📄 নারী-কল্যাণ বিষয়ে ইসলামের বৈশিষ্ট্য
১। ইসলাম নারীকে তার যথার্থ মর্যাদা ও অধিকার প্রদান করেছে। মহান আল্লাহ বলেছেন, {وَلَا تَتَمَنَّوْا مَا فَضَّلَ اللهُ بِهِ بَعْضَكُمْ عَلَى بَعْضٍ لِّرِّجَالِ نَصِيبٌ مِّمَّا اكْتَسَبُوا وَلِلنِّسَاءِ نَصِيبٌ مِّمَّا اكْتَسَبْنَ وَاسْأَلُواْ اللّهَ مِن فَضْلِهِ إِنَّ اللَّهَ كَانَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمًا} (৩২) সূরা আন-নিসা অর্থাৎ, যা দিয়ে আল্লাহ তোমাদের কাউকেও কারোর উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন, তোমরা তার লালসা করো না। পুরুষগণ যা অর্জন করে, তা তাদের প্রাপ্য অংশ এবং নারীগণ যা অর্জন করে, তা তাদের প্রাপ্য অংশ। তোমরা আল্লাহর কাছে তাঁর অনুগ্রহ প্রার্থনা কর। নিশ্চয় আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বজ্ঞ। (নিসাঃ ৩২)
২। মায়ের পায়ের তলায় পুরুষের বেহেস্ত নির্ধারণ করেছে। মহানবী ﷺ বলেছেন, “তুমি মায়ের খিদমতে অবিচল থাক। কারণ, তাঁর পদতলে তোমার জান্নাত রয়েছে।” (ইবনে মাজাহ, সহীহ নাসাঈ ২৯০৮নং)
৩। স্ত্রীকে স্বামীর লেবাস বলে মর্যাদা দিয়েছে। মহান আল্লাহ বলেছেন, {هُنَّ لِبَاسٌ لَّكُمْ وَأَنتُمْ لِبَاسٌ لَّهُنَّ} (১৮৭) সূরা আল-বাক্বারা অর্থাৎ, তারা তোমাদের পোশাক এবং তোমরা তাদের পোশাক। (বাক্বারাহঃ ১৮৭)
৪। কন্যাকে মানুষের জন্য দোযখের পর্দা ও আবরণ নির্ধারণ করেছে। মহানবী বলেছেন, “যে ব্যক্তি এই একাধিক কন্যা নিয়ে সঙ্কটাপন্ন হবে, অতঃপর সে তাদের প্রতি যথার্থ সদ্ব্যবহার করবে, সেই ব্যক্তির জন্য ঐ কন্যারা জাহান্নাম থেকে অন্তরাল (পর্দা) স্বরূপ হবে।” (বুখারী ১৪১৮ নং, মুসলিম ২৬২৯ নং)
তিনি আরো বলেছেন, “যে ব্যক্তি দুটি অথবা তিনটি কন্যা, কিংবা দুটি অথবা তিনটি বোন তাদের মৃত্যু অথবা বিবাহ, অথবা সাবালিকা হওয়া পর্যন্ত, কিংবা ঐ ব্যক্তির মৃত্যু পর্যন্ত যথার্থ প্রতিপালন করে, সে ব্যক্তি আর আমি (পরকালে) তর্জনী ও মধ্যমা অঙ্গুলিদ্বয়ের মত পাশাপাশি অবস্থান করব।” (আহমাদ ৩/১৪৭-১৪৮, ইবনে হিব্বান ২০৪৫ নং, সিলসিলাহ সহীহাহ ২৯৬ নং)
৫। বিধবা ও তালাকপ্রাপ্তার জন্য পুনর্বিবাহ বৈধ করেছে। মহান আল্লাহ বলেছেন, {وَأَنكِحُوا الْأَيَامَى مِنكُمْ وَالصَّالِحِينَ مِنْ عِبَادِكُمْ وَإِمَائِكُمْ إِن يَكُونُوا فُقَرَاء يُغْنِهِمُ اللَّهُ مِن فَضْلِهِ وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ) (৩২) سورة النور অর্থাৎ, তোমাদের মধ্যে যাদের স্বামী-স্ত্রী নেই, তাদের বিবাহ সম্পাদন কর এবং তোমাদের দাস-দাসীদের মধ্যে যারা সৎ, তাদেরও। তারা অভাবগ্রস্ত হলে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে অভাবমুক্ত ক'রে দেবেন। আর আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ। (নূরঃ ৩২)
৬। সকল ক্ষেত্রে নারীর ভরণ-পোষণের দায়িত্ব পুরুষের উপর ন্যস্ত করেছে। নারী সৃষ্টিগতভাবে দুর্বল বলেই পুরুষকেই তার কর্তা নির্বাচন করেছে। মহান আল্লাহ বলেছেন, {الرِّجَالُ قَوَّامُونَ عَلَى النِّسَاء بِمَا فَضَّلَ اللَّهُ بَعْضَهُمْ عَلَى بَعْضٍ وَبِمَا أَنفَقُوا مِنْ أَمْوَالِهِمْ} (৩৪) سورة النساء অর্থাৎ, পুরুষ নারীর কর্তা। কারণ, আল্লাহ তাদের এককে অপরের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন এবং এ জন্য যে পুরুষ (তাদের জন্য) ধন ব্যয় করে। (নিসাঃ ৩৪)
{وَلَهُنَّ মִثْلُ الَّذِي عَلَيْهِنَّ بِالْمَعْرُوفِ وَلِلرِّجَالِ عَلَيْهِنَّ دَرَجَةٌ وَاللَّهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ} (২২৮) سورة البقرة অর্থাৎ, নারীদের তেমনি ন্যায়-সঙ্গত অধিকার আছে যেমন আছে তাদের উপর পুরুষদের। কিন্তু নারীদের উপর পুরুষদের কিছুটা মর্যাদা আছে। আল্লাহ মহাপরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। (বাক্বারাহঃ ২২৮)
৭। নারী পুরুষের কাছে অবহেলিতা ছিল। কন্যা-সন্তান অবাঞ্ছনীয় ছিল। তাই তাকে ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরে হত্যা করা হতো, মাটিতে পুঁতে ফেলা হতো, কন্যার জনক হওয়াটা অপমানজনক ভাবা হতো। ইসলাম এ সবকে অন্যায় ঘোষণা করে কন্যার মর্যাদা রক্ষা করেছে। কন্যা-ঘাতকরা রক্ষা পাবে না। {وَإِذَا الْمَوْؤُودَةُ سُئِلَتْ (৮) بِأَيِّ ذَنبٍ قُتِلَتْ} (৯) التكوير অর্থাৎ, যখন জীবন্ত-প্রোথিত কন্যাকে জিজ্ঞেস করা হবে, কোন্ অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল? (তাকভীরঃ ৮-৯)
কন্যা-সন্তানের ব্যাপারে মানুষের মন ও মানসিকতা এমন ছিল যে, وَإِذَا بُشِّرَ أَحَدُهُمْ بِالأُنثَى ظَلَّ وَجْهُهُ مُسْوَدّاً وَهُوَ كَظِيمٌ (৫৮) يَتَوارَى مِنَ الْقَوْمِ مِن سُوءِ مَا بُشِّرَ بِهِ أَيُمْسِكُهُ عَلَى هُونٍ أَمْ يَدُسُّهُ فِي التَّرَابِ أَلَا سَاءَ مَا يَحْكُمُونَ} (৫৯) النحل অর্থাৎ, যখন তাদের কাউকে কন্যা-সন্তানের সুসংবাদ দেওয়া হয়, তখন তার মুখমন্ডল কালো হয়ে যায় এবং সে অসহনীয় মনস্তাপে ক্লিষ্ট হয়। তাকে যে সংবাদ দেওয়া হয়, তার গ্লানি হেতু সে নিজ সম্প্রদায় হতে আত্মগোপন করে; সে চিন্তা করে যে, হীনতা সত্ত্বেও সে তাকে রেখে দেবে, না মাটিতে পুঁতে দেবে। সাবধান! তারা যা সিদ্ধান্ত করে, তা কতই না নিকৃষ্ট। (নাহল: ৫৮-৫৯)
৮। আধুনিক জাহেলিয়াতেও নারী অবহেলিতা ও বঞ্চিতা। বিশেষ করে পণ ও যৌতুক প্রথার বিষাক্ত পরিবেশে সমাজের মন যেন গাইছে, 'কন্যা ঘরের আবর্জনা, পয়সা দিয়ে ফেলতে হয়, রক্ষণীয়া পালনীয়া শিক্ষণীয়া আদৌ নয়।' কিন্তু ইসলাম নারীর মর্যাদা দিয়েছে। পণ-যৌতুক গ্রহণ করতে নয়, বরং মোহর প্রদান করে বিবাহ করতে আদেশ করা হয়েছে পুরুষকে। মহান আল্লাহ বলেছেন, وَأُحِلَّ لَكُم মَّا وَرَاء ذَلِكُمْ أَن تَبْتَغُوا بِأَمْوَالِكُم مُّحْصِنِينَ غَيْرَ مُسَافِحِينَ فَمَا اسْتَمْتَعْتُم بِهِ مِنْهُنَّ فَآتُوهُنَّ أُجُورَهُنَّ فَرِيضَة} (২৪) سورة النساء অর্থাৎ, নারীদের মধ্যে তোমাদের অধিকারভুক্ত দাসী ব্যতীত সকল সধবা তোমাদের জন্য নিষিদ্ধ, তোমাদের জন্য এ হল আল্লাহর বিধান। উল্লিখিত নারীগণ ব্যতীত আর সকলকে বিবাহ করা তোমাদের জন্য বৈধ করা হল; এই শর্তে যে, তোমরা তাদেরকে নিজ সম্পদের বিনিময়ে বিবাহের মাধ্যমে গ্রহণ করবে, অবৈধ যৌন-সম্পর্কের মাধ্যমে নয়। অতঃপর তোমরা তাদের মধ্যে যাদের (মাধ্যমে দাম্পত্যসুখ) উপভোগ করবে, তাদেরকে নির্ধারিত মোহর অর্পণ কর। (নিসাঃ ২৪)
