📄 দ্বীন
প্রশ্নঃ দ্বীনে মধ্যমপন্থা কী?
উত্তর: দ্বীন মানতে কিছু লোক চরমপন্থী আছে, কিছু আছে নরম ও ঢিলেপন্থী এবং কিছু আছে মধ্যমপন্থী। কেউ দ্বীন ও ইবাদতের ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি ও অতিরঞ্জন করে, সহজটাকে কঠিন করে এবং কেউ একেবারে ঢিলেমি করে, অবজ্ঞা ও অবহেলা করে এবং কঠিনটাকে সহজ মনে করে। অথচ প্রত্যেক জিনিসের মাঝামাঝিটাই ঠিক।
আমাদের দ্বীনই হল মধ্যমপন্থী। তাতে অতিরঞ্জন নেই। মহানবী ও তাঁর সাহাবাবর্গের পথই হল মধ্যমপন্থা। মহানবী-এর তরীকাই হল মাঝামাঝি আচরণ। আনাস বলেন যে, তিন ব্যক্তি নবী-এর স্ত্রীদের বাসায় এলেন। তাঁরা নবী- এর ইবাদত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন। অতঃপর যখন তাঁদেরকে এর সংবাদ দেওয়া হল তখন তাঁরা যেন তা অল্প মনে করলেন এবং বললেন, 'আমাদের সঙ্গে নবী-এর তুলনা কোথায়? তাঁর তো আগের ও পরের সমস্ত গোনাহ মোচন ক'রে দেওয়া হয়েছে। (সেহেতু আমাদের তাঁর চেয়ে বেশী ইবাদত করা প্রয়োজন)।' সুতরাং তাঁদের মধ্যে একজন বললেন, 'আমি সারা জীবন রাতভর নামায পড়ব।' দ্বিতীয়জন বললেন, 'আমি সারা জীবন রোযা রাখব, কখনো রোযা ছাড়ব না।' তৃতীয়জন বললেন, 'আমি নারী থেকে দূরে থাকব, জীবনভর বিয়েই করব না।' অতঃপর রাসূলুল্লাহ তাঁদের নিকট এলেন এবং বললেন, "তোমরা এই এই কথা বলেছ? শোনো! আল্লাহর কসম! আমি তোমাদের চেয়ে বেশী আল্লাহকে ভয় করি, তার ভয় অন্তরে তোমাদের চেয়ে বেশী রাখি। কিন্তু আমি (নফল) রোযা রাখি এবং রোযা ছেড়েও দিই, নামায পড়ি এবং নিদ্রাও যাই। আর নারীদের বিয়েও করি। সুতরাং যে আমার সুন্নত হতে মুখ ফিরিয়ে নিবে, সে আমার দলভুক্ত নয়।" (বুখারী-মুসলিম)
সুতরাং তাঁর তরীকাতেই রয়েছে মধ্যমপন্থী আচরণ। তিনি বলেছেন, “নিশ্চয় দ্বীন সহজ। যে ব্যক্তি অহেতুক দ্বীনকে কঠিন বানাবে, তার উপর দ্বীন জয়ী হয়ে যাবে। (অর্থাৎ মানুষ পরাজিত হয়ে আমল ছেড়ে দেবে।) সুতরাং তোমরা সোজা পথে থাক এবং (ইবাদতে) মধ্যমপন্থা অবলম্বন কর। তোমরা সুসংবাদ নাও। আর সকাল-সন্ধ্যা ও রাতের কিছু অংশে ইবাদত করার মাধ্যমে সাহায্য নাও।” (বুখারী)
বুখারীর অন্য এক বর্ণনায় আছে, "তোমরা সরল পথে থাকো, মধ্যমপন্থা অবলম্বন কর, সকাল-সন্ধ্যায় চল (ইবাদত কর) এবং রাতের কিছু অংশে। আর তোমরা মধ্যমন্থা অবলম্বন কর, মধ্যমন্থা অবলম্বন কর, তাহলেই গন্তব্যস্থলে পৌঁছে যাবে।" যারা ঢিলেপন্থী, তারা সুন্নতের উপর আমল করে না, নফল আদায় করতে সচেষ্ট হয় না, বরং অনেক সময় ফরয আদায়েও শৈথিল্য করে।
উদাহরণ স্বরূপঃ-
(ক) একটি লোক ফাসেক (পাপাচার), সে কাবীরা গোনাহ করে, কিন্তু নামায পড়ে এবং শির্ক করে না। চরমপন্থী বলে, 'আমি তাকে সালাম করব না, তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করব, তার সাথে কথা বলব না।'
নরমপন্থী বলে, 'পাপকে ঘৃণা কর, পাপীকে নয়। আমি তাকে সালাম করব, তার সাথে সুসম্পর্ক রাখব, তার সাথে হেসে-খেলে উঠাবসা করব।'
আর মধ্যমপন্থী বলে, 'আমি তার পাপের জন্য তাকে ঘৃণা করব এবং ঈমানের জন্য ভালোবাসব। তাকে বর্জন করায় যদি কোন উপকার থাকে, তাহলে তাকে বর্জন করব।'
(খ) চরমপন্থী লোক স্ত্রীকে চরণের দাসী মনে করে। নরমপন্থী তাকে নিজের প্রভু মনে করে, বানরের মতো তার কথায় ওঠ-বস করে। আর মধ্যমপন্থী তাকে বন্ধু মনে করে। সে জানে,
{وَلَهُنَّ مِثْلُ الَّذِي عَلَيْهِنَّ بِالْمَعْرُوفِ وَلِلرِّجَالِ عَلَيْهِنَّ دَرَجَةٌ وَاللَّهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ} (۲۲۸)
অর্থাৎ, নারীদের তেমনি ন্যায়-সঙ্গত অধিকার আছে যেমন আছে তাদের উপর পুরুষদের। কিন্তু নারীদের উপর পুরুষদের কিছুটা মর্যাদা আছে। আল্লাহ মহাপরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। (বাক্বারাহঃ ২২৮)
রাসূলুল্লাহ বলেছেন, "কোন ঈমানদার পুরুষ যেন কোন ঈমানদার নারী (স্ত্রীকে) ঘৃণা না করে। যদি সে তার একটি আচরণে অসন্তুষ্ট হয়, তবে অন্য আচরণে সন্তুষ্ট হবে।” (মুসলিম)
প্রশ্ন: মহান আল্লাহ যে জিনিসকে হালাল করেছেন, তা হারাম এবং যে জিনিসকে হারাম করেছেন, তা হালাল করার ব্যাপারে কোন ইমাম, আলেম বা সরকারের আনুগত্য করা কী?
উত্তর: এই শ্রেণীর আনুগত্য তিনভাবে হতে পারে:-
(ক) আল্লাহর বিধানে অসন্তোষ প্রকার ক'রে অথবা তা অপছন্দ ক'রে গায়রুল্লাহর বিধানকে পছন্দ ক'রে তার আনুগত্য করা। এর ফলে মুসলিম 'কাফের' হয়ে যায়। যেহেতু মহান আল্লাহ বলেছেন,
{ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ كَرِهُوا مَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأَحْبَطَ أَعْمَالَهُمْ} (۹) سورة محمد
অর্থাৎ, এটা এ জন্যে যে, আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, তারা তা অপছন্দ করে। সুতরাং আল্লাহ তাদের কর্মসমূহ নিষ্ফল ক'রে দেবেন। (মুহাম্মাদঃ ৯) আর এ কথা বিদিত যে, একমাত্র কাফেরদেরই যাবতীয় আমল নিষ্ফল করা হয়।
(খ) গায়রুল্লাহর বিধানের আনুগত্য করে। তবে এ কথা মনে-প্রাণে বিশ্বাস রাখে যে, আল্লাহর বিধানই সর্বশ্রেষ্ঠ এবং মানুষের জন্য অধিক কল্যাণকর। কিন্তু কোন কুপ্রবৃত্তিবশে, কোন লোভ বা লাভের খাতিরে গায়রুল্লাহর বিধানের আনুগত্য করে। এ আনুগত্যে মুসলিম 'কাফের' হবে না। যেহেতু সে আল্লাহর বিধানকে অস্বীকার ও প্রত্যাখ্যান করে না। বরং স্বার্থবশে তা পালন করে না। সুতরাং তাকে ফাসেক বলা যাবে।
(গ) না জেনে গায়রুল্লাহর বিধানের আনুগত্য করে। অথবা সে মনে করে যে, সেটাই আল্লাহর বিধান। এ ক্ষেত্রে দুই অবস্থা হতে পারে:-
এক: তার পক্ষে আল্লাহর বিধান জানা সম্ভব। কিন্তু সে জানার চেষ্টা করে না। অথচ মহান আল্লাহ অজানা বিধান উলামার নিকট জিজ্ঞাসা ক'রে জেনে নিতে আদেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন,
{فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِن كُنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ} (٤٣) سورة النحل، الأنبياء 7
অর্থাৎ, তোমরা যদি না জান, তাহলে জ্ঞানীদেরকে জিজ্ঞাসা কর; (নাহল: ৪৩, আম্বিয়া: ৭) এ অবস্থায় সে গোনাহগার হবে।
দুই: তার পক্ষে আল্লাহর বিধান জানা সম্ভব নয়। সুতরাং সে কোন আলেম, নেতা বা সরকারের অন্ধানুকরণ করে। এমতাবস্থায় তার কোন অপরাধ হবে না। যেহেতু মহানবী বলেছেন,
« مَنْ أُفْتِيَ بِغَيْرِ عِلْمٍ كَانَ إِثْمُهُ عَلَى مَنْ أَفْتَاهُ ».
অর্থাৎ, যে ব্যক্তিকে বিনা ইল্মে (ভুল) ফতোয়া দেওয়া হয়, তার পাপ বর্তে মুফতীর উপর। (আবু দাউদ ৩৬৫৭, ইবনে মাজাহ ৫৭, দারেমী ১৫৯নং) এ অবস্থায় যদি অন্ধানুকরণকারীর অপরাধ গণ্য করা হয়, তাহলে তাতে বড় সমস্যা দেখা দেবে এবং ভুলের আশঙ্কায় কেউ কোন আলেমের কথায় ভরসাই রাখবে না। (ইউ)
প্রশ্নঃ যে ব্যক্তি শরীয়তের কোন বিধানকে 'অচল' বা 'বস্তাপচা' মনে করে, সে ব্যক্তির বিধান কী?
উত্তর: সে ব্যক্তি কাফের। যেহেতু শরীয়তের কোন বিধান অচল ও বস্তাপচা নয়। শরীয়তের বিধান বুঝার জন্য অথবা তা বহাল করার জন্য মানুষের বিবেক-বুদ্ধি অচল হতে পারে। কিন্তু সে বিধান শাশ্বত, চিরন্তন ও কালজয়ী। (ইবা)
প্রশ্নঃ যে ব্যক্তি মনে করে, নারী-পুরুষের সমান অধিকার না দিয়ে ইসলাম নারীর প্রতি যুলুম করেছে, সে ব্যক্তির বিধান কী?
উত্তর: ইসলাম নারীকে পুরুষের সমান অধিকার না দিলেও, তাকে তার যথাযথ অধিকার দান করেছে। ইসলাম তার প্রতি কোন অন্যায় করেনি। ইসলামের এ অধিকার বণ্টনকে যদি কেউ অস্বীকার করে এবং অন্যায় ও অবিচার মনে করে, তাহলে সে কাফের। (ইবা)
📄 বিদআত
প্রশ্নঃ 'বিদআত' কাকে বলে? কখন কোন্ কাজকে 'বিদআত' বলে আখ্যায়ন করা হবে?
উত্তর: বিদআত বলা হয় দ্বীন ও ইবাদতে নব আবিষ্কৃত কাজকে। অর্থাৎ, দ্বীন বা ইবাদত মনে ক'রে করা এমন কাজকে বিদআত বলা হবে, যে কাজের কুরআন ও সহীহ সুন্নাহর কোন দলীল নেই। রাসূলুল্লাহ বলেন,
(( وَإِيَّاكُمْ وَمُحْدَثَاتِ الأُمُور ؛ فَإِنَّ كلَّ بدعةٍ ضَلالَة )). رواه أبو داود والترمذي
অর্থাৎ, তোমরা (দ্বীনে) নব উদ্ভাবিত কর্মসমূহ (বিদআত) থেকে বেঁচে থাকবে। কারণ, প্রত্যেক বিদআতই ভ্রষ্টতা।” (আবু দাউদ, তিরমিযী)
(( مَنْ أَحْدَثَ فِي أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ مِنْهُ فَهُوَ رَدٌ )) . مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ ، وفي رواية المسلم : (( مَنْ عَمِلَ عَمَلاً لَيْسَ عَلَيْهِ أَمْرُنَا فَهُوَ رَدُّ)).
অর্থাৎ, “যে ব্যক্তি আমার এই দ্বীনে (নিজের পক্ষ থেকে) কোন নতুন কিছু উদ্ভাবন করল---যা তার মধ্যে নেই, তা প্রত্যাখ্যানযোগ্য।” (বুখারী ও মুসলিম) মুসলিমের অন্য এক বর্ণনায় আছে, "যে ব্যক্তি এমন কাজ করল, যে ব্যাপারে আমাদের নির্দেশ নেই, তা বর্জনীয়।” বলা বাহুল্য, নব আবিষ্কৃত পার্থিব কোন বিষয়কে বিদআত বলা যাবে না। যেমন শরীয়াতে নিষিদ্ধ কোন কাজকে বিদআত বলা হয় না। বরং তাকে অবৈধ, হারাম বা মকরূহ বলা হয়।
প্রশ্নঃ বিদআত কাকে বলে? 'বিদআতে হাসানাহ' বলে কি কোন বিদআত আছে?
