📘 দ্বীনে ইসলামের সৌন্দর্য ও বৈশিষ্ট্য > 📄 ধন-সম্পদ বিষয়ে ইসলামের বৈশিষ্ট্য

📄 ধন-সম্পদ বিষয়ে ইসলামের বৈশিষ্ট্য


১। ইসলাম পরের ধন অবৈধ কোন উপায়ে গ্রহণ করতে নিষেধ করে। অসদুপায়ে উপার্জন করতে নিষেধ করে। মহান আল্লাহ বলেছেন, {يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ لاَ تَأْكُلُواْ أَمْوَالَكُمْ بَيْنَكُمْ بِالْبَاطِلِ إِلَّا أَن تَكُونَ تِجَارَةً عَن تَرَاضٍ মِّكُم وَلَا تَقْتُلُوا أَنفُসَكُمْ إِنَّ اللَّهَ كَانَ بِكُمْ رَحِيمًا} অর্থাৎ, হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা একে অন্যের সম্পত্তি অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না। তবে তোমাদের পরস্পর সম্মতিক্রমে ব্যবসার মাধ্যমে (গ্রহণ করলে তা বৈধ)। আর নিজেদেরকে হত্যা করো না; নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের প্রতি পরম দয়ালু। (নিসাঃ ২৯)

২। ইসলাম পার্থিব কোন স্বার্থে ঋণ দিতে নিষেধ করে, সূদ খেতে নিষেধ করে। মহান আল্লাহ বলেছেন, {الَّذِينَ يَأْكُلُونَ الرِّبَا لَا يَقُومُونَ إِلَّا كَمَا يَقُومُ الَّذِي يَتَخَبَّطُهُ الشَّيْطَانُ মִَ الْمَسِّ ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ قَالُوا إِنَّمَا الْبَيْعُ মִثْلُ الرِّبَا وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا فَمَن جَاءَهُ مَوْعِظَةٌ মِّ রَّبِّهِ فَانتَهَى فَلَهُ مَا سَلَفَ وَأَمْرُهُ إِلَى اللَّهِ وَمَنْ عَادَ فَأُوْلَئِكَ أَصْحَابُ النَّارِ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ} (২৭৫) সূরা বাকারা অর্থাৎ, যারা সূদ খায় তারা (কিয়ামতে) সেই ব্যক্তির মত দন্ডায়মান হবে, যাকে শয়তান স্পর্শ দ্বারা পাগল ক'রে দিয়েছে। তা এ জন্য যে তারা বলে, 'ব্যবসা তো সূদের মতই।' অথচ আল্লাহ ব্যবসাকে বৈধ ও সুদকে অবৈধ করেছেন। অতএব যার কাছে তার প্রতিপালকের উপদেশ এসেছে, তারপর সে (সূদ খাওয়া থেকে) বিরত হয়েছে, সুতরাং (নিষিদ্ধ হওয়ার পূর্বে) যা অতীত হয়েছে, তা তার (জন্য ক্ষমার্হ হবে), আর তার ব্যাপার আল্লাহর এখতিয়ারভুক্ত। কিন্তু যারা পুনরায় (সূদ খেতে) আরম্ভ করবে, তারাই দোযখবাসী; সেখানে তারা চিরকাল থাকবে। (বাক্বারাহঃ ২৭৫)

{يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَذَرُوا مَا بَقِيَ মִَ الرِّبَا إِن كُنتُم মُّؤْمِنِينَ (২৭৮) فَإِن لَّমْ تَفْعَلُوا فَأْذَنُوا بِحَرْبٍ মَِّ اللهِ وَرَسُولِهِ وَإِن تُبْتُمْ فَلَكُمْ رُؤُوسُ أَمْوَالِكُمْ لَا تَظْلِمُونَ وَلَا تُظْلَمُونَ} (২৭৯) سورة البقرة অর্থাৎ, হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সূদের যা বকেয়া আছে তা বর্জন কর; যদি তোমরা বিশ্বাসী হও। আর যদি তোমরা (সূদ বর্জন) না কর, তাহলে আল্লাহ ও তার রসূলের পক্ষ থেকে যুদ্ধ সুনিশ্চিত জানো। কিন্তু যদি তোমরা তওবা কর, তবে তোমাদের মূলধন তোমাদেরই। তোমরা কারো উপর অত্যাচার করবে না এবং নিজেরাও অত্যাচারিত হবে না। (বাক্বারাহঃ ২৭৮-২৭৯)

ইসলাম যেমন সুদ খেতে নিষেধ করে, তেমনি দিতেও নিষেধ করে এবং তার কোন প্রকার সহযোগিতা করাকেও হারাম ঘোষণা করে। আল্লাহর রসূল সুদখোর, সূদদাতা, সুদের লেখক এবং তার উভয় সাক্ষ্যদাতাকে অভিশাপ করেছেন। আর বলেছেন, "(পাপে) ওরা সকলেই সমান।” (মুসলিম ১৫৯৮নং)

তিনি আরো বলেছেন, “জেনেশুনে মানুষের মাত্র এক দিরহাম খাওয়া সূদ আল্লাহর নিকটে ৩৬ ব্যভিচার অপেক্ষা অধিক গুরুতর।” (আহমাদ ৫/৩৩৫, ত্বাবারানীর কাবীর ও আউসাত্ব, সহীহুল জামে' ৩৩৭৫নং) "সুদ খাওয়ায় রয়েছে ৭০ প্রকার পাপ। এর মধ্যে সবচেয়ে ছোট পাপ হল নিজ মায়ের সাথে ব্যভিচার করার মতো!” (ইবনে মাজাহ ২২৭৮, সহীহ ইবনে মাজাহ ১৮-৪৪নং)

৩। ইসলাম ঘুস দেওয়া-নেওয়াকে হারাম ঘোষণা করেছে। মহান আল্লাহ বলেছেন, {وَلَا تَأْكُلُواْ أَمْوَالَكُم بَيْنَكُم بِالْبَاطِلِ وَتُدْلُوا بِهَا إِلَى الْحُكَّامِ لِتَأْكُلُوا فَرِيقًا মِّ أَمْوَالَ النَّاسِ بِالإِثْمِ وَأَنتُمْ تَعْلَمُونَ} (১৮৮) سورة البقرة অর্থাৎ, তোমরা নিজেদের মধ্যে একে অন্যের ধন অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না এবং মানুষের ধন-সম্পদের কিয়দংশ জেনেশুনে অন্যায়ভাবে গ্রাস করার উদ্দেশ্যে বিচারকগণকে ঘুষ দিও না। (বাক্বারাহঃ ১৮৮) আল্লাহর রসূল ঘুষখোর, ঘুষদাতা (উভয়কেই) অভিশাপ করেছেন। (আবু দাউদ ৩৫৮০, তিরমিযী ১৩৩৭, ইবনে মাজাহ ২৩১৩, ইবনে হিব্বান, হাকেম ৪/১০২-১০৩, সহী আবু দাউদ ৩০৫৫নং)

৪। ইসলাম জুয়াকে অবৈধ ঘোষণা করেছে। মহান আল্লাহ বলেছেন, {يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْসِرُ وَالأَنصَابُ وَالْأَزْلَامُ رিجسٌ মِّ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ (৯০) إِنَّمَا يُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَن يُوقِعَ بَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةَ وَالْبَغْضَاء فِي الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ وَيَصُدَّكُمْ عَن ذِكْرِ اللَّهِ وَعَنِ الصَّلَاةِ فَهَلْ أَنتُم মُّنتَهُونَ) (৯১) سورة المائدة অর্থাৎ, হে বিশ্বাসিগণ! মদ, জুয়া, মূর্তিপূজার বেদী ও ভাগ্যনির্ণায়ক শর ঘৃণ্য বস্তু শয়তানের কাজ। সুতরাং তোমরা তা বর্জন কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার। শয়তান তো মদ ও জুয়া দ্বারা তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ ঘটাতে চায় এবং তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ ও নামাযে বাধা দিতে চায়! অতএব তোমরা কি নিবৃত্ত হবে না? (মায়িদাহঃ ৯০-৯১)

৫। ইসলাম অপরের মালকে চুরি করে নিতে হারাম ঘোষণা করেছে। এ ব্যাপারে তাকীদ করার জন্য চোরের হাত কেটে নিয়ে শাস্তি দিতে নির্দেশ দিয়েছে। মহান আল্লাহ বলেছেন, وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا جَزَاء بِمَا كَسَبَا نَكَالاً মِّ اللَّهِ وَاللَّهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ } (৩৮) سورة المائدة অর্থাৎ, চোর এবং চোরনীর হাত কেটে ফেলো, এ তাদের কৃতকর্মের ফল এবং আল্লাহর তরফ হতে শাস্তি। বস্তুতঃ আল্লাহ পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়। (মায়িদাহঃ ৩৮)

রাসূলুল্লাহ বলেছেন, “তোমরা এক অপরের প্রতি হিংসা করো না, কেনা-বেচাতে জিনিসের মূল্য বাড়িয়ে এক অপরকে ধোকা দিয়ো না, এক অপরের প্রতি শত্রুতা রেখো না, এক অপর থেকে (ঘৃণাভরে) মুখ ফিরায়ো না এবং এক অপরের (জিনিস) কেনা-বেচার উপর কেনা- বেচা করো না। আর হে আল্লাহর বান্দারা! তোমরা ভাই-ভাই হয়ে যাও। মুসলিম মুসলিমের ভাই। সে তার প্রতি যুলুম করবে না, তাকে তুচ্ছ ভাববে না এবং তাকে অসহায় অবস্থায় ছেড়ে দেবে না। আল্লাহভীতি এখানে রয়েছে। (তিনি নিজ বুকের দিকে ইঙ্গিত করে এ কথা তিনবার বললেন।) কোন মুসলিম ভাইকে তুচ্ছ ভাবা একটি মানুষের মন্দ হওয়ার জন্য যথেষ্ট। প্রত্যেক মুসলিমের রক্ত, মাল এবং তার মর্যাদা অপর মুসলিমের উপর হারাম।” (মুসলিম)

৬। এমনকি কুড়িয়ে পাওয়া মালেও কোন মুসলিমের অধিকার নেই। সে মাল তার মালিককে ফিরিয়ে দিতে নির্দেশ দেয় ইসলাম। মালিক জানা না থাকলে এক বছর তার ঘোষণা দিতে আদেশ করে। মহানবী বলেন, “মুমিনের হারিয়ে যাওয়া জিনিস দোযখের শিখা স্বরূপ।” (ত্বাবারানী, সিলসিলাহ সহীহাহ ৬২০নং) আল্লাহর নবী -কে হারিয়ে যাওয়া উটের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করে হলে তিনি বললেন, "তোমার সাথে তার সাথ কী? তার সঙ্গে তার পানীয় থাকে, জুতা থাকে। পানির জায়গায় এসে পানি খেয়ে এবং গাছপালা ভক্ষণ (করে বেঁচে থাকতে) পারে। পরিশেষে (খুঁজতে খুঁজতে) তার মালিক এসে তাকে পেয়ে যায়।” (বুখারী, মুসলিম)

৭। দেওয়ার সময় ওজনে বা মাপে কম এবং নেওয়ার সময় ওজনে বা মাপে বেশি নিতে বা দাঁড়ি মেরে লোককে ধোঁকা দিতে নিষেধ করেছে ইসলাম। মহান আল্লাহ বলেছেন, { وَلَا تَقْرَبُوا مَالَ الْيَتِيمِ إِلَّا بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ حَتَّى يَبْلُغَ أَشُدَّهُ وَأَوْفُوا الْكَيْلَ وَالْمِيزَانَ بِالْقِسْطِ ۖ لَا نُكَلِّفُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا ۖ وَإِذَا قُلْتُمْ فَاعْدِلُوا وَلَوْ كَانَ ذَا قُرْبَىٰ وَبِعَهْدِ اللَّهِ أَوْفُوا ۚ ذَٰلِكُمْ وَصَّاكُم بِهِ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّরُونَ } (১৫২) অর্থাৎ, পিতৃহীন বয়ঃপ্রাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত সৎ উদ্দেশ্য ছাড়া তার সম্পত্তির নিকটবর্তী হয়ো না এবং পরিমাপ ও ওজন ন্যায়ভাবে পুরাপুরি প্রদান কর। আমি কাউকেও তার সাধ্যাতীত ভার অর্পণ করি না। আর যখন তোমরা কথা বলবে, তখন স্বজনের বিরুদ্ধে হলেও ন্যায় কথা বল এবং আল্লাহকে প্রদত্ত অঙ্গীকার পূর্ণ কর। এভাবে আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন, যেন তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর। (আনআমঃ ১৫২)

{ وَأَوْفُوا الْكَيْلَ إِذَا كِلْتُمْ وَزِنُوا بِالْقِسْطَاسِ الْمُسْتَقِيمِ ۚ ذَٰلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلاً} (৩৫) سورة الإسراء অর্থাৎ, মেপে দেয়ার সময় পূর্ণরূপে মাপো এবং সঠিক দাঁড়ি-পাল্লায় ওজন কর, এটাই উত্তম ও পরিণামে উৎকৃষ্টতম। (বানী ইস্রাঈল: ৩৫)

{وَيْلٌ لِّلْمُطَفِّفِينَ (১) الَّذِينَ إِذَا اكْتَالُواْ عَلَى النَّاسِ يَسْتَوْفُونَ (২) وَإِذَا كَالُوهُمْ أَو وَّزَنُوهُمْ يُخْسِرُونَ (৩) أَلَا يَظُنُّ أُولَئِكَ أَنَّهُمْ مَبْعُوثُونَ (৪) لِيَوْمٍ عَظِيمٍ (৫) يَوْمَ يَقُومُ النَّاسُ لِرَبِّ الْعَالَمِينَ} (৬) المطففين অর্থাৎ, ধ্বংস তাদের জন্য যারা মাপে কম দেয়, যারা লোকের নিকট হতে মেপে নেওয়ার সময় পূর্ণ মাত্রায় গ্রহণ করে এবং যখন তাদের জন্য মেপে অথবা ওজন করে দেয়, তখন কম দেয়। তারা কি চিন্তা করে না যে, তাদেরকে পুনরুত্থিত করা হবে। এক মহা দিবসে; যেদিন দাঁড়াবে সমস্ত মানুষ বিশ্ব-জাহানের প্রতিপালকের সম্মুখে। (মুত্বাফফিফীন: ১-৬)

৮। ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রতারণা করতে নিষেধ করেছে ইসলাম। একদা আল্লাহর রসূল (ﷺ) (বাজারে) এক রাশীকৃত খাদ্য (শস্যের) কাছে গিয়ে তার ভিতরে হাত প্রবেশ করালেন। তিনি আঙ্গুল দ্বারা অনুভব করলেন যে, ভিতরের শস্য ভিজে আছে। বললেন, “ওহে ব্যাপারী! এ কী ব্যাপার?” ব্যাপারী বলল, 'হে আল্লাহর রসূল! বৃষ্টিতে ভিজে গেছে।' তিনি বললেন, “ভিজেগুলোকে শস্যের উপরে রাখলে না কেন, যাতে লোকে দেখতে পেত? যে আমাদেরকে ধোঁকা দেয়, সে আমার দলভুক্ত নয়।” (মুসলিম ১০২, ইবনে মাজাহ ২২২৪, তিরমিযী ১৩১৫, আবু দাউদ ৩৪৫২নং)

৯। ইসলামে যা হারাম, তার ব্যবসা হারাম। তার মাধ্যমে উপার্জন হারাম। মহানবী বলেন, আমাদের প্রিয় নবী কুকুরের মূল্য, বেশ্যাবৃত্তির কামাই ও গণকের উপার্জন গ্রহণ ও ভক্ষণ করতে নিষেধ করেছেন। (সহীহুল জামে' ৬৯৫১নং) তিনি বেশ্যাবৃত্তির মাধ্যমে কামানো অর্থকে ‘খাবীষ’ বা অপবিত্র বলেছেন। (সহীহুল জামে' ৩০৭৭নং) কখনো বলেছেন ঐ উপার্জন হল হারাম। (সহীহুল জামে' ৩০৭৬নং) তিনি বলেছেন, “বেশ্যাবৃত্তির অর্থ হালাল নয়।” (আবু দাউদ ৩৪২-৪নং) রাসূলুল্লাহ কুকুরের মূল্য, ব্যভিচারের বিনিময় এবং গণকের পারিতোষিক গ্রহণ করতে নিষেধ করেছেন। (বুখারী ও মুসলিম)

১০। ছোট-বড় ঋণ নেওয়া-দেওয়ার ক্ষেত্রে সূক্ষ্ম বিধান দিয়েছে ইসলাম। মহান আল্লাহ বলেছেন, {يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا تَدَايَنتُم بِدَيْنِ إِلَى أَجَلٍ মُّسَمًّى فَاكْتُبُوهُ وَلْيَكْتُব بَيْنَكُمْ كَاتِبٌ بِالْعَدْلِ وَلَا يَأْبَ كَاتِبٌ أَنْ يَكْتُبَ كَمَا عَلَّمَهُ اللَّهُ فَلْيَكْتُবْ وَلْيُمْلِل الَّذِي عَلَيْهِ الْحَقُّ وَلْيَتَّقِ اللهَ رَبَّهُ وَلَا يَبْخَسْ মִْهُ شَيْئاً فَإِن كَانَ الَّذِي عَلَيْهِ الْحَقُّ سَفِيهَا أَوْ ضَعِيفاً أَوْ لاَ يَسْتَطِيعُ أَن يُمِلَّ هُوَ فَلْيُمْلِلْ وَلِيُّهُ بِالْعَدْلِ وَاسْتَشْهِدُوا شَهِيدَيْنِ মִ رِّجَالِكُمْ فَإِن لَّمْ يَكُونَا رَجُلَيْنِ فَرَجُلٌ وَامْرَأَتَانِ মִমَّن تَرْضَوْنَ মִَ الشُّهَدَاء أَن تَضِلَّ إِحْدَاهُمَا فَتُذَكِّرَ إِحْدَاهُمَا الْأُخْرَى وَلَا يَأْبَ الشُّهَدَاء إِذَا مَا دُعُوا وَلاَ تَسْأَمُوا أَن تَكْتُبُوهُ صَغِيراً أَو كَبِيراً إِلَى أَجَلِهِ ذَلِكُمْ أَقْسَطُ عِندَ اللَّهِ وَأَقْومُ لِلشَّهَادَةِ وَأَدْنَى أَلا تَرْتَابُوا إِلَّا أَن تَكُونَ تِجَارَةً حَاضِرَةً تُدِيرُونَهَا بَيْنَكُمْ فَلَيْسَ عَلَيْكُمْ جُنَاحٌ أَلا تَكْتُبُوهَا وَأَشْهِدُوا إِذَا تَبَايَعْتُمْ وَلَا يُضَارَّ كَاتِبٌ وَلَا شَهِيدٌ وَإِن تَفْعَلُواْ فَإِنَّهُ فُسُوقٌ بِكُمْ وَاتَّقُوا اللَّهَ وَيُعَلِّمُكُمُ اللَّهُ وَاللَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ} البقرة ২৮২ অর্থাৎ, হে ঈমানদারগণ! তোমরা যখন নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য পরস্পর ঋণ দেওয়া-নেওয়া কর, তখন তা লিখে নাও। আর তোমাদের মধ্যে কোন লেখক যেন ন্যায়ভাবে তা লিখে দেয় এবং আল্লাহ যেরূপ শিক্ষা দিয়েছেন---সেইরূপ লিখতে কোন লেখক যেন অস্বীকার না করে। অতএব তার লিখে দেওয়াই উচিত। আর ঋণগ্রহীতা যেন লিখার বিষয় বলে দিয়ে লিখিয়ে নেয় এবং সে যেন স্বীয় প্রতিপালক আল্লাহকে ভয় করে এবং লেখার মধ্যে বিন্দুমাত্র কম-বেশী না করে। অনন্তর ঋণগ্রহীতা যদি নির্বোধ হয় কিংবা দুর্বল হয় অথবা নিজে লেখার বিষয়বস্তু বলে দিতে অক্ষম হয়, তাহলে তার অভিভাবক যেন ন্যায়সঙ্গতভাবে তা লেখায়। আর তোমাদের মধ্যে দু'জন পুরুষকে (এই আদান-প্রদানের) সাক্ষী কর। যদি দু'জন পুরুষ না পাও, তাহলে সাক্ষীদের মধ্যে যাদেরকে তোমরা পছন্দ কর তাদের মধ্য হতে একজন পুরুষ ও দু'জন মহিলাকে সাক্ষী কর; যাতে মহিলাদ্বয়ের একজন ভুলে গেলে যেন অন্য জন তাকে স্মরণ করিয়ে দেয়। আর যখন (সাক্ষ্য দিতে) ডাকা হয়, তখন যেন সাক্ষীরা অস্বীকার না করে। (ঋণ) ছোট হোক, বড় হোক, তোমরা মেয়াদসহ লিখতে কোনরূপ অলসতা করো না। এ লেখা আল্লাহর নিকট ন্যায্যতর ও সাক্ষ্য (প্রমাণের) জন্য দৃঢ়তর এবং তোমাদের মধ্যে সন্দেহ উদ্রেক না হওয়ার অধিক নিকটতর। কিন্তু তোমরা পরস্পরে ব্যবসায় যে নগদ আদান-প্রদান কর, তা না লিখলে কোন দোষ নেই। তোমরা যখন পরস্পর বেচা-কেনা কর, তখন সাক্ষী রাখ। আর কোন লেখক ও সাক্ষী যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। যদি তোমরা তাদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত কর, তাহলে তা হবে তোমাদের পক্ষে পাপের বিষয়। তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। আল্লাহ তোমাদেরকে শিক্ষা দেন। আর আল্লাহ সর্ববিষয়ে মহাজ্ঞানী। (বাক্বারাহঃ ২৮২)

