📘 দ্বীনে ইসলামের সৌন্দর্য ও বৈশিষ্ট্য > 📄 মানব-মনকে প্রভাবান্বিত করার ক্ষেত্রে ইসলামের বৈশিষ্ট্য

📄 মানব-মনকে প্রভাবান্বিত করার ক্ষেত্রে ইসলামের বৈশিষ্ট্য


১। যে মন অপরাধী, সে মন ক্ষমা পেলে খুশী হয়। যে মন অলস, সে মন উৎসাহ পেলে সক্রিয় হয়। এই জন্য মুসলিম পাপ করে ফেললেও আশাবাদী থাকে এবং পুণ্যলাভে বড় উৎসাহী ও আগ্রহী হয়। যখনই কোন পুণ্য করে, তখনই তার কিছু পাপ ক্ষয় হয়ে যায়। মহান আল্লাহ বলেন, {وَالَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَنُكَفِّرَنَّ عَنْهُمْ سَيِّئَاتِهِمْ وَلَنَجْزِيَنَّهُمْ أَحْسَنَ الَّذِي كَانُوا يَعْمَلُونَ} (৭) سورة العنكبوت অর্থাৎ, যারা বিশ্বাস করে ও সৎকাজ করে, আমি নিশ্চয়ই তাদের দোষত্রুটিসমূহকে মার্জনা ক'রে দেব এবং তাদেরকে তাদের কর্মের উত্তম ফলদান করব। (আনকাবুতঃ ৭)

{وَأَقِمِ الصَّلَاةَ طَرَفَيِ النَّהَارِ وَزُلَفًا মِّনَ اللَّيْلِ إِنَّ الْحَسَنَاتِ يُذْهِبْنَ السَّيِّئَاتِ ذَلِكَ ذِكْرَى لِلذَّاكِرِينَ } (১১৪) سورة هود অর্থাৎ, নামায কায়েম কর দিবসের দু'প্রান্তে ও রাত্রির কিছু অংশে; নিঃসন্দেহে পুণ্যরাশি পাপরাশিকে মুছে ফেলে; এটা হচ্ছে উপদেশ গ্রহণকারীদের জন্য একটি উপদেশ। (হৃদঃ ১১৪)

২। কোন কাজে মন না বসলে, কোন কাজে শৈথিল্য ও অলসতা থাকলে, সে কাজে কোন পুরস্কার ঘোষণার সাথে মুসলিমকে উদ্বুদ্ধ করা হলে, সে আগ্রহের সাথে সে কাজ সম্পাদন করে। যে কাজ প্রার্থনীয়, সে কাজের বিনিময়ে বা পরিণামে নির্ধারিত পারিতোষিক থাকলে, সে কাজে মানুষের অনুপ্রেরণা জাগে। যেমন, মহান আল্লাহ বলেছেন, {وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ وَآتُوا الزَّكَاةَ وَأَقْرِضُوا اللَّهَ قَرْضًا حَسَنًا وَمَا تُقَدِّمُوا لِأَنفُسِكُم মِّ خَيْرٍ تَجِدُوهُ عِندَ اللَّهِ هُوَ خَيْرًا وَأَعْظَمَ أَجْرًا وَاسْتَغْفِرُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ) (২০) سورة المزمل অর্থাৎ, নামায প্রতিষ্ঠিত কর, যাকাত প্রদান কর এবং আল্লাহকে দাও উত্তম ঋণ। তোমরা তোমাদের আত্মার মঙ্গলের জন্য ভাল যা কিছু অগ্রিম প্রেরণ করবে, তোমরা তা আল্লাহর নিকট উৎকৃষ্টতর এবং পুরস্কার হিসাবে মহত্তর পাবে। আর তোমরা আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর, নিশ্চয়ই আল্লাহ মহা ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (মুয্যাম্মিলঃ ২০)

৩। ইসলাম কেবল বিশ্বাস ও আনুষ্ঠানিকতার নাম নয়। ইসলাম মানুষকে কর্মে উদ্বুদ্ধ করে। আর সেই কর্মের উপর বহুগুণ পুরস্কার প্রদান করে। মহান আল্লাহ বলেন, মَّثَلُ الَّذِينَ يُنفِقُونَ أَمْوَالَهُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ كَمَثَلِ حَبَّةٍ أَنبَتَتْ سَبْعَ سَنَابِلَ فِي كُلِّ سُنبُلَةٍ মِّئَةُ حَبَّةٍ وَاللَّهُ يُضَاعِفُ لِمَن يَشَاء وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ} (২৬১) অর্থাৎ, যারা আল্লাহর পথে ব্যয় করে, তাদের উপমা একটি শস্য- বীজের মত, যা থেকে সাতটি শীষ জন্মে, প্রতিটি শীষে থাকে একশত শস্য-দানা। আর আল্লাহ যার জন্য ইচ্ছা বহুগুণে বৃদ্ধি ক'রে দেন। আল্লাহ মহাদানশীল, মহাজ্ঞানী। (বাক্বারাহঃ ২৬১)

শুধু তাই নয়, মনে কর্মের সংকল্প থাকলে, তা কাজে পরিণত না করতে পারলেও পুরস্কার প্রদান করা হয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর বর্কতময় মহান প্রভু থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন যে, “নিশ্চয় আল্লাহ পুণ্যসমূহ ও পাপসমূহ লিখে দিয়েছেন। অতঃপর তিনি তার ব্যাখ্যাও করে দিয়েছেন। যে ব্যক্তি কোন নেকী করার সংকল্প করে; কিন্তু সে তা কর্মে বাস্তবায়িত করতে পারে না, আল্লাহ তাবারাকা অতাআলা তার জন্য (কেবল নিয়ত করার বিনিময়ে) একটি পূর্ণ নেকী লিখে দেন। আর সে যদি সংকল্প করার পর কাজটি করে ফেলে, তাহলে আল্লাহ তার বিনিময়ে দশ থেকে সাতশ গুণ, বরং তার চেয়েও অনেক গুণ নেকী লিখে দেন। পক্ষান্তরে যদি সে একটি পাপ করার সংকল্প করে; কিন্তু সে তা কর্মে বাস্তবায়িত না করে, তাহলে আল্লাহ তাআলা তাঁর নিকট একটি পূর্ণ নেকী হিসাবে লিখে দেন। আর সে যদি সংকল্প করার পর ঐ পাপ কাজ করে ফেলে, তাহলে আল্লাহ মাত্র একটি পাপ লিপিবদ্ধ করেন।” (বুখারী-মুসলিম)

৪। মানুষ সম্মানীয় জীব। মহান স্রষ্টা তাকে সম্মান দান করেছেন, শিখিয়েছেন আত্মসম্মানবোধ। সুতরাং সে কোন মানুষের পূজারী হতে পারে না। পারে না তার থেকে সম্মানে ছোট কোন সৃষ্টিরও কাছে মাথা নত করতে। এটা তার সম্মানের প্রতিকূল। ইসলামই শিক্ষা দিয়েছে, কোন সৃষ্টির উপাসনা নয়, একক স্রষ্টার উপাসনা কর। ইসলামই নির্দেশ দিয়েছে, সৃষ্টির ইবাদত ছেড়ে স্রষ্টার ইবাদত কর। যিনি স্রষ্টা, অধিপতি, প্রতিপালক, রুযীদাতা, তিনিই উপাস্য, তিনিই ইবাদত পাওয়ার যোগ্য অধিকারী। ইসলামই শিখিয়েছে পৌত্তলিকতা শির্ক, সৃষ্টির পূজা শির্ক। আর শির্ক হল অন্ধকার, তাওহীদ হল আলো। ইসলাম মানুষকে শির্কের অন্ধকার থেকে উদ্ধার করে তাওহীদের আলোয় আনতে চায়। মহান আল্লাহ বলেছেন, {هُوَ الَّذِي يُنَزِّلُ عَلَى عَبْدِهِ آيَاتٍ بَيِّنَاتٍ لِيُخْرِجَكُم মِّنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّورِ وَإِنَّ اللَّهَ بِكُمْ لَرَؤُوفٌ رَّحِيمٌ} الحديد ৯ অর্থাৎ, তিনিই তাঁর বান্দাদের প্রতি সুস্পষ্ট আয়াতসমূহ অবতীর্ণ করেন, তোমাদেরকে সমস্ত প্রকার অন্ধকার হতে আলোকে আনার জন্য। আর নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের প্রতি করুণাময়; পরম দয়ালু। (হাদীদঃ ৯)

