📄 অপরাধীদের প্রতি দন্ডবিধি প্রয়োগে ইসলামের বৈশিষ্ট্য
১। অপরাধীর শাস্তি প্রয়োগ করবে শাসন কর্তৃপক্ষ। কোন ব্যক্তিবিশেষ কোন দন্ডবিধি প্রয়োগ করতে পারে না। চোরের হাত কাটা, মৃত্যুদন্ডের যোগ্য ব্যক্তিকে হত্যা করা ইত্যাদি কোন সাধারণ মানুষ করতে পারে না। রাষ্ট্রনেতা বা মুসলিম নেতা ছাড়া ব্যক্তি পর্যায়ে জিহাদ ঘোষণাও করতে পারে না। মহানবী বলেছেন, (إِنَّمَا الإِمَامُ جُنَّةٌ يُقَاتَلُ মִْ وَرَائِهِ وَيُتَّقَى بِهِ). অর্থাৎ, ইমাম (রাষ্ট্রনায়ক) তো ঢাল স্বরূপ; যার আড়ালে থেকে যুদ্ধ করা হয় এবং যার সাহায্যে নিজেকে বাঁচানো যায়। (বুখারী ২৯৫৭, মুসলিম ১৮৪১ নং)
২। পৃথিবীর বুকে অপরাধী গ্রেফতার হয়ে সাজাপ্রাপ্ত হলে পরকালে আর সাজা ভোগ করতে হবে না অথবা পরকালের সাজা হাল্কা হয়ে যাবে।
৩। ইসলামের বিধানে বিদ্রোহী বিশ্বাসঘাতকের সাজা মৃত্যুদন্ড। ইসলাম কাউকে ইসলাম গ্রহণে জোর-জবরদোস্তি করে না। কিন্তু কেউ স্বেচ্ছায় সর্বশেষ ও সৃষ্টিকর্তার একমাত্র মনোনীত দ্বীন ইসলাম গ্রহণ করার পর তা ত্যাগ করলে তাকে বিদ্রোহী বিশ্বাসঘাতক মনে করে। আর তার দ্বারা ইসলামের বিশাল ক্ষতির আশঙ্কা থাকে। তাই তার শাস্তি এত কঠিন। তাছাড়া তার পারলৌকিক শাস্তি তো আছেই। মহান আল্লাহ বলেছেন, {وَمَن يَرْتَدِدْ মִكُم عَن دِينِهِ فَيَمُتْ وَهُوَ كَافِرُ فَأُوْلَئِكَ حَبِطَتْ أَعْمَالُهُمْ فِي الدُّنْيَا وَالآخِرَةِ وَأُوْلَئِكَ أَصْحَابُ النَّارِ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ} (২১৭) অর্থাৎ, তোমাদের মধ্যে যে কেউ নিজ ধর্ম ত্যাগ করে এবং সে সত্যপ্রত্যাখ্যানকারী (কাফের) রূপে মৃত্যুবরণ করে, তাদের ইহকাল ও পরকালের কর্ম নিষ্ফল হয়ে যায়। তারাই দোযখবাসী, সেখানে তারা চিরকাল থাকবে। (বাক্বারাহঃ ২১৭) এ হল মানুষের পঞ্চপ্রয়োজনীয় জিনিসের অন্যতম, ঈমান রক্ষার তাকীদ।
৪। ইসলাম নরহত্যাকে হারাম ঘোষণা করেছে। কেউ কাউকে হত্যা করলে এবং সরকারের হাতে ধরা না পড়লে পরকালে তার শাস্তি জাহান্নাম রেখেছে। ধরা পড়লে তার সাজার ব্যাপারে হত ব্যক্তির ওয়ারেসদেরকে এখতিয়ার দিয়েছে, তারা চাইলে তাকে ক্ষমা করে দিতে পারে অথবা তার প্রাণদন্ড মাফ করে অর্থদন্ড গ্রহণ করতে পারে। মহান আল্লাহ বলেছেন, {يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الْقِصَاصُ فِي الْقَتْلَى الْحُرُّ بِالْحُرِّ وَالْعَبْدُ بالْعَبْدِ وَالأُنثى بالأُنثى فَمَنْ عُفِيَ لَهُ মִْ أَخِيهِ شَيْءٌ فَاتَّبَاعٌ بِالْمَعْرُوفِ وَأَدَاءِ إِلَيْهِ بِإِحْسَانٍ ذَلِكَ تَخْفِيفٌ মِّ رَّبِّكُمْ وَرَحْمَةٌ فَمَنِ اعْتَدَى بَعْدَ ذَلِكَ فَلَهُ عَذَابٌ أَلِيمٌ} (১৭৮) সূরা বাক্বারা
