📄 বার. রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিবিগণ
উপরে বলা হয়েছে যে, দুরূদে পঠিত (اَل ) শব্দটির দ্বারা (اَزْوَاجُهٗ) রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিবিগণ উদ্দেশ্য। এবার তাঁর বিবিগণের বৈশিষ্ট্য ও ফজিলত সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধরা হলো।
(১) খাদীজাহ্ বিনতু খুওয়াইলিদ (রাঃ) ঃ উর্ধ্বতন বংশ ও পিতৃ পরিচয়ে তাঁর নাম ছিল খাদীজাহ্ বিন্তু খুওয়াইলিদ বিন আসাদ বিন আবদুল ওজ্জা বিন কুসাই বিন কিলাব। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ২৫ বৎসর বয়স কালে তাঁকে বিবাহ করেন। তখন খাদীজার (রাঃ)-এর বয়স ছিল ৪০ বৎসর। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মদীনায় হিজরতের ৩ বৎসর মতান্তরে ৪/৫ আগে খাদীজাহ্ (রাঃ) ইন্তেকাল করেন। জীবনের শেষ লগ্ন পর্যন্ত তিনি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সংগে ছিলেন। চরম দুর্দিনে তিনি ছিলেন রাসূলের জীবন সঙ্গীনি, সাহায্যকারী, পরামর্শদাতা, এবং সান্তনা দানকারী। ৬৫ বৎসর তিনি বেঁচে ছিলেন।
তাঁর মর্যাদা: * তাঁর জীবিতাবস্থায় রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আর কাউকে বিবাহ করেননি। * নবী তনয় একমাত্র ইব্রাহীম ছাড়া আর সব ছেলে-মেয়ে খাদীজার (রঃ) ঔরসে জন্মলাভ করেন। ইব্রাহীম (রাঃ) মারীয়ার (রাঃ) ঔরসে জন্ম নেন। * উম্মতে মোহাম্মাদীর তিনি হচ্ছেন শ্রেষ্ঠ নারী। * আল্লাহ্ তায়ালা জিব্রাইল (আঃ)-এর মারফতে হযরত খাদীজার (রাঃ) কাছে 'সালাম' পাঠিয়েছেন। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর 'সালাম' পৌছে দেন। * হযরত আবু হোরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেন- أَتَى جِبْرِيلُ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ : يَا رَسُولَ اللَّهِ هُذِهِ خَدِيجَةُ قَدْ أَتَتْ مَعَهَا إِنَاءٍ فِيهِ إِدَامُ أَوْ طَعَامُ أَوْ شَرَابٌ .
فَإِذَا هِيَ أَتَتْكَ فَاقْرَأْ عَلَيْهَا السَّلَامَ مِنْ رَبِّهَا وَمِنِّي - وَبَشِّرْهَا بَيْتًا فِي الْجَنَّةِ مِنْ قَصَبِ لَا صَخَبَ فِيهِ وَلَا نَصَبَ *
জিব্রাইল (আঃ) রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে বললেন- ইয়া রাসূলাল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! খাদীজাহ (রাঃ) আপনার কাছে পাত্রভর্তি কিছু খাদ্য নিয়ে আসতেছেন। তিনি আসলে তাঁর রব এবং আমার পক্ষ থেকে তাকে সালাম বলবেন এবং তাঁকে এমন মনিমুক্তা খচিত জান্নাতের শুভসংবাদ দিবেন যেখানে সুখ আর সুখ। অসুস্থ ও অশান্তির লেশ মাত্র নেই।" (বুখারী, মুসলিম: ۱۴۶۳)
* তিনি ছিলেন প্রথমা ঈমানদার মহিলা সাহাবী, প্রথমা উম্মুল মুমিনীন, প্রথমা গর্ভধারিনী মুমিনীন জননী।
(২) সাওদাহ বিনতে যামআ (রাঃ): হযরত খাদীজা (রাঃ) মৃত্যুর পর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত সাওদাহ্ বিনতে যামআকে (রাঃ) বিবাহ করেন। খাদীজার (রাঃ) মৃত্যু হলে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিষন্ন হয়ে পড়েন। মাতৃহারা সন্তানদের লালন-পালন ও সাংসারিক কাজ-কর্ম গুছানোর কাজ করা দুরূহ হয়ে উঠে। এ অবস্থা দর্শনে ইবনে মাযউনের স্ত্রী খাওলাহ (রাঃ) বিনতে হাকীম সাকরান ইবনে আমরের (রাঃ) বিধবা স্ত্রী সাওদাহকে (রাঃ) বিবাহের প্রস্তাব দিলে তিনি তা গ্রহণ করেন। পিতা-মাতা মেয়ে সাওদাহকে (রাঃ) ৪শ দিরহাম মহরানার বিনিময়ে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে বিয়ে দেন।
সাওদাহ (রাঃ) ছিলেন দীর্ঘদেহী। রাগ একটু বেশি হওয়ার দরূণ মেজাজ একটু কড়া থাকলেও উদারতা ও দানশীলতায় তা ঢাকা পড়ে যায়। তিনি গরীবদেরকে অকাতরে বিলিয়ে দিতেন। খাদ্য টাকা-পয়সা কখনো তিনি জমা করতেন না। তাঁর মধ্যে হিংসা দ্বেষ, পরশ্রীকাতরতার লেশমাত্র ছিল না।
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে বিবাহের পর তার ঔরশে কোনো সন্তান হয়নি। সাকরানের (রাঃ) ঔরশজাত একটি পুত্র সন্তান ছিল। নাম ছিল আবদুর রহমান (রাঃ)। তিনি হযরত ওমরের (রাঃ) শাসনামলে জালুলার যুদ্ধে বীরত্বের সাথে লড়াই করে শাহাদত বরণ করেন। ২য় খলীফা হযরত ওমরের (রাঃ) শাসনামলের শেষদিকে তিনি ইন্তিকাল করেন।
(৩) হযরত আয়েশা বিনতে আবু বকর (রাঃ):
হযরত আবুবকরের (রাঃ) কন্যা হযরত আয়েশার (রাঃ) মায়ের নাম ছিল উম্মে রূম্মান। চরম বর্বরতার পরিবেশেও আবু বকরের (রাঃ) পরিবার ছিল জাহিলিয়াত মুক্ত, স্বচ্ছ ও পরিচ্ছন্ন। এ পরিবেশেই লালিত হয়েছিলেন হযরত আয়েশা (রাঃ)।
৬ বৎসর বয়সকালে নবীর সাথে তাঁর বিয়ে হয়। বিয়ের ৩ বৎসর পর তিনি মদিনায় হিযরত করেন। পিতা আবুবকর (রাঃ) মেয়েকে নবীর সাথে বিবাহ দিতে সক্ষম হওয়ায় খুবই তৃপ্ত হোন। এ সম্পর্ক ছিল তার জন্যে একটি গৌরব ও মর্যাদার ব্যাপার।
বৈশিষ্ট্যসমূহ:
(ক) হযরত আয়েশা (রাঃ) ছিলেন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একমাত্র কুমারী পত্নি। অন্যান্য সকলেই ছিলেন বিধবা।
(খ) তাঁর পবিত্রতা ও নিষ্কলুতার ব্যাপারে কুরআনের আয়াত নাযিল হয়। ইফক বা মিথ্যা অপবাদের কাহিনী একথার স্বাক্ষর।
(গ) তাঁর ঘরে আবস্থানকালে রাসূলের কাছে ওহী আসতো। অন্য বিবিদের বেলায় এরূপ হতো না।
(ঘ) তাঁর কোলেই রাসূলের ওফাত হয়।
(ঙ) তাঁর গৃহেই রাসূলের দাফন কাজ সম্পন্ন হয়। মদীনায় আজকের রওজা মুবারক হযরত আয়েশার (রাঃ) গৃহ ছিল।
(চ) রাসূলের সাথে তাঁর বিবাহ হয়েছিল স্বাপ্নিক নির্দেশে। ইফকের ঘটনা, তাহরীমের ব্যাপার এবং তাখয়ীরের প্রসঙ্গে যেসব আয়াত নাযিল হয়েছে, সেগুলো তাঁকে কিয়ামত পর্যন্ত অমর করে রাখবে।
তাঁর স্বভাব প্রকৃতি :
