📄 পানাহার
প্রশ্ন: বিড়ি-সিগারেট হারাম হওয়ার স্পষ্ট দলীল শরীয়তে আছে কি? না থাকলে তা হারাম হয় কীভাবে?
উত্তর: শরীয়তের বিধানের সকল কিছুর স্পষ্ট দলীল নেই। আর না থাকলে কোন জিনিস যে হালাল, তা নয়। শরীয়তের স্পষ্ট উক্তিসমূহ থেকে ফক্বীহগণ এমন কিছু নীতি নির্ণয় করেন, যার দ্বারা বলা যায় কোন্টা হালাল, আর কোন্টা হারাম। যে সকল নীতির মাধ্যমে বিড়ি-সিগারেটকে হারাম বলা হয়, তার কিছু নিম্নরূপঃ- (ক) এতে রয়েছে অনর্থক অর্থ-অপচয়। আর ইসলামে অপচয় হারাম। (খ) এতে রয়েছে স্বাস্থ্যগত ক্ষতি। আর যা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর, ইসলামে তা হারাম। (গ) বেশি পরিমাণ পান করলে, তাতে জ্ঞানশূন্যতা আসতে পারে। আর যাতে নেশা, মাদকতা ও জ্ঞানশূন্যতা আসে, ইসলামে তা হারাম। (ঘ) এতে দুর্গন্ধ আছে। এর দুর্গন্ধে অধূমপায়ীরা কষ্ট পায়। সুতরাং তা পবিত্র জিনিস নয়। আর ইসলাম পবিত্র জিনিস খাওয়াকে হালাল এবং অপবিত্র জিনিস খাওয়াকে হারাম ঘোষণা করেছে।
প্রশ্নঃ অমুসলিমদের যবেহকৃত পশুর মাংস খাওয়া বৈধ কি?
উত্তর: অমুসলিমদের যবেহকৃত পশুর মাংস খাওয়া বৈধ নয়। তবে তাদের মধ্যে আহলে কিতাব (ইয়াহুদী-খ্রিস্টান) দের যবেহকৃত পশুর মাংস খাওয়া হালাল; যদি জানা যায় যে, তারা আল্লাহর নাম নিয়ে ছুরি দ্বারা যথানিয়মে যবেহ করে। পক্ষান্তরে যদি জানা যায় যে, তারা যবেহর সময় আল্লাহর নাম নেয় না, অথবা কারেন্টের শক দিয়ে হত্যা করে, অথবা গুলি মেরে হত্যা করে, অথবা গরম পানিতে ডুবিয়ে হত্যা করে, যাতে মাংসের ভিতরে রক্ত জমা থেকে তার ওজন বেশি হয় এবং দেখতেও লোভনীয় ভাল মাংস হয়, তাহলে ঐ মাংস খাওয়া হালাল নয়। (ইজি) প্রকাশ থাকে যে, 'মুসলিম' নামধারী কোন নাস্তিক, কাফের বা মুশরিকের যবেহ করা পশু হালাল নয়। মাযারী, কবুরী এবং মতান্তরে কোন বেনামাযীর হাতে যবেহ করা পশুর গোশত হালাল নয়। বৈধ নয় কোন ছোট শিশু, নেশাগ্রস্ত বা পাগল ব্যক্তির যবেহ।
প্রশ্ন: কোন গোশতের ব্যাপারে 'ঠিকমতো যবেহ করা হয়েছে কি না'---এই সন্দেহ হলে বাড়ি-ওয়ালা অথবা হোটেল-মালিককে জিজ্ঞাসা করা কি জরুরী? নাকি জিজ্ঞাসা না করেও খাওয়া যায়?
উত্তর: যদি প্রবল ধারণায় জানা যায় যে, যবেহকারী ঠিকভাবেই যবেহ করেছে, তাহলে জিজ্ঞাসা করা বিধেয় নয়। যেহেতু মহানবী ইয়াহুদীদের যবেহ করা ছাগলের গোশত খেয়েছেন এবং জিজ্ঞাসাও করেননি যে, তা ঠিকভাবে যবেহ করা হয়েছে কি না? (বুখারী ২৬১৭, ২০৬৯, ২৫০৮, মুসলিম ২১৯০নং) একদা একদল লোক নবী-কে জিজ্ঞাসা করল, 'এক নও-মুসলিম সম্প্রদায় আমাদের নিকট গোশত নিয়ে আসে। আমরা জানি না যে, তার যবেহকালে আল্লাহর নাম উচ্চারণ করা হয়েছে কি না। তিনি বললেন, "তোমরা আল্লাহর নাম নিয়ে তা ভক্ষণ করো।” (বুখারী ২০৫৭, ৫৫০৭নং) উক্ত হাদীসে নবী তাঁদেরকে জিজ্ঞাসা ক'রে সন্দেহ দূরীভূত করতে নির্দেশ দেননি। এমন নির্দেশ হলে নিশ্চয় মানুষ বড় সমস্যায় পতিত হতো। (ইউ)
প্রশ্নঃ দাঁড়িয়ে পানাহার করা কি হারাম?
উত্তর: দাঁড়িয়ে পানাহার করা হারাম। যেহেতু আল্লাহর রসূল বলেছেন, "তোমাদের মধ্যে কেউ যেন দাঁড়িয়ে পান না করে। কেউ ভুলে গিয়ে পান করে থাকলে সে যেন তা বমি ক'রে ফেলে।” (মুসলিম ২০২৬নং) আনাস বলেন, নবী নিষেধ করেছেন যে, কোন লোক যেন দাঁড়িয়ে পান না করে। আনাস-কে দাঁড়িয়ে খাওয়া সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে উত্তরে তিনি বললেন, 'এটা তো আরো খারাপ ও আরো নোংরা।” (মুসলিম ২০২৪নং) হাদীসে দাঁড়িয়ে পান করার ব্যাপারে নবী ধমক দিয়েছেন এবং তিনি বলেছেন, "(তুমি দাঁড়িয়ে পান করলে) তোমার সাথে শয়তান পান করেছে।” অবশ্য দাঁড়িয়ে পান বৈধ হওয়ার ব্যাপারেও হাদীস বর্ণিত হয়েছে। (বুখারী ১৬৩৭, ৫৬১৫, মুসলিম ২০২৭, ইবনে মাজাহ ৩৩০১নং প্রমুখ) সুতরাং বসার জায়গা না থাকলে অথবা অন্য কোন অসুবিধায় বা প্রয়োজনে দাঁড়িয়ে পানাহার করা হারাম নয়। (বানী, সিঃ সহীহাহ ১৭৫নং)
প্রশ্নঃ চামচ দিয়ে খাওয়া কি সুন্নত-বিরোধী?
উত্তর: মহানবী তিনটি আঙ্গুল যোগে খেতেন। কিন্তু চামচ লাগিয়ে খাওয়া অবৈধ নয়। যেহেতু তা শরয়ী ব্যাপার নয়, বরং তা পার্থিব ব্যবহারিক ব্যাপার। যেমন আধুনিক মাধ্যম বাস-ট্রেন, সাইকেল-গাড়ি ইত্যাদি ব্যবহার করা অবৈধ নয়। (বানী)
প্রশ্ন: মাছ মারা গিয়ে পানির উপরে ভেসে থাকলে তা খাওয়া বৈধ কি না?
উত্তর: মহানবী বলেছেন, "সমুদ্রের পানি পবিত্র এবং তার মৃত হালাল।” (আহমদ, সুনান আরবাআহ প্রমুখ, সিলসিলাহ সহীহাহ ৪৮০নং) এই হাদীস থেকে এ কথা বুঝা যায় যে, মাছ মারা গিয়ে পানির উপরে ভেসে উঠলেও তা হালাল। পক্ষান্তরে মাছ মারা গিয়ে পানির উপর ভেসে উঠলে তা খাওয়া নিষেধ হওয়ার ব্যাপারে হাদীস সহীহ নয়। (সিলসিলাহ সহীহাহ ১/৮৬৪) বরং পানিতে ভাসা আম্বর মাছ সাহাবাদের খাওয়ার ব্যাপারে ঘটনা হাদীসে প্রসিদ্ধ। আর তাঁরা নিরুপায় ছিলেন বলেই নয়; যেহেতু মহানবী ও সেই মাছের কিছু অংশ খেয়েছিলেন।
প্রশ্নঃ খাবার শুরুতে 'বিসমিল্লাহ'র উপর 'রাহমানির রাহীম' যোগ করা বিধেয় কি?
উত্তর: অনেকে বলেছেন, যোগ ক'রে 'বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম' বলা উত্তম। কিন্তু মহানবী-এর সুন্নতই সবচেয়ে উত্তম। তিনি কেবল 'বিসমিল্লাহ' বলারই নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, "তোমাদের কেউ যখন আহার করবে, সে যেন শুরুতে 'বিসমিল্লাহ' বলে। যদি শুরুতে তা বলতে ভুলে যায়, তাহলে সে যেন বলে 'বিসমিল্লাহি আওয়ালাহু অ আখেরাহ।” (তিরমিযী ১৮৫৭নং) (বানী)
প্রশ্নঃ ঘোড়ার গোশত খাওয়া বৈধ কি?
উত্তর: সহীহ হাদীস মতে ঘোড়ার গোশত হালাল। হানাফী মযহাবের বড় ইমামগণও হালাল বলেছেন। আবূ জা'ফর ত্বাহাবী হালাল হওয়ার কথাই প্রাধান্য দিয়েছেন। যেহেতু হারাম হওয়ার দলীলে হাদীস সহীহ নয়। (বানী)
প্রশ্ন: পরিবেশন করার সময় বুযুর্গকে আগে দিতে হবে, নাকি ডান দিক থেকে শুরু করতে হবে?
উত্তর: ডান দিক থেকেই শুরু করতে হবে। অবশ্য বুযুর্গ বা যে চেয়ে খেতে চাইবে, তাকে আগে দিতে হবে। (বানী, সিসঃ ১৭৭১নং)
প্রশ্নঃ কোন কাফের দাওয়াত দিলে খাওয়া বৈধ কি?
উত্তর: কোন কাফেরের দাওয়াতে হালাল খাদ্য খাওয়া অবৈধ নয়। আল্লাহর ওয়াস্তে তার মনকে ইসলামের দিকে আকৃষ্ট করার জন্য খাওয়া যায়। আমাদের আদর্শ নবী কাফেরদের দাওয়াতে তাদের তৈরি হালাল খাদ্য খেয়েছেন। অবশ্য তাদের পূজা (তদনুরূপ মাযারীদের উরস) উপলক্ষ্যে প্রস্তুতকৃত খাদ্য, মূর্তি বা মাযারে উৎসর্গীকৃত খাদ্য, ঠাকুরের প্রসাদ, মাযারের তবরুক ইত্যাদি খাওয়া বৈধ নয়। যেহেতু তাতে শির্কে মৌন-সম্মতি ও সমর্থন প্রকাশ পায়। (মাজাল্লাতুল বুহুসিল ইসলামিয়্যাহ ২৬/১০৯, ২৮/৮২, ৮৪)
প্রশ্ন: কাফেরদের প্রস্তুতকৃত খাদ্য খাওয়া বৈধ কি?
উত্তর: কাফেরদের প্রস্তুতকৃত খাদ্য ও পানীয় পানাহার অবৈধ নয়। যেমন তাদের প্রস্তুত, সিলাই ও ধৌত করা কাপড় ব্যবহার করা বৈধ। (ফাতাওয়া ইসলামিয়্যাহ ১/২০০)
প্রশ্নঃ কোন কাফেরকে ইসলামে নিষিদ্ধ খাবার খেতে দেওয়া বৈধ কি?
উত্তর: সহকর্মী বা কার্যক্ষেত্রে কোন অমুসলিমকে এমন জিনিস উপহার বা পানাহার করতে দেওয়া বৈধ নয়, যা তাদের ধর্মে বৈধ হলেও ইসলামে অবৈধ। যেমন কোন কাজ করাবার সময় লেবারকে, মদ বা বিড়ি-সিগারেট পেশ করাও অবৈধ। (ফাতাওয়া ইসলামিয়্যাহ ১/১১০)
📄 লেনদেন ও ব্যবসা-বাণিজ্য
প্রশ্ন: টেলিফোন-ক্যাবিনের তরফ থেকে পুরস্কার দেওয়া হয়। সে পুরস্কার গ্রহণ করা বৈধ কি?
উত্তর: টেলিফোন-ক্যাবিন বা এই শ্রেণীর কোন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে পুরস্কার প্রদানের উদ্দেশ্য হল নিজের দিকে বেশি বেশি গ্রাহক আকর্ষণ করা। যাতে তার ব্যবসা বেশি চলে এবং লাভও প্রচুর হয়। আসলে এটা জুয়ার পর্যায়ভুক্ত। এতে সাধারণ মানুষকে ধোঁকা দেওয়া হয়, লোভ দেখিয়ে বাতিল উপায়ে মানুষের অর্থ ভক্ষণ করা হয় এবং অন্য ব্যবসায়ী তথা গ্রাহকদের মনে হিংসা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক বিদ্বেষ জাগিয়ে তোলা হয়। (ইবা) মহান আল্লাহ বলেছেন, {يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالأَنصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِّنْ عَمَلٍ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ} (৯০) إِنَّ مَا يُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَن يُوقِعَ بَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةَ وَالْبَغْضَاء فِي الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ وَيَصُدَّكُمْ عَن ذِكْرِ اللَّهِ وَعَنِ الصَّلَاةِ فَهَلْ أَنتُم مُّنْتَهُونَ (৯১) سورة المائدة অর্থাৎ, হে বিশ্বাসিগণ! মদ, জুয়া, মূর্তিপূজার বেদী ও ভাগ্যনির্ণায়ক শর ঘৃণ্য বস্তু শয়তানের কাজ। সুতরাং তোমরা তা বর্জন কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার। শয়তান তো মদ ও জুয়া দ্বারা তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ ঘটাতে চায় এবং তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ ও নামাযে বাধা দিতে চায়! অতএব তোমরা কি নিবৃত্ত হবে না? (মায়িদাহঃ ৯০-৯১) {يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَأْكُلُواْ أَمْوَالَكُمْ بَيْنَكُمْ بِالْبَاطِلِ إِلَّا أَن تَكُونَ تِجَارَةً عَن تَرَاضٍ মِّنكُم} (২৯) سورة النساء অর্থাৎ, হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা একে অন্যের সম্পত্তি অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না। তবে তোমাদের পরস্পর সম্মতিক্রমে ব্যবসার মাধ্যমে (গ্রহণ করলে তা বৈধ)। (নিসাঃ ২৯)
প্রশ্নঃ কোন কোন ভাউচারে লেখা থাকে, 'বিক্রীত পণ্য পরিবর্তনযোগ্য ও ফেরৎযোগ্য নয়।' শরীয়তের বিধানে এটা কি ঠিক?
