📄 আক্বীদা ও বিশ্বাসে ইসলামের সৌন্দর্য
১। স্রষ্টা ও উপাস্যের ব্যাপারটা ইসলামে খুব স্পষ্ট। তাঁর সত্তা ও গুণাবলীর ব্যাপারে ইসলাম সমুজ্জ্বল বিবৃতি দিয়েছে। কুরআন কারীমে বলা হয়েছে,
{قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ (1) اللَّهُ الصَّمَدُ (۲) لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُولَدْ (3) وَلَمْ يَكُنْ لَهُ كُفُواً أَحَدٌ} (٤)
অর্থাৎ, বল, তিনিই আল্লাহ একক (অদ্বিতীয়)। আল্লাহ অমুখাপেক্ষী (স্বয়ংসম্পূর্ণ)। তাঁর কোন সন্তান নেই এবং তিনিও কারো সন্তান নন এবং তাঁর সমতুল্য কেউই নেই। (ইখলাসঃ ১-৪)
{هُوَ اللَّهُ الَّذِي لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ عَالِمُ الْغَيْبِ وَالشَّهَادَةِ هُوَ الرَّحْمَنُ الرَّحِيمُ (۲۲) هُوَ اللَّهُ الَّذِي لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْمَلِكُ الْقُدُّوسُ السَّلَامُ الْمُؤْمِنُ الْمُهَيْمِنُ الْعَزِيزُ الْجَبَّارُ الْمُتَكَبِّرُ سُبْحَانَ اللهِ عَمَّا يُشْرِكُونَ (۲۳) هُوَ اللَّهُ الْخَالِقُ الْبَارِئُ الْمُصَوِّرُ لَهُ الْأَسْمَاءُ الْحُسْنَى يُسَبِّحُ لَهُ مَا فِي السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ وَهُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ} (٢٤) سورة الحشر
অর্থাৎ, তিনিই আল্লাহ, যিনি ব্যতীত কোন (সত্য) উপাস্য নেই, তিনি অদৃশ্য এবং দৃশ্যের পরিজ্ঞাতা, তিনিই অতি দয়াময়, পরম দয়ালু। তিনিই আল্লাহ, যিনি ব্যতীত কোন (সত্য) উপাস্য নেই। তিনিই অধিপতি, পবিত্র, নিরবদ্য, নিরাপত্তা বিধায়ক, রক্ষক, পরাক্রমশালী, প্রবল, গর্বের অধিকারী। যারা তার শরীক স্থির করে, আল্লাহ তা হতে পবিত্র মহান। তিনিই আল্লাহ সৃজনকর্তা, উদ্ভাবনকর্তা, রূপদাতা। সকল উত্তম নাম তাঁরই। আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে, সমস্তই তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে। আর তিনিই পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। (হাশ্রঃ ২২-২৪)
سَبَّحَ لِلَّهِ مَا فِي السَّমَوَاتِ وَالْأَرْضِ وَهُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ (১) لَهُ مُلْكُ السَّমَوَاتِ وَالْأَرْضِ يُحْيِ وَيُمِيتُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ (২) هُوَ الْأَوَّلُ وَالْآخِرُ وَالظَّاهِرُ وَالْبَاطِنُ وَهُوَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ (৩) هُوَ الَّذِي خَلَقَ السَّমَوَاتِ وَالْأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ يَعْلَمُ مَا يَلِجُ فِي الْأَرْضِ وَمَا يَخْرُجُ مِنْهَا وَمَا يَنْزِلُ مِنْ السَّمَاءِ وَمَا يَعْرُجُ فِيهَا وَهُوَ مَعَكُمْ أَيْنَ مَا كُنْتُمْ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ (٤) لَهُ مُلْكُ السَّمَوَاتِ وَالأَرْضِ وَإِلى اللَّهِ تُرْجَعُ الأُمُورُ (৫) يُولِجُ اللَّيْلَ فِي النَّهَارِ وَيُولِجُ النَّهَارَ فِي اللَّيْلِ وَهُوَ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ (৬) سورة الحديد
অর্থাৎ, আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে সবই আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে। তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সার্বভৌমত্ব তাঁরই; তিনি জীবন দান করেন ও মৃত্যু ঘটান; তিনি সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান। তিনিই আদি, অন্ত, ব্যক্ত ও গুপ্ত এবং তিনি সর্ববিষয়ে সম্যক অবহিত। তিনিই ছয় দিনে আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর আরশে সমাসীন হয়েছেন। তিনি জানেন যা কিছু ভূমিতে প্রবেশ করে ও যা কিছু তা হতে বের হয় এবং আকাশ হতে যা কিছু নামে ও আকাশে যা কিছু উত্থিত হয়। তোমরা যেখানেই থাক না কেন, তিনি তোমাদের সঙ্গে আছেন, তোমরা যা কিছু কর আল্লাহ তা দেখেন। আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সার্বভৌমত্ব তাঁরই, আর আল্লাহরই দিকে সব বিষয় প্রত্যাবর্তিত হবে। তিনিই রাত্রিকে প্রবেশ করান দিনে এবং দিনকে প্রবেশ করান রাত্রিতে। আর তিনি অন্তর্যামী। (হাদীদঃ ১-৬)
তাঁর দৃষ্টি ও জ্ঞান সর্বত্র আছে। তিনি আছেন সাত আসমানের উপর আরশে। এ জগতে তিনি দৃশ্য নন। জান্নাতে তাঁর চেহারা দেখা যাবে। কুরআন মাজীদের আরো বিভিন্ন জায়গায় মহান আল্লাহর কর্ম ও গুণাবলীর বিষয় উল্লিখিত হয়েছে, যার মাধ্যমে তাঁর ব্যাপারে উজ্জ্বল ধারণা পেতে পারে একজন জ্ঞানী মানুষ।
২। ইসলাম মানুষের সৃষ্টি-উদ্দেশ্য স্পষ্ট করে। ক্ষণস্থায়ী জীবনের লক্ষ্য স্থির করে। এ কথা স্পষ্ট করে যে, মানুষকে তার নিজের ইচ্ছামতো সৃষ্টি করা হয়নি, তাকে বেকার সৃষ্টি করা হয়নি, পৃথিবীর সংসারে কেবল পানভোজন ও বিলাস-ব্যসনের জন্য পাঠানো হয়নি। তাকে সৃষ্টি করার পশ্চাতে স্রষ্টার উদ্দেশ্য আছে। এ সংসারে আসার পর তার পালনীয় কর্তব্য আছে। মহান আল্লাহ বলেছেন, {وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ} الذاريات ৫৬ অর্থাৎ, আমি জ্বিন ও মানুষকে কেবল এ জন্য সৃষ্টি করেছি যে, তারা আমারই ইবাদত করবে। (যারিয়াত: ৫৬)
{يَا أَيُّهَا النَّاسُ اعْبُدُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُمْ وَالَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ} অর্থাৎ, হে মানুষ সম্প্রদায়! তোমরা তোমাদের সেই প্রতিপালকের উপাসনা কর, যিনি তোমাদেরকে ও তোমাদের পূর্ববর্তীগণকে সৃষ্টি করেছেন; যাতে তোমরা পরহেযগার (ধর্মভীরু) হতে পার। (বাকারাহঃ ২১) আর ইবাদত ও উপাসনা কেবল মসজিদ ও সিজদার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং তা হল প্রত্যেক সেই গুপ্ত ও প্রকাশ্য কথা ও কাজ, যাতে মহান আল্লাহ সন্তুষ্ট হন। বলা বাহুল্য, ইবাদতে আছে আল্লাহর সন্তুষ্টি, মানব-চরিত্রের সৌন্দর্য, সামাজিক সুবন্ধন, জীবের সেবা ও সৃষ্টির প্রতি করুণার বিকাশ।
৩। স্রষ্টার সেই উদ্দেশ্য সফল না করলে তার পরিণামের কথাও ঘোষণা করেছে ইসলাম। কর্তব্য পালন না করলে কী পরিণতি হতে পারে, সে ব্যাপারেও যথেষ্ট সতর্ক করেছে। মহান আল্লাহ বলেছেন, {وَمَن يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَيَتَعَدَّ حُدُودَهُ يُدْخِلْهُ نَاراً خَالِداً فِيهَا وَلَهُ عَذَابٌ مُّهِينٌ} النساء ১৪ অর্থাৎ, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রসূলের অবাধ্য হবে এবং তাঁর নির্ধারিত সীমা লংঘন করবে, তিনি তাকে আগুনে নিক্ষেপ করবেন। সেখানে সে চিরকাল থাকবে, আর তার জন্য রয়েছে লাঞ্ছনা-দায়ক শাস্তি। (নিসাঃ ১৪)
৪। পক্ষান্তরে যারা মহান স্রষ্টার সে উদ্দেশ্য সফল করে এবং দুনিয়ায় এসে নিজেদের কর্তব্য যথাসাধ্য পালন করে, তাদের জন্য পুরস্কার ঘোষণা করেছে ইসলাম। মহান আল্লাহ বলেছেন, {وَالَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ سَنُدْخِلُهُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا أَبَدًا لَّهُمْ فِيهَا أَزْوَاجٌ مُّطَهَّرَةٌ وَنُدْخِلُهُمْ ظِلا ظَلِيلًا} অর্থাৎ, যারা বিশ্বাস করে ও ভাল কাজ করে, তাদেরকে বেহেশ্তে প্রবেশ করাব; যার পাদদেশে নদীসমূহ প্রবাহিত, সেখানে তারা চিরকাল থাকবে, সেখানে তাদের জন্য পবিত্র সঙ্গিনী আছে এবং তাদেরকে চিরস্নিগ্ধ ঘন ছায়ায় স্থান দান করব। (নিসাঃ ৫৭)
৫। পৃথিবীর বুকে একমাত্র ইসলামই এমন ধর্ম, যার অনুসারিগণ স্রষ্টার উপাসনা ও দাসত্ব করে সরাসরি তাঁরই নির্দেশিত পদ্ধতি অনুসারে। সরাসরি তাঁরই গাইড-বুক থেকে গ্রহণ করে নিজেদের জীবন-সংবিধান। যা প্রলয়-দিবসের পূর্ব পর্যন্ত অপরিবর্তিত থাকবে। যেহেতু সৃষ্টিকর্তা নিজেই তার রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন এবং সেই অনুসারে তাঁর অনুগতগণ সেই চেষ্টায় ব্রতী আছে। মহান আল্লাহ বলেছেন, {إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ} (৯) সূরাহ আল-হিজর অর্থাৎ, নিশ্চয় আমিই কুরআন অবতীর্ণ করেছি এবং আমিই ওর সংরক্ষক। (হিজরঃ ৯)
{وَكَذَلِكَ أَنْزَلْنَا إِلَيْكَ الْكِتَابَ فَالَّذِينَ آتَيْنَاهُمُ الْكِتَابَ يُؤْمِنُونَ بِهِ وَمِنْ هَؤُلاء مَنْ يُؤْمِنُ بِهِ وَمَا يَجْحَدُ بِآيَاتِنَا إِلَّا الْكَافِرُونَ (٤٧) وَمَا كُنْتَ تَتْلُو مِنْ قَبْلِهِ مِنْ كِتَابِ وَلَا تَخُطُّهُ بِيَمِينِكَ إِذا لارْتَابَ الْمُبْطِلُونَ (٤٨) بَلْ হُوَ آيَاتٌ بَيِّنَاتُ فِي صُدُورِ الَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ وَمَا يَجْحَدُ بِآيَاتِنَا إِلَّا الظَّالِمُونَ} অর্থাৎ, এভাবেই আমি তোমার প্রতি কুরআন অবতীর্ণ করেছি এবং যাদেরকে আমি গ্রন্থ দিয়েছিলাম, তারা এতে বিশ্বাস করে এবং এদের মধ্যেও কেউ কেউ এতে বিশ্বাস করে। কেবল অবিশ্বাসীরাই আমার আয়াতসমূহকে অস্বীকার করে। তুমি তো এর পূর্বে কোন গ্রন্থ পাঠ করতে না এবং তা নিজ হাতে লিখতে না যে, মিথ্যাবাদীরা (তা দেখে) সন্দেহ পোষণ করবে। বরং যাদেরকে জ্ঞান দেওয়া হয়েছে, তাদের অন্তরে এ (কুরআন) স্পষ্ট নিদর্শন। কেবল অনাচারীরাই আমার নিদর্শনকে অস্বীকার করে। (আনকাবুতঃ ৪৭-৪৯)
৬। ইসলামই সেই ধর্ম, যা আদম থেকে নিয়ে কিয়ামত পর্যন্ত মহান আল্লাহর প্রেরিত বিধান। সারা সৃষ্টির মাঝে যেমন তিনি ভিন্ন ভিন্ন প্রকৃতি সৃষ্টি করেছেন, তেমনি সারা সৃষ্টির কল্যাণের জন্য তিনি ইসলাম প্রেরণ করেছেন। যুগে যুগে সকল ধর্ম ইসলাম রূপেই সত্য ছিল। বিশ্বের প্রত্যেক জাতির নিকট রসূল প্রেরণ করে তিনি তাওহীদের বাণীই প্রচার করলেন। অতঃপর তার অনুসারীরা পৃথক পৃথক নাম নিয়ে ভ্রষ্ট হয়ে গেল। মহান আল্লাহ বলেন, {وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَّسُولاً أَنِ اعْبُدُوا اللَّهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ فَمِنْهُم مَّنْ هَدَى اللَّهُ وَمِنْهُم مَّنْ حَقَّتْ عَلَيْهِ الضَّلالَةُ فَسِيرُوا فِي الْأَرْضِ فَانظُرُوا كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الْمُكَذِّبِينَ} النحل ৩৬ অর্থাৎ, অবশ্যই আমি প্রত্যেক জাতির মধ্যে রসূল পাঠিয়েছি এই নির্দেশ দিয়ে যে, তোমরা আল্লাহর উপাসনা কর ও তাগূত থেকে দূরে থাক। অতঃপর তাদের কতককে আল্লাহ সৎপথে পরিচালিত করেন এবং তাদের কতকের উপর ভ্রষ্টতা অবধারিত হয়। সুতরাং তোমরা পৃথিবীতে পরিভ্রমণ করে দেখ, যারা সত্যকে মিথ্যা বলেছে তাদের পরিণাম কী হয়েছে। (নাহল: ৩৬)