১১। যথাসময়ে ঋণ পরিশোধ করতে আদেশ করে ইসলাম। পরিশোধে টাল-বাহানা করাকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে ইসলামে। আল্লাহর রসূল বলেন, “যে ব্যক্তি লোকের মাল (ঋণ) নিয়ে তা আদায় করার সংকল্প রাখে, সে ব্যক্তির তরফ থেকে আল্লাহ তা আদায় করে দেন। (অর্থাৎ পরিশোধের উপায় সহজ করে দেন।) আর যে ব্যক্তি আত্মসাৎ করার উদ্দেশ্য রেখে লোকেদের মাল গ্রহণ করে, আল্লাহ তাকে ধ্বংস করেন।" (বুখারী ২৩৮-৭, ইবনে মাজাহ ২৪১১নং) "ঋণ পরিশোধে সামর্থ্যবান ব্যক্তির টালবাহানা করা যুলুম। আর যখন কোন (ঋণদাতা) ব্যক্তিকে কোন ধনীর বরাত দেওয়া হয়, তখন সে যেন তার অনুসরণ করে।” (বুখারী ২২৮৮, মুসলিম ১৫৬৪নং, আসহাবে সুনান) "(ঋণ পরিশোধে) সক্ষম ব্যক্তির টালবাহানা করা তার সম্ভ্রম ও শাস্তিকে হালাল করে দেয়।” (আহমাদ ৪/২২২, আবু দাউদ ৩৬২৮, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ ২৪২৭, ইবনে হিব্বান ৫০৮৯, হাকেম ৪/১০২, সহীহুল জামে' ৫৪৮-৭নং)

১২। কেউ কারো সম্পদ নষ্ট করলে তার খেসারত দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে ইসলামে। মহান আল্লাহ বলেছেন, {فَمَنِ اعْتَدَى عَلَيْكُمْ فَاعْتَدُواْ عَلَيْهِ بِমִثْلِ مَا اعْتَدَى عَلَيْكُمْ وَاتَّقُوا اللَّهَ وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ مَعَ الْمُتَّقِينَ} (১৯৪) سورة البقرة অর্থাৎ, যে তোমাদেরকে আক্রমণ করবে, তোমরাও তাকে অনুরূপ আক্রমণ কর। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং জেনে রাখ যে, আল্লাহ সাবধানীদের সাথী। (বাক্বারাহঃ ১৯৪)

১৩। ধন-সম্পদ রক্ষার করার দায়িত্ব ও অধিকার আছে খোদ মালিকের। আর তার ফলে সে যদি খুন হয়ে যায়, তাহলে ইসলাম তাকে 'শহীদ'-এর মর্যাদা দেয়। রাসূলুল্লাহ বলেছেন, “যে ব্যক্তি তার ধন-সম্পদ রক্ষা করতে গিয়ে খুন হয়, সে শহীদ।” (বুখারী-মুসলিম)

১৪। অর্থ-সম্পদ অপচয় করতে নিষেধ করে ইসলাম। অপব্যয়কারীকে মহান আল্লাহ পছন্দ করেন না। মহান আল্লাহ বলেছেন, {وَآتِ ذَا الْقُرْبَى حَقَّهُ وَالْمِسْكِينَ وَابْنَ السَّبِيلِ وَلَا تُبَذِّرْ تَبْذِيرًا (২৬) إِنَّ الْمُبَذِّرِينَ كَانُوا إِخْوَانَ الشَّيَاطِينِ وَكَانَ الشَّيْطَانُ لِرَبِّهِ كَفُورًا} (২৭) অর্থাৎ, তুমি আত্মীয়-স্বজনকে তার প্রাপ্য প্রদান কর এবং অভাবগ্রস্ত ও মুসাফিরকেও। আর কিছুতেই অপব্যয় করো না। নিশ্চয় যারা অপব্যয় করে, তারা শয়তানের ভাই। আর শয়তান তার প্রতিপালকের প্রতি অতিশয় অকৃতজ্ঞ। (বানী ইস্রাঈল: ২৬-২৭) অবৈধ পথে অর্থ ব্যয় করা অথবা বৈধ পথে অপরিমিত ব্যয় করার নাম অপব্যয় করা।

মহান আল্লাহ বলেছেন, {يَا بَنِي آدَمَ খُذُوا زِينَتَكُمْ عِندَ كُلِّ مَسْجِدٍ وَكُلُوا وَاشْرَبُوا وَلَا تُسْرِفُوا إِنَّهُ لَا يُحبُّ الْمُسْرِفِينَ) (৩১) سورة الأعراف অর্থাৎ, হে আদমের বংশধরগণ! তোমরা প্রত্যেক নামাযের সময় সুন্দর পরিচ্ছদ পরিধান কর। পানাহার কর, কিন্তু অপচয় করো না। নিশ্চয় তিনি অপচয়কারীদেরকে পছন্দ করেন না। (আ'রাফঃ ৩১)

রাসূলুল্লাহ অহেতুক কথাবার্তা বলতে, ধন-সম্পদ বিনষ্ট করতে এবং অধিকাধিক প্রশ্ন করতে নিষেধ করতেন। আর তিনি মাতা-পিতার সাথে অবাধ্যাচরণ করতে, মেয়েদেরকে জীবন্ত প্রোথিত করতে এবং প্রাপকের নায্য অধিকার রোধ করতে ও অনধিকার বস্তু তলব করতেও নিষেধ করতেন। (বুখারী ও মুসলিম)

অবশ্য ব্যয়কুণ্ঠ হতেও নিষেধ করে ইসলাম। এ ব্যাপারেও ইসলাম মধ্যমপন্থাকে পছন্দ করে। মহান আল্লাহ বলেছেন, {وَلاَ تَجْعَلْ يَدَكَ مَغْلُولَةً إِلَى عُنُقِكَ وَلاَ تَبْسُطُهَا كُلَّ الْبَسْطِ فَتَقْعُدَ مَلُومًا مَّحْسُورًا) (২৯) سورة الإسراء অর্থাৎ, তুমি বদ্ধমুষ্টি হয়ো না এবং একেবারে মুক্ত হস্তও হয়ো না; হলে তুমি তিরস্কৃত ও নিঃস্ব হয়ে পড়বে। (বানী ইস্রাঈল: ২৯) তিনি ধনব্যয়ে মধ্যপন্থা অবলম্বনকারীর প্রশংসা করে বলেছেন, (পরম দয়াময়ের দাস তারা,) وَالَّذِينَ إِذَا أَنفَقُوا لَمْ يُسْرِفُوا وَلَمْ يَقْتُرُوا وَكَانَ بَيْنَ ذَلِكَ قَوَامًا} (৬৭) অর্থাৎ, যারা ব্যয় করলে অপচয় করে না, কার্পণ্যও করে না; বরং তারা এ দুইয়ের মধ্যবর্তী পন্থা অবলম্বন করে। (ফুরক্বানঃ ৬৭) পানভোজন ও বিলাস-ব্যসনেও মধ্যপন্থা অবলম্বন করতে আদেশ করে ইসলাম। মহানবী বলেন, "তোমরা যা ইচ্ছা তাই খাও এবং যেমন ইচ্ছা তেমনিই পর, তবে তাতে যেন দু'টি জিনিস না থাকে; অপচয় ও অহংকার।” (বুখারী, মিশকাত ৪৩৮০নং)

১৫। নষ্ট হবে অথবা অবৈধ পথে ব্যয় হবে---এই আশঙ্কায় নির্বোধ (শিশু বা পাগল)দের হাতে টাকা-পয়সা দিতে নিষেধ করেছে। মহান আল্লাহ বলেছেন, وَلَا تُؤْتُوا السُّفَهَاء أَمْوَالَكُمُ الَّتِي جَعَلَ اللَّهُ لَكُمْ قِيَاماً وَارْزُقُوهُمْ فِيهَا وَاكْسُوهُمْ وَقُولُوا لَهُمْ قَوْلاً مَّعْرُوفًا} (৫) سورة النساء অর্থাৎ, আর আল্লাহ তোমাদের সম্পদকে---যা তোমাদের উপজীবিকা (জীবনযাত্রার অবলম্বন) করেছেন---তা নির্বোধদের (হাতে) অর্পণ করো না। তা হতে তাদের খাওয়া-পরার ব্যবস্থা কর এবং তাদের সাথে মিষ্ট কথা বল। (নিসাঃ ৫) যেহেতু ধন-সম্পদ মহান আল্লাহর দান। তাই তা কেবল সেই পথে ব্যয় করতে হয়, যাতে তিনি সন্তুষ্ট ও সম্মত হন। তিনি বলেছেন, {آمِنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَأَنفِقُوا মִমَّا جَعَلَكُم মُّسْتَخْلَفِينَ فِيهِ فَالَّذِينَ آمَنُوا মִكُم وَأَنفَقُوا لَهُمْ أَجْرٌ كَبِيرٌ} (৭) সূরা হাদীদ অর্থাৎ, আল্লাহ ও তাঁর রসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর এবং আল্লাহ তোমাদেরকে যা কিছুর উত্তরাধিকারী করেছেন, তা হতে ব্যয় কর। তোমাদের মধ্যে যারা বিশ্বাস করে ও ব্যয় করে, তাদের জন্য আছে মহাপুরস্কার। (হাদীদঃ ৭)

১৬। ইসলাম মানুষকে উপার্জন করতে উদ্বুদ্ধ করে। মহান আল্লাহ বলেন, {هُوَ الَّذِي جَعَلَ لَكُمُ الْأَرْضَ ذَلُولًا فَامْشُوا فِي মَنَاكِبِهَا وَكُلُوا মִ রِّزْقِهِ وَإِلَيْهِ النُّشُورُ } (১৫) সূরা মুলক অর্থাৎ, তিনিই তো তোমাদের জন্য ভূমিকে সুগম ক'রে দিয়েছেন; অতএব তোমরা ওর দিক-দিগন্তে বিচরণ কর এবং তাঁর দেওয়া রুযী হতে আহার্য গ্রহণ কর। আর পুনরুত্থান তো তাঁরই নিকট। (মুল্ক: ১৫)

{فَإِذَا قُضِيَتِ الصَّلَاةُ فَانتَشِرُوا فِي الْأَرْضِ وَابْتَغُوا মִ فَضْلِ اللَّهِ وَاذْكُرُوا اللَّهَ كَثِيرًا لَّعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ } (১০) সূরা জুমু'আ অর্থাৎ, অতঃপর নামায সমাপ্ত হলে তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড় এবং আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধান কর ও আল্লাহকে অধিকরূপে স্মরণ কর; যাতে তোমরা সফলকাম হও। (জুমুআহঃ ১০)

১৭। স্বহস্তে উপার্জিত খাদ্য ভক্ষণ করতে উৎসাহিত করে ইসলাম। আল্লাহর রসূল বলেন, "স্বহস্তে উপার্জন করে যে খায়, তার চেয়ে উত্তম খাদ্য অন্য কেউ ভক্ষণ করে না। আল্লাহর নবী দাউদ স্বহস্তে উপার্জিত খাদ্য ভক্ষণ করতেন।” (বুখারী ২০৭২ নং) "তোমরা যে খাদ্য ভক্ষণ কর, তার মধ্যে সবচেয়ে উত্তম খাদ্য হল তোমাদের নিজের হাতে কামাই করা খাদ্য। আর তোমাদের সন্তানগণ তোমাদের উপার্জিত ধনের পর্যায়ভুক্ত।” (বুখারীর তারীখ, তিরমিযী, নাসাঈ, বাইহাক্বী, সহীহুল জামে' ১৫৬৬ নং)

১৮। ইসলাম ভিক্ষাবৃত্তি অবলম্বন করতে নিষেধ করে। চিৎ হস্তের লোককে অপছন্দ করে। প্রিয় নবী বলেন, “সর্বদা যাজ্ঞা করলে আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎকালে তার চেহারায় কোন মাংসপিন্ড থাকবে না।” (বুখারী ও মুসলিম) "যাঞ্চাকারী যদি যাজ্ঞায় কী শাস্তি আছে তা জানত, তাহলে সে যাঞ্চা করত না।” (সঃ তারগীব ৭৮৯নং) "অভাব না থাকা সত্ত্বেও যে যাচনা করে, কিয়ামতের দিন তার মুখমন্ডলে তা কলঙ্কের ছাপ হবে।” (ঐ ৭৯১নং) "যে ব্যক্তি দৈন্য না থাকা সত্ত্বেও চেয়ে খায়, সে যেন আঙ্গার খায়।" (ঐ ৭৯৩নং) “আল্লাহ নাছোড়-বান্দা হয়ে ভিক্ষাকারীকে ঘৃণা করেন।” (সহীহুল জামে ৮৭২নং) "বান্দা যাজ্ঞার দরজা খুললে আল্লাহ তার জন্য অভাবের দরজা খুলে দেন।” (ঐ ৩০২ ১নং) “তোমাদের মধ্যে কারো রশি নিয়ে কাঠ সংগ্রহ ক'রে পিঠে ক'রে বয়ে আনা, কোন লোকের কাছে এসে ভিক্ষা করার চেয়ে অনেক ভাল; চাহে সে দিক বা না দিক।” (বুখারী ও মুসলিম)

১৯। জীবনে বাঁচার জন্য ইসলাম হালাল উপার্জন করতে এবং হারাম উপার্জন থেকে দূরে থাকতে মুসলিমকে উদ্বুদ্ধ করে। মহান আল্লাহ নিজ রসূলগণকে বলেছেন, {يَا أَيُّهَا الرُّسُلُ كُلُوا মִَ الطَّيِّبَاتِ وَاعْمَلُوا صَالِحًا إِنِّي بِمَا تَعْمَلُونَ عَلِيمٌ} (৫১) সূরা মু'মিনূন অর্থাৎ, হে রসূলগণ! তোমরা পবিত্র বস্তু হতে আহার কর এবং সৎকর্ম কর; তোমরা যা কর, সে সম্বন্ধে আমি সবিশেষ অবগত। (মু'মিনূনঃ ৫১)

একই নির্দেশ করেছেন তাঁর প্রতি বিশ্বাসী মুসলিমদেরকে, {يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ كُلُوا মִ طَيِّبَاتِ مَا رَزَقْنَاكُمْ وَاشْكُرُوا لِلَّهِ إِن كُنتُمْ إِيَّاهُ تَعْبُدُونَ} (১৭২) সূরা আল-বাকারা অর্থাৎ, হে বিশ্বাসিগণ! আমি তোমাদেরকে যে রুযী দিয়েছি, তা থেকে পবিত্র বস্তু আহার কর এবং আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর; যদি তোমরা শুধু তাঁরই উপাসনা ক'রে থাক। (বাক্বারাহঃ ১৭২) মহানবী বলেন, তার দুআ কিভাবে কবুল হতে পারে, যে লম্বা সফর করে আলুথালু ধূলিমলিন বেশে নিজ হাত দু'টিকে আকাশের দিকে লম্বা করে তুলে দুআ করে বলে, 'হে আমার প্রতিপালক! হে আমার প্রভু!' কিন্তু তার আহার্য হারাম, তার পানীয় হারাম, তার পরিধেয় লেবাস হারাম এবং হারাম দ্বারাই তার পুষ্টিবিধান হয়েছে? (মুসলিম ১০১৫, তিরমিযী ২৯৮৯নং)

আল্লাহর রসূল একদা কা'ব বিন উজরার উদ্দেশ্যে বললেন, “হে কা'ব বিন উজরাহ! সে মাংস কোন দিন বেহেশ্ প্রবেশ করতে পারবে না, যার পুষ্টিসাধন হারাম খাদ্য দ্বারা করা হয়েছে।” (দারেমী ২৬৭৪ নং) “--- হে কা'ব বিন উজরাহ! যে মাংস হারাম খাদ্য দ্বারা প্রতিপালিত হবে, তার জন্য জাহান্নামই উপযুক্ত।” (সহীহ তিরমিযী ৫০১নং)

২০। উপার্জনে অক্ষম ব্যক্তিদের দায়ভার বহন করে ইসলাম। তার জন্য মুসলিমদেরকে সাদকাহ বা দান-খয়রাত করতে উৎসাহিত করেছে। দানের বিনিময়ে বহুগুণ প্রতিদান দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে। মহান আল্লাহ বলেছেন, {মَّثَلُ الَّذِينَ يُنفِقُونَ أَمْوَالَهُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ كَمَثَلِ حَبَّةٍ أَنبَتَتْ সَبْعَ سَنَابِلَ فِي كُلِّ سُنبُلَةٍ মِّئَةُ حَبَّةٍ وَاللَّهُ يُضَاعِفُ لِمَن يَشَاء وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ} (২৬১) অর্থাৎ, যারা আল্লাহর পথে ব্যয় করে, তাদের উপমা একটি শস্য- বীজের মত, যা থেকে সাতটি শীষ জন্মে, প্রতিটি শীষে থাকে একশত শস্য-দানা। আর আল্লাহ যার জন্য ইচ্ছা বহুগুণে বৃদ্ধি ক'রে দেন। আল্লাহ মহাদানশীল, মহাজ্ঞানী। (বাক্বারাহঃ ২৬১)

وَسَارِعُوا إِلَى مَغْفِرَةٍ মِّ رَّبِّكُمْ وَجَنَّةٍ عَرْضُهَا السَّمَاوَاتُ وَالْأَرْضُ أُعِدَّتْ لِلْمُتَّقِينَ (১৩৩) الَّذِينَ يُنفِقُونَ فِي السَّرَّاءِ وَالضَّرَّاءِ وَالْكَاظِمِينَ الْغَيْظَ وَالْعَافِينَ عَنِ النَّاسِ وَاللَّهُ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ} (১৩৪) سورة آل عمران অর্থাৎ, তোমরা প্রতিযোগিতা (ত্বরা) কর, তোমাদের প্রতিপালকের নিকট থেকে ক্ষমা এবং বেহেশ্বের জন্য, যার প্রস্থ আকাশ ও পৃথিবীর সমান, যা ধর্মভীরুদের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে। যারা সচ্ছল ও অসচ্ছল অবস্থায় দান করে, ক্রোধ সংবরণ করে এবং মানুষকে ক্ষমা ক'রে থাকে। আর আল্লাহ (বিশুদ্ধচিত্ত) সৎকর্মশীলদেরকে ভালবাসেন। (আলে ইমরানঃ ১৩৩-১৩৪) মহানবী বলেছেন, “যে ব্যক্তি (তার) বৈধ উপায়ে উপার্জিত অর্থ থেকে একটি খেজুর পরিমাণও কিছু দান করে---আর আল্লাহ তো বৈধ অর্থ ছাড়া অন্য কিছু গ্রহণই করেন না---সে ব্যক্তির ঐ দানকে আল্লাহ ডান হাতে গ্রহণ করেন। (অতঃপর তা ঐ ব্যক্তির জন্য লালন-পালন করেন;) পরিশেষে তা রহমানের করতলে বৃদ্ধিলাভ ক'রে পাহাড় থেকেও বড় হয়ে যায়। যেমন তোমাদের কেউ তার অশ্ব-শাবককে লালন-পালন ক'রে থাকে।” (বুখারী ১৪১০, মুসলিম ১০১৪নং, তিরমিযী, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ প্রভৃতি)

২১। বরং নির্দিষ্ট পরিমাণ পশুসম্পদ, ফসল, স্বর্ণ-রৌপ্য বা অর্থ থাকলে নির্দিষ্ট শর্তে নির্দিষ্ট পরিমাণ যাকাত ফরয করেছেন মহান সৃষ্টিকর্তা। আর তা হল ইসলামের তৃতীয় রুকন। তা আদায় না করলে মহাশাস্তির ঘোষণা রয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, {وَالَّذِينَ يَكْنِزُونَ الذَّهَبَ وَالْفِضَّةَ وَلَا يُنفِقُونَهَا فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَبَشِّرْهُم بِعَذَابٍ أَلِيمٍ (৩৪) يَوْمَ يُحْمَى عَلَيْهَا فِي نَارِ جَهَنَّمَ فَتُكْوَى بِهَا جِبَاهُهُمْ وَجُنوبُهُمْ وَظُهُورُهُمْ هَذَا مَا كَنَزْتُمْ لأَنفُسِكُمْ فَذُوقُوا مَا كُنتُمْ تَكْنِزُونَ} অর্থাৎ, যারা স্বর্ণ ও রৌপ্য জমা করে রাখে এবং তা আল্লাহর পথে ব্যয় করে না, তুমি তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সুসংবাদ শুনিয়ে দাও। যেদিন জাহান্নামের আগুনে ঐগুলোকে উত্তপ্ত করা হবে। অতঃপর তা দিয়ে তাদের ললাট, পার্শ্বদেশ ও পৃষ্ঠদেশ দাগা হবে, (আর বলা হবে,) 'এ হচ্ছে তাই যা তোমরা নিজেদের জন্য সঞ্চয় করে রেখেছিলে। সুতরাং এখন নিজেদের সঞ্চিত জিনিসের স্বাদ গ্রহণ কর।' (তাওবাহঃ ৩৪-৩৫)

