📘 দ্বীনি প্রশ্ন উত্তর 📄 সাজসজ্জা ও প্রসাধন

📄 সাজসজ্জা ও প্রসাধন


প্রশ্নঃ- বিনা অহংকারে পরিহিত বস্ত্র গাঁটের নিচে ঝুলানো হারাম কি না?
উত্তর:- পুরুষদের জন্য পরিহিত বস্ত্র পায়ের গাঁটের নিচে ঝুলান হারাম, তাতে অহংকারের উদ্দেশ্য হোক অথবা অহংকারের উদ্দেশ্য না হোক। তবে যদি তা অহংকার প্রকাশের উদ্দেশ্যে হয়, তাহলে তার শাস্তি অধিকতর কঠিন ও বড়। যেহেতু সহীহ মুসলিমের আবু যার কর্তৃক বর্ণিত হাদীসে নবী বলেন, "তিন ব্যক্তির সাথে কিয়ামতের দিন আল্লাহ কথা বলবেন না, তাদের প্রতি তাকাবেন না, তাদেরকে পবিত্র করবেন না এবং তাদের জন্য যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি হবে।” আবু যার বলেন, 'তারা কারা ? হে আল্লাহর রসূল! তারা ব্যর্থ ও ক্ষতিগ্রস্ত হোক।' তিনি বললেন, "গাঁটের নিচে যে কাপড় ঝুলায়, কিছু দান করে 'দিয়েছি' বলে অনুগ্রহ প্রকাশকারী এবং মিথ্যা কসম খেয়ে পণ্যদ্রব্য বিক্রেতা।” (মুসলিম ১০৬নং ও আসহাবুস সুনান)
এই হাদীসটি অনির্দিষ্ট। কিন্তু তা ইবনে উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুমার হাদীস দ্বারা নির্দিষ্ট, যাতে নবী বলেন, "যে ব্যক্তি অহংকারে তার কাপড় (মাটিতে) ছেঁচড়ায় তার দিকে আল্লাহ তাকিয়ে দেখবেন না।” (বুখারী ৫৭৮৪নং, মুসলিম ২০৮৫নং) সুতরাং আবু যারের হাদীসে অনির্দিষ্ট উক্তি ইবনে উমারের হাদীস দ্বারা নির্দিষ্ট হবে। যদি অহংকার সহ কাপড় লটকায়, তাহলে আল্লাহ তার প্রতি দেখবেন না, তাকে পবিত্র করবেন না এবং তার জন্য হবে কষ্টদায়ক আযাব। আর এই শাস্তি সেই শাস্তি অপেক্ষাও বৃহত্তর, যে শাস্তি নিরহংকারের সাথে গাঁটের নিচে লুঙ্গি নামিয়ে থাকে এমন ব্যক্তির হবে; যে ব্যক্তি প্রসঙ্গে নবী বলেন, গাঁটের নিচের লুঙ্গি জাহান্নামে।” (বুখারী ৫৭৮৭নং ও আহমদ ২/৪১০)
অতএব শাস্তি যখন পৃথক পৃথক হল, তখন অনির্দিষ্টকে নির্দিষ্টের উপর আরোপ করা অসঙ্গত হবে। কারণ অনির্দিষ্টকে নির্দিষ্টের উপর আরোপ করার নিয়মে শর্ত এই যে, উভয় দলীলের নির্দেশ অভিন্ন হবে। কিন্তু যদি নির্দেশ ভিন্ন হয়, তবে এককে অপরের সাথে নির্দিষ্ট করা যাবে না। এই জন্যই তায়াম্মুমের আয়াতকে যাতে আল্লাহ বলেন, “তা তোমাদের মুখে ও হাতে বুলাবে।” ওযুর আয়াত দ্বারা নির্দিষ্ট করি না, যাতে আল্লাহ বলেন, "তোমাদের মুখমন্ডল ও হাত কনুই পর্যন্ত ধৌত করবে।” (সূরা মায়েদাহ ৬ আয়াত) সুতরাং তায়াম্মুম (মাসাহ করা) হাতের কনুই পর্যন্ত হবে না। (যদিও ওযুতে হাতের কনুই পর্যন্ত ধুতে হয়।)
ইমাম মালেক প্রভৃতিগণ যা আবু সাঈদ খুদরী থেকে বর্ণনা করেছেন, তা এই কথার প্রতিই নির্দেশ করে। যাতে নবী বলেন, “মুমিনদের লুঙ্গি তার অর্ধ পদনালী (হাঁটু হতে গোড়ালি পর্যন্ত পায়ের অংশ বা ঠ্যাং) পর্যন্ত। আর গাঁটের নিচে যা হবে তা দোযখে হবে। আর যে ব্যক্তি অহংকারের সাথে তার পরিহিত লেবাস (লুঙ্গি, প্যান্ট, পায়জামা, ধুতি, কামীস ইত্যাদি) মাটির উপর ছেঁচড়ে নিয়ে বেড়ায় তার প্রতি আল্লাহ (তাকিয়েও) দেখবেন না।” অতএব নবী একই হাদীসে দু'টি উদাহরণ পেশ করেন এবং উভয়ের শাস্তি পৃথক হওয়ার কারণে উভয়ের নির্দেশের ভিন্নতাও বিবৃত করেন। সুতরাং উক্ত দুইজন কর্মে ভিন্ন, নির্দেশে ভিন্ন এবং শাস্তিতেও পৃথক। এই থেকে তাদের ভুল স্পষ্ট হয়, যারা তাঁর উক্তি (গাঁটের নিচে যা তা দোযখে) কে (যে ব্যক্তি অহংকারের সাথে তার কাপড় ছেঁচড়ে বেড়ায় তার প্রতি আল্লাহ তাকাবেন না) এই উক্তি দ্বারা নির্দিষ্ট করে।
আবার কতক মানুষ আছে যাদেরকে গাঁটের নিচে লুঙ্গি বা প্যান্ট ঝুলাতে নিষেধ করলে বলে, 'আমি অহংকারের উদ্দেশ্যে ঝুলাইনি তো।'
কিন্তু আমরা তাদেরকে বলি যে, গাঁটের নিচে কাপড় ঝুলানো দুই প্রকার; প্রথম প্রকার - যার শাস্তি, মানুষকে কেবল সেই স্থানে আযাব দেওয়া হবে, যে স্থানে সে (শরীয়তের) অন্যথাচরণ ও অবাধ্যতা করে এবং তা হচ্ছে গাঁটের নিচের অংশ, যার উপর নিরহংকারে কাপড় ঝুলায়। অতএব এ ব্যক্তিকে কেবল অবাধ্যতার অঙ্গে শাস্তি দেওয়া হবে। অর্থাৎ যাতে অবাধ্যতা বা অন্যথাচরণ করছে, কেবল তার বদলায় তাকে জাহান্নামে আযাব দেওয়া হবে, আর তা হচ্ছে যা গাঁটের নিচে নামে। কিন্তু এই অবাধ্যাচারীর এই শাস্তি হবে না যে, তার প্রতি আল্লাহ তাকাবেন না এবং তাকে পবিত্র করবেন না। (কারণ, তার অহংকার নেই।) আর দ্বিতীয় প্রকার শাস্তি; কিয়ামতের দিন আল্লাহ তার সাথে কথা বলবেন না, তার প্রতি তাকাবেন না, তাকে পবিত্র করবেন না এবং তার জন্য যন্ত্রনাদায়ক শাস্তি হবে। আর এটা তার জন্য হবে, যে তার পরিহিত বস্ত্রকে পায়ের গাঁটের নিচে অহংকারের সাথে মাটিতে ছেঁচড়ে নিয়ে বেড়ায়। এরূপই তাকে বলি। (ইউ)

প্রশ্নঃ মহিলার দেহ থেকে লোম তুলে ফেলা কি বৈধ?
উত্তর: মহিলার দেহে তিন প্রকার লোম আছে।
(ক) যা তুলে ফেলা ওয়াজেব। যেমন বগল ও গুপ্তাঙ্গের লোম।
(খ) যা তুলে ফেলা হারাম। যেমন ভ্রূর লোম।
(গ) যে লোম তোলার ব্যাপারে কোন আদেশ-নিষেধ নেই, তা তুলে ফেলা বৈধ। যেমন পিঠ বা পায়ের লোম। অনুরূপ চেহারায় পুরুষের মতো দাড়ি-গোঁফের অস্বাভাবিক লোম। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ কর্তৃক বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আল্লাহর অভিশাপ হোক সেই সব নারীদের উপর, যারা দেহাঙ্গে উলকি উৎকীর্ণ করে এবং যারা উৎকীর্ণ করায় এবং সে সব নারীদের উপর, যারা ভ্রূ চেঁছে সরু করে, যারা সৌন্দর্যের মানসে দাঁতের মাঝে ফাঁক সৃষ্টি করে, যারা আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে পরিবর্তন আনে।' জনৈক মহিলা এ ব্যাপারে তাঁর (ইবনে মাসউদের) প্রতিবাদ করলে তিনি বললেন, 'আমি কি তাকে অভিসম্পাত করব না, যাকে আল্লাহর রসূল অভিসম্পাত করেছেন এবং তা আল্লাহর কিতাবে আছে? আল্লাহ বলেছেন, "রসূল যে বিধান তোমাদেরকে দিয়েছেন তা গ্রহণ কর, আর যা থেকে নিষেধ করেছেন, তা থেকে বিরত থাক।” (সূরা হাশ্র ৭ আয়াত, বুখারী ও মুসলিম)

প্রশ্নঃ পুরুষদের জন্য সোনা ব্যবহার হারাম। কিন্তু শোনা যায়, চার আনা পরিমাণ নাকি জায়েয, যাতে বিপদে কাজে আসে।---এ কথা কি ঠিক?
উত্তর: পুরুষের জন্য সোনার চেন, ঘড়ি, আংটি, বোতাম, কলম ইত্যাদি ব্যবহার বৈধ নয়। যেহেতু মহানবী বলেন, "সোনা ও রেশম আমার উম্মতের মহিলাদের জন্য হালাল এবং পুরুষদের জন্য হারাম করা হয়েছে।” (তিরমিযী, নাসাঈ, মিশকাত ৪৩৪ ১নং) ইবনে আব্বাস হতে বর্ণিত, একদা আল্লাহর রসূল এক ব্যক্তির হাতে সোনার আংটি দেখলেন। তিনি তার হাত হতে তা খুলে ছুঁড়ে ফেলে দিলেন এবং বললেন, "তোমাদের কেউ কি ইচ্ছাকৃত দোযখের আঙ্গারকে হাতে নিয়ে ব্যবহার করে?” অতঃপর নবী চলে গেলে লোকটিকে বলা হল, 'তোমার আংটিটা কুড়িয়ে নিয়ে অন্য কাজে লাগাও। (অথবা তা বিক্রয় করে মূল্যটা কাজে লাগাও।)' কিন্তু লোকটি বলল, 'আল্লাহর কসম! আমি আর কক্ষনো তা গ্রহণ করব না, যা আল্লাহর রসূল ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছেন।” (মুসলিম ২০৯০নং)
প্রকাশ থাকে যে, ব্যতিক্রমভাবে পুরুষের জন্য সোনার নাক বাঁধার অনুমতি রয়েছে ইসলামে। সাহাবী আরফাজার নাক কাটা গেলে নবী তাঁকে সোনার নাক বানাতে আদেশ দিয়েছিলেন। (আহমদ ১৮৫২৭, আবু দাউদ ৪২৩২, তিরমিযী ১৭৭০, নাসাঈ ৫ ১৬ ১নং) প্রয়োজনে সোনার তার দিয়ে দাঁত বাঁধতে অথবা সোনার দাঁত বাঁধিয়ে ব্যবহার করাতেও অনুমতি আছে শরীয়তে। পক্ষান্তরে চার আনা সোনার আংটি ব্যবহারের বৈধতা শরীয়তে নেই। বিপদে প্রয়োজনে যে কোন স্বর্ণটুকরা হাতে না রেখে সাথেও তো রাখা যায়। প্রকাশ থাকে যে, সোনা দিয়ে পালিশ করা জিনিসেও যেহেতু সোনা থাকে, সেহেতু তা পুরুষের জন্য ব্যবহার বৈধ নয়। (ইজি)