৯। কামুকদের কামনা, লম্পটদের লাম্পট্য ও ইভটিজারদের ইভটিজিং থেকে নারীকে মুক্তি দিতে ইসলাম পর্দার বিধান দিয়েছে। সম্ভ্রান্ত মহিলার পরিচয় দিতে নারীকে 'হিজাব' ব্যবহার করতে বলা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেছেন, يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ قُل لِّأَزْوَاجِكَ وَبَنَاتِكَ وَنِسَاء الْمُؤْمِنِينَ يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ মִ جَلَابِيبِهِنَّ ذَلِكَ أَدْنَى أَن يُعْرَفْنَ فَلَا يُؤْذَيْنَ وَكَانَ اللَّهُ غَفُوراً رَّحِيمًا} অর্থাৎ, হে নবী! তুমি তোমার স্ত্রীগণকে, কন্যাগণকে ও বিশ্বাসীদের রমণীগণকে বল, তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দংশ নিজেদের (মুখমন্ডলের) উপর টেনে দেয়। এতে তাদেরকে চেনা সহজতর হবে; ফলে তাদেরকে উত্ত্যক্ত করা হবে না। আর আল্লাহ চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (আহযাবঃ ৫৯)
১০। নারীর নিরাপত্তার স্বার্থেই পরপুরুষের সাথে বিশেষ পদ্ধতিতে বাক্যালাপ করার বিধান দিয়েছে ইসলাম। মহান আল্লাহ বলেছেন, يَا نِسَاءِ النَّبِيِّ لَسْتُنَّ كَأَحَدٍ مِّنَ النِّسَاء إِنِ اتَّقَيْتُنَّ فَلَا تَخْضَعْنَ بِالْقَوْلِ فَيَطْمَعَ الَّذِي فِي قَلْبِهِ مَرَضٌ وَقُلْنَ قَوْلاً مَّعْرُوفاً} الأحزاب ৩২ অর্থাৎ, হে নবী-পত্নীগণ! তোমরা অন্য নারীদের মত নও; যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, তবে পরপুরুষের সাথে কোমল কণ্ঠে এমনভাবে কথা বলো না, যাতে অন্তরে যার ব্যাধি আছে সে প্রলুব্ধ হয়। আর তোমরা সদালাপ কর। (স্বাভাবিকভাবে কথা বল।) (আহযাবঃ ৩২)
উক্ত আয়াতে সম্বোধন যদিও নবী-পত্নীগণকে করা হয়েছে, তবুও তার বিধান প্রত্যেক মুসলিম নারীর জন্য। যেহেতু উক্ত বিধান পালনের ব্যাপারে তাঁদের তুলনায় এদের প্রয়োজনীয়তা বেশি।
১১। একই কারণে নারী-পুরুষ উভয়কেই চক্ষু অবনত করার বিধান দিয়েছে। যার দিকে সকাম দৃষ্টিপাত ক্ষতিকর হতে পারে, তার দিকে দৃষ্টিপাত নিষেধ করেছে। মহান আল্লাহ বলেছেন, {قُل لِّلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا মִ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ ذَلِكَ أَزْكَى لَهُمْ إِنَّ اللَّهُ خَبِيرٌ بِما يَصْنَعُونَ (৩০) وَقُل لِّلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ মִ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ মִهْهَا وَلْيَضْرِبْنَ بِخُمُرِهِنَّ عَلَى جُيُوبِهِنَّ ....) (৩১) سورة النور অর্থাৎ, বিশ্বাসীদেরকে বল, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত করে এবং তাদের যৌন অঙ্গকে সাবধানে সংযত রাখে; এটিই তাদের জন্য অধিকতর পবিত্র। ওরা যা করে, নিশ্চয় আল্লাহ সে বিষয়ে অবহিত। বিশ্বাসী নারীদেরকে বল, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত করে ও তাদের লজ্জাস্থান রক্ষা করে। তারা যা সাধারণতঃ প্রকাশ থাকে তা ব্যতীত তাদের সৌন্দর্য যেন প্রদর্শন না করে, তারা তাদের বক্ষঃস্থল যেন মাথার কাপড় দ্বারা আবৃত রাখে। (নূর: ৩০-৩১)
মহানবী বলেন, "একবার নজর পড়ে গেলে আর দ্বিতীয়বার তাকিয়ে দেখো না। প্রথমবারের (অনিচ্ছাকৃত) নজর তোমার জন্য বৈধ। কিন্তু দ্বিতীয়বারের নজর বৈধ নয়। (আহমাদ, আবু দাউদ, তিরমিযী, হাকেম, সহীহুল জামে' ৭৯৫৩ নং)
১২। একই কারণে মহিলাকে এমনভাবে চলাফেরা করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে পর-পুরুষের মনে আকর্ষণ সৃষ্টি না করে। মহান আল্লাহ বলেছেন, {وَلَا يَضْرِبْنَ بِأَرْجُلِهِنَّ لِيُعْلَمَ مَا يُخْفِينَ মִ زِينَتِهِنَّ وَتُوبُوا إِلَى اللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَا الْمُؤْمِنُونَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ) (৩১) سورة النور অর্থাৎ, তারা যেন এমন সজোরে পদক্ষেপ না করে, যাতে তাদের গোপন আভরণ প্রকাশ পেয়ে যায়। হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা সকলে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার। (নূর: ৩১)
মহানবী বলেছেন, "প্রত্যেক চক্ষুই ব্যভিচারী। আর মহিলা যদি (কোন প্রকার) সুগন্ধ ব্যবহার করে কোন (পুরুষদের) মজলিসের পাশ দিয়ে অতিক্রম করে, তবে সে ব্যভিচারিণী (বেশ্যার মেয়ে)।” (আবু দাউদ, তিরমিযী, নাসাঈ, ইবনে হিব্বান, ইবনে খুযাইমাহ, হাকেম, সহীহুল জামে' ৪৫৪০নং)
১৩। নারীর আবেগ নিয়ে যাতে কেউ খেলতে না পারে, নারীর অনভিজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে যাতে কেউ তাকে প্রবঞ্চিতা ও প্রতারিতা না করতে পারে, তার জন্য তার বিবাহে অভিভাবকের অনুমতি আবশ্যক করেছে। মহানবী বলেন, أَيُّمَا امْرَأَة نَكَحَت نَفْسَهَا بِغَيْر إِذن وَلِيَّهَا فَنِكَاحُهَا بَاطِلٌ فنكاحها بَاطِل فنكاحها باطل). অর্থাৎ, মহানবী বলেন, “যে নারী তার অভিভাবকের অনুমতি ছাড়াই নিজে নিজে বিবাহ করে, তার বিবাহ বাতিল, বাতিল, বাতিল।" (আহমাদ, আবু দাউদ, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ, দারেমী, মিশকাত ৩১৩১ নং)
অবশ্য নারীর সম্মতিকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, তার সম্মতি না নিয়ে জোর করে কারো সাথে বিবাহকে অবৈধ করা হয়েছে। যেমন অপছন্দনীয় কারো সাথে বিবাহ হলে তাকে তালাক নেওয়ার অধিকারও দেওয়া হয়েছে।
