📄 পনের. “আল্লাহুম্মা বারিক আলা মোহাম্মাদ ওয়া আলা আলি মোহাম্মদ” -এর অর্থ ও তাৎপর্য
البركة শব্দের মূল অর্থ দৃঢ়, প্রতিষ্ঠিত, স্থির থাকা। কোনো বস্তু দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করলে বলা হয় فَقَدْ بَرَكَ উটের সংখ্যা বেশি হওয়াকে البرك বলা হয়। আবার البرك শব্দের অর্থ- জলাশয়।
অপরদিকে البركة শব্দের অর্থ হলো কল্যাণ, মংগল, প্রাচুর্য, বাড়ন্ত। التبْرِيكُ শব্দের অর্থ বরকত বা কল্যাণ প্রাচুর্যের জন্যে দোয়া করা। যেমন- وَبَارَكَ لَهُ - وَبَارَكَ عَلَيْهِ - وَبَارَكَ فِيهِ - بَارَكَهُ الله কুরআনেও শব্দটির ব্যবহার আছে-
١. أَنْ بُورِكَ مَنْ فِي النَّارِ وَمَنْ حَوْلَهَا *
٢. بَارَكْنَا عَلَيْهِ وَعَلَى إِسْحَاقَ *
٣. بَارَكْنَا فِيهَا *
উপরোক্ত আয়াতগুলোতে بَارَكَ দ্বারা বরকত কল্যাণ ও মঙ্গলের প্রাচুর্যতা বুঝানো হয়েছে।
হাদীসেও শব্দটির ব্যবহার দেখা যায়। যেমন একটি দোয়ায় লেখা আছে, وَبَارِكْ لِي فِيمَا أَعْطَيْتَ এবং সায়াদ (রাঃ) এর বর্ণিত হাদীসে আছে- بَارَكَ اللهُ لَكَ فِي أَهْلِكَ وَمَالِكَ কল্যাণ-বরকতের প্রাচুর্যতার জন্য কামনা করা বুঝানো হয়েছে। (আহমদ, আবু দাউদ, তিরমিযি, ফাতহুল বারী)
আল্লাহ তায়ালার অপার বরকত ও কল্যাণে যাকে আপ্লুত করা হয়েছে তিনিই হলেন- الْمُبَارَكَ যেমন ঈসা (আঃ) বলেছেন- وَجَعَلَنِي مُبَارَكًا أَيْنَمَا كُنْتُ *
"আমি যেখানেই থাকি তিনি আমাকে বরকতময় করেছেন।” (মারয়াম: ৩১)
আল্লাহ্ তায়ালা তাঁর কিতাব আর কোরআন সম্পর্কে বলেছেন- هَذَا ذِكْرٌ مُّبَارَكَ أَنْزَلْنَاهُ *
"এটি একটি বরকতময় উপদেশ যা আমি নাযিল করেছি।" (আম্বিয়া: ৫০)
আল-কোরআন সম্পর্কে আরো একটি আয়াত হলো- كِتَابُ أَنْزَلْنَاهُ إِلَيْكَ مُبَارَكٌ *
“এটি একটি বরকতময় কিতাব, যা আপনার উপর বরকত হিসেবে অবতীর্ণ করেছি।" (সোয়াদ: ২৯)
আল-কুরআনকে মুবারক বলা সবদিক থেকে যথার্থ হয়েছে। কেননা এ আল্লাহ্র কিতাব মানব-দানব পশু-পাখি, গাছ-তরুলতা-পাতা তথা সমগ্র সৃষ্ট জীবের জন্যে বরকত ও কল্যাণময়।
লক্ষণীয় যে, মহান আল্লাহ নিজের পরিচয়ে مُبَارَكٌ শব্দ ব্যবহার করেননি। বরঞ্চ তাঁর শানে ব্যবহৃত হয়েছে تَبَارَكَ যেমন বলা হয়েছে- إِنَّ رَبَّكُمُ اللَّهُ الَّذِي خَلَقَ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوى عَلَى الْعَرْشِ يُغْشِي اللَّيْلَ النَّهَارَ يَطْلُبُهُ حَثِيثًا والشَّمْسَ وَالْقَمَرَ وَالنُّجُومَ مُسَخَّرَاتٌ بِأَمْرِهِ أَلَا لَهُ الْخَلْقُ والأمرُ - تَبَارَكَ اللَّهُ رَبُّ الْعَالَمِينَ *
"বস্তুতঃ তোমাদের রব সে আল্লাহ্ যিনি আসমান যমিন ৬ দিনে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর স্বীয় সিংহাসনে আরোহণ করেন। যিনি রাতকে দিনের উপর বিস্তার করে দেন। তারপর দিন রাতের পিছনে দৌড়াতে থাকে। যিনি চন্দ্র-সূর্য, তারকাসমূহ সৃষ্টি করেছেন। সবই তাঁর আইন বিধানে বন্দী। সাবধান, সৃষ্টি তাঁরই এবং সার্বভৌমত্বও তাঁর। অপরিসীম বরকতশালী আল্লাহ্ সমগ্র জাহানের মালিক ও লালন-পালনকারী।" (আরাফ: ৫৪)
সূরায়ে ফুরকানের ১ম আয়াতে আছে- تَبَارَكَ الَّذِي نَزَّلَ الْفُرْقَانَ عَلَى عَبْدِهِ لِيَكُونَ لِلْعَالَمِينَ نَذِيرًا *
"বরকতময় তিনি যিনি কুরআন তার বান্দার উপর নাযিল করেছেন যাতে করে দুনিয়াবাসীকে ভয় প্রদর্শন করতে পারে।” (ফুরকান : ১)
সূরায়ে মুল্কে আছে- تَبَارَكَ الَّذِي بِيَدِهِ الْمُلْكُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ *
“তিনি বরকতময় সে সত্ত্বা যার মুঠে সার্বভৌমত্ব। তিনি সবকিছু করতে সক্ষম।" (মুল্ক: ২)