উত্তর: উক্ত শর্ত লাগিয়ে বিক্রেতার পণ্য বিক্রয় করা অথবা বিক্রয়ের সময় ক্রেতার উপর উক্ত শর্ত আরোপ করা সঠিক নয়। যেহেতু এতে ক্রেতা ধোঁকা খেতে পারে। এর ফলে ত্রুটিপূর্ণ পণ্য গ্রহণ করতে সে বাধ্য হয়, ফলে সে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ক্রেতা পূর্ণ মূল্য দিয়ে একটি ত্রুটিমুক্ত পণ্য পেতে চায়। কিন্তু পরবর্তীতে দেখা যায় তা ত্রুটিপূর্ণ। সুতরাং তার অধিকার আছে, সে তার পরিবর্তে অন্য পণ্য গ্রহণ করবে অথবা মূল্য ফিরিয়ে নেবে। (লাদা)
প্রশ্নঃ সুদী ব্যাংকে টাকা রাখা বৈধ কি?
উত্তর: কোন সুদী ব্যাংকে টাকা রাখা বৈধ নয়। বরং সুদী ব্যাংকের মাধ্যমে কোন কারবারই বৈধ নয়। যেহেতু মহান আল্লাহ বলেন, وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَى وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ) (২) سورة المائدة অর্থাৎ, সৎ কাজ ও আত্মসংযমে তোমরা পরস্পর সহযোগিতা কর এবং পাপ ও সীমালংঘনের কাজে একে অন্যের সাহায্য করো না। আর আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তিদানে অতি কঠোর। (মায়িদাহঃ ২) কিন্তু ইসলামী ব্যাংক না থাকলে মানুষ টাকার হিফাযতের জন্য রাখতে বাধ্য হলে সে কথা ভিন্ন।
প্রশ্ন: ব্যাংকের সুদ হারাম। কিন্তু তা কি ব্যাংকেই ছেড়ে দেব, নাকি তুলে নিয়ে কোন কাজে লাগাব? অন্যান্য হারাম মাল থেকে হালাল মালকে পবিত্র করার উপায় কী?
উত্তর: ব্যাংকের সূদ ব্যাংকে ছেড়ে দিলে তা অবৈধ পথে অথবা মুসলিমদের বিরুদ্ধে ব্যয় হতে পারে। সুতরাং তা তুলে নিয়ে নিঃস্ব মানুষদের মাঝে সওয়াবের নিয়ত না রেখে বিতরণ ক'রে দেওয়া অথবা কোন জনকল্যাণমূলক কর্মে ব্যয় করা যায়। হারাম উপায়ে উপার্জিত মালও তওবার পরে উক্তরূপে ব্যয় করা যায়। (ইজি)
প্রশ্ন: ব্যাংকের শেয়ার ক্রয়-বিক্রয় বৈধ কি?
উত্তর: সুদী কারবারের শেয়ার হলে বৈধ নয়। যেহেতু ইসলামে সুদ বৈধ নয়। (ইজি)
প্রশ্ন:- সূদী ব্যাঙ্কে চাকুরী করা এবং এর সাথে আদান-প্রদান করা বৈধ কি?
উত্তর:- এতে যে কোন চাকুরী করা হারাম। যেহেতু এতে চাকুরী করার অর্থই হল- সূদের উপর সহায়তা করা। অতএব যদি সুদী কারবারের উপর সহায়তা হয়, তাহলে সে (চাকুরে) সহায়ক হিসাবে অভিশাপে শামিল হবে। নবী সুদখোর, সূদদাতা, তার সাক্ষিদাতা ও তার লেখককে অভিসম্পাত করেছেন এবং বলেছেন, "ওরা সবাই সমান।” (মুসলিম ১৫৯৮নং) পক্ষান্তরে এ কাজ যদি সূদী কারবারের উপর সহায়ক না হয়, তাহলেও উক্ত কারবারে তার সম্মতি ও মৌন সমর্থন প্রকাশ পায়। তাই সূদী ব্যাঙ্কে কোন প্রকার চাকুরী নেওয়া বৈধ নয়। অবশ্য প্রয়োজনে ঐ ব্যাঙ্কে টাকা জমা রাখায় ক্ষতি নেই---যদি ঐ সমস্ত ব্যাঙ্ক ছাড়া টাকা জমা রাখার জন্য আমরা অন্য কোন ভিন্ন নিরাপদ স্থান না পাই। তবে এই শর্তে যে, তা থেকে যেন কেউ সুদ গ্রহণ না করে। যেহেতু সুদ গ্রহণ অবশ্যই হারাম। (ইউ)
প্রশ্নঃ নেট-হাউস বা কফি-হাউস খুলে নেট ভাড়া দিয়ে ব্যবসা বৈধ কি?
উত্তর: নেট অস্ত্রের মতো ভাল-মন্দ উভয়ভাবে ব্যবহার করা যায়। বাজারে হাউসে আসা অধিকাংশ যুবক তা নোংরা কাজে ব্যবহার করে। তা হলে তা তাদেরকে ভাড়া দিয়ে ব্যবসা বৈধ নয়। যারা ভাল কাজে ব্যবহার করবে, তাদেরকে ভাড়া দেওয়া যায়। (ইজি) মোট কথা নোংরা ও মন্দ কাজে সহযোগিতা ক'রে কোন ব্যবসাই ইসলামে বৈধ নয়। লজ বা হোটেলে বহু যুবক-যুবতী এসে রুম ভাড়া নেয়। কিন্তু যদি জানা যায় যে, তারা প্রেমিক-প্রেমিকা, তাহলে তাদেরকে রুম ভাড়া দেওয়া বৈধ নয়। দোকানে গুড় বিক্রি হয়। কিন্তু যদি জানা যায় যে, এ গুড় দিয়ে ক্রেতা মদ তৈরি করবে, তাহলে তাকে গুড় বিক্রি করা বৈধ নয়। ইত্যাদি। মহান আল্লাহ বলেছেন, {وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَى وَلاَ تَعَاوَنُواْ عَلَى الإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ} (২) سورة المائدة অর্থাৎ, সৎ কাজ ও আত্মসংযমে তোমরা পরস্পর সহযোগিতা কর এবং পাপ ও সীমালংঘনের কাজে একে অন্যের সাহায্য করো না। আর আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তিদানে অতি কঠোর। (মায়িদাহঃ ২) অনেকে বলবেন, 'তাহলে তো ব্যবসাই চলবে না।' কিন্তু আপনার ব্যবসায় যদি হারাম প্রবিষ্ট হয়, তাহলে আপনার দ্বীন চলবে কীভাবে? মহান আল্লাহ বলেছেন, {يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُلُوا مِن طَيِّبَاتِ مَا رَزَقْنَاكُمْ وَاشْكُرُوا لِلَّهِ إِن كُنتُمْ إِيَّاهُ تَعْبُدُونَ} অর্থাৎ, হে বিশ্বাসিগণ! আমি তোমাদেরকে যে রুযী দিয়েছি, তা থেকে পবিত্র বস্তু আহার কর এবং আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর; যদি তোমরা শুধু তাঁরই উপাসনা ক'রে থাক। (বাক্বারাহঃ ১৭২)
প্রশ্নঃ সস্তা দামে ডলার কিনে রেখে দাম বাড়লে তা বিক্রি করা বৈধ কি?
উত্তর: সস্তা দামে ডলার কিনে রেখে দাম বাড়লে তা বিক্রি করা বৈধ। তবে ডলার কেনার সময় টাকা নগদ-নগদ দিতে হবে। ধারে কেনা-বেচা চলবে না। (ইবা)
প্রশ্নঃ মুদ্রা-ব্যবসায় শরীয়তী কোন বাধা আছে কি?
উত্তর: মুদ্রা ব্যবসা, ডলারের বিনিময়ে টাকা, টাকার বিনিময়ে রিয়াল ইত্যাদি বিভিন্ন দেশের মুদ্রা ক্রয়-বিক্রয়ে কোন শরয়ী বাধা নেই; যদি তা নগদ-নগদ হাতে-হাতে হয়। (ইজি) তবে একই দেশীয় মুদ্রার বিনিময়ে কম-বেশি দেওয়া-নেওয়া চলবে না। যেহেতু তা সুদী কারবারে পরিণত হয়ে যাবে।
প্রশ্ন: কাগজের টাকার বিনিময়ে ধাতুর মুদ্রা (কয়েন) কম-বেশি বেচা-কেনা বৈধ কি? যেমন ১০ টাকার নোটের বিনিময়ে ৯ টাকার কয়েন নেওয়া বৈধ কি?
উত্তর: এ বিনিময়ে সমস্যা নেই। যেহেতু এক দেশীয় মুদ্রা হলেও উভয়ের মূল উপাদান ভিন্ন। (ইজি, ইউ) আর নবী বলেছেন, الذهب بالذهب والفضة بالفضة والبر بالبر والشعير بالشعير والتمر بالتمر والملح بالملح مثلاً بمثل سواء بسواء يدا بيد ، فإذا اختلفت الأصناف فبيعوا كيف شئتم إذا كان يداً بيد). অর্থাৎ, “সোনার বিনিময়ে সোনা, রূপার বিনিময়ে রূপা, গমের বিনিময়ে গম, যবের বিনিময়ে যব, খেজুরের বিনিময়ে খেজুর, লবণের বিনিময়ে লবণ ক্রয় বিক্রয়ের ক্ষেত্রে উভয় বস্তুকে যেমনকার তেমন, সমান সমান এবং হাতে হাতে হতে হবে। অবশ্য যখন উভয় বস্তুর শ্রেণী বা জাত বিভিন্ন হবে, তখন তোমরা তা যেভাবে (কমবেশী করে) ইচ্ছা বিক্রয় কর; তবে শর্ত হল, তা যেন হাতে হাতে নগদে হয়।” (মুসলিম, মিশকাত ২৮০৮ নং)
প্রশ্ন: দ্বীনী পত্রিকায় প্রতিযোগিতা ছাড়া হয়, তাতে পুরস্কার থাকে। সেই পত্রিকার বিক্রয় বাড়ে। যে অতিরিক্ত লাভ হয়, তা থেকে পুরস্কার দেওয়া হয়। লটারির মাধ্যমে কেউ কেউ সেই পুরস্কার পায় এবং অনেকেই পায় না। অবশ্য তাতে দ্বীনী জ্ঞান বৃদ্ধি পায়। পুরস্কার পাওয়ার লোভে ঐ পত্রিকা ক্রয় ক'রে ঐ প্রতিযোগিতায় শামিল হওয়া বৈধ কি?
উত্তর: বাহ্যতঃ তা বৈধ। বিশেষতঃ তাতে দ্বীনী জ্ঞান বৃদ্ধির লাভ আছে। (ইউ)
প্রশ্ন: পত্রিকায় অনেক সময় অনেক রকম প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করা হয়। আসলে তাতে উদ্দেশ্য থাকে প্রতিযোগিতার পুরস্কারের লোভ দেখিয়ে অধিক অধিক পত্রিকা কাটানো। অনেকে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করার উদ্দেশ্যেই তা ক্রয় ক'রে থাকে। অতঃপর কয়েকজন পুরস্কার পায় এবং বাকী অবশ্যই তাদের টাকা নষ্ট ক'রে বসে। পুরস্কারের লোভে এমন পত্রিকা কিনে তার প্রতিযোগিতায় অংশ গ্রহণ করা বৈধ কি?
উত্তর: এই শ্রেণীর প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করা বৈধ নয়। যেহেতু তা এক প্রকার জুয়ার মতই। (ইজি)
প্রশ্ন: অনেক সময় অনেক ব্যবসায়ী তার পণ্য বেশী পরিমাণে কাটাবার জন্য প্রতিযোগিতা ও পুরস্কারের ব্যবস্থা ক'রে থাকে এবং তাতে শর্ত থাকে যে, এত টাকার মাল কিনলে তবেই সেই প্রতিযোগিতায় অংশ গ্রহণ করতে পারবে। ফলে সে দোকানে খদ্দের ও লাভ প্রচুর হয়। পক্ষান্তরে অন্য দোকানে মাল কম বিক্রি হয় এবং সে দোকানদার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় ক্রেতাও; যেহেতু অনেক সময় প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও কেবল পুরস্কারের লোভে সেই দোকান হতে মাল ক্রয় করে থাকে। এমন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা ব্যবসায়ীর জন্য এবং তাতে অংশগ্রহণ করা ক্রেতার জন্য বৈধ কি?
উত্তর: এটিও একটি জুয়ার মতই কারবার। সুতরাং তা বৈধ নয়। হ্যাঁ, যদি প্রয়োজনে মাল কিনতে গিয়ে অনিচ্ছা সত্ত্বেও কোন পুরস্কার পাওয়া যায়, তাহলে তা গ্রহণ করায় দোষ নেই।
প্রশ্নঃ বিমা করা বৈধ কি? কোন্ শ্রেণীর বিমা অবৈধ?