অতিথি পরায়ণতা, দানশীলতা ও দরিদ্র সেবায় তিনি ছিলেন সমধিক প্রসিদ্ধ। রাসূলের অনুপস্থিতিতে বনু শফক গোত্রের প্রতিনিধি দলের মেহমানদারী করার ঘটনা ছিল তাঁর অতিথি পরায়ণতার স্বাক্ষর। এমনিভাবে তাঁর কাছে আসা ৭০ হাজার দিরহাম এক নাগাড়ে গরীবের মাঝে বিলিয়ে দিয়ে তিনি দানশীলতার নজীর স্থাপন করেন। ইফতারের পূর্ব মূহুর্তে মিসকীনের হাঁকে ঘরে থাকা সমুদয় খাদ্য তাকে দান করে দরিদ্র সেবার পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছেন। বোনের পুত্র হযরত আবদুল্লাহ বিন যোবায়ের খালাম্মার এরূপ বদান্যতায় ও উদারতায় বিরক্ত হওয়ার খবর পেলে তিনি ভাগীনের সাথে কথা না বলার কসম করেন। পরে তিনি ৪০টি গোলাম আযাদ করে এ কসম ভংগ করে ভাগিনার সাথে কথা বলেন।
জ্ঞানের ক্ষেত্রে হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর অবদানঃ
হযরত আয়েশা (রাঃ) ছিলেন অসাধারণ জ্ঞানের অধিকারী। তাঁর মেধা ছিল তীক্ষ্ণ, বুদ্ধি ছিল প্রখর। কুরআনে করিমের অনেক আয়াতের তিনি অত্যন্ত যুক্তিগ্রাহ্য ব্যাখ্যা দিয়েছেন। একটি হাদীসে কুরআন সম্পর্কে তাঁর অগাধ জ্ঞানের কথা প্রমাণিত হয়।
মাসরূক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বললেন- আয়েশা (রাঃ) বলেছেন- এমন তিনটি কথা আছে যা বললে আল্লাহ্র উপর মিথ্যারোপ করা বুঝায়। প্রথমতঃ রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহকে প্রত্যক্ষ দেখার কথা বলা। কেননা কুরআনে আছে-
وَمَا كَانَ لِبَشَرٍ أَنْ يُكَلِّمَهُ اللهُ إِلَّا وَحْيًا أَوْ مِنْ وَرَاءِ حِجَابٍ أو يُرْسِلَ رَسُولاً فَيُوحِي بِإِذْنِهِ مَا يَشَاءُ - إِنَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ -
“কোনো মানুষের জন্যে এটা সম্ভব নয় যে, অহী অথবা পর্দার আড়াল কিংবা আল্লাহরই কোনো প্রেরিত দূত- যে তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী ওহী নিয়ে আসবে, এ ছাড়া আল্লাহ্ অন্য কারো সাথে কথা বলবেন। নিশ্চয়ই তিনি মহান ও বিজ্ঞ।” (সূরা শুরা: ৫১)
উপরোক্ত আয়াতের পরিপ্রেক্ষিতে নিম্নোক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় তিনি বলেন- এ আয়াতের মর্মার্থ সম্পর্কে আমিই সর্বপ্রথম নবীকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। তিনি বলেছেন, আমি যাকে দেখেছি তিনি ছিলেন জিব্রাইল (আঃ)। আমি তাঁকে তাঁর আসল আকৃতিতে দুবার দেখেছি। আয়াতটি হলো-
وَلَقَدْ رَاهُ بِالْأُفُقِ الْمُبِينِ - وَلَقَدْ رَاَهُ نَزْلَةً أُخْرَى *
“নিশ্চয়ই সে সমুজ্জল দিগন্তে তাকে দেখেছে এবং নিশ্চয়ই সে আর একবার তাকে প্রত্যক্ষ করেছে।" (নাজম: ১৩, ১৫)
দ্বিতীয় কথা হলো, যে ব্যক্তি মনে করে, আল্লাহ্র রাসূল কোনো কিছু গোপন করেছেন। এরূপ ধারণা পোষণ করা আল্লাহ্র উপর দোষ আরোপ করার নামান্তর। কারণ আল্লাহ বলেছেন-
يَا أَيُّهَا الرَّسُولُ بَلِّغْ مَا أُنْزِلَ إِلَيْكَ مِنْ رَّبِّكَ وَإِنْ لَّمْ تَفْعَلْ فَمَا بَلَّغْتَ رِسَالَتَهُ *
“হে রাসূল! আপনার কাছে আপনার রবের পক্ষ থেকে যা কিছু অবতীর্ণ করা হয়েছে তার সবটুকুই মানুষের কাছে পৌঁছে দিন। আপনি যদি এরূপ না করেন, তাহলে আল্লাহর রিসালাত আপনি পৌছে দিতে পারলেন না।” (মায়িদা: ৬৭)
আগামীকাল কিছু হওয়ার আগাম কথা জানা থাকার ধারণা পোষণ করা আল্লাহর উপর মিথ্যারোপের তৃতীয় কথা। কারণ কুরআনে আল্লাহ বলেছেন-
قُلْ لَا يَعْلَمُ مَنْ فِي السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ الْغَيْبَ إِلَّا اللَّهُ *
“হে নবী! আপনি বলে দিন, আল্লাহ্ ছাড়া আসমান-যমীনের কেহই অদৃশ্যের জ্ঞান রাখে না।” (নামল: ৬৫)
হাদীস সংরক্ষণ ও সংকলনে তাঁর অবদানঃ রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তেকালের পর হযরত আয়েশা (রাঃ) দীর্ঘ ৩৯ বছর বেঁচে ছিলেন। ফলে তিনি অনেক হাদীস সংরক্ষণ সংকলন করার সুযোগ পান। বহু সংখ্যক সাহাবী ও তাবেয়ী তাঁর থেকে হাদীস রেওয়ায়েত ও সংগ্রহ করেন।
ইমাম যুহরী (রঃ) লিখেছেন- لَوْ جُمِعَ عِلْمُ النَّاسِ كُلِّهِمْ وَعِلْمُ أَزْوَاجِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَكَانَتْ عَائِشَةُ أَوْسَعُهُمْ عِلْمًا *
“সকল মানুষের এবং উম্মুল মুমিনীনের সকল ইলম যদি একত্র করা হয়, তাহলে হযরত আয়েশার (রাঃ) ইলম হবে তাদের চেয়ে বেশি।”
হাদীস বর্ণনা করার সংখ্যার দিক থেকে প্রথম ছিলেন হযরত আবু হোরাইরাহ্ (রাঃ)। ২য় ছিলেন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ)।
তৃতীয় স্থান ছিল হযরত আয়েশা (রাঃ)-র। তাঁর সূত্রে বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা হলো ২২১০টি। ১৭৪ টি হাদীস আছে বুখারী, মুসলিমে। আলাদাভাবে বুখারীতে আছে ৫৪টি এবং মুসলিম শরিফে আছে ৫৮টি।
শ্রেষ্ঠ উম্মত হযরত আবু বকরের (রাঃ) আদরের দুলারী সাইয়্যেদুল মুরসালীন শ্রেষ্ঠ নবী মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভাগ্যবতী পত্নী বিশ্বখ্যাত মু'মেনীন জননী হযরত আয়েশা সিদ্দীকাহ্ (রাঃ) ৫৭ মতান্তরে ৫৮ হিজরী সনের ১৭ই রমযান মঙ্গলবার দিবাগত রাতে ৬৭ বৎসর বয়সে ইহধাম ত্যাগ করেন। তাঁর কোনো সন্তান ছিল না। হযরত আবু হোরাইরাহ (রাঃ) তাঁর নামাযে জানাযার ইমামতি করেন। তৎকালীন সময়ে অন্য কারো জানাযায় এতো লোকের সমাগম হয়নি।
(৪) হযরত হাফসা বিনতে ওমর (রাঃ): মুসলিম জাহানের ২য় খলীফা হযরত ওমরের (রাঃ) কন্যা হাফসা (রাঃ) ছিলেন উম্মুল মুমিনীনদের একজন। তাঁর প্রথম স্বামী ছিলেন খুনাইস (রাঃ)। ওহুদের যুদ্ধে বীর বিক্রমের মতো লড়াই করতে গিয়ে তিনি মারাত্মকভাবে আহত হন। এই আহতের কারণে তিনি কয়েকদিন পর ইহধাম ত্যাগ করেন।