উত্তর: বিদআত বলা হয় দ্বীন বিষয়ক কোন নতুন কর্মকে, যার কোন দলীল শরীয়তে নেই। মহানবী বলেছেন, "অবশ্যই তোমাদের মধ্যে যারা আমার বিদায়ের পর জীবিত থাকবে তারা অনেক রকমের মতভেদ দেখতে পাবে। অতএব তোমরা আমার এবং আমার সুপথপ্রাপ্ত খোলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাহ অবলম্বন করো, তা দাঁত দ্বারা দৃঢ়তার সাথে ধারণ করো। (তাতে যা পাও মান্য কর এবং অন্য কোনও মতের দিকে আকৃষ্ট হয়ো না।) আর (দ্বীনে) নবরচিত কর্মসমূহ হতে সাবধান! কারণ, নিশ্চয়ই প্রত্যেক বিদআত (নতুন আমল) হল ভ্রষ্টতা।” (আবু দাউদ ৪৪৪৩, তিরমিযী ২৮১৫, ইবনে নাজাহ ৪২ নং) আর নাসাঈর এক বর্ণনায় আছে, "আর প্রত্যেক ভ্রষ্টতা জাহান্নামে (নিয়ে যায়)।" উক্ত হাদীস থেকে এ কথাও প্রমাণ হয় যে, বিদআতে হাসানাহ (ভাল বিদআত) বলে কোন বিদআত নেই। কারণ মহানবী বলেছেন, "প্রত্যেক বিদআত হল ভ্রষ্টতা।”
প্রশ্ন: 'বিদআতে হাসানাহ' নামক কোন বিদআত আছে কি, যা করলে সওয়াব হয়। যেহেতু হাদীসে আছে, “যে ব্যক্তি ইসলামে ভাল রীতি চালু করবে, সে তার নিজের এবং ঐ সমস্ত লোকের সওয়াব পাবে, যারা তার (মৃত্যুর) পর তার উপর আমল করবে। তাদের সওয়াবের কিছু পরিমাণও কম করা হবে না।” (মুসলিম)
উত্তর: 'বিদআতে হাসানাহ' (ভাল বিদআত) বলে কোন বিদআত নেই। বরং প্রত্যেক বিদআতই 'সাইয়্যিআহ' (মন্দ)। মহানবী বলেছেন,
((فَإِنَّ كلَّ بِدْعَةٍ ضَلالَة )) . رواه أبو داود والترمذي
অর্থাৎ, প্রত্যেক বিদআতই ভ্রষ্টতা।” (আবু দাউদ, তিরমিযী) আর হাদীসে যে ভাল রীতি চালু করার কথা বলা হয়েছে, তা নতুন কোন রীতি নয়। বরং যে রীতি শরীয়ত সম্মত কিন্তু কোন জায়গায় তা চালু ছিল না। কোন ব্যক্তি তা চালু করলে তার ঐ সওয়াব হয়। পূর্ণ হাদীসটি পড়লে আপনি নিজেই বুঝতে পারবেন, কোন্ শ্রেণীর রীতির কথা বলা হয়েছে।
জারীর ইবনে আব্দুল্লাহ বলেন, একদা আমরা দিনের প্রথম ভাগে রাসূলুল্লাহ-এর নিকট ছিলাম। অতঃপর তাঁর নিকট কিছু লোক এল, যাদের দেহ বিবস্ত্র ছিল, পশমের ডোরা কাটা চাদর (মাথা প্রবেশের মত জায়গা মাঝে কেটে) পরে ছিল অথবা 'আবা' (আংরাখা) পরে ছিল, তরবারি তারা নিজেদের গর্দানে ঝুলিয়ে রেখেছিল। তাদের অধিকাংশ মুযার গোত্রের (লোক) ছিল; বরং তারা সকলেই মুযার গোত্রের ছিল। তাদের দরিদ্রতা দেখে রাসূলুল্লাহ-এর চেহারা পরিবর্তন হয়ে গেল। সুতরাং তিনি (বাড়ির ভিতর) প্রবেশ করলেন এবং পুনরায় বের হলেন। তারপর তিনি বেলালকে (আযান দেওয়ার) আদেশ করলেন। ফলে তিনি আযান দিলেন এবং ইকামত দিলেন। অতঃপর তিনি নামায পড়ে লোকদেরকে (সম্বোধন ক'রে) ভাষণ দিলেন। তিনি বললেন, “হে মানব সম্প্রদায়! তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় কর, যিনি তোমাদের এক ব্যক্তি হতে সৃষ্টি করেছেন ও তা হতে তার সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন, যিনি তাদের দু'জন থেকে বহু নরনারী (পৃথিবীতে) বিস্তার করেছেন। সেই আল্লাহকে ভয় কর, যার নামে তোমরা একে অপরের নিকট যাজ্ঞা কর এবং জ্ঞাতি-বন্ধন ছিন্ন করাকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের উপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখেন।” (সূরা নিসা ১ আয়াত) অতঃপর দ্বিতীয় আয়াত যেটি সূরা হাশরের শেষে আছে সেটি পাঠ করলেন, "হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। আর প্রত্যেকেই ভেবে দেখুক যে, আগামীকালের (কিয়ামতের) জন্য সে অগ্রিম কী পাঠিয়েছে। তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় তোমরা যা কর আল্লাহ সে সম্পর্কে অবহিত।” (সূরা হাশর ১৮ আয়াত) "সুতরাং প্রত্যেক ব্যক্তি যেন নিজ দীনার (স্বর্ণমুদ্রা), দিরহাম (রৌপ্যমুদ্রা), কাপড়, এক সা' গম ও এক সা' খেজুর থেকে সাদকাহ করে।” এমনকি তিনি বললেন, "খেজুরের আধা টুকরা হলেও (তা যেন দান করে)।” সুতরাং আনসারদের একটি লোক (চাঁদির) একটি থলে নিয়ে এল, লোকটির করতল যেন তা ধারণ করতে পারছিল না; বরং তা ধারণ করতে অক্ষমই ছিল। অতঃপর (তা দেখে) লোকেরা পরস্পর দান আনতে আরম্ভ করল। এমনকি খাদ্য সামগ্রী ও কাপড়ের দু'টি স্তূপ দেখলাম। পরিশেষে আমি দেখলাম যে, রাসুলুল্লাহ-এর চেহারা যেন সোনার মত ঝলমল করছে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ বললেন, "যে ব্যক্তি ইসলামে ভাল রীতি চালু করবে, সে তার নিজের এবং ঐ সমস্ত লোকের সওয়াব পাবে, যারা তার (মৃত্যুর) পর তার উপর আমল করবে। তাদের সওয়াবের কিছু পরিমাণও কম করা হবে না। আর যে ব্যক্তি ইসলামে কোন মন্দ রীতির প্রচলন করবে, তার উপর তার নিজের এবং ঐ লোকদের গোনাহ বর্তাবে, যারা তার (মৃত্যুর) পর তার উপর আমল করবে। তাদের গোনাহর কিছু পরিমাণও কম করা হবে না।” (মুসলিম)
লক্ষণীয় যে, দান করা একটি ভাল রীতি। কিন্তু অনেকের মধ্যে যে প্রথম শুরু করবে, তার হবে উক্ত সওয়াব। কোন নতুন রীতি আবিষ্কার করা উদ্দেশ্য নয়। হাদীসের শব্দে ঐ রীতিকে 'সুন্নাহ' বলা হয়েছে, যা বিদআতের বিপরীত। সুতরাং 'বিদআতে হাসানা'র দলীল তাতে নেই।
বলা বাহুল্য, উক্ত হাদীসে নতুন রীতি চালু করার পর্যায়ভুক্ত তিন প্রকার কাজ:- (ক) শরীয়তসম্মত ভাল কাজ। কিন্তু অনেকের মধ্যে সর্বপ্রথম করা। (খ) কোন সুন্নত কাজ, যা উঠে গিয়েছিল বা লোকমাঝে প্রচলিত ছিল না অথবা অজানা ছিল, তা নতুনভাবে প্রতিষ্ঠা করা, লোকমাঝে প্রচলিত করা অথবা জানিয়ে তার প্রচলন করা। (গ) কোন এমন কাজ করা, যা কোন শরীয়তসম্মত ভাল কাজের মাধ্যম। যেমন দ্বীনী মাদ্রাসা নির্মাণ করা, দ্বীনী বই-পত্র ছাপা ইত্যাদি। (ইউ)
প্রশ্নঃ ঈদে মীলাদুন নাবী বিদআত কেন?
উত্তর: যেহেতু শরীয়তে তার কোন দলীল নেই। খোদ নবী বা তাঁর কোন সাহাবী, কোন তাবেঈ বা ইমাম তা পালন করে যাননি, করার নির্দেশও দেননি।
সর্বপ্রথম ঈদে মীলাদ (নবীদিবস) আবিষ্কার করেন ইরাকের ইরবিল শহরের আমীর (গভর্নর) মুযাফ্ফারুদ্দীন কুকুবুরী ঠিক হিজরী সপ্তম শতাব্দীর গোড়ার দিকে ৬০৪ (মতান্তরে ৬২৫) হিজরীতে। মিসরে সর্বপ্রথম চালু করে ফাতেমীরা; যাদের প্রসঙ্গে ইবনে কাসীর বলেন, “(ফাতেমী শাসকগোষ্ঠী) কাফের, ফাসেক, পাপাচার, ধর্মধুজী, ধর্মদ্রোহী, আল্লাহর সিফাত (গুণাবলী) অস্বীকারকারী ও ইসলাম অস্বীকারকারী মাজুসী ধর্ম-বিশ্বাসী ছিল।” (আল-বিদায়াহ অন-নিহায়াহ' ১১/৩৪৬)
অনেকে বলেছেন, মীলাদে মোস্তফা একটি নব্য আবিষ্কার; যা আজ থেকে প্রায় বার শত বছর পূর্বে হিজরী দ্বিতীয় শতাব্দীর শেষভাগে শায়খ উমার বিন মুহাম্মাদ সর্বপ্রথম প্রবর্তন করেন। মাওসেলের অধিবাসী উক্ত উমার বিন মুহাম্মাদ নাকি খুবই আশেকে রসূল ও আল্লাহর অলী ছিলেন। তিনি রসূল-এর ভালবাসায় একান্ত অনুরাগের বশে এ মীলাদ তথা রসূল-এর জন্ম-বৃত্তান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনায় ব্রতী হন। বিখ্যাত সীরাতে শামী গ্রন্থে এ কথা স্বীকার করা হয়েছে। (দেখুনঃ ছহীহ মাকছুদে মু'মেনীন ৩৬৯পৃঃ) তাছাড়া এতে রয়েছে বিজাতির অনুকরণ এবং শরীয়ত-বিরোধী বহু কর্মকান্ড। ('বারো মাসে তেরো পরব' দ্রঃ)
প্রশ্নঃ 'ঈদে মীলাদুন নাবী' (নবী-দিবস) পালন করা বৈধ নয় কেন?
উত্তর: মহান আল্লাহ আমাদের দ্বীন ইসলামকে পূর্ণাঙ্গ করে দিয়েছেন তাঁর নবীর জীবদ্দশাতেই। মহান আল্লাহ বলেন,
الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دينا) (۳) المائدة
অর্থাৎ, আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন পূর্ণাঙ্গ করলাম ও তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ (নেয়ামত) সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের ধর্মরূপে মনোনীত করলাম। (সূরা মায়েদাহ ৩ আয়াত)
আর মহানবী বলেন, “যে ব্যক্তি আমাদের এ (দ্বীন) ব্যাপারে নতুন কিছু আবিষ্কার করে, সে ব্যক্তির সে কাজ প্রত্যাখ্যাত।” (বুখারী ও মুসলিম) "যে ব্যক্তি এমন কোন কাজ করে, যার উপর আমাদের কোন নির্দেশ নেই, সে ব্যক্তির সে কাজ প্রত্যাখ্যাত।” (মুসলিম) ইসলামে পালনীয় ঈদ হল মাত্র দুটি; ঈদুল ফিত্র ও ঈদুল আযহা। তৃতীয় কোন ঈদ ইসলামে নেই। মহানবী নবুয়তের ২৩ বছর কাল নিজের জীবনে কোন বছর নিজের জন্মদিন পালন করে যাননি। কোন সাহাবীকে তা পালন করার নির্দেশও দেননি। তাঁর পূর্ববর্তী নবীদের জন্ম-মৃত্যু উপলক্ষ্যে কোন আনন্দ অথবা শোকপালন করে যাননি। তাঁর পরবর্তীকালে তাঁর চারজন খলীফা তাঁদের খেলাফতকালে রাষ্ট্রীয়ভাবে অথবা এককভাবে নবীদিবস পালন করে যাননি। অন্য কোন সাহাবী বা আত্মীয়ও তাঁর প্রতি এত ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা থাকা সত্ত্বেও তাঁর জন্মদিন উপলক্ষ্যে আনন্দ অথবা মৃত্যুদিন উপলক্ষ্যে শোক পালন করেননি। তাঁদের পরেও কোন তাবেঈ অথবা তাঁদের কোন একনিষ্ঠ অনুসারী অথবা কোন ইমাম তাঁর জন্ম কিংবা মৃত্যুদিন পালন করার ইঙ্গিত দিয়ে যাননি। সুতরাং তা যে নব আবিষ্কৃত বিদআত, তা বলাই বাহুল্য। খ্রিষ্টানরা আন্দাজে ২৫শে ডিসেম্বর যীসু খ্রিস্টের জন্মোৎসব (মীলাদ, বড়দিন বা ক্রিস্টমাস ডে) এবং তাদের পরিবারের প্রত্যেক ব্যক্তির জন্মদিন (বার্থডে') বড় আনন্দের সাথে পালন করে থাকে। মুসলিমরা তাদের মত আনন্দে মাতোয়ারা হওয়ার উদ্দেশ্যে এই বিদআত ওদের নিকট হতেই গ্রহণ করে নিয়েছে। তাই এরাও ওদের মত নবীদিবস (ঈদে-মীলাদুন-নবী) এবং পরিবারের সভ্যদের (বিশেষ করে শিশুদের) 'হ্যাপি বার্থ ডে'র অনুষ্ঠান উদ্যাপন করে থাকে। অথচ তাদের রসূল তাদেরকে সাবধান করে বলেন, “যে ব্যক্তি কোন সম্প্রদায়ের সাদৃশ্য অবলম্বন করে সে তাদেরই একজন।” (আবুদাউদ)
প্রশ্নঃ কেক কেটে, মোমবাতি নিভিয়ে বার্থ-ডে বা জন্মদিন পালন করা কি?
উত্তর: বার্থ-ডে বা জন্মদিন, বিবাহবার্ষিকী পালন করা সুন্নত। তবে সেই সুন্নত, যার জন্য মহানবী বলেছেন, "অবশ্যই তোমরা তোমাদের পূর্ববর্তী জাতির সুন্নত (তরীকা) অনুসরণ করবে বিঘত বিঘত এবং হাত হাত পরিমাণ (সম্পূর্ণরূপে)। এমনকি তারা যদি সান্ডার (গোসাপ জাতীয় এক প্রকার হালাল জন্তর) গর্তে প্রবেশ করে, তবে তোমরাও তাদের অনুসরণ করবে (এবং তাদের কেউ যদি রাস্তার উপর প্রকাশ্যে স্ত্রী- সংগম করে তবে তোমরাও তা করবে)!" সাহাবাগণ বললেন, 'আল্লাহর রসূল ইয়াহুদ ও খ্রিস্টানরা?' তিনি বললেন "তবে আবার কারা?” (বুখারী, মুসলিম ও হাকেম) বলা বাহুল্য, বিজাতীর অনুকরণে এমন উৎসব বা অনুষ্ঠান পালন করা বৈধ নয়। যেহেতু মহানবী বলেন, “যে ব্যক্তি যে সম্প্রদায়ের আনুরূপ্য অবলম্বন করে, সে তাদেরই দলভুক্ত।” (আবু দাউদ, ইবা) একই পর্যায়ে পড়েঃ ভালবাসা-দিবস, মাতৃ-দিবস ইত্যাদি।
প্রশ্নঃ তসবীহ গুনতে তসবীহ-মালা ব্যবহার করা কি বিদআত?
উত্তর: অনেকে বিদআত বলেছেন। তা না হলেও তা ব্যবহার না করাই উত্তম। কারণঃ- ১। মহানবী আঙ্গুল দ্বারা তসবীহ করেছেন এবং বলেছেন,
(إِنَّهُنَّ مَسْئُولَاتٌ مُسْتَنْطَقَاتٌ).
অর্থাৎ, আঙ্গুলগুলোকে (তার দ্বারা কৃত কর্মের ব্যাপারে) জিজ্ঞাসা করা হবে, কথা বলানো হবে। (আহমাদ ৬/৩৭১, আবু দাউদ ১৫০ ১, তিরমিযী ৩৫৮৩নং) সুতরাং কিয়ামতে আঙ্গুলগুলো তসবীহ পড়ার সাক্ষ্য দেবে, মালা সাক্ষ্য দেবে না। ২। মালা ব্যবহার ক'রে তসবীহ পড়লে সাধারণতঃ মনোযোগ ও একাগ্রতা বিচ্ছিন্ন হতে পারে। আঙ্গুল গুনলে তা হয় না। ৩। তসবীহ-মালা ব্যবহারে লোক-দেখানি বা 'রিয়া' হওয়ার আশঙ্কা থাকে। রঙ- বেরঙের মালা ও তার খটখট শব্দ মানুষের দৃষ্টি ও মন আকর্ষণ করে। আর আমলে 'রিয়া' ঢুকলে সওয়াবের জায়গায় শির্ক ঘটে বসবে। বলা বাহুল্য, তসবীহ-দানার চাইতে আঙ্গুল গোনাই শরীয়তসম্মত। (ইউ)
প্রশ্ন: মুর্দার নামে কুরআনখানি, ফাতেহাখানি, কুলখানি শরীয়তসম্মত কি?
