📄 সাহাবা
প্রশ্নঃ সাহাবাগণের পরবর্তী যুগে কি কোনও মুসলিমের জন্য সাহাবার মর্তবা ও মর্যাদায় পৌঁছনো সম্ভব?
উত্তর: সাহাবগণের মর্তবা ও মর্যাদায় পৌঁছনো কোনক্রমেই সম্ভব নয়। যেহেতু মহানবী বলেছেন, (( خَيْرُكُمْ قَرْنِي ، ثُمَّ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ ، ثُمَّ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ )). متفقٌ عَلَيْهِ অর্থাৎ, “তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম যুগ হল আমার (সাহাবীদের) যুগ। অতঃপর তৎপরবর্তী (তাবেয়ীদের) যুগ। অতঃপর তৎপরবর্তী (তাবে-তাবেয়ীনদের) যুগ।” (বুখারী-মুসলিম) তবে কোন কোন ক্ষেত্রে সাহাবাগণের চাইতে বেশি সওয়াবের অধিকারী হওয়া যায়। যেহেতু নবী বলেছেন, فَإِنَّ مِنْ وَرَائِكُمْ أَيَّامَ الصَّبْرِ ، الصَّابِرُ فِيهِ مِثْلُ الْقَابِضِ عَلَى الْجَمْرِ، لِلْعَامِلِ فِي ذَلِكَ الزَّمَانِ أَجْرُ خَمْسِينَ رَجُلا ، قِيلَ: يَا رَسُولَ اللهِ ، أَجْرُ خَمْسِينَ رَجُلًا مِنَّا أَوْ مِنْهُمْ، قَالَ : لَا بَلْ أَجْرُ خَمْسِينَ رَجُلًا مِنْكُمْ. অর্থাৎ, “তোমাদের পরবর্তীতে আছে ধৈর্যের যুগ। সে (যুগে) ধৈর্যশীল হবে মুষ্টিতে অঙ্গার ধারণকারীর মতো। সে যুগের আমলকারীর হবে পঞ্চাশ জন পুরুষের সমান সওয়াব।” জিজ্ঞাসা করা হল, 'হে আল্লাহর রসূল! পঞ্চাশ জন পুরুষ আমাদের মধ্য হতে, নাকি তাদের মধ্য হতে?' তিনি বললেন, "না, বরং তোমাদের মধ্য হতে!” অন্য বর্ণনায় আছে, "তোমাদের পঞ্চাশজন শহীদের সমান সওয়াব!” (আবু দাউদ, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ, ত্বাবারানী, সঃ জামে' ২২৩৪নং)
সাহাবাগণ ইসলামের প্রারম্ভিককালে কত কষ্ট বরণ করেছেন, কাফেরদের অত্যাচারে কত ধৈর্য ধারণ করেছেন, কত শত বাধা-বিপত্তি উল্লংঘন ক'রে ঈমান ও ইসলামকে যথার্থরূপে পালন ক'রে গেছেন। আর পরবর্তী যুগের ধৈর্যশীল লোকেরাও নানা ফিতনার মাঝে, নানা ভ্রষ্টকারী দল ও মতের মাঝে, সর্বগ্রাসী ও সর্বনাশী ঈমান ও চরিত্র-বিধ্বংসী প্রচারমাধ্যমের মাঝে, অশ্লীলতা ও নোংরামির মাঝে ঈমান টিকিয়ে রাখে। যে সকল ফিতনা ও প্রচারমাধ্যম সাহাবাগণের যুগে ছিল না। তাই তো তাদের পঞ্চাশ গুণ সওয়াব বেশি!
📄 জ্বিন ও শয়তান
প্রশ্ন: মনের ভিতরে আল্লাহ ও গায়বী বিষয়সমূহে নানা সন্দেহের সৃষ্টি হলে কী করা উচিত?
উত্তর: (ক) আল্লাহর কাছে শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করা উচিত। (খ) সেই কুমন্ত্রণাকে মন থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা অব্যাহত রাখা উচিত এবং (গ) 'আমানতু বিল্লাহ' অথবা 'আমানতু বিল্লাহি অরুসুলিহ' বলা উচিত। (ইজি)
প্রশ্ন: জ্বিন যাতে কাছে বা বাড়িতে না আসে, সে উদ্দেশ্যে বাঘের ছাল বা মাথা ঘরে রাখা বৈধ কি?
