📘 দুরুদ কি ও কেন দুরুদ পাঠের হাদীস ভিত্তিক পদ্ধতি > 📄 সতের. নবীগণ ব্যতীত অপরের প্রতি দুরূদ পাঠ করা যায় কিনা

📄 সতের. নবীগণ ব্যতীত অপরের প্রতি দুরূদ পাঠ করা যায় কিনা


একথা অনস্বীকার্য যে, নবী রাসূলগণের উপর দুরূদ ও সালাম (الصَّلَاةُ وَالسّلام) পেশ করতে হবে। নূহ (আঃ) সম্পর্কে আল্লাহ্ বলেছেন- وَتَرَكْنَا عَلَيْهِ فِي الْآخِرِينَ - سَلَامٌ عَلَى نُوحٍ فِي الْعَالَمِينَ
إِنَّا كَذَلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِينَ * (সাফফাত: ৭৮-৮০)
ইব্রাহীম (আঃ) সম্পর্কিত বাণী হলো- وَتَرَكْنَا عَلَيْهِ فِي الْآخِرِينَ - سَلَامُ عَلَى إِبْرَاهِيمَ * (ঐঃ ১০৮-১০৯)
মূসা (আঃ) ও হারুন (আঃ) সম্পর্কে আল্লাহ্ বলেছেন- وَتَرَكْنَا عَلَيْهِمَا فِي الْآخِرِينَ - سَلَامٌ عَلَى مُوسَى وَهَارُونَ *
(ঐঃ ১১৯-১২০) ইলয়াস (আঃ) সম্পর্কে তিনি বলেছেন- سَلَامٌ عَلَى إِلْ يَاسِينَ * (ঐঃ ১৩০)
উপরোক্ত আয়াতগুলোতে নবীগণের নাম উল্লেখ করতঃ তাঁদের উপর 'সালাম বা শান্তি বর্ষিত হওয়ার কথা উল্লেখ হয়েছে। অধিকন্তু বলা হয়েছে فِي الْآخِرِينَ অর্থাৎ পরবর্তীতে যারা আসবেন তাদের মধ্যেও সালাম বা শান্তি বর্ষিত হওয়ার ধারা বজায় থাকবে। অর্থাৎ মহান আল্লাহ তায়ালা স্বয়ং সালাম বর্ষণ করার পর পরবর্তীতে তাদের উপর শান্তি. দয়া, রহমত কামনা করার ধারা অব্যাহত রাখার প্রকৃতি অবশিষ্ট রাখেন। ফলে নূহ, ইব্রাহীম, মুসা, হারুন, ইলইয়াস আলাইহিমুস সালামের পরও দুনিয়াবাসী নবীগণের উপর সালাম পেশ করবেন, তাঁদের স্তুতি গাইবেন। এ ধারা অব্যাহত থাকবে দুনিয়ার লয় প্রাপ্তির পূর্বক্ষণ পর্যন্ত।
সকল নবীগণের উপর 'সালাত' বা দুরূদ পাঠের ব্যাপারে কিছুটা মতানৈক্য রয়েছে। শেখ মহীউদ্দীন নববী (রঃ)-সহ প্রায় সকলেই একমত যে, নবীগণের উপর সালাত পাঠ করা ঠিক এবং পড়া দরকার। ইমাম মালিক (রঃ) বলেছেন- আমাদের নবী মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছাড়া আর কারো উপর সালাত বা দুরূদ পাঠ না করাই ভালো। তবে তাঁর সাথী শাগরীদগণ কথাটির ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে, আমরা সালাতের মাধ্যমে আমাদের নবী ব্যতীত অপর কোনো নবীর আনুগত্য এমনভাবে করবো না যেমনি আমরা আমাদের নবীর উপর সালাত বা দুরূদের মাধ্যমে আল্লাহর ইবাদত করে থাকি।
"আলিন নবী” বা নবী আলাইহিস্ সালামের পরিবার-পরিজনদের উপর দুরূদ পাঠ করা সকলের মতেই বৈধ।
একটি জিজ্ঞাসা :
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পৃথক করে শুধুমাত্র নবী পরিবারের উপর দুরূদ পাঠ করা যায় কিনা? গবেষকগণ এ জিজ্ঞাসার জবাব দুভাবে দিয়েছেন-
একটি হলো- যদি বলা হয়- اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى أَلِ مُحَمَّd আল্লা ছল্লিআলা আলি মোহাম্মাদ” তাহলে এরূপ বলা জায়েয। এরূপ দুরূদ পাঠ করায় রাসূলের উপরও দুরূদ পাঠ করা বুঝায়। কেননা এ বাক্যে শব্দগতভাবে নবী আলাইহিস সালামের পৃথক হওয়া দৃশ্যতঃ পরিদৃষ্ট হলেও অর্থগত দিক থেকে পৃথক বা স্বতন্ত্র নয়।
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নাম উল্লেখ না করে পৃথকভাবে তাঁর পরিজনদের উপর 'সালাম' পাঠ করার ব্যাপারে বিশেষজ্ঞগণ অনৈক্যমত পোষণ করেছেন। যেমন কেউ বললেন-
অথবা اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى عَلِيٌّ *