পরিশেষে পৃথিবীর যখন একটি শহরের মতো হওয়ার সময় কাছিয়ে এল, তখন সারা বিশ্বের মানুষের জন্য কেবল ইসলামকেই মনোনীত করলেন। সারা বিশ্বের মানব-দানবকে কেবল ইসলামেরই অনুসারী হতে আহবান করলেন। সমস্ত দ্বীনকে রহিত করে কেবল ইসলামকে 'শেষ পথ' বা 'চূড়ান্ত মার্গ' হিসাবে নির্ধারিত করলেন। তিনি বলেন, {إِنَّ الدِّينَ عِندَ اللهِ الإِسْلَامُ وَمَا اخْتَلَفَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ إِلَّا مِن بَعْدِ مَا جَاءَهُمُ الْعِلْمُ بَغْياً بَيْنَهُمْ وَمَن يَكْفُرْ بِآيَاتِ اللَّهِ فَإِنَّ اللَّهَ سَرِيعُ الْحِسَابِ} অর্থাৎ, নিশ্চয় ইসলাম আল্লাহর নিকট (একমাত্র মনোনীত) ধর্ম। যাদেরকে গ্রন্থ দেওয়া হয়েছিল, তারা পরস্পর বিদ্বেষবশতঃ তাদের নিকট জ্ঞান আসার পরও তাদের মধ্যে মতানৈক্য ঘটিয়েছিল! আর যে আল্লাহর নিদর্শনসমূহকে অস্বীকার করে (সে জেনে রাখুক যে), নিশ্চয় আল্লাহ সত্বর হিসাব গ্রহণকারী। (আলে ইমরানঃ ১৯)
যেহেতু একই রাজ্যে দুই আইন চলতে পারে না। একই উপাস্যের পক্ষ থেকে একই পৃথিবীতে তাঁর উপাসকদের জন্য একাধিক ধর্ম সচল হতে পারে না। একই প্রভুর নিকট হতে দাসদের নিকট একাধিক রকমের নির্দেশ আসতে পারে না। বলা বাহুল্য, ইসলামই হল সর্বশেষ ধর্ম এবং একমাত্র ধর্ম। এ ছাড়া অন্য ধর্ম রহিত। এ ছাড়া মানব-দানবের নিকট থেকে অন্য কোন ধর্ম গ্রহণ করা হবে না। মহান আল্লাহ বলেন, {وَمَن يَبْتَغِ غَيْرَ الإِسْলামِ دِيناً فَلَن يُقْبَلَ مِنْهُ وَهُوَ فِي الْآخِرَةِ مِنَ الْخَاسِرِينَ} آل عمران ৮৫ অর্থাৎ, যে কেউ ইসলাম ছাড়া অন্য ধর্ম অন্বেষণ করবে, তার পক্ষ হতে তা কখনও গ্রহণ করা হবে না। আর সে হবে পরলোকে ক্ষতিগ্রস্তদের দলভুক্ত। (আলে ইমরান: ৮৫)
৭। ইসলাম একটি সহজ ও সরল ধর্ম। এর মধ্যে কোন অস্পষ্টতা ও প্রচ্ছন্নতা নেই। মানুষের বিবেক-বুদ্ধির তারতম্য সত্ত্বেও যে কোন মানুষ তা সহজে বুঝতে পারে, গ্রহণ করতে পারে ও আমল করতে পারে। ইসলামের বিধান উচ্চ-নিম্ন সকল শ্রেণীর মানুষের জন্য সমান। ইসলাম সকল শ্রেণীর মানুষের কাছে আসা ন্যায়পরায়ণতা ও সততার আহবান। মহান আল্লাহ বলেছেন, {آمَنَ الرَّسُولُ بِمَا أُنزِلَ إِلَيْهِ مِن رَّبِّهِ وَالْمُؤْمِنُونَ كُلُّ آمَنَ بِاللَّهِ وَمَلَائِكَتِهِ وَكُتُবِهِ وَرُসُلِهِ لَا نُفَرِّقُ بَيْنَ أَحَدٍ মِّن رُّسُلِهِ وَقَالُوا سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا غُفْرَانَكَ رَبَّنَا وَإِلَيْكَ الْمَصِيرُ} البقرة ২৮৫ অর্থাৎ, রসূল তার প্রতি তার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে যা অবতীর্ণ করা হয়েছে, তাতে সে বিশ্বাস স্থাপন করেছে এবং বিশ্বাসিগণও; সকলে আল্লাহতে, তাঁর ফিরিশাগণে, তাঁর কিতাবসমূহে এবং তাঁর রসূলগণে বিশ্বাস স্থাপন করেছে। (তারা বলে,) আমরা তাঁর রসূলগণের মধ্যে কোন পার্থক্য করি না। আর তারা বলে, আমরা শুনলাম ও মান্য করলাম! হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা তোমার ক্ষমা চাই, আর তোমারই দিকে (আমাদের) প্রত্যাবর্তন হবে। (বাক্বারাহঃ ২৮৫)
can জীবনের সকল পদক্ষেপে ইসলামের নিয়ন্ত্রণ আছে। সংসারের সকল কর্মক্ষেত্রে ইসলামের সুশৃঙ্খলতা আছে। ইসলাম কেবল উপাসনালয়-কেন্দ্রিক ধর্ম নয়। বরং ইসলাম হল জীবনের চলার পথের প্রত্যেক পদক্ষেপের আলোক-দিশারী। মহান আল্লাহ বলেছেন, {قُلْ تَعَالَوْا أَتْلُ مَا حَرَّمَ رَبُّكُمْ عَلَيْكُمْ أَلا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئاً وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَاناً وَلَا تَقْتُلُواْ أَوْلَادَكُم مِّنْ إِمْلَاقٍ نَّحْنُ نَرْزُقُكُمْ وَإِيَّاهُمْ وَلَا تَقْرَبُوا الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ وَلَا تَقْتُلُوا النَّفْسَ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا بِالْحَقِّ ذَلِكُمْ وَصَّاكُمْ بِهِ لَعَلَّكُمْ تَعْقِلُونَ (১৫১) وَلَا تَقْرَبُواْ مَالَ الْيَتِيمِ إِلَّا بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ حَتَّى يَبْلُغَ أَشُدَّهُ وَأَوْفُوا الْكَيْلَ وَالْمِيزَانَ بِالْقِسْطِ لَا تُكَلِّفُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا وَإِذَا قُلْتُمْ فَاعْدِلُوا وَلَوْ كَانَ ذَا قُرْبَى وَبِعَهْدِ اللَّهِ أَوْفُوا ذَلِكُمْ وَصَّاكُم بِهِ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ} [الأنعام : ১৫১-১৫২] অর্থাৎ, বল, এসো তোমাদের জন্য তোমাদের প্রতিপালক যা নিষিদ্ধ করেছেন তা তোমাদেরকে পড়ে শোনাই। তা এই: তোমরা কোন কিছুকে তাঁর অংশী করবে না, মাতা-পিতার সাথে সদ্ব্যবহার করবে, দারিদ্র্যের কারণে তোমরা তোমাদের সন্তানদেরকে হত্যা করবে না। আমিই তোমাদেরকে ও তাদেরকে জীবিকা দিয়ে থাকি। প্রকাশ্যে হোক কিংবা গোপনে হোক, অশ্লীল আচরণের নিকটবর্তীও হয়ো না এবং আল্লাহ যার হত্যা নিষিদ্ধ করেছেন যথার্থ কারণ ব্যতীত তাকে হত্যা করো না। তোমাদেরকে তিনি এ নির্দেশ দিয়েছেন, যেন তোমরা অনুধাবন কর। পিতৃহীন বয়ঃপ্রাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত সৎ উদ্দেশ্য ছাড়া তার সম্পত্তির নিকটবর্তী হয়ো না এবং পরিমাপ ও ওজন ন্যায়ভাবে পুরাপুরি প্রদান কর। আমি কাউকেও তার সাধ্যাতীত ভার অর্পণ করি না। আর যখন তোমরা কথা বলবে, তখন স্বজনের বিরুদ্ধে হলেও ন্যায় কথা বল এবং আল্লাহকে প্রদত্ত অঙ্গীকার পূর্ণ কর। এভাবে আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন, যেন তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর। (আনআমঃ ১৫১-১৫২)
আর মহানবী বলেছেন, “সাতটি সর্বনাশী কর্ম হতে দূরে থাক।” সকলে বলল, 'হে আল্লাহর রসূল! তা কী কী?' তিনি বললেন, الشِّرْكُ باللهِ ، وَالسِّحْرُ ، وَقَتْلُ النَّفْسِ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا بِالحَقِّ ، وَأَكْلُ الرِّبَا، وَأَكْلُ مَالِ اليَتِيمِ، وَالتَّوَلِّي يَوْمَ الزَّحْفِ، وَقَدْفُ الْمُحْصَنَاتِ الْمُؤْمِنَاتِ الغَافِلاتِ)). متفق عَلَيْهِ “আল্লাহর সাথে শির্ক করা, যাদু করা, ন্যায় সঙ্গত অধিকার ছাড়া আল্লাহ যে প্রাণ হত্যা করা হারাম করেছেন তা হত্যা করা, সূদ খাওয়া, এতীমের মাল ভক্ষণ করা, (যুদ্ধক্ষেত্র হতে) যুদ্ধের দিন পলায়ন করা এবং সতী উদাসীনা মুমিনা নারীর চরিত্রে মিথ্যা অপবাদ দেওয়া।” (বুখারী ২৭৬৬, মুসলিম ৮-৯নং, আবু দাউদ, নাসাঈ)
৮। ইসলাম সকল আসমানী কিতাব (ঐশীগ্রন্থ) এর প্রতি ঈমান ও বিশ্বাস রাখাকে ওয়াজেব মনে করে। সুতরাং মুসলিমরা কোন আসমানী গ্রন্থকে অস্বীকার ও অবিশ্বাস করে না। ইতিপূর্বে তাওরাত, ইনজীল, যবুর ইত্যাদি যা কিছু অবতীর্ণ হয়েছে, তাতে বিশ্বাস রাখে। মহান আল্লাহ বলেছেন, {قُولُوا آمَنَّا بِاللَّهِ وَمَا أُنزِلَ إِلَيْنَا وَمَا أُنزِلَ إِلَى إِبْرَاهِيمَ وَإِسْمَاعِيلَ وَإِسْحَقَ وَيَعْقُوبَ وَالْأَسْبَاطِ وَمَا أُوتِيَ مُوسَى وَعِيسَى وَمَا أُوتِيَ النَّبِيُّونَ مِن رَّبِّهِمْ لَا نُفَرِّقُ بَيْنَ أَحَدٍ مِّنْهُمْ وَنَحْنُ لَهُ مُسْلِمُونَ} (১৩৬) سورة البقرة অর্থাৎ, তোমরা বল, 'আমরা আল্লাহতে বিশ্বাস করি এবং যা আমাদের প্রতি এবং ইব্রাহীম, ইসমাঈল, ইসহাক, ইয়াকুব ও তার বংশধরগণের প্রতি অবতীর্ণ করা হয়েছে এবং যা মুসা ও ঈসাকে প্রদান করা হয়েছে এবং যা অন্যান্য নবীগণ তাদের প্রতিপালকের নিকট থেকে প্রদত্ত হয়েছে তাতেও (বিশ্বাস করি)। আমরা তাদের মধ্যে কোন পার্থক্য করি না এবং আমরা তাঁর কাছে আত্ম-সমর্পণকারী।' (বাক্বারাহঃ ১৩৬)
{وَأَنزَلْنَا إِلَيْكَ الْكِতَابَ بِالْحَقِّ مُصَدِّقًا لِّمَا بَيْنَ يَدَيْهِ مِنَ الْكِتَابِ وَمهَيْمِنًا عَلَيْهِ فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللهُ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ} অর্থাৎ, এর পূর্বে অবতীর্ণ কিতাবের সমর্থক ও সংরক্ষকরূপে আমি তোমার প্রতি সত্যসহ কিতাব অবতীর্ণ করেছি। সুতরাং আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, তদনুসারে তুমি তাদের বিচার-নিষ্পত্তি কর এবং যে সত্য তোমার নিকট এসেছে, তা ত্যাগ ক'রে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করো না। (মায়িদাহঃ ৪৮)
৯। ইসলামই মহান আল্লাহর সর্বশেষ দ্বীন। কেবল এই দ্বীনের গ্রন্থই রয়েছে অবিকৃত, অপরিবর্তিত, অপরিবর্ধিত। যেহেতু মহান আল্লাহই তার হিফাযতের দায়িত্ব নিয়েছেন। পক্ষান্তরে পূর্বেকার সকল গ্রন্থ মানব কর্তৃক বিকৃত, পরিবর্তিত ও পরিবর্ধিত। যেহেতু মহান আল্লাহই তার সাক্ষ্য দিয়েছেন। মহান আল্লাহ বলেছেন, {فَبِمَا نَقْضِهِم مِّيثَاقَهُمْ لَعَنَّاهُمْ وَجَعَلْنَا قُلُوبَهُمْ قَاسِيَةً يُحَرِّفُونَ الْكَلِمَ عَن مَّوَاضِعِهِ وَنَسُواْ حَظًّا مِّمَّا ذُكِّرُوا بِهِ وَلَا تَزَالُ تَطَّلِعُ عَلَى خَائِنَةٍ مِّنْهُمْ إِلَّا قَلِيلاً مِّنْهُمُ فَاعْفُ عَنْهُمْ وَاصْفَحْ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ} (১৩) المائدة অর্থাৎ, তাদের অঙ্গীকার ভঙ্গের দরুন আমি তাদেরকে অভিসম্পাত করেছি ও তাদের হৃদয় কঠোর ক'রে দিয়েছি, তারা বাক্যাবলীর পরিবর্তন সাধন ক'রে থাকে এবং তারা যা উপদিষ্ট হয়েছিল তার একাংশ ভুলে গেছে। তুমি সর্বদা ওদের অল্পসংখ্যক ব্যতীত সকলেরই তরফ হতে বিশ্বাসঘাতকতার সংবাদ পেতে থাকবে। সুতরাং তুমি ওদেরকে ক্ষমা কর ও উপেক্ষা কর। নিশ্চয় আল্লাহ সৎকর্মশীলদেরকে ভালবাসেন। (মায়িদাহঃ ১৩)
কিতাবধারীরা কিতাবের অনেক অংশ স্বার্থবশে গোপন করেছে, সে কথারও সাক্ষ্য দিয়েছেন মহান আল্লাহ। তিনি বলেছেন, {وَإِذْ أَخَذَ اللَّهُ مِيثَاقَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ لَتُبَيِّنُنَّهُ لِلنَّাসِ وَلَا تَكْتُمُونَهُ فَتَبَذُوهُ وَرَاء ظُهُورِهِمْ وَاشْتَرَوْا بِهِ ثَمَناً قَلِيلاً فَبِئْسَ مَا يَشْتَرُونَ} (১৮৭) অর্থাৎ, (স্মরণ কর) যাদেরকে কিতাব দেওয়া হয়েছিল, আল্লাহ তাদের নিকট প্রতিশ্রুতি নিয়েছিলেন যে, তোমরা তা (কিতাব) স্পষ্টভাবে মানুষের কাছে প্রকাশ করবে এবং তা গোপন করবে না। এর পরও তারা তা পৃষ্ঠের পিছনে নিক্ষেপ করে (অগ্রাহ্য করে) ও তা স্বল্পমূল্যে বিক্রয় করে। সুতরাং তারা যা ক্রয় করে তা কত নিকৃষ্ট। (আলে ইমরানঃ ১৮৭)
