📄 ইখলাস ও নিয়ত
প্রশ্ন: অনেক সময় ভাল কাজ করি। অতঃপর মনের ভিতরে প্রশংসার লোভ হয়। তাতে কি তা বাতিল হয়ে যাবে?
উত্তর: এ হল শয়তানী অসঅসা (কুমন্ত্রণা)। এর প্রতি ভ্রূক্ষেপ করা উচিত নয়। তবে অসঅসার সাথে সাথে শয়তান থেকে পানাহ চেয়ে নেওয়া উচিত। (ইউ)
প্রশ্ন: অনেক সময় ভাল কাজ করি। অতঃপর তার ফলে লোকমাঝে তার চর্চা হয়, আমার সুনাম ও সুখ্যাতি হয়। অথচ আমি মনে মনে তা চাইনি। তাতে কি তা বাতিল হয়ে যাবে?
উত্তর: মনে সুনামের কামনা না থাকা সত্ত্বেও যদি মানুষের মাঝে কারো সুনাম হয়, তাহলে জানতে হবে এটা তার সত্বর সওয়াব। তবে তাতে তার পরকালের সওয়াব বরবাদ হয়ে যাবে না। একদা রাসূলুল্লাহ-কে জিজ্ঞাসা করা হল; বলুন, 'যে মানুষ সৎকাজ করে, আর লোকে তার প্রশংসা ক'রে থাকে, (তাহলে এরূপ কাজ কি রিয়া বলে গণ্য হবে?)' তিনি বললেন, "এটা মু'মিনের সত্বর সুসংবাদ।” (মুসলিম)
প্রশ্নঃ এক কর্মচারী বেনামাযী ছিল। মালিক বলল, 'তুমি নামায পড়লে তোমার বেতন ১০০ টাকা বাড়িয়ে দেওয়া হবে। তখন থেকে সে নামায পড়া শুরু করল। প্রশ্ন হল, তার নামায কি আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য?
উত্তর: আল্লাহর সন্তুষ্টি ছাড়া অন্য কোন উদ্দেশ্যে, অর্থ, গদি, সুনাম, সুবিধা ইত্যাদি উপার্জনের উদ্দেশ্যে কোন ইবাদত করলে তা মহান আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।
রসূল বলেছেন, "যাবতীয় কার্য নিয়ত বা সংকল্পের উপর নির্ভরশীল। আর মানুষের জন্য তাই প্রাপ্য হবে, যার সে নিয়ত করবে। অতএব যে ব্যক্তির হিজরত (স্বদেশত্যাগ) আল্লাহর (সন্তোষ লাভের) উদ্দেশ্যে ও তাঁর রসূলের জন্য হবে; তার হিজরত আল্লাহ ও তাঁর রসূলের জন্যই হবে। আর যে ব্যক্তির হিজরত পার্থিব সম্পদ অর্জন কিংবা কোন মহিলাকে বিবাহ করার উদ্দেশ্যেই হবে, তার হিজরত যে সংকল্প নিয়ে করবে তারই জন্য হবে।” (বুখারী-মুসলিম)
আবু মুসা আব্দুল্লাহ ইবনে কায়স আশআরী বলেন, আল্লাহর রসূল -কে এমন ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হল, যে বীরত্ব প্রদর্শনের জন্য যুদ্ধ করে, অন্ধ পক্ষপাতিত্বের জন্য যুদ্ধ করে এবং লোক প্রদর্শনের জন্য (সুনাম নেওয়ার উদ্দেশ্যে) যুদ্ধ করে, এর কোন্ যুদ্ধটি আল্লাহর পথে হবে? আল্লাহর রসূল বললেন, "যে ব্যক্তি আল্লাহর কালেমাকে উঁচু করার উদ্দেশ্যে যুদ্ধ করে, একমাত্র তারই যুদ্ধ আল্লাহর পথে হয়।” (বুখারী ও মুসলিম)
রাসূলুল্লাহ বলেন, মহান আল্লাহ বলেছেন, "আমি সমস্ত অংশীদারদের চাইতে অংশীদারি (শিক) থেকে অধিক অমুখাপেক্ষী। কেউ যদি এমন কাজ করে, যাতে সে আমার সঙ্গে অন্য কাউকে অংশীদার স্থাপন করে, তাহলে আমি তাকে তার অংশীদারি (শির্ক) সহ বর্জন করি।” (অর্থাৎ তার আমলই নষ্ট ক'রে দিই।) (মুসলিম)
সুতরাং সেই কর্মচারীর উচিত, নিয়ত পাল্টে নিয়ে কেবল আল্লাহর উদ্দেশ্যে নামায পড়া। বেতন সে গ্রহণ করুক, কিন্তু নামায পড়ুক আল্লাহর ভয়ে।
উল্লেখ্য যে, অভিভাবকের ভয়ে নামায পড়া, সমাজে দুর্নামের ভয়ে রোযা রাখা, অর্থ লোভে বদল হজ্জ করা, চাকরির আশায় দ্বীনী ইল্ম অর্জন করা, বেতনের লোভে ইমামতি করা, খ্যাতির লোভে দান করা, নাম ও অর্থের লোভে দ্বীনী দাওয়াতের কাজ করা ইত্যাদি 'রিয়া'র বিধান একই।
প্রশ্নঃ কোন কোন ভাল আমলের প্রশংসা শোনা গেলে তার ফলে কি ঐ আমল বাতিল গণ্য হয়?
উত্তর: আমলকারীর নিয়তে প্রশংসা নেওয়ার নিয়ত না থাকলে প্রশংসনীয় আমল বাতিল হয় না। যেহেতু
عَنْ أَبِي ذَرٍ قَالَ : قِيلَ لِرَسُولِ اللهِ ﷺ : أَرَأَيْتَ الرَّجُلَ الَّذِي يَعْمَلُ العَمَلَ مِنَ الخَيْرِ ، وَيَحْمَدُهُ النَّاسُ عَلَيْهِ ؟ قَالَ : (( تِلْكَ عَاجِلُ بُشْرَى الْمُؤْمِنِ )). رواه مسلم
আবু যার হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ-কে জিজ্ঞাসা করা হল; বলুন, 'যে মানুষ সৎকাজ করে, আর লোকে তার প্রশংসা ক'রে থাকে (তাহলে এরূপ কাজ কি রিয়া বলে গণ্য হবে?)' তিনি বললেন, "এটা মু'মিনের সত্বর সুসংবাদ।” (মুসলিম)
প্রশ্নঃ ওযু, নামায ইত্যাদির নিয়ত মুখে উচ্চারণ করা কি বিধেয়?
উত্তর: ইবাদতের নিয়ত মুখে উচ্চারণ করা বিদআত। যেহেতু তা মহানবী অথবা তাঁর কোন সাহাবী কর্তৃক প্রমাণিত নয়। সুতরাং তা বর্জন করা ওয়াজেব। নিয়ত মানে সংকল্প। আর তার স্থান হল মনে। অতএব তা মুখে উচ্চারণ করার কোনই প্রয়োজন নেই। (ইবা, ইউ)
📄 নামায
প্রশ্ন: কাজের চাপে সময় পার ক'রে নামায পিছিয়ে দেওয়া কি বৈধ?
উত্তর: নিজের কাজ বা সৃষ্টির কাজ আগে করা এবং স্রষ্টার কাজ পিছিয়ে দেওয়া বৈধ হতে পারে না। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{إِنَّ الصَّلَاةَ كَانَتْ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ كِتَابًا مَّوْقُوتًا) (۱۰۳) سورة النساء
অর্থাৎ, নিশ্চয় নামাযকে বিশ্বাসীদের জন্য নির্ধারিত সময়ে অবশ্য কর্তব্য করা হয়েছে। (নিসাঃ ১০৩)
যুদ্ধ চলাকালেও নামায পিছিয়ে না দিয়ে 'সালাতুল খাওফ' পড়ার নির্দেশ আছে। সুতরাং কাজের ফাঁকেই নামায আদায় ক'রে নেওয়ার চেষ্টা রাখা জরুরী। কাজের কাপড় নোংরা হলে পৃথক কাপড় রেখে নামায পড়তে হবে। মাঠে-ময়দানে ভিজে জায়গায় দাঁড়িয়েও নামায পড়ে নিতে হবে। একান্ত কেউ নিরুপায় হলে সে কথা ভিন্ন। যেমন রোগী ও মুসাফির জমা তাকদীম বা তা'খীর করতে পারে। বৃষ্টির জন্যও জমা তাকদীম হতে পারে।
প্রশ্ন: আমার রাত্রে শুতে দেরী হয়। ডিউটি শুরু হয় সকাল সাতটা থেকে। ফজর হয় চারটায়। ফজরের সময় উঠে জামাআতে নামায পড়লে এবং তারপর শুলে আর ঘুম হয় না। সুতরাং আমি যদি ডিউটি শুরুর এক ঘন্টা আগে এলার্ম লাগিয়ে শুই এবং ডিউটিতে যাওয়ার আগে ফজরের নামাযটা পড়ে নিই, তাহলে কি যথেষ্ট হবে না?
উত্তর: না, সময় পার ক'রে নামায পড়া যথেষ্ট নয়। ইচ্ছাকৃত সময় পার ক'রে নামায পড়লে তা নষ্ট করারই শামিল। বহু উলামার মতে এমন ব্যক্তি 'কাফের' হয়ে যাবে। (ইবা)
যে নামাযীরা সময় পার ক'রে নামায পড়ে, তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের 'গাই' উপত্যকা। মহান আল্লাহ বলেন,
{فَخَلَفَ مِن بَعْدِهِمْ خَلْفٌ أَضَاعُوا الصَّلَاةَ وَاتَّبَعُوا الشَّهَوَاتِ فَسَوْفَ يَلْقَوْنَ غَيًّا }
অর্থাৎ, তাদের পর এল অপদার্থ পরবর্তিগণ, তারা নামায নষ্ট করল ও প্রবৃত্তিপরায়ণ হল; সুতরাং তারা অচিরেই 'গাই' প্রত্যক্ষ করবে। (মারয়্যামঃ ৫৯)
নামায বিনষ্ট করার অর্থঃ একেবারে নামায না পড়া; যা মূলতঃ কুফরী, অথবা নামাযের সময় বিনষ্ট করা; যার অর্থ সঠিক সময়ে নামায আদায় না করা, যখন ইচ্ছা পড়া বা বিনা ওযরে দুই বা ততোধিক নামাযকে একত্রে পড়া, অথবা কখনো দুই, কখনো চার, কখনো এক, কখনো পাঁচ অক্তের নামায পড়া। এ সমস্ত নামায বিনষ্ট করার অর্থে শামিল।
প্রশ্ন: নামাযে শৈথিল্য বা ঢিলেমি করা অথবা নামাযকে ভারী মনে করা কাদের কাজ?
উত্তর: নামাযে শৈথিল্য বা ঢিলেমি করা অথবা নামাযকে ভারী মনে করা মুনাফিকদের কাজ। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{إِنَّ الْمُنَافِقِينَ يُخَادِعُونَ اللهَ وَهُوَ خَادِعُهُمْ وَإِذَا قَامُوا إِلَى الصَّلَاةِ قَامُوا كُسَالَى يُرَاؤُونَ النَّاسَ وَلَا يَذْكُرُونَ اللَّهَ إِلَّا قَلِيلاً} (١٤٢) سورة النساء
অর্থাৎ, নিশ্চয় মুনাফিক (কপট) ব্যক্তিরা আল্লাহকে প্রতারিত করতে চায়। বস্তুতঃ তিনিও তাদেরকে প্রতারিত করে থাকেন এবং যখন তারা নামাযে দাঁড়ায় তখন শৈথিল্যের সাথে নিছক লোক-দেখানোর জন্য দাঁড়ায় এবং আল্লাহকে তারা অল্পই স্মরণ করে থাকে। (নিসাঃ ১৪২)
{وَمَا مَنَعَهُمْ أَن تُقْبَلَ مِنْهُمْ نَفَقَاتُهُمْ إِلَّا أَنَّهُمْ كَفَرُوا بِاللَّهِ وَبِرَسُولِهِ وَلَا يَأْتُونَ الصلاةَ إِلا وَهُمْ كَسَالَى وَلا يُنفِقُونَ إِلَّا وَهُمْ كَارِهُونَ} (٥٤) سورة التوبة
অর্থাৎ, আর তাদের দান-খয়রাত গ্রহণযোগ্য না হওয়ার কারণ এ ছাড়া আর কিছুই নয় যে, তারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের সাথে কুফরী করেছে, আর তারা নামাযে শৈথিল্যের সাথেই উপস্থিত হয় এবং তারা অনিচ্ছাকৃতভাবেই দান ক'রে থাকে। (তাওবাহঃ ৫৪)
আল্লাহর রসূল বলেন, "মুনাফিকদের পক্ষে সবচেয়ে ভারী নামায হল এশা ও ফজরের নামায। ঐ দুই নামাযের কি মাহাত্ম্য আছে, তা যদি তারা জানত, তাহলে হামাগুড়ি দিয়ে হলেও অবশ্যই তাতে উপস্থিত হত। আমার ইচ্ছা ছিল যে, কাউকে নামাযের ইকামত দিতে আদেশ দিই, অতঃপর একজনকে নামায পড়তেও হুকুম করি, অতঃপর এমন একদল লোক সঙ্গে করে নিই; যাদের সাথে থাকবে কাঠের বোঝা। তাদের নিয়ে এমন সম্প্রদায়ের নিকট যাই, যারা নামাযে হাজির হয় না। অতঃপর তাদেরকে ঘরে রেখেই তাদের ঘরবাড়িকে আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দিই।” (বুখারী ৬৫৭, মুসলিম ৬৫১নং)
প্রশ্ন: দেখেছি, অনেক লোক নামাযের সালাম ফিরার পর তাদের ডানে-বামের লোকেদের সাথে মুসাফাহাহ করে। এটা কি সুন্নত?
উত্তর: না, বরং এ কাজ বিদআত। তবে যদি সে মুসাফাহাহ প্রথম সাক্ষাতের জন্য সালাম-সহ হয়, তাহলে তা সুন্নত। অর্থাৎ, নামায শুরু হওয়ার পর পাশে দাঁড়ানোর সময় সালাম-মুসাফাহাহর সুযোগ না হওয়ার ফলে নামায শেষ হওয়ার পরে তা করলে দূষণীয় নয়। (ইবা)
প্রশ্ন: জামাআত শেষে অনেক সময় মসজিদে সুন্নত পড়ি। এমন সময় কোন লোক আমার পাশে দাঁড়িয়ে আমার ইক্তিদা করতে থাকে। এটা কি বৈধ? বৈধ হলে আমার কী করা উচিত?
উত্তর: জামাআতের সওয়াব নেওয়ার উদ্দেশ্যে তা বৈধ। তখন আপনার উচিত ইমামতির নিয়ত ক'রে তকবীরাদি সশব্দে পড়া। আপনি সুন্নত পড়ছেন এবং সে নিশ্চয় ফরয পড়ছে। আপনাদের নিয়তের এই ভিন্নতা নামাযের কোন ক্ষতি করবে না। সাহাবী মুআয বিন জাবাল আল্লাহর রসূল-এর সাথে নামায পড়তেন, তারপর নিজের গোত্রে ফিরে গিয়ে তাদের ইমামতি ক'রে ঐ নামাযই পড়তেন। (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত ১১৫০নং) তাঁর প্রথম নামায ফরয হতো এবং শেষেরটা নফল।
একদা তিনি সালাম ফিরে দেখলেন, মসজিদের এক প্রান্তে দুই ব্যক্তি জামাআতে নামায পড়েনি। কারণ জিজ্ঞাসা করলে তারা কাঁপতে কাঁপতে বলল, 'আমরা আমাদের বাসায় নামায পড়ে নিয়েছি।' তিনি বললেন, "এমনটি আর করো না। বরং যখন তোমাদের কেউ নিজ বাসায় নামায পড়ে নেয়, অতঃপর (মসজিদে এসে) দেখে যে, ইমাম নামায পড়েনি, তখন সে যেন (দ্বিতীয়বার) তাঁর সাথে নামায পড়ে। আর এ নামায তার জন্য নফল হবে।” (আবু দাউদ ৫৭৫, তিরমিযী, নাসাঈ, মিশকাত ১১৫২নং)
মহানবী একদা এক ব্যক্তিকে একাকী নামায পড়তে দেখলে তিনি অন্যান্য সাহাবীদের উদ্দেশ্যে বললেন, "এমন কেউ কি নেই, যে এর সাথে নামায পড়ে একে (জামাআতের সওয়াব) দান করবে?” এ কথা শুনে এক ব্যক্তি উঠে তার সাথে নামায পড়ল। (আবু দাউদ ৫৭৪, তিরমিযী, মিশকাত ১১৪৬নং) অথচ সে মহানবী এর সাথে ঐ নামায পূর্বে পড়েছিল। সুতরাং ইমামের ছিল ফরয এবং মুক্তাদীর নফল।
এ থেকে আরো বুঝা যায় যে, জামাআত শেষ হওয়ার পর দ্বিতীয় জামাআত কায়েম করা দোষাবহ নয়。
প্রশ্নঃ কোন ব্যক্তি মসজিদে এসে যদি দেখে যে, ইমাম শেষ তাশাহহুদে আছেন, তাহলে সে কি জামাআতে শামিল হবে, নাকি শামিল না হয়ে পরবর্তী জামাআতের অপেক্ষা করবে?
উত্তর: যদি সে নিশ্চিতভাবে জানে যে, পরবর্তী জামাআতের জন্য লোক আছে, তাহলে সে শেষ বৈঠকে শামিল না হয়ে অপেক্ষা করবে এবং জামাআতের সাথে নামায পড়বে। যেহেতু সঠিক মতে পূর্ণ এক রাকআত না পেলে জামাআত পাওয়া যায় না। কিন্তু যদি কোন লোক আসার আশা না থাকে, তাহলে উত্তম জামাআতে শামিল হয়ে নামায আদায় করা; যদিও তা শেষ বৈঠক। কারণ জামাআত সহকারে নামাযের কিছু অংশ পাওয়া, মোটেই কিছু না পাওয়া থেকে উত্তম। অতঃপর সে যদি জামাআতের শেষ বৈঠকে শামিল হওয়ার পর শুনতে পায় যে, দ্বিতীয় জামাআত খাড়া হয়েছে, তাহলে সে ঐ নামায (সালাম না ফিরে) বাতিল ক'রে তাদের সাথে জামাআত সহকারে নামায আদায় করতে পারে। অথবা দু' রাকআত হয়ে থাকলে তা নফলের নিয়ত ক'রে সালাম ফিরে নামায শেষ ক'রে ঐ জামাআতে শামিল হতে পারে। পরন্তু সে একাকী নামায শেষ করলেও তাতে কোন দোষ নেই। সে এই তিনটির মধ্যে একটিকে এখতিয়ার করতে পারে। (ইউ)
প্রশ্নঃ প্লেনে কীভাবে নামায পড়া যাবে?
উত্তর: যেভাবে সম্ভব, সেভাবেই পড়ে নিতে হবে। ক্বিবলা মুখে দাঁড়িয়ে, রুকু-সিজদা যথা নিয়মে করা সম্ভব হলে, তা করতে হবে। নচেৎ বসে ইশারায় রুকু-সিজদা ক'রে নামায আদায় করতে হবে। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{فَاتَّقُوا اللَّهَ مَا اسْتَطَعْتُمْ} (١٦) سورة التغابن
অর্থাৎ, আল্লাহকে যথাসাধ্য ভয় ক'রে চল। (তাগাবুনঃ ১৬) তিনি ইমরান বিন হুসাইন-কে বলেছিলেন, "তুমি দাঁড়িয়ে নামায পড়। না পারলে বসে পড়। তাও না পারলে পার্শ্বদেশে শুয়ে পড়।” (বুখারী, আবু দাউদ, আহমাদ, মিশকাত ১২৪৮ নং) উত্তম হল প্রথম অক্তে নামায পড়ে নেওয়া। অবশ্য গন্তব্যস্থলে মাটিতে নেমে শেষ অক্তে নামায আদায় করার আশা থাকলে তাও করতে পারে। অনুরূপ মোটরগাড়ি, ট্রেন ও পানিজাহাজে নামাযের সময় হলে একই নিয়ম। (ইবা)
প্রশ্নঃ যে মসজিদে কবর আছে, সে মসজিদে নামায শুদ্ধ কি?