২২। যা হারাম, তা স্পষ্ট করেছে ইসলাম। যা হালাল তাও স্পষ্ট আছে। কিন্তু কিছু এমন জিনিস আছে, যা অস্পষ্ট ও সন্দিগ্ধ। এ ব্যাপারে ইসলামের বিধান হল, “হালাল স্পষ্ট, হারামও স্পষ্ট। আর উভয়ের মাঝে রয়েছে কিছু সন্ধিগ্ধ বিষয়-বস্তু। যে ব্যক্তি কোন সন্ধিগ্ধ পাপকে বর্জন করবে, সে তো (সন্দেহহীন) স্পষ্ট পাপকে অধিকরূপে বর্জন করবে। আর যে ব্যক্তি সন্ধিগ্ধ কিছু করার দুঃসাহস করবে, সে ব্যক্তি অদূরেই স্পষ্ট পাপেও আপতিত হয়ে যাবে। পাপ আল্লাহর সংরক্ষিত চারণভূমি। যে ঐ চারণভূমির ধারে-পাশে চরবে সে অদূরে সম্ভবতঃ তার ভিতরেও চরতে শুরু করে দেবে।” (বুখারী ও মুসলিম) “যা তোমাকে সন্দেহে ফেলে তা বর্জন করে যা সন্দেহে ফেলে না তা গ্রহণ কর। যেহেতু সত্যবাদিতা প্রশান্তি এবং মিথ্যাবাদিতা সংশয় (সৃষ্টি করে)।” (তিরমিযী, নাসাঈ)

📘 দ্বীনে ইসলামের সৌন্দর্য ও বৈশিষ্ট্য > 📄 মানুষের চরিত্র গঠনে ইসলামের বৈশিষ্ট্য

📄 মানুষের চরিত্র গঠনে ইসলামের বৈশিষ্ট্য


১। মানুষেরই প্রকৃতিতে আছে মানুষের ছয়টি শত্রু : কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ ও মাৎসর্য। এ ষড়রিপুর সুদৃঢ় কেল্লা হল মানুষের মন। তাই মনের বিরুদ্ধে সদা যুদ্ধ করতে হয় মানুষকে। সেখানে সে বিজয়ী হলে চরিত্রবান হয়ে গড়ে ওঠে। আর যে চরিত্রে ভালো, সে সবার চেয়ে ভালো। এ জন্যই মনের বিরুদ্ধে যুদ্ধকে সর্বশ্রেষ্ঠ জিহাদ বলে ইসলাম। মহানবী বলেছেন, "মুজাহিদ তো সেই, যে আল্লাহর সন্তুষ্টিতে নিজের আত্মর বিরুদ্ধে জিহাদ করে।” (সহীহুল জামে' ৬৫৫৫নং) “স্বীয় আত্মা ও কুপ্রবৃত্তির বিরুদ্ধে জিহাদ হল মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ জিহাদ।” (ঐ ১১১০নং) এমন সংগ্রামে আত্মবিজয়ী সুপথ পায়। আত্মসংযমী হয় সৎলোক। মহান আল্লাহ বলেন, وَالَّذِينَ جَاهَدُوا فِينَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا وَإِنَّ اللَّهَ لَمَعَ الْمُحْسِنِينَ} (৬৯) অর্থাৎ, যারা আমার উদ্দেশ্যে সংগ্রাম করে, আমি অবশ্যই তাদেরকে আমার পথসমূহে পরিচালিত করব। আর আল্লাহ অবশ্যই সৎকর্মপরায়ণদের সঙ্গেই থাকেন। (আনকাবুতঃ ৬৯)

২। উক্ত ষড়রিপুর মধ্যে অহংকার হল অতি সর্বনাশী শত্রু। ইসলামে তা মহাপাপ। অহংকারী ব্যক্তির ঠিকানা হবে জাহান্নামে। মহানবী বলেছেন, "যার অন্তরে অণু পরিমাণও অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।” (এ কথা শুনে) এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করল, 'মানুষ তো পছন্দ করে যে, তার কাপড়-চোপড় সুন্দর হোক, তার জুতা সুন্দর হোক, (তাহলে সেটাও কি অহংকারের মধ্যে গণ্য হবে?)' তিনি বললেন, “নিশ্চয় আল্লাহ সুন্দর, তিনি সৌন্দর্য ভালবাসেন। অহংকার হচ্ছে সত্যকে প্রত্যাখ্যান করা ও মানুষকে তুচ্ছজ্ঞান করা।” (মুসলিম ২৭৫নং)

অহংকারের সাথে দম্ভভরে চলাফেরা করতে নিষেধ করে ইসলাম। মহান আল্লাহ বলেছেন, وَلَا تَمْشِ فِي الْأَرْضِ مَرَحًا إِنَّكَ لَن تَخْرِقَ الْأَرْضِ وَلَن تَبْلُغَ الْجِبَالَ طولاً} (৩৭) سورة الإসরা অর্থাৎ, ভূ-পৃষ্ঠে দম্ভভরে বিচরণ করো না, তুমি তো কখনোই পদভারে ভূ-পৃষ্ঠ বিদীর্ণ করতে পারবে না এবং উচ্চতায় তুমি কখনোই পর্বত-প্রমাণ হতে পারবে না। (বানী ইস্রাঈল: ৩৭)

৩। ইসলাম একের কথা অন্যকে লাগিয়ে চুগলখোরি করতে নিষেধ করে। কিয়ামত প্রতিষ্ঠার আগেই কবরেই আযাব শুরু হয় চুগলখোরের। (বুখারী) আর রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, "চুগলখোর জান্নাতে যাবে না।” (বুখারী ও মুসলিম)

৪। মিথ্যা কথা বলতে নিষেধ করেছে ইসলাম। মহান আল্লাহ বলেছেন, فَاجْتَنِبُوا الرِّجْسَ মִَ الْأَوْثَانِ وَاجْتَنِبُوا قَوْلَ الزُّور (৩০) سورة الحج অর্থাৎ, তোমরা দূরে থাক মূর্তিরূপ অপবিত্রতা হতে এবং দূরে থাক মিথ্যা কথন হতে। (হাজ্জঃ ৩০)

রসূল ﷺ বলেছেন, “নিশ্চয় সত্যবাদিতা পুণ্যের পথ দেখায়। আর পুণ্য জান্নাতের দিকে পথ নির্দেশনা করে। আর মানুষ সত্য কথা বলতে থাকে, শেষ পর্যন্ত আল্লাহর নিকট তাকে 'মহাসত্যবাদী' রূপে লিপিবদ্ধ করা হয়। আর নিঃসন্দেহে মিথ্যাবাদিতা নির্লজ্জতা ও পাপাচারের দিকে নিয়ে যায়। আর পাপাচার জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়। আর মানুষ মিথ্যা বলতে থাকে, শেষ পর্যন্ত আল্লাহর নিকট তাকে 'মহামিথ্যাবাদী' রূপে লিপিবদ্ধ করা হয়। (বুখারী ও মুসলিম) ইসলাম বলে, মিথ্যাবাদিতা মুসলিমের আচরণ নয়, মিথ্যাবাদিতা হল কপটচারী (মুনাফিক) এর নিদর্শন। (বুখারী, মুসলিম)

৫। ইসলামে কারো প্রতি কুধারণা করা, কারো গোপন দোষ অনুসন্ধান বা ছিদ্রান্বেষণ করা, পরচর্চা, পরনিন্দা ও গীবত করা হারাম। মহান আল্লাহ বলেছেন, {يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اجْتَنِبُوا كَثِيرًا মَِّ الظَّنِّ إِنَّ بَعْضَ الظَّنِّ إِثْمٌ وَلَا تَجَسَّسُوا وَلَا يَغْتَب بَّعْضُكُم بَعْضًا أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَن يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيهِ مَيْتًا فَكَرِهْتুমُوهُ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ تَوَّابٌ رَّحِيمٌ} (১২) سورة الحجرات অর্থাৎ, হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা বহুবিধ ধারণা হতে দূরে থাক; কারণ কোন কোন ধারণা পাপ। আর তোমরা অপরের গোপনীয় বিষয় অনুসন্ধান করো না এবং একে অপরের পশ্চাতে নিন্দা (গীবত) করো না। তোমাদের মধ্যে কি কেউ তার মৃত ভ্রাতার গোস্ত ভক্ষণ করতে চাইবে? বস্তুতঃ তোমরা তো এটাকে ঘৃণ্যই মনে কর। তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। আল্লাহ তাওবা গ্রহণকারী, পরম দয়ালু। (হুজুরাতঃ ১২)

৬। মুখ, চোখ ও হাতের ইশারায় নিন্দা করাকে ইসলাম খুবই খারাপ জানে। মহান আল্লাহ বলেছেন, {وَيْلٌ لِّكُلِّ هُمَزَةٍ لِّمَزَةٍ} (১) سورة الهمزة অর্থাৎ, দুর্ভোগ প্রত্যেকের, যে পশ্চাতে ও সম্মুখে লোকের নিন্দা করে। (হুমাযাহঃ ১)

৭। ইসলাম পরস্পরকে ক্ষমা করতে উদ্বুদ্ধ করে। মানুষকে ক্ষমা করার বিনিময়ে সৃষ্টিকর্তার ক্ষমালাভে ধন্য হতে আগ্রহান্বিত করে। মহান আল্লাহ বলেছেন, {وَلْيَعْفُوا وَلْيَصْفَحُوا أَلَا تُحِبُّونَ أَن يَغْفِرَ اللَّهُ لَكُمْ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ} অর্থাৎ, তারা যেন ওদেরকে ক্ষমা করে এবং ওদের দোষ-ত্রুটি মার্জনা করে। তোমরা কি পছন্দ করো না যে, আল্লাহ তোমাদেরকে ক্ষমা ক'রে দিন? আর আল্লাহ চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়াময়। (নূর: ২২)

{يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّ মִْ أَزْوَاجِكُمْ وَأَوْلَادِكُمْ عَدُوًّا لَّكُمْ فَاحْذَرُوهُمْ وَإِن تَعْفُوا وَتَصْفَحُوا وَتَغْفِرُوا فَإِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ} (১৪) سورة التغابن অর্থাৎ, হে বিশ্বাসিগণ! তোমাদের স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততিদের মধ্যে কেউ কেউ তোমাদের শত্রু, অতএব তাদের সম্পর্কে তোমরা সতর্ক থেকো। আর তোমরা যদি তাদেরকে মার্জনা কর, তাদের দোষ-ত্রুটি উপেক্ষা কর এবং তাদেরকে ক্ষমা কর, তাহলে (জেনে রেখো যে,) নিশ্চয় আল্লাহ চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (তাগাবুনঃ ১৪)

وَسَارِعُوا إِلَى মগ্ফিরাতি মِّ রَّبِّكُمْ وَجَنَّةٍ عَرْضُهَا السَّمَاوَاتُ وَالْأَرْضُ أُعِدَّতْ لِلْمُتَّقِينَ (১৩৩) الَّذِينَ يُنفِقُونَ فِي السَّرَّاءِ وَالضَّرَّاءِ وَالْكَاظِمِينَ الْغَيْظَ وَالْعَافِينَ عَنِ النَّاسِ وَاللَّهُ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ} (১৩৪) سورة آل عمران অর্থাৎ, তোমরা প্রতিযোগিতা (ত্বরা) কর, তোমাদের প্রতিপালকের নিকট থেকে ক্ষমা এবং বেহেশ্বের জন্য, যার প্রস্থ আকাশ ও পৃথিবীর সমান, যা ধর্মভীরুদের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে। যারা সচ্ছল ও অসচ্ছল অবস্থায় দান করে, ক্রোধ সংবরণ করে এবং মানুষকে ক্ষমা ক'রে থাকে। আর আল্লাহ (বিশুদ্ধচিত্ত) সৎকর্মশীলদেরকে ভালবাসেন। (আলে ইমরানঃ ১৩৩-১৩৪) এক ব্যক্তি নবী -এর নিকট এসে বলল, 'হে আল্লাহর রসূল! আমরা দাস-দাসীকে কতবার ক্ষমা করব?' এ কথা শুনে তিনি নীরব থাকলেন। অতঃপর সেই ব্যক্তি পুনরায় একই প্রশ্ন করল। কিন্তু এবারেও তিনি চুপ থাকলেন। অতঃপর তৃতীয়বারে উত্তরে তিনি বললেন, “প্রত্যহ তাকে সত্তর বার ক্ষমা কর!” (আবু দাউদ ৫১৬৪, তিরমিযী ১৯৪৯, সিঃ সহীহাহ ৪৮৮নং)

৮। ইসলাম আপোসে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি বজায় রাখতে উদ্বুদ্ধ করে। নিজেদের মাঝে ও বিবদমান মানুষদের মাঝে মিলন সংসাধন ও সন্ধি স্থাপন করতে আদেশ করে। মহান আল্লাহ বলেছেন, {فَاتَّقُوا اللَّهَ وَأَصْلِحُوا ذَاتَ بَيْنِكُمْ وَأَطِيعُوا اللَّهَ وَرَسُولَهُ إِن كُنتُم মُّؤْمِنِينَ} অর্থাৎ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং নিজেদের মধ্যে সদ্ভাব স্থাপন কর; যদি তোমরা বিশ্বাসী হও, তাহলে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের আনুগত্য কর। (আনফালঃ ১)

{لَّا خَيْرَ فِي كَثِيرٍ মِّ نَّجْوَاهُمْ إِلَّا মَنْ أَمَرَ بِصَدَقَةٍ أَوْ মَعْرُوفٍ أَوْ إِصْلَاحِ بَيْنَ النَّاسِ وَمن يَفْعَلْ ذَلِكَ ابْتِغَاء মَرْضَاتِ اللَّهِ فَسَوْفَ نُؤْتِيهِ أَجْرًا عَظِيمًا } অর্থাৎ, তাদের অধিকাংশ গোপন পরামর্শে কোন কল্যাণ নেই, তবে যে (তার পরামর্শে) দান খয়রাত, সৎকাজ ও মানুষের মধ্যে শান্তি স্থাপনের নির্দেশ দেয় (তাতে কল্যাণ আছে)। আর আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আকাঙ্ক্ষায় যে ঐরূপ করবে, তাকে আমি মহা পুরস্কার দান করব। (নিসাঃ ১১৪)

{إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ فَأَصْلِحُوا بَيْنَ أَخَوَيْكُمْ وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ} অর্থাৎ, সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই, সুতরাং তোমরা তোমাদের দুই ভাই-এর মধ্যে সন্ধি স্থাপন কর এবং আল্লাহকে ভয় কর; যাতে তোমরা করুণাপ্রাপ্ত হও। (হুজুরাতঃ ১০) এমন সন্ধি স্থাপন ও মিলন সংসাধন করতে ইসলাম মিথ্যা বলাকেও বৈধ করেছে।

৯। গালাগালি করতে নিষেধ করে ইসলাম। রাসূলুল্লাহ বলেছেন, “মুসলিমকে গালি দেওয়া ফাসেকী (আল্লাহর অবাধ্যাচরণ) এবং তার সাথে লড়াই ঝগড়া করা কুফরী।” (বুখারী ও মুসলিম)

১০। ইসলাম অশ্লীল কথাকে অপছন্দ করে। কেউ স্পষ্টবাদী হলেও তার নোংরা কথাকে ঘৃণা করে। মহান আল্লাহ বলেছেন, لَا يُحِبُّ اللَّهُ الْجَهْرَ بِالسُّوءِ মִَ الْقَوْلِ إِلَّا মَنْ ظُلِمَ ۚ وَكَانَ اللَّهُ سَمِيعًا عَلِيمًا } (১৪৮) سورة النساء অর্থাৎ, মন্দ কথা প্রকাশ করাকে আল্লাহ পছন্দ করেন না; তবে যার উপর যুলুম করা হয়েছে তার কথা স্বতন্ত্র। আর আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। (নিসাঃ ১৪৮) আল্লাহর রসূল বলেন, “অশ্লীলতা (নির্লজ্জতা) যে বিষয়ে থাকে সে বিষয়কে তা সৌন্দর্যহীন (মান) করে ফেলে। আর লজ্জাশীলতা যে বিষয়ে থাকে সে বিষয়কে তা সৌন্দর্যময় (মনোহর) করে তোলে।” (সহীহ তিরমিযী ১৬০৭ নং, ইবনে মাজাহ)

১১। লজ্জাশীলতা পুরুষের আবরণ ও নারীর আভরণ। তাই ইসলাম নারী-পুরুষ সকলকেই লজ্জাশীলতার পোশাক ও অলংকার ব্যবহার করতে উদ্বুদ্ধ করে। আল্লাহর রসূল বলেন, “অবশ্যই লজ্জাশীলতা ও ঈমান একই সূত্রে গাঁথা। একটি চলে গেলে অপরটিও চলে যায়।” (হাকেম, মিশকাত ৫০৯৪, সহীহুল জামে ১৬০৩নং) "প্রত্যেক ধর্মে সচ্চরিত্রতা আছে, ইসলামের সচ্চরিত্রতা হল লজ্জাশীলতা।” (ইবনে মাজাহ, সহীহুল জামে ২১৪৯নং) "লজ্জার সবটুকুই মঙ্গলময়।” “লজ্জা কেবল মঙ্গলই আনয়ন করে।” (বুখারী, মুসলিম, সহীহুল জামে ৩১৬৬, ৩২০২নং)

১২। লোকপ্রদর্শনের জন্য কোন প্রকার ইবাদত ও আমল করতে নিষেধ করা হয়েছে। যে কাজ লোক-দেখানির জন্য করা হবে, তাকে বাতিল করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ-কে বলেছেন, মহান আল্লাহ বলেন, “আমি সমস্ত অংশীদারদের চাইতে অংশীদারি (শিক) থেকে অধিক অমুখাপেক্ষী। কেউ যদি এমন কাজ করে, যাতে সে আমার সঙ্গে অন্য কাউকে অংশীদার স্থাপন করে, তাহলে আমি তাকে তার অংশীদারি (শিক) সহ বর্জন করি।” (অর্থাৎ তার আমলই নষ্ট করে দিই।) (মুসলিম) তিনি আরো বলেছেন, “হে মানুষ! তোমরা সালাম প্রচার কর, অন্নদান কর, জ্ঞাতি-বন্ধন অক্ষুন্ন রাখ এবং লোকেরা যখন ঘুমিয়ে থাকে তখন তোমরা নামায পড়। এতে তোমরা নির্বিঘ্নে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে।” (তিরমিযী, ইবনে মাজাহ, হাকেম, সহীহ তারগীব ৬১০নং)

১৩। মুসলিমকে কোন প্রকার কষ্ট দিতে নিষেধ করে ইসলাম। মহান আল্লাহ বলেছেন, وَالَّذِينَ يُؤْذُونَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ بِغَيْرِ مَا اكْتَسَبُوا فَقَدِ احْتَمَلُوا بُهْتَانًا وَإِثْمًا মُّبِينًا} (৫৮) سورة الأحزاب অর্থাৎ, যারা বিনা অপরাধে বিশ্বাসী পুরুষ ও নারীদেরকে কষ্ট দেয়, তারা অবশ্যই মিথ্যা অপবাদ এবং স্পষ্ট অপরাধের বোঝা বহন করে। (আহযাবঃ ৫৮) রাসূলুল্লাহ বলেছেন, "প্রকৃত মুসলিম সেই, যার মুখ ও হাত হতে মুসলিমগণ নিরাপদে থাকে। আর প্রকৃত মুহাজির (দ্বীন বাঁচানোর উদ্দেশ্যে স্বদেশ ত্যাগকারী) সেই ব্যক্তি, যে আল্লাহর নিষিদ্ধ কর্মসমূহ ত্যাগ করে।” (বুখারী ও মুসলিম)

১৪। প্রতিবেশীকে কষ্ট দিতে বারণ করেছে ইসলাম। সে ভালো লোক তো নয়ই, প্রকৃত মুসলিমও নয়, যে তার প্রতিবেশীকে কোনভাবে কষ্ট দেয়। মহানবী বলেছেন, “আল্লাহর কসম! সে ব্যক্তি মু'মিন নয়। আল্লাহর কসম! সে ব্যক্তি মু'মিন নয়। আল্লাহর কসম! সে ব্যক্তি মু'মিন নয়।” জিজ্ঞেস করা হল, 'কোন্ ব্যক্তি? হে আল্লাহর রসূল!' তিনি বললেন, "যে লোকের প্রতিবেশী তার অনিষ্ট থেকে নিরাপদে থাকে না।” (বুখারী ও মুসলিম) মুসলিমের এক বর্ণনায় আছে, ঐ ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না, যার অনিষ্ট থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদে থাকে না।