৫। ইসলাম মানুষকে পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন করে। সুউন্নত ও সভ্য রূপে গড়ে তোলে। হিংসা-বিদ্বেষ, হানাহানি-খুনাখুনি ও মারামারি-দাঙ্গার নরক থেকে রক্ষা করে। ইসলাম মানুষের মাঝে সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ব স্থাপন করে। ইসলাম আপোসে বিচ্ছিন্নতা, সম্পর্কহীনতা ও দলাদলি করতে নিষেধ করে। ঐক্য, সংহতি, সহানুভূতি, সহযোগিতা, সমমর্মিতা ও সমানুভূতির প্রতি মানুষকে আহবান করে। মহান আল্লাহ বলেছেন, {وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا وَاذْكُرُوا نِعْمَةَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ إِذْ كُنتُمْ أَعْدَاء فَأَلَّفَ بَيْنَ قُلُوبِكُمْ فَأَصْبَحْتُم بِنِعْمَتِهِ إِخْوَانًا وَكُنتُمْ عَلَى شَفَا حُفْرَةٍ মِّنَ النَّارِ فَأَنقَذَكُم মِّهَا كَذَلِكَ يُبَيِّنُ اللَّهُ لَكُمْ آيَاتِهِ لَعَلَّكُمْ تَهْتَدُونَ} অর্থাৎ, তোমরা সকলে আল্লাহর রশি (ধর্ম বা কুরআন)কে শক্ত ক'রে ধর এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না। তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহকে স্মরণ কর; তোমরা পরস্পর শত্রু ছিলে, অতঃপর তিনি তোমাদের হৃদয়ে প্রীতির সঞ্চার করলেন। ফলে তোমরা তাঁর অনুগ্রহে পরস্পর ভাই-ভাই হয়ে গেলে। তোমরা অগ্নিকুন্ডের (দোযখের) প্রান্তে ছিলে, অতঃপর তিনি (আল্লাহ) তা হতে তোমাদেরকে উদ্ধার করেছেন। এরূপে আল্লাহ তোমাদের জন্য তাঁর নিদর্শন স্পষ্টভাবে বিবৃত করেন, যাতে তোমরা সৎপথ পেতে পার। (আলে ইমরানঃ ১০৩)

মহানবী বলেছেন, "তোমরা এক অপরের প্রতি হিংসা করো না, কেনা-বেচাতে জিনিসের মূল্য বাড়িয়ে এক অপরকে ধোঁকা দিয়ো না, এক অপরের প্রতি শত্রুতা রেখো না, এক অপর থেকে (ঘৃণাভরে) মুখ ফিরায়ো না এবং এক অপরের (জিনিস) কেনা-বেচার উপর কেনা- বেচা করো না। আর হে আল্লাহর বান্দারা! তোমরা ভাই-ভাই হয়ে যাও। মুসলিম মুসলিমের ভাই। সে তার প্রতি যুলুম করবে না, তাকে তুচ্ছ ভাববে না এবং তাকে অসহায় অবস্থায় ছেড়ে দেবে না। আল্লাহভীতি এখানে রয়েছে। (তিনি নিজ বুকের দিকে ইঙ্গিত করে এ কথা তিনবার বললেন।) কোন মুসলিম ভাইকে তুচ্ছ ভাবা একটি মানুষের মন্দ হওয়ার জন্য যথেষ্ট। প্রত্যেক মুসলিমের রক্ত, মাল এবং তার মর্যাদা অপর মুসলিমের উপর হারাম।” (মুসলিম)

তিনি আরো বলেছেন, "তোমাদের মধ্যে কেউ (পূর্ণ) মু'মিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে তার ভাইয়ের জন্য তাই পছন্দ করবে, যা সে নিজের জন্য পছন্দ করে।” (বুখারী ও মুসলিম)

৬। ইসলাম মুসলিমের মনে আশাবাদিতা সৃষ্টি করে। ইতিবাচক মন রাখতে উদ্বুদ্ধ করে। মন থেকে হতাশা ও নৈরাশ্য বিদূরিত করতে বলে। মানুষের মন দুর্বল হলেও সবল করতে উৎসাহিত করে। বিপদে ভেঙ্গে পড়তে এবং পতিত হলে পড়ে থাকতে নিষেধ করে। ধৈর্যধারণ করতে এবং নতুনভাবে জীবন শুরু করতে অনুপ্রাণিত করে। মহান আল্লাহ বলেছেন, إِنَّ الإِنسَانَ خُلِقَ هَلُوعاً (১৯) إِذَا مَسَّهُ الشَّرُّ جَزُوعاً (২০) وَإِذَا مَسَّهُ الْخَيْرُ منوعاً (২১) إِلَّا الْمُصَلِّينَ (২২) الَّذِينَ هُمْ عَلَى صَلَاتِهِمْ دَائِمُونَ (২৩)... অর্থাৎ, মানুষ তো সৃজিত হয়েছে অতিশয় অস্থিরচিত্তরূপে। যখন তাকে বিপদ স্পর্শ করে, তখন সে হয় হা-হুতাশকারী। আর যখন তাকে কল্যাণ স্পর্শ করে, তখন সে হয় অতি কৃপণ। অবশ্য নামাযীগণ এর ব্যতিক্রম; যারা তাদের নামাযে সদা নিষ্ঠাবান।---- (মাআ'রিজঃ ১৯-২৩)

তিনি আরো বলেছেন, وَاسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلَاةِ وَإِنَّهَا لَكَبِيرَةٌ إِلَّا عَلَى الْخَاشِعِينَ } (৪৫) অর্থাৎ, তোমরা ধৈর্য ও নামাযের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর এবং বিনীতগণ ব্যতীত আর সকলের নিকট নিশ্চিতভাবে এ কঠিন। (বাক্বারাহঃ ৪৫)

মহানবী ﷺ বলেছেন, "(দেহমনে) সবল মু'মিন আল্লাহর নিকট দুর্বল মু'মিন অপেক্ষা বেশী প্রিয়। আর প্রত্যেকের মধ্যে কল্যাণ রয়েছে। তুমি ঐ জিনিসে যত্নবান হও, যাতে তোমার উপকার আছে এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা কর ও উৎসাহহীন হয়ো না। যদি তোমার কিছু ক্ষতি হয়, তাহলে এ কথা বলো না যে, 'যদি আমি এ রকম করতাম, তাহলে এ রকম হত।' বরং বলো, 'আল্লাহর (লিখিত) ভাগ্য এবং তিনি যা চেয়েছেন, তাই করেছেন।' কারণ, 'যদি' (শব্দ) শয়তানের কাজের দুয়ার খুলে দেয়।” (মুসলিম)

৭। ইসলাম বর্ণবৈষম্য স্বীকার করে না। জাতীয়তাবাদ ও দেশ, গোত্র, রঙ, ভাষা, বা জাতিভিত্তিক কোন পক্ষপাতিত্বের স্বীকৃতি দেয় না। মানুষে-মানুষে ভেদাভেদের প্রাচীর ভেঙ্গে চুরমার করে ইসলাম। মহান স্রষ্টা মানুষকে ভিন্ন ভিন্ন রঙ, ভাষা বা গোত্রের নানা বৈচিত্র দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। এটা তাঁর এক মহিমা ও সৃষ্টিকৌশল। তিনি বলেন, {وَمِنْ آيَاتِهِ خَلْقُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَاخْتِلَافُ أَلْسِنَتِكُمْ وَأَلْوَانِكُمْ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَاتٍ لِّلْعَالِمِينَ} (২২) সূরা রূম অর্থাৎ, তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে একটি নিদর্শন: আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বিভিন্নতা। এতে জ্ঞানীদের জন্য অবশ্যই বহু নিদর্শন রয়েছে। (রুমঃ ২২)

কিন্তু পার্থক্যের বেড়া ভেঙ্গে মানুষের মাঝে সাম্য প্রতিষ্ঠা করতে আহবান করেছেন তিনিই। তিনি বলেছেন, {يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَاكُم মِّ ذَكَرٍ وَأُنثَى وَجَعَلْنَاكُمْ شُعُوبًا وَقَبَائِلَ لِتَعَارَفُوا إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِندَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرٌ} (১৩) الحجرات অর্থাৎ, হে মানুষ! আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী হতে, পরে তোমাদেরকে বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমরা একে অপরেরর সাথে পরিচিত হতে পার। তোমাদের মধ্যে ঐ ব্যক্তিই আল্লাহর নিকট অধিক মর্যাদাসম্পন্ন যে অধিক আল্লাহ-ভীরু। আল্লাহ সবকিছু জানেন, সব কিছুর খবর রাখেন। (হুজুরাতঃ ১৩)

আর তাঁর প্রেরিত দূত বলেছেন, “নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা তোমাদের দেহ এবং তোমাদের আকৃতি দেখেন না, বরং তিনি তোমাদের অন্তর ও আমল দেখেন।” (মুসলিম) "কিয়ামতের দিন মোটা-তাজা বৃহৎ মানুষ আসবে, আল্লাহর কাছে তার মাছির ডানার সমানও ওজন হবে না।” (বুখারী ও মুসলিম) "আরবীর উপর অনারবীর এবং অনারবীর উপর আরবীর, কৃষ্ণকায়ের উপর শ্বেতকায়ের এবং শ্বেতকায়ের উপর কৃষ্ণকায়ের কোন শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা নেই। শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা আছে তো কেবল তাক্বওয়ার কারণেই।” (মুসনাদে আহমাদ ৫/৪১১)

৮। ইসলাম সকল মানুষকে স্ব-স্ব অধিকার প্রদান করেছে। একজনের অধিকার-ভাগ কেটে অন্যকে প্রদান করেনি। হাদীসে বলা হয়েছে, (إِنَّ لِرَبِّكَ عَلَيْكَ حَقًّا وَلِنَفْسِكَ عَلَيْكَ حَقًّا وَلِأَهْلِكَ عَلَيْكَ حَقًّا فَأَعْطِ كُلَّ ذِي حق حقه. 'নিশ্চয় তোমার উপর তোমার প্রভুর অধিকার রয়েছে। তোমার প্রতি তোমার আত্মারও অধিকার আছে এবং তোমার প্রতি তোমার পরিবারেরও অধিকার রয়েছে। অতএব তুমি প্রত্যেক অধিকারীকে তার অধিকার প্রদান কর।' (বুখারী)