উত্তর: না। বরং তা বিদআত। এ কাজ মহানবী এবং তাঁর পরে তাঁর সাহাবাগণ, তাবেঈন ও সলফগণ ক'রে যাননি। আর আল্লাহর রসুল বলেন, "যে ব্যক্তি আমাদের এ দ্বীন বিষয়ে অভিনব কিছু রচনা করবে, যা এর অন্তর্ভুক্ত নয় তা প্রত্যাখ্যাত।” (বুখারী ২৬৯৭, মুসলিম ১৭১৮নং)
মুসলিম শরীফের এক বর্ণনায় তিনি বলেন, “যে ব্যক্তি এমন কোন কর্ম করে, যাতে আমাদের কোন নির্দেশ নেই তা প্রত্যাখ্যাত।” (মুসলিম ১৭১৮নং)
প্রশ্ন: ক্বারীদের কুরআন তিলাঅতের শেষে 'স্বাদাক্বাল্লাহুল আযীম' পড়া কি শরীয়তসম্মত?
উত্তর: না। উপর্যুক্ত কারণে তা বিদআত। (লাদা) শরীয়তে এ কাজের কোন ভিত্তি নেই। একদা মহানবী ইবনে মাসউদ-এর নিকট ক্বিরাআত শুনলেন। পরিশেষে তিনি তাঁকে 'হাসবুক' বলে থামতে বললেন। (বুখারী ৫০৫০নং) তখন তিনিও 'স্বাদাক্বাল্লাহুল আযীম' বলেননি এবং ইবনে মাসউদও বলেননি। (ইবা)
প্রশ্নঃ তিলাঅত শেষে কুরআন চুম্বন দেওয়া কি শরীয়তসম্মত?
উত্তর: একই কারণে এ কাজও বিদআত। (লাদা)
প্রশ্নঃ 'মাতৃ-দিবস' পালন করা কি বৈধ?
উত্তর: এটি আসলে অমুসলিমদের আবিষ্কৃত একটি ঈদ। সুতরাং মুসলিমদের তা পালন করা বিদআত এবং সেই সাথে কাফেরদের সাদৃশ্য অবলম্বন ও অন্ধ অনুকরণও। মুসলিমদের বাৎসরিক ঈদ দু'টি এবং সাপ্তাহিক ঈদ একটি। এ ছাড়া আর কোন ঈদ বা পালনীয় 'দিবস' নেই। বলা বাহুল্য কাফেরদের অনুকরণে অনুরূপ সকল ঈদ বর্জনীয়। রাসূলুল্লাহ বলেন, “যে ব্যক্তি আমার এই দ্বীনে (নিজের পক্ষ থেকে) কোন নতুন কথা উদ্ভাবন করল---যা তার মধ্যে নেই, তা প্রত্যাখ্যানযোগ্য।” (বুখারী ও মুসলিম)
মায়ের যে হক আছে, তা বৎসরের একটি দিবসকে তার নামে পালন ক'রে, দু'-চারটি উপহার-উপঢৌকন পেশ ক'রে, পান-ভোজনের অনুষ্ঠান ক'রে আদায় হয়ে যায় না। মায়ের প্রতি কর্তব্য আছে প্রাত্যহিক। মায়ের পদতলে আছে ছেলের বেহেস্ত। মায়ের কথার অবাধ্য হয়ে 'মাতৃ-দিবস' পালন ক'রে পার্থিব আনুষ্ঠানিক আনন্দোপভোগ ছাড়া আর কী হতে পারে? (ইউ)
প্রশ্ন: হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ-কে সোমবার দিনে রোযা রাখা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন, "ওটি এমন একটি দিন, যেদিন আমার জন্ম হয়েছে।” (মুসলিম) এ হাদীস থেকে কি প্রমাণ হয় না যে, মহানবী নিজের জন্মদিন পালন করতেন?
উত্তর: এ হাদীস থেকে জন্মদিন পালন করার কথা প্রমাণিত হয় না। যদি হয়েও থাকে, তাহলে প্রত্যেক সোমবারকে তাঁর জন্মদিন হিসাবে পালন করতে হবে এবং কেবল রোযা রাখার মাধ্যমে। নচেৎ তা কামার-পুকুরের দলীল দেখিয়ে কুমোর-পুকুর দখল করার মতো ব্যাপার হবে।
প্রশ্নঃ তসবীহ গুনতে 'তসবীহ-দানা' বা 'তসবীহ-মালা' ব্যবহার করা কি বিদআত?
উত্তর: 'তসবীহ-দানা' ব্যবহারকে বিদআত বলা হয় না। যেহেতু তা ইবাদতের একটি অসীলা। আর ইবাদতের অসীলাকে বিদআত বলা হয় না। তবে তা সুন্নাহর পরিপন্থী। যেহেতু মহানবী ডান হাতের আঙ্গুল দ্বারা তসবীহ গুনেছেন। সুতরাং 'তসবীহ-মালা' ব্যবহার না করাই উত্তম। এর আরও দু'টি কারণ আছে। এক: এতে তসবীহকারী উদাস হয়ে থাকে। যেহেতু গোনা মালা তো গাঁথাই আছে। তাই খেয়াল থাকে না গণনায় এবং খেয়াল থাকে না তসবীহতে। দুই: এতে 'রিয়া' বা লোকপ্রদর্শনের সম্ভাবনা আছে অনেক। যেহেতু 'তসবীহ-মালা' দেখে লোকে তার প্রশংসাই করবে। (ইবা, ইউ)
অনেকে বলবেন, 'আঙ্গুল দ্বারা গণনায় সংখ্যায় ভুল হতে পারে। মালা দ্বারা নির্ভুল গণনা সম্ভব।' আমরা বলি, 'গণনায় ভুল হলে সমস্যা কি? নিয়ত যখন ঠিক থাকে, তখন সওয়াব তো কমে যাবে না। বিশেষ ক'রে আঙ্গুল যখন কিয়ামতে কথা বলে তসবীহকারীর জন্য সাক্ষ্য দেবে, (আহমাদ ৬/৩৭১, আবু দাউদ ১৫০১, তিরমিযী ৩৫৮৩নং) তখন তাতেই ফযীলত বেশী নয় কি?'
প্রশ্নঃ কুরআন তিলাঅত শেষে 'স্বাদাক্বাল্লাহুল আযীম' বলা কি বিধেয়?
উত্তর: কুরআন তিলাঅত শেষে 'স্বাদাক্বাল্লাহুল আযীম' বলা বিধেয় নয়, বরং বিদআত। যেহেতু এ কাজ মহানবী, তাঁর কোন সাহাবী অথবা তাঁদের পরবর্তী কোন ইমাম ক'রে যাননি। অথচ তাঁরা ছিলেন অধিক অধিক কুরআন তিলাঅতকারী। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ আমাকে বললেন, “(হে ইবনে মাসঊদ!) আমাকে কুরআন পড়ে শুনাও।” আমি বললাম, 'হে আল্লাহর রসূল! আমি আপনাকে পড়ে শোনাব, অথচ আপনার উপরেই তা অবতীর্ণ করা হয়েছে?' তিনি বললেন, "অপরের মুখ থেকে (কুরআন পড়া) শুনতে আমি ভালবাসি।” সুতরাং তাঁর সামনে আমি সূরা নিসা পড়তে লাগলাম, পড়তে পড়তে যখন এই (৪১নং) আয়াতে পৌঁছলাম---যার অর্থ, "তখন তাদের কী অবস্থা হবে, যখন প্রত্যেক সম্প্রদায় থেকে একজন সাক্ষী উপস্থিত করব এবং তোমাকেও তাদের সাক্ষীরূপে উপস্থিত করব?” তখন তিনি বললেন, "যথেষ্ট, এখন থাম।” অতঃপর আমি তাঁর দিকে ফিরে দেখি, তাঁর নয়ন যুগল অশ্রু ঝরাচ্ছে। (বুখারী, মুসলিম) কই? এখানে তিনি 'স্বাদাক্বাল্লাহুল আযীম' বলেননি।
মহান আল্লাহ বলেছেন, বল, 'স্বাদাক্বাল্লাহ'। (আলে ইমরান: ৯৫) কিন্তু তিনি বলেননি যে, কুরআন পড়া শেষ হলে 'স্বাদাক্বাল্লাহ' বল। বলা বাহুল্য, কোন আম নির্দেশকে বিশেষ কাজের জন্য খাস করা শরয়ী নীতি নয়। (ইবা, লাদা)
প্রশ্ন: কলোম্বোর এক মসজিদের ডান দিকে নবী-এর কবরের ছবি টাঙ্গানো আছে। তার সামনে মুসল্লীরা দাঁড়িয়ে নবী-এর উপর দরূদ পাঠ করে। এ কাজ কি শরীয়তসম্মত?
উত্তর: মসজিদের ভিতরে নবী-এর কবরের (বা সবুজ গম্বুজের) ছবি রাখা একটি আপত্তিকর বিদআত। পরন্তু তার সামনে দাঁড়িয়ে দরূদ পাঠ করা অন্য একটি আপত্তিকর বিদআত। এটি অতিরঞ্জনবশতঃ কৃত আচরণ। আর নবী বলেছেন, "তোমরা দ্বীনের ব্যাপারে অতিরঞ্জন করা থেকে দূরে থেকো। কেননা অতিরঞ্জনই পূর্ববর্তী বহু উম্মতকে ধ্বংস করেছে।” (আহমদ ১/২১৫, ৩৪৭, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ ৩০২৯নং) তিনি আরো বলেছেন,
((لَا تُطْرُونِي كَمَا أَطْرَتْ النَّصَارَى ابْنَ مَرْيَمَ فَإِنَّمَا أَنَا عَبْدُهُ، فَقُولُوا عَبْدُ اللَّهِ وَرَسُولُهُ)).
অর্থাৎ, তোমরা আমাকে নিয়ে (আমার তা'যীমে) বাড়াবাড়ি করো না, যেমন খ্রিস্টানরা (ঈসা) ইবনে মারয়্যামকে নিয়ে করেছে। আমি তো আল্লার দাস মাত্র। অতএব তোমরা আমাকে আল্লাহর দাস ও তাঁর রসূলই বলো।” (বুখারী ৩৪৪৫, মুসলিম, মিশকাত ৪৮৯৭নং)
দরূদ যে কোন (পবিত্র) জায়গা থেকে দাঁড়িয়ে-বসে পড়া যায়। মহানবী-এর কবরের ছবি সামনে রেখে দাঁড়িয়ে দরূদ পড়া বিদআত। তাঁর তা'যীমের উদ্দেশ্যে বসা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে দরূদ পড়া বিদআত। এক সাথে জামাআতী দরূদ পড়া বিদআত।
তাছাড়া মসজিদের দেওয়ালে নবী-অলীর কবরের ছবি অঙ্কন করা অথবা টাঙ্গানো মসজিদে তাঁদেরকে দাফন করার বিধানের অন্তর্ভুক্ত। যেহেতু তা মানুষকে শির্কের দিকে টেনে নিয়ে যায়। ঐ ছবির সামনে দরূদ পড়তে পড়তে নবী-এর কাছে প্রার্থনাও শুরু হয়ে যায়। সুতরাং এমন কাজ তওবার সাথে বর্জনীয়। (লাদা)
📄 ইখলাস ও নিয়ত
প্রশ্ন: অনেক সময় ভাল কাজ করি। অতঃপর মনের ভিতরে প্রশংসার লোভ হয়। তাতে কি তা বাতিল হয়ে যাবে?
উত্তর: এ হল শয়তানী অসঅসা (কুমন্ত্রণা)। এর প্রতি ভ্রূক্ষেপ করা উচিত নয়। তবে অসঅসার সাথে সাথে শয়তান থেকে পানাহ চেয়ে নেওয়া উচিত। (ইউ)
প্রশ্ন: অনেক সময় ভাল কাজ করি। অতঃপর তার ফলে লোকমাঝে তার চর্চা হয়, আমার সুনাম ও সুখ্যাতি হয়। অথচ আমি মনে মনে তা চাইনি। তাতে কি তা বাতিল হয়ে যাবে?
উত্তর: মনে সুনামের কামনা না থাকা সত্ত্বেও যদি মানুষের মাঝে কারো সুনাম হয়, তাহলে জানতে হবে এটা তার সত্বর সওয়াব। তবে তাতে তার পরকালের সওয়াব বরবাদ হয়ে যাবে না। একদা রাসূলুল্লাহ-কে জিজ্ঞাসা করা হল; বলুন, 'যে মানুষ সৎকাজ করে, আর লোকে তার প্রশংসা ক'রে থাকে, (তাহলে এরূপ কাজ কি রিয়া বলে গণ্য হবে?)' তিনি বললেন, "এটা মু'মিনের সত্বর সুসংবাদ।” (মুসলিম)
প্রশ্নঃ এক কর্মচারী বেনামাযী ছিল। মালিক বলল, 'তুমি নামায পড়লে তোমার বেতন ১০০ টাকা বাড়িয়ে দেওয়া হবে। তখন থেকে সে নামায পড়া শুরু করল। প্রশ্ন হল, তার নামায কি আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য?
উত্তর: আল্লাহর সন্তুষ্টি ছাড়া অন্য কোন উদ্দেশ্যে, অর্থ, গদি, সুনাম, সুবিধা ইত্যাদি উপার্জনের উদ্দেশ্যে কোন ইবাদত করলে তা মহান আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।
রসূল বলেছেন, "যাবতীয় কার্য নিয়ত বা সংকল্পের উপর নির্ভরশীল। আর মানুষের জন্য তাই প্রাপ্য হবে, যার সে নিয়ত করবে। অতএব যে ব্যক্তির হিজরত (স্বদেশত্যাগ) আল্লাহর (সন্তোষ লাভের) উদ্দেশ্যে ও তাঁর রসূলের জন্য হবে; তার হিজরত আল্লাহ ও তাঁর রসূলের জন্যই হবে। আর যে ব্যক্তির হিজরত পার্থিব সম্পদ অর্জন কিংবা কোন মহিলাকে বিবাহ করার উদ্দেশ্যেই হবে, তার হিজরত যে সংকল্প নিয়ে করবে তারই জন্য হবে।” (বুখারী-মুসলিম)
আবু মুসা আব্দুল্লাহ ইবনে কায়স আশআরী বলেন, আল্লাহর রসূল -কে এমন ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হল, যে বীরত্ব প্রদর্শনের জন্য যুদ্ধ করে, অন্ধ পক্ষপাতিত্বের জন্য যুদ্ধ করে এবং লোক প্রদর্শনের জন্য (সুনাম নেওয়ার উদ্দেশ্যে) যুদ্ধ করে, এর কোন্ যুদ্ধটি আল্লাহর পথে হবে? আল্লাহর রসূল বললেন, "যে ব্যক্তি আল্লাহর কালেমাকে উঁচু করার উদ্দেশ্যে যুদ্ধ করে, একমাত্র তারই যুদ্ধ আল্লাহর পথে হয়।” (বুখারী ও মুসলিম)
রাসূলুল্লাহ বলেন, মহান আল্লাহ বলেছেন, "আমি সমস্ত অংশীদারদের চাইতে অংশীদারি (শিক) থেকে অধিক অমুখাপেক্ষী। কেউ যদি এমন কাজ করে, যাতে সে আমার সঙ্গে অন্য কাউকে অংশীদার স্থাপন করে, তাহলে আমি তাকে তার অংশীদারি (শির্ক) সহ বর্জন করি।” (অর্থাৎ তার আমলই নষ্ট ক'রে দিই।) (মুসলিম)
সুতরাং সেই কর্মচারীর উচিত, নিয়ত পাল্টে নিয়ে কেবল আল্লাহর উদ্দেশ্যে নামায পড়া। বেতন সে গ্রহণ করুক, কিন্তু নামায পড়ুক আল্লাহর ভয়ে।
উল্লেখ্য যে, অভিভাবকের ভয়ে নামায পড়া, সমাজে দুর্নামের ভয়ে রোযা রাখা, অর্থ লোভে বদল হজ্জ করা, চাকরির আশায় দ্বীনী ইল্ম অর্জন করা, বেতনের লোভে ইমামতি করা, খ্যাতির লোভে দান করা, নাম ও অর্থের লোভে দ্বীনী দাওয়াতের কাজ করা ইত্যাদি 'রিয়া'র বিধান একই।
প্রশ্নঃ কোন কোন ভাল আমলের প্রশংসা শোনা গেলে তার ফলে কি ঐ আমল বাতিল গণ্য হয়?
