📄 দুআ ও যিক্র
প্রশ্নঃ নিত্য প্রয়োজনীয় পঠনীয় দুআ কাগজে ছেপে বা লিখে যথাস্থানে চিটিয়ে বা টেঙ্গে রাখা বৈধ কি?
উত্তর: যথাসময়ে তা দেখে পড়ার জন্য অথবা পড়তে স্মরণ করার জন্য কাগজে ছেপে বা লিখে চিটিয়ে বা টেঙ্গে রাখা দূষণীয় নয়। যেমন গাড়ির সামনে গাড়ি চড়া ও সফরের দুআ, দরজার দু'পাশে বাড়ি প্রবেশ ও বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় দুআ, বৈঠকখানায় 'কাফফারাতুল মাজলিস'-এর দুআ লিখে রাখা অবৈধ নয়। (ইউ)
প্রশ্ন: উপদেশ নেওয়া ও দেওয়ার উদ্দেশ্যে বাড়িতে বা অফিসে কুরআনী আয়াত বা হাদীসের বাণী লিখে টাঙ্গিয়ে রাখা বৈধ কি?
উত্তর: উক্ত উদ্দেশ্যে উক্ত কাজে কোন দোষ আছে বলে মনে করি না। (ইবা)
প্রশ্নঃ দু' হাত তুলে মুনাজাত কি বিদআত?
উত্তর: দু' হাত তুলে মুনাজাত কোথাও সুন্নত, কোথাও বিদআত। এমন ক্ষেত্রে দু' হাত তুলে মুনাজাত জায়েয, যে ক্ষেত্রে মহানবী দুআ করেছেন বলে প্রমাণিত নয়। অর্থাৎ প্রয়োজনে আম সময়ের ক্ষেত্রে দু' হাত তুলে মুনাজাত জায়েয। এমন ক্ষেত্রে দু' হাত তুলে মুনাজাত সুন্নত, যে ক্ষেত্রে মহানবী দুআ করেছেন এবং দু' হাত তুলেছেন বলে প্রমাণিত। যেমন জুমআর খুতবায় বৃষ্টি প্রার্থনার সময়, কুনূত পড়ার সময়, কবর যিয়ারতের সময় ইত্যাদি। এমন ক্ষেত্রে দু' হাত তুলে মুনাজাত বিদআত, যে ক্ষেত্রে মহানবী দুআ করেছেন বলে প্রমাণিত, কিন্তু তিনি সেখানে হাত তুলেছেন বলে প্রমাণিত নয়। যেমন জুমআ বা ঈদের খুতবার শেষে, দুই সিজদার মাঝখানে, তাশাহহুদে, নামাযের সালাম ফিরার আগে ও পরে, আযানের পরে ইত্যাদি। (ইবা)
📄 মৃত্যু ও জানাযা
প্রশ্নঃ কেউ মারা গেলে কোন্ শ্রেণীর প্রচার নিষিদ্ধ? মাইকিং করা কি বৈধ?
উত্তর: যে শ্রেণীর প্রচার জাহেলী যুগে ছিল। জাহেলী যুগে উঁচু মিনারে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করা হত। (বানী) সুতরাং মাইকে ঘোষণা করা উক্ত শ্রেণীভুক্ত।
প্রশ্নঃ মৃতব্যক্তির শোকে মাতম ক'রে কান্না করা বৈধ কি?
উত্তর: না। কেউ মারা গেলে ওয়াজেব হল বিধির বিধান মেনে নিয়ে শোক দমন ক'রে ধৈর্যধারণ করা। স্বাভাবিকভাবে চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে যাওয়াও দোষাবহ নয়। দোষাবহ হল মাতম ক'রে ইনিয়ে-বিনিয়ে কান্না করা। রাসূলুল্লাহ বলেছেন, "লোকের মধ্যে দু'টি এমন দোষ রয়েছে, যা আসলে কাফেরদের (আচরণ): বংশে খোঁটা দেওয়া এবং মৃত ব্যক্তির জন্য মাতম করা।” (মুসলিম) মহানবী বলেছেন, "মৃত ব্যক্তিকে তার কবরের মধ্যে তার জন্য মাতম ক'রে কান্না করার দরুন শাস্তি দেওয়া হয়।” (বুখারী ও মুসলিম) আবু বুরদাহ বলেন, একদা (তাঁর পিতা) আবু মুসা আশআরী যন্ত্রণায় কাতর হয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়লেন। আর (ঐ সময়) তাঁর মাথা তাঁর এক স্ত্রীর কোলে রাখা ছিল এবং সে চিৎকার ক'রে কান্না করতে লাগল। তিনি (অজ্ঞান থাকার কারণে) তাকে বাধা দিতে পারলেন না। সুতরাং যখন তিনি চেতনা ফিরে পেলেন, তখন বলে উঠলেন, 'আমি সেই মহিলা থেকে সম্পর্কমুক্ত, যে মহিলা থেকে আল্লাহর রসূল সম্পর্কমুক্ত হয়েছেন। নিঃসন্দেহে আল্লাহর রসূল সেই মহিলা থেকে সম্পর্কমুক্ত হয়েছেন, যে শোকে উচ্চ স্বরে মাতম ক'রে কান্না করে, মাথা মুন্ডন করে এবং কাপড় ছিঁড়ে ফেলে।' (বুখারী ও মুসলিম) রাসূলুল্লাহ বলেছেন, "মাতমকারিণী মহিলা যদি মরণের পূর্বে তাওবাহ না করে, তাহলে আল-কাতরার পায়জামা এবং পাঁচড়ার জামা পরিহিতা অবস্থায় তাকে কিয়ামতের দিনে দাঁড় করানো হবে।” (মুসলিম)
প্রশ্ন: কবরের উপরে কবরবাসীর নাম ও মৃত্যু-তারীখ সহ কোন আয়াত বা কবিতা লেখা কি শরীয়তসম্মত?
উত্তর: না। জাবের বলেন, 'নবী কবর পাকা করতে, তার উপর বসতে এবং তার উপর ইমারত নির্মাণ করতে বারণ করেছেন।' (মুসলিম) আবু দাউদ ও নাসাঈ প্রভৃতির বর্ণনায় আছে, 'তার উপর লিখতেও নিষেধ করেছেন। (ইবা)
প্রশ্ন: কবরস্থানে গাছ রোপণ করা বৈধ কি?
উত্তর: না। কবরস্থানে ফুল, ফল বা অন্য কিছুর গাছ লাগালে প্রথমতঃ তা পার্কের মতো হয়ে যায়। ফলে আখেরাত স্মরণের জায়গায় দুনিয়ার সৌন্দর্য ও আকর্ষণই সৃষ্টি করে সেই উদ্যান-সদৃশ পরিবেশ। দ্বিতীয়তঃ তাতে খ্রিস্টানদের সাদৃশ্য অবলম্বন হয়। (ইউ)
প্রশ্নঃ কোন আত্মীয় মারা গেলে, তার শোকে কালো কাপড় পরা কি শরীয়তসম্মত?
উত্তর: কারোর জন্য শোক পালনে কালো কাপড় পরা শরীয়তসম্মত নয়। স্বামী মারা গেলে স্ত্রীর জন্যও তা বিধেয় নয়। আত্মীয় মারা গেলে মহিলারা তিনদিন পর্যন্ত শোক পালন করতে পারে। আর স্বামী মারা গেলে ৪ মাস ১০ দিন শোক পালন করা ওয়াজেব। অবশ্য গর্ভবতীর ইদ্দত প্রসবকাল পর্যন্ত। এই সময় কোন সুগন্ধি, অলংকার ও সৌন্দর্যময় পোশাক ব্যবহার করতে পারবে না। সাদা কাপড়ে সৌন্দর্য থাকলে তাও ব্যবহার করা বৈধ নয়。
প্রশ্নঃ কোন নবী-অলীর কবর যিয়ারতের জন্য সফর করা কি বৈধ?
বর্কতময় তিনটি মসজিদ (অনুরূপ কুবার মসজিদ) ছাড়া বর্কত ও সওয়াবের উদ্দেশ্যে অন্য কোন মসজিদ, মাযার বা ঐতিহাসিক স্থান যিয়ারত করার জন্য সফর করা নিষেধ। আল্লাহর রসূল বলেছেন, ((لَا تُشَدُّ الرِّجَالُ إِلَّا إِلَى ثَلَاثَةِ مَسَاجِدَ مَسْجِدِ الْحَرَامِ وَمَسْجِدِي هَذَا وَالْمَسْجِدِ الأَقْصَى)). অর্থাৎ, তিনটি মসজিদ ছাড়া সফর করা যাবে না, (মক্কার) মাসজিদে হারাম, (মদীনার) আমার এই মসজিদ এবং (জেরুজালেমের) মাসজিদে আকুসা। (বুখারী-মুসলিম) সুতরাং যে ব্যক্তি মদীনা যাবে, তার কবরে নববীর যিয়ারত যেন উদ্দেশ্য না হয়। মসজিদে নববীর যিয়ারতের নিয়তে গিয়ে কবর যিয়ারত করবেন। বৈধ নয় কোন অলী- আওলিয়ার কবর বা মাযার দূর থেকে যিয়ারত করতে আসা। অবশ্য তার সাথে যদি কোন অন্য অবৈধ আশা বা চাহিদা থাকে, তাহলে নীতি অনুযায়ী তা বিদআত বা শির্ক হবে।
প্রশ্ন: কবরে মাটি দেওয়ার সময় 'মিনহা খালাকুনাকুম...' আয়াত পড়া কি ঠিক? হাদীসে তো আছে কন্যা উম্মে কুলযূম (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা) কে কবরে রাখার সময় নবী ঐ আয়াত পড়েছিলেন। (আহমাদ)
উত্তর: প্রথমতঃ ঐ হাদীস সহীহ নয়। দ্বিতীয়তঃ তাতে এ কথা নেই যে, তিনি মাটি দেওয়ার সময় ঐ আয়াত পড়েছিলেন। বরং তিনি কবরে লাশ রাখার সময় বলেছিলেন। সুতরাং তাতে অভিষ্ট দলীল নেই। (আহকামুল জানাইয, আলবানী ১৫৩পৃঃ)
প্রশ্নঃ মসজিদের এরিয়ার ভিতর কোন বুযুর্গকে দাফন করা কি বৈধ?
উত্তর: না। মসজিদের এরিয়ার ভিতর কবর দেওয়া বৈধ নয়, বৈধ নয় কবরের উপর মসজিদ নির্মাণ করা। আল্লাহর রসূল মৃত্যুশয্যায় বলে গেছেন, "আল্লাহ ইয়াহুদী ও খ্রিস্টানদেরকে অভিশাপ (ও ধ্বংস) করুন। কারণ তারা তাদের নবীগণের কবরসমূহকে মসজিদ (সিজদা ও নামাযের স্থান) বানিয়ে নিয়েছে।” (বুখারী, মুসলিম ৫২৯নং, নাসাঈ) “সাবধান! তোমরা কবরগুলোকে মসজিদ বানিয়ে নিয়ো না। এরূপ করতে আমি তোমাদেরকে নিষেধ করছি।” (মুসলিম ৫৩২নং) যেহেতু এ কাজ শির্কের ছিদ্রপথ, সেহেতু তাতে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। আর মহান আল্লাহ বলেছেন, {وَأَنَّ الْمَسَاجِدَ لِلَّهِ فَلَا تَدْعُوا مَعَ اللَّهِ أَحَدًا} (১৮) সورة الجن অর্থাৎ, আর এই যে, মসজিদসমূহ আল্লাহরই জন্য। সুতরাং আল্লাহর সাথে তোমরা অন্য কাউকেও ডেকো না। (জ্বিনঃ ১৮)
প্রশ্নঃ কোন নেক লোকের লাশ মসজিদে দাফন করা কি বৈধ?
উত্তর: কোন নেক, বুযুর্গ বা অলী-আওলিয়ার লাশ মসজিদে দাফন করা বৈধ নয়। যেহেতু এতে তাঁদেরকে নিয়ে বাড়াবাড়ি করা হয় এবং তাঁদের কবর শির্কের অসীলায় পরিণত হয়। আর নবী বলেছেন, "ইয়াহুদী ও খ্রিস্টানদের উপর আল্লাহর অভিশাপ, কারণ তারা তাদের নবীদের কবরকে মসজিদ বানিয়ে নিয়েছে।” (বুখারী ১৩৩০, মুসলিম ৫২৯নং) তিনি আরো বলেছেন, "সাবধান! তোমাদের পূর্ববর্তী লোকেরা তাদের নবী ও নেক লোকেদের কবরকে মসজিদ বানিয়ে নিত। সাবধান! তোমরা কবরগুলোকে মসজিদ বানিয়ে নিয়ো না। এরূপ করতে আমি তোমাদেরকে নিষেধ করছি।” (মুসলিম ৫৩২নং) তাছাড়া মহান আল্লাহ বলেছেন, وَأَنَّ الْمَسَاجِدَ لِلَّهِ فَلَا تَدْعُوا مَعَ اللَّهِ أَحَدًا} (১৮) সورة الجن অর্থাৎ, আর এই যে, মসজিদসমূহ আল্লাহরই জন্য। সুতরাং আল্লাহর সাথে তোমরা অন্য কাউকেও ডেকো না। (জ্বিনঃ ১৮) সুতরাং মসজিদ সর্বপ্রকার শির্কমুক্ত হয়ে কেবল আল্লাহর থাকা উচিত, তাতে অন্য কারো আহবান বা ইবাদত হওয়া আদৌ উচিত নয়। (ইউ)
প্রশ্ন: মহানবী -এর কবর মসজিদের ভিতরে রয়েছে। তাহলে আপনারা মসজিদের ভিতরে লাশ দাফন করতে নিষেধ করেন কেন? মহানবী-এর কবরের উপর ঘর ও গম্বুজ রয়েছে। তাহলে আপনারা তা করতে নিষেধ করেন কেন?
উত্তর: মহানবী-কে মসজিদে দাফন করা হয়নি। আর নিষেধ এই জন্য করা হয় যে, তিনি বলেছেন, "ইয়াহুদী ও খ্রিস্টানদের উপর আল্লাহর অভিশাপ, কারণ তারা তাদের নবীদের কবরকে মসজিদ বানিয়ে নিয়েছে।” (বুখারী ১৩৩০, মুসলিম ৫২৯নং) তিনি আরো বলেছেন, "সাবধান! তোমাদের পূর্ববর্তী লোকেরা তাদের নবী ও নেক লোকেদের কবরকে মসজিদ বানিয়ে নিত। সাবধান! তোমরা কবরগুলোকে মসজিদ বানিয়ে নিয়ো না। এরূপ করতে আমি তোমাদেরকে নিষেধ করছি।” (মুসলিম ৫৩২নং) অনুরূপ তাঁর কবরের উপর ঘর নির্মাণ করা হয়নি। বরং তাঁর কবরই হয়েছিল তাঁর ঘরের ভিতর। যেহেতু নবীরা যেখানে ইন্তিকাল করেন, সেখানেই তাঁদের দাফন করা হয়। আর গম্বুজ বানিয়েছে পরবর্তী কালের শাসকেরা। কবরের উপর ঘর ও গম্বুজ বানাতে নিষেধ করা হয় এই জন্য যে, জাবের বলেন, 'নবী কবর পাকা করতে, তার উপর বসতে এবং তার উপর ইমারত নির্মাণ করতে বারণ করেছেন।' (মুসলিম)
প্রশ্নঃ মুসলিম মারা যাওয়ার পর তার পাশে বসে অনেককে কুরআন পড়তে দেখা যায়। এ সময় কুরআন তিলাঅত কি বিধেয় ও উপকারী?
উত্তর: মৃত ব্যক্তির পাশে বসে কুরআন পাঠ করা একটি বিদআত কাজ। এ তিলাঅত মৃত ব্যক্তির কোন কাজে আসবে না। জীবিতাবস্থায় কুরআন পড়ে, শুনে ও তার উপর আমল ক'রে থাকলে মরণের পর তা উপকারী হবে। শোক-সন্তপ্ত মানুষ কুরআন পড়লে শোকের বোঝা হাল্কা হবে। কিন্তু লাশের পাশে বসে কুরআন তিলাঅত কোন উপকারী নয়। (সাফা)
প্রশ্ন: শুনেছি, কোন মানুষের মৃত্যুর সময় কষ্ট হলে সূরা ইয়াসীন পড়তে হয়। এতে নাকি মরণ আসান হয়ে যায়। এ কথা কি ঠিক?
উত্তর: একটি হাদীসে ঐ শ্রেণীর কথা আছে, কিন্তু সেটি জাল হাদীস। (দ্রঃ সিঃ যয়ীফাহ ৫২১৯নং) সুতরাং তাতে বিশ্বাস রেখে উক্ত আমল শুদ্ধ নয়। অনুরূপ মরণের পর থেকে কবর পর্যন্ত (নামায ছাড়া অন্য স্থলে) মৃতের জন্য কুরআনখানী করা বিদআত। মরণের পূর্বে মরণোন্মুখ ব্যক্তি কুরআন শুনতে চাইলে সে কথা ভিন্ন। (দ্রঃ জানাযা দর্পণ)
প্রশ্নঃ দাফনের পর হাত তুলে জামাআতী দুআ কি বিধেয়?
উত্তর: যে কারণে ফরয নামাযের পর হাত তুলে জামাআতী দুআ বিধেয় নয়, সেই কারণেই দাফনের পর দুআ বিধেয় হলেও হাত তুলে জামাআতী দুআ বিধেয় নয়। সুতরাং বিধেয় হল, প্রত্যেকেই হাত না তুলে নিজে নিজে মৃতের জন্য দুআ করা। 'নবী মাইয়্যেত দাফন করা শেষ হলে তার কবরে দাঁড়িয়ে বলতেন, "তোমরা তোমাদের ভাইয়ের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর এবং (প্রশ্নের জওয়াবে) প্রতিষ্ঠিত থাকার তওফীক চাও। কারণ ওকে এখনই প্রশ্ন করা হবে।” (আহমাদ ৩২২ ১নং, হাকেম ১/৫৭০, বাইহাকী ৪/৫৬)
সুতরাং আল্লাহর রসূল কেবল সকলকে দুআ করতে নির্দেশ দিতেন। ফলে প্রত্যেকে নিজ নিজ মনে দুআ করতেন। তাঁরা জামাআতী দুআ করতেন না। তা করা উত্তম হলে নিশ্চয়ই রসূল দুআর আদেশ না ক'রে নিজে হাত তুলে দুআ করতেন এবং সাহাবাগণও অনুরূপ করতেন। কারণ, ভালো-মন্দের ব্যাপারে আমাদের চেয়ে তাঁরাই সব রকমের জ্ঞান অধিক রাখতেন। আর তা উত্তম হলে আমাদের আগে তাঁরাই ক'রে যেতেন। অথচ তার কোন প্রমাণ নেই। (দেখুন, ফাতাওয়াত তা'যিয়াহ, ইউ ৩১পৃঃ)
অনেকে ফাতহুল বারী (৪/২৭২)তে দাফন করার পর হাত তুলে দুআ করার দলীল খুঁজে পেয়েছেন। নবী তালহা বিন বারা'র কবরে দাঁড়িয়ে দুই হাত তুলে দুআ করেছেন। অথচ সে ঘটনা দাফনের পর নয়। পরন্তু তার সনদও সহীহ নয়। (দ্রঃ সিঃ যয়ীফাহ ৩২৩২নং) আর এ কথা বিদিত যে, যিয়ারতের সময় (একাকী) হাত তুলে দুআ করা বিধেয়।
📄 মহিলা ও পর্দা
প্রশ্ন: কোন গায়র মাহরাম ড্রাইভারের সাথে মহিলার একাকিনী কোথাও যাওয়া বৈধ কি?
উত্তরঃ না। গাড়ি, রিক্সা বা বাইকে এমন কোন পুরুষের সাথে মহিলার একাকিনী যাওয়া বৈধ নয়, যার সাথে কোনও সময় তার বিবাহ বৈধ।
বৈধ নয় বাস, ট্রেন, প্লেন বা জলজাহাজের কোন সফরে যাওয়া, এমনকি কোন ইবাদতের সফরেও নয়।
মহানবী বলেন, (لَا يَحِلُّ لِامْرَأَةٍ تُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ تُسَافِرُ مَسِيرَةً يَوْمٍ إِلَّا مَعَ ذِي مَحْرَمٍ). অর্থাৎ, “আল্লাহ ও শেষ দিবসের প্রতি যে নারী ঈমান রাখে, তার মাহরামের সঙ্গ ছাড়া একাকিনী এক দিন এক রাতের দূরত্ব সফর করা বৈধ নয়।” (বুখারী, মুসলিম ৩৩৩ ১নং) তিনি আরো বলেন, (لَا يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ إِلَّا وَمَعَهَا ذُو مَحْرَمٍ وَلَا تُسَافِرِ الْمَرْأَةُ إِلَّا مَعَ ذِي مَحْرَمٍ). فَقَامَ رَجُلٌ فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّ امْرَأَتِي خَرَجَتْ حَاجَّةً وَإِنِّي اكْتُتِبْتُ فِي غَزْوَةِ كَذَا وَكَذَا. قَالَ: (انْطَلِقْ فَحُجَّ مَعَ امْرَأَتِكَ). অর্থাৎ, “কোন পুরুষ যেন কোন বেগানা নারীর সঙ্গে তার সাথে এগানা পুরুষ ছাড়া অবশ্যই নির্জনতা অবলম্বন না করে। আর মাহরাম ব্যতিরেকে কোন নারী যেন সফর না করে।” এক ব্যক্তি আবেদন করল, 'হে আল্লাহর রসূল! আমার স্ত্রী হজ্জ পালন করতে বের হয়েছে। আর আমি অমুক অমুক যুদ্ধে নাম লিখিয়েছি।' তিনি বললেন, "যাও, তুমি তোমার স্ত্রীর সঙ্গে হজ্জ কর।” (বুখারী, মুসলিম ৩৩৩৬নং)
তিনি আরো বলেছেন, (لا يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ ، فَإِنَّ ثَالِثَهُمَا الشَّيْطَانُ). অর্থাৎ, “যখনই কোন পুরুষ কোন মহিলার সাথে নির্জনতা অবলম্বন করে, তখনই শয়তান তাদের তৃতীয় সাথী (কোটনা) হয়।” (তিরমিযী, সহীহ তিরমিযী ৯৩৪নং)
স্থানীয় কোথাও গেলে সঙ্গে যদি অন্য কোন সাবালক ছেলে, পুরুষ বা মহিলা থাকে, তাহলে যাওয়া চলে। কিন্তু সফর হলে সঙ্গে মাহরাম ছাড়া মোটেই যাওয়া বৈধ নয়; যদিও সাথে অন্য মহিলা বা পুরুষ থাকে। (ইবা, ইউ)
প্রশ্নঃ মহিলাদের জন্য পর্দা করা উত্তম, নাকি তা ফরয?
উত্তর: মহিলাদের জন্য পর্দা করা ফরয। করলে উত্তম, না করলেও চলে---এমন নয়। আর পর্দা বলতে চেহারা ঢাকা পর্দা। মহানবী-এর যুগে পর্দায় মহিলাদের চেহারা ঢাকার ব্যাপারে দুই শ্রেণীর আমল ছিল। পর্দার বিধান অবতীর্ণের পূর্বে মহিলারা চেহারা ঢাকত না। কিন্তু বিধান অবতীর্ণ হওয়ার পরে সকলেই চেহারা ঢেকে পর্দা করতেন। কোন কোন হাদীসে চেহারা না ঢাকার যে বর্ণনা পাওয়া যায়, তা পর্দার বিধান অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বেকার। (ইউ)
প্রশ্নঃ পত্র-পত্রিকা, টিভি বা নেটের ছবিতে মহিলা দেখা কি হারাম?