উত্তর: যে মসজিদে কবর আছে, সে মসজিদে নামায শুদ্ধ নয়, চাহে সে কবর নামাযীদের পিছনে বা সামনে, ডানে বা বামে হোক। যেহেতু নবী বলেছেন, “ইয়াহুদী খ্রিস্টানদের উপর আল্লাহর অভিশাপ, কারণ তারা তাদের নবীদের কবরকে মসজিদ বানিয়ে নিয়েছে।” (বুখারী ১৩৩০, মুসলিম ৫২৯নং) তিনি আরো বলেছেন, "সাবধান! তোমাদের পূর্ববর্তী লোকেরা তাদের নবী ও নেক লোকেদের কবরকে মসজিদ বানিয়ে নিত। সাবধান! তোমরা কবরগুলোকে মসজিদ বানিয়ে নিয়ো না। এরূপ করতে আমি তোমাদেরকে নিষেধ করছি।” (মুসলিম ৫৩২নং) আর যেহেতু কবরের ধারে-পাশে নামায পড়া শির্কের অন্যতম অসীলা এবং তাতে থাকে কবরস্থ ব্যক্তিকে নিয়ে অতিরঞ্জন, সেহেতু উক্ত হাদীসদ্বয় এবং অনুরূপ আরো অন্যান্য হাদীসের উপর আমল ক'রে শির্কের ছিদ্রপথ বন্ধ করার লক্ষ্যে কবরযুক্ত মসজিদে নামায নিষিদ্ধ হওয়া আবশ্যক। (ইবা)
প্রশ্নঃ অনেক নামাযী ঘরে নামায পড়ে, মসজিদে আসে না। তাদের ব্যাপারে বিধান কী?
উত্তর: তাদের জন্য বৈধ নয় ঘরে নামায পড়া। বরং তাদের জন্য ওয়াজেব হল, মসজিদে উপস্থিত হয়ে জামাআত সহকারে নামায আদায় করা। যেহেতু মহানবী বলেন, "যে ব্যক্তি আযান শোনা সত্ত্বেও মসজিদে জামাআতে এসে নামায আদায় করে না, কোন ওজর না থাকলে সে ব্যক্তির নামায কবুল হয় না।” (আবু দাউদ ৫৫১, ইবনে মাজাহ, ইবনে হিব্বান, হাকেম, সঃ জামে' ৬৩০০ নং) একটি অন্ধ লোক নবী-এর নিকট এসে নিবেদন করল, 'হে আল্লাহর রসূল! আমার কোন পরিচালক নেই, যে আমাকে মসজিদ পর্যন্ত নিয়ে যাবে।' সুতরাং সে নিজ বাড়িতে নামায পড়ার জন্য আল্লাহর রসূল-এর নিকট অনুমতি চাইল। তিনি তাকে অনুমতি দিলেন। কিন্তু যখন সে পিঠ ঘুরিয়ে রওনা দিল, তখন তিনি তাকে ডেকে বললেন, "তুমি কি আহবান (আযান) শুনতে পাও?” সে বলল, 'জী হ্যাঁ।' তিনি বললেন, "তাহলে তুমি সাড়া দাও।” (অর্থাৎ মসজিদেই এসে নামায পড়।) (মুসলিম)
রাসূলুল্লাহ বলেছেন, "সেই মহান সত্তার শপথ! যাঁর হাতে আমার জীবন আছে। আমার ইচ্ছা হচ্ছে যে, জ্বালানী কাঠ জমা করার আদেশ দিই। তারপর নামাযের জন্য আযান দেওয়ার আদেশ দিই। তারপর কোন লোককে লোকেদের ইমামতি করতে আদেশ দিই। তারপর আমি স্বয়ং সেই সব (পুরুষ) লোকদের কাছে যাই (যারা মসজিদে নামায পড়তে আসেনি) এবং তাদেরকেসহ তাদের ঘর-বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দিই।” (বুখারী ও মুসলিম)
আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ বলেন, "যাকে এ কথা আনন্দ দেয় যে, সে কাল কিয়ামতের দিন আল্লাহর সঙ্গে মুসলিম হয়ে সাক্ষাৎ করবে, তার উচিত, সে যেন এই নামাযসমূহ আদায়ের প্রতি যত্ন রাখে, যেখানে তার জন্য আযান দেওয়া হয় (অর্থাৎ, মসজিদে)। কেননা, মহান আল্লাহ তোমাদের নবী-এর নিমিত্তে হিদায়াতের পন্থা নির্ধারণ করেছেন। আর নিশ্চয় এই নামাযসমূহ হিদায়েতের অন্যতম পন্থা ও উপায়। যদি তোমরা (ফরয) নামায নিজেদের ঘরেই পড়, যেমন এই পিছিয়ে থাকা লোক নিজ ঘরে নামায পড়ে, তাহলে তোমরা তোমাদের নবীর তরীকা পরিহার করবে। আর (মনে রেখো,) যদি তোমরা তোমাদের নবীর তরীকা পরিহার কর, তাহলে নিঃসন্দেহে তোমরা পথহারা হয়ে যাবে। আমি আমাদের লোকেদের এই পরিস্থিতি দেখেছি যে, নামায (জামাতসহ পড়া) থেকে কেবল সেই মুনাফিক (কপট মুসলিম) পিছিয়ে থাকে, যে প্রকাশ্য মুনাফিক। আর (দেখেছি যে, পীড়িত) ব্যক্তিকে দু'জনের (কাঁধের) উপর ভর দিয়ে নিয়ে এসে (নামাযের) সারিতে দাঁড় করানো হতো।' (মুসলিম)
প্রশ্নঃ পাতলা কাপড়ে নামায পড়লে নামায শুদ্ধ কি?
উত্তর: যে কাপড় পরা সত্ত্বেও পুরুষদের নাভির নিচে থেকে হাঁটু পর্যন্ত কোন অংশ খোলা থাকে অথবা আবছা দেখা যায়, সে কাপড়ে নামায শুদ্ধ হয় না। অনুরূপ যে শাড়ি বা ওড়নায় মহিলার মাথার চুল, ঘাড়, হাতের রলা, পেট বা পিঠের অংশ খোলা থাকে অথবা আবছা দেখা যায়, তাতে নামায হয় না। নামাযে সতর ঢাকা জরুরী। তা খোলা গেলে নামায ঘোলা হয়ে যায়।
প্রশ্নঃ পাতলা শাড়ি বা ওড়না পরে মেয়েদের নামায শুদ্ধ কি?
উত্তর: যে লেবাস পরার পরেও ভিতরের চামড়া বা চুল নজরে আসে, সে লেবাস পরে নামায শুদ্ধ নয়। (ইউ)
প্রশ্ন: কাঁচা পিঁয়াজ-রসুন খেয়ে নামায কি শুদ্ধ নয়?
রাসূলুল্লাহ বলেছেন, "যে ব্যক্তি (কাঁচা) রসুন অথবা পিঁয়াজ খায়, সে যেন আমাদের নিকট হতে দূরে অবস্থান করে অথবা আমাদের মসজিদ থেকে দূরে থাকে।” (বুখারী ও মুসলিম)
মুসলিমের এক বর্ণনায় আছে যে, “যে ব্যক্তি (কাঁচা) পিঁয়াজ, রসূন এবং লীক পাতা খায়, সে যেন অবশ্যই আমাদের মসজিদের নিকটবর্তী না হয়। কেননা, ফিরিস্তাগণ সেই জিনিসে কষ্ট পান, যাতে আদম-সন্তান কষ্ট পায়।"
কাঁচা পিঁয়াজ-রসুন, লীক পাতা নামাযের আগে খাওয়া উচিত নয়। খেতে বাধ্য হলে এবং মুখের দুর্গন্ধ দূরীভূত না করতে পারলে জামাআতে শামিল হওয়া বৈধ নয়। তবে একাকী অথবা জামাআতে নামায পড়লে নামায শুদ্ধ হয়ে যায়। অনুরূপ বিড়ি-সিগারেট খাওয়ার ফলে মুখে বা লেবাসে দুর্গন্ধ সৃষ্টি হয়। তা খাওয়া হারাম এবং তার দুর্গন্ধ নিয়ে মসজিদে বা জামাআতে আসাও অবৈধ। একইভাবে যাদের গায়ে কোন প্রকারের দুর্গন্ধ আছে, তাদের জন্য জামাআতে উপস্থিত হওয়া মাকরূহ। সকলের জন্য জরুরী, সকল প্রকার দুর্গন্ধমুক্ত হয়ে জামাআতে উপস্থিত হওয়া। (ইবা)
প্রশ্ন: মহল্লার বা গ্রামের মসজিদ ছেড়ে অন্য মহল্লা বা গ্রামের মসজিদে জুমআহ বা তারাবীহ ইত্যাদির নামায পড়তে যাওয়া বৈধ কি? তাতে উদ্দেশ্য থাকে ভাল খতীবের ভাল বক্তব্য শোনা এবং সুমধুর কণ্ঠবিশিষ্ট ক্বারী ইমামের কুরআন শুনে উপকৃত হওয়া। সাইকেল বা গাড়িযোগে গেলে কি তা হাদীসে বর্ণিত নিষেধের আওতায় পড়ে, যাতে বলা হয়েছে, "তিন মসজিদ ছাড়া অন্য কোথাও সফর করা যাবে না; মদীনা শরীফের মসজিদে নববী, মাসজিদুল হারাম (কা'বা শরীফ) ও মসজিদে আকসা (প্যালেষ্টাইনের জেরুজালেমের মসজিদ)।” (বুখারী ১৯৯৫, মুসলিম ১৩৯৭ নং)
উত্তরঃ না। উক্ত সফর নিষিদ্ধ সফরের পর্যায়ভুক্ত নয়। কারণ মসজিদের বর্কতলাভের উদ্দেশ্যে সে সফর করা হয় না। বরং উক্ত সফর ইল্ম তলবের সফর হিসাবে পরিগণিত। আর ইল্ম তলবের জন্য সফর নিষিদ্ধ নয়। সলফে সালেহীন ইল্ম তলবের জন্য দূর- দূরান্তের পথ সফর করেছেন। আর মহানবী বলেছেন, "যে ব্যক্তি এমন পথ অবলম্বন ক'রে চলে, যাতে সে ইল্ম (শরয়ী জ্ঞান) অন্বেষণ করে, আল্লাহ তার বিনিময়ে তার জন্য জান্নাতে যাওয়ার পথ সহজ ক'রে দেন।” (মুসলিম ২৬৯৯নং, আবু দাউদ, তিরমিযী, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ, ইবনে হিব্বান, হাকেম)
প্রশ্নঃ তারাবীহর নামাযের মাঝে-মধ্যে পঠনীয় কোন নির্দিষ্ট দুআ বা দরূদ আছে কি?
উত্তর: তারাবীহর নামাযের দুই বা চার রাকআত পড়ে অথবা সবশেষে পঠনীয় নির্দিষ্ট কোন দুআ-দরূদ নেই। এ স্থলে নির্দিষ্ট কোন দুআ বা দরূদ সশব্দে বা নিঃশব্দে, একাকী বা সমবেত সুরে পড়লে বিদআত বলে পরিগণিত হবে। রাসূলুল্লাহ বলেন, “যে ব্যক্তি আমার এই দ্বীনে (নিজের পক্ষ থেকে) কোন নতুন কথা উদ্ভাবন করল---যা তার মধ্যে নেই, তা প্রত্যাখ্যানযোগ্য।” (বুখারী ও মুসলিম) মুসলিমের অন্য এক বর্ণনায় আছে, "যে ব্যক্তি এমন কাজ করল, যে ব্যাপারে আমাদের নির্দেশ নেই তা বর্জনীয়।”
প্রশ্ন: ফজরের আযানের পূর্বে মাইকে কুরআন, দুআ (বা গজল) পড়া, অনুরূপ জুমআর খুতবার পূর্বে ক্বারীর কুরআন পড়া (বা কারো বক্তৃতা করা) কি শরীয়তসম্মত?
উত্তর: না। এমন কাজ শরীতসম্মত নয়। কুরআন পড়া ভাল কাজ হলেও উক্ত সময়ে পড়া বিদআত হবে। কারণ, তার কোন দলীল নেই। কাজ ভাল বলেই তো শরীয়ত কর্তৃক নির্ধারিত সময়, পরিমাণ বা পদ্ধতির বাইরে তা করলে বিদআত হয়। পক্ষান্তরে কাজ খারাপ হলে তো তাকে 'হারাম' বলা হয়। পরন্ত বিদআতের 'ভাল-মন্দ' (হাসানাহ- সাইয়িআহ) বলে কোন প্রকার নেই। যেহেতু 'কুন্নু বিদআতিন য়ালালাহ'। অর্থাৎ, প্রত্যেকটি বিদআতই ভ্রষ্টতা। (লাদা)
প্রশ্ন: জামাআত চলাকালে ইমাম রুকু অবস্থায় থাকলে অনেক নামাযী বিভিন্ন আচরণের মাধ্যমে রুকূতে দেরী করতে বলে। যাতে সে রুকু বা রাকআত পেয়ে যায়। কেউ দৌড়ে আসে, কেউ সজোরে পদক্ষেপ করে, কেউ গলা-সাড়া দেয়, কেউ 'ইন্নাল্লাহা মাআস্ স্বাবেরীন' বলে। শরীয়তের দৃষ্টিতে এমন কাজ বৈধ কি?
উত্তর: তাদের এমন কাজ বৈধ নয়। যেহেতু মহানবী বলেন, "নামাযের ইকামত হয়ে গেলে তোমরা দৌড়ে এসো না। বরং তোমরা স্বাভাবিকভাবে চলে এসো। আর তোমাদের মাঝে যেন স্থিরতা থাকে। অতঃপর যেটুকু নামায পাও, তা পড়ে নাও এবং যা ছুটে যায়, তা পুরা করে নাও।” (বুখারী ৬৩৫, মুসলিম ৬০২নং)
আভাষে-ইঙ্গিতে ইমামকে অপেক্ষা করতে বলায় রয়েছে বেআদবি। তাতে সকল নামাযীর ডিস্টার্ব হয় এবং তাদের মনোযোগ ও বিনয় বিনষ্ট হয়ে যায়। (ইজি)
প্রশ্ন: রুকু অবস্থায় কারো আসা বুঝতে পারলে ইমামের জন্য রুকু লম্বা করা কি বিধেয়?
উত্তর: এতটুকু সময় অপেক্ষা করা বৈধ, যাতে নামাযরত নামাযীদের মনে বিরক্তি না আসে। কারণ বাইরে থেকে আগন্তুক ব্যক্তি অপেক্ষা তাদের অবস্থার খেয়াল রাখা অধিক জরুরী। বিশেষ ক'রে শেষ রাকআতে রুকু পাইয়ে দেওয়ায় লাভ এই হয় যে, তার নামায ও জামাআত পাওয়া হয়ে যায়। নবী বলেছেন, "যে ব্যক্তি নামাযের এক রাকআত পেল, সে নামায পেয়ে গেল।” (বুখারী ৫৮০, মুসলিম ৬০৭নং)
অনুরূপ শেষ তাশাহহুদ পাইয়ে দেওয়ার জন্য কিঞ্চিৎ দেরি করায় দোষ নেই। (ইবা)
প্রশ্নঃ সূরা ফাতিহা না পড়লে যদি নামায না হয়, তাহলে রুকু পেলে রাকআত গণ্য হয় কীভাবে?
উত্তর: প্রত্যেক বিষয়ের ব্যতিক্রম অবস্থা থাকে। রুকু পেলে রাকআত গণ্য হওয়ার ব্যাপারটাও সেই রকম। কিয়াম নামাযের রুক্স। কিন্তু অসুবিধার ক্ষেত্রে কিয়াম ছাড়া নামায হয়ে যায়। আবু বাকরাহ একদা মসজিদ প্রবেশ করতেই দেখলেন, নবী রুকুতে চলে গেছেন। তিনি তাড়াহুড়ো ক'রে কাতারে শামিল হওয়ার আগেই রুকু করলেন। অতঃপর রুকুর অবস্থায় চলতে চলতে কাতারে গিয়ে শামিল হলেন। এ কথা নবী-কে বলা হলে তিনি তাঁর উদ্দেশ্যে বললেন, "আল্লাহ তোমার আগ্রহ আরো বৃদ্ধি করুন। আর তুমি দ্বিতীয় বার এমনটি করো না। (অথবা আর তুমি ছুটে এসো না। অথবা তুমি নামায ফিরিয়ে পড়ো না।)” (বুখারী, আবু দাউদ, মিশকাত ১১১০নং)
প্রশ্নঃ নামায ছুটে গেলে কাযা পড়ব কখন? আগামী ওয়াক্ত অথবা আগামী দিনের ঐ নামাযের সময় পর্যন্ত কি পিছিয়ে দেওয়া চলে?
উত্তর: আগামীতে যখনই সময় পাওয়া যাবে, তখনই তা পড়ে নিতে হবে। নিষিদ্ধ সময়েও তা পড়া যাবে। আগামী ওয়াক্ত পর্যন্ত বিলম্ব করা যাবে না। মহানবী বলেন, "নিদ্রা অবস্থায় কোন শৈথিল্য নেই। শৈথিল্য তো জাগ্রত অবস্থায় হয়। সুতরাং যখন তোমাদের মধ্যে কেউ কোন নামায পড়তে ভুলে যায় অথবা ঘুমিয়ে পড়ে, তখন তার উচিত, স্মরণ হওয়া মাত্র তা পড়ে নেওয়া। কেননা, আল্লাহ তাআলা বলেন, "আর আমাকে স্মরণ করার উদ্দেশ্যে তুমি নামায কায়েম কর।” (ত্বাহাঃ ১৪, মুসলিম, মিশকাত ৬০৪নং)
প্রশ্ন: নামায কাযা রেখে মারা গেলে অনেকে হিসাব ক'রে ছেড়ে দেওয়া নামাযের 'কাফ্ফারা' আদায় করে, তা কি বিধেয়?
উত্তর: রোগী ব্যক্তির জন্য নামায মাফ নয়। যতক্ষণ জ্ঞান থাকে, ততক্ষণ তাকে নামায পড়তে হবে। ছুটে গেলে কাযা পড়ে নিতে হবে। এটাই তার কাফ্ফারা। মহানবী বলেছেন,
مَن نَسِيَ صَلاَةً أَو نَامَ عَنهَا فَكَفَّارَتُهُ أَن يُصَلِّيَهَا إِذَا ذَكَرَهَا). وفي رواية : (لا كَفَّارَةً لَهَا إِلَّا ذَلِكَ).
"যখন কেউ কোন নামায পড়তে ভুলে যায় অথবা ঘুমিয়ে পড়ে, তখন তার কাফফারা হল স্মরণ হওয়া মাত্র তা পড়ে নেওয়া।” অন্য এক বর্ণনায় আছে, "(এই কাযা আদায় করা ছাড়া) এর জন্য আর অন্য কোন কাফফারা নেই।” (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত ৬০৩নং) পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃত নামায ছেড়ে মারা গেছে, তার তরফ থেকে চাল বা টাকার কাফফারা আদায় করলেও কোন কাজের নয়। কাজের নয় তার নামে দান-খয়রাত বা অন্য কোন ঈসালে সওয়াব করা।
প্রশ্নঃ কোন ব্যক্তি নামায রেখে মারা গেলে তার তরফ থেকে তা আদায় ক'রে দেওয়া যায় কি না?
উত্তর: না। কারণ নামাযে নায়েবি চলে না। কেউ আদায় ক'রে দিলেও তা উপকারী হবে না। (লাদা) আর সে ব্যক্তি যদি ইচ্ছাকৃত নামায ত্যাগ না ক'রে থাকে, তাহলে কোন ক্ষতি হবে না।
প্রশ্নঃ সামনে আগুন অথবা জ্বলন্ত বাতি বা ধূপ থাকলে নামায পড়া বৈধ কি?
উত্তর: সামনে আগুন রেখে নামায পড়তে উলামাগণ নিষেধ করেন। কারণ তাতে অগ্নিপূজকদের সাদৃশ্য সাধন হয়। পক্ষান্তরে জ্বলন্ত কেরোসিন বা মোমবাতি, ইলেক্ট্রিক বাল্ব বা হিটার অথবা ধূপ ইত্যাদি সামনে থাকলে নামায পড়া অবৈধ নয়। কারণ অগ্নিপূজকরা এইভাবে অগ্নিপূজা করে না এবং সে সব জ্বলন্ত জিনিস তা'যীমের জন্যও সামনে রাখা হয় না। (ইউ)
প্রশ্নঃ যে ইমাম ঠিকভাবে কুরআন পড়তে জানে না, তার পিছনে নামায শুদ্ধ কি?
উত্তর: যে ইমাম শুদ্ধভাবে কুরআন পড়তে পারে না এবং এমনভাবে কুরআন পড়ে, যাতে তার মানেই বদলে যায়, সে ইমামের পিছনে নামায শুদ্ধ নয়। বিশেষ ক'রে সেই জামাআতে যদি শুদ্ধ ক'রে কুরআন পড়ার মতো কোন লোক থাকে। (ইউ)
প্রশ্ন: ইমামের সালাম ফিরার পর তিনি কি মসবুকের সুতরাহ থাকেন?
উত্তর: না। সুতরাং তার সামনে দিয়ে পার হওয়া বৈধ নয় এবং কেউ পার হতে চাইলে তার বাধা দেওয়া জরুরী। (ইউ)
প্রশ্নঃ যে নামাযী দাড়ি চাঁছে অথবা গাঁটের নিচে কাপড় ঝোলায়, তার পিছনে নামায পড়া শুদ্ধ কি?
