📘 দ্বীনে ইসলামের সৌন্দর্য ও বৈশিষ্ট্য > 📄 জন্মের আগে ও পরে মানব ও মানবতার প্রতি সযত্নতায় ইসলামের বৈশিষ্ট্য

📄 জন্মের আগে ও পরে মানব ও মানবতার প্রতি সযত্নতায় ইসলামের বৈশিষ্ট্য


১। ইসলাম বলে বিবাহের আগে দ্বীনদার চরিত্রবান বরকনে অনুসন্ধান কর। মহানবী বলেন, “তোমাদের নিকট যখন এমন ব্যক্তি (বিবাহের পয়গাম নিয়ে) আসে; যার দ্বীন ও চরিত্রে তোমরা মুগ্ধ, তখন তার সাথে (মেয়ের) বিবাহ দাও। যদি তা না কর, তাহলে পৃথিবীতে ফিৎনা ও মহাফাসাদ সৃষ্টি হয়ে যাবে।” (তিরমিযী, ইবনে মাজাহ ১৯৬৭, মিশকাত ৩০৯০, সিঃ সহীহাহ ১০২২নং) "চারটি গুণ দেখে মহিলাকে বিবাহ করা হয়; তার ধন-সম্পদ, তার বংশ মর্যাদা, তার রূপ-সৌন্দর্য এবং তার দ্বীন-ধর্ম দেখে। তুমি দ্বীনদার পাত্রী লাভ ক'রে সফলকাম হও। (অন্যথায় তুমি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।)" (বুখারী ৫০৯০নং)

ইসলাম বলে, যাকে ভালোবাসবে, তাকে আল্লাহর ওয়াস্তে বাসো, যাকে ঘৃণা করবে, তাকে দ্বীনের স্বার্থে কর। মহানবী বলেছেন, “ঈমানের সবচেয়ে মজবুত হাতল হল আল্লাহর ওয়াস্তে বন্ধুত্ব করা এবং আল্লাহর ওয়াস্তে শত্রুতা করা, আল্লাহর ওয়াস্তে ভালবাসা এবং আল্লাহর ওয়াস্তে ঘৃণা করা।" (ত্বাবারানী, সঃ জামে' ২৫৩৯নং) তিনি আরো বলেছেন, ইসলামের সবচেয়ে মজবুত হাতল এই যে, তুমি আল্লাহর ওয়াস্তে সম্প্রীতি স্থাপন করবে এবং আল্লাহর ওয়াস্তে বিদ্বেষ স্থাপন করবে। (আহমাদ, বাইহাক্বীর শুআবুল ঈমান, সঃ জামে' ২০০৯নং)

২। মাতৃগর্ভে শিশু আসার আগে সে যাতে শয়তানের কবলে না পড়ে, তার জন্য নির্দিষ্ট ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে দম্পতিকে। দ্বীনের নবী বলেন, "যদি তোমাদের কেউ স্ত্রী সহবাসের ইচ্ছা করে, তখন এই দুআ পড়ে, 'বিসমিল্লা-হ, আল্লা-হুম্মা জান্নিবনাশ শাইত্বা-না অজান্নিবিশ শায়ত্বা-না মা রাযাক্বতানা।' অর্থাৎ, আমি আল্লাহর নাম নিয়ে শুরু করছি, হে আল্লাহ! তুমি শয়তানকে আমাদের নিকট থেকে দূরে রাখ এবং আমাদেরকে যে (সন্তান) দান করবে, তার থেকেও শয়তানকে দূরে রাখ। তাহলে ওদের ভাগ্যে সন্তান এলে, শয়তান তার কোন ক্ষতি করতে পারে না।” (বুখারী-মুসলিম)

৩। মায়ের স্বাস্থ্য ও গর্ভস্থ ভ্রূণের প্রতি যথেষ্ট যত্ন নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সুতরাং গর্ভবতীকে রমযানের রোযা কাযা করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। যেমন দুগ্ধদান কালেও একই অনুমতি রয়েছে। রোযা কাযা করতে সময় না পেলে রোযা রাখার বিনিময়ে মিসকীন খাওয়াতে পারে। (আবু দাউদ ২৩১৯, তিরমিযী ৭ ১৫, ইবনে মাজাহ ১৬৬৭নং)

৪। গর্ভবতী থাকা অবস্থায় শরীয়ত তার উপর অপরাধের কোন আঘাতমূলক দন্ডবিধি প্রয়োগ করা অবৈধ ঘোষণা করেছে। যাতে ভ্রূণের কোন ক্ষতি না হয়। (মুসলিম)

৫। ইসলামের নির্দেশ, তালাকপ্রাপ্ত নারীর জন্য গর্ভ গোপন করা বৈধ নয়। কেননা, গর্ভাবস্থায় অন্যত্র বিবাহ হলে বংশে সংমিশ্রণ ঘটবে। বীর্য হবে প্রথম স্বামীর কিন্তু সন্তান সম্পর্কিত হবে দ্বিতীয় স্বামীর সাথে। আর এটা হল খুব বড় প্রতারণা, খুব বড় পাপ। মহান আল্লাহর নির্দেশ হল, وَالْمُطَلَّقَاتُ يَتَرَبَّصْنَ بِأَنفُسِهِنَّ ثلاثةَ قُرُوءٍ وَلاَ يَحِلُّ لَهُنَّ أَن يَكْتُمْنَ مَا خَلَقَ اللَّهُ فِي أَرْحَامِهِنَّ إِن كُنَّ يُؤْمِنَّ بِاللَّهِ وَالْيَوْমِ الْآخِرِ} (২২৮) البقرة অর্থাৎ, তালাকপ্রাপ্তা (বর্জিতা) নারীগণ তিন রজঃস্রাব কাল প্রতীক্ষায় থাকবে। (অর্থাৎ বিবাহ করা থেকে বিরত থাকবে।) তারা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী হলে তাদের গর্ভাশয়ে আল্লাহ যা সৃষ্টি করেছেন তা গোপন রাখা তাদের পক্ষে বৈধ নয়। (বাক্বারাহঃ ২২৮)

তাছাড়া ইসলামের নির্দেশ হল, সন্তানকে তার জনকের প্রতি সম্বদ্ধ করতে হবে। জাতকের সাথে জনকের সম্পর্ক অস্বীকার বা গোপন করা যাবে না। অন্য পুরুষকে জাতকের জনক বলে দাবী করা যাবে না। মহান আল্লাহ বলেছেন, ادْعُوهُمْ لِآبَائِهِمْ هُوَ أَقْسَطُ عِندَ اللَّهِ فَإِن لَّمْ تَعْلَمُوا آبَاءَهُمْ فَإِخْوَانُكُمْ فِي الدِّينِ وَمَوَالِيكُمْ} (৫) سورة الأحزاب অর্থাৎ, তোমরা ওদেরকে পিতৃপরিচয়ে ডাক; আল্লাহর দৃষ্টিতে এটিই ন্যায়সঙ্গত, যদি তোমরা ওদের পিতৃপরিচয় না জান, তবে ওদেরকে তোমরা ধর্মীয় ভাই এবং বন্ধুরূপে গণ্য কর। (আহযাবঃ ৫)

আর মহানবী বলেছেন, "অজ্ঞাত বংশের সম্বন্ধ দাবী করা অথবা ছোট বা নীচু হলে তা অস্বীকার করা মানুষের জন্য কুফরী।” (আহমাদ প্রমুখ, সহীহুল জামে' ৪৪৮-৬নং)

“যে ব্যক্তি পরের বাপকে নিজের বাপ বলে দাবী করে, সে ব্যক্তি জান্নাতের সুগন্ধিও পাবে না। অথচ তার সুগন্ধি ৫০০ বছরের দূরবর্তী স্থান থেকেও পাওয়া যাবে।” (আহমাদ ২/১৭১, ইবনে মাজাহ ২৬১১, সহীহুল জামে' ৫৯৮৮নং)

“যে ব্যক্তি পরের বাপকে নিজের বাপ বলে দাবী করে অথবা তার (স্বাধীনকারী) প্রভু ছাড়া অন্য প্রভুর প্রতি সম্বন্ধ জুড়ে, সে ব্যক্তির উপর কিয়ামত পর্যন্ত আল্লাহর অবিরাম অভিশাপ।” (আবু দাউদ, সহীহুল জামে' ৫৯৮৭নং)

বলা বাহুল্য, যে ব্যভিচারিণী গর্ভের ভ্রূণ গোপন করে বিবাহ ক'রে অথবা পরপুরুষের সাথে অবৈধ মিলন ক'রে স্বামীর বংশে অন্য বংশের অথবা অবৈধ সন্তানের অনুপ্রবেশ ঘটায়, তার পাপ যে কত বড়, তা অনুমেয়!

৬। জন্মের পরে পৃথিবীতে আগমনের সাথে সাথে তার কর্ণকুহরে তাওহীদের বাণী আযান-ধ্বনি শোনাবার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যেমন পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়ার সময়েও তাকে তাওহীদের কালেমা স্মরণ করানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

৭। শিশুর সুন্দর নাম রাখতে নির্দেশ দিয়েছে ইসলাম।

৮। খুশী ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের উদ্দেশ্যে জন্মের সপ্তম দিনে আকীকা (ছাগল যবাই) করতে নির্দেশ দিয়েছে। নির্দেশ দিয়েছে তার মাথার চুল চেঁছে পরিষ্কার ক'রে সেই চুলের ওজন পরিমাণ চাঁদি অভাবীদেরকে সদকা করতে।

৯। শিশুকে নির্ধারিত সময় অবধি মাতৃদুগ্ধ পান করাবার নিদের্শ দিয়েছে ইসলাম। মায়ের নিকট থেকে শিশুর এটা পাওনা অধিকার। মহান আল্লাহ বলেছেন, وَالْوَالِدَاتُ يُرضِعْنَ أَوْلَادَهُنَّ حَوْلَيْنِ كَامِلَيْنِ لِمَنْ أَرَادَ أَن يُتِمَّ الرَّضَاعَةَ وَعَلَى الْمَوْلُودِ لَهُ رِزْقُهُنَّ وَكِسْوَتُهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ لَا تُكَلِّفُ نَفْسٌ إِلَّا وُسْعَهَا لَا تُضَارَ وَالِدَةٌ بِوَلَدِهَا وَلَا مَوْلُودٌ لَّهُ بِوَلَدِهِ وَعَلَى الْوارِثِ مِثْلُ ذَلِكَ فَإِنْ أَرَادَا فِصَالاً عَن تَرَاضٍ মِّهُمَا وَتَشَاوُرٍ فَلَا جُنَاحَ عَلَيْهِمَا وَإِنْ أَرَدتُّ أَن تَسْتَرْضِعُوا أَوْلَادَكُمْ فَلَا جُنَاحَ عَلَيْكُمْ إِذَا سَلَّمْتُم মَّا آتَيْتُم بِالْمَعْرُوفِ وَاتَّقُوا اللَّهَ وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ) (২৩৩) سورة البقرة অর্থাৎ, জননীগণ তাদের সন্তানদেরকে পূর্ণ দু' বছর দুধ পান করাবে; যদি কেউ দুধ পান করার সময় পূর্ণ করতে চায়। জনকের কর্তব্য যথাবিধি তাদের ভরণ-পোষণ করা। কাউকে তার সাধ্যাতীত কার্যভার দেওয়া হয় না। কোন জননীকে তার সন্তানের জন্য এবং কোন জনককে তার সন্তানের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত করা হবে না। আর (পিতা মারা গেলে) উত্তরাধিকারীর বিধানও অনুরূপ। পক্ষান্তরে যদি পিতা- মাতা পরস্পর সম্মতি ও পরামর্শক্রমে দু' বছরের মধ্যেই (শিশুর) দুধপান ছাড়াতে চায়, তবে তাদের কোন দোষ হবে না। আর যদি তোমরা তোমাদের সন্তানদের কোন ধাত্রীর দুধ পান করাতে চাও, তাতেও তোমাদের কোন দোষ হবে না; যদি তোমরা তাদের নির্ধারিত প্রদেয় বিধিমত অর্পণ কর। আল্লাহকে ভয় কর এবং জেনে রাখ, তোমরা যা কর আল্লাহ তার দ্রষ্টা। (বাক্বারাহঃ ২৩৩)