হাফসা (রাঃ) বিধবা হলে হযরত ওমর (রাঃ) তাঁকে পুনরায় বিবাহ দেয়ার চিন্তা করেন। এ সুবাদে হযরত আবুবকর (রাঃ) এবং ওসমান (রাঃ)-এর সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক স্থাপন করার মহৎ উদ্দেশ্যে তিনি তাদেরকে পর্যায়ক্রমে কন্যা হাফসাকে (রাঃ) বিবাহ করার প্রস্তাব দেন। তাঁরা অপারগতা প্রকাশ করলে তিনি মনঃক্ষুন্ন হয়ে রাসূলের দরবারে গিয়ে মনের কথা খুলে বললেন। ওমরের (রাঃ) সব কথা শুনে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হাফসার (রাঃ) বিয়ে আবু বকর (রাঃ) এবং ওসমানের (রাঃ) উভয় থেকে উত্তম ব্যক্তির সংগে হবে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বিয়ে করেন। এদিকে ওসমানের (রাঃ) স্ত্রী রাসূল তনয়া রোকাইয়াহ্ (রাঃ) ইন্তেকাল করলে রাসূলের তনয় ২য় কন্যা হযরত উম্মে কুলসুমকে (রাঃ) হযরত ওসমানের (রাঃ) সাথে বিয়ে দেন।
চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যঃ সহীহ বুখারীর বর্ণনা মতে, হযরত হাফসাহ (রাঃ)-এর মেজাজ কিছুটা কড়া ছিল এবং মাঝে মধ্যে চড়া ভাষায় নবীর সাথে কথা বলতেন। একথা শুনার পর হযরত ওমর (রাঃ) স্বীয় কন্যাকে ধমকের সুরে বললেন- হে হাফসাহ! সাবধান! আমি তোমাকে আল্লাহর ভয় দেখাচ্ছি। আয়েশার (রাঃ) সমকক্ষ হতে চেষ্টা কর।
তিনি ছিলেন আল্লাহ্ ভীরু। বেশীর ভাগ সময় ইবাদতে কাটাতেন। বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সামনে হযরত জিব্রাইল (আঃ) হাফসাহ (রাঃ) সম্পর্কে বলেছেন- সে খুব ইবাদতকারী, রোযাদার। তিনি জান্নাতেও আপনার স্ত্রী হওয়ার সৌভাগ্যবতী হবেন। হিজরী ৪৫ সনের শাবান মাসে মদীনায় ইন্তেকাল করেন। জান্নাতুল বাকীতে তাঁকে দাফন করা হয়। তিনি ছিলেন নিঃসন্তান।
(৫) হযরত যয়নব বিনতে খোযাইমাহ (রাঃ): ওহুদের প্রান্তরে শাহাদত বরণকারী উঁচু দরজার সাহাবী আব্দুল্লাহ্ বিন জাহাশের (রাঃ) সাথে যয়নব বিনতে খোযাইমার (রাঃ) প্রথম বিবাহ হয়। আবদুল্লাহ ছিলেন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ফুফাতো ভাই। যুদ্ধে যাওয়ার প্রাক্কালে তিনি আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করলেন এভাবে- 'হে আল্লাহ! আমাকে এমন বাহাদুর শত্রুর মুকাবিলা কর যার সাথে আমি যুদ্ধ করবো অত্যন্ত তীব্র গতিতে। আমি যুদ্ধে শহীদ হলে সে রাগে রোষে আমার নাক, কান ঠোঁট কেটে ফেলবে। আর আমি এ অবস্থাতেই হাশরের মাঠে তোমার সাথে সাক্ষাৎ করতে চাই। হে আল্লাহ! তুমি আমার এ অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে আমি আরজ করবো, তোমার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সন্তুষ্টির জন্যে। বস্তুতঃ তাকে এ অবস্থাতেই যুদ্ধের ময়দানে পাওয়া যায়।'
হযরত আবদুল্লাহ বিন জাহাশের (রাঃ) শাহাদতের পর ঐ বৎসরই রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিধবা যয়নবকে (রাঃ) ৫ দিরহাম মহরানা ধার্য করে বিবাহ করেন। তখন তাঁর বয়স ছিল ৩০ বসর। বিবাহের ২/৩ মাসের মধ্যেই তিনি ইন্তেকাল করেন। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর জানাযার ইমামতি করেন। জান্নাতুল বাকীতে তিনি চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন।
ফকীর-মিসকীন অভাবগ্রস্তদেরকে উদারহস্তে দান করতেন বলে তিনি উম্মুল মাসাকীন বা গরীবের জননী রূপে খ্যাত ছিলেন।
(৬) হযরত উম্মে সালমাহ (রাঃ): আবু উমাইয়ার কন্যা নবীপত্নি হযরত উম্মে সালমাহ (রাঃ) ছিলেন কুরাইশের বনী মাখযুম গোত্রের সাথে সম্পৃক্ত। মাতা ছিলেন আতিকা বিনতে আমের (রাঃ)।
উম্মে সালমার (রাঃ) ১ম বিয়ে হয় আপন চাচাতো ভাই আবদুল্লাহর সাথে। স্বামী-স্ত্রী উভয়েই হাবশায় হিজরত করেছিলেন। বদর ও ওহুদ যুদ্ধে হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) অংশগ্রহণ করেন। ওহুদ যুদ্ধে আহত হয়ে তিনি শহীদ হন।
স্বামীর শহীদ হওয়ার পর তাঁর অসহায়ত্বের কথা বিবেচনা করে হযরত আবু বকর (রাঃ) তাঁকে বিবাহের প্রস্তাব দেন। তিনি অমত প্রকাশ করলে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওমর ফারুকের (রাঃ) মারফতে তাঁকে বিবাহের প্রস্তাব দিলে তিনি সম্মত হোন। ৪র্থ হিজরীর শাওয়াল মাসে বিবাহ হয়।
উম্মে সালমাহ (রাঃ) ছিলেন সাহিত্যিক, বাকপটু, তীক্ষ্ম মেধার অধিকারিণী। ৮৪ বছর বয়সে ৭৩ হিজরীতে তিনি ইন্তেকাল করেন। হযরত আবু হোরাইরাহ (রাঃ) তাঁর সালাতুল জানাযায় ইমামতি করেন।
(৭) হযরত যয়নব বিনতে জাহাশ (রাঃ): হযরত যয়নবের (রাঃ) পিতা ছিলেন জাহাশ বিন রিয়াব। আর মাতা ছিলেন উমাইয়া বিনতে আবদুল মোত্তালিব। তাঁর ১ম বিবাহ হয়েছিল রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আযাদকৃত গোলাম যায়েদ বিন হারিসের (রাঃ) সাথে। নবীর নির্দেশে বিবাহ সম্পন্ন হলেও অসমতা ও গোত্রীয় কৈলন্যবোধের কারণে বিবাহ বেশীদিন স্থায়ী হয়নি। যায়েদ (রাঃ) তাঁকে তালাক দেন।
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মনঃক্ষুন্ন তালাক প্রাপ্তা যয়নবকে (রাঃ) বিবাহ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। এ বিবাহের উদ্দেশ্য ছিল দু'টি (ক) হযরত যয়নবের (রাঃ) ক্ষোভ ও ক্ষেদের অবসান (খ) দত্তক পুত্র ঔরশজাত পুত্র হওয়ার ভ্রান্ত ধারণা নিরসন।
সেকালে পালক পুত্রকে আপন পুত্র মনে করা হতো। এটা ছিল কাহিনী ও ভ্রান্ত ধারণা। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পালক পুত্রের তালাক প্রাপ্তা স্ত্রীকে বিবাহ করে এ ধারণা বিলোপ করেন। কেননা আপন পুত্র হলে তাঁকে বিবাহ করা জায়েজ হতো না। এ পর্যায়ে আয়াত নাযিল হয়-
مَا كَانَ مُحَمَّd أَبَا أَحَدٍ مِنْ رِجَالِكُمْ وَلَكِنْ رَسُولَ اللَّهِ وَخَاتَمَ النَّبِيِّينَ *
