📘 দ্বীনে ইসলামের সৌন্দর্য ও বৈশিষ্ট্য > 📄 স্থান-কাল-পাত্রভেদে প্রয়োজনীয়তা ও সমঞ্জসতায় ইসলামের বৈশিষ্ট্য

📄 স্থান-কাল-পাত্রভেদে প্রয়োজনীয়তা ও সমঞ্জসতায় ইসলামের বৈশিষ্ট্য


ইসলাম কালজয়ী ধর্ম। সকল স্থানে সকল মানুষের জন্য তার প্রয়োজনীয়তা আছে। সকল ক্ষেত্রে তার সমঞ্জসতা আছে। প্রত্যেক নতুনত্বের মাঝেও তার গ্রহণযোগ্যতা আছে।

১। ইসলাম মানা কঠিন নয়। ইসলাম সরল ধর্ম। মহান আল্লাহ বলেন, {وَجَاهِدُوا فِي اللَّهِ حَقَّ جِهَادِهِ هُوَ اجْتَبَاكُمْ وَمَا جَعَلَ عَلَيْكُمْ فِي الدِّينِ مِنْ حَرَجٍ مِّلَّةَ أَبِيكُمْ إِبْرَاهِيمَ} (৭৮) অর্থাৎ, তোমরা সংগ্রাম কর আল্লাহর পথে যেভাবে সংগ্রাম করা উচিত; তিনি তোমাদেরকে মনোনীত করেছেন। তিনি দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের উপর কোন কঠিনতা আরোপ করেননি; এটা তোমাদের পিতা ইব্রাহীমের মিল্লাত (ধর্মাদর্শ)। (হাজ্জঃ ৭৮)

২। কারো সাধ্যের অতীত ভার অর্পণ করে না ইসলাম। মহান আল্লাহ বলেন, {لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا لَهَا مَا كَسَبَتْ وَعَلَيْهَا مَا اكْتَسَبَتْ} অর্থাৎ, আল্লাহ কাউকেও তার সাধ্যের অতিরিক্ত দায়িত্ব অর্পণ করেন না। যে ভাল উপার্জন করবে সে তার (প্রতিদান পাবে) এবং যে মন্দ উপার্জন করবে, সে তার (প্রতিফল পাবে)। (বাক্বারাহঃ ২৮৬)

{لِيُنفِقْ ذُو سَعَةٍ مِّن سَعَتِهِ وَمَن قُدِرَ عَلَيْهِ رِزْقُهُ فَلْيُنفِقْ مِمَّا آتَاهُ اللَّهُ لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا مَا آتَاهَا سَيَجْعَلُ اللَّهُ بَعْدَ عُسْرِ يُسْرًا} (৭) الطلاق অর্থাৎ, সামর্থ্যবান নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যয় করবে এবং যার জীবনোপকরণ সীমিত, সে আল্লাহ তাকে যা দান করেছেন তা হতে ব্যয় করবে। আল্লাহ যাকে যে সামর্থ্য দিয়েছেন, তার চেয়ে গুরুতর বোঝা তিনি তার উপর চাপান না। আল্লাহ কষ্টের পর স্বস্তি দান করবেন। (ত্বালাক্বঃ ৭)

{وَالَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لاَ تُكَلِّفُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا أُوْلَئِكَ أَصْحَابُ الْجَنَّةِ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ} (৪২) سورة الأعراف অর্থাৎ, আমি কাউকেও তার সাধ্যাতীত ভার অর্পণ করি না। যারা বিশ্বাস করে ও সৎকাজ করে, তারাই হবে জান্নাতবাসী, সেখানে তারা চিরকাল থাকবে। (আ'রাফঃ ৪২)

{وَلَا تُكَلِّفُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا وَلَدَيْنَا كِتَابٌ يَنطِقُ بِالْحَقِّ وَهُمْ لَا يُظْلَمُونَ} অর্থাৎ, আমি কাউকেও তার সাধ্যাতীত দায়িত্ব অর্পণ করি না এবং আমার নিকট আছে এক গ্রন্থ; যা সত্য ব্যক্ত করে এবং তাদের প্রতি যুলুম করা হবে না। (মু'মিনূনঃ ৬২)

{فَاتَّقُوا اللَّهَ مَا اسْتَطَعْتُمْ وَاسْمَعُوا وَأَطِيعُوا وَأَنفِقُوا خَيْرًا لِّأَنفُسِكُمْ وَمَن يُوقَ شُحَّ نَفْسِهِ فَأُوْلَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ} (১৬) سورة التغابن অর্থাৎ, তোমরা আল্লাহকে যথাসাধ্য ভয় কর এবং শোনো, আনুগত্য কর ও ব্যয় কর, তোমাদের নিজেদেরই কল্যাণ হবে। আর যারা অন্তরের কার্পণ্য হতে মুক্ত, তারাই সফলকাম। (তাগাবুনঃ ১৬)

৩। নিরুপায় বা বাধ্য হলে ইসলামে 'হারাম' জিনিস হালাল হয়ে যায়। মহান আল্লাহ বলেন, {إِنَّمَا حَرَّمَ عَلَيْكُمُ الْمَيْتَةَ وَالدَّمَ وَلَحْمَ الْخِنْزِيرِ وَمَا أُهِلَّ بِهِ لِغَيْرِ اللَّهِ فَمَن اضْطُرَّ غَيْرَ بَاغ وَلَا عَادٍ فَلَا إِثْمَ عَلَيْهِ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ} (১৭৩) البقرة অর্থাৎ, নিশ্চয় (আল্লাহ) তোমাদের জন্য শুধু মৃত জীব, রক্ত, শূকরের মাংস এবং যে সব জন্তুর উপরে (যবেহ কালে) আল্লাহ ছাড়া অন্যের নাম উচ্চারণ করা হয়ে থাকে তা তোমাদের জন্য অবৈধ করেছেন। কিন্তু যে অনন্যোপায় অথচ অন্যায়কারী কিংবা সীমালংঘনকারী নয়, তার কোন পাপ হবে না। আল্লাহ চরম ক্ষমাশীল পরম দয়ালু। (বাক্বারাহঃ ১৭৩)

حُرِّمَتْ عَلَيْكُمُ الْمَيْتَةُ وَالدَّمُ وَلَحْمُ الْخِنْزِيرِ وَمَا أُهِلَّ لِغَيْرِ اللَّهِ بِـهِ وَالْمُنْخَنِقَةُ وَالْمَوْقُوذَةُ وَالْمُتَرَدِّيَةُ وَالنَّطِيحَةُ وَمَا أَكَلَ السَّبُعُ إِلَّا مَا ذَكَّيْتُمْ وَمَا ذُبِحَ عَلَى النُّصُبِ وَأَن تَسْتَقْسِمُوا بِالْأَزْلَام ذَلِكُمْ فِسْقٌ الْيَوْمَ يَئِسَ الَّذِينَ كَفَرُوا مِن دِينِكُمْ فَلَا تَخْشَوْهُمْ وَاخْشَوْنِ الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الإِسلامَ دِينًا فَمَنِ اضْطُرَّ فِي مَخْمَصَةٍ غَيْرَ مُتَجَائِفِ لِّإِثْمٍ فَإِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ) (৩) سورة المائدة
অর্থাৎ, তোমাদের জন্য হারাম (অবৈধ) করা হয়েছে মৃত পশু, রক্ত ও শূকর-মাংস, আল্লাহ ভিন্ন অন্যের নামে উৎসর্গীকৃত পশু, শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মৃত জন্তু, ধারবিহীন কিছু দ্বারা আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে মৃত জন্তু, পতনে মৃত জন্তু, শৃঙ্গাঘাতে মৃত জন্তু এবং হিংস্র পশুর খাওয়া জন্তু; তবে তোমরা যা যবেহ দ্বারা পবিত্র করেছ তা ছাড়া। আর যা মূর্তি পূজার বেদীর উপর বলি দেওয়া হয় তা এবং জুয়ার তীর দ্বারা ভাগ্য নির্ণয় করা, এ সব পাপকার্য। আজ অবিশ্বাসিগণ তোমাদের ধর্মের বিরুদ্ধাচরণে হতাশ হয়েছে। সুতরাং তাদেরকে ভয় করো না, শুধু আমাকে ভয় কর। আজ তোমাদের জন্য তোমাদের ধর্ম (ইসলাম) পূর্ণাঙ্গ করলাম ও তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের ধর্ম হিসাবে মনোনীত করলাম। তবে যদি কেউ ক্ষুধার তাড়নায় (নিষিদ্ধ জিনিষ খেতে) বাধ্য হয়; কিন্তু ইচ্ছা ক'রে পাপের দিকে ঝুঁকে না, তাহলে (তার জন্য) আল্লাহ চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (মায়িদাহঃ ৩)

قُل لا أَجِدُ فِي مَا أُوحِيَ إِلَيَّ مُحَرَّمًا عَلَى طَاعِمٍ يَطْعَمُهُ إِلَّا أَن يَكُونَ مَيْتَةً أَوْ دَمًا مَّسْفُوحًا أَوْ لَحْمَ خِنزير فَإِنَّهُ رِجْسٌ أَوْ فِسْقًا أُهِلَّ لِغَيْرِ اللَّهِ بِهِ فَمَن اضْطُرَّ غَيْرَ بَاغ وَلَا عَادٍ فَإِنَّ رَبَّكَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ} (১৪৫) الأنعام
অর্থাৎ, বল, আমার প্রতি যে প্রত্যাদেশ হয়েছে, তাতে আহারকারী যা আহার করে, তার মধ্যে আমি কিছুই নিষিদ্ধ পাই না। তবে মৃতপ্রাণী, বহমান রক্ত ও শূকরের মাংস; কেননা তা অপবিত্র। অথবা (যবেহকালে) আল্লাহ ছাড়া অন্যের নাম নেওয়ার কারণে যা অবৈধ। তবে কেউ অবাধ্য না হয়ে এবং সীমালংঘন না করে তা গ্রহণে বাধ্য হলে, তোমার প্রতিপালক অবশ্যই চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (আনআম: ১৪৫)

{إِنَّمَا حَرَّমَ عَلَيْكُمُ الْمَيْتَةَ وَالدَّمَ وَلَحْمَ الْخَنزيرِ وَمَا أُهِلَّ لِغَيْرِ اللَّهِ بِهِ فَمَن اضْطُرَّ غَيْرَ بَاغ وَلَا عَادٍ فَإِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ} (১১৫) سورة النحل
অর্থাৎ, আল্লাহ তো শুধু মৃত, রক্ত, শূকরের মাংস এবং যার যবেহকালে আল্লাহর পরিবর্তে অন্যের নাম নেওয়া হয়েছে তা-ই তোমাদের জন্য অবৈধ করেছেন; কিন্তু কেউ অন্যায়কারী কিংবা সীমালংঘনকারী না হয়ে (তা খেতে) অনন্যোপায় হলে নিশ্চয় আল্লাহ চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (নাহল: ১১৫)

{وَمَا لَكُمْ أَلا تَأْكُلُوا مِمَّا ذُكِرَ اسْمُ اللَّهِ عَلَيْهِ وَقَدْ فَصَّلَ لَكُم مَّا حَرَّمَ عَلَيْكُمْ إِلَّا مَا اضْطُرِرْتُمْ إِلَيْهِ وَإِنَّ كَثِيرًا لَّيُضِلُّونَ بِأَهْوَائِهِم بِغَيْرِ عِلْمٍ إِنَّ رَبَّكَ هُوَ أَعْلَمُ بِالْمُعْتَدِينَ} (১১৯) سورة الأنعام
অর্থাৎ, আর তোমাদের কী হয়েছে যে, যার যবেহকালে আল্লাহর নাম নেওয়া হয়েছে, তোমরা তা ভক্ষণ করবে না? অথচ তোমরা নিরুপায় না হলে যা তোমাদের জন্য নিষিদ্ধ, তা তিনি বিশদভাবেই তোমাদের নিকট বিবৃত করেছেন। অনেকে অজ্ঞানতাবশতঃ নিজেদের খেয়াল- খুশী দ্বারা অবশ্যই অন্যকে বিপথগামী করে। নিশ্চয় তোমার প্রতিপালক সীমা লংঘনকারীদের সম্বন্ধে সবিশেষ অবহিত। (আনআম : ১১৯)