১০। ইসলাম সকল নবী-রসূলের প্রতি ঈমান ও বিশ্বাস রাখাকে জরুরী মনে করে। নাম জানা-অজানা কোনও নবীকে অবিশ্বাস করলে কেউ মুসলিম হতে পারে না। {يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ آمِنُوا بِاللهِ وَرَسُولِهِ وَالْكِتَابِ الَّذِي نَزَّلَ عَلَى رَسُولِهِ وَالْكِتَابِ الَّذِي أَنزَلَ مِن قَبْلُ وَمن يَكْফُرْ بِاللَّهِ وَمَلَائِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالاً بَعِيداً } النساء ১৩৬ অর্থাৎ, হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা আল্লাহতে, তাঁর রসূলে, তিনি যে কিতাব তাঁর রসূলের প্রতি অবতীর্ণ করেছেন তাতে এবং যে কিতাব তিনি পূর্বে অবতীর্ণ করেছেন তাতে বিশ্বাস কর; আর যে কেউ আল্লাহ, তাঁর ফিরিশাগণ, তাঁর কিতাবসমূহ, তাঁর রসূলগণ এবং পরকালকে অবিশ্বাস করে, সে পথভ্রষ্ট হয়ে সুদূরে চলে যায়। (নিসাঃ ১৩৬)
ঈমানের ক্ষেত্রে মুসলিম নবীদের মাঝে কোন পার্থক্য আনয়ন করে না। তা করলে সে ঈমানের সুফল ও পুরস্কার লাভে ধন্য হবে না। মহান আল্লাহ বলেছেন, وَالَّذِينَ آمَنُواْ بِاللَّهِ وَرُسُلِهِ وَلَمْ يُفَرِّقُوا بَيْنَ أَحَدٍ মِّهُمْ أُوْلَئِكَ سَوْفَ يُؤْتِيهِمْ أُجُورَهُمْ وَكَانَ اللَّهُ غَفُورًا رَّحِيمًا} (১৫২) سورة النساء অর্থাৎ, যারা আল্লাহ এবং তাঁর রসূলগণে বিশ্বাস করে এবং তাদের কোন একজনের সাথে অন্য জনের পার্থক্য করে না, তাদেরকেই তিনি পুরস্কার দেবেন। আর আল্লাহ চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (নিসাঃ ১৫২)
অবশ্য মুহাম্মাদ-ই সর্বশেষ নবী। তাঁর পর আর কোন নবী নেই। যেহেতু আর কোন প্রয়োজনও ছিল না। যেহেতু তাঁর শরীয়ত চিরন্তন, কিয়ামত পর্যন্ত সকল অবস্থায় সচল। তাঁর বিধান যুগান্তকারী। যত দিন যায়, পৃথিবী তত যেন ছোট হয়ে আসে। একটি শহর থেকে একটি কক্ষের মতো হয়ে আসছে পৃথিবী, যার চারিপাশে লাগানো আছে আয়না। যেন পৃথিবীর সকল সভ্যতার মানুষকে দেখা যায়, সকলের সাথে আলাপ করা যায়! সে ক্ষেত্রে অন্য কোন নবী বা নতুন বিধানের প্রয়োজনীয়তা অবশিষ্ট থাকে না।
১১। একমাত্র ইসলামের নবীই এমন, যাঁর জীবনের আম-খাস সকল খুঁটিনাটি তাঁর অনুসারিগণ সযত্নে সংরক্ষিত রেখেছেন। তাঁর প্রত্যেকটা উক্তি, কর্ম ও অবস্থাকে সূক্ষ্মভাবে বর্ণনা করেছেন। যা 'সুন্নাহ'রূপে লিপিবদ্ধ হয়েছে এবং ইসলামী শরীয়তের দ্বিতীয় উৎসরূপে মর্যাদা ও গুরুত্ব লাভ করেছে। যাঁর উক্তি ও কর্ম ছিল আল-কুরআনের ব্যাখ্যা। যাঁর সুমহান চরিত্র ছিল আল-কুরআন।
১২। পূর্ববর্তী সকল নবী-রসূল (আলাইহিমুস সালাম) প্রেরিত হয়েছিলেন নির্দিষ্ট গোত্রের জন্য, নির্ধারিত সময়ের জন্য। কিন্তু শেষনবী প্রেরিত হয়েছেন সারা বিশ্বের মানুষের জন্য, বিশ্ব ধ্বংসের পূর্ব পর্যন্ত সময়ের জন্য। মহান আল্লাহ বলেছেন, {وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِّلْعَالَمِينَ } (১০৭) سورة الأنبياء অর্থাৎ, আমি তো তোমাকে বিশ্বজগতের প্রতি শুধু করুণা রূপেই প্রেরণ করেছি। (আম্বিয়াঃ ১০৭)
{وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا كَافَّةً لِّلنَّاسِ بَشِيرًا وَنَذِيرًا وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ} অর্থাৎ, আমি তো তোমাকে সমগ্র মানবজাতির প্রতি সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে প্রেরণ করেছি; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা জানে না। (সাবা': ২৮) অতএব তাঁর আগমনের পর মানুষ মুক্তির পথ চাইলে তাকে অবশ্যই তাঁর অনুসরণ করতে হবে। তাছাড়া মুক্তিলাভের আর কোন পথ নেই। قُلْ يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنِّي رَسُولُ اللَّهِ إِلَيْكُمْ جَمِيعًا الَّذِي لَهُ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالأَرْضِ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ يُحْيِي وَيُمِيتُ فَآمِنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ النَّبِيِّ الْأُمِّيِّ الَّذِي يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَكَلِمَاتِهِ وَاتَّبِعُوهُ لَعَلَّكُمْ تَهْتَدُونَ} (১৫৮) سورة الأعراف অর্থাৎ, বল, 'হে মানুষ! আমি তোমাদের সকলের জন্য সেই আল্লাহর (প্রেরিত) রসূল; যিনি আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সার্বভৌমত্বের অধিকারী, তিনি ব্যতীত অন্য কোন (সত্য) উপাস্য নেই, তিনিই জীবিত করেন ও মৃত্যু ঘটান। সুতরাং আল্লাহর প্রতি ও তাঁর রসূল নিরক্ষর নবীর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর; যে আল্লাহ ও তাঁর বাণীতে বিশ্বাস করে, এবং তোমরা তার অনুসরণ কর, যাতে তোমরা পথ পাও।' (আ'রাফ: ১৫৮)
১৩। ইসলাম সকল নবী-রসূল (আলাইহিমুস সালাম) কে নিষ্পাপ মনে করে। তাঁদের চরিত্রকে নিষ্কলঙ্ক বিশ্বাস করে। এ কথা মানতে বাধ্য করে যে, তাঁরা ছিলেন মহান স্রষ্টার নির্বাচিত সৃষ্টি ও মনোনীত মানুষ। মহান আল্লাহ বলেছেন, {وَإِنَّهُمْ عِندَنَا لَمِنَ الْمُصْطَفَيْنَ الْأَخْيَارِ} (৪৭) سورة ص অর্থাৎ, অবশ্যই তারা ছিল আমার মনোনীত ও উত্তম দাসদের অন্তর্ভুক্ত। (স্বাদঃ ৪৭)
১৪। ইসলাম তার অনুসারীদের উপর প্রত্যহ পাঁচ ওয়াক্তের নামায ফরয করেছে। যাতে সর্বদা তারা নিজ প্রভু ও প্রতিপালকের সাথে যোগসূত্র কায়েম রাখে এবং তার মাধ্যমে পাপ-পঙ্কিলতা ও অশ্লীলতা থেকে দূরে থাকতে পারে। মহান আল্লাহ বলেছেন, وَأَقِمِ الصَّلَاةَ طَرَفَيِ النَّهَارِ وَزُلَفًا মِّنَ اللَّيْلِ إِنَّ الْحَسَنَاتِ يُذْهِبْنَ السَّيِّئَاتِ ذَلِكَ ذِكْرَى لِلذَّاكِرِينَ } (১১৪) سورة هود অর্থাৎ, নামায কায়েম কর দিবসের দু'প্রান্তে ও রাত্রির কিছু অংশে; নিঃসন্দেহে পুণ্যরাশি পাপরাশিকে মুছে ফেলে; এটা হচ্ছে উপদেশ গ্রহণকারীদের জন্য একটি উপদেশ। (হৃদঃ ১১৪)
{اتْلُ مَا أُوحِيَ إِلَيْكَ مِنَ الْكِتَابِ وَأَقِمِ الصَّلَاةَ إِنَّ الصَّلَاةَ تَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنكَرِ وَلَذِكْرُ اللَّهِ أَكْبَرُ وَاللَّهُ يَعْلَمُ مَا تَصْنَعُونَ} (৪৫) অর্থাৎ, তোমার প্রতি যে গ্রন্থ অহী করা হয়েছে তা পাঠ কর এবং যথাযথভাবে নামায পড়। নিশ্চয় নামায অশ্লীল ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে। আর অবশ্যই আল্লাহর স্মরণ সর্বশ্রেষ্ঠ। তোমরা যা কর, আল্লাহ তা জানেন। (আনকাবুতঃ ৪৫) কেবল একাকী নয়, ইসলাম মুসলিমকে জামাআত-সহকারে প্রত্যহ পাঁচবার নামায কায়েম করতে আদেশ করেছে। যাতে আছে সামাজিক যোগসূত্র, সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য, সংহতি ও ঐক্য।
১৫। মুসলিমদের পুণ্য অর্জনের পথ অগণিত অপরিমিত। প্রতিপালকের কাছে সওয়াবের আশা রেখে প্রত্যেক সেই গুপ্ত বা প্রকাশ্য কথা ও কাজ করলে পুণ্যলাভ করতে পারে, যাতে তিনি খুশী হন। আর প্রত্যেক পুণ্য সে পরকালে হিসাবের দিন প্রত্যক্ষ করবে। মহান আল্লাহ বলেন, {فَمَن يَعْمَلْ মִثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَرَهُ} (৭) سورة الزلزلة অর্থাৎ, সুতরাং কেউ অণু পরিমাণ ভালো কাজ করলে, সে তা দেখতে পাবে। (যিলযালঃ ৭)
{وَنَضَعُ الْمَوَازِينَ الْقِسْطَ لِيَوْمِ الْقِيَامَةِ فَلَا تُظْلَمُ نَفْسٌ شَيْئًا وَإِن كَانَ মִثْقَالَ حَبَّةٍ মِّ خَرْدَل أَتَيْنَا بِهَا وَكَفَى بِنَا حَاسِبِينَ } (৪৭) سورة الأنبياء অর্থাৎ, কিয়ামত দিবসে আমি স্থাপন করব ন্যায় বিচারের দাঁড়িপাল্লাসমূহ; সুতরাং কারো প্রতি কোন অবিচার করা হবে না। কর্ম যদি সরিষার দানা পরিমাণ ওজনের হয় তবুও তা আমি উপস্থিত করব। আর হিসাব গ্রহণকারীরূপে আমিই যথেষ্ট। (আম্বিয়াঃ ৪৭)
মহানবী বলেছেন, (كُلُّ سُلامَى مِنَ النَّاسِ عليه صَدَقَةٌ، كُلَّ يَوْمٍ تَطْلُعُ فِيهِ الشَّمْسُ : تَعْدِلُ بَيْنَ اثْنَيْنِ صَدَقَةٌ، وتُعين الرَّجُلَ فِي دَابَّتِهِ فَتَحْمِلُهُ عليها أو تَرْفَعُ لَهُ مَتَاعَهُ صَدَقَةٌ، وَالْكَلِمَةُ الطَّيِّبةُ صَدَقَةٌ، وبكُلِّ خَطْوَةٍ تَمْشِيها إلى الصَّلَاةِ صَدَقَةٌ، وتُمِيطُ الأَذى عن الطريق صَدَقَةٌ). “প্রত্যহ মানুষের অস্থির প্রত্যেক জোড়ের পক্ষ থেকে প্রত্যেক সূর্যময় দিনে রয়েছে প্রদেয় সদকাহ। দুই (বিবদমান) ব্যক্তির মাঝে তার সন্ধি ও শান্তি স্থাপন করা এক সদকাহ। নিজ সওয়ারীর উপর অপরকে চড়িয়ে নেওয়া অথবা তার সামগ্রী বহন করে দেওয়া সদকাহ। ভালো কথা সদকাহ। নামাযের উদ্দেশ্যে (মসজিদের প্রতি) চলার প্রতিটি পদক্ষেপ সদকাহ। এবং পথ হতে কষ্টদায়ক বস্তু অপসারণ করাও সদকাহ।” (বুখারী ২৮৯ ও ১০০৯ নং)
১৬। মানুষ প্রকৃতিগতভাবে অপরাধী। পাপ-প্রবণতা তার স্বভাব। কিন্তু ইসলাম মার্জনার ব্যবস্থা রেখেছে। নিজ প্রভুর দিকে প্রত্যাবর্তনের সুযোগ রেখেছে। পাপের অন্ধকারে তাকে নিরাশ ও হতাশাগ্রস্ত করে বর্জন করেনি। সৃষ্টিকর্তা মহান করুণাময়। কেউ পাপ থেকে ফিরে এলে তিনি খুশী হন। তিনি সমস্ত পাপ মাফ করে দেন। তিনি বলেছেন, {قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ } (৫৩) سورة الزمر অর্থাৎ, ঘোষণা করে দাও (আমার এ কথা), হে আমার দাসগণ! তোমরা যারা নিজেদের প্রতি যুলুম করেছ, তারা আল্লাহর করুণা হতে নিরাশ হয়ো না; নিশ্চয় আল্লাহ সমস্ত পাপ মাফ ক'রে দেবেন। নিশ্চয় তিনিই চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (যুমার: ৫৩)
বরং অনুতপ্ত হয়ে সুপথে প্রত্যাবর্তন করলে তিনি সমস্ত পাপকে পুণ্যে পরিবর্তন করে দেন! তিনি বলেন, إِلَّا মَن تَابَ وَآمَنَ وَعَمِلَ عَمَلًا صَالِحًا فَأُوْلَئِكَ يُبَدِّلُ اللَّهُ سَيِّئَاتِهِمْ حَسَنَاتٍ وَكَانَ اللَّهُ غَفُورًا رَّحِيمًا} (৭০) سورة الفرقان অর্থাৎ, তবে যারা তওবা করে, বিশ্বাস ও সৎকাজ করে, আল্লাহ তাদের পাপকর্মগুলিকে পুণ্য দ্বারা পরিবর্তন ক'রে দেবেন। আর আল্লাহ চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (ফুরক্বান: ৭০)