উত্তর: এ ব্যাপারে একটি সাধারণ নীতি হল: যার নিজের নামায শুদ্ধ, তার পিছনে নামায শুদ্ধ। কাফের বা মুশরিকের নামায শুদ্ধ নয়, তার পিছনে নামায শুদ্ধ নয়। ফাসেকের নামায শুদ্ধ, তার পিছনে নামায শুদ্ধ। তবে তাকে ইমাম বানানো উচিত নয়। (ইউ) সুতরাং যে ইমাম দাড়ি চাঁছে বা ছোট ক'রে ছাঁটে, গাঁটের নিচে কাপড় ঝোলায়, বিড়ি-সিগারেট খায়, ব্যাংকের সূদ খায়, বউ-বেটিকে শরয়ী পর্দা করে না, কোন অবৈধ মেয়ের সাথে ফষ্টিনষ্টি করে, মিথ্যা বলে, গীবত করে, অথবা আরো কোন কাবীরা গোনাহর কাজ করে, তার পিছনে নামায হয়ে যাবে। তবে এমন লোককে ইমাম বানানো উচিত নয় জামাআতের। কিন্তু জামাআতের মধ্যে সেই যদি সবার চাইতে ভাল লোক হয়, তাহলে 'যেমন হাঁড়ি তেমনি শরা, যেমন নদী তেমনি চরা।'
প্রশ্ন: নামায পড়তে দাঁড়ানোর পর যদি বাসার কলিং-বেল বারবার বেজে ওঠে এবং বাসায় এ নামাযী ছাড়া অন্য কেউ না থাকে, তাহলে সে কী করতে পারে?
উত্তর: নফল নামায হলে তো সহজ। কিন্তু ফরয নামায হলে পুরুষ 'সুবহানাল্লাহ' বলে এবং মহিলা হাতের চেটো দ্বারা শব্দ ক'রে জানিয়ে দেবে যে, সে নামায পড়ছে। তাতেও যদি বেল বেজেই যায় এবং বুঝতে পারে আগন্তুক বা ব্যাপারটা গুরুত্বপূর্ণ, তাহলে নামায ছেড়ে দিয়ে দরজা খুলে এসে পুনরায় নামায শুরু করবে। (ইবা)
প্রশ্নঃ যোহরের নামায পড়ার কিছু পরে আমার স্মরণ হল, আমি তিন রাকআত নামায পড়েছি। এখন আমি কী করব? আরও এক রাকআত পড়ে নিয়ে নিয়মিত সহু সিজদা করব, নাকি পুনরায় নতুন ক'রে চার রাকআত পড়ব?
উত্তর: অল্প সময় (যেমন পাঁচ মিনিটের) ভিতরে মনে পড়লে এবং তখনও মসজিদে অথবা নিজ মুসাল্লায় থাকলে আরও এক রাকআত পড়ে নিয়মিত সহু সিজদা ক'রে নেবেন। পক্ষান্তরে সময় লম্বা হয়ে গেলে এবং মসজিদ অথবা মুসাল্লা ছেড়ে চলে গেলে পুনরায় নতুন ক'রে চার রাকআত পড়বেন। যেহেতু তখন রাকআতগুলির ধারাবাহিকতা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। (ইজি)
প্রশ্ন: ছবিযুক্ত পোশাক পরে নামায বৈধ কি?
উত্তর: প্রাণী, মূর্তি, ত্রিশূল, ক্রুশ ইত্যাদির ছবিযুক্ত অথবা বিভিন্ন লেখাযুক্ত পোশাক পরে নামায বৈধ নয়। এমন ছবিযুক্ত পোশাক পরে নামায বৈধ নয়, যাতে নিজের অথবা অপরের দৃষ্টি ও মন আকৃষ্ট হয়। (ইজি)
প্রশ্ন: কারণবশতঃ একা নামায পড়তে হলে ইক্বামত দেওয়ার মান কী?
উত্তর: একা নামাযীর জন্য ইক্বামত দেওয়া জরুরী নয়। যেমন জেহরী নামাযে সশব্দে ক্বিরাআত পড়াও জরুরী নয়। এ শুধু জামাআতের নামাযের ক্ষেত্রে জরুরী। (ইজি)
প্রশ্ন: অনেক সময় একা দাঁড়িয়ে নামায পড়ি, তখন কেউ এসে আমার ডান পাশে দাঁড়িয়ে গেলে আমার কী করা উচিত?
উত্তর: ইমামতির নিয়ত ক'রে সশব্দে তকবীর বলা এবং জেহরী নামায হলে সশব্দে ক্বিরাআত করা উচিত। কেউ বাম দিকে দাঁড়িয়ে গেলে তাকে টেনে ডান দিকে ক'রে নেওয়া উচিত। এমনটি করেছিলেন রসূল ইবনে আব্বাসের সাথে। (বুখারী ১১৭, মুসলিম ৭৬৩নং)
এ ক্ষেত্রে আপনি সুন্নত আর সে ফরয পড়লে অথবা এর বিপরীত হলেও কোন ক্ষতি হবে না। মুআয বিন জাবাল মহানবী-এর সাথে তাঁর মসজিদে (নববীতে) নামায পড়তেন। অতঃপর নিজ গোত্রে ফিরে এসে ঐ নামাযেরই ইমামতি করতেন। (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত ১১৫০ নং) পরবর্তী ইমামতির নামাযটি তাঁর নফল হতো। অনুরূপ পূর্বে নামায পড়ে পুনরায় মসজিদে এলে এবং সেখানে জামাআত চলতে থাকলে সে নামাযও নফল স্বরূপ পড়তে বলা হয়েছে। (আবু দাউদ ৫৭৫, তিরমিযী ২১৯, নাসাঈ, মিশকাত ১১৫২, সঃ জামে' ৬৬৭নং)
মহানবী একদা এক ব্যক্তিকে একাকী নামায পড়তে দেখলে তিনি অন্যান্য সাহাবীদের উদ্দেশ্যে বললেন, "এমন কেউ কি নেই, যে এর সাথে নামায পড়ে একে (জামাআতের সওয়াব) দান করে?” এ কথা শুনে এক ব্যক্তি উঠে তার সাথে নামায পড়ল। (আবু দাউদ ৫৭৪, তিরমিযী, মিশকাত ১১৪৬ নং) অথচ সে মহানবী-এর সাথে ঐ নামায পূর্বে পড়েছিল।
প্রশ্ন: সউদী আরবের অধিকাংশ লোকেরা নামাযে 'জালসায়ে ইস্তিরাহাহ' করে না কেন?
উত্তর: সেখানার অধিকাংশ উলামা মনে করেন, তা সুন্নত নয়। কারণ নবী-এর নামায-পদ্ধতির অধিকাংশ হাদীসে তা বর্ণিত হয়নি। কেবল মালেক বিন হুয়াইরিসের একটিমাত্র হাদীসে তা বর্ণিত হয়েছে। (বুখারী ৮/১৮নং) আর তাঁরা মনে করেন, নবী বার্ধক্য অথবা অন্য কারণে উক্ত (দ্বিতীয় বা চতুর্থ রাকআতে ওঠার পূর্বে) বৈঠকে বসেছেন। তবে সঠিক এই যে উক্ত 'জালসাহ' সর্বদা মুস্তাহাব। আর অন্য বর্ণনায় উল্লেখ না হওয়া এ কথার দলীল নয় যে, তা সুন্নত বা মুস্তাহাব নয়। যেহেতু নবী যে কাজ করেন, সাধারণতঃ তা অনুসরণীয় তরীকা হিসাবেই করেন। তাছাড়া আবু হুমাইদ সায়েদীর হাদীসেও উক্ত জালসার কথা উল্লেখ হয়েছে। তিনি দশজন সাহাবীর সামনে ঐ জালসাহ ক'রে নবী-এর নামাযের পদ্ধতি বর্ণনা করেছেন এবং সকলেই তা সমর্থন করেছেন। (আহমদ ৫/৪২৪, আবু দাউদ ৭৩০নং) (লাদা)
প্রশ্ন: অধিকাংশ বাঙ্গালী মহিলারা শাড়ি পরে নামায পড়ে। তাতে অনেক সময় তার হাতের বাজু বের হয়ে যায়। সুতরাং তার নামায কি শুদ্ধ হবে?
উত্তর: সামনে কোন বেগানা পুরুষ না থাকলে মহিলা তার নামাযে কেবল চেহারা ও কব্জি পর্যন্ত দুই হাত বের ক'রে রাখবে। এ ছাড়া অন্য কোন অঙ্গ বের হয়ে গেলে তার নামায বাতিল হয়ে যাবে। তা ফিরিয়ে পড়তে হবে। এমনকি পায়ের পাতাও বের হয়ে গেলে নামায শুদ্ধ নয়। (ইবাঃ)
প্রশ্নঃ যোহরের পূর্বে ৪ রাকআত সুন্নত এক সালামে পড়া চলে কি?
উত্তর: যোহরের পূর্বে ও পরে এবং আসরের পূর্বে ৪ রাকআত সুন্নত ২ রাকআত ক'রে পড়ে সালাম ফিরা উত্তম। কারণ, মহানবী বলেন, "রাত ও দিনের নামায ২ রাকআত ক'রে।” (আবু দাউদ) তবে একটানা ৪ রাকআত এক সালামেও পড়া বৈধ। মহানবী বলেন, “যোহরের পূর্বে ৪ রাকআত; (যার মাঝে কোন সালাম নেই,) তার জন্য আসমানের দরজাসমূহ উন্মুক্ত করা হয়।” (আবু দাউদ ১২৭০, ইবনে মাজাহ ১১৫৭, ইবনে খুযাইমা ১২১৪, সহীহুল জামে' ৮৮৫নং)
আল্লামা আলবানীর শেষ তাহক্বীকে বন্ধনীর মাঝের শব্দগুলি সহীহ নয়। কিন্তু অন্য বর্ণনা দ্বারা ৪ রাকআত এক সালামে পড়ার সমর্থন মেলে। আবু আইয়ুব আনসারী বলেন, নবী সূর্য ঢলার সময় ৪ রাকআত নামায প্রত্যহ পড়তেন। একদা আমি বললাম, 'হে আল্লাহর রসূল! আপনি সূর্য ঢলার সময় এই ৪ রাকআত প্রত্যহ পড়ছেন?' তিনি বললেন, "সূর্য ঢলার সময় আসমানের দরজাসমূহ খোলা হয় এবং যোহরের নামায না পড়া পর্যন্ত বন্ধ করা হয় না। অতএব আমি পছন্দ করি যে, এই সময় আমার নেক আমল (আকাশে আল্লাহর নিকট) উঠানো হোক।” আমি বললাম, 'তার প্রত্যেক রাকআতেই কি ক্বিরাআত আছে?' তিনি বললেন, "হ্যাঁ।” আমি বললাম, 'তার মাঝে কি পৃথককারী সালাম আছে?' তিনি বললেন, "না।” (মুখতাসারুশ শামাইলিল মুহাম্মাদিয়্যাহ, আলবানী ২৪৯নং)
আলী বলেন, 'নবী আসরের পূর্বে ৪ রাকআত নামায পড়তেন এবং প্রত্যেক দুই রাকআতে আল্লাহর নিকটবর্তী ফিরিশ্তা, আম্বিয়া ও তাঁদের অনুসারী মুমিন-মুসলিমদের প্রতি সালাম (তাশাহহুদ) দিয়ে তা পৃথক করতেন। আর সর্বশেষে সালাম ফিরতেন।' (আহমদ, তিরমিযী, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ, সিঃ সহীহাহ ২৩৭নং)
প্রশ্নঃ কোন কোন মহিলা ঋতু বন্ধের পরেও গোসল করতে দেরি করে। অতঃপর যখন গোসল করে, তারপর থেকে নামায পড়তে শুরু করে। তাদের এমন কাজ কি বৈধ? যেমন এক মহিলার আসরের সময় খুন বন্ধ হল। অতঃপর নিশ্চিত হওয়ার অপেক্ষায় থেকে রাত্রে আর গোসল করল না। পরদিন দুপুরে গোসল ক'রে যোহরের নামায পড়ল। গোসল করার পূর্বে যে নামাযগুলি ছেড়ে দিল, সেগুলি কি মাফ?
উত্তর: অবশ্যই মাফ নয়। তার উচিত, যথাসময়ে গোসল ক'রে নামায শুরু করা। কোন বৈধ কারণে যদি গোসল করতে দেরিও হয়, তাহলে খুন বন্ধ হওয়ার পর থেকে যে নামায ছুটে গেছে, সেগুলি কাযা পড়তে হবে। নামায নিজের ইচ্ছামতো পড়ার জিনিস নয়। মিথ্যা ওজর দিয়ে এড়িয়ে গিয়ে সম্মান বাঁচানোর জিনিস নয়। মহান আল্লাহর কাছে হিসাব লাগবে। মানুষকে ঠকানো গেলেও, তাঁকে ঠকানো যাবে না। তিনি বলেছেন,
{فَخَلَفَ مِن بَعْدِهِمْ خَلْفٌ أَضَاعُوا الصَّلَاةَ وَاتَّبَعُوا الشَّهَوَاتِ فَسَوْفَ يَلْقَوْنَ غَيًّا } (٥٩)
অর্থাৎ, তাদের পর এল অপদার্থ পরবর্তিগণ, তারা নামায নষ্ট করল ও প্রবৃত্তিপরায়ণ হল; সুতরাং তারা অচিরেই অমঙ্গল প্রত্যক্ষ করবে। (মারয়্যাম : ৫৯)
{ فَوَيْلٌ لِّلْمُصَلِّينَ (٤) الَّذِينَ هُمْ عَن صَلَاتِهِمْ سَاهُونَ (٥) الَّذِينَ هُمْ يُرَاؤُونَ} (٦) الماعون
অর্থাৎ, সুতরাং পরিতাপ সেই নামায আদায়কারীদের জন্য; যারা তাদের নামাযে অমনোযোগী। যারা লোক প্রদর্শন (ক'রে তা আদায়) করে। (মাউন: ৪-৬)
প্রশ্ন: কিছু নামাযী জামাআত শুরু হওয়ার পর আসে। কিন্তু তারা রাকআত বা রুকু পাওয়ার জন্য দৌড়ে আসে। ফলে তাদের পায়ের শব্দে অন্য নামাযীদের বড় ডিস্টার্ব হয়। এ কাজ কি তাদের জন্য বৈধ?
উত্তর: জামাআতে শামিল হওয়ার জন্য দৌড়ে আসা বৈধ নয়। যেহেতু মহানবী বলেন, "নামাযের ইকামত হয়ে গেলে তোমরা দৌড়ে এস না। বরং তোমরা স্বাভাবিকভাবে চলে এস। আর তোমাদের মাঝে যেন স্থিরতা থাকে। অতঃপর যেটুকু নামায পাও তা পড়ে নাও এবং যা ছুটে যায় তা পুরা করে নাও।” (বুখারী ৬৩৬, মুসলিম ৬০২নং)
প্রশ্ন: মসবুক নামাযীর ইক্তিদা ক'রে জামাআত করা বৈধ কি?
উত্তরঃ যদি কোন নামাযী মসজিদে এসে দেখে যে, জামআত শেষ হয়ে গেছে, কিন্তু কিছু মসবুক (যাদের কিছু নামায ছুটে গেছে তারা) উঠে একাকী নামায পূর্ণ করছে, তাহলে জামাআতের সওয়াব লাভের আশায় ঐ নামাযীর কোন এক মসবুকের ডাইনে দাঁড়িয়ে তার ইক্তিদা ক'রে নামায পড়া বৈধ। (ফাতাওয়া ইসলামিয়্যাহ ১/২৬৬) কিন্তু যেহেতু সঠিক প্রমাণ নেই এবং অনেকে এরূপ শুদ্ধ নয় বলেছেন, সেহেতু তা না করাই উত্তম। আর মহানবী বলেন, "যে বিষয়ে সন্দেহ আছে সে বিষয় বর্জন করে তাই কর যাতে সন্দেহ নেই।” (তিরমিযী ২৫১৮, সহীহ জামে' ৩৩৭৮নং) "সুতরাং যে সন্দিহান বিষয়াবলী থেকে দূরে থাকবে, সে তার দ্বীন ও ইজ্জতকে বাঁচিয়ে নেবে।” (বুখারী ৫২, মুসলিম ১৫৯৯নং)
বলা বাহুল্য, অনেকে তা জায়েয বললেও না করাটাই উত্তম। (ফাতাওয়া উষাইমীন ১/৩৭১)
প্রশ্ন: অনেক সময় একাকী নামায পড়তে হলে ইকামত দেওয়া এবং রাতের নামায সশব্দে পড়া জরুরী কি?
উত্তর: একাকী নামাযীর জন্য ইকামত দেওয়া এবং রাতের নামায সশব্দে পড়া জরুরী নয়। এ কেবল জামাআতের জন্য জরুরী। (ইজি)
প্রশ্ন: কাতারে জায়গা না পেলে একা দাঁড়িয়ে নামায হবে কি?
উত্তর: কাতারে জায়গা না পাওয়ার কথা যদি বাস্তব হয় এবং সঙ্গে দাঁড়াবার মতো কাউকে না পাওয়া যায়, তাহলে একা দাঁড়িয়েই নামায হয়ে যাবে। কাতারের পিছনে একা দাঁড়িয়ে নামায হবে না তখন, যখন সামনের কাতারে জায়গা খালি থাকবে। সুতরাং এটি হবে ব্যতিক্রমধর্মী ব্যাপার। যেহেতু কাতার থেকে কাউকে টেনে নেওয়ার হাদীস সহীহ নয়। আর সে টানাতে অনেক নামাযীর নামাযের একাগ্রতায় ব্যাঘাত সৃষ্টি করে। (ইউ) নাক থেকে রক্ত পড়তে শুরু করলে অথবা উযূ নষ্ট হয়ে গেলে তো বাধ্য হয়ে যেতেই হয়। আর তার ফলে সৃষ্ট ব্যাঘাত সামনে থেকে কাউকে টেনে নেওয়ার মতো নয়। যেহেতু একটা ব্যাপার বাদলীল এবং অপরটি বেদলীল।
প্রশ্ন: কাতারের পিছে একা নামাযীর নামায হয় না। কিন্তু আগের কাতারে জায়গা না পেলে কী করবে? সামনে থেকে কি কাউকে টেনে নেবে?
উত্তর: যদি কোন ব্যক্তি জামাআতে এসে দেখে যে, কাতার পরিপূর্ণ, তাহলে সে কাতারে কোথাও ফাঁক থাকলে সেখানে প্রবেশ করবে। নচেৎ সামান্যক্ষণ কারো অপেক্ষা করে কেউ এলে তার সঙ্গে কাতার বাঁধা উচিত। সে আশা না থাকলে বা জামাআত ছুটার ভয় থাকলে (মিহরাব ছাড়া বাইরে নামায পড়ার সময়) যদি ইমামের পাশে জায়গা থাকে এবং সেখানে যাওয়া সম্ভব হয়, তাহলে তার পাশে গিয়ে দাঁড়াবে এবং এ সব উপায় থাকতে পিছনে একা দাঁড়াবে না।
পরম্ভ কাতার বাঁধার জন্য সামনের কাতার থেকে কাউকে টেনে নেওয়া ঠিক নয়। এ ব্যাপারে যে হাদীস এসেছে তা সহীহ ও শুদ্ধ নয়। (যয়ীফুল জামে' ২২৬১নং) তাছাড়া এ কাজে একাধিক ক্ষতিও রয়েছে। যেমন; যে মুসল্লীকে টানা হবে তার নামাযের একাগ্রতা নষ্ট হবে, প্রথম কাতারের ফযীলত থেকে বঞ্চিত হবে, কাতারের মাঝে ফাঁক হয়ে যাবে, সেই ফাঁক বন্ধ করার জন্য পাশের মুসল্লী সরে আসতে বাধ্য হবে, ফলে তার জায়গা ফাঁক হবে এবং শেষ পর্যন্ত প্রথম বা সামনের কাতারের ডান অথবা বাম দিককার সকল মুসল্লীকে নড়তে-সরতে হবে। আর এতে তাদের সকলের একাগ্রতা নষ্ট হবে। অবশ্য হাদীস সহীহ হলে এত ক্ষতি স্বীকার করতে বাধা ছিল না। যেমন নাক থেকে রক্ত পড়তে শুরু হলে কিংবা ওযু ভেঙ্গে গেলে কাতার ছেড়ে আসতে বাধা নেই। যেহেতু নবী বলেন, “যখন তোমাদের কেউ নামাযে বেওযূ হয়ে যায়, তখন সে যেন নাক ধরে নামায ত্যাগ ক'রে বেরিয়ে আসে।” (আবু দাউদ ১১১৪নং)
তদনুরূপ ইমামের পাশে যেতেও যদি অনুরূপ ক্ষতির শিকার হতে হয়, তাহলে তাও করা যাবে না।
ঠিক তদ্রূপই জায়গা না থাকলেও কাতারের মুসল্লীদেরকে এক এক করে ঠেলে অথবা সরে যেতে ইঙ্গিত করে জায়গা ক'রে নেওয়াতেও ঐ মুসল্লীদের নামাযের একাগ্রতায় বড় ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়। সুতরাং এ কাজও বৈধ নয়।
বলা বাহুল্য, এ ব্যাপারে সঠিক ফায়সালা এই যে, সামনে কাতারে জায়গা না পেলে পিছনে একা দাঁড়িয়েই নামায হয়ে যাবে। কারণ, সে নিরুপায়। আর মহান আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যের বাইরে ভার দেন না। (লিক্বাউ বাবিল মাফতুহ ২২৭পৃঃ)
প্রকাশ থাকে যে, মহিলা জামাআতের মহিলা কাতারে জায়গা থাকতে যে মহিলা পিছনে একা দাঁড়িয়ে নামায পড়বে তারও নামায পুরুষের মতই হবে না। (মুমতে' ৪/৩৮-৭) পক্ষান্তরে পুরুষদের পিছনে একা দাঁড়িয়ে মহিলার নামায হয়ে যাবে।
প্রশ্নঃ মুশরিক ও বিদআতী ইমামের পিছনে নামায শুদ্ধ কি? যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কোন ইবাদতে অন্য কোন সৃষ্টিকে শরীক করে, যেমন মাযার পূজা করে, মাযারে গিয়ে সিজদা, নযর-নিয়ায, মানত, কুরবানী, তওয়াফ প্রভৃতি নিবেদন করে, সেখানে সুখ-সমৃদ্ধি বা সন্তান চায়, সাহায্য প্রার্থনা করে, যে ব্যক্তি গায়বী (অদৃশ্যের খবর জানার) দাবী করে ও লোকের হাত বা ভাগ্য-ভবিষ্যত বলে দেয়, যে (কোন পশু বা পাখীর চামড়া, হাড়, লোম বা পালক দিয়ে, কোন গাছপালার শিকড় বা ফুল-পাতা দিয়ে, কারো কাপড়ের কোন অংশ দিয়ে, ফিরিশ্তা, জিন, নবী, সাহাবী, ওলী বা শয়তানের নাম লিখে অথবা বিভিন্ন সংখ্যার নকশা বানিয়ে, অথবা তেলেস্মাতি বিভিন্ন কারসাজি করে, নোংরা ও নাপাক কোন জিনিস দিয়ে) শিকী তাবীয লিখে, যে ব্যক্তি দুই জনের মাঝে (বিশেষ করে স্বামী-স্ত্রীর মাঝে) প্রেম বা বিদ্বেষ সৃষ্টি করার জন্য তাবীয করে, যোগ বা যাদু করে, এ শ্রেণীর ইমামের নামায শুদ্ধ নয়, ইমামতি শুদ্ধ নয় এবং তার পশ্চাতে নামাযও শুদ্ধ নয়। (মাজাল্লাতুল বুহূষ ১৯/১৫৯, ২২/৮২, ২৪/৭৮, ৮৯, ২৬/৯৭, ২৮/৫৫) তদনুরূপ বিদআতী যদি বিদআতে মুকাফফিরাহ বা এমন বিদআত করে যাতে মানুষ কাফের হয়ে যায়, তাহলে সে বিদআতীর পিছনে নামায শুদ্ধ নয়।
প্রশ্ন: ফাসেক ইমামের পিছনে নামায শুদ্ধ কি?
