📘 দ্বীনি শিক্ষার প্রতিবন্ধকতা 📄 ইখলাস না থাকা

📄 ইখলাস না থাকা


আমীরুল মুমিনীন হযরত উমর বিন খাত্তাব (রাঃ) প্রমুখাৎ বর্ণিত, আল্লাহর রসূল বলেন, ‘যাবতীয় আমল নিয়ত (সংকল্প) এর উপরেই নির্ভশীল। প্রত্যেক মানুষের জন্য তাই লাভ হয় যার নিয়ত সে করে থাকে। অতএব যার হিজরতের (নিয়ত) আল্লাহ ও তাঁর রসূলের উদ্দেশ্যে হবে, তার হিজরত আল্লাহ ও রসূলের প্রতি হবে। আর যার হিজরত কোন পার্থিব সম্পদ লাভের উদ্দেশ্যে অথবা কোন নারীকে বিবাহ করার উদ্দেশ্যে হবে তার হিজরত তারই জন্য হবে যার নিয়ত সে করেছে।” (বুখারী, মুসলিম)

হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন, ‘আহলে ইল্ম (উলামাগণ) যদি ইল্মের সুরক্ষা করত এবং তা প্রকৃত অধিকারীর নিকট স্থাপন করত তবে তার দ্বারা পৃথিবীর মানুষের নেতৃত্ব করতে পারত। কিন্তু তারা দুনিয়াদারের নিকট স্থাপন করেছে; যাতে তাদের দুনিয়া (পার্থিব সম্পদ) হতে কিছু পায়। যার ফলে দুনিয়াদারের নিকট তাঁদের আর কোন মূল্য নেই। আমি নবী করীম কে বলতে শুনেছি: “যে সমূদয় চিন্তারাশীকে একই চিন্তা করে নেয়, কেবলমাত্র পরলোকের চিন্তা। আল্লাহ তার ইহলোকের চিন্তার জন্য যথেষ্ট হন। আর যার চিন্তারাাজী ইহলৌকিক বিষয়ে শাখা-প্রশাখাবিশিষ্ট হয়, সে যে কোনও উপত্যকায় ধ্বংস হয়। আল্লাহর তাতে কোন পরোয়া নেই।” (ইঃমাঃ ১/৯৫, হাকেম ২/৪৪৩)

তালেবে ইল্ম (শিক্ষার্থী) যে সব বিষয়ে অধিক যত্নবান হয় তার মধ্যে সর্বাধিক যত্নযোগ্য রত্ন হচ্ছে তার নিয়ত (মনের সঙ্কল্প ও উদ্দেশ্য)। তার উচিত, ঐ নিয়তের সুচিকিৎসা করা, হেফাযত করা এবং তা যাতে ‘গড়বড়’ না হয়ে যায় তার সূক্ষ্ম খেয়াল রাখা। যেহেতু ইল্ম শিক্ষার ফযীলত ও মর্যাদা তখনই লাভ হয় যখন তা আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টিলাভের উদ্দেশ্যে শিখা হয়। তার দেওয়া উজ্জ্বল দ্বীনকে সমুজ্জ্বল রাখার উদ্দেশ্যে অন্বেষণ করা হয়। নচেৎ তা যদি অন্য কারো সন্তুষ্টি লাভের আশায় হয়, পার্থিব সুখ অথবা সম্মান ও অর্থোপার্জনের আশায় হয় তবে নিশ্চয় তাতে কোনই ফযীলত নেই। বরং ঐ ইল্ম তার জন্য ফিতনা এবং বোঝ হবে যার পরিণাম হবে অতি ভয়ানক ও নিকৃষ্ট। জানা গেল যে, আমল গ্রহণযোগ্য তখনই হবে যখন আমলকারীর নিয়ত সঠিক থাকবে। আমল শুদ্ধ হওয়ার সাথে সাথে তার হৃদয়ও পরিশুদ্ধ এবং উদ্দেশ্যও যথার্থ থাকবে। যেমন আল্লাহ পাক বলেন, অর্থাৎ, তারা আদিষ্ট হয়েছিল কেবলমাত্র আল্লাহর আনুগত্যে বিশুদ্ধ- চিত্ত হয়ে একনিষ্ঠভাবে তাঁর উপাসনা করতে।” (কুঃ ৯৮/৫)

অতএব শিক্ষার্থী যখন শিক্ষার পিছনে পার্থিব কোন কিছুর উদ্দেশ্য ও আশা রাখে তখন অবশ্যই সে প্রতিপালক আল্লাহর অবাধ্যতা করে, শুধুশুধু নিজের আত্মকে কষ্ট দেয় এবং গোনাহর ভাগী হয়। অথচ দুনিয়ার সম্পদলাভ তার পক্ষে ততটাই সম্ভব হয় যতটা আল্লাহপাক তার নিয়তিতে নির্ধারিত করেছেন।

হযরত হাসান বাসরী (রঃ) বলেন, 'যে ব্যক্তি নিজ পরলোক সুখময় করার উদ্দেশ্যে জ্ঞান অনুসন্ধান করে সে পারলৌকিক সুখ লাভ করে। আর যে দুনিয়া লাভের উদ্দেশ্যে ইল্ম শিক্ষা করে তবে সেটাই তার প্রাপ্য অংশ হয়। (পরলোক সে লাভ করতে পারে না)।' (দারেমী ১/৭০)