অর্থাৎ, হে বিশ্বাসিগণ! নরহত্যার ব্যাপারে তোমাদের জন্য ক্বিস্বাসের (প্রতিশোধ গ্রহণের বিধান) বিধিবদ্ধ করা হল; স্বাধীন ব্যক্তির বদলে স্বাধীন ব্যক্তি, ক্রীতদাসের বদলে ক্রীতদাস ও নারীর বদলে নারী। কিন্তু তার ভাইয়ের পক্ষ হতে কিছুটা ক্ষমা প্রদর্শন করা হলে, প্রচলিত প্রথার অনুসরণ করা ও সদয়ভাবে তার দেয় পরিশোধ করা উচিত। এ তো তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে ভার লাঘব ও অনুগ্রহ। এর পরও যে সীমালংঘন করে, তার জন্য কঠিন শাস্তি রয়েছে। (বাক্বারাহঃ ১৭৮) তারা সম্মত না হলে সরকারের করার কিছু নেই। খুনের বদলে খুন করা হবে। মহান আল্লাহ বলেছেন, {وَلَكُمْ فِي الْقِصَاصِ حَيَاةٌ يَا أُولِي الْأَلْبَابِ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ} (১৭৯) অর্থাৎ, (হে বুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তিগণ! তোমাদের জন্য ক্বিস্বাসে (প্রতিশোধ গ্রহণের বিধানে) জীবন রয়েছে, যাতে তোমরা সাবধান হতে পার। (বাক্বারাহঃ ১৭৯)
যখন হত্যাকারীর এই ভয় হবে যে, আমাকেও ক্বিস্বাসে হত্যা করা হবে, তখন সে কাউকে হত্যা করতে সাহস পাবে না। যে সমাজে ক্বিস্বাসের আইন বলবৎ থাকে, সে সমাজে এ (ক্বিস্বাসে হত্যা হওয়ার) ভয় সমাজকে হত্যা ও খুনোখুনি থেকে সুরক্ষিত রাখে এবং এরই ফলে সমাজে নিরাপত্তা ও শান্তি প্রতিষ্ঠা লাভ করে। তাছাড়া এ ব্যবস্থা না হলে হত ব্যক্তির ওয়ারেসরা নিজের হাতে বদলা নিতে গিয়ে একটার জায়গায় দুইটা বা তারও বেশি, অনুরূপ পাল্টা আক্রমণে তাদের মধ্যে আরও অনেকে খুন হতে পারে। আর এইভাবে খুনের সিলসিলা চালু থাকলে মানুষের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়। তাই ইসলামের ঐ সুন্দর ব্যবস্থা। আর এ হল মানুষের পঞ্চপ্রয়োজনীয় জিনিসের অন্যতম, প্রাণ রক্ষার তাকীদ।
৫। ইসলাম মানুষের জ্ঞানের কদর করে। ইসলামী ভার অর্পিত হওয়ার একটি শর্তই হল জ্ঞান। জ্ঞানহীন বা জ্ঞানশূন্য মানুষের জন্য ইসলাম ফরয নয়। জ্ঞানবত্তাই মানুষ ও পশুর মাঝে পার্থক্য সূচিত করে। জ্ঞানবত্তাই মানবকে মানবতার উচ্চাসন দান করে। অতএব তার সুরক্ষা ও প্রতিপালনের প্রয়োজন আছে। সেই জ্ঞান উজ্জ্বল করার প্রয়োজন আছে, যে