১৭। দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য, শির্ক নির্মূল করার জন্য, গায়রুল্লাহর উপাসনা ও দাসত্ব বন্ধ করার জন্য ইসলামে জিহাদ ফরয করা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেছেন, وَقَاتِلُوهُمْ حَتَّى لاَ تَكُونَ فِتْنَةٌ وَيَكُونَ الدِّينُ لِلَّهِ فَإِنِ انتَهَوا فَلَا عُدْوَانَ إِلَّا عَلَى الظَّالِمِينَ) (১৯৩) سورة البقرة অর্থাৎ, আর তোমরা তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে থাক, যতক্ষণ না ফিতনা (অশান্তি, শির্ক বা ধর্মদ্রোহিতা) দূর হয়ে আল্লাহর দ্বীন (ধর্ম) প্রতিষ্ঠিত না হয়, কিন্তু যদি তারা নিবৃত্ত হয়, তবে অত্যাচারীদের বিরুদ্ধে ছাড়া (অন্য কারো বিরুদ্ধে) আক্রমণ করা চলবে না। (বাক্বারাহঃ ১৯৩) অন্যায়-অत्याচার বন্ধ করার জন্য, আত্মরক্ষার জন্য, অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য জিহাদ আবশ্যক।
{وَلَوْلَا دَفْعُ اللَّهِ النَّاسَ بَعْضَهُمْ بِبَعْضٍ لَفَسَدَتِ الْأَرْضُ وَلَكِنَّ اللَّهَ ذُو فَضْل عَلَى الْعَالَمِينَ} (২৫১) সূরা আল-বাকারা অর্থাৎ, আল্লাহ যদি মানব জাতির একদলকে অন্য দল দ্বারা দমন না করতেন, তাহলে নিশ্চয় পৃথিবী (অশান্তিপূর্ণ ও) ধ্বংস হয়ে যেত। কিন্তু আল্লাহ বিশ্বজগতের প্রতি অনুগ্রহশীল। (বাক্বারাহঃ ২৫১)
الَّذِينَ أُخْرِجُوا مِن دِيَارِهِمْ بِغَيْرِ حَقٍّ إِلَّا أَن يَقُولُوا رَبُّنَا اللَّهُ وَلَوْلَا دَفْعُ اللَّهِ النَّاسَ بَعْضَهُم بِبَعْضٍ لَّهُدِّمَتْ صَوَامِعُ وَبِيَعٌ وَصَلَوَاتٌ وَمَسَاجِدُ يُذْكَرُ فِيهَا اسْمُ اللَّهِ كَثِيرًا وَلَيَنصُرَنَّ اللَّهُ مَن يَنصُرُهُ إِنَّ اللَّهَ لَقَوِيٌّ عَزِيزٌ} (৪০) অর্থাৎ, তাদেরকে তাদের ঘরবাড়ী হতে অন্যায়ভাবে বহিষ্কৃত করা হয়েছে শুধু এ কারণে যে, তারা বলে, 'আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ।' আল্লাহ যদি মানব জাতির এক দলকে অন্য দল দ্বারা প্রতিহত না করতেন, তাহলে বিধ্বস্ত হয়ে যেত খ্রিস্টান সংসার-বিরাগীদের উপাসনা স্থান, গীর্জা, ইয়াহুদীদের উপাসনালয় এবং মসজিদসমূহ; যাতে অধিক স্মরণ করা হয় আল্লাহর নাম। আর আল্লাহ নিশ্চয়ই তাকে সাহায্য করেন যে তাঁকে (তাঁর ধর্মকে) সাহায্য করে। আল্লাহ নিশ্চয়ই মহাশক্তিমান, চরম পরাক্রমশালী। (হাজ্জঃ ৪০)
{وَقَاتِلُوا فِي سَبِيلِ اللهِ الَّذِينَ يُقَاتِلُونَكُمْ وَلَا تَعْتَدُوا إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْمُعْتَدِينَ} (১৯০) সূরা আল-বাকারা অর্থাৎ, যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে, তোমরাও আল্লাহর পথে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কর, তবে বাড়াবাড়ি (সীমালংঘন) করো না, নিশ্চয় আল্লাহ বাড়াবাড়িকারীদেরকে পছন্দ করেন না। (বাক্বারাহঃ ১৯০)
১৮। ইসলামে যা বিধিবদ্ধ করা হয়েছে, তার উপর নতুনভাবে কিছু সংযোজন করাকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। যাতে অন্যান্য ধর্মের মতো ইসলামের ‘আসলত্ব’ ধীরে-ধীরে বিলীন হয়ে না যায়। সুন্নাহর জায়গায় বিদআহ স্থান দখল করে না বসে। এই জন্য কাজ যতই ভালো মনে করা হোক না কেন, শরীয়তে তার অনুমোদন না থাকলে, তা গ্রহণযোগ্য নয়। মহানবী বলেছেন, « মَنْ أَحْدَثَ فِي أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ মִنْهُ فَهُوَ رَدُّ ». অর্থাৎ, যে ব্যক্তি আমার এই দ্বীনে (নিজের পক্ষ থেকে) কোন নতুন কথা উদ্ভাবন করল---যা তার অন্তর্ভুক্ত নয়, তা প্রত্যাখ্যানযোগ্য। (বুখারী ২৬৯৭, মুসলিম ৪৫৮৯নং)
১৯। ইসলামে যোগ-যাদু, অশুভ ধারণা, অমূলক বিশ্বাস, গ্রহবিপাকে বিশ্বাস, ভাগ্য গণনায় বিশ্বাস, কুযাত্রা বা কুযোগে বিশ্বাস করা বৈধ নয়। মুসলিম জানে, মঙ্গলামঙ্গলের ঘটনাঘটনের মালিক একমাত্র সৃষ্টিকর্তা।
২০। ধর্মের ব্যাপারে মতভেদ করা নিষেধ। তবুও তার ব্যাখ্যা নিয়ে মতভেদ অস্বাভাবিক নয়। মহান আল্লাহ বলেছেন, {وَلَوْ شَاء رَبُّكَ لَجَعَلَ النَّاسَ أُمَّةً وَاحِدَةً وَلَا يَزَالُونَ مُخْتَلِفِينَ (১১৮) إِلَّا মَن رَّحِمَ رَبُّكَ وَلِذَلِكَ خَلَقَهُمْ وَتَمَّتْ كَلِمَةُ رَبِّكَ لأَمْلأَنَّ جَهَنَّمَ مِنَ الْجِنَّةِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ) (১১৯) سورة هود অর্থাৎ, তোমার প্রতিপালক ইচ্ছা করলে তিনি সকল মানুষকে এক জাতি করতে পারতেন। কিন্তু তারা সদা মতভেদ করতেই থাকবে। তবে যাদের প্রতি তোমার প্রতিপালক দয়া করেন তারা নয়, আর এ জন্যেই তিনি তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন এবং 'আমি জ্বিন ও মানুষ উভয় দ্বারা জাহান্নাম পূর্ণ করবই' তোমার প্রতিপালকের এই বাণী পূর্ণ হবেই। (হুদঃ ১১৮-১১৯)
অবশ্য সেই সময় উদার হয়ে বুদ্ধিমানদের করণীয় কী, তাও তিনি বলে দিয়েছেন, {يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنكُمْ فَإِن تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّهِ وَالرَّسُولِ إِن كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْমِ الْآخِرِ ذَلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلاً} (৫৯) সূরা আন-নিসা অর্থাৎ, হে বিশ্বাসিগণ! যদি তোমরা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস কর, তাহলে তোমরা আল্লাহর অনুগত হও, রসূল ও তোমাদের নেতৃবর্গ (ও উলামা)দের অনুগত হও। আর যদি কোন বিষয়ে তোমাদের মধ্যে মতভেদ ঘটে, তাহলে সে বিষয়কে আল্লাহ ও রসূলের দিকে ফিরিয়ে দাও। এটিই হল উত্তম এবং পরিণামে প্রকৃষ্টতর। (নিসা : ৫৯)
{وَالَّذِينَ اجْتَنَبُوا الطَّاغُوتَ أَن يَعْبُدُوهَا وَأَنَابُوا إِلَى اللَّهِ لَهُمُ الْبُشْرَى فَبَشِّرْ عِبَادِ (১৭) الَّذِينَ يَسْتَمِعُونَ الْقَوْلَ فَيَتَّبِعُونَ أَحْسَنَهُ أُوْلَئِكَ الَّذِينَ هَدَاهُمُ اللَّهُ وَأُوْلَئِكَ هُمْ أُوْلُوا الْأَلْبَابِ} (১৮) সূরা আয-যুমার অর্থাৎ, যারা তাগুতের পূজা হতে দূরে থাকে এবং আল্লাহর অনুরাগী হয়, তাদের জন্য আছে সুসংবাদ। অতএব সুসংবাদ দাও আমার দাসদেরকে, যারা মনোযোগ সহকারে কথা শোনে এবং যা উত্তম তার অনুসরণ করে। ওরাই তারা, যাদেরকে আল্লাহ সৎপথে পরিচালিত করেন এবং ওরাই বুদ্ধিমান। (যুমার: ১৭-১৮)
📄 মানব-মনকে প্রভাবান্বিত করার ক্ষেত্রে ইসলামের বৈশিষ্ট্য
১। যে মন অপরাধী, সে মন ক্ষমা পেলে খুশী হয়। যে মন অলস, সে মন উৎসাহ পেলে সক্রিয় হয়। এই জন্য মুসলিম পাপ করে ফেললেও আশাবাদী থাকে এবং পুণ্যলাভে বড় উৎসাহী ও আগ্রহী হয়। যখনই কোন পুণ্য করে, তখনই তার কিছু পাপ ক্ষয় হয়ে যায়। মহান আল্লাহ বলেন, {وَالَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَنُكَفِّرَنَّ عَنْهُمْ سَيِّئَاتِهِمْ وَلَنَجْزِيَنَّهُمْ أَحْسَنَ الَّذِي كَانُوا يَعْمَلُونَ} (৭) سورة العنكبوت অর্থাৎ, যারা বিশ্বাস করে ও সৎকাজ করে, আমি নিশ্চয়ই তাদের দোষত্রুটিসমূহকে মার্জনা ক'রে দেব এবং তাদেরকে তাদের কর্মের উত্তম ফলদান করব। (আনকাবুতঃ ৭)
{وَأَقِمِ الصَّلَاةَ طَرَفَيِ النَّהَارِ وَزُلَفًا মِّনَ اللَّيْلِ إِنَّ الْحَسَنَاتِ يُذْهِبْنَ السَّيِّئَاتِ ذَلِكَ ذِكْرَى لِلذَّاكِرِينَ } (১১৪) سورة هود অর্থাৎ, নামায কায়েম কর দিবসের দু'প্রান্তে ও রাত্রির কিছু অংশে; নিঃসন্দেহে পুণ্যরাশি পাপরাশিকে মুছে ফেলে; এটা হচ্ছে উপদেশ গ্রহণকারীদের জন্য একটি উপদেশ। (হৃদঃ ১১৪)
২। কোন কাজে মন না বসলে, কোন কাজে শৈথিল্য ও অলসতা থাকলে, সে কাজে কোন পুরস্কার ঘোষণার সাথে মুসলিমকে উদ্বুদ্ধ করা হলে, সে আগ্রহের সাথে সে কাজ সম্পাদন করে। যে কাজ প্রার্থনীয়, সে কাজের বিনিময়ে বা পরিণামে নির্ধারিত পারিতোষিক থাকলে, সে কাজে মানুষের অনুপ্রেরণা জাগে। যেমন, মহান আল্লাহ বলেছেন, {وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ وَآتُوا الزَّكَاةَ وَأَقْرِضُوا اللَّهَ قَرْضًا حَسَنًا وَمَا تُقَدِّمُوا لِأَنفُسِكُم মِّ خَيْرٍ تَجِدُوهُ عِندَ اللَّهِ هُوَ خَيْرًا وَأَعْظَمَ أَجْرًا وَاسْتَغْفِرُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ) (২০) سورة المزمل অর্থাৎ, নামায প্রতিষ্ঠিত কর, যাকাত প্রদান কর এবং আল্লাহকে দাও উত্তম ঋণ। তোমরা তোমাদের আত্মার মঙ্গলের জন্য ভাল যা কিছু অগ্রিম প্রেরণ করবে, তোমরা তা আল্লাহর নিকট উৎকৃষ্টতর এবং পুরস্কার হিসাবে মহত্তর পাবে। আর তোমরা আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর, নিশ্চয়ই আল্লাহ মহা ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (মুয্যাম্মিলঃ ২০)
৩। ইসলাম কেবল বিশ্বাস ও আনুষ্ঠানিকতার নাম নয়। ইসলাম মানুষকে কর্মে উদ্বুদ্ধ করে। আর সেই কর্মের উপর বহুগুণ পুরস্কার প্রদান করে। মহান আল্লাহ বলেন, মَّثَلُ الَّذِينَ يُنفِقُونَ أَمْوَالَهُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ كَمَثَلِ حَبَّةٍ أَنبَتَتْ سَبْعَ سَنَابِلَ فِي كُلِّ سُنبُلَةٍ মِّئَةُ حَبَّةٍ وَاللَّهُ يُضَاعِفُ لِمَن يَشَاء وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ} (২৬১) অর্থাৎ, যারা আল্লাহর পথে ব্যয় করে, তাদের উপমা একটি শস্য- বীজের মত, যা থেকে সাতটি শীষ জন্মে, প্রতিটি শীষে থাকে একশত শস্য-দানা। আর আল্লাহ যার জন্য ইচ্ছা বহুগুণে বৃদ্ধি ক'রে দেন। আল্লাহ মহাদানশীল, মহাজ্ঞানী। (বাক্বারাহঃ ২৬১)
শুধু তাই নয়, মনে কর্মের সংকল্প থাকলে, তা কাজে পরিণত না করতে পারলেও পুরস্কার প্রদান করা হয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর বর্কতময় মহান প্রভু থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন যে, “নিশ্চয় আল্লাহ পুণ্যসমূহ ও পাপসমূহ লিখে দিয়েছেন। অতঃপর তিনি তার ব্যাখ্যাও করে দিয়েছেন। যে ব্যক্তি কোন নেকী করার সংকল্প করে; কিন্তু সে তা কর্মে বাস্তবায়িত করতে পারে না, আল্লাহ তাবারাকা অতাআলা তার জন্য (কেবল নিয়ত করার বিনিময়ে) একটি পূর্ণ নেকী লিখে দেন। আর সে যদি সংকল্প করার পর কাজটি করে ফেলে, তাহলে আল্লাহ তার বিনিময়ে দশ থেকে সাতশ গুণ, বরং তার চেয়েও অনেক গুণ নেকী লিখে দেন। পক্ষান্তরে যদি সে একটি পাপ করার সংকল্প করে; কিন্তু সে তা কর্মে বাস্তবায়িত না করে, তাহলে আল্লাহ তাআলা তাঁর নিকট একটি পূর্ণ নেকী হিসাবে লিখে দেন। আর সে যদি সংকল্প করার পর ঐ পাপ কাজ করে ফেলে, তাহলে আল্লাহ মাত্র একটি পাপ লিপিবদ্ধ করেন।” (বুখারী-মুসলিম)