১০। শিশুর পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতার প্রতি খেয়াল রেখে তার যথাসময়ে খতনা (লিঙ্গত্বক ছেদন) করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তার নখ-চুল যথানিয়মে কেটে ফেলার তাকীদ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহর রসূল ﷺ বলেছেন, “পাঁচটি কাজ হল প্রকৃতিগত সুন্নত; খতনা করা, গুপ্তাঙ্গের লোম চেঁছে ফেলা, নখ কাটা, বগলের লোম তুলে ফেলা এবং মোছ ছেঁটে ফেলা।” (বুখারী ৫৮৮৯, মুসলিম ২৫৭নং)

১১। শিশুকে যথানিয়মে জ্ঞান, আদব ও চরিত্র শিক্ষা দেওয়ার নির্দেশ আছে ইসলামে। মহান আল্লাহ বলেছেন, {يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا وَقُودُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ عَلَيْهَا مَلَائِكَةٌ غِلَاظٌ شِدَادٌ لا يَعْصُونَ اللَّهَ مَا أَمَرَهُمْ وَيَفْعَلُونَ مَا يُؤْمَرُونَ} অর্থাৎ, হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে রক্ষা কর অগ্নি হতে, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর, যাতে নিয়োজিত আছে নির্মম-হৃদয়, কঠোর-স্বভাব ফিরিশতাগণ, যারা আল্লাহ যা তাদেরকে আদেশ করেন, তা অমান্য করে না এবং তারা যা করতে আদিষ্ট হয়, তাই করে। (তাহরীমঃ ৬)

রাসূলুল্লাহ বলেছেন, “তোমরা নিজেদের সন্তান-সন্ততিদেরকে নামাযের আদেশ দাও; যখন তারা সাত বছরের হবে। আর তারা যখন দশ বছরের সন্তান হবে, তখন তাদেরকে নামাযের জন্য প্রহার কর এবং তাদের বিছানা পৃথক করে দাও।” (আবু দাউদ)

১২। ইসলাম পিতামাতাকে সন্তানদের মাঝে ন্যায়পরায়ণতা বজায় রাখতে আদেশ দেয়। মহানবী বলেছেন, “তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং তোমাদের সন্তানদের মাঝে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা কর। (বুখারী, মুসলিম)

১৩। ইসলাম ভ্রূণ ও সন্তান হত্যা করতে নিষেধ করেছে। মহান আল্লাহ বলেছেন, {وَلَا تَقْتُلُواْ أَوْلَادَكُم মِّ إِمْلَاقٍ نَّحْنُ نَرْزُقُكُمْ وَإِيَّاهُمْ} (১৫১) আনআম অর্থাৎ, দারিদ্রের কারণে তোমরা তোমাদের সন্তানদেরকে হত্যা করবে না। আমিই তোমাদেরকে ও তাদেরকে জীবিকা দিয়ে থাকি। (আনআমঃ ১৫১)

{وَلَا تَقْتُلُوا أَوْلَادَكُمْ خَشْيَةَ إِمْلَاقٍ نَّحْنُ نَرْزُقُهُمْ وَإِيَّاكُم إِنَّ قَتْلَهُمْ كَانَ خِطْفًا كَبِيرًا) (৩১) سورة الإسراء অর্থাৎ, তোমাদের সন্তানদেরকে তোমরা দারিদ্র্য-ভয়ে হত্যা করো না, আমিই তাদেরকে জীবনোপকরণ দিয়ে থাকি এবং তোমাদেরকেও। নিশ্চয় তাদেরকে হত্যা করা মহাপাপ। (বানী ইস্রাঈল: ৩১)

{يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ إِذَا جَاءَكَ الْمُؤْمِنَاتُ يُبَايِعْنَكَ عَلَى أَن لا يُشْرِكْنَ بِاللَّهِ شَيْئًا وَلَا يَسْرِقْنَ وَلَا يَزْنِينَ وَلَا يَقْتُلْنَ أَوْلَادَهُنَّ وَلَا يَأْتِينَ بِبُهْتَانِ يَفْتَرِينَهُ بَيْنَ أَيْدِيهِنَّ وَأَرْجُلِهِنَّ وَلَا يَعْصِينَكَ فِي مَعْرُوفِ فَبَايِعُهُنَّ وَاسْتَغْفِرْ لَهُنَّ اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ غفُورٌ رَّحِيمٌ } (১২) سورة الممتحنة অর্থাৎ, হে নবী! বিশ্বাসী নারীরা যখন তোমার নিকট এসে বায়আত করে এই মর্মে যে, তারা আল্লাহর সাথে কোন শরীক স্থির করবে না, চুরি করবে না, ব্যভিচার করবে না, নিজেদের সন্তান-সন্ততিদের হত্যা করবে না, তারা সজ্ঞানে কোন অপবাদ রচনা ক'রে রটাবে না এবং সৎকার্যে তোমাকে অমান্য করবে না, তখন তাদের বায়আত গ্রহণ কর এবং তাদের জন্য আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর। নিশ্চয় আল্লাহ চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (মুমতাহিনাহঃ ১২)

১৪। ইসলাম মানুষকে সৃষ্টির সেরা জীব রূপে সৃষ্টি করেছেন। এক মানুষ অন্য মানুষের সম্মান করবে, কিন্তু ছোট হলেও বড়কে প্রণিপাত করবে না। প্রণাম বা পা ছুঁয়ে সালাম করবে না। শরয়ী পদ্ধতিতে শ্রদ্ধা জানাবে।

১৫। মানুষ মারা গেলেও সম্মানের সাথে তার কাফন-দাফন করা হয়। সাদা কাপড়কে সুগন্ধিত করে তাকে কাফনানো হয়। মহানবী বলেন, "তোমরা তোমাদের লেবাসের মধ্যে সাদা কাপড় পরিধান কর। কারণ, তা সব চাইতে উত্তম। আর ঐ সাদা কাপড় দ্বারা তোমাদের ম্যাইয়্যেতকেও কাফনাও।” (আবু দাউদ ৩৫২৯, তিরমিযী ৯১৫, ইবনে মাজাহ ১৪৬১, আহমাদ ২১০৯)

কাফনের কাপড়কে তিনবার আগর কাঠের সুগন্ধময় ধুয়া দিয়ে সুগন্ধময় করা হয়। মহানবী বলেন, “যখন তোমরা তোমাদের মাইয়্যেতকে সুগন্ধ ধুয়া দিয়ে সুগন্ধময় করবে, তখন যেন তা তিনবার কর।” (আহমাদ ১৩০১৪, ইবনে শাইবাহ, মাওয়ারিদুয যামআন ৭৫২, হাকেম ১/৩৫৫, বাইহাকী ৩/৪০৫) আগর কাঠের ধুয়া না হলে গোলাপ পানি ইত্যাদি দ্বারাও সুগন্ধিত করা হয়।

সমান মাপের তিনটি কাপড়ে (লেফাফায়) কাফনানো হয়। পরস্পর তিনটি কাপড়কে বিছিয়ে দেওয়া হয়। এর উপর প্রয়োজনে (মলদ্বার হতে নাপাকী বের হতে থাকলে) ১০০/২৫ সেমি কাপড়কে দুই মাথায় ফেড়ে নিয়ে লেঙ্গট বানিয়ে মাইয়্যেতের পাছার স্থানে রাখা হয়। (ইহরাম অবস্থার মৃত না হলে) তার উপর মিস্ক, কপূর বা অন্য কোন সুগন্ধি মিশ্রিত তুলো রাখা হয়। অতঃপর লাশকে পর্দার সাথে এনে তার উপর ধীরভাবে রাখা হয়। (মুহরিম না হলে) মাইয়্যেতের সিজদার স্থান সমূহে, বগলে, দুইরানের মধ্যবর্তী ইত্যাদি স্থানে আতর লাগিয়ে দেওয়া হয়। সসম্মানে তাকে রাখা হয় জানাযার খাটে। মুসলিমরা আন্তরিকতার সাথে শোকার্ত মনে তার আত্মর কল্যাণ কামনা করে জানাযা পড়ে। অতঃপর সম্মানের সাথে গোরস্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। আল্লাহর নাম নিয়ে কবরে রাখা হয়। কবর এমনভাবে বন্ধ করা হয়, যাতে তার দেহে মাটি না লাগে। পুনরায় সকলে তার জন্য প্রার্থনা করে, যাতে তার পরকালের হিসাব সহজ হয়। মাটির তৈরি মানুষকে সম্মানের সাথে মাটির বুকেই ফিরিয়ে দেওয়া হয়। মহান আল্লাহ বলেছেন, {مِنْهَا خَلَقْنَاكُمْ وَفِيهَا نُعِيدُكُمْ وَمِنْهَا نُخْرِجُكُمْ تَارَةً أُخْرَى} (৫৫) অর্থাৎ, আমি মাটি হতে তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি, তাতেই তোমাদেরকে ফিরিয়ে দেব এবং তা হতে পুনর্বার বের করব। (ত্বা-হাঃ ৫৫)

📘 দ্বীনে ইসলামের সৌন্দর্য ও বৈশিষ্ট্য > 📄 নারী-পুরুষের সম্পর্ক ও চারিত্রিক ব্যাপারে ইসলামের বৈশিষ্ট্য

📄 নারী-পুরুষের সম্পর্ক ও চারিত্রিক ব্যাপারে ইসলামের বৈশিষ্ট্য


১। কুল-মান, বংশ-মর্যাদা ও সম্ভ্রম ও উত্তরাধিকারী সুসন্তান বজায় রাখতে ইসলাম মুসলিমকে বিবাহ করতে উদ্বুদ্ধ করে। যাতে অশ্লীলতা, ব্যভিচার, ধর্ষণ, ইভটিজিং, সমকাম, পশুগমন ইত্যাদি অপরাধ থেকে সমাজ মুক্ত ও পবিত্র থাকে।

মহানবী ﷺ বলেছেন, “হে যুবকদল! তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি (বিবাহের অর্থাৎ স্ত্রীর ভরণপোষণ ও রতিক্রিয়ার) সামর্থ্য রাখে, সে যেন বিবাহ করে। কারণ, বিবাহ চক্ষুকে দস্তুরমত সংযত করে এবং লজ্জাস্থান হিফাযত করে। আর যে ব্যক্তি ঐ সামর্থ্য রাখে না, সে যেন রোযা রাখে। কারণ, তা যৌনেন্দ্রিয় দমনকারী।” (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত ৩০৮-০নং)

বিবাহ করে দাম্পত্য জীবনে সুখী হলে নারী-পুরুষ উভয়ে যেমন বহু পাপের ছোবল থেকে বেঁচে যায়, তেমনি তাতে অনেক পুণ্যেরও অধিকারী হয়। মহানবী ﷺ বলেন, “বান্দা যখন বিবাহ করে তখন সে তার অর্ধেক দ্বীন পূর্ণ করে নেয়। অতএব তাকে তার অবশিষ্ট অর্ধেক দ্বীনের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করা উচিত।” (বাইহাক্বীর শুআবুল ঈমান, সহীহুল জামে' ৪৩০ নং)

২। ইসলামে বৈরাগ্যবাদের স্থান নেই। সংসার বর্জন করে কোন দ্বীনদারী নেই। সন্নাসী হয়ে বা ফকীরী নিয়ে কোন উপাসনা নেই। সংসার ও দাম্পত্য বর্জন করে কোন পৃথক বা অতিরিক্তি মর্যাদা নেই। ইসলামের নীতি হল, 'বৈরাগ্য সাধনে মুক্তি সে আমার নয়, অসংখ্য বন্ধন মাঝে মহানন্দময় লভিব মুক্তির স্বাদ।'