১৫। ইসলাম মুসলিমকে পরোপকারী ও সমাজসেবী হতে উদ্বুদ্ধ করে। মানুষের সেবা করতে নির্দেশ দেয়। মহানবী বলেছেন, (خَيْرُ النَّاسِ أَنْفَعُهُمْ لِلنَّاسِ) অর্থাৎ, সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ সেই ব্যক্তি, যে মানুষের জন্য সবচেয়ে বেশি উপকারী। (সঃ জামে' ৩২৮৯, দারাকুত্বনী, সিঃ সহীহাহ ৪২৬নং) إِنَّ أَحَبَّ ألاعْمَالِ إِلَى اللَّهِ تَعَالَى بَعْدَ الفَرَائِضِ إِدْخَالُ السُّرُورِ عَلَى المُسْلِمِ». অর্থাৎ, ফরয আমলসমূহের পর মহান আল্লাহর নিকট সবচেয়ে বেশি প্রিয় আমল হল, মুসলিমের মনে আনন্দ ভরে দেওয়া। (ত্বাবারানী, সিঃ সহীহাহ ৯০৬নং)

তিনি আরো বলেন, "আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয়তম লোক হল সেই ব্যক্তি যে মানুষের জন্য সবচেয়ে বেশী উপকারী। আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয়তম আমল হল, একজন মুসলিমের হৃদয়কে খুশীতে পরিপূর্ণ করা অথবা তার কোন কষ্ট দূর করে দেওয়া অথবা তার তরফ থেকে তার ঋণ আদায় করে দেওয়া অথবা (কাপড় দান করে তার ইজ্জত ঢেকে দেওয়া অথবা) তার নিকট থেকে তার ক্ষুধা দূর করে দেওয়া। মসজিদে একমাস ধরে ই'তিকাফ করার চাইতে আমার মুসলিম ভাইয়ের কোন প্রয়োজন মিটাতে যাওয়া আমার নিকট অধিক পছন্দনীয়। যে ব্যক্তি নিজ ক্রোধ সংবরণ করে নেবে, আল্লাহ তার দোষ গোপন করে নেবেন। যে ব্যক্তি নিজ রাগ সামলে নেবে; অথচ সে ইচ্ছা করলে তা প্রয়োগ করতে পারত, সে ব্যক্তির হৃদয়কে আল্লাহ কিয়ামতের দিন সন্তুষ্ট করবেন। যে ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইয়ের প্রয়োজন পূরণ করার জন্য যাবে এবং তা পূরণ করে দেবে, আল্লাহ সেদিন তার পদযুগলকে সুদৃঢ় রাখবেন, যেদিন পদযুগল পিছল কাটবে। আর মন্দ চরিত্র আমলকে নষ্ট করে, যেমন সির্কা মধুকে নষ্ট করে ফেলে।” (সহীহ তারগীব ২০৯০, সিলসিলাহ সহীহাহ ১৪৯৪নং, সহীহুল জামে' ১৭৬নং)

বারা' ইবনে আযেব বলেন, রাসূলুল্লাহ আমাদেরকে সাতটি কাজ করতে নির্দেশ দিয়েছেন এবং সাতটি কাজ করতে নিষেধ করেছেন। তিনি রোগী দেখতে যেতে, জানাযায় অংশগ্রহণ করতে, কেউ হাঁচি দিলে তার জবাব দিতে, শপথকারীর শপথ রক্ষা করতে, নিপীড়িতদের সাহায্য করতে, সালামের প্রসার ঘটাতে এবং কেউ দাওয়াত দিলে তা গ্রহণ করতে নির্দেশ দিয়েছেন। আর তিনি আমাদেরকে সোনার আংটি পরতে, রূপার পাত্র ব্যবহার করতে, রেশমের জিনপোশ, কাস্সী, ইস্তাবরাক ও দীবাজ (সর্বপ্রকার রেশম- বস্ত্র) ব্যবহার করতে নিষেধ করেছেন। (বুখারী ও মুসলিম) শেষোক্ত কর্মাবলীতে যেহেতু মানুষের মনে সাধারণতঃ অহংকার সৃষ্টি হয়, তাই ইসলামে তা নিষিদ্ধ হয়েছে।

১৬। যারা পৃথিবীর বুকে ফিতনা-ফাসাদ ও অশান্তি সৃষ্টি করে, ইসলাম তাদেরকে পছন্দ করে না। মহান আল্লাহ বলেন, {وَإِذَا تَوَلَّى سَعَى فِي الْأَرْضِ لِيُفْسِدَ فِيهَا وَيُهْلِكَ الْحَرْثَ وَالنَّسْلَ وَاللَّهُ لَا يُحِبُّ الفَسَادَ} (২০৫) সূরা বাকারা অর্থাৎ, যখন সে (তোমার কাছ থেকে) প্রস্থান করে, তখন পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করে এবং শস্যক্ষেত্র ও (জীব-জন্তুর) বংশনিপাতের চেষ্টা করে। কিন্তু আল্লাহ অশান্তি পছন্দ করেন না। (বাক্বারাহঃ ২০৫)

{وَلَا تَبْغِ الْفَسَادَ فِي الْأَرْضِ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْمُفْسِدِينَ} (৭৭) অর্থাৎ, পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করতে চেয়ো না। আল্লাহ অবশ্যই বিপর্যয় সৃষ্টিকারীকে ভালবাসেন না। (ক্বাস্বাস্বঃ ৭৭)

১৭। অন্যায়-অত্যাচারকে ইসলাম হারাম ঘোষণা করেছে। মহান আল্লাহ অত্যাচারীকে পছন্দ করেন না। পরন্ত পরকালে তার জন্য প্রস্তুত রেখেছেন উচিত শাস্তি। আর কোন যুলুমের শাস্তি দিয়ে থাকেন ইহকালেই। তিনি বলেছেন, {وَأَمَّا الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ فَيُوَفِّيهِمْ أُجُورَهُمْ وَاللَّهُ لَا يُحِبُّ الظَّالِمِينَ} (৫৭) সূরা আলে ইমরান অর্থাৎ, যারা বিশ্বাস করেছে এবং সৎকার্য করেছে, তিনি তাদের প্রতিদান পুরোপুরিভাবে প্রদান করবেন। বস্তুতঃ আল্লাহ অত্যাচারিগণকে ভালবাসেন না।' (আলে ইমরান: ৫৭)

{إِنَّمَا السَّبِيلُ عَلَى الَّذِينَ يَظْلِمُونَ النَّاسَ وَيَبْغُونَ فِي الْأَرْضِ بِغَيْرِ الْحَقِّ أُوْلَئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ} (৪২) সূরা আশ্-শূরা অর্থাৎ, কেবল তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে, যারা মানুষের ওপর অত্যাচার করে এবং পৃথিবীতে অহেতুক বিদ্রোহাচরণ ক'রে বেড়ায়। তাদের জন্যই রয়েছে বেদনাদায়ক শাস্তি। (শূরাঃ ৪২) {وَكَذَلِكَ أَخْذُ رَبِّكَ إِذَا أَخَذَ الْقُرَى وَهِيَ ظَالِمَةٌ إِنَّ أَخْذَهُ أَلِيمٌ شَدِيدٌ} অর্থাৎ, এরূপই তোমার প্রতিপালকের পাকড়াও; যখন তিনি কোন অত্যাচারী জনপদের অধিবাসীদেরকে পাকড়াও করেন। নিঃসন্দেহে তাঁর পাকড়াও অত্যন্ত যাতনাদায়ক, কঠিন। (হৃদঃ ১০২)

আল্লাহর রসূল বলেন, "তোমরা যুলুম থেকে বাঁচ; কারণ, যুলুম হল কিয়ামতের দিনের অন্ধকার। আর কার্পণ্য থেকেও বাঁচ; কারণ কার্পণ্য তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতকে ধ্বংস করেছে; তা তাদেরকে আপোসের মধ্যে রক্তপাত ঘটাতে এবং হারামকে হালাল করে ব্যবহার করতে প্ররোচিত করেছে।” (মুসলিম ২৫৭৮নং) তিনি আরো বলেছেন, "মহান আল্লাহ বলেন, 'হে আমার বান্দারা! আমি নিজের উপর যুলুমকে হারাম করেছি এবং তোমাদের মাঝেও তা হারাম ঘোষণা করছি। সুতরাং তোমরা একে অন্যের উপর যুলুম করো না।---” (মুসলিম ২৫৭৭নং)

১৮। ইসলাম আমানতদার হতে মানুষকে নির্দেশ দেয় এবং খিয়ানত করতে নিষেধ করে। মহান আল্লাহ বলেন, {إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَن تُؤدُّوا الأَمَانَاتِ إِلَى أَهْلِهَا وَإِذَا حَكَمْتُم بَيْنَ النَّاسِ أَن تَحْكُمُوا بِالْعَدْلِ إِنَّ اللَّهَ نِعِمَّا يَعِظُكুম بِهِ إِنَّ اللَّهَ كَانَ سَمِيعًا بَصِيرًا } অর্থাৎ, নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, আমানত তার মালিককে প্রত্যর্পণ করবে। আর যখন তোমরা মানুষের মধ্যে বিচার-কার্য পরিচালনা করবে, তখন ন্যায়পরায়ণতার সাথে বিচার করবে। আল্লাহ তোমাদেরকে যে উপদেশ দেন, তা কত উৎকৃষ্ট! নিশ্চয় আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা। (নিসাঃ ৫৮)

{وَلَا تُجَادِلْ عَنِ الَّذِينَ يَخْتَانُونَ أَنفُسَهُمْ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ মَنْ كَانَ خَوَّانًا أَثِيمًا} (১০৭) সূরা নিসা অর্থাৎ, তুমি তাদের পক্ষে কথা বলো না, যারা নিজেদের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করে। নিশ্চয় আল্লাহ বিশ্বাসঘাতক পাপিষ্ঠকে ভালোবাসেন না। (নিসাঃ ১০৭) মহানবী বলেন, “তোমার কাছে যে আমানত রেখেছে, তা তাকে প্রত্যর্পণ কর এবং যে তোমার খেয়ানত করেছে, তার খেয়ানত করো না।” (সিলসিলাহ সহীহাহ ৪২৩নং) আল্লাহর রসূল প্রায় খুতবাতে বলতেন, “যার আমানতদারী নেই, তার ঈমান নেই। আর যে অঙ্গীকার পালন করে না, তার দ্বীন নেই।” (আহমাদ, বাইহাক্বী, সহীহুল জামে' ৭১৭৯নং)

১৯। প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে ও অঙ্গীকার পালন করতে নির্দেশ দেয় ইসলাম। মহান আল্লাহ বলেছেন, وَأَوْفُوا بِالْعَهْدِ إِنَّ الْعَهْدَ كَانَ مَسْؤُولاً) (৩৪) সূরা ইসরা অর্থাৎ, প্রতিশ্রুতি পালন করো; নিশ্চয়ই প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে কৈফিয়ত তলব করা হবে। (বানী ইস্রাঈল: ৩৪)

{وَأَوْفُوا بِعَهْدِ اللَّهِ إِذَا عَاهَدتُّمْ وَلَا تَنقُضُوا الأَيْمَانَ بَعْدَ تَوْكِيدِهَا وَقَدْ جَعَلْتُمُ اللَّهَ عَلَيْكُمْ كَفِيلاً إِنَّ اللَّهَ يَعْلَمُ مَا تَفْعَلُونَ} (৯১) সূরা নাহল অর্থাৎ, তোমরা যখন পরস্পর অঙ্গীকার কর তখন আল্লাহর অঙ্গীকার পূর্ণ করো এবং আল্লাহকে তোমাদের যামিন ক'রে শপথ দৃঢ় করবার পর তোমরা তা ভঙ্গ করো না; তোমরা যা কর, অবশ্যই আল্লাহ তা জানেন। (নাহলঃ ৯১)

{يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَوْفُوا بِالْعُقُودِ} (১) সূরা আল-মায়েদা অর্থাৎ, হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা অঙ্গীকার (ও চুক্তিসমূহ) পূর্ণ কর। (মায়িদাহঃ ১) আল্লাহর রসূল বলেছেন, “তোমরা তোমাদের তরফ থেকে আমার জন্য ছয়টি বিষয়ের জামিন হও, আমি তোমাদের জন্য বেহেশ্বের জামিন হয়ে যাব; কথা বললে সত্য বল, অঙ্গীকার করলে তা পালন কর, তোমাদের নিকটে কোন আমানত রাখা হলে তা আদায় কর, তোমাদের যৌনাঙ্গের হিফাযত কর, তোমাদের চক্ষুকে (অবৈধ কিছু দেখা হতে) অবনত রাখ, আর তোমাদের হাতকে (অন্যায় ও অত্যাচার করা হতে) সংযত রাখ।” (আহমাদ, ত্বাবারানী, ইবনে খুযাইমাহ, ইবনে হিব্বান, হাকেম, সিলসিলাহ সহীহাহ ১৪৭০ নং) অঙ্গীকার, প্রতিশ্রুতি বা চুক্তি পালন না করা মুনাফিকের লক্ষণ। মুসলিমের মাঝে সে দোষ থাকতে পারে না।

এমনকি শত্রুপক্ষের সাথেও যে চুক্তি করা হয়, তাও পালনীয়। মহান আল্লাহ বলেছেন, {إِلَّا الَّذِينَ عَاهَدتُّم মَِّ الْمُشْرِكِينَ ثُمَّ لَمْ يَنقُصُوكُمْ شَيْئًا وَلَمْ يُظَاهِرُوا عَلَيْكُمْ أَحَدًا فَأَتِمُّوا إِلَيْهِمْ عَهْدَهُمْ إِلَى مُدَّتِهِمْ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَّقِينَ} (৪) অর্থাৎ, তবে অংশীবাদীদের মধ্যে যাদের সাথে তোমরা চুক্তিতে আবদ্ধ ও পরে যারা তোমাদের চুক্তি রক্ষায় কোন ত্রুটি করেনি এবং তোমাদের বিরুদ্ধে কাউকেও সাহায্য করেনি, তোমরা তাদের সাথে নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত চুক্তি পালন কর। নিশ্চয় আল্লাহ সাবধানীদেরকে ভালোবাসেন। (তাওবাহ: ৪) যে ব্যক্তি সংযমশীলতার সাথে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে, মহান আল্লাহ তাকে ভালোবাসেন। তিনি বলেছেন, {بَلَى মَنْ أَوْفَى بِعَهْدِهِ وَاتَّقَى فَإِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَّقِينَ} (৭৬) আলে ইমরান অর্থাৎ, অবশ্যই যে তার অঙ্গীকার পালন করে এবং সংযত হয়ে চলে, নিশ্চয় আল্লাহ সংযমীদেরকে ভালবাসেন। (আলে ইমরান: ৭৬)

২০। এমন আনন্দ ও উল্লাস ইসলামে বৈধ নয়, যাতে দম্ভ ও অহমিকা থাকে। মাল-ধন, সুখ-শান্তি পেয়ে এমন খোশ হওয়া বৈধ নয়, যাতে গর্বের মিশ্রণ থাকে। মহান আল্লাহ বলেছেন, {إِنَّ قَارُونَ كَانَ মִ قَوْمِ مُوسَى فَبَغَى عَلَيْهِمْ وَآتَيْنَاهُ মִَ الْكُنُوزِ مَا إِنَّ مَفَاتِحَهُ لَتَنُوءُ بِالْعُصْبَةِ أُولِي الْقُوَّةِ إِذْ قَالَ لَهُ قَوْمُهُ لَا تَفْرَحْ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْفَرِحِينَ} (৭৬) সূরা কাসাস অর্থাৎ, কারূন ছিল মুসার সম্প্রদায়ভুক্ত, কিন্তু সে তাদের প্রতি যুলুম করেছিল। আমি তাকে ধনভান্ডার দান করেছিলাম, যার চাবিগুলি বহন করা একদল বলবান লোকের পক্ষেও কষ্টসাধ্য ছিল। স্মরণ কর, তার সম্প্রদায় তাকে বলেছিল, 'দম্ভ করো না, আল্লাহ দাম্ভিকদেরকে পছন্দ করেন না। (ক্বাস্বাস্বঃ ৭৬)

২১। সবরে মেওয়া ফলে। ধৈর্যশীলদের সঙ্গে থাকেন আল্লাহ। তিনি ধৈর্যশীলদেরকে ভালোবাসেন। সাফল্যের পথে ধৈর্যের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। তাই তিনি বলেন, {يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اصْبِرُوا وَصَابِرُوا وَرَابِطُوا وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ} (২০০) সূরা আলে ইমরান অর্থাৎ, হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা ধৈর্য ধারণ কর। ধৈর্য ধারণে প্রতিযোগিতা কর এবং (শত্রুর বিপক্ষে) সদা প্রস্তুত থাক; আর আল্লাহকে ভয় কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার। (আলে ইমরানঃ ২০০) وَالْعَصْرِ (১) إِنَّ الإِنسَانَ لَفِي خُسْرٍ (২) إِلَّا الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ وَتَوَاصَوْا بِالْحَقِّ وَتَوَاصَوْا بِالصَّبْرِ (৩) অর্থাৎ, মহাকালের শপথ। মানুষ অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত। কিন্তু তারা নয়, যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে এবং পরস্পরকে সত্যের উপদেশ দেয়। আর উপদেশ দেয় ধৈর্য ধারণের। (আসরঃ ১-৩)

মহানবী বলেছেন, "যে ব্যক্তি চাওয়া থেকে পবিত্র থাকার চেষ্টা করবে, আল্লাহ তাকে পবিত্র রাখবেন। আর যে ব্যক্তি (চাওয়া থেকে) অমুখাপেক্ষিতা অবলম্বন করবে, আল্লাহ তাকে অমুখাপেক্ষী করবেন। যে ব্যক্তি ধৈর্য ধারণ করার চেষ্টা করবে আল্লাহ, তাকে ধৈর্য ধারণের ক্ষমতা প্রদান করবেন। আর কোন ব্যক্তিকে এমন কোন দান দেওয়া হয়নি, যা ধৈর্য অপেক্ষা উত্তম ও বিস্তর হতে পারে।” (বুখারী-মুসলিম) রাগ ও ক্রোধ দমন করা ধৈর্যশীলতার পরিচয়। রাসূলুল্লাহ বলেছেন, “কুস্তিগীর বীর সে নয়, যে প্রতিদ্বন্দ্বীকে চিৎপাত ক'রে দেয়। প্রকৃতপক্ষে বীর সেই, যে ক্রোধের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে।” (বুখারী ও মুসলিম)

২২। মানুষ যত বড়ই হোক না কেন, কর্মে অপরের পরামর্শ নেওয়ার প্রয়োজন আছে। ইসলাম আত্মকেন্দ্রিক একনায়কতন্ত্রী হতে নিষেধ করে। ইসলাম সকলকে নিয়ে পরামর্শভিত্তিক কর্ম করতে বলে, পরামর্শভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে বলে এবং প্রত্যেক কাজে আল্লাহর উপর নির্ভরশীল হতে উদ্বুদ্ধ করে। মহান আল্লাহ বলেছেন, {فَبِمَا رَحْمَةٍ মَِّ اللَّهِ لِنتَ لَهُمْ وَلَوْ كُنتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَأَنفัضُّوا মִْ حَوْلِكَ فَاعْفُ عَنْهُمْ وَاسْتَغْفِرْ لَهُمْ وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَوَكِّلِينَ} (১৫৯) সূরা আল ইমরান অর্থাৎ, আল্লাহর দয়ায় তুমি তাদের প্রতি হয়েছিলে কোমল-হৃদয়; যদি তুমি রূঢ় ও কঠোর-চিত্ত হতে, তাহলে তারা তোমার আশপাশ হতে সরে পড়ত। সুতরাং তুমি তাদেরকে ক্ষমা কর এবং তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর। আর কাজে-কর্মে তাদের সাথে পরামর্শ কর। অতঃপর তুমি কোন সংকল্প গ্রহণ করলে আল্লাহর প্রতি নির্ভর কর। নিশ্চয় আল্লাহ (তাঁর উপর) নির্ভরশীলদের ভালবাসেন। (আলে ইমরানঃ ১৫৯)

{وَالَّذِينَ اسْتَجَابُوا لِرَبِّهِمْ وَأَقَامُوا الصَّلَاةَ وَأَمْرُهُمْ شُورَى بَيْنَهُمْ وَমִমَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنفِقُونَ} (৩৮) سورة الشورى অর্থাৎ, (আল্লাহর নিকট যা আছে, তা উত্তম ও চিরস্থায়ী তাদের জন্য, যারা বিশ্বাস করে-----) এবং যারা তাদের প্রতিপালকের আহবানে সাড়া দেয়, নামায প্রতিষ্ঠা করে, আপোসে পরামর্শের মাধ্যমে নিজেদের কর্ম সম্পাদন করে এবং তাদেরকে যে রুযী দিয়েছি, তা হতে ব্যয় করে। (শূরা: ৩৮)