উত্তর: বিমা সাধারণতঃ তিন প্রকারের। (১) গ্রুপ ইনশ্যুরেন্স (GROUP INSURANCE) সরকার এমন এক পথ ও পদ্ধতি অবলম্বন করে যাতে জনসাধারণের কোন একটি দল নিজেদের কোন ক্ষতিপূরণ অথবা কোন মুনাফালাভের ক্ষেত্রে সুবিধাভোগ করতে পারে। যেমন, সরকারী চাকরিজীবীদের বেতনের সামান্য একটা অংশ প্রত্যেক মাসে কেটে রেখে কোন বিশেষ এক ফান্ডে জমা করা হয়। অতঃপর কোন চাকরিজীবীর মুত্যু হলে অথবা সে দুর্ঘটনাগ্রস্ত হলে মোটা টাকা আকারে সাহায্য তার ওয়ারেসীনকে অথবা খোদ তাকে সমর্পণ করা হয়। এটি একটি সামাজিক (সমাজকল্যাণমূলক) কর্ম। যা সরকার তার দেশবাসীর সম্ভাব্য দুর্ঘটনার সময় অনুদান স্বরূপ দুর্গতদেরকে সাহায্য ক'রে থাকে। সুতরাং এটি সরকারের তরফ থেকে একপ্রকার অনুদান। কোন বিনিময়চুক্তির ফলে বিনিমেয় অর্থ নয়। এ কারণে এই প্রকার অনুদান গ্রহণে কোন প্রকার দ্বিমত নেই। (দিরাসাতুন শারইয়্যাহ ৪৭৭-৪৭৮ পৃঃ)
(২) সমবায় বিমা (MUTUAL INSURANCE) এর নিয়ম এই যে, যাদের সম্ভাব্য দুর্ঘটনা একই ধরনের হয়ে থাকে এমন কতকগুলি লোক আপোসে মিলে-মিশে একটি ফান্ড তৈরী করে নেয়। অতঃপর তারা এই চুক্তিবদ্ধ হয় যে, আমাদের মধ্যে কেউ দুর্ঘটনাগ্রস্ত হলে ঐ ফান্ড থেকে তার ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। ঐ ফান্ডে কেবল তার সদস্যদের টাকা জমা থাকে এবং ক্ষতিপূরণ কেবল ঐ সকল সদস্যদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। বৎসরান্তে হিসাব নেওয়া হয়। ক্ষতিপূরণ প্রদত্ত টাকার অংক যদি ফান্ডের টাকার চাইতে বেশী হয়ে যায়, তাহলে সে হিসাবে সদস্যদের নিকট থেকে আরো বেশী টাকা আদায় করা হয়। আর ফান্ডের টাকা উদ্বৃত্ত হলে সদস্যদেরকে ফেরৎ দেওয়া হয় অথবা তাদের তরফ থেকে আগামী বছরের জন্য ফান্ডের দেয় অংশ স্বরূপ রেখে নেওয়া হয়। প্রারম্ভিকভাবে বিমার এই ধরনই প্রচলিত ছিল। যার বৈধ-অবৈধতার ব্যাপারে কোন দ্বৈধ নেই। যে সমস্ত উলামাগণ বিমা নিয়ে আলোচনা করেছেন, তাঁরা সকলেই এর বৈধতার ব্যাপারে একমত।
(৩) বাণিজ্যিক বিমা (COMMERCIAL INSURANCE):- এই বিমার নিয়ম-পদ্ধতি এই যে, বিমা কোম্পানী প্রতিষ্ঠা করা হয়। কোম্পানীর উদ্দেশ্য থাকে, বিমাকে বাণিজ্যরূপে পরিচালিত করা; যার মূল উদ্দেশ্য থাকে বিমার অসীলায় মুনাফা উপার্জন। এই কোম্পানী বিভিন্ন ধরনের বিমার স্কীম জারী করে। যে ব্যক্তি বিমা করতে চায়, তার সাথে বিমা কোম্পানীর এই চুক্তি থাকে যে, এত টাকা এত কিস্তিতে আপনি আদায় করবেন। নোকসানের ক্ষেত্রে কোম্পানী আপনার ক্ষতিপূরণ দেবে। কোম্পানী কিস্তীর পরিমাণ নির্ধারণ করার জন্য হিসাব করে নেয় যে, যে সম্ভাব্য দুর্ঘটনার উপর বিমা করা হয়েছে, তা কতবার হতে পারে? যাতে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার পরও কোম্পানীর মুনাফা অবশিষ্ট থাকে। আর এই পরিসংখ্যান করার জন্য বিশেষ কৌশল আছে; যার সুদক্ষ কৌশলীকে (ACTUARY বা বিমাগাণনিক) বলা হয়। বর্তমানে এই ধরনের বিমার প্রচলন অধিক। আর এরই বৈধতা ও অবৈধতার ব্যাপারটি সাম্প্রতিককালীন উলামাগণের অধিকতর বিতর্কের বিষয় হয়ে পড়েছে। বর্তমানের মুসলিম-বিশ্বের প্রায় সকল প্রসিদ্ধ ও খ্যাতিসম্পন্ন উলামাগণের মতে তা অবৈধ। অধিকাংশ উলামাগণের ঐ জামাআত বলেন যে, এই বিমাতে জুয়ার গন্ধ আছে এবং সুদও। জুয়া এই জন্য বলা হচ্ছে যে, টাকা আদায়ের ব্যাপারটা এক পক্ষের (বিমাকারীর) তরফ থেকে নির্দিষ্ট ও নিশ্চিত। কিন্তু অপর পক্ষের (কোম্পানীর) তরফ থেকে তা সন্দিগ্ধ। বিমাকারী কিস্তীতে যে টাকা আদায় করে, তার সবটাই ডুবে যেতে পারে। আবার তার চাইতে বেশীও পেতে পারে। আর একেই জুয়া বলা হয়। সূদ আছে এই জন্য বলা হচ্ছে যে, এখানে টাকা দিয়ে বিনিময়ে টাকাই দেওয়া-নেওয়া হয়; যাতে কম বেশীও হয়ে থাকে। বিমাকারী কম টাকা জমা করলেও পাওয়ার সময় তার চেয়ে অনেক বেশীও পেয়ে থাকে। সুতরাং মুসলিমের জন্য এই বিমা বৈধ নয়। ('ব্যাংকের সুদ কি হালাল' বই থেকে)
প্রশ্ন: গাড়ি বা বাড়ির উপর বিমা বৈধ কি?
উত্তর: না। কারণ তাতে সুদ আছে এবং জুয়াও। আর নবী ধোঁকামূলক ব্যবসা করতে নিষেধ করেছেন। (মুসলিম ১৫২৩নং, ইউ)
প্রশ্ন: কোন কোন সরকারী চাকরিজীবী সরকারী মাল (তেল, ওষুধ, খনিজ পদার্থ ইত্যাদি) লুকিয়ে বিক্রি করে। সরকারী মাল বিক্রি করা কি বৈধ? সেই মাল কিনে নেওয়া কি বৈধ?
উত্তর: অবশ্য তাদের এমন আমানতে খেয়ানত বৈধ নয়। মহান আল্লাহ বলেছেন, {يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَخُونُواْ اللّهَ وَالرَّسُولَ وَتَخُونُواْ أَمَانَاتِكُمْ وَأَنتُمْ تَعْلَمُونَ } (২৭) অর্থাৎ, হে বিশ্বাসিগণ! জেনে-শুনে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের সাথে বিশ্বাস ভঙ্গ করো না এবং তোমাদের পরস্পরের আমানত (গচ্ছিত দ্রব্য) সম্পর্কেও নয়। (আনফালঃ ২৭) দ্বিতীয়তঃ এ কাজ অসদুপায়ে অপরের মাল ভক্ষণের শামিল। আর আল্লাহ বলেছেন, {يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَأْكُلُواْ أَمْوَالَكُمْ بَيْنَكُمْ بِالْبَاطِلِ إِلَّا أَن تَكُونَ تِجَارَةً عَن تَرَاضٍ মِّنكُم} (২৯) سورة النساء অর্থাৎ, হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা একে অন্যের সম্পত্তি অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না। তবে তোমাদের পরস্পর সম্মতিক্রমে ব্যবসার মাধ্যমে (গ্রহণ করলে তা বৈধ)। (নিসাঃ ২৯) আর এমন মাল চুরির জেনেশুনে ক্রয় করা বৈধ নয়, বিনামূল্যে নেওয়াও বৈধ নয়। যেহেতু তা চুরির মাল।
প্রশ্নঃ এক ব্যক্তির অর্থের প্রয়োজন হল। ঋণ কোথাও না পেয়ে এক গাড়ির ডিলারের নিকট গেল। ডিলারের নিকট থেকে ধারে এক লক্ষ টাকায় একটি গাড়ি কিনল। অতঃপর সেই গাড়িকেই ঐ ডিলারের নিকট নগদ ৯০ হাজার টাকা নিয়ে বিক্রি করল। পরবর্তীকালে কিস্তীতে সেই টাকা পরিশোধ করল। ফলে ১০ হাজার টাকা ডিলারের পকেটে অনায়াসে এসে গেল। এমন কারবার বৈধ কি?
উত্তর: কাউকে ধারে কোন মাল বিক্রি ক'রে সেই মাল কম দামে তারই নিকট থেকে ক্রয় করা হারাম। এই ব্যবসাকে শরীয়তে 'ঈনাহ' ব্যবসা বলা হয়। আল্লাহর রসূল বলেন, "যখন তোমরা 'ঈনাহ' ব্যবসা করবে এবং গরুর লেজ ধরে কেবল চাষ-বাস নিয়েই সন্তুষ্ট থাকবে, আর জিহাদ ত্যাগ ক'রে বসবে, তখন আল্লাহ তোমাদের উপর এমন হীনতা চাপিয়ে দেবেন; যা তোমাদের হৃদয় থেকে ততক্ষণ পর্যন্ত দূর করবেন না; যতক্ষণ পর্যন্ত না তোমরা তোমাদের দ্বীনের প্রতি প্রত্যাবর্তন করেছ।” (মুসনাদে আহমদ ২/২৮, ৪২, ৮৪, আবু দাউদ ৩৪৬২, বাইহাকী ৫/৩১৬)
প্রশ্ন: একই জিনিস নগদে ৫০ টাকায় এবং ধারে ৬০ টাকায় বিক্রি করা বৈধ কি?
উত্তর: এক কিস্তিতেই হোক বা একাধিক নির্দিষ্ট কিস্তিতেই হোক চুক্তি করে বেশি নেওয়া দোষাবহ নয়। যেমন যদি কোন দোকানদার ১ কেজি সরিষার তেল নগদ দরে ৫০ টাকা এবং ধারে ৬০ টাকা হিসাবে বিক্রয় করে, আর ক্রেতাও এ চুক্তিতে রাজি হয়ে ক্রয় করে থাকে, তাহলে উভয়ের জন্য তা বৈধ। এরূপ লেনদেন ব্যবসা-চুক্তি সূদের পর্যায়ভুক্ত নয়।
প্রশ্ন: ব্যবসায়ীদের অধিকাংশ লোকে বলে, 'মিথ্যা না বললে ব্যবসা চলে না।' এ কথা কি ঠিক? ব্যবসায় মিথ্যা বলা ও মিথ্যা কসম খাওয়ার পাপ কী?
উত্তর: তাদের কথা ঠিক নয়। ব্যবসা চলা-না চলা আল্লাহর হাতে। রুযী ও বর্কতের চাবি তাঁর হাতে। সুতরাং সদা সত্য কথা বলাই মুসলিমের গুণ। আর মিথ্যা বলা মুনাফিকের গুণ। রসূল বলেছেন, "নিশ্চয় সত্যবাদিতা পুণ্যের পথ দেখায়। আর পুণ্য জান্নাতের দিকে পথ নির্দেশনা করে। আর মানুষ সত্য কথা বলতে থাকে, শেষ পর্যন্ত আল্লাহর নিকট তাকে 'মহাসত্যবাদী' রূপে লিপিবদ্ধ করা হয়। আর নিঃসন্দেহে মিথ্যাবাদিতা নির্লজ্জতা ও পাপাচারের দিকে নিয়ে যায়। আর পাপাচার জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়। আর মানুষ মিথ্যা বলতে থাকে, শেষ পর্যন্ত আল্লাহর নিকট তাকে 'মহামিথ্যাবাদী' রূপে লিপিবদ্ধ করা হয়। (বুখারী ও মুসলিম) মিথ্যা কসম খেয়ে মাল বিক্রয় করাও মহাপাপ। মহানবী বলেছেন, "তিন ব্যক্তির সাথে কিয়ামতের দিন আল্লাহ কথা বলবেন না, তাদের দিকে (দয়ার দৃষ্টিতে) তাকাবেন না, তাদেরকে পবিত্র করবেন না এবং তাদের জন্য থাকবে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।” বর্ণনাকারী বলেন, 'রাসূলুল্লাহ উক্ত বাক্যগুলি তিনবার বললেন।' আবু যার বললেন, 'তারা ব্যর্থ ও ক্ষতিগ্রস্ত হোক! তারা কারা? হে আল্লাহর রসূল!' তিনি বললেন, "(লুঙ্গি- কাপড়) পায়ের গাঁটের নীচে যে ঝুলিয়ে পরে, দান ক'রে যে লোকের কাছে দানের কথা বলে বেড়ায় এবং মিথ্যা কসম খেয়ে যে পণ্য বিক্রি করে।” (মুসলিম) তিনি বলেছেন, “যে ব্যক্তি কোন মুসলমান ব্যক্তির মাল নাহক আত্মসাৎ করার জন্য মিথ্যা কসম খাবে, সে আল্লাহর সাথে এমন অবস্থায় সাক্ষাৎ করবে, যখন তিনি তার উপর ক্রোধান্বিত থাকবেন। অতঃপর এর সমর্থনে আল্লাহ আয্যা অজাল্লার কিতাব থেকে রাসূলুল্লাহ এই আয়াত পড়ে শুনালেন, {إِنَّ الَّذِينَ يَشْتَرُونَ بِعَهْدِ اللَّهِ وَأَيْمَانِهِمْ ثَمَنًا قَلِيلاً أُوْلَئِكَ لَا خَلَاقَ لَهُمْ فِي الْآخِرَةِ وَلَا يُكَلِّمُهُمُ اللَّهُ وَلَا يَنظُرُ إِلَيْهِمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَلاَ يُزَكِّيهِمْ وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ} (৭৭) سورة آل عمران অর্থাৎ, যারা আল্লাহর প্রতিশ্রুতি ও নিজেদের শপথ স্বল্প মূল্যে বিক্রয় করে, পরকালে তাদের কোন অংশ নেই। কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাদের সঙ্গে কথা বলবেন না, তাদের দিকে (দয়ার দৃষ্টিতে) চেয়ে দেখবেন না, তাদেরকে পরিশুদ্ধ করবেন না এবং তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি। (আলে ইমরান ৭৭ আয়াত, বুখারী ও মুসলিম) তিনি আরো বলেন, "ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ে পৃথক না হওয়া পর্যন্ত (ক্রয়-বিক্রয়ে তাদের) এখতিয়ার থাকে। সুতরাং তারা যদি (ক্রয়-বিক্রয়ে) সত্য বলে এবং (পণ্যদ্রব্যের দোষ-গুণ) খুলে বলে, তাহলে তাদের ক্রয়-বিক্রয়ে বর্কত দেওয়া হয়। অন্যথা যদি (পণ্যদ্রব্যের দোষ-ত্রুটি) গোপন করে এবং মিথ্যা বলে, তাহলে বাহ্যতঃ তারা লাভ করলেও তাদের ক্রয়-বিক্রয়ের বর্কত বিনাশ ক'রে দেওয়া হয়। আর মিথ্যা কসম পণ্যদ্রব্য চালু করে ঠিকই, কিন্তু তা উপার্জনের (বর্কত) বিনষ্ট ক'রে দেয়।” (বুখারী ২১১৪, মুসলিম ১৫৩২, আবুদাউদ ৩৪৫৯, তিরমিযী ১২৪৬নং, নাসাঈ) পরম্ভ মিথ্যা বলে বা মিথ্যা কসম খেয়ে ধোঁকা দিয়ে পণ্য বিক্রয় করা অসদুপায়ে অপরের মাল হরণ করার শামিল। আর আল্লাহ বলেছেন, {يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ لاَ تَأْكُلُواْ أَمْوَالَكُمْ بَيْنَكُمْ بِالْبَاطِلِ إِلَّا أَن تَكُونَ تِجَارَةً عَن تَرَاضٍ مِّنكُم} (২৯) سورة النساء অর্থাৎ, হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা একে অন্যের সম্পত্তি অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না। তবে তোমাদের পরস্পর সম্মতিক্রমে ব্যবসার মাধ্যমে (গ্রহণ করলে তা বৈধ)। (নিসাঃ ২৯)
প্রশ্নঃ এমন ব্যবসায়ীকে কি দোকান ভাড়া দেওয়া বৈধ, যে তাতে হারাম জিনিস বিক্রি করবে?
এমন লোককে কি গাড়ি ভাড়া দেওয়া বৈধ, যে গান-বাজনার অনুষ্ঠানে যাবে অথবা মাযার যাবে?
এমন লোককে কি বাড়ি ভাড়া দেওয়া বৈধ, যে তাতে ভিডিও হল করবে অথবা মদ তৈরির কারখানা করবে অথবা সেলুন খুলে দাড়ি চাঁছবে?
এমন লোককে কি বাড়ি ভাড়া দেওয়া বৈধ, যে তাতে সুদী ব্যাংক চালাবে? ঐ সকল ভাড়ার অর্থ কি হালাল?