উত্তরঃ না। এ উদ্দেশ্যে বাঘের ছাল বা মাথা (লোহা বা তামার কোন জিনিস, মাদুলি বা অন্য কিছু) ব্যবহার করা বৈধ নয়। (ইজি) বরং শরয়ী দুআ ও যিক্র পড়া উচিত। শিশুকে দুআ-তাবীয নয়, বরং নির্দিষ্ট দুআ পড়ে দুআর তাবীয দেওয়া উচিত। আর তা হল এই, أُعِيذُكُمَا بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّةِ، مِنْ كُلِّ شَيْطَانٍ وَهَامَّةٍ، وَمِنْ كُلِّ عَيْنٍ لأُمَّةٍ. উচ্চারণ: উঈযুকুমা বিকালিমা-তিল্লা-হিত তা-ম্মাহ, মিন কুল্লি শায়ত্বা-নিউ অহা- ম্মাহ, অমিন কুল্লি আইনিল লা-ম্মাহ। অর্থঃ আমি তোমাদেরকে আল্লাহর পরিপূর্ণ বাণীসমূহের অসীলায় প্রত্যেক শয়তান ও কষ্টদায়ক জন্তু হতে এবং প্রত্যেক ক্ষতিকারক (বদ) নজর হতে আল্লাহর পানাহ দিচ্ছি। (বুখারী)
প্রশ্নঃ জ্বিন কি বশ করা যায়?
উত্তর: শয়তান প্রকৃতির জ্বিনকে তুষ্ট ক'রে বশ করা যায়। (ইজি)
প্রশ্নঃ জ্বিন কি কোন মানুষের সাথে যৌন-মিলনে লিপ্ত হতে পারে?
উত্তর: জ্বিন-ইনসানের মিলন অসম্ভব নয়। (ইজি)
প্রশ্নঃ কোন মৃতের 'রূহ' কি হাযির করা যায়?
উত্তর: না। কোন মৃতের 'রূহ' হাযির করা যায় না। তবে তুষ্ট ক'রে শয়তান জ্বিন হাযির করা যায়। (ইজি)
প্রশ্নঃ জ্বিন কি মানুষকে অপহরণ ও হত্যা করতে পারে?
উত্তর: হাদীসে বর্ণিত আছে, খাযরাজের সর্দার সা'দ বিন উবাদাহ জ্বিন কর্তৃক খুন হয়েছিলেন। (ত্বাবাক্বাতে ইবনে সা'দ ৩/৬১৭, মুস্তাদরাক ৩/২৮৩, মুসান্নাফ আঃ রায্যাক্স ১১/৪৩৪) মদীনায় এক সাহাবীকে এক জ্বিন সাপের আকৃতি নিয়ে হত্যা করেছিল। (মুসলিম, মিশকাত ৪১১৮নং) অনুরূপ উমার-এর খেলাফতকালে একজন মুসলিম মুশরিক জ্বিন কর্তৃক অপহৃত হয়। পরিশেষে মুসলিম জ্বিনরা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে তাকে মুক্ত ক'রে আনে। (ইজি)
প্রশ্ন: জ্বিন কর্তৃক খুন-হত্যা, অপহরণ ইত্যাদি সত্য হলে, যাদের জ্বিন বশ আছে, তারা তার দ্বারা বড় বড় অপরাধীদেরকে ধ্বংস করায় না কেন?
উত্তর: তা করাতে গেলে হয়তো বিরোধী জ্বিন তাকে বাধা দেবে। মানুষের যেমন বন্ধু ও শত্রু আছে, তেমনি তাদেরও আছে। আর মানুষের উপকার করতে গিয়ে জ্বিনদের আপোসের গৃহযুদ্ধ বাধবে, যেমন উমার-এর খেলাফতকালে ঘটেছিল。
প্রশ্ন: অনেক সময় রোগী বড় ওঝার কাছে ভাল হয় না। জ্বিন পাওয়ার প্রায় সমস্ত আলামত থাকতেও পরিশেষে ডাক্তারের কাছে ভাল হয়। তাহলে জ্বিন পাওয়ার ব্যাপারটা কি মানসিক রোগ নয়?
উত্তর: হতে পারে। তবে এই শ্রেণীর মানসিক অনেক রোগ কোন ডাক্তারের কাছেও ভাল হয় না। বলা বাহুল্য এই শ্রেণীর রোগ হিস্টিরিয়া হতে পারে, জাদু-ঘটিত হতে পারে, জ্বিন পাওয়া হতে পারে, পরিকল্পিত অভিনয়ও হতে পারে। যার যেমন রোগ, তার তেমন ওষুধ না পড়লে সারবে কেন?