উত্তর: আমলকারীর নিয়তে প্রশংসা নেওয়ার নিয়ত না থাকলে প্রশংসনীয় আমল বাতিল হয় না। যেহেতু
عَنْ أَبِي ذَرٍ قَالَ : قِيلَ لِرَسُولِ اللهِ ﷺ : أَرَأَيْتَ الرَّجُلَ الَّذِي يَعْمَلُ العَمَلَ مِنَ الخَيْرِ ، وَيَحْمَدُهُ النَّاسُ عَلَيْهِ ؟ قَالَ : (( تِلْكَ عَاجِلُ بُشْرَى الْمُؤْمِنِ )). رواه مسلم
আবু যার হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ-কে জিজ্ঞাসা করা হল; বলুন, 'যে মানুষ সৎকাজ করে, আর লোকে তার প্রশংসা ক'রে থাকে (তাহলে এরূপ কাজ কি রিয়া বলে গণ্য হবে?)' তিনি বললেন, "এটা মু'মিনের সত্বর সুসংবাদ।” (মুসলিম)
প্রশ্নঃ ওযু, নামায ইত্যাদির নিয়ত মুখে উচ্চারণ করা কি বিধেয়?
উত্তর: ইবাদতের নিয়ত মুখে উচ্চারণ করা বিদআত। যেহেতু তা মহানবী অথবা তাঁর কোন সাহাবী কর্তৃক প্রমাণিত নয়। সুতরাং তা বর্জন করা ওয়াজেব। নিয়ত মানে সংকল্প। আর তার স্থান হল মনে। অতএব তা মুখে উচ্চারণ করার কোনই প্রয়োজন নেই। (ইবা, ইউ)
📄 নামায
প্রশ্ন: কাজের চাপে সময় পার ক'রে নামায পিছিয়ে দেওয়া কি বৈধ?
উত্তর: নিজের কাজ বা সৃষ্টির কাজ আগে করা এবং স্রষ্টার কাজ পিছিয়ে দেওয়া বৈধ হতে পারে না। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{إِنَّ الصَّلَاةَ كَانَتْ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ كِتَابًا مَّوْقُوتًا) (۱۰۳) سورة النساء
অর্থাৎ, নিশ্চয় নামাযকে বিশ্বাসীদের জন্য নির্ধারিত সময়ে অবশ্য কর্তব্য করা হয়েছে। (নিসাঃ ১০৩)
যুদ্ধ চলাকালেও নামায পিছিয়ে না দিয়ে 'সালাতুল খাওফ' পড়ার নির্দেশ আছে। সুতরাং কাজের ফাঁকেই নামায আদায় ক'রে নেওয়ার চেষ্টা রাখা জরুরী। কাজের কাপড় নোংরা হলে পৃথক কাপড় রেখে নামায পড়তে হবে। মাঠে-ময়দানে ভিজে জায়গায় দাঁড়িয়েও নামায পড়ে নিতে হবে। একান্ত কেউ নিরুপায় হলে সে কথা ভিন্ন। যেমন রোগী ও মুসাফির জমা তাকদীম বা তা'খীর করতে পারে। বৃষ্টির জন্যও জমা তাকদীম হতে পারে।
প্রশ্ন: আমার রাত্রে শুতে দেরী হয়। ডিউটি শুরু হয় সকাল সাতটা থেকে। ফজর হয় চারটায়। ফজরের সময় উঠে জামাআতে নামায পড়লে এবং তারপর শুলে আর ঘুম হয় না। সুতরাং আমি যদি ডিউটি শুরুর এক ঘন্টা আগে এলার্ম লাগিয়ে শুই এবং ডিউটিতে যাওয়ার আগে ফজরের নামাযটা পড়ে নিই, তাহলে কি যথেষ্ট হবে না?
উত্তর: না, সময় পার ক'রে নামায পড়া যথেষ্ট নয়। ইচ্ছাকৃত সময় পার ক'রে নামায পড়লে তা নষ্ট করারই শামিল। বহু উলামার মতে এমন ব্যক্তি 'কাফের' হয়ে যাবে। (ইবা)
যে নামাযীরা সময় পার ক'রে নামায পড়ে, তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের 'গাই' উপত্যকা। মহান আল্লাহ বলেন,
{فَخَلَفَ مِن بَعْدِهِمْ خَلْفٌ أَضَاعُوا الصَّلَاةَ وَاتَّبَعُوا الشَّهَوَاتِ فَسَوْفَ يَلْقَوْنَ غَيًّا }
অর্থাৎ, তাদের পর এল অপদার্থ পরবর্তিগণ, তারা নামায নষ্ট করল ও প্রবৃত্তিপরায়ণ হল; সুতরাং তারা অচিরেই 'গাই' প্রত্যক্ষ করবে। (মারয়্যামঃ ৫৯)
নামায বিনষ্ট করার অর্থঃ একেবারে নামায না পড়া; যা মূলতঃ কুফরী, অথবা নামাযের সময় বিনষ্ট করা; যার অর্থ সঠিক সময়ে নামায আদায় না করা, যখন ইচ্ছা পড়া বা বিনা ওযরে দুই বা ততোধিক নামাযকে একত্রে পড়া, অথবা কখনো দুই, কখনো চার, কখনো এক, কখনো পাঁচ অক্তের নামায পড়া। এ সমস্ত নামায বিনষ্ট করার অর্থে শামিল।
প্রশ্ন: নামাযে শৈথিল্য বা ঢিলেমি করা অথবা নামাযকে ভারী মনে করা কাদের কাজ?
উত্তর: নামাযে শৈথিল্য বা ঢিলেমি করা অথবা নামাযকে ভারী মনে করা মুনাফিকদের কাজ। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{إِنَّ الْمُنَافِقِينَ يُخَادِعُونَ اللهَ وَهُوَ خَادِعُهُمْ وَإِذَا قَامُوا إِلَى الصَّلَاةِ قَامُوا كُسَالَى يُرَاؤُونَ النَّاسَ وَلَا يَذْكُرُونَ اللَّهَ إِلَّا قَلِيلاً} (١٤٢) سورة النساء
অর্থাৎ, নিশ্চয় মুনাফিক (কপট) ব্যক্তিরা আল্লাহকে প্রতারিত করতে চায়। বস্তুতঃ তিনিও তাদেরকে প্রতারিত করে থাকেন এবং যখন তারা নামাযে দাঁড়ায় তখন শৈথিল্যের সাথে নিছক লোক-দেখানোর জন্য দাঁড়ায় এবং আল্লাহকে তারা অল্পই স্মরণ করে থাকে। (নিসাঃ ১৪২)
{وَمَا مَنَعَهُمْ أَن تُقْبَلَ مِنْهُمْ نَفَقَاتُهُمْ إِلَّا أَنَّهُمْ كَفَرُوا بِاللَّهِ وَبِرَسُولِهِ وَلَا يَأْتُونَ الصلاةَ إِلا وَهُمْ كَسَالَى وَلا يُنفِقُونَ إِلَّا وَهُمْ كَارِهُونَ} (٥٤) سورة التوبة
অর্থাৎ, আর তাদের দান-খয়রাত গ্রহণযোগ্য না হওয়ার কারণ এ ছাড়া আর কিছুই নয় যে, তারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের সাথে কুফরী করেছে, আর তারা নামাযে শৈথিল্যের সাথেই উপস্থিত হয় এবং তারা অনিচ্ছাকৃতভাবেই দান ক'রে থাকে। (তাওবাহঃ ৫৪)
আল্লাহর রসূল বলেন, "মুনাফিকদের পক্ষে সবচেয়ে ভারী নামায হল এশা ও ফজরের নামায। ঐ দুই নামাযের কি মাহাত্ম্য আছে, তা যদি তারা জানত, তাহলে হামাগুড়ি দিয়ে হলেও অবশ্যই তাতে উপস্থিত হত। আমার ইচ্ছা ছিল যে, কাউকে নামাযের ইকামত দিতে আদেশ দিই, অতঃপর একজনকে নামায পড়তেও হুকুম করি, অতঃপর এমন একদল লোক সঙ্গে করে নিই; যাদের সাথে থাকবে কাঠের বোঝা। তাদের নিয়ে এমন সম্প্রদায়ের নিকট যাই, যারা নামাযে হাজির হয় না। অতঃপর তাদেরকে ঘরে রেখেই তাদের ঘরবাড়িকে আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দিই।” (বুখারী ৬৫৭, মুসলিম ৬৫১নং)
প্রশ্ন: দেখেছি, অনেক লোক নামাযের সালাম ফিরার পর তাদের ডানে-বামের লোকেদের সাথে মুসাফাহাহ করে। এটা কি সুন্নত?
উত্তর: না, বরং এ কাজ বিদআত। তবে যদি সে মুসাফাহাহ প্রথম সাক্ষাতের জন্য সালাম-সহ হয়, তাহলে তা সুন্নত। অর্থাৎ, নামায শুরু হওয়ার পর পাশে দাঁড়ানোর সময় সালাম-মুসাফাহাহর সুযোগ না হওয়ার ফলে নামায শেষ হওয়ার পরে তা করলে দূষণীয় নয়। (ইবা)
প্রশ্ন: জামাআত শেষে অনেক সময় মসজিদে সুন্নত পড়ি। এমন সময় কোন লোক আমার পাশে দাঁড়িয়ে আমার ইক্তিদা করতে থাকে। এটা কি বৈধ? বৈধ হলে আমার কী করা উচিত?
উত্তর: জামাআতের সওয়াব নেওয়ার উদ্দেশ্যে তা বৈধ। তখন আপনার উচিত ইমামতির নিয়ত ক'রে তকবীরাদি সশব্দে পড়া। আপনি সুন্নত পড়ছেন এবং সে নিশ্চয় ফরয পড়ছে। আপনাদের নিয়তের এই ভিন্নতা নামাযের কোন ক্ষতি করবে না। সাহাবী মুআয বিন জাবাল আল্লাহর রসূল-এর সাথে নামায পড়তেন, তারপর নিজের গোত্রে ফিরে গিয়ে তাদের ইমামতি ক'রে ঐ নামাযই পড়তেন। (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত ১১৫০নং) তাঁর প্রথম নামায ফরয হতো এবং শেষেরটা নফল।
একদা তিনি সালাম ফিরে দেখলেন, মসজিদের এক প্রান্তে দুই ব্যক্তি জামাআতে নামায পড়েনি। কারণ জিজ্ঞাসা করলে তারা কাঁপতে কাঁপতে বলল, 'আমরা আমাদের বাসায় নামায পড়ে নিয়েছি।' তিনি বললেন, "এমনটি আর করো না। বরং যখন তোমাদের কেউ নিজ বাসায় নামায পড়ে নেয়, অতঃপর (মসজিদে এসে) দেখে যে, ইমাম নামায পড়েনি, তখন সে যেন (দ্বিতীয়বার) তাঁর সাথে নামায পড়ে। আর এ নামায তার জন্য নফল হবে।” (আবু দাউদ ৫৭৫, তিরমিযী, নাসাঈ, মিশকাত ১১৫২নং)
মহানবী একদা এক ব্যক্তিকে একাকী নামায পড়তে দেখলে তিনি অন্যান্য সাহাবীদের উদ্দেশ্যে বললেন, "এমন কেউ কি নেই, যে এর সাথে নামায পড়ে একে (জামাআতের সওয়াব) দান করবে?” এ কথা শুনে এক ব্যক্তি উঠে তার সাথে নামায পড়ল। (আবু দাউদ ৫৭৪, তিরমিযী, মিশকাত ১১৪৬নং) অথচ সে মহানবী এর সাথে ঐ নামায পূর্বে পড়েছিল। সুতরাং ইমামের ছিল ফরয এবং মুক্তাদীর নফল।
এ থেকে আরো বুঝা যায় যে, জামাআত শেষ হওয়ার পর দ্বিতীয় জামাআত কায়েম করা দোষাবহ নয়。
প্রশ্নঃ কোন ব্যক্তি মসজিদে এসে যদি দেখে যে, ইমাম শেষ তাশাহহুদে আছেন, তাহলে সে কি জামাআতে শামিল হবে, নাকি শামিল না হয়ে পরবর্তী জামাআতের অপেক্ষা করবে?
উত্তর: যদি সে নিশ্চিতভাবে জানে যে, পরবর্তী জামাআতের জন্য লোক আছে, তাহলে সে শেষ বৈঠকে শামিল না হয়ে অপেক্ষা করবে এবং জামাআতের সাথে নামায পড়বে। যেহেতু সঠিক মতে পূর্ণ এক রাকআত না পেলে জামাআত পাওয়া যায় না। কিন্তু যদি কোন লোক আসার আশা না থাকে, তাহলে উত্তম জামাআতে শামিল হয়ে নামায আদায় করা; যদিও তা শেষ বৈঠক। কারণ জামাআত সহকারে নামাযের কিছু অংশ পাওয়া, মোটেই কিছু না পাওয়া থেকে উত্তম। অতঃপর সে যদি জামাআতের শেষ বৈঠকে শামিল হওয়ার পর শুনতে পায় যে, দ্বিতীয় জামাআত খাড়া হয়েছে, তাহলে সে ঐ নামায (সালাম না ফিরে) বাতিল ক'রে তাদের সাথে জামাআত সহকারে নামায আদায় করতে পারে। অথবা দু' রাকআত হয়ে থাকলে তা নফলের নিয়ত ক'রে সালাম ফিরে নামায শেষ ক'রে ঐ জামাআতে শামিল হতে পারে। পরন্তু সে একাকী নামায শেষ করলেও তাতে কোন দোষ নেই। সে এই তিনটির মধ্যে একটিকে এখতিয়ার করতে পারে। (ইউ)
প্রশ্নঃ প্লেনে কীভাবে নামায পড়া যাবে?