📘 দ্বীনে ইসলামের সৌন্দর্য ও বৈশিষ্ট্য > 📄 নারী-কল্যাণ বিষয়ে ইসলামের বৈশিষ্ট্য

📄 নারী-কল্যাণ বিষয়ে ইসলামের বৈশিষ্ট্য


১। ইসলাম নারীকে তার যথার্থ মর্যাদা ও অধিকার প্রদান করেছে। মহান আল্লাহ বলেছেন, {وَلَا تَتَمَنَّوْا مَا فَضَّلَ اللهُ بِهِ بَعْضَكُمْ عَلَى بَعْضٍ لِّرِّجَالِ نَصِيبٌ مِّمَّا اكْتَسَبُوا وَلِلنِّسَاءِ نَصِيبٌ مِّمَّا اكْتَسَبْنَ وَاسْأَلُواْ اللّهَ مِن فَضْلِهِ إِنَّ اللَّهَ كَانَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمًا} (৩২) সূরা আন-নিসা অর্থাৎ, যা দিয়ে আল্লাহ তোমাদের কাউকেও কারোর উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন, তোমরা তার লালসা করো না। পুরুষগণ যা অর্জন করে, তা তাদের প্রাপ্য অংশ এবং নারীগণ যা অর্জন করে, তা তাদের প্রাপ্য অংশ। তোমরা আল্লাহর কাছে তাঁর অনুগ্রহ প্রার্থনা কর। নিশ্চয় আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বজ্ঞ। (নিসাঃ ৩২)

২। মায়ের পায়ের তলায় পুরুষের বেহেস্ত নির্ধারণ করেছে। মহানবী ﷺ বলেছেন, “তুমি মায়ের খিদমতে অবিচল থাক। কারণ, তাঁর পদতলে তোমার জান্নাত রয়েছে।” (ইবনে মাজাহ, সহীহ নাসাঈ ২৯০৮নং)

৩। স্ত্রীকে স্বামীর লেবাস বলে মর্যাদা দিয়েছে। মহান আল্লাহ বলেছেন, {هُنَّ لِبَاسٌ لَّكُمْ وَأَنتُمْ لِبَاسٌ لَّهُنَّ} (১৮৭) সূরা আল-বাক্বারা অর্থাৎ, তারা তোমাদের পোশাক এবং তোমরা তাদের পোশাক। (বাক্বারাহঃ ১৮৭)

৪। কন্যাকে মানুষের জন্য দোযখের পর্দা ও আবরণ নির্ধারণ করেছে। মহানবী বলেছেন, “যে ব্যক্তি এই একাধিক কন্যা নিয়ে সঙ্কটাপন্ন হবে, অতঃপর সে তাদের প্রতি যথার্থ সদ্ব্যবহার করবে, সেই ব্যক্তির জন্য ঐ কন্যারা জাহান্নাম থেকে অন্তরাল (পর্দা) স্বরূপ হবে।” (বুখারী ১৪১৮ নং, মুসলিম ২৬২৯ নং)

তিনি আরো বলেছেন, “যে ব্যক্তি দুটি অথবা তিনটি কন্যা, কিংবা দুটি অথবা তিনটি বোন তাদের মৃত্যু অথবা বিবাহ, অথবা সাবালিকা হওয়া পর্যন্ত, কিংবা ঐ ব্যক্তির মৃত্যু পর্যন্ত যথার্থ প্রতিপালন করে, সে ব্যক্তি আর আমি (পরকালে) তর্জনী ও মধ্যমা অঙ্গুলিদ্বয়ের মত পাশাপাশি অবস্থান করব।” (আহমাদ ৩/১৪৭-১৪৮, ইবনে হিব্বান ২০৪৫ নং, সিলসিলাহ সহীহাহ ২৯৬ নং)

৫। বিধবা ও তালাকপ্রাপ্তার জন্য পুনর্বিবাহ বৈধ করেছে। মহান আল্লাহ বলেছেন, {وَأَنكِحُوا الْأَيَامَى مِنكُمْ وَالصَّالِحِينَ مِنْ عِبَادِكُمْ وَإِمَائِكُمْ إِن يَكُونُوا فُقَرَاء يُغْنِهِمُ اللَّهُ مِن فَضْلِهِ وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ) (৩২) سورة النور অর্থাৎ, তোমাদের মধ্যে যাদের স্বামী-স্ত্রী নেই, তাদের বিবাহ সম্পাদন কর এবং তোমাদের দাস-দাসীদের মধ্যে যারা সৎ, তাদেরও। তারা অভাবগ্রস্ত হলে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে অভাবমুক্ত ক'রে দেবেন। আর আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ। (নূরঃ ৩২)

৬। সকল ক্ষেত্রে নারীর ভরণ-পোষণের দায়িত্ব পুরুষের উপর ন্যস্ত করেছে। নারী সৃষ্টিগতভাবে দুর্বল বলেই পুরুষকেই তার কর্তা নির্বাচন করেছে। মহান আল্লাহ বলেছেন, {الرِّجَالُ قَوَّامُونَ عَلَى النِّسَاء بِمَا فَضَّلَ اللَّهُ بَعْضَهُمْ عَلَى بَعْضٍ وَبِمَا أَنفَقُوا مِنْ أَمْوَالِهِمْ} (৩৪) سورة النساء অর্থাৎ, পুরুষ নারীর কর্তা। কারণ, আল্লাহ তাদের এককে অপরের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন এবং এ জন্য যে পুরুষ (তাদের জন্য) ধন ব্যয় করে। (নিসাঃ ৩৪)

{وَلَهُنَّ মִثْلُ الَّذِي عَلَيْهِنَّ بِالْمَعْرُوفِ وَلِلرِّجَالِ عَلَيْهِنَّ دَرَجَةٌ وَاللَّهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ} (২২৮) سورة البقرة অর্থাৎ, নারীদের তেমনি ন্যায়-সঙ্গত অধিকার আছে যেমন আছে তাদের উপর পুরুষদের। কিন্তু নারীদের উপর পুরুষদের কিছুটা মর্যাদা আছে। আল্লাহ মহাপরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। (বাক্বারাহঃ ২২৮)

৭। নারী পুরুষের কাছে অবহেলিতা ছিল। কন্যা-সন্তান অবাঞ্ছনীয় ছিল। তাই তাকে ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরে হত্যা করা হতো, মাটিতে পুঁতে ফেলা হতো, কন্যার জনক হওয়াটা অপমানজনক ভাবা হতো। ইসলাম এ সবকে অন্যায় ঘোষণা করে কন্যার মর্যাদা রক্ষা করেছে। কন্যা-ঘাতকরা রক্ষা পাবে না। {وَإِذَا الْمَوْؤُودَةُ سُئِلَتْ (৮) بِأَيِّ ذَنبٍ قُتِلَتْ} (৯) التكوير অর্থাৎ, যখন জীবন্ত-প্রোথিত কন্যাকে জিজ্ঞেস করা হবে, কোন্ অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল? (তাকভীরঃ ৮-৯)

কন্যা-সন্তানের ব্যাপারে মানুষের মন ও মানসিকতা এমন ছিল যে, وَإِذَا بُشِّرَ أَحَدُهُمْ بِالأُنثَى ظَلَّ وَجْهُهُ مُسْوَدّاً وَهُوَ كَظِيمٌ (৫৮) يَتَوارَى مِنَ الْقَوْمِ مِن سُوءِ مَا بُشِّرَ بِهِ أَيُمْسِكُهُ عَلَى هُونٍ أَمْ يَدُسُّهُ فِي التَّرَابِ أَلَا سَاءَ مَا يَحْكُمُونَ} (৫৯) النحل অর্থাৎ, যখন তাদের কাউকে কন্যা-সন্তানের সুসংবাদ দেওয়া হয়, তখন তার মুখমন্ডল কালো হয়ে যায় এবং সে অসহনীয় মনস্তাপে ক্লিষ্ট হয়। তাকে যে সংবাদ দেওয়া হয়, তার গ্লানি হেতু সে নিজ সম্প্রদায় হতে আত্মগোপন করে; সে চিন্তা করে যে, হীনতা সত্ত্বেও সে তাকে রেখে দেবে, না মাটিতে পুঁতে দেবে। সাবধান! তারা যা সিদ্ধান্ত করে, তা কতই না নিকৃষ্ট। (নাহল: ৫৮-৫৯)