প্রশ্নঃ যে ব্যক্তি জ্বিন অস্বীকার করে, ইসলামে তার বিধান কী?
উত্তর: যে ব্যক্তি জ্বিনের অস্তিত্বই অস্বীকার করে, সে ব্যক্তি কাফের। কারণ কিতাব ও সুন্নাহতে তাদের অস্তিত্ব ও জীবনের কথা আলোচিত হয়েছে। অদৃশ্য জগৎ ফিরিস্তার প্রতি ঈমান যেমন জরুরী, তেমনি জ্বিন জাতির অস্তিত্বের বিশ্বাসও জরুরী। মহান আল্লাহ বলেছেন, {إِنَّهُ يَرَاكُمْ هُوَ وَقَبِيلُهُ مِنْ حَيْثُ لا تَرَوْنَهُمْ} (۲۷) سورة الأعراف অর্থাৎ, নিশ্চয় সে নিজে এবং তার দলবল তোমাদেরকে এমন স্থান হতে দেখে থাকে যে, তোমরা তাদেরকে দেখতে পাও না। (আ'রাফঃ ২৭)
প্রশ্ন: জ্বিন জাতি আগুন থেকে সৃষ্ট। তাদের জান্নাত-জাহান্নাম হলে জাহান্নামের আগুনে আগুন পুড়বে বা শাস্তি পাবে কীভাবে?
উত্তর: আল্লাহর দেওয়া শাস্তিতে অসম্ভব কিছু নেই। মহান আল্লাহ জ্বিনদের কথা উদ্ধৃত ক'রে বলেছেন, {وَأَمَّا الْقَاسِطُونَ فَكَانُوا لِجَهَنَّمَ حَطَبًا} (١٥) سورة الجن অর্থাৎ, অপরপক্ষে সীমালংঘনকারীরা তো জাহান্নামেরই ইন্ধন।' (জ্বিনঃ ১৫) আর বিদিত যে, দুনিয়ার আগুনের চাইতে জাহান্নামের আগুনের তেজ সত্তর গুণ বেশি। অবশ্য এমনও হতে পারে যে, তাদেরকে আযাব দেওয়ার জন্য পৃথক আগুন প্রস্তুত আছে। যেহেতু পরকালের বিষয়াবলী ইহকালের বিষয়াবলী থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। (ইজি) মানুষ মাটি থেকে তৈরি হওয়া সত্ত্বেও যদি মাটির (ঢেলা ইত্যাদির) আঘাতে কষ্ট পায়, তাহলে জ্বিন আগুন থেকে তৈরি হওয়া সত্ত্বেও তাদের আগুন দ্বারা কষ্ট পাওয়া কোন বিচিত্র কথা নয়।
📄 কিতাব ও সুন্নাহ
প্রশ্ন: রেডিও বা টিভিতে কুরআন শুনতে শুনতে খবরের সময় হলে তা শোনা বাদ দিয়ে খবর শোনা হয়। এ কাজ কি কুরআন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার পর্যায়ে পড়ে?
উত্তর: কুরআন যে কোন সময়ে শোনা যায় এবং কোন ব্যক্তি যদি যথাসময়ে কুরআন শোনে অতঃপর খবরের সময় কুরআনের সেন্টার বা চ্যানেল বন্ধ ক'রে খবর শোনে--- যেহেতু খবর নির্দিষ্ট সময়েই হয়, তাহলে তা কুরআন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার পর্যায়ে পড়বে না। (লাদা)
প্রশ্ন: অনেকের রেডিও, টিভি, টেপ বা মোবাইলে কুরআন তিলাঅত চলতে থাকে এবং তারা আপোসে গল্পতে মগ্ন থাকে। এ আচরণ কি ঠিক?
উত্তর: মোটেই ঠিক নয়। কুরআন তিলাঅত হলে নিশ্চুপ শুনতে হবে। গল্প করলে কুরআন তিলাঅত বন্ধ ক'রে দিতে হবে। যেহেতু মহান আল্লাহ বলেন, {وَإِذَا قُرِئَ الْقُرْآنُ فَاسْتَمِعُوا لَهُ وَأَنصِتُوا لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ} (٢٠٤) سورة الأعراف অর্থাৎ, যখন কুরআন পাঠ করা হয়, তখন তোমরা মনোযোগ সহকারে তা শ্রবণ কর এবং নিশ্চুপ হয়ে থাক; যাতে তোমাদের প্রতি দয়া করা হয়। (আ'রাফঃ ২০৪)
প্রশ্নঃ বিতর্কিত সমস্যায় কার সমাধান গ্রহণ করব?