২৩। ন্যায়পরায়ণতার ধর্ম ইসলাম। আপন-পর, বন্ধু ও শত্রু সকলের সাথে ন্যায়াচরণ করতে আদেশ দেয়। মহান আল্লাহ বলেন, {إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَن تُؤدُّوا الأَمَانَاتِ إِلَى أَهْلِهَا وَإِذَا حَكَمْتুম بَيْنَ النَّاسِ أَن تَحْكُمُوا بِالْعَدْلِ إِنَّ اللَّهَ نِعِمَّا يَعِظُكুম بِهِ إِنَّ اللَّهَ كَانَ سَمِيعًا بَصِيرًا } অর্থাৎ, নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, আমানত তার মালিককে প্রত্যর্পণ করবে। আর যখন তোমরা মানুষের মধ্যে বিচার-কার্য পরিচালনা করবে, তখন ন্যায়পরায়ণতার সাথে বিচার করবে। আল্লাহ তোমাদেরকে যে উপদেশ দেন, তা কত উৎকৃষ্ট! নিশ্চয় আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা। (নিসাঃ ৫৮)

{سَمَّاعُونَ لِلْكَذِبِ أَكَّالُونَ لِلسُّحْتِ فَإِن جَاؤُوكَ فَاحْكُم بَيْنَهُم أَوْ أَعْرِضْ عَنْهُمْ وَإِن تُعْرِضْ عَنْهُمْ فَلَن يَضُرُّوكَ شَيْئًا وَإِنْ حَكَمْتَ فَاحْكُم بَيْنَهُمْ بِالْقِسْطِ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ} (৪২) سورة المائدة অর্থাৎ, তারা মিথ্যা শ্রবণে অত্যন্ত আগ্রহশীল এবং অবৈধ উপায়ে লব্ধ বস্তু ভক্ষণে অত্যন্ত আসক্ত, তারা যদি তোমার নিকট আসে, তাহলে তাদের বিচার-নিষ্পত্তি কর অথবা তাদেরকে উপেক্ষা কর। আর যদি তাদেরকে উপেক্ষা কর, তাহলে তারা তোমার কোন ক্ষতি করতে পারবে না। পক্ষান্তরে যদি বিচার-নিষ্পত্তি কর, তাহলে তাদের মাঝে ন্যায়পরায়ণতার সাথে বিচার-নিষ্পত্তি কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়পরায়ণদেরকে ভালবাসেন। (মায়িদাহঃ ৪২)

{إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالإِحْسَانِ وَإِيتَاءِ ذِي الْقُرْبَى وَيَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنكَرِ وَالْبَغْيِ يَعِظُكُمْ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ} (৯০) سورة النحل অর্থাৎ, নিশ্চয় আল্লাহ ন্যায়পরায়ণতা, সদাচরণ ও আত্মীয়- স্বজনকে দানের নির্দেশ দেন এবং তিনি অশ্লীলতা, অসৎকার্য ও সীমালংঘন করা হতে নিষেধ করেন। তিনি তোমাদেরকে উপদেশ দেন; যাতে তোমরা শিক্ষা গ্রহণ কর। (নাহল: ৯০)

{وَإِن طَائِفَتَانِ মִَ الْمُؤْمِنِينَ اقْتَتَلُوا فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا فَإِن بَغَتْ إِحْدَاهُمَا عَلَى الْأُخْرَى فَقَاتِلُوا الَّتِي تَبْغِي حَتَّى تَفِيءَ إِلَى أَمْرِ اللَّهِ فَإِن فَاءَتْ فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا بِالْعَدْلِ وَأَقْسِطُوا إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ } (৯) সূরা আল-হুজরাত অর্থাৎ, বিশ্বাসীদের দুই দল যুদ্ধে লিপ্ত হলে তোমরা তাদের মধ্যে সন্ধি স্থাপন কর; অতঃপর তাদের একদল অপর দলের প্রতি বিদ্রোহাচরণ করলে তোমরা বিদ্রোহী দলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কর; যতক্ষণ না তারা আল্লাহর নির্দেশের দিকে ফিরে আসে, যদি তারা ফিরে আসে, তাহলে তাদের মধ্যে ন্যায়ের সাথে সন্ধি স্থাপন কর এবং সুবিচার কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ সুবিচারকারীদেরকে ভালবাসেন। (হুজুরাত: ৯)

{يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ كُونُواْ قَوَّামِينَ بِالْقِسْطِ شُهَدَاء لِلَّهِ وَلَوْ عَلَى أَنفُسِكُمْ أَوِ الْوَالِدَيْنِ وَالْأَقْرَبِينَ إِن يَكُنْ غَنِيًّا أَوْ فَقِيرًا فَاللَّهُ أَوْلَى بِهِمَا فَلَا تَتَّبِعُوا الْهَوَى أَن تَعْدِلُوا وَإِن تَلْوُوا أَوْ تُعْرِضُوا فَإِنَّ اللَّهَ كَانَ بِما تَعْمَلُونَ خَبِيرًا } অর্থাৎ, হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা ন্যায় বিচারে দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত থাক, তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে সাক্ষ্য দাও; যদিও তা তোমাদের নিজেদের অথবা পিতা-মাতা এবং আত্মীয়-স্বজনের বিরুদ্ধে হয়। সে বিত্তবান হোক অথবা বিত্তহীনই হোক, আল্লাহ উভয়েরই যোগ্যতর অভিভাবক। সুতরাং তোমরা ন্যায়-বিচার করতে খেয়াল-খুশীর অনুগামী হয়ো না। যদি তোমরা পেঁচালো কথা বল অথবা পাশ কেটে চল, তাহলে (জেনে রাখ) যে, তোমরা যা কর, আল্লাহ তার খবর রাখেন। (নিসাঃ ১৩৫)

{يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُونُوا قَوَّামِينَ لِلَّهِ شُهَدَاء بِالْقِسْطِ وَلَا يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَآنُ قَوْمٍ عَلَى أَلا تَعْدِلُوا اعْدِلُواْ هُوَ أَقْرَبُ لِلتَّقْوَى وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِما تَعْمَلُونَ} (৮) সূরা আল-মায়েদা অর্থাৎ, হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে (হকের উপর) দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত (এবং) ন্যায়পরায়ণতার সাথে সাক্ষ্যদাতা হও। কোন সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ তোমাদেরকে যেন কখনও সুবিচার না করাতে প্ররোচিত না করে। সুবিচার কর, এটা আত্মসংযমের নিকটতর এবং আল্লাহকে ভয় কর। তোমরা যা কর, আল্লাহ তার খবর রাখেন। (মায়িদাহঃ ৮)

{لَا يَنْهَاكُمُ اللَّهُ عَنِ الَّذِينَ لَمْ يُقَاتِلُوكُمْ فِي الدِّينِ وَلَمْ يُخْرِجُوكুম মِّ دِيَارِكُمْ أَن تَبَرُّوهُمْ وَتُقْسِطُوا إِلَيْهِمْ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ } (৮) অর্থাৎ, দ্বীনের ব্যাপারে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদেরকে স্বদেশ হতে বহিষ্কার করেনি, তাদের প্রতি মহানুভবতা প্রদর্শন ও ন্যায় বিচার করতে আল্লাহ তোমাদেরকে নিষেধ করেন না। নিশ্চয় আল্লাহ ন্যায়-পরায়ণদেরকে ভালবাসেন। (মুমতাহিনাহঃ ৮)

২৪। ইসলাম হক কথা বলতে নির্দেশ দেয়। স্বজনের বিরুদ্ধে হলেও ন্যায্য কথা বলতে উৎসাহিত করে। মহান আল্লাহ বলেন, {يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَقُولُوا قَوْلًا سَدِيدًا} (৭০) الأحزاب অর্থাৎ, হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সঠিক কথা বল। (আহযাবঃ ৭০)

وَلَا تَق্ৰَبُوا مَالَ الْيَتِيمِ إِلَّا بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ حَتَّى يَبْلُغَ أَشُدَّهُ وَأَوْفُوا الْكَيْلَ وَالْمِيزَانَ بِالْقِسْطِ لَا تُكَلِّفُ نَفْسًا إِلَّا وُসْعَهَا وَإِذَا قُلْتُمْ فَاعْدِلُوا وَلَوْ كَانَ ذَا قُرْبَى وَبِعَهْدِ اللهِ أَوْফُوا ذَلِكُمْ وَصَّاكُم بِهِ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ} (১৫২) سورة الأنعাম অর্থাৎ, পিতৃহীন বয়ঃপ্রাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত সৎ উদ্দেশ্য ছাড়া তার সম্পত্তির নিকটবর্তী হয়ো না এবং পরিমাপ ও ওজন ন্যায়ভাবে পুরাপুরি প্রদান কর। আমি কাউকেও তার সাধ্যাতীত ভার অর্পণ করি না। আর যখন তোমরা কথা বলবে, তখন স্বজনের বিরুদ্ধে হলেও ন্যায় কথা বল এবং আল্লাহকে প্রদত্ত অঙ্গীকার পূর্ণ কর। এভাবে আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন, যেন তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর। (আনআমঃ ১৫২)

২৫। ইসলাম মানুষকে অন্যের জন্য শুভানুধ্যায়ী ও হিতাকাঙ্ক্ষী হতে নির্দেশ দেয়। মহানবী বলেন, “দ্বীন হল হিতাকাঙ্ক্ষার নাম।” সাহাবাগণ জিজ্ঞাসা করলেন, 'কার জন্য হে আল্লাহর রসূল!' তিনি বললেন, “আল্লাহ, তাঁর কিতাব, তাঁর রসূল, মুসলিমদের নেতৃবর্গ এবং তাদের জনসাধারণের জন্য।” (মুসলিম ৫৫নং)

২৬। ইসলাম আত্মীয়তার বন্ধন বজায় রাখতে নির্দেশ দেয়। জ্ঞাতিবন্ধন ছিন্ন করতে নিষেধ করে। মহান আল্লাহ বলেন, {يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُواْ رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُم মِّ নَّفْسٍ وَاحِدَةٍ وَخَلَقَ মִْهَا زَوْجَهَا وَبَثَّ মִْهُمَا رِجَالاً كَثِيرًا وَنِسَاء وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي تَسَاءَلُونَ بِهِ وَالْأَرْحَامَ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلَيْكُمْ رَقِيبًا} (১) সূরা নিসা অর্থাৎ, হে মানবসম্প্রদায়! তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় কর, যিনি তোমাদের এক ব্যক্তি হতে সৃষ্টি করেছেন ও তা হতে তার সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন, যিনি তাদের দু'জন থেকে বহু নরনারী (পৃথিবীতে) বিস্তার করেছেন। সেই আল্লাহকে ভয় কর, যার নামে তোমরা একে অপরের নিকট যাজ্ঞা কর এবং জ্ঞাতি-বন্ধন ছিন্ন করাকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের উপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখেন। (নিসাঃ ১)

فَهَلْ عَسَيْتُمْ إِن تَوَلَّيْتُمْ أَن تُফ্সِدُوا فِي الْأَرْضِ وَتُقَطِّعُوا أَرْحَامَكُمْ (২২) أُوْلَئِكَ الَّذِينَ لَعَنَهُمُ اللَّهُ فَأَصَمَّهُمْ وَأَعْمَى أَبْصَارَهُمْ} (২৩) سورة محمد অর্থাৎ, ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলে সম্ভবতঃ তোমরা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে এবং তোমাদের আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করবে। ওরা তো তারা, যাদেরকে আল্লাহ অভিশপ্ত ক'রে বধির ও দৃষ্টিশক্তিহীন করেন। (মুহাম্মাদঃ ২২-২৩) আল্লাহর রসূল বলেন, “যে ব্যক্তি পছন্দ করে যে, তার রুযী প্রশস্ত হোক এবং আয়ুষ্কাল বৃদ্ধি হোক, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।” (বুখারী + মুসলিম) “যে ব্যক্তি আল্লাহতে ও পরকালে ঈমান রাখে, সে যেন তার আত্মীয়তার বন্ধন বজায় রাখে।” (বুখারী) “জ্ঞাতিবন্ধন (আল্লাহর) আরশে ঝুলানো আছে; সে বলে, 'যে ব্যক্তি আমাকে বজায় রাখবে, সে ব্যক্তির সাথে আল্লাহ সম্পর্ক বজায় রাখবেন এবং যে ব্যক্তি আমাকে ছিন্ন করবে, সে ব্যক্তির সাথে আল্লাহও সম্পর্ক ছিন্ন করবেন।” (বুখারী ৫৯৮৯, মুসলিম ২৫৫৫ নং)

২৭। ইসলাম মুসলিমকে মানুষের সাথে সেইরূপ আচরণ ও ব্যবহার করতে নির্দেশ দেয়, যে আচরণ ও ব্যবহার সে অপরের কাছ থেকে নিজের জন্য পেতে পছন্দ করে। মহানবী বলেছেন, “ততক্ষণ পর্যন্ত তোমাদের কেউ প্রকৃত ঈমানদার হবে না; যতক্ষণ পর্যন্ত না সে তার ভাইয়ের জন্য তাই পছন্দ করবে, যা সে নিজের জন্য পছন্দ করে।” (বুখারী ও মুসলিম) তিনি আরো বলেছেন, "যে পছন্দ করে যে, তাকে জাহান্নাম থেকে দূরে রাখা হোক এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হোক, তার মরণ যেন এমন অবস্থায় হয় যে, সে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের প্রতি ঈমান রাখে এবং অন্যের প্রতি এমন ব্যবহার দেখায়, যেমন সে নিজের জন্য পছন্দ করে।” (মুসলিম ৪৮৮২নং)

২৮। ইসলাম মুসলিমদেরকে আপোসে সম্প্রীতি ও ভালোবাসা প্রতিষ্ঠা করতে আদেশ দেয়। সেই লক্ষ্যে সাক্ষাতের সময় আপোসে ‘সালাম’ ব্যাপক করতে নির্দেশ দেয়। হাতে হাত মিলিয়ে মুসাফাহাহ করতে উদ্বুদ্ধ করে। আর বলে, “তুমি কোন ভালো কাজকে তুচ্ছ মনে করো না। যদিও তুমি তোমার ভাইয়ের সাথে হাসিমুখে সাক্ষাৎ করতে পার।” (মুসলিম) তার মানে, মুসলিম ভাইয়ের সাথে হাসিমুখে সাক্ষাৎ করাও একটি পুণ্যের কাজ।

২৯। ইসলাম মুসলিমকে কোন ফালতু কাজে জড়াতে নিষেধ করে, কোন অপ্রয়োজনীয় কথা বলতে নিষেধ করে, কোন পরকীয় বিষয়ে নাক গলাতে নিষেধ করে। দ্বীন-দুনিয়ার কোন লাভ নেই, এমন অনর্থক বিষয় থেকে দূরে থাকতে বলে। মহানবী বলেন, “পরকীয় বিষয়ীভূত কথা ত্যাগ করা মানুষের সুন্দর ইসলামের প্রমাণ।” (তিরমিযী, সঃ তারগীব ২৮৮ ১নং)

📘 দ্বীনে ইসলামের সৌন্দর্য ও বৈশিষ্ট্য > 📄 স্থান-কাল-পাত্রভেদে প্রয়োজনীয়তা ও সমঞ্জসতায় ইসলামের বৈশিষ্ট্য

📄 স্থান-কাল-পাত্রভেদে প্রয়োজনীয়তা ও সমঞ্জসতায় ইসলামের বৈশিষ্ট্য


ইসলাম কালজয়ী ধর্ম। সকল স্থানে সকল মানুষের জন্য তার প্রয়োজনীয়তা আছে। সকল ক্ষেত্রে তার সমঞ্জসতা আছে। প্রত্যেক নতুনত্বের মাঝেও তার গ্রহণযোগ্যতা আছে।

১। ইসলাম মানা কঠিন নয়। ইসলাম সরল ধর্ম। মহান আল্লাহ বলেন, {وَجَاهِدُوا فِي اللَّهِ حَقَّ جِهَادِهِ هُوَ اجْتَبَاكُمْ وَمَا جَعَلَ عَلَيْكُمْ فِي الدِّينِ مِنْ حَرَجٍ مِّلَّةَ أَبِيكُمْ إِبْرَاهِيمَ} (৭৮) অর্থাৎ, তোমরা সংগ্রাম কর আল্লাহর পথে যেভাবে সংগ্রাম করা উচিত; তিনি তোমাদেরকে মনোনীত করেছেন। তিনি দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের উপর কোন কঠিনতা আরোপ করেননি; এটা তোমাদের পিতা ইব্রাহীমের মিল্লাত (ধর্মাদর্শ)। (হাজ্জঃ ৭৮)

২। কারো সাধ্যের অতীত ভার অর্পণ করে না ইসলাম। মহান আল্লাহ বলেন, {لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا لَهَا مَا كَسَبَتْ وَعَلَيْهَا مَا اكْتَسَبَتْ} অর্থাৎ, আল্লাহ কাউকেও তার সাধ্যের অতিরিক্ত দায়িত্ব অর্পণ করেন না। যে ভাল উপার্জন করবে সে তার (প্রতিদান পাবে) এবং যে মন্দ উপার্জন করবে, সে তার (প্রতিফল পাবে)। (বাক্বারাহঃ ২৮৬)

{لِيُنفِقْ ذُو سَعَةٍ مِّن سَعَتِهِ وَمَن قُدِرَ عَلَيْهِ رِزْقُهُ فَلْيُنفِقْ مِمَّا آتَاهُ اللَّهُ لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا مَا آتَاهَا سَيَجْعَلُ اللَّهُ بَعْدَ عُسْرِ يُسْرًا} (৭) الطلاق অর্থাৎ, সামর্থ্যবান নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যয় করবে এবং যার জীবনোপকরণ সীমিত, সে আল্লাহ তাকে যা দান করেছেন তা হতে ব্যয় করবে। আল্লাহ যাকে যে সামর্থ্য দিয়েছেন, তার চেয়ে গুরুতর বোঝা তিনি তার উপর চাপান না। আল্লাহ কষ্টের পর স্বস্তি দান করবেন। (ত্বালাক্বঃ ৭)

{وَالَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لاَ تُكَلِّفُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا أُوْلَئِكَ أَصْحَابُ الْجَنَّةِ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ} (৪২) سورة الأعراف অর্থাৎ, আমি কাউকেও তার সাধ্যাতীত ভার অর্পণ করি না। যারা বিশ্বাস করে ও সৎকাজ করে, তারাই হবে জান্নাতবাসী, সেখানে তারা চিরকাল থাকবে। (আ'রাফঃ ৪২)

{وَلَا تُكَلِّفُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا وَلَدَيْنَا كِتَابٌ يَنطِقُ بِالْحَقِّ وَهُمْ لَا يُظْلَمُونَ} অর্থাৎ, আমি কাউকেও তার সাধ্যাতীত দায়িত্ব অর্পণ করি না এবং আমার নিকট আছে এক গ্রন্থ; যা সত্য ব্যক্ত করে এবং তাদের প্রতি যুলুম করা হবে না। (মু'মিনূনঃ ৬২)

{فَاتَّقُوا اللَّهَ مَا اسْتَطَعْتُمْ وَاسْمَعُوا وَأَطِيعُوا وَأَنفِقُوا خَيْرًا لِّأَنفُسِكُمْ وَمَن يُوقَ شُحَّ نَفْسِهِ فَأُوْلَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ} (১৬) سورة التغابن অর্থাৎ, তোমরা আল্লাহকে যথাসাধ্য ভয় কর এবং শোনো, আনুগত্য কর ও ব্যয় কর, তোমাদের নিজেদেরই কল্যাণ হবে। আর যারা অন্তরের কার্পণ্য হতে মুক্ত, তারাই সফলকাম। (তাগাবুনঃ ১৬)

৩। নিরুপায় বা বাধ্য হলে ইসলামে 'হারাম' জিনিস হালাল হয়ে যায়। মহান আল্লাহ বলেন, {إِنَّمَا حَرَّمَ عَلَيْكُمُ الْمَيْتَةَ وَالدَّمَ وَلَحْمَ الْخِنْزِيرِ وَمَا أُهِلَّ بِهِ لِغَيْرِ اللَّهِ فَمَن اضْطُرَّ غَيْرَ بَاغ وَلَا عَادٍ فَلَا إِثْمَ عَلَيْهِ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ} (১৭৩) البقرة অর্থাৎ, নিশ্চয় (আল্লাহ) তোমাদের জন্য শুধু মৃত জীব, রক্ত, শূকরের মাংস এবং যে সব জন্তুর উপরে (যবেহ কালে) আল্লাহ ছাড়া অন্যের নাম উচ্চারণ করা হয়ে থাকে তা তোমাদের জন্য অবৈধ করেছেন। কিন্তু যে অনন্যোপায় অথচ অন্যায়কারী কিংবা সীমালংঘনকারী নয়, তার কোন পাপ হবে না। আল্লাহ চরম ক্ষমাশীল পরম দয়ালু। (বাক্বারাহঃ ১৭৩)