৮। আধুনিক জাহেলিয়াতেও নারী অবহেলিতা ও বঞ্চিতা। বিশেষ করে পণ ও যৌতুক প্রথার বিষাক্ত পরিবেশে সমাজের মন যেন গাইছে, 'কন্যা ঘরের আবর্জনা, পয়সা দিয়ে ফেলতে হয়, রক্ষণীয়া পালনীয়া শিক্ষণীয়া আদৌ নয়।' কিন্তু ইসলাম নারীর মর্যাদা দিয়েছে। পণ-যৌতুক গ্রহণ করতে নয়, বরং মোহর প্রদান করে বিবাহ করতে আদেশ করা হয়েছে পুরুষকে। মহান আল্লাহ বলেছেন, وَأُحِلَّ لَكُم মَّا وَرَاء ذَلِكُمْ أَن تَبْتَغُوا بِأَمْوَالِكُم مُّحْصِنِينَ غَيْرَ مُسَافِحِينَ فَمَا اسْتَمْتَعْتُم بِهِ مِنْهُنَّ فَآتُوهُنَّ أُجُورَهُنَّ فَرِيضَة} (২৪) سورة النساء অর্থাৎ, নারীদের মধ্যে তোমাদের অধিকারভুক্ত দাসী ব্যতীত সকল সধবা তোমাদের জন্য নিষিদ্ধ, তোমাদের জন্য এ হল আল্লাহর বিধান। উল্লিখিত নারীগণ ব্যতীত আর সকলকে বিবাহ করা তোমাদের জন্য বৈধ করা হল; এই শর্তে যে, তোমরা তাদেরকে নিজ সম্পদের বিনিময়ে বিবাহের মাধ্যমে গ্রহণ করবে, অবৈধ যৌন-সম্পর্কের মাধ্যমে নয়। অতঃপর তোমরা তাদের মধ্যে যাদের (মাধ্যমে দাম্পত্যসুখ) উপভোগ করবে, তাদেরকে নির্ধারিত মোহর অর্পণ কর। (নিসাঃ ২৪)

৯। কামুকদের কামনা, লম্পটদের লাম্পট্য ও ইভটিজারদের ইভটিজিং থেকে নারীকে মুক্তি দিতে ইসলাম পর্দার বিধান দিয়েছে। সম্ভ্রান্ত মহিলার পরিচয় দিতে নারীকে 'হিজাব' ব্যবহার করতে বলা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেছেন, يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ قُل لِّأَزْوَاجِكَ وَبَنَاتِكَ وَنِسَاء الْمُؤْمِنِينَ يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ মִ جَلَابِيبِهِنَّ ذَلِكَ أَدْنَى أَن يُعْرَفْنَ فَلَا يُؤْذَيْنَ وَكَانَ اللَّهُ غَفُوراً رَّحِيمًا} অর্থাৎ, হে নবী! তুমি তোমার স্ত্রীগণকে, কন্যাগণকে ও বিশ্বাসীদের রমণীগণকে বল, তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দংশ নিজেদের (মুখমন্ডলের) উপর টেনে দেয়। এতে তাদেরকে চেনা সহজতর হবে; ফলে তাদেরকে উত্ত্যক্ত করা হবে না। আর আল্লাহ চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (আহযাবঃ ৫৯)

১০। নারীর নিরাপত্তার স্বার্থেই পরপুরুষের সাথে বিশেষ পদ্ধতিতে বাক্যালাপ করার বিধান দিয়েছে ইসলাম। মহান আল্লাহ বলেছেন, يَا نِسَاءِ النَّبِيِّ لَسْتُنَّ كَأَحَدٍ مِّنَ النِّسَاء إِنِ اتَّقَيْتُنَّ فَلَا تَخْضَعْنَ بِالْقَوْلِ فَيَطْمَعَ الَّذِي فِي قَلْبِهِ مَرَضٌ وَقُلْنَ قَوْلاً مَّعْرُوفاً} الأحزاب ৩২ অর্থাৎ, হে নবী-পত্নীগণ! তোমরা অন্য নারীদের মত নও; যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, তবে পরপুরুষের সাথে কোমল কণ্ঠে এমনভাবে কথা বলো না, যাতে অন্তরে যার ব্যাধি আছে সে প্রলুব্ধ হয়। আর তোমরা সদালাপ কর। (স্বাভাবিকভাবে কথা বল।) (আহযাবঃ ৩২)

উক্ত আয়াতে সম্বোধন যদিও নবী-পত্নীগণকে করা হয়েছে, তবুও তার বিধান প্রত্যেক মুসলিম নারীর জন্য। যেহেতু উক্ত বিধান পালনের ব্যাপারে তাঁদের তুলনায় এদের প্রয়োজনীয়তা বেশি।

১১। একই কারণে নারী-পুরুষ উভয়কেই চক্ষু অবনত করার বিধান দিয়েছে। যার দিকে সকাম দৃষ্টিপাত ক্ষতিকর হতে পারে, তার দিকে দৃষ্টিপাত নিষেধ করেছে। মহান আল্লাহ বলেছেন, {قُل لِّلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا মִ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ ذَلِكَ أَزْكَى لَهُمْ إِنَّ اللَّهُ خَبِيرٌ بِما يَصْنَعُونَ (৩০) وَقُل لِّلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ মִ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ মִهْهَا وَلْيَضْرِبْنَ بِخُمُرِهِنَّ عَلَى جُيُوبِهِنَّ ....) (৩১) سورة النور অর্থাৎ, বিশ্বাসীদেরকে বল, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত করে এবং তাদের যৌন অঙ্গকে সাবধানে সংযত রাখে; এটিই তাদের জন্য অধিকতর পবিত্র। ওরা যা করে, নিশ্চয় আল্লাহ সে বিষয়ে অবহিত। বিশ্বাসী নারীদেরকে বল, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত করে ও তাদের লজ্জাস্থান রক্ষা করে। তারা যা সাধারণতঃ প্রকাশ থাকে তা ব্যতীত তাদের সৌন্দর্য যেন প্রদর্শন না করে, তারা তাদের বক্ষঃস্থল যেন মাথার কাপড় দ্বারা আবৃত রাখে। (নূর: ৩০-৩১)

মহানবী বলেন, "একবার নজর পড়ে গেলে আর দ্বিতীয়বার তাকিয়ে দেখো না। প্রথমবারের (অনিচ্ছাকৃত) নজর তোমার জন্য বৈধ। কিন্তু দ্বিতীয়বারের নজর বৈধ নয়। (আহমাদ, আবু দাউদ, তিরমিযী, হাকেম, সহীহুল জামে' ৭৯৫৩ নং)

১২। একই কারণে মহিলাকে এমনভাবে চলাফেরা করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে পর-পুরুষের মনে আকর্ষণ সৃষ্টি না করে। মহান আল্লাহ বলেছেন, {وَلَا يَضْرِبْنَ بِأَرْجُلِهِنَّ لِيُعْلَمَ مَا يُخْفِينَ মִ زِينَتِهِنَّ وَتُوبُوا إِلَى اللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَا الْمُؤْمِنُونَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ) (৩১) سورة النور অর্থাৎ, তারা যেন এমন সজোরে পদক্ষেপ না করে, যাতে তাদের গোপন আভরণ প্রকাশ পেয়ে যায়। হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা সকলে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার। (নূর: ৩১)

মহানবী বলেছেন, "প্রত্যেক চক্ষুই ব্যভিচারী। আর মহিলা যদি (কোন প্রকার) সুগন্ধ ব্যবহার করে কোন (পুরুষদের) মজলিসের পাশ দিয়ে অতিক্রম করে, তবে সে ব্যভিচারিণী (বেশ্যার মেয়ে)।” (আবু দাউদ, তিরমিযী, নাসাঈ, ইবনে হিব্বান, ইবনে খুযাইমাহ, হাকেম, সহীহুল জামে' ৪৫৪০নং)

১৩। নারীর আবেগ নিয়ে যাতে কেউ খেলতে না পারে, নারীর অনভিজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে যাতে কেউ তাকে প্রবঞ্চিতা ও প্রতারিতা না করতে পারে, তার জন্য তার বিবাহে অভিভাবকের অনুমতি আবশ্যক করেছে। মহানবী বলেন, أَيُّمَا امْرَأَة نَكَحَت نَفْسَهَا بِغَيْر إِذن وَلِيَّهَا فَنِكَاحُهَا بَاطِلٌ فنكاحها بَاطِل فنكاحها باطل). অর্থাৎ, মহানবী বলেন, “যে নারী তার অভিভাবকের অনুমতি ছাড়াই নিজে নিজে বিবাহ করে, তার বিবাহ বাতিল, বাতিল, বাতিল।" (আহমাদ, আবু দাউদ, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ, দারেমী, মিশকাত ৩১৩১ নং)

অবশ্য নারীর সম্মতিকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, তার সম্মতি না নিয়ে জোর করে কারো সাথে বিবাহকে অবৈধ করা হয়েছে। যেমন অপছন্দনীয় কারো সাথে বিবাহ হলে তাকে তালাক নেওয়ার অধিকারও দেওয়া হয়েছে।