উপরোক্ত আয়াতসমূহে আল্লাহ্ তায়ালা স্বীয় সত্ত্বার শ্রেষ্ঠত্ব বুঝাতে تَبَارَكَ শব্দ ব্যবহার করেছেন। ফোরকানের নাযিল হওয়া, দুনিয়া সৃষ্টি করা, সার্বভৌম ক্ষমতার একচ্ছত্র অধিকারী হওয়া ইত্যাকার বৈশিষ্ট্যগুলো প্রকাশ করতে তিনি تَبَارَكَ শব্দ ব্যবহার করেছেন। সুতরাং বুঝা গেল যে, تَبَارَكَ এবং مُبَارَكَ শব্দদ্বয়ের মধ্যে একটা ফারাক রয়েছে। مُبَارَكَ হচ্ছে যাকে বরকতময় করা হয়েছে। আর تَبَارَكَ হচ্ছে যিনি বরকতময় করার উৎস ও আঁধার। প্রতিটি কল্যাণ, বরকত, প্রাচুর্যতা আল্লাহ্র অধীনে। তিনি যাকে ইচ্ছা করেন কিংবা যার আমল আখলাক, কর্ম তৎপরতা আল্লাহর করুণা, দয়া, রহমত, কল্যাণ পাওয়ার অধিকারী তাকেই মহান আল্লাহ কল্যাণের প্রাচুর্যতায় আপ্লুত করে 'মোবারক' করে তোলেন।
হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণনা করে আবু সালেহ বলেছেনঃ تَبَارَكَ শব্দের অর্থ হচ্ছে تَعَالٰى অর্থাৎ সর্বোচ্চ, মহান, আবু আব্বাস বলেছেন- تَبَارَكَ শব্দের সমার্থক হচ্ছে إرتفع। যার অর্থ উপরে উত্থিত, উন্নত, সমুচ্চ, উত্থাপিত। ইবনুল আনবারী বলেছেন- تَبَارَكَ শব্দের অর্থ হলো تَقَدَّسَ শব্দটির বাংলা তরজমা হলো পবিত্র হওয়া, উৎসর্গীকৃত হওয়া।
হাসান বলেছেন- تَبْجِيُ الْبَرَكَةُ مِنْ قَبْلِهِ- শব্দের অর্থ হলো অর্থাৎ সামনের দিক থেকে বরকত আসা। দাহাক বলেছেন- تَبَارَكَ শব্দের অর্থ عَظَمَ সম্মানিত, মহিমান্বিত। খলিল বিন আহমদ বলেছেন- تَبَارَكَ শব্দের অর্থ مَجْدٌ অর্থাৎ গৌরবান্বিত, উচ্চ প্রশংসিত। হোসাইন বিন ফজল بَارَكَ فِي ذَاتِهِ অর্থাৎ তিনি আপন সত্তায় বরকতময়, وَبَارَكَ مِنْ شَاءَ مِنْ خَلْقِهِ এবং তাঁর সৃষ্ট জীবের মধ্যে যাকে ইচ্ছা বরকত দান করেন। বস্তুতঃ تَبَارَكَ শব্দের এ ব্যাখ্যাটি সবচে সুন্দর। ইবনে আতীয়াহ বলেছেন- تَبَارَكَ শব্দের অর্থ হলো عَظَمَ অর্থাৎ বরকত ও মংগল অধিক পরিমাণে হওয়া। আল্লাহ্ ছাড়া আর কারো জন্যে تَبَارَكَ শব্দের ব্যবহার জায়েয নেই।
রাসূলুল্লাহু সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মতে মোহাম্মদীকে যে দুরূদ বা সালাত পাঠের কথা বলেছেন সে দুরূদের শেষাংশে রয়েছে- وَبَارِكْ عَلَى مُحَمَّd، وَعَلَى آلِ مُحَمَّd كَمَا بَارَكْتَ عَلَى آلِ A إبراهيم * অর্থাৎ, “বরকত ও মংগল নাযিল কর মোহাম্মদ ও তাঁর বংশধরদের উপর যেমন তুমি বরকত ও মংগলে আপ্লুত করেছিলে ইব্রাহীমের বংশধরদেরকে।”
কথাগুলো আমাদের নবী এবং তাঁর বংশধরদের মংগল ও বরকতের জন্য বিশেষ দোয়া। ইব্রাহীম (আঃ) ও তাঁর বংশধরদের জন্যে আল্লাহ্ তায়ালা যে ধরনের মংগল, কল্যাণ, দয়া ও রহমত নাযিল করেছিলেন সে ধরনের বরকত যেন অধিক পরিমাণে সব সময়ের জন্যে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর বংশধরদের জন্যে নাযিল করেন।
ইব্রাহীম আলাইহিস্ সালাম ও তাঁর বংশধরদের জন্যে আল্লাহ্ তায়ালা কি ধরনের বরকত ও মংগল করেছেন তা ইতিপূর্বে কুরআনের উদ্ধৃতিসহ আলোচনা করা হয়েছে। বরকত নাযিল হওয়ার আরো আয়াত হলো-
وَبَشَّرْنَاهُ بِإِسْحَاقَ نَبِيًّا مِنَ الصَّالِحِينَ وَبَارَكْنَا عَلَيْهِ وَعَلَى إِسْحَاقَ *
আমি তাঁকে সুসংবাদ দিয়েছি ইসহাকের, তিনি সৎকর্মীদের মধ্য থেকে একজন নবী। তাঁকে এবং ইসহাককে আমি বরকত দান করেছি। (সাফফাত: ১১২, ১১৩)
আল্লাহ্ ইব্রাহীম (আঃ) ও তাঁর আহল সম্পর্কে আরো বলেছেন- رَحْمَةُ اللهِ وَبَرَكَاتُهُ عَلَيْكُمْ أَهْلَ الْبَيْتِ إِنَّهُ حَمِيدٌ مَجِيدٌ *
আল্লাহর রহমত ও বরকত যা তোমাদের উপর হে গৃহবাসী! নিশ্চয়ই তিনি প্রশংসিত ও মহিমাময়। (হুদ: ৭৩)
সূরায়ে বাকারার ১২৩ আয়াতে ইব্রাহীম (আঃ) নবী প্রেরণের وَابْعَثْ )فِيهِمْ رَسُولًا) যে দোয়া করেছিলেন তারই সর্বশেষ বাস্তবায়ন ছিল নবী আলাইহিস্ সালামের আগমন। ইতিমধ্যে ইব্রাহীম আলাইহিস্ সালামের বংশধরদের মধ্য থেকে কয়েকজন নবীরূপে আগমন করেছেন। আমরা উম্মতে মোহাম্মদীর জন্য সকল প্রেরিত নবী-রাসূলগণের উপর ঈমান রাখা, তাঁদের কার্যাবলী ও হুকুম আহকামের স্বীকৃতি দেয়া ঈমানী দায়িত্ব কর্তব্য।
কুরআনের অমোঘ বাণী এবং রাসূলের কথা- হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হলো যে, ইব্রাহীম আলাইহিস্ সালাম ও তাঁর বংশধরগণ পবিত্র, বরকতময় ও কল্যাণকর। বিশ্ব জুড়ে তাদের রয়েছে খ্যাতি, অবদান। যেসব আল্লাহ্ প্রদত্ত বৈশিষ্ট্যের দরুণ তাঁরা খ্যাত সেগুলোর পরিসংখ্যান এরূপ-