উত্তর: হ্যাঁ। ছবিতেও গম্য মহিলা দেখা হারাম। যেহেতু তাতেও ফিতনা আছে। আর মহান আল্লাহ বলেছেন, {قُل لِّلْمُؤْمِنِينَ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ ذَلِكَ أَزْكَى لَهُمْ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا يَصْنَعُونَ) (৩০) سورة النور অর্থাৎ, বিশ্বাসীদেরকে বল, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত করে এবং তাদের যৌন অঙ্গকে সাবধানে সংযত রাখে; এটিই তাদের জন্য অধিকতর পবিত্র। ওরা যা করে, নিশ্চয় আল্লাহ সে বিষয়ে অবহিত। (নূরঃ ৩০, ইবা)
প্রশ্ন: বেগানা মহিলা দেখা হারাম। কিন্তু টিভি ইত্যাদির পর্দায় বা ছাপা কাগজে তার ছবিও দেখা কি হারাম?
উত্তর: বেগানা মহিলার প্রতি তাকিয়ে দেখতে নিষেধ যে কারণে করা হয়েছে, সে কারণ তার ছবি দেখাতেও রয়েছে। তাছাড়া মহান আল্লাহ বলেছেন, {قُل لِّلْمُؤْمِنِينَ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ ذَلِكَ أَزْكَى لَهُمْ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا يَصْنَعُونَ) (৩০) سورة النুর অর্থাৎ, বিশ্বাসীদেরকে বল, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত করে এবং তাদের যৌন অঙ্গকে সাবধানে সংযত রাখে; এটিই তাদের জন্য অধিকতর পবিত্র। ওরা যা করে, নিশ্চয় আল্লাহ সে বিষয়ে অবহিত। (নূর: ৩০) এ নির্দেশ জীবিত, মৃত, মূর্তি বা ছবি সর্ব প্রকার মহিলা দেখার ব্যাপারে ব্যাপক। (ইবা)
প্রশ্ন: আপন মামাতো, খালাতো, চাচাতো, ফুফাতো বোন, চাচী, মামী, স্ত্রীর বোন বা ভাবীর সাথে মুসাফাহাহ বৈধ কি?
উত্তর: যার সাথে পুরুষের কোনও কালে বিবাহ বৈধ, তার সাথে মুসাফাহাহ করা অথবা তার চেহারা দেখা বৈধ নয়। কাপড় বা কভারের উপরেও তার হাত ধরে মুসাফাহাহ হারাম। মহিলা বুড়ি অথবা পুরুষ বুড়ো হলেও আপোসের মুসাফাহাহ নাজায়েয। বায়আতের সময় মহানবী কোন মহিলার হাত স্পর্শ করতেন না। (আহমাদ ২৬৪৬৬, বুখারী ৫২৮৮, মুসলিম ১৮৬৬, নাসাঈ ৪১৮১, ইবনে মাজাহ ২৮৭৪) পরন্তু তিনি বলেছেন, (لأَنْ يُطْعَنَ فِي رَأْسِ أَحَدِكُمْ بِمِخْيَطٍ مِنْ حَدِيدٍ خَيْرٌ لَهُ مِنْ أَنْ يَمَسَّ امْرَأَةً لا تَحِلُّ لَهُ). অর্থাৎ, “যে মহিলা (স্পর্শ করা) হালাল নয়, তাকে স্পর্শ করার চেয়ে তোমাদের কারো মাথায় লোহার ছুঁচ গেঁথে যাওয়া অনেক ভালো।” (ত্বাবারানী, সহীহুল জামে' ৫০৪৫নং) বলা বাহুল্য, মহিলার জন্য তার মামাতো, খালাতো, চাচাতো, ফুফাতো ভাই, ফোফা, খালু, স্বামীর ভাই (দেওর), বুনাই বা নন্দাইয়ের সাথে মুসাফাহাহ করা বৈধ নয়।
প্রশ্নঃ মাহরাম মহিলাদের মাথা-চুম্বন করা কি বৈধ?
উত্তরঃ বৈধ, যদি তাতে কাম-বাসনা না থাকে। (ইউ)
প্রশ্নঃ মহিলাদের চাকরি করা কি বৈধ?
উত্তর: বৈধ কর্মক্ষেত্রে মহিলাদের চাকরি করা বৈধ। শর্ত হল, সে কর্মক্ষেত্র কেবল মহিলাদের জন্য খাস হবে। পুরুষ-মহিলা একই স্থলে কর্ম হলে, সে চাকরি বৈধ নয়। যেহেতু তাতে ফিতনা আছে। নারী মোহিনী ও আকর্ষণময়ী। মহানবী বলেন, (مَا تَرَكْتُ بَعْدِى فِتْنَةٌ هِيَ أَضَرُّ عَلَى الرِّجَالِ مِنَ النِّسَاءِ). অর্থাৎ, “আমার গত হওয়ার পরে পুরুষের পক্ষে নারীর চেয়ে অধিক ক্ষতিকর কোন ফিতনা অন্য কিছু ছেড়ে যাচ্ছি না।” (আহমাদ, বুখারী ৫০৯৬, মুসলিম ২৭৪০নং, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ) সুতরাং পরপুরুষ থেকে যথাসম্ভব দূরে থাকতে হবে মহিলাকে। নামাযের কাতারের ব্যাপারে তিনি বলেন, ( خَيْرُ صُفُوفِ الرِّجَالِ أَوَّلُهَا وَشَرُّهَا آخِرُهَا وَخَيْرُ صُفُوفِ النِّسَاءِ آخِرُهَا وَشَرُّهَا أَوَّلُهَا). "পুরুষদের শ্রেষ্ঠ কাতার হল প্রথম কাতার এবং নিকৃষ্ট কাতার হল সর্বশেষ কাতার। আর মহিলাদের শ্রেষ্ঠ কাতার হল সর্বশেষ কাতার এবং নিকৃষ্ট কাতার হল প্রথম কাতার।” (আহমাদ, মুসলিম ৪৪০, সুনান আরবাআহ, মিশকাত ১০৯২নং) বলাই বাহুল্য যে, নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশার মিশ্র প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা ও চাকরি মুসলিম মহিলার জন্য বৈধ নয়। (ইউ)
প্রশ্নঃ চিকিৎসার জন্য কি বেপর্দা হওয়া বৈধ?
উত্তর: মহিলার চিকিৎসার জন্য প্রথমতঃ মহিলা ডাক্তার খোঁজা জরুরী। না পাওয়া গেলে পুরুষ ডাক্তারের কাছে স্বামী বা কোন মাহরামের উপস্থিতিতে চিকিৎসা করানো জরুরী। মহিলা ডাক্তার থাকতে পুরুষ ডাক্তারের কাছে চিকিৎসা করানো হারাম। যেমন পুরুষ ডাক্তারের কাছে প্রয়োজনীয় অঙ্গ ছাড়া অন্য অঙ্গ প্রকাশ করা অবৈধ।
প্রশ্নঃ মহিলা সেন্ট ব্যবহার ক'রে বাড়ির বাইরে যেতে পারে কি?
উত্তর: পর্দার সাথে হলেও মহিলা সেন্ট বা পারফিউম জাতীয় কোন সুগন্ধি ব্যবহার ক'রে বাইরে যেতে পারে না। কারণ তাতে ফিতনা আছে। মহানবী বলেন, (إِذَا اسْتَعْطَرَتِ الْمَرْأَةُ فَمَرَّتْ عَلَى الْقَوْمِ لِيَجِدُوا رِيحَهَا فَهِيَ كَذَا وَكَذَا) يعني زانية. অর্থাৎ, “প্রত্যেক চক্ষুই ব্যভিচারী। আর মহিলা যদি (কোন প্রকার) সুগন্ধ ব্যবহার করে কোন (পুরুষদের) মজলিসের পাশ দিয়ে অতিক্রম করে, তবে সে ব্যভিচারিণী (বেশ্যার মেয়ে)।” (আবু দাউদ, তিরমিযী, নাসাঈ, ইবনে হিব্বান, ইবনে খুযাইমাহ, হাকেম, সহীহুল জামে' ৪৫৪০নং) এমনকি মসজিদে নামায পড়ার উদ্দেশ্যে যেতেও সে সেন্ট ব্যবহার করতে পারে না। মহানবী বলেন, (لَا تَمْنَعُوا إِمَاءَ اللَّهِ مَسَاجِدَ اللهِ وَلَكِنْ لِيَخْرُجْنَ وَهنَّ تَفِلاتٌ). অর্থাৎ, “আল্লাহর বান্দীদেরকে মসজিদে আসতে বারণ করো না, তবে তারা যেন খোশবু ব্যবহার না ক'রে সাদাসিধাভাবে আসে।” (আহমাদ, আবু দাউদ, সঃ জামে' ৭৪৫৭নং) أَيُّمَا امْرَأَةٍ تَطَيَّبَتْ ثُمَّ خَرَجَتْ إِلَى الْمَسْجِدِ لَمْ تُقْبَلْ لَهَا صَلَاةٌ حَتَّى تَغْتَسِلَ). "যে মহিলা সেন্ট ব্যবহার করে মসজিদে যাবে, সেই মহিলার গোসল না করা পর্যন্ত কোন নামায কবুল হবে না।” (ইবনে মাজাহ ৪০০২, সঃজামে' ২৭০৩নং)
প্রশ্নঃ স্বামী যদি পর্দা করতে বাধা দেয়, তাহলে স্ত্রীর করণীয় কী?
উত্তর: স্বামীর জন্য ওয়াজেব স্ত্রীকে পর্দার ব্যবস্থা ক'রে দেওয়া। তাকে বেপর্দার দিকে ঠেলে দেওয়া নয়। বন্ধু-বান্ধবের সামনে দেখা-সাক্ষাৎ করতে নিয়ে নিজের তথা তার সর্বনাশ আনয়ন করা মোটেই বৈধ নয়। মহান আল্লাহ বলেন, {يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنفُسكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا وَقُودُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ عَلَيْهَا مَلَائِكَةٌ غِلَاظٌ شِدَادٌ لَا يَعْصُونَ اللَّهَ مَا أَمَرَهُمْ وَيَفْعَلُونَ مَا يُؤْمَرُونَ} (৬) সورة التحريم অর্থাৎ, হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে রক্ষা কর অগ্নি হতে, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর, যাতে নিয়োজিত আছে নির্মম-হৃদয়, কঠোর-স্বভাব ফিরিস্তাগণ, যারা আল্লাহ যা তাদেরকে আদেশ করেন, তা অমান্য করে না এবং তারা যা করতে আদিষ্ট হয়, তাই করে। (তাহরীমঃ ৬) আর স্ত্রীর জন্য উচিত নয়, বেপর্দা হওয়ার ব্যাপারে স্বামীর আনুগত্য করা। স্বামীর আনুগত্য ওয়াজেব। কিন্তু গোনাহর বিষয়ে তার আনুগত্য বৈধ নয়। মহানবী বলেন, لا طَاعَةَ لِمَخْلُوقٍ فِي مَعْصِيَةِ الْخَالِقِ). অর্থাৎ, স্রষ্টার অবাধ্যতা ক'রে কোন সৃষ্টির বাধ্য হওয়া বৈধ নয়। (আহমাদ, হাকেম, সঃ জামে' ৭৫২০নং) কিন্তু পর্দা করার জন্য যদি কোন হতভাগা স্বামী তার স্ত্রীকে তালাক দিতে চায়, তাহলে তাও গ্রহণ করতে পারে সে। হয়তো-বা মহান আল্লাহ তার জীবনে উত্তম স্বামী মিলিয়ে দেবেন, যাকে নিয়ে সে ইহ-পরকালে সুখী হবে। (ইবা)
প্রশ্ন: ডাক্তারের সাথে নার্সের এবং ম্যানেজারের সাথে মহিলা প্রাইভেট সেক্রেটারির নির্জনতা অবলম্বন বৈধ কি?
উত্তর: মোটেই না। কারণ শরীয়তের নির্দেশ হল, অর্থাৎ, “কোন পুরুষ যেন কোন বেগানা নারীর সঙ্গে তার সাথে এগানা পুরুষ ছাড়া অবশ্যই নির্জনতা অবলম্বন না করে।" (বুখারী ও মুসলিম) আর "যখনই কোন পুরুষ কোন মহিলা সাথে নির্জনতা অবলম্বন করে, তখনই শয়তান তাদের তৃতীয় সাথী (কোটনা) হয়।” (তিরমিযী, সহীহ তিরমিযী ৯৩৪নং) সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহ বলেছেন, زُيِّنَ لِلنَّاسِ حُبُّ الشَّهَوَاتِ مِنَ النِّسَاء ...... (১৪) সورة آل عمران অর্থাৎ, নারী........এর প্রতি আসক্তি মানুষের নিকট লোভনীয় করা হয়েছে। (আলে ইমরানঃ ১৪) আর এই কারণেই কোন মুসলিম মহিলার জন্য এমন চাকরি নেওয়া বৈধ নয়, যেখানে পর-পুরুষের সাথে ওঠাবসা করতে বা নির্জনতায় থাকতে হবে।
প্রশ্নঃ মহিলা কি ড্রাইভিং করতে পারে?
উত্তর: শরীয়তের দু'টি নীতি আছে:- ১। যে বৈধ কাজ অবৈধ কোন কাজে টেনে নিয়ে যায়, তা অবৈধ। ২। মঙ্গল আনয়ন অপেক্ষা অমঙ্গল দূর করা অধিক প্রাধান্যযোগ্য। এই নীতির আলোকে বলা যায় যে, মহিলা ড্রাইভিং করতে পারে না। যেহেতু তারা ড্রাইভিং করলে পর্দায় তাদেরকে চেহারা খুলতে হবে। তেল ভরতে, টায়ার ইত্যাদি পরিবর্তন করতে, চেক-পয়েন্টে, পথে গাড়ি বিকল হলে পুরুষদের সাথে কথা বলতে হবে। নির্জন জায়গায় বিকল হলে তাকে বিপদে পড়তে হবে। তার যৌবন তাকে অজানা সর্বনাশের দিকে নিয়ে যাবে। এ ছাড়া আরো অনেক কারণে মহিলাদের জন্য ড্রাইভিং বৈধ নয়। (ইউ)
প্রশ্ন: অন্ধ শিক্ষকের সামনে ছাত্রীর বেপর্দা হয়ে কি পড়া যায়?
উত্তর: পরিপূর্ণ অন্ধ হলে তার সামনে পর্দার প্রয়োজন নেই। কারণ সে তো দেখতেই পায় না। নবী ফাতেমা বিন্তে ক্বাইসকে অন্ধ সাহাবী আব্দুল্লাহ বিন উম্মে মাকতুমের বাড়িতে ইদ্দত পালন করতে অনুমতি দিয়ে বলেছিলেন, “সে একজন অন্ধ লোক। তুমি তার কাছে নিজের চাদর খুলে রাখবে (সে তোমাকে দেখতে পাবে না)।” (মুসলিম ১৪৮০নং) তাছাড়া নবী-এর পিছনে লুকিয়ে থেকে মা আয়েশা হাবশীদের খেলা দেখেছেন। (বুখারী ৯৫০, মুসলিম ৮৯২নং) পক্ষান্তরে আবু দাউদ ও তিরমিযীর "তোমরা দুজনেও কি অন্ধ?"---এ হাদীস সহীহ নয়। তবে শর্ত হল, মহিলা অন্ধের প্রতি (অনুরূপ কোন পুরুষের প্রতি) কামদৃষ্টিতে তাকাবে না। কারণ মহান আল্লাহ মহিলাকেও নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, {وَقُل لِّلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ} (৩১) সورة النور অর্থাৎ, বিশ্বাসী নারীদেরকে বল, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত করে ও তাদের লজ্জাস্থান রক্ষা করে। (নূর: ৩১)
প্রশ্ন: বিবাহের পূর্বে কি বাগদত্ত স্বামী-স্ত্রীর অবাধ মেলামেশা বা ফোনে কথাবার্তা বলা বৈধ?
উত্তর: যতক্ষণ না বিবাহ-বন্ধন কায়েম হয়েছে, ততক্ষণ আপোসের দেখা-সাক্ষাৎ, অবাধ মেলামেশা বা যৌনজীবনের কথাবার্তা বলা হারাম। অভিভাবকের জন্যও হারাম ছেলেমেয়েকে এমন অবাধ মেলামেশার সুযোগ ক'রে দেওয়া। অবশ্য বিবাহের পূর্বে এক নজর দেখে নেওয়া বৈধ। যেমন আকদের পরে ও বিয়ে সারার আগে স্বামী-স্ত্রীর আপোসে দেখা-সাক্ষাৎ ও অবাধ মেলামেশা করা বা যৌনজীবনের কথাবার্তা বলা, বরং যৌন-মিলন করাও বৈধ।
প্রশ্ন: কোন যুবতীকে বোন বা বন্ধু বানিয়ে কি তার সাথে দেখা-সাক্ষাৎ ও অবাধ মেলামেশা করা বা কথাবার্তা বলা ও পত্রালাপ করা বৈধ?
উত্তর: কোন যুবতীর সাথে কোন যুবকের নিষ্কাম বন্ধুত্ব অসম্ভব। পরন্ত সেই বন্ধুত্বের জেরে দেখা-সাক্ষাৎ ও অবাধ মেলামেশা করা বা কথাবার্তা বলা ও পত্রালাপ করা নিঃসন্দেহে হারাম। তেমনি কোন যুবতীকে বোন বানিয়েও অনুরূপ দেখা-সাক্ষাৎ ও অবাধ মেলামেশা করা বা কথাবার্তা বলা ও পত্রালাপ করা বৈধ নয়। কারণ 'বোন' বলতে বলতেই বান আসে। 'বোন' বলতে বলতেই মনের বন তুফান তোলে। বরং কারো সাথে 'মা' পাতিয়েও অনুরূপ দেখা-সাক্ষাৎ ও অবাধ মেলামেশা ইত্যাদি বৈধ নয়। যেহেতু কাউকে 'বউ' বললেই যেমন সে নিজের 'বউ' হয়ে যায় না। তেমনি কাউকে 'মা' বা 'বোন' বললেই নিজের মাহরাম হয়ে যায় না; যতক্ষণ না তাদের সাথে রক্ত, দুগ্ধ বা বৈবাহিক সম্পর্ক কায়েম হয়েছে।
প্রশ্নঃ মহিলা কি পর-পুরুষের সাথে কথা বলতে পারে?
উত্তর: মহিলা প্রয়োজনে পর-পুরুষের সাথে কথা বলতে পারে। তবে সে কথা যেন স্বাভাবিক হয়; না রুক্ষ ও কর্কষ হয়, আর না মধুময় আকর্ষণীয় হয়। মহান আল্লাহ বলেছেন, {إِنِ اتَّقَيْتُنَّ فَلَا تَخْضَعْنَ بِالْقَوْلِ فَيَطْمَعَ الَّذِي فِي قَلْبِهِ مَرَضٌ وَقُلْنَ قَوْلًا مَّعْرُوفًا} (৩২) অর্থাৎ, হে নবী-পত্নীগণ! তোমরা অন্য নারীদের মত নও; যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় কর তবে পরপুরুষের সাথে কোমল কণ্ঠে এমনভাবে কথা বলো না, যাতে অন্তরে যার ব্যাধি আছে সে প্রলুব্ধ হয়। আর তোমরা সদালাপ কর। (স্বাভাবিকভাবে কথা বল।) (আহমাবঃ ৩২)
প্রশ্নঃ পরপুরুষের সাথে পার্থিব ও দ্বীনী কথা বলাও কি হারাম?
উত্তর: পর্দার আড়াল থেকে পরপুরুষের সাথে পার্থিব ও দ্বীনী কথা বলা হারাম নয়। তবে তাতে শর্ত আছে। মহান আল্লাহ বলেছেন, {إِنِ اتَّقَيْتُنَّ فَلَا تَخْضَعْنَ بِالْقَوْলِ فَيَطْمَعَ الَّذِي فِي قَلْبِهِ مَرَضٌ وَقُلْنَ قَوْلًا مَّعْرُوفًا} (৩২) অর্থাৎ, হে নবী-পত্নীগণ! তোমরা অন্য নারীদের মত নও; যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় কর তবে পরপুরুষের সাথে কোমল কণ্ঠে এমনভাবে কথা বলো না, যাতে অন্তরে যার ব্যাধি আছে সে প্রলুব্ধ হয়। আর তোমরা সদালাপ কর। (স্বাভাবিকভাবে কথা বল।) (আহমাদঃ ৩২) তবে নামাযের জামাআতে ইমামের ভুল সংশোধন করতে মহিলা তসবীহ বলবে না, বরং হাত দ্বারা শব্দ করবে।
প্রশ্নঃ মুসলিম মহিলা কি নার্সের কাজ করতে পারে?
উত্তর: কেবল মহিলা রোগীর ক্ষেত্রে করতে পারে। কোন বেগানা পুরুষের সেবা-শুশ্রূষা করা তার জন্য বৈধ নয়। অনুরূপ পুরুষ নার্স কেবল পুরুষ রোগীর খিদমত করতে পারে। (ইবা)
প্রশ্ন: অনেকে বলে মহিলা সতী হলে, তার মন পবিত্র হলে পর্দার দরকার হয় না।
উত্তর: মহিলা যতই সতী ও পবিত্র মনের হোক, তার জন্য পর্দা ওয়াজেব। কোন মহিলার মন কোন সাহাবী মহিলার মনের থেকে বেশি পবিত্র হতে পারে না। অথচ তাঁদেরকেই পর্দার আদেশ দেওয়া হয়েছিল। পরন্তু কেউ সতী হলে সে নিজেকে পবিত্র রাখতে পারবে ঠিকই, কিন্তু পর-পুরুষের নজর ও মনকে কি পবিত্র রাখতে পারবে? সে নিজের মনকে পবিত্র রেখে নিজ রূপ-সৌন্দর্য দ্বারা পর-পুরুষের মনকে প্রলুব্ধ করলে কি পর্দার উদ্দেশ্য সফল হবে? সুতরাং পর্দা সতী-অসতী সকলের জন্য। বরং অসতী মেয়ে পর্দা করলেও পর্দার ভিতরে তার অসতীত্ব বজায় থাকবে। ঘোমটার ভিতরে খেমটার নাচ দেখিয়ে পরিবেশ নোংরা করবে। আর তার হিসাব তো ভিন্ন আল্লাহর কাছে।
প্রশ্ন: কিছু পুরুষ আছে, যারা বাড়ির সকল দায়িত্ব স্ত্রীর ঘাড়ে চাপিয়ে স্বস্তি নেয়। এমনকি মার্কেট পর্যন্ত স্ত্রী নিজেই করে। এমন পুরুষ সম্বন্ধে শরীয়তের বিধান কি?