উত্তর: কোন বিষয়ে মতভেদ থাকলে অথবা একই সময়ে দুই আলেমের ভিন্নমুখী ফতোয়া হলে তাঁর ফতোয়া গ্রহণ করতে হবে, যাঁর ফতোয়া কুরআন ও সহীহ সুন্নাহর বেশি নিকটবর্তী মনে করেন। যাঁকে ইল্ম ও তাক্বওয়ায় বেশি বড় মনে হয়। যেমন একই রোগের দুই ডাক্তারের দুই রকম চিকিৎসা-পদ্ধতি ও রায় শোনেন, তাহলে যাঁকে আপনি বড় ও অভিজ্ঞ ডাক্তার মনে করেন, তাঁর চিকিৎসা ও পথ্য গ্রহণ করবেন।
যদি তুলনা করার উপায় না থাকে, তাহলে যাঁর ফতোয়াটা মানার দিক থেকে সহজ, তাঁর ফতোয়া অনুযায়ী আমল করবেন। যেহেতু দ্বীন সহজ। মহান আল্লাহ বলেছেন, {يُرِيدُ اللهُ بِكُمُ الْيُسْرَ وَلَا يُرِيدُ بِكُمُ الْعُسْرَ} (١٨٥) سورة البقرة অর্থাৎ, আল্লাহ তোমাদের (জন্য যা) সহজ (তা) করতে চান, তিনি তোমাদের কষ্ট চান না। (বাক্বারাহঃ ১৮৫) {مَا يُرِيدُ اللَّهُ لِيَجْعَلَ عَلَيْكُم مِّنْ حَرَجٍ} (٦) سورة المائدة অর্থাৎ, আল্লাহ তোমাদেরকে কোন প্রকার কষ্ট দিতে চান না। (মায়িদাহঃ ৬) {وَمَا جَعَلَ عَلَيْكُمْ فِي الدِّينِ مِنْ حَرَجٍ} (۷৮) سورة الحج অর্থাৎ, তিনি দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের উপর কোন কঠিনতা আরোপ করেননি। (হাজ্জঃ ৭৮)
আর মহানবী বলেছেন, يَسِّرُوا وَلَا تُعَسِّرُوا .... অর্থাৎ, সহজ কর, কঠিন করো না।
আবারও বলি যে, এ হল সাধারণ মানুষের জন্য, যারা নিজে দলীল যাচাই-বাছাই করতে পারে না এবং দুই আলেমের মাঝে পার্থক্য নির্ণয় করতে পারে না। পক্ষান্তরে যাদের সে ক্ষমতা আছে, তাদের জন্য অনুসন্ধান চালিয়ে সঠিক সমাধান জেনে নেওয়া জরুরী। (ইউ)
প্রশ্নঃ অনেক শিক্ষিত মুসলিম পরিবার আছে, যারা কুরআন শেখে না, শিখে থাকলেও নিয়মিত তিলাঅত করে না, তিলাঅত করলেও মানে বুঝে (পড়ে) না, বুঝলেও যথাযথভাবে আমল করে না। এদের আলমারী অথবা দেওয়ালের তাকে বড় যত্নের সাথে কুরআন রাখা থাকে। এদের ব্যাপারে উপদেশ কী?