৪। ভুল হয়ে গেলে অথবা ভুল করে কিছু করে ফেললে ইসলামে তা ধর্তব্য নয়। মহান আল্লাহ বলেন, {وَلَيْسَ عَلَيْكُمْ جُنَاحٌ فِيمَا أَخْطَأْتُم بِهِ وَلَكِن مَّا تَعَمَّدَتْ قُلُوبُكُمْ وَكَانَ اللَّهُ غَفُورًا رَّحِيمًا } (৫) سورة الأحزاب
অর্থাৎ, যে বিষয়ে তোমরা ভুল কর সে বিষয়ে তোমাদের কোন অপরাধ নেই, কিন্তু তোমাদের আন্তরিক ইচ্ছা থাকলে (তাতে অপরাধ আছে)। আর আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (আহযাবঃ ৫)

এমন ভুলের ক্ষমা চাইতেও ইসলাম নির্দেশ দেয়। মহান আল্লাহ বলেছেন, {لَا يُকَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا لَهَا مَا كَسَبَتْ وَعَلَيْهَا مَا اكْتَسَبَتْ رَبَّنَا لَا تُؤَاخِذْنَا إِن نَّسِينَا أَوْ أَخْطَأْنَا رَبَّنَا وَلَا تَحْمِلْ عَلَيْنَا إِصْرًا كَمَا حَمَلْتَهُ عَلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِنَا رَبَّنَا وَلَا تُحَمِّ لْنَا مَا لاَ طَاقَةَ لَنَا بِهِ وَاعْفُ عَنَّا وَاغْفِرْ لَنَا وَارْحَمْنَا أَنتَ مَوْلَانَا فَانصُرْنَا عَلَى الْقَوْمِ الْكَافِرِينَ} (২৮৬) سورة البقرة
অর্থাৎ, আল্লাহ কাউকেও তার সাধ্যের অতিরিক্ত দায়িত্ব অর্পণ করেন না। যে ভাল উপার্জন করবে সে তার (প্রতিদান পাবে) এবং যে মন্দ উপার্জন করবে, সে তার (প্রতিফল পাবে)। হে আমাদের প্রতিপালক! যদি আমরা বিস্মৃত হই অথবা ভুল করি, তাহলে তুমি আমাদেরকে অপরাধী করো না। হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের পূর্ববর্তিগণের উপর যেমন গুরুদায়িত্ব অর্পণ করেছিলে, আমাদের উপর তেমন দায়িত্ব অর্পণ করো না। হে আমাদের প্রতিপালক! এমন ভার আমাদের উপর অর্পণ করো না, যা বহন করার শক্তি আমাদের নেই। তুমি আমাদেরকে ক্ষমা কর, আমাদের পাপ মোচন কর এবং আমাদের প্রতি দয়া কর। তুমি আমাদের অভিভাবক। অতএব সত্য প্রত্যাখ্যানকারী (কাফের) সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাদেরকে (সাহায্য ও) জয়যুক্ত কর। (বাক্বারাহঃ ২৮৬)

৫। দ্বীনের প্রতি আহবানের ক্ষেত্রেও নম্রতা ও সরলতা প্রয়োগ করার বিধান দিয়েছে ইসলাম। মহান আল্লাহ তাঁর দূতকে বলেছেন, {فَبِمَا رَحْمَةٍ مِّنَ اللَّهِ لِنتَ لَهُمْ وَلَوْ كُنتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَانفَضُّوا مِنْ حَوْলِكَ فَاعْفُ عَنْهُمْ وَاسْتَغْفِرْ لَهُمْ وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَوَكِّلِينَ} (১৫৯) سورة آل عمران
অর্থাৎ, আল্লাহর দয়ায় তুমি তাদের প্রতি হয়েছিলে কোমল-হৃদয়; যদি তুমি রূঢ় ও কঠোর-চিত্ত হতে, তাহলে তারা তোমার আশপাশ হতে সরে পড়ত। সুতরাং তুমি তাদেরকে ক্ষমা কর এবং তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর। আর কাজে-কর্মে তাদের সাথে পরামর্শ কর। অতঃপর তুমি কোন সংকল্প গ্রহণ করলে আল্লাহর প্রতি নির্ভর কর। নিশ্চয় আল্লাহ (তাঁর উপর) নির্ভরশীলদের ভালবাসেন। (আলে ইমরানঃ ১৫৯)

৬। ইসলাম হল মধ্যমপন্থী ধর্ম। কোন বিষয়ে না তাতে অবজ্ঞা করা যাবে, আর না অতিরঞ্জন। মহান আল্লাহ বলেছেন, { وَكَذَلِكَ جَعَلْنَاكُمْ أُمَّةً وَسَطًا لِّتَكُونُوا شُهَدَاء عَلَى النَّاسِ وَيَكُونَ الرَّسُولُ عَلَيْكُمْ شَهِيدًا} (১৪৩) سورة البقرة
অর্থাৎ, এভাবে আমি তোমাদেরকে এক মধ্যপন্থী জাতিরূপে প্রতিষ্ঠিত করেছি, যাতে তোমরা মানব জাতির জন্য সাক্ষীস্বরূপ হতে পার এবং রসূল তোমাদের জন্য সাক্ষীস্বরূপ হবে। (বাক্বারাহঃ ১৪৩)

মহানবী বলেন, “নিশ্চয় দ্বীন সহজ। যে ব্যক্তি অহেতুক দ্বীনকে কঠিন বানাবে, তার উপর দ্বীন জয়ী হয়ে যাবে। (অর্থাৎ মানুষ পরাজিত হয়ে আমল ছেড়ে দেবে।) সুতরাং তোমরা সোজা পথে থাক এবং (ইবাদতে) মধ্যমপন্থা অবলম্বন কর। তোমরা সুসংবাদ নাও। আর সকাল-সন্ধ্যা ও রাতের কিছু অংশে ইবাদত করার মাধ্যমে সাহায্য নাও।” (বুখারী)

বুখারীর অন্য এক বর্ণনায় আছে, “তোমরা সরল পথে থাকো, মধ্যমপন্থা অবলম্বন কর, সকাল-সন্ধ্যায় চল (ইবাদত কর) এবং রাতের কিছু অংশে। আর তোমরা মধ্যমপন্থা অবলম্বন কর, মধ্যমপন্থা অবলম্বন কর, তাহলেই গন্তব্যস্থলে পৌঁছে যাবে।”

সাহাবী আনাস বলেন যে, তিন ব্যক্তি নবী-এর স্ত্রীদের বাসায় এলেন। তাঁরা নবী-এর ইবাদত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন। অতঃপর যখন তাঁদেরকে এর সংবাদ দেওয়া হল তখন তাঁরা যেন তা অল্প মনে করলেন এবং বললেন, 'আমাদের সঙ্গে নবী-এর তুলনা কোথায়? তাঁর তো আগের ও পরের সমস্ত গোনাহ মোচন ক'রে দেওয়া হয়েছে। (সেহেতু আমাদের তাঁর চেয়ে বেশী ইবাদত করা প্রয়োজন)।' সুতরাং তাঁদের মধ্যে একজন বললেন, 'আমি সারা জীবন রাতভর নামায পড়ব।' দ্বিতীয়জন বললেন, 'আমি সারা জীবন রোযা রাখব, কখনো রোযা ছাড়ব না।' তৃতীয়জন বললেন, 'আমি নারী থেকে দূরে থাকব, জীবনভর বিয়েই করব না।' অতঃপর রাসূলুল্লাহ তাঁদের নিকট এলেন এবং বললেন, "তোমরা এই এই কথা বলেছ? শোনো! আল্লাহর কসম! আমি তোমাদের চেয়ে বেশী আল্লাহকে ভয় করি, তার ভয় অন্তরে তোমাদের চেয়ে বেশী রাখি। কিন্তু আমি (নফল) রোযা রাখি এবং রোযা ছেড়েও দিই, নামায পড়ি এবং নিদ্রাও যাই। আর নারীদের বিয়েও করি। সুতরাং যে আমার সুন্নত হতে মুখ ফিরিয়ে নেবে, সে আমার দলভুক্ত নয়।” (বুখারী-মুসলিম)

৭। ইসলামের বিধান পালন করা যে সহজ, তার কিছু নমুনা।
(ক) পবিত্রতা অর্জনের ক্ষেত্রে ইসলামের সহজ বিধান দিয়ে মহান আল্লাহ বলেন, {يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا قُمْتُمْ إِلَى الصَّلاةِ فَاغْسِلُوا وُجُوهَكُمْ وَأَيْدِيَكُمْ إِلَى الْمَرَافِقِ وَامْسَحُوا بِرُؤُوسِكُمْ وَأَرْجُلَكُمْ إِلَى الْكَعْبَينِ وَإِن كُنتُمْ جُنُبًا فَاطْهَرُوا وَإِن كُنتُم مَّرْضَى أَوْ عَلَى سَفَرٍ أَوْ جَاء أَحَدٌ مَّنكُم مِّنَ الْغَائِطِ أَوْ لَأَمَسْتُمُ النِّسَاءِ فَلَمْ تَجِدُوا مَاء فَتَيَمَّمُوا صَعِيدًا طَيِّبًا فَامْسَحُوا بِوُجُوهِكُمْ وَأَيْدِيكُم مِّنْهُ مَا يُرِيدُ اللَّهُ لِيَجْعَلَ عَلَيْكُم مِّن حَرَجٍ وَلَكِن يُرِيدُ لِيُطَهَّরَكُمْ وَلِيُتِمَّ نِعْمَتَهُ عَلَيْكُمْ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ} (৬) سورة المائدة
অর্থাৎ, হে বিশ্বাসিগণ! যখন তোমরা নামাযের জন্য প্রস্তুত হবে, তখন তোমরা তোমাদের মুখমন্ডল ও কনুই পর্যন্ত হাত ধৌত কর এবং তোমাদের মাথা মাসাহ কর এবং পা গ্রন্থি পর্যন্ত ধৌত কর। আর যদি তোমরা অপবিত্র থাক, তাহলে বিশেষভাবে (গোসল ক’রে) পবিত্র হও। যদি তোমরা পীড়িত হও অথবা সফরে থাক অথবা তোমাদের কেউ প্রস্রাব-পায়খানা হতে আগমন করে, অথবা তোমরা স্ত্রী-সহবাস কর এবং পানি না পাও, তাহলে পবিত্র মাটি দ্বারা তায়াম্মুম কর; তা দিয়ে তোমাদের মুখমন্ডল ও হস্তদ্বয় মাসাহ কর। আল্লাহ তোমাদেরকে কোন প্রকার কষ্ট দিতে চান না, বরং তিনি তোমাদেরকে পবিত্র করতে চান ও তোমাদের প্রতি তাঁর অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করতে চান, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন কর। (মায়িদাহঃ ৬)

(খ) সফরে নামায কসর করার (৪ রাকাত নামাযকে ২ রাকাত পড়ার) বিধান দিয়ে মহান আল্লাহ বলেছেন, {وَإِذَا ضَرَبْتُمْ فِي الأَرْضِ فَلَيْسَ عَلَيْكُمْ جُنَاحٌ أَن تَقْصُرُوا مِنَ الصَّلَاةِ إِنْ خِفْتُمْ أَن يَفْتِنَكُمُ الَّذِينَ كَفَرُوا إِنَّ الْكَافِرِينَ كَانُوا لَكُمْ عَدُوًّا مُّبِينًا} (১০১) অর্থাৎ, তোমরা যখন দেশ-বিদেশে সফর করবে, তখন যদি তোমাদের আশংকা হয় যে, অবিশ্বাসিগণ তোমাদেরকে বিপন্ন করবে, তাহলে নামায কসর (সংক্ষিপ্ত) করলে তোমাদের কোন দোষ নেই। নিশ্চয় অবিশ্বাসিগণ তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু। (নিসাঃ ১০১)

সফরে যোহর-আসর এবং মাগরিব-এশাকে একত্রে জমা করার বিধানও আছে। বৃষ্টি ইত্যাদির কারণে মসজিদে যেতে বাধা হলে অনুরূপ নামায জমা করে পড়ার অনুমতি রয়েছে।

