📘 দ্বীনি প্রশ্ন উত্তর 📄 আক্বীদাহ ও তাওহীদ

📄 আক্বীদাহ ও তাওহীদ


প্রশ্ন: মহান আল্লাহ কোথায় আছেন?
উত্তর: মহান আল্লাহ আছেন সাত আসমানের ঊর্ধ্বে আরশের উপরে। তিনি বলেছেন, الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى} (٥) سورة طه অর্থাৎ, পরম দয়াময় আরশে সমাসীন। (ত্বা-হাঃ ৫)
তিনি স্রষ্টা, সৃষ্টি থেকে ঊর্ধ্বে থাকেন। তবুও তিনি বান্দার নিকটবর্তী। তাঁর জ্ঞান ও দৃষ্টি সর্বত্র আছে। মু'মিনের হৃদয়ে তাঁর যিক্র বা স্মরণ থাকে।

প্রশ্ন: মহান আল্লাহ কি নিরাকার, নাকি তাঁর আকার আছে?
উত্তর: মহান আল্লাহর আকার আছে। তিনি নিরাকার নন। তবে সেই আকার কেমন, তা কেউ জানে না। তিনি বলেছেন, {لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ البَصِيرُ} (۱۱) سورة الشورى অর্থাৎ, কোন কিছুই তাঁর সদৃশ নয়। তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা। (শূরাঃ ১১) তাঁকে বেহেশতে দেখা যাবে। তাঁর দীদারই হবে বেহেশতের সবচেয়ে বড় সুখ। মহানবী স্বপ্নে আল্লাহকে দেখেছেন। তিনি বলেছেন, (رَأَيْتُ رَبِّي فِي أَحْسَنِ صُورَةٍ). অর্থাৎ, আমি আমার প্রতিপালককে সবচেয়ে সুন্দর আকৃতিতে দর্শন করেছি। (আহমাদ, তিরমিযী, সহীহুল জামে' ৫৯নং) আর যা দেখা যায়, তা নিরাকার নয়।

প্রশ্নঃ যে মসজিদে কবর আছে, সে মসজিদে নামায হয় না। মসজিদে কবর দেওয়া অথবা কবরের উপরে মসজিদ বানানো বৈধ নয় কেন? অথচ মহানবী-এর কবর মসজিদে নববীর ভিতরে রয়েছে。
উত্তর: বৈধ নয়, যেহেতু মহানবী তা নিষেধ ক'রে গেছেন। আর তাঁর কবর মসজিদের ভিতরে মনে হলেও তাতে কিন্তু বৈধতার দলীল নেই। কারণঃ-
প্রথমতঃ মসজিদে নববী নবী নিজে বানিয়েছেন। সুতরাং তাঁর কবরের উপরে মসজিদ হয়নি।
দ্বিতীয়তঃ তাঁর ইন্তিকালের পর তাঁর কবর মসজিদে হয়নি। বরং তাঁর কবর হয়েছিল মা আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহার ঘরের ভিতরে।
তৃতীয়তঃ মসজিদে নববী সম্প্রসারণের সময় মা আয়েশার ঘর যখন মসজিদের শামিলে আনা হয়, তখন তা সাহাবাগণের ঐক্যমতে ছিল না। বরং সেই সময় অধিকাংশ সাহাবা পরলোকগত। আর তা ছিল প্রায় ৯৪ হিজরীতে। যে সকল সাহাবা তখন বর্তমান ছিলেন, তাঁদের মধ্যে অনেকেই সে কাজের প্রতিবাদ করেছেন। তাবেঈনদের মধ্যে যাঁরা প্রতিবাদ করেছেন, তাঁদের মধ্যে সাঈদ বিন মুসাইয়িব অন্যতম।
চতুর্থতঃ মা আয়েশার হুজরা মসজিদে শামিল হওয়ার পরেও কবর মসজিদে নয়। বরং তা পৃথক কক্ষে সংরক্ষিত আছে। তিন-তিনটি দেওয়াল ও রেলিং দিয়ে তা পৃথক করা আছে। ভিতরের দেওয়াল দেওয়া আছে তিনকোণা আকারে, যাতে তার পশ্চাতে কেউ নামায পড়তে দাঁড়ালে সরাসরি কবর সামনে না পড়ে।
বলা বাহুল্য, মহানবী-এর কবর দেখে মসজিদের ভিতর কবর দেওয়ার বৈধতার দলীল পেশ করা শুদ্ধ নয়। (ইউ)

প্রশ্ন: আহলে কিতাব (ইয়াহুদী-খ্রিস্টান) কি কাফের?
উত্তর: মহান আল্লাহই তাদেরকে মুশরিক ও কাফের গণ্য করেছেন। তিনি বলেছেন, {وَقَالَتِ الْيَهُودُ عُزَيْرٌ ابْنُ اللهِ وَقَالَتْ النَّصَارَى الْمَسِيحُ ابْنُ اللَّهِ ذَلِكَ قَوْلُهُم بأَفْوَاهِهِمْ يُضَاهِؤُونَ قَوْلَ الَّذِينَ كَفَرُوا مِن قَبْلُ قَاتَلَهُمُ اللَّهُ أَنَّى يُؤْفَكُونَ (۳۰) اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِّن دُونِ اللَّهِ وَالْمَسِيحَ ابْنَ مَرْيَمَ وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا إِلَهَا وَاحِدًا لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ سُبْحَانَهُ عَمَّا يُشْرِكُونَ) (۳۱) سورة التوبة অর্থাৎ, আর ইয়াহুদীরা বলে, 'উযাইর আল্লাহর পুত্র' এবং খ্রিষ্টানরা বলে, 'মসীহ আল্লাহর পুত্র।' এটা তাদের মুখের কথা মাত্র (বাস্তবে তা কিছুই নয়)। তারা তো তাদের মতই কথা বলছে, যারা তাদের পূর্বে অবিশ্বাস করেছে। আল্লাহ তাদেরকে ধ্বংস করুন, তারা উল্টা কোন্ দিকে যাচ্ছে! তারা আল্লাহকে ছেড়ে নিজেদের পন্ডিত-পুরোহিতদেরকে প্রভু বানিয়ে নিয়েছে এবং মারয়‍্যামের পুত্র মসীহকেও। অথচ তাদেরকে শুধু এই আদেশ করা হয়েছিল যে, তারা শুধুমাত্র একক উপাস্যের উপাসনা করবে, যিনি ব্যতীত (সত্য) উপাস্য আর কেউই নেই, তিনি তাদের অংশী স্থির করা হতে পবিত্র। (তাওবাহঃ ৩০-৩১) لْقَدْ كَفَرَ الَّذِينَ قَالُوا إِنَّ اللَّهَ هُوَ الْمَسِيحُ ابْنُ مَرْيَمَ } (۱۷) سورة المائدة و ۷۲ অর্থাৎ, নিশ্চয় তারা অবিশ্বাসী (কাফের), যারা বলে, 'মারয়‍্যাম-তনয় মসীহই আল্লাহ।' (মায়িদাহঃ ১৭, ৭২) আর মহানবী বলেছেন, (وَالَّذِي نَفْسُ مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ لَا يَسْمَعُ بِى أَحَدٌ مِنْ هَذِهِ الأُمَّةِ يَهُودِي وَلَا نَصْرَانِي ثُمَّ يَمُوتُ وَلَمْ يُؤْمِنْ بِالَّذِي أُرْسِلْتُ بِهِ إِلَّا كَانَ مِنْ أَصْحَابِ النَّارِ). অর্থাৎ, সেই সত্তার কসম, যাঁর হাতে আমার প্রাণ আছে! এই উম্মতের যে কেউ, ইয়াহুদী অথবা খ্রিস্টান আমার কথা শুনবে, অতঃপর সে আমি যা দিয়ে প্রেরিত হয়েছি, তার প্রতি ঈমান না এনে মারা যাবে, সে জাহান্নামবাসী হবে। (মুসলিম) সুতরাং রাজনৈতিক তোষামদির কারণে কাফেরকে কাফের মনে না করা, কাফেরদের ভজনালয়কে আল্লাহর ঘর ধারণা করা কুফরী। (ইউ)

প্রশ্নঃ কবরপূজা কি ইসলামের শরীয়ত-সমর্থিত?
উত্তর: না। কবরপূজা, আস্তানাপূজা ইত্যাদি ইসলামে কোন পূজা নেই। ইসলামে আছে ইবাদত। আর তা কেবলমাত্র মহান আল্লাহর জন্য। কবরপূজা মূর্তিপূজার শামিল। কবরকে কেন্দ্র ক'রে তাওয়াফ করা, নযর বা মানত মানা, কবরকে সিজদা করা, কবরবাসীর কাছে প্রার্থনা বা কামনা করা ইত্যাদি শির্কে আকবার। এমন কাজে মুসলিম ইসলাম থেকে খারিজ হয়ে যায়। কবরকে উঁচু করা, কবর বাঁধানো, রঙ করা, তার উপর চাদর চড়ানো, তার উপর ঘর বা গম্বুজ নির্মাণ করা, কবরের পাশে বাতি বা ধূপধুনো দেওয়া, উরস করা ইত্যাদিতেও ইসলামের অনুমোদন নেই। (বিস্তারিত তাওহীদের পুস্তকাবলীতে দ্রষ্টব্য)

প্রশ্ন: আল্লাহর নবী কি হাযির-নাযির?
উত্তর: আল্লাহর নবী-এর ইন্তিকালের পর তাঁর দেহ মা আয়েশার ঘরে সমাহিত আছে এবং তাঁর রূহ আছে জান্নাতে। সে এক ভিন্ন জগৎ। সে (মধ্য) জগৎ ও এ (পার্থিব) জগতের মাঝে আছে যবনিকা। সে জগৎ থেকে তিনি এ জগতের কোথাও হাযির (উপস্থিত) ও নাযির (পরিদর্শক) বা বিরাজমান হতে পারেন না। তিনি না বিদআতী মীলাদের সময়, আর না অন্য কোন শুভ সন্ধিক্ষণে এসে উপস্থিত হতে পারেন। সে জগৎ থেকে তিনি এ জগতের কোন খবরও জানতে পারেন না। ভক্তির আতিশয্যে শুধু বিশ্বাস করলেই হয় না, বাস্তবে তার দলীল-প্রমাণ থাকা আবশ্যক।
প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে, মহান আল্লাহও সর্বত্র বিরাজমান নন। বরং তাঁর জ্ঞান, দৃষ্টি ও সাহায্য গগণে-ভুবনে সর্বত্র আছে। আর তিনি আছেন সকল সৃষ্টির ঊর্ধ্বে আরশের উপরে।

প্রশ্নঃ 'ইয়া রাসূলাল্লাহ', 'ইয়া আলী', বা 'ইয়া জীলানী' বলা বৈধ কি?
উত্তর: উদ্দেশ্য যদি আপদে-বিপদে আহবান বা সাহায্য প্রার্থনা করা হয়, তাহলে তা শির্কে আকবার। এমন শির্ক মুসলিমকে ইসলাম থেকে খারিজ ক'রে দেয়। মহান আল্লাহ বলেন, {أَمَّن يُجِيبُ الْمُضْطَرَّ إِذَا دَعَاهُ وَيَكْشِفُ السُّوءَ وَيَجْعَلُكُمْ خُلَفَاءِ الْأَرْضِ أَإِلَهُ مَّعَ اللَّهِ قَلِيلًا مَّا تَذَكَّرُونَ} (٦٢) سورة النمل অর্থাৎ, অথবা তিনি, যিনি আর্তের আহবানে সাড়া দেন, যখন সে তাঁকে ডাকে এবং বিপদ-আপদ দূরীভূত করেন এবং তোমাদেরকে পৃথিবীর প্রতিনিধি করেন। আল্লাহর সঙ্গে অন্য কোন উপাস্য আছে কি? তোমরা অতি সামান্যই উপদেশ গ্রহণ ক'রে থাক। (নাম্ল : ৬২)
মহানবী বলেন, "যখন তুমি চাইবে, তখন আল্লাহর কাছেই চেয়ো। আর যখন তুমি প্রার্থনা করবে, তখন একমাত্র আল্লাহর কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করো।” (তিরমিযী)