এর চেয়ে বৃহত্তর কথা প্রিয় নবী এর; তিনি বলেন, “যে ব্যক্তি এমন শিক্ষা করে যার দ্বারায় সে আল্লাহর সন্তুষ্টি বিধান করতে পারে, কিন্তু সেই শিক্ষা কেবল মাত্র পার্থিব কোন সম্পদলাভের আশায় শিখতে রত হয়, তবে কিয়ামতের দিন সে জান্নাতের গন্ধটুকুও পাবে না।” (মুঃআঃ ২/৩৩৮, আঃদাঃ ৪/৭১)

যারা আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্য ব্যতীত অন্য কোন উদ্দেশ্যে ইলম শিক্ষা করে তাদের সম্পর্কে হযরত আতা (রঃ) বলেন, যাদের গুণ এই (পার্থিব উদ্দেশ্যে ইল্ম শিখা) তাদের ইল্মকে আল্লাহ পাক তাদের বিপক্ষে দলীল স্বরূপ এবং শাস্তিলাভের কারণ স্বরূপ করে রাখেন।

অবশ্য তাদের দ্বারা কিছু উপকার দেখে ধোকা খাওয়া উচিত নয়। কারণ, হাদীসে বর্ণিত, “আল্লাহ তাআলা ফাজির (পাপী) ব্যক্তি দ্বারায়ও দ্বীনকে সাহায্য করেন।” যে ব্যক্তি পার্থিব সম্পদ ও সম্মান লাভের উদ্দেশ্যে জ্ঞান অন্বেষণ করে তার উপমা ঐ ব্যক্তির ন্যায়, যে মুক্তার চামড়ার সাহায্যে বিষ্ঠা সংগ্রহ করে। মাধ্যম কি সুন্দর! কিন্তু যা সংগ্রহ করে তা কত নিকৃষ্ট! (টীকা, মুসনাদে আবী য়া'লা ১১/২৬১)

সহনূন বলেন, 'ইবনে কাসেম প্রায় আমাদের কাছে এসে বলতেন, আল্লাহকে ভয় কর। কারণ, এর (ইলমের) স্বল্প ভাগ আল্লাহভীতিতে বহু অধিক। আর তার অধিক ভাগ আল্লাহভীরুতা ছাড়া অতি সামান্য। (যার কোন মূল্য নেই।) (আস সিয়ার, যাহাবী ৯/১২২)

ইউসুফ বিন হুসাইন বলেন, আমি যুন্নুন মিসরীকে বলতে শুনেছি, 'ওলামাগণের তিনটি বিষয় দ্বারা আপোসে উপদেশ দেওয়া নেওয়া করতেন; এক অপরকে লিখতেন, যে নিজের অভ্যন্তর পরিষ্কার ও সুন্দর করে আল্লাহ তার বাহির সুন্দর করেন। যে আল্লাহ ও তার মাঝে সবকিছু শুদ্ধ করে আল্লাহ তার ও সকল মানুষের মাঝে সবকিছু শুদ্ধ ও সুন্দর করেন। যে পারলৌকিক বিষয়ে যত্নবান হয় আল্লাহ তার ইহলৌকিক বিষয়ে সুব্যবস্থা করে দেন।' (আস সিয়ার ১৯/১৪১)

ইবনে মুবারক (রাঃ) বলেন, 'ইলমের সর্বপ্রথম পর্যায় হল শুদ্ধ নিয়ত, অতঃপর মনোযোগ সহকারে শ্রবণ, অতঃপর উপলদ্ধি (বুঝা), অতঃপর হিফ্য (মুখস্থ বা স্মৃতিস্থ করা), অতঃপর আমল এবং তারপর প্রচার ও তবলীগ। (জামেউ বায়ানিল ইল্ল্ম অফাযলিহ ১/১১৮)

এখানে একটি সতর্ক ও প্রনিধানযোগ্য বিষয় এই যে, সলফের এক জামাআত বলেছেন, 'আমরা দুনিয়ার লোভে ইল্ম শিক্ষা করতাম কিন্তু তারপর ইল্ম আমাদেরকে আখেরাতের প্রতি আকর্ষণ করেছে। আমরা ইল্ম অন্বেষণ শুরু করেছি যখন কোন নিয়ত ছিল না। অতঃপর (আল্লাহর তুষ্টি বিধানের) নিয়ত এসেছে।' 'যে, গায়রুল্লাহর উদ্দেশ্যে ইলম তলব করে ইল্ম তাকে আল্লাহর উদ্দেশ্যে না করে ছাড়ে না।' ইত্যাদি। (জামিউ বায়ানিল ইলম ২/২২-২৩)

এই কথাগুলির মূল্যবান ব্যাখ্যা দিয়েছেন ইমাম যাহাবী (রঃ)। তিনি হযরত মা'মর বিন রাশেদের কথার ব্যাখ্যায় বলেন, 'বলা হত যে, মানুষ গায়রুল্লাহর উদ্দেশ্যে ইল্ম শিক্ষা করে কিন্তু ইল্ম আল্লাহর উদ্দেশ্যে না করে ছাড়ে না।'