জ্ঞান দিয়ে মানুষ তার সৃষ্টিকর্তাকে খুঁজে নিতে পারে। সৎ ও সঠিক পথ বেছে নিতে পারে। সেই জ্ঞানের সুরক্ষার প্রয়োজন আছে, যা কোন প্রকার বাতিলের অনুপ্রবেশে অথবা অবিশ্বাস ও নাস্তিকতার জীবাণু মিশ্রণে নষ্ট হতে পারে। অথবা কোন মাদকদ্রব্য সেবনের ফলে বিলীন বা দুর্বল হয়ে যেতে পারে। মহান আল্লাহ বলেছেন, {يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالْأَنصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ মِّ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ (৯০) إِنَّمَا يُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَن يُوقِعَ بَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةَ وَالْبَغْضَاء فِي الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ وَيَصُدَّكُمْ عَن ذِكْرِ اللَّهِ وَعَنِ الصَّলَاةِ فَهَلْ أَنتُم মُّنتَهُونَ} (৯১) سورة المائدة
অর্থাৎ, হে বিশ্বাসিগণ! মদ, জুয়া, মূর্তিপূজার বেদী ও ভাগ্যনির্ণায়ক শর ঘৃণ্য বস্তু শয়তানের কাজ। সুতরাং তোমরা তা বর্জন কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার। শয়তান তো মদ ও জুয়া দ্বারা তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ ঘটাতে চায় এবং তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ ও নামাযে বাধা দিতে চায়! অতএব তোমরা কি নিবৃত্ত হবে না? (মায়িদাহঃ ৯০-৯১)
আল্লাহর রসূল বলেন, “যে ব্যক্তি মদ পান করবে সে ব্যক্তির ৪০ দিনের নামায কবুল হবে না। কিন্তু এরপর যদি সে তওবা করে, তবে আল্লাহ তার তওবা গ্রহণ করে নেবেন। অন্যথা যদি সে পুনরায় পান করে, তাহলে অনুরূপ তার ৪০ দিনের নামায কবুল হবে না। যদি এর পরেও সে তওবা করে, তবে আল্লাহ তার তওবা কবুল করে নেবেন। অন্যথা যদি সে তৃতীয়বার পান করে, তাহলে অনুরূপ তার ৪০ দিনের নামায কবুল হবে না। কিন্তু এর পরেও যদি সে তওবা করে, তবে আল্লাহ তার তওবা গ্রহণ করে নেবেন। অন্যথা যদি সে চতুর্থবার তা পান করে, তাহলে অনুরূপ তার ৪০ দিনের নামায কবুল হবে না। কিন্তু এরপরে সে যদি তওবা করে, তবে আল্লাহ তার তওবা কবুল করেন না, তিনি তার প্রতি ক্রোধান্বিত হন এবং (পরকালে) তাকে ‘খাবাল নদী’ থেকে পানীয় পান করাবেন।” ইবনে উমার-কে জিজ্ঞাসা করা হল, 'হে আবু আব্দুর রহমান! ‘খাবাল-নদী’ কী?' উত্তরে তিনি বললেন, 'তা হল জাহান্নামবাসীদের পুঁজ দ্বারা প্রবাহিত (জাহান্নামের) এক