উত্তর: কিছু পুরুষ প্রকৃতিগতভাবে 'দাইয়ূস' বা ভেড়া হয়। যারা স্ত্রীর বেপর্দা ও নোংরামিতেও সায় দিয়ে থাকে। তাদের ব্যাপারে রসূল বলেছেন, "মেড়া (স্ত্রী-কন্যার পর্দাহীনতা ও নোংরামির ব্যাপারে ঈর্ষাহীন) ব্যক্তির দিকে আল্লাহ কিয়ামতে তাকিয়েও দেখবেন না।” (নাসাঈ ২৫৬১ নং) আর কিছু পুরুষ ততটা না হলেও স্ত্রীর আঁচল-ধরা হয়। সে 'গাঁড়ল' হয়ে স্ত্রীকে 'মোড়ল' বানায়। এমন অসফল পুরুষ জানতে অথবা অজান্তে নিজেকে প্রভু স্ত্রীর 'বাধ্য গোলাম' বানায়। অথচ মহান আল্লাহ বলেন, {الرِّجَالُ قَوَّامُونَ عَلَى النِّسَاء بِمَا فَضَّلَ اللَّهُ بَعْضَهُمْ عَلَى بَعْضٍ وَبِمَا أَنفَقُوا مِنْ أَمْوَالِهِمْ} অর্থাৎ, পুরুষ নারীর কর্তা। কারণ, আল্লাহ তাদের এককে অপরের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন এবং এ জন্য যে পুরুষ (তাদের জন্য) ধন ব্যয় করে। (নিসাঃ ৩৪) পাশ্চাত্যের সভ্যতা-ঘেঁষা এমন পুরুষরা কোনদিন দ্বীন-দুনিয়ায় সফল হতে পারে না। যেহেতু মহানবী বলেছেন, "সে জাতি কোন দিন সফলকাম হতে পারে না, যে জাতি তাদের শাসন ক্ষমতা একজন নারীর হাতে তুলে দেয়।” (বুখারী ৪৪২৫নং)
প্রশ্ন: সেন্ট বা সেন্ট জাতীয় কোন ক্রিম বা পাউডার লাগিয়ে মহিলা বাড়ির বাইরে যেতে পারে কি?
উত্তর: সেন্ট বা সেন্ট জাতীয় কোন ক্রিম বা পাউডার লাগিয়ে মহিলা বাড়ির বাইরে যেতে পারে না। শরীয়তে এ ব্যাপারে স্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে। নবী বলেছেন, "প্রত্যেক চক্ষুই ব্যভিচারী। আর মহিলা যদি (কোন প্রকার) সুগন্ধ ব্যবহার ক'রে কোন (পুরুষদের) মজলিসের পাশ দিয়ে অতিক্রম করে, তাহলে সে ব্যভিচারিণী (বেশ্যার মেয়ে)।” (আবু দাউদ, তিরমিযী, নাসাঈ, ইবনে হিব্বান, ইবনে খুযাইমাহ, হাকেম, সহীহুল জামে' ৪৫৪০নং) এমন মহিলা সেন্ট লাগিয়ে মসজিদে নামায পড়তে গেলেও তার নামায শুদ্ধ নয়। আবু হুরাইরা কর্তৃক বর্ণিত, একদা চান্তের সময় তিনি মসজিদ থেকে বের হলেন। দেখলেন, একটি মহিলা মসজিদ প্রবেশে উদ্যত। তার দেহ বা লেবাস থেকে উৎকৃষ্ট সুগন্ধির সুবাস ছড়াচ্ছিল। আবু হুরাইরা মহিলাটির উদ্দেশে বললেন, 'আলাইকিস্ সালাম।' মহিলাটি সালামের উত্তর দিল। তিনি তাকে প্রশ্ন করলেন, 'কোথায় যাবে তুমি?' সে বলল, 'মসজিদে।' বললেন, 'কি জন্য এমন সুন্দর সুগন্ধি মেখেছ তুমি?' বলল, 'মসজিদের জন্য।' বললেন, 'আল্লাহর কসম?' বলল, 'আল্লাহর কসম।' পুনরায় বললেন, 'আল্লাহর কসম?' বলল, 'আল্লাহর কসম।' তখন তিনি বললেন, 'তবে শোন, আমাকে আমার প্রিয়তম আবুল কাসেম বলেছেন যে, "সেই মহিলার কোন নামায কবুল হয় না, যে তার স্বামী ছাড়া অন্য কারোর জন্য সুগন্ধি ব্যবহার করে; যতক্ষণ না সে নাপাকীর গোসল করার মত গোসল করে নেয়।” অতএব তুমি ফিরে যাও, গোসল ক'রে সুগন্ধি ধুয়ে ফেল। তারপর ফিরে এসে নামায পড়ো।' (আবু দাউদ, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ, বাইহাকী, সিলসিলাহ সহীহাহ ১০৩ ১নং)
আল্লাহর রসূল বলেছেন, "আল্লাহর বান্দীদেরকে মসজিদে আসতে বারণ করো না, তবে তারা যেন খোশবু ব্যবহার না ক'রে সাদাসিধাভাবে আসে।” (আহমাদ, আবু দাউদ, সহীহুল জামে' ৭৪৫৭নং)
প্রশ্ন: পৃথক গার্লস্ স্কুল-কলেজ না থাকলে মেয়েদেরকে যৌথ-প্রতিষ্ঠানে পড়তে পাঠানো কি বৈধ হবে?
উত্তর: ছেলে-মেয়ের অবাধ মেলামিশার যৌথ শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে মেয়েদেরকে পড়তে পাঠানো বৈধ নয়। মুসলিমদের জন্য ওয়াজেব হল, পৃথক শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থা করা এবং নিজেদের মেয়ে-বোনকে পর-পুরুষের আকর্ষণে আসতে বাধা দেওয়া। (ইউ)
প্রশ্ন: এমন পর্দাহীন দেশ ও পরিবেশেও কি পর্দা করা ওয়াজেব, যেখানে পর্দাটাই মানুষের কাছে দৃষ্টি-আকর্ষক হয়?
উত্তর: এমন দেশ ও পরিবেশ, যেখানে পর্দা নেই অথবা বিরল, যেখানে মহিলারা দিনেও নাইট-ড্রেস পরে থাকে অথবা নগ্নপ্রায় থাকে, সেখানেও মুসলিম মহিলার জন্য পর্দা ওয়াজেব। যদিও চাদর বা বোরকা সেখানকার বেদ্বীন মানুষদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এ হল আল্লাহর বিধান। এ বিধান সর্বত্র বহাল থাকবে।
প্রশ্ন: বাড়ির দাসী কি বাড়িতে পর্দা করবে?
উত্তর: বর্তমানের দাসী যেহেতু ক্রীতদাসী নয়, সেহেতু সাধারণ মুসলিম নারীর মতো তার জন্যও পর্দা ওয়াজেব। বাড়ির লোককে সে পর্দা করবে এবং কোন পুরুষের সাথে নির্জনতা অবলম্বন করবে না। (ইবা) অনুরূপ বাড়ির মহিলারাও বাড়ির দাস, চাকর, ড্রাইভার ইত্যাদিকে পর্দা করবে।
প্রশ্নঃ বাড়ির চাকরকে কি পর্দা করতে হবে? হাউস-বয়, হাউস-ড্রাইভেরকে পর্দা করা তো বড় কঠিন। আমার মা বলে, 'মাথায় কাপড় থাকলে সমস্যা নেই।' তার কথা কি ঠিক?
উত্তর: বাড়ির চাকর ক্রীতদাস নয়। চাকর, ড্রাইভার প্রভৃতি সেবক হলেও তারা পুরুষ। আর যে পুরুষ মাহরাম নয়, তার সামনে মহিলার পর্দা ওয়াজেব। এ ব্যাপারে আপনার মায়ের কথা ঠিক নয়। কারণ মাথায় কাপড় নিলেই পর্দা হয়ে যায় না। চেহারা হল আসল সৌন্দর্যের জিনিস। আর তা খোলা রাখলেই মিষ্টি হাসি ও চোখাচোখির ফলে বিপদ আসন্ন হতে পারে। মহান আল্লাহ বলেছেন, {وَإِذَا سَأَلْتُمُوهُنَّ مَتَاعًا فَاسْأَلُوهُنَّ مِن وَرَاءِ حِجَابٍ ذَلِكُمْ أَطْهَرُ لِقُلُوبِكُمْ وَقُلُوبِهِنَّ} (৫৩) অর্থাৎ, তোমরা তাদের নিকট হতে কিছু চাইলে পর্দার অন্তরাল হতে চাও। এ বিধান তোমাদের এবং তাদের হৃদয়ের জন্য অধিকতর পবিত্র। (আহযাবঃ ৫৩) মহানবী বলেন, “যখনই কোন পুরুষ কোন মহিলার সাথে নির্জনতা অবলম্বন করে, তখনই শয়তান তাদের তৃতীয় সাথী (কোটনা) হয়।” (তিরমিযী, সহীহ তিরমিযী ৯৩৪নং)
প্রশ্নঃ আমি আমাদের বাড়ির হাউস-ড্রাইভারের সাথে একাকিনী কলেজে যাই। কখনও মার্কেট করতেও যাই তাকে নিয়ে। আমার মন তার প্রতি আকৃষ্ট না হলে শরীয়তের দৃষ্টিতে কি কোন সমস্যা আছে তাতে?
উত্তর: যে ড্রাইভার মহিলার মাহরাম নয়, তার সাথে একাকিনী কলেজ বা মার্কেটে যাওয়া কোন মহিলার জন্য বৈধ নয়। যেহেতু মহানবী বলেছেন, "কোন পুরুষ যেন কোন বেগানা নারীর সঙ্গে তার সাথে এগানা পুরুষ ছাড়া অবশ্যই নির্জনতা অবলম্বন না করে। আর মাহরাম ব্যতিরেকে কোন নারী যেন সফর না করে।” (বুখারী ৫২৩৩, মুসলিম ১৩৪১নং)
প্রশ্নঃ আমি আমাদের বাড়ির হাউস-ড্রাইভারের সাথে একাকিনী কলেজে যাই। কখনও মার্কেট করতেও যাই তাকে নিয়ে। নির্জনতা দূর করার জন্য আমি আমার ছোট ভাইকে সাথে নিই। তাহলে কি আমার জন্য তা বৈধ হবে?
উত্তর: আপনার ছোট ভাই যদি সাবালক হয়, তাহলে বেগানা হাউস-ড্রাইভারের সাথে আসা-যাওয়া চলবে। পক্ষান্তরে যদি নাবালক হয়, তাহলে তার আপনার সঙ্গে থাকা-না থাকা উভয়ই সমান।
প্রশ্ন: আমরা আমাদের বাড়ির হাউস-ড্রাইভারের সাথে দুই বোনে কলেজে যাই। কখনও মার্কেট করতেও যাই তাকে নিয়ে। শরীয়তের দৃষ্টিতে কি কোন সমস্যা আছে তাতে?
উত্তর: একাধিক মহিলা হলে বেগানা হাউস-ড্রাইভারের সাথে শহরের ভিতরে আসা- যাওয়া চলবে। তবে নিরাপত্তার শর্তসাপেক্ষে। কিন্তু দূরের সফর বৈধ নয়, যদিও তা ইবাদতের হয়। যেহেতু মহানবী বলেছেন, “কোন পুরুষ যেন কোন বেগানা নারীর সঙ্গে তার সাথে এগানা পুরুষ ছাড়া অবশ্যই নির্জনতা অবলম্বন না করে। আর মাহরাম ব্যতিরেকে কোন নারী যেন সফর না করে।" এক ব্যক্তি আবেদন করল, 'হে আল্লাহর রসূল! আমার স্ত্রী হজ্জ পালন করতে বের হয়েছে। আর আমি অমুক অমুক যুদ্ধে নাম লিখিয়েছি।' তিনি বললেন, "যাও, তুমি তোমার স্ত্রীর সঙ্গে হজ্জ কর।” (বুখারী ও মুসলিম)
প্রশ্ন: বেগানা মহিলার সাথে মুসাফাহা করা হারাম। কিন্তু হাতে কাপড় রেখে সরাসরি স্পর্শ না ক'রে মুসাফাহা বৈধ কি? বুড়িদের সাথে মুসাফাহাতেও সমস্যা আছে কি?
উত্তর: সর্বপ্রকার বেগানা মহিলার সাথে মুসাফাহা অবৈধ। হাতে কোন আবরক রেখেও তা বৈধ নয়। কারণ তাতে ফিতনার ভয় আছেই আছে। মহানবী সকল মহিলার শ্রদ্ধার পাত্র হওয়া সত্ত্বেও তিনি (বেগানা) কারো সাথে মুসাফাহা করতেন না। (আহমাদ ৬/৩৫৭, নাসাঈ ৭/১৪৯, ইবনে মাজাহ ২৮৭৪নং) বায়আতের সময়েও তিনি কোন মহিলার হাত স্পর্শ করতেন না। (বুখারী ৫২৮৮, মুসলিম ১৮৬৬নং) আর তিনি বলেছেন, "যে মহিলা (স্পর্শ করা) হালাল নয়, তাকে স্পর্শ করার চেয়ে তোমাদের কারো মাথায় লোহার ছুঁচ গেঁথে যাওয়া অনেক ভালো।” (ত্বাবারানী, সহীহুল জামে' ৫০৪৫নং)
প্রশ্নঃ স্ত্রীর চাকরি করাতে সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলি কী কী?
উত্তর: পুরুষ-মহলে চাকরি করলে অবাধ মেলামিশার সমস্যা, বেপর্দা হওয়ার সমস্যা, চরিত্র খারাপ হওয়ার সমস্যা, সন্তান পালনের সমস্যা, বাড়িতে আয়ার সাথে স্বামীর নির্জনতাবলম্বনের সমস্যা ইত্যাদি। আর মহিলা-মহলে চাকরি করলে সন্তান পালনের সমস্যা, বাড়িতে আয়ার সাথে স্বামীর নির্জনতাবলম্বনের সমস্যা ইত্যাদি।
প্রশ্ন: অবরোধ প্রথা কি ইসলামে স্বীকৃত?
উত্তর: ইসলামে অবরোধ প্রথা নেই। ইসলামে আছে পর্দার বিধান। মহিলার কর্মস্থল মাঠে-ঘাটে, কল-কারখানায়, অফিসে-ক্লাবে নয়। ইসলাম মহিলাকে বাড়িতে থাকতে নির্দেশ দেয়। কুরআন বলে, {وَقَرْنَ فِي بُيُوتِكُنَّ وَلَا تَبَرَّجْنَ تَبَرُّجَ الْجَاهِلِيَّةِ الْأُولَى} (৩৩) সورة الأحزاب অর্থাৎ, তোমরা স্বগৃহে অবস্থান কর এবং (প্রাক-ইসলামী) জাহেলী যুগের মত নিজেদেরকে প্রদর্শন ক'রে বেড়িয়ো না। (আহযাবঃ ৩৩) হাদীস বলে, وَبُيُوتِهُনَّ خَيْرٌ لَّهنَّ. অর্থাৎ, তাদের ঘরই তাদের জন্য উত্তম। (আবু দাউদ ৫৭৬নং) কিন্তু তার মানে এই নয় যে, তারা ঘরের ভিতরে অর্গলবদ্ধ ও অবরুদ্ধ থাকবে। বরং তারা প্রয়োজনে পর্দার সাথে বের হতে পারবে। তবে তারা (প্রাক-ইসলামী) জাহেলী যুগের মত নিজেদেরকে প্রদর্শন ক'রে বেড়াতে পারবে না। তাদেরকে মসজিদে যেতে বাধা দেওয়া যাবে না। তবে তারা সুগন্ধি বিলিয়ে বের হতে পারবে না। তারা প্রয়োজনে মাঠে- ঘাটে ও বাজারে যেতে পারে। তবে 'ছল করে জল আনতে যাওয়া'র মতো মামুলি প্রয়োজনে বাজারে বাজারে ফিরে বেড়াবে না। মহিলা হেরেমের বন্দিনী নয়। যদিও কোন কোন পরিবেশে বাড়াবাড়ি ক'রে তাকে বন্দিনী ক'রে রাখা হয়। স্বামী স্ত্রীর কর্তা বলে কোন কোন পুরুষ তার উপর অবৈধ কর্তৃত্ব করে।
প্রশ্নঃ যে অন্ধ বেগানা পুরুষ মোটেই দেখতে পায় না, তার সামনেও কি পর্দা জরুরী?
উত্তরঃ দৃষ্টিহীন পুরুষের সামনে পর্দা নেই। যেহেতু পর্দা কেবল পর-পুরুষের দৃষ্টি থেকে বাঁচার জন্যই। তাছাড়া মহানবী ফাতেমা বিন্তে ক্বাইসকে অন্ধ সাহাবী ইবনে উম্মে মাকতূমের বাড়িতে ইদ্দত পালন করতে নির্দেশ দিয়ে বলেছিলেন, “কারণ সে অন্ধ মানুষ। তুমি তার নিকট বহির্বাস খুলে রাখবে, সে তোমাকে দেখতে পাবে না।” (মুসলিম ১৪৮০নং)
প্রশ্ন: বেগানা মহিলার উপর আচমকা দৃষ্টি পড়ে গেলে হাদীসে বলা হয়েছে, “তুমি তোমার দৃষ্টি ফিরিয়ে নাও।” (মুসলিম) মহিলাদের ক্ষেত্রেও কি একই নির্দেশ? তারাও কি বেগানা পুরুষদের দিকে তাকাতে পারবে না?
উত্তরঃ হ্যাঁ, নির্দেশে সবাই সমান। মহান আল্লাহ বলেছেন, {وَقُل لِّلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْফَظْنَ فُرُوجَهُنَّ} (৩১) সورة النور অর্থাৎ, বিশ্বাসী নারীদেরকে বল, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত করে ও তাদের লজ্জাস্থান রক্ষা করে। (নূর: ৩১) তবে কামদৃষ্টি ছাড়া অন্য কোন বৈধ দৃষ্টিতে তাকানো যাবে। মা আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) হাবশীদের খেলা দেখেছেন। নবী তাঁকে আড়াল ক'রে তা দেখিয়েছেন। (বুখারী ৯৫০, মুসলিম ৮৯২নং) টিভি প্রভৃতির পর্দায় বা ছবিতে পুরুষ দেখার ক্ষেত্রেও একই বিধান। কামনজর নিয়ে তাকানো যাবে না। (ইউ)
প্রশ্নঃ যুবক-যুবতীর মাঝে বন্ধুত্ব অতঃপর পোস্ট, এসএমএস, ইমেল প্রভৃতির মাধ্যমে চিঠি লেখালিখি ক'রে হৃদয়ের আদান-প্রদান করা কি বৈধ? যদি তাদের মাঝে বিবাহের ইনগেইজমেন্ট হয়ে থাকে, তাহলে কি কোন সমস্যা আছে?
উত্তর: বেগান যুবক-যুবতীর মাঝে নিষ্কাম বন্ধুত্ব অসম্ভব। কারো দ্বারা বিরলভাবে সম্ভব হলেও শরয়ীতে তা হারাম। তাদের আপোসে পত্রালাপ ও রসালাপ বৈধ নয়। ইনগেইজমেন্ট (বাগদান) হয়ে গেলেও বিবাহ-বন্ধন সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত যেমন তাদের মাঝে দেখা-সাক্ষাৎ হারাম, তেমনি চিঠির মাধ্যমে হৃদয়ের আদান-প্রদানও। যেহেতু তাতে ফিতনার আশঙ্কা রয়েছে। আর ফিতনা ও দাজ্জাল থেকে পাকা মু'মিনকেও দূরে থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। (আহমাদ ৪/৪৩১, ৪৪১, আবু দাউদ ৪৩ ১৯নং)
প্রশ্ন: বিবাহের পূর্বে যুবক-যুবতীর একে অপরকে বুঝে নেওয়ার, পছন্দ ক'রে নেওয়ার, ভালবাসা ক'রে নেওয়ার সুযোগ ইসলামে আছে কি?
উত্তর: বিবাহের পূর্বে বর-কনের একে অপরকে এক নজর দেখে নেওয়ার ও পছন্দ ক'রে নেওয়ার সুযোগ আছে। কিন্তু তারপরে চিঠি, ফোন বা নেটের মাধ্যমে অথবা তাকে সঙ্গে নিয়ে বেড়াতে যাওয়ার মাধ্যমে ভালবাসা ক'রে নেওয়ার সুযোগ ইসলামে নেই। বিবাহ-বন্ধন কায়েম করা বা বিয়ে পড়িয়ে দেওয়ার পর বিবাহ সারার পূর্বে সে সব চলবে। বন্ধনের আগে নয়। (ইউ) বিএ পরীক্ষা দেওয়ার আগে হয়তো টেস্ট-পরীক্ষা আছে। কিন্তু বিয়ে করার আগে কোন টেস্ট-পরীক্ষা নেই।
প্রশ্ন: স্বামীর অনুমতি ছাড়া তার বাসা থেকে বের হওয়া স্ত্রীর জন্য বৈধ নয়। কিন্তু অনেক সময় সে বাড়িতে না থাকলে পাশের বাসা অথবা কাছের মার্কেটে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে। তখন কি তার বিনা অনুমতিতে গেলে গোনাহ হবে?
উত্তর: স্ত্রীর উচিত, এ ক্ষেত্রে স্বামীর নিকট থেকে আম অনুমতি নিয়ে রাখা। অতঃপর শরয়ী আদবের সাথে নিজের বা ছেলেমেয়ের প্রয়োজনে বাইরে কোথাও গেলে কোন ক্ষতি হবে না ইন শাআল্লাহ। (ইজি)
প্রশ্নঃ সত্তর-আশি বছরের বৃদ্ধা যদি বেগানা পুরুষকে পর্দা না করে, তাহলে কোন ক্ষতি আছে কি?
উত্তর: সত্তর-আশি বছরের বৃদ্ধার জন্য পর্দা ফরয থাকে না। সে বেগানা পুরুষকে দেখা দিতে পারে। তবে শর্ত হল, সে যেন সেজেগুজে প্রসাধন ক'রে বের না হয়। মহান আল্লাহ বলেছেন, وَالْقَوَاعِدُ مِنَ النِّسَاءِ اللَّاتِي لَا يَرْجُونَ نِكَاحًا فَلَيْسَ عَلَيْهِنَّ جُنَاحٌ أَن يَضَعْنَ ثِيَابَهُنَّ غَيْرَ مُتَبَرِّجَاتٍ بزينة) (৬০) সورة النور অর্থাৎ, বৃদ্ধ নারী; যারা বিবাহের আশা রাখে না, তাদের জন্য অপরাধ নেই; যদি তারা তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না ক'রে তাদের বহির্বাস খুলে রাখে। (নূর: ৬০) তবে বৃদ্ধার পর্দা করাটাই উত্তম। যেহেতু মহান আল্লাহ বলেছেন, {وَأَن يَسْتَعْফِفْنَ خَيْرٌ لَّهُنَّ وَاللَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ} (৬০) সورة النور অর্থাৎ, তবে এ থেকে তাদের বিরত থাকাই তাদের জন্য উত্তম। আর আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। (নূর: ৬০)
প্রশ্নঃ শরয়ী পর্দা করলে স্বামী তালাক দিতে চায়। সুতরাং আমি কী করতে পারি?