প্রশ্ন: মহানবী কি আমাদের মতো মানুষ ছিলেন?
উত্তর: মহানবী আমাদের মত রক্ত, মাংস ও অস্থির গড়া মানুষ ছিলেন। আমাদের মত পিতার ঔরসে ও মাতার গর্ভে তাঁর জন্ম হয়েছিল। আমাদের মত তিনি খেতেন, পান করতেন। সুস্থ-অসুস্থ থাকতেন। বিস্মৃত হতেন, স্মরণ করতেন। বিবাহ-শাদী করেছেন, তাঁর একাধিক স্ত্রী ছিল। তিনি সন্তানের জনক ছিলেন। ব্যবসা-বাণিজ্য করতেন। দুঃখ-শোক, ব্যথা ও যন্ত্রণা অনুভব করতেন। তাঁর প্রস্রাব-পায়খানা হত এবং তা অপবিত্র ছিল। তাঁর নাপাকীর উযু-গোসলের প্রয়োজন হতো। (তিরমিযী ২৪৯ ১নং) জীবিত ছিলেন, ইন্তিকাল করেছেন। মানুষের সকল প্রকৃতি ও প্রয়োজন তাঁর মাঝে ছিল। মহান আল্লাহ তাঁর নবী-কে বলেছেন, {قُلْ إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ مِّثْلُكُمْ يُوحَى إِلَيَّ أَنَّمَا إِلَهُكُمْ إِلَهٌ وَاحِدٌ} (১১০) سورة الكهف {وَمَنْ أَضَلُّ مِمَّن يَدْعُو مِن دُونِ اللَّهِ مَن لَّا يَسْتَجِيبُ لَهُ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ وَهُمْ عَن دُعَائِهِمْ غَافِلُونَ} (৫) سورة الأحقاف অর্থাৎ, সে ব্যক্তি অপেক্ষা অধিক বিভ্রান্ত কে, যে আল্লাহর পরিবর্তে এমন কিছুকে ডাকে, যা কিয়ামত দিবস পর্যন্তও তার ডাকে সাড়া দেবে না? আর তারা তাদের ডাক সম্বন্ধে অবহিতও নয়। (আহক্বাফঃ ৫)
প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে, কোন সৃষ্টির কাছে সাহায্য প্রার্থনার আহবান তিন শর্তে বৈধ:- ১। যার নিকট সাহায্য চাওয়া হবে, তাকে পার্থিব জীবনে জীবিত থাকতে হবে। ২। তাকে উপস্থিত বা আহবান শুনতে পাচ্ছে এমন অবস্থায় থাকতে হবে। ৩। যে সাহায্য চাওয়া হচ্ছে, সে সাহায্য করার মতো তার ক্ষমতা থাকতে হবে। (দলীল 'তাওহীদ-কৌমুদী'তে দ্রঃ)

প্রশ্ন: আল্লাহ ছাড়া কেউ কি 'বিপত্তারণ' বা 'গওস পাক' আছে?
উত্তর: আল্লাহ ছাড়া কেউ 'বিপত্তারণ' বা 'গওস' নেই। সুতরাং বিপদে একমাত্র আল্লাহকেই ডাকতে হবে, একমাত্র তাঁরই কাছে সাহায্য চাইতে হবে। বিপদে 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, ইয়া আলী, ইয়া জীলানী' বলে সাহায্য চাওয়া শির্কে আকবার। মহান আল্লাহ বলেন, অর্থাৎ, তুমি বল, 'আমি তো তোমাদের মতই একজন মানুষ; আমার প্রতি প্রত্যাদেশ হয় যে, তোমাদের উপাস্যই একমাত্র উপাস্য; সুতরাং যে তার প্রতিপালকের সাক্ষাৎ কামনা করে, সে যেন সৎকর্ম করে এবং তার প্রতিপালকের ইবাদতে কাউকেও শরীক না করে।' (কাহফঃ ১১০, হা-মীম সাজদাহঃ ৬)
পক্ষান্তরে কোন মানুষই তাঁর মতো (সমান) নয়। আমরা তাঁর মতো মানুষ নই। অতিপ্রাকৃত বিষয়ে কেউই তাঁর মতো নয়। তিনি একটানা রোযা রাখতেন। সাহাবীগণ তাঁর মতো রাখতে চাইলেন। তিনি বললেন, 'এ বিষয়ে তোমরা আমার মতো নও। আমি তো রাত্রি অতিবাহিত করি, আর আমার প্রতিপালক আমাকে পানাহার করান।' (মুসলিম ১১০৩, মিশকাত ১৯৮৬ নং) তাঁর দেহের ঘাম ছিল শ্রেষ্ঠ সুগন্ধি। একদা তিনি উম্মে সুলাইম (রাযিয়াল্লাহু আনহা)র ঘরে এসে শুয়ে ঘুমিয়ে গেলেন। তিনি ঘর্মাক্ত হলে উম্মে সুলাইম সেই ঘাম জমা করতে লাগলেন। তিনি জেগে উঠে তা দেখে জিজ্ঞাসা করলেন, 'কী ব্যাপার উম্মে সুলাইম?' বললেন, 'আপনার ঘাম। আমাদের সুগন্ধিতে মিশিয়ে দেব। আর তা হবে শ্রেষ্ঠ সুগন্ধি।' (মুসলিম ৬২০ ১নং) তিনি বিশেষ ক'রে নামাযে সামনে যেমন দেখতেন, তেমনি পিছনেও দেখতেন। একদা এক নামাযের সালাম ফিরে তিনি বললেন, "তোমরা তোমাদের রুকু ও সিজদাকে পরিপূর্ণরূপে আদায় কর। সেই সত্তার শপথ! যাঁর হাতে আমার প্রাণ আছে, আমার নিকট তোমাদের রুকু, সিজদাহ ও বিনয়-নম্রতা অস্পষ্ট নয়। আমি আমার পিঠের পিছন থেকে দেখতে পাই, যেমন সামনে দেখতে পাই। (আহমাদ ৯৭৯৬, বুখারী ৪১৮, মুসলিম ৯৮৬, হাকেম ১/৩৬১, ইবনে খুযাইমা ৪৭৪, মিশকাত ৮৬৮-নং) তাঁর চক্ষু নিদ্রাভিভূত হতো, কিন্তু হৃদয় নিদ্রাভিভূত হতো না। (বুখারী ৮৫৯, ১১৪৭, মুসলিম ১৭৫৭, ১৮-২৬, আবু দাউদ ২০২, তিরমিযী ৪৩৯, নাসাঈ १६৯৭নং) তাঁর দেহ ও দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন চুল, থুথু, তাঁর ব্যবহৃত জিনিস ইত্যাদি বর্কতময় ছিল। (বুখারী, মুসলিম ৩২ ১৩নং)

প্রশ্ন: মহানবী কি মাটির তৈরি ছিলেন, নাকি নূরের তৈরি ছিলেন?
উত্তর: নূরের তৈরি ফিরিস্তামন্ডলী। মহানবী আদমের অন্যতম সন্তান। সুতরাং তাঁরও আদিসৃষ্টি মাটি থেকেই। তিনি আল্লাহর তরফ থেকে অন্ধকারে নিমজ্জিত পথভ্রষ্ট মানুষের জন্য প্রেরিত নূর (জ্যোতি বা আলো) ছিলেন। সেই নূর বা আলোতে জাহেলিয়াতের তমসাচ্ছন্ন যুগ ও সমাজ আলোকিত হল। অন্ধকারে দিশাহারা মানুষ সেই আলোকবর্তিকায় সরল পথের দিশা পেল। তাঁর দেহ নূরানী ছিল, কিন্তু তিনি নূর বা নূর থেকে সৃষ্টি ছিলেন না। মহান আল্লাহর সৃষ্টি বৃত্তান্তে একমাত্র ফিরিশাই নূর থেকে সৃষ্টি। আর নবী মুস্তফা ফিরিশাও ছিলেন না। (কুরআন ৬/৫০) সর্বপ্রথম আল্লাহপাক আরশ ও কলম সৃষ্টি করেন। (আহমাদ ৫/৩১৭) নূরে মুহাম্মাদী আল্লাহর প্রথম সৃষ্টি নয়। পক্ষান্তরে যে হাদীসে নূরে মুহাম্মাদীর কথা বলা হয়েছে, তা জাল বা বাতিল হাদীস।

প্রশ্নঃ যারা 'নবী'কে খোদ 'খোদা' বলে বিশ্বাস রাখে, তাদের বিধান কী?
উত্তর: তারা খ্রিস্টানদের মতো কাফের। মহান আল্লাহ বলেছেন, {لَقَدْ كَفَرَ الَّذِينَ قَالُوا إِنَّ اللهَ هُوَ الْمَسِيحُ ابْنُ مَرْيَمَ وَقَالَ الْمَسِيحُ يَا بَنِي إِسْرَائِيلَ اعْبُدُوا اللَّهَ رَبِّي وَرَبَّكُمْ إِنَّهُ مَن يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدْ حَرَّمَ اللَّهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ وَمَأْوَاهُ النَّارُ وَمَا لِلظَّالِمِينَ مِنْ أَنصَارٍ} অর্থাৎ, তারা নিঃসন্দেহে কাফের, যারা বলে, 'আল্লাহই মারয়‍্যাম-তনয় মসীহ।' অথচ মসীহ বলেছিল, 'হে বনী ইস্রাঈল! তোমরা আমার প্রতিপালক ও তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহর উপাসনা কর। অবশ্যই যে কেউ আল্লাহর অংশী করবে, নিশ্চয় আল্লাহ তার জন্য বেহেশ্ নিষিদ্ধ করবেন ও দোযখ তার বাসস্থান হবে এবং অত্যাচারীদের জন্য কোন সাহায্যকারী নেই।' (মায়িদাহঃ ৭২)

প্রশ্নঃ নবীর জন্য সারা বিশ্বজগৎ সৃষ্টি হয়েছে।---এ ধারণা কি সঠিক।
উত্তর: মোটেই না। 'লাওলাক'-এর হাদীস মনগড়া। ভক্তির আতিশয্যে মানুষ এমন অত্যুক্তি রচনা ক'রে প্রচার করেছে। মহান আল্লাহ এ বিশ্ব রচনা করেছেন তাঁর ইবাদতের জন্য। তিনি বলেছেন, {وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ} (٥٦) سورة الذاريات অর্থাৎ, আমি সৃষ্টি করেছি জ্বিন ও মানুষকে কেবল এ জন্য যে, তারা আমারই ইবাদত করবে। (যারিয়াত: ৫৬) আর নবী পাঠিয়েছেন সেই ইবাদতের পদ্ধতি বাতলে দেওয়ার জন্য।

প্রশ্ন: নবী-অলীর অসীলায় দুআ করা যায় কি?
উত্তর: না। নবী-অলীর অসীলায় দুআ করা যায় না। মহান আল্লাহ আমাদেরকে সরাসরি দুআ করতে নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, {وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِي عَنِّي فَإِنِّي قَرِيبٌ أُجِيبُ دَعْوَةَ الدَّاعِ إِذَا دَعَانِ فَلْيَسْتَجِيبُوا لِي وَلْيُؤْمِنُوا بِي لَعَلَّهُمْ يَرْشُدُونَ} (١٨٦) سورة البقرة অর্থাৎ, আর আমার দাসগণ যখন আমার সম্বন্ধে তোমাকে জিজ্ঞাসা করে, তখন তুমি বল, আমি তো কাছেই আছি। যখন কোন প্রার্থনাকারী আমাকে ডাকে, তখন আমি তার ডাকে সাড়া দিই। অতএব তারাও আমার ডাকে সাড়া দিক এবং আমাতে বিশ্বাস স্থাপন করুক, যাতে তারা ঠিক পথে চলতে পারে। (বাক্বারাহঃ ১৮-৬) আর মুহাম্মাদ-এর অসীলায় আদম-এর দুআ করার কথা প্রমাণিত নয়। পরম্ভ প্রমাণের ভিত্তিতে তিন প্রকার অসীলায় দুআ করা যায়:- ১। মহান আল্লাহর নাম ও গুণাবলীর অসীলায় দুআ। ২। স্বকৃত নেক আমলের অসীলায় দুআ। ৩। জীবিত ও উপস্থিত ব্যক্তির দুআর অসীলায় দুআ। এ সবের দলীল রয়েছে আক্বীদার বইগুলিতে। পক্ষান্তরে শেষ নবী-এর অসীলায় আদম-এর দুআর হাদীস সহীহ নয়। দলীল-সহ সবিস্তার দ্রষ্টব্য 'তাওহীদ-কৌমুদী'।

প্রশ্নঃ হেতুর উপর ভরসা করলে শির্ক কখন হয়?
উত্তর: হেতুর উপর ভরসা তিন প্রকার হতে পারে:- ১। মানুষ এমন হেতুর উপর পরিপূর্ণ ভরসা করে, যা আসলেই কোন হেতু নয়। যেমন সন্তান লাভের হেতু স্বরূপ কুমীর-পীরের উপর ভরসা রাখে। এমন ভরসা শির্কে আকবার, যা করলে মানুষ ইসলাম থেকে খারিজ হয়ে যায়। ২। এমন হেতুর উপর ভরসা করে, যা আসলেই শরয়ী ও শুদ্ধ হেতু। কিন্তু হেতুর সংঘটক ও সৃষ্টিকর্তা আল্লাহকে ভুলে বসে। এ কাজও এক প্রকার শির্ক, তবে তাতে মানুষ দ্বীন থেকে খারিজ হয়ে যায় না। যেমন নিজ রুযী-রুটির ব্যাপারে চাকরি বা ব্যাবসার উপর ভরসা রাখে, আরোগ্যের ব্যাপারে ওষুধের উপর ভরসা রাখে আর রুযীদাতা ও আরোগ্যদাতা যে একমাত্র আল্লাহ এবং চাকরি ও ওষুধ শুধু হেতুমাত্র---তা ভুলে বসে। এটি শির্কে আসগার। ৩। এমন হেতুর উপর ভরসা করে, যা আসলেই শরয়ী ও শুদ্ধ হেতু। কিন্তু হেতুর সংঘটক ও সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর উপরেই পরিপূর্ণ ভরসা রাখে। সে জানে, আল্লাহর ইচ্ছা হলে চাকরি বা ব্যবসার মাধ্যমে রুযী দেবেন, নচেৎ দেবেন না, ওষুধ খেলে আল্লাহর ইচ্ছায় আরোগ্য হবে, নচেৎ হবে না। এমন কাজ তাওহীদ ও তাওয়াক্কুল-বিরোধী নয়। বরং এমন কাজ তাওহীদবাদী মুসলিমের। পূর্ণ ভরসা রাখতে হবে আল্লাহর উপর, কিন্তু সেই সাথে শরয়ী ও শুদ্ধ হেতু বা অসীলাও ব্যবহার করতে হবে। মহানবী মহান আল্লাহর উপর পরিপূর্ণ ভরসা রাখতেন, কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি আঘাত থেকে বাঁচার জন্য শিরস্ত্রাণ ও লৌহবর্ম ব্যবহার করতেন। (ইউ)