১৪। নারীর স্বার্থেই একাধিক বিবাহ বৈধ করেছে ইসলাম। তার কোন ত্রুটির কারণে স্বামী তাকে বর্জন করলে তার দুর্দিন আসে, পুরুষের তুলনায় নারীর সংখ্যা বেশি হলে বহু নারী অবিবাহিতা থেকে যায়, স্ত্রী যৌন-মিলনে অক্ষম বা শীতল হলে স্বামী পরকীয়ার প্রেমে পড়ে, আরো কত কী। কিন্তু একাধিক বিবাহ করার সুযোগ সৃষ্টি করে দিলে বৈধভাবে স্বামীও খোশ হয়, স্ত্রীও স্ত্রী থাকে। তবে তাতে শর্ত হল পুরুষকে স্ত্রীদের মাঝে ন্যায়পরায়ণতা বজায় রাখতে হবে। নচেৎ একাধিক বিবাহ বৈধ নয়। মহান আল্লাহ বলেছেন, وَإِنْ خِفْتُمْ أَلا تُقْسِطُواْ فِي الْيَتَامَى فَانكِحُوا مَا طَابَ لَكُم মِّ النِّسَاءِ مَثْنَى وَثُلَاثَ وَرُبَاعَ فَإِنْ خِفْتُمْ أَلا تَعْدِلُوا فَوَاحِدَةً أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ ذَلِكَ أَدْنَى أَلا تَعُولُوا} (৩) سورة النساء অর্থাৎ, আর তোমরা যদি আশংকা কর যে, পিতৃহীনাদের প্রতি সুবিচার করতে পারবে না, তবে বিবাহ কর (স্বাধীন) নারীদের মধ্যে যাকে তোমাদের ভাল লাগে; দুই, তিন অথবা চার। আর যদি আশংকা কর যে, সুবিচার করতে পারবে না, তবে একজনকে (বিবাহ কর) অথবা তোমাদের অধিকারভুক্ত (ক্রীত অথবা যুদ্ধবন্দিনী) দাসীকে (স্ত্রীরূপে ব্যবহার কর)। এটাই তোমাদের পক্ষপাতিত্ব না করার অধিকতর নিকটবর্তী। (নিসাঃ ৩) যেমন এমার্জেন্সী গেটের মতো তালাক (বিবাহ-বিচ্ছেদ) কেও বৈধতা দান করেছে ইসলাম।
১৫। জাহেলী যুগে নারীই এক প্রকার মীরাসের সম্পত্তি ছিল। তাকে মীরাস থেকে বঞ্চিত করা হতো। ইসলাম তাকে তার প্রাপ্য হক প্রদান করেছে। কখনো পুরুষের অর্ধেক, কখনো পুরুষের সমান। আল- কুরআনের সূরা নিসায় তার বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে।
১৬। স্বামীর কাছে স্ত্রীর মর্যাদা নিয়ে সমান ব্যবহার পাওয়া অধিকারিণী করেছে নারীকে। মহান আল্লাহ বলেছেন, وَلَهُنَّ মִثْلُ الَّذِي عَلَيْهِنَّ بِالْمَعْرُوفِ وَلِلرِّجَالِ عَلَيْهِنَّ دَرَجَةٌ وَاللَّهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ} (২২৮) سورة البقرة অর্থাৎ, নারীদের তেমনি ন্যায়-সঙ্গত অধিকার আছে যেমন আছে তাদের উপর পুরুষদের। কিন্তু নারীদের উপর পুরুষদের কিছুটা মর্যাদা আছে। আল্লাহ মহাপরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। (বাক্বারাহঃ ২২৮)
{وَوعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ فَإِن كَرِهْتُمُوهُنَّ فَعَسَى أَن تَكْرَهُوا شَيْئًا وَيَجْعَلَ اللَّهُ فِيهِ خَيْرًا كَثِيرًا} (১৯) سورة النساء অর্থাৎ, তাদের সাথে সৎভাবে জীবন যাপন কর; তোমরা যদি তাদেরকে ঘৃণা কর, তাহলে এমন হতে পারে যে, আল্লাহ যাতে প্রভূত কল্যাণ রেখেছেন, তোমরা তাকে ঘৃণা করছ। (নিসাঃ ১৯)
১৭। মহান আল্লাহর কাছে আনুগত্যের প্রতিদানে নারীকেও পুরুষের সমান করা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেছেন, {إِنَّ الْمُسْلِمِينَ وَالْمُسْلِمَاتِ وَالْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ وَالْقَانِتِينَ وَالْقَانِتَاتِ وَالصَّادِقِينَ وَالصَّادِقَاتِ وَالصَّابِرِينَ وَالصَّابِرَاتِ وَالْخَاشِعِينَ وَالْخَاشِعَاتِ وَالْمُتَصَدِّقِينَ وَالْمُتَصَدِّقَاتِ وَالصَّائِمِينَ وَالصَّائِمَاتِ وَالْحَافِظِينَ فُرُوجَهُمْ وَالْحَافِظَاتِ وَالذَّاكِرِينَ اللَّهَ كَثِيراً وَالذَّاكِرَاتِ أَعَدَّ اللَّهُ لَهُم মَّغْفِرَةً وَأَجْراً عظِيماً} الأحزاب ৩৫ অর্থাৎ, নিশ্চয়ই আত্মসমর্পণকারী (মুসলিম) পুরুষ ও আত্মসমর্পণকারী (মুসলিম) নারী, বিশ্বাসী পুরুষ ও বিশ্বাসী নারী, অনুগত পুরুষ ও অনুগত নারী, সত্যবাদী পুরুষ ও সত্যবাদী নারী, ধৈর্যশীল পুরুষ ও ধৈর্যশীল নারী, বিনীত পুরুষ ও বিনীত নারী, দানশীল পুরুষ ও দানশীল নারী, রোযা পালনকারী পুরুষ ও রোযা পালনকারী নারী, যৌনাঙ্গ হিফাযতকারী (সংযমী) পুরুষ ও যৌনাঙ্গ হিফাযতকারী (সংযমী) নারী, আল্লাহকে অধিক স্মরণকারী পুরুষ ও আল্লাহকে অধিক স্মরণকারী নারী---এদের জন্য আল্লাহ ক্ষমা ও মহাপ্রতিদান রেখেছেন। (আহযাবঃ ৩৫)
{فَاسْتَجَابَ لَهُمْ رَبُّهُمْ أَنِّي لَا أُضِيعُ عَمَلَ عَامِلٍ মِّكُم مِّ ذَكَرٍ أَوْ أُنثَى بَعْضُكُم মِّ بَعْضٍ} آل عمران ১৯৫ অর্থাৎ, অতঃপর তাদের প্রতিপালক তাদের ডাকে সাড়া দিয়ে বলেন, আমি তোমাদের মধ্যে কোন কর্মনিষ্ঠ নর অথবা নারীর কর্ম বিফল করি না; তোমরা পরস্পর সমান। (আলে ইমরানঃ ১৯৫)
{وَمَن يَعْمَلْ মִ الصَّالِحَاتِ মִ ذَكَرٍ أَوْ أُنثَى وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَأُوْلَئِكَ يَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ وَلَا يُظْلَمُونَ نَقِيراً النساء ১২৪ অর্থাৎ, আর পুরুষই হোক অথবা নারীই হোক, যারাই বিশ্বাসী হয়ে সৎকাজ করবে, তারাই জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং তাদের প্রতি (খেজুরের আঁটির পিঠে) বিন্দু পরিমাণও যুলুম করা হবে না। (নিসাঃ ১২৪)
পক্ষান্তরে যেখানে নারীকে পুরুষের সমানাধিকার দেওয়া হয়নি, যেমন পিতার ওয়ারেস হওয়ার ক্ষেত্রে, একই সময়ে একাধিক স্বামী রাখার ক্ষেত্রে ইত্যাদি, সেখানে সৃষ্টিকর্তার মহা কৌশল ও ইসলামের হিকমতপূর্ণ যৌক্তিকতা আছে। জ্ঞানিগণ জ্ঞান-গবেষণা করলেই সহজে বুঝতে পারবেন, তাতে আসলে নারীর মর্যাদা আদৌ ক্ষুণ্ণ করা হয়নি।
📄 আম অধিকারে ইসলামের বৈশিষ্ট্য
১। ইসলাম প্রত্যেক মানুষকে তার স্বাধিকার প্রদান করতে উদ্বুদ্ধ করে। শুধু মানুষই নয়, জীব-জন্তু ও উদ্ভিদের অধিকার সম্বন্ধেও উদাসীন নয় ইসলাম। অধিকারীর অধিকার লংঘন করতে নিষেধ করেছে ইসলাম। মহান আল্লাহ বলেন, {وَلَا تَعْتَدُوا إِنَّ اللَّهَ لاَ يُحِبُّ الْمُعْتَدِينَ} (১৯০) البقرة والمائدة ৮৭ অর্থাৎ, বাড়াবাড়ি (সীমালংঘন) করো না, নিশ্চয় আল্লাহ বাড়াবাড়িকারীদেরকে পছন্দ করেন না। (বাক্বারাহঃ ১৯০, মায়িদাহঃ ৮৭)
পশুর প্রতি দয়াপ্রদর্শনে পুরস্কার রেখেছে ইসলাম। রসূল বলেন, “এক ব্যক্তি এক কুয়ার নিকটবর্তী হয়ে তাতে অবতরণ করে পানি পান করল। অতঃপর উঠে দেখল, কুয়ার পাশে একটি কুকুর (পিপাসায়) জিহ্বা বের করে হাঁপাচ্ছে। তার প্রতি লোকটির দয়া হল। সে তার পায়ের একটি (চর্মনির্মিত) মোজা খুলে (কুয়াতে নেমে তাতে পানি ভরে এনে) কুকুরটিকে পান করাল। ফলে আল্লাহ তার এই কাজের প্রতিদান স্বরূপ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করালেন।" লোকেরা বলল, 'হে আল্লাহর রসূল! জীব-জন্তর প্রতি দয়াপ্রদর্শনেও কি আমাদের সওয়াব আছে? তিনি বললেন, “প্রত্যেক সজীব প্রাণবিশিষ্ট জীবের (প্রতি দয়াপ্রদর্শনে) সওয়াব বিদ্যমান।” (বুখারী ২৪৬৬ নং, মুসলিম ২২৪৪ নং)