উত্তর: কোন প্রকার অবৈধ কাজের জন্য নিজের গাড়ি-বাড়ি বা অন্য কিছু ভাড়া দেওয়া হারাম। যেহেতু মহান আল্লাহ বলেছেন, {وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْবিরِّ وَالتَّقْوَى وَلَا تَعَاوَنُواْ عَلَى الإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ} (২) سورة المائدة অর্থাৎ, সৎ কাজ ও আত্মসংযমে তোমরা পরস্পর সহযোগিতা কর এবং পাপ ও সীমালংঘনের কাজে একে অন্যের সাহায্য করো না। আর আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তিদানে অতি কঠোর। (মায়িদাহঃ ২) আর হারাম কাজে ভাড়া দিয়ে যে অর্থ আসে, তা হালাল নয়। যেহেতু মহানবী বলেছেন, إِنَّ اللَّهَ تَعَالَى إِذَا حَرَّمَ شَيئًا حَرَّمَ ثَمَنَه. অর্থাৎ, মহান আল্লাহ যখন কোন জিনিসকে হারাম করেন, তখন তার মূল্যকেও হারাম করেন। (আহমাদ, আবু দাউদ, দারাকুত্বনী, ত্বাবারানী, বাইহাক্বী প্রমুখ)
প্রশ্নঃ ফিল্মী ভিডিও-সিডির ব্যবসা করা বৈধ কি?
উত্তর: ইসলামে যা হারাম, তার ব্যবসা করাও হারাম। সুতরাং ফিল্ম অবৈধ হলে তার ভিডিও-সিডি বিক্রয় ক'রে অথবা ভাড়া দিয়ে অর্থ উপার্জন হালাল নয়। (ইবা)
প্রশ্নঃ এক ব্যক্তি গাড়ি কিনবে। সে এক গাড়ির ডিলারের কাছে গেল। কিন্তু তার কাছে সেই গাড়ি নেই, যা সে কিনবে। যোগাযোগের মাধ্যমে অন্য ডিলারের কাছ থেকে তাকে গাড়ি নিয়ে দিল নগদ ১ লক্ষ টাকা দামে। তারপর সে তার নিকট থেকে কিস্তী চুক্তিতে ১ লক্ষ ২০ হাজার টাকা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি নিল। কিস্তী দিয়ে অতিরিক্ত ঐ ২০ হাজার টাকা খাওয়া কি ঐ ডিলারের জন্য হালাল?
উত্তরঃ ঐ ২০ হাজার টাকা হালাল নয়। কারণ তা সুদ। যেহেতু তা ১ লক্ষ ধার দিয়ে ১ লক্ষ ২০ হাজার টাকা নেওয়ার মতোই। পক্ষান্তরে ঐ ডিলার যদি ঐ গাড়ি কিনে নিজের শো-রুমে রেখে ঐ ক্রেতাকে কিস্তীতে ঐ দামেই বিক্রি করত, তাহলে সুদ হতো না। (ইউ)
প্রশ্ন: সরকারী সুবিধা ভোগ করতে অফিসারদেরকে ঘুস দেওয়া বৈধ কি?
উত্তর: ঘুস দেওয়া-নেওয়া একটি সামাজিক ব্যাধি। এর অর্থ হালাল নয়। মহান আল্লাহ এ কাজে নিষেধ ক'রে বলেছেন, {وَلَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُم بَيْنَكُم بِالْبَاطِلِ وَتُدْلُواْ بِهَا إِلَى الْحُكَّامِ لِتَأْكُلُوا فَرِيقًا মِّنْ أَمْوَالِ النَّاسِ بِالإِثْمِ وَأَنتُمْ تَعْلَمُونَ} (১৮৮) سورة البقرة অর্থাৎ, তোমরা নিজেদের মধ্যে একে অন্যের ধন অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না এবং মানুষের ধন-সম্পদের কিয়দংশ জেনেশুনে অন্যায়ভাবে গ্রাস করার উদ্দেশ্যে বিচারকগণকে ঘুষ দিও না। (বাক্বারাহঃ ১৮৮) ঘুস দাতা যদি ঘুস দিতে বাধ্য না হয়, তাহলে সেও সমান পাপী। মাঝের যোগাযোগকারীও পাপী। মহান আল্লাহ বলেছেন, {وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَى وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ} (২) سورة المائدة অর্থাৎ, সৎ কাজ ও আত্মসংযমে তোমরা পরস্পর সহযোগিতা কর এবং পাপ ও সীমালংঘনের কাজে একে অন্যের সাহায্য করো না। আর আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তিদানে অতি কঠোর। (মায়িদাহঃ ২) ঘুসের নানা রকম অপকারিতা আছে। ('হারাম রুযী ও রোযগার' দ্রঃ)
প্রশ্নঃ নিজের হক ও সুবিধা আদায় করতে যদি ঘুস দিতে হয়, তাহলে কি ঘুসদাতারও পাপ হবে?
উত্তর: স্বেচ্ছায় কোন কাজে ঘুস দেওয়া হারাম। 'আল্লাহর রসূল ঘুসখোর, ঘুসদাতা (উভয়কেই) অভিশাপ করেছেন।' (আবু দাউদ ৩৫৮০, তিরমিযী ১৩৩৭, ইবনে মাজাহ ২৩১৩, ইবনে হিব্বান, হাকেম ৪/১০২-১০৩, সহী আবু দাউদ ৩০৫৫নং) অবশ্য নিজের অধিকার আদায় করতে গিয়ে যদি কেউ ঘুস দিতে বাধ্য হয়, তাহলে ঘুসদাতা পাপী হবে না, পাপী হবে ঘুসগ্রহীতা। পক্ষান্তরে যাতে তার অধিকার নেই, তা আদায় করার জন্য অথবা হককে বাতিল বা বাতিলকে হক করার জন্য ঘুস দেওয়া হারাম। (ইউ)
প্রশ্ন: ব্যাকিং-সোর্স প্রয়োগ করা কি ঘুসের মতো?
উত্তর: ব্যাকিং-সোর্স প্রয়োগ করার ফলে যদি অন্যের হক নষ্ট ক'রে নিজের জন্য আদায় করা হয়, যেমন কোন যোগ্যতর লোককে তার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়, তাহলে তা হারাম। কিন্তু যদি তাতে কারো হক নষ্ট না হয়, তাহলে তা বৈধ সুপারিশের পর্যায়ভুক্ত। (লাদা) আবু মুসা আশআরী বলেন, যখন নবী-এর নিকট কোন প্রয়োজন প্রার্থী আসত, তখন তিনি তাঁর সঙ্গীদের দিকে মুখ ফিরিয়ে বলতেন, "(এর জন্য) তোমরা সুপারিশ কর, তোমাদেরকে প্রতিদান দেওয়া হবে। আর আল্লাহ তাআলা তাঁর নবীর যবানে যা পছন্দ করেন, তা ফায়সালা ক'রে দেন।” (বুখারী ও মুসলিম)
প্রশ্ন: আমি উঁচু পোস্টে এক সরকারী চাকরি করি। তাতে মোটা টাকা বেতন পাই। কিন্তু কখনও কখনও উপহার-উপঢৌকন আসে। তা কি ঘুসের পর্যায়ভুক্ত?
উত্তর: কোনও প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীর কাছে যে উপঢৌকন আসে, তা ঐ প্রতিষ্ঠানের হবে। নিজে গ্রহণ করলে ঘুস খাওয়া হবে। আর তাতে খিয়ানতের আশঙ্কাও আছে। (ইবা) আবু হুমাইদ আব্দুর রহমান ইবনে সা'দ সায়েদী বলেন, নবী ﷺ আব্দ গোত্রের ইবনে লুবিয়্যাহ নামক এক ব্যক্তিকে যাকাত আদায় করার কাজে কর্মচারী নিয়োগ করলেন। সে ব্যক্তি (আদায়কৃত মালসহ) ফিরে এসে বলল, 'এটা আপনাদের (বায়তুল মালের), আর এটা আমাকে উপহার স্বরূপ দেওয়া হয়েছে।' এ কথা শুনে আল্লাহর রসূল মিম্বরে উঠে দন্ডায়মান হয়ে আল্লাহর প্রশংসা ও স্তুতি বর্ণনা ক'রে বললেন, "অতঃপর বলি যে, আল্লাহ আমাকে যে সকল কর্মের অধিকারী করেছেন, তার মধ্য হতে কোনও কর্মের তোমাদের কাউকে কর্মচারী নিয়োগ করলে সে ফিরে এসে বলে কি না, 'এটা আপনাদের, আর এটা উপহার স্বরূপ আমাকে দেওয়া হয়েছে!' যদি সে সত্যবাদী হয়, তবে তার বাপ-মায়ের ঘরে বসে থেকে দেখে না কেন, তাকে কোন উপহার দেওয়া হচ্ছে কি না? আল্লাহর কসম; তোমাদের মধ্যে যে কেউ কোন জিনিস অনধিকার গ্রহণ করবে, সে কিয়ামতের দিন তা নিজ ঘাড়ে বহন করা অবস্থায় আল্লাহ তাআলার সাথে সাক্ষাৎ করবে। অতএব আমি যেন অবশ্যই চিনতে না পারি যে, তোমাদের মধ্য হতে কেউ নিজ ঘাড়ে চিঁহি-রববিশিষ্ট উট, অথবা হাম্বা-রববিশিষ্ট গাই, অথবা মে-মে-রববিশিষ্ট ছাগল বহন করা অবস্থায় আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করেছ।” আবু হুমাইদ বলেন, অতঃপর নবী ﷺ তাঁর উভয় হাতকে উপর দিকে এতটা তুললেন যে, তাঁর উভয় বগলের শুভ্রতা দেখা গেল। অতঃপর তিনবার বললেন, "হে আল্লাহ! আমি কি পৌঁছে দিলাম?” (বুখারী-মুসলিম)
প্রশ্ন: আমি একজন টেকনিশিয়ান। ওয়ার্কশপে কাজ করি, বেতন নিই। কিন্তু অনেক কাজের জন্য অনেকের বাড়িতে যেতে হয়। আর তখন বাড়ি-ওয়ালা আমাকে ২০/৫০ টাকা অতিরিক্ত বখশিশ দেয়। সেটা কি আমার জন্য হালাল?
উত্তর: কাজের খাতিরে পাওয়া যে কোন টাকা মালিকের হক। কর্মচারীর বেতন ছাড়া অন্য কিছু নেওয়ার অধিকার নেই। অবশ্য মালিকের অনুমতি থাকলে আলাদা কথা। অনুমতি না থাকলে তা না নেওয়াই পরহেযগারির কাজ। কারণ, নবী ﷺ বলেছেন, "আল্লাহ আমাকে যে সকল কর্মের অধিকারী করেছেন, তার মধ্য হতে কোনও কর্মের তোমাদের কাউকে কর্মচারী নিয়োগ করলে সে ফিরে এসে বলে কি না, 'এটা আপনাদের, আর এটা উপহার স্বরূপ আমাকে দেওয়া হয়েছে!' যদি সে সত্যবাদী হয়, তবে তার বাপ-মায়ের ঘরে বসে থেকে দেখে না কেন, তাকে কোন উপহার দেওয়া হচ্ছে কি না?” (বুখারী-মুসলিম)
প্রশ্ন: ইসলামের দৃষ্টিতে ক্রেতা বা বিক্রেতা ভাঙ্গানো কী? 'আমার কাছে ওর থেকে ভাল জিনিস আছে, আমার কাছে নাও' অথবা 'আমি ওর চাইতে বেশি দাম দেব, আমাকে বিক্রি কর' বলে নিজের স্বার্থ রক্ষা করা বৈধ কি?
উত্তর: এমন কাজ বৈধ নয়। যেহেতু মহানবী ﷺ বলেছেন, “তোমাদের কেউ যেন অপরের ক্রয়-বিক্রয়ের উপর ক্রয়-বিক্রয় না করে এবং তার মুসলিম ভাইয়ের বিবাহ প্রস্তাবের উপর নিজের বিবাহ-প্রস্তাব না দেয়। কিন্তু যদি সে তাকে সম্মতি জানায় (তবে তা বৈধ)।” (বুখারী ও মুসলিম) তিনি আরো বলেছেন, "এক মু'মিন অপর মু'মিনের ভাই। কোন মু'মিনের জন্য এটা বৈধ নয় যে, সে তার ভাইয়ের ক্রয়-বিক্রয়ের উপর নিজের ক্রয়-বিক্রয়ের কথা বলবে। আর এটাও বৈধ নয় যে, সে ভাইয়ের বিবাহ-প্রস্তাবের উপর নিজের বিবাহ-প্রস্তাব দেবে; যতক্ষণ না সে বর্জন করে।” (মুসলিম)
প্রশ্নঃ বিড়ি-সিগারেট বাঁধার কাজ ক'রে অথবা তার ব্যবসা ক'রে অর্থ উপার্জন হালাল কি না?
উত্তর: বিড়ি-সিগারেট পান করা হারাম। আর যে জিনিস পানাহার করা হারাম, তার মূল্য, উপার্জন ও ভাড়া খাওয়াও হারাম। মহানবী ﷺ বলেছেন, إِنَّ اللَّهَ تَعَالَى إِذَا حَرَّمَ شَيْئًا حَرَّمَ ثَمَنَه. অর্থাৎ, মহান আল্লাহ যখন কোন জিনিসকে হারাম করেন, তখন তার মূল্যকেও হারাম করেন। (আহমাদ, আবু দাউদ, দারাকুত্বনী, ত্বাবারানী, বাইহাক্বী প্রমুখ)
প্রশ্ন: হাদীসে এসেছে, "যে ব্যক্তি কুরআন শিক্ষাদানের উপর একটি ধনুকও গ্রহণ করবে, আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন তার পরিবর্তে জাহান্নামের আগুনের ধনুক তার গলায় লটকাবেন।” (সহীহুল জামে' ৫৯৮২নং) তাহলে যারা টিউশনি ক'রে ছোট ছোট বাচ্চাদেরকে কুরআন শিখিয়ে বেতন নেয় অথবা মক্তব-মাদ্রাসায় কুরআন পড়িয়ে বেতন নেয়, তাদের অবস্থা কী হবে?