উত্তর: বুঝানোর পরেও যদি না মানে, তাহলে সন্তান হওয়ার আগে আগেই এমন হতভাগা স্বামীর নিকট থেকে তালাক নেওয়াই ভালো। ইন শাআল্লাহ পরবর্তীতে তার চেয়ে ভালো স্বামী জুটে যাবে। মহান আল্লাহ বলেছেন, {وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا) (২) সورة الطلاق অর্থাৎ, যে কেউ আল্লাহকে ভয় করবে, আল্লাহ তার নিষ্কৃতির পথ ক'রে দেবেন। (ত্বালাক্বঃ ২) কোন মুসলিমের জন্য বৈধ নয়, দ্বীন মানার জন্য স্ত্রীকে তালাকের হুমকি দেওয়া। (ইবা) আল্লাহর নবী আমাদেরকে দ্বীনদার মেয়ে বিয়ে করতে বলেছেন। অথচ ভাগ্যের ব্যাপার এমন যে, যে চায়, সে পায় না। পরন্তু সে পায়, যে চায় না। ফাল্লাহুল মুস্তাআন।
📄 বিবাহ ও দাম্পত্য
প্রশ্নঃ বহু-বিবাহ বা একাধিক বিবাহকে অনেক মুসলিমও ঘৃণা করে। যদিও অনেকে তা কামনা করে। ইসলামে বহু-বিবাহের মান কী?
উত্তর: অধিকাংশ মানুষের বহু-বিবাহকে ঘৃণা করার কারণ হচ্ছে সতীনের সংসারের অশান্তির বহিঃপ্রকাশ। পুরুষ তার একাধিক স্ত্রীকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না অথবা ইনসাফ ও ন্যায়পরায়ণতা বজায় রাখতে পারে না বলে যে অশান্তি সৃষ্টি হয়, তা দেখে মানুষ বহু- বিবাহকে ঘৃণা করে। অথচ ইসলামে বিবাহের ব্যাপারে মৌলিক বিধান হল, সামর্থ্য থাকলে পুরুষ একাধিক বিবাহ করবে। তবে বহু স্ত্রীর মাঝে ইনসাফ বজায় না রাখতে পারলে একটি নিয়ে সন্তুষ্ট হবে। মহান আল্লাহ বলেছেন, {وَإِنْ خِفْتُمْ أَلَّا تُقْسِطُوا فِي الْيَتَامَى فَانكِحُواْ مَا طَابَ لَكُم مِّنَ النِّسَاءِ مَثْنَى وَثُلَاثَ وَرُبَاعَ فَإِنْ خِفْتُمْ أَلا تَعْدِلُواْ فَوَاحِدَةً أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ ذَلِكَ أَدْنَى أَلا تَعُولُوا} (৩) সورة النساء
অর্থাৎ, আর তোমরা যদি আশংকা কর যে, পিতৃহীনাদের প্রতি সুবিচার করতে পারবে না, তবে বিবাহ কর (স্বাধীন) নারীদের মধ্যে যাকে তোমাদের ভাল লাগে; দুই, তিন অথবা চার। আর যদি আশংকা কর যে, সুবিচার করতে পারবে না, তবে একজনকে (বিবাহ কর) অথবা তোমাদের অধিকারভুক্ত (ক্রীত অথবা যুদ্ধবন্দিনী) দাসীকে (স্ত্রীরূপে ব্যবহার কর)। এটাই তোমাদের পক্ষপাতিত্ব না করার অধিকতর নিকটবর্তী। (নিসাঃ ৩) পরম্ভ বহু-বিবাহ করা শর্তসাপেক্ষে সুন্নত ও আফযল। যেহেতু আমাদের গুরু মহানবী বহু-বিবাহ করেছেন। ইবনে আব্বাস সাঈদ বিন জুবাইরকে বলেছিলেন, 'বিবাহ কর। কারণ এই উম্মতের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তি, যার সবার চেয়ে বেশি স্ত্রী।' অথবা 'এই উম্মতের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তির সবার চেয়ে বেশি স্ত্রী ছিল।' (আহমদ, বুখারী) উল্লেখ্য যে, একই সাথে চারটির বেশি স্ত্রী রাখা হারাম। যেমন উক্ত আয়াতে উল্লিখিত হয়েছে। সমানাধিকার দিয়ে রাখার ক্ষমতা না হলে একটাই বিবাহ করতে হবে। তাতেও সক্ষম না হলে রোযা পালন ক'রে যেতে হবে। (বুখারী ৫০৬৫, মুসলিম ১৪০০নং)
প্রশ্ন: যাকে রক্ত দেওয়া হয়েছে, তার সাথে কি বিবাহ বৈধ?
উত্তর: কাউকে রক্ত দান করলে তার সাথে রক্তের সম্পর্ক কায়েম হয় না। সুতরাং তার সাথে বিবাহ বৈধ। (লাদা)
প্রশ্নঃ কোন বিবাহিত মহিলাকে বিবাহ করা বৈধ কি?
উত্তর: কোন বিবাহিত স্বামী-ওয়ালী সধবা মহিলাকে বিবাহ করা বৈধ নয়, যতক্ষণ না তার তালাক হয়েছে অথবা তার স্বামী মারা গেছে এবং তার নির্ধারিত ইদ্দত-কাল অতিবাহিত হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেছেন, وَالْمُحْصَنَاتُ مِنَ النِّসَاءِ إِلَّا مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ كِتَابَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ وَأُحِلَّ لَكُم مَّا وَرَاءِ ذَلِكُمْ أَن تَبْتَغُوا بِأَمْوَالِكُم مُّحْصِنِينَ غَيْرَ مُসَافِحِينَ} (২৪) সورة النساء অর্থাৎ, নারীদের মধ্যে তোমাদের অধিকারভুক্ত দাসী ব্যতীত সকল সধবা তোমাদের জন্য নিষিদ্ধ, তোমাদের জন্য এ হল আল্লাহর বিধান। উল্লিখিত নারীগণ ব্যতীত আর সকলকে বিবাহ করা তোমাদের জন্য বৈধ করা হল; এই শর্তে যে, তোমরা তাদেরকে নিজ সম্পদের বিনিময়ে বিবাহের মাধ্যমে গ্রহণ করবে, অবৈধ যৌন-সম্পর্কের মাধ্যমে নয়। (নিসাঃ ২৪)
প্রশ্নঃ একজনের বিবাহিত স্ত্রী হয়ে থাকা অবস্থায় অন্যের সাথে পালিয়ে গিয়ে বিয়ে বৈধ কি?
উত্তর: মহান আল্লাহ যে সকল মহিলাকে বিবাহ করা হারাম বলেছেন, তার মধ্যে একজন হল বিবাহিত মহিলা, যে কোন স্বামীর বিবাহ-বন্ধনে বর্তমানে সংসার করছে এবং তালাক হয়নি। মহান আল্লাহ বলেন, {وَالْمُحْصَنَاتُ مِنَ النِّসَاءِ إِلَّا مَا মَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ كِتَابَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ وَأُحِلَّ لَكُم مَّا وَرَاء ذَلِكُمْ أَن تَبْتَغُوا بِأَمْوَالِكُم مُّحْصِنِينَ غَيْرَ مُসَافِحِينَ} (২৪) সورة النساء অর্থাৎ, নারীদের মধ্যে তোমাদের অধিকারভুক্ত দাসী ব্যতীত সকল সধবা তোমাদের জন্য নিষিদ্ধ, তোমাদের জন্য এ হল আল্লাহর বিধান। উল্লিখিত নারীগণ ব্যতীত আর সকলকে বিবাহ করা তোমাদের জন্য বৈধ করা হল; এই শর্তে যে, তোমরা তাদেরকে নিজ সম্পদের বিনিময়ে বিবাহের মাধ্যমে গ্রহণ করবে, অবৈধ যৌন-সম্পর্কের মাধ্যমে নয়। (নিসাঃ ২৪) বলা বাহুল্য একজনের স্ত্রী অবস্থায় থাকাকালে অন্যের সাথে বিবাহ-বন্ধনই শুদ্ধ হবে না। কিন্তু অন্ধ প্রেম সেই দম্পতিকে চির-ব্যভিচারের নর্দমায় ফেলে রাখে।
প্রশ্ন: এক ব্যক্তি এক কুমারীর সাথে (প্রেম ক'রে) ব্যভিচার করেছে, এখন সে তাকে বিবাহ করতে চায়। এটা কি তার জন্য বৈধ?
উত্তর: যদি বাস্তবে তাই হয়ে থাকে, তাহলে ওদের প্রত্যেকের উপর আল্লাহর নিকট তওবা করা ওয়াজেব; এই নিকৃষ্টতম অপরাধ হতে বিরত হবে, অশ্লীলতায় পড়ার ফলে যা ঘটে গেছে, তার উপর খুব লজ্জিত হবে, এমন নোংরামীর পথে পুনরায় পা না বাড়াতে দৃঢ়সংকল্প হবে এবং অধিক অধিক সৎকাজ করবে। সম্ভবতঃ আল্লাহ উভয়কে ক্ষমা করে দেবেন এবং তাদের পাপসমূহকে পুণ্যে পরিণত করবেন। যেমন তিনি বলেন,
{وَالَّذِينَ لَا يَدْعُوْنَ مَعَ اللَّهِ إِلَهَا آخَرَ وَلَا يَقْتُلُوْنَ النَّفْسَ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا بِالْحَقِّ وَلَا يَزْنُونَ وَمَنْ يَفْعَلْ ذَلِكَ يَلْقَ أَتَاماً ، يُضَاعَفْ لَهُ الْعَذَابُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَيَخْلُدْ فِيْهِ مُهَاناً ، إِلَّا مَنْ تَابَ وَآمَنَ وَعَمِلَ عَمَلاً صَالِحاً فَأُولَئِكَ يُبَدِّلُ اللَّهُ سَيِّئَاتِهِمْ حَسَنَاتٍ وَكَانَ اللهُ غَفُورًا رَّحِيماً ، وَمَنْ تَابَ وَعَمِلَ صَالِحاً فَإِنَّهُ يَتُوْبُ إِلَى اللَّهِ مَتَاباً
অর্থাৎ, যারা আল্লাহর সঙ্গে অন্য উপাস্যকে আহবান করে না, আল্লাহ যাকে যথার্থ কারণ ব্যতিরেকে হত্যা নিষেধ করেছেন, তাকে হত্যা করে না এবং ব্যভিচার করে না। যারা এগুলি করে তারা শাস্তি ভোগ করবে। কিয়ামতের দিন ওদের শাস্তিকে দ্বিগুণ করা হবে এবং সেখানে তারা হীন অবস্থায় স্থায়ী হবে। তবে তারা নয়, যারা তওবা করে, (পূর্ণ) ঈমান এনে সৎকাজ করে, আল্লাহ ওদের পাপরাশীকে পুণ্যে পরিবর্তিত ক'রে দেবেন। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। যে ব্যক্তি তওবা করে ও সৎকাজ করে, সে সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর অভিমুখী হয়। (সূরা ফুরক্বান ৬৮-৭১ আয়াত)
আর ঐ ব্যক্তি যদি ঐ মহিলাকে বিবাহ করতে চায়, তাহলে বিবাহ বন্ধনের পূর্বে এক মাসিক দেখে তাকে (গর্ভবতী কি না তা) পরীক্ষা করে নেবে। যদি (মাসিক না হয় এবং) তার গর্ভ প্রকাশ পায়, তাহলে তার বিবাহ বন্ধন ততক্ষণ পর্যন্ত বৈধ হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না সে সন্তান প্রসব করেছে। যেহেতু রসূল অপরের ফসলকে নিজের পানি দ্বারা সিঞ্চিত (অর্থাৎ গর্ভবতী নারীকে বিবাহ ক'রে সঙ্গম) করতে নিষেধ করেছেন। (আবু দাউদ) (লাদা)
প্রশ্নঃ কোন মুসলিমের সাথে কোন অমুসলিমের বিবাহ কি বৈধ?
উত্তর: কোন মুসলিম মহিলার কোন অমুসলিম পুরুষের সাথে বিবাহ বৈধ নয়। যেহেতু মহান আল্লাহ বলেছেন, {وَلَا تَنكِحُوا الْمُشْرِكَاتِ حَتَّى يُؤْمِنَّ وَلأَمَةٌ مُّؤْمِنَةٌ خَيْرٌ مِّن مُّشْرِكَةٍ وَلَوْ أَعْجَبَتْكُمْ وَلَا تُنكِحُوا الْمُشْرِكِينَ حَتَّى يُؤْمِنُواْ وَلَعَبْدٌ مُّؤْمِنٌ خَيْرٌ مِّن مُّشْرِكٍ وَلَوْ أَعْجَبَكُمْ أُوْلَئِكَ يَدْعُونَ إِلَى النَّارِ وَاللَّهُ يَدْعُوَ إِلَى الْجَنَّةِ وَالْمَغْفيرةِ بِإِذْنِهِ وَيُبَيِّنُ آيَاتِهِ لِلنَّاسِ لَعَلَّهُمْ يَتَذَكَّرُونَ} (২২১) البقرة অর্থাৎ, অংশীবাদী রমণী যে পর্যন্ত না (ইসলাম ধর্মে) বিশ্বাস করে, তোমরা তাদেরকে বিবাহ করো না। অংশীবাদী নারী তোমাদেরকে চমৎকৃত করলেও নিশ্চয় (ইসলাম ধর্মে) বিশ্বাসী ক্রীতদাসী তার থেকেও উত্তম। (ইসলাম ধর্মে) বিশ্বাস না করা পর্যন্ত অংশীবাদী পুরুষের সাথে (তোমাদের কন্যার) বিবাহ দিও না। অংশীবাদী পুরুষ তোমাদেরকে চমৎকৃত করলেও (ইসলাম ধর্মে) বিশ্বাসী ক্রীতদাস তার থেকেও উত্তম। কারণ, ওরা তোমাদের আগুনের দিকে আহবান করে এবং আল্লাহ তোমাদেরকে স্বীয় ইচ্ছায় বেহেশত ও ক্ষমার দিকে আহবান করেন। তিনি মানুষের জন্য স্বীয় নিদর্শনসমূহ সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেন, যাতে তারা তা থেকে উপদেশ গ্রহণ করতে পারে। (বাক্বারাহঃ ২২১)
{يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا جَاءَكُمُ الْمُؤْمِنَاتُ مُهَاجِرَاتٍ فَامْتَحِنُوهُنَّ اللَّهُ أَعْلَمُ بِإِيمَانِهِنَّ فَإِنْ عَلِمْتُمُوهُنَّ مُؤْمِنَاتٍ فَلَا تَرْجِعُوهُنَّ إِلَى الْكُفَّارِ لَا هُنَّ حِلٌّ لَّهُمْ وَلَا هُمْ يَحِلُّونَ لَهُنَّ وَآتُوهُم مَّا أَنفَقُوا وَلَا جُنَاحَ عَلَيْكُمْ অَن تَنكِحُوهُنَّ إِذَا آتَيْتُمُوهُنَّ أُجُورَهُنَّ وَلَا تُمْسِكُوا بِعِصَمِ الْكَوَافِرِ وَاسْأَلُوا مَا أَنفَقْتُمْ وَلْيَسْأَلُوا مَا أَنفَقُوا ذَلِكُمْ حُكْمُ اللَّهِ يَحْكُمُ بَيْنَكُمْ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ} (১০) অর্থাৎ, হে বিশ্বাসিগণ! তোমাদের নিকট বিশ্বাসী নারীরা দেশত্যাগ ক'রে আসলে, তোমরা তাদেরকে পরীক্ষা কর। আল্লাহ তাদের ঈমান (বিশ্বাস) সম্বন্ধে সম্যক অবগত আছেন। যদি তোমরা জানতে পার যে, তারা বিশ্বাসিনী, তবে তাদেরকে অবিশ্বাসীদের নিকট ফেরত পাঠিয়ে দিয়ো না। বিশ্বাসী নারীরা অবিশ্বাসীদের জন্য বৈধ নয় এবং অবিশ্বাসীরা বিশ্বাসী নারীদের জন্য বৈধ নয়। অবিশ্বাসীরা যা ব্যয় করেছে, তা তাদেরকে ফিরিয়ে দাও। অতঃপর তোমরা তাদেরকে বিবাহ করলে তোমাদের কোন অপরাধ হবে না; যদি তোমরা তাদেরকে তাদের মোহর দিয়ে দাও। তোমরা অবিশ্বাসী নারীদের সাথে দাম্পত্য সম্পর্ক বজায় রেখো না। তোমরা যা ব্যয় করেছ, তা ফেরত চেয়ে নাও এবং অবিশ্বাসীরা ফেরত চেয়ে নিক, যা তারা ব্যয় করেছে। এটাই আল্লাহর ফায়সালা। তিনি তোমাদের মধ্যে ফায়সালা করছেন। আর আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়। (মুমতাহিনাহঃ ১০)
বলা বাহুল্য, ইসলাম গ্রহণ করলে তার সাথে মুসলিম মহিলার বিবাহ বৈধ। অনুরূপ কোন মুসলিম পুরুষও কোন অমুসলিম মহিলাকে বিবাহ করতে পারে না। অবশ্য কিছু শর্তের সাথে কেবল ইয়াহুদী-খ্রিস্টান মহিলাকে বিবাহ করতে পারে। মহান আল্লাহ বলেছেন, {وَالْمُحْصَنَاتُ مِنَ الْمُؤْمِنَاتِ وَالْمُحْصَنَاتُ مِنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ مِن قَبْلِكُمْ إِذَا آتَيْتُمُوهُنَّ أُجُورَهُنَّ مُحْصِنِينَ غَيْرَ مُسَافِحِينَ وَلَا مُتَّخِذِي أَخْدَانٍ} (৫) সورة المائدة
অর্থাৎ, বিশ্বাসী সচ্চরিত্রা নারীগণ ও তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেওয়া হয়েছে, তাদের সচ্চরিত্রা নারীগণ (তোমাদের জন্য বৈধ করা হল); যদি তোমরা তাদেরকে মোহর প্রদান ক'রে বিবাহ কর, প্রকাশ্য ব্যভিচার অথবা উপপত্নীরূপে গ্রহণ করার জন্য নয়। (মায়িদাহঃ ৫) কিন্তু কোন মুসলিম মহিলা কোন ইয়াহুদী-খ্রিস্টান পুরুষকে বিবাহ করতে পারে না। কারণ মুসলিমরা তাদের নবীর প্রতি ঈমান রাখে, কিন্তু তারা মুসলিমদের নবীর প্রতি ঈমান রাখে না।
প্রশ্ন: হালালা বিবাহ বৈধ কি?
উত্তর: স্ত্রীকে তিন তালাক দেওয়ার পর লজ্জিত হয়ে ভুল বুঝতে পেরে তাকে ফিরে পেতে 'হালালা' পন্থা অবলম্বন বৈধ নয়। অর্থাৎ, স্ত্রীকে হালাল করার জন্য পরিকল্পিতভাবে কোন বন্ধু বা চাচাতো-মামাতো ভায়ের সাথে বিবাহ দিয়ে এক রাত্রি বাস ক'রে তালাক দিলে পরে ইদ্দতের পর নিজে বিবাহ করা এক প্রকার ধোঁকা এবং ব্যভিচার। যাতে দ্বিতীয় স্বামী এক রাত্রি ব্যভিচার করে এবং প্রথম স্বামী ঐ স্ত্রীকে হালাল মনে করে ফিরে নিয়েও তার সাথে চিরদিন ব্যভিচার করতে থাকে। কারণ, প্রকৃতপক্ষে স্ত্রী ঐভাবে তার জন্য হালাল হয় না। যে ব্যক্তি হালাল করার জন্য ঐরূপ বিবাহ করে, হাদীসের ভাষায় সে হল 'ধার করা ষাঁড়।' (ইরওয়াউল গালীল ৬/৩০৯) এই ব্যক্তি এবং যার জন্য হালাল করা হয়, সে ব্যক্তি (অর্থাৎ প্রথম স্বামী) আল্লাহ ও তদীয় রসূলের অভিশপ্ত। (ঐ ১৮৯৭নং, মিশকাত ৩২৯৬)
প্রশ্নঃ জায়বদলি বিবাহ বৈধ কি?
উত্তর: জায়বদলী বা বিনিময়-বিবাহ বিনা পৃথক মোহরে বৈধ নয়। এ ওর বোন বা বেটিকে এবং ও এর বোন বা বেটীকে বিনিময় ক'রে পাত্রীর বদলে পাত্রীকে মোহর বানিয়ে বিবাহ ইসলামে হারাম। (বুখারী, মুসলিম ইত্যাদি) অবশ্য বহু উলামার নিকট উভয় পাত্রীর পৃথক মোহর হলেও জায়বদলী বিয়ে বৈধ নয়। (যদি তাতে কোন ধোকা-ধাপ্পা দিয়ে নামকে-ওয়াস্তে মোহর বাঁধা হয় তাহলে। (মাজাল্লাতুল বুহূষিল ইসলামিয়্যাহ ৪/৩২৮, ৯/৬৮)
প্রশ্নঃ মুআহ বিবাহ বৈধ কি?
উথর: মুআহ বা সাময়িক বিবাহ ইসলামে বৈধ নয়। কিছুর বিনিময়ে কেবল এক সপ্তাহ বা মাস বা বছর স্ত্রীসঙ্গ গ্রহণ ক'রে বিচ্ছিন্ন হওয়ায় যেহেতু ঐ স্ত্রী ও তার সন্তানের দুর্দিন আসে, তাই ইসলাম এমন বিবাহকে হারাম ঘোষণা করেছে। (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত ৩১৪৭নং)
প্রশ্নঃ তালাকের নিয়তে বিবাহ বৈধ কি?
উত্তর: তালাকের নিয়তে বিবাহ এক প্রকার ধোঁকাবাজি। বিদেশে গিয়ে বা দেশেই বিবাহ-বন্ধনের সময় মনে মনে এই নিয়ত রাখা যে, কিছুদিন সুখ লুটে তালাক দিয়ে দেশে ফিরব বা চম্পট দেব, তবে এমন বিবাহও বৈধ নয়। (এরূপ করলে ব্যভিচার করা হয়।) কারণ, এতেও ঐ স্ত্রী ও তার সন্তানের অসহায় অবস্থা নেমে আসে। (ফাতাওয়াল মারআহ ৪৯পৃঃ) তাতে নারীর মান ও অধিকার খর্ব হয়।
প্রশ্ন: বাল্য-বিবাহ বৈধ কি?
উত্তর: বাল্য-বিবাহ বৈধ। (মুসলিম, মিশকাত ৩১২৯নং) তবে সাবালক হওয়ার পর স্বামী-স্ত্রীর এক অপরকে পছন্দ না হলে তারা বিবাহবন্ধন ছিন্ন করতে পারে। (বুখারী ৫১৩৮-নং, আবু দাউদ, মিশকাত ৩ ১৩৬নং)
প্রশ্নঃ কোন মুসলিম বেশ্যা বা অসতী মহিলাকে বিবাহ করা বৈধ কি?