নদী।' (তিরমিযী, হাকেম ৪/১৪৬, নাসাঈ, সহীহুল জামে' ৬৩১২-৬৩১৩নং) তিনি আরো বলেন, “যে ব্যক্তি মদ্যপানে অভ্যাস থাকা অবস্থায় মারা যাবে সে ব্যক্তি মূর্তিপূজকের মত (পাপী) হয়ে আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করবে।” (ত্বাবারানীর কাবীর, সিলসিলাহ সহীহাহ ৬৭৭নং) আর এ হল মানুষের পঞ্চপ্রয়োজনীয় জিনিসের অন্যতম, জ্ঞান রক্ষার তাকীদ।
৬। ইসলাম মনুষ্য-সমাজকে পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন দেখতে চায়। অশ্লীলতা ও চারিত্রিক নোংরামি থেকে মানুষকে শুদ্ধ করতে চায়। সুন্দর চরিত্র গঠনের মাঝে উন্নত সমাজ গড়তে চায়। নারী-পুরুষের বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্কের মাধ্যমে সৃষ্ট সকল প্রকার নোংরামি থেকে সমাজকে পবিত্র রাখতে চায়। তাই ইসলাম ব্যভিচারকে হারাম ঘোষণা করে এবং উক্ত কুকর্মের ধারেপাশেও যেতে নিষেধ করে। মহান আল্লাহ বলেন, وَلَا تَق੍ਰَبُوا الزِّنَى إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاء سَبيلاً) (৩২) سورة الإسراء অর্থাৎ, তোমরা ব্যভিচারের নিকটবর্তী হয়ো না, নিশ্চয় তা অশ্লীল ও নিকৃষ্ট আচরণ। (বানী ইস্রাঈল : ৩২)
কিন্তু সে নিষেধ অমান্য করে যে ব্যক্তি ব্যভিচারে লিপ্ত হয়, ইসলাম তাকে সাজা দেয়। মহান আল্লাহ বলেছেন, الزَّانِيَةُ وَالزَّانِي فَاجْلِدُوا كُلَّ وَاحِدٍ মِّهُمَا মِئَةَ جَلْدَةٍ وَلَا تَأْخُذْكُم بِهِمَا رَأْفَةٌ فِي دِينِ اللَّهِ إِن كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْমِ الْآخِرِ وَلْيَشْهَدْ عَذَابَهُمَا طَائِفَةٌ মَِّ الْمُؤْمِنِينَ) (২) سورة النور অর্থাৎ, ব্যভিচারিণী ও ব্যভিচারী---ওদের প্রত্যেককে একশো কশাঘাত কর। আল্লাহর বিধান কার্যকরীকরণে ওদের প্রতি দয়া যেন তোমাদেরকে অভিভূত না করে; যদি তোমরা আল্লাহতে এবং পরকালে বিশ্বাসী হও। আর বিশ্বাসীদের একটি দল যেন ওদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করে। (নূর : ২)
এ হল অবিবাহিত ব্যভিচারী নারী-পুরুষের সাজা। পক্ষান্তরে বিবাহিত ব্যভিচারী নারী-পুরুষের সাজা হল কোমর পর্যন্ত মাটিতে পুঁতে পাথর ছুড়ে হত্যা। এক বেদুইন পরিবারে এক অবিবাহিত যুবক কর্মচারী নিযুক্ত ছিল। বাড়ির বধূর সাথে তার প্রকৃতিগত আকর্ষণ সৃষ্টি হয়েছিল। সংযমের বাঁধ ভাঙ্গলে এক সময় তাদের মাঝে ব্যভিচার সংঘটিত হয়ে গেল! ধরাও পড়ে গেল তারা। লোকমুখে ফতোয়া এল যে, যুবককে