হ্যাঁ, প্রথমতঃ ইল্ম শিক্ষা শুরু করত কেবল মাত্র তার মহব্বতে (শিক্ষাকে ভালোবেসে) এবং মূর্খতা দূরীকরণের উদ্দেশ্যে, চাকুরী বা অন্য কিছু লাভের আশায়। তখন ইখলাস যে ওয়াজেব তা জানত না। নিয়ত কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি বিধানেরই হওয়া চাই তা ধারণায় ছিল না। কিন্তু পরক্ষণে যখন সে সবকিছু জানতে পারত তখন সাবধান ও সতর্ক হত, তার উদ্দেশ্যে ত্রুটির ভয়ঙ্কর পরিণাম বিষয়ে ভয়ার্ত হত এবং তার নেক নিয়ত ফিরে আসত - পুরোটাই অথবা কিছুটা। কখনোও বা কু- নিয়ত হতে তওবা করত এবং লজ্জিতও হত। আর তার লক্ষণ এই যে, সে অধিক ইলমের দাবী করে না। চ্যালেঞ্জ ও বিতর্কপ্রিয় হয় না। ইল্ম নিয়ে অহংকারী ও গর্বিত হয় না। বরং নিজেকে ছোট মনে করে। আবার যদি গর্ব করে বলে যে, 'আমি অমুকের চেয়ে বড় আলেম' তবে ইল্ম হতে সে বহু দূরে। (আস্ সিয়ার ৭/১৭)

যেমন কোন গল্পকার বলেন, এক ব্যক্তি একজন সম্ভ্রান্তা সুন্দরী যুবতীকে বিবাহের পায়গাম দিল। মেয়েটি তার দারিদ্র ও কুলমানহীনতা দেখে বিবাহে অসম্মতি প্রকাশ করল। লোকটি চিন্তা করল, দুই-এর মধ্যে কোন্ জিনিস দিয়ে তাকে লাভ করা যায়? ধন-দৌলত দ্বারা অথবা মান সম্ভ্রম দ্বারা? পরিশেষে সে সম্ভ্রমের পথ বেছে নিল। ফলে তাকে লাভের উদ্দেশ্যে ইল্ম অন্বেষণ শুরু করল। কিছুদিন পর সত্য সত্যই সে এক উচ্চ পদস্থ বড় আলেম হয়ে উঠল। তা দেখে ঐ মহিলাটি নিজ হতে ঐ ব্যক্তির নিকট বিবাহের পয়গাম পাঠাল। প্রত্যুত্তরে সে বলল, 'ইল্মের উপর আমি কিছুকে প্রাধান্য দিবনা।'

যেহেতু ইল্ম শিখে সে নিয়ত পরিশুদ্ধ করতে শিখেছে। ইল্ম শিক্ষা ও অন্যান্য ইবাদতের সংকল্পে আল্লাহর সন্তুষ্টি চায়। ভয় করে সব কাজে তাঁকে। কারণ, “তাঁর বান্দাদের মধ্যে ওলামা সম্প্রদায়ই তাঁকে ভয় করে থাকে।” (কুঃ ৩৫/২৮)

সুতরাং সেই দিকে খেয়াল রেখে ঐ মহিলাকে আর বিবাহ করল না। যাতে তার ইল্ম শিক্ষা তাকে বিবাহের উদ্দেশ্যে না হয় এবং তার নিয়ত হয় সত্য খাঁটি।

অতএব সাবধান ও হুশিয়ার হে তালেবে ইল্ম! যাতে নিয়তে শির্ক না হয়ে যায়। কারণ, আল্লাহ পাক হাদীসে কুদসীতে বলেন, “আমি শির্ক হতে সমস্ত শরীকদের চেয়ে বেপরোয়া। যে কেউ এমন আমল করে যাতে সে আমার সহিত অপরকে শরীক (অংশী) করে, আমি তার শির্ক সহ তাকে প্রত্যাখ্যান করি।” (মুসলিম)

আরেফগণের নিকট সর্বসম্মত বিষয় যে, মানুষের ধ্বংস তখনই অবশ্যম্ভাবী হয় যখন আল্লাহ তাআলা তাকে তার আত্মর মাঝে বর্জন করে দেন; যখন শয়তান তাকে লুফে নেয় এবং তার চলার পথ বিভিন্ন হয়ে পড়ে। যার জন্য দোযখই হয় তার উপযুক্ত স্থান।

আহমদ বিন সালামাহ (রঃ) বলেন, 'যে ব্যক্তি গায়রুল্লাহর (আল্লাহর সন্তুষ্টি ছাড়া অন্য কোন) উদ্দেশ্যে হাদীস অনুসন্ধান করে আল্লাহ তাকে প্রবঞ্চনায় ফেলেন।'

নিয়তের শুদ্ধতা ইলমের জন্য বড় সহযোগী প্রতিপন্ন হয়। যেমন, আবু আব্দুল্লাহর রওযবারী বলেন, 'ইল্ম আমলের উপর নির্ভরশীল। আমল ইখলাস (শুদ্ধ নিয়তের উপর) নির্ভরশীল। আর ইখলাস আল্লাহ সম্পর্কে জ্ঞান ও উপলব্ধি সঞ্চার করে।' (জামেউ বায়ানিল ইলল্ম ১/১৯৯)

ইব্রাহীম নখয়ী বলেন, 'যে ব্যক্তি কিছু পরিমাণও ইল্ম অর্জন করে; যার দ্বারায় সে আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করে, আল্লাহ তাকে যথেষ্ট জ্ঞান দান করেন।'

অনেকে মনে করে যে, ইল্ম শিক্ষা করা জরুরী নয়; বরং আমলই ইল্মের জন্ম দেয় এবং কুরআনের এই আয়াতকে তার দলীল মনে করে। আল্লাহ বলেন, ( তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, এবং তিনি তোমাদেরকে জ্ঞান দান করবেন। (কুঃ ২/২৮-২)

তফসীরুল মানার (৩/১২৮) এ বলা হয়েছে, অনেক সূফীদের নিকট এই আয়াতের অর্থ প্রসিদ্ধ যে, তাকওয়া ও পরহেযগারী ইল্ম হওয়ার কারণ। আর এর উপরেই ভিত্তি করে তারা তাদের মনগড়া তরীকত, রিয়াযত, বিদআত, ওযীফা পাঠ ইত্যাদির মাধ্যমে ইল্ম অর্জন করার প্রচেষ্টা করে। ভাবে, কোন ইল্ম অন্বেষণ না করেই এই সবের মাধ্যমে কলবে কলবে ইল্ম উদ্ভাসিত হবে!