প্রশ্নঃ পুরুষদের জন্য সোনা ছাড়া অন্য ধাতুর চেন পরা কি বৈধ?
উত্তর: যে অলংকার সাধারণতঃ মহিলাদের, তা পুরুষদের পরা বৈধ নয়। গলায় চেন, কানে দুল, হাতে বালা ইত্যাদি পুরুষরা পরতে পারে না। কারণ তাতে মহিলাদের সাদৃশ্য অবলম্বন হয়। যেমন মহিলারা পুরুষদের মতো প্যান্ট-শার্ট পরতে পারে না। কারণ তাতে পুরুষদের সাদৃশ্য অবলম্বন হয়। আল্লাহর রসূল নারীর বেশ ধারণকারী পুরুষদেরকে এবং পুরুষের বেশ ধারণকারী মহিলাদেরকে অভিশাপ করেছেন। অন্য বর্ণনায় আছে, 'আল্লাহর রসূল মহিলাদের সাদৃশ্য অবলম্বনকারী পুরুষদেরকে এবং পুরুষদের সাদৃশ্য অবলম্বনকারী মহিলাদেরকে অভিশাপ করেছেন।' (বুখারী) 'আল্লাহর রসূল সেই পুরুষকে অভিসম্পাত করেছেন, যে মহিলার পোশাক পরে এবং সেই মহিলাকে অভিসম্পাত করেছেন যে পুরুষের পোশাক পরিধান করে।' (আবু দাউদ)

প্রশ্ন: পাকা চুল-দাড়িতে কি কালো কলপ ব্যবহার করা বৈধ?
উত্তর: পাকা চুল-দাড়ি সাদা না রেখে রঙিয়ে রাখা তাকীদপ্রাপ্ত সুন্নত। তবে তাতে কালো কলপ ব্যবহার করা বৈধ নয়। জাবের বলেন, মক্কা বিজয়ের দিন আবু কুহাফাকে আনা হল। তখন তাঁর চুল-দাড়ি ছিল 'যাগামা' ফুলের মত সফেদ (সাদা)। নবী বললেন, "কোন রঙ দিয়ে এই সফেদিকে বদলে ফেল। আর কালো রঙ থেকে ওঁকে দূরে রাখ।” (মুসলিম, মিশকাত ৪৪২৪নং) আর সকলের উদ্দেশ্যে সাধারণ নির্দেশ দিয়ে আল্লাহর রসূল বলেন, “শেষ যামানায় এমন এক শ্রেণীর লোক হবে; যারা পায়রার ছাতির মত কালো কলপ ব্যবহার করবে, তারা জান্নাতের সুগন্ধও পাবে না।” (আবু দাউদ ৪২১২, নাসাঈ, সহীহুল জামে' ৮১৫৩নং)

প্রশ্নঃ মুসলিম মহিলার জন্য শাড়ি পরা কি বৈধ?
উত্তর: শাড়ি যদি সারা দেহকে ঢেকে নেয়, তাহলে বৈধ। বলা বাহুল্য, পেট-পিঠ বের ক'রে রেখে অথবা পাতলা শাড়ি পরা বৈধ নয়। অনুরূপ এমন লেবাসও বৈধ নয় যাতে নারী-দেহের কোনও সৌন্দর্য প্রকাশ পায়। যে নারীরা এমন শাড়ি বা লেবাস পরে, তারা সেই নারীদলের অন্তর্ভুক্ত, যাদের ব্যাপারে আল্লাহর রসূল বলেছেন, "দুই শ্রেণীর মানুষ জাহান্নামবাসী হবে, যাদেরকে এখনো আমি দেখিনি। তন্মধ্যে দ্বিতীয় শ্রেণী হল সেই মহিলাদল, যারা কাপড় পরা সত্ত্বেও যেন উলঙ্গ থাকবে, (যারা পাতলা অথবা খোলা লেবাস পরিধান করবে।) এরা (পর পুরুষকে নিজের প্রতি) আকৃষ্ট করবে এবং নিজেরাও (তার প্রতি) আকৃষ্ট হবে; তাদের মাথা হবে হিলে যাওয়া উটের কুঁজের মত। তারা জান্নাত প্রবেশ করবে না এবং তার সুগন্ধও পাবে না। অথচ তার সুগন্ধ এত-এত দূরবর্তী স্থান হতে পাওয়া যাবে।” (মুসলিম ২১২৮নং)

প্রশ্নঃ সৌন্দর্যের জন্য ভ্রূ চাঁছা কি বৈধ?
উত্তর: বৈধ নয়। কারণ 'আল্লাহর অভিশাপ হোক সেই সব নারীদের উপর, যারা দেহাঙ্গে উলকি উৎকীর্ণ করে এবং যারা উৎকীর্ণ করায় এবং সে সব নারীদের উপর, যারা ভ্রূ চেঁছে সরু করে, যারা সৌন্দর্যের মানসে দাঁতের মাঝে ফাঁক সৃষ্টি করে, যারা আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে পরিবর্তন আনে।' (বুখারী, মুসলিম)

প্রশ্নঃ হাতের নখ লম্বা করা কি হারাম?
উত্তর: হাতের নখ কেটে ফেলা প্রকৃতিগত সুন্নত। নবী বলেছেন, "প্রকৃতিগত আচরণ (নবীগণের তরীকা) পাঁচটি অথবা পাঁচটি কাজ প্রকৃতিগত আচরণ, (১) খাতনা (লিঙ্গত্বক ছেদন) করা। (২) লজ্জাস্থানের লোম কেটে পরিষ্কার করা। (৩) নখ কাটা। (৪) বগলের লোম ছিঁড়া। (৫) গোঁফ ছেঁটে ফেলা।” (বুখারী ও মুসলিম) আনাস বলেন, 'মোছ ছাঁটা, নখ কাটা, নাভির নিচের লোম চাঁছা এবং বোগলের লোম তুলে ফেলার ব্যাপারে আমাদেরকে সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে; যাতে আমরা সে সব চল্লিশ দিনের বেশী ছেড়ে না রাখি।' (মুসলিম ২৫৮নং) তাছাড়া তাতে রয়েছে জন্তু-জানোয়ার ও কিছু কাফের মহিলাদের অনুকরণ ও সাদৃশ্য অবলম্বন, যা মুসলিমের জন্য বৈধ নয়। (ইবা)

প্রশ্নঃ নখে নখ-পালিশ লাগানো কি বৈধ?
উত্তর: নখে নখ-পালিশ লাগানো বৈধ। তবে উযু-গোসলের আগে তা তুলে ফেলতে হবে। নচেৎ উযু-গোসল শুদ্ধ হবে না। অবশ্য যে রঙে পানি আটকায় না, সে (আলতা বা মেহেন্দি জাতীয়) রঙ ব্যবহার করা যায়। (ইবা)

প্রশ্ন: বিউটি-পার্লারে সুন্দরী সাজতে যাওয়া কি মুসলিম মহিলাদের জন্য বৈধ?
উত্তর: কয়েকটি কারণে বৈধ নয়:- (ক) অপ্রয়োজনে তাতে অর্থের অপচয় হয়। (খ) পুরুষ কর্মচারীর স্পর্শ নিতে হয়। (গ) অপরের সামনে লজ্জাস্থান খুলতে হয়। (ঘ) সৌন্দর্যে অনেক ক্ষেত্রে কাফের মহিলাদের সাদৃশ্য অবলম্বন হয়। (ঙ) অনেক সময় গুপ্ত ক্যামেরায় মহিলার নগ্ন ছবি ধরে রাখা ও নেটে প্রচার করা হয়।

প্রশ্ন: স্বামীর চোখে অধিক সুন্দরী সাজার জন্য কি মাথায় পরচুলা, নকল চুল বা টেসেল ব্যবহার করা যায়?
উত্তর: মহিলার সুকেশ সৌন্দর্যের অন্যতম। মাথায় আদৌ চুল না থাকলে ত্রুটি ঢাকার জন্য পরচুলা ব্যবহার করা যায়। কিন্তু অধিক চুল দেখাবার জন্য তা বৈধ নয়। যেহেতু 'যে অপরের মাথায় পরচুলা বেঁধে দেয় এবং যে নিজের মাথায় তা বাঁধে, এমন উভয় মহিলাকেই নবী অভিশাপ করেছেন।' (বুখারী ৫৯৪১, মুসলিম ২১২২, ইবনে মাজাহ ১৯৮৮নং)

প্রশ্নঃ সৌন্দর্যের জন্য প্লাস্টিক-সার্জারি বৈধ কি?
উত্তর: প্লাস্টিক-সার্জারি দুটি উদ্দেশ্যে করা হয়: আঙ্গিক ত্রুটি দূরীকরণের উদ্দেশ্যে অথবা অতিরিক্ত সৌন্দর্য আনয়নের উদ্দেশ্যে। প্রথম উদ্দেশ্যে বৈধ। যেমন বিকৃত ও কুশ্রী মুখমন্ডলে সৌন্দর্য আনয়নের উদ্দেশ্যে করা যায়। কিন্তু দ্বিতীয় উদ্দেশ্যে বৈধ নয়। কারণ তাতে আল্লাহর সৃষ্টিতে বিকৃতি সৃষ্টি করা হয়। যা শয়তানের প্ররোচনায় করা হয় (সূরা নিসা ১১৯ আয়াত) আর মহানবী (হাত বা চেহারায়) দেগে যারা নকশা ক'রে দেয় অথবা করায়, চেহারা থেকে যারা লোম তুলে ফেলে (ভ্রূ চাঁছে), সৌন্দর্য আনার জন্য যারা দাঁতের মাঝে ঘসে (ফাঁক ফাঁক করে) এবং আল্লাহর সৃষ্টি-প্রকৃতিতে পরিবর্তন ঘটায় (যাতে তাঁর অনুমতি নেই) এমন সকল মহিলাদেরকে আল্লাহর অভিশাপ দিয়েছেন। (বুখারী ৪৮৮-৬নং, মুসলিম ২১২৫নং, আসহাবে সুনান)