পাথর ছুঁড়ে হত্যা করতে হবে। কিন্তু যুবকটির বাপ একশটি বকরী ও একটি ক্রীতদাসী মুক্তিপণ দিয়ে তাকে মুক্ত করে নিল। অতঃপর উলামাদেরকে জিজ্ঞাসা করে জানতে পারল যে, যুবকটিকে ১০০ চাবুক লাগিয়ে এক বছর নির্বাসনে পাঠাতে হবে। আর বধূটিকে পাথর ছুড়ে হত্যা করতে হবে। মহিলাটির স্বামী ও যুবকটির বাপ আল্লাহর রসূল -এর নিকট এসে মহান আল্লাহর কিতাবের ফায়সালা জানতে চাইল। তিনি বললেন, «وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَأَقْضِيَنَّ بَيْنَكُمَا بِكِتَابِ اللَّهِ، الْوَلِيدَةُ وَالْغَنَمُ رَدُّ، وَعَلَى ابْنِكَ جَلْدُ مِائَةٍ وَتَغْرِيبُ عَامٍ ، وَاغْدُ يَا أُنَيْسُ إِلَى امْرَأَةِ هَذَا، فَإِنِ اعْتَرَفَتْ فَارْجُمْهَا ». অর্থাৎ, সেই সত্তার কসম, যার হাতে আমার প্রাণ আছে! আমি অবশ্যই তোমাদের মাঝে আল্লাহর কিতাব দিয়ে ফায়সালা করব। বাঁদী ও বকরী তুমি ফিরে পাবে। তোমার ছেলেকে একশ চাবুক লাগিয়ে এক বছর নির্বাসনে পাঠাতে হবে। আর হে উনাইস! তুমি সকালে এর স্ত্রীর কাছে যাও। অতঃপর সে যদি ব্যভিচারের কথা স্বীকার করে, তাহলে তাকে পাথর ছুড়ে হত্যা করে দাও।” সুতরাং সে ব্যভিচারের কথা স্বীকার করলে তাকে পাথর ছুড়ে হত্যা করা হল। (বুখারী ২৬৯৫, মুসলিম ৪৫৩১নং)
অনুরূপ বিবাহিত-অবিবাহিত সমকামী ও পশুগমনকারীর সাজাও মৃত্যুদন্ড। আল্লাহর রসূল বলেন, “তোমরা যে ব্যক্তিকে লুত নবীর উম্মতের মত সমকামে লিপ্ত পাবে সে ব্যক্তি ও তার সহকর্মীকে হত্যা করে ফেলো।” (আহমাদ, আবু দাউদ ৪৪৬২, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ ২৫৬১, বাইহাকীর শুআবুল ঈমান, সহীহুল জামে' ৬৫৮৯নং) তিনি আরো বলেন, “যে ব্যক্তিকে কোন পশু-সঙ্গমে লিপ্ত পাবে, সে ব্যক্তি ও সে পশুকে তোমরা হত্যা করে ফেলবে।” (তিরমিযী, হাকেম, সহীহুল জামে' ৬৫৮৮নং)
কেউ কোন সতী নারীর প্রতি মিথ্যা অপবাদ দিলে, তার সাজা হল আশি চাবুক। মহান আল্লাহ বলেছেন, وَالَّذِينَ يَرْمُونَ الْمُحْصَنَاتِ ثُمَّ لَمْ يَأْتُوا بِأَرْبَعَةِ شُهَدَاء فَاجْلِدُوهُمْ ثَمَانِينَ جَلْدَةً وَلَا تَقْبَلُوا لَهُمْ شَهَادَةً أَبَدًا وَأُوْلَئِكَ هُمُ الْفাসিকُونَ} (৪) النور অর্থাৎ, যারা সাধী রমণীদের প্রতি অপবাদ আরোপ করে, অতঃপর স্বপক্ষে চারজন সাক্ষী উপস্থিত করে না, তাদেরকে আশি বার কশাঘাত করবে এবং কখনও তাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করবে না; এরাই তো সত্যত্যাগী। (নূর: ৪) আর এ হল মানুষের পঞ্চপ্রয়োজনীয় জিনিসের অন্যতম, মান রক্ষার তাকীদ।