অথচ ওদের এইরূপ দলীল ধরা আদৌ সঠিক নয়। যেহেতু নহবী সিবওয়াইহ-এর মতে এইরূপ অর্থ করা বৈধ নয়। কারণ, (আল্লাহকে ভয় কর) এর উপর (তোমাদেরকে জ্ঞান দান করবেন) এর (সংযোজন) পূর্বোক্তের বা এর জওয়াব বা অনুক্রম হওয়াকে খন্ডন করে। যেহেতু আল্ফ ভিন্নতা চায়। দ্বিতীয়তঃ ওদের এই উক্তিতে মুসাব্বাবকে সাবাব, ফারা'কে আস্ল এবং নতীজাকে মুকাদ্দামা করা হয়। (অথচ এর বিপরীতটাই হওয়া বিধেয়)। কারণ বিদিত ও বোধগম্য যে, ইল্মই তাকওয়াহ্ ও পরহেযগারী সৃষ্টি করে। ইল্ম ছাড়া তাকওয়া হয় কি করে? ইল্মই হল তাকওয়ার মূল ও প্রধান কারণ। (কোন বিষয়ে কিছুর জ্ঞান না হলে তাকওয়া করবে কোথা হতে? বিনা ইল্মে তো বিদআত হওয়াই সম্ভব।)

ব্যাখ্যাতার এ কথাগুলি সত্যই মূল্যবান। অধিক ব্যাখ্যা দিয়ে বলা যায় যে, আমল ও তাকওয়া হৃদয়ে অধিক ঈমানী শক্তি সঞ্চয় করে। যদ্বারা মুত্তাকী অধিক ইল্মের অধিকারী হয় এবং অধিক ফল ও লাভ অর্জন করতে পারে; যা কোন অমুত্তাকী বা বেআমল ব্যক্তি লাভ করতে পারে না। আর একথা সকলের বিদিত ও প্রত্যক্ষ। কিন্তু যে বিনা ইল্মে আল্লাহর ইবাদত করে ও তাকওয়াগিরি দেখিয়ে ইল্ম বর্জন করে এবং বলে, সে জাহেল।

📘 দ্বীনি শিক্ষার প্রতিবন্ধকতা 📄 আমল ত্যাগ

📄 আমল ত্যাগ


আবু বারযাহ আসলামী প্রমুখাৎ বর্ণিত, আল্লাহর রসূল বলেন, "কিয়ামতের দিন ততক্ষণ পর্যন্ত কোন বান্দার পা সরবে না যতক্ষণ পর্যন্ত না তাকে প্রশ্ন করা হয়েছে, তার আয়ু কি কাজে ব্যয় করেছে, তার ইল্ম দ্বারা কি আমল করেছে, তার সম্পদ কোথা হতে অর্জন করেছে এবং কোথায় ব্যয় করেছে, তার দেহ কোথায় ধ্বংস করেছে-এসব সম্পর্কে। (তিরমিযী, সহীহুল জামে' ৭৩০০নং)

অনুরূপভাবে খতীবও বর্ণনা করেছেন যে, তাকে তার ইল্ম ও তার মাধ্যমে সে কি আমল করেছে সে প্রসঙ্গে কৈফিয়ত করা হবে। (ইকতিযাউল ইলমিল আমাল)

হযরত আবু দারদা (রাঃ) বলেন, 'ততক্ষণ পর্যন্ত তুমি আলেম হতে পারবে না যতক্ষণ পর্যন্ত না তুমি মুতাআল্লিম (শিক্ষার্থী) হয়েছ। আর ইলম শিক্ষার পরও ততক্ষণ পর্যন্ত তুমি কোন আলেম নও যতক্ষণ পর্যন্ত না তুমি তার দ্বারায় আমল করেছ।'

হযরত আলী (রাঃ) বলেন, 'ইল্ম আমলকে আহ্বান করে। যদি আলেম তাতে সাড়া দেয় তবে ইল্ম থাকে; নচেৎ প্রস্থান করে।' (অর্থাৎ বেআমল আলেম, আলেম হয়না।)

ফুযাইল বিন ইয়ায বলেন, 'আলেম নিজ ইল্ম দ্বারা আমল না করা পর্যন্ত জাহেলই থাকে। যখন আমল করে তখন সে আলেম হয়।'

আমলে ইল্ম সংরক্ষিত ও অধিক স্মৃতিস্থ থাকে। বেআমলে ইল্ম নষ্ট ও বিস্মৃত হয়। যার জন্য শা'বী (রঃ) বলেন, 'আমরা হাদীস হিফ্য! (মুখস্থ) করতে তার উপর আমলের সাহায্য নিতাম। আর হাদীস অন্বেষণ করতে অনশনের (রোযার) সাহায্য নিতাম।' (আলজামে' ২/১১)

হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) বলেন, 'আমি মনে করি জানা ইল্ম বান্দা কোন গোনাহর কারণে ভুলে যায়।'