উত্তর: ফাসেক হল সেই ব্যক্তি, যে অবৈধ, হারাম বা নিষিদ্ধ কাজ করে এবং ফরয বা ওয়াজেব কাজ ত্যাগ করে; অর্থাৎ কাবীরা গোনাহ করে। যেমন, ধূমপান করে, বিড়ি- সিগারেট, জর্দা-তামাক প্রভৃতি মাদকদ্রব্য ব্যবহার করে, গাঁটের নিচে ঝুলিয়ে কাপড় পরে, অথবা সূদ বা ঘুস খায়, অথবা মিথ্যা বলে, অথবা (অবৈধ প্রেম) ব্যভিচার করে, অথবা দাড়ি চাঁছে বা (এক মুঠির কম) ছেঁটে ফেলে, অথবা মুশরিকদের যবেহ (হালাল মনে না করে) খায়, (হালাল মনে করে খেলে তার পিছনে নামায হবে না।) অথবা স্ত্রী-কন্যাকে বেপর্দা রেখে তাদের ব্যাপারে ঈর্ষাহীন হয়, অথবা মা-বাপকে দেখে না বা তাদেরকে ভাত দেয় না ইত্যাদি। উক্ত সকল ব্যক্তি এবং তাদের অনুরূপ অন্যান্য ব্যক্তির পিছনে নামায মকরূহ (অপছন্দনীয়)। বিধায় তাকে ইমামরূপে নির্বাচন ও নিয়োগ করা বৈধ ও উচিত নয়। কিন্তু যদি কোন কারণে বা চাপে পড়ে বাধ্য হয়েই তার পিছনে নামায পড়তেই হয়, তাহলে নামায হয়ে যাবে। (মাজাল্লাতুল বুহূষিল ইসলামিয়্যাহ ৫/২৯০, ৩০০, ৬/২৫১, ১৫/৮০, ১৮/৯০, ১১১, ১৯/১৫২, ২২/৭৫, ৭৭, ৯২, ২৪/৭৮) সাহাবাগণের যামানায় সাহাবাগণ ফাসেকের পিছনে নামায পড়েছেন। আব্দুল্লাহ বিন উমার হাজ্জাজের পিছনে নামায পড়েছেন। (বুখারী) আবু সাঈদ খুদরী মারওয়ানের পিছনে নামায পড়েছেন। (মুসলিম, আবু দাউদ, তিরমিযী) দ্বিতীয় খলীফা উষমান রাযিয়াল্লাহু আনহু ফিতনার সময় যখন স্বগৃহে অবরুদ্ধ ছিলেন, তখন উবাইদুল্লাহ বিন আদী বিন খিয়ার তাঁর নিকট উপস্থিত হয়ে বললেন, 'আপনি জনসাধারণের ইমাম। আর আপনার উপর যে বিপদ এসেছে, তা তো দেখতেই পাচ্ছেন। ফিতনার ইমাম আমাদের নামাযের ইমামতি করছে; অথচ তার পশ্চাতে নামায পড়তে আমরা দ্বিধাবোধ করি।' তিনি বললেন, 'নামায হল মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ আমল। সুতরাং লোকে ভালো ব্যবহার করলে তাদের সাথেও ভালো ব্যবহার কর। আর মন্দ ব্যবহার করলে তাদের সাথে মন্দ ব্যবহার করা থেকে দূরে থাক।' (বুখারী ৬৯৫, মিশকাত ৬২৩নং)
প্রশ্নঃ আমাদের মসজিদের ইমাম সাহেব ফজরের আযানের পূর্বে মাইকে কুরআন পাঠ করেন, কিছু দুআ-দরূদ পড়েন, তারপর আযান দেন। এটা কি শরীয়তসম্মত?
উত্তর: ফজরের আযানের পূর্বে মাইকে কুরআন পাঠ করা, কিছু দুআ-দরূদ পড়া, তারপর আযান দেওয়া শরীয়তসম্মত নয়, বরং তা বিদআত। (লাদা)
প্রশ্নঃ জুমআর দিন মিম্বরে চড়ে খতীবের খুতবা দেওয়ার পূর্বে একজন ক্বারী কুরআন তিলাঅত ক'রে (অথবা বক্তৃতা ক'রে) শোনায়। এটা কি শরীয়তসম্মত?
উত্তর: এ কাজের কোন দলীল আমাদের জানা নেই। আর মহানবী বলেন, "যে ব্যক্তি আমাদের এ (দ্বীন) ব্যাপারে নতুন কিছু আবিষ্কার করে, সে ব্যক্তির সে কাজ প্রত্যাখ্যাত।” (বুখারী ও মুসলিম) “যে ব্যক্তি এমন কোন কাজ করে, যার উপর আমাদের কোন নির্দেশ নেই, সে ব্যক্তির সে কাজ প্রত্যাখ্যাত।” (মুসলিম, লাদা) আমাদের আদর্শ নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তিনি মিম্বরে খুতবা দেওয়ার আগে নিচে দাঁড়িয়ে খুতবা দেননি। তিনি উম্মতকে নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, "যে ব্যক্তি জুমআর দিন নাপাকির গোসলের ন্যায় গোসল করল এবং (সূর্য ঢলার সঙ্গে সঙ্গে) প্রথম অক্তে মসজিদে এল, সে যেন একটি উট দান করল। যে ব্যক্তি দ্বিতীয় সময়ে এল, সে যেন একটি গাভী দান করল। যে ব্যক্তি তৃতীয় সময়ে এল, সে যেন একটি শিংবিশিষ্ট দুম্বা দান করল। যে ব্যক্তি চতুর্থ সময়ে এল, সে যেন একটি মুরগী দান করল। আর যে ব্যক্তি পঞ্চম সময়ে এল, সে যেন একটি ডিম দান করল। তারপর ইমাম যখন খুতবাহ প্রদানের জন্য বের হন, তখন (লেখক) ফিরিস্তাগণ যিক্র শোনার জন্য হাজির হয়ে যান।” (বুখারী ও মুসলিম) তিনি আরো বলেছেন, "যে কোন ব্যক্তি জুমআর দিন গোসল ও সাধ্যমত পবিত্রতা অর্জন করে, নিজস্ব তেল গায়ে লাগায় অথবা নিজ ঘরের সুগন্ধি (আতর) ব্যবহার করে, অতঃপর (মসজিদে) গিয়ে দু'জনের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি না করেই (যেখানে স্থান পায়, বসে যায়) এবং তার ভাগ্যে যত রাকআত নামায জোটে, আদায় করে। তারপর ইমাম খুতবা আরম্ভ করলে নীরব থাকে, সে ব্যক্তির সংশ্লিষ্ট জুমআহ থেকে পরবর্তী জুমআহ পর্যন্ত কৃত সমুদয় (সাগীরা) গুনাহরাশিকে মাফ ক'রে দেওয়া হয়।” (বুখারী) সুতরাং মসজিদে গিয়ে নামায পড়া কর্তব্য মুসল্লীদের। অতঃপর ইমাম খুতবা দিলে নীরব হয়ে বসে খুতবা শুনবে। সুতরাং তার আগে আবার খুতবা শোনার অবসর কোথায়? মিম্বরে খুতবা শুরু হওয়ার আগে কেউ না কেউ আসতেই থাকবে। সুতরাং তাদেরকে নামায পড়তে না দিয়ে লেকচার শুনিয়ে ডিস্টার্ব করা কীভাবে বৈধ হতে পারে? অথচ রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবাগণকে সশব্দে কুরআন পড়তে নিষেধ ক'রে বলেন, "তোমরা একে অপরকে কষ্ট দিয়ো না এবং একে অপরের উপর ক্বিরাআতে শব্দ উঁচু করো না।" (আহমাদ ৩/৯৪, আবু দাউদ ১২৩২নং, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ প্রমুখ) পরন্তু তিনি জুমআর দিন নামাযের পূর্বে দর্সের জন্য হালকা বাঁধতে নিষেধও করেছেন। (আবু দাউদ ৯৯১, নাসাঈ ৭১৪, ইবনে মাজাহ ১১৩৩নং) তাহলে জুমআর খুতবার পূর্বে নামাযের সময় অতিরিক্ত লেকচার কীভাবে বৈধ হতে পারে?
আসলে স্থানীয় ভাষায় খুতবা 'হারাম' ক'রে উক্ত 'লেকচারের বিদআত' আবিষ্কৃত হয়েছে।
প্রশ্ন: জুমআর সময় একজন খুতবা দিলে এবং অন্যজন নামায পড়লে ক্ষতি আছে কি?
উত্তর: একজন খুতবা দিলে এবং অপরজন ইমামতি করলে কোন দোষের নয়। যেহেতু যিনি খতীব, তিনিই ইমাম হবেন---এমন কোন বাধ্যবাধকতা নেই। অবশ্য উত্তম হল, যিনি খুতবা দেবেন, তিনিই নামায পড়াবেন। যেহেতু এটাই নবী-এর আমল। (ইবা) আর কোন অসুবিধার কারণে হলে তো কোন প্রশ্নই নেই। যেমন খতীব খুতবায় ভাল, কিন্তু ইমাম ইমামতির বেশি হকদার হলে---সে ক্ষেত্রেও তাঁকে ইমামতির জন্য বাড়িয়ে দিলে সুন্নাহর উপরই আমল হয়।
প্রশ্ন: অনেক নামাযী নামাযরত অবস্থায় নাক, দাড়ি বা কাপড় ইত্যাদি নিয়ে খেলা করে। এদের ব্যাপারে কিছু বলার আছে কি?
উত্তর: নামাযরত অবস্থায় নাক, দাড়ি ইত্যাদি নিয়ে উদাস হওয়া উচিত নয়। যেহেতু তা নামাযের একাগ্রতার পরিপন্থী। আর মহান আল্লাহ বলেছেন,
{ قَدْ أَفْلَحَ الْمُؤْمِنُونَ (۱) الَّذِينَ هُمْ فِي صَلَاتِهِمْ خَاشِعُونَ} (۲) سورة المؤمنون
অর্থাৎ, অবশ্যই বিশ্বাসিগণ সফলকাম হয়েছে। যারা নিজেদের নামাযে বিনয়-নম্র। (মু'মিনূনঃ ১-২)
প্রশ্নঃ নামাযের শেষ তাশাহহুদে কি নিজের ভাষায় দুআ করা যায়?
উত্তর: অনেক উলামার মতে বৈধ নয়। যেহেতু নামায আল্লাহ ও তাঁর রসূলের ভাষায়, সুতরাং সেই ভাষাতেই দুআ হওয়া উচিত। যে সব কুরআনী ও হাদীসী দুআ জানা আছে, তাই পড়া উচিত। যা জানা নেই, তা নামাযের বাইরে অন্য সময় নিজের ভাষায় করা উচিত। অনেকে 'ইচ্ছামতো দুআ' বলতে 'ইচ্ছামতো ভাষা'য় দুআ বলেছেন। সুতরাং নিজের ভাষায় দুআ করা যাবে। আমরা বলি, না করাই উচিত। যেহেতু ইবাদত প্রমাণসাপেক্ষ। আর নবী-এর বাণী, "যখন তোমাদের মধ্যে কেউ (শেষ) তাশাহহুদ সম্পন্ন করবে, তখন সে যেন আল্লাহর নিকট চারটি জিনিস থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করে। এরপর সে ইচ্ছামতো দুআ করবে।” এ ব্যাপারে ইমাম আহমাদ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, 'বর্ণিত ও বিদিত দুআ করবে।' যেহেতু নিজের ভাষায় দুআ হল সাধারণ মানুষের কথা। আর তা নামাযে বলা বৈধ নয়। (আল-মুগনী ১/৬২০)
প্রশ্নঃ সিজদায় কি কুরআনী দুআ করা যায়?
উত্তর: সিজদায় কুরআনের আয়াত পড়া নিষেধ। কিন্তু মুনাজাতের দুআ হিসাবে তা পড়লে দোষ নেই। (ইউ) 'আমাকে সিজদায় কুরআন পড়তে নিষেধ করা হয়েছে' যেমনি আম, তেমনি 'তোমরা সিজদায় বেশি বেশি দুআ কর' নির্দেশও আম। তাতে কুরআনী ও হাদীসী সব রকম দুআই করা যাবে। যারকাশী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন,
مَحَلَ الْكَرَاهَةِ مَا إِذَا قَصَدَ بِهَا الْقِرَاءَةَ ، فَإِنْ قَصَدَ بِهَا الدُّعَاءَ وَالتَّنَاءَ فَيَنْبَغِي أَنْ يَكُونَ كَمَا لَوْ قَنَتَ بِآيَةٍ مِنَ الْقُرْآنِ.
অর্থাৎ, সিজদায় কুরআন পড়া মকরূহ তখন, যখন ক্বিরাআতের উদ্দেশ্যে তা পড়া হবে। পক্ষান্তরে তা যদি দুআ অথবা (আল্লাহর) প্রশংসা হিসাবে পড়া হয়, তাহলে তা কুরআনী আয়াত দিয়ে কুনুত পড়ার মতো হওয়া উচিত। (হাশিয়াতু ইবনিল আবেদীন ১/৪৪০, হাশিয়াতুদ দুসুক্বী আলাশ শারহিল কাবীর ১/২৫৩, মাজমু ৩/৪১৪)
প্রশ্নঃ কর্মক্ষেত্রে পানি নেই। বাসায় পানি আছে। নামাযের ওয়াক্ত যাওয়ার আগে বাসায় পৌঁছে যাব। নামাযের সময় হলে তায়াম্মুম ক'রে আওয়াল ওয়াক্তে নামায পড়ে নেব, নাকি বাসায় ফিরে শেষ ওয়াক্তে উযূ ক'রে নামায পড়ব?
উত্তর: সময় পার হওয়ার আশঙ্কা থাকলে এবং তার আগে পানি না পাওয়ার কথা নিশ্চিত হলে তায়াম্মুম ক'রে আওয়াল অক্তেই নামায পড়ে নেবেন। পক্ষান্তরে বাসায় ফিরে ওয়াক্ত বাকী থাকার কথা নিশ্চিত হলে বাসায় ফিরে উযূ করেই নামায পড়বেন।
প্রশ্ন: কাঁচা পিঁয়াজ-রসুন খেলে মুখের গন্ধের ফলে মসজিদে বা জামাআতে আসা নিষেধ। কিন্তু যাদের মুখে প্রকৃতিগতভাবে দুর্গন্ধ থাকে, তাদের জন্যও কি নিষেধ?
উত্তর: যাদের মুখে প্রকৃতিগতভাবে দুর্গন্ধ থাকে, তাদের জন্যও মসজিদ বা জামাআতে আসা নিষেধ বলা যায় না। যেহেতু এটা তার এখতিয়ারভুক্ত নয়। (বানী)
📄 যাকাত
প্রশ্ন: দাওয়াতের কাজের জন্য, ইসলামী বই-পুস্তক ছেপে বা ক্যাসেট-সিডি তৈরি ক'রে বিতরণের জন্য কি যাকাতের অর্থ ব্যবহার করা যায়?
উত্তর: ইসলামী দাওয়াতের কাজে যাকাতের অর্থ ব্যবহার করা যায়। যেহেতু তা আমভাবে যাকাতের একটি খাত 'ফী সাবীলিল্লাহ'র অন্তর্ভূত। (ইজি)
প্রশ্নঃ পেশাদার ভিক্ষুকদেরকে কি যাকাতের মাল দেওয়া যাবে?
উত্তর: যদি জানা যায় যে, যাজ্ঞাকারী একটি পেশাদার ভিক্ষুক, সে যাকাতের হকদার নয় এবং ভিক্ষা করা তার জন্য বৈধও নয়, তাহলে তাকে ভিক্ষাও দেবেন না। (ইজি) বিদায়ী হজ্জের সময়ে আল্লাহর রসূল সাদকাহ বিতরণ করছিলেন। এমন সময় দুটি লোক এসে তাঁর কাছে যাজ্ঞা করল। তিনি লোক দুটির দিকে নজর তুলে পুনরায় নামিয়ে নিলেন। দেখলেন, তারা উভয়ে কর্মক্ষম লোক। অতঃপর তিনি বললেন, "তোমরা যদি চাও, তাহলে আমি দিতে পারি। কিন্তু এ মালে কোন ধনী ও উপার্জনশীল কর্মঠ লোকের কোন অংশ নেই।” (আবু দাউদ ১৬৩৩নং)
প্রশ্নঃ একজন লোককে গরীব ভেবে যাকাতের অর্থ দিলাম। সেও হয়তো হাদিয়া ভেবে হাত পেতে নিয়ে নিল। কিন্তু পরবর্তীতে জানতে পারলাম, সে ধনী ব্যক্তি। এখন আমার যাকাত কি কবুল হবে?
উত্তর: কোন ব্যক্তিকে যাকাতের হকদার ভেবে যাকাত দেওয়ার পর যদি মনে হয় যে, সে আসলে যাকাতের হকদার নয়, তাহলে অজানার কারণে তা কবুল হয়ে যাবে। একদা (বনী ইসরাঈলের) এক ব্যক্তি এক রাতে অজান্তে এক চোরকে সাদকাহ করল। সকালে সে জানতে পারল যে সে চোর ছিল। কিন্তু তাতে সে আল্লাহর প্রশংসা করল। তারপরের রাতে আবার অজান্তে এক বেশ্যাকে সাদকাহ করল। সকাল বেলায় তা জানতে পেরে তার জন্যও আল-হামদু লিল্লাহ পড়ল। তৃতীয় রাতেও অজান্তে এক ধনীর হাতে সাদকাহ দিল। সকালে তা জানতে পেরে আল্লাহর প্রশংসা করল। অতঃপর (নবী অথবা স্বপ্নযোগে) তাকে বলা হল যে, তোমার সাদকাহ কবুল হয়ে গেছে। আর সম্ভবতঃ তোমার ঐ দান নিয়ে চোর চুরি করা হতে বিরত হবে, বেশ্যা বেশ্যাবৃত্তি হতে তাওবাহ করবে এবং ধনী উপদেশ গ্রহণ করে দান করতে শিখবে। (বুখারী, মুসলিম ১০২২নং)
প্রশ্ন: কাউকে যাকাত দেওয়ার সময় সে যাকাতের হকদার কি না, তা জিজ্ঞাসা করা জরুরী কি?