উত্তর: মহানবী ﷺ বলেছেন, "তোমরা কুরআন শিক্ষা কর এবং তার মাধ্যমে আল্লাহর নিকট বেহেস্ত প্রার্থনা কর তাদের পূর্বে, যারা কুরআন শিক্ষা ক'রে তার মাধ্যমে দুনিয়া যাচনা করবে। যেহেতু কুরআন তিন ব্যক্তি শিক্ষা করে; প্রথমতঃ সেই ব্যক্তি, যে তার দ্বারা বড়াই করবে। দ্বিতীয়তঃ সেই ব্যক্তি, যে তার দ্বারা উদরপূর্তি করবে এবং তৃতীয়তঃ সেই ব্যক্তি, যে কেবল আল্লাহর উদ্দেশ্যে তেলাঅত করবে।' (আবু উবাইদ, হাকেম, সিলসিলাহ সহীহাহ ২৫৮নং) তিনি বলেন, "তোমরা কুরআন পাঠ কর এবং তার নির্দেশ পালন কর, তার ব্যাপারে অবজ্ঞা প্রদর্শন ও অতিরঞ্জন করো না এবং তার মাধ্যমে উদরপূর্তি ও ধনবৃদ্ধি করো না।” (সহীহুল জামে' ১১৬৮নং) তিনি আরো বলেন, “যে ব্যক্তি আখেরাতের কর্ম দুনিয়া লাভের উদ্দেশ্যে করবে, তার জন্য আখেরাতের কোন ভাগ থাকবে না।” (আহমদ) তিনি আরো বলেন, "যে ব্যক্তি কোন এমন ইলম অন্বেষণ করে যার দ্বারা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশা করা হয়, যদি সে তা কেবলমাত্র পার্থিব সম্পদলাভের উদ্দেশ্যেই অন্বেষণ করে তবে সে কিয়ামতের দিন জান্নাতের সুগন্ধও পাবে না।” (আবু দাউদ, আহমদ, ইবনে মাজাহ, ইবনে হিব্বান) আসলেই দ্বীনের কোন কাজকেই দুনিয়ার স্বার্থে ব্যবহার করা বৈধ নয়। অর্থ, গদি, সম্মান, খ্যাতি ইত্যাদি লাভের জন্য দ্বীনকে ব্যবহার করা বৈধ নয়। তবে যে ব্যক্তি উদ্দেশ্য ঠিক রেখে বেতন গ্রহণ করবে, তার জন্য তা দূষণীয় হবে না। মূল উদ্দেশ্য আল্লাহর সন্তুষ্টি ও তাঁর দ্বীনের উপকার হতে হবে। হাদীসে এসেছে, আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) বলেন, নবী ﷺ-এর কিছু সাহাবা আরবের কোন এক বসতিতে এলেন। কিন্তু সেখানকার বাসিন্দারা তাঁদেরকে মেহমানরূপে বরণ করল না (এবং কোন খাদ্যও পেশ করল না)। অতঃপর তাঁরা সেখানে থাকা অবস্থায় তাদের সর্দারকে (বিছুতে) দংশন করল। তারা বলল, 'তোমাদের কাছে কি কোন ওষুধ অথবা ঝাড়ফুঁককারী (ওঝা) আছে?' তাঁরা বললেন, 'তোমরা আমাদেরকে মেহমানরূপে বরণ করলে না। সুতরাং আমরাও পারিশ্রমিক ছাড়া (ঝাড়ফুঁক) করব না।' ফলে তারা এক পাল ছাগল পারিশ্রমিক নির্ধারিত করল। একজন সাহাবী উম্মুল কুরআন (সূরা ফাতিহা) পড়তে লাগলেন এবং থুথু জমা ক'রে (দংশনের জায়গায়) দিতে লাগলেন। সর্দার সুস্থ হয়ে উঠল। তারা ছাগলের পাল হাজির করল। তাঁরা বললেন, 'আমরা নবী-কে জিজ্ঞাসা না ক'রে গ্রহণ করব না।' সুতরাং তাঁরা তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন। তিনি হেসে বললেন, "তোমাকে কিসে জানাল যে, ওটি ঝাড়ফুঁকের মন্ত্র?! ছাগলগুলি গ্রহণ কর এবং আমার জন্য একটি ভাগ রেখো।” (বুখারী ৫৭৩৬নং) এই বর্ণনায় আছে, নবী তাঁদেরকে বললেন, "তোমরা ঠিক করেছ।” (বুখারী ২২৭৬নং) এক বর্ণনায় আছে, "তোমরা যে সব জিনিসের উপর পারিশ্রমিক গ্রহণ কর, তার মধ্যে আল্লাহর কিতাব সবচেয়ে বেশি হকদার।” (বুখারী ৫৭৩৭নং) এ হাদীস থেকেও বুঝা যায় যে, কুরআন দিয়ে ঝাড়ফুঁক ক'রে পারিশ্রমিক নেওয়া হালাল। অনুরূপ তা শিক্ষা দিয়েও পারিশ্রমিক নেওয়া হালাল। (ইবা)
প্রশ্ন: চাকরিস্থলে অনেক সময় আমার এক সাথী আসতে পারে না। আমাকে অনুরোধ করলে আমি তার হয়ে হাজরি-খাতায় সই ক'রে দিই। এটা মানবিক খিদমত মানা যাবে, নাকি কোন প্রকার ধোঁকাবাজি ও খেয়ানত?
উত্তর: এটা মানবিক খিদমত নয়, এটা শয়তানী খিদমত। এই কাজে আপনার তিন প্রকার অন্যায় হয়। এক: মিথ্যা জালিয়াতি। দুইঃ কর্তৃপক্ষের খেয়ানত ও তার সাথে ধোঁকাবাজি। তিন: অপরকে বাতিল উপায়ে মাল ভক্ষণে সহযোগিতা করা। আর প্রত্যেকটির পাপই হল বিশাল। (ইউ)
প্রশ্নঃ নিজে থেকে যেচে অথবা দরখাস্ত লিখে দ্বীনী পদ প্রার্থনা করা বৈধ কি?
উত্তর: দ্বীনী পদসমূহ থেকে উপযুক্ত উলামাগণ দূরে সরতে চাইলে সে স্থলে জাহেলগণ বহাল হয়ে যাবে। আর তখন তারা নিজেরা ভ্রষ্ট হবে এবং অপরকেও ভ্রষ্ট করবে। সুতরাং নিজেকে সত্যই সে পদের যোগ্য অধিকারী মনে করলে নিজে থেকে সে পদ চেয়ে নেওয়া দূষণীয় নয়। যেমন ইউসুফ চেয়ে নিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, {اجْعَلْنِي عَلَى خَزَائِنِ الْأَرْضِ إِنِّي حَفِيظٌ عَلِيمٌ} (৫৫) سورة يوسف অর্থাৎ, সে বলল, 'আমাকে দেশের কোষাধ্যক্ষ নিযুক্ত করুন। নিশ্চয়ই আমি সুসংরক্ষণকারী, সুবিজ্ঞ।' (ইউসুফ: ৫৫) যখন তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে জানতে পেরেছিলেন যে, তাঁর তুলনায় সংকট মুহূর্তে কৃষি ও খাদ্য মন্ত্রণা বেশি ভাল অন্য কেউ চালাতে পারবে না। অনুরূপ যদি কোন যোগ্য আলেম নিজেকে কোন জামাআত বা জমঈয়তের যোগ্য আমীর মনে করেন, তাহলে তা চেয়ে নিতে দোষ নেই। তবে তা যেন কেবল দ্বীনী স্বার্থে লিল্লাহীভাবে হয়। তাতে উদ্দেশ্য যেন খ্যাতি বা অর্থলাভ না হয়। বিশেষ ক'রে তিনি যদি নিশ্চিত হন যে, এ পদে তিনি অধিষ্ঠিত না হলে অন্য কোন জাহেল তা দখল ক'রে মানুষকে ভ্রষ্ট ক'রে ছাড়বে। অনুরূপ উষমান বিন আবিল আস ইমামতি প্রার্থনা ক'রে বলেছিলেন, 'হে আল্লাহর রসূল! আমাকে আমার কওমের ইমাম বানিয়ে দিন।' মহানবী বললেন, "তুমি তাদের ইমাম। তুমি জামাআতের সবচেয়ে দুর্বল ব্যক্তির খেয়াল ক'রে নামায পড়াবে। আর এমন মুআযযিন রাখবে, যে আযানের জন্য পারিশ্রমিক নেয় না।” (আবু দাউদ ৫৩১, তিরমিযী ২০৯, নাসাঈ ২/২৩, ইবনে মাজাহ ৯৮৭নং, ত্বাবারানী, সহীহুল জামে' ৩৭৭৩নং) সুতরাং তিনি শরয়ী স্বার্থ রক্ষার উদ্দেশ্যে ইমামতি চেয়ে নিয়েছিলেন। কিন্তু যেখানে মানুষ দুর্বল, যেখানে উদ্দেশ্য থাকে দুনিয়া, যেখানে থাকে পার্থিব লোভ, সেখানে পদ চেয়ে নেওয়া বৈধ নয়। (ইবা) আবু যার বলেন, একদা আমি বললাম, 'হে আল্লাহ রসূল! আপনি আমাকে (কোন স্থানের সরকারী) কর্মচারী কেন নিযুক্ত করছেন না?' তিনি নিজ হাত আমার কাঁধের উপর মেরে বললেন, “হে আবু যার! তুমি দুর্বল এবং (এ পদ) আমানত। এটা কিয়ামতের দিন অপমান ও অনুতাপের কারণ হবে। কিন্তু যে ব্যক্তি তা হকের সাথে (যোগ্যতার ভিত্তিতে) গ্রহণ করল এবং নিজ দায়িত্ব (যথাযথভাবে) পালন করল (তার জন্য এ পদ লজ্জা ও অনুতাপের কারণ নয়)।” (মুসলিম) আল্লাহর রসূল বলেছেন, "তোমরা অতি সত্বর নেতৃত্বের লোভ করবে। (কিন্তু স্মরণ রাখো) এটি কিয়ামতের দিন অনুতাপের কারণ হবে।” (বুখারী) আবু মুসা আশআরী বলেন, আমি এবং আমার চাচাতো দু'ভাই নবী-এর নিকট গেলাম। সে দু'জনের মধ্যে একজন বলল, 'হে আল্লাহর রসূল! মহান আল্লাহ আপনাকে যে সব শাসন-ক্ষমতা দান করেছেন, তার মধ্যে কিছু (এলাকার) শাসনভার আমাকে প্রদান করুন।' দ্বিতীয়জনও একই কথা বলল। উত্তরে তিনি বললেন, "আল্লাহর কসম! যে সরকারী পদ চেয়ে নেয় অথবা তার প্রতি লোভ রাখে, তাকে অবশ্যই আমরা এ কাজ দিই না।” (বুখারী ও মুসলিম)
প্রশ্ন: পরীক্ষায় চিট ক'রে পাশ করা বৈধ কি?
উত্তর: ধোঁকা দেওয়া হারাম। পরীক্ষা দ্বীনী বিষয়ে হোক অথবা দুনিয়াবী বিষয়ে, সর্ববিষয়ের পরীক্ষায় ধোঁকা দেওয়া এবং চিট, চুরি বা টুকলি ক'রে লেখা হারাম। আল্লাহর রসূল বলেন, “যে ব্যক্তি আমাদেরকে ধোঁকা দেয়, সে ব্যক্তি আমাদের দলভুক্ত নয়। (ত্বাবারানীর কাবীর ও সাগীর, ইবনে হিব্বান ৫৫৩৩, সহীহুল জামে' ৬৪০৮ নং) এতে সব রকমের ধোঁকা শামিল।
প্রশ্নঃ আমার চাকরি করার যোগ্যতা আছে, কিন্তু সার্টিফিকেট নেই। নকল সার্টিফিকেট বানিয়ে চাকরি নিতে পারি কি?
উত্তর: নকল সার্টিফিকেট শো ক'রে চাকরি নেওয়া বৈধ নয়। কারণ তাতে রয়েছে মিথ্যা জালিয়াতি, ধোঁকাবাজি ও প্রতারণা। যার সবটাই হারাম। (ইবা) আল্লাহর রসূল বলেন, "যে ব্যক্তি আমাদেরকে ধোঁকা দেয়, সে ব্যক্তি আমাদের দলভুক্ত নয়। ধোঁকা ও চালবাজি জাহান্নামে যাবে।” (ত্বাবারানীর কাবীর ও সাগীর, ইবনে হিব্বান ৫৫৩৩, সহীহুল জামে' ৬৪০৮ নং)
প্রশ্নঃ একজনের তরফ থেকে চাকরির ইন্টারভিউ বা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা দিয়ে তাকে চাকরি পাইয়ে দেওয়া কি বৈধ?
উত্তর: এমন কাজ বৈধ নয়। কারণ তাতে রয়েছে ধোঁকাবাজি ও প্রতারণা। এর ফলে অযোগ্য লোককে চাকরির উপযুক্ত বানিয়ে দেওয়া হয়। যার পরিণাম নিশ্চয় শুভ নয়। (ইবা)
প্রশ্ন: আমি এক প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার বা সুপারভাইজার। আমার আন্ডারে অনেক লোক চাকরি করে। কিছু লোক ডিউটিতে ফাঁকি দেওয়ার জন্য মিথ্যা ওজর পেশ ক'রে ছুটি নেয়। তাদেরকে ছুটি দেওয়া কি আমার জন্য বৈধ?
উত্তর: আপনি একজন দায়িত্বশীল অফিসার। যখন আপনি জানবেন যে, বাস্তবেই তাদের ওজর মিথ্যা, তখন তাদেরকে ছুটি দেওয়া এবং প্রতিষ্ঠানের কাজের ক্ষতি করা আপনার জন্য বৈধ নয়। কারণ তা এক প্রকার খেয়ানত এবং খেয়ানতের সহযোগিতা। আর মহান আল্লাহ বলেছেন, {يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَخُونُواْ اللّهَ وَالرَّسُولَ وَتَخُونُواْ أَمَانَاتِكُمْ وَأَنتُمْ تَعْلَمُونَ } (২৭) অর্থাৎ, হে বিশ্বাসিগণ! জেনে-শুনে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের সাথে বিশ্বাস ভঙ্গ করো না এবং তোমাদের পরস্পরের আমানত (গচ্ছিত দ্রব্য) সম্পর্কেও নয়। (আনফালঃ ২৭) {إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَن تُؤدُّواْ الأَمَانَاتِ إِلَى أَهْلِهَا} (৫৮) سورة النساء অর্থাৎ, নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, আমানত তার মালিককে প্রত্যর্পণ করবে। (নিসাঃ ৫৮) আর আল্লাহর নবী "প্রতিটি মানুষই দায়িত্বশীল। সুতরাং প্রত্যেকেই অবশ্যই তার অধীনস্থদের দায়িত্বশীলতার বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। দেশের শাসক জনগণের দায়িত্বশীল। সে তার দায়িত্বশীলতার ব্যাপারে জবাবদিহী করবে। একজন পুরুষ তার পরিবারের দায়িত্বশীল। অতএব সে তার দায়িত্বশীলতার বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। স্ত্রী তার স্বামী ও সন্তানের দায়িত্বশীল। কাজেই সে তার দায়িত্বশীলতার বিষয়ে জিজ্ঞাসিতা হবে। তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল। অতএব প্রত্যেকেই নিজ নিজ অধীনস্থের দায়িত্বশীলতার ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবে।” (বুখারী ও মুসলিম)
প্রশ্ন: আমার অনেক রিক্সা আছে। এক একটি চালককে দিয়ে প্রত্যহ ১০০ টাকা আদায় করি। এতে শরয়ী কোন সমস্যা আছে কি?