প্রশ্ন: বৈধ খেলাধূলার সময় শর্ট-প্যান্ট পরা বৈধ কি?
উত্তর: যে প্যান্টে জাং খোলা যায়, সে প্যান্ট পরাই বৈধ নয়। হাঁটু পর্যন্ত প্যান্ট পরে খেলাধূলা করা বা সাঁতার কাটা যায়। জাং-খোলা খেলোয়ারের খেলা দেখাও দর্শকদের জন্য বৈধ নয়। মহানবী বলেন, "তুমি তোমার উরু খুলে রেখো না এবং কোন জীবিত অথবা মৃতের উরুর দিকে তাকিয়ে দেখো না।” (আবু দাউদ, সহীহুল জামে' ৭৪৪০ নং) অন্যত্র বলেন, "তুমি তোমার জাং ঢেকে নাও। কারণ, জাং হল লজ্জাস্থান।” (আহমাদ, আবু দাউদ, তিরমিযী, হাকেম, ইবনে হিব্বান, সহীহুল জামে' ৭৯০৬ নং) পক্ষান্তরে কিশোরী ও যুবতীদের জন্য বৈধ নয় কোন পুরুষ (প্রশিক্ষক বা অন্য পুরুষের) সামনে অনুরূপ ব্যায়াম, শরীর-চর্চা বা খেলাধূলা করা অথবা সাঁতার কাটা, বৈধ নয় তা দর্শন করাও।

প্রশ্ন: বাড়িতে পাখি পোষা কি জায়েয?
উত্তর: সৌন্দর্য ও বিলাসিতার জন্য পিঞ্জারা বা ঘরের মধ্যে আবদ্ধ রেখে পাখি পোষা, হওয বা পাত্রের মধ্যে পানি রেখে মাছ পোষা বৈধ, যদি সঠিকভাবে খেতে-পান করতে দেওয়া হয় এবং কোন প্রকারে যুলুম না করা হয়। আল্লাহর রসূল বলেন, "একজন মহিলা একটি বিড়ালের কারণে জাহান্নামে গেছে; যাকে সে বেঁধে রেখে খেতে দেয়নি এবং ছেড়েও দেয়নি; যাতে সে নিজে স্থলচর কীটপতঙ্গ ধরে খেত।” (বুখারী ২৩৬৫, ৩৪৮২, মুসলিম ২২৪২নং) বুঝা গেল, যদি তাকে খেতে দিত, তাহলে জাহান্নামে যেত না। (ইবা)

প্রশ্নঃ চোখের ভিতরে কন্ট্যাক্ট-লেন্স ব্যবহার করা কি বৈধ?
উত্তর: প্রয়োজন হলে অবশ্যই বৈধ। তবে বিনা প্রয়োজনে কেবল চোখের সৌন্দর্য আনয়নের জন্য অর্থের অপচয় ঘটানো ঠিক নয়। বৈধ নয় অনুরূপ সৌন্দর্য নিয়ে কাউকে ধোঁকা দেওয়া। (ইফা)

প্রশ্ন: নক্সাদার বোরকা পরা কি বৈধ?
উত্তর: মহিলার লেবাসের সৌন্দর্য; দৃষ্টি-আকর্ষী রঙ, নক্সা, ফুল ইত্যাদি গোপন করার জন্যই বোরকা বা চাদর ব্যবহার করা হয়। কিন্তু সেই বোরকা বা চাদরই যদি জরিদার, এমব্রয়ডারি করা, ফুলছাপা ইত্যাদি হয়, তাহলে তো তার উপরে আরো একটা বোরকা পরা ওয়াজেব হয়ে যায়। সুতরাং চাদর বা বোরকা সাদা-সিধা হবে, যা সৌন্দর্য গোপন করবে এবং বিতরণ করবে না। যা দেখে পুরুষের মনে শ্রদ্ধা সৃষ্টি করবে এবং আকর্ষণ সৃষ্টি করবে না। (ইজি)

প্রশ্ন: চোখের পাতায় অতিরিক্ত লোম বা ল্যাশ লাগানো বৈধ কি?
উত্তর: বৈধ নয়। এটিও পরচুলা লাগানোর মতো জালিয়াতির পর্যায়ে পড়ে। আর এমন প্রসাধিকা মহিলা অভিশপ্তা। (ইজি)

প্রশ্ন: শিশু-কিশোরীকে বুক ওঠার আগে বগল কাটা ফ্রক পরানো কি বৈধ নয়?
উত্তর: মুসলিম মায়ের উচিত, শৈশব থেকেই মেয়েকে ইসলামী লেবাসে অভ্যস্ত ক'রে তোলা। কিশোরী মেয়ের প্রতি পাশবিক অত্যাচারের খবর প্রায় শোনা যায়। সুতরাং তার প্রতি অবহেলা প্রদর্শন করা আদৌ উচিত নয়। বলা বাহুল্য, শেলোয়ারের সাথে ফুল-হাতা কামিস বা ফ্রকই পরানো উচিত। সেই সাথে মাথায় ওড়না। যাতে শৈশব থেকেই তার মনে লজ্জাশীলতা, অপ্রগল্ভতা ও ধর্মভীরুতা স্থান ক'রে নিতে পারে।

প্রশ্ন: হাদীসে এসেছে, 'সাধাসিধা বা আড়ম্বরহীন হয়ে থাকা ঈমানের অন্তর্ভুক্ত।' তার মানে কি সৌন্দর্য অবলম্বন করা ঈমানের আলামত নয়?
উত্তর: উক্ত হাদীসের অর্থ হল, লেবাসে-পোশাকে মুসলিম অতিরঞ্জন, বাড়াবাড়ি, বিলাসিতা ও অপচয় করবে না। তার পোশাকে জাঁকজমক, ঠাটবাট ও আড়ম্বর থাকবে না। নচেৎ সৌন্দর্য অবলম্বন করা দোষের নয়। আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ হতে বর্ণিত, নবী বলেন, "যার হৃদয়ে অণু পরিমাণও অহংকার থাকবে সে জান্নাতে যাবে না।" এক ব্যক্তি বলল, 'লোকে তো পছন্দ করে যে, তার পোশাক ও জুতা সুন্দর হোক (তাহলে সে ব্যক্তির কী হবে?)' নবী বললেন, "অবশ্যই আল্লাহ সুন্দর এবং তিনি সৌন্দর্য পছন্দ করেন। (সুতরাং সুন্দর জামা-পোষাক পরায় অহংকার নেই।) অহংকার হল, হক (সত্য) প্রত্যাখ্যান করা এবং মানুষকে ঘৃণা করার নাম।” (মুসলিম ৯১নং, তিরমিযী, হাকেম ১/২৬) যেমন সাধাসিধা হয়ে থাকার মানে এও নয় যে, মুসলিম ন্যালাখ্যাপা হয়ে থাকবে, লেবাস পোশাক নোংরা হয়ে থাকবে এবং তার দেহ থেকে দুর্গন্ধ বের হবে। যেহেতু পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতাও ঈমানের অন্তর্ভুক্ত। (ইউ)

প্রশ্ন: হাদীসের নির্দেশমতে বগলের লোম ছিঁড়ে বা তুলে ফেলতে হয়। কিন্তু আমাকে তা কষ্টকর মনে হয়। সুতরাং তা যদি কেটে বা চেঁছে ফেলি অথবা কেমিক্যাল দিয়ে তুলে ফেলি, তাহলে কোন ক্ষতি আছে কি?
উত্তর: বগলের লোম ছিঁড়ে বা তুলে ফেলতে না পারলে তা ক্ষুর বা ব্লেড দিয়ে চেঁছে ফেলা অথবা কাঁচি দিয়ে কেটে ফেলা অথবা কেমিক্যাল দিয়ে তুলে ফেলায় কোন দোষ নেই। (ইজি)

প্রশ্ন: অনেক মহিলার ধারণা, লম্বা নখে সৌন্দর্য আছে। সুতরাং নখ লম্বা ছেড়ে রাখায় কোন দোষ আছে কি?
উত্তর: লম্বা নখে সৌন্দর্য নেই। অবশ্য বিকৃত পছন্দের অনেকের নিকট তা থাকতে পারে। কিন্তু শরীয়তে নখ লম্বা করায় অনুমতি নেই। বরং মানুষের প্রকৃতি তা লম্বা রাখার বিরোধী। তাই চল্লিশ দিনের মাথায় তা কেটে ফেলতেই হবে। মহানবী বলেছেন, "প্রকৃতিগত আচরণ পাঁচটি অথবা পাঁচটি কাজ প্রকৃতিগত আচরণ, (১) খাতনা (লিঙ্গত্বক ছেদন) করা। (২) লজ্জাস্থানের লোম কেটে পরিষ্কার করা। (৩) নখ কাটা। (৪) বগলের লোম ছিঁড়া। (৫) গোঁফ ছেঁটে ফেলা।” (বুখারী ও মুসলিম) আনাস বলেন, 'মোছ ছাঁটা, নখ কাটা, নাভির নিচের লোম চাঁছা এবং বোগলের লোম তুলে ফেলার ব্যাপারে আমাদেরকে সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে; যাতে আমরা সে সব চল্লিশ দিনের বেশী ছেড়ে না রাখি।' (মুসলিম ২৫৮নং)

প্রশ্নঃ শোনা যায়, 'মোছের পানি হারাম।'---এ কথা কি ঠিক?
উত্তর: যে পানিতে মোছ ডুবেছে, সে পানি প্রকৃতিগতভাবে ঘৃণ্য হতে পারে। তবে সে পানি পান করা হারাম, তা বলা যায় না। অবশ্য মোছ ছেঁটে ছোট করার নির্দেশ আছে শরীয়তে। আল্লাহর রসূল বলেছেন, "তোমরা দাড়ি বাড়াও, মোছ ছোট কর, পাকা চুলে (কালো ছাড়া অন্য) খেযাব লাগাও এবং ইয়াহুদ ও নাসারার সাদৃশ্য অবলম্বন করো না।” (আহমাদ, সহীহুল জামে' ১০৬৭নং) তিনি আরো বলেছেন, "যে ব্যক্তি তার মোছ ছাঁটে না, সে আমার দলভুক্ত নয়।” (তিরমিযী, ২৭৬২, সহীহুল জামে' ৬৫৩৩নং)

প্রশ্নঃ চুল-নখ ইত্যাদি কেটে ফেলার পর তা দাফন করা কি বিধেয়?
উত্তর: সাহাবী আব্দুল্লাহ বিন উমার কর্তৃক এরূপ আমল বর্ণিত আছে। অনেক ফুক্বাহাও তা মুস্তাহাব মনে করেন। (ইউ) আর এ কথা বিদিত যে, বহু যাদুকর তা দিয়ে যাদুও ক'রে থাকে। সুতরাং সতর্কতাই বাঞ্ছনীয়।

প্রশ্নঃ দাড়ি রাখা কি সুন্নত, নাকি ওয়াজেব?
উত্তর: দাড়ি রাখা সকল নবীর সুন্নত (তরীকা)। কিন্তু উম্মতের জন্য তা পালন করা ওয়াজেব। যেহেতু আল্লাহর রসূল বলেছেন, "তোমরা দাড়ি বাড়াও, মোছ ছোট কর, পাকা চুলে (কালো ছাড়া অন্য) খেযাব লাগাও এবং ইয়াহুদ ও নাসারার সাদৃশ্য অবলম্বন করো না।” (আহমাদ, সহীহুল জামে' ১০৬৭নং) তিনি আরো বলেছেন, "মোছ ছেঁটে ও দাড়ি রেখে অগ্নিপূজকদের বৈপরীত্য কর।" (মুসলিম ২৬০ নং)

প্রশ্ন: দাড়ি কি মোটেই ছাঁটা চলবে না? নাকি সৌন্দর্যের জন্য এক মুঠির বেশি দাড়ি ছেঁটে ফেলা যায়?
উত্তর: নবী-এর ব্যাপক নির্দেশ পালন করতে গিয়ে দাড়িকে নিজের অবস্থায় ছেড়ে দেওয়া ভাল। যেহেতু তিনি যে দাড়ি ছাঁটতেন, তার সহীহ দলীল নেই। তবে সাহাবীদের আমল থেকে বুঝা যায় যে, এক মুঠির অতিরিক্ত দাড়ি ছেঁটে ফেলা যায়।