উত্তর: দেওয়ার সময় সে যাকাতের হকদার কিনা তা জিজ্ঞাসা করা জরুরী নয়? তাতে মুসলিমের বেইজ্জতি হয়। যদি আপনি আপনার প্রবল ধারণায় মনে করেন যে, অমুক যাকাতের হকদার, তাহলে তাকে দিয়ে ফেলুন। হাত-পাতা ফকীর না হলেও সে মিসকীন হতে পারে। অতএব আপনার সাদকাহ আদায় ও কবুল হয়ে যাবে---ইন শাআল্লাহ।
প্রশ্ন: কাউকে যাকাত দেওয়ার সময় তাকে জানিয়ে দেওয়া জরুরী কি?
উত্তর: যাকে যাকাতের মাল দিয়ে সাহায্য করা হবে, তাকে এ কথা জানানো জরুরী নয় যে, তা যাকাতের মাল। আপনি তাকে হকদার বুঝলে, তাকে দিন। সে যা মনে ক'রে গ্রহণ করবে, করুক।
প্রশ্নঃ কোন শ্রেণীর ঋণগ্রস্তকে যাকাতের মাল দিয়ে সাহায্য করতে পারা যায়?
উত্তর: যে ব্যক্তি কোন বিধেয় বা বৈধ কাজ করতে গিয়ে ঋণগ্রস্ত হয়, তাকেই যাকাত থেকে সাহায্য করা যাবে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি অবৈধ কাজ করতে গিয়ে; যেমন মদ খেতে অভ্যাসী হয়ে, বেশ্যাগমনে অথবা জুয়া খেলায় সর্বস্ব হারিয়ে ঋণগ্রস্ত হয়, তাকে যাকাত দিয়ে সাহায্য করা যাবে না। (ফিক্বহুয যাকাত ২/৬২৫)
প্রশ্ন: কাউকে ঋণ দেওয়ার পর সে যাকাতের হকদার হলে, যাকাতের নিয়তে ঋণ মওকুব ক'রে দেওয়া বৈধ কি?
উত্তর: কাউকে ঋণ দেওয়ার পর সে যাকাতের হকদার হলে, যাকাতের নিয়তে ঋণ মওকুব ক'রে দেওয়া বৈধ কি না---এ বিষয়ে উলামাদের মাঝে মতভেদ রয়েছে। অনেকে বলেছেন, নিজের টাকা বাঁচানোর উদ্দেশ্যে এমন করা বৈধ নয়। কিন্তু অন্যান্য অনেকে বলেছেন যে, যদি সত্যই সে যাকাতের হকদার হয়, তাহলে তার ঋণ মকুব করে, যাকাত থেকে শোধ করা হল, তাকে এ কথা জানিয়ে দিলে এমন কাজ বৈধ। আর আল্লাহই অধিক জানেন। (ফিক্বহুয যাকাত ২/৮৪৯)
প্রশ্ন: আমি একজন প্রবাসী। আমার যাকাত কি আমার স্বদেশের মানুষদেরকে দিতে পারব?
উত্তর: যাকাত স্থানীয় হকদারকে দেওয়াই উত্তম। তবে সেখানে যদি হকদার না থাকে অথবা অন্য জায়গার হকদার বেশি হকদার হয়, তাহলে সেখানে দেওয়া যায়। তাতে কোন বাধা নেই। (ইউ, ইজি)
প্রশ্ন: আমার মা পৃথক থাকে। আমি কি আমার মা-কে যাকাত দিতে পারি?
উত্তর: মা-কে যাকাত দেওয়া বৈধ নয়। মায়ের ভরণপোষণ করা তো ছেলের জন্য ওয়াজেব। আর তা হবে তার পকেট থেকে। অনুরূপ বাপ, স্ত্রী ও ছেলেকে যাকাত দেওয়া যাবে না। (ইবা)
প্রশ্ন: আমার স্বামী বিদেশে পড়াশোনা করে। কিন্তু তার অর্থের বড় অভাব। আমি কি আমার মালের যাকাত তাকে দিতে পারি?
উত্তর: স্ত্রী তার স্বামীকে প্রয়োজনে যাকাত দিতে পারে। যেহেতু স্বামীর ভরণপোষণ করা স্ত্রীর উপর ওয়াজেব নয়।
প্রশ্নঃ বেনামাযীকে যাকাত দেওয়া বৈধ কি?
উত্তর: বেনামাযীকে যাকাত দেওয়া বৈধ নয়। তবে তাকে নামাযের দিকে আকর্ষণ করার উদ্দেশ্যে যাকাত দেওয়া যায়।
প্রশ্ন: কোন মিসকীন আমার নিকট চাকরি করলে আমি তাকে আমার যাকাত দিতে পারি কি না?
উত্তর: তার অভাব বলে তাকে দেওয়া যাবে। তবে সেই দেওয়াতে আপনার উদ্দেশ্য যেন তাকে আপনার কাজে উদ্বুদ্ধ করা না হয়, কাজে তার আন্তরিকতা পাওয়া না হয়, তার কাজের বোনাস স্বরূপ না হয়, তা তার প্রাপ্য হক থেকে কেটে না নেওয়া হয়। (ইজি)
প্রশ্নঃ ঋণে দেওয়া টাকা বা অন্য কাজে পড়ে থাকা টাকার যাকাত দিতে হবে কি?
উত্তর: নিসাব পরিমাণ টাকা কাউকে ঋণ দেওয়া থাকলে, কিছুর ভাড়া আদায় বাকী থাকলে, মালের মূল্য বকেয়া থাকলে, দেনমোহর বাকী থাকলে আদায় হওয়া মাত্র সেই বছরের যাকাত আদায় দিতে হবে। এর পূর্বের বছরগুলোর যাকাত লাগবে না। বলা বাহুল্য, যদি কোন এমন ব্যক্তি বা সংস্থাকে ঋণ দেওয়া থাকে, যার নিকট চাওয়া মাত্র পরিশোধ পাওয়া যাবে না, তাহলে এমন ঋণে দেওয়া টাকার যাকাত আদায় করা ফরয নয়। অবশ্য পরিশোধ পেলেই সেই বছরের যাকাত (বছর পূর্ণ না হলেও) আদায় করতে হবে।
তদনুরূপ হারিয়ে যাওয়া অথবা চুরি হয়ে যাওয়া মাল ফিরে পেলে ঐভাবেই যাকাত আদায় করতে হবে।
যেমন পেনশনের টাকা এক সাথে নিসাব পরিমাণ পেলে তার (১ বছরের) যাকাত সাথে সাথে আদায় করতে হবে। (মাজমুউ ফাতাওয়া ইবনে উষাইমীন ১৮/১৭৫)
প্রশ্নঃ ঋণে নেওয়া টাকার যাকাত আদায় করতে হবে কি?
উত্তর: ঋণে নেওয়া টাকা যদি যাকাতের নিসাব পরিমাণ হয় অথবা তা মিলিয়ে নিসাব পূর্ণ হয় এবং তা ব্যবসা ইত্যাদিতে থেকে বছর পূর্ণ হয়, তাহলে ঋণগ্রহীতাকে তার যাকাত আদায় করতে হবে。
ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির যদি যাকাতের নিসাব পরিমাণ অর্থ থাকে এবং ঋণ পরিশোধ করার পরও নিসাব বহাল থাকে, তাহলে তাকে যাকাত অবশ্যই আদায় করতে হবে। অন্যথা ঋণ পরিশোধ করার পর যদি নিসাব বহাল না থাকে, তাহলে তার উপর যাকাত ফরয নয়।
ঋণ পরিশোধ না করে যাকাত ফরয নয় মনে করা ঠিক নয়। সুতরাং ঋণ থাকলে আগে ঋণ পরিশোধ করে ফেলুন। তারপর যদি নিসাব পরিমাণ মাল থাকে তাহলে যাকাত দিন, নচেৎ না। আর ঋণ পরিশোধ না করলে এবং নিসাব পরিমাণ মাল সারা বছর জমা থাকলে আপনাকে যাকাত দিতে হবে।
জ্ঞাতব্য যে, ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির জমির ওশর অথবা পশুর যাকাত ফরয হলেও অনুরূপ তার উচিত আগে ঋণ পরিশোধ করা। অতঃপর নিসাব পরিমাণ থাকলে তার ওশর বা যাকাত আদায় করা।
প্রশ্ন: ব্যাংকে ডিপোজিট ও জমা রাখা টাকার যাকাত দিতে হবে কি?
উত্তর: ব্যাংকে জমা রাখা টাকা আমানত; তা যে কোন সময় তোলা যায়। অতএব তা নিসাব পরিমাণ হলে এবং বছর ঘুরলে ঋণদাতাকে সে টাকার বাৎসরিক যাকাত আদায় করতে হবে। তদনুরূপ কোন ব্যক্তি বিশেষের কাছে রাখা আমানতের টাকা; যা চাইবা মাত্র পাওয়া যাবে তারও যাকাত বাৎসরিক আদায় করা ফরয।
প্রকাশ থাকে যে, ব্যাংকের সূদ হারাম। অতএব সে সূদে যাকাতও নেই।
প্রশ্নঃ শিশু, এতীম ও পাগলের মালেও যাকাত ফরয কি?
উত্তর: যাকাত ফরয হয় মালে। তাই তা ফরয হওয়ার জন্য মালিকের জ্ঞানসম্পন্ন ও সাবালক হওয়া শর্ত নয়। বলা বাহুল্য শিশু, এতীম ও পাগলের মালেও যাকাত ফরয। তাদের তরফ থেকে তাদের অভিভাবক (অলী বা অসী) হিসাব করে আদায় করবে। এতে বাহ্য দৃষ্টিতে মাল কমতে থাকলেও বাস্তবে তাদের মালে বর্কত বৃদ্ধি পাবে। তাছাড়া অভিভাবকদের উচিত, তাদের মাল ব্যবসায় বিনিয়োগ করা। (আল-মুমতে ৬/২৬-২৭)
প্রশ্নঃ খয়রাতি ফান্ডের টাকার যাকাত আছে কি?
উত্তর: সাদকাহ, যাকাত, দান বা ওয়াক্ফ প্রভৃতি খয়রাতি ফান্ডের (মসজিদ বা মাদ্রাসার) মাল (বা শস্য) নিসাব পরিমাণ হলেও তাতে যাকাত নেই। কারণ সে মাল আল্লাহর। আর তা আল্লাহর পথেই ব্যয় হবে। (মাজাল্লাতুল বুহুসিল ইসলামিয়্যাহ ৮/১৫০, ১৬১, ২৫/৪৪, ৩০/১১৯)
প্রশ্ন: কারখানা ও প্রেসের মালিক কিসের যাকাত দেবে?
উত্তর: কারখানা ও প্রেসের যন্ত্রপাতির কোন যাকাত নেই। যাকাত আছে নিসাব পরিমাণ টাকা-পয়সা ও বিক্রেয় পণ্য-সামগ্রীর। (লাদা)
প্রশ্নঃ এক ব্যক্তি বহু কষ্ট ক'রে ২/৩ বছর থেকে টাকা জমিয়েছে মেয়ের বিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে। সে টাকারও কি যাকাত আছে?
উত্তর: নিসাব পরিমাণ হলে সে টাকারও প্রত্যেক বছর যাকাত আদায় করতে হবে। (ইবা)
প্রশ্নঃ ভাড়ায় দেওয়ার জন্য একাধিক গাড়ি আছে। তাতে কি যাকাত আছে?
উত্তর: তাতে যাকাত নেই। ভাড়ার টাকা-সহ অন্য টাকা নিসাব পরিমাণ পৌঁছলে ফি-বছর তাতে যাকাত আছে। (লাদা)
প্রশ্নঃ শো-রুমে একাধিক গাড়ি রাখা আছে বিক্রির জন্য, তাতে কি যাকাত আছে?
উত্তর: যে জিনিস ব্যবসার জন্য রাখা আছে, সে জিনিসের মূল্য নিসাব পরিমাণ হলে ফি-বছর তাতে যাকাত আছে। পণ্যদ্রব্য, গাড়ি, বাড়ি, জমি ইত্যাদি ব্যবসার জন্য হলে তাতে যাকাত আছে। (ইবা, ইজি)
প্রশ্ন: ব্যাংক বা কোম্পানির শেয়ারে কি যাকাত আছে?
উত্তর: পণ্যদ্রব্যের মতোই ফি-বছর তার যাকাত আছে। (লাদা)
প্রশ্নঃ হিরের যাকাত আছে কি?
উত্তর: হিরের যাকাত নেই। তবে পণ্যদ্রব্য হলে তাতে নিয়মিত যাকাত আছে। (ইবা)
প্রশ্ন: ফিতরার যাকাত কি মালের যাকাতের মতোই আট শ্রেণীর হকদারের মাঝে বিতরণ করা যাবে?
উত্তর: ফিতরার যাকাত আম নয়, বরং তা কেবল মিসকীনদের জন্য খাস। (বানী, তামামুল মিন্নাহ)
প্রশ্নঃ যাকাতের মাল কি কোন মিসকীনকে হজ্জ করার জন্য দেওয়া যায়?
উত্তর: যাকাতের মাল কোন মিসকীনকে হজ্জ করার জন্য দেওয়া যায়। যেহেতু হজ্জ 'সাবীলিল্লাহ'র পর্যাভুক্ত। (বানী)
প্রশ্নঃ আমার বেতন মাসিক ত্রিশ হাজার টাকা। আমার নিসাব পরিমাণ টাকা ব্যাংকে আছে। আমি কি প্রত্যেক মাসের বেতনের টাকার যাকাত প্রত্যেক মাসেই বের করব?
উত্তরঃ যে নিসাব পরিমাণ টাকা যে মাসে হাতে এসেছে, সেই টাকা বছর ঘুরলে সেই মাসেই যাকাত দিতে হবে। অবশ্য তার হিসাব রাখা বড় কঠিন। এই জন্য যদি কিছু মাসের যাকাত আগাম দেওয়া হয়, তাহলে তা উত্তম। সুতরাং সারা বছরের মধ্যে যদি বর্কতময় রমযান মাসকে যাকাত আদায়ের জন্য নির্ধারিত করা হয় এবং শাবান মাসের বেতনের যাকাতও সব টাকার সাথে মিলিয়ে আদায় ক'রে দেওয়া হয়, তাহলে সমস্যা এড়ানো যাবে। আল্লাহর পথে দু'টাকা বেশি যাক, তা ভাল। কিন্তু যেন কম না যায়।
প্রশ্নঃ অলঙ্কারের যাকাত দেওয়ার সময় কি মা-মেয়ের অলঙ্কার একত্রিত ক'রে যাকাত দিতে হবে?
উত্তর: না। প্রত্যেক মহিলার অলঙ্কার নিসাব পরিমাণ (৮৫ গ্রাম) হলে তবেই যাকাত লাগবে। মায়ের সাথে মেয়ের অলঙ্কার একত্রিত ক'রে নিসাব দেখা জরুরী নয়。
প্রশ্নঃ আমি কীভাবে স্বর্ণের যাকাত আদায় করব?
উত্তর: আপনার কাছে যে মানের স্বর্ণ আছে, সেই মানের স্বর্ণের বাজার-দর জেনে নেবেন। তার সঠিক ওজন জেনে নেবেন। অতঃপর তার মূল্য নির্ধারণ ক'রে প্রত্যেক একশ টাকায় আড়াই টাকা, প্রত্যেক হাজারে ২৫০ এবং প্রত্যেক লাখে ২৫০০ টাকা যাকাত আদায় করবেন।
প্রশ্নঃ অতিরিক্ত বাড়ি ও গাড়ির যাকাত কীভাবে আদায় করব?
উত্তর: বাড়ি বা গাড়ির যাকাত নেই। তবে যদি তা ব্যবসার সামগ্রী হয়, তাহলে তার মূল্যে যাকাত আছে। আর ভাড়ার জন্য হলে ভাড়ার টাকা নিসাব পরিমাণ হলে তাতে যাকাত আছে।
প্রশ্ন: জামাআতের লোকেরা নিজ নিজ যাকাত ইমাম সাহেবের নিকট জমা করে। যাতে তিনি সঠিক জায়গায় ব্যয় করতে পারেন। তিনি অভাবী হলে জামাআতকে না জানিয়ে তা নিতে পারেন না। (ইজি)
📄 রোযা
প্রশ্নঃ মেঘ বা অন্য কোন কারণে চাঁদ যথাসময়ে না দেখা গেলে করণীয় কী?
উত্তরঃ মেঘ বা অন্য কোন কারণে চাঁদ যথাসময়ে না দেখা গেলে মাসের তারীখ ৩০ পূর্ণ করে নিতে হবে। অবশ্য ঈদের চাঁদ প্রমাণ করার জন্য ২ জন মুসলিমের সাক্ষ্য প্রয়োজন। যেহেতু মহানবী বলেন, "তোমরা চাঁদ দেখে রোযা রাখ, চাঁদ দেখে রোযা ছাড়। যদি চাঁদ না দেখা যায়, তাহলে মাস ৩০ পূর্ণ করে নাও। কিন্তু যদি দুই জন মুসলিম সাক্ষ্য দেয়, তাহলে তোমরা রোযা রাখ ও রোযা ছাড়।” (আহমাদ ৪/৩২ ১, নাসাঈ, দারাকুত্বনী, ইগঃ ৯০৯নং) পক্ষান্তরে রোযার মাসের শুরু হওয়ার কথা প্রমাণ করার জন্য এ কথা প্রমাণিত যে, আল্লাহর রসূল একজন লোকের সাক্ষি নিয়ে রোযা রেখেছেন। (আবু দাউদ ২৩৪২, দারেমী, দারাকুত্বনী, বাইহাক্বী ৪/২১২, ইরওয়াউল গালীল ৯০৮-নং)
প্রশ্ন: ঈদের চাঁদ কেউ একা দেখলে সে কি একা একা ঈদ করতে পারে?
উত্তর: ঈদের চাঁদ কেউ একা দেখলে সে কিন্তু একা একা ঈদ করতে পারে না। বরং চাঁদ দেখা সত্ত্বেও তার জন্য রোযা রাখা ওয়াজেব। কেননা, শওয়ালের চাঁদ দুই জন মুসলিম দেখার সাক্ষ্য না দেওয়া পর্যন্ত শরীয়তের দৃষ্টিতে প্রমাণ হয় না। তা ছাড়া মহানবী বলেন, "ঈদ সেদিন, যেদিন লোকেরা ঈদ করে। কুরবানী সেদিন, যেদিন লোকেরা কুরবানী করে।” (সহীহ তিরমিযী ৬৪৩, ইরওয়াউল গালীল ৯০৫নং) যেহেতু শরীয়তে জামাআতের বড় মর্যাদা আছে। মতান্তরে যে ব্যক্তি একা চাঁদ দেখবে সে পরের দিন রোযা রাখবে না। যেহেতু মহানবী বলেন, "তোমরা চাঁদ দেখে রোযা রাখ, চাঁদ দেখে রোযা ছাড়।” তবে প্রকাশ্যে নয়, বরং গোপনে ইফতার করবে সে। যাতে সে জামাআত-বিরোধী না হয়ে যায়। অথবা তাকে কেউ অসঙ্গত অপবাদ না দিয়ে বসে। আর আল্লাহই অধিক জানেন। (মুমতে' ৬/৩২৯)
প্রশ্ন: ২৮ দিন রোযা রাখার পর শওয়ালের চাঁদ শরয়ী সাক্ষ্য দ্বারা প্রমাণিত হলে করণীয় কী?