(১) মহান আল্লাহ এ ঘর থেকেই নবী মনোনীত করেছেন এবং তাদেরকে কিতাব দিয়েছেন। ইব্রাহীম আলাইহিস্ সালামের আগমনের পর তাঁর বংশ ছাড়া অন্য কোনো বংশ থেকে নবী প্রেরিত হয়নি।
(২) এ ঘর থেকেই আল্লাহ্ তায়ালা হিদায়াতের ইমামগণকে নির্ধারণ করেছেন। পরবর্তী পর্যায়ের সৎলোকগণ তাঁদের কাছে ঋণী এ কারণে যে, তাঁরা তাদেরই তরীকা অনুযায়ী চলার কারণে সৎলোক তথা জান্নাতবাসী হওয়ার সুযোগ পেয়েছে।
(৩) আল্লাহ্ তায়ালা এ ঘর থেকে দু'জন খলিল (অন্তরঙ্গ বন্ধু) গ্রহণ করেছেন, একজন ইব্রাহীম খলীলুল্লাহ অপরজন মোহাম্মদ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। এ পর্যায়ে আল্লাহ্ বলেছেন-
وَاتَّخَذَ اللَّهُ إِبْرَاهِيمَ خَلِيلًا * “এবং আল্লাহ্ তায়ালা ইব্রাহীমকে খলিল রূপে গ্রহণ করেছেন"। (নিসা: ১২৫)
অপরদিকে রাসূল (সঃ) বলেছেন-
إِنَّ اللَّهَ اتَّخَذَنِي خَلِيلًا كَمَا اتَّخَذَ إِبْرَاهِيمَ خَلِيلًا * আল্লাহ্ আমাকে খলিলরূপে গ্রহণ করেছেন যেমনি ইব্রাহীমকে খলিলরূপে গ্রহণ করেছিলেন।” (মুসলিম: ৫৩২)
(৪) আল্লাহ্ তায়ালা এ ঘরের মালিককে সারাবিশ্বের ইমামরূপে মনোনীত করেছেন। আল্লাহ্ বলেছেন-
وَإِذِ ابْتَلَى إِبْرَاهِيمَ رَبُّهُ بِكَلِمَاتٍ فَأَتَمَّهُنَّ - قَالَ إِنِّي جَاعِلُكَ لِلنَّاسِ إِمَامًا * “এবং যখন ইব্রাহীমকে কতিপয় ঘটনা দিয়ে তাঁর প্রভু তাকে পরীক্ষা করলেন, তখন তিনি সে পরীক্ষায় সফলতার সাথে উত্তীর্ণ হলেন। পরন্তু আল্লাহ বললেন- আমি তোমাকে মানবমণ্ডলীর জন্যে ইমাম নিযুক্ত করলাম।" (আহমদ, তিরমিযি)
(৫) হযরত ইব্রাহীমের (আঃ) হাতেই কাবা ঘরের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপিত হয়। পরবর্তীতে এই কাবা ঘর সারাবিশ্বের মুসলমানের জন্যে কিবলা রূপে পরিগণিত হয় এবং ইসলামের অন্যতম স্তম্ভ হজ্জ পালনের জন্যে এখানেই আসতে হয়।
(৬) আল্লাহ্ তায়ালা আহলে বাইতের উপর দুরূদ পড়ার যে আদেশ বান্দাদেরকে দিয়েছেন, সেরূপ আদেশ ইব্রাহীম আলাইহিস সালামের আহল এবং পরবর্তী বংশধরদের জন্যে দিয়েছেন। বস্তুতঃ এরূপ নির্দেশ অন্য কোনো নবীর বেলায় দেয়া হয়নি।
(৭) ইব্রাহীম আলাইহিস্ সালামের বংশধরদের থেকে দুটি নন্দিত উম্মত বিশ্বখ্যাত ও স্বীকৃত হয়। উম্মতে মুসা এবং উম্মতে মোহাম্মদী। আর উম্মতে মোহাম্মদীকে আল্লাহ্ তায়ালা ৭০ ধরনের উম্মতের চেয়েও বেশি মর্যাদা দিয়েছেন। (আহমদ, তিরমিযি)
উম্মতে মোহাম্মদী সম্পর্কে আল্লাহ্ বলেছেন-
كُنتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ *
“তোমরা সর্বোত্তম উম্মত; মানুষের মংগলের জন্যে তোমাদের আবির্ভাব।"
(৮) আল্লাহ্ তায়ালা ইব্রাহীম আলাইহিস্ সালাম ও তাঁর বংশধরদেরকে পৃথিবীতে সততা, পরোপকারী ও বদান্যরূপে স্মরণীয় করে রাখার ব্যবস্থা করেছেন। আজকের বিশ্বে তাঁর উপর সালাম ও সালাত ও প্রশংসা প্রদর্শন করে তাঁর কথা স্মরণ করা হয়।
এ সম্পর্কে আল্লাহ্ বলেছেন-
وَتَرَكْنَا عَلَيْهِ فِي الَّا خِرِينَ - سَلَامٌ عَلَى إِبْرَاهِيمَ - كَذَلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِينَ *
"আমি তাদের জন্যে এ বিষয়টি পরবর্তীদের মধ্য থেকে দিয়েছি যে, ইব্রাহীমের প্রতি সালাম বর্ষিত হোক। এমনিভাবে আমি সৎকর্মীদেরকে প্রতিদান দিয়ে থাকি।" (সাফফাত: ১০৮-১১০)
(৯) আল্লাহ তায়ালা এ ঘরকে লোকদের মধ্যে 'ফুরকান' বা পার্থক্যকারী রূপে নির্ণয় করেছেন। যারা এ ঘর তথা তাঁর অনুসৃত আদর্শ ও নীতিসমূহ অনুসরণ করেছে তাঁরা 'সায়ীদ' বা সত্যানুসারী রূপে পরিগণিত হয়ে জান্নাত লাভে ধন্য হবে। আর বিরুদ্ধাচারীগণ 'শাকী' বা হতভাগা রূপে চিহ্নিত হয়ে জাহান্নামের অনলে দগ্ধ হতে থাকবে।
(১০) আল্লাহ্ তায়ালা তাঁর নামের সাথে ইব্রাহীম আলাইহিস সালামের নামও সম্পৃক্ত করেছেন। সুতরাং বলা হয়, ইব্রাহীমু খলিলুল্লাহ্।