“তোমাদের পুরুষদের মধ্যে মুহাম্মদ কারো পিতা নন বরং তিনি আল্লাহর রাসূল এবং শেষ নবী।” 66
মহান আল্লাহ আরো বলেছেন-
فَلَمَّا قَضَى زَيْدٌ مِنْهَا وَطَراً زَوَّجْنَكَهَا لِكَيْ لَا يَكُونَ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ حَرَجٌ فِي أَزْوَاجِ أَدْعِيَائِهِمْ إِذَا قَضَوْ مِنْهُنَّ وَطَرًا - وَكَانَ أَمْرُ اللَّهِ مَفْعُولاً *
“অতঃপর যায়েদ যখন তার কাছ যায় না থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করে নিল, তখন আমি তাকে তোমার কাছে বিয়ে দিলাম। যাতে প্রয়োজন পূরণ করার পর মুখ ডাকা পুত্রের স্ত্রীদের ব্যাপারে মুমিনদের উপর কোনো দোষারোপ করা না চলে। আল্লাহ্র ইচ্ছা তো পূর্ণ হবেই। (আহযাব: ৩৭)
হযরত ওমর (রাঃ)-এর শাসনামলে ২০ হিজরী সনে ৫৩ বৎসর বয়স কালে হযরত যয়নব বিনতে জাহাশ (রাঃ) ইহধام ত্যাগ করেন। হযরত ওমর (রাঃ) তাঁর সালাতুল জানাযায় ইমামতি করেন। জান্নাতুল বাকিতে তিনি শুয়ে আছেন। ১১টি হাদীস তাঁর থেকে বর্ণিত আছে।
(৮) হযরত যুবাইরিয়াহ বিনতে হারিস (রাঃ)ঃ নবীপত্নী যুবাইরিয়াহর (রাঃ) নাম ছিল বারা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ নাম পরিবর্তন করে রাখেন যুবাইরিয়াহ। তিনি গোত্র নেতার কন্যা ছিলেন। ৫ হিজরী সনে বনু মোস্তালিক যুদ্ধে গনীমতের মাল হিসেবে বন্দী হয়ে নীত হন। বন্টনে তিনি সাবিত বিন কয়েসের ভাগে পড়েন। দাসত্ব জীবন ছিল তাঁর জন্যে অপমানজনক। তাই তিনি মুদ্রার বিনিময়ে মুক্ত হতে চাইলেন। রাসূল তাঁকে ক্রয় করতঃ মুক্ত করে দেন এবং স্বীয় স্ত্রীরূপে গ্রহণ করেন।
এদিকে যুবাইরিয়ার (রাঃ) গোত্র নেতা বারা কন্যার বন্দী হওয়ার কথা শুনে কয়েকটি উট বোঝাই সম্পদ নিয়ে মদীনায় উপস্থিত হোন। কন্যা নবী পত্নি হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছেন এবং পথিমধ্যে নবীর আশ্চর্যজনক ঘটনায় অভিভূত হয়ে তিনি ইসলাম গ্রহণ করে কন্যাকে দেখে খুশি মনে গৃহে ফিরে যান।
হযরত যুবাইরিয়াহ (রাঃ) লাজুক প্রকৃতির ও সুন্দর আকৃতি সম্পন্ন ছিলেন। দৈহিক গড়ন ছিল চমৎকার, স্বভাব ছিল নমনীয়। চেহারা ছিল শ্রদ্ধা মিশ্রিত কান্তিময়। অধিকাংশ সময় ইবাদতে কাটাতেন। হিজরী ৫০ সনে ৬৫ বৎসর বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন। মদীনার তৎকালীন শাসক মারওয়ান ইবনুল হাকام তাঁর সালাতুল জানাযায় ইমামতি করেন। জান্নাতুল বাকিতে তিনি চিরনিদ্রায় শুয়ে আছেন।
(৯) হযরত উম্মে হাবীবাহ (রাঃ):
আবু সুফিয়ানের (রাঃ) কন্যা উম্মে হাবীবাহর (রাঃ) আসল নাম 'রামলা'। তবে তিনি 'উম্মে হাবীবাহ' উপনামে খ্যাত ছিলেন।
উম্মে হাবীবাহ (রাঃ) প্রথমতঃ যয়নব বিনতে জাহাশের (রাঃ) ভাই ওবায়দুল্লাহর সাথে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হোন। তারা উভয়েই হাবশায় হিজরত করেন। পরবর্তিতে ওবায়দুল্লাহ ধর্মান্তরিত হয়ে খৃষ্টান হয়ে যায়। ফলে স্বামীর সাথে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
উম্মে হাবীবাহর (রাঃ) নিঃসগ্ন জীবনে সঙ্গ দেয়ার উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বিবাহ করার প্রস্তাব দিলে তিনি সানন্দে গ্রহণ করেন। ৪শ দিনার মহরানা ধার্য করে বিবাহ সম্পন্ন করা হয়।
তিনি খুব নরম স্বভাবের লোক হওয়া সত্ত্বেও ঈমানী চেতনায় ছিলেন প্রদীপ্ত। পিতা আবু সুফিয়ানকে ইসলাম গ্রহণের আগ পর্যন্ত রাসূলের বিছানায় বসার সময় বিছানা উল্টে দিতেন। কারণটা তিনি নিজেই বললেন: একজন মুশরিকের (স্বীয় পিতা) নবীর বিছানায় বসা আমি পছন্দ করি না। ঈমানী চেতনায় তেজোদীপ্ত একটি হৃদয় থেকে এরূপ কথারই বহিপ্রকাশ ঘটে থাকে। হিজরী ৫৪ সালে ৭৩ বৎসর বয়স কালে তিনি ইহধাম ত্যাগ করেন।
(১০) হযরত সাফিয়াহ বিনতে হুইয়াহ (রাঃ):
সাফিয়াহর পিতা ছিলেন হুইয়াহ বিন আখতাব। পিতা ও দাদা ইহুদী সম্প্রদায়ের শীর্ষস্থানীয় নেতা ছিলেন। খায়বার যুদ্ধে মুসলমানদের কাছে ইহুদী ও মুশরিকগণ পরাজিত হলে অন্যান্যদের ন্যায় হযরত সাফিয়াহ বন্দী হোন। এ যুদ্ধে তার পূর্ব স্বামী কিনান বিন অকাল নিহত হয়।
যুদ্ধলব্ধ মালামাল বণ্টনের সময় দাহিয়া কালবী (রাঃ) একজন দাসীর প্রয়োজনীয়তার কথা রাসূলের কাছে ব্যক্ত করলে তিনি তার পছন্দ মতো একজনকে বেছে নেয়ার অনুমতি প্রদান করেন। দাহিয়া (রাঃ) সাফিয়াকে পছন্দ করেন। সাফিয়াহ (রাঃ) কৌলিন্য ও মর্যাদার দিক থেকে দাহিয়া (রাঃ) সাথে সামঞ্জস্যশীল না হওয়ার কথা উপস্থিত সাহাবাগণ ব্যক্ত করলেন এবং তাঁকে খোদ রাসূলের জন্যই মানানসই বলে অভিমত প্রকাশ করেন। সাহাবাগণের পরামর্শের ভিত্তিতে হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বিবাহ করেন। তিনি ছিলেন বুদ্ধিমতী, মর্যাদাবান ও ধৈর্য্যশীলা। ৬০ বৎসর বয়সে ৫০ হিজরী সনে তিনি ইন্তেকাল করেন। জান্নাতুল বাকীতে তাকে দাফন করা হয়।
(১১) হযরত মাইমুনাহ বিনতে হারিস (রাঃ)ঃ
হযরত মাইমুনাহ (রাঃ) ছিলেন হারিস বিন হামযার কন্যা। তাঁর ১ম বিবাহ হয় মাসউদ বিন আমরের সাথে। কোন কারণে তাদের মধ্যে ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। ২য় বিবাহ হয় আবু রেহেমের সাথে। ৭ম হিজরী সনে ২য় স্বামীর মৃত্যু হয়।
৭ম হিজরীতে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওমরার উদ্দেশ্যে মদীনা থেকে মক্কায় রওয়ানা হোন। এ সময় চাচা আব্বাসের (রাঃ) অনুরোধক্রমে তিনি মাইমুনাকে বিবাহ করেন। এটাই ছিল রাসূলের শেষ বিবাহ।
তিনি আল্লাহর আদেশ নিষেধ পালনে ছিলেন খুবই হুশিয়ার। এ ব্যাপারে তিনি কখনো কাউকে ছাড় দিতেন না। আত্মীয়-স্বজনদের সাথে তিনি সদ্ভাব বজায় রেখে চলতেন।