উত্তর: ২৮ দিন রোযা রাখার পর শওয়ালের চাঁদ শরয়ী সাক্ষ্য দ্বারা প্রমাণিত হলে জানতে হবে যে, রমযান মাসের প্রথম দিন অবশ্যই ছুটে গেছে। সুতরাং সে ক্ষেত্রে ঐ দিন ঈদের পরে কাযা করতে হবে। কারণ, চান্দ্র মাস ২৮ দিনের হতেই পারে না। হয় ৩০ দিনে মাস হবে, নচেৎ ২৯ দিনে। (ফাতাওয়াস সিয়াম, মুসনিদ ১৫পৃঃ)
প্রশ্নঃ যে দেশের রোযা ২/১ দিন পিছনে, শেষ রমযানে সে দেশে সফর করলে অথবা সে দেশ থেকে ফিরে এলে করণীয় কী? পূর্ব দিককার (প্রাচ্যের) দেশগুলিতে চাঁদ ১ অথবা ২ দিন পরে দেখা দেয়। এখন ২৯শে রমযান চাঁদ দেখার পর অথবা ৩০শে রমযান ঐ দিককার কোন দেশে সফর করলে সেখানে গিয়ে দেখবে তার পরের দিনও রোযা। সে ক্ষেত্রে তাকে ঐ দেশের মুসলিমদের সাথে রোযা রাখতে হবে। অতঃপর তারা ঈদ করলে তাদের সাথে সেও ঈদ করবে; যদিও তার রোযা ৩ ১টি হয়ে যায়। কারণ, মহান আল্লাহ বলেন, (فَمَنْ شَهِدَ مِنْكُمُ الشَّهْرَ فَلْيَصُمْهُ) অর্থাৎ, অতএব তোমাদের মধ্যে যে কেউ এ মাস পাবে সে যেন এ মাসে রোযা রাখে। (কুঃ ২/১৮৫) আর মহানবী বলেন, "রোযা সেদিন, যেদিন লোকেরা রোযা রাখে। ঈদ সেদিন, যেদিন লোকেরা ঈদ করে।” (তিরমিযী, ইরওয়াউল গালীল ৯০৫, সিঃ সহীহাহ ২২৪নং) কিন্তু যদি কেউ পূর্ব থেকে পশ্চিম দিকে ২৮শে রমযান সফর করে, অতঃপর তার পর দিনই সেখানে ঈদ হয়, তাহলে সেও রোযা ভেঙ্গে লোকদের সাথে ঈদ করবে। অবশ্য তার পরে সে একটি রোযা কাযা রাখবে। কারণ, মাস ২৯ দিনের কম হয় না। পক্ষান্তরে যদি ২৯শে রমযান সফর করে তার পরের দিন ঈদ হয়, তাহলে তাদের সাথে ঈদ করার পর তাকে আর কোন রোযা কাযা করতে হবে না। কারণ, তার ২৯টি রোযা হয়ে গেছে এবং মাস ২৯ দিনেও হয়। (ইবা, ফাতাওয়াস সিয়াম, মুসনিদ ১৬পৃঃ) অনুরূপ ৩০শের সকালে রোযা অবস্থায় সফর ক'রে নিজ দেশে ফিরে ঈদ দেখলে, তাদের সাথে ঈদ করবে। (লাদা) পরম্ভ যদি কেউ ঈদের দিনে ঈদ করে প্রাচ্যের দেশে সফর করে এবং সেখানে গিয়ে দেখে সেখানকার লোকেদের রোযা চলছে, তাহলে সে ক্ষেত্রে তাকে পানাহার বন্ধ করতে হবে না এবং রোযা কাযা করতেও হবে না। কেননা, সে শরয়ী নিয়ম মতে রোযা ভেঙ্গেছে। অতএব এ দিন তার জন্য পানাহার বৈধ হওয়ার দিন। (আসইলাহ অআজবিবাহ ফী স্বালাতিল ঈদাইন ২৮পৃঃ)
প্রশ্ন: এক দেশে চাঁদ দেখা গেলে কি পৃথিবীর সকল দেশে রোযা বা ঈদ করা জরুরী নয়?
উত্তর: মহান আল্লাহ বলেছেন, 'তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি এ মাসে উপনীত হবে, সে যেন রোযা রাখে।' (বাক্বারাহঃ ১৮৫) আর মহানবী বলেছেন, 'তোমরা চাঁদ দেখলে রোযা রাখো...' (বুখারী ১৯০০, মুসলিম ১০৮০নং) এই নির্দেশ থেকে অনেকে বুঝেছেন যে, সারা বিশ্বের ২/১ জন মুসলিম চাঁদ দেখলেই সকল মুসলিমদের জন্য রোযা বা ঈদ করা জরুরী। কিন্তু সাহাবাগণ এরূপ বুঝেননি। তাঁরা উদয়স্থলের পার্থক্য মেনে নিয়ে শাম দেশের চাঁদের খবর নিয়ে মদীনায় ঈদ করেননি। কুরাইব বলেন, একদা উম্মুল ফাল বিন্তুল হারেষ আমাকে শাম দেশে মুআবিয়ার নিকট পাঠালেন। আমি শাম (সিরিয়া) পৌঁছে তাঁর প্রয়োজন পূর্ণ করলাম। অতঃপর আমার শামে থাকা কালেই রমযান শুরু হল। (বৃহস্পতিবার দিবাগত) জুমআর রাত্রে চাঁদ দেখলাম। অতঃপর মাসের শেষ দিকে মদীনায় এলাম। আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস আমাকে চাঁদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলেন, 'তোমরা কবে চাঁদ দেখেছ?' আমি বললাম, 'আমরা জুমআর রাত্রে দেখেছি।' তিনি বললেন, 'তুমি নিজে দেখেছ?' আমি বললাম, 'জী হ্যাঁ। আর লোকেরাও দেখে রোযা রেখেছে এবং মুআবিয়াও রোযা রেখেছেন।' ইবনে আব্বাস বললেন, 'কিন্তু আমরা তো (শুক্রবার দিবাগত) শনিবার রাত্রে চাঁদ দেখেছি। অতএব আমরা ৩০ পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত অথবা নতুন চাঁদ না দেখা পর্যন্ত রোযা রাখতে থাকব।' আমি বললাম, 'মুআবিয়ার দর্শন ও তাঁর রোযার খবর কি আপনার জন্য যথেষ্ট নয়?' তিনি বললেন, 'না। আল্লাহর রসূল আমাদেরকে এ রকমই আদেশ দিয়েছেন।' (মুসলিম ১০৭৮ নং)
আমরা মনে করি, আমরা সালাফী। অতএব সালাফদের বুঝ নিয়েই আমাদের উচিত কুরআন-হাদীস বুঝা এবং উদয়স্থলের ভিন্নতা গণ্য ক'রে নেওয়া।
তাছাড়া আমভাবে শরীয়তের সকল নির্দেশ একই সময়ে মান্য করা অনেক ক্ষেত্রে সম্ভব নয়। যেমনঃ-
মহান আল্লাহ বলেছেন, 'তোমরা পানাহার কর; যতক্ষণ কালো সুতা (রাতের কালো রেখা) হতে ঊষার সাদা সুতা (সাদা রেখা) স্পষ্টরূপে তোমাদের নিকট প্রতিভাত না হয়। অতঃপর রাত্রি পর্যন্ত রোযা পূর্ণ কর।' (বাক্বারাহঃ ১৮৭)
মহানবী বলেন, "রাত যখন এদিক (পূর্ব গগন) থেকে আগত হবে, দিন যখন এদিক (পশ্চিম গগন) থেকে বিদায় নেবে এবং সূর্য যখন অস্ত যাবে, তখন রোযাদার ইফতার করবে।” (বুখারী ১৯৪১, ১৯৫৪, মুসলিম ১১০০, ১১০ ১, আবু দাউদ ২৩৫১, ২৩৫২, তিরমিযী)
উক্ত নির্দেশ দু'টি সারা বিশ্বের সকল মুসলিমদের জন্য একই সাথে মান্য করা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে কেউ বলেন না যে, নির্দেশ ব্যাপক। অতএব সারা বিশ্বের ২/১ জন মুসলিম ফজর উদয় দেখলেই সকল মুসলিমদের জন্য পানাহার বন্ধ করা জরুরী। অথবা সারা বিশ্বের ২/১ জন মুসলিম সূর্যাস্ত দেখলেই সকল মুসলিমদের জন্য ইফতারী করা জরুরী। বরং বিশ্বের প্রতীচ্যের লোক যখন ইফতারী করে, প্রাচ্যের লোক ইফতারী করে তাদের থেকে প্রায় ১২-১৫ ঘন্টা পরে。
সুতরাং ঈদ সারা বিশ্বে একদিনে একই সময়ে হওয়াও সম্ভব নয়। আর নাই-বা হল একই দিনে ঈদ। কী এমন ঐক্য আছে এতে? কত শত বিষয়ে মতভেদ ও মতানৈক্য। হৃদয়ে-হৃদয়ে, বিশ্বাসে ও আচরণে কত ভিন্নতা। কেবল ঈদের দিনের অভিন্নতা নিয়ে কোন্ ফল ফলবে? তবুও বলব, এ বিষয়ে উলামাদের 'ইজমা' হলে দোষ নেই।
প্রকাশ থাকে যে, যাঁরা উক্ত হাদীসের উপর আমল করতে গিয়ে সউদী আরবের সাথে রোযা-ঈদ ক'রে থাকেন, তাঁরাও কিন্তু অনেক সময় ভুল করেন। কারণ সউদী আরব অন্য দেশের চাঁদ দেখে ঈদ করে না। তার পশ্চিমে আফ্রিকার কোন দেশের চাঁদ দেখে সউদীরা রোযা-ঈদ করেন না। তাহলে উপমহাদেশ থেকে চোখ বুজে সউদিয়ার অনুকরণ করলে উক্ত হাদীসের উপর তাঁদের আমল হয় না, যে হাদীস পেশ ক'রে তাঁরা মনে করেন যে, সারা বিশ্বের মুসলিমগণকে একই সাথে রোযা-ঈদ করতে হবে।
প্রশ্নঃ রমযান মাসে আগামী কাল সকালে সফরের নিয়ত থাকলেও কি ফজরের পূর্বে রোযার নিয়ত করতে হবে?
উত্তর: অবশ্যই। রোযার নিয়তে রোযা রেখে গ্রাম বা শহর ছেড়ে বের হয়ে গিয়ে তারপর রোযা ভাঙ্গা চলবে। দুপুরে সফর করবে বলে সকাল থেকে বাড়িতে বসে রোযা বন্ধ করা বৈধ নয়।
প্রশ্নঃ এগারো মাস নামায পড়ে না। রমযান এলে রোযা রাখে ও নামায পড়ে। এমন লোকের রোযা কবুল হবে কি? রোযার উপর নামাযের প্রভাব আছে কি? তারা রোযা রেখে (জান্নাতের) 'রাইয়ান' গেটে প্রবেশকারীদের সঙ্গে প্রবেশ করবে না কি? 'এক রমযান থেকে অপর রমযান মধ্যবর্তী সকল গোনাহকে মোচন করে দেয়।'---এ কথা ঠিক নয় কি?
উত্তর: বেনামাযীর রোযা কবুল হবে না। যেহেতু নামায ইসলামের খুঁটি, যা ব্যতিরেকে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। পরন্ত বেনামাযী কাফের ও ইসলামের মিল্লত থেকে বহির্ভূত।
রাসূলুল্লাহ বলেছেন, "মানুষ ও কুফরীর মধ্যে (পর্দা) হল, নামায ত্যাগ করা।” (মুসলিম)
তিনি আরো বলেছেন, "যে চুক্তি আমাদের ও তাদের (কাফেরদের) মধ্যে বিদ্যমান, তা হচ্ছে নামায (পড়া)। অতএব যে নামায ত্যাগ করবে, সে নিশ্চয় কাফের হয়ে যাবে।” (তিরমিযী)
শাক্বীক ইবনে আব্দুল্লাহ তাবেঈ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'মুহাম্মাদ-এর সহচরবৃন্দ নামায ছাড়া অন্য কোন আমল ত্যাগ করাকে কুফরীমূলক কাজ বলে মনে করতেন না।' (তিরমিযী) (ফাতাওয়া ইবনে উষাইমীন ২/৬৮-৭)
আর কাফেরের নিকট থেকে আল্লাহ রোযা, সাদকা, হজ্জ এবং অন্যান্য কোনও নেক আমল কবুল করেন না। যেহেতু আল্লাহ পাক বলেন,
وَمَا مَنَعَهُمْ أَنْ تُقْبَلَ مِنْهُمْ نَفَقَاتُهُمْ إِلَّا أَنَّهُمْ كَفَرُوا بِاللَّهِ وَبِرَسُوْلِهِ وَلَا يَأْتُوْنَ الصَّلاَةَ إِلَّا وَهُمْ كُسَالى وَلَا يُنْفِقُونَ إِلَّا وَهُمْ كَارِهُونَ
অর্থাৎ, ওদের অর্থ-সাহায্য গৃহীত হতে কোন বাধা ছিল না। তবে বাধা এই ছিল যে, ওরা আল্লাহ ও তদীয় রসূলকে অস্বীকার (কুফরী) করে এবং নামাযে আলস্যের সঙ্গে উপস্থিত হয়। আর অনিচ্ছাকৃতভাবে অর্থদান করে। (সূরা তাওবা ৫৪ আয়াত)
সুতরাং যদি কেউ রোযা রাখে এবং নামায না পড়ে, তাহলে তার রোযা বাতিল ও অশুদ্ধ। আল্লাহর নিকট তা কোন উপকারে আসবে না এবং তা তাকে আল্লাহর সান্নিধ্য দান করতেও পারবে না।
আর তার অমূলক ধারণা যে, 'এক রমযান থেকে অপর রমযান মধ্যবর্তী সকল গোনাহকে মোচন ক'রে দেয়'- তো এর জওয়াবে বলি যে, সে এ বিষয়ে বর্ণিত হাদীসটাই জানতে (বা বুঝতে) পারেনি। রসূল বলেন, "পাঁচ ওয়াক্ত নামায, জুমআহ থেকে জুমআহ এবং রমযান থেকে রমযান; এর মধ্যবর্তী সকল গোনাহকে মোচন ক'রে দেয়--- যতক্ষণ পর্যন্ত কাবীরা গোনাহসমূহ থেকে দূরে থাকা হয়।” (মুসলিম, মিশকাত ৫৬৪নং) সুতরাং রমযান থেকে রমযানের মধ্যবর্তী পাপসমূহ মোচন হওয়ার জন্য মহানবী শর্তারোপ করেছেন যে, কাবীরা গোনাহসমূহ থেকে দূরে থাকতে হবে। কিন্তু সে তো নামাযই পড়ে না, আর রোযা রাখে। যাতে সে কাবীরা গোনাহ থেকে দূরে থাকতে পারে না। যেহেতু নামায ত্যাগ করার চেয়ে অধিক বড় কাবীরা গোনাহর কাজ আর কী আছে? বরং নামায ত্যাগ করা তো কুফরী। তাহলে কী ক'রে সম্ভব যে, রোযা তার পাপ মোচন করবে? সুতরাং নিজ প্রভুর কাছে তার জন্য তওবা (অনুশোচনার সাথে প্রত্যাবর্তন) করা ওয়াজেব। আল্লাহ যে তার উপর নামায ফরয করেছেন, তা পালন ক'রে তারপর রোযা রাখা উচিত। যেহেতু নবী মুআয-কে ইয়ামান প্রেরণকালে বলেছিলেন, "ওদেরকে তোমার প্রথম দাওয়াত যেন 'আল্লাহ ছাড়া কোন সত্য উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ তাঁর রসূল'- এই সাক্ষ্যদানের প্রতি হয়। যদি ওরা তা তোমার নিকট থেকে গ্রহণ করে, তবে তাদেরকে জানিয়ে দাও যে, আল্লাহ ওদের উপর প্রত্যেক দিবা-রাত্রে পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরয করেছেন।
অতএব দুই সাক্ষ্যদানের পর নামায, অতঃপর যাকাত দিয়ে (দাওয়াত) শুরু করেছেন। (ইউ)
নিকৃষ্ট মানুষ সে, যে নিজ প্রভুকে কেবল রমযানে চেনে ও স্মরণ করে, বাকী এগারো মাস ভুলে থাকে! অথচ সে এক মাসের চেনা তাদের কোন কাজে লাগবে না। (লাদা)
প্রশ্ন: রোযাদারের জন্য এমন দেশে সফর ক'রে রোযা রাখা বৈধ কি, যেখানের দিন ঠান্ডা ও ছোট?
রোযাদারের জন্য এমন দেশে সফর করে রোযা রাখা বৈধ, যেখানের দিন ঠান্ডা ও ছোট। (ইবনে উষাইমীন, মাজমুউ ফাতাওয়া ১/৫০৬)
প্রশ্ন: আমার কিডনীর সমস্যা আছে। রোযা রাখলেই সমস্যা বাড়ে। ডাক্তার রোযা রাখতে নিষেধও করেছে। আমার এখন কী করা উচিত?
উত্তর: এ সমস্যা যদি চির-সমস্যা হয়, অর্থাৎ, পরে কাযা করতেও না পারা যায়, তাহলে প্রত্যেক রোযার বিনিময়ে একটি ক'রে মিসকীন খাওয়াতে হবে। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{أَيَّامًا مَّعْدُودَاتٍ فَمَن كَانَ مِنكُم مَّرِيضًا أَوْ عَلَى سَفَرٍ فَعِدَّةٌ مِّنْ أَيَّامٍ أُخَرَ وَعَلَى الَّذِينَ يُطِيقُونَهُ فِدْيَةٌ طَعَامُ مِسْكِين} (١٨٤) سورة البقرة
অর্থাৎ, (রোযা) নির্দিষ্ট কয়েক দিনের জন্য। তোমাদের মধ্যে কেউ অসুস্থ হলে বা সফর অবস্থায় থাকলে অন্য দিনে এ সংখ্যা পূরণ করে নেবে। আর যারা রোযা রাখার সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও রোযা রাখতে চায় না (যারা রোযা রাখতে অক্ষম), তারা এর পরিবর্তে একজন মিসকীনকে খাদ্য দান করবে। (বাক্বারাহঃ ১৮৪)
প্রশ্নঃ শোনা যায়, ফিতরা না দিলে রোযা কবুল হয় না।---এ কথা কি ঠিক?
উত্তর: এ মর্মে একটি হাদীস বর্ণিত আছে, যা সহীহ নয়। (সিঃ যয়ীফাহ ৪৩নং)
প্রশ্নঃ পরিজনের সাথে এক সঙ্গে রোযা রাখার উদ্দেশ্যে মহিলারা ট্যাবলেট খেয়ে মাসিক বন্ধ রাখতে পারে কি?
উত্তর: মহান আল্লাহর দেওয়া এ প্রকৃতিকে রোধ করলে তার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। মাসিক-নিবারক ট্যাবলেট ব্যবহারে মহিলার গর্ভাশয়েরও নানান ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে; যেমন সে কথা ডাক্তারগণ উল্লেখ ক'রে থাকেন। সুতরাং ওষুধ ব্যবহার না ক'রে কাযা করাই উত্তম। কিন্তু যদি মহিলা ঐভাবে মাসিক বন্ধ রেখে এবং পবিত্রা থেকে রোযা রাখে, তাহলে সে রোযা শুদ্ধ ও যথেষ্ট হয়ে যাবে। (ইউ)
প্রশ্নঃ রমযানের একাধিক রোযা কাযা করতে হলে কি একটানা করা জরুরী?
উত্তর: একটানা হওয়া জরুরী নয়। কেটে কেটেও রাখা যায়। তবে উত্তম হল একটানা রাখা। (ইজি)
প্রশ্নঃ কেউ রোযা রেখে মারা গেলে তার তরফ থেকে মিসকীন খাওয়াতে হবে, নাকি ওয়ারেসকে রোযা রেখে দিতে হবে?
উত্তর: রমযানের রোযা কাযা রেখে মারা গেলে তার তরফ থেকে মিসকীন খাওয়াতে হবে। আর নযরের রোযা না রেখে মারা গেলে তার তরফ থেকে ওয়ারেসকে রোযাই রাখতে হবে।
আমরাহর মা রমযানের রোযা বাকী রেখে ইন্তিকাল করলে তিনি মা আয়েশা (রাঃ) কে জিজ্ঞাসা করলেন, 'আমি আমার মায়ের তরফ থেকে কাযা ক'রে দেব কি?' আয়েশা (রাঃ) বললেন, 'না। বরং তার তরফ থেকে প্রত্যেক দিনের পরিবর্তে এক একটি মিসকীনকে অর্ধ সা' (প্রায় ১ কিলো ২৫০ গ্রাম খাদ্য) সদকাহ ক'রে দাও।' (ত্বাহাবী ৩/১৪২, মুহাল্লা ৭/৪, আহকামুল জানাইয, টীকা ১৭০পৃঃ)
ইবনে আব্বাস বলেন, 'কোন ব্যক্তি রমযান মাসে অসুস্থ হয়ে পড়লে এবং তারপর রোযা না রাখা অবস্থায় মারা গেলে তার তরফ থেকে মিসকীন খাওয়াতে হবে; তার কাযা নেই। পক্ষান্তরে নযরের রোযা বাকী রেখে গেলে তার তরফ থেকে তার অভিভাবক (বা ওয়ারেস) রোযা রাখবে।' (আবু দাউদ ২৪০ ১নং প্রমুখ)
প্রশ্নঃ রোযা না রাখার নিয়ত করলে এবং তার নিয়ত বাতিল ক'রে দিলে রোযা বাতিল হয়ে যাবে কি?
উত্তর: নিয়ত প্রত্যেক ইবাদত তথা রোযার অন্যতম রুকন। আর সারা দিন সে নিয়ত নিরবচ্ছিন্নভাবে মনে জাগ্রত রাখতে হবে; যাতে রোযাদার রোযা না রাখার বা রোযা বাতিল করার কোন প্রকার দৃঢ় সংকল্প না করে বসে। বলা বাহুল্য, রোযা না রাখার নিয়ত করলে এবং তার নিয়ত বাতিল করে দিলে সারাদিন পানাহার আদি না করে উপবাস করলেও রোযা বাতিল গণ্য হবে। (দ্রঃ ফিক্বহুস সুন্নাহ ১/৪১২, মুমতে' ৬/৩৭৬)
পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি কিছু খাওয়া অথবা পান করার প্রাথমিক ইচ্ছা পোষণ করার পর ধৈর্য ধরে পানাহার করার ঐ ইচ্ছা বাতিল করে পানাহার করে না, সে ব্যক্তির কেবল রোযা ভাঙ্গার ইচ্ছা পোষণ করার ফলে রোযা নষ্ট হবে না; যতক্ষণ না সে সত্যসত্যই পানাহার করে নেবে। আর এর উদাহরণ সেই ব্যক্তির মত, যে নামাযে কথা বলার ইচ্ছা পোষণ করার পর কথা না বলে অথবা নামায পড়তে পড়তে হাওয়া ছাড়ার ইচ্ছা করার পর তা সামলে নিতে পারে। এমন ব্যক্তির যেমন নামায ও ওযু বাতিল নয়, ঠিক তেমনি ঐ রোযাদারের রোযা। (ইবনে উষাইমীন, ক্যাসেট, আহকামুন মিনাস সিয়াম)
প্রশ্নঃ ফজরের আযান হলেই কি পানাহার বন্ধ করা জরুরী?