সলফে সালেহীনগণের অভ্যাস ছিল ইল্ম দ্বারা আমল করা। যার দরুন তাঁরা এত অগ্রণী ছিলেন এবং তাঁদের ইলমে বর্কত ছিল। আর এই জন্যই আবু আব্দুর রহমান সুলামী (রঃ) বলেন, 'আমাদেরকে আমাদের ওস্তাদগণ বর্ণনা করেছেন যে, যাঁরা নবী এর ছাত্র ছিলেন তাঁরা দশটি আয়াত শিখলে ততক্ষণ পর্যন্ত আর আগে বাড়তেন না যতক্ষণ পর্যন্ত ঐ দশ আয়াতের বর্ণিত ও নির্দেশিত সমস্ত আমল করেছেন। তাই আমরা কুরআন ও আমল উভয়ই (একই সময়ে) শিক্ষা করেছি।'

ইল্ম দ্বারা আমল ত্যাগ করা দুই ধরনের হয়ে থাকে:-
১- শরয়ী ফরয ও ওয়াজেব কর্ম বর্জন করা এবং শরয়ী হারাম ও অবৈধ কর্ম ত্যাগ না করা। জানার পর এটা কাবীরাহ গোনাহ (মহাপাপ)। আর এই আলেমদের সম্পর্কেই কুরআন ও হাদীসে আমল ত্যাগ করায় শাস্তি ভোগ করার কথা আলোচিত হয়েছে।
২- শরয়ী মুস্তাহাব (যা করলে পূণ্য হয় ও না করলে পাপ হয় না তা) ত্যাগ করা এবং মকরূহ (যা ত্যাগ করলে পূণ্য হয় ও করলে পাপ হয় না তা) পরিত্যাগ না করা। এটা নিন্দনীয় হলেও শাস্তির অঙ্গীকার ও ধমকমূলক আমল ত্যাগের হাদীসগুলি এমন আলেমকে শামিল করে না। তবে আলেম ও তালেবে ইলমের জন্য উচিত, যাবতীয় সুন্নতের উপর আমলে অভ্যাসী হওয়া এবং সকল প্রকার মকরূহ আমল হতে বেঁচে ও দূরে থাকা।

ইবনুল জওযী (রঃ) বলেন, 'নিহাতই মিসকিন তো সেই আলেম যার ইলমের বোঝা নিয়ে জীবন বিনষ্ট হল অথচ সেই অনুযায়ী কোন আমল করল না। (ইলমের পিছে সময় ব্যয় করে) পার্থিব সুখস্বাদও হারাল এবং পারলৌকিক কল্যাণও লাভ করতে পারল না। নিঃস্ব হয়ে পরলোক গমন করল এবং সেই ইল্ম হল তার বিপক্ষে শক্ত দলীল ও সবুত।' (সাইদুল খাতির ১৪৪পৃঃ)

সে আবার কেমন আলেম যে, আলেম অথচ নামাযে যত্নবান নয়, আলেম অথচ তার স্ত্রী-কন্যা বেপর্দা, আলেম অথচ অন্যায়ভাবে লোকের অর্থ ভক্ষণ করে, আলেম অথচ বলে গান-বাজনা হারাম নাকি?!!

📘 দ্বীনি শিক্ষার প্রতিবন্ধকতা 📄 ওস্তায় ছেড়ে কেবল কিতাবের উপর ভরসা

📄 ওস্তায় ছেড়ে কেবল কিতাবের উপর ভরসা


কতক তালেবে ইল্ম আছে যারা নিজের উপর এমন বিশ্বাস রাখে যে, তারা মনে করে, বিনা কোন আলেম বা ওস্তাদে কেবল মাত্র বই-পুস্তক পাঠ করেই আলেম হয়ে যাবে। কিন্তু এ ধারণা তাদের খাঁটি ভ্রান্ত। যেহেতু তাতে সে প্রকৃত ইল্মের নাগাল পাবে না। আসল শরয়ী জ্ঞানের তথ্য উদ্ধার করতে সক্ষম হবে না। তাদের ঐ জ্ঞানে থাকবে অগণিত ভ্রম, থাকবে পরস্পর-বিরোধিতা, আমলে থাকবে বিত্তত এবং ফতোয়ায় থাকবে ভ্রষ্টতা।

ইমাম শাফেয়ী (রঃ) বলেন, 'যে ব্যক্তি শুধুমাত্র কিতাবের উদর হতে জ্ঞান অন্বেষণ করবে (ও শরয়ী আলেম হতে চাইবে) সে সমস্ত আহকামকে ধ্বংস করে ফেলবে।'

তাদের কেউ কেউ বলতেন, 'দ্বীনের জন্য বড় আপদ তারা যারা কিতাব-পত্রকে নিজেদের শায়খ বা ওস্তাদ বানিয়ে আলেম হয়।' (তাযকেরাতুস সা-মে' অল মুতাকাল্লিম ৮৭পৃঃ)

ফকীহ সুলাইমান বিন মুসা বলেন, 'বলা হত, কুরআনের নকল নবীশ (যারা লিখে গ্রন্থাকারে প্রকাশ করে তাদের কাছে কুরআন শিখতে যেও না এবং ইলমের নকল নবীশদের নিকটও ইল্ম শিখতে যেও না।' (যেহেতু তারা লিখতে জানলেও কি লিখছে তার সবটা বুঝে না। যেমন একজন হাফেয যদি আলেম বা ক্বারী না হয় তবে তার নিকট কুরআনের তর্জমা বা তফসীর অথবা ক্বিরাত শিখতে যাওয়া নিহাতই ভ্রষ্টতার কারণ।)