📘 দ্বীনি প্রশ্ন উত্তর 📄 গান-বাজনা, খেলাধুলা

📄 গান-বাজনা, খেলাধুলা


প্রশ্ন: গান-বাজনা শোনা বৈধ কি? সেই সমস্ত টি, ভি-সিরিজ দেখা বৈধ কি? যাতে অর্ধনগ্না নারীদেহ প্রদর্শিত হয়?
উত্তর:- গান-বাজনা শোনা হারাম। আর তা হারাম হওয়ার ব্যাপারে লেশমাত্র সন্দেহ নেই। সলফে সালেহীন; সাহাবা ও তাবেঈন কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে যে, গান অন্তরে মুনাফিকী (কপটতা) উদ্গত করে। উপরন্ত গান শোনা -- অসার বাক্য শোনা এবং তার প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার পর্যায়ভুক্ত। আর আল্লাহ তাআলা বলেন, وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَشْتَرِي لَهْوَ الْحَدِيْثِ لِيُضِلَّ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ بِغَيْرِ عِلْمٍ وَيَتَّخِذَهَا هزُواً، أُولَئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ مُّهِينٌ অর্থাৎ, মানুষের মধ্যে কেউ কেউ এমনও রয়েছে যারা অজ্ঞতায় লোকদেরকে আল্লাহর পথ হতে বিচ্যুত করার জন্য অসার বাক্য বেছে নেয় এবং আল্লাহর প্রদর্শিত পথ নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করে। ওদেরই জন্য রয়েছে অবমাননাকর শাস্তি।” (সূরা লুকমান ৬ আয়াত) ইবনে মাসউদ উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, 'সেই আল্লাহর কসম যিনি ছাড়া কেউ সত্য উপাস্য নেই! নিশ্চয় তা (অসার বাক্য) হচ্ছে গান।' সাহাবাগণের ব্যাখ্যা (তফসীর) এক প্রকার দলীল। তফসীরের তৃতীয় পর্যায়ে এর মান রয়েছে। যেহেতু তফসীরের তিনটি পর্যায়; কুরআনের তফসীর কুরআন দ্বারা, কুরআনের তফসীর সুন্নাহ দ্বারা এবং কুরআনের তফসীর সাহাবাগণের উক্তি দ্বারা। এমনকি কিছু উলামার সিদ্ধান্ত এই যে, সাহাবীর তফসীর রসূল-এর তফসীরের পর্যায়ভুক্ত। কিন্তু শুদ্ধ অভিমত এই যে, তা রসূল-এর তফসীরের পর্যায়ভুক্ত নয়। অবশ্য তা বিভিন্ন উক্তিসমূহের মধ্যে সঠিকতার অধিকতর নিকটবর্তী।
পক্ষান্তরে গান-বাজনা শ্রবণ করার অর্থই হল, সেই কর্মে আপতিত হওয়া, যা থেকে নবী সাবধান করেছেন। তিনি বলেন, "নিশ্চয় আমার উম্মতের মধ্যে এমন কতক সম্প্রদায় হবে যারা ব্যভিচার, রেশম বস্ত্র, মদ্য এবং বাদ্য-যন্ত্রকে হালাল মনে করবে।” (বুখারী প্রভৃতি) অর্থাৎ, তারা নারী-পুরুষের অবৈধ যৌন-সম্পর্ক, মদপান এবং রেশমের কাপড় পরাকে হালাল ও বৈধ মনে করবে অথচ তারা পুরুষ, তাদের জন্য রেশম বস্ত্র পরিধান বৈধ নয়। অনুরূপ মিউজিক বা বাজনা শোনাকেও বৈধ ভাববে। আর বাদ্য-যন্ত্র, যার শব্দে মন উদাস হয়, এমন অসার যন্ত্রকে বলে। হাদীসটিকে ইমাম বুখারী আবু মালেক আল আশআরী অথবা আবু আমের আল আশআরী থেকে বর্ণনা করেছেন।
সুতরাং এই কথার উপর ভিত্তি ক'রে আমি আমার মুসলিম ভ্রাতৃবৃন্দের প্রতি গান-বাদ্য শ্রবণ করা থেকে সাবধান হওয়ার জন্য এই উপদেশবাণী প্রেরণ করছি। তারা যেন এমন আলেমদের কথায় ধোঁকা না খায়, যাঁরা বাদ্য-যন্ত্রকে বৈধ বলে মত প্রকাশ করেছেন। যেহেতু এর অবৈধতার সপক্ষে সমস্ত দলীল ব্যক্ত ও সুস্পষ্ট। আর টি,ভি-সিরিজ যাতে মহিলা প্রদর্শিত হয় তা দেখাও হারাম। যেহেতু তা ফিতনা (বিঘ্ন) এবং (অবৈধ) নারীর প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার দিকে ধাবিত করে। পরন্ত সমস্ত সিরিজের অধিকাংশই ক্ষতিকারক। যদিও তাতে পুরুষ নারীকে এবং নারী পুরুষকে দর্শন না করে। যেহেতু এ সবের পশ্চাতে সাধারণতঃ উদ্দেশ্য থাকে সমাজকে তার আচরণ ও চরিত্রে ক্ষতিগ্রস্ত করা। আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করি যে, তিনি যেন মুসলমানদেরকে এর অনিষ্ট থেকে বাঁচান। আর আল্লাহই অধিক জানেন। (ইউ)

প্রশ্ন: গজল গাওয়া ও শোনা কি বৈধ?
উত্তর: গজলও গানের মতোই। তা অসার ও অশ্লীল না হলে এবং শির্ক ও বিদআতমুক্ত থাকলে গাওয়া ও শোনা বৈধ। কিন্তু তাতে বাজনা বা মিউজিক থাকলে তা যতই ভাল ও তাওহীদমূলক হোক, গাওয়া ও শোনা বৈধ নয়।

প্রশ্নঃ বিয়ে ও ঈদের সময় 'দুফ' বাজিয়ে ছোট ছোট মেয়েরা বৈধ গীত গাইতে পারে। অন্য খুশীর উপলক্ষ্যেও কি অনুরূপ দুফ বাজিয়ে গীত গাওয়া যায়?
উত্তর: বিয়ে ও ঈদ ছাড়া অন্য কোন খুশীর উপলক্ষ্যে দুফ বাজানো বৈধ নয়। একদা কোন যুদ্ধ থেকে মহানবী বিজয়ী হয়ে ফিরে এলে একটি কৃষ্ণকায় দাসী এসে বলল, '(হে আল্লাহর রসূল!) আমি নযর মেনেছিলাম যে, আপনি ভালভাবে ফিরে এলে আমি আপনার কাছে দুফ বাজাব।' নবী বললেন, "তুমি যদি নযর মেনে থাকো, তাহলে তা পূরা কর। আর না মেনে থাকলে তা করো না।” সুতরাং দাসীটি দুফ বাজাতে লাগল। ইতিমধ্যে আবু বাক্স প্রবেশ করলেন। তখনও সে বাজাতে থাকল। অন্য কেউ এসে উপস্থিত হলেও সে বাজাতে থাকল। অবশেষে উমার প্রবেশ করলে দুফটাকে সে নিজ পিছনে লুকিয়ে কাপড়ে মুখও লুকাতে লাগল। তা দেখে আল্লাহর রসূল উমারের উদ্দেশ্যে বললেন, "শয়তানও তোমাকে ভয় পায় হে উমার!” (আহমাদ, তিরমিযী, সিঃ সহীহাহ ১৬০৯নং) উক্ত হাদীস থেকেও বুঝা যায় যে, বিয়ে ও ঈদ ছাড়া অন্য উপলক্ষ্যে দুফ বাজানো বৈধ নয়। অবশ্য নযর পালন করা ও সে ব্যাপারে নবী-এর অনুমতি দেওয়া এ কথার দলীল যে, এ কেবল তাঁর ফিরে আসার জন্য নির্দিষ্ট। যেহেতু তাঁর নিরাপদে ফিরে আসার বিষয়টা ঈদ ও বিয়ের চাইতেও বেশি খুশীর বিষয়। (বানী)

প্রশ্নঃ বাজনা হারাম। কিন্তু হারিয়ে যাওয়ার ভয়ে গরু-ছাগলের গলায় ঘন্টা বাঁধা বৈধ কি?
উত্তর: রাসূলুল্লাহ বলেছেন, "সেই কাফেলার সঙ্গে (রহমতের) ফিরিস্তা থাকেন না, যাতে কুকুর কিংবা ঘুঙুর থাকে।” (মুসলিম) তিনি আরো বলেছেন, “ঘন্টা বা ঘুঙুর শয়তানের বাঁশি।” (বুখারী ও মুসলিম) সুতরাং অপ্রয়োজনে তা ব্যবহার করা বৈধ নয়। তবে প্রয়োজনে হারিয়ে যাওয়ার ভয়ে পশুর গলায়, টেলিফোন বা মোবাইলের রিং-টনে, এলার্ম ঘড়িতে, বাড়ির কলিং-বেল ইত্যাদিতে ব্যবহার করা দূষণীয় নয়। (ইজি) প্রকাশ থাকে যে, এ সব ক্ষেত্রে মিউজিক জাতীয় কিছু ব্যবহার করা বৈধ নয়। বৈধ হল সাধারণ রিং।

প্রশ্ন:- তাস ও দাবা খেলা বৈধ কি?
উত্তর:- উলামাগণ স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন যে, উভয় প্রকার খেলাই হারাম। আল্লাহ তাঁদের প্রতি করুণা করুন। যেমন আমাদের শায়খ ও ওস্তাদগণও তা উল্লেখ করেছেন। এই সিদ্ধান্তের কারণ এই যে, উভয় খেলাতে মানুষের মধ্যে বহু ঔদাস্য এবং আল্লাহ সুবহানাহু তাআলার যিক্র ও স্মরণে বাধা সৃষ্টি হয়। আবার কখনো কখনো উভয় খেলাই খেলোয়াড়দের মধ্যে শত্রুতা ও দ্বেষের কারণ হয়। পরন্ত অনেক ক্ষেত্রে ঐ সব খেলাতে অর্থের বাজিও রাখা হয়। আর এ কথা বিদিত যে, প্রতিযোগীদের মধ্যে প্রতিযোগিতার উপর কোন পণ বা বাজি রাখা বৈধ নয়। তবে যে প্রতিযোগিতায় বাজি রাখায় শরীয়ত অনুমতি দিয়েছে তাতে রাখা চলে এবং তা মাত্র তিনটি প্রতিযোগিতা; তীর, উট ও ঘোড়া প্রতিযোগিতা। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি তাস ও দাবা খেলার খেলোয়াড়দের অবস্থা চিন্তা করে, সে বুঝতে পারে যে, তারা তাতে কত বেশী সময় নষ্ট করে; যার সমস্তই আল্লাহর আনুগত্যের বাইরে এবং তাদের নিজস্ব কোন পার্থিব উপকার লাভ ছাড়াই তা অতিবাহিত ক'রে ফেলে। আবার কিছু লোক বলে থাকে যে, তাস ও দাবা খেলায় নাকি ব্রেন খুলে এবং বুদ্ধি বাড়ে। কিন্তু বাস্তব তাদের দাবীর বাইরে। বরং ঐ সব খেলা ব্রেনকে ভোঁতা করে এবং এই প্রকার বুদ্ধিতেই ব্রেনকে সীমাবদ্ধ ক'রে রাখে। সুতরাং যদি কেউ তার চিন্তাশক্তিকে উক্ত পদ্ধতি ছাড়া অন্যভাবে (ভিন্ন বিষয়ে) ব্যবহার করে, তবে সে কিছু ফল লাভ করতে সক্ষম হয় না। অতএব এই কথার উপর ভিত্তি ক'রে বলা যায় যে, যে খেলা ব্রেনকে ভোঁতা করে এবং তাকে এই প্রকার বুদ্ধিতেই সীমিত করে রাখে সেই খেলা থেকে জ্ঞানী মানুষকে দূরে থাকা আবশ্যক। (ইউ)