১৪। নারীর স্বার্থেই একাধিক বিবাহ বৈধ করেছে ইসলাম। তার কোন ত্রুটির কারণে স্বামী তাকে বর্জন করলে তার দুর্দিন আসে, পুরুষের তুলনায় নারীর সংখ্যা বেশি হলে বহু নারী অবিবাহিতা থেকে যায়, স্ত্রী যৌন-মিলনে অক্ষম বা শীতল হলে স্বামী পরকীয়ার প্রেমে পড়ে, আরো কত কী। কিন্তু একাধিক বিবাহ করার সুযোগ সৃষ্টি করে দিলে বৈধভাবে স্বামীও খোশ হয়, স্ত্রীও স্ত্রী থাকে। তবে তাতে শর্ত হল পুরুষকে স্ত্রীদের মাঝে ন্যায়পরায়ণতা বজায় রাখতে হবে। নচেৎ একাধিক বিবাহ বৈধ নয়। মহান আল্লাহ বলেছেন, وَإِنْ خِفْتُمْ أَلا تُقْسِطُواْ فِي الْيَتَامَى فَانكِحُوا مَا طَابَ لَكُم মِّ النِّسَاءِ مَثْنَى وَثُلَاثَ وَرُبَاعَ فَإِنْ خِفْتُمْ أَلا تَعْدِلُوا فَوَاحِدَةً أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ ذَلِكَ أَدْنَى أَلا تَعُولُوا} (৩) سورة النساء অর্থাৎ, আর তোমরা যদি আশংকা কর যে, পিতৃহীনাদের প্রতি সুবিচার করতে পারবে না, তবে বিবাহ কর (স্বাধীন) নারীদের মধ্যে যাকে তোমাদের ভাল লাগে; দুই, তিন অথবা চার। আর যদি আশংকা কর যে, সুবিচার করতে পারবে না, তবে একজনকে (বিবাহ কর) অথবা তোমাদের অধিকারভুক্ত (ক্রীত অথবা যুদ্ধবন্দিনী) দাসীকে (স্ত্রীরূপে ব্যবহার কর)। এটাই তোমাদের পক্ষপাতিত্ব না করার অধিকতর নিকটবর্তী। (নিসাঃ ৩) যেমন এমার্জেন্সী গেটের মতো তালাক (বিবাহ-বিচ্ছেদ) কেও বৈধতা দান করেছে ইসলাম।

১৫। জাহেলী যুগে নারীই এক প্রকার মীরাসের সম্পত্তি ছিল। তাকে মীরাস থেকে বঞ্চিত করা হতো। ইসলাম তাকে তার প্রাপ্য হক প্রদান করেছে। কখনো পুরুষের অর্ধেক, কখনো পুরুষের সমান। আল- কুরআনের সূরা নিসায় তার বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে।

১৬। স্বামীর কাছে স্ত্রীর মর্যাদা নিয়ে সমান ব্যবহার পাওয়া অধিকারিণী করেছে নারীকে। মহান আল্লাহ বলেছেন, وَلَهُنَّ মִثْلُ الَّذِي عَلَيْهِنَّ بِالْمَعْرُوفِ وَلِلرِّجَالِ عَلَيْهِنَّ دَرَجَةٌ وَاللَّهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ} (২২৮) سورة البقرة অর্থাৎ, নারীদের তেমনি ন্যায়-সঙ্গত অধিকার আছে যেমন আছে তাদের উপর পুরুষদের। কিন্তু নারীদের উপর পুরুষদের কিছুটা মর্যাদা আছে। আল্লাহ মহাপরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। (বাক্বারাহঃ ২২৮)

{وَوعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ فَإِن كَرِهْتُمُوهُنَّ فَعَسَى أَن تَكْرَهُوا شَيْئًا وَيَجْعَلَ اللَّهُ فِيهِ خَيْرًا كَثِيرًا} (১৯) سورة النساء অর্থাৎ, তাদের সাথে সৎভাবে জীবন যাপন কর; তোমরা যদি তাদেরকে ঘৃণা কর, তাহলে এমন হতে পারে যে, আল্লাহ যাতে প্রভূত কল্যাণ রেখেছেন, তোমরা তাকে ঘৃণা করছ। (নিসাঃ ১৯)

১৭। মহান আল্লাহর কাছে আনুগত্যের প্রতিদানে নারীকেও পুরুষের সমান করা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেছেন, {إِنَّ الْمُسْلِمِينَ وَالْمُسْلِمَاتِ وَالْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ وَالْقَانِتِينَ وَالْقَانِتَاتِ وَالصَّادِقِينَ وَالصَّادِقَاتِ وَالصَّابِرِينَ وَالصَّابِرَاتِ وَالْخَاشِعِينَ وَالْخَاشِعَاتِ وَالْمُتَصَدِّقِينَ وَالْمُتَصَدِّقَاتِ وَالصَّائِمِينَ وَالصَّائِمَاتِ وَالْحَافِظِينَ فُرُوجَهُمْ وَالْحَافِظَاتِ وَالذَّاكِرِينَ اللَّهَ كَثِيراً وَالذَّاكِرَاتِ أَعَدَّ اللَّهُ لَهُم মَّغْفِرَةً وَأَجْراً عظِيماً} الأحزاب ৩৫ অর্থাৎ, নিশ্চয়ই আত্মসমর্পণকারী (মুসলিম) পুরুষ ও আত্মসমর্পণকারী (মুসলিম) নারী, বিশ্বাসী পুরুষ ও বিশ্বাসী নারী, অনুগত পুরুষ ও অনুগত নারী, সত্যবাদী পুরুষ ও সত্যবাদী নারী, ধৈর্যশীল পুরুষ ও ধৈর্যশীল নারী, বিনীত পুরুষ ও বিনীত নারী, দানশীল পুরুষ ও দানশীল নারী, রোযা পালনকারী পুরুষ ও রোযা পালনকারী নারী, যৌনাঙ্গ হিফাযতকারী (সংযমী) পুরুষ ও যৌনাঙ্গ হিফাযতকারী (সংযমী) নারী, আল্লাহকে অধিক স্মরণকারী পুরুষ ও আল্লাহকে অধিক স্মরণকারী নারী---এদের জন্য আল্লাহ ক্ষমা ও মহাপ্রতিদান রেখেছেন। (আহযাবঃ ৩৫)

{فَاسْتَجَابَ لَهُمْ رَبُّهُمْ أَنِّي لَا أُضِيعُ عَمَلَ عَامِلٍ মِّكُم مِّ ذَكَرٍ أَوْ أُنثَى بَعْضُكُم মِّ بَعْضٍ} آل عمران ১৯৫ অর্থাৎ, অতঃপর তাদের প্রতিপালক তাদের ডাকে সাড়া দিয়ে বলেন, আমি তোমাদের মধ্যে কোন কর্মনিষ্ঠ নর অথবা নারীর কর্ম বিফল করি না; তোমরা পরস্পর সমান। (আলে ইমরানঃ ১৯৫)

{وَمَن يَعْمَلْ মִ الصَّالِحَاتِ মִ ذَكَرٍ أَوْ أُنثَى وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَأُوْلَئِكَ يَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ وَلَا يُظْلَمُونَ نَقِيراً النساء ১২৪ অর্থাৎ, আর পুরুষই হোক অথবা নারীই হোক, যারাই বিশ্বাসী হয়ে সৎকাজ করবে, তারাই জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং তাদের প্রতি (খেজুরের আঁটির পিঠে) বিন্দু পরিমাণও যুলুম করা হবে না। (নিসাঃ ১২৪)

পক্ষান্তরে যেখানে নারীকে পুরুষের সমানাধিকার দেওয়া হয়নি, যেমন পিতার ওয়ারেস হওয়ার ক্ষেত্রে, একই সময়ে একাধিক স্বামী রাখার ক্ষেত্রে ইত্যাদি, সেখানে সৃষ্টিকর্তার মহা কৌশল ও ইসলামের হিকমতপূর্ণ যৌক্তিকতা আছে। জ্ঞানিগণ জ্ঞান-গবেষণা করলেই সহজে বুঝতে পারবেন, তাতে আসলে নারীর মর্যাদা আদৌ ক্ষুণ্ণ করা হয়নি।

📘 দ্বীনে ইসলামের সৌন্দর্য ও বৈশিষ্ট্য > 📄 আম অধিকারে ইসলামের বৈশিষ্ট্য

📄 আম অধিকারে ইসলামের বৈশিষ্ট্য


১। ইসলাম প্রত্যেক মানুষকে তার স্বাধিকার প্রদান করতে উদ্বুদ্ধ করে। শুধু মানুষই নয়, জীব-জন্তু ও উদ্ভিদের অধিকার সম্বন্ধেও উদাসীন নয় ইসলাম। অধিকারীর অধিকার লংঘন করতে নিষেধ করেছে ইসলাম। মহান আল্লাহ বলেন, {وَلَا تَعْتَدُوا إِنَّ اللَّهَ لاَ يُحِبُّ الْمُعْتَدِينَ} (১৯০) البقرة والمائدة ৮৭ অর্থাৎ, বাড়াবাড়ি (সীমালংঘন) করো না, নিশ্চয় আল্লাহ বাড়াবাড়িকারীদেরকে পছন্দ করেন না। (বাক্বারাহঃ ১৯০, মায়িদাহঃ ৮৭)