উত্তর: আযান দেখার বিষয় নয়। দেখার বিষয় হল ফজর উদয়ের সময়। যেমন সময়ের ঘড়িও মজবুত হওয়া প্রয়োজন। নচেৎ মুআযযিন আগে আযান দিলে অথবা ঘড়ি ফার্স্ট থাকলে যেমন খাওয়া বন্ধ করা বিধেয় নয়, তেমনি মুআযযিন দেরি ক'রে আযান দিলে অথবা ঘড়ি স্লো থাকলে খেয়ে যেতেই থাকা বৈধ নয়। বলা বাহুল্য, এ বিষয়ে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা কর্তব্য। (ইবাঃ)
প্রশ্ন: এক ব্যক্তি ঘুম থেকে উঠে সেহরী খেল। অতঃপর জানতে পারল যে, তার খাওয়াটা ফজরের আযানের পর হয়েছে। সুতরাং তার রোযা কি শুদ্ধ হবে?
উত্তর: আযান সঠিক সময়ে হয়ে থাকলে এবং সে আযান হয়ে গেছে---এ কথা না জানলে তার রোযা শুদ্ধ। কারণ অজান্তে বা ভুলে অনিচ্ছাকৃতভাবে পানাহার ক'রে ফেললে রোযার কোন ক্ষতি হয় না।
মহানবী বলেন, “যে রোযাদার ভুলে গিয়ে পানাহার করে ফেলে, সে যেন তার রোযা পূর্ণ করে নেয়। এ পানাহার তাকে আল্লাহই করিয়েছেন।” (বুখারী ১৯৩৩, মুসলিম ১১৫৫, আবু দাউদ ২৩৯৮, তিরমিযী, দারেমী, ইবনে মাজাহ ১৬৭৩, দারাকুত্বনী, বাইহাক্বী ৪/২২৯, আহমাদ ২/৩৯৫, ৪২৫, ৪৯১, ৫১৩) আসমা বিন্তে আবী বাক্স (রাঃ) বলেন, 'নবী-এর যুগে একদা আমরা মেঘলা দিনে ইফতার করলাম। তারপর সূর্য দেখা গেল।' (বুখারী ১৯৫৯, আবু দাউদ ২৩৫৯, ইবনে মাজাহ ১৬৭৪নং) এই অবস্থায় রোযা কাযা করার নির্দেশ দেওয়া হয়নি। তার মানে রোযা শুদ্ধ।
প্রশ্নঃ চোখে বা কানে ওষুধ দিলে কি রোযা ভেঙ্গে যায়?
উত্তর: চোখে বা কানে ওষুধ দিলে রোযা ভাঙ্গে না। কারণ চোখ ও কান খাদ্যনালী নয় এবং সে ওষুধও কোন খাবারের কাজ করে না। তবে সন্দেহ হলে তা রাতে ব্যবহার করাই পূর্বসতর্কতামূলক কর্ম। (লাদা)
প্রশ্নঃ বমি করলে কি রোযা ভেঙ্গে যায়?
উত্তর: ইচ্ছাকৃত বমি করলে রোযা নষ্ট হয়ে যায়। মহানবী বলেন, “রোযা অবস্থায় যে ব্যক্তি বমনকে দমন করতে সক্ষম হয় না, তার জন্য কাযা নেই। পক্ষান্তরে যে ইচ্ছাকৃতভাবে বমি করে, সে যেন ঐ রোযা কাযা করে।” (আহমাদ ২/৪৯৮, আবু দাউদ ২৩৮০, তিরমিযী ৭ ১৬, ইবনে মাজাহ ১৬৭৬, সঃ জামে' ৬২৪৩নং)
প্রশ্ন: রোযাদার কি দাঁতন করতে পারে? তার ফলে আল্লাহর নিকট কস্তুরি অপেক্ষা বেশি সুগন্ধময় গন্ধ কি দূর হয়ে যায় না?
উত্তর: রোযাদার দিনের প্রথম ও শেষভাগে যে কোন সময় দাঁতন করতে পারে। রোযাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহর কাছে প্রিয় বলে তা ইচ্ছাকৃত ছেড়ে রাখা বিধেয় নয়। তাছাড়া দাঁতন করলে মুখের গন্ধ যায় না। কারণ তা আসে পেট খাদ্যশূন্য হওয়ার কারণে। (ইজি)
প্রশ্নঃ রোযার দিনে দাঁতের মাজন (টুথ-পেস্ট বা পাওডার) ব্যবহার করলে রোযা শুদ্ধ হবে কি?
উত্তর: রোযার দিনে দাঁতের মাজন (টুথ পেস্ট বা পাওডার) ব্যবহার না করাই উত্তম। বরং তা রাত্রে এবং ফজরের আগে ব্যবহার করাই উচিত। কারণ, মাজনের এমন প্রতিক্রিয়া ও সঞ্চার ক্ষমতা আছে, যার ফলে তা গলা ও পাকস্থলীতে নেমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। অনুরূপ আশঙ্কার ফলেই মহানবী লাকীত্ব বিন সাবরাহকে বলেছিলেন, "(ওযু করার সময়) তুমি নাকে খুব অতিরঞ্জিতভাবে পানি টেনে নিয়ো। কিন্তু তোমার রোযা থাকলে নয়।” (আহমাদ ৪/৩৩, আবু দাউদ ১৪২, তিরমিযী, নাসাঈ, সঃ ইবনে মাজাহ ৩২৮নং)
পক্ষান্তরে নেশাদার ও দেহে অবসন্ন আনয়নকারী মাজন; যেমন, গুল-গুড়াকু প্রভৃতি; যা ব্যবহারের ফলে মাথা ঘোরে অথবা ব্যবহারকারী জ্ঞানশূন্য হয়ে যায়, তা ব্যবহার করা বৈধ নয়; না রোযা অবস্থায় এবং না অন্য সময়। কারণ, তা মহানবী-এর এই বাণীর আওতাভুক্ত হতে পারে, যাতে তিনি বলেন, “প্রত্যেক মাদকতা আনয়নকারী দ্রব্য হারাম।” (বুখারী, মুসলিম, সুনানে আরবাআহ, সঃ জামে' ৪৫৫০নং)
প্রশ্নঃ রোযা অবস্থায় তরকারির লবণ বা চায়ের মিষ্টি চেক করা বৈধ কি?
উত্তরঃ রান্না করতে করতে প্রয়োজনে খাবারের লবণ বা মিষ্টি সঠিক হয়েছে কি না, তা চেখে দেখা রোযাদারের জন্য বৈধ। তদনুরূপ কোন কিছু কেনার সময় চেখে পরীক্ষা করার দরকার হলে তা করতে পারে। ইবনে আব্বাস বলেন, 'কোন খাদ্য, সির্কা এবং কোন কিছু কিনতে হলে তা চেখে দেখাতে কোন দোষ নেই।' (দ্রঃ বুখারী ৩৮০পৃঃ, ইবনে আবী শাইবাহ ২/৩০৫, বাইহাক্বী ৪/২৬১, ইরওয়াউল গালীল ৯৩৭নং)
অনুরূপভাবে অতি প্রয়োজনে মা তার শিশুর জন্য কোন শক্ত খাবার চিবিয়ে নরম করে দিতে পারে, ধান শুকিয়েছে কি না এবং মুড়ির চাল হয়েছে কি না তা চিবিয়ে দেখতে পারে। অবশ্য এ সকল ক্ষেত্রে শর্ত হল, যেন চর্বিত কোন অংশ রোযাদারের পেটে না চলে যায়। বরং অতি সাবধানতার সাথে কেবল দাঁতে চিবিয়ে এবং জিভে তার স্বাদ চেখে সঙ্গে সঙ্গে বাইরে ফেলা জরুরী। (ফাতাওয়া ইসলামিয়্যাহ ২/১২৮)
প্রশ্নঃ রোযাদার ব্যক্তি কি দীর্ঘক্ষণ সাঁতার কাটতে পারে?
উত্তর: রোযাদারের জন্য সাঁতার কাটতে কোন বাধা নেই। তবে সতর্ক থাকতে হবে, যাতে পানি পেটে চলে না যায়। (ইউ)
প্রশ্নঃ দেহ থেকে রক্ত পড়লে কি রোযার কোন ক্ষতি হয়?
উত্তর: কেটে-ফেটে গিয়ে অথবা ঘা টিপতে গিয়ে অথবা দাঁত তুলতে গিয়ে অথবা দাঁতন করতে গিয়ে রক্ত পড়লে অথবা রক্ত পরীক্ষার জন্য দিলে রোযার কোন ক্ষতি হয় না। মুখের রক্ত গেলা যাবে না। (ইউ)
প্রশ্নঃ থুথু বা গয়ের গিললে কি রোযার ক্ষতি হয়?
উত্তর: থুথু ও গয়ের থেকে বাঁচা দুঃসাধ্য। কারণ, তা মুখে বা গলার গোড়ায় জমা হয়ে নিচে এমনিতেই চলে যায়। অতএব এতে রোযা নষ্ট হবে না এবং বারবার থুথু ফেলারও দরকার হবে না।
অবশ্য যে কফ, গয়ের, খাঁকার বা শ্লেষ্মা বেশী মোটা এবং যা কখনো মানুষের বুক (শ্বাসযন্ত্র) থেকে, আবার কখনো মাথা (Sinuses) থেকে বের হয়ে আসে, তা গলা ঝেড়ে বের করে বাইরে ফেলা ওয়াজেব এবং তা গিলে ফেলা বৈধ নয়। যেহেতু তা ঘৃণিত; সম্ভবতঃ তাতে শরীর থেকে বেরিয়ে আসা কোন রোগজীবাণুও থাকতে পারে। সুতরাং তা গিলে ফেলাতে স্বাস্থ্যের ক্ষতিও হতে পারে। তবে যদি কেউ ফেলতে না পেরে গিলেই ফেলে, তাহলে তাতে রোযা নষ্ট হবে না।
পক্ষান্তরে মুখের ভিতরকার স্বাভাবিক লালা গিলাতে কোন ক্ষতি নেই। রোযাতেও কোন প্রভাব পড়ে না। (মুমতে' ৬/৪২৮-৪২৯, ফাতাওয়া ইসলামিয়্যাহ ২/১২৫, ফাতাওয়াস সিয়াম ৩৮-পৃঃ)
প্রশ্নঃ রাস্তার ধুলো বা আটার গুঁড়ো নাকের ভিতরে গেলে রোযা নষ্ট হয়ে যাবে কি?
উত্তর: রাস্তার ধূলা রোযাদারের নিঃশ্বাসের সাথে পেটে গেলে রোযার কোন ক্ষতি হয় না। তদনুরূপ যে ব্যক্তি আটাচাকিতে কাজ করে অথবা তার কাছে যায় সে ব্যক্তির পেটে আটার গুঁড়ো গেলেও রোযার কোন ক্ষতি হবে না। (ইজি) কারণ, এ সব থেকে বাঁচার উপায় নেই। অবশ্য মুখে মুখোশ ব্যবহার করে বা কাপড় বেঁধে কাজ করাই উত্তম。
প্রশ্নঃ রোযা অবস্থায় সুরমা লাগানো এবং চোখে ও কানে ওষুধ ব্যবহার করা বৈধ কি?
উত্তর: রোযা অবস্থায় সুরমা লাগানো এবং চোখে ও কানে ওষুধ ব্যবহার বৈধ। কিন্তু ব্যবহার করার পর যদি গলায় সুরমা বা ওষুধের স্বাদ অনুভূত হয়, তাহলে (কিছু উলামার নিকট রোযা ভেঙ্গে যাবে এবং সে রোযা) কাযা রেখে নেওয়াই হল পূর্বসতর্কতামূলক কর্ম। (ইবা) কারণ, চোখ ও কান খাদ্য ও পানীয় পেটে যাওয়ার পথ নয় এবং সুরমা বা ওষুধ লাগানোকে খাওয়া বা পান করাও বলা যায় না; না সাধারণ প্রচলিত কথায় এবং না-ই শরয়ী পরিভাষায়। অবশ্য রোযাদার যদি চোখে বা কানে ওষুধ দিনে ব্যবহার না করে রাতে করে, তাহলে সেটাই হবে পূর্বসাবধানতামূলক কর্ম। (মুমতে' ৬/৩৮-২, লাদা, ফাতাওয়া ইসলামিয়্যাহ ২/১২৯)
হযরত আনাস রোযা থাকা অবস্থায় সুরমা ব্যবহার করতেন। (সহীহ আবু দাউদ ২০৮-২নং)
পক্ষান্তরে রোযা থাকা অবস্থায় নাকে ওষুধ ব্যবহার বৈধ নয়। কারণ, নাকের মাধ্যমে পানাহার পেটে পৌঁছে থাকে। আর এ জন্যই মহানবী বলেছেন, “(ওযু করার সময়) তুমি নাকে খুব অতিরঞ্জিতভাবে পানি টেনে নিও। কিন্তু তোমার রোযা থাকলে নয়।" (আহমাদ ৪/৩৩, আবু দাউদ ১৪২, তিরমিযী, নাসাঈ, সহীহ ইবনে মাজাহ ৩২৮নং)
বলা বাহুল্য, উক্ত হাদীস এবং অনুরূপ অর্থের অন্যান্য হাদীসের ভিত্তিতেই নাকে ওষুধ ব্যবহার করার পর যদি গলাতে তার স্বাদ অনুভূত হয়, তাহলে রোযা নষ্ট হয়ে যাবে এবং সে রোযা কাযা করতে হবে। (ইবা, ফাতাওয়া মুহিম্মাহ, তাতাআল্লাকু বিসিয়াম ২৮পৃঃ)
প্রশ্নঃ রোযা অবস্থায় পায়খানা-দ্বারে ওষুধ ব্যবহার করা যায় কি?
উত্তর: রোযাদারের জ্বর হলে তার জন্য পায়খানা-দ্বারে ওষুধ (সাপোজিটরি) রাখা যায়। তদনুরূপ জ্বর মাপা বা অন্য কোন পরীক্ষার জন্য মল-দ্বারে কোন যন্ত্র ব্যবহার করা দোষাবহ বা রোযার পক্ষে ক্ষতিকর নয়। কারণ, এ কাজকে খাওয়া বা পান করা কিছুই বলা হয় না। (এবং পায়খানা-দ্বার পানাহারের পথও নয়।) (মুমতে' ৬/৩৮১)
রোযা অবস্থায় পেটে (এন্ডোসকপি মেশিন) নল সঞ্চালন করলে রোযার ক্ষতি হয় কি?
উত্তর: পেটের ভিতর কোন পরীক্ষার জন্য (এন্ডোসকপি মেশিন) নল বা স্টমাক টিউব সঞ্চালন করার ফলে রোযার কোন ক্ষতি হয় না। তবে হ্যাঁ, যদি পাইপের সাথে কোন (তৈলাক্ত) পদার্থ থাকে এবং তা তার সাথে পেটে গিয়ে পৌঁছে, তাহলে তাতে রোযা নষ্ট হয়ে যাবে। অতএব একান্ত প্রয়োজন ছাড়া এ কাজ ফরয বা ওয়াজেব রোযায় করা বৈধ নয়। (মুমতে' ৬/৩৮-৩-৩৮-৪)
প্রশ্নঃ রোযা অবস্থায় বাহ্যিক শরীরে তেল, মলম, পাওডার বা ক্রিম ব্যবহার করা বৈধ কি?
উত্তর: বাহ্যিক শরীরের চামড়ায় পাওডার বা মলম ব্যবহার করা রোযাদারের জন্য বৈধ। কারণ, তা পেটে পৌঁছে না।
তদনুরূপ প্রয়োজনে ত্বককে নরম রাখার জন্য কোন তেল, ভ্যাসলিন বা ক্রিম ব্যবহার করাও রোযা অবস্থায় অবৈধ নয়। কারণ, এ সব কিছু কেবল চামড়ার বাহিরের অংশ নরম করে থাকে এবং শরীরের ভিতরে প্রবেশ করে না। পরন্তু যদিও লোমকূপে তা প্রবেশ হওয়ার কথা ধরেই নেওয়া যায়, তবুও তাতে রোযা নষ্ট হবে না। (ইজি, ফাতাওয়া ইসলামিয়্যাহ ২/১২৭)
তদনুরূপ রোযা অবস্থায় মহিলাদের জন্য হাতে মেহেন্দী, পায়ে আলতা অথবা চুলে (কালো ছাড়া অন্য রঙের) কলফ ব্যবহার বৈধ। এ সবে রোযা বা রোযাদারের উপর কোন (মন্দ) প্রভাব ফেলে না। (ফাতাওয়া ইসলামিয়্যাহ ২/১২৭)
প্রশ্নঃ স্বামী-স্ত্রীর আপোষের চুম্বন ও প্রেমকেলিতে রোযার ক্ষতি হয় কি না?
উত্তর: যে রোযাদার স্বামী-স্ত্রী মিলনে ধৈর্য রাখতে পারে; অর্থাৎ সঙ্গম বা বীর্যপাত ঘটে যাওয়ার আশঙ্কা না করে, তাদের জন্য আপোসে চুম্বন ও প্রেমকেলি বা কোলাকুলি করা বৈধ এবং তা তাদের জন্য মকরূহ নয়। কারণ, মহানবী রোযা রাখা অবস্থায় স্ত্রী-চুম্বন করতেন এবং রোযা অবস্থায় প্রেমকেলিও করতেন। আর তিনি ছিলেন যৌন ব্যাপারে বড় সংযমী। (বুখারী ১৯২৭, মুসলিম ১১০৬, আবু দাউদ ২৩৮২, তিরমিযী ৭২৯, ইবনে আবী শাইবাহ ৯৩৯২নং) অন্য এক বর্ণনায় আছে যে, আল্লাহর রসূল স্ত্রী-চুম্বন করতেন রমযানে রোযা রাখা অবস্থায়; (মুসলিম ১১০৬নং) রোযার মাসে। (আবু দাউদ ২৩৮-৩, ইবনে আবী শাইবাহ ৯৩৯০নং)
আর এক বর্ণনায় আছে, মা আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, 'আল্লাহর রসূল আমাকে চুম্বন দিতেন। আর সে সময় আমরা উভয়ে রোযা অবস্থায় থাকতাম।' (আবু দাউদ ২৩৮-৪, ইবনে আবী শাইবাহ ৯৩৯৭নং)
উম্মে সালামাহ (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, তিনি তাঁর সাথেও অনুরূপ করতেন। (মুসলিম ১১০৮নং) আর তদ্রূপ বলেন হাফসা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা)ও। (ঐ ১১০৭নং)
উমার বলেন, একদা স্ত্রীকে খুশী করতে গিয়ে রোযা অবস্থায় আমি তাকে চুম্বন দিয়ে ফেললাম। অতঃপর নবী-এর নিকট উপস্থিত হয়ে বললাম, 'আজ আমি একটি বিরাট ভুল করে ফেলেছি; রোযা অবস্থায় স্ত্রী-চুম্বন করে ফেলেছি।' আল্লাহর রসূল বললেন, "যদি রোযা রেখে পানি দ্বারা কুল্লি করতে, তাহলে তাতে তোমার অভিমত কী?” আমি বললাম, 'তাতে কোন ক্ষতি নেই।' মহানবী বললেন, "তাহলে ভুল কিসের?” (আহমাদ ১/২১, ৫২, সহীহ আবু দাউদ ২০৮৯, দারেমী ১৬৭৫, ইবনে আবী শাইবাহ ৯৪০৬নং)
পক্ষান্তরে রোযাদার যদি আশঙ্কা করে যে, প্রেমকেলি বা চুম্বনের ফলে তার বীর্যপাত ঘটে যেতে পারে অথবা (স্বামী-স্ত্রী) উভয়ের উত্তেজনার ফলে সহসায় মিলন ঘটে যেতে পারে, কারণ সে সময় সে হয়তো তাদের উদগ্র কাম-লালসাকে সংযত করতে পারবে না, তাহলে সে কাজ তাদের জন্য হারাম। আর তা হারাম এই জন্য যে, যাতে পাপের ছিদ্রপথ বন্ধ থাকে এবং তাদের রোযা নষ্ট হওয়া থেকে রক্ষা পায়।
প্রশ্নঃ চুম্বন ছাড়া অন্য শৃঙ্গারাচারের ব্যাপারে বিধান কী? এ সময় মযী বের হয়ে গেলে রোযার ক্ষতি হবে কি?