৫১ হিজরী সনে তিনি ইহলোক ত্যাগ করেন। যে স্থানে তাঁর বিয়ের অনুষ্ঠান হয়েছিল সেখানেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
📄 তের. শব্দের তাৎপর্য ও রাসূলের সন্তানদের পরিচয়
ذُرِّيَّة ذُرِّيَّةٌ শব্দটির উৎপত্তি সম্পর্কে কয়েকটি উক্তি আছে। শব্দটির মূলশব্দ হলো ذريئه শেষ অক্ষরে ব্যবহৃত "" (হামযাহ) অক্ষরটি কাঠিন্যের কারণে রহিত হয়ে যায়। ফলে শব্দটি ذُرِّيَّة তে রূপান্তরিত হয়। ذريئه শব্দটির ذُرِّيَّة অর্থে প্রযোজ্য। ذَرَأَ অর্থ ছড়ানো-ছিটানো। যেমন- বলা হয় ذَرَأَ الله الْخَلَىَ অর্থাৎ আল্লাহ্ তায়ালা সৃষ্টি জীবকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দিয়েছেন কিংবা প্রকাশ করেছেন। ভাষাবিদগণ এ ব্যাপারে ঐক্যমত প্রকাশ করেছেন যে, ذُرِّيَّة শব্দটি ছোট বড় সব ধরনের সন্তান-সন্ততিদের জন্যে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। যেমন কুরআনে আছে-
وَإِذِ ابْتَلَى إِبْرَاهِيمَ رَبُّهُ بِكَلِمَاتٍ فَأَتَمَهُنَّ قَالَ إِنِّي جَاعِلُكَ لِلنَّاسِ إِمَا مَا قَالَ وَمِنْ ذُرِّيَّتِي *
অর্থাৎ যখন ইব্রাহিম আলাইহিস সালামকে তাঁর রব কয়েকটি কথা দ্বারা পরীক্ষা করলেন, তখন তিনি সেগুলো সম্পন্ন করলে আল্লাহ্ বললেন, আমি তোমাকে লোকগণের ইমাম (নেতা) বানালাম। ইব্রাহীম (আঃ) বললেন : আমার আওলাদ ফরবন্দ থেকেও ...... (বাকারাহ ১: ২৪)
সূরায়ে আলে ইমরানের ৩৩-৩৪ আয়াতে আছে- إِنَّ اللهَ اصْطَفَى آدَمَ وَنُوحًا وَآلَ إِبْرَاهِيمَ وَآلَ عِمْرَانَ عَلَى الْعَالَمِينَ : ذُرِّيَّةٌ بَعْضُهَا مِنْ بَعْضٍ - وَاللهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ *
সূরায়ে আনআমের ৮৭নং আয়াতে আছে- وَمِنْ أَبَائِهِمْ وَذُرِّيَّاتِهِمْ وَإِخْوَانِهِمْ وَاجْتَبَيْنَهُمْ وَهَدَيْنَاهُمْ إِلَى صِرَاطٍ مُسْتَقِيمٍ *
সূরায়ে ইসরার ২ ও ৩ আয়াতে আল্লাহ বলেছেন-
وَآتَيْنَا مُوسَى الْكِتَابَ وَجَعَلْنَاهُ هُدًى لِبَنِي إِسْرَائِيلَ أَنْ لَّا A تَتَّخِذُوا مِنْ دُونِي وَكِيلًا ، ذُرِّيَّةَ مَنْ حَمَلْنَا مَعَ نُوحٍ إِنَّهُ كَانَ عَبْدًا شَكُوراً * و ساتو
উপরে বর্ণিত আয়াতগুলোতে ذُرِّيَّةٌ শব্দ দ্বারা সন্তান-সন্ততি আওলাদ ফরযন্দকে বুঝানো হয়েছে।
وستو ذُرِّيَّةٌ শব্দটি أَبَاء (বাপ-দাদা) এর অর্থে প্রযোজ্য হতে পারে কিনা এনিয়ে মতানৈক্য আছে। কিছু লোক বলছেন, ذُرِّيَّةٌ শব্দটি أب শব্দে অর্থে অর্থাৎ বাপ-দাদার অর্থে প্রয়োগ হতে পারে।
وستو ভাষাবিদগণের একদল লোক বলেন- এরূপ ভাবার্থ প্রয়োগ করা ঠিক নয়। ذُرِّيَّةٌ শব্দটি মূলতঃ বংশ, সন্তান এবং পশ্চাতে আগমনকারী অর্থে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। যদি ذُرِّيَّةٌ শব্দটির দ্বারা أَبَاء বুঝা যেতো তাহলে A آبَاء ذُرِّيَّةٌ وَمِنْ آبَائِهِمْ وَذُرِّيَّاتِهِم ... Palais ace শব্দের প্রয়োগ হতো না।
কারো মতে, নসবনামা বা বংশ তালিকার উর্ধ্বতন তিন পুরুষ এবং অধঃস্তন তিন পুরুষ পর্যন্ত ذرة এর মধ্যে গণ্য।
ww ذُرِّيَّةُ শব্দটি দ্বারা اَوْلَادُو أَوْلَادِهِمْ ছেলে সন্তান ও তদীয় ছেলে সন্তান হওয়ায় মেয়ে সন্তানের সন্তান এর অন্তর্ভুক্ত হবে কিনা এনিয়ে মতভেদ রয়েছে। ইমাম শাফেয়ী (রঃ) বলেছেন- মেয়ে সন্তান ও ذُرِّيَّة এর অন্তর্ভুক্ত। ইমাম আবু হানীফা (রঃ) বলেছেন- মেয়ে সন্তানের সন্তান ম এর অন্তর্ভুক্ত নয়।
📄 চৌদ্দ. ইব্রাহীম এবং আলে ইব্রাহীমের তাৎপর্য
উম্মতে মোহাম্মদীর জন্যে নির্দেশিত দুরূদে আমরা দেখতে পাই, ইব্রাহীম এবং আলে ইব্রাহীমের উল্লেখ আছে এভাবে-
كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ *
অতএব ইব্রাহীম এবং আলে ইব্রাহীম সম্পর্কে ধারণা থাকা বাঞ্চনীয়। إِبْرَاهِيم শব্দ টি সুরইয়ানী ভাষা। শব্দটির অর্থ اَبُ رَحِيمُ মহান আল্লাহ্ তাঁকে সারা বিশ্বের তৃতীয় পিতা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। ১ম পিতা হচ্ছেন আদম (আঃ) এবং ২য় পিতা হচ্ছেন নূহ (আঃ)। সারাবিশ্বের মানবমণ্ডলী তাদের বংশোদ্ভূত। যেমন আল্লাহ্ বলেছেন-
وَجَعَلْنَا ذُرِّيَّتَهُ هُمُ الْبَاقِينَ *
“এবং তাঁর বংশধরদেরকেই আমি অবশিষ্ট রেখেছিলাম।” (সাফ্ফাতঃ ৭৭) যারা নূহ আলাইহিস্ সালামকে ও তাঁর বংশধরদেরকে চিনেনা কিংবা তুফানের ধ্বংসলীলার পর তাঁর বংশধরদের সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ার কথা অস্বীকার করতে চায় অত্র আয়াতটি তাদের ধারণা অসাড় হওয়ার প্রমাণ।
ইব্রাহীম আলাইহিস্ সালাম হচ্ছেন ৩য় পিতা। তিনি عَمُودُ الْعَالَمِ “বিশ্বের খুঁটি” إِمَامُ الْحُنَفَا "সত্যের অধিনায়ক" خَلِيلُ الرَّحْمَنِ “রহমানের অন্তরঙ্গ বন্ধু” شَيْخُ الْأَنْبِيَاءِ "নবীগণের গুরু” ইত্যাকার উপাধীতে ভূষিত ছিলেন। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আল্লাইহি ওয়া সাল্লামকে অন্য কোনো নবীর মিল্লাত (দল, দ্বীন)-কে অনুসরণ করতে বলা হয়নি। বলা হয়েছে কেবলমাত্র মিল্লাতে ইব্রাহীমকে অনুসরণ করার জন্যে। যেমন আল্লাহ বলেছেন-
ثُمَّ أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ أَنِ اتَّبِعُ مِلَّةَ إِبْرَاهِيمَ حَنِيفًا وَمَا كَانَ مِنَ الْمُشْرِكِينَ *
তাঁরপর আমি তাঁকে (মোহাম্মদ) এ কথার আহবান করলাম যে, ইব্রাহীমের মিল্লাতকে অনুসরণ কর, তিনি ছিলেন একনিষ্ঠ, তিনি মুশরিক ছিলেন না।” (নাহল : ১২৩)
উম্মতে মোহাম্মদীকে ইব্রাহীম আলাইহিস সালামের মিল্লাতকে অনুসরণ করার নির্দেশ দেয়া হলো। আল্লাহ্ এ সম্পর্কে বললেন-
هُوَ اجْتَبَاكُمْ وَمَا جَعَلَ عَلَيْكُمْ فِي الدِّينِ مِنْ حَرَجٍ - مِلَّةَ أَبِيكُمْ إِبْرَاهِيمَ - هُوَ سَمَّاكُمُ الْمُسْلِمِينَ مِنْ قَبْلُ ....