পশুর অধিকার নষ্ট করার এবং তার প্রতি নিষ্ঠুর হওয়ার সাজা রেখেছে ইসলাম। রাসূলুল্লাহ বলেছেন, عُذِّبَتْ امْرَأَةٌ فِي هِرَّةٍ سَجَنَتْهَا حَتَّى مَاتَتْ فَدَخَلَتْ فِيهَا النَّارَ لَا هِيَ أَطْعَمَتْهَا وَلَا سَقَتْهَا إِذْ حَبَسَتْهَا وَلَا هِيَ تَرَكَتْهَا تَأْكُلُ মִ خَشَاشِ الْأَرْضِ). "এক মহিলাকে একটি বিড়ালের জন্য শাস্তি দেওয়া হয়েছে। সে তাকে বেঁধে রেখেছিল এবং অবশেষে সে মারা গিয়েছিল, পরিণতিতে মহিলা তারই কারণে জাহান্নামে প্রবেশ করল। সে যখন তাকে বেঁধে রেখেছিল, তখন তাকে আহার ও পানি দিত না এবং তাকে ছেড়েও দিত না যে, সে কীট-পতঙ্গ ধরে খাবে।” (বুখারী ও মুসলিম)
একদা মহানবী একটি উটকে দেখলেন, (ক্ষুধায়) তার পিঠের সাথে পেট লেগে গেছে। তা দেখে তিনি বললেন, “তোমরা এই অবলা জন্তুদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় কর। সুতরাং উত্তমভাবে (সুস্থ থাকা অবস্থায়) তাতে সওয়ার হও এবং উত্তমভাবে (সুস্থ থাকা অবস্থায়) তা খাও (বা তার পিঠ থেকে নেমে যাও)।” (আবু দাউদ, ইবনে খুযাইমাহ, সহীহ তারগীব ২২৭৩নং)
অহেতুক প্রাণী হত্যা করতে নিষেধ করেছে ইসলাম। ইসলামের নবী বলেছেন, (إِنَّ أَعْظَمَ الذُّنُوبِ عِنْدَ اللَّهِ رَجُلٌ تَزَوَّجَ امْرَأَةً فَلَمَّا قَضَى حَاجَتَهُ মִْهَا طَلَّقَهَا وَذَهَبَ بِمَهْرُها وَرَجُلٌ اسْتَعْمَلَ رَجُلاً فَذَهَبَ بِأُجْرَتِهِ وَآخَرُ يَقْتُلُ دَابَّةً عَبثًا). “আল্লাহর নিকট সব চাইতে বড় পাপিষ্ঠ সেই ব্যক্তি, যে কোন মহিলাকে বিবাহ করে, অতঃপর তার নিকট থেকে মজা লুটে নিয়ে তাকে তালাক দেয় এবং তার মোহরও আত্মসাৎ করে। (দ্বিতীয় হল) সেই ব্যক্তি, যে কোন লোককে মজুর খাটায়, অতঃপর তার মজুরী আত্মসাৎ করে এবং (তৃতীয় হল) সেই ব্যক্তি, যে খামোখা পশু হত্যা করে।” (হাকেম, বাইহাকী, সহীহুল জামে' ১৫৬৭ নং)
অহেতুক গাছ কেটে ফেলতে নিষেধ করেছে ইসলাম। মহানবী ﷺ বলেছেন, "যে ব্যক্তি (খামোখা) কোন কুল গাছ কেটে ফেলবে (যে গাছের নিচে মুসাফির বা পশু-পক্ষী ছায়া গ্রহণ করত), সে ব্যক্তির মাথাকে আল্লাহ সোজা জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন।” (আবু দাউদ ৫২৩৯নং)
ফল-ফসলের জন্য, পরিবেশ দূষণমুক্ত করার জন্য অথবা ছায়াগ্রহণ করার জন্য ইসলাম গাছ লাগাতে উদ্বুদ্ধ করেছে। মহানবী ﷺ বলেন, "কিয়ামত কায়েম হয়ে গেলেও তোমাদের কারো হাতে যদি কোন গাছের চারা থাকে এবং সে তা এর আগেই রোপন করতে সক্ষম হয়, তবে যেন তা রোপন করে ফেলে।” (আহমাদ, সঃ জামে। ১৪২৪নং)
প্রিয় নবী ﷺ আরো বলেন, "যে কোন মুসলিম গাছ লাগায় কিংবা কোন ফসল ফলায় আর তা হতে কোন পাখী, মানুষ অথবা চতুষ্পদ জন্তু ভক্ষণ করে, তবে তা তার জন্য সদকাহ (করার সমপরিমাণ সওয়াব লাভ) হয়।” (বুখারী ২৩২০নং)
২। মানুষের প্রতি দরদী হতে উদ্বুদ্ধ করে ইসলাম। মানুষের প্রতি হিতাকাঙ্ক্ষী হতে, তার ইহ-পরকালের ব্যাপারে কল্যাণকামী হতে অনুপ্রাণিত করে। মহানবী ﷺ বলেন, “দ্বীন হল হিতাকাঙ্ক্ষার নাম।" আমরা জিজ্ঞাসা করলাম, 'কার জন্য হে আল্লাহর রসূল!' তিনি বললেন, “আল্লাহ, তাঁর কিতাব, তাঁর রসূল, মুসলিমদের নেতৃবর্গ এবং তাদের জনসাধারণের জন্য।” (মুসলিম ৫৫নং)
পরকালের শাস্তি থেকে মুক্তি দেওয়ার লক্ষ্যে মানুষকে সৎকর্মে আদেশ ও অসৎ কর্মে বাধা প্রদান করতে নির্দেশ দেয়। মহান আল্লাহ বলেন, {وَلْتَكُن মِّكُم মَّةٌ يَدْعُونَ إِلَى الْخَيْرِ وَيَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ وَأُوْلَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ} (১০৪) سورة آل عمران অর্থাৎ, তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকা উচিত, যারা (লোককে) কল্যাণের দিকে আহবান করবে এবং সৎকার্যের নির্দেশ দেবে ও অসৎ কার্য থেকে নিষেধ করবে। আর এ সকল লোকই হবে সফলকাম। (আলে ইমরানঃ ১০৪)
{كُنتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ وَتُؤْمِنُونَ باللهِ } (১১০) سورة آل عمران অর্থাৎ, তোমরাই শ্রেষ্ঠতম জাতি। মানবমন্ডলীর জন্য তোমাদের অভ্যুত্থান হয়েছে, তোমরা সৎকার্যের নির্দেশ দান করবে, অসৎ কার্য (করা থেকে) নিষেধ করবে, আর আল্লাহতে বিশ্বাস করবে। (আলে ইমরানঃ ১১০)
বলাই বাহুল্য যে, উপকারিতার স্থায়িত্বকাল অনুসারে উপকারীর মহত্ত্ব কম-বেশি হয়। যে উপকারী পার্থিব কোন উপকার করে মানুষের সাহায্য করে, হয়তো-বা ৬০/৭০ বছর জীবনের উপকার সাধন করে তাকে কৃতার্থ করে, সে উপকারী নিশ্চয় মহান। কিন্তু যে উপকারী পার্থিব জীবনে উপকার করার পরেও পরকালের অনন্তকাল জীবনে সুখী হওয়ার জন্য উপকার সাধন করে, সে উপকারী নিশ্চয় সুমহান।
৩। পার্থিব সাহায্য-সহযোগিতার ক্ষেত্রে ইসলাম মুসলিমকে অপর মুসলিমের জন্য আয়নাস্বরূপ মনে করে। সামাজিক বন্ধনের ক্ষেত্রে পুরো সমাজকে একটি অট্টালিকার মতো নিরূপণ করে। ধনীদের ধনে গরীবদের অধিকার নির্ধারণ করে। ইসলাম এমন সমাজ চায় না, যে সমাজে কেউ খাবে, কেউ খাবে না। কেউ পোলাও খাবে, কেউ রুটিও পাবে না। মহান আল্লাহ বলেছেন, {وَفِي أَمْوَالِهِمْ حَقٌّ لِّلسَّائِلِ وَالْمَحْرُومِ} (১৯) سورة الذاريات অর্থাৎ, তাদের ধন-সম্পদে রয়েছে ভিক্ষুক ও বঞ্চিতের হক। (যারিয়াতঃ ১৯)
{إِنَّمَا الصَّدَقَاتُ لِلْفُقَرَاءِ وَالْمَسَاكِينِ وَالْعَامِلِينَ عَلَيْهَا وَالْمُؤَلَّفَةِ قُلُوبُهُمْ وَفِي الرِّقَابِ وَالْغَارِمِينَ وَفِي سَبِيلِ اللَّهِ وَابْنِ السَّبِيلِ فَرِيضَةً মِّ اللَّهِ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ} (৬০) سورة التوبة অর্থাৎ, (ফরয) স্বাদক্বাসমূহ শুধুমাত্র নিঃস্ব, অভাবগ্রস্ত এবং স্বাদক্বাহ (আদায়ের) কাজে নিযুক্ত কর্মচারীদের জন্য, যাদের মনকে ইসলামের প্রতি অনুরাগী করা আবশ্যক তাদের জন্য, দাসমুক্তির জন্য, ঋণগ্রস্তদের জন্য, আল্লাহর পথে (সংগ্রামকারী) ও (বিপদগ্রস্ত) মুসাফিরের জন্য। এ হল আল্লাহর পক্ষ হতে নির্ধারিত (বিধান)। আর আল্লাহ মহাজ্ঞানী, প্রজ্ঞাময়। (তাওবাহঃ ৬০)