ইসলামের দূত বলেছেন, «تزوجوا ؛ فإني مكاثر بكم الأمم ، ولا تكونوا كرهبانية النصارى» অর্থাৎ, তোমরা বিবাহ কর। কারণ আমি সকল উম্মতের মোকাবেলায় তোমাদের সংখ্যাধিক্য নিয়ে (কিয়ামতে) আমি গর্ব করব। আর তোমরা খ্রিস্টানদের মতো বৈরাগী (সংসারত্যাগী) হয়ো না। (বাইহাক্বী ১৩২৩৫, সিঃ সহীহাহ ১৭৮২নং)

আসলেই সন্নাসবাদ পূর্ববর্তী জাতির আবিষ্কৃত উপাসনা-পদ্ধতি। তাতে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি নেই। সে কথার সাক্ষ্য দিয়ে তিনি বলেছেন, {وَرَهْبَانِيَّةً ابْتَدَعُوهَا مَا كَتَبْنَاهَا عَلَيْهِمْ إِلَّا ابْتِغَاءَ رِضْوَانِ اللَّهِ فَمَا رَعَوْهَا حَقَّ رِعَايَتِهَا فَآتَيْنَا الَّذِينَ آمَنُوا مِنْهُمْ أَجْرَهُمْ وَكَثِيرٌ مِّنْهُمْ فَاسِقُونَ} (২৭) অর্থাৎ, সন্ন্যাসবাদ; এটা তো তারা নিজেরা প্রবর্তন করেছিল, আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের বিধান ছাড়া আমি তাদেরকে এ (সন্ন্যাসবাদে) র বিধান দিইনি; অথচ এটাও তারা যথাযথভাবে পালন করেনি। সুতরাং তাদের মধ্যে যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছিল, তাদেরকে আমি তাদের পুরস্কার দিয়েছিলাম। আর তাদের অনেকেই সত্যত্যাগী। (হাদীদঃ ২৭)

উষমান বিন মাযঊন আবেগময় ইবাদত শুরু করেছিলেন। সংসার-বিরাগী হয়ে সব ছেড়ে আল্লাহর ইবাদতে মন দিয়েছিলেন। মহানবী ﷺ তাঁকে বলেছিলেন, “হে উষমান! আমাকে সন্ন্যাসবাদে আদেশ দেওয়া হয়নি। তুমি কি আমার তরীকা থেকে বিমুখ হয়েছ?” উষমান বললেন, 'না হে আল্লাহর রসূল!' তিনি বললেন, "আমার তরীকা হল, আমি (রাতে) নামায পড়ি এবং ঘুমাই, (কোনদিন) রোযা রাখি এবং (কোনদিন) রাখি না, বিবাহ করি ও ত্বালাক দিই। সুতরাং যে ব্যক্তি আমার তরীকা থেকে বিমুখ হবে, সে আমার দলভুক্ত নয়। হে উষমান! নিশ্চয় তোমার উপর তোমার স্ত্রীর হক আছে, তোমার উপর তোমার নিজের হক আছে, তোমার উপর তোমার মেহমানের হক আছে....।” (আবু দাউদ প্রমুখ, সিঃ সহীহাহ ১/৭৫০)

অবশ্য ইসলাম মানুষকে পরিপূর্ণরূপে দুনিয়ার দিকে ঝুঁকে পড়তেও নিষেধ করে। দুনিয়া পেয়ে আখেরাতকে ভুলে যেতে বারণ করে। ইসলামের নীতি হল, {وَابْتَغِ فِيمَا آتَاكَ اللَّهُ الدَّارَ الْآخِرَةَ وَلَا تَنسَ نَصِيبَكَ مِنَ الدُّنْيَا وَأَحْسِن كَمَا أَحْسَنَ اللَّهُ إِلَيْكَ وَلَا تَبْغِ الْفَسَادَ فِي الْأَرْضِ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْمُفْسِدِينَ} (৭৭) سورة القصص অর্থাৎ, আল্লাহ যা তোমাকে দিয়েছেন তার মাধ্যমে পরলোকের কল্যাণ অনুসন্ধান কর। আর তুমি তোমার ইহলোকের অংশ ভুলে যেয়ো না। তুমি (পরের প্রতি) অনুগ্রহ কর, যেমন আল্লাহ তোমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করতে চেয়ো না। আল্লাহ অবশ্যই বিপর্যয় সৃষ্টিকারীকে ভালবাসেন না। (কাসাস্বঃ ৭৭)

মহান আল্লাহ বলেছেন, {فَمِنَ النَّاسِ مَن يَقُولُ رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا وَمَا لَهُ فِي الْآخِرَةِ مِنْ خَلَاقٍ} (২০০) وَمِنْهُم মَّن يَقُولُ رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ (২০১) أُولَئِكَ لَهُمْ نَصِيبٌ মِّما كَسَبُوا وَاللَّهُ سَرِيعُ الْحِسَابِ} অর্থাৎ, এমন কিছু লোক আছে যারা বলে, 'হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে পৃথিবীতে (সওয়াব) দান কর।' বস্তুতঃ তাদের জন্য পরকালে কোন অংশ নেই। পক্ষান্তরে তাদের মধ্যে (এমন কিছু লোক আছে) যারা বলে, 'হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের ইহকালে কল্যাণ দান কর এবং পরকালেও কল্যাণ দান কর। আর আমাদেরকে দোযখ-যন্ত্রণা থেকে রক্ষা কর।' তারা যা অর্জন করেছে, তার প্রাপ্ত অংশ তাদেরই। বস্তুতঃ আল্লাহ হিসাব গ্রহণে অত্যন্ত তৎপর। (বাক্বারাহঃ ২০০-২০২)

দুনিয়া মানুষের লক্ষ্য নয়, উপলক্ষ্য। দুনিয়া মানুষের স্থায়ী ঠিকানা নয়, পরকালের জান্নাত অথবা জাহান্নামই আসল ঠিকানা। দুনিয়া আখেরাতের ফসলের জমি।

৩। মান-সম্ভ্রম ও বংশ নির্মল রাখার জন্য ইসলাম নারী-পুরুষের বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্ককে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। বরং প্রেম- ভালোবাসার নামে তার নিকটবর্তী হতেই নিষেধ করেছে। মহান আল্লাহ বলেছেন, وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَى إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاء سَبيلاً) (৩২) سورة الإسراء অর্থাৎ, তোমরা ব্যভিচারের নিকটবর্তী হয়ো না, নিশ্চয় তা অশ্লীল ও নিকৃষ্ট আচরণ। (বানী ইস্রাঈল: ৩২)

সমাজকে পবিত্র রাখার জন্য বৈধ স্বামী-স্ত্রী ছাড়া অন্য নারী-পুরুষের সহবাস, যিনা ও ব্যভিচারের কঠোরতম শাস্তি নির্ধারণ করেছে ইসলাম। বিবাহিত ব্যভিচারীর শাস্তি মৃত্যুদন্ড। আর অবিবাহিতদের ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেছেন, الزَّانِيَةُ وَالزَّانِي فَاجْلِدُوا كُلَّ وَاحِدٍ মِّهُمَا مِئَةَ جَلْدَةٍ وَلَا تَأْخُذْكُم بِهِمَا رَأْفَةٌ فِي دِينِ اللَّهِ إِن كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْমِ الْآخِرِ وَلْيَشْهَدْ عَذَابَهُمَا طَائِفَةٌ মَِّ الْمُؤْمِنِينَ) (২) سورة النور অর্থাৎ, ব্যভিচারিণী ও ব্যভিচারী---ওদের প্রত্যেককে একশো কশাঘাত কর। আল্লাহর বিধান কার্যকরীকরণে ওদের প্রতি দয়া যেন তোমাদেরকে অভিভূত না করে; যদি তোমরা আল্লাহতে এবং পরকালে বিশ্বাসী হও। আর বিশ্বাসীদের একটি দল যেন ওদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করে। (নূরঃ ২)

৪। লিভ টুগেদার বা গার্লফ্রেন্ড রেখে দায়িত্ব ও বন্ধনহীন সংসার করতে নিষেধ করেছে ইসলাম। মহান আল্লাহ বলেছেন, الْيَوْমَ أُحِلَّ لَكُمُ الطَّيِّبَاتُ وَطَعَامُ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ حِلٌّ لَّكُمْ وَطَعَامُكُمْ حِلٌّ لَّهُمْ وَالْمُحْصَنَاتُ মִَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُحْصَنَاتُ মִَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ মִ قَبْلِكُمْ إِذَا آتَيْتُمُوهُنَّ أُجُورَهُنَّ مُحْصِنِينَ غَيْرَ مُسَافِحِينَ وَلَا مُتَّخِذِي أَخْدَانِ وَمَن يَكْفُرْ بِالإِيمَانِ فَقَدْ حَبِطَ عَمَلُهُ وَهُوَ فِي الآخِرَةِ মִَ الْخَاسِرِينَ} (৫) سورة المائدة অর্থাৎ, আজ তোমাদের জন্য সমস্ত ভাল জিনিস বৈধ করা হল, যাদেরকে কিতাব দেওয়া হয়েছে, তাদের (যবেহকৃত) খাদ্যদ্রব্য তোমাদের জন্য বৈধ ও তোমাদের (যবেহকৃত) খাদ্যদ্রব্য তাদের জন্য বৈধ এবং বিশ্বাসী সচ্চরিত্রা নারীগণ ও তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেওয়া হয়েছে, তাদের সচ্চরিত্রা নারীগণ (তোমাদের জন্য বৈধ করা হল); যদি তোমরা তাদেরকে মোহর প্রদান ক'রে বিবাহ কর, প্রকাশ্য ব্যভিচার অথবা উপপত্নীরূপে গ্রহণ করার জন্য নয়। আর যে কেউ ঈমানকে অস্বীকার করবে, তার কর্ম নিষ্ফল হবে এবং সে পরকালে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত। (মায়িদাহঃ ৫)

৫। ইসলাম অপরের চরিত্রে কলঙ্ক লেপন করতে নিষেধ করেছে। বরং অপবাদ দাতার জন্য শাস্তি নির্ধারণ করেছে। মহান আল্লাহ বলেছেন, وَالَّذِينَ يَرْمُونَ الْمُحْصَنَاتِ ثُمَّ لَمْ يَأْتُوا بِأَرْبَعَةِ شُهَدَاء فَاجْلِدُوهُمْ ثَمَانِينَ جَلْدَةً وَلَا تَقْبَلُوا لَهُمْ شَهَادَةً أَبَدًا وَأُوْلَئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ} (৪) النور অর্থাৎ, যারা সাধী রমণীদের প্রতি অপবাদ আরোপ করে, অতঃপর স্বপক্ষে চারজন সাক্ষী উপস্থিত করে না, তাদেরকে আশি বার কশাঘাত করবে এবং কখনও তাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করবে না; এরাই তো সত্যত্যাগী। (নূর: ৪)

৬। যেভাবে চরিত্রে দাগ লাগতে পারে অথবা অবৈধ মিলন বা ব্যভিচার ঘটে যেতে পারে, সেভাবে নারী-পুরুষকে অবস্থান করতে নিষেধ করেছে ইসলাম। মহানবী ﷺ বলেছেন, لا يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ إِلَّا وَمَعَهَا ذُو مَحْرَمٍ وَلَا تُسَافِرِ الْمَرْأَةُ إِلَّا مَعَ ذِي مَحْرَمٍ ». “কোন পুরুষ যেন কোন বেগানা নারীর সঙ্গে তার সাথে এগানা পুরুষ ছাড়া অবশ্যই নির্জনতা অবলম্বন না করে। আর মাহরাম ব্যতিরেকে কোন নারী যেন সফর না করে।" এক ব্যক্তি আবেদন করল, 'হে আল্লাহর রসূল! আমার স্ত্রী হজ্জ পালন করতে বের হয়েছে। আর আমি অমুক অমুক যুদ্ধে নাম লিখিয়েছি।' তিনি বললেন, "যাও, তুমি তোমার স্ত্রীর সঙ্গে হজ্জ কর।” (বুখারী ও মুসলিম)