উত্তর: এই শ্রেণীর মুসলিমরা সেই লোকেদের মতো, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ কুরআন বর্জন করার অভিযোগ রয়েছে। মহান আল্লাহ বলেছেন, {وَقَالَ الرَّسُولُ يَا رَبِّ إِنَّ قَوْمِي اتَّخَذُوا هَذَا الْقُرْآنَ مَهْجُورًا} (٣٠) سورة الفرقان অর্থাৎ, রসূল বলে, 'হে আমার প্রতিপালক! আমার সম্প্রদায় তো এ কুরআনকে পরিত্যাজ্য মনে করেছে।' (ফুরক্বান: ৩০) তাদের মধ্যে এমন লোকও থাকতে পারে, যাদের ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেছেন, {وَمَنْ أَعْرَضَ عَن ذِكْرِي فَإِنَّ لَهُ مَعِيشَةً ضَنكًا وَنَحْشُرُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَعْمَى} (١٢٤) طه অর্থাৎ, যে আমার স্মরণ থেকে বিমুখ হবে, অবশ্যই তার হবে সংকীর্ণতাময় জীবন এবং আমি তাকে কিয়ামতের দিন অন্ধ অবস্থায় উত্থিত করব।' (ত্বা-হাঃ ১২৪) {وَعَرَضْنَا جَهَنَّمَ يَوْمَئِذٍ لِّلْكَافِرِينَ عَرْضًا (۱۰۰) الَّذِينَ كَانَتْ أَعْيُنُهُمْ فِي غِطَاء عَن ذِكْرِي وَكَانُوا لا يَسْتَطِيعُونَ سَمْعًا} (۱۰۱) سورة الكهف অর্থাৎ, সেদিন আমি জাহান্নামকে প্রত্যক্ষভাবে উপস্থিত করব সত্য প্রত্যাখ্যানকারীদের নিকট। যাদের চক্ষু ছিল আমার স্মরণ (কুরআন) এর ব্যাপারে অন্ধ এবং যারা শুনতেও ছিল অপারগ। (কাহফঃ ১০০-১০১)
এদের মধ্যে অনেকে দুনিয়াদার, এরা পত্র-পত্রিকা পড়ে, গল্প-উপন্যাস পড়ে, কিন্তু কুরআন পড়ার সময় পায় না। এই শ্রেণীর লোকদের থেকে বিমুখ হতে নির্দেশ রয়েছে, {فَأَعْرِضْ عَن مَّن تَوَلَّى عَن ذِكْرِنَا وَلَمْ يُرِدْ إِلَّا الْحَيَاةَ الدُّنْيَا (۲۹) ذَلِكَ مَبْلَغُهُمْ مِنَ الْعِلْمِ إِنَّ رَبَّكَ هُوَ أَعْلَمُ بِمَنْ ضَلَّ عَنْ سَبِيلِهِ وَهُوَ أَعْلَمُ بِمَنْ اهْتَدَى} (٣٠) سورة النجم অর্থাৎ, অতএব তাকে উপেক্ষা ক'রে চল, যে আমার স্মরণে বিমুখ এবং যে শুধু পার্থিব জীবনই কামনা করে। তাদের জ্ঞানের দৌড় এই পর্যন্ত। নিশ্চয় তোমার প্রতিপালকই ভাল জানেন, কে তাঁর পথ হতে বিচ্যুত এবং তিনিই ভাল জানেন, কে সৎপথপ্রাপ্ত। (নাজম: ২৯-৩০)
অনেকে কুরআনকে কেবল তাবীয ও মৃতের আত্মার কল্যাণে ব্যবহার করে। অথচ কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে জীবিত মানুষের আমলের জন্য। মহান আল্লাহ বলেছেন, {كِتَابٌ أَنزَلْنَاهُ إِلَيْكَ مُبَارَكٌ لِّيَدَّبَّرُوا آيَاتِهِ وَلِيَتَذَكَّرَ أُولُوا الْأَلْبَابِ} (۲۹) سورة ص অর্থাৎ, আমি এ কল্যাণময় গ্রন্থ তোমার প্রতি অবতীর্ণ করেছি, যাতে মানুষ এর আয়াতসমূহ অনুধাবন করে এবং বুদ্ধিমান ব্যক্তিগণ গ্রহণ করে উপদেশ। (স্বাদঃ ২৯) {إِنَّ الَّذِينَ يَتْلُونَ كِتَابَ اللَّهِ وَأَقَامُوا الصَّلَاةَ وَأَنفَقُوا مِمَّا رَزَقْنَاهُمْ سِرًّا وَعَلَانِيَةً يَرْجُونَ تِجَارَةً لَّن تَبُورَ (۲۹) لِيُوَفِّيَهُمْ أُجُورَهُمْ وَيَزِيدَهُم مِّن فَضْلِهِ إِنَّهُ غَفُورٌ شَكُورٌ} (۳۰) سورة فاطر অর্থাৎ, নিশ্চয় যারা আল্লাহর গ্রন্থ পাঠ করে, যথাযথভাবে নামায পড়ে, আমি তাদেরকে যে রুযী দিয়েছি, তা হতে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে; তারাই আশা করতে পারে এমন ব্যবসার যাতে কখনোই নোকসান হবে না। এ জন্য যে, আল্লাহ তাদেরকে (তাদের কর্মের) পূর্ণ প্রতিদান দেবেন এবং তিনি নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে আরও বেশী দেবেন। তিনি তো ক্ষমাশীল, গুণগ্রাহী। (ফাত্বিরঃ ২৯-৩০)
আর মহানবী বলেছেন, "তোমরা কুরআন পাঠ কর। কেননা, তা কিয়ামতের দিন তার পাঠকারীদের জন্য সুপারিশকারীরূপে উপস্থিত হবে।” (মুসলিম ৮০৪ নং)
"যে ব্যক্তি আল্লাহর কিতাব (কুরআন মাজীদ) এর একটি বর্ণ পাঠ করবে, তার একটি নেকী হবে। আর একটি নেকী, দশটি নেকীর সমান হয়। আমি বলছি না যে, 'আলিফ- লাম-মীম' একটি বর্ণ; বরং আলিফ একটি বর্ণ, লাম একটি বর্ণ এবং মীম একটি বর্ণ।” (অর্থাৎ, তিনটি বর্ণ দ্বারা গঠিত 'আলিফ-লাম-মীম, যার নেকীর সংখ্যা হবে ত্রিশ।) (তিরমিযী)
প্রশ্নঃ উম্মতের ইখতিলাফ কি রহমত?
