকৃষ্টতর। যেহেতু আল্লাহর প্রদত্ত ইল্মী নেয়ামতের কদর সে করে না।
দ্বিতীয়তঃ জানা উচিত যে, গর্ব আল্লাহ ব্যতীত কারো জন্য উপযুক্ত নয়। তিনি ছাড়া কেউ গরিমার যোগ্যও নয়। তাই যদি সে গর্ব করে তবে আল্লাহর নিকট অবশ্যই সে ঘৃণ্য ও ক্রোধের পাত্র হয়ে যাবে। প্রিয় নবী বলেন, "আল্লাহ বলেন, 'সম্ভ্রম, ইজ্জত ও বিজয় আমার পরিধেয় বস্ত্র, গৌরব গরিমা আমার চাদর, অতএব (এতে) যে আমার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চাইবে আমি তাকে শাস্তি দেব।” (মুসলিম)
আল্লাহর রসূল আরো বলেন, “সে ব্যক্তি বেহেশতে যাবে না যার হৃদয়ে ধূলিকণা পরিমাণও অহংকার থাকবে।” তখন এক ব্যক্তি বলে উঠল, 'যদি কোন মানুষ চায় যে, তার পোশাক সুন্দর হোক, তার জুতা সুন্দর হোক তাহলে?' তিনি বললেন, "আল্লাহ সুন্দর, সৌন্দর্য পছন্দ করেন। অহংকার হল হক (ন্যায় ও সত্য)কে প্রত্যাখ্যান করা এবং মানুষকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য (ও ঘৃণা) করার নামান্তর।” (মুসলিম, প্রমুখ)