উত্তর: যেভাবে সম্ভব, সেভাবেই পড়ে নিতে হবে। ক্বিবলা মুখে দাঁড়িয়ে, রুকু-সিজদা যথা নিয়মে করা সম্ভব হলে, তা করতে হবে। নচেৎ বসে ইশারায় রুকু-সিজদা ক'রে নামায আদায় করতে হবে। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{فَاتَّقُوا اللَّهَ مَا اسْتَطَعْتُمْ} (١٦) سورة التغابن
অর্থাৎ, আল্লাহকে যথাসাধ্য ভয় ক'রে চল। (তাগাবুনঃ ১৬) তিনি ইমরান বিন হুসাইন-কে বলেছিলেন, "তুমি দাঁড়িয়ে নামায পড়। না পারলে বসে পড়। তাও না পারলে পার্শ্বদেশে শুয়ে পড়।” (বুখারী, আবু দাউদ, আহমাদ, মিশকাত ১২৪৮ নং) উত্তম হল প্রথম অক্তে নামায পড়ে নেওয়া। অবশ্য গন্তব্যস্থলে মাটিতে নেমে শেষ অক্তে নামায আদায় করার আশা থাকলে তাও করতে পারে। অনুরূপ মোটরগাড়ি, ট্রেন ও পানিজাহাজে নামাযের সময় হলে একই নিয়ম। (ইবা)
প্রশ্নঃ যে মসজিদে কবর আছে, সে মসজিদে নামায শুদ্ধ কি?
উত্তর: যে মসজিদে কবর আছে, সে মসজিদে নামায শুদ্ধ নয়, চাহে সে কবর নামাযীদের পিছনে বা সামনে, ডানে বা বামে হোক। যেহেতু নবী বলেছেন, “ইয়াহুদী খ্রিস্টানদের উপর আল্লাহর অভিশাপ, কারণ তারা তাদের নবীদের কবরকে মসজিদ বানিয়ে নিয়েছে।” (বুখারী ১৩৩০, মুসলিম ৫২৯নং) তিনি আরো বলেছেন, "সাবধান! তোমাদের পূর্ববর্তী লোকেরা তাদের নবী ও নেক লোকেদের কবরকে মসজিদ বানিয়ে নিত। সাবধান! তোমরা কবরগুলোকে মসজিদ বানিয়ে নিয়ো না। এরূপ করতে আমি তোমাদেরকে নিষেধ করছি।” (মুসলিম ৫৩২নং) আর যেহেতু কবরের ধারে-পাশে নামায পড়া শির্কের অন্যতম অসীলা এবং তাতে থাকে কবরস্থ ব্যক্তিকে নিয়ে অতিরঞ্জন, সেহেতু উক্ত হাদীসদ্বয় এবং অনুরূপ আরো অন্যান্য হাদীসের উপর আমল ক'রে শির্কের ছিদ্রপথ বন্ধ করার লক্ষ্যে কবরযুক্ত মসজিদে নামায নিষিদ্ধ হওয়া আবশ্যক। (ইবা)
প্রশ্নঃ অনেক নামাযী ঘরে নামায পড়ে, মসজিদে আসে না। তাদের ব্যাপারে বিধান কী?
উত্তর: তাদের জন্য বৈধ নয় ঘরে নামায পড়া। বরং তাদের জন্য ওয়াজেব হল, মসজিদে উপস্থিত হয়ে জামাআত সহকারে নামায আদায় করা। যেহেতু মহানবী বলেন, "যে ব্যক্তি আযান শোনা সত্ত্বেও মসজিদে জামাআতে এসে নামায আদায় করে না, কোন ওজর না থাকলে সে ব্যক্তির নামায কবুল হয় না।” (আবু দাউদ ৫৫১, ইবনে মাজাহ, ইবনে হিব্বান, হাকেম, সঃ জামে' ৬৩০০ নং) একটি অন্ধ লোক নবী-এর নিকট এসে নিবেদন করল, 'হে আল্লাহর রসূল! আমার কোন পরিচালক নেই, যে আমাকে মসজিদ পর্যন্ত নিয়ে যাবে।' সুতরাং সে নিজ বাড়িতে নামায পড়ার জন্য আল্লাহর রসূল-এর নিকট অনুমতি চাইল। তিনি তাকে অনুমতি দিলেন। কিন্তু যখন সে পিঠ ঘুরিয়ে রওনা দিল, তখন তিনি তাকে ডেকে বললেন, "তুমি কি আহবান (আযান) শুনতে পাও?” সে বলল, 'জী হ্যাঁ।' তিনি বললেন, "তাহলে তুমি সাড়া দাও।” (অর্থাৎ মসজিদেই এসে নামায পড়।) (মুসলিম)
রাসূলুল্লাহ বলেছেন, "সেই মহান সত্তার শপথ! যাঁর হাতে আমার জীবন আছে। আমার ইচ্ছা হচ্ছে যে, জ্বালানী কাঠ জমা করার আদেশ দিই। তারপর নামাযের জন্য আযান দেওয়ার আদেশ দিই। তারপর কোন লোককে লোকেদের ইমামতি করতে আদেশ দিই। তারপর আমি স্বয়ং সেই সব (পুরুষ) লোকদের কাছে যাই (যারা মসজিদে নামায পড়তে আসেনি) এবং তাদেরকেসহ তাদের ঘর-বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দিই।” (বুখারী ও মুসলিম)
আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ বলেন, "যাকে এ কথা আনন্দ দেয় যে, সে কাল কিয়ামতের দিন আল্লাহর সঙ্গে মুসলিম হয়ে সাক্ষাৎ করবে, তার উচিত, সে যেন এই নামাযসমূহ আদায়ের প্রতি যত্ন রাখে, যেখানে তার জন্য আযান দেওয়া হয় (অর্থাৎ, মসজিদে)। কেননা, মহান আল্লাহ তোমাদের নবী-এর নিমিত্তে হিদায়াতের পন্থা নির্ধারণ করেছেন। আর নিশ্চয় এই নামাযসমূহ হিদায়েতের অন্যতম পন্থা ও উপায়। যদি তোমরা (ফরয) নামায নিজেদের ঘরেই পড়, যেমন এই পিছিয়ে থাকা লোক নিজ ঘরে নামায পড়ে, তাহলে তোমরা তোমাদের নবীর তরীকা পরিহার করবে। আর (মনে রেখো,) যদি তোমরা তোমাদের নবীর তরীকা পরিহার কর, তাহলে নিঃসন্দেহে তোমরা পথহারা হয়ে যাবে। আমি আমাদের লোকেদের এই পরিস্থিতি দেখেছি যে, নামায (জামাতসহ পড়া) থেকে কেবল সেই মুনাফিক (কপট মুসলিম) পিছিয়ে থাকে, যে প্রকাশ্য মুনাফিক। আর (দেখেছি যে, পীড়িত) ব্যক্তিকে দু'জনের (কাঁধের) উপর ভর দিয়ে নিয়ে এসে (নামাযের) সারিতে দাঁড় করানো হতো।' (মুসলিম)
প্রশ্নঃ পাতলা কাপড়ে নামায পড়লে নামায শুদ্ধ কি?
উত্তর: যে কাপড় পরা সত্ত্বেও পুরুষদের নাভির নিচে থেকে হাঁটু পর্যন্ত কোন অংশ খোলা থাকে অথবা আবছা দেখা যায়, সে কাপড়ে নামায শুদ্ধ হয় না। অনুরূপ যে শাড়ি বা ওড়নায় মহিলার মাথার চুল, ঘাড়, হাতের রলা, পেট বা পিঠের অংশ খোলা থাকে অথবা আবছা দেখা যায়, তাতে নামায হয় না। নামাযে সতর ঢাকা জরুরী। তা খোলা গেলে নামায ঘোলা হয়ে যায়।
প্রশ্নঃ পাতলা শাড়ি বা ওড়না পরে মেয়েদের নামায শুদ্ধ কি?
উত্তর: যে লেবাস পরার পরেও ভিতরের চামড়া বা চুল নজরে আসে, সে লেবাস পরে নামায শুদ্ধ নয়। (ইউ)
প্রশ্ন: কাঁচা পিঁয়াজ-রসুন খেয়ে নামায কি শুদ্ধ নয়?
রাসূলুল্লাহ বলেছেন, "যে ব্যক্তি (কাঁচা) রসুন অথবা পিঁয়াজ খায়, সে যেন আমাদের নিকট হতে দূরে অবস্থান করে অথবা আমাদের মসজিদ থেকে দূরে থাকে।” (বুখারী ও মুসলিম)
মুসলিমের এক বর্ণনায় আছে যে, “যে ব্যক্তি (কাঁচা) পিঁয়াজ, রসূন এবং লীক পাতা খায়, সে যেন অবশ্যই আমাদের মসজিদের নিকটবর্তী না হয়। কেননা, ফিরিস্তাগণ সেই জিনিসে কষ্ট পান, যাতে আদম-সন্তান কষ্ট পায়।"
কাঁচা পিঁয়াজ-রসুন, লীক পাতা নামাযের আগে খাওয়া উচিত নয়। খেতে বাধ্য হলে এবং মুখের দুর্গন্ধ দূরীভূত না করতে পারলে জামাআতে শামিল হওয়া বৈধ নয়। তবে একাকী অথবা জামাআতে নামায পড়লে নামায শুদ্ধ হয়ে যায়। অনুরূপ বিড়ি-সিগারেট খাওয়ার ফলে মুখে বা লেবাসে দুর্গন্ধ সৃষ্টি হয়। তা খাওয়া হারাম এবং তার দুর্গন্ধ নিয়ে মসজিদে বা জামাআতে আসাও অবৈধ। একইভাবে যাদের গায়ে কোন প্রকারের দুর্গন্ধ আছে, তাদের জন্য জামাআতে উপস্থিত হওয়া মাকরূহ। সকলের জন্য জরুরী, সকল প্রকার দুর্গন্ধমুক্ত হয়ে জামাআতে উপস্থিত হওয়া। (ইবা)
প্রশ্ন: মহল্লার বা গ্রামের মসজিদ ছেড়ে অন্য মহল্লা বা গ্রামের মসজিদে জুমআহ বা তারাবীহ ইত্যাদির নামায পড়তে যাওয়া বৈধ কি? তাতে উদ্দেশ্য থাকে ভাল খতীবের ভাল বক্তব্য শোনা এবং সুমধুর কণ্ঠবিশিষ্ট ক্বারী ইমামের কুরআন শুনে উপকৃত হওয়া। সাইকেল বা গাড়িযোগে গেলে কি তা হাদীসে বর্ণিত নিষেধের আওতায় পড়ে, যাতে বলা হয়েছে, "তিন মসজিদ ছাড়া অন্য কোথাও সফর করা যাবে না; মদীনা শরীফের মসজিদে নববী, মাসজিদুল হারাম (কা'বা শরীফ) ও মসজিদে আকসা (প্যালেষ্টাইনের জেরুজালেমের মসজিদ)।” (বুখারী ১৯৯৫, মুসলিম ১৩৯৭ নং)
উত্তরঃ না। উক্ত সফর নিষিদ্ধ সফরের পর্যায়ভুক্ত নয়। কারণ মসজিদের বর্কতলাভের উদ্দেশ্যে সে সফর করা হয় না। বরং উক্ত সফর ইল্ম তলবের সফর হিসাবে পরিগণিত। আর ইল্ম তলবের জন্য সফর নিষিদ্ধ নয়। সলফে সালেহীন ইল্ম তলবের জন্য দূর- দূরান্তের পথ সফর করেছেন। আর মহানবী বলেছেন, "যে ব্যক্তি এমন পথ অবলম্বন ক'রে চলে, যাতে সে ইল্ম (শরয়ী জ্ঞান) অন্বেষণ করে, আল্লাহ তার বিনিময়ে তার জন্য জান্নাতে যাওয়ার পথ সহজ ক'রে দেন।” (মুসলিম ২৬৯৯নং, আবু দাউদ, তিরমিযী, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ, ইবনে হিব্বান, হাকেম)
প্রশ্নঃ তারাবীহর নামাযের মাঝে-মধ্যে পঠনীয় কোন নির্দিষ্ট দুআ বা দরূদ আছে কি?
উত্তর: তারাবীহর নামাযের দুই বা চার রাকআত পড়ে অথবা সবশেষে পঠনীয় নির্দিষ্ট কোন দুআ-দরূদ নেই। এ স্থলে নির্দিষ্ট কোন দুআ বা দরূদ সশব্দে বা নিঃশব্দে, একাকী বা সমবেত সুরে পড়লে বিদআত বলে পরিগণিত হবে। রাসূলুল্লাহ বলেন, “যে ব্যক্তি আমার এই দ্বীনে (নিজের পক্ষ থেকে) কোন নতুন কথা উদ্ভাবন করল---যা তার মধ্যে নেই, তা প্রত্যাখ্যানযোগ্য।” (বুখারী ও মুসলিম) মুসলিমের অন্য এক বর্ণনায় আছে, "যে ব্যক্তি এমন কাজ করল, যে ব্যাপারে আমাদের নির্দেশ নেই তা বর্জনীয়।”
প্রশ্ন: ফজরের আযানের পূর্বে মাইকে কুরআন, দুআ (বা গজল) পড়া, অনুরূপ জুমআর খুতবার পূর্বে ক্বারীর কুরআন পড়া (বা কারো বক্তৃতা করা) কি শরীয়তসম্মত?
উত্তর: না। এমন কাজ শরীতসম্মত নয়। কুরআন পড়া ভাল কাজ হলেও উক্ত সময়ে পড়া বিদআত হবে। কারণ, তার কোন দলীল নেই। কাজ ভাল বলেই তো শরীয়ত কর্তৃক নির্ধারিত সময়, পরিমাণ বা পদ্ধতির বাইরে তা করলে বিদআত হয়। পক্ষান্তরে কাজ খারাপ হলে তো তাকে 'হারাম' বলা হয়। পরন্ত বিদআতের 'ভাল-মন্দ' (হাসানাহ- সাইয়িআহ) বলে কোন প্রকার নেই। যেহেতু 'কুন্নু বিদআতিন য়ালালাহ'। অর্থাৎ, প্রত্যেকটি বিদআতই ভ্রষ্টতা। (লাদা)
প্রশ্ন: জামাআত চলাকালে ইমাম রুকু অবস্থায় থাকলে অনেক নামাযী বিভিন্ন আচরণের মাধ্যমে রুকূতে দেরী করতে বলে। যাতে সে রুকু বা রাকআত পেয়ে যায়। কেউ দৌড়ে আসে, কেউ সজোরে পদক্ষেপ করে, কেউ গলা-সাড়া দেয়, কেউ 'ইন্নাল্লাহা মাআস্ স্বাবেরীন' বলে। শরীয়তের দৃষ্টিতে এমন কাজ বৈধ কি?
উত্তর: তাদের এমন কাজ বৈধ নয়। যেহেতু মহানবী বলেন, "নামাযের ইকামত হয়ে গেলে তোমরা দৌড়ে এসো না। বরং তোমরা স্বাভাবিকভাবে চলে এসো। আর তোমাদের মাঝে যেন স্থিরতা থাকে। অতঃপর যেটুকু নামায পাও, তা পড়ে নাও এবং যা ছুটে যায়, তা পুরা করে নাও।” (বুখারী ৬৩৫, মুসলিম ৬০২নং)
আভাষে-ইঙ্গিতে ইমামকে অপেক্ষা করতে বলায় রয়েছে বেআদবি। তাতে সকল নামাযীর ডিস্টার্ব হয় এবং তাদের মনোযোগ ও বিনয় বিনষ্ট হয়ে যায়। (ইজি)
প্রশ্ন: রুকু অবস্থায় কারো আসা বুঝতে পারলে ইমামের জন্য রুকু লম্বা করা কি বিধেয়?