ইমাম সাঈদ বিন আব্দুল আযীয তনুখী (যিনি আওযায়ীর সমতুল্য আলেম ছিলেন তিনি) ও ঐ একই কথা বলেন। যেমন পূর্বে বলা হত যে, 'কিতাবই যার ওস্তাদ হয়, তার ঠিকের চেয়ে ভুলের ভাগই বেশী হয়।'

আবু হাইয়ান নহবী বলেন, 'অনেক অবুঝ লোকের ধারণা যে, কেবল মাত্র বই-পত্র পড়েই ইল্ম (জ্ঞান) অর্জন করা যায় এবং ইচ্ছা করলে সবকিছু বোঝা যায়। কিন্তু জাহেল জানে না যে, তার মধ্যে এমন বাক্য ও কথা থাকবে যা তার বোধগম্য নয় বা সহজে উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। তাই যদি তুমি বিনা ওস্তাদে ইল্ম লাভ করার আশা রাখ তবে সঠিক পথ হতে অবশ্যই ভ্রষ্ট হয়ে যাবে। আর সমস্ত বিষয় তোমার মস্তিষ্কে তালগোল পাকিয়ে তুলবে এবং ধর্মের পথে অধিক ভ্রান্ত হবে তুমিই।' (যেহেতু নিম হাকীমে জানের খতরা এবং নিম আলেমে ঈমানের খতরা থাকে। আর অল্প বিদ্যা ভয়ঙ্করী।)

কিন্তু তালেবে ইলমকে কেন ওলামাদের নিকট বসে তাদের মুখামুখি ইল্ম অর্জন করতে জরুরী বলা হয়েছে? জ্ঞানীরা এই কথার ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

ইবনে বাত্তাল বলেছেন, 'কিতাবে এমন কতক ভ্রান্তকর (সন্দিগ্ধ) জিনিস থাকে যার কারণে মূল বক্তব্য স্পষ্টভাবে বুঝা যায় না। কোন আলেম বা ওস্তাদের নিকট পড়লে তা ধরা পড়ে বা সে ভ্রান্তি হয় না। যেমন, মুদ্রাকর-প্রমাদ বা ছাপায় ভুল, দৃষ্টি প্রমাদে পড়ায় ভুল, এ'রাব (আরবীতে কোথায় জের, জবর বা পেশ হবে তার) ভুল, (এই ভুলে কর্তাকে কর্মকারক এবং মানুষকে পশু বানিয়ে দেওয়া হয় এবং এইমত আরো কতশত ভুল হয়ে থাকে এই এ'রাব না জানার কারণে।) বিরাম বা থামার স্থান না জানায় ভুল, (বিশেষ করে সেই সব কিতাবে যাতে যতিচিহ্ন ব্যবহৃত হয়নি।) পুস্তকের পরিভাষা না জানায় ভুল, (নাসেখ- মানসূখ, সহীহ-যয়ীফ, আদেশ-উপদেশ প্রভৃতি না জানার প্রমাদ) ইত্যাদি।' (শারহু ইহয়্যায়ি উলুমিদ্দীন ১/৬৬)

ডাক্তারের বিনা পরামর্শে কেবল বই পড়ে ওষুধ ব্যবহার করলে যেমন অনেক সময় বিপদে পড়তে হয় ঠিক তেমনিই কোন ওস্তাদ বিনা কেবল বই পড়ে আলেম হতে চাইলে একই অবস্থা হওয়ার আশঙ্কা থাকে। সুতরাং বাড়িতে বসে নিজে নিজে পড়ে কিছু শিক্ষার চেয়ে কোন আলেম ও ওস্তাদের নিকট বসে তা পড়া ও শিক্ষা করাই উচিত। অনুরূপ মুখস্ত করে ইল্ম হৃদয়ে স্থান না দিয়ে যদি কিতাবেই রেখে দেওয়া হয় তবে সে ইল্মেও তালেবে ইল্ম উপকৃত হতে পারে না। পুঁথিগত বিদ্যা সময়ে কাজে দেয় না।
'গ্রন্থ-বিদ্যা আর পর হস্তে ধন, নহে বিদ্যা নহে ধন হলে প্রয়োজন।'

প্রকাশ থাকে যে, ধর্মীয় বা পাঠ্য বিষয় ছাড়া কোন গায়বী খবর জানা, আরোগ্যলাভ, সন্তানলাভ, বর্কতলাভ, বিনা আমলে মুক্তিলাভ প্রভৃতির উদ্দেশ্যে ওস্তাদ বা গুরু ধরা ঐ পর্যায়ে পড়েনা। নযর-নিয়ায পেশ করে ঐসব উদ্দেশ্য সাধনের জন্য অথবা কিয়ামতে পারের জন্য কাউকে ওস্তাদ বা গুরু মনে করা শির্ক।

📘 দ্বীনি শিক্ষার প্রতিবন্ধকতা 📄 ছোটদের নিকট ইলম্ তলব করা

📄 ছোটদের নিকট ইলম্ তলব করা


এ যুগে এক সমস্যা দেখা দিয়েছে যে, তালেবে ইলমদেরকে অনেক ক্ষেত্রে (স্বেচ্ছায় বা অনিচ্ছায়) বড়দের পরিহার করে ছোটদের নিকট ইলম শিক্ষা করতে হয়। প্রকৃতপক্ষে এই সমস্যা শিক্ষার পথে এক বাধা, যথার্থ জ্ঞানান্বেষণের পথে একপ্রকার কাঁটা, তালেবে ইলমের এক মানসিক রোগ যার দ্বারা সে ইলম অর্জনে হীনমনা হয়ে যায়। যেহেতু বড় ও অভিজ্ঞ আলেম থাকতে যাঁরা বয়সে ছোট; যাঁদের ইলমী অভিজ্ঞতা কম তাঁদের নিকট ইলম শিক্ষায় শিক্ষার্থী নিজেকে ধোকা দেয়। কারণ, তাতে প্রাথমিক শিক্ষার্থীর শিক্ষার বুনিয়াদ কাঁচা হয়ে থাকে, ইলমী বিকলাঙ্গের নিকট থেকে সেও ঐরূপ বিকলাঙ্গ হয়ে যায়। বড় ও অভিজ্ঞ ওলামাগণের অভিজ্ঞতা ও দীর্ঘ ইলমীচর্চায় প্রাপ্ত আদর্শ ও চরিত্র হতে বঞ্চিত থেকে যায়।