৭। ইসলাম মানুষের ধনরক্ষার তাকীদ দেয়। অন্যের ধন ভক্ষণকে হারাম ঘোষণা করে। সুদ, ঘুস, জুচ্চোরি প্রভৃতি বাতিল উপারে পরের ধন গ্রহণ করতে নিষেধ করে। নিষেধ করে চুরি করতে। ঘোষণা করে চোরের শাস্তি। মহান আল্লাহ বলেন, وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا جَزَاء بِمَا كَسَبَا نَكَالاً মِّ اللَّهِ وَاللَّهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ } (৩৮) سورة المائدة
অর্থাৎ, চোর এবং চোরনীর হাত কেটে ফেলো, এ তাদের কৃতকর্মের ফল এবং আল্লাহর তরফ হতে শাস্তি। বস্তুতঃ আল্লাহ পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়। (মায়িদাহঃ ৩৮)
এ ছাড়া ডাকাতি, রাহাজানি, ছিন্তাই প্রভৃতির মাধ্যমে পৃথিবীর বুকে ফাসাদ ছড়ায়, তাদের জন্য রয়েছে পৃথক শাস্তি। মহান আল্লাহ বলেছেন, {إِنَّمَا جَزَاء الَّذِينَ يُحَارِبُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَيَسْعَوْنَ فِي الْأَرْضِ فَسَادًا أَن يُقَتَّلُوا أَوْ يُصَلَّبُوا أَوْ تُقَطَّعَ أَيْدِيهِمْ وَأَرْجُلُهُم মِّْ خِلافٍ أَوْ يُنفَوْا মִَ الْأَرْضِ ذَلِكَ لَهُمْ خِزْيٌ فِي الدُّنْيَا وَلَهُمْ فِي الآخِرَةِ عَذَابٌ عَظِيمٌ } (৩৩) المائدة অর্থাৎ, যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং পৃথিবীতে ধ্বংসাত্মক কাজ করে (অশান্তি সৃষ্টি করে বেড়ায়) তাদের শাস্তি এই যে, তাদের হত্যা করা হবে অথবা শূলে চড়ানো হবে অথবা বিপরীত দিক হতে তাদের হাত ও পা কেটে ফেলা হবে অথবা তাদেরকে দেশ হতে নির্বাসিত করা হবে। ইহকালে এটাই তাদের লাঞ্ছনা ও পরকালে তাদের জন্য মহাশাস্তি রয়েছে। (মায়িদাহঃ ৩৩) আর এ হল মানুষের পঞ্চপ্রয়োজনীয় জিনিসের অন্যতম, ধন রক্ষার তাকীদ।
📄 পরিশিষ্ট
১। ইসলাম ছাড়া এমন কোন ধর্ম নেই, যে ধর্ম প্রত্যেক ময়দানে জ্ঞান ও বিজ্ঞানের সাথে সামঞ্জস্য রেখে চলতে পারে।
২। ইসলাম ছাড়া এমন কোন ধর্ম নেই, যে ধর্ম আধ্যাত্মিক ও বৈষয়িক উভয় দিকে পরিপূর্ণ।
৩। ইসলাম ছাড়া এমন কোন ধর্ম নেই, যে ধর্ম মানুষকে সভ্যতা ও উন্নয়নের প্রতি আহবান করে।
৪। ইসলাম ছাড়া এমন কোন ধর্ম নেই, যে ধর্মকে সত্য বলে সভ্য জগতের (বহু) দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক সাক্ষ্য দিয়েছেন।
৫। ইসলাম ছাড়া এমন কোন ধর্ম নেই, যে ধর্ম অভিজ্ঞতা দ্বারা উপলব্ধি করা অতি সহজ।