উত্তর: কোন মুসলিম কোন ব্যভিচারিণী নারীকে বিবাহ করতে পারে না। বরং এ ব্যাপারে ঐরূপ নারী মনোমুগ্ধকর সুন্দরী রূপের ডালি বা ডানা-কাটা পরি হলেও মুসলিম পুরুষের তাতে রুচি হওয়াই উচিত নয়। একান্ত প্রেমের নেশায় নেশাগ্রস্ত হলেও তাকে সহধর্মিনী করা হারাম। এ ব্যাপারে আল্লাহ পাক বলেন,
الزَّانِي لَا يَنكِحُ إِلَّا زَانِيَةً أَوْ مُشْرِكَةً وَالزَّانِيَةُ لَا يَنكِحُهَا إِلَّا زَانٍ أَوْ مُشْرِكٌ وَحُرِّمَ ذَلِكَ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ} (৩) সورة النور
"ব্যভিচারী কেবল ব্যভিচারিণী অথবা অংশীবাদিনীকে এবং ব্যভিচারিণী কেবল ব্যভিচারী অথবা অংশীবাদী পুরুষকে বিবাহ করে থাকে। আর মুমিন পুরুষদের জন্য তা হারাম করা হল।” (নূরঃ ৩)
সুতরাং অসতী নারী মুশরিকের উপযুক্ত; মুসলিমের নয়। কারণ উভয়েই অংশীবাদী; এ পতির প্রেমে উপপতিকে অংশীস্থাপন করে এবং ও করে একক মা'বুদের ইবাদতে অন্য বাতিল মা'বুদকে শরীক। (অবশ্য অসতী হলেও কোন মুশরিকের সাথে কোন মুসলিম নারীর বিবাহ বৈধ নয়।) পক্ষান্তরে ব্যভিচারিণী যদি তওবা করে প্রকৃত মুসলিম নারী হয়, তাহলে এক মাসিক অপেক্ষার পর তবেই তাকে বিবাহ করা বৈধ হতে পারে। গর্ভ হলে গর্ভাবস্থায় বিবাহ- বন্ধন শুদ্ধ নয়। প্রসবের পরই বিবাহ হতে হবে। (ইউঃ ২/৭৮০)
প্রশ্ন: একই সাথে ৫টি বা তারও বেশি মহিলাকে স্ত্রীরূপে রাখা বৈধ কি?
উত্তর: ইসলামী বিধানে প্রয়োজনে ৪টি মহিলাকে একই সময় স্ত্রীরূপে রাখা যায়। তার বেশি নয়। মহান আল্লাহ বলেছেন, وَإِنْ خِفْتُمْ أَلا تُقْسِطُوا فِي الْيَتَامَى فَانكِحُوا مَا طَابَ لَكُم مِّنَ النِّسَاءِ مَثْنَى وَثُلَاثَ وَرُبَاعَ فَإِنْ خِفْتُمْ أَلا تَعْدِلُواْ فَوَاحِدَةً أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ ذَلِكَ أَدْنَى أَلا تَعُولُوا} (৩) সورة النساء অর্থাৎ, আর তোমরা যদি আশংকা কর যে, পিতৃহীনাদের প্রতি সুবিচার করতে পারবে না, তবে বিবাহ কর (স্বাধীন) নারীদের মধ্যে যাকে তোমাদের ভাল লাগে; দুই, তিন অথবা চার। আর যদি আশংকা কর যে, সুবিচার করতে পারবে না, তবে একজনকে (বিবাহ কর) অথবা তোমাদের অধিকারভুক্ত (ক্রীত অথবা যুদ্ধবন্দিনী) দাসীকে (স্ত্রীরূপে ব্যবহার কর)। এটাই তোমাদের পক্ষপাতিত্ব না করার অধিকতর নিকটবর্তী। (নিসাঃ ৩)
প্রশ্ন: নাতিন বা পুতিনকে ঠাট্টাছলে অনেকে 'গিন্নী' বলে। তাহলে তাদের সাথে কি নানা বা দাদার বিবাহ বৈধ?
উত্তর: নাতিন ও পুতিনের কাছে তাদের নানা ও দাদা পিতা স্বরূপ এবং নানা-দাদার কাছে তারা 'কন্যা' বা মেয়ে স্বরূপ। তাদের আপোসে বিবাহ বৈধ নয় এবং ঐ শ্রেণীর ঠাট্টা-উপহাসও বৈধ নয়। মহান আল্লাহ বলেছেন, حُرِّمَتْ عَلَيْكُمْ أُمَّهَاتُكُمْ وَبَنَاتُكُمْ .... (২৩) সورة النساء অর্থাৎ, তোমাদের জন্য হারাম (নিষিদ্ধ) করা হয়েছে তোমাদের মাতাগণ, কন্যাগণ....... (নিসাঃ ২৩)
প্রশ্ন: স্ত্রী থাকতে তার বোনকে অথবা তার বুনঝি বা ভাইঝিকে অথবা তার খালা বা ফুফুকে বিবাহ করা বৈধ কি?
উত্তর: দুই বোনকে সতীন বানানো কুরআনী বিধানে নিষিদ্ধ। মহান আল্লাহ বলেছেন, وَأَن تَجْمَعُوا بَيْنَ الْأُخْتَيْنِ إِلَّا مَا قَدْ سَلَفَ إِنَّ اللَّهَ كَانَ غَفُورًا رَّحِيمًا} (২৩) সورة النساء অর্থাৎ, (হারাম করা হয়েছে) দুই ভগিনীকে একত্রে বিবাহ করা; কিন্তু যা গত হয়ে গেছে, তা (ধর্তব্য নয়)। নিশ্চয় আল্লাহ চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (নিসাঃ ২৩) আর হাদীসের বিধানে ফুফু-ভাইঝি বা খালা-বুনঝিকে সতীন বানাতে নিষেধ করা হয়েছে। (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত ৩১৬০নং)
প্রশ্নঃ কোন কোন সময় এমন হয় যে, জোরপূর্বক বর বা কনেকে বিবাহের কাবিন-নামা বা তালাক-পত্রে সই করিয়ে বিবাহ বা তালাক দেওয়া হয়। কিন্তু জোরপূর্বক বিবাহ বা তালাক কি গণ্য?
উত্তর: জোরপূর্বক বিবাহ বা তালাক গণ্য নয়। ভয় দেখিয়ে বা হুমকির মুখে কাউকে বিয়ে ক'রে সংসার করলে ব্যভিচার করা হয়। অনুরূপ তালাকও। জোরপূর্বক মুসলমান বানানো হলে যেমন কেউ মুসলিম হয়ে যায় না, জোরপূর্বক কুফরী করালে যেমন কেউ কাফের হয় না, তেমনি বিবাহ ও তালাকও। মহান আল্লাহ বলেছেন, মَن كَفَرَ بِاللَّهِ مِن بَعْدِ إِيمَانِهِ إِلَّا مَنْ أُكْرِهَ وَقَلْبُهُ مُطْمَئِنَّ بِالْإِيمَانِ وَلَكِن مَّن شَرَحَ بِالْكُفْرِ صَدْرًا فَعَلَيْهِمْ غَضَبٌ مِّنَ اللَّهِ وَلَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ} (১০৬) সورة النحل অর্থাৎ, কেউ বিশ্বাস করার পরে আল্লাহকে অস্বীকার করলে এবং অবিশ্বাসের জন্য হৃদয় উন্মুক্ত রাখলে তার উপর আপতিত হবে আল্লাহর ক্রোধ এবং তার জন্য রয়েছে মহাশাস্তি; তবে তার জন্য নয়, যাকে অবিশ্বাসে বাধ্য করা হয়েছে, অথচ তার চিত্ত বিশ্বাসে অবিচল। (নাহলঃ ১০৬) রসূল বলেছেন, "নিশ্চয় আল্লাহ আমার উম্মতের ভুল, বিস্মৃত এবং যার উপর তাকে নিরুপায় করা হয়, তার (পাপ) কে অতিক্রম (ক্ষমা) করেন।” (ইবনে মাজাহ ২০৪৫নং)
প্রশ্ন: আমি বিবাহের বয়স-উত্তীর্ণ একজন ধনী ও রোগী মহিলা। আমি একজন সুপুরুষকে বিবাহ ক'রে কেবল স্ত্রীর মর্যাদা পেতে চাই। আমি আমার পৈতৃক বাড়িতেই থাকতে। আমি তার নিকট কোন প্রকার খোরপোশ দাবী করব না। সে কেবল মাঝে মাঝে আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ ক'রে যাবে। তার প্রথম স্ত্রী আছে। সে তার ঐ স্ত্রীর কাছে আমার কথা গোপন রাখবে। সে রাজি, আমি রাজি, আমার অভিভাবকও রাজি। এমন বিবাহে কোন সমস্যা আছে কি?
উত্তর: বিবাহের যে সকল শর্ত আছে, তা পূরণ হলে এমন বিবাহ বৈধ। আপনার অভিভাবক, সাক্ষীস্বরূপ কমপক্ষে দুইজন সৎ ব্যক্তি, দেনমোহর, বিবাহের প্রচার ইত্যাদি। খোরপোশ স্বামীর উপর ফরয, কিন্তু আপনি তা থেকে তাকে মুক্তি দিলে তা বৈধ হবে। আর তার প্রথম স্ত্রী এর খবর না জানলে বা অনুমতি না দিলেও কোন ক্ষতি হবে না। (ইবা)
প্রশ্নঃ অনেক সময় উপযুক্ত পাত্র বিবাহের প্রস্তাব দিলে মেয়ে অথবা মেয়ের বাপ এই বলে রদ ক'রে দেয় যে, পড়া শেষ হলে তবেই বিয়ে হবে। এটা কি বৈধ?
উত্তর: এটা বৈধ নয়। পড়া কোন ওজর নয়। তাছাড়া বিয়ের পরেও পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া যায়। আর মহানবী বলেছেন, "যার দ্বীন ও চরিত্র তোমাদেরকে মুগ্ধ করে, তার সাথে (তোমাদের ছেলে কিংবা মেয়ের) বিবাহ দাও। যদি তা না কর, তবে পৃথিবীতে বড় ফিতনা ও মস্ত ফাসাদ, বিঘ্ন ও অশান্তি সৃষ্টি হবে।” (তিরমিযী ১০৮৫নং, ইবনে মাজাহ ১৯৬৭নং)
প্রশ্নঃ বর ভিন দেশে থাকলে টেলিফোনের মাধ্যমে বিয়ে পড়ালে শুদ্ধ হবে কি?
উত্তর: বিবাহের ব্যাপারটা দু'টি জীবনের চির-বন্ধন। সুতরাং ধোঁকাবাজির আশঙ্কায় টেলিফোন বা নেটের মাধ্যমে বিয়ে পড়ানো বৈধ নয়। অবশ্য বরের ফিরে আসার আগে বিয়ে পড়ানো একান্ত জরুরী হলে যেখানে সে থাকে, সেখানের পরিচিত কাউকে উকীল বা প্রতিনিধি বানিয়ে বিয়ে পড়ানো যায়। (মাজমাউল ফিক্বহিল ইসলামী)
প্রশ্নঃ বিবাহের পর মোহর কখন ওয়াজেব হয়?
উত্তর: স্ত্রীর সঙ্গে সহবাস করলে, স্পর্শ করলে, নির্জনতা অবলম্বন করলে অথবা বিবাহের পর মারা গেলে মোহর ওয়াজেব হয়। কেবল বিয়ে পড়ালেই মোহর ওয়াজেব হয় না। (ইউ)
প্রশ্নঃ নাবালিকার বিবাহ কি শুদ্ধ নয়?
উত্তর: দেশীয় আইনে সাবালিকা হয় ১৮ বছর পূর্ণ হলে। কিন্তু শরীয়তের আইনে সাবালিকা হল সেই মেয়ে, যার স্বাভাবিকভাবে মাসিক শুরু হয়েছে। সে ক্ষেত্রে তার অনুমতিক্রমে বিবাহ দিলে কোন বাধা নেই। অবশ্য মেয়ে না চাইলে জোরপূর্বক বিবাহ শুদ্ধ নয়।
প্রশ্নঃ অনেক বৃদ্ধ অল্প বয়সের মেয়েকে বিয়ে করে, এটা কি শরীয়তে বৈধ?
উত্তর: মেয়ে ও তার অভিভাবক সম্মত থাকলে সে বিবাহ বৈধ।
প্রশ্নঃ নাম করা বংশের ছেলে বা মেয়ের সাথে কি বংশ-পরিচয়হীন ছেলে বা মেয়ের বিবাহ শুদ্ধ নয়?
উত্তর: কোন কোন মানুষ এই ভেদাভেদ-জ্ঞান রেখে উপযুক্ত পাত্র বা পাত্রী হাতছাড়া করে। অথচ তা বৈধ নয়। মহান আল্লাহ বলেছেন, {يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَاكُم مِّن ذَكَرٍ وَأُنثَى وَجَعَلْنَاكُمْ شُعُوبًا وَقَبَائِلَ لِتَعَارَفُوا إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِندَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرٌ} (১৩) সورة الحجرات অর্থাৎ, হে মানুষ! আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী হতে, পরে তোমাদেরকে বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমরা একে অপরেরর সাথে পরিচিত হতে পার। তোমাদের মধ্যে ঐ ব্যক্তিই আল্লাহর নিকট অধিক মর্যাদাসম্পন্ন যে অধিক আল্লাহ-ভীরু। আল্লাহ সবকিছু জানেন, সব কিছুর খবর রাখেন। (১৩) আর মহানবী বলেন, "আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয়তম বান্দা হল সেই যার চরিত্র সুন্দর।” (ত্বাবারানী, সহীহুল জামে' ১৭৯নং) ইবনে আব্বাস বলেন, "আল্লাহর নিকট সবচেয়ে মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি সে, যে সবচেয়ে বেশী পরহেযগার। আর সবচেয়ে উচ্চ বংশীয় লোক সে, যার চরিত্র সবচেয়ে সুন্দর।” (আল-আদাবুল মুফরাদ) নবী বলেন, "যার দ্বীন ও চরিত্র তোমাদেরকে মুগ্ধ করে, তার সাথে (তোমাদের ছেলে কিংবা মেয়ের) বিবাহ দাও। যদি তা না কর (শুধুমাত্র দ্বীন ও চরিত্র দেখে তাদের বিবাহ না দাও বরং দ্বীন বা চরিত্র থাকলেও কেবলমাত্র বংশ, রূপ বা ধন-সম্পত্তির লোভে বিবাহ দাও), তবে পৃথিবীতে বড় ফিতনা ও মস্ত ফাসাদ, বিঘ্ন ও অশান্তি সৃষ্টি হবে।” (তিরমিযী ১০৮৫নং, ইবনে মাজাহ ১৯৬৭নং)
প্রশ্নঃ মেয়ে যাকে বিয়ে করতে রাজি নয়, তার সাথে বাপ জোরপূর্বক বিয়ে দিতে পারে কি?
উত্তর: মেয়ে রাজি না থাকলে কারো সাথে জোর ক'রে বিয়ে দেওয়া শরীয়তসম্মত নয়। যেহেতু মহানবী বলেছেন, "অকুমারীর পরামর্শ বা জবানী অনুমতি না নিয়ে এবং কুমারীর সম্মতি না নিয়ে তাদের বিবাহ দেওয়া যাবে না। আর কুমারীর সম্মতি হল মৌন থাকা। (বুখারী, মুসলিম, সহীহ নাসাঈ ৩০৫৮, সহীহ ইবনে মাজাহ ১৫১৬নং)
প্রশ্নঃ বিয়েতে বাপ রাজি ছিল না। ভাই দাঁড়িয়ে থেকে বিয়ে দিয়েছে। পরবর্তীতে অবশ্য বাপ রাজি হয়ে গেছে। এখন সে বিয়ের মান কী?
উত্তর: বাপ থাকতে ভাই শরয়ী অভিভাবক হতে পারে না। সুতরাং বিবাহ শুদ্ধ নয়। পরবর্তীতে রাজি হলেও পুনরায় বিয়ে পড়াতে হবে। (মুই) অনুরূপ যারা পালিয়ে গিয়ে মেয়ের অভিভাবকের অনুমতি ছাড়াই বিয়ে করে তাদের অবস্থা।
প্রশ্ন: অবৈধ প্রণয়ের মাধ্যমে কোট-ম্যারেজ বা লাভ-ম্যারেজ বৈধ কি? তাতে যদি মেয়ের অভিভাবক সম্মত না থাকে, তাহলে সে বিবাহ বৈধ কি?
উত্তর: বিয়ের পূর্বে কোন যুবক-যুবতীর ভালবাসা করা হারাম। অতঃপর আপোসে অবাধ মেলামিশা ও ব্যভিচার করা তো কাবীরা গোনাহর পর্যায়ভুক্ত। আর ব্যভিচার হল ১০০ চাবুক ও কারা-শাস্তি ভোগার পাপ। পরন্তু বিবাহিত হলে মৃত্যুদন্ড পাওয়ার উপযুক্ত। অতঃপর যে মা-বাপ কত মায়া-মমতার সাথে মানুষ করে, সেই মা-বাপের মাথায় লাথি মেরে চোরের মতো পালিয়ে গিয়ে লাভ-ম্যারেজ বা কোর্ট-ম্যারেজ করে! কিন্তু সে বিয়েতে মেয়ের বাপ রাজি না থাকলে বিয়ে শুদ্ধই হবে না। যেহেতু নবী বলেছেন, "যে নারী তার অভিভাবকের সম্মতি ছাড়াই নিজে নিজে বিবাহ করে, তার বিবাহ বাতিল, বাতিল, বাতিল।” (আহমদ, আবু দাউদ, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ, দারেমী, মিশকাত ৩ ১৩১ নং) এমন চোরদের দাম্পত্য, চির-ব্যভিচারের হয়। যেহেতু তাদের বিবাহ শুদ্ধ নয়।
প্রশ্ন: মা-বাপের পছন্দমতো বিয়ে করা কি ছেলের জন্য জরুরী? মা-বাপ যখন নিজেদের কোন আত্মীয়-বন্ধুর মেয়ের সাথে বিয়ে দিতে চায়, অথবা বেশি পণদাতা ঘরের মেয়ের সাথে বিয়ে দিতে চায়, অথচ ছেলের পছন্দ না হয়, তাহলে কি তাদের বাধ্য হয়ে সেই বিয়ে করা জরুরী? দ্বীনদার মেয়ে যদি বাপ-মা পছন্দ না করে, তাহলে ছেলে কী করতে পারে?
উত্তর: ছেলের যে মেয়ে পছন্দ নয়, তার সাথে জোর ক'রে বিয়ে দেওয়া বাপের জন্য জায়েয নয়। বরং বরের সম্মতি না থাকলে জোর ক'রে বিয়ের বন্ধনই হবে না। সুতরাং ছেলে সে ক্ষেত্রে বাপের কথা মানতে বাধ্য নয়। বাপ-মা নিজেদের স্বার্থ দেখলে এবং বউ পছন্দে দ্বীনদারিকে প্রাধান্য না দিলে ছেলে নিজেই সে বিয়ে করতে পারে। (ইউ) কিন্তু যে মেয়ে মা-বাপের পছন্দ নয়, সে মেয়েকে নিজে নিজে বিয়ে ক'রে ঘরে আনলে যদি তারা ঘরে জায়গা না দেয়, তাহলে অবশ্যই তা বড় অন্যায়। অবশ্য মেয়ে খারাপ বা অসতী হওয়ার ফলে যদি মা-বাপ বাদ সাধে, তাহলে সে কথা ভিন্ন।
প্রশ্নঃ পাত্রী দেখতে গিয়ে পাত্রীর কী কী দেখা যায়? বর ছাড়া কি বরের বাপ-চাচা, ভাই- বন্ধু বা বুনাইও কি পাত্রী দেখতে পারে?
উত্তর: পাত্রী দেখতে গিয়ে বরের জন্য পাত্রীর চেহারা, হাত ও পায়ের পাতা দেখা বৈধ। অনেকে বলেছেন, খোলা মাথাও দেখা যায়। তবে শর্ত হল, পাত্রীকে নিয়ে নির্জনতা অবলম্বন করা বৈধ নয়। বরং তার সঙ্গে তার কোন এগানা পুরুষ (বাপ-ভাই) অবশ্যই থাকবে। বাপ-মায়েরও উচিত নয়, তাদেরকে কোন রুমে একাকী ছেড়ে দেওয়া। মহানবী বলেছেন, "কোন পুরুষ যেন কোন বেগানা নারীর সঙ্গে তার সাথে এগানা পুরুষ ছাড়া অবশ্যই নির্জনতা অবলম্বন না করে।” (বুখারী ও মুসলিম, ইবা) বর ছাড়া ঐ পাত্রীকে অন্য কোন পুরুষ, বরের বাপ-চাচা, ভাই-বন্ধু বা বুনাই দেখতে পারে না। পক্ষান্তরে মেয়ে যদি বেপর্দা হয় অথবা বর যদি পর্দা-বিরোধী হয়, তাহলে আর ফতোয়া কিসের?
প্রশ্ন: অনেক ছেলে আছে, যারা বিয়ের আগে হবু বউকে দেখতে লজ্জা করে এবং বলে, 'মা-বোন দেখলেই যথেষ্ট। তাদের পছন্দ হলে আমারও পছন্দ হয়ে যাবে।' এটা কি ঠিক?
উত্তর: এ হল সেই ছেলেদের কথা, যারা নিজের মা-বোনকে চরম শ্রদ্ধা ও ভক্তি করে। কিন্তু তার ফলে নিজের জীবনের একটি মহাফায়সালার সময়ে তাদের অন্ধভক্ত সাজা ঠিক নয়। বরং অন্ধভক্ত সাজতে হলে তাদের থেকেও বেশি প্রিয় মহানবী -এর সাজতে হয়। তিনি বলেছেন, “যখন তোমাদের কেউ কোন মহিলাকে বিবাহ প্রস্তাব দেয়, তখন যদি প্রস্তাবের জন্যই তাকে দেখে, তবে তা দূষণীয় নয়; যদিও ঐ মহিলা তা জানতে না পারে।” (সিলসিলাহ সহীহাহ ৯৭নং) এক মহিলার সাথে মুগীরাহ বিন শু'বাহর বিয়ের কথা পাকা হল। তিনি তাঁকে বললেন, "তাকে দেখে নাও। কারণ তাতে বেশি আশা করা যায় যে, তোমাদের ভালবাসা চিরস্থায়ী হবে।” (আহমাদ ৪/২৪৪, ২৪৬, তিরমিযী ১০৮৭নং, নাসাঈ ৬/৬৯, ইবনে মাজাহ ৮৬৬নং) সুতরাং এই নির্দেশের উপরে মা-বোনের দেখাকে প্রাধান্য দেওয়া জ্ঞানী যুবকের উচিত নয়। যাতে তাকে পরে পস্তাতে না হয় এবং মা-বোনের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে তাদের প্রতি অভক্তি না চলে আসে। যেহেতু বিয়ের আগে দেখে অপছন্দ হলে তাকে বর্জন করার সুযোগ থাকবে, কিন্তু বিয়ের পরে সে সুযোগ বিরল।
প্রশ্নঃ যাকে বিয়ে করব, তাকে তার অজান্তে লুকিয়ে দেখতে পারি কি?
উত্তর: বিয়ের আগে কনেকে দেখে নেওয়া বিধেয়। যাতে পছন্দ-অপছন্দ করার মতো সুযোগ হাতছাড়া না হয়ে যায়। সুতরাং যদি কেউ বিবাহ করার পাক্কা নিয়তে নিজ পাত্রীকে তার ও তার অভিভাবকের অজান্তে গোপনে থেকে লুকিয়ে দেখে, তাহলে তাও বৈধ। তবে এমন স্থান থেকে লুকিয়ে দেখা বৈধ নয়, যেখানে সে তার একান্ত গোপনীয় অঙ্গ প্রকাশ করতে পারে। অতএব স্কুলের পথে বা কোন আত্মীয়র বাড়িতে থেকেও দেখা যায়। প্রিয় নবী বলেন, “যখন তোমাদের কেউ কোন রমণীকে বিবাহ প্রস্তাব দেয়, তখন যদি প্রস্তাবের জন্যই তাকে দেখে, তবে তা দূষণীয় নয়; যদিও ঐ রমণী তা জানতে না পারে।” (সিঃ সহীহাহ ৯৭নং) সাহাবী জাবের বিন আব্দুল্লাহ বলেন, 'আমি এক তরুণীকে বিবাহের প্রস্তাব দিলে তাকে দেখার জন্য লুকিয়ে থাকতাম। শেষ পর্যন্ত আমি তার সেই সৌন্দর্য দেখলাম, যা আমাকে বিবাহ করতে উৎসাহিত করল। অতঃপর আমি তাকে বিবাহ করলাম। (সিঃ সহীহাহ ৯৯নং)
প্রশ্ন: ইনগেইজমেন্ট বা বাগদানের সময় বরকনের আংটি পরা কি ঠিক?