📘 দ্বীনে ইসলামের সৌন্দর্য ও বৈশিষ্ট্য > 📄 ব্যক্তিগত জীবনে ইসলামের বৈশিষ্ট্য

📄 ব্যক্তিগত জীবনে ইসলামের বৈশিষ্ট্য


১। ইসলাম মুসলিমকে আভ্যন্তরিক ও বাহ্যিক উভয়ভাবে পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন থাকতে আদেশ করে। শির্ক, কুফরী, মুনাফিকী ও অমূলক বিশ্বাসের অপবিত্রতা থেকে মনকে এবং প্রস্রাব-পায়খানা, ঋতুস্রাব ও বীর্য ইত্যাদি থেকে দেহকে পবিত্র রাখতে নির্দেশ দেয়। মহান আল্লাহ বলেন, {إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ وَيُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِينَ) (২২২) سورة البقرة অর্থাৎ, নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাপ্রার্থিগণকে এবং যারা পবিত্র থাকে, তাদেরকে পছন্দ করেন। (বাক্বারাহঃ ২২২)

যাতে অহংকার সৃষ্টি হয়, এমন বিলাসিতাকে অপছন্দ করে ইসলাম। তবে সৌন্দর্য বর্জন করতে আদেশ করে না। ভালো খেতে ও পরতে নিষেধ করে না। এ ব্যাপারে বিধান হল, يَا بَنِي آدَمَ خُذُوا زِينَتَكُمْ عِندَ كُلِّ مَسْجِدٍ وكُلُوا وَاشْرَبُوا وَلَا تُسْرِفُوا إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُسْرِفِينَ (৩১) قُلْ মَنْ حَرَّمَ زِينَةَ اللَّهِ الَّتِي أَخْرَجَ لِعِبَادِهِ وَالْطَّيِّبَاتِ মִَ الرِّزْقِ قُلْ هِي لِلَّذِينَ آمَنُواْ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا خَالِصَةً يَوْمَ الْقِيَامَةِ كَذَلِكَ نُفَصِّلُ الْآيَاتِ لِقَوْمٍ يَعْلَمُونَ} (৩২) سورة الأعراف অর্থাৎ, হে আদমের বংশধরগণ! তোমরা প্রত্যেক নামাযের সময় সুন্দর পরিচ্ছদ পরিধান কর। পানাহার কর, কিন্তু অপচয় করো না। নিশ্চয় তিনি অপচয়কারীদেরকে পছন্দ করেন না। বল, 'আল্লাহ স্বীয় দাসদের জন্য যে সব সুশোভন বস্তু ও পবিত্র জীবিকা সৃষ্টি করেছেন, তা কে নিষিদ্ধ করেছে?' বল, 'পার্থিব জীবনে বিশেষ করে কিয়ামতের দিনে এ সমস্ত তাদের জন্য, যারা বিশ্বাস করে।' এরূপে আমি জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শনসমূহ বিশদভাবে বিবৃতিতে করি। (আ'রাফঃ ৩১-৩২)

মহানবী বলেন, "তোমরা যা ইচ্ছা তাই খাও এবং যেমন ইচ্ছা তেমনিই পর, তবে তাতে যেন দু'টি জিনিস না থাকে; অপচয় ও অহংকার।” (বুখারী, মিশকাত ৪৩৮০নং) তিনি আরো বলেছেন, "যার অন্তরে অণু পরিমাণ অহঙ্কার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।” একটি লোক বলল, 'মানুষ তো ভালবাসে যে, তার পোশাক সুন্দর হোক ও তার জুতো সুন্দর হোক, (তাহলে)?' তিনি বললেন, “আল্লাহ সুন্দর, তিনি সৌন্দর্যকে ভালবাসেন। (সুন্দর পোশাক ও সুন্দর জুতো ব্যবহার অহংকার নয়, বরং) অহংকার হল, সত্য প্রত্যাখ্যান করা এবং মানুষকে তুচ্ছজ্ঞান করা।” (মুসলিম)

২। মানুষের জ্ঞান-বিবেক নষ্ট ও ধ্বংস করে দেয়, এমন সকল মাদকদ্রব্যকে 'হারাম' ঘোষণা করেছে। মহান আল্লাহ বলেছেন, {يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالأَنصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ মِّ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ} (৯০) سورة المائدة অর্থাৎ, হে বিশ্বাসিগণ! মদ, জুয়া, মূর্তিপূজার বেদী ও ভাগ্যনির্ণায়ক শর ঘৃণ্য বস্তু শয়তানের কাজ। সুতরাং তোমরা তা বর্জন কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার। (মায়িদাহঃ ৯০)

৩। ইসলাম আত্মহত্যাকে অবৈধ ঘোষণা করেছে। যেহেতু আত্ম মানুষের মালিকানাভুক্ত নয়। সৃষ্টিকর্তার দেওয়া প্রাণকে হত্যা করার অধিকার মানুষকে দেয়নি ইসলাম। মহান আল্লাহ বলেছেন, {وَلَا تُلْقُوا بِأَيْدِيكُمْ إِلَى التَّهْلُكَةِ} (১৯৫) سورة البقرة অর্থাৎ, তোমরা নিজেরা নিজেদের সর্বনাশ করো না। (বাক্বারাহঃ ১৯৫)

{وَلَا تَقْتُلُواْ أَنفُسَكُمْ إِنَّ اللَّهَ كَانَ بِكُمْ رَحِيمًا} (২৯) سورة النساء অর্থাৎ, তোমরা আত্মহত্যা করো না; নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের প্রতি পরম দয়ালু। (নিসাঃ ২৯)

আল্লাহর রসূল বলেন, “যে ব্যক্তি কোন পাহাড় হতে নিজেকে ফেলে আত্মহত্যা করবে, সে ব্যক্তি জাহান্নামেও সর্বদা ও চিরকালের জন্য নিজেকে ফেলে অনুরূপ শাস্তিভোগ করবে। যে ব্যক্তি বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করবে, সে ব্যক্তি জাহান্নামেও সর্বদা চিরকালের জন্য বিষ পান করে যাতনা ভোগ করবে। আর যে ব্যক্তি কোন লৌহখন্ড (ছুরি ইত্যাদি) দ্বারা আত্মহত্যা করবে, সে ব্যক্তি জাহান্নামেও ঐ লৌহখন্ড দ্বারা সর্বদা ও চিরকালের জন্য নিজেকে আঘাত করে যাতনা ভোগ করতে থাকতে।” (বুখারী ৫৭৭৮, মুসলিম ১০৯নং প্রমুখ)

তিনি আরো বলেছেন, "যে ব্যক্তি ফাঁসি নিয়ে আত্মহত্যা করবে, সে ব্যক্তি দোযখেও অনুরূপ ফাঁসি নিয়ে আযাব ভোগ করবে। আর যে ব্যক্তি বর্শা বা ছুরিকাঘাত দ্বারা আত্মহত্যা করবে, সে ব্যক্তি দোযখেও অনুরূপ বর্শা বা ছুরিকাঘাত দ্বারা (নিজে নিজে) আযাব ভোগ করবে।” (বুখারী ১৩৬৫নং)

৪। ইসলাম পার্থিব জীবনকে মানুষের প্রকৃত জীবন ও সর্বশেষ লক্ষ্যমাত্রা বলে স্থির করে না। বরং এ জীবনকে উপলক্ষ্য মনে করে। খেলা, ছলনা ও ধোঁকার বাসগৃহ ধারণা করে। যাতে কোন মানুষ এ জীবনে অনর্থক খেলায় মত্ত না হয়ে পড়ে, এ ক্ষণস্থায়ী জীবনের ছলনার শিকার না হয়ে যায় এবং এ জীবনের বাহ্যিক চাকচিক্য দেখে ধোঁকা না খেয়ে যায়। কুরআন মানুষকে সতর্ক করে বলে, {وَمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلَّا لَعِبٌ وَلَهْوٌ وَلَلدَّارُ الآখِرَةُ خَيْرٌ لِّلدَّينَ يَتَّقُونَ أَفَلَا تَعْقِلُونَ } (৩২) سورة الأنعাম অর্থাৎ, পার্থিব জীবন তো ক্রীড়া-কৌতুক বই আর কিছুই নয় এবং যারা সাবধানতা অবলম্বন করে, তাদের জন্য পরকালের আবাসই শ্রেয়, তোমরা কি (তা) অনুধাবন কর না? (আনআমঃ ৩২)

وَاضْرِبْ لَهُم মَّثَلَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا كَمَاء أَنزَلْنَاهُ মִَ السَّمَاءِ فَاخْتَلَطَ بِهِ نَبَاتُ الْأَرْضِ فَأَصْبَحَ هَشِيمًا تَذْرُوهُ الرِّيَاحُ وَكَانَ اللَّهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ মُّقْتَدِرًا} (৪৫) অর্থাৎ, তাদের কাছে পেশ কর উপমা পার্থিব জীবনের; এটা পানির ন্যায় যা আমি বর্ষণ করি আকাশ হতে, যার দ্বারা ভূমির উদ্ভিদ ঘন সন্নিবিষ্ট হয়ে উদ্‌গত হয়। অতঃপর তা বিশুষ্ক হয়ে এমন চূর্ণ-বিচূর্ণ হয় যে, বাতাস ওকে উড়িয়ে নিয়ে যায়। আর আল্লাহ সর্ব বিষয়ে শক্তিমান। (কাহফঃ ৪৫)

{وَمَا هَذِهِ الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلَّا لَهْوٌ وَلَعِبٌ وَإِنَّ الدَّارَ الْآخِرَةَ لَهِيَ الْحَيَوَانُ لَوْ كَانُوا يَعْلَمُونَ} (৬৪) سورة العنكبوت অর্থাৎ, এ পার্থিব জীবন তো খেল-তামাশা ছাড়া কিছুই নয়। আর পারলৌকিক জীবনই তো প্রকৃত জীবন; যদি ওরা জানত। (আনকাবুতঃ ৬৪)

{يَا قَوْمِ إِنَّمَا هَذِهِ الْحَيَاةُ الدُّنْيَا مَتَاعٌ وَإِنَّ الْآخِرَةَ هِيَ دَارُ الْقَرَارِ} (৩৯) অর্থাৎ, (ফিরাউন সম্প্রদায়ের বিশ্বাসী ব্যক্তি বলল,) হে আমার সম্প্রদায়! এ পার্থিব জীবন তো অস্থায়ী উপভোগের বস্তু। আর নিশ্চয় পরকাল হচ্ছে চিরস্থায়ী আবাস। (মু'মিনঃ ৩৯)

إِنَّمَا الحَيَاةُ الدُّنْيَا لَعِبٌ وَلَهْوٌ وَإِن تُؤْمِنُوا وَتَتَّقُوا يُؤْتِكُمْ أُجُورَكُمْ وَلَا يَسْأَلْكُمْ أَمْوَالَكُمْ} (৩৬) سورة محمد অর্থাৎ, পার্থিব জীবন তো শুধু খেল-তামাশা মাত্র। যদি তোমরা বিশ্বাস কর ও আল্লাহ-ভীরুতা অবলম্বন কর, তাহলে আল্লাহ তোমাদেরকে পুরস্কার দেবেন। আর তিনি তোমাদের ধন-সম্পদ চান না। (মুহাম্মাদঃ ৩৬)