(গ) যুদ্ধের ময়দানে নামায সংক্ষেপের বিশেষ বিধান দেওয়া হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেছেন, {وَإِذَا كُنتَ فِيهِمْ فَأَقَمْتَ لَهُمُ الصَّلاةَ فَلْتَقُمْ طَائِفَةٌ মِّنْهُم مَّعَكَ وَلْيَأْخُذُوا أَسْلِحَتَهُمْ فَإِذَا سَجَدُوا فَلْيَكُونُوا مِن وَرَائِكُمْ وَلْتَأْتِ طَائِفَةٌ أُخْرَى لَمْ يُصَلُّوا فَلْيُصَلُّوا مَعَكَ وَلْيَأْخُذُواْ حِدْرَهُمْ وَأَسْلِحَتَهُمْ وَدَّ الَّذِينَ كَفَرُوا لَوْ تَغْفُلُونَ عَنْ أَسْلِحَتِكُمْ وَأَمْتِعَتِكُمْ فَيَمِيلُونَ عَلَيْكُم مَّيْلَةً وَاحِدَةً وَلَا جُنَاحَ عَلَيْكُمْ إِن كَانَ بِكُمْ أَذَى مِّن مَّطَرٍ أَوْ كُنتُمْ مَّرْضَى أَن تَضَعُوا أَسْلِحَتَكُمْ وَخُذُوا حِذْرَكُمْ إِنَّ اللَّهَ أَعَدَّ لِلْكَافِرِينَ عَذَابًا مُّهِينًا (১০২) فَإِذَا قَضَيْتُمُ الصَّلاةَ فَاذْكُرُوا اللَّهَ قِيَامًا وَقُعُودًا وَعَلَى جُنُوبِكُمْ فَإِذَا اطْمَأَنَنتُمْ فَأَقِيمُوا الصَّلاةَ إِنَّ الصَّلَاةَ كَانَتْ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ كِتَابًا مَّوْقُوتًا) (১০৩) سورة النساء
অর্থাৎ, তুমি যখন তাদের মাঝে অবস্থান করবে ও তাদের নিয়ে নামায পড়বে, তখন একদল যেন তোমার সঙ্গে দাঁড়ায়, আর তারা যেন সশস্ত্র থাকে। অতঃপর সিজদাহ করা হলে তারা যেন তোমাদের পিছনে অবস্থান করে; আর অপর একদল যারা নামাযে শরীক হয়নি, তারা তোমার সাথে যেন নামাযে শরীক হয় এবং তারা যেন সতর্ক ও সশস্ত্র থাকে। অবিশ্বাসিগণ কামনা করে, যেন তোমরা তোমাদের অস্ত্র-শস্ত্র ও আসবাবপত্র সম্বন্ধে অসতর্ক হও, যাতে তারা তোমাদের উপর হঠাৎ ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে। আর অস্ত্র রাখাতে তোমাদের কোন দোষ নেই; যদি বৃষ্টি-বাদলের জন্য তোমাদের কষ্ট হয় অথবা তোমাদের অসুখ হয়। কিন্তু অবশ্যই তোমরা হুঁশিয়ার থাকবে। নিশ্চয় আল্লাহ অবিশ্বাসীদের জন্য লাঞ্ছনাকর শাস্তি প্রস্তুত রেখেছেন। তারপর যখন তোমরা নামায শেষ করবে, তখন দাঁড়িয়ে, বসে এবং শুয়ে আল্লাহকে স্মরণ কর। অতঃপর যখন তোমরা নিরাপদ হবে, তখন যথাযথভাবে নামায পড়। নিশ্চয় নামাযকে বিশ্বাসীদের জন্য নির্ধারিত সময়ে অবশ্য কর্তব্য করা হয়েছে। (নিসাঃ ১০২-১০৩)

(ঘ) রোগীর সাধ্যমতো নামায পড়ার বিধান আছে। মহানবী বলেছেন, "তুমি দাঁড়িয়ে নামায পড়। না পারলে বসে পড়। তাও না পারলে পার্শ্বদেশে শুয়ে পড়।” (বুখারী, আবু দাউদ, আহমাদ, মিশকাত ১২৪৮ নং)

(ঙ) নিসাব পরিমাণ না হলে কারো উপর যাকাত ফরয নয়।

(চ) রোযা রাখতে অক্ষম ব্যক্তিদের বিশেষ বিধান দেওয়া হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, أَيَّامًا মَّعْدُودَاتٍ فَمَن كَانَ মִكُم মَّرِيضًا أَوْ عَلَى سَفَرٍ فَعِدَّةٌ মِّ أَيَّامٍ أُخَرَ وَعَلَى الَّذِينَ يُطِيقُونَهُ فِدْيَةٌ طَعَامُ মِسْكِينَ فَمَن تَطَوَّعَ خَيْرًا فَهُوَ خَيْرٌ لَّهُ وَأَن تَصُومُوا خَيْرٌ لَّكُمْ إِن كُنتُمْ تَعْلَمُونَ (১৮৪) شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ هُدًى لِّلنَّاسِ وَبَيِّنَاتٍ মَِّ الْهُدَى وَالْفُرْقَانِ فَمَن شَهِدَ মִكُمُ الشَّهْرَ فَلْيَصُمْهُ وَمن كَانَ مَرِيضًا أَوْ عَلَى سَفَرٍ فَعِدَّةٌ মِّ أَيَّامٍ أُخَرَ يُرِيدُ اللَّهُ بِكُمُ الْيُسْرَ وَلَا يُرِيدُ بِكُمُ الْعُسْرَ وَلِتُكْمِلُوا الْعِدَّةَ وَلِتُكَبِّرُوا اللهَ عَلَى مَا هَدَاكُمْ وَلَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ} (১৮৫)
অর্থাৎ, (রোযা) নির্দিষ্ট কয়েক দিনের জন্য। তোমাদের মধ্যে কেউ অসুস্থ হলে বা সফর অবস্থায় থাকলে অন্য দিনে এ সংখ্যা পূরণ করে নেবে। আর যারা রোযা রাখার সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও রোযা রাখতে চায় না (যারা রোযা রাখতে অক্ষম), তারা এর পরিবর্তে একজন মিসকীনকে খাদ্য দান করবে। পরন্তু যে ব্যক্তি খুশীর সাথে সৎকর্ম করে, তা তার জন্য কল্যাণকর হয়। আর যদি তোমরা রোযা রাখ, তাহলে তা তোমাদের জন্য বিশেষ কল্যাণপ্রসূ; যদি তোমরা উপলব্ধি করতে পার। রমযান মাস, এতে মানুষের দিশারী এবং সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যাসত্যের পার্থক্যকারীরূপে কুরআন অবতীর্ণ করা হয়েছে। অতএব তোমাদের মধ্যে যে কেউ এ মাস পাবে সে যেন তাতে রোযা পালন করে। আর যে অসুস্থ অথবা মুসাফির থাকে, তাকে অন্য দিনে এ সংখ্যা পূরণ করতে হবে। আল্লাহ তোমাদের (জন্য যা) সহজ (তা) করতে চান, তিনি তোমাদের কষ্ট চান না। যেন তোমরা (রোযার) নির্ধারিত সংখ্যা পূরণ করে নিতে পার এবং তোমাদেরকে যে সুপথ দেখিয়েছেন, তার জন্য তোমরা আল্লাহর তকবীর পাঠ (মহিমা বর্ণনা) কর এবং যেন তোমরা কৃতজ্ঞ হতে পার। (বাক্বারাহঃ ১৮৪-১৮৫)

(ছ) যে কাজের কাফ্ফারা আছে, সে কাজ করে ফেললে এবং তা আদায় করতে সক্ষম না হলে মাফ হয়ে যায়। আর আবু হুরাইরা বলেন, একদা আমরা নবী -এর কাছে বসে ছিলাম। এমন সময় তাঁর নিকট এক ব্যক্তি উপস্থিত হয়ে বলল, 'হে আল্লাহর রসূল! আমি ধ্বংসগ্রস্ত হয়ে পড়েছি।' তিনি বললেন, “কোন্ জিনিস তোমাকে ধ্বংসগ্রস্ত ক'রে ফেলল?” লোকটি বলল, 'আমি রোযা অবস্থায় আমার স্ত্রীর সাথে সঙ্গম ক'রে ফেলেছি।' এ কথা শুনে আল্লাহর রসূল তাকে বললেন, “তুমি কি একটি ক্রীতদাস মুক্ত করতে পারবে?” লোকটি বলল, 'জী না।' তিনি বললেন, “তাহলে কি তুমি একটানা দুই মাস রোযা রাখতে পারবে?” সে বলল, 'জী না।' তিনি বললেন, “তাহলে কি তুমি ষাট জন মিসকীনকে খাদ্যদান করতে পারবে?” লোকটি বলল, 'জী না।' কিছুক্ষণ পর নবী এক ঝুড়ি খেজুর এনে বললেন, "এগুলি নিয়ে দান ক'রে দাও।” লোকটি বলল, 'আমার চেয়ে বেশী গরীব মানুষকে হে আল্লাহর রসূল? আল্লাহর কসম! (মদীনার) দুই হারার মাঝে আমার পরিবার থেকে বেশী গরীব অন্য কোন পরিবার নেই!' এ কথা শুনে নবী হেসে ফেললেন এবং তাতে তাঁর ছেদক দাঁত দেখা গেল। অতঃপর বললেন, "তোমার পরিবারকেই তা খেতে দাও!” (বুখারী ১৯৩৭, মুসলিম ১১১১নং)

(জ) আর্থিক ও দৈহিত সামর্থ্য না থাকলে হজ্জ ফরয নয়। মহান আল্লাহ বলেন, وَلِلَّهِ عَلَى النَّاسِ حِجُّ الْبَيْتِ মَنِ اسْتَطَاعَ إِلَيْهِ سَبِيلًا وَمن كَفَرَ فَإِنَّ اللَّهَ غَنِيٌّ عَنِ الْعَالَمِينَ } (৯৭) سورة آل عمران
অর্থাৎ, মানুষের মধ্যে যার সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য আছে, আল্লাহর উদ্দেশ্যে ঐ গৃহের হজ্জ করা তার (পক্ষে) অবশ্য কর্তব্য। আর যে অস্বীকার করবে (সে জেনে রাখুক যে), আল্লাহ জগতের প্রতি অমুখাপেক্ষী। (আলে ইমরানঃ ৯৭)

(ঝ) অক্ষম ব্যক্তিদের জন্য জিহাদ ফরয করা হয়নি। মহান আল্লাহ বলেন, {لَيْسَ عَلَى الضُّعَفَاء وَلَا عَلَى الْمَرْضَى وَلاَ عَلَى الَّذِينَ لَا يَجِدُونَ مَا يُنفِقُونَ حَرَجٌ إِذَا نَصَحُوا لِلَّهِ وَرَسُولِهِ مَا عَلَى الْمُحْسِنِينَ مِن سَبِيلِ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ}
অর্থাৎ, দুর্বল, পীড়িত এবং অর্থব্যয় করতে যারা অসমর্থ তাদের কোন অপরাধ নেই; যদি তারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের প্রতি হিতাকাঙ্ক্ষী হয়। সৎকর্মপরায়ণদের বিরুদ্ধে অভিযোগের কোন পথ নেই। আর আল্লাহ অতিশয় ক্ষমাশীল, পরম করুণাময়। (তাওবাহঃ ৯১)

(ঞ) এমন কিছু সৌন্দর্য আছে, যা আনয়ন করলে সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টিতে পরিবর্তন সাধন করা হয়, তা করতে নিষেধ করা হয়েছে। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ বলেন, 'আল্লাহর অভিশাপ হোক সেই সব নারীদের উপর, যারা দেহাঙ্গে উলকি উৎকীর্ণ করে এবং যারা উৎকীর্ণ করায় এবং সে সব নারীদের উপর, যারা ভ্রূ চেঁছে সরু করে, যারা সৌন্দর্যের মানসে দাঁতের মাঝে ফাঁক সৃষ্টি করে, যারা আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে পরিবর্তন আনে।' জনৈক মহিলা এ ব্যাপারে তাঁর (ইবনে মাসউদের) প্রতিবাদ করলে তিনি বললেন, 'আমি কি তাকে অভিসম্পাত করব না, যাকে আল্লাহর রসূল অভিসম্পাত করেছেন এবং তা আল্লাহর কিতাবে আছে? আল্লাহ বলেছেন, "রসূল যে বিধান তোমাদেরকে দিয়েছেন তা গ্রহণ কর, আর যা থেকে নিষেধ করেছেন, তা থেকে বিরত থাক।” (সূরা হাশ্র ৭ আয়াত, বুখারী ও মুসলিম) কিন্তু কোন বিকৃত অঙ্গে স্বাভাবিক সৌন্দর্য আনয়নকে ইসলাম হারাম বলে না।

(ট) মন্দ কাজে বাধা দেওয়ার পর্যায়ক্রম আছে। সে ক্ষেত্রেও সামর্থ্য বিবেচ্য হয়েছে। মহানবী বলেন, "তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি কোন গর্হিত কাজ দেখবে, সে যেন তা নিজ হাত দ্বারা পরিবর্তন ক'রে দেয়। যদি (তাতে) ক্ষমতা না রাখে, তাহলে নিজ জিভ দ্বারা (উপদেশ দিয়ে পরিবর্তন করে)। যদি (তাতেও) সামর্থ্য না রাখে, তাহলে অন্তর দ্বারা (ঘৃণা করে)। আর এ হল সবচেয়ে দুর্বল ঈমান।” (মুসলিম)