তিনি তোমাদেরকে পছন্দ করেছেন এবং ধর্মের ব্যাপারে তোমাদের উপর কোনো সংকীর্ণতা রাখেননি। তোমরা তোমাদের পিতা ইব্রাহিমের মিল্লাতের উপর কায়েম থাক। তিনিই তোমাদের নাম মুসলমান রেখেছেন এর আগেও ...... (হজ্জ: ৭৮)
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সাহাবীগণকে উপদেশ দিয়ে বলতেন- তোমরা সকাল-সন্ধ্যায় বল-
أَصْبَحْنَا عَلَى فِطْرَةِ الْإِسْلَامِ وَكَلِمَةِ الْإِخْلَاصِ، وَدِينِ نَبِيِّنَا مُحَمَّd وَمِلَّةِ أَبِيْنَا إِبْرَاهِيمَ حَنِيفًا مُسْلِمًا وَمَا كَانَ مِنَ الْمُشْرِكِينَ *
مِلَّةِ إِبْرَاهِيمَ كَلِمَةُ الْإِخْلَاصِ، فِطْرَةُ الْإِسْلَامِ
অর্থাৎ ইসলামের স্বাভাবিকতা, একনিষ্ঠ কালিমাহ্ এবং দ্বীনে ইব্রাহীমের কথা উল্লেখ রয়েছে। ফিত্রাতে ইসলাম বলতে আল্লাহ্ তায়ালা যে স্বাভাবিকতার উপর মানব জাতিকে সৃষ্টি করেছেন তা বুঝায়। কালিমাতুল ইসলাম বলতে شَهَادَةٌ أَنْ لَّا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ অর্থাৎ আল্লাহর একত্ববাদের সাক্ষ্য দেয়া বুঝায়। আর মিল্লাতে ইব্রাহীম বলতে দ্বীনের ধারক-বাহক (صَاحِبُ الْمِلَّةِ) বুঝায়। বস্তুতঃ আমাদের নবী তথা সমগ্র নবীর দ্বীনের মূলতঃ একই আওয়াজ, এক উদ্দেশ্য ও অভিন্ন লক্ষ্য। বিশ্বব্যাপী সমস্ত নবী-রাসূলগণ আল্লাহর একত্ববাদের প্রতি মানুষকে আহবান জানিয়েছেন। তাঁর কোনো শরীক না থাকা, একক ও একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারে বিশ্বাস স্থাপন করা এবং সর্বোপরি তাঁর আনুগত্য করা, মানুষের মুখ্য উদ্দেশ্য হওয়া ইত্যাদির প্রতি ডাক দেয়া এবং বাস্তবায়ন করাই ছিল তাদের লক্ষ্য। আল্লাহ্ তায়ালা সূরায়ে নাহলের ১২০-১২২ আয়াতে ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম সম্পর্কে আরো বলেছেন-
إِنَّ إِبْرَاهِيمَ كَانَ أُمَّةٌ قَانِتَا لِلَّهِ حَنِيفًا - وَلَمْ يَكُ مِنَ الْمُشْرِكِينَ - شَاكِرًا لِأَنْعُمِهِ اجْتَبَاهُ وَهَدَاهُ إِلَى صِرَاطٍ مُسْتَقِيمٍ - وَآتَيْنَاهُ فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَإِنَّهُ فِي الْآخِرَةِ لَمِنَ الصَّالِحِينَ *
"নিশ্চয়ই ইব্রাহীম ছিলেন এক সম্প্রদায়ের প্রতীক, আল্লাহ্র জন্যে একনিষ্ঠ এবং তিনি অংশীবাদীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না। বরং তিনি ছিলেন নেয়ামতের শুকরগুজার ব্যক্তি। আল্লাহ্ তাঁকে মনোনীত করেন এবং সহজ পথে পরিচালিত করেন। আমি তাঁকে দুনিয়াতে কল্যাণ দান করেছি এবং তিনি আখিরাতে নেককার লোকদের অন্তর্ভুক্ত হবেন।”
আয়াতে হযরত ইব্রাহিম আলাইহিস্ সালামকে 'উম্মত', 'ইমাম', 'কানিত', হানীফ', 'শাকির', 'হাদী', 'সালিহ্' ইত্যাকার উপধীতে বিভূষিত করা হয়েছে। উম্মত শব্দের অর্থ দল, সম্প্রদায়। শব্দটি জাতির অনুসৃত নেতা, যাবতীয় গুণরাজির আঁধার। অর্থাৎ ইব্রাহীম 'আলাইহিস সালাম একাই এক ব্যক্তি, এক সম্প্রদায় এবং কওমের গুণাবলী ও শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী ছিলেন।
قَانِتُ 'কানিত' শব্দের অর্থ আজ্ঞাবহ। ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম উভয় ক্ষেত্রে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ছিলেন। অনুসৃত একারণে যে, বিশ্বের প্রসিদ্ধ ধর্মাবলম্বীগণ একবাক্যে তাঁকে সম্মান করে। মুসলমান তো বটেই ইহুদী, খ্রীষ্টান, এমনকি মুশরিক ও অবিশ্বাসীগণও তাঁর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও অন্যান্য গুণাবলীর প্রশংসা করে থাকে। নমরূদের আগুন পরীক্ষা, জন-মানবশূন্য অরণ্যে পরিবার-পরিজনকে একাকী ছেড়ে আসার নির্দেশ, অনেক আশা-আকাংখার প্রতীক পুত্র ইসমাঈলকে কুরবানী করার নির্দেশ পালন এসব স্বাত্যন্ত্র গুণাবলীর কারণেই আল্লাহ্ তায়ালা তাকে উপরোক্ত উপাধিতে ভূষিত করেন এবং 'খলীল' বা একনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে সারা বিশ্বে খ্যাত ও পরিচিত হয়ে আছেন।
ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম আমাদের জাতির পিতা হিসেবে স্বীকৃত। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা, মহব্বত ও সম্মান প্রদর্শন করতেন।
হযরত আনাস বিন মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন-
جَاءَ رَجُلٌ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ : يَا خَيْرَ الْبَرِيَّةِ : فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : ذَلِكَ إِبْرَاهِيمُ *
'এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে বললো- يَا خَيْرَ الْبَرِيَّةِ 'হে দুনিয়ার সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তি! তখন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন- তিনি হচ্ছেন ইব্রাহীম (আঃ)" (মুসলিম: ২৩২৯, আবু দাউদ: ৪৬৭২, তিরমিযি: ৩৪৯)
বুখারী মুসলিম হাদীস গ্রন্থদ্বয়ে আছে- ইবনে আব্বাস (রাঃ) রাসূলুল্লাহু সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, রাসূল (সাঃ) বলেছেন-
إِنَّكُمْ مُحْشَرُونَ حُفَاةً عُرَاةٌ غَرْلًا ، ثُمَّ قَرَاءَ كَمَا بَدَانَا أَوَّلَ خَلْقٍ تُعِيدُهُ وَعْدًا عَلَيْنَا إِنَّا كُنَّا فَاعِلِينَ وَأَوَّلُ مَنْ يُكْسَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ إِبْرَاهِيمَ *
"তোমরা হাশরের মাঠে উলঙ্গ হয়ে উত্থিত হবে।” তারপর তিনি কুরআনের এ আয়াত পাঠ করলেন।
তোমাদেরকে প্রথমে যেভাবে আমি সৃষ্টি করেছি সেভাবে পুনরায় সৃষ্টি করব। আমার ওয়াদা নিশ্চিত। আমাকে তা পূরণ করতেই হবে।” কিয়ামত দিবসে ইব্রাহীম আলাইহিস সালামকেই সর্বপ্রথম কাপড় পড়ানো হবে।” (বুখারী (ফাতহুল বারী ৮/৪৭৪০ মুসলিম, ২৮৬০)
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বীয় পৌত্র হাসান ও হোসাইন (রাঃ)-দের জন্যে দোয়া করে বলতেন-