৪। দান-খয়রাত করে অনাথ, বিধবা ও দরিদ্রের সেবা করতে উদ্বুদ্ধ করে ইসলাম। দুর্বলদের প্রতি দয়াপ্রদর্শন করতে উৎসাহিত করে দ্বীনের বিধান। আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীর সাথে সদ্ব্যবহার করতে আগ্রহান্বিত করে ইসলামী শরীয়ত। মহান আল্লাহ বলেন, {وَاعْبُدُوا اللَّهَ وَلاَ تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا وَبِذِي الْقُرْبَى وَالْيَتَامَى وَالْمَسَاكِينِ وَالْجَارِ ذِي الْقُرْبَى وَالْجَارِ الْجُنُبِ وَالصَّاحِبِ بِالجَنبِ وَابْنِ السَّبِيلِ وَمَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ إِنَّ اللَّهَ لاَ يُحِبُّ মَن كَانَ مُخْتَالاً فَخُورًا} অর্থাৎ, তোমরা আল্লাহর উপাসনা কর ও কোন কিছুকে তাঁর অংশী করো না এবং পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন, পিতৃহীন, অভাবগ্রস্ত, আত্মীয় ও অনাত্মীয় প্রতিবেশী, সঙ্গী-সাথী, পথচারী এবং তোমাদের অধিকারভুক্ত দাস-দাসীদের প্রতি সদ্ব্যবহার কর। নিশ্চয় আল্লাহ আত্মম্ভরী দাম্ভিককে ভালবাসেন না। (নিসাঃ ৩৬)
মহানবী বলেছেন "আমি এবং নিজের অথবা অপরের অনাথ (এতীমের) তত্ত্বাবধায়ক জান্নাতে (পাশাপাশি) থাকব। আর বিধবা ও দুঃস্থ মানুষকে দেখাশুনাকারী ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় জিহাদকারীর সমতুল্য।” (ত্বাবারানীর আওসাত্ব, সহীহুল জামে' ১৪৭৬নং)
তিনি আরো বলেছেন, “আত্মীয়তার বন্ধন বজায় রাখা, সুন্দর চরিত্র অবলম্বন করা, এবং প্রতিবেশীর সাথে সদ্ব্যবহার রাখায় দেশ আবাদ থাকে এবং আয়ু বৃদ্ধি পায়।” (আহমাদ, সহীহুল জামে ৩৭৬৭নং)
তিনি আরো বলেছেন, (( وَاللَّهِ لَا يُؤْمِنُ ، وَاللَّهِ لَا يُؤْمِنُ ، وَاللَّهِ لا يُؤْمِنُ ! )) قِيلَ : মَنْ يَا رَسُولَ اللهِ ؟ قَالَ : ((الَّذِي لَا يَأْمَنُ جَارُهُ بَوَائِقَهُ !)). مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ "আল্লাহর কসম! সে ব্যক্তি মু'মিন নয়। আল্লাহর কসম! সে ব্যক্তি মু'মিন নয়। আল্লাহর কসম! সে ব্যক্তি মু'মিন নয়।” জিজ্ঞেস করা হল, 'কোন্ ব্যক্তি? হে আল্লাহর রসূল!' তিনি বললেন, “যে লোকের প্রতিবেশী তার অনিষ্ট থেকে নিরাপদে থাকে না।” (বুখারী ও মুসলিম)
৫। ইসলাম তার অনুসারীবর্গকে পূর্ণ একটি মাস উপবাস ও রোযা পালন করার নির্দেশ দেয়। যাতে তার মাধ্যমে শিখতে পারে আত্মসংযম, সহানুভূতি, সহমর্মিতা ও ধৈর্যশীলতা। অনুশীলন করতে পারে আল্লাহ-ভীতি ও সৎকর্মের। মহান আল্লাহ বলেছেন, {يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ মִ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ} (১৮৩) سورة البقرة অর্থাৎ, হে বিশ্বাসিগণ! তোমাদের জন্য সিয়ামের (রোযার) বিধান দেওয়া হল, যেমন বিধান তোমাদের পূর্ববর্তীগণকে দেওয়া হয়েছিল, যাতে তোমরা সংযমশীল হতে পার। (বাক্বারাহঃ ১৮৩)
৬। ইসলাম অনাথের তত্ত্বাবধান করতে উদ্বুদ্ধ করে। এতীমের প্রতি অনুগ্রহ করতে উৎসাহিত করে এবং তার অধিকার হরণ তথা সম্পদ ভক্ষণ করতে কঠোরভাবে নিষেধ করে। মহান আল্লাহ বলেছেন, وَآتُوا الْيَتَامَى أَمْوَالَهُمْ وَلَا تَتَبَدَّلُوا الْخَبِيثَ بِالطَّيِّبِ وَلَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَهُمْ إِلَى أَمْوَالِكُمْ إِنَّهُ كَانَ حُوبًا كَبِيرًا} (২) سورة النساء অর্থাৎ, পিতৃহীনদেরকে তাদের ধন-সম্পদ সমর্পণ কর এবং উৎকৃষ্টের সাথে নিকৃষ্ট বদল করো না এবং তোমাদের সম্পদের সাথে তাদের সম্পদকে মিশ্রিত ক'রে গ্রাস করো না; নিশ্চয় তা মহাপাপ। (নিসাঃ ২)
وَلَا تَقْرَبُواْ মَالَ الْيَتِيمِ إِلَّا بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ حَتَّى يَبْلُغَ أَشُدَّهُ وَأَوْفُوا بِالْعَهْدِ إِنَّ الْعَهْدَ كَانَ مَسْؤُولاً) (৩৪) سورة الإسراء অর্থাৎ, সাবালক না হওয়া পর্যন্ত সদুদ্দেশ্যে ছাড়া এতীমের সম্পত্তির নিকটবর্তী হয়ো না। আর প্রতিশ্রুতি পালন করো; নিশ্চয়ই প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে কৈফিয়ত তলব করা হবে। (৩৪)
{إِنَّ الَّذِينَ يَأْكُلُونَ أَمْوَالَ الْيَتَامَى ظُلْمًا إِنَّمَا يَأْكُلُونَ فِي بُطُونِهِمْ نَارًا وَسَيَصْلَوْنَ سَعِيرًا} (১০) سورة النساء অর্থাৎ, নিশ্চয় যারা পিতৃহীনদের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করে, তারা আসলে নিজেদের উদরে অগ্নি ভক্ষণ করে। আর অচিরেই তারা জ্বলন্ত আগুনে প্রবেশ করবে। (নিসাঃ ১০)
৭। ব্যবহারে ধনী-গরীব, আমীর-ফকীর, দেশী-বিদেশী বা কুলীন- অকুলীনের মাঝে কোন পার্থক্য করে না। ইসলামে সবাই সমান। মহান আল্লাহর দরবারে ও ইবাদতে সবাই বরাবর। {وَلَا تَطْرُدِ الَّذِينَ يَدْعُونَ رَبَّهُم بِالْغَدَاةِ وَالْعَشِيِّ يُرِيدُونَ وَجْهَهُ مَا عَلَيْكَ মִ حِسَابِهِم মِّ شَيْءٍ وَمَا মִ حِسَابِكَ عَلَيْهِم মِّ شَيْءٍ فَتَطْرُدَهُمْ فَتَكُونَ মִَ الظَّالِمِينَ} (৫২) সূরাহ্ আল-আনআম অর্থাৎ, যারা তাদের প্রতিপালককে প্রাতে ও সন্ধ্যায় তাঁর মুখমণ্ডল (দর্শন বা সন্তুষ্টি) লাভের জন্য ডাকে, তাদেরকে তুমি বিতাড়িত করো না। তাদের কর্মের জবাবদিহির দায়িত্ব তোমার নয় এবং তোমার কোন কর্মের জবাবদিহির দায়িত্ব তাদের নয় যে, তুমি তাদেরকে বিতাড়িত করবে, করলে তুমি অত্যাচারীদের অন্তর্ভুক্ত হবে। (আনআমঃ ৫২)
{وَاصْبِرْ نَفْسَكَ مَعَ الَّذِينَ يَدْعُونَ رَبَّهُم بِالْغَدَاةِ وَالْعَشِيِّ يُرِيدُونَ وَجْهَهُ وَلَا تَعْدُ عَيْنَاكَ عَنْهُمْ تُرِيدُ زِينَةَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَلَا تُطِعْ মَنْ أَغْفَلْنَا قَلْبَهُ عَنْ ذِكْرِنَا وَاتَّبَعَ هَوَاهُ وَكَانَ أَمْرُهُ فُرُطًا} (২৮) সূরাহ্ আল-কাহ্ফ অর্থাৎ, তুমি নিজেকে তাদেরই সংসর্গে রাখ, যারা সকাল ও সন্ধ্যায় তাদের প্রতিপালককে তাঁর মুখমণ্ডল (দর্শন বা সন্তুষ্টি) লাভের উদ্দেশ্যে আহবান করে এবং তুমি পার্থিব জীবনের শোভা কামনা করে, তাদের দিক হতে তোমার দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ো না। আর তুমি তার আনুগত্য করো না, যার হৃদয়কে আমি আমার স্মরণে অমনোযোগী ক'রে দিয়েছি, যে তার খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করে ও যার কার্যকলাপ সীমা অতিক্রম করে। (কাহফঃ ২৮)
{ عَبَسَ وَتَوَلَّى (1) أَنْ جَاءَهُ الأَعْمَى (২) وَمَا يُدْرِيكَ لَعَلَّهُ يَزَّكَّى (৩) أَوْ يَذَّكَّرُ فَتَنْفَعَهُ الذِّكْرَى (٤) أَمَّا মَنْ اسْتَغْنَى (৫) فَأَنْتَ لَهُ تَصَدَّى (৬) وَمَا عَلَيْكَ أَلا يَزَّكَّى (৭) وَأَمَّا মَنْ جَاءَكَ يَسْعَى (৮) وَهُوَ يَخْشَى (৯) فَأَنْتَ عَنْهُ تَلَقَّى (১০) كَلَّا إِنَّهَا تَذْكِرَةٌ (১১) فَمَنْ شَاءَ ذَكَرَهُ} (১২) অর্থাৎ, সে ভ্রূ কুঞ্চিত করল এবং মুখ ফিরিয়ে নিল। যেহেতু তার নিকট অন্ধ লোকটি আগমন করেছিল। তোমাকে কিসে জানাবে? হয়তো বা সে পরিশুদ্ধ হত। অথবা উপদেশ গ্রহণ করত, ফলে তা তার উপকারে আসত। পক্ষান্তরে যে লোক বেপরোয়া, তুমি তার প্রতি মনোযোগ দিলে। অথচ সে পরিশুদ্ধ না হলে তোমার কোন দোষ নেই। পক্ষান্তরে যে তোমার নিকট ছুটে এল, সভয় মনে, তুমি তার প্রতি বিমুখ হলে! কক্ষনো (এরূপ করবে) না। এটা তো উপদেশবাণী; যে ইচ্ছা করবে সে তা স্মরণ রাখবে (ও উপদেশ গ্রহণ করবে)। (আবাসাঃ ১-১২)