উত্তর: এটি একটি ইউরোপীয় ও বিজাতীয় প্রথা। মুসলিমদের বৈধ নয়, বিজাতির অনুসরণ করা।
প্রশ্ন: আমাদের বিবাহ ঠিক হয়ে গেছে। আগামী বছর বিবাহ হবে। ততদিন পর্যন্ত আমি কি আমার হবু স্ত্রীকে টেলিফোনের মাধ্যমে দ্বীন শিক্ষা দিতে পারি? কোন সাংসারিক আলাপ-আলোচনা করতে পারি কি?
উত্তর: পাত্রী দেখার পর বিবাহ ঠিক হয়ে গেলে অথবা পাকা কথা বা তার দিন স্থির হয়ে গেলে হবু স্ত্রীর সাথে পর্দার সাথে বা টেলিফোনে অথবা পত্রালাপের মাধ্যমে দ্বীনী বা সাংসারিক কোন আলোচনা করা হারাম নয়। তবে তা হারামের দিকে টেনে নিয়ে যেতে পারে। তবুও যদি সত্যই আপনি হারামের দিকে না যান, অর্থাৎ কোন যৌন বিষয় বা প্রেম-ভালবাসার কথা আলোচনা না করেন---আর তা অবশ্যই কঠিন---তাহলে আপনি তা করতে পারেন। নচেৎ ক্ষেতের পাশে চরতে চরতে যদি ক্ষেতের ফসলও খেতে শুরু করেন, তাহলে অবশ্যই আপনি গোনাহগার হবেন।
প্রশ্নঃ কনের মাসিক অবস্থায় কি বিয়ে পড়ানো যায়?
উত্তর: কনের মাসিক অবস্থায় বিয়ে পড়ানোতে কোন সমস্যা নেই। সমস্যা হল, বাসর রাতে স্বামী-সহবাস করা। যেহেতু তাতে রয়েছে মহাপাপ।
প্রশ্নঃ বিয়ের সময় উলুধ্বনি দেওয়া বৈধ কি?
উত্তর: বিয়ের সময় উলু-উলু খুশীর ধ্বনি বৈধ নয়। এ সময় বর-কনেকে দুআ দিতে হয়। (ইজি)
প্রশ্ন: বিবাহের সময় খাস মহিলা-মহলে কেবল মহিলাদের সামনে মহিলারা নাচতে পারে কি?
উত্তর: মহিলাদের নাচে অনেক প্রকার ফিতনার আশঙ্কা আছে। তাই তা মকরূহ। (ইউ)
প্রশ্নঃ বিবাহের সময় মেয়েরা ঢোল বাজিয়ে গান করতে পারে কি না?
উত্তর: কেবল মহিলাদের সামনে হলে ও কেবল তাদের কানে গেলে 'দুফ' (একমুখো ঢোলক) বাজিয়ে বৈধ গান গাওয়া যায়। (সাফা) তার মানে বেগানা পুরুষদের সামনে বা তাদেরকে শুনিয়ে গাইলে অথবা তার সঙ্গে ঢোল বা অন্য কোন মিউজিক হলে অথবা গান অশ্লীল বা শিকী বা বিদআতী হলে চলবে না।
প্রশ্ন: বিবাহে দুফ বাজিয়ে গান মেয়েরা গাইতে পারে, কিন্তু কতদিন? কোন্ দিনে এই গীত বা গান গাওয়া যায়?
উত্তর: বিবাহের প্রচার স্বরূপ দুফ বাজিয়ে অথবা না বাজিয়ে বৈধ গীত বাসরের রাতে গাওয়া বিধেয়। এ ছাড়া অন্য দিনে গাওয়ার অনুমতি নেই। (ইউ)
প্রশ্নঃ বিবাহের পর মহিলা-মহলে বর-কনেকে 'একঠাই' করা বৈধ কি? উল্লেখ্য যে, সেখানে বরের সাথে তার বুনাই-বন্ধুও থাকে। সেখানে বর-কনেকে নিয়ে চলে নানা লোকাচার, নানা কীর্তি।
উত্তর: বাড়ির ভিতরে বেপর্দা মেয়েদের এমন 'একঠাই' আচার বৈধ নয়। শরীয়তে এমন বেহায়ামির সমর্থন নেই। (ইবা, ইউ, ইজি)
প্রশ্নঃ স্ত্রী কি নির্জনে কেবল স্বামীকে নানা অঙ্গ-ভঙ্গির সাথে নাচ দেখাতে পারে?
উত্তর: তাতে কোন বাধা নেই। (বানী)
প্রশ্ন: গান-বাজনা হারাম। কিন্তু স্বামী-স্ত্রী যদি একে অপরকে শোনায়, তাহলে তাতে ক্ষতি আছে কি?
উত্তর: স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে প্রেমের গান গেয়ে শোনাতে পারে। তবে তাতে শর্ত হলঃ যেন তার সাথে বাজনা না থাকে এবং তারা ছাড়া অন্য কেউ তা শুনতে না পায়। এমনকি তাদের সন্তানরাও তা না শোনে। কারণ এটিও এক প্রকার স্পর্শ ও চুম্বনের মতো মিলনের ভূমিকা।
প্রশ্ন: স্বামীর হাতে আংটি বা স্ত্রীর হাতে চুড়ি রাখা কি জরুরী? তা খুলে ফেললে কি কোন অমঙ্গল বা বিপদের আশঙ্কা আছে?
উত্তর: দাম্পত্যের চিহ্নস্বরূপ হাতে আংটি দেওয়া বৈধ নয়। কারণ তা অমুসলিমদের আচরণ। (ইউ) হাতের সৌন্দর্যের জন্য মহিলাদের চুড়ি পরা বৈধ। তবে তাতে এই বিশ্বাস রাখা অমূলক যে, তা খুলে ফেললে স্বামীর কোন অমঙ্গল ঘটবে।
প্রশ্নঃ আমাদের বিবাহের দিনে আমি কি আমার স্ত্রীকে কোন উপহার দিয়ে স্মৃতিচারণা ক'রে খুশী করতে পারি?
উত্তর: এ দরজা খুলে দেওয়া ঠিক মনে করি না। কারণ ধীরে ধীরে তা বিজাতির 'হানিমুন' ও 'বিবাহ-বার্ষিকী' পালনের প্রথা হিসাবে পালন শুরু হয়ে যাবে। সুতরাং প্রত্যহ না পারলেও অনির্দিষ্ট দিনে কোন উপহার পেশ ক'রে ঐ খুশী করা যায়। নচেৎ মুসলিম দম্পতির তো সর্বদা খোশ থাকার কথা। (ইউ) মহানবী বলেন, “সর্বশ্রেষ্ঠ স্ত্রী হল সে, যার দিকে তার স্বামী তাকালে তাকে খোশ ক'রে দেয়, যাকে কোন আদেশ করলে তা পালন করে এবং সে তার নিজের ব্যাপারে এবং স্বামীর মালের ব্যাপারে কোন অপছন্দনীয় বিরুদ্ধাচরণ করে না।” (আহমাদ, নাসাঈ)
প্রশ্নঃ স্ত্রী কি কুলক্ষণা হতে পারে?
উত্তর: মহানবী বলেছেন, "যদি কোন কিছুতে কুলক্ষণ থাকে, তাহলে তা আছে নারী, বাড়ি ও সওয়ারী (গাড়ি)তে।” (বুখারী) ভাগ্যদোষে এমন কুলক্ষণা স্ত্রী এসে স্বামীর সুখী জীবনকে দুঃখময় ক'রে তুলতে পারে। তবে সে ক্ষেত্রে তকদীরের উপর বিশ্বাস রেখে আল্লাহর উপর পরিপূর্ণ ভরসা রাখতে হয়। আল্লাহর রসূল বলেন, "কিছুকে অশুভ লক্ষণ বলে মনে করা শির্ক। কিছুকে কুপয়া মনে করা শির্ক, কিছুকে কুলক্ষণ মনে করা শির্ক। কিন্তু আমাদের মধ্যে এমন কেউ নেই যার মনে কুধারণা জন্মে না। তবে আল্লাহ (তাঁরই উপর) তাওয়াক্কুল (ভরসার) ফলে তা (আমাদের হৃদয় থেকে) দূর ক'রে দেন।” (আহমাদ ১/৩৮৯, ৪৪০, আবু দাউদ ৩৯ ১০, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ, ইবনে হিব্বান, হাকেম প্রমুখ, সিঃ সহীহাহ ৪৩০নং)
প্রশ্নঃ আমার স্বামী বড় কৃপণ। আমার ব্যাপারে এবং আমাদের ছেলেমেয়ের ব্যাপারে পয়সা খরচ করতে বড় কৃপণতা করে। এখন তার অজান্তে যদি টাকা-পয়সা নিয়ে খরচ করি, তাহলে সেটা কি চুরি হবে?
উত্তর: স্বামী যদি সত্য-সত্যই কৃপণ হয় এবং বাস্তবেই যদি স্ত্রী ও ছেলেমেয়েদের অর্থাভাবে কষ্ট হয়, তাহলে তার অজান্তে তার সম্পদ নিয়ে প্রয়োজনে খরচ করা বৈধ। তবে তা যেন প্রয়োজনের অতিরিক্ত না হয়। অধিক বিলাসিতা করার জন্য না হয়। অথবা অন্য কোন আত্মীয়কে দেওয়ার জন্য না হয়। একদা আবু সুফয়ানের স্ত্রী হিন্দ নবী -কে বললেন যে, 'আবু সুফয়ান একজন কৃপণ লোক। আমি তার সম্পদ থেকে (তার অজান্তে) যা কিছু নিই, তা ছাড়া সে আমার ও আমার সন্তানকে পর্যাপ্ত পরিমাণে খরচ দেয় না।' রাসূলুল্লাহ বললেন, "তোমার ও তোমার সন্তানের প্রয়োজন মোতাবেক খরচ (তার অজান্তে) নিতে পার।” (বুখারী ও মুসলিম)
প্রশ্ন: আমার স্বামী আমাকে ভালবাসে না। কথায় কথায় আমাকে গালাগালি করে, মারধরও করে। ছেলেমেয়ে এবং নিকট ও দূরের মানুষের কাছে আমাকে অপমানিতা করে। কিন্তু সে আবার নামাযও পড়ে। সুখ-শান্তির জন্য আমি এখন কী করতে পারি?
উত্তর: (১) আপনি ধৈর্য ধরুন এবং গালি ও মারের বদলা নেওয়া থেকে দূরে থাকুন। (২) আল্লাহর কাছে নামাযে দুআ করুন, যেন আল্লাহ আপনার স্বামীকে সৎশীল বানায়। (৩) কেন আপনাকে গালাগালি বা মারধর করছে, তার কারণ আবিষ্কার করুন। আপনি বলছেন, 'সে নামাযী।' তাহলে আশা করি, সে পাগল নয় এবং মাদকদ্রব্যও সেবন করে না। তাহলে কেন খামোকা আপনাকে গালাগালি করবে? ভেবে দেখুন, দোষ আপনার মধ্যে নেই তো? আপনার পারিপাট্য, সাজগোজ বা সময়ানুবর্তিতাতে কোন ত্রুটি নেই তো? আপনি কি আপনার স্বামীর সব চাহিদা মিটাতে পেরেছেন? আপনি কি সেই স্ত্রী, যার ব্যাপারে মহানবী বলেছেন, "সর্বশ্রেষ্ঠ স্ত্রী হল সে, যার দিকে তার স্বামী তাকালে তাকে খোশ ক'রে দেয়, যাকে কোন আদেশ করলে তা পালন করে এবং সে তার নিজের ব্যাপারে এবং স্বামীর মালের ব্যাপারে কোন অপছন্দনীয় বিরুদ্ধাচরণ করে না।" (আহমাদ, নাসাঈ) আপনি হয়তো কোন কোন ব্যাপারে তার মতের সাথে মত মিলাতে পারছেন না। আপনি হয়তো চাচ্ছেন, সে আপনার মতে চলুক। অথচ বৈধ বিষয়ে তার আনুগত্য করা আপনার জন্য ওয়াজেব। সে আপনার কর্তা, অথচ আপনি হয়তো তাকে নিজের কর্তা বলে মেনে নিতে পারছেন না। আর তার জন্যই সে আপনার প্রতি খাপ্পা। আপনি হয়তো তার মুখের ওপর মুখ দেন, তার প্রতি মুখ চালান। আর তার জন্যই সে আপনাকে মারধর করে। যাই হোক, কারণ নির্ণয় ক'রে জ্ঞানী মেয়ের মতো তার বাধ্য হয়ে যান। আর এতে নিজেকে ছোট মনে করবেন না। কারণ, স্বামীর মর্যাদার কাছে প্রত্যেক স্ত্রীই ছোট; যদিও স্ত্রী ধনে, বংশে ও শিক্ষায় স্বামীর তুলনায় বড় হয়। এ কথা মেনে নিতে পারলে আপনাদের সুখ-শান্তির বাগানে আবার বসন্ত ফিরে আসবে।
প্রশ্ন: বিবাহের চার মাস পর আমার স্ত্রীর সাথে আমার মায়ের মনোমালিন্য শুরু হয়ে গেল। এক সময় অশান্তি ক'রে সে মায়ের ঘর চলে গেল। অতঃপর পুনরায় সে আমাদের বাড়ি আসতে চাইল না। সে বলল, 'যদি আমাকে নিয়ে আপনি অন্য কোথাও অথবা আমার বাপের বাড়িতে থাকতে পারেন, তাহলে সংসার করব। নচেৎ না। এখন আমি কী করি? আমার মা-বাপ বউয়ের খিদমত চায়। কিন্তু আমরা অশান্তি চাই না। এখন শান্তি বজায় রাখার জন্য যদি অন্যত্র কোথাও মা-বাপকে ছেড়ে ভাড়া-বাড়িতে বাস করি, তাহলে কি আমি গোনাহগার হব? নাকি আমি স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দেব?
উত্তর: সংসারের এটি একটি মহাসমস্যা। মা ও বউয়ের খেয়াল-খুশির মাঝে পুরুষ দিশেহারা হয়ে যায়। মায়ের মন রক্ষা করা জরুরী। আবার বিনা পর্যাপ্ত কারণে তালাক দেওয়াও হারাম। সুতরাং শেষ পথ এটাই যে, আপনি বউ নিয়ে অন্যত্র বাস করুন, মায়ের সংসার থেকে পৃথক হয়ে যান। তবে মা-বাপের সুবিধা-অসুবিধার কথা ভুলবেন না। আপনার দ্বারা যতটা সম্ভব, আপনি ততটা তাদের খিদমত করবেন। পারলে তাদের জন্য দাসী রেখে নেবেন। (ইউ)
প্রশ্ন: বাপ-মায়ের আদেশ পালন করা ওয়াজেব। কিন্তু তারা যদি বউ তালাক দিতে বলে, তাহলে করণীয় কী?
উত্তর: বাপ-মায়ের আদেশ পালন করা ওয়াজেব। কিন্তু তারা যদি অন্যায় আদেশ করে, তাহলে তা পালন করা হারাম। সুতরাং বউ তালাক দিতে বললে কারণ জানতে হবে। কারণ যদি সঠিক হয় এবং সে কারণে বউ তালাক দেওয়া ওয়াজেব হয়, তাহলে বুঝানোর পর তালাক দেবে। পক্ষান্তরে কারণ যদি সঠিক না হয়, কেবল বউয়ের প্রতি ঈর্ষাবশতঃ হয়, তাহলে তালাক দেওয়া বৈধ নয়। পুরুষকে পরীক্ষা দিতে হবে সংসারের এই মা-বউয়ের দ্বন্দ্বে। শরীয়তই হবে সঠিক ফায়সালাদাতা। কোন আবেগ বা প্রেম, কোন ঈর্ষা বা হিংসা অথবা কোন পার্থিব লোভ-লালসা যেন পুরুষকে কারো প্রতি অন্যায়াচরণে বাধ্য না করে।
প্রশ্নঃ সন্তান বেশি হলে মানুষ গরীব হয়ে যাবে। এ কথা বলা কি ঠিক?
উত্তর: অবশ্যই ঠিক নয়। কারণ রুযীর মালিক আল্লাহ। কেউ কারো রুযীর দায়িত্ব নিতে পারে না। মহান আল্লাহ বলেন, وَكَأَيِّنْ مِنْ دَابَّةٍ لَا تَحْمِلُ رِزْقَهَا اللهُ يَرْزُقُهَا وَإِيَّاكُمْ وَهُوَ السَّمِيعُ العَلِيمُ العنكبوت : ٦٠)
অর্থাৎ, এমন বহু জীব-জন্তু আছে, যারা নিজেদের রুযী বহন করে না; আল্লাহই ওদেরকে এবং তোমাদেরকে রুযী দান করেন। আর তিনিই সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞাতা। (আনকাবুতঃ ৬০)
{وَلَا تَقْتُلُوا أَوْلَادَكُم مِّنْ إِمْلَاقٍ نَّحْنُ نَرْزُقُكُمْ وَإِيَّاهُمْ} (১৫১) সورة الأنعام
অর্থাৎ, দারিদ্রের কারণে তোমরা তোমাদের সন্তানদেরকে হত্যা করো না। আমিই তোমাদেরকে ও তাদেরকে জীবিকা দিয়ে থাকি। (আআমঃ ১৫১)
{وَلَا تَقْتُلُوا أَوْلَادَكُمْ خَشْيَةَ إِمْلَاقٍ نَّحْنُ نَرْزُقُهُمْ وَإِيَّاكُم إِنَّ قَتْلَهُمْ كَانَ خِطْبًا كبيরা) (৩১)
অর্থাৎ, তোমাদের সন্তানদেরকে তোমরা দারিদ্র্য-ভয়ে হত্যা করো না, আমিই তাদেরকে জীবনোপকরণ দিয়ে থাকি এবং তোমাদেরকেও। নিশ্চয় তাদেরকে হত্যা করা মহাপাপ। (বানী ইস্রাঈল: ৩১)
প্রশ্ন: গর্ভ-নিরোধক ট্যাবলেট ব্যবহার বৈধ কি?
উত্তর: মুসলিমের উচিত, সংখ্যা-বৃদ্ধিতে শরীয়তের উদ্দেশ্যকে সফল করা। তবুও যদি অতি প্রয়োজন পড়ে, যেমন মহিলা যদি রোগা হয়, প্রত্যেক বছর সন্তান হওয়ার ফলে অতি দুর্বল হয়ে পড়ে, অথবা অন্য কোন সমস্যা থাকে, তাহলে ট্যাবলেট ব্যবহার ক'রে সাময়িকভাবে সন্তান বন্ধ রাখতে পারে। অবশ্য সেই সাথে স্বামীর অনুমতি ও ডাক্তারের পরামর্শও জরুরী। পক্ষান্তরে জীবনহানির আশঙ্কা ছাড়া চিরতরের জন্য গর্ভধারণের পথ বন্ধ ক'রে দেওয়া বৈধ নয়। (ইউ)
প্রশ্ন: টেস্ট-টিউবের মাধ্যমে গর্ভ-সঞ্চার করা কি বৈধ?
উত্তর: বীর্য স্বামীর হলেও তা টেস্ট-টিউবের মধ্যে রেখে স্ত্রী গর্ভে রাখতে গিয়ে তার লজ্জাস্থান খোলা যায়, তা স্পর্শ করা হয় ইত্যাদি। আমার মতে বলে স্বামী-স্ত্রীর উচিত, এ কাজ না ক'রে আল্লাহর তকদীরে সন্তুষ্ট থাকা। (ইজি)
প্রশ্নঃ কৃত্রিমভাবে সন্তান নেওয়ার বিধান কী?