(১১) সারা বিশ্বের এটি একটি অনন্য পরিবার। আল্লাহকে চিনা জানা, মান্য করা এবং তাঁর ভয়ে সদা শংকিত থাকা, তাঁর নিয়ামতের আশায় বিনয়ী ও অনুগত হওয়ার ব্যাপারে বিশ্বজুড়ে আর কোনো ঘর পাওয়া যাবে না। সর্ববিদ জ্ঞান ও গুণের এটি একটি খনি।
(১২) আল্লাহ্ পাক এ পরিবারের লোকদের হাতেই খিলাফতের দায়িত্ব অর্পণ করেন। দুনিয়াবাসীর অধিকাংশ লোক তাদেরকে মান্য করে।
(১৩) শত্রুর উপর তারা এমন বিজয় লাভ করেন যা ইতিপূর্বে কারো ভাগ্যে ঘটেনি।
(১৪) মহান আল্লাহ্ তাঁদের গড়া কীর্তিসমূহ এমনভাবে মর্যাদাবান করেন যে, সেসব কীর্তি অবশিষ্ট থাকার উপর দুনিয়া টিকে থাকা নির্ভর করে। এ পর্যায়ে বলা যায় কাবা, কুরবানী, মিনা তথা হজ্জের কথা। এ সম্পর্কে হযরত ইবনে ............... (রাঃ) বলেছেন-
لَوْ تَرَكَ النَّاسُ كُلُّهُمُ الْحَجَّ لَوَقَعَتِ السَّمَاءُ عَلَى الْأَرْضِ * "অর্থাৎ যদি সমগ্র লোক হজ্জ পরিত্যাগ করে তাহলে আকাশ যমীনের উপর ভেংগে পড়বে।”
এ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
إِنَّ فِي آخِرِ الزَّمَانِ يَرْفَعُ اللَّهُ بَيْتَهُ مِنَ الْأَرْضِ وَكَلَامَهُ مِنَ الْمُصْحَفِ وَصُدُورِ الرِّجَالِ - فَلَا يَبْقَى لَهُ فِي الْأَرْضِ بَيْتُ يُحَجُّ وَلَا كَلَامُ يُتْلَى، فَحِينَئِذٍ يَقْرُبُ خَرَابُ الْعَالَمِ *
“শেষ যমানায় আল্লাহ্ তায়ালা তাঁর ঘর বাইতুল্লাহ্ দুনিয়া থেকে উঠিয়ে নিবেন এবং তাঁর বাণীসমূহ কুরআন এবং মানুষের মন-মগজ থেকে মুছে ফেলবেন। ফলে হজ্জ করার এবং কুরআন তিলাওয়াত করার আর কোনো সুযোগ থাকবে না। তখনই পৃথিবীর ধ্বংস হওয়া অত্যাসন্ন হয়ে দাঁড়াবে।” (ইবনে মাজাহ : ৪০৪৯)
এসব হাদীস এ কথার প্রমাণ যে, হযরত ইব্রাহীম (আঃ) তথা তাঁর বংশধরগণ যে অমর কীর্তি রেখে গেছেন তা সৃষ্টির লয় পর্যন্ত অক্ষুন্ন থাকবে। আর এগুলো ধ্বংসের সাথে সাথে দুনিয়ার আয়ু শেষ হয়ে যাবে। এরূপ অমর কীর্তি স্থাপন করা অন্য কারো জন্যে সম্ভব হয়নি।
উপরোক্ত অবদান, বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলীর কারণে আমাদের নবী মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস্ সাল্লাম ও তাঁর বংশধরদের জন্যে আল্লাহর কাছে বরকত ও মঙ্গল কামনা করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং কিভাবে কামনা করতে হবে সে কথাও তিনি আমাদেরকে শিখিয়েছেন। তাই আমরা বলি-
اللَّهُمَّ بَارِكْ عَلَى مُحَمَّd وَعَلَى آلِ مُحَمَّd كَمَا بَارَكْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ *
হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস্ সালামের অপর বৈশিষ্ট হলো, তাঁর ও তাঁর বংশধরদের আগমনের কারণে আল্লাহ্ তায়ালা দুনিয়াবাসীদের অপরাধের শাস্তি প্রদান সাধারণভাবে মুলতবি রাখেন। ইব্রাহীম আলাইহিস্ সালামের আগমনের আগে মানুষ অপরাধ করলে সাথে সাথেই অপরাধের শাস্তি ভোগ করতে হতো। যেমন নূহ (আঃ) হুদ (আঃ) সালিহ (আঃ) লুত (আঃ) প্রমুখ নবীগণের সম্প্রদায়ের ব্যাপারে ঘটেছিল। এসব সম্প্রদায়ের কাউকে অপরাধের শাস্তি স্বরূপ বানর জাতীয় পশুতে রূপান্তরিত করা হয়। আবার কাউকে ধ্বংস করে দেয়া হয়। কোনো সম্প্রদায়কে অপরাধের দরুন বিলীন ও নিশ্চিহ্ন করা হয়। কিন্তু হযরত ইব্রাহীম (আঃ) ও তাঁর বংশের মনীষীদের আগমণের পর তাৎক্ষণিক শাস্তি রহিত করে অপরাধ ক্ষমা চাওয়ার অবকাশ দেয়া হয়। কেউ যে কোনো ধরনের অপরাধ করলে সে অনুতপ্ত হলে কিংবা আল্লাহ্র কাছে কায়মনোবাক্যে ক্ষমা চাইলে দয়াময় আল্লাহ্ তাঁকে ক্ষমা করে দেন। কেউ নবী-রাসূলগণের প্রদর্শিত পথে চলতে বাধা দিলে কিংবা নবীগণের নীতি ও আদর্শ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অন্তরায় সৃষ্টি করলে তাকে বুঝাবার চেষ্টা করার অবকাশ রয়েছে। এসব চেষ্টা-প্রচেষ্টা বিফল হলে সেক্ষেত্রে অপশক্তির বিরুদ্ধাচরণ করতঃ জিহাদে অংশগ্রহণ করে শাহাদত বরণ করা কিংবা বিজয়ের মালা পড়ে 'গাযী' উপাধি ধারণ করার অবকাশ রয়েছে। শহীদ কিংবা 'গাযী' হওয়ার এরূপ কোনো সুযোগ সেকালে ছিল না।