إِنَّ أَبَاكُمَا كَانَ يَعُوذُ بِهِمَا إِسْمَاعِيلَ وَإِسْحَاقَ : أَعُوذُ بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّةِ مِنْ كُلِّ شَيْطَانٍ وَهَامَّةٍ وَمِنْ كُلِّ عَيْنٍ لَامَّةٍ *
তোমাদের বাবা ইব্রাহীম (আঃ) স্বীয় পুত্র ইসমাঈল ও ইসহাকের (আঃ) জন্যে বলতেন : আমি আল্লাহর পূর্ণ নামের উপর ভরসা করে সব ধরনের শয়তানী অনিষ্ট থেকে এবং সব ধরনের চোখ লাগা থেকে আশ্রয় চাই।” (বুখারী [ফাতহুল] : ৬/৩৩৭১)
ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম ছিলেন ১ম অতিথি (মানববেশী ফেরেশতা) আপ্যায়ণকারী, ১ম খৎনাকারী, ১ম বার্ধক্য দর্শনকারী। বার্ধেক্যের ছাপ দেখার পর তিনি জিজ্ঞেস করলেন- مَا هَذَا يَارب؟ হে পরওয়ারদেগার তা কি? আল্লাহ্ বললেন- وَقَارُ, সম্মান, মর্যাদা। ইব্রাহীম (আঃ) বললেন- رَبِّ زِدْنِی وَقَارًا, পরওয়ার দেগার! আমার ইজ্জত সম্মান বাড়িয়ে দাও।”
আল্লাহ্ তায়ালা এ সম্পর্কে বলেন- هَلْ أَتَاكَ حَدِيثُ ضَيْفِ إِبْرَاهِيمَ الْمُكْرَمِينَ - إِذْ دَخَلُوا عَلَيْهِ فَقَالُوا سَلَامًا - قَالَ سَلَامٌ قَوْمٌ مُنْكَرُونَ - فَرَاغَ إِلَى أَهْلِهِ فَجَاءَ بِعِجْلٍ سَمِينٍ - فَقَرَّبَةٌ إِلَيْهِ قَالَ أَلَا تَأْكُلُونَ *
“তোমার কাছে সম্মানিত মেহমানদের আগমণের বৃত্তান্ত এসেছে কি? যখন তাঁরা তাঁর কাছে উপস্থিত হয়ে সালাম নিবেদন করলেন, তখন তিনিও সালাম পেশ করলেন। তাঁরা ছিলেন অপরিচিত। তারপর তিনি ঘরে নিয়ে গিয়ে একটি মোটা বকরী মেহমানদের আপ্যায়নের উদ্দেশ্য নিয়ে এসে পরিবেশন করলেন। তিনি বললেন, আপনারা আহার করছেন না কেন?” (যারিয়াতঃ ২৪, ২৭)
ইব্রাহীম আলাইহিস্ সালামের কর্তব্যপরায়ণতা সম্পর্কে আল্লাহ্ আরো বলেছেন- أَمْ لَمْ يُنَبَّاءُ بِمَا فِي صُحُفِ مُوسَى وَإِبْرَاهِيمَ الَّذِي وَفَّى *
“অথবা তাকে কি মুসার কিতাবে যা আছে সে সম্পর্কে অবহিত করা হয়নি এবং ইব্রাহিমের কিতাবে, যিনি তার দায়িত্ব পূর্ণ করেছিলেন।” (নাজম: ৩৬, ৩৭)
হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস্ সালামের উপর যেসব দায়িত্ব অর্পিত হয়েছিল তা তিনি পরিপূর্ণ করেছিলেন এবং যেসব পরীক্ষার মুখোমুখী হয়েছিলেন সেসব পরীক্ষায় তিনি সফলতার সাথে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। আয়াতটি এ কথার স্পষ্ট দলিল।
তাঁর সম্পর্কে রাসূলুল্লাহু সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
قَلْبُهُ لِلرَّحْمَنِ وَوَلَدُهُ لِلْقُرْبانِ، وَبَدَنَهُ لِلنِّيرَانِ وَمَالُهُ لِلضَّيفان *
অর্থাৎ তাঁর হৃদয় ছিল রহমানের জন্যে, তাঁর ছেলে ছিল কুরবানীর জন্য, তাঁর দেহ ছিল আগুনের জন্যে এবং তাঁর ধন-সম্পদ ছিল অতিথিদের জন্যে নিবেদিত।
তিনিই তো বাইতুল্লাহ্ বানিয়েছেন, হজ্জের জন্যে দুনিয়াবাসীকে আহবান করেছেন। সেই শত সহস্র বৎসর আগ থেকে আরম্ভ করে আজ পর্যন্ত যারা হজ্জ করেন, ওমরা করেন তাদের সমপরিমাণ অতিরিক্ত নেকী তাঁর আমলনামায় জমা হচ্ছে। তাঁর পুণ্য স্মৃতি ও অমর কীর্তি অক্ষুন্ন ও অমর রাখার জন্যে আল্লাহ্ বললেন-
وَإِذْ جَعَلْنَا الْبَيْتَ مَثَابَةً لِلنَّاسِ وَآمَنَا وَاتَّخِذُو مِنْ مَّقَامِ إِبْرَاهِيمَ مُصَلَّى *
“যখন আমি কাবাগৃহকে মানুষের জন্যে সম্মিলিত স্থান ও শান্তির আলয় করলাম, আর তোমরা ইব্রাহীমের দাঁড়ানো জায়গাকে নামাজের জায়গা বানাও।” (বাকারাহ: ১২৫)
ইব্রাহীম আলাইহিস্ সালামের অবদান, বদান্যতা, আনুগত্য সম্পর্কে মহান আল্লাহ্ আরো বললেন--
وَإِذْ قَالَ إِبْرَاهِيمُ رَبِّ اجْعَلْ هَذَا بَلَدًا مِنَّا وَارْزُقْ أَهْلَهُ مِنَ الثَّمَرَاتِ *
“যখন ইব্রাহীম বললেন, পরওয়ারদেগার! এ স্থানকে তুমি শান্তিধাম কর, এবং এর অধিবাসীদের মধ্যে যারা আল্লাহ্ ও কিয়ামতে বিশ্বাস করে তাদেরকে ফলের দ্বারা রিযক দান কর, আল্লাহ বলেন- যারা অবিশ্বাস করে আমি/তাদেরকেও কিছুদিন ফায়দা ভোগ করার সুযোগ দিব। অতঃপর তাদেরকে বল প্রয়োগে শাস্তিতে ঠেলে দিব, সেটা খুবই নিকৃষ্টস্থান।” (বাকারাহ: ১২৬)
ইব্রাহীম আল্লাইহিস্ সালাম কাবা ঘরের ভিত্তি প্রস্তরের পর আল্লাহ্র কাছে দোয়া করলেন এভাবে-
وَإِذْ يَرْفَعُ إِبْرَاهِيمُ الْقَوَاعِدَ مِنَ الْبَيْتِ وَإِسْمَاعِيلُ : رَبَّنَا تَقَبَّلْ مِنَّا إِنَّكَ أَنْتَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ - رَبَّنَا وَاجْعَلْنَا مُسْلِمَيْنِ لَكَ وَمِنْ ذُرِّيَّتِنَا أُمَّةٌ مُسْلِمَةٌ لَكَ وَارِنَا مَنَاسِكَنَا وَتُبْ عَلَيْنَا إِنَّكَ أَنْتَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ - رَبَّنَا وَابْعَثْ فِيهِمْ رَسُولًا مِّنْهُمْ يَتْلُوا عَلَيْهِمْ آيَاتِكَ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَيُزَكِّيهِمْ إِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ *
স্মরণ কর, যখন ইব্রাহীম ও ইসমাঈল কাবা ঘরের ভিত্তি প্রস্তর করছিল। তখন তারা দোয়া করেছিল, পরওয়ারদেগার! আমাদের পক্ষ থেকে কবুল কর। নিশ্চয়ই তুমি শ্রবণকারী, সর্বজ্ঞ। পরওয়ারদেগার! আমাদের উভয়কে তোমার আজ্ঞাবহ কর এবং আমাদের বংশধর থেকেও একটি অনুগত দল সৃষ্টি কর। আমাদেরকে হজ্জের নীতিসমূহ বলে দাও এবং আমাদেরকে ক্ষমা কর। নিশ্চয়ই তুমি তওবাহ কবুলকারী। হে পরওয়ারদেগার! তাদের মধ্য থেকেই তাদের নিকট একজন রাসূল প্রেরণ করুন। যিনি তাদের কাছে তোমার আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করবেন, তাদেরকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দিবেন এবং তাদেরকে পবিত্র করবেন। নিশ্চয়ই তুমি পরাক্রমশালী কৌসুলী। (বাকারা: ১২৭-১৩০)