কৃত্রিম উপায়ে সন্তান প্রজনন মূলতঃ দুইভাবে হয়ে থাকে:
(ক) আভ্যন্তরিক প্রজনন। আর তা এইভাবে হয় যে, পুরুষের বীর্য সিরিঞ্জের সাহায্যে নারীর গর্ভাশয়ে বিশেষ পদ্ধতিতে রাখা হয়।
(খ) বাহ্যিক প্রজনন। আর তা এইভাবে হয় যে, নারী-পুরুষের বীর্য নির্দিষ্ট টেস্ট- টিউবে নিয়ে মিলন ঘটানোর পর যথাসময়ে নারীর গর্ভাশয়ে রাখা হয়।
উক্ত দুই পদ্ধতির প্রজনন অনুসারে ছয় ভাবে সন্তান নেওয়া হয়ে থাকে। ইসলামী শরীয়তে তার কিছু বৈধ, কিছু অবৈধ।
প্রথমতঃ আভ্যন্তরিক প্রজনন:-
১। সঙ্গমের সময় স্বামীর বীর্য স্ত্রীর গর্ভাশয়ে কারণবশতঃ না পৌঁছলে তা নিয়ে সিরিঞ্জের সাহায্যে স্ত্রীর গর্ভাশয়ে স্থাপন ক'রে সন্তান নেওয়া।
২। স্বামীর বীর্যে শুক্রকীট না থাকলে অন্য কোন পুরুষের বীর্য নিয়ে সিরিঞ্জের সাহায্যে স্ত্রীর গর্ভাশয়ে স্থাপন ক'রে সন্তান নেওয়া।
দ্বিতীয়তঃ বাহ্যিক প্রজনন:-
৩। স্বামী-স্ত্রীর বীর্য নিয়ে টেস্ট-টিউবে রেখে মিলন ঘটিয়ে যথাসময়ে তা স্ত্রীর গর্ভাশয়ে স্থাপন ক'রে সন্তান নেওয়া।
৪। স্ত্রীর গর্ভাশয় সুস্থ, কিন্তু তার ডিম্বাণু না থাকার ফলে স্বামীর বীর্য এবং অন্য কোন মহিলার ডিম্বাণু নিয়ে প্রজনন টেস্ট-টিউবে মিলন ঘটিয়ে স্ত্রীর গর্ভাশয়ে স্থাপন ক'রে সন্তান নেওয়া।
৫। স্বামীর বীর্যে শুক্রকীট না থাকলে এবং স্ত্রীর গর্ভাশয় সুস্থ, কিন্তু তার ডিম্বাণু না থাকার ফলে অন্য পুরুষের বীর্য এবং অন্য কোন মহিলার ডিম্বাণু নিয়ে প্রজনন টেস্ট- টিউবে মিলন ঘটিয়ে স্ত্রীর গর্ভাশয়ে স্থাপন ক'রে সন্তান নেওয়া।
৬। স্ত্রীর গর্ভাশয় সন্তান ধারণে অক্ষম হলে অথবা গর্ভ-ধারণের কষ্ট বরণ না করতে চাইলে স্বামী-স্ত্রীর বীর্য নিয়ে টেস্ট-টিউবে রেখে মিলন ঘটিয়ে যথাসময়ে তা অন্য কোন মহিলার গর্ভাশয়ে স্থাপন ক'রে সন্তান নেওয়া।
সরাসরি ব্যভিচার ছাড়া উক্ত ছয় উপায়ে সন্তান গ্রহণ প্রচলিত রয়েছে বিশ্বের বহু দেশে এবং সে জন্য বীর্য-ব্যাঙ্কও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে এই শ্রেণীর সন্তান নেওয়ার বিধান নিম্নরূপঃ-
কেবল বিলাসিতার জন্য কৃত্রিম পদ্ধতিতে সন্তান নেওয়া ইসলামে বৈধ হতে পারে না। কারণ, পর্যাপ্ত কারণ ব্যতিরেকে স্বামী ছাড়া অন্য কোন পুরুষের নিকট স্ত্রীর লজ্জাস্থান প্রকাশ করা বৈধ নয়। তাছাড়া চিকিৎসার জন্য প্রথমতঃ মুসলিম মহিলা ডাক্তারের সাহায্য গ্রহণ করা ওয়াজেব। তা না পাওয়া গেলে অমুসলিম মহিলা ডাক্তার। তা না পাওয়া গেলে মুসলিম পুরুষ ডাক্তার। পরিশেষে তাও না পাওয়া গেলে অমুসলিম পুরুষ ডাক্তারের কাছে চিকিৎসা করানো বৈধ। তাতেও কোন পুরুষ ডাক্তারের সাথে কোন রুমে একাকিনী চিকিৎসা করানো বৈধ নয়। জরুরী হল, সেই রুমে তার স্বামী অথবা অন্য কোন মহিলা থাকবে।
বন্ধ্যত্ব দূরীকরণের উদ্দেশ্যে মুসলিম মহিলার ডাক্তারের কাছে যাওয়া বৈধ। তবে সন্তান গ্রহণের ছয়টি পদ্ধতির মধ্যে কেবল প্রথম ও তৃতীয় পদ্ধতি ব্যবহার করা বৈধ। আর উক্ত উভয় পদ্ধতিতে যে সন্তান হবে, তা হবে বৈধ সন্তান।
কিন্তু অবশিষ্ট ২, ৪, ৫ ও ৬নং পদ্ধতিতে প্রজন্মিত সন্তান বৈধ সন্তান হবে না। যেহেতু তাতে বংশে অন্য বংশের অবৈধ সংমিশ্রণ ঘটে।
পরিশেষে সতর্কতার বিষয় এই যে, একান্ত প্রয়োজন ছাড়া যেন মুসলিম উক্ত দু'টি বৈধ পদ্ধতিও অবলম্বন না করে, কারণ তাতেও টেস্ট-টিউবের মাধ্যমে অজ্ঞাত-পরিচয় শুক্রাণুর অনুপ্রবেশ ঘটার আশঙ্কা থাকে। (মাজলিসুল মাজমাইল ফিক্বহী)
প্রশ্ন: অনেক পুরুষ আছে, যাদের কন্যা-সন্তান হলে স্ত্রীকে দোষ দেয়, তাকে ঘৃণা করতে শুরু করে। আর দ্বিতীয় ও তৃতীয় হলে তো রেহাই নেই। এমন পুরুষদের ব্যাপারে শরীয়তের বিধান কী?
উত্তর: নিঃসন্দেহে এ আচরণ বর্তমানের পণ ও যৌতুক প্রথার করাল গ্রাসের শিকার হওয়ার আশঙ্কায় দুর্বল ঈমানের মানুষ দ্বারা ঘটে থাকে। আর যে স্বামী কন্যা প্রসব করার জন্য স্ত্রীকে দায়ী করে, তার জ্ঞানও দুর্বল। কারণ, বীজ তো তারই। জমির দোষ কী? তাছাড়া কন্যা তার জন্য ভাল হবে না মন্দ, তাই বা সে জানল কী ক'রে? সমাজে দেখা যায় যে, কত কন্যার পিতামাতা সুখী এবং কত পুত্রের পিতামাতা চিরদুঃখী। তাহলে আল্লাহর উপর ভরসা রেখে তাঁর দেওয়া ভাগ ও ভাগ্য নিয়ে কি সন্তুষ্ট হওয়া উচিত নয়? পরন্তু কন্যা-সন্তান অপছন্দ করা জাহেলী যুগের আচরণ। মহান আল্লাহ বলেছেন, {وَإِذَا بُشِّرَ أَحدُهُمْ بِالْأُنثَى ظَلَّ وَجْهُهُ مُسْوَدًا وَهو كَظِيمٌ (৫৮) يَتَوَارَى مِنَ الْقَوْمِ مِن سُوءِ مَا بُشِّرَ بِهِ أَيُمْسِكُهُ عَلَى هُونٍ أَمْ يَدُسُّهُ فِي التَّرَابِ أَلَا سَاءِ مَا يَحْكُمُونَ} (৫৯) সورة النحل
অর্থাৎ, তাকে যে সংবাদ দেওয়া হয়, তার গ্লানি হেতু সে নিজ সম্প্রদায় হতে আত্মগোপন করে; সে চিন্তা করে যে, হীনতা সত্ত্বেও সে তাকে রেখে দেবে, না মাটিতে পুঁতে দেবে। সাবধান! তারা যা সিদ্ধান্ত করে, তা কতই না নিকৃষ্ট। (নাহল: ৫৯)
প্রশ্নঃ কোন লম্পট যদি শালী বা শাশুড়ীর সাথে অথবা পুত্রবধূর সাথে ব্যভিচার করে, তাহলে তার বিবাহিত স্ত্রী হারাম হয়ে যাবে কি?
উত্তর: এতে কোন সন্দেহ নেই যে, কোন মাহরামের সাথে ব্যভিচার করা সবচেয়ে বড় ব্যভিচার। কিন্তু কোন অবৈধ সম্পর্ক বৈধ সম্পর্ককে ছিন্ন করতে পারে না। অবৈধভাবে মিলন ঘটালেই সে তার স্ত্রী হয়ে যায় না এবং তার মা বা মেয়ে স্ত্রীর বন্ধন থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে উন্মুক্ত হয়ে যায় না।
মহান আল্লাহ কাকে কাকে বিবাহ হারাম---সে কথা বলার পর বলেছেন,
{وَأُحِلَّ لَكُم مَّا وَرَاءِ ذَلِكُمْ أَن تَبْتَغُوا بِأَمْوَالِكُم مُّحْصِنِينَ غَيْرَ مُسَافِحِينَ} (২৪) النساء
অর্থাৎ, অর্থাৎ, উল্লিখিত নারীগণ ব্যতীত আর সকলকে বিবাহ করা তোমাদের জন্য বৈধ করা হল; এই শর্তে যে, তোমরা তাদেরকে নিজ সম্পদের বিনিময়ে বিবাহের মাধ্যমে গ্রহণ করবে, অবৈধ যৌন-সম্পর্কের মাধ্যমে নয়। (নিসাঃ ২৪)
সেখানে বৈধ মিলনের ফলে অনেক মহিলা হারাম হওয়ার কথা বলা হয়েছে, কিন্তু অবৈধ মিলন ব্যভিচারের ফলে কেউ হারাম হবে কি না, সে কথা বলেননি। সুতরাং বুঝা যায় যে, উক্ত মহিলাগণ ছাড়া অন্য কেউ হারাম নয়। হাদীসে কিছু মহিলার হারাম হওয়ার কথা বলা হলেও ব্যভিচারের ফলে হারাম হওয়ার কথা বলা হয়নি। অথচ জাহেলী যুগে ব্যভিচারের প্রকোপ খুব বেশি ছিল। সুতরাং বুঝা যায় যে, কোন অপবিত্র সম্পর্ক কোন পবিত্র সম্পর্কের বন্ধনকে ধ্বংস করতে পারে না। (দ্রঃ ৭/৯০, আযওয়াউল বায়ান ৬/৩৪১, মুমতে' ৫/২০৩)
প্রশ্ন: একজন স্বামী তার স্ত্রীকে 'মা' বলে 'যিহার' করেছে। অতঃপর তাকে তালাক দিয়েছে। তাকে কি যিহারের কাফফারা আদায় করতে হবে?
উত্তর: তালাক দেওয়ার পর যিহারের কাফফারা আদায় করতে হবে না। যেহেতু সে আর স্ত্রীকে স্পর্শ করবে না। মহান আল্লাহ বলেন,
وَالَّذِينَ يُظَاهِرُونَ مِن نِّسَائِهِمْ ثُمَّ يَعُودُونَ لِمَا قَالُوا فَتَحْرِيرُ رَقَبَةٍ মِّقَبْلِ أَن يَتَمَاسَّا } (৩)
অর্থাৎ, যারা নিজেদের স্ত্রীদের সাথে 'যিহার' করে এবং পরে তাদের উক্তি প্রত্যাহার করে, তাহলে (এর প্রায়শ্চিত্ত) একে অপরকে স্পর্শ করার পূর্বে একটি দাসের মুক্তিদান। এর দ্বারা তোমাদেরকে সদুপদেশ দেওয়া হচ্ছে। আর তোমরা যা কর, আল্লাহ তার খবর রাখেন। (মুজাদালাহঃ ৩)
সুতরাং স্ত্রীকে স্পর্শ না করতে হলে, কাফফারা দেওয়ার প্রয়োজন নেই।
প্রশ্ন: কোন হতভাগা স্বামী স্ত্রীকে 'তুই আমার মা বা মায়ের মতো' বললে 'যিহার' হয়। কিন্তু কোন হতভাগী স্ত্রী যদি স্বামীকে 'তুমি আমার বাপ বা বাপের মতো' বলে, তাহলে তার বিধান কী?
উত্তর: এ ক্ষেত্রে মহিলার পক্ষ থেকে 'যিহার' হবে না। কেবল মহিলাকে কসমের কাফফারা আদায় করতে হবে। (ইবা)
প্রশ্ন: যদি কোন স্ত্রী তার স্বামীকে বলে, 'আমি তোমার নিকট থেকে আল্লাহর পানাহ চাচ্ছি' তাহলে কি তাকে স্ত্রীরূপে রাখা যাবে?
উত্তর: স্ত্রী নিজ স্বামী থেকে আল্লাহর পানাহ চাইলে আল্লাহর নামের তা'যীম ক'রে তাকে তা দেওয়া ওয়াজেব। মহানবী বলেছেন, "কেউ আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করলে, তাকে আশ্রয় দাও। আর যে আল্লাহর নামে যাজ্ঞা করবে, তাকে দান কর।” (আবু দাউদ, নাসাঈ) তাঁর এক স্ত্রী তাঁর নিকট থেকে আল্লাহর পানাহ চাইলে তিনি বলেছিলেন, "তুমি বিশাল সত্তার পানাহ চেয়েছ। সুতরাং তুমি তোমার মায়ের বাড়ি চলে যাও।” (বুখারী ৫২৫৪নং)
প্রশ্ন: স্বামীর নিকট থেকে কখন তালাক নেওয়া বৈধ এবং কখন ওয়াজেব?
উত্তর: যখন স্বামী এমন কাজ করবে, যা কাবীরা গোনাহ এবং তা কুফরী নয়, বুঝানোর পরেও মানতে চাইবে না, তখন তালাক নেওয়া বৈধ। যেমন ব্যভিচার, মদপান ইত্যাদি। কিন্তু যে কাজ করার ফলে মানুষ ইসলাম থেকে খারিজ হয়ে যায়, তার সাথে সংসার করা বৈধ নয়। তওবা না করলে সে ক্ষেত্রে তালাক নেওয়া ওয়াজেব। যেমন মাযার যাওয়া, শির্ক করা, দ্বীন, আল্লাহ বা তাঁর রসূলকে গালি দেওয়া, নামায ত্যাগ করা ইত্যাদি। (ইউ)
প্রশ্ন: তালাক স্বামীর হাতে দেওয়া হল কেন? স্ত্রী তালাক নিতে পারে, দিতে পারে না কেন?
উত্তর: যেহেতু পুরুষ মহিলার তুলনায় জ্ঞানে পাকা, ক্রোধের সময় বেশি ধৈর্যশীল। নচেৎ স্ত্রীর হাতেও তালাক থাকলে সামান্য ঝামেলাতেই সে 'তোমাকে তালাক' বলে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটিয়ে থাকত। যেমন অনেক মহিলা সামান্য কিছু হলেই রেগে বলে বসে, 'আমাকে তালাক দাও, আমি তোমার ভাত খাব না' ইত্যাদি।
প্রশ্নঃ বিয়ে পড়ানোর পর স্বামী-স্ত্রীর দেখা-সাক্ষাৎ হওয়ার আগেই যদি স্বামী তার স্ত্রীকে তালাক দেয়, তাহলে স্ত্রী কি মোহর পাওয়ার অধিকার রাখে?
উত্তর: মোহর বাঁধা হলে অর্ধেক মোহর পাবে। বাঁধা না হলে কিছু খরচ-পত্র পাবে। আর তার কোন ইদ্দত নেই। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَإِن طَلَّقْتُمُوهُنَّ مِن قَبْلِ أَن تَمَسُّوهُنَّ وَقَدْ فَرَضْتُمْ لَهُنَّ فَرِيضَةً فَنِصْفُ مَا فَرَضْتُمْ إِلَّا أَن يَعْفُونَ أَوْ يَعْفُوَ الَّذِي بِيَدِهِ عُقْدَةُ النِّكَاحِ وَأَن تَعْفُوا أَقْرَبُ لِلتَّقْوَى وَلَا تَنسَوُا الْفَضْلَ بَيْنَكُمْ إِنَّ اللَّهَ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ} (২৩৭) সورة البقرة
অর্থাৎ, যদি স্পর্শ করার পূর্বে স্ত্রীদের তালাক দাও, অথচ মোহর পূর্বেই ধার্য করে থাক, তাহলে নির্দিষ্ট মোহরের অর্ধেক আদায় করতে হবে। কিন্তু যদি স্ত্রী অথবা যার হাতে বিবাহ-বন্ধন, সে যদি মাফ ক'রে দেয়, (তাহলে স্বতন্ত্র কথা।) অবশ্য তোমাদের মাফ ক'রে দেওয়াই আত্মসংযমের নিকটতর। তোমরা নিজেদের মধ্যে সহানুভূতি (ও মর্যাদার) কথা বিস্মৃত হয়ো না। নিশ্চয় তোমরা যা কর, আল্লাহ তার সম্যক দ্রষ্টা। (বাক্বারাহঃ ২৩৭)
{يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا نَكَحْتُمُ الْمُؤْمِنَاتِ ثُمَّ طَلَّقْتُمُوهُنَّ مِن قَبْلِ أَن تَمَسُّوهُنَّ فَمَا لَكُمْ عَلَيْهِنَّ مِنْ عِدَّةٍ تَعْتَدُّونَهَا فَمَتَّعُوهُنَّ وَسَرِّحُوهُنَّ سَرَاحًا جَمِيلًا} (৪৯) সورة الأحزاب
অর্থাৎ, হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা বিশ্বাসী রমণীদেরকে বিবাহ করার পর ওদেরকে স্পর্শ করার পূর্বে তালাক দিলে তোমাদের জন্য তাদের কোন পালনীয় ইদ্দত নেই। সুতরাং তোমরা ওদেরকে কিছু সামগ্রী প্রদান কর এবং সৌজন্যের সাথে ওদেরকে বিদায় কর। (আহমাবঃ ৪৯)
প্রশ্ন: কোন স্বামী যদি স্ত্রীকে হুমকি দিয়ে বলে, 'তুমি অমুকের বাড়ি গেলে তোমাকে তালাক।' অতঃপর স্ত্রী তা অমান্য ক'রে অমুকের বাড়ি চলে গেলে তালাক হয়ে যাবে কি?
উত্তর: তালাক নির্ভর করছে স্বামীর নিয়তের উপর। স্বামীর উদ্দেশ্য যদি সত্যই তালাক দেওয়ার থাকে, তাহলে তালাক হয়ে যাবে। তালাকের নিয়ত না থাকলে এবং স্ত্রী যাতে অমুকের বাড়ি না যায়, সে ব্যাপারে ভয় দেখানোর উদ্দেশ্য থাকলে তালাক হবে না। তবে এ ক্ষেত্রে কসমের কাফ্ফারা আদায় করতে হবে। (ইজি)
প্রশ্ন: আমি স্ত্রীকে বলেছিলাম, 'তুমি তোমার দোলাভাইয়ের বাড়ি গেলে তোমাকে তালাক।' অতঃপর সে আমার কথা মানেনি, সে তার দোলাভাইয়ের বাড়ি গেছে। এখন কি তালাক হয়ে যাবে? এখন আমার করণীয় কী?
উত্তর: অবাধ্য বউকে বাধ্য করার জন্য তালাকের হুমকি দেওয়া যায়, কিন্তু তাকে জীবন থেকে সরিয়ে দেওয়ার সংকল্প না থাকলে তালাক দিয়ে ফেলতে হয় না। তবুও নিয়ত যদি জীবন থেকে সরিয়ে দেওয়ার এবং তালাক দেওয়ার থাকে, তাহলে তালাক হয়ে যাবে। ইদ্দতের মধ্যে তাকে যথানিয়মে ফিরিয়ে নিতে হবে। পক্ষান্তরে তাকে কেবল শক্তভাবে বাধা দেওয়ার নিয়ত থাকলে এবং তালাকের নিয়ত আদৌ না থাকলে তালাক হবে না। বরং তার মান হবে কসমের। সে ক্ষেত্রে কসমের কাফফারা আদায় করতে হবে।
প্রশ্ন: আমি মায়ের বাড়িতে ছিলাম। স্বামী বলেছিল, 'আজ তুমি বাড়ি না ফিরলে, তোমাকে তালাক।' আমি বাড়ি ফিরতে চাইলাম। কিন্তু আমার ভাই জেদ ধরে আমাকে ফিরতে দিল না। এখন আমার কি তালাক হয়ে গেছে?
উত্তর: যদি আপনার ভাইয়ের আপনাকে জোরপূর্বক আটকে রাখার কথা সত্য হয়, তাহলে তালাক হবে না। (মুই) পরম্ভ স্বামীর মনে তালাকের নিয়ত না থাকলে এবং কেবল তাকীদ উদ্দেশ্য হলে তাকে কসমের কাফফারা আদায় করতে হবে।
প্রশ্ন: স্বামী ছয় মাস স্ত্রীর সঙ্গে দৈহিক সম্পর্ক না রাখলে আপনা-আপনি তালাক হয়ে যায় কি?
উত্তর: শরীয়তে আপনা-আপনি তালাক নামে কোন তালাক নেই। তালাক দিতে হয়, না হয় নিতে হয়। উভয় পক্ষ সম্মত থাকলে ছয় মাস কেন, ছয় বছরও দূরে থাকতে পারে। অবশ্য স্বামী নিখোঁজ হয়ে গেলে, সে কথা ভিন্ন। নিখোঁজ হওয়ার দিন থেকে পূর্ণ চার বছর অপেক্ষা করার পর আরো চার মাস দশদিন স্বামী-মৃত্যুর ইদ্দত পালন ক'রে স্ত্রী দ্বিতীয় স্বামী গ্রহণ করতে পারে। 'লিআন' হওয়ার পর স্বামী-স্ত্রীর মাঝে আপনা-আপনি বিবাহ-বিচ্ছেদ ঘটে। তদনুরূপ বিবাহ অবৈধ প্রমাণিত হলে, স্বামী-স্ত্রীর একজন মুর্তাদ হয়ে গেলে সাথে সাথে বিবাহ-বিচ্ছেদ ঘটে।
প্রশ্ন: স্বামী দ্বিতীয় বিবাহ করেছে বলে কি প্রথম স্ত্রীর তালাক চাওয়া বৈধ; যদিও বৈধভাবে শরীয়তসম্মত বিবাহ হয়?
উত্তর: শরীয়তের শর্ত মেনে দু'জনকেই সুখে রাখতে পারলে প্রথমার তালাক চাওয়া বৈধ নয়। যেমন দ্বিতীয়ার জন্যও বৈধ নয় প্রথমাকে তালাক দিতে স্বামীকে চাপ দেওয়া। মহানবী বলেন, “যে স্ত্রীলোক অকারণে তার স্বামীর নিকট থেকে তালাক চাইবে, সে স্ত্রীলোকের জন্য জান্নাতের সুগন্ধও হারাম হয়ে যাবে।” (আবু দাউদ ২২২৬, তিরমিযী ১১৮৭, ইবনে মাজাহ ২০৫৫নং, ইবনে হিব্বান, বাইহাকী ৭/৩ ১৬, সহীহুল জামে' ২৭০৬নং) তিনি আরো বলেন, "খোলা তালাক প্রার্থিনী এবং বিবাহ বন্ধন ছিন্নকারিণীরা মুনাফিক মেয়ে।” (আহমদ, নাসাঈ, বাইহাকী, সিলসিলাহ সহীহাহ ৬৩২নং)
নবী বলেন, “কোন মহিলা তার বোনের (সতীনের) তালাক চাইবে না; যাতে সে তার পাত্রে যা আছে, তা ঢেলে ফেলে দেয়। (এবং একাই স্বামী-প্রেমের অধিকারিণী হয়।)” (বুখারী, মুসলিম)
প্রশ্নঃ স্ত্রীর মাসিক অবস্থায় তালাক দেওয়া হারাম। কিন্তু কোন সময়ে মাসিক থাকলেও তালাক দেওয়া যায়?
উত্তরঃ তিন সময় মাসিক থাকলেও তালাক দেওয়া যায়। (১) তার সাথে মিলন না হয়ে থাকলে। (২) গর্ভাবস্থায় মাসিক অব্যাহত থাকলে। (৩) খোলা তালাক হলে। (ইউ)
প্রশ্নঃ স্ত্রীকে তালাক দিয়ে পুনরায় ফিরে পেতে চাইলে করণীয় কী?
উত্তর: একই সঙ্গে তিন বা ততোধিক বার অথবা একবার তালাক দিলে তা এক তালাক রজয়ী হয়। তাকে ইদ্দতের মধ্যে ফিরিয়ে নেওয়া যায়। ইদ্দত পার হয়ে গেলে স্ত্রী হারাম হয়ে যায়। তারপরেও তাকে পেতে চাইলে নতুনভাবে বিয়ে করতে হয়। কিন্তু নিয়মিত তিন তালাক দেওয়ার পর সে সুযোগ আর থাকে না। অবশ্য সে মহিলার অন্যত্র বিবাহ হলে, অতঃপর সে স্বামী তাকে স্বেচ্ছায় তালাক দিলে অথবা মারা গেলে ইদ্দতের পর আগের স্বামী তাকে পুনর্বিবাহ করতে পারে। মহান আল্লাহ বলেছেন, {فَإِن طَلَّقَهَا فَلَا تَحِلُّ لَهُ مِن بَعْدُ حَتَّى تَنكِحَ زَوْجًا غَيْرَهُ فَإِن طَلَّقَهَا فَلَا جُنَاحَ عَلَيْهِمَا أَن يَتَرَاجَعَا إِن ظَنَّا أَن يُقِيمَا حُدُودَ اللهِ وَتِلْكَ حُدُودُ اللَّهِ يُبَيِّنُهَا لِقَوْمٍ يَعْلَمُونَ} (২৩০) সورة البقرة
অর্থাৎ, অতঃপর উক্ত স্ত্রীকে যদি সে (তৃতীয়) তালাক দেয়, তবে যে পর্যন্ত না ঐ স্ত্রী অন্য স্বামীকে বিবাহ করবে, তার পক্ষে সে বৈধ হবে না। অতঃপর ঐ দ্বিতীয় স্বামী যদি তাকে তালাক দেয় এবং যদি উভয়ে মনে করে যে, তারা আল্লাহর সীমারেখা রক্ষা ক'রে চলতে পারবে, তাহলে তাদের (পুনর্বিবাহের মাধ্যমে দাম্পত্য-জীবনে) ফিরে আসায় কোন দোষ নেই। এ সব আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখা, জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য আল্লাহ এগুলি স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেন। (বাক্বারাহঃ ২৩০) জ্ঞাতব্য যে, এ ক্ষেত্রে পরিকল্পিতভাবে 'হালালা-বিবাহ' দিয়ে স্ত্রী হালাল করা বৈধ নয়। যেহেতু তাতে স্ত্রী হালাল হয় না। সতর্কতার বিষয় যে, তালাকের বিষয়টি সকল ক্ষেত্রে এক রকম নয়। সুতরাং সে ক্ষেত্রে স্থানীয় কাযীর সহযোগিতা প্রয়োজন।
প্রশ্ন: রজয়ী তালাক দিয়ে ইদ্দতের মধ্যে ফিরিয়ে নেওয়ার সময় স্ত্রী যদি ফিরতে না চায়, তাহলেও কি সে স্ত্রীই থাকবে?