পশুর প্রতি দয়াপ্রদর্শনে পুরস্কার রেখেছে ইসলাম। রসূল বলেন, “এক ব্যক্তি এক কুয়ার নিকটবর্তী হয়ে তাতে অবতরণ করে পানি পান করল। অতঃপর উঠে দেখল, কুয়ার পাশে একটি কুকুর (পিপাসায়) জিহ্বা বের করে হাঁপাচ্ছে। তার প্রতি লোকটির দয়া হল। সে তার পায়ের একটি (চর্মনির্মিত) মোজা খুলে (কুয়াতে নেমে তাতে পানি ভরে এনে) কুকুরটিকে পান করাল। ফলে আল্লাহ তার এই কাজের প্রতিদান স্বরূপ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করালেন।" লোকেরা বলল, 'হে আল্লাহর রসূল! জীব-জন্তর প্রতি দয়াপ্রদর্শনেও কি আমাদের সওয়াব আছে? তিনি বললেন, “প্রত্যেক সজীব প্রাণবিশিষ্ট জীবের (প্রতি দয়াপ্রদর্শনে) সওয়াব বিদ্যমান।” (বুখারী ২৪৬৬ নং, মুসলিম ২২৪৪ নং)

পশুর অধিকার নষ্ট করার এবং তার প্রতি নিষ্ঠুর হওয়ার সাজা রেখেছে ইসলাম। রাসূলুল্লাহ বলেছেন, عُذِّبَتْ امْرَأَةٌ فِي هِرَّةٍ سَجَنَتْهَا حَتَّى مَاتَتْ فَدَخَلَتْ فِيهَا النَّارَ لَا هِيَ أَطْعَمَتْهَا وَلَا سَقَتْهَا إِذْ حَبَسَتْهَا وَلَا هِيَ تَرَكَتْهَا تَأْكُلُ মִ خَشَاشِ الْأَرْضِ). "এক মহিলাকে একটি বিড়ালের জন্য শাস্তি দেওয়া হয়েছে। সে তাকে বেঁধে রেখেছিল এবং অবশেষে সে মারা গিয়েছিল, পরিণতিতে মহিলা তারই কারণে জাহান্নামে প্রবেশ করল। সে যখন তাকে বেঁধে রেখেছিল, তখন তাকে আহার ও পানি দিত না এবং তাকে ছেড়েও দিত না যে, সে কীট-পতঙ্গ ধরে খাবে।” (বুখারী ও মুসলিম)

একদা মহানবী একটি উটকে দেখলেন, (ক্ষুধায়) তার পিঠের সাথে পেট লেগে গেছে। তা দেখে তিনি বললেন, “তোমরা এই অবলা জন্তুদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় কর। সুতরাং উত্তমভাবে (সুস্থ থাকা অবস্থায়) তাতে সওয়ার হও এবং উত্তমভাবে (সুস্থ থাকা অবস্থায়) তা খাও (বা তার পিঠ থেকে নেমে যাও)।” (আবু দাউদ, ইবনে খুযাইমাহ, সহীহ তারগীব ২২৭৩নং)

অহেতুক প্রাণী হত্যা করতে নিষেধ করেছে ইসলাম। ইসলামের নবী বলেছেন, (إِنَّ أَعْظَمَ الذُّنُوبِ عِنْدَ اللَّهِ رَجُلٌ تَزَوَّجَ امْرَأَةً فَلَمَّا قَضَى حَاجَتَهُ মִْهَا طَلَّقَهَا وَذَهَبَ بِمَهْرُها وَرَجُلٌ اسْتَعْمَلَ رَجُلاً فَذَهَبَ بِأُجْرَتِهِ وَآخَرُ يَقْتُلُ دَابَّةً عَبثًا). “আল্লাহর নিকট সব চাইতে বড় পাপিষ্ঠ সেই ব্যক্তি, যে কোন মহিলাকে বিবাহ করে, অতঃপর তার নিকট থেকে মজা লুটে নিয়ে তাকে তালাক দেয় এবং তার মোহরও আত্মসাৎ করে। (দ্বিতীয় হল) সেই ব্যক্তি, যে কোন লোককে মজুর খাটায়, অতঃপর তার মজুরী আত্মসাৎ করে এবং (তৃতীয় হল) সেই ব্যক্তি, যে খামোখা পশু হত্যা করে।” (হাকেম, বাইহাকী, সহীহুল জামে' ১৫৬৭ নং)

অহেতুক গাছ কেটে ফেলতে নিষেধ করেছে ইসলাম। মহানবী ﷺ বলেছেন, "যে ব্যক্তি (খামোখা) কোন কুল গাছ কেটে ফেলবে (যে গাছের নিচে মুসাফির বা পশু-পক্ষী ছায়া গ্রহণ করত), সে ব্যক্তির মাথাকে আল্লাহ সোজা জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন।” (আবু দাউদ ৫২৩৯নং)

ফল-ফসলের জন্য, পরিবেশ দূষণমুক্ত করার জন্য অথবা ছায়াগ্রহণ করার জন্য ইসলাম গাছ লাগাতে উদ্বুদ্ধ করেছে। মহানবী ﷺ বলেন, "কিয়ামত কায়েম হয়ে গেলেও তোমাদের কারো হাতে যদি কোন গাছের চারা থাকে এবং সে তা এর আগেই রোপন করতে সক্ষম হয়, তবে যেন তা রোপন করে ফেলে।” (আহমাদ, সঃ জামে। ১৪২৪নং)

প্রিয় নবী ﷺ আরো বলেন, "যে কোন মুসলিম গাছ লাগায় কিংবা কোন ফসল ফলায় আর তা হতে কোন পাখী, মানুষ অথবা চতুষ্পদ জন্তু ভক্ষণ করে, তবে তা তার জন্য সদকাহ (করার সমপরিমাণ সওয়াব লাভ) হয়।” (বুখারী ২৩২০নং)

২। মানুষের প্রতি দরদী হতে উদ্বুদ্ধ করে ইসলাম। মানুষের প্রতি হিতাকাঙ্ক্ষী হতে, তার ইহ-পরকালের ব্যাপারে কল্যাণকামী হতে অনুপ্রাণিত করে। মহানবী ﷺ বলেন, “দ্বীন হল হিতাকাঙ্ক্ষার নাম।" আমরা জিজ্ঞাসা করলাম, 'কার জন্য হে আল্লাহর রসূল!' তিনি বললেন, “আল্লাহ, তাঁর কিতাব, তাঁর রসূল, মুসলিমদের নেতৃবর্গ এবং তাদের জনসাধারণের জন্য।” (মুসলিম ৫৫নং)

পরকালের শাস্তি থেকে মুক্তি দেওয়ার লক্ষ্যে মানুষকে সৎকর্মে আদেশ ও অসৎ কর্মে বাধা প্রদান করতে নির্দেশ দেয়। মহান আল্লাহ বলেন, {وَلْتَكُن মِّكُم মَّةٌ يَدْعُونَ إِلَى الْخَيْرِ وَيَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ وَأُوْلَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ} (১০৪) سورة آل عمران অর্থাৎ, তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকা উচিত, যারা (লোককে) কল্যাণের দিকে আহবান করবে এবং সৎকার্যের নির্দেশ দেবে ও অসৎ কার্য থেকে নিষেধ করবে। আর এ সকল লোকই হবে সফলকাম। (আলে ইমরানঃ ১০৪)

{كُنتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ وَتُؤْمِنُونَ باللهِ } (১১০) سورة آل عمران অর্থাৎ, তোমরাই শ্রেষ্ঠতম জাতি। মানবমন্ডলীর জন্য তোমাদের অভ্যুত্থান হয়েছে, তোমরা সৎকার্যের নির্দেশ দান করবে, অসৎ কার্য (করা থেকে) নিষেধ করবে, আর আল্লাহতে বিশ্বাস করবে। (আলে ইমরানঃ ১১০)

বলাই বাহুল্য যে, উপকারিতার স্থায়িত্বকাল অনুসারে উপকারীর মহত্ত্ব কম-বেশি হয়। যে উপকারী পার্থিব কোন উপকার করে মানুষের সাহায্য করে, হয়তো-বা ৬০/৭০ বছর জীবনের উপকার সাধন করে তাকে কৃতার্থ করে, সে উপকারী নিশ্চয় মহান। কিন্তু যে উপকারী পার্থিব জীবনে উপকার করার পরেও পরকালের অনন্তকাল জীবনে সুখী হওয়ার জন্য উপকার সাধন করে, সে উপকারী নিশ্চয় সুমহান।

৩। পার্থিব সাহায্য-সহযোগিতার ক্ষেত্রে ইসলাম মুসলিমকে অপর মুসলিমের জন্য আয়নাস্বরূপ মনে করে। সামাজিক বন্ধনের ক্ষেত্রে পুরো সমাজকে একটি অট্টালিকার মতো নিরূপণ করে। ধনীদের ধনে গরীবদের অধিকার নির্ধারণ করে। ইসলাম এমন সমাজ চায় না, যে সমাজে কেউ খাবে, কেউ খাবে না। কেউ পোলাও খাবে, কেউ রুটিও পাবে না। মহান আল্লাহ বলেছেন, {وَفِي أَمْوَالِهِمْ حَقٌّ لِّلسَّائِلِ وَالْمَحْرُومِ} (১৯) سورة الذاريات অর্থাৎ, তাদের ধন-সম্পদে রয়েছে ভিক্ষুক ও বঞ্চিতের হক। (যারিয়াতঃ ১৯)