প্রশ্নঃ কোন মাযারের জন্য হাঁস-মুরগী বা ফল-ফসল মানত করা বৈধ কি?
উত্তর: কোন মাযার বা পীরের জন্য হাঁস-মুরগী মানত করা, সেখানে তা পেশ করা অথবা যবেহ করা শির্কে আকবার। কারণ নযর ও যবেহ এক প্রকার ইবাদত। আর সে ইবাদত আল্লাহ ছাড়া অন্যের জন্য নিবেদন করা হারাম ও শির্ক।

প্রশ্নঃ মুসলিম হওয়ার জন্য কেবল কালেমা পড়াই কি যথেষ্ট?
উত্তর: অবশ্যই নয়। কালেমা হল ইসলাম-গৃহে প্রবেশ করার চাবি। প্রবেশ করার পরেও এমন কাজ আছে, যা না করলে সে মুসলিম থাকতে পারে না। ঈমানের ছয় রুক্স ছাড়া আরো অনেক কিছুর প্রতি ঈমান জরুরী। প্রকৃত মুসলিম হতে অনেক কিছু করার আছে। মহানবী মুআয-কে ইয়ামান পাঠাবার সময়ে (তাঁর উদ্দেশ্যে) বললেন, "তাদের (ইয়ামানবাসীদেরকে সর্বপ্রথম) এই সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য আহবান জানাবে যে, আল্লাহ ছাড়া কোন সত্য উপাস্য নেই, আর আমি আল্লাহর রসূল। যদি তারা এ কথা মেনে নেয়, তাহলে তাদেরকে জানিয়ে দেবে যে, আল্লাহ তাদের উপর দিবারাত্রে পাঁচ অক্তের নামায ফরয করেছেন। অতঃপর যদি তারা এ কথা মেনে নেয়, তাহলে তাদেরকে জানিয়ে দাও যে, আল্লাহ তাদের উপর যাকাত ফরয করেছেন; যা তাদের মধ্যে যারা (নিসাব পরিমাণ) মালের অধিকারী তাদের নিকট থেকে গ্রহণ করা হবে এবং তাদের দরিদ্র ও অভাবী মানুষদের মাঝে তা বন্টন ক'রে দেওয়া হবে।” (বুখারী ও মুসলিম)

প্রশ্ন: 'জন্মে-জন্মে' বা 'জন্মে-জন্মান্তরে তোমাকে ভালবাসব'---এ বিশ্বাস কি সঠিক?
উত্তর: যে জন্মান্তরবাদে বিশ্বাস রাখে, সে মুসলিম থাকতে পারে না। এ জন্মের পর কেবল একটাই জীবন আছে। আর তা হল হিসাব-নিকাশের জন্য পরকালের পুনরুত্থান। অতঃপর জান্নাত নতুবা জাহান্নাম। মানুষ মারা গেলে পুনরায় মানুষ হয়ে অথবা নিজ কর্ম অনুযায়ী অন্য কোন জীব-জন্ত হয়ে জন্ম গ্রহণ করে, এমন আক্বীদা কুফরী।

প্রশ্ন: জাতীয় পতাকার তা'যীমে তাকে 'সেলুট' করা এবং তার সামনে একাগ্রচিত্তে দন্ডায়মান হওয়া কি মুসলিমের জন্য বৈধ?
উত্তর: মুসলিমের জন্য এ কাজ বৈধ নয়। এ কাজ আসলে অমুসলিমদের। মুসলিম মহান আল্লাহ ছাড়া অন্য কারোর তা'যীম উদ্দেশ্যে একাগ্রচিত্তে দন্ডায়মান হয় না। সুতরাং উক্ত কাজ একটি জঘন্য বিদআত এবং পরিপূর্ণ তাওহীদের পরিপন্থী। (লাদা)

প্রশ্ন: মহান আল্লাহ আমাদেরকে তাঁর প্রতি ঈমানের সাথে তাগুতের প্রতি কুফরী (অর্থাৎ, তাগুতকে অস্বীকার) করতে বলেছেন। কিন্তু 'তাগূত' কাকে বলে?
উত্তর: প্রত্যেক সেই পূজ্যমান উপাস্য যে আল্লাহর পরিবর্তে পূজিত হয় এবং সে তার এই পূজায় সম্মত থাকে অথবা আল্লাহ ও তদীয় রসূলের অবাধ্যতায় প্রত্যেক অনুসৃত বা মানিত ব্যক্তিকেই তাগূত বলা হয়। এ দুনিয়ায় তাগূত বহু আছে। অবশ্য তাদের প্রধান হল পাঁচটি:- (১) শয়তান। (২) আল্লাহর বিধান বিকৃতকারী অত্যাচারী শাসক। (৩) আল্লাহর অবতীর্ণকৃত বিধান ছেড়ে অন্য বিধানানুসারে বিচারকর্তা শাসক। (৪) আল্লাহ ব্যতীত ইলমে গায়েব (গায়েবী বা অদৃশ্য খবর জানার) দাবীদার। (৫) আল্লাহর পরিবর্তে (নযর- নিয়ায, মানত, সিজদা প্রভৃতি দ্বারা) যার পূজা করা ও যাকে (বিপদে) আহবান করা হয় এবং সে এতে সম্মত থাকে。

প্রশ্নঃ তকদীর যদি সত্য হয়, তাহলে কি আমল বৃথা নয়?
উত্তর: না। তকদীর সত্য এবং তদবীরও সঠিক। বান্দা নিজ এখতিয়ারে ভাল-মন্দ কর্ম করে। আর মহান আল্লাহ সেই বান্দা ও তার কর্মের সৃষ্টিকর্তা। বান্দার ভাগ্যে যা লেখা থাকে, তা তার জন্য সহজ হয়ে যায়। মহান আল্লাহ বলেছেন, إِنَّ سَعْيَكُمْ لَشَتَّى (٤) فَأَمَّا مَنْ أَعْطَى وَاتَّقَى (٥) وَصَدَّقَ بِالْحُسْنَى (٦) فَسَنُيَسِّرُهُ لِلْيُسْرَى (۷) وَأَمَّا مَنْ بَخِلَ وَاسْتَغْنَى (۸) وَكَذَّبَ بِالْحُسْنَى (۹) فَسَنُيَسِّرُهُ لِلْعُسْرَى) (۱۰) سورة الليل অর্থাৎ, অবশ্যই তোমাদের কর্মপ্রচেষ্টা বিভিন্নমুখী। সুতরাং যে দান করে ও আল্লাহকে ভয় করে এবং সৎ বিষয়কে সত্যজ্ঞান করে। অচিরেই আমি তার জন্য সুগম ক'রে দেব (জান্নাতের) সহজ পথ। পক্ষান্তরে যে কার্পণ্য করে ও নিজেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ মনে করে। আর সৎ বিষয়কে মিথ্যাজ্ঞান করে, অচিরেই তার জন্য আমি সুগম ক'রে দেব (জাহান্নামের) কঠোর পরিণামের পথ। (লাইলঃ ৪-১০) আর মহানবী বলেছেন, (اعْمَلُوا فَكُلِّ مُيَسَّرٌ لِمَا خُلِقَ لَهُ). অর্থাৎ, তোমরা কাজ ক'রে যাও। যেহেতু যাকে যে জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে, তার জন্য তা সহজ ক'রে দেওয়া হবে। (বুখারী ৪৯৪৯, মুসলিম ৬৯০৩নং)

প্রশ্নঃ এ কথা কি ঠিক যে, যার নাম 'মুহাম্মাদ' হবে সে জান্নাতী হবে এবং তাকে গালি দেওয়া ও প্রহার করা যাবে না?
উত্তর: এ কথা আদৌ সঠিক নয়। কারো নাম বা বংশ তাকে সম্মান ও মুক্তি দিতে পারে না। আসলে উক্ত কথা নবী-এর নাম নিয়ে অতিরঞ্জন ও মনগড়া অত্যুক্তি ছাড়া কিছু নয়। (ইবা) অনুরূপ এ কথাও মনগড়া যে, যে মেয়ের নাম 'মারয়‍্যাম', 'মারিয়াম' বা 'মরিয়ম' হবে সে জাহান্নামে যাবে না। কারণ তা এক নবীর মায়ের নাম।

প্রশ্ন: মানুষের মতো জ্বিনদেরও জান্নাত-জাহান্নাম আছে। কিন্তু আগুনের তৈরি জ্বিন আগুনে শাস্তি পাবে কীভাবে?
উত্তর: মানুষের মতো জ্বিনেরাও জাহান্নামে যাবে। মহান আল্লাহ বলেন, وَأَنَّا مِنَّا الْمُسْلِمُونَ وَمِنَّا الْقَاسِطُونَ فَمَنْ أَسْلَمَ فَأُوْلَئِكَ تَحَرَّوْا رَشَدًا (١٤) وَأَمَّا {الْقَاسِطُونَ فَكَانُوا لِجَهَنَّمَ حَطَبًا} (١٥) سورة الجن অর্থাৎ, আমাদের কতক আত্মসমর্পণকারী (মুসলিম) এবং কতক সীমালংঘনকারী; সুতরাং যারা আত্মসমর্পণ করে (মুসলমান হয়), তারা নিঃসন্দেহে সত্য পথ বেছে নেয়। অপরপক্ষে সীমালংঘনকারীরা তো জাহান্নামেরই ইন্ধন।' (জ্বিনঃ ১৪-১৫) তারা আগুন থেকে সৃষ্টি হলেও পরকালে আগুন দ্বারা শাস্তি ও কষ্ট পাবে। কারণ জাহান্নামের আগুন দুনিয়ার আগুন অপেক্ষা সত্তর গুণ তেজবিশিষ্ট। অথবা তাদের জন্য থাকবে পৃথক আগুনের ব্যবস্থা। (ইজি) মানুষ মাটির তৈরি হয়েও যেমন মাটির আঘাতে কষ্ট পায়, তেমনি জ্বিনও আগুনের তৈরি হয়ে আগুনের দহনে কষ্ট পাবে।

প্রশ্নঃ জ্বিন কি মানবদেহে প্রবেশ করতে পারে?
উত্তর: জ্বিন মানবদেহে প্রবেশ করতে পারে। তার প্রমাণ স্বরূপ উলামাগণ বিভিন্ন দলীল উল্লেখ করেন। মহান আল্লাহ বলেন, {الَّذِينَ يَأْكُلُونَ الرِّبَا لَا يَقُومُونَ إِلَّا كَمَا يَقُومُ الَّذِي يَتَخَبَّطُهُ الشَّيْطَانُ مِنَ الْمَسِّ} (٢٧٥) অর্থাৎ, যারা সূদ খায় তারা (কিয়ামতে) সেই ব্যক্তির মত দন্ডায়মান হবে, যাকে শয়তান স্পর্শ দ্বারা পাগল ক'রে দিয়েছে। (বাক্বারাহঃ ২৭৫) মহানবী বলেছেন, (إِنَّ الشَّيْطَانَ يَجْرِي مِنْ الْإِنْسَانِ مَجْرَى الدَّمِ). অর্থাৎ, শয়তান মানুষের রক্ত-শিরায় প্রবাহিত হয়। (বুখারী ২০৩৮, মুসলিম ৫৮০৭নং) এ ছাড়া মহানবী 'উখরুজ আদুওয়াল্লাহ' বলে মুখে থুথু দিয়ে জ্বিন বিতাড়িত করেছেন। (আহমাদ, ইবনে মাজাহ ৩৫৪৮-নং)

প্রশ্নঃ স্বামী বা ডাক্তার কি ইচ্ছামতো পুত্র বা কন্যা-সন্তান জন্মাতে পারে?
উত্তর: বিশেষ পদ্ধতিতে চেষ্টা করতে পারে মাত্র। বাকী সব কিছু আল্লাহর হাতে। তিনিই নিজ ইচ্ছামতো পুত্র-কন্যা, সুঠামাঙ্গ-বিকলাঙ্গ, সুন্দর-অসুন্দর সৃষ্টি করেন। তিনি বলেন, {هُوَ الَّذِي يُصَوِّرُكُمْ فِي الأَرْحَامِ كَيْفَ يَشَاء لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ} (٦) آل عمران অর্থাৎ, তিনিই মাতৃগর্ভে যেভাবে ইচ্ছা তোমাদের আকৃতি গঠন করেন। তিনি ব্যতীত অন্য কোন (সত্যিকার) উপাস্য নেই। তিনি প্রবল পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। (আলে ইমরানঃ ৬) لِلَّهِ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ يَخْلُقُ مَا يَشَاء يَهَبُ لِمَنْ يَشَاء إِنَاثًا وَيَهَبُ لِمَنْ يَشَاء الذُّكُورَ (٤٩) أَوْ يُزَوِّجُهُمْ ذُكْرَانًا وَإِنَاثًا وَيَجْعَلُ مَن يَشَاء عَقِيمًا إِنَّهُ عَلِيمٌ {قَدِيرٌ} (٥٠) سورة الشورى অর্থাৎ, আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সার্বভৌমত্ব আল্লাহরই। তিনি যা ইচ্ছা তাই সৃষ্টি করেন; তিনি যাকে ইচ্ছা কন্যা সন্তান দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা পুত্র সন্তান দান করেন। অথবা দান করেন পুত্র-কন্যা উভয়ই এবং যাকে ইচ্ছা তাকে বন্ধ্যা ক'রে দেন। নিশ্চয়ই তিনি সর্বজ্ঞ সর্বশক্তিমান। (শূরাঃ ৪৯-৫০)