উত্তর: উম্মতের ইখতিলাফ রহমত নয়। বরং ইবনে মাসউদ বলেছেন, 'ইখতিলাফ খারাপ জিনিস।' (আবু দাউদ ১৯৬০নং) ইখতিলাফ হলে কিতাব ও সুন্নাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করা ওয়াজেব। আর সাহাবাদের ইখতিলাফ ইজতিহাদী। আর ইজতিহাদে ভুল করলেও একটি সওয়াব। কিন্তু ভুল তো ভুলই। সঠিকতা জানার পর আর ইজতিহাদী ভুল বা ইখতিলাফে পড়ে থাকা বৈধ নয়? পরন্ত 'ইখতিলাফ উম্মাতী রাহমাহ' হাদীস সহীহ নয়। (বানী)
📄 দ্বীন
প্রশ্নঃ দ্বীনে মধ্যমপন্থা কী?
উত্তর: দ্বীন মানতে কিছু লোক চরমপন্থী আছে, কিছু আছে নরম ও ঢিলেপন্থী এবং কিছু আছে মধ্যমপন্থী। কেউ দ্বীন ও ইবাদতের ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি ও অতিরঞ্জন করে, সহজটাকে কঠিন করে এবং কেউ একেবারে ঢিলেমি করে, অবজ্ঞা ও অবহেলা করে এবং কঠিনটাকে সহজ মনে করে। অথচ প্রত্যেক জিনিসের মাঝামাঝিটাই ঠিক।
আমাদের দ্বীনই হল মধ্যমপন্থী। তাতে অতিরঞ্জন নেই। মহানবী ও তাঁর সাহাবাবর্গের পথই হল মধ্যমপন্থা। মহানবী-এর তরীকাই হল মাঝামাঝি আচরণ। আনাস বলেন যে, তিন ব্যক্তি নবী-এর স্ত্রীদের বাসায় এলেন। তাঁরা নবী- এর ইবাদত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন। অতঃপর যখন তাঁদেরকে এর সংবাদ দেওয়া হল তখন তাঁরা যেন তা অল্প মনে করলেন এবং বললেন, 'আমাদের সঙ্গে নবী-এর তুলনা কোথায়? তাঁর তো আগের ও পরের সমস্ত গোনাহ মোচন ক'রে দেওয়া হয়েছে। (সেহেতু আমাদের তাঁর চেয়ে বেশী ইবাদত করা প্রয়োজন)।' সুতরাং তাঁদের মধ্যে একজন বললেন, 'আমি সারা জীবন রাতভর নামায পড়ব।' দ্বিতীয়জন বললেন, 'আমি সারা জীবন রোযা রাখব, কখনো রোযা ছাড়ব না।' তৃতীয়জন বললেন, 'আমি নারী থেকে দূরে থাকব, জীবনভর বিয়েই করব না।' অতঃপর রাসূলুল্লাহ তাঁদের নিকট এলেন এবং বললেন, "তোমরা এই এই কথা বলেছ? শোনো! আল্লাহর কসম! আমি তোমাদের চেয়ে বেশী আল্লাহকে ভয় করি, তার ভয় অন্তরে তোমাদের চেয়ে বেশী রাখি। কিন্তু আমি (নফল) রোযা রাখি এবং রোযা ছেড়েও দিই, নামায পড়ি এবং নিদ্রাও যাই। আর নারীদের বিয়েও করি। সুতরাং যে আমার সুন্নত হতে মুখ ফিরিয়ে নিবে, সে আমার দলভুক্ত নয়।" (বুখারী-মুসলিম)