৬। ইসলাম ছাড়া এমন কোন ধর্ম নেই, যে ধর্মের মূলনীতি হল, সমস্ত নবী-রসূল এবং আসমানী গ্রন্থকে সত্য বলে স্বীকার করা।
৭। ইসলাম ছাড়া এমন কোন ধর্ম নেই, যে ধর্মে মানুষের জীবনের প্রয়োজনীয় যাবতীয় বিষয়-বস্তুতে পরিব্যাপ্ত।
৮। ইসলাম ছাড়া এমন কোন ধর্ম নেই, যে ধর্মে অধিক অধিক সরলতা ও নমনীয়তা বিদ্যমান।
৯। ইসলাম ছাড়া এমন কোন ধর্ম নেই, যে ধর্মের সাক্ষ্য দেয় নিত্য-নতুন বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার।
১০। ইসলাম ছাড়া এমন কোন ধর্ম নেই, যে ধর্ম সকল জাতি ও যুগের জন্য উপযোগী।
১১। ইসলাম ছাড়া এমন কোন ধর্ম নেই, যে ধর্ম অনুযায়ী সর্বাবস্থায় আমল করা সহজ।
১২। ইসলাম ছাড়া এমন কোন ধর্ম নেই, যে ধর্মে অতিরঞ্জন (সীমাতিরিক্ততা, অসংযম) ও অবজ্ঞা নেই।
১৩। ইসলাম ছাড়া এমন কোন ধর্ম নেই, যে ধর্মের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ অবিকল সংরক্ষিত ও অবিকৃত আছে।
১৪। ইসলাম ছাড়া এমন কোন ধর্ম নেই, যে ধর্মের ধর্মগ্রন্থ স্পষ্ট ঘোষণা করেছে যে, তা সমগ্র মানব জাতির জন্য অবতীর্ণ।
১৫। ইসলাম ছাড়া এমন কোন ধর্ম নেই, যে ধর্ম সকল প্রকার উপকারী জ্ঞান-বিজ্ঞান শিক্ষা করতে আদেশ দেয়।
১৬। ইসলাম ছাড়া এমন কোন ধর্ম নেই, যে ধর্ম বর্তমান সভ্যতার মূল উৎস।
১৭। ইসলাম ছাড়া এমন কোন ধর্ম নেই, যে ধর্ম বর্তমান ব্যাধিগ্রস্ত সভ্যতার অব্যর্থ ঔষধ হতে পারে।
১৮। ইসলাম ছাড়া এমন কোন ধর্ম নেই, যে ধর্মের সভ্যতা আধ্যাত্মিক ও জাগতিক সকল বিষয়ে পরিব্যাপ্ত।
১৯। ইসলাম ছাড়া এমন কোন ধর্ম নেই, যে ধর্ম দ্বারা বিশ্বশান্তি কায়েম হতে পারে।
২০। ইসলাম ছাড়া এমন কোন ধর্ম নেই, যে ধর্ম বিজ্ঞান-বিশ্লেষণ দ্বারা প্রমাণ সহজ হতে পারে।
২১। ইসলাম ছাড়া এমন কোন ধর্ম নেই, যে ধর্ম সকল মানুষের জন্য অভিন্ন ব্যবহারিক আইন প্রণয়ন করতে পেরেছে।
২২। ইসলাম ছাড়া এমন কোন ধর্ম নেই, যে ধর্ম জাতপাত ও আতরাফ-আশরাফের ভেদাভেদের সকল প্রাচীর তুলে দিয়েছে।
২৩। ইসলাম ছাড়া এমন কোন ধর্ম নেই, যে ধর্ম সামাজিক ও দাম্পত্য ন্যায়-নিষ্ঠা বাস্তবায়িত করেছে।
২৪। ইসলাম ছাড়া এমন কোন ধর্ম নেই, যে ধর্ম মানুষের প্রকৃতি থেকে দূরে নয়।
২৫। ইসলাম ছাড়া এমন কোন ধর্ম নেই, যে ধর্ম স্বৈরতন্ত্র ও একনায়কতন্ত্র প্রতিহত করে পরামর্শ-ভিত্তিক রাজনীতি প্রণয়ন করেছে।
২৬। ইসলাম ছাড়া এমন কোন ধর্ম নেই, যে ধর্ম শত্রুপক্ষের প্রতিও ন্যায় বিচার ও ব্যবহার করতে আদেশ দিয়েছে।