৮। ইসলাম মান্যতার ধর্ম, স্বেচ্ছায় বরণীয় দ্বীন। অনিচ্ছায় বরণ করলে তা কোন কাজে লাগে না। এই জন্য ভাবনা-চিন্তা করে মনে পরিতুষ্ট হয়ে গ্রহণ করতে আহবান জানায়। ইসলাম মানুষকে সৃষ্টিকর্তার পরিচয় দিতে ও এবং সঠিক ধর্মের দিশা দিতে জোর-জবরদস্তি করে না। অবিশ্বাসী নাস্তিককে বিশ্বাসী আস্তিক বানাতে বল প্রয়োগ করে না। মহান আল্লাহ বলেছেন, {لَا إِكْرَاهَ فِي الدِّينِ قَد تَّبَيَّنَ الرُّشْدُ مِنَ الْغَيِّ فَمَنْ يَكْفُرْ بِالطَّاغُوتِ وَيُؤْمِن باللَّهِ فَقَدِ اسْتَمْسَكَ بِالْعُرْوَةِ الْوُثْقَى لَا انفِصَامَ لَهَا وَاللَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ} (২৫৬)
অর্থাৎ, ধর্মের জন্য কোন জোর-জবরদস্তি নেই। নিশ্চয় সুপথ প্রকাশ্যভাবে কুপথ থেকে পৃথক হয়েছে। সুতরাং যে তাগূতকে (অর্থাৎ, আল্লাহ ছাড়া অন্যান্য বাতিল উপাস্যসমূহকে) অস্বীকার করবে ও আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস করবে, নিশ্চয় সে এমন এক শক্ত হাতল ধরবে, যা কখনো ভাঙ্গার নয়। আর আল্লাহ সর্বশ্রোতা, মহাজ্ঞানী। (বাক্বারাহঃ ২৫৬)

{وَلَوْ شَاء رَبُّكَ لَآمَنَ মَن فِي الأَرْضِ كُلُّهُمْ جَمِيعًا أَفَأَنتَ تُكْرِهُ النَّاسَ حَتَّى يَكُونُوا مُؤْمِنِينَ (৯৯) وَمَا كَانَ لِنَفْسٍ أَن تُؤْمِنَ إِلَّا بِإِذْنِ اللَّهِ وَيَجْعَلُ الرِّجْسَ عَلَى الَّذِينَ لَا يَعْقِلُونَ} (১০০) سورة يونس
অর্থাৎ, যদি তোমার প্রতিপালক ইচ্ছা করতেন, তাহলে বিশ্বের সকল লোকই বিশ্বাস করত; তাহলে তুমি কি বিশ্বাসী হওয়ার জন্য মানুষের উপর জবরদস্তি করবে? অথচ আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কারো বিশ্বাস স্থাপন করার সাধ্য নেই; আর আল্লাহ নির্বোধ লোকদের উপর (কুফরীর) অপবিত্রতা স্থাপন ক'রে দেন। (ইউনুসঃ ৯৯-১০০)

৯। ইসলাম মানুষকে চিন্তা-গবেষণা করে সৃষ্টিকর্তা ও তাঁর দ্বীনের পরিচয় পেতে উদ্বুদ্ধ করে। চিন্তা করে দেখো হে মানুষ! তুমি কি স্রষ্টা ছাড়াই সৃষ্ট হয়েছ? أَمْ خُلِقُوا মִْ غَيْرِ شَيْءٍ أَمْ هُمُ الْخَالِقُونَ (৩৫) أَمْ خَلَقُوا السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ بل لا يُوقِنُونَ (৩৬) أَمْ عِنْدَهُمْ خَزَائِنُ رَبِّكَ أَمْ هُمُ الْمُسَيْطِرُونَ} অর্থাৎ, তারা কি কোন কিছু ব্যতিরেকে আপনা-আপনিই সৃষ্ট হয়েছে, না তারা নিজেরাই স্রষ্টা? নাকি তারা আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছে? বরং তারা নিশ্চিত বিশ্বাস রাখে না। নাকি তোমার প্রতিপালকের ভান্ডারসমূহ তাদের নিকট রয়েছে, না তারা এ সমুদয়ের নিয়ন্ত্রক? (তুরঃ ৩৫-৩৭)

প্রকৃতির নিয়মে সব কিছু হলেও, সেই স্রষ্টাই কি নিয়ামক নন? তুমি কি বলতে পারো, ফল আগে, না গাছ আগে? ডিম আগে, না মুরগী আগে? আবার কোন্ মাথায় বল যে, নর প্রথমে বানর ছিল? এ কুবিশ্বাসকে প্রমাণ করার জন্য কোটি-কোটি ডলার ব্যয় কর? দেশ হিসাবে নরের বর্ণ ও ভাষাবৈচিত্র, তোমার নিজের দেহ নিয়ে গবেষণা করে কি সত্যের সন্ধান পাও না? وَفِي الْأَرْضِ آيَاتٌ لِّلْمُوقِنِينَ (২০) وَفِي أَنفُسِكُمْ أَفَلَا تُبْصِرُونَ} (২১) অর্থাৎ, নিশ্চিত বিশ্বাসীদের অনেক নিদর্শন রয়েছে পৃথিবীতে এবং তোমাদের নিজেদের মধ্যেও! তোমরা কি ভেবে দেখবে না? (যারিয়াত : ২০-২১)

সুতরাং, আমি ওদের জন্য আমার নিদর্শনাবলী বিশ্বজগতে ব্যক্ত করব এবং ওদের নিজেদের মধ্যেও; ফলে ওদের নিকট স্পষ্ট হয়ে উঠবে যে, এ (কুরআন) সত্য। এ কি যথেষ্ট নয় যে, তোমার প্রতিপালক সর্ববিষয়ের প্রত্যক্ষদর্শী? (হা-মীম সাজদাহঃ ৫৩)

বিশ্বজগৎ নিয়ে গবেষণা করে দেখো, সে সব কি বিনা স্রষ্টার সৃষ্টি? تَبَارَكَ الَّذِي جَعَلَ فِي السَّمَاءِ بُرُوجًا وَجَعَلَ فِيهَا سِرَاجًا وَقَمَرًا মُّنِيرًا (৬১) وَهُوَ الَّذِي جَعَلَ اللَّيْلَ وَالنَّهَارَ خِلْفَةً لِّمَنْ أَرَادَ أَن يَذَّكَّرَ أَوْ أَرَادَ شُكُورًا} (৬২) سورة الفرقان
অর্থাৎ, কত প্রাচুর্যময় তিনি যিনি নভোমন্ডলে রাশিচক্র সৃষ্টি করেছেন এবং ওতে স্থাপন করেছেন প্রদীপ (সূর্য) ও জ্যোতির্ময় চন্দ্র। এবং যারা উপদেশ গ্রহণ ও কৃতজ্ঞতা করতে ইচ্ছুক তাদের জন্য রাত এবং দিনকে সৃষ্টি করেছেন পরস্পরের অনুগামীরূপে। (ফুরক্বানঃ ৬১-৬২)

هُوَ الَّذِي جَعَلَ الشَّمْسَ ضِيَاء وَالْقَمَرَ نُورًا وَقَدَّرَهُ মَنَازِلَ لِتَعْلَمُوا عَدَدَ السِّنِينَ وَالْحِسَابَ مَا خَلَقَ اللَّهُ ذَلِكَ إِلَّا بِالْحَقِّ يُفَصِّلُ الْآيَاتِ لِقَوْمٍ يَعْلَمُونَ} অর্থাৎ, তিনিই সেই সত্তা যিনি সূর্যকে দীপ্তিমান ও চন্দ্রকে আলোকময় বানিয়েছেন এবং ওর (গতির) জন্যে কক্ষসমূহ নির্ধারিত করেছেন, যাতে তোমরা বছরসমূহের সংখ্যা ও (সময়ের) হিসাব জানতে পার। আল্লাহ এসব বস্তু অযথা সৃষ্টি করেননি, তিনি জ্ঞানবান সম্প্রদায়ের জন্য এই সমস্ত নিদর্শন বিশদভাবে বর্ণনা করেন। (ইউনুসঃ ৫)

فَالِقُ الإِصْبَاحِ وَجَعَلَ اللَّيْلَ سَكَنَا وَالشَّمْسَ وَالْقَمَرَ حُسْبَانًا ذَلِكَ تَقْدِيرُ الْعَزِيزِ الْعَلِيمِ} (৯৬) سورة الأنعام অর্থাৎ, তিনিই ঊষার উন্মেষ ঘটান, আর তিনিই বিশ্রামের জন্য রাত এবং গণনার জন্য চন্দ্র ও সূর্যকে সৃষ্টি করেছেন, এ সব পরাক্রমশালী সর্বজ্ঞ কর্তৃক সুবিন্যস্ত। (আনআম: ৯৬)

{أَفَلَمْ يَنظُرُوا إِلَى السَّمَاء فَوْقَهُمْ كَيْفَ بَنَيْنَاهَا وَزَيَّنَّاهَا وَمَا لَهَا মִ فُرُوجٍ} অর্থাৎ, তারা কি তাদের উপরিস্থিত আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখে না যে, আমি কিভাবে ওটা নির্মাণ করেছি ও তাকে সুশোভিত করেছি এবং ওতে কোন ফাটলও নেই? (ক্বাফ: ৬)

{الَّذِي خَلَقَ سَبْعَ سَمَاوَاتٍ طِبَاقًا مَّا تَرَى فِي خَلْقِ الرَّحْمَنِ মִ تَفَاوُت فَارْجِعِ الْبَصَرَ هَلْ تَرَى মִ فُطُورِ (৩) ثُمَّ ارْجِعِ الْبَصَرَ كَرَّتَيْنِ يَنقَلِبْ إِلَيْكَ الْبَصَرُ خَاسِأَ وَهُوَ حَسِيرٌ (৪) وَلَقَدْ زَيَّنَّا السَّمَاءِ الدُّنْيَا بِمَصَابِيحَ وَجَعَلْنَاهَا رُجُومًا لِّلشَّيَاطِينِ وَأَعْتَدْنَا لَهُمْ عَذَابَ السَّعِيرِ} (৫) سورة الملك অর্থাৎ, তিনি সৃষ্টি করেছেন স্তরে স্তরে সপ্তাকাশ। দয়াময় আল্লাহর সৃষ্টিতে তুমি কোন খুঁত দেখতে পাবে না; আবার তাকিয়ে দেখ, কোন ত্রুটি দেখতে পাচ্ছ কি? অতঃপর তুমি বারবার দৃষ্টি ফিরাও, সেই দৃষ্টি ব্যর্থ ও ক্লান্ত হয়ে তোমার দিকে ফিরে আসবে। আমি নিকটবর্তী আকাশকে প্রদীপমালা দ্বারা সুশোভিত করেছি এবং ওগুলোকে করেছি শয়তানদের প্রতি ক্ষেপণাস্ত্র স্বরূপ এবং তাদের জন্য প্রস্তুত রেখেছি জ্বলন্ত অগ্নির শাস্তি। (মুল্কঃ ৩-৫)

পৃথিবীর বুকে তাকিয়ে দেখো, পর্বত ও নদীমালা, কত রকমের বৃক্ষলতা, ফুল-ফল-ফসল! একই মাটির বুকে একই পানিতে সিঞ্চিত হয়ে সকল গাছ-পালা দর্শনে এক নয়, ডাল-পাতায় এক নয়, ফুল-ফলের রঙ, গন্ধ ও স্বাদে অভিন্ন নয়। একই মাটি ও একই পানির একটি গাছের ফল ঝাল, অন্যটির তেঁতো, মিষ্টি বা টক! মহান আল্লাহ বলেন, وَفِي الْأَرْضِ قِطَعٌ مُتَجَاوَرَاتٌ وَجَنَّاتٌ মِّ أَعْنَابٍ وَزَرْعٌ وَنَخِيلٌ صِنْوَانٌ وَغَيْرُ صِنْوَانٍ يُسْقَى بِمَاء وَاحِدٍ وَنُفَضِّلُ بَعْضَهَا عَلَى بَعْضٍ فِي الْأُكُلِ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَاتٍ لِّقَوْمٍ يَعْقِلُونَ} (৪) سورة الرعد
অর্থাৎ, পৃথিবীতে রয়েছে পরস্পর সংলগ্ন ভূ-খন্ড; ওতে আছে আঙ্গুর-কানন, শস্যক্ষেত্র, একাধিক ফেঁকড়া-বিশিষ্ট অথবা ফেঁকড়াহীন খেজুর বৃক্ষ, যা একই পানিতে সিঞ্চিত হয়ে থাকে। ফল হিসাবে ওগুলির কতককে কতকের উপর আমি উৎকৃষ্টতা দিয়ে থাকি, অবশ্যই বোধশক্তিসম্পন্ন সম্প্রদায়ের জন্য এতে রয়েছে নিদর্শন। (রা'দঃ ৪)