اعْلَمُوا أَنَّمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا لَعِبٌ وَلَهْوٌ وَزِينَةً وَتَفَاخُرٌ بَيْنَكُمْ وَتَكَاثُرُ فِي الْأَمْوَالِ وَالْأَوْلَادِ كَمَثَلِ غَيْثٍ أَعْجَبَ الْكُفَّارَ نَبَاتُهُ ثُمَّ يَهِيجُ فَتَرَاهُ مُصْفَرًّا ثُمَّ يَكُونُ حُطَامًا وَفِي الْآخِرَةِ عَذَابٌ شَدِيدٌ وَمَغْفِرَةٌ মِّ اللَّهِ وَرِضْوَانٌ وَمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلَّا مَتَاعُ الْغُرُورِ} (২০) سورة الحديد অর্থাৎ, তোমরা জেনে রেখো যে, পার্থিব জীবন তো ক্রীড়া-কৌতুক, জাঁকজমক, পারস্পরিক গর্ব প্রকাশ, ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে প্রাচুর্য লাভের প্রতিযোগিতা ব্যতীত আর কিছুই নয়। এর উপমা বৃষ্টি; যার দ্বারা উৎপন্ন ফসল কৃষকদেরকে চমৎকৃত করে, অতঃপর তা শুকিয়ে যায়, ফলে তুমি তা পীতবর্ণ দেখতে পাও, অবশেষে তা টুকরা-টুকরা (খড়-কুটায়) পরিণত হয় এবং পরকালে রয়েছে কঠিন শাস্তি এবং আল্লাহর ক্ষমা ও সন্তুষ্টি। আর পার্থিব জীবন ছলনাময় ভোগ ব্যতীত কিছুই নয়। (হাদীদঃ ২০)

৫। ইসলাম মানুষকে সম্মান দিয়েছে। এমনকি মরণের পরেও তার যথাযোগ্য মর্যাদা রক্ষা করেছে। যথানিয়মে গোসল দিয়ে সুগন্ধময় কাফনে জড়িয়ে তার জন্য শুভ কামনা ও কল্যাণ প্রার্থনা করে সসম্মানে তার শেষ ঠিকানায় রেখে আসার নির্দেশ দিয়েছে। লাশের প্রতি অসম্মান করতে ও তার হাড্ডি ভাঙ্গতে নিষেধ করেছে। মৃতকে গালি দিতে নিষেধ করেছে। কবরের উপর বসতে নিষেধ করেছে। জুতো পায়ে কবরস্থানে চলতে বারণ করেছে। মৃতের সন্তানকে তার জন্য দুআ ও দান-খয়রাত করতে নির্দেশ দিয়েছে।

অবশ্য মৃতের সম্মানে বাড়াবাড়ি করতেও নিষেধ করেছে, যাতে পৌত্তলিকতার পরশ না লেগে বসে। বলা বাহুল্য, ফুল চড়ানো, চাদর চড়ানো, ধূপবাতি বা মোমবাতি জ্বালানো, তার সামনে প্রণতি জানানো ইত্যাদিতে ইসলামের অনুমোদন নেই।

📘 দ্বীনে ইসলামের সৌন্দর্য ও বৈশিষ্ট্য > 📄 ধন-সম্পদ বিষয়ে ইসলামের বৈশিষ্ট্য

📄 ধন-সম্পদ বিষয়ে ইসলামের বৈশিষ্ট্য


১। ইসলাম পরের ধন অবৈধ কোন উপায়ে গ্রহণ করতে নিষেধ করে। অসদুপায়ে উপার্জন করতে নিষেধ করে। মহান আল্লাহ বলেছেন, {يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ لاَ تَأْكُلُواْ أَمْوَالَكُمْ بَيْنَكُمْ بِالْبَاطِلِ إِلَّا أَن تَكُونَ تِجَارَةً عَن تَرَاضٍ মِّكُم وَلَا تَقْتُلُوا أَنفُসَكُمْ إِنَّ اللَّهَ كَانَ بِكُمْ رَحِيمًا} অর্থাৎ, হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা একে অন্যের সম্পত্তি অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না। তবে তোমাদের পরস্পর সম্মতিক্রমে ব্যবসার মাধ্যমে (গ্রহণ করলে তা বৈধ)। আর নিজেদেরকে হত্যা করো না; নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের প্রতি পরম দয়ালু। (নিসাঃ ২৯)

২। ইসলাম পার্থিব কোন স্বার্থে ঋণ দিতে নিষেধ করে, সূদ খেতে নিষেধ করে। মহান আল্লাহ বলেছেন, {الَّذِينَ يَأْكُلُونَ الرِّبَا لَا يَقُومُونَ إِلَّا كَمَا يَقُومُ الَّذِي يَتَخَبَّطُهُ الشَّيْطَانُ মִَ الْمَسِّ ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ قَالُوا إِنَّمَا الْبَيْعُ মִثْلُ الرِّبَا وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا فَمَن جَاءَهُ مَوْعِظَةٌ মِّ রَّبِّهِ فَانتَهَى فَلَهُ مَا سَلَفَ وَأَمْرُهُ إِلَى اللَّهِ وَمَنْ عَادَ فَأُوْلَئِكَ أَصْحَابُ النَّارِ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ} (২৭৫) সূরা বাকারা অর্থাৎ, যারা সূদ খায় তারা (কিয়ামতে) সেই ব্যক্তির মত দন্ডায়মান হবে, যাকে শয়তান স্পর্শ দ্বারা পাগল ক'রে দিয়েছে। তা এ জন্য যে তারা বলে, 'ব্যবসা তো সূদের মতই।' অথচ আল্লাহ ব্যবসাকে বৈধ ও সুদকে অবৈধ করেছেন। অতএব যার কাছে তার প্রতিপালকের উপদেশ এসেছে, তারপর সে (সূদ খাওয়া থেকে) বিরত হয়েছে, সুতরাং (নিষিদ্ধ হওয়ার পূর্বে) যা অতীত হয়েছে, তা তার (জন্য ক্ষমার্হ হবে), আর তার ব্যাপার আল্লাহর এখতিয়ারভুক্ত। কিন্তু যারা পুনরায় (সূদ খেতে) আরম্ভ করবে, তারাই দোযখবাসী; সেখানে তারা চিরকাল থাকবে। (বাক্বারাহঃ ২৭৫)

{يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَذَرُوا مَا بَقِيَ মִَ الرِّبَا إِن كُنتُم মُّؤْمِنِينَ (২৭৮) فَإِن لَّমْ تَفْعَلُوا فَأْذَنُوا بِحَرْبٍ মَِّ اللهِ وَرَسُولِهِ وَإِن تُبْتُمْ فَلَكُمْ رُؤُوسُ أَمْوَالِكُمْ لَا تَظْلِمُونَ وَلَا تُظْلَمُونَ} (২৭৯) سورة البقرة অর্থাৎ, হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সূদের যা বকেয়া আছে তা বর্জন কর; যদি তোমরা বিশ্বাসী হও। আর যদি তোমরা (সূদ বর্জন) না কর, তাহলে আল্লাহ ও তার রসূলের পক্ষ থেকে যুদ্ধ সুনিশ্চিত জানো। কিন্তু যদি তোমরা তওবা কর, তবে তোমাদের মূলধন তোমাদেরই। তোমরা কারো উপর অত্যাচার করবে না এবং নিজেরাও অত্যাচারিত হবে না। (বাক্বারাহঃ ২৭৮-২৭৯)

ইসলাম যেমন সুদ খেতে নিষেধ করে, তেমনি দিতেও নিষেধ করে এবং তার কোন প্রকার সহযোগিতা করাকেও হারাম ঘোষণা করে। আল্লাহর রসূল সুদখোর, সূদদাতা, সুদের লেখক এবং তার উভয় সাক্ষ্যদাতাকে অভিশাপ করেছেন। আর বলেছেন, "(পাপে) ওরা সকলেই সমান।” (মুসলিম ১৫৯৮নং)

তিনি আরো বলেছেন, “জেনেশুনে মানুষের মাত্র এক দিরহাম খাওয়া সূদ আল্লাহর নিকটে ৩৬ ব্যভিচার অপেক্ষা অধিক গুরুতর।” (আহমাদ ৫/৩৩৫, ত্বাবারানীর কাবীর ও আউসাত্ব, সহীহুল জামে' ৩৩৭৫নং) "সুদ খাওয়ায় রয়েছে ৭০ প্রকার পাপ। এর মধ্যে সবচেয়ে ছোট পাপ হল নিজ মায়ের সাথে ব্যভিচার করার মতো!” (ইবনে মাজাহ ২২৭৮, সহীহ ইবনে মাজাহ ১৮-৪৪নং)

৩। ইসলাম ঘুস দেওয়া-নেওয়াকে হারাম ঘোষণা করেছে। মহান আল্লাহ বলেছেন, {وَلَا تَأْكُلُواْ أَمْوَالَكُم بَيْنَكُم بِالْبَاطِلِ وَتُدْلُوا بِهَا إِلَى الْحُكَّامِ لِتَأْكُلُوا فَرِيقًا মِّ أَمْوَالَ النَّاسِ بِالإِثْمِ وَأَنتُمْ تَعْلَمُونَ} (১৮৮) سورة البقرة অর্থাৎ, তোমরা নিজেদের মধ্যে একে অন্যের ধন অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না এবং মানুষের ধন-সম্পদের কিয়দংশ জেনেশুনে অন্যায়ভাবে গ্রাস করার উদ্দেশ্যে বিচারকগণকে ঘুষ দিও না। (বাক্বারাহঃ ১৮৮) আল্লাহর রসূল ঘুষখোর, ঘুষদাতা (উভয়কেই) অভিশাপ করেছেন। (আবু দাউদ ৩৫৮০, তিরমিযী ১৩৩৭, ইবনে মাজাহ ২৩১৩, ইবনে হিব্বান, হাকেম ৪/১০২-১০৩, সহী আবু দাউদ ৩০৫৫নং)

৪। ইসলাম জুয়াকে অবৈধ ঘোষণা করেছে। মহান আল্লাহ বলেছেন, {يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْসِرُ وَالأَنصَابُ وَالْأَزْلَامُ رিجسٌ মِّ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ (৯০) إِنَّمَا يُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَن يُوقِعَ بَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةَ وَالْبَغْضَاء فِي الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ وَيَصُدَّكُمْ عَن ذِكْرِ اللَّهِ وَعَنِ الصَّلَاةِ فَهَلْ أَنتُم মُّنتَهُونَ) (৯১) سورة المائدة অর্থাৎ, হে বিশ্বাসিগণ! মদ, জুয়া, মূর্তিপূজার বেদী ও ভাগ্যনির্ণায়ক শর ঘৃণ্য বস্তু শয়তানের কাজ। সুতরাং তোমরা তা বর্জন কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার। শয়তান তো মদ ও জুয়া দ্বারা তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ ঘটাতে চায় এবং তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ ও নামাযে বাধা দিতে চায়! অতএব তোমরা কি নিবৃত্ত হবে না? (মায়িদাহঃ ৯০-৯১)

৫। ইসলাম অপরের মালকে চুরি করে নিতে হারাম ঘোষণা করেছে। এ ব্যাপারে তাকীদ করার জন্য চোরের হাত কেটে নিয়ে শাস্তি দিতে নির্দেশ দিয়েছে। মহান আল্লাহ বলেছেন, وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا جَزَاء بِمَا كَسَبَا نَكَالاً মِّ اللَّهِ وَاللَّهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ } (৩৮) سورة المائدة অর্থাৎ, চোর এবং চোরনীর হাত কেটে ফেলো, এ তাদের কৃতকর্মের ফল এবং আল্লাহর তরফ হতে শাস্তি। বস্তুতঃ আল্লাহ পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়। (মায়িদাহঃ ৩৮)