প্রশ্নঃ মায়ের পেটে কোন্ সন্তান আছে, তা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। কিন্তু বর্তমানে তো যন্ত্র দ্বারা বলা সম্ভব হয়েছে। তাহলে কি কুরআনের ব্যাখ্যা ভুল করা হয়েছে?
উত্তর: কুরআনের বক্তব্য ও ব্যাখ্যা ঠিকই আছে, আল্লাহ ছাড়া কেউ অদৃশ্যের খবর জানে না। কোন যন্ত্রের দ্বারা অদৃশ্যের বস্তুকে দৃশ্য ক'রে দেখার নাম অদৃশ্যের খবর জানা নয়, বরং বিনা কোন মাধ্যম বা অসীলায় কোন অদৃশ্যের খবর বলে দেওয়াকে 'গায়ব জানা' বলা হয়। আপনার পেটের উপরে জামা-গেঞ্জির ভিতরে কী বাঁধা আছে আমি জানি না, বিনা অসীলায় তা বলে দিতে পারলে আমি গায়েব-জান্তা। কিন্তু কোন যন্ত্র লাগিয়ে বলে দিলে আমি গায়েব-জান্তা নই। এইভাবেই মহানবী গায়েব জানতেন না। কিন্তু তিনি অনেক গায়েবের খবর বলেছেন। যেহেতু তিনি অহীর মাধ্যমে বলেছেন, তাই গায়বী খবর বলা সত্ত্বেও তিনি 'গায়েব-জান্তা' ছিলেন না। 'গায়েব-জান্তা' কেবল মহান আল্লাহ। তিনি বলেছেন, {قُل لَّا يَعْلَمُ مَن فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ الْغَيْبَ إِلَّا اللَّهُ وَمَا يَشْعُرُونَ أَيَّانَ يُبْعَثُونَ} (٦٥) অর্থাৎ, বল, 'আল্লাহ ব্যতীত আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে কেউই অদৃশ্য বিষয়ের জ্ঞান রাখে না এবং ওরা কখন পুনরুত্থিত হবে (তাও) ওরা জানে না।' (নামঃ ৬৫)

প্রশ্ন: আল্লাহ বা তাঁর রসূল-কে গালি দিলে কেউ মুসলিম থাকবে কি?
উত্তর: আল্লাহ বা তাঁর রসূল-এর বিরুদ্ধে কোন কুমন্তব্য করা, গালি প্রয়োগ করা, ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ বা কটাক্ষ করা বড় কুফরী। মহান আল্লাহ বলেন, {إِنَّ الَّذِينَ يُؤْذُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ لَعَنَهُمُ اللَّهُ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَأَعَدَّ لَهُمْ عَذَابًا مهينًا} (٥٧) অর্থাৎ, যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলকে কষ্ট দেয়, আল্লাহ তো তাদেরকে ইহলোকে ও পরলোকে অভিশপ্ত করেন এবং তিনি তাদের জন্য লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি প্রস্তুত রেখেছেন। (আহযাবঃ ৫৭) তিনি আরো বলেন, وَمِنْهُمُ الَّذِينَ يُؤْذُونَ النَّبِيَّ وَيَقُولُونَ هُوَ أُذُنٌ قُلْ أُذُنُ خَيْرٍ لَّكُمْ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَيُؤْمِنُ لِلْمُؤْمِنِينَ وَرَحْمَةٌ لِّلَّذِينَ آمَنُواْ مِنكُمْ وَالَّذِينَ يُؤْذُونَ رَسُولَ اللَّهِ لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ} (٦١) سورة التوبة অর্থাৎ, তাদের মধ্যে এমন কতিপয় লোক আছে, যারা নবীকে কষ্ট দেয় এবং বলে, 'সে প্রত্যেক কথায় কর্ণপাত ক'রে থাকে।' তুমি বলে দাও, 'সে কর্ণপাত তো তোমাদের জন্য কল্যাণকর। সে আল্লাহর প্রতি ঈমান আনয়ন করে এবং মু'মিনদের (কথাকে) বিশ্বাস করে। আর সে তোমাদের মধ্যে বিশ্বাসী লোকদের জন্য করুণাস্বরূপ। যারা আল্লাহর রসূলকে কষ্ট দেয়, তাদের জন্য যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি রয়েছে।' (তাওবাহঃ ৬১)

প্রশ্নঃ অনেক সময় নবী-এর হুজরার আশেপাশে চিরকুট পড়ে থাকতে দেখা যায়, তাতে থাকে নানা আবেদন। সে আবেদন করা হয় নবী-এর কাছে। কেউ লেখে, চাকরি চাই, কেউ লেখে, সুখ-সমৃদ্ধি চাই, কেউ লেখে, কিয়ামতে সুপারিশ চাই, কেউ লেখে, ভাল স্বামী চাই ইত্যাদি। নবী-এর দরবারে এমন দরখাস্ত পেশ করার শরয়ী বিধান কী?
উত্তর: নবী-এর দরবারে এমন দরখাস্ত পেশ করা শির্কে আকবার। যেহেতু তিনি এ দরখাস্ত সম্বন্ধে জানতে পারেন না, এ দরখাস্ত মঞ্জুর করার মতো ক্ষমতাও তাঁর নেই। এ ক্ষমতা কেবল মহান আল্লাহর হাতে। তিনি তাঁকে বলেছেন, {قُل لَّا أَقُولُ لَكُمْ عِندِي خَزَائِنُ اللَّهِ وَلَا أَعْلَمُ الْغَيْبَ وَلَا أَقُولُ لَكُمْ إِنِّي مَلَكٌ إِنْ أَتَّبِعُ إِلَّا مَا يُوحَى إِلَيَّ قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الأَعْمَى وَالْبَصِيرُ أَفَلَا تَتَفَكَّرُونَ} (৫০) سورة الأنعام অর্থাৎ, বল, 'আমি তোমাদেরকে এ বলি না যে, আমার নিকট আল্লাহর ধনভান্ডার আছে, অদৃশ্য সম্বন্ধেও আমি অবগত নই এবং তোমাদেরকে এ কথাও বলি না যে, আমি ফিরিশ্তা। আমার প্রতি যা প্রত্যাদেশ হয় আমি শুধু তারই অনুসরণ করি!' বল, 'অন্ধ ও চক্ষুষ্মান কি সমান? তোমরা কি অনুধাবন কর না?' (আনআমঃ ৫০) {قُلْ إِنِّي لَا أَمْلِكُ لَكُمْ ضَرًّا وَلَا رَشَدًا} (২১) سورة الجن অর্থাৎ, বল, 'আমি তোমাদের অপকার অথবা উপকার কিছুরই মালিক নই।' (জ্বিনঃ ২১) মহানবী তাঁর আত্মীয় ও বংশকে সম্বোধন ক'রে বলে গেছেন, "হে কুরাইশদল! তোমরা আল্লাহর নিকট নিজেদেরকে বাঁচিয়ে নাও, আমি তোমাদের ব্যাপারে আল্লাহর নিকট কোন উপকার করতে পারব না। হে বানী আব্দুল মুত্তালিব! আমি আল্লাহর দরবারে তোমাদের কোন উপকার করতে পারব না। হে (চাচা) আব্বাস বিন আব্দুল মুত্তালিব! আমি আল্লাহর দরবারে আপনার কোন কাজে আসব না। হে আল্লাহর রসূলের ফুফু সাফিয়্যাহ! আমি আপনার জন্য আল্লাহর দরবারে কোন উপকারে আসব না। হে আল্লাহর রসূলের বেটী ফাতেমা! আমার কাছে যে ধন-সম্পদ চাইবে চেয়ে নাও, আমি আল্লাহর কাছে তোমার কোন উপকার করতে পারব না।” (বুখারী-মুসলিম) মনের আকুল আবেদন শ্রবণ করেন একমাত্র মহান আল্লাহ। তিনি বলেছেন, অর্থাৎ, অথবা তিনি, যিনি আর্তের আহবানে সাড়া দেন, যখন সে তাঁকে ডাকে এবং বিপদ-আপদ দূরীভূত করেন এবং তোমাদেরকে পৃথিবীর প্রতিনিধি করেন। আল্লাহর সঙ্গে অন্য কোন উপাস্য আছে কি? তোমরা অতি সামান্যই উপদেশ গ্রহণ ক'রে থাক। (নাম্লঃ ৬২)

প্রশ্ন: এক পীর সাহেব আছেন, যিনি তাঁর মুরীদদেরকে অসিয়তে বলেন, 'পাপের সম্মুখীন হলে আমাকে স্মরণ করো, তাহলে পাপ থেকে বেঁচে যাবে।' এই শ্রেণীর স্মরণ কি শির্ক নয়?
উত্তর: এটি একটি বড় আপত্তিকর ও বড় শির্কের কাজ। পাপ সামনে এলে পীরকে কেন স্মরণ করতে হবে? স্মরণ করতে হবে মহান আল্লাহকে। (ইবা) পাপ কাজের সম্মুখীন হলে আল্লাহকে স্মরণ ক'রে কেবল তাঁরই ভয়ে পাপ বর্জন করতে হবে। পাপ ঘটে গেলে তাঁকেই স্মরণ ক'রে ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে। মহান আল্লাহ বলেছেন, وَالَّذِينَ إِذَا فَعَلُوا فَاحِشَةً أَوْ ظَلَمُوا أَنْفُسَهُمْ ذَكَرُوا اللَّهَ فَاسْتَغْفَرُوا لِذُنُوبِهِمْ وَمَن يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا اللَّهُ وَلَمْ يُصِرُّوا عَلَى مَا فَعَلُواْ وَهُمْ يَعْلَمُونَ} (১৩৫) سورة آل عمران অর্থাৎ, যারা কোন অশ্লীল কাজ ক'রে ফেললে অথবা নিজেদের প্রতি যুলুম করলে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং নিজেদের পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। আর আল্লাহ ছাড়া অন্য কে পাপ ক্ষমা করতে পারে? এবং তারা যা (অপরাধ) ক'রে ফেলে, তাতে জেনে- শুনে অটল থাকে না। (আলে ইমরানঃ ১৩৫)

প্রশ্নঃ শোনা যায়, আল্লাহর চোখ আছে। এ কথা কি ঠিক?
উত্তর: মহান আল্লাহর চোখ আছে। যেহেতু তিনি নূহ-কে বলেছিলেন, وَاصْنَعِ الْفُلْكَ بِأَعْيُنِنَا وَوَحْيِنَا وَلَا تُخَاطِبْنِي فِي الَّذِينَ ظَلَمُوا إِنَّهُم مُّغْرَقُونَ} (۳۷) هود অর্থাৎ, আর তুমি আমার চোখের সামনে ও আমার অহী (প্রত্যাদেশ) অনুযায়ী নৌকা নির্মাণ কর, আর যালেমদের ব্যাপারে আমাকে কিছু বলো না। নিশ্চয়ই তাদেরকে ডুবানো হবে। (হুদঃ ৩৭) আর মহানবী-কে বলেছিলেন, وَاصْبِرْ لِحُكْمِ رَبِّكَ فَإِنَّكَ بِأَعْيُنِنَا وَسَبِّحْ بِحَمْدِ رَبِّكَ حِينَ تَقُومُ} (٤٨) سورة الطور অর্থাৎ, তুমি ধৈর্যধারণ কর তোমার প্রতিপালকের নির্দেশের অপেক্ষায়; তুমি আমার চোখের সামনেই রয়েছ। আর তুমি তোমার প্রতিপালকের সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কর যখন তুমি শয্যা ত্যাগ কর। (তুরঃ ৪৮) রাসূলুল্লাহ ﷺ কানা দাজ্জালের কথা আলোচনা করতে গিয়ে বলেছিলেন, “আল্লাহ যে নবীই পাঠিয়েছেন, তিনি নিজ জাতিকে তার ব্যাপারে ভয় দেখিয়েছেন। নূহ ও তাঁর পরে আগমনকারী নবীগণ তার ব্যাপারে ভীতি প্রদর্শন করেছেন। যদি সে তোমাদের মধ্যে বের হয়, তবে তার অবস্থা তোমাদের কাছে গোপন থাকবে না। তোমাদের কাছে এ কথা গোপন নয় যে, তোমাদের প্রভু কানা নয়, আর দাজ্জাল কানা হবে। তার ডান চোখ কানা হবে, তার চোখটি যেন (গুচ্ছ থেকে) ভেসে ওঠা আঙ্গুর।” (বুখারী, মুসলিম ৪৪৪নং) হাদীসে 'তোমাদের প্রভু কানা নন' মানেই তাঁর চোখ আছে। অবশ্য তা কেমন তা কেউ বলতে পারে না। (বানী)