উত্তর: এইভাবে টাকা ফিক্সড ক'রে নেওয়া বৈধ নয়। যেহেতু এতে চালকের ক্ষতি আছে। কোন কোনদিন তার ১০০ টাকা নাও হতে পারে। অথচ সে তা দিতে বাধ্য। অন্যদিন টাকা বেশি উপার্জন হলে তা মালিককে না দিলেও ক্ষতির সময় চালকই একা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই জন্য বৈধ উপায় হল পারসেন্টেজ চুক্তি করা। অর্থাৎ, সারা দিনে যে উপার্জন হবে, তার অর্ধেক বা এক তৃতীয়াংশ মালিকের, বাকী চালকের। তাতে চালক মিথ্যা বলে মেরে খেলে খেতে পারে। সে তার হিসাব দেবে। মালিক তো হারাম থেকে বেঁচে যাবে। (ইজি)
প্রশ্নঃ বহু মালিক আছে, যারা তাদের কর্মচারীদের (চাকর, ড্রাইভারদের) বেতন দিতে গয়ংগচ্ছ ও দেরি করে। এতে কি তারা গোনাহগার হবে না?
উত্তর: অবশ্যই তারা গোনাহগার ও যালেম। প্রথমতঃ সে মহানবী-এর আদেশের খেলাপ করে। তিনি বলেছেন, "মজুরকে তার ঘাম শুকাবার পূর্বে তোমরা তার মজুরী দিয়ে দাও।” (সহীহুল জামে' ১০৫৫নং) দ্বিতীয়তঃ সে সেই ব্যক্তির খাদ্য আটকে রাখে, যার খাবারের দায়িত্ব তার ঘাড়ে আছে এবং সেই বেতনে আরো অনেক মানুষের খোরপোশ আছে। আর আল্লাহর রসূল বলেছেন, "মানুষের পাপী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যার আহারের দায়িত্বশীল, তাকে তা (না দিয়ে) আটকে রাখে।” (মুসলিম ৯৯৬নং) তৃতীয়তঃ বেতন না পেয়ে মনের কষ্টে কর্মচারী বদ্দুআ করতে পারে। আর সে যদি অত্যাচারিত হয়, তাহলে সে বদ্দুআ সাথে সাথে মালিককে লাগে। আল্লাহর রসূল বলেন, “তিনটি দুআ এমন আছে, যার কবুল হওয়ার ব্যাপারে কোন প্রকার সন্দেহ নেই; অত্যাচারিতের দুআ, মুসাফির ব্যক্তির দুআ এবং ছেলের জন্য তার মা-বাপের দুআ বা বদ্দুআ।” (তিরমিযী ৩৪৪৮, ইবনে মাজাহ ৩৮৬২, সিলসিলাহ সহীহাহ ৫৯৬নং) তিনি মুআয-কে ইয়ামান প্রেরণকালে বলেছিলেন, "তুমি মযলুম (অত্যাচারিতের) (বদ) দুআ থেকে সাবধান থেকো। কারণ, অত্যাচারিতের দুআ ও আল্লাহর মাঝে কোন অন্তরাল থাকে না।” (অর্থাৎ, সত্বর কবুল হয়ে যায়।) (বুখারী ১৪৯৬, মুসলিম ১৯নং, আবু দাউদ, নাসাঈ, তিরমিযী) সুতরাং মালিকের উচিত, সে বিষয়ে বিশেষ সতর্কতা রাখা। সে যদি সরকারী চাকুরিজীবী হয়, তাহলে ভেবে দেখা উচিত, তার বেতন তিন-চার মাস আটকে রাখলে তার কী অবস্থা হবে? তেমনি তার কর্মচারীরও। (ইজি)
প্রশ্নঃ অমুসলিম মালিকের কাজ ক'রে উপার্জিত অর্থ হালাল কি?
উত্তর: কাজ যদি হালাল হয়, তাহলে তার বিনিময়ে পাওয়া অর্থও হালাল। মালিক অমুসলিম হলে কোন ক্ষতি হবে না।
প্রশ্ন: কাজের জন্য মুসলিম লেবার লাগানো উচিত, নাকি অমুসলিম? বিশেষ ক'রে অমুসলিম লেবার বেশি দক্ষ হলে কী করা যাবে?
উত্তর: মুসলিম লেবার লাগানোই উত্তম; যদিও দক্ষতায় তারা কম। যেহেতু মুসলিম বলে তাদের আমানতদারী ও ইখলাসের ফলে কাজে বর্কত হবে। আর মহান আল্লাহ বলেছেন, وَلَعَبْدٌ মُّؤْمِنٌ خَيْرٌ মِّن মُّشْرِكٍ وَلَوْ أَعْجَبَكُمْ} (২২১) سورة البقرة অর্থাৎ, অংশীবাদী পুরুষ তোমাদেরকে চমৎকৃত করলেও (ইসলাম ধর্মে) বিশ্বাসী ক্রীতদাস তার থেকেও উত্তম। (বাক্বারাহঃ ২২১) অবশ্য মুসলিমরাই যদি নামসর্বস্ব হয়, তাহলে সে কথা ভিন্ন। (ইজি)
প্রশ্নঃ শুনেছি, স্বামী নিজ স্ত্রীকে ছেড়ে ছয় মাসের বেশি বাইরে থাকলে স্ত্রী তালাক হয়ে যায়। তাহলে যারা স্ত্রী ছেড়ে দুই-তিন বছর ক'রে বিদেশে থাকছে, তাদের কী হবে?
উত্তর: উক্ত শোনা কথা ঠিক নয়। স্ত্রী রাজি থাকলে উপার্জনের উদ্দেশ্যে দুই-তিন বছর থাকা কোন দোষের নয়। যে এতদিন থাকে, সে তো বাধ্য হয়েই থাকে। বিশেষ কারণে দ্বিতীয় খলীফা উমার স্বামী-স্ত্রীর সাক্ষাতের জন্য ছয় মাস সময় বেঁধে দিয়েছিলেন। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, তার বেশি পৃথক থাকলে স্বামী-স্ত্রীর বন্ধন আপনা-আপনিই ছিন্ন হয়ে যাবে। (ইজি)
প্রশ্নঃ দোকানের মালিক দোকানে কারবেরে রেখে দোকান চালায়। তাকে বলা হয়েছে অমুক মাল এত টাকায় বিক্রি করবে। কিন্তু সে তার থেকে দশ-বিশ টাকা দাম বেশি বলে বেশি টাকাটা নিজের পকেটে রাখে। আর মালিকের বলা দাম মালিক পেয়ে যায়। কারবেরের ঐ টাকা হালাল কি?
উত্তর: বেতনভোগী কর্মচারী বা কারবেরের ঐ বেশি টাকা নেওয়ার অধিকার নেই। যেহেতু সে মাল তার নয়, তার মালিকের। তার ডিউটির জন্য সে বেতন পায়। সে আমানতদার প্রতিনিধি। বেশি লাভ হলে তার মালিকের হবে, তার নয়। অবশ্য যদি মালিকের সে ব্যাপারে অনুমতি থাকে, তাহলে সে কথা ভিন্ন। (ইজি)
প্রশ্ন: আমি এখনও উপার্জনশীল হয়ে উঠিনি। মা-সহ আমরা সবাই আব্বার কামাই-নির্ভর। কিন্তু আমরা জানি, আব্বার কামাই হালাল নয়। এখন আমরা কী করি?
উত্তর: প্রথমতঃ তোমাদের উচিত, আব্বাকে নসীহত করা এবং হারাম উপার্জন বর্জন করতে চাপ দেওয়া। তোমাদের কথা গ্রাহ্য না করলে এমন কাউকে লাগাও, যার কথা কাজে লাগবে। ততদিন পর্যন্ত তোমাদের প্রয়োজন অনুযায়ী ভরণ-পোষণ নিয়ে যাওয়ায় গোনাহ হবে না। তবে প্রয়োজনের অতিরিক্ত কিছু নেওয়া বৈধ হবে না। (ইউ)
প্রশ্ন: আমরা পাঁচজন চাকুরিজীবী প্রত্যেক মাসে বেতন থেকে পাঁচ হাজার টাকা জমা ক'রে পঁচিশ হাজার টাকা লটারির মাধ্যমে একজনকে দিই। পরের মাসেও একই নিয়মে ক'রে পরপর পাঁচ মাসে পালা ফিরে। এতে এক সাথে পঁচিশ হাজার টাকা কোন কাজে লাগানো সহজ হয়। এতে শরয়ী-বিধানে কোন সমস্যা আছে কি?
উত্তর: এতে শরয়ী-বিধানে কোন সমস্যা নেই। যেহেতু তাতে কম-বেশি কেউ পায় না। দেরিতে হলেও ভাগ সমান পায়। সুতরাং পারস্পরিক সহযোগিতাপূর্ণ এমন সমিতি করা বৈধ। (ইবা)
প্রশ্ন: আমরা তিনজন একই প্রতিষ্ঠানে একই চাকরি করি। প্রত্যহ যা কাজ থাকে, তা দু'জনের জন্যও কম। সে ক্ষেত্রে যদি আমাদের মধ্যে একজন ক'রে পালা বদলে অনুপস্থিত হয়, তাহলে তা বৈধ হবে কি?
উত্তর: কর্তৃপক্ষের বিনা অনুমতিতে নিজের ইচ্ছামতো অনুপস্থিত থাকা বৈধ নয়। কাজ না থাকলেও চাকুরিস্থলে উপস্থিত থাকা জরুরী। (ইউ)
প্রশ্ন: চাকুরির ডিউটিতে যে কাজ, তাতে হাতে অনেক সময় থাকে। সেই সময়ে অনেকে পেপার পড়ে, অনেকে নাটক-নোবেল। আমি কুরআন পড়ি। তাতে কি কোন ক্ষতি আছে?
উত্তর: ডিউটি পালন করা ওয়াজেব। আর কুরআন পড়া নফল ইবাদত। ওয়াজেব ছেড়ে নফল করা যুক্তিযুক্ত নয়। বরং বেতন-নেওয়া কাজের ক্ষতি ক'রে কুরআন পড়া হারাম। ডিউটির কোন ক্ষতি না হলে কুরআন বা অন্য কোন উপকারী বই-পত্র পড়ায় সমস্যা নেই। (ইউ)
প্রশ্ন: আমি এক হোটেলে চাকরি করি। সেখানে মদও দিতে হয়। এমন হোটেলে কাজ করা কি আমার জন্য বৈধ?
উত্তর: সে হোটেল ছেড়ে অন্য কাজ দেখে নেওয়া জরুরী। নচেৎ নিরুপায় হয়ে সেখানে চাকরি করতে হলে মদ পরিবেশনার কাজ করবেন না। অন্য কোন কাজ করুন, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার কাজ অথবা (হালাল) খাবার পাকাবার কাজ ইত্যাদি। (ইজি) নচেৎ মদ্য-পরিবেশকও অভিশপ্ত। আল্লাহর রসূল বলেন, “মদ পানকারীকে, মদ পরিবেশনকারীকে, তার ক্রেতা ও বিক্রেতাকে, তার প্রস্তুতকারককে, যার জন্য প্রস্তুত করা হয় তাকে, তার বাহককে ও যার জন্য বহন করা হয়, তাকে আল্লাহ অভিশাপ করেছেন।” (আবু দাউদ ৩৬৭৪, ইবনে মাজাহ ৩৩৮০নং)
প্রশ্ন: আমার এক ডাক্তার বন্ধু আছেন, তিনি হাসপাতালে চাকরি করেন। অনেক সময় প্রয়োজনীয় ওষুধ-পথ্য বিনামূল্যে আমাকে দিয়ে থাকেন। এক বন্ধু আছেন, তিনি মুদিখানায় বেতন নিয়ে চাকরি করেন। আমি সেখানে গেলে বিস্কুট ইত্যাদি খেতে দেন। কখনো কখনো বাড়িতেও দোকানের নানা জিনিস উপহার নিয়ে আসেন। মাল নিলে সস্তায় দেন। এক বন্ধু বাগানে চাকরি করেন। সেখানে গেলে বাগানের ফল খেতে দেন। কখনো কখনো বাড়িতেও পাঠিয়ে দেন। এক বন্ধু কসাইখানায় ডিউটি করেন। তিনিও মাঝে-মধ্যে গোশত উপহার দেন। এখন এই সব বন্ধুদের নিকট থেকে তাদের উপহার গ্রহণ করা কি বৈধ?
উত্তর: আপনি বেছে বেছে প্রয়োজনীয় বন্ধু যোগাড় করেছেন বেশ। সে যাই হোক, যদি আপনি মনে করেন, তাঁরা কর্তৃপক্ষের বিনা অনুমতিতে চুরি ক'রে দিচ্ছেন, তাহলে সে সব উপহার গ্রহণ করা হারাম। আর মালিকের মাল নিয়ে বন্ধুত্ব বহাল রাখা তাঁদের জন্য খেয়ানত। তাঁদের উচিত, মালিকের অনুমতি নিয়ে কোন জিনিস বাড়িতে নিয়ে যাওয়া অথবা বন্ধুকে দেওয়া। নচেৎ সকলের হারাম খাওয়া হবে।
প্রশ্ন: আমি বাসের কন্ডাক্টরের চাকরি করি। সেই বাসে বাড়ির কোন লোক বা বন্ধু চড়লে তাদের নিকট থেকে ভাড়া চাইতে লজ্জাবোধ করি। তারা ভাড়া দিতে চাইলেও সৌজন্যের খাতিরে না নিয়ে বিনা ভাড়াতে তাদের গন্তব্যস্থলে পৌঁছে দিই। এটা কি আমার মালিকের কাজে খেয়ানত গণ্য হবে?
উত্তর: অবশ্যই আপনার খেয়ানত হবে। তবে আপনি দু'টির একটি করতে পারেন। নিজের পকেট থেকে সেই ভাড়া দিয়ে পুজিয়ে দিতে পারেন অথবা বাস-মালিকের নিকট অনুমতি নিতে পারেন।
প্রশ্ন: আমি টেলিফোন সেন্ট্রালে কাজ করি। অনেক সময় আমার ব্যক্তিগত প্রয়োজনে সেই ফোন ব্যবহার করি। কখনো কখনো আত্মীয়-বন্ধুকে কল-ট্রান্সফার করি। কোম্পানী আদৌ টের পায় না। এটা কি খেয়ানত হবে?
উত্তর: কোম্পানীর অনুমতি না থাকলে অবশ্যই খেয়ানত হবে। (ইবা) প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে, আপনি যে অফিসেই চাকরি করুন, সেই অফিসের জিনিস ব্যবহারের আম অনুমতি মালিক বা ম্যানেজারের নিকট থেকে নিয়ে রাখুন। নচেৎ অফিসের কাগজ, কলম, ফোন, ফ্যাক্স, জেরক্স-মেশিন, নেট, কম্পিউটার, গাড়ি ইত্যাদি ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করা খেয়ানত হবে।
প্রশ্নঃ আমি গরীব মানুষ। নাপিতের কাজ ক'রে পেট চালাই। কিন্তু কেউ কেউ বলছে, 'দাড়ি চেঁছে পয়সা কামানো হালাল নয়।' এ কথা কি ঠিক?