এসব সংগত কারণে হযরত ইব্রাহীম (আঃ) তাঁর বংশধর এবং পরিবার-পরিজনদের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা থাকা, তাদের জন্যে দোয়া করা আমাদের নৈতিক, ধর্মীয় ও সাংবিধানিক দায়িত্ব ও কর্তব্য।
📄 ষোল. ‘হামীদুন’ ও ‘মাজীদুন’ এর তাৎপর্য
'দুরূদ' শরীফের শেষে ব্যবহৃত দু'টি শব্দ حَمِيدٌ 'হামীদুন' এবং مَجِيدٌ 'মাজীদুন' এর অর্থ ও তাৎপর্য সম্পর্কে এখন আলোচনা করতে প্রবৃত্ত হলাম।
حَمَّدٌ শব্দটি مَحْمُودُ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। মহান আল্লাহ তায়ালার অন্যান্য গুণবাচক নামের ন্যায় حَمِيدٌ ও একটি গুণবাচক নাম। শব্দের ছন্দে অনুসৃত।
حَلِيمٌ - حَكِيمُ - قَدِيرُ - عَلِيمٌ - بَصِيرٌ - - فَعِيل
حمد শব্দের আভিধানিক অর্থ প্রশংসা, স্তুতি, স্তর, গুণগান, মহিমা। ব্যাপক অর্থে حَمِيدٌ বলা হয়ে এমন সত্ত্বাকে যার এমনসব গুণাবলী ও উপাদান আছে যদ্বারা ঐ সত্ত্বার প্রশংসা ও গুণগান করা অপরিহার্য হয়ে দাঁড়ায়। অর্থাৎ তিনি স্বতই প্রশংসিত। প্রশংসাকারী সংশ্লিষ্ট যে বস্তু বা সত্ত্বার প্রশংসা করে সেটাই مَحْمُودُ কিংবা প্রশংসিত।
শব্দটি প্রশংসা বা স্তুতির পূর্ণতার প্রতি ইঙ্গিত প্রদান করে এবং শব্দটি প্রশংসিত সত্ত্বার প্রশংসা করা অপরিহার্য করে তোলে। আল্লাহ্ শানে শব্দটি ব্যবহৃত হওয়ায় শব্দটির অর্থ দাঁড়ায়, আল্লাহ পাক পরওয়ারদেগার এমন সত্ত্বা যার মধ্যে প্রশংসা পাওয়ার উপাদান এবং বৈশিষ্ট্যসমূহ পরিপূর্ণ ভাবে বিরাজমান। বস্তুতঃ মহান আল্লাহ্ তায়ালার সত্ত্বা, তাঁর গুণাবলী, কার্যাবলী, নামাবলীতে প্রশংসা ও স্তুতির পরিপূর্ণ উপাদান রয়েছে। কোনো অবস্থাতেই এগুলোর মধ্যে কেনো ধরনের অপূর্ণতা, খুঁৎ কিংবা ত্রুটি পরিদৃষ্ট হওয়া অসম্ভব। মানুষ জাতি আল্লাহ্ তায়ালার এই পরিপূর্ণ ও নিরংকুশ প্রশংসার বহিঃপ্রকাশ করে رَحِيمُ - حَلِيمُ - كَرِيمٌ - قَدِيرُ - عَلِيمٌ . - سَمِيعٌ - بَصِيرٌ ইত্যাকার শব্দ দ্বারা।
مَجْدٌ শব্দ থেকে مَجِيدٌ শব্দের উৎপত্তি। এ শব্দটিও فَعِيلٌ এর ছন্দে অনুসৃত। শব্দটির আভিধানিক অর্থ- মর্যাদা, গৌরব, মহিমা, মহত্ত্ব,
সম্মান। ব্যাপক অর্থে এমন সত্ত্বাকে বুঝায় যার মর্যাদা, গৌরব, মহত্ত্ব অনিবার্যরূপে প্রতিষ্ঠিত, স্বীকৃত। মানব জাতি আল্লাহ্র এই মহত্ত্ব ও মহিমা প্রকাশ করে أَكْبَرُ( )لاَ إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَاللَّهُ 'লাইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার' এ ঘোষণার মাধ্যমে। ঘোষণাটির প্রথম অংশ “লাইলাহা ইল্লাল্লাহু” এ কথার প্রমাণ যে, একচ্ছত্র ও নিরংকুশ ক্ষমতার একমাত্র অধিকারী আল্লাহ্ তায়ালা। তিনি এক ও একক। শেষাংশ وَاللَّهُ أَكْبَرُ আল্লাহ্র মহত্ত্ব, সম্মান ও মহিমার প্রকাশ। সুতরাং مَجِيدٌ শব্দটি আল্লাহ্র মহিমা, সম্মান ও গৌরবকে পরিপূর্ণ ও নিখুঁতভাবে প্রতিষ্ঠা করে।
দয়াময় আল্লাহ তায়ালা নিজেই মানব জাতিকে তাঁর মহিমা ও গুণগান করার ভাষা ও পদ্ধতি শিখিয়েছেন। মহিমা ও স্তবকের ব্যাপারে আল্লাহ্ বললেন- رَحْمَةُ اللهِ وَبَرَكَاتُهُ عَلَيْكُمْ أَهْلَ الْبَيْتِ إِنَّهُ حَمِيدٌ مَجِيدٌ * “হে গৃহবাসী! আল্লাহ্র রহমত ও বরকত তোমাদের উপর, নিশ্চয়ই তিনি প্রশংসিত ও মহিমাময়।” (হুদ: ৭৩)
তিনি আরো বলেছেন- وَقُلِ الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي لَمْ يَتَّخِذُ وَلَدًا وَلَمْ يَكُنْ لَهُ شَرِيكَ فِي الْمُلْكِ وَلَمْ يَكُنْ لَهُ وَلِيٌّ مِّنَ الذُّلِّ وَكَبِّرْهُ تَكْبِيرًا * “এবং বলুন, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর যার কোনো সন্তান নেই। সার্বভৌম ক্ষমতার মধ্যে তাঁর কোনো শরীক নেই। তিনি দুর্দশাগ্রস্ত হন না, যে কারণে তাঁর কোনো সাহায্যকারীর দরকার হতে পারে। সুতরাং আপনি তাঁর মহত্ত্ব বর্ণনা করতে থাকুন।” (বনি ইসরাঈল : ১১১)