৪। মানুষ সম্মানীয় জীব। মহান স্রষ্টা তাকে সম্মান দান করেছেন, শিখিয়েছেন আত্মসম্মানবোধ। সুতরাং সে কোন মানুষের পূজারী হতে পারে না। পারে না তার থেকে সম্মানে ছোট কোন সৃষ্টিরও কাছে মাথা নত করতে। এটা তার সম্মানের প্রতিকূল। ইসলামই শিক্ষা দিয়েছে, কোন সৃষ্টির উপাসনা নয়, একক স্রষ্টার উপাসনা কর। ইসলামই নির্দেশ দিয়েছে, সৃষ্টির ইবাদত ছেড়ে স্রষ্টার ইবাদত কর। যিনি স্রষ্টা, অধিপতি, প্রতিপালক, রুযীদাতা, তিনিই উপাস্য, তিনিই ইবাদত পাওয়ার যোগ্য অধিকারী। ইসলামই শিখিয়েছে পৌত্তলিকতা শির্ক, সৃষ্টির পূজা শির্ক। আর শির্ক হল অন্ধকার, তাওহীদ হল আলো। ইসলাম মানুষকে শির্কের অন্ধকার থেকে উদ্ধার করে তাওহীদের আলোয় আনতে চায়। মহান আল্লাহ বলেছেন, {هُوَ الَّذِي يُنَزِّلُ عَلَى عَبْدِهِ آيَاتٍ بَيِّنَاتٍ لِيُخْرِجَكُم মِّنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّورِ وَإِنَّ اللَّهَ بِكُمْ لَرَؤُوفٌ رَّحِيمٌ} الحديد ৯ অর্থাৎ, তিনিই তাঁর বান্দাদের প্রতি সুস্পষ্ট আয়াতসমূহ অবতীর্ণ করেন, তোমাদেরকে সমস্ত প্রকার অন্ধকার হতে আলোকে আনার জন্য। আর নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের প্রতি করুণাময়; পরম দয়ালু। (হাদীদঃ ৯)
৫। ইসলাম মানুষকে পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন করে। সুউন্নত ও সভ্য রূপে গড়ে তোলে। হিংসা-বিদ্বেষ, হানাহানি-খুনাখুনি ও মারামারি-দাঙ্গার নরক থেকে রক্ষা করে। ইসলাম মানুষের মাঝে সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ব স্থাপন করে। ইসলাম আপোসে বিচ্ছিন্নতা, সম্পর্কহীনতা ও দলাদলি করতে নিষেধ করে। ঐক্য, সংহতি, সহানুভূতি, সহযোগিতা, সমমর্মিতা ও সমানুভূতির প্রতি মানুষকে আহবান করে। মহান আল্লাহ বলেছেন, {وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا وَاذْكُرُوا نِعْمَةَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ إِذْ كُنتُمْ أَعْدَاء فَأَلَّفَ بَيْنَ قُلُوبِكُمْ فَأَصْبَحْتُم بِنِعْمَتِهِ إِخْوَانًا وَكُنتُمْ عَلَى شَفَا حُفْرَةٍ মِّنَ النَّارِ فَأَنقَذَكُم মِّهَا كَذَلِكَ يُبَيِّنُ اللَّهُ لَكُمْ آيَاتِهِ لَعَلَّكُمْ تَهْتَدُونَ} অর্থাৎ, তোমরা সকলে আল্লাহর রশি (ধর্ম বা কুরআন)কে শক্ত ক'রে ধর এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না। তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহকে স্মরণ কর; তোমরা পরস্পর শত্রু ছিলে, অতঃপর তিনি তোমাদের হৃদয়ে প্রীতির সঞ্চার করলেন। ফলে তোমরা তাঁর অনুগ্রহে পরস্পর ভাই-ভাই হয়ে গেলে। তোমরা অগ্নিকুন্ডের (দোযখের) প্রান্তে ছিলে, অতঃপর তিনি (আল্লাহ) তা হতে তোমাদেরকে উদ্ধার করেছেন। এরূপে আল্লাহ তোমাদের জন্য তাঁর নিদর্শন স্পষ্টভাবে বিবৃত করেন, যাতে তোমরা সৎপথ পেতে পার। (আলে ইমরানঃ ১০৩)
মহানবী বলেছেন, "তোমরা এক অপরের প্রতি হিংসা করো না, কেনা-বেচাতে জিনিসের মূল্য বাড়িয়ে এক অপরকে ধোঁকা দিয়ো না, এক অপরের প্রতি শত্রুতা রেখো না, এক অপর থেকে (ঘৃণাভরে) মুখ ফিরায়ো না এবং এক অপরের (জিনিস) কেনা-বেচার উপর কেনা- বেচা করো না। আর হে আল্লাহর বান্দারা! তোমরা ভাই-ভাই হয়ে যাও। মুসলিম মুসলিমের ভাই। সে তার প্রতি যুলুম করবে না, তাকে তুচ্ছ ভাববে না এবং তাকে অসহায় অবস্থায় ছেড়ে দেবে না। আল্লাহভীতি এখানে রয়েছে। (তিনি নিজ বুকের দিকে ইঙ্গিত করে এ কথা তিনবার বললেন।) কোন মুসলিম ভাইকে তুচ্ছ ভাবা একটি মানুষের মন্দ হওয়ার জন্য যথেষ্ট। প্রত্যেক মুসলিমের রক্ত, মাল এবং তার মর্যাদা অপর মুসলিমের উপর হারাম।” (মুসলিম)
তিনি আরো বলেছেন, "তোমাদের মধ্যে কেউ (পূর্ণ) মু'মিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে তার ভাইয়ের জন্য তাই পছন্দ করবে, যা সে নিজের জন্য পছন্দ করে।” (বুখারী ও মুসলিম)
৬। ইসলাম মুসলিমের মনে আশাবাদিতা সৃষ্টি করে। ইতিবাচক মন রাখতে উদ্বুদ্ধ করে। মন থেকে হতাশা ও নৈরাশ্য বিদূরিত করতে বলে। মানুষের মন দুর্বল হলেও সবল করতে উৎসাহিত করে। বিপদে ভেঙ্গে পড়তে এবং পতিত হলে পড়ে থাকতে নিষেধ করে। ধৈর্যধারণ করতে এবং নতুনভাবে জীবন শুরু করতে অনুপ্রাণিত করে। মহান আল্লাহ বলেছেন, إِنَّ الإِنسَانَ خُلِقَ هَلُوعاً (১৯) إِذَا مَسَّهُ الشَّرُّ جَزُوعاً (২০) وَإِذَا مَسَّهُ الْخَيْرُ منوعاً (২১) إِلَّا الْمُصَلِّينَ (২২) الَّذِينَ هُمْ عَلَى صَلَاتِهِمْ دَائِمُونَ (২৩)... অর্থাৎ, মানুষ তো সৃজিত হয়েছে অতিশয় অস্থিরচিত্তরূপে। যখন তাকে বিপদ স্পর্শ করে, তখন সে হয় হা-হুতাশকারী। আর যখন তাকে কল্যাণ স্পর্শ করে, তখন সে হয় অতি কৃপণ। অবশ্য নামাযীগণ এর ব্যতিক্রম; যারা তাদের নামাযে সদা নিষ্ঠাবান।---- (মাআ'রিজঃ ১৯-২৩)
তিনি আরো বলেছেন, وَاسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلَاةِ وَإِنَّهَا لَكَبِيرَةٌ إِلَّا عَلَى الْخَاشِعِينَ } (৪৫) অর্থাৎ, তোমরা ধৈর্য ও নামাযের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর এবং বিনীতগণ ব্যতীত আর সকলের নিকট নিশ্চিতভাবে এ কঠিন। (বাক্বারাহঃ ৪৫)
মহানবী ﷺ বলেছেন, "(দেহমনে) সবল মু'মিন আল্লাহর নিকট দুর্বল মু'মিন অপেক্ষা বেশী প্রিয়। আর প্রত্যেকের মধ্যে কল্যাণ রয়েছে। তুমি ঐ জিনিসে যত্নবান হও, যাতে তোমার উপকার আছে এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা কর ও উৎসাহহীন হয়ো না। যদি তোমার কিছু ক্ষতি হয়, তাহলে এ কথা বলো না যে, 'যদি আমি এ রকম করতাম, তাহলে এ রকম হত।' বরং বলো, 'আল্লাহর (লিখিত) ভাগ্য এবং তিনি যা চেয়েছেন, তাই করেছেন।' কারণ, 'যদি' (শব্দ) শয়তানের কাজের দুয়ার খুলে দেয়।” (মুসলিম)
৭। ইসলাম বর্ণবৈষম্য স্বীকার করে না। জাতীয়তাবাদ ও দেশ, গোত্র, রঙ, ভাষা, বা জাতিভিত্তিক কোন পক্ষপাতিত্বের স্বীকৃতি দেয় না। মানুষে-মানুষে ভেদাভেদের প্রাচীর ভেঙ্গে চুরমার করে ইসলাম। মহান স্রষ্টা মানুষকে ভিন্ন ভিন্ন রঙ, ভাষা বা গোত্রের নানা বৈচিত্র দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। এটা তাঁর এক মহিমা ও সৃষ্টিকৌশল। তিনি বলেন, {وَمِنْ آيَاتِهِ خَلْقُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَاخْتِلَافُ أَلْسِنَتِكُمْ وَأَلْوَانِكُمْ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَاتٍ لِّلْعَالِمِينَ} (২২) সূরা রূম অর্থাৎ, তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে একটি নিদর্শন: আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বিভিন্নতা। এতে জ্ঞানীদের জন্য অবশ্যই বহু নিদর্শন রয়েছে। (রুমঃ ২২)
কিন্তু পার্থক্যের বেড়া ভেঙ্গে মানুষের মাঝে সাম্য প্রতিষ্ঠা করতে আহবান করেছেন তিনিই। তিনি বলেছেন, {يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَاكُم মِّ ذَكَرٍ وَأُنثَى وَجَعَلْنَاكُمْ شُعُوبًا وَقَبَائِلَ لِتَعَارَفُوا إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِندَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرٌ} (১৩) الحجرات অর্থাৎ, হে মানুষ! আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী হতে, পরে তোমাদেরকে বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমরা একে অপরেরর সাথে পরিচিত হতে পার। তোমাদের মধ্যে ঐ ব্যক্তিই আল্লাহর নিকট অধিক মর্যাদাসম্পন্ন যে অধিক আল্লাহ-ভীরু। আল্লাহ সবকিছু জানেন, সব কিছুর খবর রাখেন। (হুজুরাতঃ ১৩)
আর তাঁর প্রেরিত দূত বলেছেন, “নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা তোমাদের দেহ এবং তোমাদের আকৃতি দেখেন না, বরং তিনি তোমাদের অন্তর ও আমল দেখেন।” (মুসলিম) "কিয়ামতের দিন মোটা-তাজা বৃহৎ মানুষ আসবে, আল্লাহর কাছে তার মাছির ডানার সমানও ওজন হবে না।” (বুখারী ও মুসলিম) "আরবীর উপর অনারবীর এবং অনারবীর উপর আরবীর, কৃষ্ণকায়ের উপর শ্বেতকায়ের এবং শ্বেতকায়ের উপর কৃষ্ণকায়ের কোন শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা নেই। শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা আছে তো কেবল তাক্বওয়ার কারণেই।” (মুসনাদে আহমাদ ৫/৪১১)
৮। ইসলাম সকল মানুষকে স্ব-স্ব অধিকার প্রদান করেছে। একজনের অধিকার-ভাগ কেটে অন্যকে প্রদান করেনি। হাদীসে বলা হয়েছে, (إِنَّ لِرَبِّكَ عَلَيْكَ حَقًّا وَلِنَفْسِكَ عَلَيْكَ حَقًّا وَلِأَهْلِكَ عَلَيْكَ حَقًّا فَأَعْطِ كُلَّ ذِي حق حقه. 'নিশ্চয় তোমার উপর তোমার প্রভুর অধিকার রয়েছে। তোমার প্রতি তোমার আত্মারও অধিকার আছে এবং তোমার প্রতি তোমার পরিবারেরও অধিকার রয়েছে। অতএব তুমি প্রত্যেক অধিকারীকে তার অধিকার প্রদান কর।' (বুখারী)
📄 নারী-কল্যাণ বিষয়ে ইসলামের বৈশিষ্ট্য
১। ইসলাম নারীকে তার যথার্থ মর্যাদা ও অধিকার প্রদান করেছে। মহান আল্লাহ বলেছেন, {وَلَا تَتَمَنَّوْا مَا فَضَّلَ اللهُ بِهِ بَعْضَكُمْ عَلَى بَعْضٍ لِّرِّجَالِ نَصِيبٌ مِّمَّا اكْتَسَبُوا وَلِلنِّسَاءِ نَصِيبٌ مِّمَّا اكْتَسَبْنَ وَاسْأَلُواْ اللّهَ مِن فَضْلِهِ إِنَّ اللَّهَ كَانَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمًا} (৩২) সূরা আন-নিসা অর্থাৎ, যা দিয়ে আল্লাহ তোমাদের কাউকেও কারোর উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন, তোমরা তার লালসা করো না। পুরুষগণ যা অর্জন করে, তা তাদের প্রাপ্য অংশ এবং নারীগণ যা অর্জন করে, তা তাদের প্রাপ্য অংশ। তোমরা আল্লাহর কাছে তাঁর অনুগ্রহ প্রার্থনা কর। নিশ্চয় আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বজ্ঞ। (নিসাঃ ৩২)
২। মায়ের পায়ের তলায় পুরুষের বেহেস্ত নির্ধারণ করেছে। মহানবী ﷺ বলেছেন, “তুমি মায়ের খিদমতে অবিচল থাক। কারণ, তাঁর পদতলে তোমার জান্নাত রয়েছে।” (ইবনে মাজাহ, সহীহ নাসাঈ ২৯০৮নং)
৩। স্ত্রীকে স্বামীর লেবাস বলে মর্যাদা দিয়েছে। মহান আল্লাহ বলেছেন, {هُنَّ لِبَاسٌ لَّكُمْ وَأَنتُمْ لِبَاسٌ لَّهُنَّ} (১৮৭) সূরা আল-বাক্বারা অর্থাৎ, তারা তোমাদের পোশাক এবং তোমরা তাদের পোশাক। (বাক্বারাহঃ ১৮৭)
৪। কন্যাকে মানুষের জন্য দোযখের পর্দা ও আবরণ নির্ধারণ করেছে। মহানবী বলেছেন, “যে ব্যক্তি এই একাধিক কন্যা নিয়ে সঙ্কটাপন্ন হবে, অতঃপর সে তাদের প্রতি যথার্থ সদ্ব্যবহার করবে, সেই ব্যক্তির জন্য ঐ কন্যারা জাহান্নাম থেকে অন্তরাল (পর্দা) স্বরূপ হবে।” (বুখারী ১৪১৮ নং, মুসলিম ২৬২৯ নং)