حُرِّمَتْ عَلَيْكُمُ الْمَيْتَةُ وَالدَّمُ وَلَحْمُ الْخِنْزِيرِ وَمَا أُهِلَّ لِغَيْرِ اللَّهِ بِـهِ وَالْمُنْخَنِقَةُ وَالْمَوْقُوذَةُ وَالْمُتَرَدِّيَةُ وَالنَّطِيحَةُ وَمَا أَكَلَ السَّبُعُ إِلَّا مَا ذَكَّيْتُمْ وَمَا ذُبِحَ عَلَى النُّصُبِ وَأَن تَسْتَقْسِمُوا بِالْأَزْلَام ذَلِكُمْ فِسْقٌ الْيَوْمَ يَئِسَ الَّذِينَ كَفَرُوا مِن دِينِكُمْ فَلَا تَخْشَوْهُمْ وَاخْشَوْنِ الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الإِسلامَ دِينًا فَمَنِ اضْطُرَّ فِي مَخْمَصَةٍ غَيْرَ مُتَجَائِفِ لِّإِثْمٍ فَإِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ) (৩) سورة المائدة
অর্থাৎ, তোমাদের জন্য হারাম (অবৈধ) করা হয়েছে মৃত পশু, রক্ত ও শূকর-মাংস, আল্লাহ ভিন্ন অন্যের নামে উৎসর্গীকৃত পশু, শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মৃত জন্তু, ধারবিহীন কিছু দ্বারা আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে মৃত জন্তু, পতনে মৃত জন্তু, শৃঙ্গাঘাতে মৃত জন্তু এবং হিংস্র পশুর খাওয়া জন্তু; তবে তোমরা যা যবেহ দ্বারা পবিত্র করেছ তা ছাড়া। আর যা মূর্তি পূজার বেদীর উপর বলি দেওয়া হয় তা এবং জুয়ার তীর দ্বারা ভাগ্য নির্ণয় করা, এ সব পাপকার্য। আজ অবিশ্বাসিগণ তোমাদের ধর্মের বিরুদ্ধাচরণে হতাশ হয়েছে। সুতরাং তাদেরকে ভয় করো না, শুধু আমাকে ভয় কর। আজ তোমাদের জন্য তোমাদের ধর্ম (ইসলাম) পূর্ণাঙ্গ করলাম ও তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের ধর্ম হিসাবে মনোনীত করলাম। তবে যদি কেউ ক্ষুধার তাড়নায় (নিষিদ্ধ জিনিষ খেতে) বাধ্য হয়; কিন্তু ইচ্ছা ক'রে পাপের দিকে ঝুঁকে না, তাহলে (তার জন্য) আল্লাহ চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (মায়িদাহঃ ৩)

قُل لا أَجِدُ فِي مَا أُوحِيَ إِلَيَّ مُحَرَّمًا عَلَى طَاعِمٍ يَطْعَمُهُ إِلَّا أَن يَكُونَ مَيْتَةً أَوْ دَمًا مَّسْفُوحًا أَوْ لَحْمَ خِنزير فَإِنَّهُ رِجْسٌ أَوْ فِسْقًا أُهِلَّ لِغَيْرِ اللَّهِ بِهِ فَمَن اضْطُرَّ غَيْرَ بَاغ وَلَا عَادٍ فَإِنَّ رَبَّكَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ} (১৪৫) الأنعام
অর্থাৎ, বল, আমার প্রতি যে প্রত্যাদেশ হয়েছে, তাতে আহারকারী যা আহার করে, তার মধ্যে আমি কিছুই নিষিদ্ধ পাই না। তবে মৃতপ্রাণী, বহমান রক্ত ও শূকরের মাংস; কেননা তা অপবিত্র। অথবা (যবেহকালে) আল্লাহ ছাড়া অন্যের নাম নেওয়ার কারণে যা অবৈধ। তবে কেউ অবাধ্য না হয়ে এবং সীমালংঘন না করে তা গ্রহণে বাধ্য হলে, তোমার প্রতিপালক অবশ্যই চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (আনআম: ১৪৫)

{إِنَّمَا حَرَّমَ عَلَيْكُمُ الْمَيْتَةَ وَالدَّمَ وَلَحْمَ الْخَنزيرِ وَمَا أُهِلَّ لِغَيْرِ اللَّهِ بِهِ فَمَن اضْطُرَّ غَيْرَ بَاغ وَلَا عَادٍ فَإِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ} (১১৫) سورة النحل
অর্থাৎ, আল্লাহ তো শুধু মৃত, রক্ত, শূকরের মাংস এবং যার যবেহকালে আল্লাহর পরিবর্তে অন্যের নাম নেওয়া হয়েছে তা-ই তোমাদের জন্য অবৈধ করেছেন; কিন্তু কেউ অন্যায়কারী কিংবা সীমালংঘনকারী না হয়ে (তা খেতে) অনন্যোপায় হলে নিশ্চয় আল্লাহ চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (নাহল: ১১৫)

{وَمَا لَكُمْ أَلا تَأْكُلُوا مِمَّا ذُكِرَ اسْمُ اللَّهِ عَلَيْهِ وَقَدْ فَصَّلَ لَكُم مَّا حَرَّمَ عَلَيْكُمْ إِلَّا مَا اضْطُرِرْتُمْ إِلَيْهِ وَإِنَّ كَثِيرًا لَّيُضِلُّونَ بِأَهْوَائِهِم بِغَيْرِ عِلْمٍ إِنَّ رَبَّكَ هُوَ أَعْلَمُ بِالْمُعْتَدِينَ} (১১৯) سورة الأنعام
অর্থাৎ, আর তোমাদের কী হয়েছে যে, যার যবেহকালে আল্লাহর নাম নেওয়া হয়েছে, তোমরা তা ভক্ষণ করবে না? অথচ তোমরা নিরুপায় না হলে যা তোমাদের জন্য নিষিদ্ধ, তা তিনি বিশদভাবেই তোমাদের নিকট বিবৃত করেছেন। অনেকে অজ্ঞানতাবশতঃ নিজেদের খেয়াল- খুশী দ্বারা অবশ্যই অন্যকে বিপথগামী করে। নিশ্চয় তোমার প্রতিপালক সীমা লংঘনকারীদের সম্বন্ধে সবিশেষ অবহিত। (আনআম : ১১৯)

৪। ভুল হয়ে গেলে অথবা ভুল করে কিছু করে ফেললে ইসলামে তা ধর্তব্য নয়। মহান আল্লাহ বলেন, {وَلَيْسَ عَلَيْكُمْ جُنَاحٌ فِيمَا أَخْطَأْتُم بِهِ وَلَكِن مَّا تَعَمَّدَتْ قُلُوبُكُمْ وَكَانَ اللَّهُ غَفُورًا رَّحِيمًا } (৫) سورة الأحزاب
অর্থাৎ, যে বিষয়ে তোমরা ভুল কর সে বিষয়ে তোমাদের কোন অপরাধ নেই, কিন্তু তোমাদের আন্তরিক ইচ্ছা থাকলে (তাতে অপরাধ আছে)। আর আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (আহযাবঃ ৫)

এমন ভুলের ক্ষমা চাইতেও ইসলাম নির্দেশ দেয়। মহান আল্লাহ বলেছেন, {لَا يُকَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا لَهَا مَا كَسَبَتْ وَعَلَيْهَا مَا اكْتَسَبَتْ رَبَّنَا لَا تُؤَاخِذْنَا إِن نَّسِينَا أَوْ أَخْطَأْنَا رَبَّنَا وَلَا تَحْمِلْ عَلَيْنَا إِصْرًا كَمَا حَمَلْتَهُ عَلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِنَا رَبَّنَا وَلَا تُحَمِّ لْنَا مَا لاَ طَاقَةَ لَنَا بِهِ وَاعْفُ عَنَّا وَاغْفِرْ لَنَا وَارْحَمْنَا أَنتَ مَوْلَانَا فَانصُرْنَا عَلَى الْقَوْمِ الْكَافِرِينَ} (২৮৬) سورة البقرة
অর্থাৎ, আল্লাহ কাউকেও তার সাধ্যের অতিরিক্ত দায়িত্ব অর্পণ করেন না। যে ভাল উপার্জন করবে সে তার (প্রতিদান পাবে) এবং যে মন্দ উপার্জন করবে, সে তার (প্রতিফল পাবে)। হে আমাদের প্রতিপালক! যদি আমরা বিস্মৃত হই অথবা ভুল করি, তাহলে তুমি আমাদেরকে অপরাধী করো না। হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের পূর্ববর্তিগণের উপর যেমন গুরুদায়িত্ব অর্পণ করেছিলে, আমাদের উপর তেমন দায়িত্ব অর্পণ করো না। হে আমাদের প্রতিপালক! এমন ভার আমাদের উপর অর্পণ করো না, যা বহন করার শক্তি আমাদের নেই। তুমি আমাদেরকে ক্ষমা কর, আমাদের পাপ মোচন কর এবং আমাদের প্রতি দয়া কর। তুমি আমাদের অভিভাবক। অতএব সত্য প্রত্যাখ্যানকারী (কাফের) সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাদেরকে (সাহায্য ও) জয়যুক্ত কর। (বাক্বারাহঃ ২৮৬)

৫। দ্বীনের প্রতি আহবানের ক্ষেত্রেও নম্রতা ও সরলতা প্রয়োগ করার বিধান দিয়েছে ইসলাম। মহান আল্লাহ তাঁর দূতকে বলেছেন, {فَبِمَا رَحْمَةٍ مِّنَ اللَّهِ لِنتَ لَهُمْ وَلَوْ كُنتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَانفَضُّوا مِنْ حَوْলِكَ فَاعْفُ عَنْهُمْ وَاسْتَغْفِرْ لَهُمْ وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَوَكِّلِينَ} (১৫৯) سورة آل عمران
অর্থাৎ, আল্লাহর দয়ায় তুমি তাদের প্রতি হয়েছিলে কোমল-হৃদয়; যদি তুমি রূঢ় ও কঠোর-চিত্ত হতে, তাহলে তারা তোমার আশপাশ হতে সরে পড়ত। সুতরাং তুমি তাদেরকে ক্ষমা কর এবং তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর। আর কাজে-কর্মে তাদের সাথে পরামর্শ কর। অতঃপর তুমি কোন সংকল্প গ্রহণ করলে আল্লাহর প্রতি নির্ভর কর। নিশ্চয় আল্লাহ (তাঁর উপর) নির্ভরশীলদের ভালবাসেন। (আলে ইমরানঃ ১৫৯)

৬। ইসলাম হল মধ্যমপন্থী ধর্ম। কোন বিষয়ে না তাতে অবজ্ঞা করা যাবে, আর না অতিরঞ্জন। মহান আল্লাহ বলেছেন, { وَكَذَلِكَ جَعَلْنَاكُمْ أُمَّةً وَسَطًا لِّتَكُونُوا شُهَدَاء عَلَى النَّاسِ وَيَكُونَ الرَّسُولُ عَلَيْكُمْ شَهِيدًا} (১৪৩) سورة البقرة
অর্থাৎ, এভাবে আমি তোমাদেরকে এক মধ্যপন্থী জাতিরূপে প্রতিষ্ঠিত করেছি, যাতে তোমরা মানব জাতির জন্য সাক্ষীস্বরূপ হতে পার এবং রসূল তোমাদের জন্য সাক্ষীস্বরূপ হবে। (বাক্বারাহঃ ১৪৩)

মহানবী বলেন, “নিশ্চয় দ্বীন সহজ। যে ব্যক্তি অহেতুক দ্বীনকে কঠিন বানাবে, তার উপর দ্বীন জয়ী হয়ে যাবে। (অর্থাৎ মানুষ পরাজিত হয়ে আমল ছেড়ে দেবে।) সুতরাং তোমরা সোজা পথে থাক এবং (ইবাদতে) মধ্যমপন্থা অবলম্বন কর। তোমরা সুসংবাদ নাও। আর সকাল-সন্ধ্যা ও রাতের কিছু অংশে ইবাদত করার মাধ্যমে সাহায্য নাও।” (বুখারী)

বুখারীর অন্য এক বর্ণনায় আছে, “তোমরা সরল পথে থাকো, মধ্যমপন্থা অবলম্বন কর, সকাল-সন্ধ্যায় চল (ইবাদত কর) এবং রাতের কিছু অংশে। আর তোমরা মধ্যমপন্থা অবলম্বন কর, মধ্যমপন্থা অবলম্বন কর, তাহলেই গন্তব্যস্থলে পৌঁছে যাবে।”

সাহাবী আনাস বলেন যে, তিন ব্যক্তি নবী-এর স্ত্রীদের বাসায় এলেন। তাঁরা নবী-এর ইবাদত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন। অতঃপর যখন তাঁদেরকে এর সংবাদ দেওয়া হল তখন তাঁরা যেন তা অল্প মনে করলেন এবং বললেন, 'আমাদের সঙ্গে নবী-এর তুলনা কোথায়? তাঁর তো আগের ও পরের সমস্ত গোনাহ মোচন ক'রে দেওয়া হয়েছে। (সেহেতু আমাদের তাঁর চেয়ে বেশী ইবাদত করা প্রয়োজন)।' সুতরাং তাঁদের মধ্যে একজন বললেন, 'আমি সারা জীবন রাতভর নামায পড়ব।' দ্বিতীয়জন বললেন, 'আমি সারা জীবন রোযা রাখব, কখনো রোযা ছাড়ব না।' তৃতীয়জন বললেন, 'আমি নারী থেকে দূরে থাকব, জীবনভর বিয়েই করব না।' অতঃপর রাসূলুল্লাহ তাঁদের নিকট এলেন এবং বললেন, "তোমরা এই এই কথা বলেছ? শোনো! আল্লাহর কসম! আমি তোমাদের চেয়ে বেশী আল্লাহকে ভয় করি, তার ভয় অন্তরে তোমাদের চেয়ে বেশী রাখি। কিন্তু আমি (নফল) রোযা রাখি এবং রোযা ছেড়েও দিই, নামায পড়ি এবং নিদ্রাও যাই। আর নারীদের বিয়েও করি। সুতরাং যে আমার সুন্নত হতে মুখ ফিরিয়ে নেবে, সে আমার দলভুক্ত নয়।” (বুখারী-মুসলিম)

৭। ইসলামের বিধান পালন করা যে সহজ, তার কিছু নমুনা।
(ক) পবিত্রতা অর্জনের ক্ষেত্রে ইসলামের সহজ বিধান দিয়ে মহান আল্লাহ বলেন, {يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا قُمْتُمْ إِلَى الصَّلاةِ فَاغْسِلُوا وُجُوهَكُمْ وَأَيْدِيَكُمْ إِلَى الْمَرَافِقِ وَامْسَحُوا بِرُؤُوسِكُمْ وَأَرْجُلَكُمْ إِلَى الْكَعْبَينِ وَإِن كُنتُمْ جُنُبًا فَاطْهَرُوا وَإِن كُنتُم مَّرْضَى أَوْ عَلَى سَفَرٍ أَوْ جَاء أَحَدٌ مَّنكُم مِّنَ الْغَائِطِ أَوْ لَأَمَسْتُمُ النِّسَاءِ فَلَمْ تَجِدُوا مَاء فَتَيَمَّمُوا صَعِيدًا طَيِّبًا فَامْسَحُوا بِوُجُوهِكُمْ وَأَيْدِيكُم مِّنْهُ مَا يُرِيدُ اللَّهُ لِيَجْعَلَ عَلَيْكُم مِّن حَرَجٍ وَلَكِن يُرِيدُ لِيُطَهَّরَكُمْ وَلِيُتِمَّ نِعْمَتَهُ عَلَيْكُمْ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ} (৬) سورة المائدة
অর্থাৎ, হে বিশ্বাসিগণ! যখন তোমরা নামাযের জন্য প্রস্তুত হবে, তখন তোমরা তোমাদের মুখমন্ডল ও কনুই পর্যন্ত হাত ধৌত কর এবং তোমাদের মাথা মাসাহ কর এবং পা গ্রন্থি পর্যন্ত ধৌত কর। আর যদি তোমরা অপবিত্র থাক, তাহলে বিশেষভাবে (গোসল ক’রে) পবিত্র হও। যদি তোমরা পীড়িত হও অথবা সফরে থাক অথবা তোমাদের কেউ প্রস্রাব-পায়খানা হতে আগমন করে, অথবা তোমরা স্ত্রী-সহবাস কর এবং পানি না পাও, তাহলে পবিত্র মাটি দ্বারা তায়াম্মুম কর; তা দিয়ে তোমাদের মুখমন্ডল ও হস্তদ্বয় মাসাহ কর। আল্লাহ তোমাদেরকে কোন প্রকার কষ্ট দিতে চান না, বরং তিনি তোমাদেরকে পবিত্র করতে চান ও তোমাদের প্রতি তাঁর অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করতে চান, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন কর। (মায়িদাহঃ ৬)

(খ) সফরে নামায কসর করার (৪ রাকাত নামাযকে ২ রাকাত পড়ার) বিধান দিয়ে মহান আল্লাহ বলেছেন, {وَإِذَا ضَرَبْتُمْ فِي الأَرْضِ فَلَيْسَ عَلَيْكُمْ جُنَاحٌ أَن تَقْصُرُوا مِنَ الصَّلَاةِ إِنْ خِفْتُمْ أَن يَفْتِنَكُمُ الَّذِينَ كَفَرُوا إِنَّ الْكَافِرِينَ كَانُوا لَكُمْ عَدُوًّا مُّبِينًا} (১০১) অর্থাৎ, তোমরা যখন দেশ-বিদেশে সফর করবে, তখন যদি তোমাদের আশংকা হয় যে, অবিশ্বাসিগণ তোমাদেরকে বিপন্ন করবে, তাহলে নামায কসর (সংক্ষিপ্ত) করলে তোমাদের কোন দোষ নেই। নিশ্চয় অবিশ্বাসিগণ তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু। (নিসাঃ ১০১)

সফরে যোহর-আসর এবং মাগরিব-এশাকে একত্রে জমা করার বিধানও আছে। বৃষ্টি ইত্যাদির কারণে মসজিদে যেতে বাধা হলে অনুরূপ নামায জমা করে পড়ার অনুমতি রয়েছে।

(গ) যুদ্ধের ময়দানে নামায সংক্ষেপের বিশেষ বিধান দেওয়া হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেছেন, {وَإِذَا كُنتَ فِيهِمْ فَأَقَمْتَ لَهُمُ الصَّلاةَ فَلْتَقُمْ طَائِفَةٌ মِّنْهُم مَّعَكَ وَلْيَأْخُذُوا أَسْلِحَتَهُمْ فَإِذَا سَجَدُوا فَلْيَكُونُوا مِن وَرَائِكُمْ وَلْتَأْتِ طَائِفَةٌ أُخْرَى لَمْ يُصَلُّوا فَلْيُصَلُّوا مَعَكَ وَلْيَأْخُذُواْ حِدْرَهُمْ وَأَسْلِحَتَهُمْ وَدَّ الَّذِينَ كَفَرُوا لَوْ تَغْفُلُونَ عَنْ أَسْلِحَتِكُمْ وَأَمْتِعَتِكُمْ فَيَمِيلُونَ عَلَيْكُم مَّيْلَةً وَاحِدَةً وَلَا جُنَاحَ عَلَيْكُمْ إِن كَانَ بِكُمْ أَذَى مِّن مَّطَرٍ أَوْ كُنتُمْ مَّرْضَى أَن تَضَعُوا أَسْلِحَتَكُمْ وَخُذُوا حِذْرَكُمْ إِنَّ اللَّهَ أَعَدَّ لِلْكَافِرِينَ عَذَابًا مُّهِينًا (১০২) فَإِذَا قَضَيْتُمُ الصَّلاةَ فَاذْكُرُوا اللَّهَ قِيَامًا وَقُعُودًا وَعَلَى جُنُوبِكُمْ فَإِذَا اطْمَأَنَنتُمْ فَأَقِيمُوا الصَّلاةَ إِنَّ الصَّلَاةَ كَانَتْ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ كِتَابًا مَّوْقُوتًا) (১০৩) سورة النساء
অর্থাৎ, তুমি যখন তাদের মাঝে অবস্থান করবে ও তাদের নিয়ে নামায পড়বে, তখন একদল যেন তোমার সঙ্গে দাঁড়ায়, আর তারা যেন সশস্ত্র থাকে। অতঃপর সিজদাহ করা হলে তারা যেন তোমাদের পিছনে অবস্থান করে; আর অপর একদল যারা নামাযে শরীক হয়নি, তারা তোমার সাথে যেন নামাযে শরীক হয় এবং তারা যেন সতর্ক ও সশস্ত্র থাকে। অবিশ্বাসিগণ কামনা করে, যেন তোমরা তোমাদের অস্ত্র-শস্ত্র ও আসবাবপত্র সম্বন্ধে অসতর্ক হও, যাতে তারা তোমাদের উপর হঠাৎ ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে। আর অস্ত্র রাখাতে তোমাদের কোন দোষ নেই; যদি বৃষ্টি-বাদলের জন্য তোমাদের কষ্ট হয় অথবা তোমাদের অসুখ হয়। কিন্তু অবশ্যই তোমরা হুঁশিয়ার থাকবে। নিশ্চয় আল্লাহ অবিশ্বাসীদের জন্য লাঞ্ছনাকর শাস্তি প্রস্তুত রেখেছেন। তারপর যখন তোমরা নামায শেষ করবে, তখন দাঁড়িয়ে, বসে এবং শুয়ে আল্লাহকে স্মরণ কর। অতঃপর যখন তোমরা নিরাপদ হবে, তখন যথাযথভাবে নামায পড়। নিশ্চয় নামাযকে বিশ্বাসীদের জন্য নির্ধারিত সময়ে অবশ্য কর্তব্য করা হয়েছে। (নিসাঃ ১০২-১০৩)