২৭। ইসলাম ছাড়া এমন কোন ধর্ম নেই, যে ধর্মের সুসংবাদ দিয়েছে আসমানী গ্রন্থাবলী।
২৮। ইসলাম ছাড়া এমন কোন ধর্ম নেই, যে ধর্ম নারীকে মা, স্ত্রী ও কন্যা; তার সকল অবস্থায় যথার্থ অধিকার ও মর্যাদা প্রদান করেছে।
২৯। ইসলাম ছাড়া এমন কোন ধর্ম নেই, যে ধর্ম বর্ণ-বৈষম্যের অন্তরাল তুলে দিয়ে শ্বেতকায়-কৃষ্ণকায় এবং আরব-আজমের মাঝে সাম্য প্রতিষ্ঠা করেছে।
৩০। ইসলাম ছাড়া এমন কোন ধর্ম নেই, যে ধর্ম শিক্ষাকে প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য ফরয (আবশ্যিক) করেছে এবং শিক্ষা বা জ্ঞান গুপ্ত করাকে অবৈধ ঘোষণা করেছে।
৩১। ইসলাম ছাড়া এমন কোন ধর্ম নেই, যে ধর্ম আন্তর্জাতিক আইন প্রণয়ন করেছে।
৩২। ইসলাম ছাড়া এমন কোন ধর্ম নেই, যে ধর্মের সুস্বাস্থ্য বিষয়ক উপদেশাবলী আধুনিক চিকিৎসা-বিজ্ঞানের অনুকূল।
৩৩। ইসলাম ছাড়া এমন কোন ধর্ম নেই, যে ধর্ম ক্রীতদাসকে পাশবিক আচরণের হাত থেকে রক্ষা করেছে, প্রভুর সাথে সমতার মর্যাদা রক্ষা করেছে এবং দাসমুক্ত করতে উদ্বুদ্ধ করেছে।
৩৪। ইসলাম ছাড়া এমন কোন ধর্ম নেই, যে ধর্ম বিবেক-বুদ্ধির স্থান রেখেছে এবং তার যুক্তিকে মেনে নিয়েছে।
৩৫। ইসলাম ছাড়া এমন কোন ধর্ম নেই, যে ধর্ম ধনীর নিকট থেকে নির্ধারিত পরিমাণ ধন নিয়ে দরিদ্রের মাঝে বিতরণ করে ধনী-গরীব উভয়কেই রক্ষা করেছে।
৩৬। ইসলাম ছাড়া এমন কোন ধর্ম নেই, যে ধর্ম মানুষের প্রকৃতি ও ঐশ্বরিক হিকমত অনুযায়ী এমন আচার-আচরণ বা চরিত্র নির্ধারণ করেছে, যা প্রয়োজনে কঠোর হতে এবং প্রয়োজনে দয়ার্দ্র হতে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে।
৩৭। ইসলাম ছাড়া এমন কোন ধর্ম নেই, যে ধর্ম সমগ্র সৃষ্টির প্রতি করুণা ও অনুগ্রহ প্রদর্শন করতে আদেশ করেছে।
৩৮। ইসলাম ছাড়া এমন কোন ধর্ম নেই, যে ধর্ম প্রকৃতিগত ভিত্তির উপর দেওয়ানী আইনের মৌলনীতি প্রণয়ন করেছে।
৩৯। ইসলাম ছাড়া এমন কোন ধর্ম নেই, যে ধর্ম মানুষের স্বাস্থ্য ও সম্পদ বিষয়ে বিশেষ যত্ন নিয়েছে।
৪০। ইসলাম ছাড়া এমন কোন ধর্ম নেই, যে ধর্ম হৃদয়, চরিত্র ও বিবেককে প্রভাবান্বিত করতে পেরেছে।
وصلى الله وسلم وبارك على نبينا محمد وعلى آله وصحبه أجمعين والحمد لله الذي جعلنا مسلمين.
(সূত্র: ক্বাত্মারের শরয়ী আদালতের বিচারপতি শায়খ আহমাদ বিন হাজার আল বুত্বামী প্রণীত 'আল-ইসলামু অরাসূল ফী নাযারি মুনসিফীশ শারক্তি অল-গার্ব' ১১৭-১১৯ পৃষ্ঠা থেকে গৃহীত)