{إِنَّمَا الصَّدَقَاتُ لِلْفُقَرَاءِ وَالْمَسَاكِينِ وَالْعَامِلِينَ عَلَيْهَا وَالْمُؤَلَّفَةِ قُلُوبُهُمْ وَفِي الرِّقَابِ وَالْغَارِمِينَ وَفِي سَبِيلِ اللَّهِ وَابْنِ السَّبِيلِ فَرِيضَةً মِّ اللَّهِ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ} (৬০) سورة التوبة অর্থাৎ, (ফরয) স্বাদক্বাসমূহ শুধুমাত্র নিঃস্ব, অভাবগ্রস্ত এবং স্বাদক্বাহ (আদায়ের) কাজে নিযুক্ত কর্মচারীদের জন্য, যাদের মনকে ইসলামের প্রতি অনুরাগী করা আবশ্যক তাদের জন্য, দাসমুক্তির জন্য, ঋণগ্রস্তদের জন্য, আল্লাহর পথে (সংগ্রামকারী) ও (বিপদগ্রস্ত) মুসাফিরের জন্য। এ হল আল্লাহর পক্ষ হতে নির্ধারিত (বিধান)। আর আল্লাহ মহাজ্ঞানী, প্রজ্ঞাময়। (তাওবাহঃ ৬০)

৪। দান-খয়রাত করে অনাথ, বিধবা ও দরিদ্রের সেবা করতে উদ্বুদ্ধ করে ইসলাম। দুর্বলদের প্রতি দয়াপ্রদর্শন করতে উৎসাহিত করে দ্বীনের বিধান। আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীর সাথে সদ্ব্যবহার করতে আগ্রহান্বিত করে ইসলামী শরীয়ত। মহান আল্লাহ বলেন, {وَاعْبُدُوا اللَّهَ وَلاَ تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا وَبِذِي الْقُرْبَى وَالْيَتَامَى وَالْمَسَاكِينِ وَالْجَارِ ذِي الْقُرْبَى وَالْجَارِ الْجُنُبِ وَالصَّاحِبِ بِالجَنبِ وَابْنِ السَّبِيلِ وَمَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ إِنَّ اللَّهَ لاَ يُحِبُّ মَن كَانَ مُخْتَالاً فَخُورًا} অর্থাৎ, তোমরা আল্লাহর উপাসনা কর ও কোন কিছুকে তাঁর অংশী করো না এবং পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন, পিতৃহীন, অভাবগ্রস্ত, আত্মীয় ও অনাত্মীয় প্রতিবেশী, সঙ্গী-সাথী, পথচারী এবং তোমাদের অধিকারভুক্ত দাস-দাসীদের প্রতি সদ্ব্যবহার কর। নিশ্চয় আল্লাহ আত্মম্ভরী দাম্ভিককে ভালবাসেন না। (নিসাঃ ৩৬)

মহানবী বলেছেন "আমি এবং নিজের অথবা অপরের অনাথ (এতীমের) তত্ত্বাবধায়ক জান্নাতে (পাশাপাশি) থাকব। আর বিধবা ও দুঃস্থ মানুষকে দেখাশুনাকারী ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় জিহাদকারীর সমতুল্য।” (ত্বাবারানীর আওসাত্ব, সহীহুল জামে' ১৪৭৬নং)

তিনি আরো বলেছেন, “আত্মীয়তার বন্ধন বজায় রাখা, সুন্দর চরিত্র অবলম্বন করা, এবং প্রতিবেশীর সাথে সদ্ব্যবহার রাখায় দেশ আবাদ থাকে এবং আয়ু বৃদ্ধি পায়।” (আহমাদ, সহীহুল জামে ৩৭৬৭নং)

তিনি আরো বলেছেন, (( وَاللَّهِ لَا يُؤْمِنُ ، وَاللَّهِ لَا يُؤْمِنُ ، وَاللَّهِ لا يُؤْمِنُ ! )) قِيلَ : মَنْ يَا رَسُولَ اللهِ ؟ قَالَ : ((الَّذِي لَا يَأْمَنُ جَارُهُ بَوَائِقَهُ !)). مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ "আল্লাহর কসম! সে ব্যক্তি মু'মিন নয়। আল্লাহর কসম! সে ব্যক্তি মু'মিন নয়। আল্লাহর কসম! সে ব্যক্তি মু'মিন নয়।” জিজ্ঞেস করা হল, 'কোন্ ব্যক্তি? হে আল্লাহর রসূল!' তিনি বললেন, “যে লোকের প্রতিবেশী তার অনিষ্ট থেকে নিরাপদে থাকে না।” (বুখারী ও মুসলিম)

৫। ইসলাম তার অনুসারীবর্গকে পূর্ণ একটি মাস উপবাস ও রোযা পালন করার নির্দেশ দেয়। যাতে তার মাধ্যমে শিখতে পারে আত্মসংযম, সহানুভূতি, সহমর্মিতা ও ধৈর্যশীলতা। অনুশীলন করতে পারে আল্লাহ-ভীতি ও সৎকর্মের। মহান আল্লাহ বলেছেন, {يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ মִ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ} (১৮৩) سورة البقرة অর্থাৎ, হে বিশ্বাসিগণ! তোমাদের জন্য সিয়ামের (রোযার) বিধান দেওয়া হল, যেমন বিধান তোমাদের পূর্ববর্তীগণকে দেওয়া হয়েছিল, যাতে তোমরা সংযমশীল হতে পার। (বাক্বারাহঃ ১৮৩)

৬। ইসলাম অনাথের তত্ত্বাবধান করতে উদ্বুদ্ধ করে। এতীমের প্রতি অনুগ্রহ করতে উৎসাহিত করে এবং তার অধিকার হরণ তথা সম্পদ ভক্ষণ করতে কঠোরভাবে নিষেধ করে। মহান আল্লাহ বলেছেন, وَآتُوا الْيَتَامَى أَمْوَالَهُمْ وَلَا تَتَبَدَّلُوا الْخَبِيثَ بِالطَّيِّبِ وَلَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَهُمْ إِلَى أَمْوَالِكُمْ إِنَّهُ كَانَ حُوبًا كَبِيرًا} (২) سورة النساء অর্থাৎ, পিতৃহীনদেরকে তাদের ধন-সম্পদ সমর্পণ কর এবং উৎকৃষ্টের সাথে নিকৃষ্ট বদল করো না এবং তোমাদের সম্পদের সাথে তাদের সম্পদকে মিশ্রিত ক'রে গ্রাস করো না; নিশ্চয় তা মহাপাপ। (নিসাঃ ২)

وَلَا تَقْرَبُواْ মَالَ الْيَتِيمِ إِلَّا بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ حَتَّى يَبْلُغَ أَشُدَّهُ وَأَوْفُوا بِالْعَهْدِ إِنَّ الْعَهْدَ كَانَ مَسْؤُولاً) (৩৪) سورة الإسراء অর্থাৎ, সাবালক না হওয়া পর্যন্ত সদুদ্দেশ্যে ছাড়া এতীমের সম্পত্তির নিকটবর্তী হয়ো না। আর প্রতিশ্রুতি পালন করো; নিশ্চয়ই প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে কৈফিয়ত তলব করা হবে। (৩৪)

{إِنَّ الَّذِينَ يَأْكُلُونَ أَمْوَالَ الْيَتَامَى ظُلْمًا إِنَّمَا يَأْكُلُونَ فِي بُطُونِهِمْ نَارًا وَسَيَصْلَوْنَ سَعِيرًا} (১০) سورة النساء অর্থাৎ, নিশ্চয় যারা পিতৃহীনদের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করে, তারা আসলে নিজেদের উদরে অগ্নি ভক্ষণ করে। আর অচিরেই তারা জ্বলন্ত আগুনে প্রবেশ করবে। (নিসাঃ ১০)

৭। ব্যবহারে ধনী-গরীব, আমীর-ফকীর, দেশী-বিদেশী বা কুলীন- অকুলীনের মাঝে কোন পার্থক্য করে না। ইসলামে সবাই সমান। মহান আল্লাহর দরবারে ও ইবাদতে সবাই বরাবর। {وَلَا تَطْرُدِ الَّذِينَ يَدْعُونَ رَبَّهُم بِالْغَدَاةِ وَالْعَشِيِّ يُرِيدُونَ وَجْهَهُ مَا عَلَيْكَ মִ حِسَابِهِم মِّ شَيْءٍ وَمَا মִ حِسَابِكَ عَلَيْهِم মِّ شَيْءٍ فَتَطْرُدَهُمْ فَتَكُونَ মִَ الظَّالِمِينَ} (৫২) সূরাহ্ আল-আনআম অর্থাৎ, যারা তাদের প্রতিপালককে প্রাতে ও সন্ধ্যায় তাঁর মুখমণ্ডল (দর্শন বা সন্তুষ্টি) লাভের জন্য ডাকে, তাদেরকে তুমি বিতাড়িত করো না। তাদের কর্মের জবাবদিহির দায়িত্ব তোমার নয় এবং তোমার কোন কর্মের জবাবদিহির দায়িত্ব তাদের নয় যে, তুমি তাদেরকে বিতাড়িত করবে, করলে তুমি অত্যাচারীদের অন্তর্ভুক্ত হবে। (আনআমঃ ৫২)