প্রশ্নঃ 'মালাকুল মাওত' ফিরিস্তার নাম কি 'আজরাঈল'?
উত্তর: এ নাম কুরআন ও সহীহ সুন্নাহতে উল্লেখ হয়নি। এ নামটি ইস্রাঈলী বর্ণনা-উদ্ভূত। (বানী)

প্রশ্নঃ কুফ্র ও শির্ক না করেও মানুষ কখন কাফের হয়?
উত্তর: যখন মুসলিম কোন কাবীরা গোনাহর 'হারাম' কাজকে অন্তরে 'হালাল' বিশ্বাস রেখে করে, তখন সে কাফের হয়ে যায়। (বানী)

প্রশ্ন: নবী ﷺ-এর নবুঅত-প্রাপ্তির আগে যারা মুশরিক অবস্থায় মারা গেছে, তারা জাহান্নামে যাবে কেন? অথচ মহান আল্লাহ বলেছেন, "আমি রসূল না পাঠানো পর্যন্ত কাউকে শাস্তি দিই না। (বানী ইস্রাঈল: ১৫)
উত্তর: তারা তাদের শির্ক ও কুফরীর কারণে জাহান্নামে যাবে। তাদের কাছে পূর্বে রসূল এসেছিলেন ইব্রাহীম আ. ও তাঁর পরবর্তীতে আরো নবী তাদের প্রতি প্রেরিত হয়েছিলেন। কিন্তু তারা পৌত্তলিকতা অবলম্বন করে। আর তার ফলে তাদের শাস্তি হবে। (বানী)

প্রশ্নঃ কোন কাফের 'মুসলিম' হলে কুফরী অবস্থায় কৃত আমলের সওয়াব সে পাবে কি?
উত্তর: কাফের কোন নেক কাজের সওয়াবই আখেরাতে পাবে না। যেহেতু সে সওয়াব সে দুনিয়াতেই ভোগ ক'রে নেয়। পক্ষান্তরে সে ইসলাম গ্রহণ করলে কুফরী অবস্থায় কৃত নেক আমলের সওয়াবের আখেরাতে পাবে। মহানবী ﷺ বলেছেন, (إِذَا أَسْلَمَ الْعَبْدُ فَحَسُنَ إِسْلَامُهُ كَتَبَ اللهُ لَهُ كُلَّ حَسَنَةٍ كَانَ أَزْلَفَهَا). অর্থাৎ, বান্দা যখন ইসলাম গ্রহণ করে এবং তার ইসলাম সুন্দর হয়, তখন আল্লাহ তার পূর্বকৃত পুণ্যগুলিকেও লিপিবদ্ধ করেন। (নাসাঈ ৪৯৯৮-নং, বানী)

প্রশ্ন: ভাল নিয়তে কোন খারাপ কাজ করলে কি তার সওয়াব পাওয়া যায়?
উত্তর: খারাপ কাজ ভাল নিয়তে করলে তা ভাল হয়ে যায় না, তথা তার সওয়াব পাওয়া যায় না। কবরকে সামনে ক'রে ভাল নিয়তে আল্লাহর উদ্দেশ্যে নামায পড়লে কি সেটা ভাল কাজ মনে করা যাবে? অবশ্যই না। (বানী) বরং ভাল কাজ ভাল নিয়তে করলেও অনেক সময় তা ভাল কাজ হয় না। যখন তা তরীকায়ে মুহাম্মাদী ﷺ অনুযায়ী না ক'রে নিজের অথবা অন্য কারো তরীকা অনুযায়ী করা হয়।

প্রশ্নঃ আল্লাহর রসূল ﷺ-কে 'হাবীবুল্লাহ' বলা উচিত, নাকি 'খালীলুল্লাহ'?
উত্তর: আল্লাহর রসূল ﷺ-কে 'খালীলুল্লাহ' বলা উচিত। যেহেতু 'হাবীবুল্লাহ' থেকে 'খালীলুল্লাহ'র মর্যাদা উচ্চতর। আর তিনি বলেছেন, لَوْ كُنْتُ مُتَّخِذًا مِنْ أَهْلِ الأَرْضِ خَلِيلاً لاَتَّخَذْتُ ابْنَ أَبِي قُحَافَةَ خَلِيلاً وَلَكِنْ صَاحِبُكُمْ خَلِيلُ اللَّهِ ». অর্থাৎ, আমি পৃথিবীর কাউকে 'খালীল' রূপে গ্রহণ করলে ইবনে আবী কুহাফাহ (আবু বাক্র)-কে 'খালীল'রূপে গ্রহণ করতাম। কিন্তু তোমাদের সাথী 'খালীলুল্লাহ'। (মুসলিম ৬৩২৬নং) পক্ষান্তরে তাঁর 'হাবীবুল্লাহ' হওয়ার কথা কোন সহীহ হাদীসে আসেনি। (বানী)

প্রশ্ন: মহান আল্লাহর সর্বপ্রথম সৃষ্টি কী?
উত্তর: মহান আল্লাহর প্রথম সৃষ্টি কলম। মহানবী ﷺ বলেছেন, «إِنَّ أَوَّلَ مَا خَلَقَ اللَّهُ الْقَلَمَ فَقَالَ لَهُ اكْتُبْ قَالَ رَبِّ وَمَاذَا أَكْتُبُ قَالَ اكْتُبْ مَقَادِيرَ كُلِّ شَيْءٍ حَتَّى تَقُومَ السَّاعَةُ». অর্থাৎ, নিশ্চয় আল্লাহ প্রথম যে জিনিস সৃষ্টি করেন, তা হল কলম। তিনি তাকে বললেন, 'লিখো।' সে বলল, 'প্রভু! কী লিখব?' তিনি বললেন, 'কিয়ামত পর্যন্ত প্রত্যেক জিনিসের ভাগ্য লিখো।' (আবু দাউদ ৪৭০২, তিরমিযী ২১৫৫নং)

প্রশ্ন: আল্লাহর রসূল ﷺ কি কিছু ভুলতেন? যা ভুলে যেতেন, তা কি আল্লাহর পক্ষ থেকে বিধান জারি করার জন্য নয়?
উত্তর: আল্লাহর রসূল ﷺ ভুলতেন, তাঁর নামায ভুল হতো, কুরআন পড়তে গিয়ে আয়াত ছুটে যেতো। আর এটা বিধান জারি করার জন্য নয়। বরং মানব-মনের সাধারণ প্রকৃতির কারণেই তিনি ভুলতেন। তিনি বলেছেন, إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ مِثْلُكُمْ أَنْسَى كَمَا تَنْسَوْنَ فَإِذَا نَسِيتُ فَذَكِّرُونِي.... "আমি তোমাদেরই মত একজন মানুষ। আমিও ভুলে যাই, যেমন তোমরা ভুলে যাও। সুতরাং আমি ভুলে গেলে তোমরা আমাকে মনে পড়িয়ে দিও।” (বুখারী ৪০১, মুসলিম ৫৭২নং) অবশ্য সে ভুলের কারণেও বিধান জারি হতো এবং উম্মতের শিক্ষা হতো। (বানী)

প্রশ্ন: মহান আল্লাহ তো সবই জানেন, তাহলে কিরামান-কাতেবীন দ্বারা লেখানোর যুক্তি কি?
উত্তর: মহান আল্লাহ বান্দার সকল আমল লিখে রাখছেন, কিয়ামতে তা বান্দার সামনে পেশ করবেন, তার বিরুদ্ধে সাক্ষী মানা হবে, তার আমল ওজন করা হবে, তাকে প্রশ্ন করা হবে ইত্যাদি, অথচ তিনি সব জানেন। যেহেতু বান্দাকে তিনি বুঝাতে চান যে, তিনি তার প্রতি কোন অন্যায় করছেন না। বান্দা মিথ্যা বলে পার পেতে চাইলেও যাতে লেখা ও সাক্ষ্য অনুযায়ী সে বুঝতে পারে যে, তার প্রতি অবিচার করা হচ্ছে না。

প্রশ্নঃ যারা কাবীরা গোনাহ করে, অর্থাৎ ব্যভিচার করে, খুন করে, মদ্যপান করে, মিথ্যা কথা বলে ইত্যাদি, তারা কি কাফের? তারা কি চিরকাল দোযখে বাস করবে?
উত্তর: কাবীরা গোনাহর গোনাহগার যদি সেই গোনাহর কাজকে হালাল মনে না করে, তাহলে কাফের নয়। গোনাহর ফলে অবশ্যই ঈমানে দুর্বলতা আসবে। তাওহীদ থাকলে ও নিয়মিত নামায পড়লে এবং গোনাহ থেকে তওবা না ক'রে মারা গেলে কিয়ামতে সে মহান আল্লাহর ইচ্ছাধীন থাকবে। তিনি ইচ্ছা করলে তাওহীদের গুণে তাকে ক্ষমা ক'রে বেহেশতে দেবেন। নচেৎ গোনাহ অনুযায়ী জাহান্নামে শাস্তি ভুগিয়ে একদিন না একদিন বেহেশতে দেবেন। মহান আল্লাহ বলেন, {إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَن يَشَاء وَمَن يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا بَعِيدًا } (١١৬) سورة النساء অর্থাৎ, নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে অংশী (শিক) করার অপরাধ ক্ষমা করেন না। এ ছাড়া অন্যান্য অপরাধ যার জন্য ইচ্ছা ক্ষমা ক'রে দেন। আর যে কেউ আল্লাহর সাথে অংশী স্থাপন (শিক) করে, সে ভীষণভাবে পথভ্রষ্ট হয়। (নিসাঃ ১১৬) লক্ষণীয় যে, অবিবাহিত ব্যভিচারীর শাস্তি ১০০ বেত্রাঘাত ও কারাদন্ড, মদ্যপায়ীর শাস্তি বেত্রাঘাত, চোরের শাস্তি হাত কাটা ইত্যাদি। তারা কাফের হয়ে গেলে তাদেরকে হত্যা করা হতো। যেহেতু মুসলিম কাফের হয়ে গেলে তার শাস্তি হল হত্যা। (বুখারী ৩০১৭নং)

প্রশ্নঃ 'আল্লাহ আকাশ-পৃথিবীর জ্যোতি' কথার অর্থ কী?
উত্তর: 'আল্লাহ আকাশ-পৃথিবীর জ্যোতি।' (নূরঃ ৩৫) এর অর্থ হল, মহান আল্লাহ আকাশ-পৃথিবীকে জ্যোতির্ময় ও আলোকিত করেন। সুতরাং আকাশে যত আলো আছে, পৃথিবীতে যত রকমের আলো আছে এবং কিয়ামতে যে আলো হবে, সব কিছুই তাঁরই আলো, তাঁরই জ্যোতি। অবশ্য তাঁর জ্যোতি দুই প্রকার: সৃষ্ট জ্যোতি। আর তা হল আকাশ-পৃথিবীর যে আলো আমরা দেখতে পাচ্ছি, যা সূর্য, চন্দ্র ও গ্রহ-নক্ষত্রের মাধ্যমে লাভ ক'রে থাকি এবং যা বিদ্যুৎ ও অগ্নির মাধ্যমে দেখতে পাই, সবই তাঁর সৃষ্ট আলো। আর দ্বিতীয় প্রকার জ্যোতি হল তাঁর গুণ। সে জ্যোতি সৃষ্ট নয়। তা তাঁর সাত্তিক গুণ। একদা নবী -কে জিজ্ঞাসা করা হল, 'আপনি কি আপনার প্রতিপালককে দেখেছেন?' উত্তরে তিনি বললেন, "তাঁকে কিরূপে দেখা সম্ভব? যাঁর পর্দা (অন্তরাল) হল নূর (জ্যোতি)। যে পর্দা উন্মোচিত হলে তাঁর আনন-দীপ্তি সমগ্র সৃষ্টিকুলকে দগ্ধীভূত ক'রে ফেলবে।” (মুসলিম ৪৬৩নং) অন্য এক বর্ণনায় তিনি বলেন, "আমি নূর দেখেছি।”

প্রশ্নঃ সৃষ্টিতত্ত্বের কোন সংবাদ প্রচারে কেউ কেউ বলে থাকেন, 'এত কোটি বছরে এই হয়েছিল। এত কোটি বছর আগে ঐ হয়েছিল। এত কোটি বছর পূর্বে পৃথিবীতে মানুষের বসবাস শুরু হয়।' ইত্যাদি। এ সবে বিশ্বাস করা কি বৈধ?
উত্তর: কোন তত্ত্ববিদ বা বিজ্ঞানী যখন অনুরূপ তথ্য পরিবেশন করেন, তখন কিছুর উপর ভিত্তি ক'রে অনুমানপ্রসূত কথা বলেন। তাতে বিশ্বাস-অবিশ্বাস কিছুই করা জরুরী নয়। মানুষের ইতিহাস যে কত বছরের, তাও কেউ বলতে পারে না। মহান আল্লাহ বলেছেন, {أَلَمْ يَأْتِكُمْ نَبَأُ الَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ قَوْمٍ نُوحٍ وَعَادٍ وَثَمُودَ وَالَّذِينَ مِن بَعْدِهِمْ لَا يَعْلَمُهُمْ إِلَّا الله) (৯) سورة إبراهيم অর্থাৎ, তোমাদের কাছে কি সংবাদ আসেনি তোমাদের পূর্ববর্তীদের; নূহের সম্প্রদায়ের, আ'দের ও সামুদের এবং তাদের পরবর্তীদের? তাদের বিষয় আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ জানে পশ্চিমা। (ইব্রাহীমঃ ৯)