ইসলামে অস্পৃশ্যতা নেই, নেই জাতপাতের কোন প্রকার দুর্গন্ধ। যোগ্যতা অর্জন করলে ইমামতি করার অধিকার আছে সকলের। আল্লাহর দরবারে পরস্পরের পায়ে পা লাগিয়ে দাঁড়াবার অধিকার আছে সকলের। উর্দু কবি বলেছেন, 'এক হী সফ্ মে খড়ে হো গয়ে মাহমুদ ও ইয়ায, না কোয়ী বান্দা রহা, না কোয়ী বান্দা-নেওয়ায।'
ইসলামে জাতপাত নেই। ভেদাভেদের কোন প্রাচীর নেই। আপোসের সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের কোন অন্তরাল নেই। কবি বলেছেন, 'সৈয়দ, পাঠান, কাজী, মোল্লা, চৌধুরী বা খন্দকার, কুলি, চাষী, জোলা, নাপিত, কর্মকার বা কুন্তুকার। যে যাহাই হও, মুসলিম কিনা জানিতে আমি চাই, মুসলিম যদি এসো মোর বুকে তুমি যে আমার ভাই।'
📄 সামাজিকতা ও সহাবস্থানে ইসলামের বৈশিষ্ট্য
১। সামাজিকতা ও সহাবস্থানের ক্ষেত্রে মুসলিমদের মাঝে কোন ভেদাভেদ নেই। আমীর-গরীব, উঁচু-নিচু সকলেই একপাত্রে পানাহার করতে পারে। এক জায়গায় বসতে পারে। এমনকি মসজিদেও আমীর-গরীব সবাই সমান। সেখানে কেবল ধনীদের দাপট থাকবে---তা নয়। বসার জায়গা, যা যার, তা তার। গরীবকে তুলে কোন ধনী সেখানে বসতে পারে না।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, "কোন ব্যক্তি অন্য কাউকে তার জায়গা থেকে উঠিয়ে দিয়ে সেখানে যেন অবশ্যই না বসে। বরং তোমরা জায়গা প্রশস্ত ক'রে ও নড়ে-সরে জায়গা ক'রে বসো।” (বুখারী ও মুসলিম)
যে জায়গায় যে বসেছিল, কোন কাজে সে অন্যত্র গিয়ে ফিরে এলে, সেই জায়গার বেশি হকদার সেই। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “মজলিস থেকে কেউ উঠে গিয়ে আবার সেখানে ফিরে এলে সেই ঐ জায়গার বেশি হকদার।” (মুসলিম) সেখানে আমীর-গরীব দেখা হয় না। গরীব হলেও সে তার নিজ জায়গা গ্রহণ করবে অনায়াসে। ধনী বা প্রভাবশালী বলেই কেউ অন্যদের মাঝে ফারাক সৃষ্টি তাদের মাঝে বসতে পারে না। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “কোন ব্যক্তির জন্য এটা বৈধ নয় যে, সে দু'জনের মধ্যে তাদের বিনা অনুমতিতে তফাৎ সৃষ্টি করবে। (আবূ দাউদ, তিরমিযী) আবু দাউদের এক বর্ণনায় আছে, "দু'জনের মধ্যে তাদের বিনা অনুমতিতে বসা যাবে না।”
উঠা-বসার আদব শিখাতেও কুরআন বলে, {يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا قِيلَ لَكُمْ تَفَسَّحُوا فِي الْمَجَالِسِ فَافْسَحُوا يَفْسَحِ اللَّهُ لَكُمْ وَإِذَا قِيلَ انشُزُوا فَانشُزُوا يَرْفَعِ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا মִكُم وَالَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ دَرَجَاتٍ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرٌ} (১১) سورة المجادلة অর্থাৎ, হে বিশ্বাসিগণ! যখন তোমাদেরকে বলা হয়, 'মজলিসে স্থান প্রশস্ত কর', তখন তোমরা প্রশস্ত ক'রে দাও। আল্লাহ তোমাদের জন্য প্রশস্ততা দেবেন। আর যখন বলা হয়, 'উঠে যাও', তখন তোমরা উঠে যাও। তোমাদের মধ্যে যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছে এবং যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে, আল্লাহ তাদেরকে বহু মর্যাদায় উন্নত করবেন। আর তোমরা যা কর, আল্লাহ সে সম্পর্কে সবিশেষ অবহিত। (মুজাদালাহঃ ১১)
২। তিনজন একত্রে থাকলে একজনকে ছেড়ে দুইজন গোপনে বা ফিস্ফিসিয়ে কিছু বলাকে পছন্দ করে না ইসলাম। যেহেতু তাতে তৃতীয়জনের মনে কুধারণা ও সন্দেহ সৃষ্টি হতে পারে এবং তার ফলে আপোসের মাঝে বিদ্বেষ ও মনোমালিন্য দেখা দিতে পারে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, "যখন (কোন স্থানে) একত্রে তিনজন থাকবে, তৃতীয়জনকে ছেড়ে যেন দু'জনে কানাকানি না করে।” (বুখারী ও মুসলিম)
৩। ইসলাম সহাবস্থানে ও লোকাচরণের আদব শিক্ষা দিয়ে মুসলিমকে পথে-ঘাটে বসতে মানা করে। মহানবী ﷺ বলেন, "তোমরা রাস্তায় বসা হতে বিরত থাক।” সাহাবীগণ বললেন, 'হে আল্লাহর রসূল! সে মজলিসে না বসলে তো আমাদের উপায় নেই; আমরা সেখানে কথাবার্তা বলি।' রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, "যখন তোমরা (সেখানে) না বসে মানবেই না, তখন তোমরা রাস্তার হক আদায় কর।" তাঁরা বললেন, 'হে আল্লাহর রসূল! রাস্তার হক কী?' তিনি বললেন, “দৃষ্টি সংযত রাখা, কাউকে কষ্ট না দেওয়া, সালামের জবাব দেওয়া, ভাল কাজের নির্দেশ ও মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করা।” (বুখারী-মুসলিম)
📄 জন্মের আগে ও পরে মানব ও মানবতার প্রতি সযত্নতায় ইসলামের বৈশিষ্ট্য
১। ইসলাম বলে বিবাহের আগে দ্বীনদার চরিত্রবান বরকনে অনুসন্ধান কর। মহানবী বলেন, “তোমাদের নিকট যখন এমন ব্যক্তি (বিবাহের পয়গাম নিয়ে) আসে; যার দ্বীন ও চরিত্রে তোমরা মুগ্ধ, তখন তার সাথে (মেয়ের) বিবাহ দাও। যদি তা না কর, তাহলে পৃথিবীতে ফিৎনা ও মহাফাসাদ সৃষ্টি হয়ে যাবে।” (তিরমিযী, ইবনে মাজাহ ১৯৬৭, মিশকাত ৩০৯০, সিঃ সহীহাহ ১০২২নং) "চারটি গুণ দেখে মহিলাকে বিবাহ করা হয়; তার ধন-সম্পদ, তার বংশ মর্যাদা, তার রূপ-সৌন্দর্য এবং তার দ্বীন-ধর্ম দেখে। তুমি দ্বীনদার পাত্রী লাভ ক'রে সফলকাম হও। (অন্যথায় তুমি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।)" (বুখারী ৫০৯০নং)
ইসলাম বলে, যাকে ভালোবাসবে, তাকে আল্লাহর ওয়াস্তে বাসো, যাকে ঘৃণা করবে, তাকে দ্বীনের স্বার্থে কর। মহানবী বলেছেন, “ঈমানের সবচেয়ে মজবুত হাতল হল আল্লাহর ওয়াস্তে বন্ধুত্ব করা এবং আল্লাহর ওয়াস্তে শত্রুতা করা, আল্লাহর ওয়াস্তে ভালবাসা এবং আল্লাহর ওয়াস্তে ঘৃণা করা।" (ত্বাবারানী, সঃ জামে' ২৫৩৯নং) তিনি আরো বলেছেন, ইসলামের সবচেয়ে মজবুত হাতল এই যে, তুমি আল্লাহর ওয়াস্তে সম্প্রীতি স্থাপন করবে এবং আল্লাহর ওয়াস্তে বিদ্বেষ স্থাপন করবে। (আহমাদ, বাইহাক্বীর শুআবুল ঈমান, সঃ জামে' ২০০৯নং)