তিনি আরো বলেছেন, “যে ব্যক্তি দুটি অথবা তিনটি কন্যা, কিংবা দুটি অথবা তিনটি বোন তাদের মৃত্যু অথবা বিবাহ, অথবা সাবালিকা হওয়া পর্যন্ত, কিংবা ঐ ব্যক্তির মৃত্যু পর্যন্ত যথার্থ প্রতিপালন করে, সে ব্যক্তি আর আমি (পরকালে) তর্জনী ও মধ্যমা অঙ্গুলিদ্বয়ের মত পাশাপাশি অবস্থান করব।” (আহমাদ ৩/১৪৭-১৪৮, ইবনে হিব্বান ২০৪৫ নং, সিলসিলাহ সহীহাহ ২৯৬ নং)
৫। বিধবা ও তালাকপ্রাপ্তার জন্য পুনর্বিবাহ বৈধ করেছে। মহান আল্লাহ বলেছেন, {وَأَنكِحُوا الْأَيَامَى مِنكُمْ وَالصَّالِحِينَ مِنْ عِبَادِكُمْ وَإِمَائِكُمْ إِن يَكُونُوا فُقَرَاء يُغْنِهِمُ اللَّهُ مِن فَضْلِهِ وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ) (৩২) سورة النور অর্থাৎ, তোমাদের মধ্যে যাদের স্বামী-স্ত্রী নেই, তাদের বিবাহ সম্পাদন কর এবং তোমাদের দাস-দাসীদের মধ্যে যারা সৎ, তাদেরও। তারা অভাবগ্রস্ত হলে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে অভাবমুক্ত ক'রে দেবেন। আর আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ। (নূরঃ ৩২)
৬। সকল ক্ষেত্রে নারীর ভরণ-পোষণের দায়িত্ব পুরুষের উপর ন্যস্ত করেছে। নারী সৃষ্টিগতভাবে দুর্বল বলেই পুরুষকেই তার কর্তা নির্বাচন করেছে। মহান আল্লাহ বলেছেন, {الرِّجَالُ قَوَّامُونَ عَلَى النِّسَاء بِمَا فَضَّلَ اللَّهُ بَعْضَهُمْ عَلَى بَعْضٍ وَبِمَا أَنفَقُوا مِنْ أَمْوَالِهِمْ} (৩৪) سورة النساء অর্থাৎ, পুরুষ নারীর কর্তা। কারণ, আল্লাহ তাদের এককে অপরের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন এবং এ জন্য যে পুরুষ (তাদের জন্য) ধন ব্যয় করে। (নিসাঃ ৩৪)
{وَلَهُنَّ মִثْلُ الَّذِي عَلَيْهِنَّ بِالْمَعْرُوفِ وَلِلرِّجَالِ عَلَيْهِنَّ دَرَجَةٌ وَاللَّهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ} (২২৮) سورة البقرة অর্থাৎ, নারীদের তেমনি ন্যায়-সঙ্গত অধিকার আছে যেমন আছে তাদের উপর পুরুষদের। কিন্তু নারীদের উপর পুরুষদের কিছুটা মর্যাদা আছে। আল্লাহ মহাপরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। (বাক্বারাহঃ ২২৮)
৭। নারী পুরুষের কাছে অবহেলিতা ছিল। কন্যা-সন্তান অবাঞ্ছনীয় ছিল। তাই তাকে ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরে হত্যা করা হতো, মাটিতে পুঁতে ফেলা হতো, কন্যার জনক হওয়াটা অপমানজনক ভাবা হতো। ইসলাম এ সবকে অন্যায় ঘোষণা করে কন্যার মর্যাদা রক্ষা করেছে। কন্যা-ঘাতকরা রক্ষা পাবে না। {وَإِذَا الْمَوْؤُودَةُ سُئِلَتْ (৮) بِأَيِّ ذَنبٍ قُتِلَتْ} (৯) التكوير অর্থাৎ, যখন জীবন্ত-প্রোথিত কন্যাকে জিজ্ঞেস করা হবে, কোন্ অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল? (তাকভীরঃ ৮-৯)
কন্যা-সন্তানের ব্যাপারে মানুষের মন ও মানসিকতা এমন ছিল যে, وَإِذَا بُشِّرَ أَحَدُهُمْ بِالأُنثَى ظَلَّ وَجْهُهُ مُسْوَدّاً وَهُوَ كَظِيمٌ (৫৮) يَتَوارَى مِنَ الْقَوْمِ مِن سُوءِ مَا بُشِّرَ بِهِ أَيُمْسِكُهُ عَلَى هُونٍ أَمْ يَدُسُّهُ فِي التَّرَابِ أَلَا سَاءَ مَا يَحْكُمُونَ} (৫৯) النحل অর্থাৎ, যখন তাদের কাউকে কন্যা-সন্তানের সুসংবাদ দেওয়া হয়, তখন তার মুখমন্ডল কালো হয়ে যায় এবং সে অসহনীয় মনস্তাপে ক্লিষ্ট হয়। তাকে যে সংবাদ দেওয়া হয়, তার গ্লানি হেতু সে নিজ সম্প্রদায় হতে আত্মগোপন করে; সে চিন্তা করে যে, হীনতা সত্ত্বেও সে তাকে রেখে দেবে, না মাটিতে পুঁতে দেবে। সাবধান! তারা যা সিদ্ধান্ত করে, তা কতই না নিকৃষ্ট। (নাহল: ৫৮-৫৯)
৮। আধুনিক জাহেলিয়াতেও নারী অবহেলিতা ও বঞ্চিতা। বিশেষ করে পণ ও যৌতুক প্রথার বিষাক্ত পরিবেশে সমাজের মন যেন গাইছে, 'কন্যা ঘরের আবর্জনা, পয়সা দিয়ে ফেলতে হয়, রক্ষণীয়া পালনীয়া শিক্ষণীয়া আদৌ নয়।' কিন্তু ইসলাম নারীর মর্যাদা দিয়েছে। পণ-যৌতুক গ্রহণ করতে নয়, বরং মোহর প্রদান করে বিবাহ করতে আদেশ করা হয়েছে পুরুষকে। মহান আল্লাহ বলেছেন, وَأُحِلَّ لَكُم মَّا وَرَاء ذَلِكُمْ أَن تَبْتَغُوا بِأَمْوَالِكُم مُّحْصِنِينَ غَيْرَ مُسَافِحِينَ فَمَا اسْتَمْتَعْتُم بِهِ مِنْهُنَّ فَآتُوهُنَّ أُجُورَهُنَّ فَرِيضَة} (২৪) سورة النساء অর্থাৎ, নারীদের মধ্যে তোমাদের অধিকারভুক্ত দাসী ব্যতীত সকল সধবা তোমাদের জন্য নিষিদ্ধ, তোমাদের জন্য এ হল আল্লাহর বিধান। উল্লিখিত নারীগণ ব্যতীত আর সকলকে বিবাহ করা তোমাদের জন্য বৈধ করা হল; এই শর্তে যে, তোমরা তাদেরকে নিজ সম্পদের বিনিময়ে বিবাহের মাধ্যমে গ্রহণ করবে, অবৈধ যৌন-সম্পর্কের মাধ্যমে নয়। অতঃপর তোমরা তাদের মধ্যে যাদের (মাধ্যমে দাম্পত্যসুখ) উপভোগ করবে, তাদেরকে নির্ধারিত মোহর অর্পণ কর। (নিসাঃ ২৪)
৯। কামুকদের কামনা, লম্পটদের লাম্পট্য ও ইভটিজারদের ইভটিজিং থেকে নারীকে মুক্তি দিতে ইসলাম পর্দার বিধান দিয়েছে। সম্ভ্রান্ত মহিলার পরিচয় দিতে নারীকে 'হিজাব' ব্যবহার করতে বলা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেছেন, يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ قُل لِّأَزْوَاجِكَ وَبَنَاتِكَ وَنِسَاء الْمُؤْمِنِينَ يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ মִ جَلَابِيبِهِنَّ ذَلِكَ أَدْنَى أَن يُعْرَفْنَ فَلَا يُؤْذَيْنَ وَكَانَ اللَّهُ غَفُوراً رَّحِيمًا} অর্থাৎ, হে নবী! তুমি তোমার স্ত্রীগণকে, কন্যাগণকে ও বিশ্বাসীদের রমণীগণকে বল, তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দংশ নিজেদের (মুখমন্ডলের) উপর টেনে দেয়। এতে তাদেরকে চেনা সহজতর হবে; ফলে তাদেরকে উত্ত্যক্ত করা হবে না। আর আল্লাহ চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (আহযাবঃ ৫৯)
১০। নারীর নিরাপত্তার স্বার্থেই পরপুরুষের সাথে বিশেষ পদ্ধতিতে বাক্যালাপ করার বিধান দিয়েছে ইসলাম। মহান আল্লাহ বলেছেন, يَا نِسَاءِ النَّبِيِّ لَسْتُنَّ كَأَحَدٍ مِّنَ النِّسَاء إِنِ اتَّقَيْتُنَّ فَلَا تَخْضَعْنَ بِالْقَوْلِ فَيَطْمَعَ الَّذِي فِي قَلْبِهِ مَرَضٌ وَقُلْنَ قَوْلاً مَّعْرُوفاً} الأحزاب ৩২ অর্থাৎ, হে নবী-পত্নীগণ! তোমরা অন্য নারীদের মত নও; যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, তবে পরপুরুষের সাথে কোমল কণ্ঠে এমনভাবে কথা বলো না, যাতে অন্তরে যার ব্যাধি আছে সে প্রলুব্ধ হয়। আর তোমরা সদালাপ কর। (স্বাভাবিকভাবে কথা বল।) (আহযাবঃ ৩২)
উক্ত আয়াতে সম্বোধন যদিও নবী-পত্নীগণকে করা হয়েছে, তবুও তার বিধান প্রত্যেক মুসলিম নারীর জন্য। যেহেতু উক্ত বিধান পালনের ব্যাপারে তাঁদের তুলনায় এদের প্রয়োজনীয়তা বেশি।
১১। একই কারণে নারী-পুরুষ উভয়কেই চক্ষু অবনত করার বিধান দিয়েছে। যার দিকে সকাম দৃষ্টিপাত ক্ষতিকর হতে পারে, তার দিকে দৃষ্টিপাত নিষেধ করেছে। মহান আল্লাহ বলেছেন, {قُل لِّلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا মִ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ ذَلِكَ أَزْكَى لَهُمْ إِنَّ اللَّهُ خَبِيرٌ بِما يَصْنَعُونَ (৩০) وَقُل لِّلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ মִ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ মִهْهَا وَلْيَضْرِبْنَ بِخُمُرِهِنَّ عَلَى جُيُوبِهِنَّ ....) (৩১) سورة النور অর্থাৎ, বিশ্বাসীদেরকে বল, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত করে এবং তাদের যৌন অঙ্গকে সাবধানে সংযত রাখে; এটিই তাদের জন্য অধিকতর পবিত্র। ওরা যা করে, নিশ্চয় আল্লাহ সে বিষয়ে অবহিত। বিশ্বাসী নারীদেরকে বল, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত করে ও তাদের লজ্জাস্থান রক্ষা করে। তারা যা সাধারণতঃ প্রকাশ থাকে তা ব্যতীত তাদের সৌন্দর্য যেন প্রদর্শন না করে, তারা তাদের বক্ষঃস্থল যেন মাথার কাপড় দ্বারা আবৃত রাখে। (নূর: ৩০-৩১)
মহানবী বলেন, "একবার নজর পড়ে গেলে আর দ্বিতীয়বার তাকিয়ে দেখো না। প্রথমবারের (অনিচ্ছাকৃত) নজর তোমার জন্য বৈধ। কিন্তু দ্বিতীয়বারের নজর বৈধ নয়। (আহমাদ, আবু দাউদ, তিরমিযী, হাকেম, সহীহুল জামে' ৭৯৫৩ নং)
১২। একই কারণে মহিলাকে এমনভাবে চলাফেরা করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে পর-পুরুষের মনে আকর্ষণ সৃষ্টি না করে। মহান আল্লাহ বলেছেন, {وَلَا يَضْرِبْنَ بِأَرْجُلِهِنَّ لِيُعْلَمَ مَا يُخْفِينَ মִ زِينَتِهِنَّ وَتُوبُوا إِلَى اللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَا الْمُؤْمِنُونَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ) (৩১) سورة النور অর্থাৎ, তারা যেন এমন সজোরে পদক্ষেপ না করে, যাতে তাদের গোপন আভরণ প্রকাশ পেয়ে যায়। হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা সকলে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার। (নূর: ৩১)
মহানবী বলেছেন, "প্রত্যেক চক্ষুই ব্যভিচারী। আর মহিলা যদি (কোন প্রকার) সুগন্ধ ব্যবহার করে কোন (পুরুষদের) মজলিসের পাশ দিয়ে অতিক্রম করে, তবে সে ব্যভিচারিণী (বেশ্যার মেয়ে)।” (আবু দাউদ, তিরমিযী, নাসাঈ, ইবনে হিব্বান, ইবনে খুযাইমাহ, হাকেম, সহীহুল জামে' ৪৫৪০নং)
১৩। নারীর আবেগ নিয়ে যাতে কেউ খেলতে না পারে, নারীর অনভিজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে যাতে কেউ তাকে প্রবঞ্চিতা ও প্রতারিতা না করতে পারে, তার জন্য তার বিবাহে অভিভাবকের অনুমতি আবশ্যক করেছে। মহানবী বলেন, أَيُّمَا امْرَأَة نَكَحَت نَفْسَهَا بِغَيْر إِذن وَلِيَّهَا فَنِكَاحُهَا بَاطِلٌ فنكاحها بَاطِل فنكاحها باطل). অর্থাৎ, মহানবী বলেন, “যে নারী তার অভিভাবকের অনুমতি ছাড়াই নিজে নিজে বিবাহ করে, তার বিবাহ বাতিল, বাতিল, বাতিল।" (আহমাদ, আবু দাউদ, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ, দারেমী, মিশকাত ৩১৩১ নং)
অবশ্য নারীর সম্মতিকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, তার সম্মতি না নিয়ে জোর করে কারো সাথে বিবাহকে অবৈধ করা হয়েছে। যেমন অপছন্দনীয় কারো সাথে বিবাহ হলে তাকে তালাক নেওয়ার অধিকারও দেওয়া হয়েছে।