প্রশ্ন: আল্লাহর বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ, আল্লাহর কাজের সমালোচনা অথবা আল্লার কাজে দোষ বের করা বৈধ কি?
উত্তর: আল্লাহর বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ, আল্লাহর কাজের সমালোচনা অথবা আল্লার কাজে দোষ বের করার অধিকার কোন বান্দার নেই। যেহেতু সকল বিধানে তিনি নিখুঁত বিধায়ক। 'কেন' বলে অভিযোগ বা আপত্তি করার অবকাশ ও অধিকার নেই কারো। মহান আল্লাহ বলেন, وَاللَّهُ يَحْكُمُ لَا مُعَقِّبَ لِحُكْمِهِ وَهُوَ سَرِيعُ الْحِسَابِ} (٤١) سورة الرعد অর্থাৎ, আল্লাহ আদেশ করেন। তাঁর আদেশের সমালোচনা (পুনর্বিবেচনা) করার কেউ নেই এবং তিনি হিসাব গ্রহণে তৎপর। (রা'দঃ ৪১) لَا يُسْأَلُ عَمَّا يَفْعَلُ وَهُمْ يُسْأَلُونَ} (۲۳) سورة الأنبياء অর্থাৎ, তিনি যা করেন, সে বিষয়ে তাঁকে প্রশ্ন করা হবে না; বরং ওদেরকেই প্রশ্ন করা হবে। (আম্বিয়াঃ ২৩)

প্রশ্ন: বদ-নজর থেকে বাঁচার উদ্দেশ্যে গাড়ির সামনে ছেঁড়া জুতো ঝুলিয়ে দেওয়া, ফলদার গাছে ভাঙ্গা হাঁড়ি টেঙ্গে দেওয়া, গরু বা ঘোড়ার গলায় কিছু বেঁধে দেওয়া বৈধ কি?
উত্তরঃ বদ-নজর থেকে বাঁচার জন্য এ সব ব্যবহার করা বৈধ নয়। (বানী) যেহেতু এতে শির্কও হতে পারে।

প্রশ্নঃ যদি কেউ ইমাম মাহদীর আগমন ও ঈসা-এর অবতরণকে অস্বীকার করে, তাহলে তার বিধান কী?
উত্তর: যদি কেউ ইমাম মাহদীর আগমন ও ঈসা-এর অবতরণকে অস্বীকার করে, তাহলে সে ভ্রষ্ট। (বানী)

প্রশ্নঃ কিয়ামতে মানুষকে তার মায়ের নাম ধরে ডাকা হবে, নাকি বাপের নাম ধরে?
উত্তর: কিয়ামতে মানুষকে তার বাপের নাম ধরে ডাকা হবে। যেমন হাদীসে এ কথা স্পষ্টভাবে এসেছে। (আবু দাউদ) তাছাড়া নবী বলেন, "আল্লাহ যখন পূর্বেকার ও পরেকার সকল মানুষকে কিয়ামতের দিন সমবেত করবেন, তখন প্রত্যেক (প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকারী) প্রতারকের জন্য একটি ক'রে পতাকা উড্ডয়ন করা হবে, আর বলা হবে, 'এ হল অমুক (লোকের) পুত্র অমুক (লোকের) প্রতারণা।” (মুসলিম ১৭৩৫নং, ইবনে হিব্বান, বাইহাকী) পক্ষান্তরে মায়ের নাম ধরে ডাকার হাদীস সহীহ নয়। (বানী, সিঃ যয়ীফাহ ৪৩৩নং)

প্রশ্ন: আল্লাহর রসূল-এর পিতামাতা কি মুশরিক অবস্থায় মারা গেছেন?
উত্তর: তাঁরা উভয়েই মুশরিক অবস্থায় মারা গেছেন। আল্লাহর রসূল একবার মায়ের কবর যিয়ারতে গেলেন। সঙ্গে কিছু সাহাবাও ছিলেন। সেখানে পৌঁছে তিনি কেঁদে উঠলেন। সাহাবাগণ কাঁদার কারণ জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, আমি আল্লাহর নিকট আম্মার (আব্বার) কবর যিয়ারতের এবং ইস্তিগফারের (ক্ষমা প্রার্থনা করার) অনুমতি চাইলাম, কিন্তু আল্লাহ আযযা অজাল্ল তাঁদের জন্য ইস্তিগফারের অনুমতি দিলেন না। আল্লাহর রসূল এর মনে প্রশ্ন জাগল যে, হযরত ইব্রাহীম তো তাঁর পিতার জন্য (মুশরিক হওয়া সত্ত্বেও) ইস্তিগফার করেছিলেন। আল্লাহর তরফ থেকে উত্তর এল, {وَمَا كَانَ اسْتِغْفَارُ إِبْرَاهِيمَ لِأَبِيهِ إِلَّا عَن مَّوْعِدَةٍ وَعَدَهَا إِيَّاهُ فَلَمَّا تَبَيَّنَ لَهُ أَنَّهُ عَدُوٌّ لِلَّهِ تَبَرَّأَ مِنْهُ إِنَّ إِبْرَاهِيمَ لأَوَّاهُ حَلِيمٌ } (١١٤) سورة التوبة "ইব্রাহীম তাঁর পিতার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেছিল এবং তা (ইস্তিগফার) তাকে দেওয়া আল্লাহর একটি প্রতিশ্রুতির জন্য সম্ভব হয়েছিল। অতঃপর যখন এ তার নিকট সুস্পষ্ট হল যে, সে আল্লাহর শত্রু, তখন ইব্রাহীম তার সম্পর্কে নির্লিপ্ত হয়ে গেল। নিশ্চয় ইব্রাহীম ছিল কোমল হৃদয় ও সহনশীল।” (তাওবাহঃ ১১৪, তফসীর ইবনে কাষীর ২/৩৯৩) একদা এক ব্যক্তি প্রশ্ন করল, 'হে আল্লাহর রসূল! আমার (মৃত) পিতা কোথায় (জান্নাতে না জাহান্নামে)?' তিনি বললেন, "জাহান্নামে।” অতঃপর সে যখন (মন খারাপ ক'রে) ফিরে যেতে লাগল, তখন তিনি তাকে ডেকে বললেন, "আমার পিতা এবং তোমার পিতা জাহান্নামে।” (মুসলিম ৫২ ১নং, দ্রঃ সিঃ সহীহাহ ২৫৯২নং)

প্রশ্ন: আদম যখন তওবা করেছিলেন, তখন তিনি মুহাম্মাদের অসীলায় ক্ষমা প্রার্থনা করেছিলেন।---এ কথা সঠিক কি?
উত্তর: এ ব্যাপারে একটি হাদীস বর্ণনা করা হয়, যাতে বলা হয়েছে, আদম যখন পাপ করেন, তখন তিনি বললেন, 'হে আমার প্রতিপালক! মুহাম্মাদের অসীলায় আমি তোমার নিকট প্রার্থনা করছি, তুমি আমাকে ক্ষমা ক'রে দাও।' আল্লাহ বললেন, 'হে আদম! তুমি মুহাম্মাদকে চিনলে কীভাবে, অথচ আমি এখনো তাকে সৃষ্টিই করিনি? আদম বললেন, 'হে আমার প্রতিপালক! তুমি যখন আমাকে তোমার হাত দিয়ে সৃষ্টি কর এবং আমার মাঝে তোমার রূহ ফুঁকো, তখন আমি মাথা তুলে দেখি, আরশের পায়ায় লেখা আছে, “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ"। তখন আমি জানি যে, তুমি তোমার নামের পাশে সেই ব্যক্তির নামই যোগ করেছ, যে তোমার সবচেয়ে প্রিয়তম সৃষ্টি।' আল্লাহ বললেন, 'আমি তোমাকে ক্ষমা ক'রে দিলাম। আর মুহাম্মাদ না হলে আমি তোমাকে সৃষ্টিই করতাম না।' (হাকেম প্রমুখ, সিঃ যয়ীফাহ ২৫নং)
উক্ত হাদীসটি জাল ও গড়া হাদীস। অন্য একটি যয়ীফ হাদীস উক্ত হাদীসের জাল হওয়ার কথা সাক্ষ্য দেয়। আর সেটা এই যে, "আদমকে ভারতে অবতারণ করা হয়। তিনি সেখানে আতঙ্কিত হন। সুতরাং জিবরীল অবতরণ করেন এবং আযান দিতে শুরু করেন, 'আশহাদু আল-লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' ২বার এবং 'আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ ২বার। আদম বললেন, 'মুহাম্মাদ কে?' তিনি বললেন, 'তোমার সন্তানদের মধ্যে শেষ নবী।' পূর্বের হাদীস সত্য হলে আদম মুহাম্মাদ সম্বন্ধে প্রশ্ন করতেন না। (বানী) পক্ষান্তরে আদম-হাওয়ার পাপ থেকে ক্ষমা প্রার্থনার দুআ আমরা কুরআন থেকে জানতে পারি, তাঁরা বলেছিলেন, رَبَّنَا ظَلَمْنَا أَنفُسَنَا وَإِن لَّمْ تَغْفِرْ لَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ} (۲۳) الأعراف অর্থাৎ, তারা বলল, 'হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা নিজেদের প্রতি অন্যায় করেছি। যদি তুমি আমাদেরকে ক্ষমা না কর, তাহলে অবশ্যই আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হব।' (আ'রাফঃ ২৩)

প্রশ্নঃ কিয়ামতে প্রত্যেক সন্তানকে কি তার মায়ের নাম জুড়ে ডাকা হবে?
উত্তর: এ ব্যাপারে যে হাদীস বর্ণিত আছে, তা সহীহ নয়। (সিযঃ ৪৩৩) সুতরাং সঠিক হল এই যে, প্রত্যেক সন্তানকে তার বাপের নাম জুড়েই ডাকা হবে। মহানবী বলেছেন, "কিয়ামতে তোমাদেরকে তোমাদের ও বাপের নাম ধরে ডাকা হবে।” (আবু দাউদ) নবী আরো বলেছেন, "কিয়ামতে প্রত্যেক (প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকারী) প্রতারকের জন্য একটি ক'রে পতাকা উড্ডয়ন করা হবে, আর বলা হবে, 'এ হল অমুকের পুত্র অমুকের প্রতারণা।” (বুখারী ৬১৭৭, মুসলিম ৪৬২৯নং) লক্ষণীয় যে, হাদীসে 'ফুলান' (পুং-বাচক) বলা হয়েছে, 'ফুলানাহ' (স্ত্রী-বাচক) বলা হয়নি。

প্রশ্নঃ দাউদ-এর সৈনিক আওরিয়ার স্ত্রীর প্রেমে পড়া এবং কৌশলে তাকে হত্যা করিয়ে ঐ মহিলাকে বিয়ে করার কাহিনী কি ঠিক?
উত্তর: কক্ষনো ঠিক নয়। এটি একটি ইসরাঈলী রূপকথা। (দ্রঃ সিঃ যয়ীফাহ ৩ ১৩-৩১৪)

প্রশ্নঃ উল্কা বা তারা ছুটার সাথে দুনিয়ার কোন ঘটনাঘটনের সম্পর্ক আছে কি?
উত্তর: উল্কা বা তারা ছুটার সাথে দুনিয়ার কোন ঘটনাঘটনের সম্পর্ক নেই। শয়তানকে তারা ছুঁড়ে মারা হয়। মহান আল্লাহ বলেছেন, إِنَّا زَيَّنَّا السَّماءَ الدُّنْيَا بِزِينَةِ الْكَوَاكِبِ (٦) وَحِفْظاً مِنْ كُلِّ شَيْطَانِ مَارِدٍ (۷) لَا يَسْمَعُونَ إِلَى الْمَلَا الْأَعْلَى وَيُقْذَفُونَ مِنْ كُلِّ جَانِب (۸) دُحُورًاً وَلَهُمْ عَذَابٌ وَاصِبٌ (۹) إلا مَنْ خَطِفَ الْخَطْفَةَ فَأَتْبَعَهُ شِهَابٌ ثَاقِبٌ (۱۰) অর্থাৎ, আমি তোমাদের নিকটবর্তী আকাশকে নক্ষত্ররাজি দ্বারা সুশোভিত করেছি এবং একে প্রত্যেক বিদ্রোহী শয়তান হতে রক্ষা করেছি। ফলে, শয়তানরা ঊর্ধ্ব জগতের কিছু শ্রবণ করতে পারে না। ওদের ওপর সকল দিক হতে (উল্কা) নিক্ষিপ্ত হয়; ওদেরকে বিতাড়নের জন্য। আর ওদের জন্য আছে অবিরাম শাস্তি। তবে কেউ গোপনে হঠাৎ কিছু শুনে ফেললে জ্বলন্ত উল্কাপিন্ড তার পশ্চাদ্ধাবন করে। (স্বাফফাতঃ ৬-১০)

প্রশ্নঃ চন্দ্র বা সূর্য গ্রহণের সাথে দুনিয়ার কোন ঘটনাঘটনের সম্পর্ক আছে কি?
উত্তরঃ চন্দ্র বা সূর্য গ্রহণের সাথে দুনিয়ার কোন ঘটনাঘটনের সম্পর্ক নেই। মহানবী বলেন, "সূর্য ও চন্দ্র আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্যতম। কারো জন্ম বা মৃত্যুর কারণে তাতে গ্রহণ লাগে না। সুতরাং গ্রহণ লাগা দেখলে তোমরা আল্লাহর নিকট দুআ কর, তকবীর পড়, নামায পড় এবং সদকাহ কর।” (বুঃ, মুঃ, মিশকাত ১৪৮-৩ নং)