২। মাতৃগর্ভে শিশু আসার আগে সে যাতে শয়তানের কবলে না পড়ে, তার জন্য নির্দিষ্ট ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে দম্পতিকে। দ্বীনের নবী বলেন, "যদি তোমাদের কেউ স্ত্রী সহবাসের ইচ্ছা করে, তখন এই দুআ পড়ে, 'বিসমিল্লা-হ, আল্লা-হুম্মা জান্নিবনাশ শাইত্বা-না অজান্নিবিশ শায়ত্বা-না মা রাযাক্বতানা।' অর্থাৎ, আমি আল্লাহর নাম নিয়ে শুরু করছি, হে আল্লাহ! তুমি শয়তানকে আমাদের নিকট থেকে দূরে রাখ এবং আমাদেরকে যে (সন্তান) দান করবে, তার থেকেও শয়তানকে দূরে রাখ। তাহলে ওদের ভাগ্যে সন্তান এলে, শয়তান তার কোন ক্ষতি করতে পারে না।” (বুখারী-মুসলিম)
৩। মায়ের স্বাস্থ্য ও গর্ভস্থ ভ্রূণের প্রতি যথেষ্ট যত্ন নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সুতরাং গর্ভবতীকে রমযানের রোযা কাযা করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। যেমন দুগ্ধদান কালেও একই অনুমতি রয়েছে। রোযা কাযা করতে সময় না পেলে রোযা রাখার বিনিময়ে মিসকীন খাওয়াতে পারে। (আবু দাউদ ২৩১৯, তিরমিযী ৭ ১৫, ইবনে মাজাহ ১৬৬৭নং)
৪। গর্ভবতী থাকা অবস্থায় শরীয়ত তার উপর অপরাধের কোন আঘাতমূলক দন্ডবিধি প্রয়োগ করা অবৈধ ঘোষণা করেছে। যাতে ভ্রূণের কোন ক্ষতি না হয়। (মুসলিম)
৫। ইসলামের নির্দেশ, তালাকপ্রাপ্ত নারীর জন্য গর্ভ গোপন করা বৈধ নয়। কেননা, গর্ভাবস্থায় অন্যত্র বিবাহ হলে বংশে সংমিশ্রণ ঘটবে। বীর্য হবে প্রথম স্বামীর কিন্তু সন্তান সম্পর্কিত হবে দ্বিতীয় স্বামীর সাথে। আর এটা হল খুব বড় প্রতারণা, খুব বড় পাপ। মহান আল্লাহর নির্দেশ হল, وَالْمُطَلَّقَاتُ يَتَرَبَّصْنَ بِأَنفُسِهِنَّ ثلاثةَ قُرُوءٍ وَلاَ يَحِلُّ لَهُنَّ أَن يَكْتُمْنَ مَا خَلَقَ اللَّهُ فِي أَرْحَامِهِنَّ إِن كُنَّ يُؤْمِنَّ بِاللَّهِ وَالْيَوْমِ الْآخِرِ} (২২৮) البقرة অর্থাৎ, তালাকপ্রাপ্তা (বর্জিতা) নারীগণ তিন রজঃস্রাব কাল প্রতীক্ষায় থাকবে। (অর্থাৎ বিবাহ করা থেকে বিরত থাকবে।) তারা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী হলে তাদের গর্ভাশয়ে আল্লাহ যা সৃষ্টি করেছেন তা গোপন রাখা তাদের পক্ষে বৈধ নয়। (বাক্বারাহঃ ২২৮)
তাছাড়া ইসলামের নির্দেশ হল, সন্তানকে তার জনকের প্রতি সম্বদ্ধ করতে হবে। জাতকের সাথে জনকের সম্পর্ক অস্বীকার বা গোপন করা যাবে না। অন্য পুরুষকে জাতকের জনক বলে দাবী করা যাবে না। মহান আল্লাহ বলেছেন, ادْعُوهُمْ لِآبَائِهِمْ هُوَ أَقْسَطُ عِندَ اللَّهِ فَإِن لَّمْ تَعْلَمُوا آبَاءَهُمْ فَإِخْوَانُكُمْ فِي الدِّينِ وَمَوَالِيكُمْ} (৫) سورة الأحزاب অর্থাৎ, তোমরা ওদেরকে পিতৃপরিচয়ে ডাক; আল্লাহর দৃষ্টিতে এটিই ন্যায়সঙ্গত, যদি তোমরা ওদের পিতৃপরিচয় না জান, তবে ওদেরকে তোমরা ধর্মীয় ভাই এবং বন্ধুরূপে গণ্য কর। (আহযাবঃ ৫)
আর মহানবী বলেছেন, "অজ্ঞাত বংশের সম্বন্ধ দাবী করা অথবা ছোট বা নীচু হলে তা অস্বীকার করা মানুষের জন্য কুফরী।” (আহমাদ প্রমুখ, সহীহুল জামে' ৪৪৮-৬নং)
“যে ব্যক্তি পরের বাপকে নিজের বাপ বলে দাবী করে, সে ব্যক্তি জান্নাতের সুগন্ধিও পাবে না। অথচ তার সুগন্ধি ৫০০ বছরের দূরবর্তী স্থান থেকেও পাওয়া যাবে।” (আহমাদ ২/১৭১, ইবনে মাজাহ ২৬১১, সহীহুল জামে' ৫৯৮৮নং)
“যে ব্যক্তি পরের বাপকে নিজের বাপ বলে দাবী করে অথবা তার (স্বাধীনকারী) প্রভু ছাড়া অন্য প্রভুর প্রতি সম্বন্ধ জুড়ে, সে ব্যক্তির উপর কিয়ামত পর্যন্ত আল্লাহর অবিরাম অভিশাপ।” (আবু দাউদ, সহীহুল জামে' ৫৯৮৭নং)
বলা বাহুল্য, যে ব্যভিচারিণী গর্ভের ভ্রূণ গোপন করে বিবাহ ক'রে অথবা পরপুরুষের সাথে অবৈধ মিলন ক'রে স্বামীর বংশে অন্য বংশের অথবা অবৈধ সন্তানের অনুপ্রবেশ ঘটায়, তার পাপ যে কত বড়, তা অনুমেয়!
৬। জন্মের পরে পৃথিবীতে আগমনের সাথে সাথে তার কর্ণকুহরে তাওহীদের বাণী আযান-ধ্বনি শোনাবার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যেমন পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়ার সময়েও তাকে তাওহীদের কালেমা স্মরণ করানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
৭। শিশুর সুন্দর নাম রাখতে নির্দেশ দিয়েছে ইসলাম।
৮। খুশী ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের উদ্দেশ্যে জন্মের সপ্তম দিনে আকীকা (ছাগল যবাই) করতে নির্দেশ দিয়েছে। নির্দেশ দিয়েছে তার মাথার চুল চেঁছে পরিষ্কার ক'রে সেই চুলের ওজন পরিমাণ চাঁদি অভাবীদেরকে সদকা করতে।
৯। শিশুকে নির্ধারিত সময় অবধি মাতৃদুগ্ধ পান করাবার নিদের্শ দিয়েছে ইসলাম। মায়ের নিকট থেকে শিশুর এটা পাওনা অধিকার। মহান আল্লাহ বলেছেন, وَالْوَالِدَاتُ يُرضِعْنَ أَوْلَادَهُنَّ حَوْلَيْنِ كَامِلَيْنِ لِمَنْ أَرَادَ أَن يُتِمَّ الرَّضَاعَةَ وَعَلَى الْمَوْلُودِ لَهُ رِزْقُهُنَّ وَكِسْوَتُهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ لَا تُكَلِّفُ نَفْسٌ إِلَّا وُسْعَهَا لَا تُضَارَ وَالِدَةٌ بِوَلَدِهَا وَلَا مَوْلُودٌ لَّهُ بِوَلَدِهِ وَعَلَى الْوارِثِ مِثْلُ ذَلِكَ فَإِنْ أَرَادَا فِصَالاً عَن تَرَاضٍ মِّهُمَا وَتَشَاوُرٍ فَلَا جُنَاحَ عَلَيْهِمَا وَإِنْ أَرَدتُّ أَن تَسْتَرْضِعُوا أَوْلَادَكُمْ فَلَا جُنَاحَ عَلَيْكُمْ إِذَا سَلَّمْتُم মَّا آتَيْتُم بِالْمَعْرُوفِ وَاتَّقُوا اللَّهَ وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ) (২৩৩) سورة البقرة অর্থাৎ, জননীগণ তাদের সন্তানদেরকে পূর্ণ দু' বছর দুধ পান করাবে; যদি কেউ দুধ পান করার সময় পূর্ণ করতে চায়। জনকের কর্তব্য যথাবিধি তাদের ভরণ-পোষণ করা। কাউকে তার সাধ্যাতীত কার্যভার দেওয়া হয় না। কোন জননীকে তার সন্তানের জন্য এবং কোন জনককে তার সন্তানের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত করা হবে না। আর (পিতা মারা গেলে) উত্তরাধিকারীর বিধানও অনুরূপ। পক্ষান্তরে যদি পিতা- মাতা পরস্পর সম্মতি ও পরামর্শক্রমে দু' বছরের মধ্যেই (শিশুর) দুধপান ছাড়াতে চায়, তবে তাদের কোন দোষ হবে না। আর যদি তোমরা তোমাদের সন্তানদের কোন ধাত্রীর দুধ পান করাতে চাও, তাতেও তোমাদের কোন দোষ হবে না; যদি তোমরা তাদের নির্ধারিত প্রদেয় বিধিমত অর্পণ কর। আল্লাহকে ভয় কর এবং জেনে রাখ, তোমরা যা কর আল্লাহ তার দ্রষ্টা। (বাক্বারাহঃ ২৩৩)