১৪। নারীর স্বার্থেই একাধিক বিবাহ বৈধ করেছে ইসলাম। তার কোন ত্রুটির কারণে স্বামী তাকে বর্জন করলে তার দুর্দিন আসে, পুরুষের তুলনায় নারীর সংখ্যা বেশি হলে বহু নারী অবিবাহিতা থেকে যায়, স্ত্রী যৌন-মিলনে অক্ষম বা শীতল হলে স্বামী পরকীয়ার প্রেমে পড়ে, আরো কত কী। কিন্তু একাধিক বিবাহ করার সুযোগ সৃষ্টি করে দিলে বৈধভাবে স্বামীও খোশ হয়, স্ত্রীও স্ত্রী থাকে। তবে তাতে শর্ত হল পুরুষকে স্ত্রীদের মাঝে ন্যায়পরায়ণতা বজায় রাখতে হবে। নচেৎ একাধিক বিবাহ বৈধ নয়। মহান আল্লাহ বলেছেন, وَإِنْ خِفْتُمْ أَلا تُقْسِطُواْ فِي الْيَتَامَى فَانكِحُوا مَا طَابَ لَكُم মِّ النِّسَاءِ مَثْنَى وَثُلَاثَ وَرُبَاعَ فَإِنْ خِفْتُمْ أَلا تَعْدِلُوا فَوَاحِدَةً أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ ذَلِكَ أَدْنَى أَلا تَعُولُوا} (৩) سورة النساء অর্থাৎ, আর তোমরা যদি আশংকা কর যে, পিতৃহীনাদের প্রতি সুবিচার করতে পারবে না, তবে বিবাহ কর (স্বাধীন) নারীদের মধ্যে যাকে তোমাদের ভাল লাগে; দুই, তিন অথবা চার। আর যদি আশংকা কর যে, সুবিচার করতে পারবে না, তবে একজনকে (বিবাহ কর) অথবা তোমাদের অধিকারভুক্ত (ক্রীত অথবা যুদ্ধবন্দিনী) দাসীকে (স্ত্রীরূপে ব্যবহার কর)। এটাই তোমাদের পক্ষপাতিত্ব না করার অধিকতর নিকটবর্তী। (নিসাঃ ৩) যেমন এমার্জেন্সী গেটের মতো তালাক (বিবাহ-বিচ্ছেদ) কেও বৈধতা দান করেছে ইসলাম।
১৫। জাহেলী যুগে নারীই এক প্রকার মীরাসের সম্পত্তি ছিল। তাকে মীরাস থেকে বঞ্চিত করা হতো। ইসলাম তাকে তার প্রাপ্য হক প্রদান করেছে। কখনো পুরুষের অর্ধেক, কখনো পুরুষের সমান। আল- কুরআনের সূরা নিসায় তার বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে।
১৬। স্বামীর কাছে স্ত্রীর মর্যাদা নিয়ে সমান ব্যবহার পাওয়া অধিকারিণী করেছে নারীকে। মহান আল্লাহ বলেছেন, وَلَهُنَّ মִثْلُ الَّذِي عَلَيْهِنَّ بِالْمَعْرُوفِ وَلِلرِّجَالِ عَلَيْهِنَّ دَرَجَةٌ وَاللَّهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ} (২২৮) سورة البقرة অর্থাৎ, নারীদের তেমনি ন্যায়-সঙ্গত অধিকার আছে যেমন আছে তাদের উপর পুরুষদের। কিন্তু নারীদের উপর পুরুষদের কিছুটা মর্যাদা আছে। আল্লাহ মহাপরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। (বাক্বারাহঃ ২২৮)
{وَوعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ فَإِن كَرِهْتُمُوهُنَّ فَعَسَى أَن تَكْرَهُوا شَيْئًا وَيَجْعَلَ اللَّهُ فِيهِ خَيْرًا كَثِيرًا} (১৯) سورة النساء অর্থাৎ, তাদের সাথে সৎভাবে জীবন যাপন কর; তোমরা যদি তাদেরকে ঘৃণা কর, তাহলে এমন হতে পারে যে, আল্লাহ যাতে প্রভূত কল্যাণ রেখেছেন, তোমরা তাকে ঘৃণা করছ। (নিসাঃ ১৯)
১৭। মহান আল্লাহর কাছে আনুগত্যের প্রতিদানে নারীকেও পুরুষের সমান করা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেছেন, {إِنَّ الْمُسْلِمِينَ وَالْمُسْلِمَاتِ وَالْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ وَالْقَانِتِينَ وَالْقَانِتَاتِ وَالصَّادِقِينَ وَالصَّادِقَاتِ وَالصَّابِرِينَ وَالصَّابِرَاتِ وَالْخَاشِعِينَ وَالْخَاشِعَاتِ وَالْمُتَصَدِّقِينَ وَالْمُتَصَدِّقَاتِ وَالصَّائِمِينَ وَالصَّائِمَاتِ وَالْحَافِظِينَ فُرُوجَهُمْ وَالْحَافِظَاتِ وَالذَّاكِرِينَ اللَّهَ كَثِيراً وَالذَّاكِرَاتِ أَعَدَّ اللَّهُ لَهُم মَّغْفِرَةً وَأَجْراً عظِيماً} الأحزاب ৩৫ অর্থাৎ, নিশ্চয়ই আত্মসমর্পণকারী (মুসলিম) পুরুষ ও আত্মসমর্পণকারী (মুসলিম) নারী, বিশ্বাসী পুরুষ ও বিশ্বাসী নারী, অনুগত পুরুষ ও অনুগত নারী, সত্যবাদী পুরুষ ও সত্যবাদী নারী, ধৈর্যশীল পুরুষ ও ধৈর্যশীল নারী, বিনীত পুরুষ ও বিনীত নারী, দানশীল পুরুষ ও দানশীল নারী, রোযা পালনকারী পুরুষ ও রোযা পালনকারী নারী, যৌনাঙ্গ হিফাযতকারী (সংযমী) পুরুষ ও যৌনাঙ্গ হিফাযতকারী (সংযমী) নারী, আল্লাহকে অধিক স্মরণকারী পুরুষ ও আল্লাহকে অধিক স্মরণকারী নারী---এদের জন্য আল্লাহ ক্ষমা ও মহাপ্রতিদান রেখেছেন। (আহযাবঃ ৩৫)
{فَاسْتَجَابَ لَهُمْ رَبُّهُمْ أَنِّي لَا أُضِيعُ عَمَلَ عَامِلٍ মِّكُم مِّ ذَكَرٍ أَوْ أُنثَى بَعْضُكُم মِّ بَعْضٍ} آل عمران ১৯৫ অর্থাৎ, অতঃপর তাদের প্রতিপালক তাদের ডাকে সাড়া দিয়ে বলেন, আমি তোমাদের মধ্যে কোন কর্মনিষ্ঠ নর অথবা নারীর কর্ম বিফল করি না; তোমরা পরস্পর সমান। (আলে ইমরানঃ ১৯৫)
{وَمَن يَعْمَلْ মִ الصَّالِحَاتِ মִ ذَكَرٍ أَوْ أُنثَى وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَأُوْلَئِكَ يَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ وَلَا يُظْلَمُونَ نَقِيراً النساء ১২৪ অর্থাৎ, আর পুরুষই হোক অথবা নারীই হোক, যারাই বিশ্বাসী হয়ে সৎকাজ করবে, তারাই জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং তাদের প্রতি (খেজুরের আঁটির পিঠে) বিন্দু পরিমাণও যুলুম করা হবে না। (নিসাঃ ১২৪)
পক্ষান্তরে যেখানে নারীকে পুরুষের সমানাধিকার দেওয়া হয়নি, যেমন পিতার ওয়ারেস হওয়ার ক্ষেত্রে, একই সময়ে একাধিক স্বামী রাখার ক্ষেত্রে ইত্যাদি, সেখানে সৃষ্টিকর্তার মহা কৌশল ও ইসলামের হিকমতপূর্ণ যৌক্তিকতা আছে। জ্ঞানিগণ জ্ঞান-গবেষণা করলেই সহজে বুঝতে পারবেন, তাতে আসলে নারীর মর্যাদা আদৌ ক্ষুণ্ণ করা হয়নি।
📄 আম অধিকারে ইসলামের বৈশিষ্ট্য
১। ইসলাম প্রত্যেক মানুষকে তার স্বাধিকার প্রদান করতে উদ্বুদ্ধ করে। শুধু মানুষই নয়, জীব-জন্তু ও উদ্ভিদের অধিকার সম্বন্ধেও উদাসীন নয় ইসলাম। অধিকারীর অধিকার লংঘন করতে নিষেধ করেছে ইসলাম। মহান আল্লাহ বলেন, {وَلَا تَعْتَدُوا إِنَّ اللَّهَ لاَ يُحِبُّ الْمُعْتَدِينَ} (১৯০) البقرة والمائدة ৮৭ অর্থাৎ, বাড়াবাড়ি (সীমালংঘন) করো না, নিশ্চয় আল্লাহ বাড়াবাড়িকারীদেরকে পছন্দ করেন না। (বাক্বারাহঃ ১৯০, মায়িদাহঃ ৮৭)
পশুর প্রতি দয়াপ্রদর্শনে পুরস্কার রেখেছে ইসলাম। রসূল বলেন, “এক ব্যক্তি এক কুয়ার নিকটবর্তী হয়ে তাতে অবতরণ করে পানি পান করল। অতঃপর উঠে দেখল, কুয়ার পাশে একটি কুকুর (পিপাসায়) জিহ্বা বের করে হাঁপাচ্ছে। তার প্রতি লোকটির দয়া হল। সে তার পায়ের একটি (চর্মনির্মিত) মোজা খুলে (কুয়াতে নেমে তাতে পানি ভরে এনে) কুকুরটিকে পান করাল। ফলে আল্লাহ তার এই কাজের প্রতিদান স্বরূপ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করালেন।" লোকেরা বলল, 'হে আল্লাহর রসূল! জীব-জন্তর প্রতি দয়াপ্রদর্শনেও কি আমাদের সওয়াব আছে? তিনি বললেন, “প্রত্যেক সজীব প্রাণবিশিষ্ট জীবের (প্রতি দয়াপ্রদর্শনে) সওয়াব বিদ্যমান।” (বুখারী ২৪৬৬ নং, মুসলিম ২২৪৪ নং)
পশুর অধিকার নষ্ট করার এবং তার প্রতি নিষ্ঠুর হওয়ার সাজা রেখেছে ইসলাম। রাসূলুল্লাহ বলেছেন, عُذِّبَتْ امْرَأَةٌ فِي هِرَّةٍ سَجَنَتْهَا حَتَّى مَاتَتْ فَدَخَلَتْ فِيهَا النَّارَ لَا هِيَ أَطْعَمَتْهَا وَلَا سَقَتْهَا إِذْ حَبَسَتْهَا وَلَا هِيَ تَرَكَتْهَا تَأْكُلُ মִ خَشَاشِ الْأَرْضِ). "এক মহিলাকে একটি বিড়ালের জন্য শাস্তি দেওয়া হয়েছে। সে তাকে বেঁধে রেখেছিল এবং অবশেষে সে মারা গিয়েছিল, পরিণতিতে মহিলা তারই কারণে জাহান্নামে প্রবেশ করল। সে যখন তাকে বেঁধে রেখেছিল, তখন তাকে আহার ও পানি দিত না এবং তাকে ছেড়েও দিত না যে, সে কীট-পতঙ্গ ধরে খাবে।” (বুখারী ও মুসলিম)
একদা মহানবী একটি উটকে দেখলেন, (ক্ষুধায়) তার পিঠের সাথে পেট লেগে গেছে। তা দেখে তিনি বললেন, “তোমরা এই অবলা জন্তুদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় কর। সুতরাং উত্তমভাবে (সুস্থ থাকা অবস্থায়) তাতে সওয়ার হও এবং উত্তমভাবে (সুস্থ থাকা অবস্থায়) তা খাও (বা তার পিঠ থেকে নেমে যাও)।” (আবু দাউদ, ইবনে খুযাইমাহ, সহীহ তারগীব ২২৭৩নং)
অহেতুক প্রাণী হত্যা করতে নিষেধ করেছে ইসলাম। ইসলামের নবী বলেছেন, (إِنَّ أَعْظَمَ الذُّنُوبِ عِنْدَ اللَّهِ رَجُلٌ تَزَوَّجَ امْرَأَةً فَلَمَّا قَضَى حَاجَتَهُ মִْهَا طَلَّقَهَا وَذَهَبَ بِمَهْرُها وَرَجُلٌ اسْتَعْمَلَ رَجُلاً فَذَهَبَ بِأُجْرَتِهِ وَآخَرُ يَقْتُلُ دَابَّةً عَبثًا). “আল্লাহর নিকট সব চাইতে বড় পাপিষ্ঠ সেই ব্যক্তি, যে কোন মহিলাকে বিবাহ করে, অতঃপর তার নিকট থেকে মজা লুটে নিয়ে তাকে তালাক দেয় এবং তার মোহরও আত্মসাৎ করে। (দ্বিতীয় হল) সেই ব্যক্তি, যে কোন লোককে মজুর খাটায়, অতঃপর তার মজুরী আত্মসাৎ করে এবং (তৃতীয় হল) সেই ব্যক্তি, যে খামোখা পশু হত্যা করে।” (হাকেম, বাইহাকী, সহীহুল জামে' ১৫৬৭ নং)
অহেতুক গাছ কেটে ফেলতে নিষেধ করেছে ইসলাম। মহানবী ﷺ বলেছেন, "যে ব্যক্তি (খামোখা) কোন কুল গাছ কেটে ফেলবে (যে গাছের নিচে মুসাফির বা পশু-পক্ষী ছায়া গ্রহণ করত), সে ব্যক্তির মাথাকে আল্লাহ সোজা জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন।” (আবু দাউদ ৫২৩৯নং)
ফল-ফসলের জন্য, পরিবেশ দূষণমুক্ত করার জন্য অথবা ছায়াগ্রহণ করার জন্য ইসলাম গাছ লাগাতে উদ্বুদ্ধ করেছে। মহানবী ﷺ বলেন, "কিয়ামত কায়েম হয়ে গেলেও তোমাদের কারো হাতে যদি কোন গাছের চারা থাকে এবং সে তা এর আগেই রোপন করতে সক্ষম হয়, তবে যেন তা রোপন করে ফেলে।” (আহমাদ, সঃ জামে। ১৪২৪নং)
প্রিয় নবী ﷺ আরো বলেন, "যে কোন মুসলিম গাছ লাগায় কিংবা কোন ফসল ফলায় আর তা হতে কোন পাখী, মানুষ অথবা চতুষ্পদ জন্তু ভক্ষণ করে, তবে তা তার জন্য সদকাহ (করার সমপরিমাণ সওয়াব লাভ) হয়।” (বুখারী ২৩২০নং)
২। মানুষের প্রতি দরদী হতে উদ্বুদ্ধ করে ইসলাম। মানুষের প্রতি হিতাকাঙ্ক্ষী হতে, তার ইহ-পরকালের ব্যাপারে কল্যাণকামী হতে অনুপ্রাণিত করে। মহানবী ﷺ বলেন, “দ্বীন হল হিতাকাঙ্ক্ষার নাম।" আমরা জিজ্ঞাসা করলাম, 'কার জন্য হে আল্লাহর রসূল!' তিনি বললেন, “আল্লাহ, তাঁর কিতাব, তাঁর রসূল, মুসলিমদের নেতৃবর্গ এবং তাদের জনসাধারণের জন্য।” (মুসলিম ৫৫নং)
পরকালের শাস্তি থেকে মুক্তি দেওয়ার লক্ষ্যে মানুষকে সৎকর্মে আদেশ ও অসৎ কর্মে বাধা প্রদান করতে নির্দেশ দেয়। মহান আল্লাহ বলেন, {وَلْتَكُن মِّكُم মَّةٌ يَدْعُونَ إِلَى الْخَيْرِ وَيَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ وَأُوْلَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ} (১০৪) سورة آل عمران অর্থাৎ, তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকা উচিত, যারা (লোককে) কল্যাণের দিকে আহবান করবে এবং সৎকার্যের নির্দেশ দেবে ও অসৎ কার্য থেকে নিষেধ করবে। আর এ সকল লোকই হবে সফলকাম। (আলে ইমরানঃ ১০৪)
{كُنتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ وَتُؤْمِنُونَ باللهِ } (১১০) سورة آل عمران অর্থাৎ, তোমরাই শ্রেষ্ঠতম জাতি। মানবমন্ডলীর জন্য তোমাদের অভ্যুত্থান হয়েছে, তোমরা সৎকার্যের নির্দেশ দান করবে, অসৎ কার্য (করা থেকে) নিষেধ করবে, আর আল্লাহতে বিশ্বাস করবে। (আলে ইমরানঃ ১১০)
বলাই বাহুল্য যে, উপকারিতার স্থায়িত্বকাল অনুসারে উপকারীর মহত্ত্ব কম-বেশি হয়। যে উপকারী পার্থিব কোন উপকার করে মানুষের সাহায্য করে, হয়তো-বা ৬০/৭০ বছর জীবনের উপকার সাধন করে তাকে কৃতার্থ করে, সে উপকারী নিশ্চয় মহান। কিন্তু যে উপকারী পার্থিব জীবনে উপকার করার পরেও পরকালের অনন্তকাল জীবনে সুখী হওয়ার জন্য উপকার সাধন করে, সে উপকারী নিশ্চয় সুমহান।
৩। পার্থিব সাহায্য-সহযোগিতার ক্ষেত্রে ইসলাম মুসলিমকে অপর মুসলিমের জন্য আয়নাস্বরূপ মনে করে। সামাজিক বন্ধনের ক্ষেত্রে পুরো সমাজকে একটি অট্টালিকার মতো নিরূপণ করে। ধনীদের ধনে গরীবদের অধিকার নির্ধারণ করে। ইসলাম এমন সমাজ চায় না, যে সমাজে কেউ খাবে, কেউ খাবে না। কেউ পোলাও খাবে, কেউ রুটিও পাবে না। মহান আল্লাহ বলেছেন, {وَفِي أَمْوَالِهِمْ حَقٌّ لِّلسَّائِلِ وَالْمَحْرُومِ} (১৯) سورة الذاريات অর্থাৎ, তাদের ধন-সম্পদে রয়েছে ভিক্ষুক ও বঞ্চিতের হক। (যারিয়াতঃ ১৯)
{إِنَّمَا الصَّدَقَاتُ لِلْفُقَرَاءِ وَالْمَسَاكِينِ وَالْعَامِلِينَ عَلَيْهَا وَالْمُؤَلَّفَةِ قُلُوبُهُمْ وَفِي الرِّقَابِ وَالْغَارِمِينَ وَفِي سَبِيلِ اللَّهِ وَابْنِ السَّبِيلِ فَرِيضَةً মِّ اللَّهِ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ} (৬০) سورة التوبة অর্থাৎ, (ফরয) স্বাদক্বাসমূহ শুধুমাত্র নিঃস্ব, অভাবগ্রস্ত এবং স্বাদক্বাহ (আদায়ের) কাজে নিযুক্ত কর্মচারীদের জন্য, যাদের মনকে ইসলামের প্রতি অনুরাগী করা আবশ্যক তাদের জন্য, দাসমুক্তির জন্য, ঋণগ্রস্তদের জন্য, আল্লাহর পথে (সংগ্রামকারী) ও (বিপদগ্রস্ত) মুসাফিরের জন্য। এ হল আল্লাহর পক্ষ হতে নির্ধারিত (বিধান)। আর আল্লাহ মহাজ্ঞানী, প্রজ্ঞাময়। (তাওবাহঃ ৬০)
৪। দান-খয়রাত করে অনাথ, বিধবা ও দরিদ্রের সেবা করতে উদ্বুদ্ধ করে ইসলাম। দুর্বলদের প্রতি দয়াপ্রদর্শন করতে উৎসাহিত করে দ্বীনের বিধান। আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীর সাথে সদ্ব্যবহার করতে আগ্রহান্বিত করে ইসলামী শরীয়ত। মহান আল্লাহ বলেন, {وَاعْبُدُوا اللَّهَ وَلاَ تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا وَبِذِي الْقُرْبَى وَالْيَتَامَى وَالْمَسَاكِينِ وَالْجَارِ ذِي الْقُرْبَى وَالْجَارِ الْجُنُبِ وَالصَّاحِبِ بِالجَنبِ وَابْنِ السَّبِيلِ وَمَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ إِنَّ اللَّهَ لاَ يُحِبُّ মَن كَانَ مُخْتَالاً فَخُورًا} অর্থাৎ, তোমরা আল্লাহর উপাসনা কর ও কোন কিছুকে তাঁর অংশী করো না এবং পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন, পিতৃহীন, অভাবগ্রস্ত, আত্মীয় ও অনাত্মীয় প্রতিবেশী, সঙ্গী-সাথী, পথচারী এবং তোমাদের অধিকারভুক্ত দাস-দাসীদের প্রতি সদ্ব্যবহার কর। নিশ্চয় আল্লাহ আত্মম্ভরী দাম্ভিককে ভালবাসেন না। (নিসাঃ ৩৬)
মহানবী বলেছেন "আমি এবং নিজের অথবা অপরের অনাথ (এতীমের) তত্ত্বাবধায়ক জান্নাতে (পাশাপাশি) থাকব। আর বিধবা ও দুঃস্থ মানুষকে দেখাশুনাকারী ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় জিহাদকারীর সমতুল্য।” (ত্বাবারানীর আওসাত্ব, সহীহুল জামে' ১৪৭৬নং)
তিনি আরো বলেছেন, “আত্মীয়তার বন্ধন বজায় রাখা, সুন্দর চরিত্র অবলম্বন করা, এবং প্রতিবেশীর সাথে সদ্ব্যবহার রাখায় দেশ আবাদ থাকে এবং আয়ু বৃদ্ধি পায়।” (আহমাদ, সহীহুল জামে ৩৭৬৭নং)
তিনি আরো বলেছেন, (( وَاللَّهِ لَا يُؤْمِنُ ، وَاللَّهِ لَا يُؤْمِنُ ، وَاللَّهِ لا يُؤْمِنُ ! )) قِيلَ : মَنْ يَا رَسُولَ اللهِ ؟ قَالَ : ((الَّذِي لَا يَأْمَنُ جَارُهُ بَوَائِقَهُ !)). مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ "আল্লাহর কসম! সে ব্যক্তি মু'মিন নয়। আল্লাহর কসম! সে ব্যক্তি মু'মিন নয়। আল্লাহর কসম! সে ব্যক্তি মু'মিন নয়।” জিজ্ঞেস করা হল, 'কোন্ ব্যক্তি? হে আল্লাহর রসূল!' তিনি বললেন, “যে লোকের প্রতিবেশী তার অনিষ্ট থেকে নিরাপদে থাকে না।” (বুখারী ও মুসলিম)
৫। ইসলাম তার অনুসারীবর্গকে পূর্ণ একটি মাস উপবাস ও রোযা পালন করার নির্দেশ দেয়। যাতে তার মাধ্যমে শিখতে পারে আত্মসংযম, সহানুভূতি, সহমর্মিতা ও ধৈর্যশীলতা। অনুশীলন করতে পারে আল্লাহ-ভীতি ও সৎকর্মের। মহান আল্লাহ বলেছেন, {يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ মִ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ} (১৮৩) سورة البقرة অর্থাৎ, হে বিশ্বাসিগণ! তোমাদের জন্য সিয়ামের (রোযার) বিধান দেওয়া হল, যেমন বিধান তোমাদের পূর্ববর্তীগণকে দেওয়া হয়েছিল, যাতে তোমরা সংযমশীল হতে পার। (বাক্বারাহঃ ১৮৩)
৬। ইসলাম অনাথের তত্ত্বাবধান করতে উদ্বুদ্ধ করে। এতীমের প্রতি অনুগ্রহ করতে উৎসাহিত করে এবং তার অধিকার হরণ তথা সম্পদ ভক্ষণ করতে কঠোরভাবে নিষেধ করে। মহান আল্লাহ বলেছেন, وَآتُوا الْيَتَامَى أَمْوَالَهُمْ وَلَا تَتَبَدَّلُوا الْخَبِيثَ بِالطَّيِّبِ وَلَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَهُمْ إِلَى أَمْوَالِكُمْ إِنَّهُ كَانَ حُوبًا كَبِيرًا} (২) سورة النساء অর্থাৎ, পিতৃহীনদেরকে তাদের ধন-সম্পদ সমর্পণ কর এবং উৎকৃষ্টের সাথে নিকৃষ্ট বদল করো না এবং তোমাদের সম্পদের সাথে তাদের সম্পদকে মিশ্রিত ক'রে গ্রাস করো না; নিশ্চয় তা মহাপাপ। (নিসাঃ ২)
وَلَا تَقْرَبُواْ মَالَ الْيَتِيمِ إِلَّا بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ حَتَّى يَبْلُغَ أَشُدَّهُ وَأَوْفُوا بِالْعَهْدِ إِنَّ الْعَهْدَ كَانَ مَسْؤُولاً) (৩৪) سورة الإسراء অর্থাৎ, সাবালক না হওয়া পর্যন্ত সদুদ্দেশ্যে ছাড়া এতীমের সম্পত্তির নিকটবর্তী হয়ো না। আর প্রতিশ্রুতি পালন করো; নিশ্চয়ই প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে কৈফিয়ত তলব করা হবে। (৩৪)
{إِنَّ الَّذِينَ يَأْكُلُونَ أَمْوَالَ الْيَتَامَى ظُلْمًا إِنَّمَا يَأْكُلُونَ فِي بُطُونِهِمْ نَارًا وَسَيَصْلَوْنَ سَعِيرًا} (১০) سورة النساء অর্থাৎ, নিশ্চয় যারা পিতৃহীনদের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করে, তারা আসলে নিজেদের উদরে অগ্নি ভক্ষণ করে। আর অচিরেই তারা জ্বলন্ত আগুনে প্রবেশ করবে। (নিসাঃ ১০)
৭। ব্যবহারে ধনী-গরীব, আমীর-ফকীর, দেশী-বিদেশী বা কুলীন- অকুলীনের মাঝে কোন পার্থক্য করে না। ইসলামে সবাই সমান। মহান আল্লাহর দরবারে ও ইবাদতে সবাই বরাবর। {وَلَا تَطْرُدِ الَّذِينَ يَدْعُونَ رَبَّهُم بِالْغَدَاةِ وَالْعَشِيِّ يُرِيدُونَ وَجْهَهُ مَا عَلَيْكَ মִ حِسَابِهِم মِّ شَيْءٍ وَمَا মִ حِسَابِكَ عَلَيْهِم মِّ شَيْءٍ فَتَطْرُدَهُمْ فَتَكُونَ মִَ الظَّالِمِينَ} (৫২) সূরাহ্ আল-আনআম অর্থাৎ, যারা তাদের প্রতিপালককে প্রাতে ও সন্ধ্যায় তাঁর মুখমণ্ডল (দর্শন বা সন্তুষ্টি) লাভের জন্য ডাকে, তাদেরকে তুমি বিতাড়িত করো না। তাদের কর্মের জবাবদিহির দায়িত্ব তোমার নয় এবং তোমার কোন কর্মের জবাবদিহির দায়িত্ব তাদের নয় যে, তুমি তাদেরকে বিতাড়িত করবে, করলে তুমি অত্যাচারীদের অন্তর্ভুক্ত হবে। (আনআমঃ ৫২)
{وَاصْبِرْ نَفْسَكَ مَعَ الَّذِينَ يَدْعُونَ رَبَّهُم بِالْغَدَاةِ وَالْعَشِيِّ يُرِيدُونَ وَجْهَهُ وَلَا تَعْدُ عَيْنَاكَ عَنْهُمْ تُرِيدُ زِينَةَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَلَا تُطِعْ মَنْ أَغْفَلْنَا قَلْبَهُ عَنْ ذِكْرِنَا وَاتَّبَعَ هَوَاهُ وَكَانَ أَمْرُهُ فُرُطًا} (২৮) সূরাহ্ আল-কাহ্ফ অর্থাৎ, তুমি নিজেকে তাদেরই সংসর্গে রাখ, যারা সকাল ও সন্ধ্যায় তাদের প্রতিপালককে তাঁর মুখমণ্ডল (দর্শন বা সন্তুষ্টি) লাভের উদ্দেশ্যে আহবান করে এবং তুমি পার্থিব জীবনের শোভা কামনা করে, তাদের দিক হতে তোমার দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ো না। আর তুমি তার আনুগত্য করো না, যার হৃদয়কে আমি আমার স্মরণে অমনোযোগী ক'রে দিয়েছি, যে তার খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করে ও যার কার্যকলাপ সীমা অতিক্রম করে। (কাহফঃ ২৮)
{ عَبَسَ وَتَوَلَّى (1) أَنْ جَاءَهُ الأَعْمَى (২) وَمَا يُدْرِيكَ لَعَلَّهُ يَزَّكَّى (৩) أَوْ يَذَّكَّرُ فَتَنْفَعَهُ الذِّكْرَى (٤) أَمَّا মَنْ اسْتَغْنَى (৫) فَأَنْتَ لَهُ تَصَدَّى (৬) وَمَا عَلَيْكَ أَلا يَزَّكَّى (৭) وَأَمَّا মَنْ جَاءَكَ يَسْعَى (৮) وَهُوَ يَخْشَى (৯) فَأَنْتَ عَنْهُ تَلَقَّى (১০) كَلَّا إِنَّهَا تَذْكِرَةٌ (১১) فَمَنْ شَاءَ ذَكَرَهُ} (১২) অর্থাৎ, সে ভ্রূ কুঞ্চিত করল এবং মুখ ফিরিয়ে নিল। যেহেতু তার নিকট অন্ধ লোকটি আগমন করেছিল। তোমাকে কিসে জানাবে? হয়তো বা সে পরিশুদ্ধ হত। অথবা উপদেশ গ্রহণ করত, ফলে তা তার উপকারে আসত। পক্ষান্তরে যে লোক বেপরোয়া, তুমি তার প্রতি মনোযোগ দিলে। অথচ সে পরিশুদ্ধ না হলে তোমার কোন দোষ নেই। পক্ষান্তরে যে তোমার নিকট ছুটে এল, সভয় মনে, তুমি তার প্রতি বিমুখ হলে! কক্ষনো (এরূপ করবে) না। এটা তো উপদেশবাণী; যে ইচ্ছা করবে সে তা স্মরণ রাখবে (ও উপদেশ গ্রহণ করবে)। (আবাসাঃ ১-১২)
ইসলামে অস্পৃশ্যতা নেই, নেই জাতপাতের কোন প্রকার দুর্গন্ধ। যোগ্যতা অর্জন করলে ইমামতি করার অধিকার আছে সকলের। আল্লাহর দরবারে পরস্পরের পায়ে পা লাগিয়ে দাঁড়াবার অধিকার আছে সকলের। উর্দু কবি বলেছেন, 'এক হী সফ্ মে খড়ে হো গয়ে মাহমুদ ও ইয়ায, না কোয়ী বান্দা রহা, না কোয়ী বান্দা-নেওয়ায।'
ইসলামে জাতপাত নেই। ভেদাভেদের কোন প্রাচীর নেই। আপোসের সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের কোন অন্তরাল নেই। কবি বলেছেন, 'সৈয়দ, পাঠান, কাজী, মোল্লা, চৌধুরী বা খন্দকার, কুলি, চাষী, জোলা, নাপিত, কর্মকার বা কুন্তুকার। যে যাহাই হও, মুসলিম কিনা জানিতে আমি চাই, মুসলিম যদি এসো মোর বুকে তুমি যে আমার ভাই।'