সুতরাং তাঁর তরীকাতেই রয়েছে মধ্যমপন্থী আচরণ। তিনি বলেছেন, “নিশ্চয় দ্বীন সহজ। যে ব্যক্তি অহেতুক দ্বীনকে কঠিন বানাবে, তার উপর দ্বীন জয়ী হয়ে যাবে। (অর্থাৎ মানুষ পরাজিত হয়ে আমল ছেড়ে দেবে।) সুতরাং তোমরা সোজা পথে থাক এবং (ইবাদতে) মধ্যমপন্থা অবলম্বন কর। তোমরা সুসংবাদ নাও। আর সকাল-সন্ধ্যা ও রাতের কিছু অংশে ইবাদত করার মাধ্যমে সাহায্য নাও।” (বুখারী)
বুখারীর অন্য এক বর্ণনায় আছে, "তোমরা সরল পথে থাকো, মধ্যমপন্থা অবলম্বন কর, সকাল-সন্ধ্যায় চল (ইবাদত কর) এবং রাতের কিছু অংশে। আর তোমরা মধ্যমন্থা অবলম্বন কর, মধ্যমন্থা অবলম্বন কর, তাহলেই গন্তব্যস্থলে পৌঁছে যাবে।" যারা ঢিলেপন্থী, তারা সুন্নতের উপর আমল করে না, নফল আদায় করতে সচেষ্ট হয় না, বরং অনেক সময় ফরয আদায়েও শৈথিল্য করে।
উদাহরণ স্বরূপঃ-
(ক) একটি লোক ফাসেক (পাপাচার), সে কাবীরা গোনাহ করে, কিন্তু নামায পড়ে এবং শির্ক করে না। চরমপন্থী বলে, 'আমি তাকে সালাম করব না, তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করব, তার সাথে কথা বলব না।'
নরমপন্থী বলে, 'পাপকে ঘৃণা কর, পাপীকে নয়। আমি তাকে সালাম করব, তার সাথে সুসম্পর্ক রাখব, তার সাথে হেসে-খেলে উঠাবসা করব।'
আর মধ্যমপন্থী বলে, 'আমি তার পাপের জন্য তাকে ঘৃণা করব এবং ঈমানের জন্য ভালোবাসব। তাকে বর্জন করায় যদি কোন উপকার থাকে, তাহলে তাকে বর্জন করব।'
(খ) চরমপন্থী লোক স্ত্রীকে চরণের দাসী মনে করে। নরমপন্থী তাকে নিজের প্রভু মনে করে, বানরের মতো তার কথায় ওঠ-বস করে। আর মধ্যমপন্থী তাকে বন্ধু মনে করে। সে জানে,
{وَلَهُنَّ مِثْلُ الَّذِي عَلَيْهِنَّ بِالْمَعْرُوفِ وَلِلرِّجَالِ عَلَيْهِنَّ دَرَجَةٌ وَاللَّهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ} (۲۲۸)
অর্থাৎ, নারীদের তেমনি ন্যায়-সঙ্গত অধিকার আছে যেমন আছে তাদের উপর পুরুষদের। কিন্তু নারীদের উপর পুরুষদের কিছুটা মর্যাদা আছে। আল্লাহ মহাপরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। (বাক্বারাহঃ ২২৮)
রাসূলুল্লাহ বলেছেন, "কোন ঈমানদার পুরুষ যেন কোন ঈমানদার নারী (স্ত্রীকে) ঘৃণা না করে। যদি সে তার একটি আচরণে অসন্তুষ্ট হয়, তবে অন্য আচরণে সন্তুষ্ট হবে।” (মুসলিম)
প্রশ্ন: মহান আল্লাহ যে জিনিসকে হালাল করেছেন, তা হারাম এবং যে জিনিসকে হারাম করেছেন, তা হালাল করার ব্যাপারে কোন ইমাম, আলেম বা সরকারের আনুগত্য করা কী?