অপর আয়াতে আছে- تبارك اسْمُ رَبِّكَ ذِي الْجَلَالِ وَالْإِكْرَامِ ....... وَيَبْقَى وَجْهُ رَبِّكَ ذُو الْجَلَالِ وَالْإِكْرَامِ * “কত পুণ্যময় আপনার পালনকর্তার নাম যিনি মহিমাময় ও মহানুভব।” (আর রহমান : ৭৮)
“এবং অবশিষ্ট থাকবে একমাত্র আপনার মহিমাময় ও মহানুভব পালনকর্তার সত্ত্বা।” (ঐঃ ২৭)
কোরআনের অপর আয়াতে শব্দটি সরাসরি ব্যবহৃত হয়েছে। কোরআনে বলা হয়েছে-
وَهُوَ الْغَفُورُ الْوَدُودُ - ذُو الْعَرْشِ الْمَجِيدُ *
"তিনি ক্ষমাশীল, প্রেমময়, মহান আরশের অধিপতি।” (বুরুজ: ১৪, ১৫)
রাসূলের বাণী হাদীসে বিপদকালে আল্লাহ তায়ালার মহিমা ও গৌরবের কথা উল্লেখ করে দোয়া করার কথা উল্লেখ আছে। রাসূল বলেছেন- বিপদ থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্যে বল-
لَّا إِلَهَ إِلَّا اللهُ الْعَظِيمُ الْحَلِيمُ ، لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ رَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ رَبُّ السَّمَوَاتِ وَرَبُّ الْأَرْضِ وَرَبُّ الْعَرْشِ الْكَرِيمِ *
দুরূদের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয় حَمِيدٌ এবং مَجِيدٌ শব্দদ্বয় দিয়ে।
শব্দ দু'টি মহান আল্লাহর মহত্ত্ব, মহিমা ও গৌরব সূচক গুণবাচক নাম। এ গুণবাচক নাম দিয়ে দুরূদের ইতি টানার তাৎপর্য হলো, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং ইব্রাহীম খলিলুল্লাহ আলাইহিস্ সালামের মান-মর্যাদা, গৌরব, মহিমা বাড়িয়ে দেয়ার আকুতি প্রকাশ করা।
নবী রাসূলগণের মান-ইজ্জত, গৌরব, মহিমা এবং তাঁদের বদান্যতা, সততা, একনিষ্ঠতা ও আন্তরিকতা স্বতসিদ্ধ, প্রতিষ্ঠিত, স্বীকৃত। এতদসত্ত্বেও বান্দাহ আল্লাহ্র কাছে দুরূদের মাধ্যমে তাঁদের গৌরব ও মান-সম্মান বাড়িয়ে দেয়ার এই যে আকুতি-মিনতি তা একথার বহিঃপ্রকাশ যে, আল্লাহ কোনো দুরূদ পাঠকারীকেও এ অছিলায় ইজ্জত ও সম্মান দান করেন। গৌরব ও মহিমা বাড়িয়ে দেন।
📄 সতের. নবীগণ ব্যতীত অপরের প্রতি দুরূদ পাঠ করা যায় কিনা
একথা অনস্বীকার্য যে, নবী রাসূলগণের উপর দুরূদ ও সালাম (الصَّلَاةُ وَالسّلام) পেশ করতে হবে। নূহ (আঃ) সম্পর্কে আল্লাহ্ বলেছেন- وَتَرَكْنَا عَلَيْهِ فِي الْآخِرِينَ - سَلَامٌ عَلَى نُوحٍ فِي الْعَالَمِينَ
إِنَّا كَذَلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِينَ * (সাফফাত: ৭৮-৮০)
ইব্রাহীম (আঃ) সম্পর্কিত বাণী হলো- وَتَرَكْنَا عَلَيْهِ فِي الْآخِرِينَ - سَلَامُ عَلَى إِبْرَاهِيمَ * (ঐঃ ১০৮-১০৯)
মূসা (আঃ) ও হারুন (আঃ) সম্পর্কে আল্লাহ্ বলেছেন- وَتَرَكْنَا عَلَيْهِمَا فِي الْآخِرِينَ - سَلَامٌ عَلَى مُوسَى وَهَارُونَ *
(ঐঃ ১১৯-১২০) ইলয়াস (আঃ) সম্পর্কে তিনি বলেছেন- سَلَامٌ عَلَى إِلْ يَاسِينَ * (ঐঃ ১৩০)
উপরোক্ত আয়াতগুলোতে নবীগণের নাম উল্লেখ করতঃ তাঁদের উপর 'সালাম বা শান্তি বর্ষিত হওয়ার কথা উল্লেখ হয়েছে। অধিকন্তু বলা হয়েছে فِي الْآخِرِينَ অর্থাৎ পরবর্তীতে যারা আসবেন তাদের মধ্যেও সালাম বা শান্তি বর্ষিত হওয়ার ধারা বজায় থাকবে। অর্থাৎ মহান আল্লাহ তায়ালা স্বয়ং সালাম বর্ষণ করার পর পরবর্তীতে তাদের উপর শান্তি. দয়া, রহমত কামনা করার ধারা অব্যাহত রাখার প্রকৃতি অবশিষ্ট রাখেন। ফলে নূহ, ইব্রাহীম, মুসা, হারুন, ইলইয়াস আলাইহিমুস সালামের পরও দুনিয়াবাসী নবীগণের উপর সালাম পেশ করবেন, তাঁদের স্তুতি গাইবেন। এ ধারা অব্যাহত থাকবে দুনিয়ার লয় প্রাপ্তির পূর্বক্ষণ পর্যন্ত।
সকল নবীগণের উপর 'সালাত' বা দুরূদ পাঠের ব্যাপারে কিছুটা মতানৈক্য রয়েছে। শেখ মহীউদ্দীন নববী (রঃ)-সহ প্রায় সকলেই একমত যে, নবীগণের উপর সালাত পাঠ করা ঠিক এবং পড়া দরকার। ইমাম মালিক (রঃ) বলেছেন- আমাদের নবী মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছাড়া আর কারো উপর সালাত বা দুরূদ পাঠ না করাই ভালো। তবে তাঁর সাথী শাগরীদগণ কথাটির ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে, আমরা সালাতের মাধ্যমে আমাদের নবী ব্যতীত অপর কোনো নবীর আনুগত্য এমনভাবে করবো না যেমনি আমরা আমাদের নবীর উপর সালাত বা দুরূদের মাধ্যমে আল্লাহর ইবাদত করে থাকি।