রাসূলুল্লাহ বলেছেন, “তোমরা এক অপরের প্রতি হিংসা করো না, কেনা-বেচাতে জিনিসের মূল্য বাড়িয়ে এক অপরকে ধোকা দিয়ো না, এক অপরের প্রতি শত্রুতা রেখো না, এক অপর থেকে (ঘৃণাভরে) মুখ ফিরায়ো না এবং এক অপরের (জিনিস) কেনা-বেচার উপর কেনা- বেচা করো না। আর হে আল্লাহর বান্দারা! তোমরা ভাই-ভাই হয়ে যাও। মুসলিম মুসলিমের ভাই। সে তার প্রতি যুলুম করবে না, তাকে তুচ্ছ ভাববে না এবং তাকে অসহায় অবস্থায় ছেড়ে দেবে না। আল্লাহভীতি এখানে রয়েছে। (তিনি নিজ বুকের দিকে ইঙ্গিত করে এ কথা তিনবার বললেন।) কোন মুসলিম ভাইকে তুচ্ছ ভাবা একটি মানুষের মন্দ হওয়ার জন্য যথেষ্ট। প্রত্যেক মুসলিমের রক্ত, মাল এবং তার মর্যাদা অপর মুসলিমের উপর হারাম।” (মুসলিম)

৬। এমনকি কুড়িয়ে পাওয়া মালেও কোন মুসলিমের অধিকার নেই। সে মাল তার মালিককে ফিরিয়ে দিতে নির্দেশ দেয় ইসলাম। মালিক জানা না থাকলে এক বছর তার ঘোষণা দিতে আদেশ করে। মহানবী বলেন, “মুমিনের হারিয়ে যাওয়া জিনিস দোযখের শিখা স্বরূপ।” (ত্বাবারানী, সিলসিলাহ সহীহাহ ৬২০নং) আল্লাহর নবী -কে হারিয়ে যাওয়া উটের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করে হলে তিনি বললেন, "তোমার সাথে তার সাথ কী? তার সঙ্গে তার পানীয় থাকে, জুতা থাকে। পানির জায়গায় এসে পানি খেয়ে এবং গাছপালা ভক্ষণ (করে বেঁচে থাকতে) পারে। পরিশেষে (খুঁজতে খুঁজতে) তার মালিক এসে তাকে পেয়ে যায়।” (বুখারী, মুসলিম)

৭। দেওয়ার সময় ওজনে বা মাপে কম এবং নেওয়ার সময় ওজনে বা মাপে বেশি নিতে বা দাঁড়ি মেরে লোককে ধোঁকা দিতে নিষেধ করেছে ইসলাম। মহান আল্লাহ বলেছেন, { وَلَا تَقْرَبُوا مَالَ الْيَتِيمِ إِلَّا بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ حَتَّى يَبْلُغَ أَشُدَّهُ وَأَوْفُوا الْكَيْلَ وَالْمِيزَانَ بِالْقِسْطِ ۖ لَا نُكَلِّفُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا ۖ وَإِذَا قُلْتُمْ فَاعْدِلُوا وَلَوْ كَانَ ذَا قُرْبَىٰ وَبِعَهْدِ اللَّهِ أَوْفُوا ۚ ذَٰلِكُمْ وَصَّاكُم بِهِ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّরُونَ } (১৫২) অর্থাৎ, পিতৃহীন বয়ঃপ্রাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত সৎ উদ্দেশ্য ছাড়া তার সম্পত্তির নিকটবর্তী হয়ো না এবং পরিমাপ ও ওজন ন্যায়ভাবে পুরাপুরি প্রদান কর। আমি কাউকেও তার সাধ্যাতীত ভার অর্পণ করি না। আর যখন তোমরা কথা বলবে, তখন স্বজনের বিরুদ্ধে হলেও ন্যায় কথা বল এবং আল্লাহকে প্রদত্ত অঙ্গীকার পূর্ণ কর। এভাবে আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন, যেন তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর। (আনআমঃ ১৫২)

{ وَأَوْفُوا الْكَيْلَ إِذَا كِلْتُمْ وَزِنُوا بِالْقِسْطَاسِ الْمُسْتَقِيمِ ۚ ذَٰلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلاً} (৩৫) سورة الإسراء অর্থাৎ, মেপে দেয়ার সময় পূর্ণরূপে মাপো এবং সঠিক দাঁড়ি-পাল্লায় ওজন কর, এটাই উত্তম ও পরিণামে উৎকৃষ্টতম। (বানী ইস্রাঈল: ৩৫)

{وَيْلٌ لِّلْمُطَفِّفِينَ (১) الَّذِينَ إِذَا اكْتَالُواْ عَلَى النَّاسِ يَسْتَوْفُونَ (২) وَإِذَا كَالُوهُمْ أَو وَّزَنُوهُمْ يُخْسِرُونَ (৩) أَلَا يَظُنُّ أُولَئِكَ أَنَّهُمْ مَبْعُوثُونَ (৪) لِيَوْمٍ عَظِيمٍ (৫) يَوْمَ يَقُومُ النَّاسُ لِرَبِّ الْعَالَمِينَ} (৬) المطففين অর্থাৎ, ধ্বংস তাদের জন্য যারা মাপে কম দেয়, যারা লোকের নিকট হতে মেপে নেওয়ার সময় পূর্ণ মাত্রায় গ্রহণ করে এবং যখন তাদের জন্য মেপে অথবা ওজন করে দেয়, তখন কম দেয়। তারা কি চিন্তা করে না যে, তাদেরকে পুনরুত্থিত করা হবে। এক মহা দিবসে; যেদিন দাঁড়াবে সমস্ত মানুষ বিশ্ব-জাহানের প্রতিপালকের সম্মুখে। (মুত্বাফফিফীন: ১-৬)

৮। ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রতারণা করতে নিষেধ করেছে ইসলাম। একদা আল্লাহর রসূল (ﷺ) (বাজারে) এক রাশীকৃত খাদ্য (শস্যের) কাছে গিয়ে তার ভিতরে হাত প্রবেশ করালেন। তিনি আঙ্গুল দ্বারা অনুভব করলেন যে, ভিতরের শস্য ভিজে আছে। বললেন, “ওহে ব্যাপারী! এ কী ব্যাপার?” ব্যাপারী বলল, 'হে আল্লাহর রসূল! বৃষ্টিতে ভিজে গেছে।' তিনি বললেন, “ভিজেগুলোকে শস্যের উপরে রাখলে না কেন, যাতে লোকে দেখতে পেত? যে আমাদেরকে ধোঁকা দেয়, সে আমার দলভুক্ত নয়।” (মুসলিম ১০২, ইবনে মাজাহ ২২২৪, তিরমিযী ১৩১৫, আবু দাউদ ৩৪৫২নং)

৯। ইসলামে যা হারাম, তার ব্যবসা হারাম। তার মাধ্যমে উপার্জন হারাম। মহানবী বলেন, আমাদের প্রিয় নবী কুকুরের মূল্য, বেশ্যাবৃত্তির কামাই ও গণকের উপার্জন গ্রহণ ও ভক্ষণ করতে নিষেধ করেছেন। (সহীহুল জামে' ৬৯৫১নং) তিনি বেশ্যাবৃত্তির মাধ্যমে কামানো অর্থকে ‘খাবীষ’ বা অপবিত্র বলেছেন। (সহীহুল জামে' ৩০৭৭নং) কখনো বলেছেন ঐ উপার্জন হল হারাম। (সহীহুল জামে' ৩০৭৬নং) তিনি বলেছেন, “বেশ্যাবৃত্তির অর্থ হালাল নয়।” (আবু দাউদ ৩৪২-৪নং) রাসূলুল্লাহ কুকুরের মূল্য, ব্যভিচারের বিনিময় এবং গণকের পারিতোষিক গ্রহণ করতে নিষেধ করেছেন। (বুখারী ও মুসলিম)

১০। ছোট-বড় ঋণ নেওয়া-দেওয়ার ক্ষেত্রে সূক্ষ্ম বিধান দিয়েছে ইসলাম। মহান আল্লাহ বলেছেন, {يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا تَدَايَنتُم بِدَيْنِ إِلَى أَجَلٍ মُّسَمًّى فَاكْتُبُوهُ وَلْيَكْتُব بَيْنَكُمْ كَاتِبٌ بِالْعَدْلِ وَلَا يَأْبَ كَاتِبٌ أَنْ يَكْتُبَ كَمَا عَلَّمَهُ اللَّهُ فَلْيَكْتُবْ وَلْيُمْلِل الَّذِي عَلَيْهِ الْحَقُّ وَلْيَتَّقِ اللهَ رَبَّهُ وَلَا يَبْخَسْ মִْهُ شَيْئاً فَإِن كَانَ الَّذِي عَلَيْهِ الْحَقُّ سَفِيهَا أَوْ ضَعِيفاً أَوْ لاَ يَسْتَطِيعُ أَن يُمِلَّ هُوَ فَلْيُمْلِلْ وَلِيُّهُ بِالْعَدْلِ وَاسْتَشْهِدُوا شَهِيدَيْنِ মִ رِّجَالِكُمْ فَإِن لَّمْ يَكُونَا رَجُلَيْنِ فَرَجُلٌ وَامْرَأَتَانِ মִমَّن تَرْضَوْنَ মִَ الشُّهَدَاء أَن تَضِلَّ إِحْدَاهُمَا فَتُذَكِّرَ إِحْدَاهُمَا الْأُخْرَى وَلَا يَأْبَ الشُّهَدَاء إِذَا مَا دُعُوا وَلاَ تَسْأَمُوا أَن تَكْتُبُوهُ صَغِيراً أَو كَبِيراً إِلَى أَجَلِهِ ذَلِكُمْ أَقْسَطُ عِندَ اللَّهِ وَأَقْومُ لِلشَّهَادَةِ وَأَدْنَى أَلا تَرْتَابُوا إِلَّا أَن تَكُونَ تِجَارَةً حَاضِرَةً تُدِيرُونَهَا بَيْنَكُمْ فَلَيْسَ عَلَيْكُمْ جُنَاحٌ أَلا تَكْتُبُوهَا وَأَشْهِدُوا إِذَا تَبَايَعْتُمْ وَلَا يُضَارَّ كَاتِبٌ وَلَا شَهِيدٌ وَإِن تَفْعَلُواْ فَإِنَّهُ فُسُوقٌ بِكُمْ وَاتَّقُوا اللَّهَ وَيُعَلِّمُكُمُ اللَّهُ وَاللَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ} البقرة ২৮২ অর্থাৎ, হে ঈমানদারগণ! তোমরা যখন নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য পরস্পর ঋণ দেওয়া-নেওয়া কর, তখন তা লিখে নাও। আর তোমাদের মধ্যে কোন লেখক যেন ন্যায়ভাবে তা লিখে দেয় এবং আল্লাহ যেরূপ শিক্ষা দিয়েছেন---সেইরূপ লিখতে কোন লেখক যেন অস্বীকার না করে। অতএব তার লিখে দেওয়াই উচিত। আর ঋণগ্রহীতা যেন লিখার বিষয় বলে দিয়ে লিখিয়ে নেয় এবং সে যেন স্বীয় প্রতিপালক আল্লাহকে ভয় করে এবং লেখার মধ্যে বিন্দুমাত্র কম-বেশী না করে। অনন্তর ঋণগ্রহীতা যদি নির্বোধ হয় কিংবা দুর্বল হয় অথবা নিজে লেখার বিষয়বস্তু বলে দিতে অক্ষম হয়, তাহলে তার অভিভাবক যেন ন্যায়সঙ্গতভাবে তা লেখায়। আর তোমাদের মধ্যে দু'জন পুরুষকে (এই আদান-প্রদানের) সাক্ষী কর। যদি দু'জন পুরুষ না পাও, তাহলে সাক্ষীদের মধ্যে যাদেরকে তোমরা পছন্দ কর তাদের মধ্য হতে একজন পুরুষ ও দু'জন মহিলাকে সাক্ষী কর; যাতে মহিলাদ্বয়ের একজন ভুলে গেলে যেন অন্য জন তাকে স্মরণ করিয়ে দেয়। আর যখন (সাক্ষ্য দিতে) ডাকা হয়, তখন যেন সাক্ষীরা অস্বীকার না করে। (ঋণ) ছোট হোক, বড় হোক, তোমরা মেয়াদসহ লিখতে কোনরূপ অলসতা করো না। এ লেখা আল্লাহর নিকট ন্যায্যতর ও সাক্ষ্য (প্রমাণের) জন্য দৃঢ়তর এবং তোমাদের মধ্যে সন্দেহ উদ্রেক না হওয়ার অধিক নিকটতর। কিন্তু তোমরা পরস্পরে ব্যবসায় যে নগদ আদান-প্রদান কর, তা না লিখলে কোন দোষ নেই। তোমরা যখন পরস্পর বেচা-কেনা কর, তখন সাক্ষী রাখ। আর কোন লেখক ও সাক্ষী যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। যদি তোমরা তাদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত কর, তাহলে তা হবে তোমাদের পক্ষে পাপের বিষয়। তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। আল্লাহ তোমাদেরকে শিক্ষা দেন। আর আল্লাহ সর্ববিষয়ে মহাজ্ঞানী। (বাক্বারাহঃ ২৮২)