তোমার সৃষ্টি নিয়ে ভেবে দেখো, তোমাদের ছড়ানো বীজ ও অঙ্কুরিত ফসলের কথা, আকাশ থেকে বর্ষণ করা বৃষ্টির কথা এবং আগুনের কথা ভেবে দেখো।
{أَفَرَأَيْتُمْ مَا تُمْنُونَ (৫৮) أَأَنْتُمْ تَخْلُقُونَهُ أَمْ نَحْنُ الْخَالِقُونَ (৫৯) نَحْنُ قَدَّرْنَا بَيْنَكُمُ الْمَوْتَ وَمَا نَحْنُ بِمَسْبُوقِينَ (৬০) عَلَى أَنْ نُبَدِّلَ أَمْثَالَكُمْ وَنُنْشِئُكُمْ فِي مَا لَا تَعْلَمُونَ (৬১) وَلَقَدْ عَلِمْتُمُ النَّشْأَةَ الأُولَى فَلَوْلا تَذَكَّرُونَ (৬২) أَفَرَأَيْتُمْ مَا تَحْرُثُونَ (৬৩) أَأَنْتُمْ تَزْرَعُونَهُ أَمْ نَحْنُ الزَّارِعُونَ (৬৪) لَوْ نَشَاءُ لَجَعَلْنَاهُ حُطَامًا فَظَلَلْتُمْ تَتَفَكَّهُونَ (৬৫) إِنَّا لَمُغْرَمُونَ (৬৬) بَلْ نَحْنُ مَحْرُومُونَ (৬৭) أَفَرَأَيْتُمُ الْمَاءَ الَّذِي تَشْرَبُونَ (৬৮) أَأَنْتُمْ أَنزَلْتُمُوهُ মִْ الْمُزْنِ أَمْ نَحْنُ الْمُنزِلُونَ (৬৯) لَوْ نَشَاءُ جَعَلْنَاهُ أَجَاجاً فَلَوْلا تَشْكُرُونَ (৭০) أَفَرَأَيْتُمْ النَّارَ الَّتِي تُورُونَ (৭১) أَأَنْتُمْ أَنشَأْتُمْ شَجَرَتَهَا أَمْ نَحْنُ الْمُنشِئُونَ (৭২) نَحْنُ جَعَلْنَاهَا تَذْكِرَةً وَمَتَاعاً لِلْمُقْوِينَ) (৭৩) الواقعة
অর্থাৎ, তোমরা কি ভেবে দেখেছ, তোমাদের বীর্যপাত সম্বন্ধে? ওটা কি তোমরা সৃষ্টি কর, না আমি সৃষ্টি করি? আমি তোমাদের জন্য মৃত্যু নির্ধারিত করেছি এবং আমি অক্ষম নই---তোমাদের স্থলে তোমাদের অনুরূপ আনয়ন করতে এবং তোমাদেরকে এমন এক আকৃতি দান করতে, যা তোমরা জান না। তোমরা তো অবগত হয়েছ প্রথম সৃষ্টি সম্বন্ধে। তবে তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর না কেন? তোমরা যে বীজ বপন কর, সে সম্পর্কে চিন্তা করেছ কি? তোমরা কি ওকে অঙ্কুরিত কর, না আমি অঙ্কুরিত করি? আমি ইচ্ছা করলে অবশ্যই একে টুকরা- টুকরা (খড়-কুটায়) পরিণত করতে পারি, তখন হতবুদ্ধি হয়ে পড়বে তোমরা। (বলবে,) 'নিশ্চয় আমরা সর্বনাশগ্রস্ত! বরং আমরা হৃতসর্বস্ব।' তোমরা যে পানি পান কর, সে সম্পর্কে তোমরা চিন্তা করেছ কি? তোমরাই কি তা মেঘ হতে বর্ষণ কর, না আমি বর্ষণ করি? আমি ইচ্ছা করলে ওটা লবণাক্ত ক'রে দিতে পারি। তবুও তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর না কেন? তোমরা যে আগুন জ্বালিয়ে থাক, তা লক্ষ্য ক'রে দেখেছ কি? তোমরাই কি ওর বৃক্ষ সৃষ্টি কর, না আমি সৃষ্টি করি? আমি একে করেছি উপদেশের বিষয় এবং মরুচারীদের প্রয়োজনীয় বস্তু। (ওয়াক্বিআহঃ ৫৮-৭৩)

ভেবে দেখো, এ বিশ্বে কি একাধিক স্রষ্টা, প্রতিপালক, পরিচালক, নিয়ামক বা নিয়ন্তা আছে? مَا اتَّخَذَ اللَّهُ مِ وَلَدٍ وَمَا كَانَ مَعَهُ মִْ إِلَةٍ إِذَا لَّذَهَبَ كُلُّ إِلَهِ بِمَا خَلَقَ وَلَعَلَا بَعْضُهُمْ عَلَى بَعْضٍ سُبْحَانَ اللَّهِ عَمَّا يَصِفُونَ) (৯১) سورة المؤمنون অর্থাৎ, আল্লাহ কোন সন্তান গ্রহণ করেননি এবং তাঁর সাথে অপর কোন উপাস্য নেই; যদি থাকত, তাহলে প্রত্যেক উপাস্য স্বীয় সৃষ্টি নিয়ে পৃথক হয়ে যেত এবং একে অপরের উপর প্রাধান্য বিস্তার করত। তারা যা বলে, তা হতে আল্লাহ কত পবিত্র! (মু'মিনূনঃ ৯১)

{ لَوْ كَانَ فِيهِمَا آلِهَةٌ إِلَّا اللَّهُ لَفَسَدَتَا فَسُبْحَانَ اللَّهِ رَبِّ الْعَرْشِ عَمَّا يَصِفُونَ) (২২) سورة الأنبياء অর্থাৎ, যদি আল্লাহ ব্যতীত আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে বহু উপাস্য থাকত, তাহলে উভয়ই ধ্বংস হয়ে যেত। সুতরাং ওরা যে বর্ণনা দেয়, তা থেকে আরশের অধিপতি আল্লাহ পবিত্র, মহান। (আম্বিয়া: ২২)

📘 দ্বীনে ইসলামের সৌন্দর্য ও বৈশিষ্ট্য > 📄 আত্মীয়তা ও বন্ধুত্বে ইসলামের বৈশিষ্ট্য

📄 আত্মীয়তা ও বন্ধুত্বে ইসলামের বৈশিষ্ট্য


১। ইসলামে পিতামাতার মর্যাদা রয়েছে অনেক। মহান আল্লাহ বলেছেন, وَقَضَى رَبُّكَ أَلا تَعْبُدُوا إِلا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا إِمَّا يَبْلُغَنَّ عِندَكَ الْكِبَرَ أَحَدُهُمَا أَوْ كِلَاهُمَا فَلا تَقُل لَّهُمَا أُفٍّ وَلاَ تَنْهَرْهُمَا وَقُل لَّهُمَا قَوْلاً كَرِيمًا (২৩) وَاخْفِضْ لَهُمَا جَنَاحَ الذُّلِّ মִَ الرَّحْمَةِ وَقُل رَّبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا} (২৪) سورة الإسراء
অর্থাৎ, তোমার প্রতিপালক নির্দেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তিনি ছাড়া অন্য কারো উপাসনা করবে না এবং পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করবে; তাদের এক জন অথবা উভয়েই তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হলে তাদেরকে বিরক্তিসূচক কিছু বলো না এবং তাদেরকে ভর্ৎসনা করো না; বরং তাদের সাথে বলো সম্মানসূচক নম্র কথা। অনুকম্পায় তাদের প্রতি বিনয়াবনত থেকো এবং বলো, 'হে আমার প্রতিপালক! তাদের উভয়ের প্রতি দয়া কর; যেভাবে শৈশবে তারা আমাকে প্রতিপালন করেছে।' (বানী ইস্রাঈল: ২৩-২৪)

মহানবী বলেছেন, "পিতা-মাতা জান্নাতের দুয়ারসমূহের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ দুয়ার। সুতরাং তুমি যদি চাও, তাহলে এ দুয়ারকে নষ্ট কর অথবা তার রক্ষণাবেক্ষণ কর।” (তিরমিযী)

অমুসলিম হলেও তাদের পার্থিব অধিকার আদায় করতে বলা হয়েছে ইসলামে। মহান আল্লাহ বলেছেন, {وَإِن جَاهَدَاكَ عَلى أَن تُشْرِكَ بِي مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ فَلَا تُطِعْهُمَا وَصَاحِبْهُمَا فِي الدُّنْيَا مَعْرُوفًا وَاتَّبِعْ سَبِيلَ মَنْ أَنَابَ إِلَيَّ ثُمَّ إِلَيَّ مَرْجِعُكُمْ فَأُنَبِّئُكُم بِمَا كُنتُمْ تَعْمَلُونَ} (১৫) সূরা লুকমান
অর্থাৎ, তোমার পিতা-মাতা যদি তোমাকে আমার অংশী করতে পীড়াপীড়ি করে, যে বিষয়ে তোমার কোন জ্ঞান নেই, তাহলে তুমি তাদের কথা মান্য করো না, তবে পৃথিবীতে তাদের সঙ্গে সদ্ভাবে বসবাস কর এবং যে ব্যক্তি আমার অভিমুখী হয়েছে তার পথ অবলম্বন কর, অতঃপর আমারই নিকট তোমাদের প্রত্যাবর্তন এবং তোমরা যা করতে, আমি সে বিষয়ে তোমাদেরকে অবহিত করব। (লুক্বমানঃ ১৫)

২। ইসলাম আত্মীয়-স্বজন, অনাথ-দরিদ্র ও প্রতিবেশীর প্রতি অনুগ্রহশীল সদ্ব্যবহার করতে নির্দেশ দিয়েছে। মহান আল্লাহ বলেছেন, وَاعْبُدُوا اللَّهَ وَلَا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا وَبِذِي الْقُرْبَى وَالْيَتَامَى وَالْمَسَاكِينِ وَالْجَارِ ذِي الْقُرْبَى وَالْجَارِ الْجُنُبِ وَالصَّاحِبِ بِالجَنبِ وَابْنِ السَّবিليلِ وَمَا মَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ إِنَّ اللَّهَ لاَ يُحِبُّ মَن كَانَ مُخْتَالاً فَخُورًا}
অর্থাৎ, তোমরা আল্লাহর উপাসনা কর ও কোন কিছুকে তাঁর অংশী করো না এবং পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন, পিতৃহীন, অভাবগ্রস্ত, আত্মীয় ও অনাত্মীয় প্রতিবেশী, সঙ্গী-সাথী, পথচারী এবং তোমাদের অধিকারভুক্ত দাস-দাসীদের প্রতি সদ্ব্যবহার কর। নিশ্চয় আল্লাহ আত্মম্ভরী দাম্ভিককে ভালবাসেন না। (নিসাঃ ৩৬)

দাস-দাসীদের প্রতি যথোচিত ন্যায়াচরণ করতে নির্দেশ দেয় ইসলাম। একদা আবু যার নিজ দাসকে তার মা ধরে খোঁটা দিয়ে কথা বললে, নবী তাঁকে বলেছিলেন, “নিশ্চয় তুমি এমন লোক; যার মধ্যে জাহেলিয়াত আছে।” আবু যার বলেছিলেন, 'আমার বৃদ্ধ বয়সের এই সময়েও?' তিনি বললেন, "হ্যাঁ, ওরা তোমাদের ভাই স্বরূপ। আল্লাহ তাদেরকে তোমাদের মালিকানাধীন করে দিয়েছেন। সুতরাং যে ব্যক্তির ভাইকে আল্লাহ তার মালিকানাধীন করেছেন, সে ব্যক্তি যেন তাকে (দাসকে) তাই খাওয়ায়; যা সে নিজে খায়, তাই পরায় যা সে নিজে পরে এবং এমন কাজের যেন ভার না দেয়, যা করতে সে সক্ষম নয়। পরন্ত যদি সে এমন দুঃসাধ্য কাজের ভার দিয়েই ফেলে, তবে তাতে যেন তাকে সহযোগিতা করে।” (বুখারী ৬০৫০, মুসলিম ১৬৬১নং)