প্রশ্ন: মাটিতে দাগ টেনে হাত চালিয়ে অদৃশ্যের কিছু বলা সম্ভব কি? হাত চালিয়ে ঘরের মধ্যে সাপ কোথায় আছে, সাপে কামড়ালে বিষ হয়েছে কি না, চুরি হওয়া জিনিস কোথায় আছে বা কে নিয়েছে---এ সব বলা কি বৈধ?
উত্তর: এ সব অদৃশ্যের খবর এবং ইল্মে গায়বের দাবি। অনুমান অনেক সময় কাজে লাগলেও এমন দাবি বড় গোনাহর কাজ। মুআবিয়াহ ইবনে হাকাম বলেন, একদা আমি নিবেদন করলাম, 'হে আল্লাহর রসূল! আমি জাহেলী যুগের অত্যন্ত নিকটবর্তী (অর্থাৎ আমি অল্পদিন হল অন্ধযুগ থেকে নিষ্কৃতি পেয়েছি) এবং বর্তমানে আল্লাহ আমাকে ইসলামে দীক্ষিত করেছেন। আমাদের কিছু লোক গণকদের নিকট (ভাগ্য- ভবিষ্যৎ জানতে) যায়।' তিনি বললেন, "তুমি তাদের কাছে যেয়ো না।” আমি বললাম, 'আমাদের কিছু লোক অশুভ লক্ষণ মেনে চলে।' তিনি বললেন, "এ এমন জিনিস, যা তারা নিজেদের অন্তরে অনুভব করে। সুতরাং এ (সব ধারণা) যেন তাদেরকে (বাঞ্ছিত কর্মে) বাধা না দেয়।” আমি নিবেদন করলাম, 'আমাদের মধ্যে কিছু লোক দাগ টেনে শুভাশুভ নিরূপণ করে।' তিনি বললেন, "(প্রাচীন যুগে) এক পয়গম্বর দাগ টানতেন। সুতরাং যার দাগ টানার পদ্ধতি উক্ত পয়গম্বরের পদ্ধতি অনুসারে হবে, তা সঠিক বলে বিবেচিত হবে (নচেৎ না)।” (মুসলিম) আর বিদিত যে, কোন নবীর মতো কারোর খবর হতে পারে না। কারণ তাঁর নিকট অহী আসে, কোন সাধারণ মানুষের কাছে নয়। অতএব হাত চালানো এবং হাত চালিয়ে বলা খবরে বিশ্বাস করা বৈধ নয়।

📘 দ্বীনি প্রশ্ন উত্তর 📄 সাহাবা

📄 সাহাবা


প্রশ্নঃ সাহাবাগণের পরবর্তী যুগে কি কোনও মুসলিমের জন্য সাহাবার মর্তবা ও মর্যাদায় পৌঁছনো সম্ভব?
উত্তর: সাহাবগণের মর্তবা ও মর্যাদায় পৌঁছনো কোনক্রমেই সম্ভব নয়। যেহেতু মহানবী বলেছেন, (( خَيْرُكُمْ قَرْنِي ، ثُمَّ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ ، ثُمَّ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ )). متفقٌ عَلَيْهِ অর্থাৎ, “তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম যুগ হল আমার (সাহাবীদের) যুগ। অতঃপর তৎপরবর্তী (তাবেয়ীদের) যুগ। অতঃপর তৎপরবর্তী (তাবে-তাবেয়ীনদের) যুগ।” (বুখারী-মুসলিম) তবে কোন কোন ক্ষেত্রে সাহাবাগণের চাইতে বেশি সওয়াবের অধিকারী হওয়া যায়। যেহেতু নবী বলেছেন, فَإِنَّ مِنْ وَرَائِكُمْ أَيَّامَ الصَّبْرِ ، الصَّابِرُ فِيهِ مِثْلُ الْقَابِضِ عَلَى الْجَمْرِ، لِلْعَامِلِ فِي ذَلِكَ الزَّمَانِ أَجْرُ خَمْسِينَ رَجُلا ، قِيلَ: يَا رَسُولَ اللهِ ، أَجْرُ خَمْسِينَ رَجُلًا مِنَّا أَوْ مِنْهُمْ، قَالَ : لَا بَلْ أَجْرُ خَمْسِينَ رَجُلًا مِنْكُمْ. অর্থাৎ, “তোমাদের পরবর্তীতে আছে ধৈর্যের যুগ। সে (যুগে) ধৈর্যশীল হবে মুষ্টিতে অঙ্গার ধারণকারীর মতো। সে যুগের আমলকারীর হবে পঞ্চাশ জন পুরুষের সমান সওয়াব।” জিজ্ঞাসা করা হল, 'হে আল্লাহর রসূল! পঞ্চাশ জন পুরুষ আমাদের মধ্য হতে, নাকি তাদের মধ্য হতে?' তিনি বললেন, "না, বরং তোমাদের মধ্য হতে!” অন্য বর্ণনায় আছে, "তোমাদের পঞ্চাশজন শহীদের সমান সওয়াব!” (আবু দাউদ, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ, ত্বাবারানী, সঃ জামে' ২২৩৪নং)

সাহাবাগণ ইসলামের প্রারম্ভিককালে কত কষ্ট বরণ করেছেন, কাফেরদের অত্যাচারে কত ধৈর্য ধারণ করেছেন, কত শত বাধা-বিপত্তি উল্লংঘন ক'রে ঈমান ও ইসলামকে যথার্থরূপে পালন ক'রে গেছেন। আর পরবর্তী যুগের ধৈর্যশীল লোকেরাও নানা ফিতনার মাঝে, নানা ভ্রষ্টকারী দল ও মতের মাঝে, সর্বগ্রাসী ও সর্বনাশী ঈমান ও চরিত্র-বিধ্বংসী প্রচারমাধ্যমের মাঝে, অশ্লীলতা ও নোংরামির মাঝে ঈমান টিকিয়ে রাখে। যে সকল ফিতনা ও প্রচারমাধ্যম সাহাবাগণের যুগে ছিল না। তাই তো তাদের পঞ্চাশ গুণ সওয়াব বেশি!

📘 দ্বীনি প্রশ্ন উত্তর 📄 জ্বিন ও শয়তান

📄 জ্বিন ও শয়তান


প্রশ্ন: মনের ভিতরে আল্লাহ ও গায়বী বিষয়সমূহে নানা সন্দেহের সৃষ্টি হলে কী করা উচিত?
উত্তর: (ক) আল্লাহর কাছে শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করা উচিত। (খ) সেই কুমন্ত্রণাকে মন থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা অব্যাহত রাখা উচিত এবং (গ) 'আমানতু বিল্লাহ' অথবা 'আমানতু বিল্লাহি অরুসুলিহ' বলা উচিত। (ইজি)

প্রশ্ন: জ্বিন যাতে কাছে বা বাড়িতে না আসে, সে উদ্দেশ্যে বাঘের ছাল বা মাথা ঘরে রাখা বৈধ কি?
উত্তরঃ না। এ উদ্দেশ্যে বাঘের ছাল বা মাথা (লোহা বা তামার কোন জিনিস, মাদুলি বা অন্য কিছু) ব্যবহার করা বৈধ নয়। (ইজি) বরং শরয়ী দুআ ও যিক্র পড়া উচিত। শিশুকে দুআ-তাবীয নয়, বরং নির্দিষ্ট দুআ পড়ে দুআর তাবীয দেওয়া উচিত। আর তা হল এই, أُعِيذُكُمَا بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّةِ، مِنْ كُلِّ شَيْطَانٍ وَهَامَّةٍ، وَمِنْ كُلِّ عَيْنٍ لأُمَّةٍ. উচ্চারণ: উঈযুকুমা বিকালিমা-তিল্লা-হিত তা-ম্মাহ, মিন কুল্লি শায়ত্বা-নিউ অহা- ম্মাহ, অমিন কুল্লি আইনিল লা-ম্মাহ। অর্থঃ আমি তোমাদেরকে আল্লাহর পরিপূর্ণ বাণীসমূহের অসীলায় প্রত্যেক শয়তান ও কষ্টদায়ক জন্তু হতে এবং প্রত্যেক ক্ষতিকারক (বদ) নজর হতে আল্লাহর পানাহ দিচ্ছি। (বুখারী)

প্রশ্নঃ জ্বিন কি বশ করা যায়?
উত্তর: শয়তান প্রকৃতির জ্বিনকে তুষ্ট ক'রে বশ করা যায়। (ইজি)

প্রশ্নঃ জ্বিন কি কোন মানুষের সাথে যৌন-মিলনে লিপ্ত হতে পারে?
উত্তর: জ্বিন-ইনসানের মিলন অসম্ভব নয়। (ইজি)

প্রশ্নঃ কোন মৃতের 'রূহ' কি হাযির করা যায়?
উত্তর: না। কোন মৃতের 'রূহ' হাযির করা যায় না। তবে তুষ্ট ক'রে শয়তান জ্বিন হাযির করা যায়। (ইজি)

প্রশ্নঃ জ্বিন কি মানুষকে অপহরণ ও হত্যা করতে পারে?
উত্তর: হাদীসে বর্ণিত আছে, খাযরাজের সর্দার সা'দ বিন উবাদাহ জ্বিন কর্তৃক খুন হয়েছিলেন। (ত্বাবাক্বাতে ইবনে সা'দ ৩/৬১৭, মুস্তাদরাক ৩/২৮৩, মুসান্নাফ আঃ রায্যাক্স ১১/৪৩৪) মদীনায় এক সাহাবীকে এক জ্বিন সাপের আকৃতি নিয়ে হত্যা করেছিল। (মুসলিম, মিশকাত ৪১১৮নং) অনুরূপ উমার-এর খেলাফতকালে একজন মুসলিম মুশরিক জ্বিন কর্তৃক অপহৃত হয়। পরিশেষে মুসলিম জ্বিনরা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে তাকে মুক্ত ক'রে আনে। (ইজি)

প্রশ্ন: জ্বিন কর্তৃক খুন-হত্যা, অপহরণ ইত্যাদি সত্য হলে, যাদের জ্বিন বশ আছে, তারা তার দ্বারা বড় বড় অপরাধীদেরকে ধ্বংস করায় না কেন?
উত্তর: তা করাতে গেলে হয়তো বিরোধী জ্বিন তাকে বাধা দেবে। মানুষের যেমন বন্ধু ও শত্রু আছে, তেমনি তাদেরও আছে। আর মানুষের উপকার করতে গিয়ে জ্বিনদের আপোসের গৃহযুদ্ধ বাধবে, যেমন উমার-এর খেলাফতকালে ঘটেছিল。

প্রশ্ন: অনেক সময় রোগী বড় ওঝার কাছে ভাল হয় না। জ্বিন পাওয়ার প্রায় সমস্ত আলামত থাকতেও পরিশেষে ডাক্তারের কাছে ভাল হয়। তাহলে জ্বিন পাওয়ার ব্যাপারটা কি মানসিক রোগ নয়?
উত্তর: হতে পারে। তবে এই শ্রেণীর মানসিক অনেক রোগ কোন ডাক্তারের কাছেও ভাল হয় না। বলা বাহুল্য এই শ্রেণীর রোগ হিস্টিরিয়া হতে পারে, জাদু-ঘটিত হতে পারে, জ্বিন পাওয়া হতে পারে, পরিকল্পিত অভিনয়ও হতে পারে। যার যেমন রোগ, তার তেমন ওষুধ না পড়লে সারবে কেন?