{وَاصْبِرْ نَفْسَكَ مَعَ الَّذِينَ يَدْعُونَ رَبَّهُم بِالْغَدَاةِ وَالْعَشِيِّ يُرِيدُونَ وَجْهَهُ وَلَا تَعْدُ عَيْنَاكَ عَنْهُمْ تُرِيدُ زِينَةَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَلَا تُطِعْ মَنْ أَغْفَلْنَا قَلْبَهُ عَنْ ذِكْرِنَا وَاتَّبَعَ هَوَاهُ وَكَانَ أَمْرُهُ فُرُطًا} (২৮) সূরাহ্ আল-কাহ্ফ অর্থাৎ, তুমি নিজেকে তাদেরই সংসর্গে রাখ, যারা সকাল ও সন্ধ্যায় তাদের প্রতিপালককে তাঁর মুখমণ্ডল (দর্শন বা সন্তুষ্টি) লাভের উদ্দেশ্যে আহবান করে এবং তুমি পার্থিব জীবনের শোভা কামনা করে, তাদের দিক হতে তোমার দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ো না। আর তুমি তার আনুগত্য করো না, যার হৃদয়কে আমি আমার স্মরণে অমনোযোগী ক'রে দিয়েছি, যে তার খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করে ও যার কার্যকলাপ সীমা অতিক্রম করে। (কাহফঃ ২৮)

{ عَبَسَ وَتَوَلَّى (1) أَنْ جَاءَهُ الأَعْمَى (২) وَمَا يُدْرِيكَ لَعَلَّهُ يَزَّكَّى (৩) أَوْ يَذَّكَّرُ فَتَنْفَعَهُ الذِّكْرَى (٤) أَمَّا মَنْ اسْتَغْنَى (৫) فَأَنْتَ لَهُ تَصَدَّى (৬) وَمَا عَلَيْكَ أَلا يَزَّكَّى (৭) وَأَمَّا মَنْ جَاءَكَ يَسْعَى (৮) وَهُوَ يَخْشَى (৯) فَأَنْتَ عَنْهُ تَلَقَّى (১০) كَلَّا إِنَّهَا تَذْكِرَةٌ (১১) فَمَنْ شَاءَ ذَكَرَهُ} (১২) অর্থাৎ, সে ভ্রূ কুঞ্চিত করল এবং মুখ ফিরিয়ে নিল। যেহেতু তার নিকট অন্ধ লোকটি আগমন করেছিল। তোমাকে কিসে জানাবে? হয়তো বা সে পরিশুদ্ধ হত। অথবা উপদেশ গ্রহণ করত, ফলে তা তার উপকারে আসত। পক্ষান্তরে যে লোক বেপরোয়া, তুমি তার প্রতি মনোযোগ দিলে। অথচ সে পরিশুদ্ধ না হলে তোমার কোন দোষ নেই। পক্ষান্তরে যে তোমার নিকট ছুটে এল, সভয় মনে, তুমি তার প্রতি বিমুখ হলে! কক্ষনো (এরূপ করবে) না। এটা তো উপদেশবাণী; যে ইচ্ছা করবে সে তা স্মরণ রাখবে (ও উপদেশ গ্রহণ করবে)। (আবাসাঃ ১-১২)

ইসলামে অস্পৃশ্যতা নেই, নেই জাতপাতের কোন প্রকার দুর্গন্ধ। যোগ্যতা অর্জন করলে ইমামতি করার অধিকার আছে সকলের। আল্লাহর দরবারে পরস্পরের পায়ে পা লাগিয়ে দাঁড়াবার অধিকার আছে সকলের। উর্দু কবি বলেছেন, 'এক হী সফ্ মে খড়ে হো গয়ে মাহমুদ ও ইয়ায, না কোয়ী বান্দা রহা, না কোয়ী বান্দা-নেওয়ায।'

ইসলামে জাতপাত নেই। ভেদাভেদের কোন প্রাচীর নেই। আপোসের সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের কোন অন্তরাল নেই। কবি বলেছেন, 'সৈয়দ, পাঠান, কাজী, মোল্লা, চৌধুরী বা খন্দকার, কুলি, চাষী, জোলা, নাপিত, কর্মকার বা কুন্তুকার। যে যাহাই হও, মুসলিম কিনা জানিতে আমি চাই, মুসলিম যদি এসো মোর বুকে তুমি যে আমার ভাই।'

📘 দ্বীনে ইসলামের সৌন্দর্য ও বৈশিষ্ট্য > 📄 সামাজিকতা ও সহাবস্থানে ইসলামের বৈশিষ্ট্য

📄 সামাজিকতা ও সহাবস্থানে ইসলামের বৈশিষ্ট্য


১। সামাজিকতা ও সহাবস্থানের ক্ষেত্রে মুসলিমদের মাঝে কোন ভেদাভেদ নেই। আমীর-গরীব, উঁচু-নিচু সকলেই একপাত্রে পানাহার করতে পারে। এক জায়গায় বসতে পারে। এমনকি মসজিদেও আমীর-গরীব সবাই সমান। সেখানে কেবল ধনীদের দাপট থাকবে---তা নয়। বসার জায়গা, যা যার, তা তার। গরীবকে তুলে কোন ধনী সেখানে বসতে পারে না।

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, "কোন ব্যক্তি অন্য কাউকে তার জায়গা থেকে উঠিয়ে দিয়ে সেখানে যেন অবশ্যই না বসে। বরং তোমরা জায়গা প্রশস্ত ক'রে ও নড়ে-সরে জায়গা ক'রে বসো।” (বুখারী ও মুসলিম)

যে জায়গায় যে বসেছিল, কোন কাজে সে অন্যত্র গিয়ে ফিরে এলে, সেই জায়গার বেশি হকদার সেই। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “মজলিস থেকে কেউ উঠে গিয়ে আবার সেখানে ফিরে এলে সেই ঐ জায়গার বেশি হকদার।” (মুসলিম) সেখানে আমীর-গরীব দেখা হয় না। গরীব হলেও সে তার নিজ জায়গা গ্রহণ করবে অনায়াসে। ধনী বা প্রভাবশালী বলেই কেউ অন্যদের মাঝে ফারাক সৃষ্টি তাদের মাঝে বসতে পারে না। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “কোন ব্যক্তির জন্য এটা বৈধ নয় যে, সে দু'জনের মধ্যে তাদের বিনা অনুমতিতে তফাৎ সৃষ্টি করবে। (আবূ দাউদ, তিরমিযী) আবু দাউদের এক বর্ণনায় আছে, "দু'জনের মধ্যে তাদের বিনা অনুমতিতে বসা যাবে না।”

উঠা-বসার আদব শিখাতেও কুরআন বলে, {يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا قِيلَ لَكُمْ تَفَسَّحُوا فِي الْمَجَالِسِ فَافْسَحُوا يَفْسَحِ اللَّهُ لَكُمْ وَإِذَا قِيلَ انشُزُوا فَانشُزُوا يَرْفَعِ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا মִكُم وَالَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ دَرَجَاتٍ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرٌ} (১১) سورة المجادلة অর্থাৎ, হে বিশ্বাসিগণ! যখন তোমাদেরকে বলা হয়, 'মজলিসে স্থান প্রশস্ত কর', তখন তোমরা প্রশস্ত ক'রে দাও। আল্লাহ তোমাদের জন্য প্রশস্ততা দেবেন। আর যখন বলা হয়, 'উঠে যাও', তখন তোমরা উঠে যাও। তোমাদের মধ্যে যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছে এবং যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে, আল্লাহ তাদেরকে বহু মর্যাদায় উন্নত করবেন। আর তোমরা যা কর, আল্লাহ সে সম্পর্কে সবিশেষ অবহিত। (মুজাদালাহঃ ১১)

২। তিনজন একত্রে থাকলে একজনকে ছেড়ে দুইজন গোপনে বা ফিস্ফিসিয়ে কিছু বলাকে পছন্দ করে না ইসলাম। যেহেতু তাতে তৃতীয়জনের মনে কুধারণা ও সন্দেহ সৃষ্টি হতে পারে এবং তার ফলে আপোসের মাঝে বিদ্বেষ ও মনোমালিন্য দেখা দিতে পারে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, "যখন (কোন স্থানে) একত্রে তিনজন থাকবে, তৃতীয়জনকে ছেড়ে যেন দু'জনে কানাকানি না করে।” (বুখারী ও মুসলিম)

৩। ইসলাম সহাবস্থানে ও লোকাচরণের আদব শিক্ষা দিয়ে মুসলিমকে পথে-ঘাটে বসতে মানা করে। মহানবী ﷺ বলেন, "তোমরা রাস্তায় বসা হতে বিরত থাক।” সাহাবীগণ বললেন, 'হে আল্লাহর রসূল! সে মজলিসে না বসলে তো আমাদের উপায় নেই; আমরা সেখানে কথাবার্তা বলি।' রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, "যখন তোমরা (সেখানে) না বসে মানবেই না, তখন তোমরা রাস্তার হক আদায় কর।" তাঁরা বললেন, 'হে আল্লাহর রসূল! রাস্তার হক কী?' তিনি বললেন, “দৃষ্টি সংযত রাখা, কাউকে কষ্ট না দেওয়া, সালামের জবাব দেওয়া, ভাল কাজের নির্দেশ ও মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করা।” (বুখারী-মুসলিম)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00