৩। ইসলাম বিধবা ও অনাথ-এতীমদের তত্ত্বাবধান করতে উদ্বুদ্ধ করে। মহানবী বলেন, "আমি এবং নিজের অথবা অপরের অনাথ (এতীমের) তত্ত্বাবধায়ক জান্নাতে (পাশাপাশি) থাকব। আর বিধবা ও দুঃস্থ মানুষকে দেখাশুনাকারী ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় জিহাদকারীর সমতুল্য।” (ত্বাবারানীর আওসাত্ব, সহীহুল জামে' ১৪৭৬নং)

তিনি আরো বলেন, "আমি ও অনাথ (এতীমের) তত্ত্বাবধায়ক জান্নাতে এরূপ (পাশাপাশি) বাস করব।” এর সাথে তিনি তাঁর তর্জনী ও মধ্যমা অঙ্গুলি দ্বারা ইঙ্গিত করলেন এবং দুটির মাঝে একটু ফাঁক করলেন।” (বুখারী ৫৩০৪ নং)

আর তাদের প্রাপ্যের ব্যাপারে ইসলাম বলে, “মজুরকে তার ঘাম শুকাবার পূর্বে তোমরা তার মজুরী দিয়ে দাও।” (সহীহুল জামে' ১০৫৫নং)

৪। আত্মীয় ও বন্ধুদের সম্পর্কে ঘনিষ্ঠতা আনতে বিধান দিয়ে কুরআন বলেছে, {لَيْسَ عَلَى الْأَعْمَى حَرَجٌ وَلَا عَلَى الْأَعْرَجِ حَرَجٌ وَلَا عَلَى الْمَرِيضِ حَرَجٌ وَلَا عَلَى أَنفُسِكُمْ أَن تَأْكُلُوا মִ بُيُوتِكُمْ أَوْ بُيُوتِ آبَائِكُمْ أَوْ بُيُوتِ أُمَّهَاتِكُمْ أَوْ بُيُوتِ إِخْوَانِكُمْ أَوْ بُيُوتِ أَخَوَاتِكُمْ أَوْ بُيُوتِ أَعْمَامِكُمْ أَوْ بُيُوتِ عَمَّاتِكُمْ أَوْ بُيُوتِ أَخْوَالِكُمْ أَوْ بُيُوتِ خَالَاتِكُمْ أَوْ مَا مَلَكْتُم مَّفَاتِحَهُ أَوْ صَدِيقِكُمْ لَيْسَ عَلَيْكُمْ جُنَاحٌ أَن تَأْكُلُوا جَمِيعًا أَوْ أَشْتَاتًا فَإِذَا دَخَلْتُم بُيُوتًا فَسَلِّمُوا عَلَى أَنفُسِكُمْ تَحِيَّةً মِّ عِندِ اللَّهِ مُبَارَكَةً طَيِّبَةً كَذَلِكَ يُبَيِّنُ اللَّهُ لَكُمُ الْآيَاتِ لَعَلَّكُمْ تَعْقِلُونَ} (৬১)
অর্থাৎ, অন্ধের জন্য, খঞ্জের জন্য, রুগ্নের জন্য এবং তোমাদের নিজেদের জন্য তোমাদের নিজেদের গৃহে আহার করা দূষণীয় নয় অথবা তোমাদের পিতৃগণের গৃহে, মাতৃগণের গৃহে, ভ্রাতৃগণের গৃহে, ভগিনীগণের গৃহে, পিতৃব্যদের গৃহে, ফুফুদের গৃহে, মাতুলদের গৃহে, খালাদের গৃহে অথবা সে সব গৃহে যার চাবি তোমাদের হাতে আছে অথবা তোমাদের বন্ধুদের গৃহে; তোমরা একত্রে আহার কর অথবা পৃথক্ পৃথক্কাবে আহার কর, তাতে তোমাদের জন্য কোন অপরাধ নেই; তবে যখন তোমরা গৃহে প্রবেশ করবে, তখন তোমরা তোমাদের স্বজনদের প্রতি সালাম বলবে। এ হবে আল্লাহর নিকট হতে কল্যাণময় ও পবিত্র অভিবাদন। এভাবে তোমাদের জন্য নিদর্শনাবলী বিশদভাবে বিবৃত করেন; যাতে তোমরা বুঝতে পার। (নূর : ৬১)

৫। তা বলে তাদের মাঝে বেগানা নারী-পুরুষের একাকার হওয়াতে অনুমতি দেয়নি। বরং বাড়ি প্রবেশের বিশেষ বিধান দিয়েছে ইসলাম। মহান আল্লাহ বলেছেন, {يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَدْخُلُوا بُيُوتًا غَيْرَ بُيُوتِكُمْ حَتَّى تَسْتَأْنِسُوا وَتُسَلِّمُوا عَلَى أَهْلِهَا ذَلِكُمْ خَيْرٌ لَّكُمْ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ (২৭) فَإِن لَّمْ تَجِدُوا فِيهَا أَحَدًا فَلَا تَدْخُلُوهَا حَتَّى يُؤْذَنَ لَكُمْ وَإِن قِيلَ لَكُمُ ارْجِعُوا فَارْجِعُوا هُوَ أَزْكَى لَكُمْ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ عَلِيمٌ} (২৮) سورة النور
অর্থাৎ, যদি তোমরা গৃহে কাউকেও না পাও, তাহলে তোমাদেরকে যতক্ষণ না অনুমতি দেওয়া হয়, ততক্ষণ ওতে প্রবেশ করবে না। যদি তোমাদেরকে বলা হয়, 'ফিরে যাও' তবে তোমরা ফিরে যাবে; এটিই তোমাদের জন্য উত্তম। আর তোমরা যা কর, সে সম্বন্ধে আল্লাহ সবিশেষ অবহিত। (নূর : ২৮)

৬। ইসলাম বড়দের প্রতি শ্রদ্ধা ও ছোটদের প্রতি স্নেহ করতে নির্দেশ দেয়। আল্লাহর রসূল বলেন, “সে ব্যক্তি আমার উম্মতের দলভুক্ত নয়, যে ব্যক্তি আমাদের বড়দেরকে সম্মান দেয় না, ছোটদেরকে স্নেহ করে না এবং আলেমের অধিকার চেনে না।” (আহমাদ, ত্বাবারানী, হাকেম, সহীহ তারগীব ৯৫নং)

📘 দ্বীনে ইসলামের সৌন্দর্য ও বৈশিষ্ট্য > 📄 অপরাধীদের প্রতি দন্ডবিধি প্রয়োগে ইসলামের বৈশিষ্ট্য

📄 অপরাধীদের প্রতি দন্ডবিধি প্রয়োগে ইসলামের বৈশিষ্ট্য


১। অপরাধীর শাস্তি প্রয়োগ করবে শাসন কর্তৃপক্ষ। কোন ব্যক্তিবিশেষ কোন দন্ডবিধি প্রয়োগ করতে পারে না। চোরের হাত কাটা, মৃত্যুদন্ডের যোগ্য ব্যক্তিকে হত্যা করা ইত্যাদি কোন সাধারণ মানুষ করতে পারে না। রাষ্ট্রনেতা বা মুসলিম নেতা ছাড়া ব্যক্তি পর্যায়ে জিহাদ ঘোষণাও করতে পারে না। মহানবী বলেছেন, (إِنَّمَا الإِمَامُ جُنَّةٌ يُقَاتَلُ মִْ وَرَائِهِ وَيُتَّقَى بِهِ). অর্থাৎ, ইমাম (রাষ্ট্রনায়ক) তো ঢাল স্বরূপ; যার আড়ালে থেকে যুদ্ধ করা হয় এবং যার সাহায্যে নিজেকে বাঁচানো যায়। (বুখারী ২৯৫৭, মুসলিম ১৮৪১ নং)

২। পৃথিবীর বুকে অপরাধী গ্রেফতার হয়ে সাজাপ্রাপ্ত হলে পরকালে আর সাজা ভোগ করতে হবে না অথবা পরকালের সাজা হাল্কা হয়ে যাবে।

৩। ইসলামের বিধানে বিদ্রোহী বিশ্বাসঘাতকের সাজা মৃত্যুদন্ড। ইসলাম কাউকে ইসলাম গ্রহণে জোর-জবরদোস্তি করে না। কিন্তু কেউ স্বেচ্ছায় সর্বশেষ ও সৃষ্টিকর্তার একমাত্র মনোনীত দ্বীন ইসলাম গ্রহণ করার পর তা ত্যাগ করলে তাকে বিদ্রোহী বিশ্বাসঘাতক মনে করে। আর তার দ্বারা ইসলামের বিশাল ক্ষতির আশঙ্কা থাকে। তাই তার শাস্তি এত কঠিন। তাছাড়া তার পারলৌকিক শাস্তি তো আছেই। মহান আল্লাহ বলেছেন, {وَمَن يَرْتَدِدْ মִكُم عَن دِينِهِ فَيَمُتْ وَهُوَ كَافِرُ فَأُوْلَئِكَ حَبِطَتْ أَعْمَالُهُمْ فِي الدُّنْيَا وَالآخِرَةِ وَأُوْلَئِكَ أَصْحَابُ النَّارِ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ} (২১৭) অর্থাৎ, তোমাদের মধ্যে যে কেউ নিজ ধর্ম ত্যাগ করে এবং সে সত্যপ্রত্যাখ্যানকারী (কাফের) রূপে মৃত্যুবরণ করে, তাদের ইহকাল ও পরকালের কর্ম নিষ্ফল হয়ে যায়। তারাই দোযখবাসী, সেখানে তারা চিরকাল থাকবে। (বাক্বারাহঃ ২১৭) এ হল মানুষের পঞ্চপ্রয়োজনীয় জিনিসের অন্যতম, ঈমান রক্ষার তাকীদ।

৪। ইসলাম নরহত্যাকে হারাম ঘোষণা করেছে। কেউ কাউকে হত্যা করলে এবং সরকারের হাতে ধরা না পড়লে পরকালে তার শাস্তি জাহান্নাম রেখেছে। ধরা পড়লে তার সাজার ব্যাপারে হত ব্যক্তির ওয়ারেসদেরকে এখতিয়ার দিয়েছে, তারা চাইলে তাকে ক্ষমা করে দিতে পারে অথবা তার প্রাণদন্ড মাফ করে অর্থদন্ড গ্রহণ করতে পারে। মহান আল্লাহ বলেছেন, {يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الْقِصَاصُ فِي الْقَتْلَى الْحُرُّ بِالْحُرِّ وَالْعَبْدُ بالْعَبْدِ وَالأُنثى بالأُنثى فَمَنْ عُفِيَ لَهُ মִْ أَخِيهِ شَيْءٌ فَاتَّبَاعٌ بِالْمَعْرُوفِ وَأَدَاءِ إِلَيْهِ بِإِحْسَانٍ ذَلِكَ تَخْفِيفٌ মِّ رَّبِّكُمْ وَرَحْمَةٌ فَمَنِ اعْتَدَى بَعْدَ ذَلِكَ فَلَهُ عَذَابٌ أَلِيمٌ} (১৭৮) সূরা বাক্বারা
অর্থাৎ, হে বিশ্বাসিগণ! নরহত্যার ব্যাপারে তোমাদের জন্য ক্বিস্বাসের (প্রতিশোধ গ্রহণের বিধান) বিধিবদ্ধ করা হল; স্বাধীন ব্যক্তির বদলে স্বাধীন ব্যক্তি, ক্রীতদাসের বদলে ক্রীতদাস ও নারীর বদলে নারী। কিন্তু তার ভাইয়ের পক্ষ হতে কিছুটা ক্ষমা প্রদর্শন করা হলে, প্রচলিত প্রথার অনুসরণ করা ও সদয়ভাবে তার দেয় পরিশোধ করা উচিত। এ তো তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে ভার লাঘব ও অনুগ্রহ। এর পরও যে সীমালংঘন করে, তার জন্য কঠিন শাস্তি রয়েছে। (বাক্বারাহঃ ১৭৮) তারা সম্মত না হলে সরকারের করার কিছু নেই। খুনের বদলে খুন করা হবে। মহান আল্লাহ বলেছেন, {وَلَكُمْ فِي الْقِصَاصِ حَيَاةٌ يَا أُولِي الْأَلْبَابِ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ} (১৭৯) অর্থাৎ, (হে বুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তিগণ! তোমাদের জন্য ক্বিস্বাসে (প্রতিশোধ গ্রহণের বিধানে) জীবন রয়েছে, যাতে তোমরা সাবধান হতে পার। (বাক্বারাহঃ ১৭৯)