প্রশ্ন:- কিছু লোক তর্কের উপর বাজি রাখে এবং তা বৈধ মনে ক'রে থাকে; কিন্তু আসলে তা বৈধ কি?
উত্তর:- তর্কের উপর পণ রাখা বহু লোকের নিকট বিদিত। তা এই রূপে হয় যে, দুই ব্যক্তি কোন বিষয়ে মতভেদ ক'রে তর্কের সাথে বলে, 'আমি যা বলছি তা যদি সত্য বা সঠিক হয়, তাহলে তোমাকে এই এই লাগবে।' এবং যা লাগবে তার নাম নেয়। (অর্থাৎ এত মিষ্টি খাওয়াতে হবে বা এত পয়সা দিতে হবে ইত্যাদি বলে)। 'আর তুমি যা বলছ তা যদি সত্য বা সঠিক হয়, তাহলে আমি এই এই দেব।' এবং যা দেবে তার নাম নেয়। এরূপ বাজি রাখা হারাম। কারণ এ কাজ জুয়ার পর্যায়ভুক্ত, যাকে আল্লাহ তাআলা মদের পাশাপাশি উল্লেখ ক'রে বলেছেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوْا إِنَّ الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالأَنْصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِّنْ عَمَلٍ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُوْনَ، إِنَّ مَا يُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَنْ يُوْقِعَ بَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةَ وَالْبَغْضَاءَ فِي الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ وَيَصُدَّكُمْ عَنْ ذِكْرِ اللَّهِ وَعَنِ الصَّلَاةِ فَهَلْ أَنْتُمْ مُنْتَهُونَ
অর্থাৎ, হে ঈমানদারগণ! মদ, জুয়া, মূর্তিপূজার বেদী ও ভাগ্য-নির্ণায়ক শর ঘৃণ্য বস্তু, শয়তানের কাজ। সুতরাং তোমরা তা বর্জন কর। এতে তোমরা সফলকাম হতে পারবে। শয়তান তো মদ ও জুয়া দ্বারা তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ ঘটাতে চায় এবং তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণে ও নামাযে বাধা দিতে চায়। অতএব তোমরা কি নিবৃত্ত হবে?” (সূরা মাইদাহ ৯০-৯১ আয়াত)
এই ভিত্তিতে উক্ত প্রকার জুয়াবাজি অবৈধ। কিছু লোকের তাকে 'বৈধ' বলা তার নিকৃষ্টতাকে অধিক বৃদ্ধি করে। যেহেতু সে অন্যায়কে ন্যায় সাব্যস্ত করে এবং তার আসল নাম বর্জন ক'রে ভিন্ন নামকরণ করে। আর তার উপর বৈধতার রঙ চড়িয়ে দেয়, ফলে সে যা দাবী করে, তাতে মিথ্যুক প্রমাণিত হয় এবং যা ব্যক্ত করে, তাতে সে প্রতারক প্রতীয়মান হয়। (ইউ)

📘 দ্বীনি প্রশ্ন উত্তর 📄 ছবি-মূর্তি

📄 ছবি-মূর্তি


প্রশ্নঃ কোন প্রাণীর ছবি বা মূর্তি কেবল সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য ঘরে স্থাপন করা বৈধ কি?
উত্তর: ছবি ও মূর্তিতে যেহেতু পৌত্তলিকতা আছে, সেহেতু তা ঘরে বা রাস্তার মোড়ে স্থাপন করা বৈধ নয়। মূর্তি থেকেই পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম মূর্তিপূজা শুরু হয়েছে নূহ (আ.)-এর যুগে। তাই ইসলাম মূর্তি ও মূর্তিপূজার ঘোর বিরোধী। সে জন্যই শরীয়তের নির্দেশ হল, 'কোন (বিচরণশীল প্রাণীর) ছবি বা মূর্তি দেখলেই তা নিশ্চিহ্ন ক'রে দেবে এবং কোন উঁচু কবর দেখলে তা সমান ক'রে দেবে।' (মুসলিম ৯৬৯নং) রাসূলুল্লাহ বলেছেন, "কিয়ামতের দিনে ছবি বা মূর্তি নির্মাতাদের সর্বাধিক কঠিন শাস্তি হবে।” (বুখারী ৫৯৫০, মুসলিম ২১০৯নং) "সে ঘরে (রহমতের) ফিরিস্তা প্রবেশ করেন না, যে ঘরে কুকুর থাকে এবং সে ঘরেও নয়, যে ঘরে ছবি বা মূর্তি থাকে।” (বুখারী ও মুসলিম)

প্রশ্নঃ যে লেবাসে কোন প্রাণীর ছবি থাকে, সে লেবাস পরা বৈধ কি?
উত্তর: যে লেবাসে কোন (বিচরণশীল) প্রাণীর ছবি থাকে, সে লেবাস পরা মুসলিমের জন্য বৈধ নয়। কারণ ছবি ও মূর্তি ইসলামের চরম পরিপন্থী। (ইউ)

প্রশ্ন: ফটোগ্রাফের বা ক্যামেরার ছবিও কি হারাম?
উত্তর: অনেকে বলেছেন, 'ক্যামেরার ছবি নিষেধের পর্যায়ভুক্ত নয়।' কিন্তু নিষেধের কারণ বিশ্লেষণ করলে তা অবৈধই মনে হয়। তবে পরিচয়পত্র ইত্যাদির প্রয়োজনে তা বৈধ।

প্রশ্নঃ ভিডিওর ছবিও কি জায়েয নয়?
উত্তর: অনেকে বলেছেন, 'ভিডিওর ছবি গুপ্ত থাকে, সময়ে দেখা যায়। সুতরাং তা আয়না ও পানির উপরে প্রকাশিত ছবির মতো। তা নিষেধের পর্যায়ভুক্ত নয়।' বর্তমান যুগে সে ছবির প্রয়োজনীয়তা অধিকাংশ উলামা অস্বীকার করতে পারেন না।

প্রশ্ন: বাচ্চাদের খেলনা-পুতুলের ব্যাপারে বিধান কী?
উত্তর: বাচ্চারা নিজে যে সব পুতুল কাপড় দিয়ে বানিয়ে খেলা করে, তা বৈধ হওয়ার ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। যেহেতু এই শ্রেণীর পুতুল নিয়ে মা আয়েশা দাম্পত্যের প্রথম জীবনে নবী-এর সামনে খেলা করতেন। কিন্তু যে খেলনা নিখুঁতভাবে মানুষের বা অন্য প্রাণীর আকার-আকৃতি দিয়ে তৈরি, যা কথা বলে, কান্না করে, আওয়াজ করে, হাঁটে বা নাচে, তা বৈধ কি না---তাতে সন্দেহ আছে। (ইউ) অনেক উলামার মতে যা শিশুদের খেলনা এবং যা অবজ্ঞা ও অবমাননার পুতুল বা ছবি, তা বৈধ। অনেকের মতে কাপড় বা তুলোর পুতুল ছাড়া অন্য পুতুল অবৈধ। অবশ্য পূর্বসতর্কতামূলক আমল হিসাবে তা শিশুদের জন্য ক্রয় না করাই উত্তম।

প্রশ্নঃ স্কুলের ছবি অঙ্কন বিষয়ক ক্লাশে প্রাণীর ছবি আঁকতে আদেশ করা হয়। সে ক্ষেত্রে ছাত্র-ছাত্রীরা কী করতে পারে?
উত্তর: বিচরণশীল প্রাণীর ছবি আঁকা বৈধ নয়। যদি কেউ আঁকতে একান্ত বাধ্যই হয়, তাহলে প্রাণীর মাথাটা আঁকবে না। (ইউ) ড্রেসের ডিজাইন আঁকতে মাথাহীন দেহের উপর ড্রেস আঁকতে পারা যায়। মাথাহীন স্ট্যাচুর দেহে পোশাক পরিয়ে তা শো করা যায়। কোন ছবি বা মূর্তির মাথা না থাকলে ক্ষতির আওতায় পড়ে না। মহানবী বলেছেন, الصورة الرأس، فإذا قطع الرأس، فلا صورة. অর্থাৎ, মূর্তি বা ছবি হল মাথাটাই। সুতরাং মাথা কেটে দেওয়া হলে সে ছবি বা মূর্তিতে সমস্যা নেই। (সিঃ সহীহাহ ১৯২১নং)

প্রশ্নঃ মূর্তি বা পুতুল তৈরির কারখানায় চাকরি করা বৈধ কি?
উত্তর: এমন কারখানায় চাকরি বৈধ নয়। বৈধ নয় এমন শিল্পী ও ছবিনির্মাতাদের উপার্জন। যেহেতু ইসলামে যা হারাম, তার ব্যবসা হারাম, তাতে কোনও প্রকার সহযোগিতা ক'রে চাকরি করা হারাম। আল্লাহর রসূল সুদখোর, সূদদাতা, সূদের লেখক এবং তার উভয় সাক্ষ্যদাতাকে অভিশাপ করেছেন। আর বলেছেন, “(পাপে) ওরা সকলেই সমান।” (মুসলিম ১৫৯৮নং) মদের ব্যাপারে তিনি বলেছেন, "মদ পানকারীকে, মদ পরিবেশনকারীকে, তার ক্রেতা ও বিক্রেতাকে, তার প্রস্তুতকারককে, যার জন্য প্রস্তুত করা হয় তাকে, তার বাহককে ও যার জন্য বহন করা হয় তাকে আল্লাহ অভিশাপ করেছেন।” (আবু দাউদ ৩৬৭৪, ইবনে মাজাহ ৩৩৮০নং) ইবনে মাজার বর্ণনায় আছে, "তার মূল্য ভক্ষণকারীও (অভিশপ্ত)।” (সহীহুল জামে' ৫০৯১নং)

প্রশ্নঃ ছবি আঁকলে বা মূর্তি বানালে তা আল্লাহর সৃষ্টির সাথে টেক্কা দেওয়া হয়। কিন্তু আল্লাহরই সৃষ্টি বাজ, পায়রা প্রভৃতি পাখীকে মমি ক'রে বাড়িতে সাজিয়ে রাখলে দোষ আছে কি? যেহেতু তা তো মূর্তি নয়।
উত্তর: এ কাজ মূর্তি নির্মাণের শামিল নয় এবং আল্লাহর সৃষ্টিকে টেক্কা দেওয়াও নয়। তবে তাতে অযথা প্রাণিহত্যা ও অপচয় রয়েছে এবং তা গৃহে মূর্তিস্থাপনের চোরা পথ ও সুসদৃশ। তাই তা বৈধ নয়। (লাদা)