হযরত ইবনে মসউদ (রাঃ) এর উক্তি এই কথার প্রতিই ইঙ্গিত বহন করে। তিনি বলেন, 'মানুষ ততকাল অবধি কল্যাণে থাকবে যতকাল তারা (তালেবে ইল্মরা) তাদের বড় ও বুযুর্গ আমানতদার (ও পরহেযগার বাআমল) ওলামাদের নিকট ইলম তলব করবে। যখনই তারা ছোট বেআমল ও অসৎ আলেমের নিকট ইলম শিক্ষা করবে তখনই তারা ধ্বংস হবে।'

আল্লাহর রসূল বলেন, "কিয়ামতের এক লক্ষণ এই যে, ছোটদের নিকট ইল্ম অনুসন্ধান করা হবে।”

এখানে 'ছোট' এর ব্যাখ্যা নিয়ে ওলামাদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। এ ব্যাপারে ইবনে আব্দুল বার (রঃ) (জামে' ১/১৫৭ তে) এবং শাত্মবী (রঃ) (ই'তিসাম ২/৯৩ তে) অনেক উক্তির উল্লেখ করেছেন।

ইবনে কুতাইবা (রঃ) বলেন, 'ছোট বলতে যারা বয়োকনিষ্ঠ।' আর পূর্বোক্ত ইবনে মসউদের উক্তির টীকায় বলেন, 'তাঁর বলার উদ্দেশ্য এই যে, মানুষ ততকাল অবধি কল্যাণে থাকবে যতকাল অবধি তাদের ওলামাগণ বয়োজ্যেষ্ঠ ও বুযুর্গ হবেন। আর বয়োকনিষ্ঠ ও কাঁচা যুবক হবেন না। কারণ, বুযুর্গ ও বৃদ্ধ তিনিই, যাঁর যৌনজ্বালা উপশমিত হয়ে গেছে, দীর্ঘ সময় ধরে বহু অভিমত ও পরিপক্কতা লাভ করেছেন। যাঁর ইলম ও জ্ঞানে কোন সন্দেহ ও সংশয় থাকবে না। যাঁর উপর তার প্রবৃত্তি বিজয়ী হতে পারবে না। যাঁকে কোন লালসা অবনমিত করতে পারবে না। সদ্য যুবকদের মত শয়তান যাঁর পদস্খলন ঘটাতে পারবে না। বয়সাধিক্যের সাথে যার গাম্ভীর্য, প্রতিভা, বিচক্ষণতা, সৌম্যতা ও মননশীলতা ইত্যাদি থাকবে।

কিন্তু তরুণ উদীয়মান আলেমদের মধ্যে হয়তো তা অনুপ্রবেশ করতে পারে যা বুযুর্গদের মধ্যে প্রবেশ করতে পারে না। অতএব যদি তুমি ঐ নব যুবকের নিকট জ্ঞান অন্বেষণ করতে যাও এবং সে ঐ কাঁচা অবস্থায় তোমাকে তা'লীম ও ফতোয়া দেয় তবে সে নিজে ধ্বংস হবে এবং তুমিও।' (নসীহাতু আহলিল হাদীস, খতীব ১৬পৃঃ)

ইবনে আব্দুল বার (রঃ) হযরত উমর (রাঃ) হতে একটি বর্ণনা নকল করেছেন, তিনি বলেন, 'কখন মানুষের শান্তি ও কল্যাণ হবে এবং কখন তাদের অশান্তি ও বিঘ্ন আসবে তা আমি অবশ্যই জানি; কোন বয়োকনিষ্ঠের নিকট হতে যখন ফতোয়া ও ফিক্হ আসবে বড় তখন তা অমান্য ও অগ্রাহ্য করবে। (তখনই তাদের মধ্যে বিঘ্ন সৃষ্টি হবে) এবং যখন কোন বড়র নিকট হতে ফিক্হ আসবে আর ছোট তার অনুসরণ ও মান্য করবে তখন দুজনেই সুপথপ্রাপ্ত হবে। (এবং শান্তি ও কল্যাণ বিরাজিত হবে।)'

হযরত ইবনে মসউদ (রাঃ) বলেন, 'তোমরা ততক্ষণ মঙ্গলে থাকবে যতক্ষণ তোমাদের ইল্ম থাকবে তোমাদের বড়দের কাছে। যখন ইলম তোমাদের ছোটদের কাছে থাকবে তখন বড় ছোটকে (না মেনে) বেওকুফ ও অপক্ক ভাববে।'

অতএব এই দু'টি বর্ণনায় ছোটদের নিকট ইল্ম না শিখার কারণ যা ইবনে কুতাইবাহ দর্শিয়েছেন তা থেকে ভিন্ন ব্যক্ত করা হয়েছে। আর তা হল কোন ছোটর নিকট হতে ইল্ম বা ফতোয়া এলে তা অমান্য ও অগ্রাহ্য করার ভয়। মোটকথা 'ছোট' শব্দটি সাধারণ যা বাহ্যিক ও আভ্যন্তরিক সকল প্রকার ছোটকেই বুঝায়।