উত্তর: এতটুকু সময় অপেক্ষা করা বৈধ, যাতে নামাযরত নামাযীদের মনে বিরক্তি না আসে। কারণ বাইরে থেকে আগন্তুক ব্যক্তি অপেক্ষা তাদের অবস্থার খেয়াল রাখা অধিক জরুরী। বিশেষ ক'রে শেষ রাকআতে রুকু পাইয়ে দেওয়ায় লাভ এই হয় যে, তার নামায ও জামাআত পাওয়া হয়ে যায়। নবী বলেছেন, "যে ব্যক্তি নামাযের এক রাকআত পেল, সে নামায পেয়ে গেল।” (বুখারী ৫৮০, মুসলিম ৬০৭নং)
অনুরূপ শেষ তাশাহহুদ পাইয়ে দেওয়ার জন্য কিঞ্চিৎ দেরি করায় দোষ নেই। (ইবা)
প্রশ্নঃ সূরা ফাতিহা না পড়লে যদি নামায না হয়, তাহলে রুকু পেলে রাকআত গণ্য হয় কীভাবে?
উত্তর: প্রত্যেক বিষয়ের ব্যতিক্রম অবস্থা থাকে। রুকু পেলে রাকআত গণ্য হওয়ার ব্যাপারটাও সেই রকম। কিয়াম নামাযের রুক্স। কিন্তু অসুবিধার ক্ষেত্রে কিয়াম ছাড়া নামায হয়ে যায়। আবু বাকরাহ একদা মসজিদ প্রবেশ করতেই দেখলেন, নবী রুকুতে চলে গেছেন। তিনি তাড়াহুড়ো ক'রে কাতারে শামিল হওয়ার আগেই রুকু করলেন। অতঃপর রুকুর অবস্থায় চলতে চলতে কাতারে গিয়ে শামিল হলেন। এ কথা নবী-কে বলা হলে তিনি তাঁর উদ্দেশ্যে বললেন, "আল্লাহ তোমার আগ্রহ আরো বৃদ্ধি করুন। আর তুমি দ্বিতীয় বার এমনটি করো না। (অথবা আর তুমি ছুটে এসো না। অথবা তুমি নামায ফিরিয়ে পড়ো না।)” (বুখারী, আবু দাউদ, মিশকাত ১১১০নং)
প্রশ্নঃ নামায ছুটে গেলে কাযা পড়ব কখন? আগামী ওয়াক্ত অথবা আগামী দিনের ঐ নামাযের সময় পর্যন্ত কি পিছিয়ে দেওয়া চলে?
উত্তর: আগামীতে যখনই সময় পাওয়া যাবে, তখনই তা পড়ে নিতে হবে। নিষিদ্ধ সময়েও তা পড়া যাবে। আগামী ওয়াক্ত পর্যন্ত বিলম্ব করা যাবে না। মহানবী বলেন, "নিদ্রা অবস্থায় কোন শৈথিল্য নেই। শৈথিল্য তো জাগ্রত অবস্থায় হয়। সুতরাং যখন তোমাদের মধ্যে কেউ কোন নামায পড়তে ভুলে যায় অথবা ঘুমিয়ে পড়ে, তখন তার উচিত, স্মরণ হওয়া মাত্র তা পড়ে নেওয়া। কেননা, আল্লাহ তাআলা বলেন, "আর আমাকে স্মরণ করার উদ্দেশ্যে তুমি নামায কায়েম কর।” (ত্বাহাঃ ১৪, মুসলিম, মিশকাত ৬০৪নং)
প্রশ্ন: নামায কাযা রেখে মারা গেলে অনেকে হিসাব ক'রে ছেড়ে দেওয়া নামাযের 'কাফ্ফারা' আদায় করে, তা কি বিধেয়?
উত্তর: রোগী ব্যক্তির জন্য নামায মাফ নয়। যতক্ষণ জ্ঞান থাকে, ততক্ষণ তাকে নামায পড়তে হবে। ছুটে গেলে কাযা পড়ে নিতে হবে। এটাই তার কাফ্ফারা। মহানবী বলেছেন,
مَن نَسِيَ صَلاَةً أَو نَامَ عَنهَا فَكَفَّارَتُهُ أَن يُصَلِّيَهَا إِذَا ذَكَرَهَا). وفي رواية : (لا كَفَّارَةً لَهَا إِلَّا ذَلِكَ).
"যখন কেউ কোন নামায পড়তে ভুলে যায় অথবা ঘুমিয়ে পড়ে, তখন তার কাফফারা হল স্মরণ হওয়া মাত্র তা পড়ে নেওয়া।” অন্য এক বর্ণনায় আছে, "(এই কাযা আদায় করা ছাড়া) এর জন্য আর অন্য কোন কাফফারা নেই।” (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত ৬০৩নং) পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃত নামায ছেড়ে মারা গেছে, তার তরফ থেকে চাল বা টাকার কাফফারা আদায় করলেও কোন কাজের নয়। কাজের নয় তার নামে দান-খয়রাত বা অন্য কোন ঈসালে সওয়াব করা।
প্রশ্নঃ কোন ব্যক্তি নামায রেখে মারা গেলে তার তরফ থেকে তা আদায় ক'রে দেওয়া যায় কি না?
উত্তর: না। কারণ নামাযে নায়েবি চলে না। কেউ আদায় ক'রে দিলেও তা উপকারী হবে না। (লাদা) আর সে ব্যক্তি যদি ইচ্ছাকৃত নামায ত্যাগ না ক'রে থাকে, তাহলে কোন ক্ষতি হবে না।
প্রশ্নঃ সামনে আগুন অথবা জ্বলন্ত বাতি বা ধূপ থাকলে নামায পড়া বৈধ কি?
উত্তর: সামনে আগুন রেখে নামায পড়তে উলামাগণ নিষেধ করেন। কারণ তাতে অগ্নিপূজকদের সাদৃশ্য সাধন হয়। পক্ষান্তরে জ্বলন্ত কেরোসিন বা মোমবাতি, ইলেক্ট্রিক বাল্ব বা হিটার অথবা ধূপ ইত্যাদি সামনে থাকলে নামায পড়া অবৈধ নয়। কারণ অগ্নিপূজকরা এইভাবে অগ্নিপূজা করে না এবং সে সব জ্বলন্ত জিনিস তা'যীমের জন্যও সামনে রাখা হয় না। (ইউ)
প্রশ্নঃ যে ইমাম ঠিকভাবে কুরআন পড়তে জানে না, তার পিছনে নামায শুদ্ধ কি?
উত্তর: যে ইমাম শুদ্ধভাবে কুরআন পড়তে পারে না এবং এমনভাবে কুরআন পড়ে, যাতে তার মানেই বদলে যায়, সে ইমামের পিছনে নামায শুদ্ধ নয়। বিশেষ ক'রে সেই জামাআতে যদি শুদ্ধ ক'রে কুরআন পড়ার মতো কোন লোক থাকে। (ইউ)
প্রশ্ন: ইমামের সালাম ফিরার পর তিনি কি মসবুকের সুতরাহ থাকেন?
উত্তর: না। সুতরাং তার সামনে দিয়ে পার হওয়া বৈধ নয় এবং কেউ পার হতে চাইলে তার বাধা দেওয়া জরুরী। (ইউ)
প্রশ্নঃ যে নামাযী দাড়ি চাঁছে অথবা গাঁটের নিচে কাপড় ঝোলায়, তার পিছনে নামায পড়া শুদ্ধ কি?
উত্তর: এ ব্যাপারে একটি সাধারণ নীতি হল: যার নিজের নামায শুদ্ধ, তার পিছনে নামায শুদ্ধ। কাফের বা মুশরিকের নামায শুদ্ধ নয়, তার পিছনে নামায শুদ্ধ নয়। ফাসেকের নামায শুদ্ধ, তার পিছনে নামায শুদ্ধ। তবে তাকে ইমাম বানানো উচিত নয়। (ইউ) সুতরাং যে ইমাম দাড়ি চাঁছে বা ছোট ক'রে ছাঁটে, গাঁটের নিচে কাপড় ঝোলায়, বিড়ি-সিগারেট খায়, ব্যাংকের সূদ খায়, বউ-বেটিকে শরয়ী পর্দা করে না, কোন অবৈধ মেয়ের সাথে ফষ্টিনষ্টি করে, মিথ্যা বলে, গীবত করে, অথবা আরো কোন কাবীরা গোনাহর কাজ করে, তার পিছনে নামায হয়ে যাবে। তবে এমন লোককে ইমাম বানানো উচিত নয় জামাআতের। কিন্তু জামাআতের মধ্যে সেই যদি সবার চাইতে ভাল লোক হয়, তাহলে 'যেমন হাঁড়ি তেমনি শরা, যেমন নদী তেমনি চরা।'
প্রশ্ন: নামায পড়তে দাঁড়ানোর পর যদি বাসার কলিং-বেল বারবার বেজে ওঠে এবং বাসায় এ নামাযী ছাড়া অন্য কেউ না থাকে, তাহলে সে কী করতে পারে?
উত্তর: নফল নামায হলে তো সহজ। কিন্তু ফরয নামায হলে পুরুষ 'সুবহানাল্লাহ' বলে এবং মহিলা হাতের চেটো দ্বারা শব্দ ক'রে জানিয়ে দেবে যে, সে নামায পড়ছে। তাতেও যদি বেল বেজেই যায় এবং বুঝতে পারে আগন্তুক বা ব্যাপারটা গুরুত্বপূর্ণ, তাহলে নামায ছেড়ে দিয়ে দরজা খুলে এসে পুনরায় নামায শুরু করবে। (ইবা)
প্রশ্নঃ যোহরের নামায পড়ার কিছু পরে আমার স্মরণ হল, আমি তিন রাকআত নামায পড়েছি। এখন আমি কী করব? আরও এক রাকআত পড়ে নিয়ে নিয়মিত সহু সিজদা করব, নাকি পুনরায় নতুন ক'রে চার রাকআত পড়ব?
উত্তর: অল্প সময় (যেমন পাঁচ মিনিটের) ভিতরে মনে পড়লে এবং তখনও মসজিদে অথবা নিজ মুসাল্লায় থাকলে আরও এক রাকআত পড়ে নিয়মিত সহু সিজদা ক'রে নেবেন। পক্ষান্তরে সময় লম্বা হয়ে গেলে এবং মসজিদ অথবা মুসাল্লা ছেড়ে চলে গেলে পুনরায় নতুন ক'রে চার রাকআত পড়বেন। যেহেতু তখন রাকআতগুলির ধারাবাহিকতা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। (ইজি)
প্রশ্ন: ছবিযুক্ত পোশাক পরে নামায বৈধ কি?
উত্তর: প্রাণী, মূর্তি, ত্রিশূল, ক্রুশ ইত্যাদির ছবিযুক্ত অথবা বিভিন্ন লেখাযুক্ত পোশাক পরে নামায বৈধ নয়। এমন ছবিযুক্ত পোশাক পরে নামায বৈধ নয়, যাতে নিজের অথবা অপরের দৃষ্টি ও মন আকৃষ্ট হয়। (ইজি)
প্রশ্ন: কারণবশতঃ একা নামায পড়তে হলে ইক্বামত দেওয়ার মান কী?
উত্তর: একা নামাযীর জন্য ইক্বামত দেওয়া জরুরী নয়। যেমন জেহরী নামাযে সশব্দে ক্বিরাআত পড়াও জরুরী নয়। এ শুধু জামাআতের নামাযের ক্ষেত্রে জরুরী। (ইজি)
প্রশ্ন: অনেক সময় একা দাঁড়িয়ে নামায পড়ি, তখন কেউ এসে আমার ডান পাশে দাঁড়িয়ে গেলে আমার কী করা উচিত?
উত্তর: ইমামতির নিয়ত ক'রে সশব্দে তকবীর বলা এবং জেহরী নামায হলে সশব্দে ক্বিরাআত করা উচিত। কেউ বাম দিকে দাঁড়িয়ে গেলে তাকে টেনে ডান দিকে ক'রে নেওয়া উচিত। এমনটি করেছিলেন রসূল ইবনে আব্বাসের সাথে। (বুখারী ১১৭, মুসলিম ৭৬৩নং)
এ ক্ষেত্রে আপনি সুন্নত আর সে ফরয পড়লে অথবা এর বিপরীত হলেও কোন ক্ষতি হবে না। মুআয বিন জাবাল মহানবী-এর সাথে তাঁর মসজিদে (নববীতে) নামায পড়তেন। অতঃপর নিজ গোত্রে ফিরে এসে ঐ নামাযেরই ইমামতি করতেন। (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত ১১৫০ নং) পরবর্তী ইমামতির নামাযটি তাঁর নফল হতো। অনুরূপ পূর্বে নামায পড়ে পুনরায় মসজিদে এলে এবং সেখানে জামাআত চলতে থাকলে সে নামাযও নফল স্বরূপ পড়তে বলা হয়েছে। (আবু দাউদ ৫৭৫, তিরমিযী ২১৯, নাসাঈ, মিশকাত ১১৫২, সঃ জামে' ৬৬৭নং)
মহানবী একদা এক ব্যক্তিকে একাকী নামায পড়তে দেখলে তিনি অন্যান্য সাহাবীদের উদ্দেশ্যে বললেন, "এমন কেউ কি নেই, যে এর সাথে নামায পড়ে একে (জামাআতের সওয়াব) দান করে?” এ কথা শুনে এক ব্যক্তি উঠে তার সাথে নামায পড়ল। (আবু দাউদ ৫৭৪, তিরমিযী, মিশকাত ১১৪৬ নং) অথচ সে মহানবী-এর সাথে ঐ নামায পূর্বে পড়েছিল।
প্রশ্ন: সউদী আরবের অধিকাংশ লোকেরা নামাযে 'জালসায়ে ইস্তিরাহাহ' করে না কেন?
উত্তর: সেখানার অধিকাংশ উলামা মনে করেন, তা সুন্নত নয়। কারণ নবী-এর নামায-পদ্ধতির অধিকাংশ হাদীসে তা বর্ণিত হয়নি। কেবল মালেক বিন হুয়াইরিসের একটিমাত্র হাদীসে তা বর্ণিত হয়েছে। (বুখারী ৮/১৮নং) আর তাঁরা মনে করেন, নবী বার্ধক্য অথবা অন্য কারণে উক্ত (দ্বিতীয় বা চতুর্থ রাকআতে ওঠার পূর্বে) বৈঠকে বসেছেন। তবে সঠিক এই যে উক্ত 'জালসাহ' সর্বদা মুস্তাহাব। আর অন্য বর্ণনায় উল্লেখ না হওয়া এ কথার দলীল নয় যে, তা সুন্নত বা মুস্তাহাব নয়। যেহেতু নবী যে কাজ করেন, সাধারণতঃ তা অনুসরণীয় তরীকা হিসাবেই করেন। তাছাড়া আবু হুমাইদ সায়েদীর হাদীসেও উক্ত জালসার কথা উল্লেখ হয়েছে। তিনি দশজন সাহাবীর সামনে ঐ জালসাহ ক'রে নবী-এর নামাযের পদ্ধতি বর্ণনা করেছেন এবং সকলেই তা সমর্থন করেছেন। (আহমদ ৫/৪২৪, আবু দাউদ ৭৩০নং) (লাদা)
প্রশ্ন: অধিকাংশ বাঙ্গালী মহিলারা শাড়ি পরে নামায পড়ে। তাতে অনেক সময় তার হাতের বাজু বের হয়ে যায়। সুতরাং তার নামায কি শুদ্ধ হবে?