"আলিন নবী” বা নবী আলাইহিস্ সালামের পরিবার-পরিজনদের উপর দুরূদ পাঠ করা সকলের মতেই বৈধ।
একটি জিজ্ঞাসা :
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পৃথক করে শুধুমাত্র নবী পরিবারের উপর দুরূদ পাঠ করা যায় কিনা? গবেষকগণ এ জিজ্ঞাসার জবাব দুভাবে দিয়েছেন-
একটি হলো- যদি বলা হয়- اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى أَلِ مُحَمَّd আল্লা ছল্লিআলা আলি মোহাম্মাদ” তাহলে এরূপ বলা জায়েয। এরূপ দুরূদ পাঠ করায় রাসূলের উপরও দুরূদ পাঠ করা বুঝায়। কেননা এ বাক্যে শব্দগতভাবে নবী আলাইহিস সালামের পৃথক হওয়া দৃশ্যতঃ পরিদৃষ্ট হলেও অর্থগত দিক থেকে পৃথক বা স্বতন্ত্র নয়।
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নাম উল্লেখ না করে পৃথকভাবে তাঁর পরিজনদের উপর 'সালাম' পাঠ করার ব্যাপারে বিশেষজ্ঞগণ অনৈক্যমত পোষণ করেছেন। যেমন কেউ বললেন-
অথবা اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى عَلِيٌّ *
কিংবা اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى حُسَيْنٍ *
اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى فَاطِمَةَ *
এরূপ সালাত পাঠে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নাম উল্লেখ না থাকায় এভাবে 'সালাত' পেশ করাকে ইমাম মালেক (রঃ) মকরূহ বলেছেন। কেননা অতীতে এরূপ পৃথক 'সালাত' পাঠের কোনো নজির নেই। ইমাম আবু হানীফা (রঃ), সুফিয়ানে সাওরী এবং সুফিয়ান ইবনে ওয়াইনাহ প্রমুখও এমত পোষণ করেছেন।
ইসমাঈল ইবনে ইসহাক বলেছেন- ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে-
لَا تَصْلُحُ الصَّلَاةُ عَلَى أَحَدٍ إِلَّا عَلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَلَكِنْ يَرْضَى لِلْمُسْلِمِينَ وَالْمُسْلِمَاتِ بِالْاِسْتِغْفَارِ * অর্থাৎ নবী আলাইহিস সালাম ব্যতীত অপর কারো জন্যে 'সালাত' পাঠ করা সঠিক নয়। তবে মুসলমান নর-নারীদের জন্যে মাগফিরাত কামনা করা উচিত। এ মতের সাথে ঐক্যমত পোষণ করেছেন ওমর বিন আবদুল আযীয (রাঃ)।
এ পর্যায়ে জাফর বিন ফোরকানের কথা প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছেন- ওমর বিন আবদুল আযীয গভর্নরদের কাছে একটি চিঠিতে লিখেন-
امَّا بَعْدُ : فَإِنَّ نَاسَامِنَ النَّاسِ الْتَمَسُوا الدُّنْيَا بِعَمَلِ الْآخِرَةِ - وَإِنَّ الْقَصَاصَ قَدْ أَحْدَثُوا فِي الصَّلَاةِ عَلَى خُلَفَائِهِم وَأَمَرَائِهِمْ عَدُلَ صَلَاتِهِمْ عَلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَإِذَا جَاءَكَ كِتَابِي، فَمُرْهُمْ أَنْ تَكُونَ صَلَاتُهُمْ عَلَى النَّبِيِّينَ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِمْ وَسَلَّمَ وَدُعَانُهُمْ لِلْمُسْلِمِينَ عَامَّةً *
(শুনা যাচ্ছে) কিছু সংখ্যক লোক আখেরাতের করণীয় কার্যক্রমের বিনিময়ে পার্থিব স্বার্থ চরিতার্থ করার প্রয়াস চালাচ্ছে। আবার কতিপয় কাহিনীকার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরিবর্তে আমীর অমাত্য এবং খলিফাদের উপর দুরূদ পাঠ করার রেওয়ায চালু করছে। আমার এ লেখা তোমার কাছে পৌছা মাত্র ঐসব কাহিনীকারদেরকে নির্দেশ দিবে তারা যেনো নবীগণের উপর 'সালাত' পাঠ করেন এবং সর্বসাধারণ মুসলমানগণের জন্যে মাগফিরাত কামনা করেন। (সালাত মর্যাদা: ৬৯)
এ বিষয়ে ইমাম শাফেয়ী মতাবলম্বীদের ৩টি রায় দেখা যায়- (ক) স্বতন্ত্রভাবে 'সালাত' পড়া হারাম।
(খ) এরূপ 'সালাত' পাঠ করা মকরূহে তানযিহী। অনেকেই এমত প্রকাশ করেছেন।
(গ) এরূপ না করা উত্তম। তবে এরূপ করা মকরূহ নয়। এ মত ইমাম নববীর (রঃ)। তবে মকরূহে তানযিহী হওয়াই যুক্তিযুক্ত বলে অনেকে মনে করেন।