📘 দ্বীনি প্রশ্ন উত্তর 📄 আখলাক ও ব্যবহার

📄 আখলাক ও ব্যবহার


প্রশ্নঃ 'কিয়াম' বৈধ কি?
উত্তর: 'কিয়াম' কয়েক প্রকারের। (ক) কারো তা'যীমের উদ্দেশ্যে কিয়াম করা, যেমন রাজা-বাদশাদের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা হয়। এমন কিয়াম বৈধ নয়। যেহেতু প্রিয় রসূল বলেন, "যে ব্যক্তি পছন্দ করে যে, লোক তার জন্য দন্ডায়মান হোক সে যেন তার বাসস্থান জাহান্নামে ক'রে নেয়।” (মুসনাদে আহমাদ)
(খ) আগন্তুকের সম্মানার্থে উঠে দাঁড়ানো। তাকে আগে বেড়ে আনার জন্য নয়, তাকে ধরে বসাবার জন্য নয়, তার সাথে মুসাফাহা-মুআনাক্বা করার জন্য নয়। সে প্রবেশ করলে অথবা প্রস্থান করলে তার তা'যীমের উদ্দেশ্যে খাড়া হওয়া অতঃপর বসে যাওয়া। এই শ্রেণীর 'কিয়াম'ও হারাম না হলে মাকরূহ তো বটেই। যেহেতু আনাস বলেন, 'তাঁদের (সাহাবাদের) নিকট রসূল অপেক্ষা অন্য কেউই প্রিয়তম ছিল না। তা সত্ত্বেও তাঁরা যখন তাঁকে দেখতেন, তখন তাঁর জন্য উঠে দাঁড়াতেন না। যেহেতু তাঁরা জানতেন যে, তিনি তা অপছন্দ করেন।” (তিরমিযী)
(গ) আগন্তুককে আগে বেড়ে আনার জন্য, তাকে ধরে বসাবার জন্য, তার সাথে মুসাফাহা-মুআনাক্বা করার জন্য উঠে দাঁড়ানো সুন্নত। রসূল-এর কন্যা ফাতেমা তাঁর নিকট এলে তিনি তাঁর প্রতি উঠে গিয়ে তাঁর হাত ধরতেন (মুসাফাহাহ করতেন), তাকে চুমা দিতেন এবং নিজের আসনে তাঁকে বসাতেন। তদনুরূপ তিনি ফাতেমার নিকট এলে তিনিও পিতার প্রতি উঠে গিয়ে তাঁর হাত ধরতেন (মুসাফাহাহ করতেন), তাকে চুমা দিতেন এবং নিজের আসনে তাঁকে বসাতেন। (আবু দাউদ ৫২১৭, তিরমিযী ৩৮৭২নং) (খন্দকের যুদ্ধ শেষে) সা'দ আহত ছিলেন। ইয়াহুদীদের ব্যাপারে বিচার করার উদ্দেশ্যে রসূল তাঁকে আহূত করেন। তাই তিনি এক গর্দভের পৃষ্ঠে আরোহণ করে যখন তাঁর নিকট পৌঁছলেন তখন রসূল আনসারকে লক্ষ্য ক'রে বললেন, "তোমরা তোমাদের সর্দারের প্রতি উঠ এবং ওঁকে নামাও।” সুতরাং (কিছু) সাহাবা উঠে গিয়ে তাঁকে গাধার পিঠ থেকে নামালেন। (আহমাদ, আবু দাউদ প্রমুখ, সিলসিলাহ সহীহাহ ৬৭নং) আর এক প্রকার 'কিয়াম' আছে, যা মীলাদীরা মীলাদ শেষে ক'রে থাকে। তা বিদআত।

প্রশ্ন: ক্লাসরুমে শিক্ষক প্রবেশ করলে ছাত্রদের দাঁড়িয়ে গিয়ে শ্রদ্ধা জানানো বৈধ কি?
উত্তর: না, এমন শ্রদ্ধার কিয়াম বৈধ নয়। যেহেতু আনাস বলেন, 'তাঁদের (সাহাবাদের) নিকট রসূল অপেক্ষা অন্য কেউই প্রিয়তম ছিল না। তা সত্ত্বেও তাঁরা যখন তাঁকে দেখতেন, তখন তাঁর জন্য উঠে দাঁড়াতেন না। যেহেতু তাঁরা জানতেন যে, তিনি তা অপছন্দ করেন।” (তিরমিযী) শিক্ষকের জন্য এমন শ্রদ্ধা নেওয়া বৈধ নয়, বৈধ নয় ছাত্রদের জন্য সেই শ্রদ্ধা প্রদর্শনের আদেশ পালন করা। (লাদা)

প্রশ্নঃ রহীম যদি করীমকে বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য মনে করে অথচ করীম তার বিপরীত হয়, তাহলে রহীমকে সতর্ক করা কি জরুরী? নাকি তা গীবতের পর্যায়ভুক্ত হবে?
উত্তর: উদ্দেশ্য যদি রহীমের হিতাকাঙ্ক্ষা হয়, তাহলে তা গীবতের পর্যায়ভুক্ত নয়। যেহেতু তামীম দারী বলেন, أَنَّ النَّبيَّ ، قَالَ : (( الدِّينُ النَّصِيحَةُ (( قُلْنَا : لِمَنْ ؟ قَالَ : (( لِلهِ وَلِكِتَابِهِ وَلِرَسُولِهِ وَلِأَئِمَّةِ الْمُسْلِمِينَ وَعَامَّتِهِمْ)). رواه مسلم নবী বলেন, “দ্বীন হল কল্যাণ কামনা করার নাম।" আমরা বললাম, 'কার জন্য?' তিনি বললেন, "আল্লাহর জন্য, তাঁর কিতাবের জন্য, তাঁর রসূলের জন্য, মুসলিমদের শাসকদের জন্য এবং মুসলিম জনসাধারণের জন্য। (মুসলিম)
وعَن جَرِيرِ بنِ عَبْدِ اللَّهِ ، قَالَ : بَايَعْتُ رَسُولَ اللَّهِ عَلَى إِقَامِ الصَّلَاةِ ، وَإِيتَاءِ الزَّكَاةِ ، والنُّصْحِ لِكُلِّ مُسْلِمٍ . مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ . জারীর ইবনে আব্দুল্লাহ কর্তৃক বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ-এর নিকট নামায কায়েম করা, যাকাত দেওয়া ও সকল মুসলমানের জন্য হিত-কামনা করার উপর বায়আত করেছি। (বুখারী ও মুসলিম)

প্রশ্ন: দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করা কি আদৌ বৈধ নয়?
উত্তর: প্রয়োজনে দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করা যায়; যদি কাপড়ে তার ছিটা লাগার ভয় না থাকে। নবী দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করেছেন। (বুখারী ২২২৪, মুসলিম ২৭৩নং) তবে বসে প্রস্রাব করাই উত্তম। যাতে সাবধান হওয়া যায়। আল্লাহর রসূল বলেন, "তোমরা প্রস্রাব থেকে সাবধানতা অবলম্বন কর। কারণ, অধিকাংশ কবরের আযাব এই প্রস্রাব (থেকে সাবধান না হওয়ার) ফলেই হয়ে থাকে।” (দারাকুত্বনী, সহীহ তারগীব ১৫১ নং)

প্রশ্ন: খবরের কাগজ বিছিয়ে খাওয়া, তা দিয়ে প্রস্রাব-পায়খানা পরিষ্কার করা, তার উপর বসা বা পা দেওয়া বৈধ কি?
উত্তর: যে কোনও কাগজে আল্লাহর নাম অথবা আল্লাহর নামযুক্ত কোন ব্যক্তি বা বস্তুর নাম থাকলে অথবা কুরআনের আয়াত থাকলে বিছিয়ে খাওয়া, তা দিয়ে প্রস্রাব-পায়খানা পরিষ্কার করা, তার উপর বসা বা পা দেওয়া বৈধ নয়। এমন কুরআনের পাতা, বই-পুস্তক বা পত্র-পত্রিকা পবিত্র জায়গায় দাফন করা অথবা পুড়িয়ে ফেলা বিধেয়। যাতে আল্লাহর নাম বা কুরআনের আয়াতের কোন অমর্যাদা না হয়। (ইবা)

প্রশ্নঃ হাতের ইশারায় সালাম দেওয়া কি বিধেয়?
উত্তর: কেবল হাতের ইশারা করা এবং মুখে সালাম উচ্চারণ না করা বৈধ নয়। যে ব্যক্তির কাছে আওয়াজ পৌঁছবে না, সে ব্যক্তিকে সালাম জানাতে হাতের ইশারার সাথে মুখে সালাম বলতে হবে। যেহেতু কেবল হাতের ইশারায় সালাম আহলে কিতাব (ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানদের) সালাম। (সহীহ তিরমিযী ২১৬৮নং, সিলসিলাহ সহীহাহ ২১৯৪নং) অবশ্য নামাযরত ব্যক্তি সালামের জবাব দেবে কেবল হাত বা আঙ্গুলের ইশারায়। (মুসলিম ৫৪০, আবু দাউদ ৯২৫নং)

প্রশ্নঃ অনেকে শ্রদ্ধেয়ভাজনের পা ছুঁয়ে সালাম করে। তা কি বৈধ?
উত্তর: পা ছুঁয়ে সালামও অমুসলিমদের। আর তা সালাম নয়, তা আসলে প্রণাম। সুতরাং তা মুসলিমদের জন্য বৈধ নয়। বৈধ নয় আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও জন্য মাথা নত করা।

প্রশ্ন: অনেকে সালাম করার সময় মাথা নত করে। তা কি বৈধ?
উত্তর: সালাম ও মুসাফাহাহ করার সময় মাথা নত করা বৈধ নয়। বৈধ নয় আল্লাহ ছাড়া কারও জন্য মাথা নত করা। (ইউ)

প্রশ্নঃ সালামের পর কি শ্রদ্ধেয়ভাজনের কপাল বা হাত চুমা জায়েয?
উত্তর: দুই চোখের মাঝে কপাল চুম্বন দেওয়া বৈধ। জাফর হাবশা থেকে ফিরে এলে মহানবী তাঁর সাথে মুআনাকা করে তাঁর দুই চোখের মাঝে (কপালে) চুম্বন দিয়েছিলেন। (সিলসিলাহ সহীহাহ ৬/১/৩৩৮) কিছু শর্তের সাথে আলেম (পিতা-মাতা বা গুরুজন) দের হাতে বুসা দেওয়া বৈধ। (ক) শ্রদ্ধাস্পদ যেন গর্বভরে হাত প্রসারিত না করে। (খ) শ্রদ্ধাকারীর মনে যেন তাবারুক বা বর্কত নেওয়ার খেয়াল না থাকে। (গ) বুসা দেওয়া বা নেওয়াটা যেন কোন প্রথা বা অভ্যাসে পরিণত না হয়। (ঘ) ওর স্থলে যেন মুসাফাহা পরিত্যক্ত না হয়। (সিলসিলাহ সহীহাহ ১/৩০২) (ঙ) বুসার সময় হাতকে নিয়ে কপালে যেন স্পর্শ না করা হয়।