প্রশ্নঃ যে ব্যক্তি জ্বিন অস্বীকার করে, ইসলামে তার বিধান কী?
উত্তর: যে ব্যক্তি জ্বিনের অস্তিত্বই অস্বীকার করে, সে ব্যক্তি কাফের। কারণ কিতাব ও সুন্নাহতে তাদের অস্তিত্ব ও জীবনের কথা আলোচিত হয়েছে। অদৃশ্য জগৎ ফিরিস্তার প্রতি ঈমান যেমন জরুরী, তেমনি জ্বিন জাতির অস্তিত্বের বিশ্বাসও জরুরী। মহান আল্লাহ বলেছেন, {إِنَّهُ يَرَاكُمْ هُوَ وَقَبِيلُهُ مِنْ حَيْثُ لا تَرَوْنَهُمْ} (۲۷) سورة الأعراف অর্থাৎ, নিশ্চয় সে নিজে এবং তার দলবল তোমাদেরকে এমন স্থান হতে দেখে থাকে যে, তোমরা তাদেরকে দেখতে পাও না। (আ'রাফঃ ২৭)

প্রশ্ন: জ্বিন জাতি আগুন থেকে সৃষ্ট। তাদের জান্নাত-জাহান্নাম হলে জাহান্নামের আগুনে আগুন পুড়বে বা শাস্তি পাবে কীভাবে?
উত্তর: আল্লাহর দেওয়া শাস্তিতে অসম্ভব কিছু নেই। মহান আল্লাহ জ্বিনদের কথা উদ্ধৃত ক'রে বলেছেন, {وَأَمَّا الْقَاسِطُونَ فَكَانُوا لِجَهَنَّمَ حَطَبًا} (١٥) سورة الجن অর্থাৎ, অপরপক্ষে সীমালংঘনকারীরা তো জাহান্নামেরই ইন্ধন।' (জ্বিনঃ ১৫) আর বিদিত যে, দুনিয়ার আগুনের চাইতে জাহান্নামের আগুনের তেজ সত্তর গুণ বেশি। অবশ্য এমনও হতে পারে যে, তাদেরকে আযাব দেওয়ার জন্য পৃথক আগুন প্রস্তুত আছে। যেহেতু পরকালের বিষয়াবলী ইহকালের বিষয়াবলী থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। (ইজি) মানুষ মাটি থেকে তৈরি হওয়া সত্ত্বেও যদি মাটির (ঢেলা ইত্যাদির) আঘাতে কষ্ট পায়, তাহলে জ্বিন আগুন থেকে তৈরি হওয়া সত্ত্বেও তাদের আগুন দ্বারা কষ্ট পাওয়া কোন বিচিত্র কথা নয়।

📘 দ্বীনি প্রশ্ন উত্তর 📄 কিতাব ও সুন্নাহ

📄 কিতাব ও সুন্নাহ


প্রশ্ন: রেডিও বা টিভিতে কুরআন শুনতে শুনতে খবরের সময় হলে তা শোনা বাদ দিয়ে খবর শোনা হয়। এ কাজ কি কুরআন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার পর্যায়ে পড়ে?
উত্তর: কুরআন যে কোন সময়ে শোনা যায় এবং কোন ব্যক্তি যদি যথাসময়ে কুরআন শোনে অতঃপর খবরের সময় কুরআনের সেন্টার বা চ্যানেল বন্ধ ক'রে খবর শোনে--- যেহেতু খবর নির্দিষ্ট সময়েই হয়, তাহলে তা কুরআন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার পর্যায়ে পড়বে না। (লাদা)

প্রশ্ন: অনেকের রেডিও, টিভি, টেপ বা মোবাইলে কুরআন তিলাঅত চলতে থাকে এবং তারা আপোসে গল্পতে মগ্ন থাকে। এ আচরণ কি ঠিক?
উত্তর: মোটেই ঠিক নয়। কুরআন তিলাঅত হলে নিশ্চুপ শুনতে হবে। গল্প করলে কুরআন তিলাঅত বন্ধ ক'রে দিতে হবে। যেহেতু মহান আল্লাহ বলেন, {وَإِذَا قُرِئَ الْقُرْآنُ فَاسْتَمِعُوا لَهُ وَأَنصِتُوا لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ} (٢٠٤) سورة الأعراف অর্থাৎ, যখন কুরআন পাঠ করা হয়, তখন তোমরা মনোযোগ সহকারে তা শ্রবণ কর এবং নিশ্চুপ হয়ে থাক; যাতে তোমাদের প্রতি দয়া করা হয়। (আ'রাফঃ ২০৪)

প্রশ্নঃ বিতর্কিত সমস্যায় কার সমাধান গ্রহণ করব?
উত্তর: কোন বিষয়ে মতভেদ থাকলে অথবা একই সময়ে দুই আলেমের ভিন্নমুখী ফতোয়া হলে তাঁর ফতোয়া গ্রহণ করতে হবে, যাঁর ফতোয়া কুরআন ও সহীহ সুন্নাহর বেশি নিকটবর্তী মনে করেন। যাঁকে ইল্ম ও তাক্বওয়ায় বেশি বড় মনে হয়। যেমন একই রোগের দুই ডাক্তারের দুই রকম চিকিৎসা-পদ্ধতি ও রায় শোনেন, তাহলে যাঁকে আপনি বড় ও অভিজ্ঞ ডাক্তার মনে করেন, তাঁর চিকিৎসা ও পথ্য গ্রহণ করবেন।

যদি তুলনা করার উপায় না থাকে, তাহলে যাঁর ফতোয়াটা মানার দিক থেকে সহজ, তাঁর ফতোয়া অনুযায়ী আমল করবেন। যেহেতু দ্বীন সহজ। মহান আল্লাহ বলেছেন, {يُرِيدُ اللهُ بِكُمُ الْيُسْرَ وَلَا يُرِيدُ بِكُمُ الْعُسْرَ} (١٨٥) سورة البقرة অর্থাৎ, আল্লাহ তোমাদের (জন্য যা) সহজ (তা) করতে চান, তিনি তোমাদের কষ্ট চান না। (বাক্বারাহঃ ১৮৫) {مَا يُرِيدُ اللَّهُ لِيَجْعَلَ عَلَيْكُم مِّنْ حَرَجٍ} (٦) سورة المائدة অর্থাৎ, আল্লাহ তোমাদেরকে কোন প্রকার কষ্ট দিতে চান না। (মায়িদাহঃ ৬) {وَمَا جَعَلَ عَلَيْكُمْ فِي الدِّينِ مِنْ حَرَجٍ} (۷৮) سورة الحج অর্থাৎ, তিনি দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের উপর কোন কঠিনতা আরোপ করেননি। (হাজ্জঃ ৭৮)

আর মহানবী বলেছেন, يَسِّرُوا وَلَا تُعَسِّرُوا .... অর্থাৎ, সহজ কর, কঠিন করো না।

আবারও বলি যে, এ হল সাধারণ মানুষের জন্য, যারা নিজে দলীল যাচাই-বাছাই করতে পারে না এবং দুই আলেমের মাঝে পার্থক্য নির্ণয় করতে পারে না। পক্ষান্তরে যাদের সে ক্ষমতা আছে, তাদের জন্য অনুসন্ধান চালিয়ে সঠিক সমাধান জেনে নেওয়া জরুরী। (ইউ)

প্রশ্নঃ অনেক শিক্ষিত মুসলিম পরিবার আছে, যারা কুরআন শেখে না, শিখে থাকলেও নিয়মিত তিলাঅত করে না, তিলাঅত করলেও মানে বুঝে (পড়ে) না, বুঝলেও যথাযথভাবে আমল করে না। এদের আলমারী অথবা দেওয়ালের তাকে বড় যত্নের সাথে কুরআন রাখা থাকে। এদের ব্যাপারে উপদেশ কী?
উত্তর: এই শ্রেণীর মুসলিমরা সেই লোকেদের মতো, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ কুরআন বর্জন করার অভিযোগ রয়েছে। মহান আল্লাহ বলেছেন, {وَقَالَ الرَّسُولُ يَا رَبِّ إِنَّ قَوْمِي اتَّخَذُوا هَذَا الْقُرْآنَ مَهْجُورًا} (٣٠) سورة الفرقان অর্থাৎ, রসূল বলে, 'হে আমার প্রতিপালক! আমার সম্প্রদায় তো এ কুরআনকে পরিত্যাজ্য মনে করেছে।' (ফুরক্বান: ৩০) তাদের মধ্যে এমন লোকও থাকতে পারে, যাদের ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেছেন, {وَمَنْ أَعْرَضَ عَن ذِكْرِي فَإِنَّ لَهُ مَعِيشَةً ضَنكًا وَنَحْشُرُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَعْمَى} (١٢٤) طه অর্থাৎ, যে আমার স্মরণ থেকে বিমুখ হবে, অবশ্যই তার হবে সংকীর্ণতাময় জীবন এবং আমি তাকে কিয়ামতের দিন অন্ধ অবস্থায় উত্থিত করব।' (ত্বা-হাঃ ১২৪) {وَعَرَضْنَا جَهَنَّمَ يَوْمَئِذٍ لِّلْكَافِرِينَ عَرْضًا (۱۰۰) الَّذِينَ كَانَتْ أَعْيُنُهُمْ فِي غِطَاء عَن ذِكْرِي وَكَانُوا لا يَسْتَطِيعُونَ سَمْعًا} (۱۰۱) سورة الكهف অর্থাৎ, সেদিন আমি জাহান্নামকে প্রত্যক্ষভাবে উপস্থিত করব সত্য প্রত্যাখ্যানকারীদের নিকট। যাদের চক্ষু ছিল আমার স্মরণ (কুরআন) এর ব্যাপারে অন্ধ এবং যারা শুনতেও ছিল অপারগ। (কাহফঃ ১০০-১০১)

এদের মধ্যে অনেকে দুনিয়াদার, এরা পত্র-পত্রিকা পড়ে, গল্প-উপন্যাস পড়ে, কিন্তু কুরআন পড়ার সময় পায় না। এই শ্রেণীর লোকদের থেকে বিমুখ হতে নির্দেশ রয়েছে, {فَأَعْرِضْ عَن مَّن تَوَلَّى عَن ذِكْرِنَا وَلَمْ يُرِدْ إِلَّا الْحَيَاةَ الدُّنْيَا (۲۹) ذَلِكَ مَبْلَغُهُمْ مِنَ الْعِلْمِ إِنَّ رَبَّكَ هُوَ أَعْلَمُ بِمَنْ ضَلَّ عَنْ سَبِيلِهِ وَهُوَ أَعْلَمُ بِمَنْ اهْتَدَى} (٣٠) سورة النجم অর্থাৎ, অতএব তাকে উপেক্ষা ক'রে চল, যে আমার স্মরণে বিমুখ এবং যে শুধু পার্থিব জীবনই কামনা করে। তাদের জ্ঞানের দৌড় এই পর্যন্ত। নিশ্চয় তোমার প্রতিপালকই ভাল জানেন, কে তাঁর পথ হতে বিচ্যুত এবং তিনিই ভাল জানেন, কে সৎপথপ্রাপ্ত। (নাজম: ২৯-৩০)

অনেকে কুরআনকে কেবল তাবীয ও মৃতের আত্মার কল্যাণে ব্যবহার করে। অথচ কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে জীবিত মানুষের আমলের জন্য। মহান আল্লাহ বলেছেন, {كِتَابٌ أَنزَلْنَاهُ إِلَيْكَ مُبَارَكٌ لِّيَدَّبَّرُوا آيَاتِهِ وَلِيَتَذَكَّرَ أُولُوا الْأَلْبَابِ} (۲۹) سورة ص অর্থাৎ, আমি এ কল্যাণময় গ্রন্থ তোমার প্রতি অবতীর্ণ করেছি, যাতে মানুষ এর আয়াতসমূহ অনুধাবন করে এবং বুদ্ধিমান ব্যক্তিগণ গ্রহণ করে উপদেশ। (স্বাদঃ ২৯) {إِنَّ الَّذِينَ يَتْلُونَ كِتَابَ اللَّهِ وَأَقَامُوا الصَّلَاةَ وَأَنفَقُوا مِمَّا رَزَقْنَاهُمْ سِرًّا وَعَلَانِيَةً يَرْجُونَ تِجَارَةً لَّن تَبُورَ (۲۹) لِيُوَفِّيَهُمْ أُجُورَهُمْ وَيَزِيدَهُم مِّن فَضْلِهِ إِنَّهُ غَفُورٌ شَكُورٌ} (۳۰) سورة فاطر অর্থাৎ, নিশ্চয় যারা আল্লাহর গ্রন্থ পাঠ করে, যথাযথভাবে নামায পড়ে, আমি তাদেরকে যে রুযী দিয়েছি, তা হতে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে; তারাই আশা করতে পারে এমন ব্যবসার যাতে কখনোই নোকসান হবে না। এ জন্য যে, আল্লাহ তাদেরকে (তাদের কর্মের) পূর্ণ প্রতিদান দেবেন এবং তিনি নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে আরও বেশী দেবেন। তিনি তো ক্ষমাশীল, গুণগ্রাহী। (ফাত্বিরঃ ২৯-৩০)

আর মহানবী বলেছেন, "তোমরা কুরআন পাঠ কর। কেননা, তা কিয়ামতের দিন তার পাঠকারীদের জন্য সুপারিশকারীরূপে উপস্থিত হবে।” (মুসলিম ৮০৪ নং)

"যে ব্যক্তি আল্লাহর কিতাব (কুরআন মাজীদ) এর একটি বর্ণ পাঠ করবে, তার একটি নেকী হবে। আর একটি নেকী, দশটি নেকীর সমান হয়। আমি বলছি না যে, 'আলিফ- লাম-মীম' একটি বর্ণ; বরং আলিফ একটি বর্ণ, লাম একটি বর্ণ এবং মীম একটি বর্ণ।” (অর্থাৎ, তিনটি বর্ণ দ্বারা গঠিত 'আলিফ-লাম-মীম, যার নেকীর সংখ্যা হবে ত্রিশ।) (তিরমিযী)

প্রশ্নঃ উম্মতের ইখতিলাফ কি রহমত?
উত্তর: উম্মতের ইখতিলাফ রহমত নয়। বরং ইবনে মাসউদ বলেছেন, 'ইখতিলাফ খারাপ জিনিস।' (আবু দাউদ ১৯৬০নং) ইখতিলাফ হলে কিতাব ও সুন্নাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করা ওয়াজেব। আর সাহাবাদের ইখতিলাফ ইজতিহাদী। আর ইজতিহাদে ভুল করলেও একটি সওয়াব। কিন্তু ভুল তো ভুলই। সঠিকতা জানার পর আর ইজতিহাদী ভুল বা ইখতিলাফে পড়ে থাকা বৈধ নয়? পরন্ত 'ইখতিলাফ উম্মাতী রাহমাহ' হাদীস সহীহ নয়। (বানী)

ফন্ট সাইজ
15px
17px