উত্তর: জী হ্যাঁ, এ কথা ঠিক। কারণ, দাড়ি চাঁছা হারাম। আর তা চেঁছে দিয়ে নেওয়া পয়সাও হারাম। মহান আল্লাহ বলেছেন, وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْবিরِّ وَالتَّقْوَى وَلَا تَعَاوَنُواْ عَلَى الإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ} (২) سورة المائدة অর্থাৎ, সৎ কাজ ও আত্মসংযমে তোমরা পরস্পর সহযোগিতা কর এবং পাপ ও সীমালংঘনের কাজে একে অন্যের সাহায্য করো না। আর আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তিদানে অতি কঠোর। (মায়িদাহঃ ২)
প্রশ্ন: অসুস্থ হলে আমি অফিস থেকে দশ দিনের ছুটি নিয়েছিলাম। কিন্তু পাঁচ দিনের মাথায় আমার অসুখ সেরে যায়। বাকী ছুটি ভোগ করার অধিকার কি আমার ছিল?
উত্তর: আপনার উচিত ছিল, অসুখ সেরে যাওয়ার পর অফিসে হাজির হওয়া এবং ম্যানেজারের কাছে সে কথা জানানো। সে অনুমতি দিলে আপনি বাকী ছুটিটা ভোগ করতেন। না দিলে কাজে যোগ দিতেন। (ইউ)
প্রশ্ন: আমি এক কোম্পানীতে চাকরি করি। আমার ব্যক্তিগত কাজে এক জায়গায় গেলে সেখানে আমার গাড়ি এক্সিডেন্ট হয়। চিকিৎসা ও গাড়ির খরচ অনেক বেশি হবে বুঝে কোম্পানীর কাজে গিয়ে এক্সিডেন্ট হয়েছে বলে চালিয়ে দিই। কোম্পানী আমার সমস্ত খরচ বহন করে। কিন্তু বর্তমানে আমার বিবেক আমাকে কামড় দিচ্ছে। সে কাজ কি আমার ঠিক ছিল? এখন আমি কী করতে পারি?
উত্তর: যা করেছেন, তা প্রতারণা ও ধোঁকাবাজি। এখন আপনার উচিত, কোম্পানীকে আসল কথা খুলে বলা এবং যে অর্থ ব্যয় করেছে, তা আপনার বেতন থেকে কেটে নেওয়ার আর্জি পেশ করা। অতঃপর যদি কোম্পানী আপনাকে ক্ষমা ক'রে দেয়, তাহলে উত্তম। আর আপনি এই প্রতারণার জন্য আল্লাহর কাছে তওবা করুন। (ইউ)
প্রশ্নঃ ডিউটির ফিক্সড টাইম আট ঘন্টা। শুরুতে ১০/১৫ মিনিট দেরি ক'রে এলে এবং শেষে ১০/১৫ মিনিট আগে বেরিয়ে গেলে কোন ক্ষতি হবে কি?
উত্তর: এ ক্ষতির কথা ম্যানেজারের কাছে। সে চাইলে দেরিতে আসা ও আগে বেরিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিতে পারে। অনুমতি না দিলে ডিউটির বাঁধা সময় চুরি করা বৈধ নয়। (ইউ)
প্রশ্নঃ যে কর্মচারী কাজে ফাঁকি দেয়, ঠিকমতো ডিউটি পালন করে না, তার বেতন কি হালাল?
উত্তর: যে কর্মচারী কাজে ফাঁকি দেয়, ঠিকমতো ডিউটি পালন করে না, তার বেতন পুরো হালাল নয়। ফাঁকি অনুযায়ী হারামের পরিমাণ কম-বেশি হবে। (ইবা)
প্রশ্ন: আমি এক সরকারী প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার। আমার নেতৃত্বে বহু কর্মচারী কাজ করে। আমার ব্যক্তিগত প্রয়োজনে তাদের কাউকে কি কোন কাজে লাগাতে পারি?
উত্তর: ডিউটির সময়ে অবশ্যই না। ছুটির সময়ে নিজের পয়সা খরচ ক'রে কাজে লাগাতে পারেন। (সাফা)
প্রশ্নঃ ঘুস দিয়ে চাকরি নেওয়া বৈধ কি?
উত্তর: ঘুস দিয়ে চাকরি দেওয়া-নেওয়া বৈধ নয়। চাকরি দিতে হবে পরীক্ষা-বিবেচনার মাধ্যমে যোগ্যতম ব্যক্তিকে। যোগ্যতায় সমান হলে লটারির মাধ্যমে নিতে হবে। ঘুস খেয়ে কাউকে চাকরি দেওয়া বা নেওয়া এবং যোগ্য লোকের অধিকার নষ্ট করা বৈধ নয়। 'আল্লাহর রসূল ঘুসখোর, ঘুসদাতা (উভয়কেই) অভিশাপ করেছেন।' (আবু দাউদ ৩৫৮০, তিরমিযী ১৩৩৭, ইবনে মাজাহ ২৩১৩, ইবনে হিব্বান, হাকেম ৪/১০২-১০৩, সহীহ আবু দাউদ ৩০৫৫নং)
প্রশ্ন: “তুমি ও তোমার মাল তোমার পিতার জন্য”---এর মানে কি পিতা নিজ ইচ্ছামতো ছেলের মাল খরচ করতে পারে?
উত্তর: পিতা তার ছেলের মাল নিজের প্রয়োজনমতো খরচ করতে পারে, ইচ্ছামতো নয়। (বানী, সিসঃ ২৫৬৪নং)
📄 সৎকাজের আদেশ ও মন্দ কাজে বাধাদান
প্রশ্ন: হাদীসে এসেছে, "তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি কোন গর্হিত কাজ দেখবে, সে যেন তা নিজ হাত দ্বারা পরিবর্তন ক'রে দেয়। যদি (তাতে) ক্ষমতা না রাখে, তাহলে নিজ জিভ দ্বারা। যদি (তাতেও) সামর্থ্য না রাখে, তাহলে অন্তর দ্বারা।” কিন্তু মুসলিম অন্তর দ্বারা গর্হিত কাজ কীভাবে পরিবর্তন করবে?
উত্তর: অন্তর দ্বারা খারাপ কাজকে খারাপ জানবে এবং তার কাজীদের সাথে বসবে না। যেহেতু বিন আপত্তিতে তাদের সাথে বসা সেই অভিশপ্ত বানী ইস্রাঈলের মতো কাজ হবে, যাদের ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেছেন, لُلْعِنَ الَّذِينَ كَفَرُوا مِن بَنِي إِسْرَائيلَ عَلَى لِسَانِ دَاوُودَ وَعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ ذَلِكَ بِمَا عَصَوا وَكَانُوا يَعْتَدُونَ (৭৮) كَانُواْ لَا يَتَنَاهَوْنَ عَن مُّنكَرٍ فَعَلُوهُ لَبِئْسَ مَا كَانُوا يَفْعَلُونَ) (৭৯) المائدة অর্থাৎ, বনী ইস্রাঈলের মধ্যে যারা অবিশ্বাস করেছিল, তারা দাউদ ও মারয়্যাম-তনয় কর্তৃক অভিশপ্ত হয়েছিল। কেননা, তারা ছিল অবাধ্য ও সীমালংঘনকারী। তারা যেসব গর্হিত কাজ করত, তা থেকে তারা একে অন্যকে বারণ করত না। তারা যা করত, নিশ্চয় তা নিকৃষ্ট। (মায়িদাহঃ ৭৮-৭৯)
প্রশ্নঃ হাত দ্বারা মন্দকাজে বাধা বা তার পরিবর্তন কীভাবে হবে?
উত্তর: যার ক্ষমতা আছে, সে তার হাত বা ক্ষমতা দ্বারা মন্দকাজে বাধা দেবে। যেমন সরকার ও প্রশাসন এ কাজ করবে। জামাআতের আমীর এ কাজ পারবে। ছেলেমেয়েদের ক্ষেত্রে বাপ-মা এ কাজ পারবে। স্ত্রীর ক্ষেত্রে স্বামী এ কাজ পারবে। অবশ্য শর্ত হল, ক্ষমতা প্রয়োগ ক'রে নোংরা কাজ বন্ধ করতে গিয়ে তার থেকে বড় নোংরা বা খারাপ কাজ না হয়ে বসে। তাহলে সে ক্ষেত্রে ক্ষমতা প্রয়োগ করা বৈধ নয়। (ইবা)
প্রশ্ন: বহু মানুষ আছে, যারা চোখের সামনে খারাপ কাজ হতে দেখেও বাধা দেয় না। পরন্ত যারা সে কাজ করে, তাদের সাথে ভাল সম্পর্কও রাখে, ওঠা-বসা করে, সহাবস্থান করে। মন চটে যাওয়ার ভয়ে তাদের কাজে কোন প্রকার আপত্তি জানায় না। জানি না, তাদের মনে ঘৃণা আছে কি না। আর ঘৃণা থাকলেও কি কোন কাজে দেবে? এই শ্রেণীর লোকেদের ব্যাপারে শরয়ী বিধান কী?
উত্তর: এই শ্রেণীর লোকেরা আল্লাহ ও তাঁর রসূল-এর অবাধ্য। তাদের ঈমান সবচেয়ে দুর্বল। তাদের হৃদয়ে আছে বিপজ্জনক ব্যাধি। তারা বিলম্বে অথবা অবিলম্বে আল্লাহর শাস্তি বা আযাবের উপযুক্ত। মহান আল্লাহ বলেছেন, {وَقَدْ نَزَّلَ عَلَيْكُمْ فِي الْكِتَابِ أَنْ إِذَا سَمِعْتُمْ آيَاتِ اللَّهِ يُكْفَرُ بِهَا وَيُسْتَهْزَأُ بِهَا فَلَا تَقْعُدُوا مَعَهُمْ حَتَّى يَخوضُواْ فِي حَدِيثٍ غَيْرِهِ إِنَّكُمْ إِذًا মِّثْلُهُمْ إِنَّ اللَّهَ جَامِعُ الْمُنَافِقِينَ وَالْكَافِرِينَ فِي جَهَنَّمَ جَمِيعًا} (১৪০) সورة النساء অর্থাৎ, আর তিনি কিতাবে তোমাদের প্রতি অবতীর্ণ করেছেন যে, যখন তোমরা শুনবে আল্লাহর কোন আয়াতকে প্রত্যাখ্যান করা হচ্ছে এবং তা নিয়ে বিদ্রূপ করা হচ্ছে, তখন যে পর্যন্ত তারা অন্য প্রসঙ্গে আলোচনায় লিপ্ত না হয় তোমরা তাদের সাথে বসো না; নচেৎ তোমরাও তাদের মত হয়ে যাবে। নিশ্চয় আল্লাহ কপট ও অবিশ্বাসী সকলকেই জাহান্নামে একত্র করবেন। (নিসাঃ ১৪০) {وَإِذَا رَأَيْتَ الَّذِينَ يَخوضُونَ فِي آيَاتِنَا فَأَعْرِضْ عَنْهُمْ حَتَّى يَخوضُوا فِي حَدِيثٍ غَيْرِهِ وَإِمَّا يُنسِيَنَّكَ الشَّيْطَانُ فَلاَ تَقْعُدْ بَعْدَ الذِّكْرَى مَعَ الْقَوْمِ الظَّالِمِينَ} (৬৮) সورة الأنعাম অর্থাৎ, তুমি যখন দেখ, তারা আমার নিদর্শন সম্বন্ধে ব্যঙ্গ আলোচনায় মগ্ন হয়, তখন তুমি দূরে সরে পড়; যে পর্যন্ত না তারা অন্য প্রসঙ্গে আলোচনায় প্রবৃত্ত হয় এবং শয়তান যদি তোমাকে ভ্রমে ফেলে, তাহলে স্মরণ হওয়ার পরে তুমি অত্যাচারী সম্প্রদায়ের সাথে বসবে না। (আনআম: ৬৮) {لُعِنَ الَّذِينَ كَفَرُوا مِن بَنِي إِسْرَائيلَ عَلَى لِسَانِ دَاوُودَ وَعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ ذَلِكَ بِمَا عَصَوا وَكَانُوا يَعْتَدُونَ (৭৮) كَانُواْ لَا يَتَنَاهَوْنَ عَن مُّنكَرٍ فَعَلُوهُ لَبِئْسَ مَا كَانُوا يَفْعَلُونَ} (৭৯) المائدة অর্থাৎ, বনী ইস্রাঈলের মধ্যে যারা অবিশ্বাস করেছিল, তারা দাউদ ও মারয়্যাম-তনয় কর্তৃক অভিশপ্ত হয়েছিল। কেননা, তারা ছিল অবাধ্য ও সীমালংঘনকারী। তারা যেসব গর্হিত কাজ করত, তা থেকে তারা একে অন্যকে বারণ করত না। তারা যা করত, নিশ্চয় তা নিকৃষ্ট। (মায়িদাহঃ ৭৮-৭৯) আল্লাহর রসূল বলেন, "তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি কোন গর্হিত কাজ দেখবে, সে যেন তা নিজ হাত দ্বারা পরিবর্তন ক'রে দেয়। যদি (তাতে) ক্ষমতা না রাখে, তাহলে নিজ জিভ দ্বারা (উপদেশ দিয়ে পরিবর্তন করে)। যদি (তাতেও) সামর্থ্য না রাখে, তাহলে অন্তর দ্বারা (ঘৃণা করে)। আর এ হল সবচেয়ে দুর্বল ঈমান।” (মুসলিম) "আমার পূর্বে যে উম্মতের মাঝেই আল্লাহ নবী প্রেরণ করেছেন সেই নবীরই তাঁর উম্মতের মধ্য হতে খাস ভক্ত ও সহচর ছিল; যারা তাঁর তরীকার অনুগামী ও প্রত্যেক কর্মের অনুসারী ছিল। অতঃপর তাদের পর এমন অসৎ উত্তরসুরিদের আবির্ভাব হয়; যারা তা বলে যা নিজে করে না এবং তা করে যা করতে তারা আদিষ্ট নয়। সুতরাং যে ব্যক্তি তাদের বিরুদ্ধে নিজ হস্ত দ্বারা জিহাদ (সংগ্রাম) করে, সে মুমিন, যে ব্যক্তি তাদের বিরুদ্ধে নিজ জিহ্বা দ্বারা জিহাদ করে, সে মুমিন এবং যে ব্যক্তি তাদের বিরুদ্ধে নিজ হৃদয় দ্বারা সংগ্রাম করে (ঘৃণা করে), সে মুমিন। আর এর পশ্চাতে (অর্থাৎ ঘৃণা না করলে কারো হৃদয়ে) সরিষা দানা পরিমাণও ঈমান থাকতে পারে না।” (মুসলিম ৫০নং) "লোকেরা যখন কোন গর্হিত (শরীয়ত-পরিপন্থী) কাজ দেখেও তার পরিবর্তন সাধনে যত্নবান হয় না, তখন অনতিবিলম্বে আল্লাহ তাদের জন্য তাঁর কোন শাস্তিকে ব্যাপক ক'রে দেন।” (আহমাদ, আবু দাউদ ৪৩৩৮, তিরমিযী ৩০৫৭, ইবনে হিব্বান, সহীহ ইবনে মাজাহ ৩২৩৬নং)
প্রশ্নঃ রোযাদার ব্যক্তি ভুল ক'রে পানাহার করলে আল্লাহই তাকে খাওয়ান এবং তার রোযাও শুদ্ধ। কিন্তু যে ব্যক্তি তাকে পানাহার করতে দেখবে, সে কি তাকে রোযার কথা স্মরণ করিয়ে পানাহারে বাধা দেবে? নাকি আল্লাহ খাওয়াচ্ছেন বলে তাকে খাওয়ার সুযোগ দেবে?