১১। যথাসময়ে ঋণ পরিশোধ করতে আদেশ করে ইসলাম। পরিশোধে টাল-বাহানা করাকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে ইসলামে। আল্লাহর রসূল বলেন, “যে ব্যক্তি লোকের মাল (ঋণ) নিয়ে তা আদায় করার সংকল্প রাখে, সে ব্যক্তির তরফ থেকে আল্লাহ তা আদায় করে দেন। (অর্থাৎ পরিশোধের উপায় সহজ করে দেন।) আর যে ব্যক্তি আত্মসাৎ করার উদ্দেশ্য রেখে লোকেদের মাল গ্রহণ করে, আল্লাহ তাকে ধ্বংস করেন।" (বুখারী ২৩৮-৭, ইবনে মাজাহ ২৪১১নং) "ঋণ পরিশোধে সামর্থ্যবান ব্যক্তির টালবাহানা করা যুলুম। আর যখন কোন (ঋণদাতা) ব্যক্তিকে কোন ধনীর বরাত দেওয়া হয়, তখন সে যেন তার অনুসরণ করে।” (বুখারী ২২৮৮, মুসলিম ১৫৬৪নং, আসহাবে সুনান) "(ঋণ পরিশোধে) সক্ষম ব্যক্তির টালবাহানা করা তার সম্ভ্রম ও শাস্তিকে হালাল করে দেয়।” (আহমাদ ৪/২২২, আবু দাউদ ৩৬২৮, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ ২৪২৭, ইবনে হিব্বান ৫০৮৯, হাকেম ৪/১০২, সহীহুল জামে' ৫৪৮-৭নং)

১২। কেউ কারো সম্পদ নষ্ট করলে তার খেসারত দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে ইসলামে। মহান আল্লাহ বলেছেন, {فَمَنِ اعْتَدَى عَلَيْكُمْ فَاعْتَدُواْ عَلَيْهِ بِমִثْلِ مَا اعْتَدَى عَلَيْكُمْ وَاتَّقُوا اللَّهَ وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ مَعَ الْمُتَّقِينَ} (১৯৪) سورة البقرة অর্থাৎ, যে তোমাদেরকে আক্রমণ করবে, তোমরাও তাকে অনুরূপ আক্রমণ কর। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং জেনে রাখ যে, আল্লাহ সাবধানীদের সাথী। (বাক্বারাহঃ ১৯৪)

১৩। ধন-সম্পদ রক্ষার করার দায়িত্ব ও অধিকার আছে খোদ মালিকের। আর তার ফলে সে যদি খুন হয়ে যায়, তাহলে ইসলাম তাকে 'শহীদ'-এর মর্যাদা দেয়। রাসূলুল্লাহ বলেছেন, “যে ব্যক্তি তার ধন-সম্পদ রক্ষা করতে গিয়ে খুন হয়, সে শহীদ।” (বুখারী-মুসলিম)

১৪। অর্থ-সম্পদ অপচয় করতে নিষেধ করে ইসলাম। অপব্যয়কারীকে মহান আল্লাহ পছন্দ করেন না। মহান আল্লাহ বলেছেন, {وَآتِ ذَا الْقُرْبَى حَقَّهُ وَالْمِسْكِينَ وَابْنَ السَّبِيلِ وَلَا تُبَذِّرْ تَبْذِيرًا (২৬) إِنَّ الْمُبَذِّرِينَ كَانُوا إِخْوَانَ الشَّيَاطِينِ وَكَانَ الشَّيْطَانُ لِرَبِّهِ كَفُورًا} (২৭) অর্থাৎ, তুমি আত্মীয়-স্বজনকে তার প্রাপ্য প্রদান কর এবং অভাবগ্রস্ত ও মুসাফিরকেও। আর কিছুতেই অপব্যয় করো না। নিশ্চয় যারা অপব্যয় করে, তারা শয়তানের ভাই। আর শয়তান তার প্রতিপালকের প্রতি অতিশয় অকৃতজ্ঞ। (বানী ইস্রাঈল: ২৬-২৭) অবৈধ পথে অর্থ ব্যয় করা অথবা বৈধ পথে অপরিমিত ব্যয় করার নাম অপব্যয় করা।

মহান আল্লাহ বলেছেন, {يَا بَنِي آدَمَ খُذُوا زِينَتَكُمْ عِندَ كُلِّ مَسْجِدٍ وَكُلُوا وَاشْرَبُوا وَلَا تُسْرِفُوا إِنَّهُ لَا يُحبُّ الْمُسْرِفِينَ) (৩১) سورة الأعراف অর্থাৎ, হে আদমের বংশধরগণ! তোমরা প্রত্যেক নামাযের সময় সুন্দর পরিচ্ছদ পরিধান কর। পানাহার কর, কিন্তু অপচয় করো না। নিশ্চয় তিনি অপচয়কারীদেরকে পছন্দ করেন না। (আ'রাফঃ ৩১)

রাসূলুল্লাহ অহেতুক কথাবার্তা বলতে, ধন-সম্পদ বিনষ্ট করতে এবং অধিকাধিক প্রশ্ন করতে নিষেধ করতেন। আর তিনি মাতা-পিতার সাথে অবাধ্যাচরণ করতে, মেয়েদেরকে জীবন্ত প্রোথিত করতে এবং প্রাপকের নায্য অধিকার রোধ করতে ও অনধিকার বস্তু তলব করতেও নিষেধ করতেন। (বুখারী ও মুসলিম)

অবশ্য ব্যয়কুণ্ঠ হতেও নিষেধ করে ইসলাম। এ ব্যাপারেও ইসলাম মধ্যমপন্থাকে পছন্দ করে। মহান আল্লাহ বলেছেন, {وَلاَ تَجْعَلْ يَدَكَ مَغْلُولَةً إِلَى عُنُقِكَ وَلاَ تَبْسُطُهَا كُلَّ الْبَسْطِ فَتَقْعُدَ مَلُومًا مَّحْسُورًا) (২৯) سورة الإسراء অর্থাৎ, তুমি বদ্ধমুষ্টি হয়ো না এবং একেবারে মুক্ত হস্তও হয়ো না; হলে তুমি তিরস্কৃত ও নিঃস্ব হয়ে পড়বে। (বানী ইস্রাঈল: ২৯) তিনি ধনব্যয়ে মধ্যপন্থা অবলম্বনকারীর প্রশংসা করে বলেছেন, (পরম দয়াময়ের দাস তারা,) وَالَّذِينَ إِذَا أَنفَقُوا لَمْ يُسْرِفُوا وَلَمْ يَقْتُرُوا وَكَانَ بَيْنَ ذَلِكَ قَوَامًا} (৬৭) অর্থাৎ, যারা ব্যয় করলে অপচয় করে না, কার্পণ্যও করে না; বরং তারা এ দুইয়ের মধ্যবর্তী পন্থা অবলম্বন করে। (ফুরক্বানঃ ৬৭) পানভোজন ও বিলাস-ব্যসনেও মধ্যপন্থা অবলম্বন করতে আদেশ করে ইসলাম। মহানবী বলেন, "তোমরা যা ইচ্ছা তাই খাও এবং যেমন ইচ্ছা তেমনিই পর, তবে তাতে যেন দু'টি জিনিস না থাকে; অপচয় ও অহংকার।” (বুখারী, মিশকাত ৪৩৮০নং)

১৫। নষ্ট হবে অথবা অবৈধ পথে ব্যয় হবে---এই আশঙ্কায় নির্বোধ (শিশু বা পাগল)দের হাতে টাকা-পয়সা দিতে নিষেধ করেছে। মহান আল্লাহ বলেছেন, وَلَا تُؤْتُوا السُّفَهَاء أَمْوَالَكُمُ الَّتِي جَعَلَ اللَّهُ لَكُمْ قِيَاماً وَارْزُقُوهُمْ فِيهَا وَاكْسُوهُمْ وَقُولُوا لَهُمْ قَوْلاً مَّعْرُوفًا} (৫) سورة النساء অর্থাৎ, আর আল্লাহ তোমাদের সম্পদকে---যা তোমাদের উপজীবিকা (জীবনযাত্রার অবলম্বন) করেছেন---তা নির্বোধদের (হাতে) অর্পণ করো না। তা হতে তাদের খাওয়া-পরার ব্যবস্থা কর এবং তাদের সাথে মিষ্ট কথা বল। (নিসাঃ ৫) যেহেতু ধন-সম্পদ মহান আল্লাহর দান। তাই তা কেবল সেই পথে ব্যয় করতে হয়, যাতে তিনি সন্তুষ্ট ও সম্মত হন। তিনি বলেছেন, {آمِنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَأَنفِقُوا মִমَّا جَعَلَكُم মُّسْتَخْلَفِينَ فِيهِ فَالَّذِينَ آمَنُوا মִكُم وَأَنفَقُوا لَهُمْ أَجْرٌ كَبِيرٌ} (৭) সূরা হাদীদ অর্থাৎ, আল্লাহ ও তাঁর রসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর এবং আল্লাহ তোমাদেরকে যা কিছুর উত্তরাধিকারী করেছেন, তা হতে ব্যয় কর। তোমাদের মধ্যে যারা বিশ্বাস করে ও ব্যয় করে, তাদের জন্য আছে মহাপুরস্কার। (হাদীদঃ ৭)

১৬। ইসলাম মানুষকে উপার্জন করতে উদ্বুদ্ধ করে। মহান আল্লাহ বলেন, {هُوَ الَّذِي جَعَلَ لَكُمُ الْأَرْضَ ذَلُولًا فَامْشُوا فِي মَنَاكِبِهَا وَكُلُوا মִ রِّزْقِهِ وَإِلَيْهِ النُّشُورُ } (১৫) সূরা মুলক অর্থাৎ, তিনিই তো তোমাদের জন্য ভূমিকে সুগম ক'রে দিয়েছেন; অতএব তোমরা ওর দিক-দিগন্তে বিচরণ কর এবং তাঁর দেওয়া রুযী হতে আহার্য গ্রহণ কর। আর পুনরুত্থান তো তাঁরই নিকট। (মুল্ক: ১৫)

{فَإِذَا قُضِيَتِ الصَّلَاةُ فَانتَشِرُوا فِي الْأَرْضِ وَابْتَغُوا মִ فَضْلِ اللَّهِ وَاذْكُرُوا اللَّهَ كَثِيرًا لَّعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ } (১০) সূরা জুমু'আ অর্থাৎ, অতঃপর নামায সমাপ্ত হলে তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড় এবং আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধান কর ও আল্লাহকে অধিকরূপে স্মরণ কর; যাতে তোমরা সফলকাম হও। (জুমুআহঃ ১০)