যখন হত্যাকারীর এই ভয় হবে যে, আমাকেও ক্বিস্বাসে হত্যা করা হবে, তখন সে কাউকে হত্যা করতে সাহস পাবে না। যে সমাজে ক্বিস্বাসের আইন বলবৎ থাকে, সে সমাজে এ (ক্বিস্বাসে হত্যা হওয়ার) ভয় সমাজকে হত্যা ও খুনোখুনি থেকে সুরক্ষিত রাখে এবং এরই ফলে সমাজে নিরাপত্তা ও শান্তি প্রতিষ্ঠা লাভ করে। তাছাড়া এ ব্যবস্থা না হলে হত ব্যক্তির ওয়ারেসরা নিজের হাতে বদলা নিতে গিয়ে একটার জায়গায় দুইটা বা তারও বেশি, অনুরূপ পাল্টা আক্রমণে তাদের মধ্যে আরও অনেকে খুন হতে পারে। আর এইভাবে খুনের সিলসিলা চালু থাকলে মানুষের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়। তাই ইসলামের ঐ সুন্দর ব্যবস্থা। আর এ হল মানুষের পঞ্চপ্রয়োজনীয় জিনিসের অন্যতম, প্রাণ রক্ষার তাকীদ।

৫। ইসলাম মানুষের জ্ঞানের কদর করে। ইসলামী ভার অর্পিত হওয়ার একটি শর্তই হল জ্ঞান। জ্ঞানহীন বা জ্ঞানশূন্য মানুষের জন্য ইসলাম ফরয নয়। জ্ঞানবত্তাই মানুষ ও পশুর মাঝে পার্থক্য সূচিত করে। জ্ঞানবত্তাই মানবকে মানবতার উচ্চাসন দান করে। অতএব তার সুরক্ষা ও প্রতিপালনের প্রয়োজন আছে। সেই জ্ঞান উজ্জ্বল করার প্রয়োজন আছে, যে জ্ঞান দিয়ে মানুষ তার সৃষ্টিকর্তাকে খুঁজে নিতে পারে। সৎ ও সঠিক পথ বেছে নিতে পারে। সেই জ্ঞানের সুরক্ষার প্রয়োজন আছে, যা কোন প্রকার বাতিলের অনুপ্রবেশে অথবা অবিশ্বাস ও নাস্তিকতার জীবাণু মিশ্রণে নষ্ট হতে পারে। অথবা কোন মাদকদ্রব্য সেবনের ফলে বিলীন বা দুর্বল হয়ে যেতে পারে। মহান আল্লাহ বলেছেন, {يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالْأَنصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ মِّ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ (৯০) إِنَّمَا يُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَن يُوقِعَ بَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةَ وَالْبَغْضَاء فِي الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ وَيَصُدَّكُمْ عَن ذِكْرِ اللَّهِ وَعَنِ الصَّলَاةِ فَهَلْ أَنتُم মُّنتَهُونَ} (৯১) سورة المائدة
অর্থাৎ, হে বিশ্বাসিগণ! মদ, জুয়া, মূর্তিপূজার বেদী ও ভাগ্যনির্ণায়ক শর ঘৃণ্য বস্তু শয়তানের কাজ। সুতরাং তোমরা তা বর্জন কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার। শয়তান তো মদ ও জুয়া দ্বারা তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ ঘটাতে চায় এবং তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ ও নামাযে বাধা দিতে চায়! অতএব তোমরা কি নিবৃত্ত হবে না? (মায়িদাহঃ ৯০-৯১)

আল্লাহর রসূল বলেন, “যে ব্যক্তি মদ পান করবে সে ব্যক্তির ৪০ দিনের নামায কবুল হবে না। কিন্তু এরপর যদি সে তওবা করে, তবে আল্লাহ তার তওবা গ্রহণ করে নেবেন। অন্যথা যদি সে পুনরায় পান করে, তাহলে অনুরূপ তার ৪০ দিনের নামায কবুল হবে না। যদি এর পরেও সে তওবা করে, তবে আল্লাহ তার তওবা কবুল করে নেবেন। অন্যথা যদি সে তৃতীয়বার পান করে, তাহলে অনুরূপ তার ৪০ দিনের নামায কবুল হবে না। কিন্তু এর পরেও যদি সে তওবা করে, তবে আল্লাহ তার তওবা গ্রহণ করে নেবেন। অন্যথা যদি সে চতুর্থবার তা পান করে, তাহলে অনুরূপ তার ৪০ দিনের নামায কবুল হবে না। কিন্তু এরপরে সে যদি তওবা করে, তবে আল্লাহ তার তওবা কবুল করেন না, তিনি তার প্রতি ক্রোধান্বিত হন এবং (পরকালে) তাকে ‘খাবাল নদী’ থেকে পানীয় পান করাবেন।” ইবনে উমার-কে জিজ্ঞাসা করা হল, 'হে আবু আব্দুর রহমান! ‘খাবাল-নদী’ কী?' উত্তরে তিনি বললেন, 'তা হল জাহান্নামবাসীদের পুঁজ দ্বারা প্রবাহিত (জাহান্নামের) এক নদী।' (তিরমিযী, হাকেম ৪/১৪৬, নাসাঈ, সহীহুল জামে' ৬৩১২-৬৩১৩নং) তিনি আরো বলেন, “যে ব্যক্তি মদ্যপানে অভ্যাস থাকা অবস্থায় মারা যাবে সে ব্যক্তি মূর্তিপূজকের মত (পাপী) হয়ে আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করবে।” (ত্বাবারানীর কাবীর, সিলসিলাহ সহীহাহ ৬৭৭নং) আর এ হল মানুষের পঞ্চপ্রয়োজনীয় জিনিসের অন্যতম, জ্ঞান রক্ষার তাকীদ।

৬। ইসলাম মনুষ্য-সমাজকে পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন দেখতে চায়। অশ্লীলতা ও চারিত্রিক নোংরামি থেকে মানুষকে শুদ্ধ করতে চায়। সুন্দর চরিত্র গঠনের মাঝে উন্নত সমাজ গড়তে চায়। নারী-পুরুষের বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্কের মাধ্যমে সৃষ্ট সকল প্রকার নোংরামি থেকে সমাজকে পবিত্র রাখতে চায়। তাই ইসলাম ব্যভিচারকে হারাম ঘোষণা করে এবং উক্ত কুকর্মের ধারেপাশেও যেতে নিষেধ করে। মহান আল্লাহ বলেন, وَلَا تَق੍ਰَبُوا الزِّنَى إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاء سَبيلاً) (৩২) سورة الإسراء অর্থাৎ, তোমরা ব্যভিচারের নিকটবর্তী হয়ো না, নিশ্চয় তা অশ্লীল ও নিকৃষ্ট আচরণ। (বানী ইস্রাঈল : ৩২)

কিন্তু সে নিষেধ অমান্য করে যে ব্যক্তি ব্যভিচারে লিপ্ত হয়, ইসলাম তাকে সাজা দেয়। মহান আল্লাহ বলেছেন, الزَّانِيَةُ وَالزَّانِي فَاجْلِدُوا كُلَّ وَاحِدٍ মِّهُمَا মِئَةَ جَلْدَةٍ وَلَا تَأْخُذْكُم بِهِمَا رَأْفَةٌ فِي دِينِ اللَّهِ إِن كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْমِ الْآخِرِ وَلْيَشْهَدْ عَذَابَهُمَا طَائِفَةٌ মَِّ الْمُؤْمِنِينَ) (২) سورة النور অর্থাৎ, ব্যভিচারিণী ও ব্যভিচারী---ওদের প্রত্যেককে একশো কশাঘাত কর। আল্লাহর বিধান কার্যকরীকরণে ওদের প্রতি দয়া যেন তোমাদেরকে অভিভূত না করে; যদি তোমরা আল্লাহতে এবং পরকালে বিশ্বাসী হও। আর বিশ্বাসীদের একটি দল যেন ওদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করে। (নূর : ২)

এ হল অবিবাহিত ব্যভিচারী নারী-পুরুষের সাজা। পক্ষান্তরে বিবাহিত ব্যভিচারী নারী-পুরুষের সাজা হল কোমর পর্যন্ত মাটিতে পুঁতে পাথর ছুড়ে হত্যা। এক বেদুইন পরিবারে এক অবিবাহিত যুবক কর্মচারী নিযুক্ত ছিল। বাড়ির বধূর সাথে তার প্রকৃতিগত আকর্ষণ সৃষ্টি হয়েছিল। সংযমের বাঁধ ভাঙ্গলে এক সময় তাদের মাঝে ব্যভিচার সংঘটিত হয়ে গেল! ধরাও পড়ে গেল তারা। লোকমুখে ফতোয়া এল যে, যুবককে পাথর ছুঁড়ে হত্যা করতে হবে। কিন্তু যুবকটির বাপ একশটি বকরী ও একটি ক্রীতদাসী মুক্তিপণ দিয়ে তাকে মুক্ত করে নিল। অতঃপর উলামাদেরকে জিজ্ঞাসা করে জানতে পারল যে, যুবকটিকে ১০০ চাবুক লাগিয়ে এক বছর নির্বাসনে পাঠাতে হবে। আর বধূটিকে পাথর ছুড়ে হত্যা করতে হবে। মহিলাটির স্বামী ও যুবকটির বাপ আল্লাহর রসূল -এর নিকট এসে মহান আল্লাহর কিতাবের ফায়সালা জানতে চাইল। তিনি বললেন, «وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَأَقْضِيَنَّ بَيْنَكُمَا بِكِتَابِ اللَّهِ، الْوَلِيدَةُ وَالْغَنَمُ رَدُّ، وَعَلَى ابْنِكَ جَلْدُ مِائَةٍ وَتَغْرِيبُ عَامٍ ، وَاغْدُ يَا أُنَيْسُ إِلَى امْرَأَةِ هَذَا، فَإِنِ اعْتَرَفَتْ فَارْجُمْهَا ». অর্থাৎ, সেই সত্তার কসম, যার হাতে আমার প্রাণ আছে! আমি অবশ্যই তোমাদের মাঝে আল্লাহর কিতাব দিয়ে ফায়সালা করব। বাঁদী ও বকরী তুমি ফিরে পাবে। তোমার ছেলেকে একশ চাবুক লাগিয়ে এক বছর নির্বাসনে পাঠাতে হবে। আর হে উনাইস! তুমি সকালে এর স্ত্রীর কাছে যাও। অতঃপর সে যদি ব্যভিচারের কথা স্বীকার করে, তাহলে তাকে পাথর ছুড়ে হত্যা করে দাও।” সুতরাং সে ব্যভিচারের কথা স্বীকার করলে তাকে পাথর ছুড়ে হত্যা করা হল। (বুখারী ২৬৯৫, মুসলিম ৪৫৩১নং)

অনুরূপ বিবাহিত-অবিবাহিত সমকামী ও পশুগমনকারীর সাজাও মৃত্যুদন্ড। আল্লাহর রসূল বলেন, “তোমরা যে ব্যক্তিকে লুত নবীর উম্মতের মত সমকামে লিপ্ত পাবে সে ব্যক্তি ও তার সহকর্মীকে হত্যা করে ফেলো।” (আহমাদ, আবু দাউদ ৪৪৬২, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ ২৫৬১, বাইহাকীর শুআবুল ঈমান, সহীহুল জামে' ৬৫৮৯নং) তিনি আরো বলেন, “যে ব্যক্তিকে কোন পশু-সঙ্গমে লিপ্ত পাবে, সে ব্যক্তি ও সে পশুকে তোমরা হত্যা করে ফেলবে।” (তিরমিযী, হাকেম, সহীহুল জামে' ৬৫৮৮নং)

কেউ কোন সতী নারীর প্রতি মিথ্যা অপবাদ দিলে, তার সাজা হল আশি চাবুক। মহান আল্লাহ বলেছেন, وَالَّذِينَ يَرْمُونَ الْمُحْصَنَاتِ ثُمَّ لَمْ يَأْتُوا بِأَرْبَعَةِ شُهَدَاء فَاجْلِدُوهُمْ ثَمَانِينَ جَلْدَةً وَلَا تَقْبَلُوا لَهُمْ شَهَادَةً أَبَدًا وَأُوْلَئِكَ هُمُ الْفাসিকُونَ} (৪) النور অর্থাৎ, যারা সাধী রমণীদের প্রতি অপবাদ আরোপ করে, অতঃপর স্বপক্ষে চারজন সাক্ষী উপস্থিত করে না, তাদেরকে আশি বার কশাঘাত করবে এবং কখনও তাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করবে না; এরাই তো সত্যত্যাগী। (নূর: ৪) আর এ হল মানুষের পঞ্চপ্রয়োজনীয় জিনিসের অন্যতম, মান রক্ষার তাকীদ।