উত্তর: সামনে কোন বেগানা পুরুষ না থাকলে মহিলা তার নামাযে কেবল চেহারা ও কব্জি পর্যন্ত দুই হাত বের ক'রে রাখবে। এ ছাড়া অন্য কোন অঙ্গ বের হয়ে গেলে তার নামায বাতিল হয়ে যাবে। তা ফিরিয়ে পড়তে হবে। এমনকি পায়ের পাতাও বের হয়ে গেলে নামায শুদ্ধ নয়। (ইবাঃ)
প্রশ্নঃ যোহরের পূর্বে ৪ রাকআত সুন্নত এক সালামে পড়া চলে কি?
উত্তর: যোহরের পূর্বে ও পরে এবং আসরের পূর্বে ৪ রাকআত সুন্নত ২ রাকআত ক'রে পড়ে সালাম ফিরা উত্তম। কারণ, মহানবী বলেন, "রাত ও দিনের নামায ২ রাকআত ক'রে।” (আবু দাউদ) তবে একটানা ৪ রাকআত এক সালামেও পড়া বৈধ। মহানবী বলেন, “যোহরের পূর্বে ৪ রাকআত; (যার মাঝে কোন সালাম নেই,) তার জন্য আসমানের দরজাসমূহ উন্মুক্ত করা হয়।” (আবু দাউদ ১২৭০, ইবনে মাজাহ ১১৫৭, ইবনে খুযাইমা ১২১৪, সহীহুল জামে' ৮৮৫নং)
আল্লামা আলবানীর শেষ তাহক্বীকে বন্ধনীর মাঝের শব্দগুলি সহীহ নয়। কিন্তু অন্য বর্ণনা দ্বারা ৪ রাকআত এক সালামে পড়ার সমর্থন মেলে। আবু আইয়ুব আনসারী বলেন, নবী সূর্য ঢলার সময় ৪ রাকআত নামায প্রত্যহ পড়তেন। একদা আমি বললাম, 'হে আল্লাহর রসূল! আপনি সূর্য ঢলার সময় এই ৪ রাকআত প্রত্যহ পড়ছেন?' তিনি বললেন, "সূর্য ঢলার সময় আসমানের দরজাসমূহ খোলা হয় এবং যোহরের নামায না পড়া পর্যন্ত বন্ধ করা হয় না। অতএব আমি পছন্দ করি যে, এই সময় আমার নেক আমল (আকাশে আল্লাহর নিকট) উঠানো হোক।” আমি বললাম, 'তার প্রত্যেক রাকআতেই কি ক্বিরাআত আছে?' তিনি বললেন, "হ্যাঁ।” আমি বললাম, 'তার মাঝে কি পৃথককারী সালাম আছে?' তিনি বললেন, "না।” (মুখতাসারুশ শামাইলিল মুহাম্মাদিয়্যাহ, আলবানী ২৪৯নং)
আলী বলেন, 'নবী আসরের পূর্বে ৪ রাকআত নামায পড়তেন এবং প্রত্যেক দুই রাকআতে আল্লাহর নিকটবর্তী ফিরিশ্তা, আম্বিয়া ও তাঁদের অনুসারী মুমিন-মুসলিমদের প্রতি সালাম (তাশাহহুদ) দিয়ে তা পৃথক করতেন। আর সর্বশেষে সালাম ফিরতেন।' (আহমদ, তিরমিযী, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ, সিঃ সহীহাহ ২৩৭নং)
প্রশ্নঃ কোন কোন মহিলা ঋতু বন্ধের পরেও গোসল করতে দেরি করে। অতঃপর যখন গোসল করে, তারপর থেকে নামায পড়তে শুরু করে। তাদের এমন কাজ কি বৈধ? যেমন এক মহিলার আসরের সময় খুন বন্ধ হল। অতঃপর নিশ্চিত হওয়ার অপেক্ষায় থেকে রাত্রে আর গোসল করল না। পরদিন দুপুরে গোসল ক'রে যোহরের নামায পড়ল। গোসল করার পূর্বে যে নামাযগুলি ছেড়ে দিল, সেগুলি কি মাফ?
উত্তর: অবশ্যই মাফ নয়। তার উচিত, যথাসময়ে গোসল ক'রে নামায শুরু করা। কোন বৈধ কারণে যদি গোসল করতে দেরিও হয়, তাহলে খুন বন্ধ হওয়ার পর থেকে যে নামায ছুটে গেছে, সেগুলি কাযা পড়তে হবে। নামায নিজের ইচ্ছামতো পড়ার জিনিস নয়। মিথ্যা ওজর দিয়ে এড়িয়ে গিয়ে সম্মান বাঁচানোর জিনিস নয়। মহান আল্লাহর কাছে হিসাব লাগবে। মানুষকে ঠকানো গেলেও, তাঁকে ঠকানো যাবে না। তিনি বলেছেন,
{فَخَلَفَ مِن بَعْدِهِمْ خَلْفٌ أَضَاعُوا الصَّلَاةَ وَاتَّبَعُوا الشَّهَوَاتِ فَسَوْفَ يَلْقَوْنَ غَيًّا } (٥٩)
অর্থাৎ, তাদের পর এল অপদার্থ পরবর্তিগণ, তারা নামায নষ্ট করল ও প্রবৃত্তিপরায়ণ হল; সুতরাং তারা অচিরেই অমঙ্গল প্রত্যক্ষ করবে। (মারয়্যাম : ৫৯)
{ فَوَيْلٌ لِّلْمُصَلِّينَ (٤) الَّذِينَ هُمْ عَن صَلَاتِهِمْ سَاهُونَ (٥) الَّذِينَ هُمْ يُرَاؤُونَ} (٦) الماعون
অর্থাৎ, সুতরাং পরিতাপ সেই নামায আদায়কারীদের জন্য; যারা তাদের নামাযে অমনোযোগী। যারা লোক প্রদর্শন (ক'রে তা আদায়) করে। (মাউন: ৪-৬)
প্রশ্ন: কিছু নামাযী জামাআত শুরু হওয়ার পর আসে। কিন্তু তারা রাকআত বা রুকু পাওয়ার জন্য দৌড়ে আসে। ফলে তাদের পায়ের শব্দে অন্য নামাযীদের বড় ডিস্টার্ব হয়। এ কাজ কি তাদের জন্য বৈধ?
উত্তর: জামাআতে শামিল হওয়ার জন্য দৌড়ে আসা বৈধ নয়। যেহেতু মহানবী বলেন, "নামাযের ইকামত হয়ে গেলে তোমরা দৌড়ে এস না। বরং তোমরা স্বাভাবিকভাবে চলে এস। আর তোমাদের মাঝে যেন স্থিরতা থাকে। অতঃপর যেটুকু নামায পাও তা পড়ে নাও এবং যা ছুটে যায় তা পুরা করে নাও।” (বুখারী ৬৩৬, মুসলিম ৬০২নং)
প্রশ্ন: মসবুক নামাযীর ইক্তিদা ক'রে জামাআত করা বৈধ কি?
উত্তরঃ যদি কোন নামাযী মসজিদে এসে দেখে যে, জামআত শেষ হয়ে গেছে, কিন্তু কিছু মসবুক (যাদের কিছু নামায ছুটে গেছে তারা) উঠে একাকী নামায পূর্ণ করছে, তাহলে জামাআতের সওয়াব লাভের আশায় ঐ নামাযীর কোন এক মসবুকের ডাইনে দাঁড়িয়ে তার ইক্তিদা ক'রে নামায পড়া বৈধ। (ফাতাওয়া ইসলামিয়্যাহ ১/২৬৬) কিন্তু যেহেতু সঠিক প্রমাণ নেই এবং অনেকে এরূপ শুদ্ধ নয় বলেছেন, সেহেতু তা না করাই উত্তম। আর মহানবী বলেন, "যে বিষয়ে সন্দেহ আছে সে বিষয় বর্জন করে তাই কর যাতে সন্দেহ নেই।” (তিরমিযী ২৫১৮, সহীহ জামে' ৩৩৭৮নং) "সুতরাং যে সন্দিহান বিষয়াবলী থেকে দূরে থাকবে, সে তার দ্বীন ও ইজ্জতকে বাঁচিয়ে নেবে।” (বুখারী ৫২, মুসলিম ১৫৯৯নং)
বলা বাহুল্য, অনেকে তা জায়েয বললেও না করাটাই উত্তম। (ফাতাওয়া উষাইমীন ১/৩৭১)
প্রশ্ন: অনেক সময় একাকী নামায পড়তে হলে ইকামত দেওয়া এবং রাতের নামায সশব্দে পড়া জরুরী কি?
উত্তর: একাকী নামাযীর জন্য ইকামত দেওয়া এবং রাতের নামায সশব্দে পড়া জরুরী নয়। এ কেবল জামাআতের জন্য জরুরী। (ইজি)
প্রশ্ন: কাতারে জায়গা না পেলে একা দাঁড়িয়ে নামায হবে কি?
উত্তর: কাতারে জায়গা না পাওয়ার কথা যদি বাস্তব হয় এবং সঙ্গে দাঁড়াবার মতো কাউকে না পাওয়া যায়, তাহলে একা দাঁড়িয়েই নামায হয়ে যাবে। কাতারের পিছনে একা দাঁড়িয়ে নামায হবে না তখন, যখন সামনের কাতারে জায়গা খালি থাকবে। সুতরাং এটি হবে ব্যতিক্রমধর্মী ব্যাপার। যেহেতু কাতার থেকে কাউকে টেনে নেওয়ার হাদীস সহীহ নয়। আর সে টানাতে অনেক নামাযীর নামাযের একাগ্রতায় ব্যাঘাত সৃষ্টি করে। (ইউ) নাক থেকে রক্ত পড়তে শুরু করলে অথবা উযূ নষ্ট হয়ে গেলে তো বাধ্য হয়ে যেতেই হয়। আর তার ফলে সৃষ্ট ব্যাঘাত সামনে থেকে কাউকে টেনে নেওয়ার মতো নয়। যেহেতু একটা ব্যাপার বাদলীল এবং অপরটি বেদলীল।
প্রশ্ন: কাতারের পিছে একা নামাযীর নামায হয় না। কিন্তু আগের কাতারে জায়গা না পেলে কী করবে? সামনে থেকে কি কাউকে টেনে নেবে?
উত্তর: যদি কোন ব্যক্তি জামাআতে এসে দেখে যে, কাতার পরিপূর্ণ, তাহলে সে কাতারে কোথাও ফাঁক থাকলে সেখানে প্রবেশ করবে। নচেৎ সামান্যক্ষণ কারো অপেক্ষা করে কেউ এলে তার সঙ্গে কাতার বাঁধা উচিত। সে আশা না থাকলে বা জামাআত ছুটার ভয় থাকলে (মিহরাব ছাড়া বাইরে নামায পড়ার সময়) যদি ইমামের পাশে জায়গা থাকে এবং সেখানে যাওয়া সম্ভব হয়, তাহলে তার পাশে গিয়ে দাঁড়াবে এবং এ সব উপায় থাকতে পিছনে একা দাঁড়াবে না।
পরম্ভ কাতার বাঁধার জন্য সামনের কাতার থেকে কাউকে টেনে নেওয়া ঠিক নয়। এ ব্যাপারে যে হাদীস এসেছে তা সহীহ ও শুদ্ধ নয়। (যয়ীফুল জামে' ২২৬১নং) তাছাড়া এ কাজে একাধিক ক্ষতিও রয়েছে। যেমন; যে মুসল্লীকে টানা হবে তার নামাযের একাগ্রতা নষ্ট হবে, প্রথম কাতারের ফযীলত থেকে বঞ্চিত হবে, কাতারের মাঝে ফাঁক হয়ে যাবে, সেই ফাঁক বন্ধ করার জন্য পাশের মুসল্লী সরে আসতে বাধ্য হবে, ফলে তার জায়গা ফাঁক হবে এবং শেষ পর্যন্ত প্রথম বা সামনের কাতারের ডান অথবা বাম দিককার সকল মুসল্লীকে নড়তে-সরতে হবে। আর এতে তাদের সকলের একাগ্রতা নষ্ট হবে। অবশ্য হাদীস সহীহ হলে এত ক্ষতি স্বীকার করতে বাধা ছিল না। যেমন নাক থেকে রক্ত পড়তে শুরু হলে কিংবা ওযু ভেঙ্গে গেলে কাতার ছেড়ে আসতে বাধা নেই। যেহেতু নবী বলেন, “যখন তোমাদের কেউ নামাযে বেওযূ হয়ে যায়, তখন সে যেন নাক ধরে নামায ত্যাগ ক'রে বেরিয়ে আসে।” (আবু দাউদ ১১১৪নং)
তদনুরূপ ইমামের পাশে যেতেও যদি অনুরূপ ক্ষতির শিকার হতে হয়, তাহলে তাও করা যাবে না।
ঠিক তদ্রূপই জায়গা না থাকলেও কাতারের মুসল্লীদেরকে এক এক করে ঠেলে অথবা সরে যেতে ইঙ্গিত করে জায়গা ক'রে নেওয়াতেও ঐ মুসল্লীদের নামাযের একাগ্রতায় বড় ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়। সুতরাং এ কাজও বৈধ নয়।
বলা বাহুল্য, এ ব্যাপারে সঠিক ফায়সালা এই যে, সামনে কাতারে জায়গা না পেলে পিছনে একা দাঁড়িয়েই নামায হয়ে যাবে। কারণ, সে নিরুপায়। আর মহান আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যের বাইরে ভার দেন না। (লিক্বাউ বাবিল মাফতুহ ২২৭পৃঃ)
প্রকাশ থাকে যে, মহিলা জামাআতের মহিলা কাতারে জায়গা থাকতে যে মহিলা পিছনে একা দাঁড়িয়ে নামায পড়বে তারও নামায পুরুষের মতই হবে না। (মুমতে' ৪/৩৮-৭) পক্ষান্তরে পুরুষদের পিছনে একা দাঁড়িয়ে মহিলার নামায হয়ে যাবে।
প্রশ্নঃ মুশরিক ও বিদআতী ইমামের পিছনে নামায শুদ্ধ কি? যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কোন ইবাদতে অন্য কোন সৃষ্টিকে শরীক করে, যেমন মাযার পূজা করে, মাযারে গিয়ে সিজদা, নযর-নিয়ায, মানত, কুরবানী, তওয়াফ প্রভৃতি নিবেদন করে, সেখানে সুখ-সমৃদ্ধি বা সন্তান চায়, সাহায্য প্রার্থনা করে, যে ব্যক্তি গায়বী (অদৃশ্যের খবর জানার) দাবী করে ও লোকের হাত বা ভাগ্য-ভবিষ্যত বলে দেয়, যে (কোন পশু বা পাখীর চামড়া, হাড়, লোম বা পালক দিয়ে, কোন গাছপালার শিকড় বা ফুল-পাতা দিয়ে, কারো কাপড়ের কোন অংশ দিয়ে, ফিরিশ্তা, জিন, নবী, সাহাবী, ওলী বা শয়তানের নাম লিখে অথবা বিভিন্ন সংখ্যার নকশা বানিয়ে, অথবা তেলেস্মাতি বিভিন্ন কারসাজি করে, নোংরা ও নাপাক কোন জিনিস দিয়ে) শিকী তাবীয লিখে, যে ব্যক্তি দুই জনের মাঝে (বিশেষ করে স্বামী-স্ত্রীর মাঝে) প্রেম বা বিদ্বেষ সৃষ্টি করার জন্য তাবীয করে, যোগ বা যাদু করে, এ শ্রেণীর ইমামের নামায শুদ্ধ নয়, ইমামতি শুদ্ধ নয় এবং তার পশ্চাতে নামাযও শুদ্ধ নয়। (মাজাল্লাতুল বুহূষ ১৯/১৫৯, ২২/৮২, ২৪/৭৮, ৮৯, ২৬/৯৭, ২৮/৫৫) তদনুরূপ বিদআতী যদি বিদআতে মুকাফফিরাহ বা এমন বিদআত করে যাতে মানুষ কাফের হয়ে যায়, তাহলে সে বিদআতীর পিছনে নামায শুদ্ধ নয়।
প্রশ্ন: ফাসেক ইমামের পিছনে নামায শুদ্ধ কি?