তবে একথাটি যে সবার জন্য সর্বাবস্থায় সঠিক তা নয়। কারণ, ছোট সাহাবী ও তাবেয়ীগণের এক জামাআত তাঁদের বয়োজ্যেষ্ঠ থাকতে তাঁদের সামনেই ফতোয়া ও দর্স দান করেছেন। তবে তাঁদের কথা অবশ্যই ভিন্ন। কারণ, তাঁরা ছোট হলেও তাঁদের মত প্রতিভাবান ব্যক্তিত্ব তাঁদের পরের যুগে সত্যই বিরল। পক্ষান্তরে যদি প্রায় সেই রকম কোন ছোট আলেম পাওয়া যায়, তাঁর পরিপক্কতা ও যোগ্যতা প্রসিদ্ধ হয়, তাঁর ইল্ম, দর্স ও তদরীসে প্রকৃত পরিপক্কতা ও সঠিক সফলতা প্রকাশ পায় এবং ঐরূপ কোন বুযুর্গ অভিজ্ঞ আলেম যদি না পাওয়া যায় আর যদি কোন বিঘ্ন না দেখা যায় তবে ঐ ছোটর নিকটই ইলম অর্জন করা প্রয়োজন।

আবার এই আলোচনার উদ্দেশ্য এই নয় যে, বড়রা থাকতে ছোটদের ইল্মের প্রতি ভ্রূক্ষেপ করা হবে না বা ছোটদের নিকট শিখা যাবে না। বরং উদ্দেশ্য এই যে, সকলকে নিজ নিজ উপযুক্ত স্থান ও পদ দান করতে হবে। অতএব যারা ছোট হবেন প্রাথমিক শিক্ষা তাঁদের নিকট শিখতে হবে। বা যতটা শিক্ষাদান তাঁর পক্ষে সম্ভব হবে ততটা শিখা হবে; তার বেশী নয়। তাছাড়া তাঁর নিকট হতে ফতোয়া চাওয়া, কোন সমস্যার সমাধান চাওয়া ইত্যাদি উচিত নয়। কারণ, এটা তাঁর জন্য ও সকলের জন্য ধ্বংসের হেতু।

অতএব তালেবে ইল্মের উচিত বুযুর্গ ও অভিজ্ঞ আলেমের নিকট শিক্ষা গ্রহণ করা, যাঁর বিগত আয়ু ইল্মেই ব্যয় হয়েছে। ইল্মী মসনদে যাঁর বার্ধক্য এসেছে। তাঁকে হারিয়ে ফেলার পূর্বে তাঁর শিষ্যত্ব ও সাহচর্য গ্রহণ করা। তাঁর ইল্মী গুপ্তখনির দ্বার উদ্ঘাটন করা কর্তব্য।

দুঃখের বিষয় যে, এ যুগের অধিকাংশ সাধারণ মানুষ প্রকৃত ওলামাদের মূল্যায়ন করতে এবং সঠিক যোগ্য আলেম চিহ্নিত করতে খুবই ভুল করে থাকে। তাই যদি কারো নিকট কোন জালসা মহফিলে বা মসজিদে সাহিত্য বাগাড়ম্বরপূর্ণ বক্তৃতা অথবা মর্মস্পর্শী ওয়ায শোনে অথবা কাউকে লম্বা আলখাল্লা বা জুব্বা পরা ও পাগড়ী বাঁধা দেখে তবে তাকেই প্রকৃত আলেম বলে ধারণা করে বসে এবং তাকে নানা ফতোয়া ও সমস্যার কথা জানিয়ে উত্তরের আশা করে।

অথচ এটা এক বেদনাদায়ক বিপদ এবং ভয়ানক মসীবত যা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি হতে চলেছে। অর্থাৎ অযোগ্য আলেমের উপর ইল্ল্মী ভরসা বেড়ে চলেছে। আর যখন অযোগ্য লোকের উপর কোন যোগ্য কাজ সমর্পণ করা হবে তখনই কিয়ামতের অপেক্ষার সময়।

অতএব তালেবে ইল্ম (প্রতি মুসলিম) এর উচিত ওঁদের নিকট হতে কোন ধর্মীয় সমাধান বা ইল্ম না নেওয়া। ইল্ম নেবে তাঁদের নিকট যাঁরা ইল্মে পরিচিত ও প্রসিদ্ধ। কেউ ভালো বক্তৃতা বা ওয়ায করতে পারলেই আলেম হয়ে যায় না। দেখতে আবেদ হলে, লোকে তার খিদমত করলে, তার অসংখ্য ভক্তদল হলে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির তালে তাল মিলিয়ে কথা বললে বা তর্কশাস্ত্রে পারদর্শী হলেই দ্বীনী আলেম হয়ে যায় না। প্রকৃত আলেম চেনার কষ্টিপাথর আছে ভিন্ন।

পূর্বালোচনার অর্থ এই নয় যে, তাঁদের বক্তৃতা শোনা হবে না বা তাঁদের নিকট পড়া হবে না যেমন অনেকে মনে করতে পারে। বরং তার অর্থ এই যে, কোন জটিল বিষয়ে ফতোয়া বা ইলম তাঁদের নিকট গ্রহণ করা যাবে না এবং তাঁদেরকে ঐ রব্বানী ওলামাগণের আসনে বসানো যাবে না।

ফন্ট সাইজ
15px
17px