উত্তর: রজয়ী তালাক দেওয়ার পর ইদ্দতের মধ্যে দু'জনকে সাক্ষী রেখে স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিলে সে স্ত্রীই থাকবে, যদিও সে ফিরতে রাজি না হয়। (লাদা) তালাকের পর এমন স্বামীর সাথে স্ত্রী সংসার করতে না চাইলে খোলা তালাক নিতে পারে।
প্রশ্নঃ স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বিবাহ-বিচ্ছেদ হলে তাদের সন্তান কার নিকট থাকবে?
উত্তর: মহানবী বলেছেন, "পুনর্বিবাহ না হওয়া পর্যন্ত মহিলা তার সন্তানের বেশি হকদার।” (দারাকুত্বনী ৪১৮নং, সিসঃ ৩৬৮নং) অবশ্য মায়ের মধ্যে কোন প্রতিকূল গুণ থাকলে আলাদা কথা। সেক্ষেত্রে বাপই সন্তানের অধিকার পাবে। যেমন মায়ের হাতে সন্তান থাকলে খারাপ হয়ে যাবে---এই আশঙ্কা থাকলে সে সন্তানের অধিকার হারাবে। পরন্ত সন্তান যদি জ্ঞানসম্পন্ন হয়, তাহলে তাকে এখতিয়ার দেওয়া হবে। সে যাকে বেছে নেবে, সেই তার প্রতিপালনের দায়িত্ব পাবে। (তিরমিযী ১৩৫৭, ইবনে মাজাহ ২৩৫ ১নং)
প্রশ্নঃ তালাক ও শোক পালনের ইদ্দত কখন থেকে শুরু হবে? খবর জানার পর থেকে, নাকি তালাক ও মরণের দিন থেকে?
উত্তর: তালাক ও শোক পালনের ইদ্দত খবর জানার পর থেকে নয়, বরং তালাক ও মরণের দিন থেকে গণ্য হবে। সুতরাং যদি কোন মহিলা তিন মাসিকের পর খবর পায় যে, তার স্বামী তাকে তালাক দিয়েছে, তাহলে নতুন ক'রে সে আর ইদ্দত পালন করবে না। অনুরূপ যদি কোন মহিলা ৪ মাস ১০ দিন পর জানতে পারে যে, তার স্বামী মারা গেছে, তাহলে তাকে আর ইদ্দত পালন করতে হবে না। প্রকাশ থাকে যে, তালাকের ইদ্দত অন্য মহিলাদের জন্য ভিন্ন রকম।
{وَاللَّائِي يَئِسْنَ مِنَ الْمَحِيضِ مِن نِّسَائِكُمْ إِنِ ارْتَبْتُمْ فَعِدَّتُهُنَّ ثَلَاثَةُ أَشْهُرٍ وَاللَّائِي لَمْ يَحِضْنَ وَأُوْلَاتُ الْأَحْمَالِ أَجَلُهُنَّ أَن يَضَعْنَ حَمْلَهُنَّ} (৪) সورة الطلاق
অর্থাৎ, তোমাদের যেসব স্ত্রীদের মাসিক হবার আশা নেই, তাদের ইদ্দত সম্পর্কে তোমরা সন্দেহ করলে তাদের ইদ্দতকাল হবে তিন মাস এবং যাদের এখনো মাসিক হয়নি তাদেরও। আর গর্ভবতী নারীদের ইদ্দতকাল সন্তান প্রসব করা পর্যন্ত। (ত্বালাকুঃ ৪) যেমন শোকপালনের ইদ্দতও গর্ভকাল পর্যন্ত।
প্রশ্ন: স্বামী মারা গেলে মহিলা কোথায় ইদ্দত পালন করবে?
উত্তর: যে গৃহে থেকে স্বামী মরার খবর পাবে, সেই গৃহ তার জন্য নিরাপদ ও সুবিধাজনক হলে সেখানে ৪ মাস ১০ দিন অথবা গর্ভকাল ইদ্দত পালন করবে। মহানবী ফুরাইআহকে বলেছিলেন,
« امْكُثِي فِي الْبَيْتِ الَّذِي أَتَاكِ فِيهِ نَعْيُ زَوْجِكِ حَتَّى يَبْلُغَ الْكِتَابُ أَجَلَهُ »
অর্থাৎ, তুমি সেই গৃহে অবস্থান কর, যে গৃহে তোমার কাছে তোমার স্বামীর মৃত্যু- সংবাদ এসেছে। (আহমাদ ৬/৩৭০, ইবনে মাজাহ ২০৩১নং, হাকেম ২/২২৬, ত্বাবারানীর কাবীর ১০৮৪নং, বাইহাক্বী ৭/৪৩৪) সুতরাং সে যদি সেই সময় স্ত্রী মায়ের বাড়িতে থাকে এবং শ্বশুরবাড়ি অপেক্ষা সেই বাড়ি সুবিধাজনক ও নিরাপদ হয়, তাহলে সেখানেই ইদ্দত পালন করতে হবে। মেয়ের বাড়িতে থাকলেও তাই। নচেৎ স্বামী-গৃহে ফিরে যেতে হবে। পক্ষান্তরে স্বামী-গৃহে থাকা অবস্থায় স্বামী মারা গেলে এবং সেখানে তাকে দেখাশোনা করার মতো কোন মাহরাম পুরুষ বা তেমন কেউ না থাকলে, সেখানে বসবাস করা তার অসুবিধাজনক বা ক্ষতিকর হলে মায়ের বাড়িতে গিয়ে ইদ্দত পালন করতে পারে।
প্রশ্নঃ কোন পড়ুয়া ছাত্রীর স্বামী মারা গেলে সে কীভাবে ইদ্দত পালন করবে? তার কি বিদ্যালয়ে যাওয়া বৈধ হবে?
উত্তর: অন্যান্য মহিলাদের মতো তার জন্যও স্বগৃহে ইদ্দত পালন করা এবং তাতে সকল প্রকার সৌন্দর্য ও সুগন্ধি বর্জন করা জরুরী। অবশ্য নিজের একান্ত প্রয়োজনে বাইরে যেতে পারে। সুতরাং দিনের বেলায় সে বিদ্যালয়ে গিয়ে ক্লাস ক'রে আসতে পারে। (লাদা) অবশ্য ইদ্দতের ভিতরে হজ্জ-সফরে যেতে পারে না।
প্রশ্ন: স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার পর স্বামী হঠাৎ মারা যায়। ঐ স্ত্রীকে কি ইদ্দত পালন করতে হবে? ঐ স্ত্রী কি তার ওয়ারেস হবে?
উত্তর: যে তালাকে স্ত্রী প্রত্যনয়নযোগ্যা থাকে সেই (রজয়ী) তালাক পাওয়া অবস্থায় স্ত্রীকে শোকপালনের ইদ্দত পালন করতে হবে এবং স্বামীর ওয়ারেসও হবে। কারণ পূর্বের মতোই। পক্ষান্তরে বায়েন বা খোলা তালাক পাওয়ার ইদ্দতে অথবা ফাসখের ইদ্দতে থাকলে স্ত্রীকে শোকপালনের ইদ্দত পালন করতে হবে না এবং সে স্বামীর ওয়ারেসও হবে না। (ইউ)
প্রশ্নঃ বিবাহের পর স্বামীর সাথে বাসর বা মিলন হওয়ার আগেই যদি স্বামী মারা যায়, তাহলেও কি ইদ্দত পালন করতে হবে? ঐ স্ত্রী কি তার ওয়ারেস হবে?
উত্তরঃ হ্যাঁ, ঐ স্ত্রীকে ৪ মাস ১০ দিন ইদ্দত পালন করতে হবে। যেহেতু মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَالَّذِينَ يُتَوَفَّوْنَ مِنكُمْ وَيَذَرُونَ أَزْوَاجًا يَتَرَبَّصْنَ بِأَنفُسِهِنَّ أَرْبَعَةَ أَشْهُرٍ وَعَشْرًا} (২৩৪)
অর্থাৎ, তোমাদের মধ্যে যারা স্ত্রী রেখে মারা যায়, তাদের স্ত্রীগণ চার মাস দশ দিন অপেক্ষা করবে। (বাক্বারাহঃ ২৩৪) এখানে মহান আল্লাহ আমভাবে সকল স্ত্রীর প্রতিই একই নির্দেশ দিয়েছেন। আর আল্লাহর রসূল বলেছেন, "যে স্ত্রীলোক আল্লাহ ও কিয়ামতের প্রতি ঈমান রাখে, তার পক্ষে স্বামী ছাড়া অন্য কোন মৃত ব্যক্তির জন্য তিন দিনের বেশী শোক পালন করা জায়েয নয়। তার স্বামীর জন্য সে চার মাস দশ দিন শোক পালন করবে।” (বুখারী ও মুসলিম) এখানে মহানবী আমভাবে সকল স্ত্রীর প্রতিই একই নির্দেশ দিয়েছেন। অনুরূপ মীরাসের আয়াতেও আম নির্দেশ আছে। সুতরাং সে স্বামীর (এক চতুর্থাংশ সম্পত্তির) ওয়ারেস হবে; যদি অন্য কোন বাধা না থাকে। (ইবা)
প্রশ্ন: গর্ভস্থ ভ্রূণ যদি গর্ভচ্যুত হয়, তাহলে কি গর্ভবতীর ইদ্দতকাল শেষ হয়ে যাবে?
উত্তর: ভ্রূণ ভূমিষ্ঠ হলেই গর্ভবতীর ইদ্দত শেষ হয়ে যাবে। (সা'দী) যেহেতু মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَأُوْلَاتُ الْأَحْمَالِ أَجَلُهُنَّ أَن يَضَعْنَ حَمْلَهُنَّ} (৪) সورة الطلاق অর্থাৎ, গর্ভবতী নারীদের ইদ্দতকাল সন্তান প্রসব করা পর্যন্ত। (ত্বালাক্বঃ ৪)
প্রশ্নঃ ইদ্দত যদি মহিলার গর্ভে সন্তান আছে কি না, তা দেখার জন্য হয়, তাহলে স্বামী ছেড়ে এক-দেড় বছর মায়ের বাড়িতে থাকার পর যে মহিলাকে স্বামী তালাক দেয়, তাকেও কি অতিরিক্ত তিন মাসিক অথবা মাসিক না হলে তিন মাস ইদ্দত পালন করতে হবে?
উত্তর: আসলে ইদ্দত শুরু হবে তালাকের পর থেকে। ইতিপূর্বে সে স্বামীর সাথে বহু দিন যাবৎ মিলন না ক'রে থাকলেও বিধান এটাই যে, তালাক হওয়ার পর নির্ধারিত ইদ্দত পালন করতে হবে। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَالْمُطَلَّقَاتُ يَتَرَبَّصْنَ بِأَنفُسِهِنَّ ثَلاثَةَ قُرُوءٍ} (২২৮) সورة البقرة অর্থাৎ, তালাকপ্রাপ্তা (বর্জিতা) নারীগণ তিন রজঃস্রাব কাল প্রতীক্ষায় থাকবে। (অর্থাৎ বিবাহ করা থেকে বিরত থাকবে।) (বাক্বারাহঃ ২২৮)
প্রশ্ন: স্বামী মারা গেলে এবং গর্ভে দুই মাসের বাচ্চা থাকলে ৪ মাস ১০ দিন ইদ্দত পালন করবে, নাকি প্রসব হওয়া পর্যন্ত আরো প্রায় ৭ মাস ইদ্দত পালন করবে?
উত্তর: গর্ভবতীর ইদ্দত শেষ হবে প্রসবের পর; যদিও তা তুলনামূলক লম্বা। যেহেতু মহান আল্লাহ বলেছেন,
وَأُوْلَاتُ الْأَحْمَالِ أَجَلُهُنَّ أَن يَضَعْنَ حَمْلَهُنَّ} (৪) সورة الطلاق অর্থাৎ, গর্ভবতী নারীদের ইদ্দতকাল সন্তান প্রসব করা পর্যন্ত। (ত্বালাকুঃ ৪) একই কারণে গর্ভের শেষের দিকে স্বামী মারা গেলে স্ত্রীর ইদ্দত মাত্র কয়েক ঘন্টা হতে পারে।
প্রশ্নঃ যে মহিলা স্বামী মরার ইদ্দতে আছে, সে মহিলাকে বিবাহের প্রস্তাব দেওয়া যায় কি না?
উত্তর: ইদ্দতে থাকা বিধবাকে সরাসরি বিবাহের প্রস্তাব দেওয়া বৈধ নয়। অবশ্য আভাসে ইঙ্গিতে বিয়ের কথা জানানোতে দোষ নেই। মহান আল্লাহ বলেছেন,
وَلَا جُنَاحَ عَلَيْكُمْ فِيمَا عَرَّضْتُم بِهِ مِنْ خِطْبَةِ النِّسَاءِ أَوْ أَكْنَنتُمْ فِي أَنفُسِكُمْ عَلِمَ اللهُ أَنَّكُمْ سَتَذْكُرُونَهُنَّ وَلَكِن لا تُوَاعِدُوهُنَّ سِرًّا إِلَّا أَن تَقُولُوا قَوْلًا مَّعْرُوفًا وَلَا تَعْزِمُوا عُقْدَةَ النِّكَاحِ حَتَّى يَبْلُغَ الْكِتَابُ أَجَلَهُ وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ يَعْلَمُ مَا فِي أَنفُسِكُمْ فَاحْذَرُوهُ وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ غَفُورٌ حَلِيمٌ}
অর্থাৎ, আর তোমরা যদি আভাসে-ইঙ্গিতে উক্ত রমণীদেরকে বিবাহের প্রস্তাব দাও অথবা অন্তরে তা গোপন রাখ, তাতে তোমাদের দোষ হবে না। আল্লাহ জানেন যে, তোমরা তাদের সম্বন্ধে আলোচনা করবে। কিন্তু বিধিমত কথাবার্তা ছাড়া গোপনে তাদের নিকট কোন অঙ্গীকার করো না; নির্দিষ্ট সময় (ইদ্দত) পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত বিবাহকার্য সম্পন্ন করার সংকল্প করো না। আর জেনে রাখ, আল্লাহ তোমাদের মনোভাব জানেন। অতএব তাঁকে ভয় কর এবং জেনে রাখ, নিশ্চয় আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল, বড় সহিষ্ণু। (বাক্বারাহঃ ২৩৫)
প্রশ্নঃ ইদ্দত পালনের সময়কাল কি পিছিয়ে দেওয়া যায়?
উত্তরঃ মোটেই না। মৃত্যুর পর থেকেই সে সময় শুরু হয়। (ইউ)
প্রশ্নঃ ইদ্দত পালনের সময়ে কি ঘড়ি পরা যায়?
উত্তর: কেবল সময় দেখার উদ্দেশ্যে পরা যায়। জরুরী না হলে না পরাই উত্তম। যেহেতু তা অলংকারের মতো। (লাদা)
প্রশ্নঃ ইদ্দত পালনের সময়ে কি বিধবাকে সাদা কাপড়ই পরতে হবে?
উত্তর: ইদ্দত পালনের জন্য কোন নির্দিষ্ট রঙের লেবাস নেই। যে লেবাসে সৌন্দর্য আছে, তা বর্জন ক'রে সাদাসিধা লেবাস পরতে হবে। যে সাদা রঙের কাপড়ে সৌন্দর্য আছে, তাও পরা যাবে না।
প্রশ্ন: ইদ্দত পালনের সময় বিধবা কি ছাত্রী হলে বিদ্যালয়ে অথবা চাকুরে হলে চাকুরিস্থলে যেতে পারে?
উত্তর: যে কাজে যাওয়া জরুরী, সে কাজে যাওয়া চলবে। (মুই)
প্রশ্নঃ বিদেশে থাকা অবস্থায় বিধবা হলে মহিলা কোথায় ইদ্দত পালন করবে?
উত্তর: যে ঘরে থাকা অবস্থায় স্বামী মারা গেছে, সে ঘরেই ইদ্দত পালন করতে হবে। অবশ্য সেখানে যদি দেখাশোনা করার কেউ না থাকে, তাহলে শ্বশুরবাড়ি অথবা মায়ের বাড়িতে ফিরে গিয়ে ইদ্দত পালন করতে পারবে। (লাদা)
প্রশ্নঃ স্বামী মরার সময় স্ত্রী মায়ের বাড়িতে ছিল। সে কোথায় উদ্দত পালন করবে?
উত্তর: নিজের স্বামীগৃহে ফিরে এসে ইদ্দত পালন করবে। (ইউ)
প্রশ্নঃ কোন স্ত্রীর স্বামী নিখোঁজ হলে করণীয় কী?
উত্তর: কোন মহিলার স্বামী নিখোঁজ হলে নিখোঁজ হওয়ার দিন থেকে পূর্ণ চার বছর অপেক্ষা করার পর আরো চার মাস দশদিন স্বামী-মৃত্যুর ইদ্দত পালন করে দ্বিতীয় স্বামী গ্রহণ করতে পারে। এই নির্ধারিত সময়ের পূর্বে তার বিবাহ হারাম। বিবাহের পর তার পূর্বস্বামী ফিরে এলে তার এখতিয়ার হবে; স্ত্রী ফেরৎ নিতে পারে অথবা মোহর ফেরৎ নিয়ে তাকে ঐ স্বামীর জন্য ত্যাগ করতেও পারে। (মানারুস সাবীল ২/৮৮পৃঃ) স্ত্রী চাইলে আর নতুনভাবে বিবাহ আন্দের প্রয়োজন নেই। কারণ, স্ত্রী তারই এবং দ্বিতীয় আব্দ তার ফিরে আসার পর বাতিল। তবে তাকে ফিরে নেওয়ার পূর্বে ঐ স্ত্রী (এক মাসিক) ইদ্দত পালন করবে। (ইউঃ ২/৭৬৬) গর্ভবতী হলে প্রসবকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করবে। আর সে সময়ে দ্বিতীয় স্বামী থেকে পর্দা ওয়াজেব হয়ে যাবে।
প্রশ্ন: এক মহিলার দুধ-বেটা ছাড়া আর কেউ নেই। সে মারা গেলে ঐ বেটা কি তার ওয়ারেস হবে?
উত্তরঃ না। কারণ দুধ পান করলে দুধের আত্মীয়তা কায়েম হয় ঠিকই, কিন্তু মীরাসের অধিকার প্রতিষ্ঠা হয় না। সুতরাং সেই মহিলার সম্পত্তি বায়তুল মালে জমা হবে। (ইউ)
প্রশ্নঃ আমি বৃদ্ধ মানুষ। আমার ভয় হয়, আমার মৃত্যুর পর জমি-সম্পত্তি নিয়ে ছেলেরা ঝগড়া-ঝামেলা করবে। সুতরাং আমি কি এখন আমার স্থাবর-অস্থাবর সকল অর্থ-সম্পত্তি মীরাসের ভাগ-বন্টন অনুযায়ী প্রত্যেকের নামে লিখে দিতে পারি?
উত্তর: আপনার এ কাজ ঠিক হবে না। কারণ আপনি জানেন না যে, কে কখন মারা যাবে। হতে পারে আপনার কোন ওয়ারেসেরই আপনি ওয়ারেস হবেন। সুতরাং আপনার মৃত্যুর পর আপনার ছেলে-মেয়েরা শরয়ী মীরাস অনুযায়ী বিলি-বন্টন ক'রে নেবে। তারা ঝগড়া করলে আপনার দোষ হবে না। আপনি তাদেরকে ঝগড়া না করতে অসিয়ত করুন। কারো নামে কিছু লিখে না দিয়ে সব নিজের নামেই রাখুন। (ইউ)
প্রশ্ন: আমার তিনটি মেয়ে, কোন ছেলে নেই। শুনেছি, আমার মৃত্যুর পর আমার মেয়েরা দুইয়ের-তিন ভাগ সম্পত্তি পাবে এবং বাকী পাবে আমার ভাই। অথচ সে আমার ভাই হলেও, সে আমার দুশমন। আমি চাই না, সে আমার কোন সম্পত্তি পাক। এখন কি আমি আমার সব সম্পত্তি আমার মেয়েদের নামে লিখে দিতে পারি?
উত্তর: আপনার সম্পত্তি কে পাবে, আর কে পাবে না, তাতে আপনার ইচ্ছা নেই। সে ইচ্ছা সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর। তাঁর বিধানে যে যা পাবে, তাতে বাদ সাধবার অধিকার আপনার নেই। মহান আল্লাহ মীরাসের ভাগ-বন্টনের বিধান দেওয়ার পর বলেছেন,
{تِلْكَ حُدُودُ اللَّهِ وَمَن يُطِعِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ يُدْخِلْهُ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا وَذَلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ (১৩) وَمَن يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَيَتَعَدَّ حُدُودَهُ يُدْخِلْهُ نَارًا خَالِدًا فِيهَا وَلَهُ عَذَابٌ مُّهِينٌ) (১৪) সورة النساء}
অর্থাৎ, এসব আল্লাহর নির্ধারিত সীমা। আর যে আল্লাহ ও রসূলের অনুগত হয়ে চলবে, আল্লাহ তাকে বেহেস্তে স্থান দান করবেন; যার নীচে নদীসমূহ প্রবাহিত। সেখানে তারা চিরকাল থাকবে এবং এ মহা সাফল্য। পক্ষান্তরে যে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের অবাধ্য হবে এবং তাঁর নির্ধারিত সীমা লংঘন করবে, তিনি তাকে আগুনে নিক্ষেপ করবেন। সেখানে সে চিরকাল থাকবে, আর তার জন্য রয়েছে লাঞ্ছনা-দায়ক শাস্তি। (নিসাঃ ১৩-১৪)
সুতরাং আপনার ভাই আপনার দুশমন হলেও আল্লাহর ইচ্ছায় সে আপনার সম্পত্তির ভাগ পাবে। অবশ্য সে যদি কাফের বা মুশরিক হয়, তাহলে সে আল্লাহর বিধানে মুসলিমের নিকট থেকে কোন অংশ পাবে না। (ইউ)