১৭। স্বহস্তে উপার্জিত খাদ্য ভক্ষণ করতে উৎসাহিত করে ইসলাম। আল্লাহর রসূল বলেন, "স্বহস্তে উপার্জন করে যে খায়, তার চেয়ে উত্তম খাদ্য অন্য কেউ ভক্ষণ করে না। আল্লাহর নবী দাউদ স্বহস্তে উপার্জিত খাদ্য ভক্ষণ করতেন।” (বুখারী ২০৭২ নং) "তোমরা যে খাদ্য ভক্ষণ কর, তার মধ্যে সবচেয়ে উত্তম খাদ্য হল তোমাদের নিজের হাতে কামাই করা খাদ্য। আর তোমাদের সন্তানগণ তোমাদের উপার্জিত ধনের পর্যায়ভুক্ত।” (বুখারীর তারীখ, তিরমিযী, নাসাঈ, বাইহাক্বী, সহীহুল জামে' ১৫৬৬ নং)

১৮। ইসলাম ভিক্ষাবৃত্তি অবলম্বন করতে নিষেধ করে। চিৎ হস্তের লোককে অপছন্দ করে। প্রিয় নবী বলেন, “সর্বদা যাজ্ঞা করলে আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎকালে তার চেহারায় কোন মাংসপিন্ড থাকবে না।” (বুখারী ও মুসলিম) "যাঞ্চাকারী যদি যাজ্ঞায় কী শাস্তি আছে তা জানত, তাহলে সে যাঞ্চা করত না।” (সঃ তারগীব ৭৮৯নং) "অভাব না থাকা সত্ত্বেও যে যাচনা করে, কিয়ামতের দিন তার মুখমন্ডলে তা কলঙ্কের ছাপ হবে।” (ঐ ৭৯১নং) "যে ব্যক্তি দৈন্য না থাকা সত্ত্বেও চেয়ে খায়, সে যেন আঙ্গার খায়।" (ঐ ৭৯৩নং) “আল্লাহ নাছোড়-বান্দা হয়ে ভিক্ষাকারীকে ঘৃণা করেন।” (সহীহুল জামে ৮৭২নং) "বান্দা যাজ্ঞার দরজা খুললে আল্লাহ তার জন্য অভাবের দরজা খুলে দেন।” (ঐ ৩০২ ১নং) “তোমাদের মধ্যে কারো রশি নিয়ে কাঠ সংগ্রহ ক'রে পিঠে ক'রে বয়ে আনা, কোন লোকের কাছে এসে ভিক্ষা করার চেয়ে অনেক ভাল; চাহে সে দিক বা না দিক।” (বুখারী ও মুসলিম)

১৯। জীবনে বাঁচার জন্য ইসলাম হালাল উপার্জন করতে এবং হারাম উপার্জন থেকে দূরে থাকতে মুসলিমকে উদ্বুদ্ধ করে। মহান আল্লাহ নিজ রসূলগণকে বলেছেন, {يَا أَيُّهَا الرُّسُلُ كُلُوا মִَ الطَّيِّبَاتِ وَاعْمَلُوا صَالِحًا إِنِّي بِمَا تَعْمَلُونَ عَلِيمٌ} (৫১) সূরা মু'মিনূন অর্থাৎ, হে রসূলগণ! তোমরা পবিত্র বস্তু হতে আহার কর এবং সৎকর্ম কর; তোমরা যা কর, সে সম্বন্ধে আমি সবিশেষ অবগত। (মু'মিনূনঃ ৫১)

একই নির্দেশ করেছেন তাঁর প্রতি বিশ্বাসী মুসলিমদেরকে, {يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ كُلُوا মִ طَيِّبَاتِ مَا رَزَقْنَاكُمْ وَاشْكُرُوا لِلَّهِ إِن كُنتُمْ إِيَّاهُ تَعْبُدُونَ} (১৭২) সূরা আল-বাকারা অর্থাৎ, হে বিশ্বাসিগণ! আমি তোমাদেরকে যে রুযী দিয়েছি, তা থেকে পবিত্র বস্তু আহার কর এবং আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর; যদি তোমরা শুধু তাঁরই উপাসনা ক'রে থাক। (বাক্বারাহঃ ১৭২) মহানবী বলেন, তার দুআ কিভাবে কবুল হতে পারে, যে লম্বা সফর করে আলুথালু ধূলিমলিন বেশে নিজ হাত দু'টিকে আকাশের দিকে লম্বা করে তুলে দুআ করে বলে, 'হে আমার প্রতিপালক! হে আমার প্রভু!' কিন্তু তার আহার্য হারাম, তার পানীয় হারাম, তার পরিধেয় লেবাস হারাম এবং হারাম দ্বারাই তার পুষ্টিবিধান হয়েছে? (মুসলিম ১০১৫, তিরমিযী ২৯৮৯নং)

আল্লাহর রসূল একদা কা'ব বিন উজরার উদ্দেশ্যে বললেন, “হে কা'ব বিন উজরাহ! সে মাংস কোন দিন বেহেশ্ প্রবেশ করতে পারবে না, যার পুষ্টিসাধন হারাম খাদ্য দ্বারা করা হয়েছে।” (দারেমী ২৬৭৪ নং) “--- হে কা'ব বিন উজরাহ! যে মাংস হারাম খাদ্য দ্বারা প্রতিপালিত হবে, তার জন্য জাহান্নামই উপযুক্ত।” (সহীহ তিরমিযী ৫০১নং)

২০। উপার্জনে অক্ষম ব্যক্তিদের দায়ভার বহন করে ইসলাম। তার জন্য মুসলিমদেরকে সাদকাহ বা দান-খয়রাত করতে উৎসাহিত করেছে। দানের বিনিময়ে বহুগুণ প্রতিদান দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে। মহান আল্লাহ বলেছেন, {মَّثَلُ الَّذِينَ يُنفِقُونَ أَمْوَالَهُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ كَمَثَلِ حَبَّةٍ أَنبَتَتْ সَبْعَ سَنَابِلَ فِي كُلِّ سُنبُلَةٍ মِّئَةُ حَبَّةٍ وَاللَّهُ يُضَاعِفُ لِمَن يَشَاء وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ} (২৬১) অর্থাৎ, যারা আল্লাহর পথে ব্যয় করে, তাদের উপমা একটি শস্য- বীজের মত, যা থেকে সাতটি শীষ জন্মে, প্রতিটি শীষে থাকে একশত শস্য-দানা। আর আল্লাহ যার জন্য ইচ্ছা বহুগুণে বৃদ্ধি ক'রে দেন। আল্লাহ মহাদানশীল, মহাজ্ঞানী। (বাক্বারাহঃ ২৬১)

وَسَارِعُوا إِلَى مَغْفِرَةٍ মِّ رَّبِّكُمْ وَجَنَّةٍ عَرْضُهَا السَّمَاوَاتُ وَالْأَرْضُ أُعِدَّتْ لِلْمُتَّقِينَ (১৩৩) الَّذِينَ يُنفِقُونَ فِي السَّرَّاءِ وَالضَّرَّاءِ وَالْكَاظِمِينَ الْغَيْظَ وَالْعَافِينَ عَنِ النَّاسِ وَاللَّهُ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ} (১৩৪) سورة آل عمران অর্থাৎ, তোমরা প্রতিযোগিতা (ত্বরা) কর, তোমাদের প্রতিপালকের নিকট থেকে ক্ষমা এবং বেহেশ্বের জন্য, যার প্রস্থ আকাশ ও পৃথিবীর সমান, যা ধর্মভীরুদের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে। যারা সচ্ছল ও অসচ্ছল অবস্থায় দান করে, ক্রোধ সংবরণ করে এবং মানুষকে ক্ষমা ক'রে থাকে। আর আল্লাহ (বিশুদ্ধচিত্ত) সৎকর্মশীলদেরকে ভালবাসেন। (আলে ইমরানঃ ১৩৩-১৩৪) মহানবী বলেছেন, “যে ব্যক্তি (তার) বৈধ উপায়ে উপার্জিত অর্থ থেকে একটি খেজুর পরিমাণও কিছু দান করে---আর আল্লাহ তো বৈধ অর্থ ছাড়া অন্য কিছু গ্রহণই করেন না---সে ব্যক্তির ঐ দানকে আল্লাহ ডান হাতে গ্রহণ করেন। (অতঃপর তা ঐ ব্যক্তির জন্য লালন-পালন করেন;) পরিশেষে তা রহমানের করতলে বৃদ্ধিলাভ ক'রে পাহাড় থেকেও বড় হয়ে যায়। যেমন তোমাদের কেউ তার অশ্ব-শাবককে লালন-পালন ক'রে থাকে।” (বুখারী ১৪১০, মুসলিম ১০১৪নং, তিরমিযী, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ প্রভৃতি)

২১। বরং নির্দিষ্ট পরিমাণ পশুসম্পদ, ফসল, স্বর্ণ-রৌপ্য বা অর্থ থাকলে নির্দিষ্ট শর্তে নির্দিষ্ট পরিমাণ যাকাত ফরয করেছেন মহান সৃষ্টিকর্তা। আর তা হল ইসলামের তৃতীয় রুকন। তা আদায় না করলে মহাশাস্তির ঘোষণা রয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, {وَالَّذِينَ يَكْنِزُونَ الذَّهَبَ وَالْفِضَّةَ وَلَا يُنفِقُونَهَا فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَبَشِّرْهُم بِعَذَابٍ أَلِيمٍ (৩৪) يَوْمَ يُحْمَى عَلَيْهَا فِي نَارِ جَهَنَّمَ فَتُكْوَى بِهَا جِبَاهُهُمْ وَجُنوبُهُمْ وَظُهُورُهُمْ هَذَا مَا كَنَزْتُمْ لأَنفُسِكُمْ فَذُوقُوا مَا كُنتُمْ تَكْنِزُونَ} অর্থাৎ, যারা স্বর্ণ ও রৌপ্য জমা করে রাখে এবং তা আল্লাহর পথে ব্যয় করে না, তুমি তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সুসংবাদ শুনিয়ে দাও। যেদিন জাহান্নামের আগুনে ঐগুলোকে উত্তপ্ত করা হবে। অতঃপর তা দিয়ে তাদের ললাট, পার্শ্বদেশ ও পৃষ্ঠদেশ দাগা হবে, (আর বলা হবে,) 'এ হচ্ছে তাই যা তোমরা নিজেদের জন্য সঞ্চয় করে রেখেছিলে। সুতরাং এখন নিজেদের সঞ্চিত জিনিসের স্বাদ গ্রহণ কর।' (তাওবাহঃ ৩৪-৩৫)

২২। যা হারাম, তা স্পষ্ট করেছে ইসলাম। যা হালাল তাও স্পষ্ট আছে। কিন্তু কিছু এমন জিনিস আছে, যা অস্পষ্ট ও সন্দিগ্ধ। এ ব্যাপারে ইসলামের বিধান হল, “হালাল স্পষ্ট, হারামও স্পষ্ট। আর উভয়ের মাঝে রয়েছে কিছু সন্ধিগ্ধ বিষয়-বস্তু। যে ব্যক্তি কোন সন্ধিগ্ধ পাপকে বর্জন করবে, সে তো (সন্দেহহীন) স্পষ্ট পাপকে অধিকরূপে বর্জন করবে। আর যে ব্যক্তি সন্ধিগ্ধ কিছু করার দুঃসাহস করবে, সে ব্যক্তি অদূরেই স্পষ্ট পাপেও আপতিত হয়ে যাবে। পাপ আল্লাহর সংরক্ষিত চারণভূমি। যে ঐ চারণভূমির ধারে-পাশে চরবে সে অদূরে সম্ভবতঃ তার ভিতরেও চরতে শুরু করে দেবে।” (বুখারী ও মুসলিম) “যা তোমাকে সন্দেহে ফেলে তা বর্জন করে যা সন্দেহে ফেলে না তা গ্রহণ কর। যেহেতু সত্যবাদিতা প্রশান্তি এবং মিথ্যাবাদিতা সংশয় (সৃষ্টি করে)।” (তিরমিযী, নাসাঈ)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00