উত্তর: ফাসেক হল সেই ব্যক্তি, যে অবৈধ, হারাম বা নিষিদ্ধ কাজ করে এবং ফরয বা ওয়াজেব কাজ ত্যাগ করে; অর্থাৎ কাবীরা গোনাহ করে। যেমন, ধূমপান করে, বিড়ি- সিগারেট, জর্দা-তামাক প্রভৃতি মাদকদ্রব্য ব্যবহার করে, গাঁটের নিচে ঝুলিয়ে কাপড় পরে, অথবা সূদ বা ঘুস খায়, অথবা মিথ্যা বলে, অথবা (অবৈধ প্রেম) ব্যভিচার করে, অথবা দাড়ি চাঁছে বা (এক মুঠির কম) ছেঁটে ফেলে, অথবা মুশরিকদের যবেহ (হালাল মনে না করে) খায়, (হালাল মনে করে খেলে তার পিছনে নামায হবে না।) অথবা স্ত্রী-কন্যাকে বেপর্দা রেখে তাদের ব্যাপারে ঈর্ষাহীন হয়, অথবা মা-বাপকে দেখে না বা তাদেরকে ভাত দেয় না ইত্যাদি। উক্ত সকল ব্যক্তি এবং তাদের অনুরূপ অন্যান্য ব্যক্তির পিছনে নামায মকরূহ (অপছন্দনীয়)। বিধায় তাকে ইমামরূপে নির্বাচন ও নিয়োগ করা বৈধ ও উচিত নয়। কিন্তু যদি কোন কারণে বা চাপে পড়ে বাধ্য হয়েই তার পিছনে নামায পড়তেই হয়, তাহলে নামায হয়ে যাবে। (মাজাল্লাতুল বুহূষিল ইসলামিয়্যাহ ৫/২৯০, ৩০০, ৬/২৫১, ১৫/৮০, ১৮/৯০, ১১১, ১৯/১৫২, ২২/৭৫, ৭৭, ৯২, ২৪/৭৮) সাহাবাগণের যামানায় সাহাবাগণ ফাসেকের পিছনে নামায পড়েছেন। আব্দুল্লাহ বিন উমার হাজ্জাজের পিছনে নামায পড়েছেন। (বুখারী) আবু সাঈদ খুদরী মারওয়ানের পিছনে নামায পড়েছেন। (মুসলিম, আবু দাউদ, তিরমিযী) দ্বিতীয় খলীফা উষমান রাযিয়াল্লাহু আনহু ফিতনার সময় যখন স্বগৃহে অবরুদ্ধ ছিলেন, তখন উবাইদুল্লাহ বিন আদী বিন খিয়ার তাঁর নিকট উপস্থিত হয়ে বললেন, 'আপনি জনসাধারণের ইমাম। আর আপনার উপর যে বিপদ এসেছে, তা তো দেখতেই পাচ্ছেন। ফিতনার ইমাম আমাদের নামাযের ইমামতি করছে; অথচ তার পশ্চাতে নামায পড়তে আমরা দ্বিধাবোধ করি।' তিনি বললেন, 'নামায হল মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ আমল। সুতরাং লোকে ভালো ব্যবহার করলে তাদের সাথেও ভালো ব্যবহার কর। আর মন্দ ব্যবহার করলে তাদের সাথে মন্দ ব্যবহার করা থেকে দূরে থাক।' (বুখারী ৬৯৫, মিশকাত ৬২৩নং)
প্রশ্নঃ আমাদের মসজিদের ইমাম সাহেব ফজরের আযানের পূর্বে মাইকে কুরআন পাঠ করেন, কিছু দুআ-দরূদ পড়েন, তারপর আযান দেন। এটা কি শরীয়তসম্মত?
উত্তর: ফজরের আযানের পূর্বে মাইকে কুরআন পাঠ করা, কিছু দুআ-দরূদ পড়া, তারপর আযান দেওয়া শরীয়তসম্মত নয়, বরং তা বিদআত। (লাদা)
প্রশ্নঃ জুমআর দিন মিম্বরে চড়ে খতীবের খুতবা দেওয়ার পূর্বে একজন ক্বারী কুরআন তিলাঅত ক'রে (অথবা বক্তৃতা ক'রে) শোনায়। এটা কি শরীয়তসম্মত?
উত্তর: এ কাজের কোন দলীল আমাদের জানা নেই। আর মহানবী বলেন, "যে ব্যক্তি আমাদের এ (দ্বীন) ব্যাপারে নতুন কিছু আবিষ্কার করে, সে ব্যক্তির সে কাজ প্রত্যাখ্যাত।” (বুখারী ও মুসলিম) “যে ব্যক্তি এমন কোন কাজ করে, যার উপর আমাদের কোন নির্দেশ নেই, সে ব্যক্তির সে কাজ প্রত্যাখ্যাত।” (মুসলিম, লাদা) আমাদের আদর্শ নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তিনি মিম্বরে খুতবা দেওয়ার আগে নিচে দাঁড়িয়ে খুতবা দেননি। তিনি উম্মতকে নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, "যে ব্যক্তি জুমআর দিন নাপাকির গোসলের ন্যায় গোসল করল এবং (সূর্য ঢলার সঙ্গে সঙ্গে) প্রথম অক্তে মসজিদে এল, সে যেন একটি উট দান করল। যে ব্যক্তি দ্বিতীয় সময়ে এল, সে যেন একটি গাভী দান করল। যে ব্যক্তি তৃতীয় সময়ে এল, সে যেন একটি শিংবিশিষ্ট দুম্বা দান করল। যে ব্যক্তি চতুর্থ সময়ে এল, সে যেন একটি মুরগী দান করল। আর যে ব্যক্তি পঞ্চম সময়ে এল, সে যেন একটি ডিম দান করল। তারপর ইমাম যখন খুতবাহ প্রদানের জন্য বের হন, তখন (লেখক) ফিরিস্তাগণ যিক্র শোনার জন্য হাজির হয়ে যান।” (বুখারী ও মুসলিম) তিনি আরো বলেছেন, "যে কোন ব্যক্তি জুমআর দিন গোসল ও সাধ্যমত পবিত্রতা অর্জন করে, নিজস্ব তেল গায়ে লাগায় অথবা নিজ ঘরের সুগন্ধি (আতর) ব্যবহার করে, অতঃপর (মসজিদে) গিয়ে দু'জনের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি না করেই (যেখানে স্থান পায়, বসে যায়) এবং তার ভাগ্যে যত রাকআত নামায জোটে, আদায় করে। তারপর ইমাম খুতবা আরম্ভ করলে নীরব থাকে, সে ব্যক্তির সংশ্লিষ্ট জুমআহ থেকে পরবর্তী জুমআহ পর্যন্ত কৃত সমুদয় (সাগীরা) গুনাহরাশিকে মাফ ক'রে দেওয়া হয়।” (বুখারী) সুতরাং মসজিদে গিয়ে নামায পড়া কর্তব্য মুসল্লীদের। অতঃপর ইমাম খুতবা দিলে নীরব হয়ে বসে খুতবা শুনবে। সুতরাং তার আগে আবার খুতবা শোনার অবসর কোথায়? মিম্বরে খুতবা শুরু হওয়ার আগে কেউ না কেউ আসতেই থাকবে। সুতরাং তাদেরকে নামায পড়তে না দিয়ে লেকচার শুনিয়ে ডিস্টার্ব করা কীভাবে বৈধ হতে পারে? অথচ রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবাগণকে সশব্দে কুরআন পড়তে নিষেধ ক'রে বলেন, "তোমরা একে অপরকে কষ্ট দিয়ো না এবং একে অপরের উপর ক্বিরাআতে শব্দ উঁচু করো না।" (আহমাদ ৩/৯৪, আবু দাউদ ১২৩২নং, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ প্রমুখ) পরন্তু তিনি জুমআর দিন নামাযের পূর্বে দর্সের জন্য হালকা বাঁধতে নিষেধও করেছেন। (আবু দাউদ ৯৯১, নাসাঈ ৭১৪, ইবনে মাজাহ ১১৩৩নং) তাহলে জুমআর খুতবার পূর্বে নামাযের সময় অতিরিক্ত লেকচার কীভাবে বৈধ হতে পারে?
আসলে স্থানীয় ভাষায় খুতবা 'হারাম' ক'রে উক্ত 'লেকচারের বিদআত' আবিষ্কৃত হয়েছে।
প্রশ্ন: জুমআর সময় একজন খুতবা দিলে এবং অন্যজন নামায পড়লে ক্ষতি আছে কি?
উত্তর: একজন খুতবা দিলে এবং অপরজন ইমামতি করলে কোন দোষের নয়। যেহেতু যিনি খতীব, তিনিই ইমাম হবেন---এমন কোন বাধ্যবাধকতা নেই। অবশ্য উত্তম হল, যিনি খুতবা দেবেন, তিনিই নামায পড়াবেন। যেহেতু এটাই নবী-এর আমল। (ইবা) আর কোন অসুবিধার কারণে হলে তো কোন প্রশ্নই নেই। যেমন খতীব খুতবায় ভাল, কিন্তু ইমাম ইমামতির বেশি হকদার হলে---সে ক্ষেত্রেও তাঁকে ইমামতির জন্য বাড়িয়ে দিলে সুন্নাহর উপরই আমল হয়।
প্রশ্ন: অনেক নামাযী নামাযরত অবস্থায় নাক, দাড়ি বা কাপড় ইত্যাদি নিয়ে খেলা করে। এদের ব্যাপারে কিছু বলার আছে কি?
উত্তর: নামাযরত অবস্থায় নাক, দাড়ি ইত্যাদি নিয়ে উদাস হওয়া উচিত নয়। যেহেতু তা নামাযের একাগ্রতার পরিপন্থী। আর মহান আল্লাহ বলেছেন,
{ قَدْ أَفْلَحَ الْمُؤْمِنُونَ (۱) الَّذِينَ هُمْ فِي صَلَاتِهِمْ خَاشِعُونَ} (۲) سورة المؤمنون
অর্থাৎ, অবশ্যই বিশ্বাসিগণ সফলকাম হয়েছে। যারা নিজেদের নামাযে বিনয়-নম্র। (মু'মিনূনঃ ১-২)
প্রশ্নঃ নামাযের শেষ তাশাহহুদে কি নিজের ভাষায় দুআ করা যায়?
উত্তর: অনেক উলামার মতে বৈধ নয়। যেহেতু নামায আল্লাহ ও তাঁর রসূলের ভাষায়, সুতরাং সেই ভাষাতেই দুআ হওয়া উচিত। যে সব কুরআনী ও হাদীসী দুআ জানা আছে, তাই পড়া উচিত। যা জানা নেই, তা নামাযের বাইরে অন্য সময় নিজের ভাষায় করা উচিত। অনেকে 'ইচ্ছামতো দুআ' বলতে 'ইচ্ছামতো ভাষা'য় দুআ বলেছেন। সুতরাং নিজের ভাষায় দুআ করা যাবে। আমরা বলি, না করাই উচিত। যেহেতু ইবাদত প্রমাণসাপেক্ষ। আর নবী-এর বাণী, "যখন তোমাদের মধ্যে কেউ (শেষ) তাশাহহুদ সম্পন্ন করবে, তখন সে যেন আল্লাহর নিকট চারটি জিনিস থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করে। এরপর সে ইচ্ছামতো দুআ করবে।” এ ব্যাপারে ইমাম আহমাদ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, 'বর্ণিত ও বিদিত দুআ করবে।' যেহেতু নিজের ভাষায় দুআ হল সাধারণ মানুষের কথা। আর তা নামাযে বলা বৈধ নয়। (আল-মুগনী ১/৬২০)
প্রশ্নঃ সিজদায় কি কুরআনী দুআ করা যায়?
উত্তর: সিজদায় কুরআনের আয়াত পড়া নিষেধ। কিন্তু মুনাজাতের দুআ হিসাবে তা পড়লে দোষ নেই। (ইউ) 'আমাকে সিজদায় কুরআন পড়তে নিষেধ করা হয়েছে' যেমনি আম, তেমনি 'তোমরা সিজদায় বেশি বেশি দুআ কর' নির্দেশও আম। তাতে কুরআনী ও হাদীসী সব রকম দুআই করা যাবে। যারকাশী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন,
مَحَلَ الْكَرَاهَةِ مَا إِذَا قَصَدَ بِهَا الْقِرَاءَةَ ، فَإِنْ قَصَدَ بِهَا الدُّعَاءَ وَالتَّنَاءَ فَيَنْبَغِي أَنْ يَكُونَ كَمَا لَوْ قَنَتَ بِآيَةٍ مِنَ الْقُرْآنِ.
অর্থাৎ, সিজদায় কুরআন পড়া মকরূহ তখন, যখন ক্বিরাআতের উদ্দেশ্যে তা পড়া হবে। পক্ষান্তরে তা যদি দুআ অথবা (আল্লাহর) প্রশংসা হিসাবে পড়া হয়, তাহলে তা কুরআনী আয়াত দিয়ে কুনুত পড়ার মতো হওয়া উচিত। (হাশিয়াতু ইবনিল আবেদীন ১/৪৪০, হাশিয়াতুদ দুসুক্বী আলাশ শারহিল কাবীর ১/২৫৩, মাজমু ৩/৪১৪)
প্রশ্নঃ কর্মক্ষেত্রে পানি নেই। বাসায় পানি আছে। নামাযের ওয়াক্ত যাওয়ার আগে বাসায় পৌঁছে যাব। নামাযের সময় হলে তায়াম্মুম ক'রে আওয়াল ওয়াক্তে নামায পড়ে নেব, নাকি বাসায় ফিরে শেষ ওয়াক্তে উযূ ক'রে নামায পড়ব?
উত্তর: সময় পার হওয়ার আশঙ্কা থাকলে এবং তার আগে পানি না পাওয়ার কথা নিশ্চিত হলে তায়াম্মুম ক'রে আওয়াল অক্তেই নামায পড়ে নেবেন। পক্ষান্তরে বাসায় ফিরে ওয়াক্ত বাকী থাকার কথা নিশ্চিত হলে বাসায় ফিরে উযূ করেই নামায পড়বেন।
প্রশ্ন: কাঁচা পিঁয়াজ-রসুন খেলে মুখের গন্ধের ফলে মসজিদে বা জামাআতে আসা নিষেধ। কিন্তু যাদের মুখে প্রকৃতিগতভাবে দুর্গন্ধ থাকে, তাদের জন্যও কি নিষেধ?
উত্তর: যাদের মুখে প্রকৃতিগতভাবে দুর্গন্ধ থাকে, তাদের জন্যও মসজিদ বা জামাআতে আসা নিষেধ বলা যায় না। যেহেতু এটা তার এখতিয়ারভুক্ত নয়। (বানী)