কিংবা اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى حُسَيْنٍ *
اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى فَاطِمَةَ *
এরূপ সালাত পাঠে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নাম উল্লেখ না থাকায় এভাবে 'সালাত' পেশ করাকে ইমাম মালেক (রঃ) মকরূহ বলেছেন। কেননা অতীতে এরূপ পৃথক 'সালাত' পাঠের কোনো নজির নেই। ইমাম আবু হানীফা (রঃ), সুফিয়ানে সাওরী এবং সুফিয়ান ইবনে ওয়াইনাহ প্রমুখও এমত পোষণ করেছেন।
ইসমাঈল ইবনে ইসহাক বলেছেন- ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে-
لَا تَصْلُحُ الصَّلَاةُ عَلَى أَحَدٍ إِلَّا عَلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَلَكِنْ يَرْضَى لِلْمُسْلِمِينَ وَالْمُسْلِمَاتِ بِالْاِسْتِغْفَارِ * অর্থাৎ নবী আলাইহিস সালাম ব্যতীত অপর কারো জন্যে 'সালাত' পাঠ করা সঠিক নয়। তবে মুসলমান নর-নারীদের জন্যে মাগফিরাত কামনা করা উচিত। এ মতের সাথে ঐক্যমত পোষণ করেছেন ওমর বিন আবদুল আযীয (রাঃ)।
এ পর্যায়ে জাফর বিন ফোরকানের কথা প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছেন- ওমর বিন আবদুল আযীয গভর্নরদের কাছে একটি চিঠিতে লিখেন-
امَّا بَعْدُ : فَإِنَّ نَاسَامِنَ النَّاسِ الْتَمَسُوا الدُّنْيَا بِعَمَلِ الْآخِرَةِ - وَإِنَّ الْقَصَاصَ قَدْ أَحْدَثُوا فِي الصَّلَاةِ عَلَى خُلَفَائِهِم وَأَمَرَائِهِمْ عَدُلَ صَلَاتِهِمْ عَلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَإِذَا جَاءَكَ كِتَابِي، فَمُرْهُمْ أَنْ تَكُونَ صَلَاتُهُمْ عَلَى النَّبِيِّينَ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِمْ وَسَلَّمَ وَدُعَانُهُمْ لِلْمُسْلِمِينَ عَامَّةً *
(শুনা যাচ্ছে) কিছু সংখ্যক লোক আখেরাতের করণীয় কার্যক্রমের বিনিময়ে পার্থিব স্বার্থ চরিতার্থ করার প্রয়াস চালাচ্ছে। আবার কতিপয় কাহিনীকার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরিবর্তে আমীর অমাত্য এবং খলিফাদের উপর দুরূদ পাঠ করার রেওয়ায চালু করছে। আমার এ লেখা তোমার কাছে পৌছা মাত্র ঐসব কাহিনীকারদেরকে নির্দেশ দিবে তারা যেনো নবীগণের উপর 'সালাত' পাঠ করেন এবং সর্বসাধারণ মুসলমানগণের জন্যে মাগফিরাত কামনা করেন। (সালাত মর্যাদা: ৬৯)
এ বিষয়ে ইমাম শাফেয়ী মতাবলম্বীদের ৩টি রায় দেখা যায়- (ক) স্বতন্ত্রভাবে 'সালাত' পড়া হারাম।
(খ) এরূপ 'সালাত' পাঠ করা মকরূহে তানযিহী। অনেকেই এমত প্রকাশ করেছেন।
(গ) এরূপ না করা উত্তম। তবে এরূপ করা মকরূহ নয়। এ মত ইমাম নববীর (রঃ)। তবে মকরূহে তানযিহী হওয়াই যুক্তিযুক্ত বলে অনেকে মনে করেন।
'সালাম' পেশ করার ব্যাপারেও গবেষক আলেমগণ বিভিন্ন মত পোষণ করেছেন। 'সালাম' শব্দের অর্থ যদি 'সালাত' ধরে নেয়া হয় তাহলে এরূপ 'সালাম' শর্তহীনভাবে সকলের জন্যে ব্যবহার করা মাকরূহ। যেমন বলা হলো- السَّلَامُ عَلَى فُلَانٍ অথবা বলা হলো- فُلَانٌ عَلَيْهِ السَّلَامُ মোহাম্মদ আল জুবাইনীসহ অনেকেই এরূপ বলাকে মাকরূহ বলেছেন। এবং তিনি عَلَى عَلَيْهِ السَّلَامُ আলা আলাইহিস্ সালাম বলা নিষিদ্ধ বলেছেন।