(ঘ) রোগীর সাধ্যমতো নামায পড়ার বিধান আছে। মহানবী বলেছেন, "তুমি দাঁড়িয়ে নামায পড়। না পারলে বসে পড়। তাও না পারলে পার্শ্বদেশে শুয়ে পড়।” (বুখারী, আবু দাউদ, আহমাদ, মিশকাত ১২৪৮ নং)

(ঙ) নিসাব পরিমাণ না হলে কারো উপর যাকাত ফরয নয়।

(চ) রোযা রাখতে অক্ষম ব্যক্তিদের বিশেষ বিধান দেওয়া হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, أَيَّامًا মَّعْدُودَاتٍ فَمَن كَانَ মִكُم মَّرِيضًا أَوْ عَلَى سَفَرٍ فَعِدَّةٌ মِّ أَيَّامٍ أُخَرَ وَعَلَى الَّذِينَ يُطِيقُونَهُ فِدْيَةٌ طَعَامُ মِسْكِينَ فَمَن تَطَوَّعَ خَيْرًا فَهُوَ خَيْرٌ لَّهُ وَأَن تَصُومُوا خَيْرٌ لَّكُمْ إِن كُنتُمْ تَعْلَمُونَ (১৮৪) شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ هُدًى لِّلنَّاسِ وَبَيِّنَاتٍ মَِّ الْهُدَى وَالْفُرْقَانِ فَمَن شَهِدَ মִكُمُ الشَّهْرَ فَلْيَصُمْهُ وَمن كَانَ مَرِيضًا أَوْ عَلَى سَفَرٍ فَعِدَّةٌ মِّ أَيَّامٍ أُخَرَ يُرِيدُ اللَّهُ بِكُمُ الْيُسْرَ وَلَا يُرِيدُ بِكُمُ الْعُسْرَ وَلِتُكْمِلُوا الْعِدَّةَ وَلِتُكَبِّرُوا اللهَ عَلَى مَا هَدَاكُمْ وَلَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ} (১৮৫)
অর্থাৎ, (রোযা) নির্দিষ্ট কয়েক দিনের জন্য। তোমাদের মধ্যে কেউ অসুস্থ হলে বা সফর অবস্থায় থাকলে অন্য দিনে এ সংখ্যা পূরণ করে নেবে। আর যারা রোযা রাখার সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও রোযা রাখতে চায় না (যারা রোযা রাখতে অক্ষম), তারা এর পরিবর্তে একজন মিসকীনকে খাদ্য দান করবে। পরন্তু যে ব্যক্তি খুশীর সাথে সৎকর্ম করে, তা তার জন্য কল্যাণকর হয়। আর যদি তোমরা রোযা রাখ, তাহলে তা তোমাদের জন্য বিশেষ কল্যাণপ্রসূ; যদি তোমরা উপলব্ধি করতে পার। রমযান মাস, এতে মানুষের দিশারী এবং সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যাসত্যের পার্থক্যকারীরূপে কুরআন অবতীর্ণ করা হয়েছে। অতএব তোমাদের মধ্যে যে কেউ এ মাস পাবে সে যেন তাতে রোযা পালন করে। আর যে অসুস্থ অথবা মুসাফির থাকে, তাকে অন্য দিনে এ সংখ্যা পূরণ করতে হবে। আল্লাহ তোমাদের (জন্য যা) সহজ (তা) করতে চান, তিনি তোমাদের কষ্ট চান না। যেন তোমরা (রোযার) নির্ধারিত সংখ্যা পূরণ করে নিতে পার এবং তোমাদেরকে যে সুপথ দেখিয়েছেন, তার জন্য তোমরা আল্লাহর তকবীর পাঠ (মহিমা বর্ণনা) কর এবং যেন তোমরা কৃতজ্ঞ হতে পার। (বাক্বারাহঃ ১৮৪-১৮৫)

(ছ) যে কাজের কাফ্ফারা আছে, সে কাজ করে ফেললে এবং তা আদায় করতে সক্ষম না হলে মাফ হয়ে যায়। আর আবু হুরাইরা বলেন, একদা আমরা নবী -এর কাছে বসে ছিলাম। এমন সময় তাঁর নিকট এক ব্যক্তি উপস্থিত হয়ে বলল, 'হে আল্লাহর রসূল! আমি ধ্বংসগ্রস্ত হয়ে পড়েছি।' তিনি বললেন, “কোন্ জিনিস তোমাকে ধ্বংসগ্রস্ত ক'রে ফেলল?” লোকটি বলল, 'আমি রোযা অবস্থায় আমার স্ত্রীর সাথে সঙ্গম ক'রে ফেলেছি।' এ কথা শুনে আল্লাহর রসূল তাকে বললেন, “তুমি কি একটি ক্রীতদাস মুক্ত করতে পারবে?” লোকটি বলল, 'জী না।' তিনি বললেন, “তাহলে কি তুমি একটানা দুই মাস রোযা রাখতে পারবে?” সে বলল, 'জী না।' তিনি বললেন, “তাহলে কি তুমি ষাট জন মিসকীনকে খাদ্যদান করতে পারবে?” লোকটি বলল, 'জী না।' কিছুক্ষণ পর নবী এক ঝুড়ি খেজুর এনে বললেন, "এগুলি নিয়ে দান ক'রে দাও।” লোকটি বলল, 'আমার চেয়ে বেশী গরীব মানুষকে হে আল্লাহর রসূল? আল্লাহর কসম! (মদীনার) দুই হারার মাঝে আমার পরিবার থেকে বেশী গরীব অন্য কোন পরিবার নেই!' এ কথা শুনে নবী হেসে ফেললেন এবং তাতে তাঁর ছেদক দাঁত দেখা গেল। অতঃপর বললেন, "তোমার পরিবারকেই তা খেতে দাও!” (বুখারী ১৯৩৭, মুসলিম ১১১১নং)

(জ) আর্থিক ও দৈহিত সামর্থ্য না থাকলে হজ্জ ফরয নয়। মহান আল্লাহ বলেন, وَلِلَّهِ عَلَى النَّاسِ حِجُّ الْبَيْتِ মَنِ اسْتَطَاعَ إِلَيْهِ سَبِيلًا وَمن كَفَرَ فَإِنَّ اللَّهَ غَنِيٌّ عَنِ الْعَالَمِينَ } (৯৭) سورة آل عمران
অর্থাৎ, মানুষের মধ্যে যার সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য আছে, আল্লাহর উদ্দেশ্যে ঐ গৃহের হজ্জ করা তার (পক্ষে) অবশ্য কর্তব্য। আর যে অস্বীকার করবে (সে জেনে রাখুক যে), আল্লাহ জগতের প্রতি অমুখাপেক্ষী। (আলে ইমরানঃ ৯৭)

(ঝ) অক্ষম ব্যক্তিদের জন্য জিহাদ ফরয করা হয়নি। মহান আল্লাহ বলেন, {لَيْسَ عَلَى الضُّعَفَاء وَلَا عَلَى الْمَرْضَى وَلاَ عَلَى الَّذِينَ لَا يَجِدُونَ مَا يُنفِقُونَ حَرَجٌ إِذَا نَصَحُوا لِلَّهِ وَرَسُولِهِ مَا عَلَى الْمُحْسِنِينَ مِن سَبِيلِ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ}
অর্থাৎ, দুর্বল, পীড়িত এবং অর্থব্যয় করতে যারা অসমর্থ তাদের কোন অপরাধ নেই; যদি তারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের প্রতি হিতাকাঙ্ক্ষী হয়। সৎকর্মপরায়ণদের বিরুদ্ধে অভিযোগের কোন পথ নেই। আর আল্লাহ অতিশয় ক্ষমাশীল, পরম করুণাময়। (তাওবাহঃ ৯১)

(ঞ) এমন কিছু সৌন্দর্য আছে, যা আনয়ন করলে সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টিতে পরিবর্তন সাধন করা হয়, তা করতে নিষেধ করা হয়েছে। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ বলেন, 'আল্লাহর অভিশাপ হোক সেই সব নারীদের উপর, যারা দেহাঙ্গে উলকি উৎকীর্ণ করে এবং যারা উৎকীর্ণ করায় এবং সে সব নারীদের উপর, যারা ভ্রূ চেঁছে সরু করে, যারা সৌন্দর্যের মানসে দাঁতের মাঝে ফাঁক সৃষ্টি করে, যারা আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে পরিবর্তন আনে।' জনৈক মহিলা এ ব্যাপারে তাঁর (ইবনে মাসউদের) প্রতিবাদ করলে তিনি বললেন, 'আমি কি তাকে অভিসম্পাত করব না, যাকে আল্লাহর রসূল অভিসম্পাত করেছেন এবং তা আল্লাহর কিতাবে আছে? আল্লাহ বলেছেন, "রসূল যে বিধান তোমাদেরকে দিয়েছেন তা গ্রহণ কর, আর যা থেকে নিষেধ করেছেন, তা থেকে বিরত থাক।” (সূরা হাশ্র ৭ আয়াত, বুখারী ও মুসলিম) কিন্তু কোন বিকৃত অঙ্গে স্বাভাবিক সৌন্দর্য আনয়নকে ইসলাম হারাম বলে না।

(ট) মন্দ কাজে বাধা দেওয়ার পর্যায়ক্রম আছে। সে ক্ষেত্রেও সামর্থ্য বিবেচ্য হয়েছে। মহানবী বলেন, "তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি কোন গর্হিত কাজ দেখবে, সে যেন তা নিজ হাত দ্বারা পরিবর্তন ক'রে দেয়। যদি (তাতে) ক্ষমতা না রাখে, তাহলে নিজ জিভ দ্বারা (উপদেশ দিয়ে পরিবর্তন করে)। যদি (তাতেও) সামর্থ্য না রাখে, তাহলে অন্তর দ্বারা (ঘৃণা করে)। আর এ হল সবচেয়ে দুর্বল ঈমান।” (মুসলিম)

৮। ইসলাম মান্যতার ধর্ম, স্বেচ্ছায় বরণীয় দ্বীন। অনিচ্ছায় বরণ করলে তা কোন কাজে লাগে না। এই জন্য ভাবনা-চিন্তা করে মনে পরিতুষ্ট হয়ে গ্রহণ করতে আহবান জানায়। ইসলাম মানুষকে সৃষ্টিকর্তার পরিচয় দিতে ও এবং সঠিক ধর্মের দিশা দিতে জোর-জবরদস্তি করে না। অবিশ্বাসী নাস্তিককে বিশ্বাসী আস্তিক বানাতে বল প্রয়োগ করে না। মহান আল্লাহ বলেছেন, {لَا إِكْرَاهَ فِي الدِّينِ قَد تَّبَيَّنَ الرُّشْدُ مِنَ الْغَيِّ فَمَنْ يَكْفُرْ بِالطَّاغُوتِ وَيُؤْمِن باللَّهِ فَقَدِ اسْتَمْسَكَ بِالْعُرْوَةِ الْوُثْقَى لَا انفِصَامَ لَهَا وَاللَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ} (২৫৬)
অর্থাৎ, ধর্মের জন্য কোন জোর-জবরদস্তি নেই। নিশ্চয় সুপথ প্রকাশ্যভাবে কুপথ থেকে পৃথক হয়েছে। সুতরাং যে তাগূতকে (অর্থাৎ, আল্লাহ ছাড়া অন্যান্য বাতিল উপাস্যসমূহকে) অস্বীকার করবে ও আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস করবে, নিশ্চয় সে এমন এক শক্ত হাতল ধরবে, যা কখনো ভাঙ্গার নয়। আর আল্লাহ সর্বশ্রোতা, মহাজ্ঞানী। (বাক্বারাহঃ ২৫৬)

{وَلَوْ شَاء رَبُّكَ لَآمَنَ মَن فِي الأَرْضِ كُلُّهُمْ جَمِيعًا أَفَأَنتَ تُكْرِهُ النَّاسَ حَتَّى يَكُونُوا مُؤْمِنِينَ (৯৯) وَمَا كَانَ لِنَفْسٍ أَن تُؤْمِنَ إِلَّا بِإِذْنِ اللَّهِ وَيَجْعَلُ الرِّجْسَ عَلَى الَّذِينَ لَا يَعْقِلُونَ} (১০০) سورة يونس
অর্থাৎ, যদি তোমার প্রতিপালক ইচ্ছা করতেন, তাহলে বিশ্বের সকল লোকই বিশ্বাস করত; তাহলে তুমি কি বিশ্বাসী হওয়ার জন্য মানুষের উপর জবরদস্তি করবে? অথচ আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কারো বিশ্বাস স্থাপন করার সাধ্য নেই; আর আল্লাহ নির্বোধ লোকদের উপর (কুফরীর) অপবিত্রতা স্থাপন ক'রে দেন। (ইউনুসঃ ৯৯-১০০)

৯। ইসলাম মানুষকে চিন্তা-গবেষণা করে সৃষ্টিকর্তা ও তাঁর দ্বীনের পরিচয় পেতে উদ্বুদ্ধ করে। চিন্তা করে দেখো হে মানুষ! তুমি কি স্রষ্টা ছাড়াই সৃষ্ট হয়েছ? أَمْ خُلِقُوا মִْ غَيْرِ شَيْءٍ أَمْ هُمُ الْخَالِقُونَ (৩৫) أَمْ خَلَقُوا السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ بل لا يُوقِنُونَ (৩৬) أَمْ عِنْدَهُمْ خَزَائِنُ رَبِّكَ أَمْ هُمُ الْمُسَيْطِرُونَ} অর্থাৎ, তারা কি কোন কিছু ব্যতিরেকে আপনা-আপনিই সৃষ্ট হয়েছে, না তারা নিজেরাই স্রষ্টা? নাকি তারা আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছে? বরং তারা নিশ্চিত বিশ্বাস রাখে না। নাকি তোমার প্রতিপালকের ভান্ডারসমূহ তাদের নিকট রয়েছে, না তারা এ সমুদয়ের নিয়ন্ত্রক? (তুরঃ ৩৫-৩৭)

প্রকৃতির নিয়মে সব কিছু হলেও, সেই স্রষ্টাই কি নিয়ামক নন? তুমি কি বলতে পারো, ফল আগে, না গাছ আগে? ডিম আগে, না মুরগী আগে? আবার কোন্ মাথায় বল যে, নর প্রথমে বানর ছিল? এ কুবিশ্বাসকে প্রমাণ করার জন্য কোটি-কোটি ডলার ব্যয় কর? দেশ হিসাবে নরের বর্ণ ও ভাষাবৈচিত্র, তোমার নিজের দেহ নিয়ে গবেষণা করে কি সত্যের সন্ধান পাও না? وَفِي الْأَرْضِ آيَاتٌ لِّلْمُوقِنِينَ (২০) وَفِي أَنفُسِكُمْ أَفَلَا تُبْصِرُونَ} (২১) অর্থাৎ, নিশ্চিত বিশ্বাসীদের অনেক নিদর্শন রয়েছে পৃথিবীতে এবং তোমাদের নিজেদের মধ্যেও! তোমরা কি ভেবে দেখবে না? (যারিয়াত : ২০-২১)

সুতরাং, আমি ওদের জন্য আমার নিদর্শনাবলী বিশ্বজগতে ব্যক্ত করব এবং ওদের নিজেদের মধ্যেও; ফলে ওদের নিকট স্পষ্ট হয়ে উঠবে যে, এ (কুরআন) সত্য। এ কি যথেষ্ট নয় যে, তোমার প্রতিপালক সর্ববিষয়ের প্রত্যক্ষদর্শী? (হা-মীম সাজদাহঃ ৫৩)

বিশ্বজগৎ নিয়ে গবেষণা করে দেখো, সে সব কি বিনা স্রষ্টার সৃষ্টি? تَبَارَكَ الَّذِي جَعَلَ فِي السَّمَاءِ بُرُوجًا وَجَعَلَ فِيهَا سِرَاجًا وَقَمَرًا মُّنِيرًا (৬১) وَهُوَ الَّذِي جَعَلَ اللَّيْلَ وَالنَّهَارَ خِلْفَةً لِّمَنْ أَرَادَ أَن يَذَّكَّرَ أَوْ أَرَادَ شُكُورًا} (৬২) سورة الفرقان
অর্থাৎ, কত প্রাচুর্যময় তিনি যিনি নভোমন্ডলে রাশিচক্র সৃষ্টি করেছেন এবং ওতে স্থাপন করেছেন প্রদীপ (সূর্য) ও জ্যোতির্ময় চন্দ্র। এবং যারা উপদেশ গ্রহণ ও কৃতজ্ঞতা করতে ইচ্ছুক তাদের জন্য রাত এবং দিনকে সৃষ্টি করেছেন পরস্পরের অনুগামীরূপে। (ফুরক্বানঃ ৬১-৬২)

هُوَ الَّذِي جَعَلَ الشَّمْسَ ضِيَاء وَالْقَمَرَ نُورًا وَقَدَّرَهُ মَنَازِلَ لِتَعْلَمُوا عَدَدَ السِّنِينَ وَالْحِسَابَ مَا خَلَقَ اللَّهُ ذَلِكَ إِلَّا بِالْحَقِّ يُفَصِّلُ الْآيَاتِ لِقَوْمٍ يَعْلَمُونَ} অর্থাৎ, তিনিই সেই সত্তা যিনি সূর্যকে দীপ্তিমান ও চন্দ্রকে আলোকময় বানিয়েছেন এবং ওর (গতির) জন্যে কক্ষসমূহ নির্ধারিত করেছেন, যাতে তোমরা বছরসমূহের সংখ্যা ও (সময়ের) হিসাব জানতে পার। আল্লাহ এসব বস্তু অযথা সৃষ্টি করেননি, তিনি জ্ঞানবান সম্প্রদায়ের জন্য এই সমস্ত নিদর্শন বিশদভাবে বর্ণনা করেন। (ইউনুসঃ ৫)

فَالِقُ الإِصْبَاحِ وَجَعَلَ اللَّيْلَ سَكَنَا وَالشَّمْسَ وَالْقَمَرَ حُسْبَانًا ذَلِكَ تَقْدِيرُ الْعَزِيزِ الْعَلِيمِ} (৯৬) سورة الأنعام অর্থাৎ, তিনিই ঊষার উন্মেষ ঘটান, আর তিনিই বিশ্রামের জন্য রাত এবং গণনার জন্য চন্দ্র ও সূর্যকে সৃষ্টি করেছেন, এ সব পরাক্রমশালী সর্বজ্ঞ কর্তৃক সুবিন্যস্ত। (আনআম: ৯৬)

{أَفَلَمْ يَنظُرُوا إِلَى السَّمَاء فَوْقَهُمْ كَيْفَ بَنَيْنَاهَا وَزَيَّنَّاهَا وَمَا لَهَا মִ فُرُوجٍ} অর্থাৎ, তারা কি তাদের উপরিস্থিত আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখে না যে, আমি কিভাবে ওটা নির্মাণ করেছি ও তাকে সুশোভিত করেছি এবং ওতে কোন ফাটলও নেই? (ক্বাফ: ৬)