প্রশ্ন: অবৈধ কাজে কি পিতামাতার আনুগত্য করা জায়েয?
উত্তর: পিতামাতার আনুগত্য করা ওয়াজেব। কিন্তু অবৈধ কাজে তাদের আনুগত্য বৈধ নয়। পিতামাতা যদি হারাম উপার্জন করতে বলে, পর্দা করতে নিষেধ করে, পণ বা যৌতুক নিতে বলে, শির্ক বা বিদআত করতে বলে, তাহলে সে সব কাজে তাদের আনুগত্য করা বৈধ নয়। মহান আল্লাহ বলেন, {وَوَصَّيْنَا الْإِنسَانَ بِوَالِدَيْهِ حُسْنًا وَإِن جَاهَدَاكَ لِتُشْرِكَ بِي مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ فَلَا تُطِعْهُمَا إِلَيَّ مَرْجِعُكُمْ فَأُنَبِّئُคُم بِمَا كُنتُمْ تَعْمَلُونَ} (৮) سورة العنكبوت অর্থাৎ, আমি মানুষকে তার মাতা-পিতার প্রতি সদ্ব্যবহার করতে নির্দেশ দিয়েছি, তবে ওরা যদি তোমাকে আমার সাথে এমন কিছুকে অংশী করতে বাধ্য করে, যার সম্পর্কে তোমার কোন জ্ঞান নেই, তাহলে তুমি তাদের কথা মান্য করো না। আমারই নিকট তোমাদের প্রত্যাবর্তন; অতঃপর তোমরা যা কিছু করেছ, আমি তা তোমাদেরকে জানিয়ে দেব। (আনকাবুতঃ ৮) {وَإِن جَاهَدَاكَ عَلَى أَن تُشْرِكَ بِي مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ فَلَا تُطِعْهُمَا وَصَاحِبْهُمَا فِي الدُّنْيَا مَعْرُوفًا وَاتَّبِعْ سَبِيلَ مَنْ أَنَابَ إِلَيَّ ثُمَّ إِلَيَّ مَرْجِعُكُمْ فَأُنَبِّئُكُم بِمَا كُنتُمْ تَعْمَلُونَ} (১৫) لقمان অর্থাৎ, তোমার পিতা-মাতা যদি তোমাকে আমার অংশী করতে পীড়াপীড়ি করে, যে বিষয়ে তোমার কোন জ্ঞান নেই, তাহলে তুমি তাদের কথা মান্য করো না, তবে পৃথিবীতে তাদের সঙ্গে সদ্ভাবে বসবাস কর এবং যে ব্যক্তি আমার অভিমুখী হয়েছে তার পথ অবলম্বন কর, অতঃপর আমারই নিকট তোমাদের প্রত্যাবর্তন এবং তোমরা যা করতে, আমি সে বিষয়ে তোমাদেরকে অবহিত করব। (লুকুমানঃ ১৫)
আর মহানবী বলেন, “স্রষ্টার অবাধ্যতা ক'রে কোন সৃষ্টির আনুগত্য নেই।” (মুসনাদে আহমাদ)

প্রশ্নঃ পিতামাতা যদি জিহাদে যেতে বাধা দেয়, তাহলে তাদের কথা মানা কি বৈধ?
উত্তর: জিহাদ ফার্যে আইন হলে তাদের কথা মেনে ঘরে বসে থাকা বৈধ নয়। ফার্যে কিফায়াহ বা নফল হলে তাদের কথা মেনে তাদের খিদমত করা বেশি জরুরী। আব্দুল্লাহ ইবনে আম্র ইবনুল আস বলেন, এক ব্যক্তি আল্লাহর নবীর নিকট এসে বলল, 'আমি আপনার সঙ্গে আল্লাহ তাআলার কাছে নেকী পাওয়ার উদ্দেশ্যে হিজরত এবং জিহাদের বায়আত করছি।' নবী বললেন, "তোমার পিতা-মাতার মধ্যে কি কেউ জীবিত আছে?” সে বলল, 'জী হ্যাঁ; বরং দু'জনই জীবিত রয়েছে।' রসূল বললেন, "তুমি আল্লাহ তাআলার কাছে নেকী পেতে চাও?” সে বলল, 'জী হ্যাঁ।' তিনি বললেন, "তাহলে তুমি তোমার পিতা-মাতার নিকট ফিরে যাও এবং উত্তমরূপে তাদের খিদমত কর।” (বুখারী, আর শব্দগুলি মুসলিমের) উভয়ের অন্য এক বর্ণনায় আছে, এক ব্যক্তি তাঁর নিকট এসে জিহাদ করার অনুমতি চাইল। তিনি বললেন, "তোমার পিতা-মাতা কি জীবিত আছে?” সে বলল, 'জী হ্যাঁ।' তিনি বললেন, "অতএব তুমি তাদের (সেবা করার) মাধ্যমে জিহাদ কর।”

প্রশ্নঃ পিতামাতা মারা যাওয়ার পর তাদের আত্মার কল্যাণের জন্য কী কী করা যায়?
উত্তর: তাদের জন্য ৩টি কাজ করা যায়:- ১। তাদের জন্য দুআ করা যায়। রাসূলুল্লাহ বলেছেন, "যখন কোন মানুষ মারা যায়, তখন তার কর্ম বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু তিনটি জিনিস নয়; (১) সাদকা জারিয়াহ, (২) যে বিদ্যা দ্বারা উপকার পাওয়া যায় অথবা (৩) নেক সন্তান, যে তার জন্য দুআ করে।" (মুসলিম) ২। দান-খায়রাত করা। এক ব্যক্তি নবী-কে বলল, 'আমার মা হঠাৎ মারা গেছে। আমার ধারণা যে, সে কথা বলার সুযোগ পেলে সাদকাহ করত। সুতরাং আমি যদি তার পক্ষ থেকে সাদকাহ করি, তাহলে কি সে নেকী পাবে?' তিনি বললেন, "হ্যাঁ।” (বুখারী ও মুসলিম) আল্লাহর রসূল বলেছেন, "মুমিনের মৃত্যুর পর তার আমল ও পুণ্যকর্মসমূহ হতে নিশ্চিতভাবে যা এসে তার সাথে মিলিত হয়, তা হল; সেই ইল্ম, যা সে শিক্ষা ক'রে প্রচার করেছে অথবা নেক সন্তান, যাকে রেখে সে মারা গেছে, অথবা কুরআন শরীফ, যা সে মীরাসরূপে ছেড়ে গেছে, অথবা মসজিদ, যা সে নিজে নির্মাণ ক'রে গেছে, অথবা মুসাফিরখানা, যা সে মুসাফিরদের সুবিধার্থে নির্মাণ ক'রে গেছে, অথবা পানির নালা, যা সে (সেচ ইত্যাদির উদ্দেশ্যে) প্রবাহিত ক'রে গেছে, অথবা সাদকাহ, যা সে নিজের মাল থেকে তার সুস্থ ও জীবিতাবস্থায় বের (দান) ক'রে গেছে। এসব কর্মের সওয়াব তার মৃত্যুর পরও তার সাথে এসে মিলিত হবে।” (ইবনে মাজাহ, বাইহাকী, ইবনে খুজাইমাহ ভিন্ন শব্দে, সহীহ তারগীব ১০৭নং) ৩। হজ্জ-উমরাহ করা। আব্দুল্লাহ বিন আম্র বলেন, আস বিন ওয়াইল সাহমী তার তরফ হতে ১০০টি ক্রীতদাস মুক্ত করার অসিয়ত ক'রে মারা যায়। সুতরাং তার ছোট ছেলে হিশাম ৫০টি দাস মুক্ত করে। অতঃপর তার বড় ছেলে আম্র বাকী ৫০টি দাস মুক্ত করার ইচ্ছা করলে বললেন, '(বাপ তো কাফের অবস্থায় মারা গেছে) তাই আমি এ কাজ আল্লাহর রসূল-কে জিজ্ঞাসা না ক'রে করব না।' সুতরাং তিনি নবী-এর নিকট এসে ঘটনা খুলে বলে জিজ্ঞাসা করলেন, "আমি কি বাকী ৫০টি দাস তার তরফ থেকে মুক্ত করব?' উত্তরে আল্লাহর রসূল বললেন, "সে যদি মুসলিম হতো এবং তোমরা তার তরফ থেকে দাস মুক্ত করতে, অথবা সদকাহ করতে অথবা হজ্জ করতে তাহলে তার সওয়াব তার নিকট পৌঁছত।” (আবু দাউদ ২৮৮৩নং, বাইহাকী ৬/ ২৭৯, আহমাদ ৬৭০৪নং) ৪। তাদের কোন অসিয়ত থাকলে তা পালন করুন। ৫। তাদের কোন বন্ধু থাকলে তার খাতির করুন। ৬। তাদের সম্পর্কের জেরে সকল আত্মীয়তার বন্ধন বজায় রাখুন। আর কোন বিদআতী কাজ করবেন না বা বিদআতী অসিয়ত পালন করবেন না। যেমন চালসে-চাহারম, ফাতিহা-খানী, স্কুল-খানী, কুরআন-খানী, মৌলুদ-পাঠ ইত্যাদি করবেন না। কোন ভোজবাজি বা দুআর অনুষ্ঠান করবেন না। জেনে রাখবেন, যা আপনি তাদের আত্মার কামনার উদ্দেশ্যে আল্লাহর জন্য করবেন, তাই তাদের উপকারে আসবে। পক্ষান্তরে যা নিজের স্বার্থের জন্য করবেন, সুনাম নেওয়ার জন্য করবেন অথবা বদনাম থেকে বাঁচার জন্য করবেন, তা কোন উপকার দেবে না। সবচেয়ে বেশি উপকারী হিসাবে আপনি প্রত্যহ প্রত্যেক ফরয নামাযের শেষাংশে তাদের জন্য দুআ করুন। তাহলেই তাদের হক আদায় করতে পারবেন।

প্রশ্ন: সাহাবাগণের চরিত্র অভিনয় করা বৈধ কি?
উত্তর: সাহাবাদের যে মর্যাদা আছে, অভিনয়ের ফলে তা ক্ষুণ্ণ হয়ে যায়। বিশেষ ক'রে অভিনেতা যদি ফাসেক বা কাফের হয়, তাহলে অবৈধতার মাত্রা বেশি। বলা বাহুল্য, অভিনেতা সচ্চরিত্রবান মুসলিম হলেও তাঁদের চরিত্রের অভিনয় বৈধ নয়। (ইউ)

প্রশ্ন: কাউকে উদ্বুদ্ধ করতে হাততালি দেওয়া বৈধ কি?
উত্তর: কাউকে উদ্বুদ্ধ করতে অথবা কোন মুগ্ধকারী বিষয় দেখে তকবীর ও তসবীহ বলাই বিধেয়। তবে জামাআতীভাবে নয়, একাকী। তবে হাততালি দেওয়া যে হারাম, তা বলতে পারব না। মুশরিকরা নামাযে সিটি বাজাতো ও হাততালি দিতো। সে ছিল ইবাদতে। মহিলাদের জন্য হাততালিও নামাযে। আর আলোচ্য হাততালি হল লোকাচারে। সুতরাং ইবাদতে হাততালি নিষিদ্ধ অথবা মহিলাদের বলে লোকাচারে তা করা যাবে না, তা নয়। তবুও বলব তা মকরূহ, তা না করাই ভাল। (ইউ)