১০। শিশুর পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতার প্রতি খেয়াল রেখে তার যথাসময়ে খতনা (লিঙ্গত্বক ছেদন) করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তার নখ-চুল যথানিয়মে কেটে ফেলার তাকীদ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহর রসূল ﷺ বলেছেন, “পাঁচটি কাজ হল প্রকৃতিগত সুন্নত; খতনা করা, গুপ্তাঙ্গের লোম চেঁছে ফেলা, নখ কাটা, বগলের লোম তুলে ফেলা এবং মোছ ছেঁটে ফেলা।” (বুখারী ৫৮৮৯, মুসলিম ২৫৭নং)
১১। শিশুকে যথানিয়মে জ্ঞান, আদব ও চরিত্র শিক্ষা দেওয়ার নির্দেশ আছে ইসলামে। মহান আল্লাহ বলেছেন, {يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا وَقُودُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ عَلَيْهَا مَلَائِكَةٌ غِلَاظٌ شِدَادٌ لا يَعْصُونَ اللَّهَ مَا أَمَرَهُمْ وَيَفْعَلُونَ مَا يُؤْمَرُونَ} অর্থাৎ, হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে রক্ষা কর অগ্নি হতে, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর, যাতে নিয়োজিত আছে নির্মম-হৃদয়, কঠোর-স্বভাব ফিরিশতাগণ, যারা আল্লাহ যা তাদেরকে আদেশ করেন, তা অমান্য করে না এবং তারা যা করতে আদিষ্ট হয়, তাই করে। (তাহরীমঃ ৬)
রাসূলুল্লাহ বলেছেন, “তোমরা নিজেদের সন্তান-সন্ততিদেরকে নামাযের আদেশ দাও; যখন তারা সাত বছরের হবে। আর তারা যখন দশ বছরের সন্তান হবে, তখন তাদেরকে নামাযের জন্য প্রহার কর এবং তাদের বিছানা পৃথক করে দাও।” (আবু দাউদ)
১২। ইসলাম পিতামাতাকে সন্তানদের মাঝে ন্যায়পরায়ণতা বজায় রাখতে আদেশ দেয়। মহানবী বলেছেন, “তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং তোমাদের সন্তানদের মাঝে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা কর। (বুখারী, মুসলিম)
১৩। ইসলাম ভ্রূণ ও সন্তান হত্যা করতে নিষেধ করেছে। মহান আল্লাহ বলেছেন, {وَلَا تَقْتُلُواْ أَوْلَادَكُم মِّ إِمْلَاقٍ نَّحْنُ نَرْزُقُكُمْ وَإِيَّاهُمْ} (১৫১) আনআম অর্থাৎ, দারিদ্রের কারণে তোমরা তোমাদের সন্তানদেরকে হত্যা করবে না। আমিই তোমাদেরকে ও তাদেরকে জীবিকা দিয়ে থাকি। (আনআমঃ ১৫১)
{وَلَا تَقْتُلُوا أَوْلَادَكُمْ خَشْيَةَ إِمْلَاقٍ نَّحْنُ نَرْزُقُهُمْ وَإِيَّاكُم إِنَّ قَتْلَهُمْ كَانَ خِطْفًا كَبِيرًا) (৩১) سورة الإسراء অর্থাৎ, তোমাদের সন্তানদেরকে তোমরা দারিদ্র্য-ভয়ে হত্যা করো না, আমিই তাদেরকে জীবনোপকরণ দিয়ে থাকি এবং তোমাদেরকেও। নিশ্চয় তাদেরকে হত্যা করা মহাপাপ। (বানী ইস্রাঈল: ৩১)
{يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ إِذَا جَاءَكَ الْمُؤْمِنَاتُ يُبَايِعْنَكَ عَلَى أَن لا يُشْرِكْنَ بِاللَّهِ شَيْئًا وَلَا يَسْرِقْنَ وَلَا يَزْنِينَ وَلَا يَقْتُلْنَ أَوْلَادَهُنَّ وَلَا يَأْتِينَ بِبُهْتَانِ يَفْتَرِينَهُ بَيْنَ أَيْدِيهِنَّ وَأَرْجُلِهِنَّ وَلَا يَعْصِينَكَ فِي مَعْرُوفِ فَبَايِعُهُنَّ وَاسْتَغْفِرْ لَهُنَّ اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ غفُورٌ رَّحِيمٌ } (১২) سورة الممتحنة অর্থাৎ, হে নবী! বিশ্বাসী নারীরা যখন তোমার নিকট এসে বায়আত করে এই মর্মে যে, তারা আল্লাহর সাথে কোন শরীক স্থির করবে না, চুরি করবে না, ব্যভিচার করবে না, নিজেদের সন্তান-সন্ততিদের হত্যা করবে না, তারা সজ্ঞানে কোন অপবাদ রচনা ক'রে রটাবে না এবং সৎকার্যে তোমাকে অমান্য করবে না, তখন তাদের বায়আত গ্রহণ কর এবং তাদের জন্য আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর। নিশ্চয় আল্লাহ চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (মুমতাহিনাহঃ ১২)
১৪। ইসলাম মানুষকে সৃষ্টির সেরা জীব রূপে সৃষ্টি করেছেন। এক মানুষ অন্য মানুষের সম্মান করবে, কিন্তু ছোট হলেও বড়কে প্রণিপাত করবে না। প্রণাম বা পা ছুঁয়ে সালাম করবে না। শরয়ী পদ্ধতিতে শ্রদ্ধা জানাবে।
১৫। মানুষ মারা গেলেও সম্মানের সাথে তার কাফন-দাফন করা হয়। সাদা কাপড়কে সুগন্ধিত করে তাকে কাফনানো হয়। মহানবী বলেন, "তোমরা তোমাদের লেবাসের মধ্যে সাদা কাপড় পরিধান কর। কারণ, তা সব চাইতে উত্তম। আর ঐ সাদা কাপড় দ্বারা তোমাদের ম্যাইয়্যেতকেও কাফনাও।” (আবু দাউদ ৩৫২৯, তিরমিযী ৯১৫, ইবনে মাজাহ ১৪৬১, আহমাদ ২১০৯)
কাফনের কাপড়কে তিনবার আগর কাঠের সুগন্ধময় ধুয়া দিয়ে সুগন্ধময় করা হয়। মহানবী বলেন, “যখন তোমরা তোমাদের মাইয়্যেতকে সুগন্ধ ধুয়া দিয়ে সুগন্ধময় করবে, তখন যেন তা তিনবার কর।” (আহমাদ ১৩০১৪, ইবনে শাইবাহ, মাওয়ারিদুয যামআন ৭৫২, হাকেম ১/৩৫৫, বাইহাকী ৩/৪০৫) আগর কাঠের ধুয়া না হলে গোলাপ পানি ইত্যাদি দ্বারাও সুগন্ধিত করা হয়।
সমান মাপের তিনটি কাপড়ে (লেফাফায়) কাফনানো হয়। পরস্পর তিনটি কাপড়কে বিছিয়ে দেওয়া হয়। এর উপর প্রয়োজনে (মলদ্বার হতে নাপাকী বের হতে থাকলে) ১০০/২৫ সেমি কাপড়কে দুই মাথায় ফেড়ে নিয়ে লেঙ্গট বানিয়ে মাইয়্যেতের পাছার স্থানে রাখা হয়। (ইহরাম অবস্থার মৃত না হলে) তার উপর মিস্ক, কপূর বা অন্য কোন সুগন্ধি মিশ্রিত তুলো রাখা হয়। অতঃপর লাশকে পর্দার সাথে এনে তার উপর ধীরভাবে রাখা হয়। (মুহরিম না হলে) মাইয়্যেতের সিজদার স্থান সমূহে, বগলে, দুইরানের মধ্যবর্তী ইত্যাদি স্থানে আতর লাগিয়ে দেওয়া হয়। সসম্মানে তাকে রাখা হয় জানাযার খাটে। মুসলিমরা আন্তরিকতার সাথে শোকার্ত মনে তার আত্মর কল্যাণ কামনা করে জানাযা পড়ে। অতঃপর সম্মানের সাথে গোরস্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। আল্লাহর নাম নিয়ে কবরে রাখা হয়। কবর এমনভাবে বন্ধ করা হয়, যাতে তার দেহে মাটি না লাগে। পুনরায় সকলে তার জন্য প্রার্থনা করে, যাতে তার পরকালের হিসাব সহজ হয়। মাটির তৈরি মানুষকে সম্মানের সাথে মাটির বুকেই ফিরিয়ে দেওয়া হয়। মহান আল্লাহ বলেছেন, {مِنْهَا خَلَقْنَاكُمْ وَفِيهَا نُعِيدُكُمْ وَمِنْهَا نُخْرِجُكُمْ تَارَةً أُخْرَى} (৫৫) অর্থাৎ, আমি মাটি হতে তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি, তাতেই তোমাদেরকে ফিরিয়ে দেব এবং তা হতে পুনর্বার বের করব। (ত্বা-হাঃ ৫৫)