উত্তর: চুম্বনের ক্ষেত্রে চুম্বন গালে হোক অথবা ঠোঁটে উভয় অবস্থাই সমান। তদনুরূপ সঙ্গমের সকল প্রকার ভূমিকা ও শৃঙ্গারাচার; সকাম স্পর্শ, ঘর্ষণ, দংশন, মর্দন, প্রচাপন, আলিঙ্গন প্রভৃতির মানও চুম্বনের মতই। এ সবের মাঝে কোন পার্থক্য নেই। আর এ সব করতে গিয়ে যদি কারো মযী (বা উত্তেজনার সময় আঠালো তরল পানি) নিঃসৃত হয়, তাহলে তাতে রোযার কোন ক্ষতি হয় না। (মুমতে' ৬/৩৯০, ৪৩২-৪৩৩)
প্রশ্নঃ স্ত্রীর জিভ চোষণের ফলে রোযার কোন ক্ষতি হবে কি?
উত্তর: জিভ চোষার ফলে একে অন্যের জিহ্বারস গিলে ফেললে রোযা ভেঙ্গে যাবে। যেমন স্তনবৃন্ত চোষণের ফলে মুখে দুগ্ধ এসে গলায় নেমে গেলেও রোযা ভেঙ্গে যাবে।
প্রশ্নঃ স্ত্রীর দেহাঙ্গের যে কোন অংশ দেখা রোযাদার স্বামীর জন্য বৈধ কি?
উত্তর: স্ত্রীর দেহাঙ্গের যে কোন অংশ দেখা রোযাদার স্বামীর জন্যও বৈধ। অবশ্য একবার দেখার ফলেই চরম উত্তেজিত হয়ে কারো মযী বা বীর্যপাত ঘটলে কোন ক্ষতি হবে না। (বুখারী ১৯২৭নং দ্রঃ) কারণ, অবৈধ নজরবাজীর ব্যাপারে মহানবী বলেন, "প্রথম দৃষ্টি তোমার জন্য বৈধ। কিন্তু দ্বিতীয় দৃষ্টি বৈধ নয়।” (আবু দাউদ ২১৪৯, তিরমিযী ২৭৭৮, সহীহ আবু দাউদ ১৮৮১নং) তাছাড়া দ্রুতপতনগ্রস্ত এমন দুর্বল স্বামীর এমন ওযর গ্রহণযোগ্য।
পক্ষান্তরে কেউ বারবার দেখার ফলে মযী নির্গত করলে রোযার কোন ক্ষতি হয় না। কিন্তু বারবার দেখার ফলে বীর্যপাত করে ফেললে রোযা নষ্ট হয়ে যাবে।
প্রশ্নঃ স্ত্রীর দেহাঙ্গ নিয়ে কল্পনাবিহারে বীর্যপাত ঘটলে রোযা নষ্ট হবে কি?
উত্তর: স্ত্রী-দেহ নিয়ে কল্পনা করার ফলে কারো মযী বা বীর্যপাত হলে রোযা নষ্ট হয় না। যেহেতু মহানবী-এর ব্যাপক নির্দেশ এ কথার প্রতি ইঙ্গিত করে। তিনি বলেন, "নিশ্চয় আল্লাহ আমার উম্মতের মনের কল্পনা উপেক্ষা করেন, যতক্ষণ কেউ তা কাজে পরিণত অথবা কথায় প্রকাশ না করে।” (বুখারী ২৫২৮, মুসলিম ১২৭, দ্রঃ মুমতে' ৬/৩৯০-৩৯১)
প্রশ্নঃ রোযা অবস্থায় দাঁত তোলা বৈধ কি?
উত্তর: রোযাদারের জন্য দাঁত (স্টোন ইত্যাদি থেকে) পরিষ্কার করা, ডাক্তারী ভরণ (ইনলেই) ব্যবহার করা এবং যন্ত্রণায় দাঁত তুলে ফেলা বৈধ। তবে এ সব ক্ষেত্রে তাকে একান্ত সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত, যাতে কোন প্রকার ওষুধ বা রক্ত গিলা না যায়। (ইবা, ফাতাওয়া মুহিম্মাহ, তাতাআল্লাকু বিস্সিয়াম ২৯পৃঃ)
প্রশ্নঃ রোযা অবস্থায় দেহের রক্তশোধন বৈধ কি?
উত্তর: রোযাদারের কিডনী অচল হলে রোযা অবস্থায় প্রয়োজনে দেহের রক্ত পরিষ্কার ও শোধন (Dialysis) করা বৈধ। পরিশুদ্ধ করার পর পুনরায় দেহে ফিরিয়ে দিতে যদিও রক্ত দেহ থেকে বের হয়, তবুও তাতে রোযার কোন ক্ষতি হবে না। (ইউ)
প্রশ্নঃ রোযা অবস্থায় ইঞ্জেকশন নেওয়া বৈধ কি?
উত্তর: রোযাদারের জন্য চিকিৎসার ক্ষেত্রে সেই ইঞ্জেকশন ব্যবহার করা বৈধ, যা পানাহারের কাজ করে না। যেমন, পেনিসিলিন বা ইন্সুলিন ইঞ্জেকশন অথবা অ্যান্টিবায়োটিক বা টনিক কিংবা ভিটামিন ইঞ্জেকশন অথবা ভ্যাকসিন ইঞ্জেকশন প্রভৃতি হাতে, কোমরে বা অন্য জায়গায়, দেহের পেশী অথবা শিরায় ব্যবহার করলে রোযার ক্ষতি হয় না। তবুও নিতান্ত জরুরী না হলে তা দিনে ব্যবহার না করে রাত্রে ব্যবহার করাই উত্তম ও পূর্বসাবধানতামূলক কর্ম। যেহেতু মহানবী বলেন, “যে বিষয়ে সন্দেহ আছে, সে বিষয় বর্জন করে তাই কর, যাতে সন্দেহ নেই।” (আহমাদ, তিরমিযী ২৫ ১৮, নাসাঈ, ইবনে হিব্বান, ত্বাবারানী প্রমুখ, সহীহুল জামে' ৩৩৭৭, ৩৩৭৮নং) "সুতরাং যে সন্দিহান বিষয়াবলী থেকে দূরে থাকবে, সে তার দ্বীন ও ইজ্জতকে বাঁচিয়ে নেবে।” (আহমাদ ৪/২৬৯, ২৭০, বুখারী 5২, মুসলিম ১৫৯৯নং, আবু দাউদ, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ, দারেমী)
প্রশ্নঃ রোযা অবস্থায় ক্ষতস্থানে ওষুধ ব্যবহার করা বৈধ কি?
উত্তর: রোযাদারের জন্য নিজ দেহের ক্ষতস্থানে ওষুধ দিয়ে ব্যান্ডেজ ইত্যাদি করা দূষণীয় নয়। তাতে সে ক্ষত গভীর হোক অথবা অগভীর। কারণ, এ কাজকে না কিছু খাওয়া বলা যাবে, আর না পান করা। তা ছাড়া ক্ষতস্থান স্বাভাবিক পানাহারের পথ নয়। (আহকামুস সাওমি অল-ই'তিকাফ ১৪০পৃঃ)
প্রশ্নঃ রোযা অবস্থায় মাথার চুল বা নাভির নিচের লোম চাঁছা বৈধ কি?
উত্তর: রোযাদারের জন্য নিজ মাথার চুল বা নাভির নিচের লোম ইত্যাদি চাঁছা বৈধ। তাতে যদি কোন স্থান কেটে রক্ত পড়লেও রোযার কোন ক্ষতি হয় না। পক্ষান্তরে দাড়ি চাঁছা সব সময়কার জন্য হারাম; রোযা অবস্থায় অথবা অন্য কোন অবস্থায়। (মাজাল্লাতুল বুহুসিল ইসলামিয়্যাহ ১৯/১৬৫)
প্রশ্নঃ রোযা অবস্থায় সুগন্ধির সুঘ্রাণ নেওয়া বৈধ কি?
উত্তর: রোযা রাখা অবস্থায় আতর বা অন্য প্রকার সুগন্ধি ব্যবহার করা এবং সর্বপ্রকার সুঘ্রাণ নাকে নেওয়া রোযাদারের জন্য বৈধ। তবে ধুয়া জাতীয় সুগন্ধি (যেমন আগরবাতি, চন্দন-ধুয়া প্রভৃতি) ইচ্ছাকৃত নাকে নেওয়া বৈধ নয়। কারণ, এই শ্রেণীর সুগন্ধির ঘনত্ব আছে; যা পাকস্থলিতে গিয়ে পৌঁছে। (ফাতাওয়া ইসলামিয়্যাহ ২/১২৮) বলা বাহুল্য, রান্নাশালের যে ধুয়া অনিচ্ছা সত্ত্বেও নাকে এসে প্রবেশ করে, তাতে রোযার কোন ক্ষতি হবে না। কারণ, তা থেকে বাঁচার উপায় নেই। (ইউ, মাজমু' ফাতাওয়া ১/৫০৮)
প্রকাশ থাকে যে নস্যি ব্যবহার করলে রোযা নষ্ট হয়ে যাবে। কারণ, তারও ঘনত্ব আছে এবং তার গুঁড়া পেটের ভিতরে পৌঁছে থাকে। তা ছাড়া তা মাদকদ্রব্যের শ্রেণীভুক্ত হলে ব্যবহার করা যে কোন সময়ে এমনিতেই হারাম।
প্রশ্নঃ রোযা অবস্থায় নাকে বা মুখে স্প্রে ব্যবহার বৈধ কি?
উত্তরঃ স্প্রে দুই প্রকার; প্রথম প্রকার হল ক্যাপসুল স্প্রে পাওডার জাতীয়। যা পিস্তলের মত কোন পাত্রে রেখে পুশ করে স্প্রে করা হয় এবং ধূলোর মত উড়ে গিয়ে গলায় পৌঁছলে রোগী তা গিলতে থাকে। এই প্রকার স্প্রেতে রোযা নষ্ট হয়ে যাবে। রোযাদারকে যদি এমন স্প্রে বছরের সব মাসে এবং দিনেও ব্যবহার করতেই হয়, তাহলে তাকে এমন রোগী গণ্য করা হবে, যার রোগ সারার কোন আশা নেই। সুতরাং সে রোযা না রেখে প্রত্যেক দিনের বিনিময়ে একটি করে মিসকীন খাইয়ে দেবে। দ্বিতীয় প্রকার স্প্রে হল বাষ্প জাতীয়। এই প্রকার স্প্রেতে রোযা ভাঙ্গবে না। কেননা, তা পাকস্থলীতে পৌঁছে না। (ইবনে উষাইমীন, ক্যাসেটঃ আহকামুন মিনাস সিয়াম) কারণ, তা হল এক প্রকার কমপ্রেস্ড গ্যাস; যার ডিব্বায় প্রেসার পড়লে উড়ে গিয়ে (নিঃশ্বাসের বাতাসের সাথে) ফুসফুসে পৌঁছে এবং শ্বাসকষ্ট দূর করে। এমন গ্যাস কোন প্রকার খাদ্য নয়। আর রমযান অরমযান এবং দিনে রাতে সব সময়ে (বিশেষ করে শ্বাসরোধ বা শ্বাসকষ্ট জাতীয় যেমন হাঁফানির রোগী) এর মুখাপেক্ষী থাকে। (ইবা, ফাতাওয়া মুহিম্মাহ, তাতাআল্লাকু বিস্সয়াম ৩৬পৃঃ) অনুরূপভাবে মুখের দুর্গন্ধ দূরীকরণের উদ্দেশ্যে ব্যবহার্য স্প্রে রোযাদারের জন্য ব্যবহার করা দোষাবহ নয়। তবে শর্ত হল, সে স্প্রে পবিত্র ও হালাল হতে হবে। (মাজাল্লাতুল বুহুসিল ইসলামিয়্যাহ ৩০/১১২)
প্রশ্নঃ সেহরীর শেষ সময় পর্যন্ত পানাহার ও স্ত্রী-সহবাস করা রোযাদারের জন্য বৈধ কি?
উত্তর: সেহরীর শেষ সময় পর্যন্ত পানাহার ও স্ত্রী-সহবাস করা রোযাদারের জন্য বৈধ। কিন্তু ফজর উদয় (সময় বা আযান) হওয়ার সাথে সাথে মুখের খাবার উগলে ফেলা ওয়াজেব। (এ ব্যাপারে মতভেদ পূর্বে আলোচিত হয়েছে।) অনুরূপ সহবাস করতে থাকলে সঙ্গে সঙ্গে স্বামী-স্ত্রী পৃথক হয়ে যাওয়া জরুরী। এরূপ করলে রোযা শুদ্ধ হয়ে যাবে। পক্ষান্তরে সেহরীর সময় শেষ হয়ে গেছে বা ফজরের আযান শুরু হয়ে গেছে জেনে বা শুনেও যদি কেউ পানাহার বা স্ত্রী-সঙ্গমে মত্ত থাকে, তাহলে তার রোযা হবে না। মহানবী বলেন, "বিলাল রাতে আযান দেয়। সুতরাং তোমরা ততক্ষণ পর্যন্ত পানাহার করতে থাক, যতক্ষণ পর্যন্ত না ইবনে উম্মে মাকতুম আযান দেয়।” (বুখারী ৬১৭নং, মুসলিম)
প্রশ্নঃ ফজর উদয় হওয়ার পরেও নাপাক থাকা রোযাদারের জন্য বৈধ কি? স্ত্রী-সঙ্গম অথবা স্বপ্নদোষ হওয়ার পরেও সময় অভাবে গোসল না করে নাপাক অবস্থাতেই রোযাদার রোযার নিয়ত করতে এবং সেহরী খেতে পারে। এমন কি সেহরীর সময় শেষ হয়ে গেলেও আযানের পর গোসল করতে পারে। এ ক্ষেত্রে রোযার শুরুর কিছু অংশ নাপাকে অতিবাহিত হলেও রোযার কোন ক্ষতি হবে না। অবশ্য নামাযের জন্য গোসল জরুরী।
মা আয়েশা ও উম্মে সালামাহ (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন, 'আল্লাহর রসূল-এর (কখনো কখনো) স্ত্রী-মিলন করে অপবিত্র অবস্থায় ফজর হয়ে যেত। তারপর তিনি গোসল করতেন এবং রোযা রাখতেন।' (বুখারী ১৯২৫, মুসলিম ১১০৯নং) তাছাড়া মহান আল্লাহ ফজর উদয় হওয়ার সময় পর্যন্ত স্ত্রী-মিলনের অনুমতি দিয়েছেন এবং তার পর থেকে রোযা রাখার আদেশ দিয়েছেন। আর তার মানেই হল যে, রোযাদারের জন্য (ফজর উদয়ের পূর্বে) মিলনের পর (ফজর উদয়ের পরে) নাপাকীর গোসল করা বৈধ। (দ্রঃ মুহাল্লা ৬/২২০) তদনুরূপ নিফাস ও ঋতুমতী মহিলার রাত্রে খুন বন্ধ হলে (রোযার নিয়ত করে এবং সেহরী খেয়ে) ফজরের পর রোযায় থেকে পরে গোসল করে নামায পড়তে পারে। উপর্যুক্ত নাপাক পুরুষ ও মহিলার জন্য নাপাকীর গোসলকে সকাল বা দুপুরের সময় পর্যন্ত বিলম্বিত করা বৈধ নয়। বরং সূর্য উদয়ের পূর্বেই গোসল করে যথাসময়ে নামায আদায় করা তাদের জন্য ওয়াজেব। যেমন পুরুষের জন্য ওয়াজেব এমন সময়ের ভিতরে সত্বর গোসল করা, যাতে ফজরের নামায জামাআত সহকারে মসজিদে আদায় করতে সক্ষম হয়। (ফিক্বহুস সুন্নাহ ১/৪১১, ইবা, ফাতাওয়াস সিয়াম ৫১পৃঃ)
জ্ঞাতব্য যে, রমযানের দিনের বেলায় রোযাদারের স্বপ্নদোষ হয়ে গেলে তার রোযা বাতিল নয়। কেননা, তা তার এখতিয়ারকৃত নয়। অতএব তার জন্য জরুরী হল, নাপাকীর গোসল করা। অবশ্য ফজরের নামায পড়ার পর ঘুমাতে গিয়ে স্বপ্নদোষ হলে, সঙ্গে সঙ্গে গোসল না করে যদি যোহরের আগে পর্যন্ত বিলম্ব করে গোসল করে, তাহলে তাতে দোষ হবে না। (ইবা, ফাতাওয়াস সিয়াম ৫১ পৃঃ) অবশ্য উত্তম হল, নাপাকে না থেকে সম্ভব হলে সঙ্গে সঙ্গে গোসল করে বিভিন্নভাবে আল্লাহর যিকর করা。
প্রশ্নঃ রোযার দিনে ঘুমিয়ে থাকা বৈধ কি?
উত্তর: রোযাদারের জন্য দিনে ঘুমানো বৈধ। কিন্তু সকল নামায তার যথাসময়ে জামাআত সহকারে আদায় করতে অবহেলা প্রদর্শন করা বৈধ নয়। যেমন, বিভিন্ন ইবাদতের কল্যাণ থেকে নিজেকে বঞ্চিত করা উচিত নয়। বরং উচিত হল, ঘুমিয়ে সময় নষ্ট না করে রমযানের সেই মাহাত্ম্যপূর্ণ সময়কে নফল নামায, যিক্র-আযকার ও কুরআন কারীম তেলাঅত দ্বারা আবাদ করা। যাতে তার রোযার ভিতরে নানা প্রকার ইবাদতের সমাবেশ ঘটে। (ইবনে উষাইমীন, ফাতাওয়াস সিয়াম ৩১-৩২পৃঃ)
প্রশ্নঃ সেহরীর সময় আমি মাসিক থেকে পবিত্রতা লক্ষ্য করলাম। সুতরাং সেহরী খেয়ে রোযার নিয়ত করলাম। সূর্য ওঠার আগেও দেখলাম, অপবিত্রতার কোন চিহ্ন ফিরে আসেনি। অতএব গোসল ক'রে ফজরের নামায পড়লাম। আমার এ দিনের রোযা কি শুদ্ধ হবে?
উত্তর: খুন বন্ধ হওয়ার পর গোসল না ক'রে সেহরী খেয়ে এবং ফজরের সময় হওয়ার পর সূর্য ওঠার আগে গোসল ক'রে ফজরের নামায পড়লে রোযা হয়ে যাবে। (ইজি)
প্রশ্ন: সেহরীর সময় উঠে দেখি, তখনও অপবিত্রতার চিহ্ন রয়ে গেছে। সুতরাং রোযা রাখলাম না। কিন্তু সকালে উঠে দেখি, আমি পবিত্র হয়ে গেছি। তখন আমার করণীয় কী?
উত্তর: আপনি সারা দিন কিছু পানাহার করবেন না। গোসল ক'রে যোহরের নামায পড়বেন। তবে ঐ দিনকার রোযা আপনার হবে না, কাযা করতে হবে。
প্রশ্ন: সারাদিন রোযা থাকার পর ইফতারের পাঁচ মিনিট আগে মাসিক দেখা দিলে, সেদিনকার রোযাটা বরবাদ যাবে কি?
উত্তর: ফজর উদয়ের পর থেকে নিয়ে সূর্য ডোবার আগে পর্যন্ত সময়ে মাসিক শুরু হলে রোযা নষ্ট হয়ে যাবে。
প্রশ্নঃ ঋতুবতী মহিলা কি রোযার দিনে পানাহার করতে পারে না?
উত্তর: ঋতু থাকা অবস্থায় পারে। সেহরী খেয়ে সকালে খুন দেখলে সারাদিন সে পানাহার করতে পারে। কিন্তু ঋতু বন্ধ হয়ে গেলে আর পানাহার করতে পারে না। যেমন সেহরীর সময় খুন দেখে সকালে পবিত্রতা লক্ষ্য করলে সারাদিন পানাহার করতে পারে না。
প্রশ্নঃ রমযানের দিনের বেলায় যদি কোন রোযাদার প্রথমে কিছু খেয়ে রোযা নষ্ট করার পর স্ত্রী-সহবাস করে, তাহলে কি তাকে কাফফারা লাগবে না?
উত্তর: যদি সে মুসাফির হয়, তাহলে তার জন্য বৈধ। তাকে কাফফারা লাগবে না। কিন্তু বাড়িতে থাকা অবস্থায় এমন ছল-বাহানা ক'রে স্ত্রী-সহবাস করলে কাফফারা থেকে রেহাই পাবে না। বরং এমন মানুষের গোনাহ বেশি।
প্রশ্ন: রমযানের কাযা রোযা রেখে সহবাস করলেও কি অনুরূপ কাফফারা আদায় করতে হবে?
উত্তর: রমযানের কাযা রোযা, কোন সুন্নত বা নফল রোযা, নযর বা কসমের কাফফারার রোযা রাখা অবস্থায় সহবাস হয়ে গেলে কোন কাফফারা আদায় করতে হয় না।।
প্রশ্ন: স্বামী-স্ত্রী সফরে ছিল। সেহরী খেয়ে রমযানের রোযাও রেখেছিল। কিন্তু দুপুরে মিলন ঘটে যায়? এতে কি কাফ্ফারা ওয়াজেব?
উত্তর: যে সফরে রোযা কাযা করা চলে, সে সফরে রোযা অবস্থায় মিলন ঘটে গেলে কাফফারা লাগবে না। যেমন সফরে তার জন্য পানাহার বৈধ, তেমনি স্ত্রী-মিলনও বৈধ। (ইজি)