৭। ইসলাম মানুষের ধনরক্ষার তাকীদ দেয়। অন্যের ধন ভক্ষণকে হারাম ঘোষণা করে। সুদ, ঘুস, জুচ্চোরি প্রভৃতি বাতিল উপারে পরের ধন গ্রহণ করতে নিষেধ করে। নিষেধ করে চুরি করতে। ঘোষণা করে চোরের শাস্তি। মহান আল্লাহ বলেন, وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا جَزَاء بِمَا كَسَبَا نَكَالاً মِّ اللَّهِ وَاللَّهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ } (৩৮) سورة المائدة
অর্থাৎ, চোর এবং চোরনীর হাত কেটে ফেলো, এ তাদের কৃতকর্মের ফল এবং আল্লাহর তরফ হতে শাস্তি। বস্তুতঃ আল্লাহ পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়। (মায়িদাহঃ ৩৮)

এ ছাড়া ডাকাতি, রাহাজানি, ছিন্তাই প্রভৃতির মাধ্যমে পৃথিবীর বুকে ফাসাদ ছড়ায়, তাদের জন্য রয়েছে পৃথক শাস্তি। মহান আল্লাহ বলেছেন, {إِنَّمَا جَزَاء الَّذِينَ يُحَارِبُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَيَسْعَوْنَ فِي الْأَرْضِ فَسَادًا أَن يُقَتَّلُوا أَوْ يُصَلَّبُوا أَوْ تُقَطَّعَ أَيْدِيهِمْ وَأَرْجُلُهُم মِّْ خِلافٍ أَوْ يُنفَوْا মִَ الْأَرْضِ ذَلِكَ لَهُمْ خِزْيٌ فِي الدُّنْيَا وَلَهُمْ فِي الآخِرَةِ عَذَابٌ عَظِيمٌ } (৩৩) المائدة অর্থাৎ, যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং পৃথিবীতে ধ্বংসাত্মক কাজ করে (অশান্তি সৃষ্টি করে বেড়ায়) তাদের শাস্তি এই যে, তাদের হত্যা করা হবে অথবা শূলে চড়ানো হবে অথবা বিপরীত দিক হতে তাদের হাত ও পা কেটে ফেলা হবে অথবা তাদেরকে দেশ হতে নির্বাসিত করা হবে। ইহকালে এটাই তাদের লাঞ্ছনা ও পরকালে তাদের জন্য মহাশাস্তি রয়েছে। (মায়িদাহঃ ৩৩) আর এ হল মানুষের পঞ্চপ্রয়োজনীয় জিনিসের অন্যতম, ধন রক্ষার তাকীদ।

📘 দ্বীনে ইসলামের সৌন্দর্য ও বৈশিষ্ট্য > 📄 পরিশিষ্ট

📄 পরিশিষ্ট


১। ইসলাম ছাড়া এমন কোন ধর্ম নেই, যে ধর্ম প্রত্যেক ময়দানে জ্ঞান ও বিজ্ঞানের সাথে সামঞ্জস্য রেখে চলতে পারে।
২। ইসলাম ছাড়া এমন কোন ধর্ম নেই, যে ধর্ম আধ্যাত্মিক ও বৈষয়িক উভয় দিকে পরিপূর্ণ।
৩। ইসলাম ছাড়া এমন কোন ধর্ম নেই, যে ধর্ম মানুষকে সভ্যতা ও উন্নয়নের প্রতি আহবান করে।
৪। ইসলাম ছাড়া এমন কোন ধর্ম নেই, যে ধর্মকে সত্য বলে সভ্য জগতের (বহু) দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক সাক্ষ্য দিয়েছেন।
৫। ইসলাম ছাড়া এমন কোন ধর্ম নেই, যে ধর্ম অভিজ্ঞতা দ্বারা উপলব্ধি করা অতি সহজ।
৬। ইসলাম ছাড়া এমন কোন ধর্ম নেই, যে ধর্মের মূলনীতি হল, সমস্ত নবী-রসূল এবং আসমানী গ্রন্থকে সত্য বলে স্বীকার করা।
৭। ইসলাম ছাড়া এমন কোন ধর্ম নেই, যে ধর্মে মানুষের জীবনের প্রয়োজনীয় যাবতীয় বিষয়-বস্তুতে পরিব্যাপ্ত।
৮। ইসলাম ছাড়া এমন কোন ধর্ম নেই, যে ধর্মে অধিক অধিক সরলতা ও নমনীয়তা বিদ্যমান।
৯। ইসলাম ছাড়া এমন কোন ধর্ম নেই, যে ধর্মের সাক্ষ্য দেয় নিত্য-নতুন বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার।
১০। ইসলাম ছাড়া এমন কোন ধর্ম নেই, যে ধর্ম সকল জাতি ও যুগের জন্য উপযোগী।
১১। ইসলাম ছাড়া এমন কোন ধর্ম নেই, যে ধর্ম অনুযায়ী সর্বাবস্থায় আমল করা সহজ।
১২। ইসলাম ছাড়া এমন কোন ধর্ম নেই, যে ধর্মে অতিরঞ্জন (সীমাতিরিক্ততা, অসংযম) ও অবজ্ঞা নেই।
১৩। ইসলাম ছাড়া এমন কোন ধর্ম নেই, যে ধর্মের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ অবিকল সংরক্ষিত ও অবিকৃত আছে।
১৪। ইসলাম ছাড়া এমন কোন ধর্ম নেই, যে ধর্মের ধর্মগ্রন্থ স্পষ্ট ঘোষণা করেছে যে, তা সমগ্র মানব জাতির জন্য অবতীর্ণ।
১৫। ইসলাম ছাড়া এমন কোন ধর্ম নেই, যে ধর্ম সকল প্রকার উপকারী জ্ঞান-বিজ্ঞান শিক্ষা করতে আদেশ দেয়।
১৬। ইসলাম ছাড়া এমন কোন ধর্ম নেই, যে ধর্ম বর্তমান সভ্যতার মূল উৎস।
১৭। ইসলাম ছাড়া এমন কোন ধর্ম নেই, যে ধর্ম বর্তমান ব্যাধিগ্রস্ত সভ্যতার অব্যর্থ ঔষধ হতে পারে।
১৮। ইসলাম ছাড়া এমন কোন ধর্ম নেই, যে ধর্মের সভ্যতা আধ্যাত্মিক ও জাগতিক সকল বিষয়ে পরিব্যাপ্ত।
১৯। ইসলাম ছাড়া এমন কোন ধর্ম নেই, যে ধর্ম দ্বারা বিশ্বশান্তি কায়েম হতে পারে।
২০। ইসলাম ছাড়া এমন কোন ধর্ম নেই, যে ধর্ম বিজ্ঞান-বিশ্লেষণ দ্বারা প্রমাণ সহজ হতে পারে।
২১। ইসলাম ছাড়া এমন কোন ধর্ম নেই, যে ধর্ম সকল মানুষের জন্য অভিন্ন ব্যবহারিক আইন প্রণয়ন করতে পেরেছে।
২২। ইসলাম ছাড়া এমন কোন ধর্ম নেই, যে ধর্ম জাতপাত ও আতরাফ-আশরাফের ভেদাভেদের সকল প্রাচীর তুলে দিয়েছে।
২৩। ইসলাম ছাড়া এমন কোন ধর্ম নেই, যে ধর্ম সামাজিক ও দাম্পত্য ন্যায়-নিষ্ঠা বাস্তবায়িত করেছে।
২৪। ইসলাম ছাড়া এমন কোন ধর্ম নেই, যে ধর্ম মানুষের প্রকৃতি থেকে দূরে নয়।
২৫। ইসলাম ছাড়া এমন কোন ধর্ম নেই, যে ধর্ম স্বৈরতন্ত্র ও একনায়কতন্ত্র প্রতিহত করে পরামর্শ-ভিত্তিক রাজনীতি প্রণয়ন করেছে।
২৬। ইসলাম ছাড়া এমন কোন ধর্ম নেই, যে ধর্ম শত্রুপক্ষের প্রতিও ন্যায় বিচার ও ব্যবহার করতে আদেশ দিয়েছে।
২৭। ইসলাম ছাড়া এমন কোন ধর্ম নেই, যে ধর্মের সুসংবাদ দিয়েছে আসমানী গ্রন্থাবলী।
২৮। ইসলাম ছাড়া এমন কোন ধর্ম নেই, যে ধর্ম নারীকে মা, স্ত্রী ও কন্যা; তার সকল অবস্থায় যথার্থ অধিকার ও মর্যাদা প্রদান করেছে।
২৯। ইসলাম ছাড়া এমন কোন ধর্ম নেই, যে ধর্ম বর্ণ-বৈষম্যের অন্তরাল তুলে দিয়ে শ্বেতকায়-কৃষ্ণকায় এবং আরব-আজমের মাঝে সাম্য প্রতিষ্ঠা করেছে।
৩০। ইসলাম ছাড়া এমন কোন ধর্ম নেই, যে ধর্ম শিক্ষাকে প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য ফরয (আবশ্যিক) করেছে এবং শিক্ষা বা জ্ঞান গুপ্ত করাকে অবৈধ ঘোষণা করেছে।
৩১। ইসলাম ছাড়া এমন কোন ধর্ম নেই, যে ধর্ম আন্তর্জাতিক আইন প্রণয়ন করেছে।
৩২। ইসলাম ছাড়া এমন কোন ধর্ম নেই, যে ধর্মের সুস্বাস্থ্য বিষয়ক উপদেশাবলী আধুনিক চিকিৎসা-বিজ্ঞানের অনুকূল।
৩৩। ইসলাম ছাড়া এমন কোন ধর্ম নেই, যে ধর্ম ক্রীতদাসকে পাশবিক আচরণের হাত থেকে রক্ষা করেছে, প্রভুর সাথে সমতার মর্যাদা রক্ষা করেছে এবং দাসমুক্ত করতে উদ্বুদ্ধ করেছে।
৩৪। ইসলাম ছাড়া এমন কোন ধর্ম নেই, যে ধর্ম বিবেক-বুদ্ধির স্থান রেখেছে এবং তার যুক্তিকে মেনে নিয়েছে।
৩৫। ইসলাম ছাড়া এমন কোন ধর্ম নেই, যে ধর্ম ধনীর নিকট থেকে নির্ধারিত পরিমাণ ধন নিয়ে দরিদ্রের মাঝে বিতরণ করে ধনী-গরীব উভয়কেই রক্ষা করেছে।
৩৬। ইসলাম ছাড়া এমন কোন ধর্ম নেই, যে ধর্ম মানুষের প্রকৃতি ও ঐশ্বরিক হিকমত অনুযায়ী এমন আচার-আচরণ বা চরিত্র নির্ধারণ করেছে, যা প্রয়োজনে কঠোর হতে এবং প্রয়োজনে দয়ার্দ্র হতে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে।
৩৭। ইসলাম ছাড়া এমন কোন ধর্ম নেই, যে ধর্ম সমগ্র সৃষ্টির প্রতি করুণা ও অনুগ্রহ প্রদর্শন করতে আদেশ করেছে।
৩৮। ইসলাম ছাড়া এমন কোন ধর্ম নেই, যে ধর্ম প্রকৃতিগত ভিত্তির উপর দেওয়ানী আইনের মৌলনীতি প্রণয়ন করেছে।
৩৯। ইসলাম ছাড়া এমন কোন ধর্ম নেই, যে ধর্ম মানুষের স্বাস্থ্য ও সম্পদ বিষয়ে বিশেষ যত্ন নিয়েছে।
৪০। ইসলাম ছাড়া এমন কোন ধর্ম নেই, যে ধর্ম হৃদয়, চরিত্র ও বিবেককে প্রভাবান্বিত করতে পেরেছে।

وصلى الله وسلم وبارك على نبينا محمد وعلى آله وصحبه أجمعين والحمد لله الذي جعلنا مسلمين.

(সূত্র: ক্বাত্মারের শরয়ী আদালতের বিচারপতি শায়খ আহমাদ বিন হাজার আল বুত্বামী প্রণীত 'আল-ইসলামু অরাসূল ফী নাযারি মুনসিফীশ শারক্তি অল-গার্ব' ১১৭-১১৯ পৃষ্ঠা থেকে গৃহীত)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00