'সালাম' শান্তি অর্থে প্রতিটি মুসলমান নর-নারী উপস্থিত-অনুপস্থিত এমনকি মৃত ব্যক্তিকেও পেশ করা কিংবা পৌছানো জায়েয। যেমন বলা হল بَلِّغْ فُلَانًا مِنِّي السَّلَامَ "অমুককে আমার সালাম পৌছে দিও।” এক্ষেত্রে 'সালাম' পৌছানোর মাধ্যমে একজন মুসলমানকে সম্মান প্রদর্শন করা বুঝায়। পক্ষান্তরে 'সালাত' বা 'দুরূদ' হচ্ছে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রাপ্য। যেমন আমরা তাশাহুদে বলে থাকি- السَّلَامُ عَلَيْنَا وَعَلَى عِبَادِ اللَّهِ الصَّالِحِينَ *
আমাদের একথা শিখানো হয়নি এবং আমরা বলি- الصَّلَاةُ عَلَيْنَا وَعَلَى عِبَادِ اللَّهِ الصَّالِحِينَ *
একথা আগেই বলা হয়েছে যে, রাসূলের নাম উল্লেখ করতঃ তাঁর পরিবার-পরিজন এবং সাহাবীগণের উপর 'সালাত' পড়া বিধি সম্মত। যেমন বলা হয়ে থাকে- اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّd وَعَلَى آلِهِ وَأَصْحَابِهِ وَمَلَائِكَتِكَ الْمُقَرَّبِينَ وَأَهْلِ طَاعَتِكَ أَجْمَعِينَ *
এরূপ 'সালাত' পড়া বৈধ। এরূপ সালাতে রাসূলের সাথে যুক্ত হয়েছে তাঁর আহল, সাহাবী, ফেরেশতা এবং বুযর্গ ও আল্লাহ্ ওয়ালা ব্যক্তিত্ব।
আহলে তাআত )أَهْلِ طَاعَةُ( হলো সার্বিকভাবে আল্লাহর অনুগত ব্যক্তিত্ব। এক্ষেত্রে যদি কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করতঃ একটি রূসম বা প্রথা প্রচলন করা উদ্দেশ্য হয় তাহলে এরূপ বলা মাকরূহ হবে। এমনকি এরূপ 'সালাত' পাঠ হারামও হতে পারে। কেননা, কোনো নির্দিষ্ট বুযর্গ ব্যক্তিত্বের ক্ষেত্রে এরূপ 'সালাত' পাঠ কখনো একটি রূসম প্রচলন করার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। এরূপ রূসম ও রেওয়াজ প্রচলন করা ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে গর্হিত। অধিকন্তু যে ব্যক্তির কাছে যে ব্যক্তি বা গোষ্ঠী অধিকতর বুযর্গ, সম্মানিত, বরণীয়, পূজনীয় তাঁর নাম কিংবা গোষ্ঠীর নাম সালাতে সংযোজিত হবে। ফলে স্ব স্ব মনোনীত ও পূজনীয় ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে সালাতের অন্তর্গত করার একটি ঘৃণিত ও অবজ্ঞেয় প্রতিযোগিতা দেখা দিতে পারে। তখন 'সালাত' এর অবস্থান হবে হীনমন্যতা ও স্বার্থসিদ্ধির ঘৃণ্য প্রয়াস মাত্র। এমতাবস্থায় এরূপ কর্মতৎপরতাকে হারাম বলা ছাড়া আর কোনো গত্যন্তর থাকে না। আগের যুগের রাফেজী খারেজী সম্প্রদায় নিজ নিজ নেতাদেরকে নিয়ে এরূপ টানা হেচড়া করেছে। সমকালীন সময়ের সর্বজন নন্দিত ব্যক্তিকে বাদ দিয়ে স্ব স্ব মনোনীত ও পূজনীয় ব্যক্তিকে সে সময়ের কিছুলোক ও গোষ্ঠী এরূপ বিষয়ে তুলকালাম কাণ্ড ঘটিয়েছে।
আজকের এ যুগেও কতিপয় লোক ও গোষ্ঠী তরীকত বা ইলমে মারিফাতের ছত্রছায়ায় স্ব স্ব বরণীয় ও মনোনীত ব্যক্তিত্বকে কেন্দ্র করে এরূপ হীনমন্য ও ঘৃণ্য কাজে তৎপর বলে পরিলক্ষিত হয়। মনোনীত ব্যক্তির নামে দুরূদ বা ওযীফা তৈরি করতঃ বানানো ওযীফার অনুশীলন করে পরম তৃপ্তি সহকারে।
একজন বুযর্গ বা আল্লাহর ওলীরূপে খ্যাত ও স্বীকৃত ব্যক্তির জন্যে সালাতের মাধ্যমে দোয়া করা বিধিসম্মত। এমনকি মৃত ব্যক্তির জন্য ইবনে ওমর (রাঃ) দোয়া করতেন এভাবে صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ )আল্লাহ্ তাঁর উপর রহমত করুক) এমনিভাবে আল্লাহর রাসূলের সালাত পেশ করার কথাও হাদীসে উল্লেখ আছে।
মোটকথা, কোনো আহলে তাআতের জন্যে 'সালাত' পেশ করার উদ্দেশ্যে যদি কোনো ধরনের রেওয়ায বা হীনস্বার্থ চিরতার্থ করা উদ্দেশ্য না হয় তাহলে এরূপ 'সালাত' পাঠ জায়েয। অন্যথায় না জায়েয, এমনকি হারাম।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00