{الَّذِي خَلَقَ سَبْعَ سَمَاوَاتٍ طِبَاقًا مَّا تَرَى فِي خَلْقِ الرَّحْمَنِ মִ تَفَاوُت فَارْجِعِ الْبَصَرَ هَلْ تَرَى মִ فُطُورِ (৩) ثُمَّ ارْجِعِ الْبَصَرَ كَرَّتَيْنِ يَنقَلِبْ إِلَيْكَ الْبَصَرُ خَاسِأَ وَهُوَ حَسِيرٌ (৪) وَلَقَدْ زَيَّنَّا السَّمَاءِ الدُّنْيَا بِمَصَابِيحَ وَجَعَلْنَاهَا رُجُومًا لِّلشَّيَاطِينِ وَأَعْتَدْنَا لَهُمْ عَذَابَ السَّعِيرِ} (৫) سورة الملك অর্থাৎ, তিনি সৃষ্টি করেছেন স্তরে স্তরে সপ্তাকাশ। দয়াময় আল্লাহর সৃষ্টিতে তুমি কোন খুঁত দেখতে পাবে না; আবার তাকিয়ে দেখ, কোন ত্রুটি দেখতে পাচ্ছ কি? অতঃপর তুমি বারবার দৃষ্টি ফিরাও, সেই দৃষ্টি ব্যর্থ ও ক্লান্ত হয়ে তোমার দিকে ফিরে আসবে। আমি নিকটবর্তী আকাশকে প্রদীপমালা দ্বারা সুশোভিত করেছি এবং ওগুলোকে করেছি শয়তানদের প্রতি ক্ষেপণাস্ত্র স্বরূপ এবং তাদের জন্য প্রস্তুত রেখেছি জ্বলন্ত অগ্নির শাস্তি। (মুল্কঃ ৩-৫)

পৃথিবীর বুকে তাকিয়ে দেখো, পর্বত ও নদীমালা, কত রকমের বৃক্ষলতা, ফুল-ফল-ফসল! একই মাটির বুকে একই পানিতে সিঞ্চিত হয়ে সকল গাছ-পালা দর্শনে এক নয়, ডাল-পাতায় এক নয়, ফুল-ফলের রঙ, গন্ধ ও স্বাদে অভিন্ন নয়। একই মাটি ও একই পানির একটি গাছের ফল ঝাল, অন্যটির তেঁতো, মিষ্টি বা টক! মহান আল্লাহ বলেন, وَفِي الْأَرْضِ قِطَعٌ مُتَجَاوَرَاتٌ وَجَنَّاتٌ মِّ أَعْنَابٍ وَزَرْعٌ وَنَخِيلٌ صِنْوَانٌ وَغَيْرُ صِنْوَانٍ يُسْقَى بِمَاء وَاحِدٍ وَنُفَضِّلُ بَعْضَهَا عَلَى بَعْضٍ فِي الْأُكُلِ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَاتٍ لِّقَوْمٍ يَعْقِلُونَ} (৪) سورة الرعد
অর্থাৎ, পৃথিবীতে রয়েছে পরস্পর সংলগ্ন ভূ-খন্ড; ওতে আছে আঙ্গুর-কানন, শস্যক্ষেত্র, একাধিক ফেঁকড়া-বিশিষ্ট অথবা ফেঁকড়াহীন খেজুর বৃক্ষ, যা একই পানিতে সিঞ্চিত হয়ে থাকে। ফল হিসাবে ওগুলির কতককে কতকের উপর আমি উৎকৃষ্টতা দিয়ে থাকি, অবশ্যই বোধশক্তিসম্পন্ন সম্প্রদায়ের জন্য এতে রয়েছে নিদর্শন। (রা'দঃ ৪)

তোমার সৃষ্টি নিয়ে ভেবে দেখো, তোমাদের ছড়ানো বীজ ও অঙ্কুরিত ফসলের কথা, আকাশ থেকে বর্ষণ করা বৃষ্টির কথা এবং আগুনের কথা ভেবে দেখো।
{أَفَرَأَيْتُمْ مَا تُمْنُونَ (৫৮) أَأَنْتُمْ تَخْلُقُونَهُ أَمْ نَحْنُ الْخَالِقُونَ (৫৯) نَحْنُ قَدَّرْنَا بَيْنَكُمُ الْمَوْتَ وَمَا نَحْنُ بِمَسْبُوقِينَ (৬০) عَلَى أَنْ نُبَدِّلَ أَمْثَالَكُمْ وَنُنْشِئُكُمْ فِي مَا لَا تَعْلَمُونَ (৬১) وَلَقَدْ عَلِمْتُمُ النَّشْأَةَ الأُولَى فَلَوْلا تَذَكَّرُونَ (৬২) أَفَرَأَيْتُمْ مَا تَحْرُثُونَ (৬৩) أَأَنْتُمْ تَزْرَعُونَهُ أَمْ نَحْنُ الزَّارِعُونَ (৬৪) لَوْ نَشَاءُ لَجَعَلْنَاهُ حُطَامًا فَظَلَلْتُمْ تَتَفَكَّهُونَ (৬৫) إِنَّا لَمُغْرَمُونَ (৬৬) بَلْ نَحْنُ مَحْرُومُونَ (৬৭) أَفَرَأَيْتُمُ الْمَاءَ الَّذِي تَشْرَبُونَ (৬৮) أَأَنْتُمْ أَنزَلْتُمُوهُ মִْ الْمُزْنِ أَمْ نَحْنُ الْمُنزِلُونَ (৬৯) لَوْ نَشَاءُ جَعَلْنَاهُ أَجَاجاً فَلَوْلا تَشْكُرُونَ (৭০) أَفَرَأَيْتُمْ النَّارَ الَّتِي تُورُونَ (৭১) أَأَنْتُمْ أَنشَأْتُمْ شَجَرَتَهَا أَمْ نَحْنُ الْمُنشِئُونَ (৭২) نَحْنُ جَعَلْنَاهَا تَذْكِرَةً وَمَتَاعاً لِلْمُقْوِينَ) (৭৩) الواقعة
অর্থাৎ, তোমরা কি ভেবে দেখেছ, তোমাদের বীর্যপাত সম্বন্ধে? ওটা কি তোমরা সৃষ্টি কর, না আমি সৃষ্টি করি? আমি তোমাদের জন্য মৃত্যু নির্ধারিত করেছি এবং আমি অক্ষম নই---তোমাদের স্থলে তোমাদের অনুরূপ আনয়ন করতে এবং তোমাদেরকে এমন এক আকৃতি দান করতে, যা তোমরা জান না। তোমরা তো অবগত হয়েছ প্রথম সৃষ্টি সম্বন্ধে। তবে তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর না কেন? তোমরা যে বীজ বপন কর, সে সম্পর্কে চিন্তা করেছ কি? তোমরা কি ওকে অঙ্কুরিত কর, না আমি অঙ্কুরিত করি? আমি ইচ্ছা করলে অবশ্যই একে টুকরা- টুকরা (খড়-কুটায়) পরিণত করতে পারি, তখন হতবুদ্ধি হয়ে পড়বে তোমরা। (বলবে,) 'নিশ্চয় আমরা সর্বনাশগ্রস্ত! বরং আমরা হৃতসর্বস্ব।' তোমরা যে পানি পান কর, সে সম্পর্কে তোমরা চিন্তা করেছ কি? তোমরাই কি তা মেঘ হতে বর্ষণ কর, না আমি বর্ষণ করি? আমি ইচ্ছা করলে ওটা লবণাক্ত ক'রে দিতে পারি। তবুও তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর না কেন? তোমরা যে আগুন জ্বালিয়ে থাক, তা লক্ষ্য ক'রে দেখেছ কি? তোমরাই কি ওর বৃক্ষ সৃষ্টি কর, না আমি সৃষ্টি করি? আমি একে করেছি উপদেশের বিষয় এবং মরুচারীদের প্রয়োজনীয় বস্তু। (ওয়াক্বিআহঃ ৫৮-৭৩)

ভেবে দেখো, এ বিশ্বে কি একাধিক স্রষ্টা, প্রতিপালক, পরিচালক, নিয়ামক বা নিয়ন্তা আছে? مَا اتَّخَذَ اللَّهُ مِ وَلَدٍ وَمَا كَانَ مَعَهُ মִْ إِلَةٍ إِذَا لَّذَهَبَ كُلُّ إِلَهِ بِمَا خَلَقَ وَلَعَلَا بَعْضُهُمْ عَلَى بَعْضٍ سُبْحَانَ اللَّهِ عَمَّا يَصِفُونَ) (৯১) سورة المؤمنون অর্থাৎ, আল্লাহ কোন সন্তান গ্রহণ করেননি এবং তাঁর সাথে অপর কোন উপাস্য নেই; যদি থাকত, তাহলে প্রত্যেক উপাস্য স্বীয় সৃষ্টি নিয়ে পৃথক হয়ে যেত এবং একে অপরের উপর প্রাধান্য বিস্তার করত। তারা যা বলে, তা হতে আল্লাহ কত পবিত্র! (মু'মিনূনঃ ৯১)

{ لَوْ كَانَ فِيهِمَا آلِهَةٌ إِلَّا اللَّهُ لَفَسَدَتَا فَسُبْحَانَ اللَّهِ رَبِّ الْعَرْشِ عَمَّا يَصِفُونَ) (২২) سورة الأنبياء অর্থাৎ, যদি আল্লাহ ব্যতীত আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে বহু উপাস্য থাকত, তাহলে উভয়ই ধ্বংস হয়ে যেত। সুতরাং ওরা যে বর্ণনা দেয়, তা থেকে আরশের অধিপতি আল্লাহ পবিত্র, মহান। (আম্বিয়া: ২২)

📘 দ্বীনে ইসলামের সৌন্দর্য ও বৈশিষ্ট্য > 📄 আত্মীয়তা ও বন্ধুত্বে ইসলামের বৈশিষ্ট্য

📄 আত্মীয়তা ও বন্ধুত্বে ইসলামের বৈশিষ্ট্য


১। ইসলামে পিতামাতার মর্যাদা রয়েছে অনেক। মহান আল্লাহ বলেছেন, وَقَضَى رَبُّكَ أَلا تَعْبُدُوا إِلا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا إِمَّا يَبْلُغَنَّ عِندَكَ الْكِبَرَ أَحَدُهُمَا أَوْ كِلَاهُمَا فَلا تَقُل لَّهُمَا أُفٍّ وَلاَ تَنْهَرْهُمَا وَقُل لَّهُمَا قَوْلاً كَرِيمًا (২৩) وَاخْفِضْ لَهُمَا جَنَاحَ الذُّلِّ মִَ الرَّحْمَةِ وَقُل رَّبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا} (২৪) سورة الإسراء
অর্থাৎ, তোমার প্রতিপালক নির্দেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তিনি ছাড়া অন্য কারো উপাসনা করবে না এবং পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করবে; তাদের এক জন অথবা উভয়েই তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হলে তাদেরকে বিরক্তিসূচক কিছু বলো না এবং তাদেরকে ভর্ৎসনা করো না; বরং তাদের সাথে বলো সম্মানসূচক নম্র কথা। অনুকম্পায় তাদের প্রতি বিনয়াবনত থেকো এবং বলো, 'হে আমার প্রতিপালক! তাদের উভয়ের প্রতি দয়া কর; যেভাবে শৈশবে তারা আমাকে প্রতিপালন করেছে।' (বানী ইস্রাঈল: ২৩-২৪)

মহানবী বলেছেন, "পিতা-মাতা জান্নাতের দুয়ারসমূহের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ দুয়ার। সুতরাং তুমি যদি চাও, তাহলে এ দুয়ারকে নষ্ট কর অথবা তার রক্ষণাবেক্ষণ কর।” (তিরমিযী)

অমুসলিম হলেও তাদের পার্থিব অধিকার আদায় করতে বলা হয়েছে ইসলামে। মহান আল্লাহ বলেছেন, {وَإِن جَاهَدَاكَ عَلى أَن تُشْرِكَ بِي مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ فَلَا تُطِعْهُمَا وَصَاحِبْهُمَا فِي الدُّنْيَا مَعْرُوفًا وَاتَّبِعْ سَبِيلَ মَنْ أَنَابَ إِلَيَّ ثُمَّ إِلَيَّ مَرْجِعُكُمْ فَأُنَبِّئُكُم بِمَا كُنتُمْ تَعْمَلُونَ} (১৫) সূরা লুকমান
অর্থাৎ, তোমার পিতা-মাতা যদি তোমাকে আমার অংশী করতে পীড়াপীড়ি করে, যে বিষয়ে তোমার কোন জ্ঞান নেই, তাহলে তুমি তাদের কথা মান্য করো না, তবে পৃথিবীতে তাদের সঙ্গে সদ্ভাবে বসবাস কর এবং যে ব্যক্তি আমার অভিমুখী হয়েছে তার পথ অবলম্বন কর, অতঃপর আমারই নিকট তোমাদের প্রত্যাবর্তন এবং তোমরা যা করতে, আমি সে বিষয়ে তোমাদেরকে অবহিত করব। (লুক্বমানঃ ১৫)

২। ইসলাম আত্মীয়-স্বজন, অনাথ-দরিদ্র ও প্রতিবেশীর প্রতি অনুগ্রহশীল সদ্ব্যবহার করতে নির্দেশ দিয়েছে। মহান আল্লাহ বলেছেন, وَاعْبُدُوا اللَّهَ وَلَا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا وَبِذِي الْقُرْبَى وَالْيَتَامَى وَالْمَسَاكِينِ وَالْجَارِ ذِي الْقُرْبَى وَالْجَارِ الْجُنُبِ وَالصَّاحِبِ بِالجَنبِ وَابْنِ السَّবিليلِ وَمَا মَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ إِنَّ اللَّهَ لاَ يُحِبُّ মَن كَانَ مُخْتَالاً فَخُورًا}
অর্থাৎ, তোমরা আল্লাহর উপাসনা কর ও কোন কিছুকে তাঁর অংশী করো না এবং পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন, পিতৃহীন, অভাবগ্রস্ত, আত্মীয় ও অনাত্মীয় প্রতিবেশী, সঙ্গী-সাথী, পথচারী এবং তোমাদের অধিকারভুক্ত দাস-দাসীদের প্রতি সদ্ব্যবহার কর। নিশ্চয় আল্লাহ আত্মম্ভরী দাম্ভিককে ভালবাসেন না। (নিসাঃ ৩৬)

দাস-দাসীদের প্রতি যথোচিত ন্যায়াচরণ করতে নির্দেশ দেয় ইসলাম। একদা আবু যার নিজ দাসকে তার মা ধরে খোঁটা দিয়ে কথা বললে, নবী তাঁকে বলেছিলেন, “নিশ্চয় তুমি এমন লোক; যার মধ্যে জাহেলিয়াত আছে।” আবু যার বলেছিলেন, 'আমার বৃদ্ধ বয়সের এই সময়েও?' তিনি বললেন, "হ্যাঁ, ওরা তোমাদের ভাই স্বরূপ। আল্লাহ তাদেরকে তোমাদের মালিকানাধীন করে দিয়েছেন। সুতরাং যে ব্যক্তির ভাইকে আল্লাহ তার মালিকানাধীন করেছেন, সে ব্যক্তি যেন তাকে (দাসকে) তাই খাওয়ায়; যা সে নিজে খায়, তাই পরায় যা সে নিজে পরে এবং এমন কাজের যেন ভার না দেয়, যা করতে সে সক্ষম নয়। পরন্ত যদি সে এমন দুঃসাধ্য কাজের ভার দিয়েই ফেলে, তবে তাতে যেন তাকে সহযোগিতা করে।” (বুখারী ৬০৫০, মুসলিম ১৬৬১নং)

৩। ইসলাম বিধবা ও অনাথ-এতীমদের তত্ত্বাবধান করতে উদ্বুদ্ধ করে। মহানবী বলেন, "আমি এবং নিজের অথবা অপরের অনাথ (এতীমের) তত্ত্বাবধায়ক জান্নাতে (পাশাপাশি) থাকব। আর বিধবা ও দুঃস্থ মানুষকে দেখাশুনাকারী ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় জিহাদকারীর সমতুল্য।” (ত্বাবারানীর আওসাত্ব, সহীহুল জামে' ১৪৭৬নং)

তিনি আরো বলেন, "আমি ও অনাথ (এতীমের) তত্ত্বাবধায়ক জান্নাতে এরূপ (পাশাপাশি) বাস করব।” এর সাথে তিনি তাঁর তর্জনী ও মধ্যমা অঙ্গুলি দ্বারা ইঙ্গিত করলেন এবং দুটির মাঝে একটু ফাঁক করলেন।” (বুখারী ৫৩০৪ নং)

আর তাদের প্রাপ্যের ব্যাপারে ইসলাম বলে, “মজুরকে তার ঘাম শুকাবার পূর্বে তোমরা তার মজুরী দিয়ে দাও।” (সহীহুল জামে' ১০৫৫নং)

৪। আত্মীয় ও বন্ধুদের সম্পর্কে ঘনিষ্ঠতা আনতে বিধান দিয়ে কুরআন বলেছে, {لَيْسَ عَلَى الْأَعْمَى حَرَجٌ وَلَا عَلَى الْأَعْرَجِ حَرَجٌ وَلَا عَلَى الْمَرِيضِ حَرَجٌ وَلَا عَلَى أَنفُسِكُمْ أَن تَأْكُلُوا মִ بُيُوتِكُمْ أَوْ بُيُوتِ آبَائِكُمْ أَوْ بُيُوتِ أُمَّهَاتِكُمْ أَوْ بُيُوتِ إِخْوَانِكُمْ أَوْ بُيُوتِ أَخَوَاتِكُمْ أَوْ بُيُوتِ أَعْمَامِكُمْ أَوْ بُيُوتِ عَمَّاتِكُمْ أَوْ بُيُوتِ أَخْوَالِكُمْ أَوْ بُيُوتِ خَالَاتِكُمْ أَوْ مَا مَلَكْتُم مَّفَاتِحَهُ أَوْ صَدِيقِكُمْ لَيْسَ عَلَيْكُمْ جُنَاحٌ أَن تَأْكُلُوا جَمِيعًا أَوْ أَشْتَاتًا فَإِذَا دَخَلْتُم بُيُوتًا فَسَلِّمُوا عَلَى أَنفُسِكُمْ تَحِيَّةً মِّ عِندِ اللَّهِ مُبَارَكَةً طَيِّبَةً كَذَلِكَ يُبَيِّنُ اللَّهُ لَكُمُ الْآيَاتِ لَعَلَّكُمْ تَعْقِلُونَ} (৬১)
অর্থাৎ, অন্ধের জন্য, খঞ্জের জন্য, রুগ্নের জন্য এবং তোমাদের নিজেদের জন্য তোমাদের নিজেদের গৃহে আহার করা দূষণীয় নয় অথবা তোমাদের পিতৃগণের গৃহে, মাতৃগণের গৃহে, ভ্রাতৃগণের গৃহে, ভগিনীগণের গৃহে, পিতৃব্যদের গৃহে, ফুফুদের গৃহে, মাতুলদের গৃহে, খালাদের গৃহে অথবা সে সব গৃহে যার চাবি তোমাদের হাতে আছে অথবা তোমাদের বন্ধুদের গৃহে; তোমরা একত্রে আহার কর অথবা পৃথক্ পৃথক্কাবে আহার কর, তাতে তোমাদের জন্য কোন অপরাধ নেই; তবে যখন তোমরা গৃহে প্রবেশ করবে, তখন তোমরা তোমাদের স্বজনদের প্রতি সালাম বলবে। এ হবে আল্লাহর নিকট হতে কল্যাণময় ও পবিত্র অভিবাদন। এভাবে তোমাদের জন্য নিদর্শনাবলী বিশদভাবে বিবৃত করেন; যাতে তোমরা বুঝতে পার। (নূর : ৬১)

৫। তা বলে তাদের মাঝে বেগানা নারী-পুরুষের একাকার হওয়াতে অনুমতি দেয়নি। বরং বাড়ি প্রবেশের বিশেষ বিধান দিয়েছে ইসলাম। মহান আল্লাহ বলেছেন, {يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَدْخُلُوا بُيُوتًا غَيْرَ بُيُوتِكُمْ حَتَّى تَسْتَأْنِسُوا وَتُسَلِّمُوا عَلَى أَهْلِهَا ذَلِكُمْ خَيْرٌ لَّكُمْ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ (২৭) فَإِن لَّمْ تَجِدُوا فِيهَا أَحَدًا فَلَا تَدْخُلُوهَا حَتَّى يُؤْذَنَ لَكُمْ وَإِن قِيلَ لَكُمُ ارْجِعُوا فَارْجِعُوا هُوَ أَزْكَى لَكُمْ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ عَلِيمٌ} (২৮) سورة النور
অর্থাৎ, যদি তোমরা গৃহে কাউকেও না পাও, তাহলে তোমাদেরকে যতক্ষণ না অনুমতি দেওয়া হয়, ততক্ষণ ওতে প্রবেশ করবে না। যদি তোমাদেরকে বলা হয়, 'ফিরে যাও' তবে তোমরা ফিরে যাবে; এটিই তোমাদের জন্য উত্তম। আর তোমরা যা কর, সে সম্বন্ধে আল্লাহ সবিশেষ অবহিত। (নূর : ২৮)

৬। ইসলাম বড়দের প্রতি শ্রদ্ধা ও ছোটদের প্রতি স্নেহ করতে নির্দেশ দেয়। আল্লাহর রসূল বলেন, “সে ব্যক্তি আমার উম্মতের দলভুক্ত নয়, যে ব্যক্তি আমাদের বড়দেরকে সম্মান দেয় না, ছোটদেরকে স্নেহ করে না এবং আলেমের অধিকার চেনে না।” (আহমাদ, ত্বাবারানী, হাকেম, সহীহ তারগীব ৯৫নং)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00