উত্তর: যে ব্যক্তি রোযাদার ব্যক্তিকে পানাহার করতে দেখবে, তার জন্য ওয়াজেব তাকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া। যেহেতু সে ভুলে পানাহার করছে। আর রোযা অবস্থায় পানাহার হারাম। অনুরূপ রোযাদারের উচিত, স্মরণ হওয়া মাত্র সাথে সাথে মুখ থেকে খাবার ফেলে দেওয়া। (ইউ)
প্রশ্ন: বড়দেরকে গীবত ইত্যাদি আপত্তিকর কর্মে লিপ্ত দেখে বাধা দিলে তাঁরা রেগে ওঠেন। বিশেষ ক'রে পিতামাতা হলে তাঁদের রাগ কি আমার জন্য ক্ষতিকর হবে?
উত্তর: অবশ্যই না। তবে বড়দের সঙ্গে আদব বজায় রেখে হিকমতের সাথে অসৎকর্মে বাধা দিতে হবে। আর কেউ রাগলে তার রাগের উপর ধৈর্য ধারণ করতে হবে। লুক্বমান হাকীম তাঁর ছেলেকে বলেছিলেন, {يَا بُنَيَّ أَقِمِ الصَّلَاةَ وَأْمُرْ بِالْمَعْرُوفِ وَانْهَ عَنِ الْمُنكَرِ وَاصْبِرْ عَلَى مَا أَصَابَكَ إِنَّ ذَلِكَ مِنْ عَزْمِ الْأُمُورِ} (১৭) সورة لقمان অর্থাৎ, হে বৎস! যথারীতি নামায পড়, সৎকাজের নির্দেশ দাও, অসৎকাজে বাধা দান কর এবং আপদে-বিপদে ধৈর্য ধারণ কর। নিশ্চয়ই এটিই দৃঢ় সংকল্পের কাজ। (লুকুমানঃ ১৭)
প্রশ্নঃ আমি একজন ধার্মিক মহিলা। আমার বাড়ি বা প্রতিবেশীতে যে সকল আপত্তিকর কর্ম ঘটে, তাতে বাধা দিলে লোকে আমাকে নিয়ে ব্যঙ্গ করে। গান-বাজনা শুনতে, গীবত- চর্চা করতে নিষেধ করলে আমাকে অনেকে 'সেকেলে' মেয়ে বলে। এ ক্ষেত্রে আমার করণীয় কী?
উত্তর: আপনার জন্য ওয়াজেব এই যে, আপনি উত্তম কথা ও ভঙ্গিমার মাধ্যমে নম্রতা ও ভদ্রতার সাথে গোনাহর কাজে আপত্তি জানাবেন। পারলে দলীল উল্লেখ ক'রে উপদেশ দেবেন। তারা গ্রহণ করুক চাই না-ই করুক, আপনি তাদের গোনাহে শরীক হবেন না। তাদের গীবত ও গান-বাজনার মজলিসে বসবেন না। মহান আল্লাহ বলেছেন, {وَإِذَا رَأَيْتَ الَّذِينَ يَخوضُونَ فِي آيَاتِنَا فَأَعْرِضْ عَنْهُمْ حَتَّى يَخوضُوا فِي حَدِيثٍ غَيْرِهِ وَإِمَّا يُنسِيَنَّكَ الشَّيْطَانُ فَلاَ تَقْعُدْ بَعْدَ الذِّكْرَى مَعَ الْقَوْمِ الظَّالِمِينَ} (৬৮) সورة الأنعাম অর্থাৎ, তুমি যখন দেখ, তারা আমার নিদর্শন সম্বন্ধে ব্যঙ্গ আলোচনায় মগ্ন হয়, তখন তুমি দূরে সরে পড়; যে পর্যন্ত না তারা অন্য প্রসঙ্গে আলোচনায় প্রবৃত্ত হয় এবং শয়তান যদি তোমাকে ভ্রমে ফেলে, তাহলে স্মরণ হওয়ার পরে তুমি অত্যাচারী সম্প্রদায়ের সাথে বসবে না। (আনআম: ৬৮) যখন আপনি আপনার সাধ্যমতো পাপকাজে মুখ দ্বারা আপত্তি জানাবেন এবং তাদের ঐ কাজ থেকে দূরে থাকবেন, তখন আপনি ক্ষতির হাত থেকে বেঁচে যাবেন। আপনার দায়িত্ব পালন হয়ে যাবে। মহান আল্লাহ বলেন, {يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا عَلَيْكُمْ أَنفُسَكُمْ لَا يَضُرُّكُم مَّن ضَلَّ إِذَا اهْتَدَيْتُمْ إِلَى اللَّهِ مَرْجِعُكُمْ جَمِيعًا فَيُنَبِّئُكُم بِمَا كُنتُمْ تَعْمَلُونَ} (১০৫) সورة المائدة অর্থাৎ, হে বিশ্বাসিগণ! তোমাদের আত্মরক্ষা করাই কর্তব্য। তোমরা যদি সৎপথে পরিচালিত হও, তবে যে পথভ্রষ্ট হয়েছে, সে তোমাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না। আল্লাহরই দিকেই তোমাদের সকলের প্রত্যাবর্তন। অতঃপর তোমরা যা করতে, তিনি সে সম্বন্ধে তোমাদেরকে অবহিত করবেন। (মায়িদাহঃ ১০৫) আপনি হকপথে অবিচল থাকুন, আল্লাহর পথে মানুষকে আহবান করতে থাকুন, ইন শাআল্লাহ আপনার জন্য পথ সহজ হয়ে যাবে। ধৈর্যের সাথে সওয়াবের আশা রাখলে আপনি মহা কল্যাণের আশা করতে পারেন। যেহেতু শুভ পরিণাম মুত্তাক্বীনদের জন্য। মহান আল্লাহ বলেন, {فَاصْبِرْ إِنَّ الْعَاقِبَةَ لِلْمُتَّقِينَ} (৪৯) সورة هود অর্থাৎ, সুতরাং তুমি ধৈর্য ধারণ কর। নিশ্চয় শুভ পরিণাম সংযমশীলদের জন্যই। (হুদ : ৪৯) {وَالَّذِينَ جَاهَدُوا فِينَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا وَإِنَّ اللَّهَ لَمَعَ الْمُحْسِنِينَ} (৬৯) সورة العنكبوت অর্থাৎ, যারা আমার উদ্দেশ্যে সংগ্রাম করে, আমি অবশ্যই তাদেরকে আমার পথসমূহে পরিচালিত করব। আর আল্লাহ অবশ্যই সৎকর্মপরায়ণদের সঙ্গেই থাকেন। (আনকাবৃত: ৬৯)
প্রশ্নঃ আমি যে কাজ নিজে করতে পারি না, তা অপরকে করতে কি আদেশ করতে পারি? যে কাজ নিজে বর্জন করতে পারি না, তা অপরকে বর্জন করতে কি আদেশ করতে পারি?
উত্তর: মহান আল্লাহ বলেন, {أَتَأْمُرُونَ النَّاسَ بِالْبِرِّ وَتَنسَوْنَ أَنفُسَكُمْ وَأَنتُمْ تَتْلُونَ الْكِتَابَ أَفَلَا تَعْقِلُونَ} (৪৪) البقرة অর্থাৎ, কি আশ্চর্য! তোমরা নিজেদের বিস্মৃত হয়ে মানুষকে সৎকাজের নির্দেশ দাও, অথচ তোমরা কিতাব (গ্রন্থ) অধ্যয়ন কর, তবে কি তোমরা বুঝ না? (বাক্বারাহঃ ৪৪) রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, "কিয়ামতের দিন এক ব্যক্তিকে আনা হবে। অতঃপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। সেখানে তার নাড়িভুঁড়ি বের হয়ে যাবে এবং সে তার চারিপাশে এমনভাবে ঘুরতে থাকবে, যেমন গাধা তার চাকির চারিপাশে ঘুরতে থাকে। তখন জাহান্নামীরা তার কাছে একত্রিত হয়ে তাকে বলবে, 'ওহে অমুক! তোমার এ অবস্থা কেন? তুমি না (আমাদেরকে) সৎ কাজের আদেশ, আর অসৎ কাজে বাধাদান করতে?' সে বলবে, 'অবশ্যই। আমি (তোমাদেরকে) সৎকাজের আদেশ দিতাম; কিন্তু আমি তা নিজে করতাম না এবং অসৎ কাজে বাধা দান করতাম; অথচ আমি নিজেই তা করতাম!” (বুখারী ও মুসলিম) কিন্তু আপনি যদি কোন বাধার কারণে কোন ভাল কাজ করতে এবং খারাপ কাজ ছাড়তে না পারেন, তাহলে তার আদেশ করতে কোন দোষ নেই। আপনার উপর দু'টি কাজ ওয়াজেব। এক: মন্দ কাজ বর্জন করা। দুইঃ কাউকে মন্দ কাজ করতে দেখলে তাতে বাধা দেওয়া। এখন যদি প্রথম ওয়াজেবটি কোন বাধা থাকার কারণে পালন করতে না পারেন এবং দ্বিতীয় ওয়াজেবটি পালন করতে কোন বাধা না থাকে, তাহলে তা পালন করা জরুরী। জাহান্নামে নাড়িভুঁড়ি বের হওয়া এবং তার চারিপাশে ঘুরতে থাকার আযাব ঐ ব্যক্তির হবে, যার ভাল কাজ করতে ও খারাপ কাজ ছাড়তে কোন বাধা নেই। কেবল সে নিজের খেয়াল-খুশীর বশীভূত হয়ে নিজেকে ভুলে অপরকে আদেশ করে। কিন্তু এমনও হতে পারে যে, যে ব্যক্তি নিজে ভাল কাজ করে না এবং অপরকে তা করতে আদেশও দেয় না আর মন্দ কাজ বর্জন করে না এবং তা বর্জন করতেও অপরকে আদেশ দেয় না, তার আযাব হয়তো আরো কঠিন। (ইউ)
প্রশ্ন: "যে ব্যক্তি কোন গর্হিত কাজ দেখবে, সে যেন তা নিজ হাত দ্বারা পরিবর্তন ক'রে দেয়। যদি (তাতে) ক্ষমতা না রাখে, তাহলে নিজ জিভ দ্বারা। যদি (তাতেও) সামর্থ্য না রাখে, তাহলে অন্তর দ্বারা।” অন্তর দ্বারা আপত্তি ও পরিবর্তন কীভাবে সম্ভব?
উত্তর: সে ব্যক্তি অন্তর দ্বারা সেই কাজকে ঘৃণা করবে এবং সেই সাথে তার কাজীর সংস্রব বর্জন করবে। যেহেতু আপত্তি না জানিয়ে তার সাথে স্বাভাবিকভাবে ওঠা-বসা করা বানী ইস্রাঈলদের কর্মের শামিল হয়ে যাবে। যাদের ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেছেন, {لُعِنَ الَّذِينَ كَفَرُوا مِن بَنِي إِسْرَائيلَ عَلَى لِسَانِ دَاوُودَ وَعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ ذَلِكَ بِمَا عَصَوا وَكَانُوا يَعْتَدُونَ (৭৮) كَانُوا لَا يَتَنَاهَوْنَ عَن مُّنكَرٍ فَعَلُوهُ لَبِئْسَ مَا كَانُوا يَفْعَلُونَ} (৭৯) المائدة অর্থাৎ, বনী ইস্রাঈলের মধ্যে যারা অবিশ্বাস করেছিল, তারা দাউদ ও মারয়্যাম-তনয় কর্তৃক অভিশপ্ত হয়েছিল। কেননা, তারা ছিল অবাধ্য ও সীমালংঘনকারী। তারা যেসব গর্হিত কাজ করত, তা থেকে তারা একে অন্যকে বারণ করত না। তারা যা করত, নিশ্চয় তা নিকৃষ্ট। (মায়িদাহঃ ৭৮-৭৯, ইবা)
প্রশ্নঃ হাত দ্বারা আপত্তি করার অধিকার ও কর্তব্য কার আছে?
উত্তর: যার ক্ষমতা আছে তার। যেমন শাসনকর্তৃপক্ষ, বাড়ির মুরব্বী, স্বামী, বাপ প্রভৃতি। সুতরাং যার ক্ষমতা নেই অথবা ক্ষমতা আছে, কিন্তু তা প্রয়োগ করলে ফিতনা বা মারামারি হওয়ার আশঙ্কা আছে অথবা অপেক্ষাকৃত বড় নোংরা সংঘটিত হওয়ার ভয় আছে, তাহলে তা প্রয়োগ করা যাবে না। (ইবা)
প্রশ্ন: কোন আপত্তিকর কাজ যদি বিতর্কিত হয়, তাহলে সে ক্ষেত্রে আপত্তি কীভাবে সম্ভব?
উত্তর: যে কাজে বিতর্ক ও উলামাদের মতভেদ আছে, সে কাজে বাধা দেওয়া বা আপত্তি করার ক্ষেত্রে দেখতে হবে যে, তা ইজতিহাদী কি না? অর্থাৎ তাতে মতভেদ স্বাভাবিক কি না? উভয় পক্ষের দলীল সমপর্যায়ের কি না? তা হলে আপত্তি করা যাবে না। যেমন: যদি কেউ ডবল শব্দে ইকামত দেয়, রুকু থেকে দাঁড়িয়ে বুকে হাত না বাঁধে, সিজদায় হাঁটু আগে বাড়ায়, রুকু পেলে রাকআত গণ্য না করে, তাহলে তাতে আপত্তি করা ঠিক নয়। অবশ্য এই শ্রেণীর আপত্তির ক্ষেত্রে 'এটা করা উত্তম' বলা যায়। চাপ দেওয়া যায় না। পক্ষান্তরে যেখানে সহীহ ও স্পষ্ট দলীলের বিরোধিতা হয়, সেখানে আপত্তি করতে হলে দলীলের সাথে করা কর্তব্য। যেমন: ইমামের পশ্চাতে সূরা ফাতিহা না পড়া, সশব্দে 'আমীন' না বলা, রুকুর আগে-পরে রফয়ে য়্যাদাইন ত্যাগ করা ইত্যাদি। কিন্তু মতভেদ আকীদাগত বিষয়ে হলে আপত্তি জরুরী। যেহেতু তাতে বিদআতী ছাড়া আহলে সুন্নাহ ভিন্নমত পোষণ করে না। যেমন: মহান আল্লাহর আরশে থাকার কথা অস্বীকার করা, কুরআন আল্লাহর সৃষ্টি মনে করা, বান্দার কর্ম আল্লাহর সৃষ্টি নয় মনে করা, কাবীরা গোনাহ করলে মুসলিম কাফের হয়ে যায় ধারণা করা, রাজার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা ইত্যাদি বিষয়। (ইজি)