প্রশ্ন: অমুসলিম আয়া রেখে তার ওপর সন্তানের লালন-পালনের দায়িত্ব দেওয়া কি বৈধ?
উত্তর: অমুসলিম আয়া রেখে শিশু-প্রতিপালনের দায়িত্ব তাকে দিলে তার আক্বীদা ও চরিত্রে শিশু প্রতিপালিত হবে। সুতরাং তা বৈধ নয়। অনুরূপ নামে মাত্র মুসলিম আয়া রেখে সন্তানের আক্বীদা ও চরিত্র বিনাশ করা উচিত নয় মা-বাপের। আল্লাহর রসূল বলেন, "সুসঙ্গী ও কুসঙ্গীর উপমা তো আতর-ওয়ালা ও কামারের মত। আতর-ওয়ালা (এর পাশে বসলে) হয় সে তোমার দেহে (বিনামূল্যে) আতর লাগিয়ে দেবে, না হয় তুমি তার নিকট থেকে তা ক্রয় করবে। তা না হলেও (অন্ততঃপক্ষে) তার নিকট থেকে এমনিই সুবাস পেতে থাকবে। পক্ষান্তরে কামার (এর পাশে বসলে) হয় সে (তার আগুনের ফিনকি দ্বারা) তোমার কাপড় পুড়িয়ে ফেলবে, না হয় তার নিকট থেকে বিকট দুর্গন্ধ পাবে।” (বুখারী ২১০১, মুসলিম ২৬২৮নং)

প্রশ্নঃ ট্রাফিক আইন মেনে চলা কি জরুরী। বিশেষ ক'রে শিগন্যালের বাতি যখন লাল থাকে এবং অপর দিকে কোন গাড়ি না থাকে, তখনও কি তা মানা জরুরী?
উত্তর: এই আইন সকলের নিরাপত্তার জন্য, এমনকি খোদ চালকেরও নিরাপত্তার জন্য। সুতরাং তা মান্য করা জরুরী। গাড়ি নেই দেখে হঠাৎ এসে যেতেও পারে। সুতরাং নিজের দিকের শিগন্যাল-বাতি সবুজ না হওয়া পর্যন্ত পার হওয়া বৈধ নয়। শরীয়তের একটি ব্যাপক নীতি হল, ((لَا ضَرَرَ وَلَا ضَرَار)). "কারো জন্য অপরের কোন প্রকার ক্ষতি করা বৈধ নয়। কোন দু'জনের জন্য প্রতিশোধমূলক পরস্পরকে ক্ষতিগ্রস্ত করাও বৈধ নয়।” (আহমাদ, মালেক, ইবনে মাজাহ ২৩৪০, ২৩৪১নং)

প্রশ্নঃ 'ধূমপান নিষিদ্ধ' লেখা সত্ত্বেও অনেকে তা পালন করে না। সরকারীভাবে তা নিষিদ্ধ করা হলে সে নির্দেশ অমান্য করার জন্য ধূমপায়ী কি গোনাহগার হবে না?
উত্তর: সে দুইভাবে পাপী হবে। শরয়ী আইন অমান্য ক'রে ধূমপান করার জন্য। আর সরকারী আইন ও নির্দেশ অমান্য করার জন্য। (ইবা)

প্রশ্ন: নিজের জায়গা ছেড়ে কোন সম্মানিতকে বসতে দেওয়া কি ইসলামী আদবের পর্যায়ভুক্ত?
উত্তর: নিজের জায়গা ছেড়ে কোন সম্মানিতকে বসতে দেওয়া ইসলামী আদবের পর্যায়ভুক্ত নয়। বরং আদব হল নড়ে-সরে বসে পাশে জায়গা ক'রে দেওয়া। আর যার জন্য জায়গা ছেড়ে দেওয়া হবে, তার উচিত হল, সে জায়গায় না বসা। ইবনে উমার এরূপই করতেন। (বানী)

প্রশ্নঃ ক্বিবলার দিকে মুখ ক'রে প্রস্রাব-পায়খানা নিষেধ জানি, কিন্তু সে দিকে থুথু ছুড়ে ফেলাও কি নিষেধ? ক্বিবলার দিকে থুথু ফেলা নিষেধ হওয়ার ব্যাপারটা কি নামাযের মধ্যে সীমিত নয়?
উত্তর: আনাস বলেন, নবী কিবলার (দিকের দেওয়ালে) থুথু দেখতে পেলেন। এটা তাঁর প্রতি খুব ভারী মনে হল; এমনকি তাঁর চেহারায় সে চিহ্ন দেখা গেল। ফলে দাঁড়ালেন এবং তিনি তা নিজ হাত দ্বারা ঘষে তুলে ফেললেন। তারপর বললেন, "তোমাদের কেউ যখন নামাযে দাঁড়ায়, তখন সে তার প্রতিপালকের সাথে কানে কানে (ফিসফিস ক'রে কথা) বলে। আর তার প্রতিপালক তার ও কেবলার মধ্যস্থলে থাকেন। সুতরাং তোমাদের কেউ যেন ক্বিবলার দিকে থুথু না ফেলে; বরং তার বামে অথবা পদতলে ফেলে। অতঃপর তিনি তাঁর চাদরের এক প্রান্ত ধরে তাতে থুথু নিক্ষেপ করলেন। তারপর তিনি তার এক অংশকে আর এক অংশের সাথে রগড়ে দিয়ে বললেন, কিংবা এইরূপ করে।” (বুখারী-মুসলিম) এ নিষেধ হল নামাযের ব্যাপারে। কিন্তু আমভাবেও ক্বিবলার দিকে থুথু ছুড়ে ফেলতে নিষেধ এসেছে। ক্বিবলার প্রতি আদব প্রদর্শনের নির্দেশ দিয়ে আল্লাহর রসূল বলেছেন, “ক্বিবলার দিকে যে কফ্ ফেলে, তার চেহারায় ঐ কফ্ থাকা অবস্থায় সে ব্যক্তিকে কিয়ামতের দিন পুনরুত্থিত করা হবে।” (বাযযার, ইবনে খুযাইমাহ, ইবনে হিব্বান, সহীহ তারগীব ২৮১নং)

প্রশ্ন: যে নামে আত্মপ্রশংসা হয়, সে নাম রাখা বৈধ নয়। তাহলে 'ইযযুদ্দীন, মুহিউদ্দীন, নাসিরুদ্দীন' ইত্যাদি নাম রাখা বৈধ কি?
উত্তর: না, উক্ত সকল নাম তথা ঐ শ্রেণীর কোন নাম রাখা বৈধ নয়, যাতে আত্মপ্রশংসা হয়। মহানবী এই শ্রেণীর নাম শুনলে তা পরিবর্তন ক'রে দিতেন। (বানী, দ্রঃ সিঃ সহীহাহ হাদীস নং ২০৭-২১৬)

প্রশ্নঃ লোকের ভয়ে সত্য গোপন করা অথবা সত্যের অপলাপ করা বৈধ কি?
উত্তর: লোকে কষ্ট দেবে---এই ভয়ে, গালি দেবে, মারবে অথবা রুযী বন্ধ ক'রে দেবে---এই ভয়ে, চাকরি চলে যাবার ভয়ে অথবা সম্মান ও পজিশন চলে যাওয়ার ভয়ে সত্য গোপন করা অথবা সত্যের অপলাপ করা বৈধ নয়। যেহেতু মহানবী বলেছেন, (لَا يَمْنَعَنَّ رَجُلاً هَيْبَةُ النَّاسِ أَنْ يَقُولَ بِحَقِّ إِذَا عَلِمَهُ أَوْ شَهِدَهُ أَوْ سَمِعَهُ). অর্থাৎ, লোকের ভয় যেন কোন ব্যক্তিকে এমন কোন 'হক' বলতে বাধাগ্রস্ত না করে, যা সে জেনেছে, দেখেছে অথবা শুনেছে। (সিঃ সহীহাহ ১৬৮নং) উবাদাহ ইবনে স্বামেত বলেন, 'আমরা রাসূলুল্লাহ-এর কাছে এই মর্মে বাইয়াত করলাম যে, দুঃখে-সুখে, আরামে ও কষ্টে এবং আমাদের উপর (অন্যদেরকে) প্রাধান্য দেওয়ার অবস্থায় আমরা তাঁর পূর্ণ আনুগত্য করব। রাষ্ট্রনেতার বিরুদ্ধে তার নিকট থেকে ক্ষমতা কেড়ে নেওয়ার লড়াই করব না; যতক্ষণ না তোমরা (তার মধ্যে) প্রকাশ্য কুফরী দেখ, যে ব্যাপারে তোমাদের নিকট আল্লাহর পক্ষ থেকে দলীল রয়েছে। আর আমরা সর্বদা সত্য কথা বলব এবং আল্লাহর ব্যাপারে কোন নিন্দুকের নিন্দাকে ভয় করব না।' (বুখারী-মুসলিম)

প্রশ্নঃ শোনা যায়, জুমআর দিন সফর করতে নেই।---এ কথা কি ঠিক?
উত্তর: জুমআর দিন সফর নিষিদ্ধ হওয়ার ব্যাপারে কোন সহীহ দলীল নেই। বরং একদা উমার একটি লোককে বলতে শুনলেন, 'আজ জুমআর দিন না হলে আমি সফরে বের হতাম।' তিনি তাকে বললেন, 'তুমি বের হও। কারণ জুমআহ সফরে বাধা দেয় না।' (বাইহাক্বী, সিঃ যয়ীফাহ ২১৯নং) অবশ্য অনেকে বলেছেন, জুমআর আযান হয়ে গেলে জরুরী ছাড়া সফর করা বৈধ নয়।

প্রশ্নঃ 'দেশ-প্রেম ঈমানের অংশ' কথাটি কি ঠিক?
উত্তর: মোটেই না। যেহেতু দেশ-প্রেম আত্মপ্রেম ও ধন-প্রেমের মতোই মানুষের প্রকৃতিগত আচরণ। সুতরাং সে প্রেম দ্বারা কেউ প্রশংসিত হতে পারে না এবং তা ঈমানের কোন জরুরী জিনিসও নয়। বলা বাহুল্য, দেশ-প্রেমে মু'মিন-কাফের সকলেই সমান। (সিঃ যয়ীফাহ)

প্রশ্নঃ ক্বিবলার দিকে পা ক'রে শোওয়া কি হারাম?
উত্তর: কিছু ফুক্বাহা ক্বিবলার দিকে পা ক'রে শোয়াকে মকরূহ মনে করেন। কিন্তু মকরূহ একটি শরয়ী হুকুম। আর শরয়ী কোন হুকুম প্রমাণ করতে দলীল লাগে। কিতাব, সুন্নাহ, ইজমা অথবা সঠিক কিয়াস থেকে কোন দলীল না থাকলে তার জন্য কোন বিধান নির্ধারণ করা যাবে না। আর এ কথা বিদিত যে, ব্যবহারিক জীবনের আচার-আচরণ, খাওয়া-পান করা, শোওয়া ইত্যাদি সব কিছু বৈধের পর্যায়ভুক্ত। যতক্ষণ না তার অবৈধতার কোন দলীল পাওয়া যায়, ততক্ষণ তাকে অবৈধ বলা যাবে না। আর শরীয়তে এমন কোন দলীল নেই। প্রস্রাব-পায়খানার উপরেও শোওয়াকে কিয়াস করা যায় না। পরন্তু রোগীর নামায পড়ার সময় ক্বিবলার দিকে পা ক'রে নামায পড়তে বলা হয়েছে। অতএব বুঝা যায় যে, ক্বিবলা দিকে পা ক'রে শোওয়া হারাম বা মকরূহ নয়।

ফন্ট সাইজ
15px
17px