উত্তর: এই শ্রেণীর আনুগত্য তিনভাবে হতে পারে:-
(ক) আল্লাহর বিধানে অসন্তোষ প্রকার ক'রে অথবা তা অপছন্দ ক'রে গায়রুল্লাহর বিধানকে পছন্দ ক'রে তার আনুগত্য করা। এর ফলে মুসলিম 'কাফের' হয়ে যায়। যেহেতু মহান আল্লাহ বলেছেন,
{ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ كَرِهُوا مَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأَحْبَطَ أَعْمَالَهُمْ} (۹) سورة محمد
অর্থাৎ, এটা এ জন্যে যে, আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, তারা তা অপছন্দ করে। সুতরাং আল্লাহ তাদের কর্মসমূহ নিষ্ফল ক'রে দেবেন। (মুহাম্মাদঃ ৯) আর এ কথা বিদিত যে, একমাত্র কাফেরদেরই যাবতীয় আমল নিষ্ফল করা হয়।
(খ) গায়রুল্লাহর বিধানের আনুগত্য করে। তবে এ কথা মনে-প্রাণে বিশ্বাস রাখে যে, আল্লাহর বিধানই সর্বশ্রেষ্ঠ এবং মানুষের জন্য অধিক কল্যাণকর। কিন্তু কোন কুপ্রবৃত্তিবশে, কোন লোভ বা লাভের খাতিরে গায়রুল্লাহর বিধানের আনুগত্য করে। এ আনুগত্যে মুসলিম 'কাফের' হবে না। যেহেতু সে আল্লাহর বিধানকে অস্বীকার ও প্রত্যাখ্যান করে না। বরং স্বার্থবশে তা পালন করে না। সুতরাং তাকে ফাসেক বলা যাবে।
(গ) না জেনে গায়রুল্লাহর বিধানের আনুগত্য করে। অথবা সে মনে করে যে, সেটাই আল্লাহর বিধান। এ ক্ষেত্রে দুই অবস্থা হতে পারে:-
এক: তার পক্ষে আল্লাহর বিধান জানা সম্ভব। কিন্তু সে জানার চেষ্টা করে না। অথচ মহান আল্লাহ অজানা বিধান উলামার নিকট জিজ্ঞাসা ক'রে জেনে নিতে আদেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন,
{فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِن كُنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ} (٤٣) سورة النحل، الأنبياء 7
অর্থাৎ, তোমরা যদি না জান, তাহলে জ্ঞানীদেরকে জিজ্ঞাসা কর; (নাহল: ৪৩, আম্বিয়া: ৭) এ অবস্থায় সে গোনাহগার হবে।
দুই: তার পক্ষে আল্লাহর বিধান জানা সম্ভব নয়। সুতরাং সে কোন আলেম, নেতা বা সরকারের অন্ধানুকরণ করে। এমতাবস্থায় তার কোন অপরাধ হবে না। যেহেতু মহানবী বলেছেন,
« مَنْ أُفْتِيَ بِغَيْرِ عِلْمٍ كَانَ إِثْمُهُ عَلَى مَنْ أَفْتَاهُ ».
অর্থাৎ, যে ব্যক্তিকে বিনা ইল্মে (ভুল) ফতোয়া দেওয়া হয়, তার পাপ বর্তে মুফতীর উপর। (আবু দাউদ ৩৬৫৭, ইবনে মাজাহ ৫৭, দারেমী ১৫৯নং) এ অবস্থায় যদি অন্ধানুকরণকারীর অপরাধ গণ্য করা হয়, তাহলে তাতে বড় সমস্যা দেখা দেবে এবং ভুলের আশঙ্কায় কেউ কোন আলেমের কথায় ভরসাই রাখবে না। (ইউ)
প্রশ্নঃ যে ব্যক্তি শরীয়তের কোন বিধানকে 'অচল' বা 'বস্তাপচা' মনে করে, সে ব্যক্তির বিধান কী?
উত্তর: সে ব্যক্তি কাফের। যেহেতু শরীয়তের কোন বিধান অচল ও বস্তাপচা নয়। শরীয়তের বিধান বুঝার জন্য অথবা তা বহাল করার জন্য মানুষের বিবেক-বুদ্ধি অচল হতে পারে। কিন্তু সে বিধান শাশ্বত, চিরন্তন ও কালজয়ী। (ইবা)
প্রশ্নঃ যে ব্যক্তি মনে করে, নারী-পুরুষের সমান অধিকার না দিয়ে ইসলাম নারীর প্রতি যুলুম করেছে, সে ব্যক্তির বিধান কী?
উত্তর: ইসলাম নারীকে পুরুষের সমান অধিকার না দিলেও, তাকে তার যথাযথ অধিকার দান করেছে। ইসলাম তার প্রতি কোন অন্যায় করেনি। ইসলামের এ অধিকার বণ্টনকে যদি কেউ অস্বীকার করে এবং অন্যায় ও অবিচার মনে করে, তাহলে সে কাফের। (ইবা)