'সালাম' পেশ করার ব্যাপারেও গবেষক আলেমগণ বিভিন্ন মত পোষণ করেছেন। 'সালাম' শব্দের অর্থ যদি 'সালাত' ধরে নেয়া হয় তাহলে এরূপ 'সালাম' শর্তহীনভাবে সকলের জন্যে ব্যবহার করা মাকরূহ। যেমন বলা হলো- السَّلَامُ عَلَى فُلَانٍ অথবা বলা হলো- فُلَانٌ عَلَيْهِ السَّلَامُ মোহাম্মদ আল জুবাইনীসহ অনেকেই এরূপ বলাকে মাকরূহ বলেছেন। এবং তিনি عَلَى عَلَيْهِ السَّلَامُ আলা আলাইহিস্ সালাম বলা নিষিদ্ধ বলেছেন।
'সালাম' শান্তি অর্থে প্রতিটি মুসলমান নর-নারী উপস্থিত-অনুপস্থিত এমনকি মৃত ব্যক্তিকেও পেশ করা কিংবা পৌছানো জায়েয। যেমন বলা হল بَلِّغْ فُلَانًا مِنِّي السَّلَامَ "অমুককে আমার সালাম পৌছে দিও।” এক্ষেত্রে 'সালাম' পৌছানোর মাধ্যমে একজন মুসলমানকে সম্মান প্রদর্শন করা বুঝায়। পক্ষান্তরে 'সালাত' বা 'দুরূদ' হচ্ছে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রাপ্য। যেমন আমরা তাশাহুদে বলে থাকি- السَّلَامُ عَلَيْنَا وَعَلَى عِبَادِ اللَّهِ الصَّالِحِينَ *
আমাদের একথা শিখানো হয়নি এবং আমরা বলি- الصَّلَاةُ عَلَيْنَا وَعَلَى عِبَادِ اللَّهِ الصَّالِحِينَ *
একথা আগেই বলা হয়েছে যে, রাসূলের নাম উল্লেখ করতঃ তাঁর পরিবার-পরিজন এবং সাহাবীগণের উপর 'সালাত' পড়া বিধি সম্মত। যেমন বলা হয়ে থাকে- اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّd وَعَلَى آلِهِ وَأَصْحَابِهِ وَمَلَائِكَتِكَ الْمُقَرَّبِينَ وَأَهْلِ طَاعَتِكَ أَجْمَعِينَ *
এরূপ 'সালাত' পড়া বৈধ। এরূপ সালাতে রাসূলের সাথে যুক্ত হয়েছে তাঁর আহল, সাহাবী, ফেরেশতা এবং বুযর্গ ও আল্লাহ্ ওয়ালা ব্যক্তিত্ব।
আহলে তাআত )أَهْلِ طَاعَةُ( হলো সার্বিকভাবে আল্লাহর অনুগত ব্যক্তিত্ব। এক্ষেত্রে যদি কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করতঃ একটি রূসম বা প্রথা প্রচলন করা উদ্দেশ্য হয় তাহলে এরূপ বলা মাকরূহ হবে। এমনকি এরূপ 'সালাত' পাঠ হারামও হতে পারে। কেননা, কোনো নির্দিষ্ট বুযর্গ ব্যক্তিত্বের ক্ষেত্রে এরূপ 'সালাত' পাঠ কখনো একটি রূসম প্রচলন করার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। এরূপ রূসম ও রেওয়াজ প্রচলন করা ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে গর্হিত। অধিকন্তু যে ব্যক্তির কাছে যে ব্যক্তি বা গোষ্ঠী অধিকতর বুযর্গ, সম্মানিত, বরণীয়, পূজনীয় তাঁর নাম কিংবা গোষ্ঠীর নাম সালাতে সংযোজিত হবে। ফলে স্ব স্ব মনোনীত ও পূজনীয় ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে সালাতের অন্তর্গত করার একটি ঘৃণিত ও অবজ্ঞেয় প্রতিযোগিতা দেখা দিতে পারে। তখন 'সালাত' এর অবস্থান হবে হীনমন্যতা ও স্বার্থসিদ্ধির ঘৃণ্য প্রয়াস মাত্র। এমতাবস্থায় এরূপ কর্মতৎপরতাকে হারাম বলা ছাড়া আর কোনো গত্যন্তর থাকে না। আগের যুগের রাফেজী খারেজী সম্প্রদায় নিজ নিজ নেতাদেরকে নিয়ে এরূপ টানা হেচড়া করেছে। সমকালীন সময়ের সর্বজন নন্দিত ব্যক্তিকে বাদ দিয়ে স্ব স্ব মনোনীত ও পূজনীয় ব্যক্তিকে সে সময়ের কিছুলোক ও গোষ্ঠী এরূপ বিষয়ে তুলকালাম কাণ্ড ঘটিয়েছে।
আজকের এ যুগেও কতিপয় লোক ও গোষ্ঠী তরীকত বা ইলমে মারিফাতের ছত্রছায়ায় স্ব স্ব বরণীয় ও মনোনীত ব্যক্তিত্বকে কেন্দ্র করে এরূপ হীনমন্য ও ঘৃণ্য কাজে তৎপর বলে পরিলক্ষিত হয়। মনোনীত ব্যক্তির নামে দুরূদ বা ওযীফা তৈরি করতঃ বানানো ওযীফার অনুশীলন করে পরম তৃপ্তি সহকারে।
একজন বুযর্গ বা আল্লাহর ওলীরূপে খ্যাত ও স্বীকৃত ব্যক্তির জন্যে সালাতের মাধ্যমে দোয়া করা বিধিসম্মত। এমনকি মৃত ব্যক্তির জন্য ইবনে ওমর (রাঃ) দোয়া করতেন এভাবে صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ )আল্লাহ্ তাঁর উপর রহমত করুক) এমনিভাবে আল্লাহর রাসূলের সালাত পেশ করার কথাও হাদীসে উল্লেখ আছে।
মোটকথা, কোনো আহলে তাআতের জন্যে 'সালাত' পেশ করার উদ্দেশ্যে যদি কোনো ধরনের রেওয়ায বা হীনস্বার্থ চিরতার্থ করা উদ্দেশ্য না হয় তাহলে এরূপ 'সালাত' পাঠ জায়েয। অন্যথায় না জায়েয, এমনকি হারাম।