মহান আল্লাহর উপরোক্ত বাণীসমূহে হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস্ সালামের কাবা ঘরের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করা, অধিবাসীদের জীবিকার ব্যবস্থাপনা, শহরকে নিরাপদ রাখা, হজ্জের আহকাম সম্পর্কে অবহিত হওয়া, পরবর্তী পর্যায়ে নবী প্রেরণ করার আবেদন, প্রেরিত নবীর কার্যাবলীর বিশদ বিবরণ ফুটে উঠেছে। যে নবী নিজের সময়ের এবং পরবর্তীতে আগত উম্মতের দিক দর্শন সম্পর্কে একবার অবদান রাখেন তাঁকে স্মরণীয় ও বরণীয় রাখার উদ্দেশ্যে আল্লাহ্র ব্যবস্থাপনা খুবই যুক্তিসংগত। 'মাকামে ইব্রাহীম' 'সাফা-মারওয়ার সায়ী' মিনায় তথা সারাবিশ্বে পশু কোরবানী করার হাজার হাজার বছরব্যাপী ধর্মীয় প্রথা ইব্রাহীম আলাইহিস সালামের পুণ্য স্মৃতির বাস্তব নিদর্শন।
অপরদিকে আল্লাহ্র রাসূল স্বীয় প্রভুর নির্দেশে তাঁর উপর দুরূদ পাঠের সাথে ইব্রাহীম (আঃ) ও তাঁর বংশধরদের সংশ্লিষ্ট করে কিয়ামত পর্যন্ত তাঁকে স্মরণ ও বরণ করার প্রক্রিয়া তৈরি করেন যা যথার্থ ও পূর্ণাংগ সম্মান প্রদর্শনের মূর্ত প্রতীকরূপে গৃহীত ও স্বীকৃত।
📄 পনের. “আল্লাহুম্মা বারিক আলা মোহাম্মাদ ওয়া আলা আলি মোহাম্মদ” -এর অর্থ ও তাৎপর্য
البركة শব্দের মূল অর্থ দৃঢ়, প্রতিষ্ঠিত, স্থির থাকা। কোনো বস্তু দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করলে বলা হয় فَقَدْ بَرَكَ উটের সংখ্যা বেশি হওয়াকে البرك বলা হয়। আবার البرك শব্দের অর্থ- জলাশয়।
অপরদিকে البركة শব্দের অর্থ হলো কল্যাণ, মংগল, প্রাচুর্য, বাড়ন্ত। التبْرِيكُ শব্দের অর্থ বরকত বা কল্যাণ প্রাচুর্যের জন্যে দোয়া করা। যেমন- وَبَارَكَ لَهُ - وَبَارَكَ عَلَيْهِ - وَبَارَكَ فِيهِ - بَارَكَهُ الله কুরআনেও শব্দটির ব্যবহার আছে-
١. أَنْ بُورِكَ مَنْ فِي النَّارِ وَمَنْ حَوْلَهَا *
٢. بَارَكْنَا عَلَيْهِ وَعَلَى إِسْحَاقَ *
٣. بَارَكْنَا فِيهَا *
উপরোক্ত আয়াতগুলোতে بَارَكَ দ্বারা বরকত কল্যাণ ও মঙ্গলের প্রাচুর্যতা বুঝানো হয়েছে।
হাদীসেও শব্দটির ব্যবহার দেখা যায়। যেমন একটি দোয়ায় লেখা আছে, وَبَارِكْ لِي فِيمَا أَعْطَيْتَ এবং সায়াদ (রাঃ) এর বর্ণিত হাদীসে আছে- بَارَكَ اللهُ لَكَ فِي أَهْلِكَ وَمَالِكَ কল্যাণ-বরকতের প্রাচুর্যতার জন্য কামনা করা বুঝানো হয়েছে। (আহমদ, আবু দাউদ, তিরমিযি, ফাতহুল বারী)
আল্লাহ তায়ালার অপার বরকত ও কল্যাণে যাকে আপ্লুত করা হয়েছে তিনিই হলেন- الْمُبَارَكَ যেমন ঈসা (আঃ) বলেছেন- وَجَعَلَنِي مُبَارَكًا أَيْنَمَا كُنْتُ *
"আমি যেখানেই থাকি তিনি আমাকে বরকতময় করেছেন।” (মারয়াম: ৩১)
আল্লাহ্ তায়ালা তাঁর কিতাব আর কোরআন সম্পর্কে বলেছেন- هَذَا ذِكْرٌ مُّبَارَكَ أَنْزَلْنَاهُ *
"এটি একটি বরকতময় উপদেশ যা আমি নাযিল করেছি।" (আম্বিয়া: ৫০)
আল-কোরআন সম্পর্কে আরো একটি আয়াত হলো- كِتَابُ أَنْزَلْنَاهُ إِلَيْكَ مُبَارَكٌ *
“এটি একটি বরকতময় কিতাব, যা আপনার উপর বরকত হিসেবে অবতীর্ণ করেছি।" (সোয়াদ: ২৯)
আল-কুরআনকে মুবারক বলা সবদিক থেকে যথার্থ হয়েছে। কেননা এ আল্লাহ্র কিতাব মানব-দানব পশু-পাখি, গাছ-তরুলতা-পাতা তথা সমগ্র সৃষ্ট জীবের জন্যে বরকত ও কল্যাণময়।
লক্ষণীয় যে, মহান আল্লাহ নিজের পরিচয়ে مُبَارَكٌ শব্দ ব্যবহার করেননি। বরঞ্চ তাঁর শানে ব্যবহৃত হয়েছে تَبَارَكَ যেমন বলা হয়েছে- إِنَّ رَبَّكُمُ اللَّهُ الَّذِي خَلَقَ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوى عَلَى الْعَرْشِ يُغْشِي اللَّيْلَ النَّهَارَ يَطْلُبُهُ حَثِيثًا والشَّمْسَ وَالْقَمَرَ وَالنُّجُومَ مُسَخَّرَاتٌ بِأَمْرِهِ أَلَا لَهُ الْخَلْقُ والأمرُ - تَبَارَكَ اللَّهُ رَبُّ الْعَالَمِينَ *
"বস্তুতঃ তোমাদের রব সে আল্লাহ্ যিনি আসমান যমিন ৬ দিনে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর স্বীয় সিংহাসনে আরোহণ করেন। যিনি রাতকে দিনের উপর বিস্তার করে দেন। তারপর দিন রাতের পিছনে দৌড়াতে থাকে। যিনি চন্দ্র-সূর্য, তারকাসমূহ সৃষ্টি করেছেন। সবই তাঁর আইন বিধানে বন্দী। সাবধান, সৃষ্টি তাঁরই এবং সার্বভৌমত্বও তাঁর। অপরিসীম বরকতশালী আল্লাহ্ সমগ্র জাহানের মালিক ও লালন-পালনকারী।" (আরাফ: ৫৪)
সূরায়ে ফুরকানের ১ম আয়াতে আছে- تَبَارَكَ الَّذِي نَزَّلَ الْفُرْقَانَ عَلَى عَبْدِهِ لِيَكُونَ لِلْعَالَمِينَ نَذِيرًا *
"বরকতময় তিনি যিনি কুরআন তার বান্দার উপর নাযিল করেছেন যাতে করে দুনিয়াবাসীকে ভয় প্রদর্শন করতে পারে।” (ফুরকান : ১)
সূরায়ে মুল্কে আছে- تَبَارَكَ الَّذِي بِيَدِهِ الْمُلْكُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ *
“তিনি বরকতময় সে সত্ত্বা যার মুঠে সার্বভৌমত্ব। তিনি সবকিছু করতে সক্ষম।" (মুল্ক: ২)
উপরোক্ত আয়াতসমূহে আল্লাহ্ তায়ালা স্বীয় সত্ত্বার শ্রেষ্ঠত্ব বুঝাতে تَبَارَكَ শব্দ ব্যবহার করেছেন। ফোরকানের নাযিল হওয়া, দুনিয়া সৃষ্টি করা, সার্বভৌম ক্ষমতার একচ্ছত্র অধিকারী হওয়া ইত্যাকার বৈশিষ্ট্যগুলো প্রকাশ করতে তিনি تَبَارَكَ শব্দ ব্যবহার করেছেন। সুতরাং বুঝা গেল যে, تَبَارَكَ এবং مُبَارَكَ শব্দদ্বয়ের মধ্যে একটা ফারাক রয়েছে। مُبَارَكَ হচ্ছে যাকে বরকতময় করা হয়েছে। আর تَبَارَكَ হচ্ছে যিনি বরকতময় করার উৎস ও আঁধার। প্রতিটি কল্যাণ, বরকত, প্রাচুর্যতা আল্লাহ্র অধীনে। তিনি যাকে ইচ্ছা করেন কিংবা যার আমল আখলাক, কর্ম তৎপরতা আল্লাহর করুণা, দয়া, রহমত, কল্যাণ পাওয়ার অধিকারী তাকেই মহান আল্লাহ কল্যাণের প্রাচুর্যতায় আপ্লুত করে 'মোবারক' করে তোলেন।
হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণনা করে আবু সালেহ বলেছেনঃ تَبَارَكَ শব্দের অর্থ হচ্ছে تَعَالٰى অর্থাৎ সর্বোচ্চ, মহান, আবু আব্বাস বলেছেন- تَبَارَكَ শব্দের সমার্থক হচ্ছে إرتفع। যার অর্থ উপরে উত্থিত, উন্নত, সমুচ্চ, উত্থাপিত। ইবনুল আনবারী বলেছেন- تَبَارَكَ শব্দের অর্থ হলো تَقَدَّسَ শব্দটির বাংলা তরজমা হলো পবিত্র হওয়া, উৎসর্গীকৃত হওয়া।
হাসান বলেছেন- تَبْجِيُ الْبَرَكَةُ مِنْ قَبْلِهِ- শব্দের অর্থ হলো অর্থাৎ সামনের দিক থেকে বরকত আসা। দাহাক বলেছেন- تَبَارَكَ শব্দের অর্থ عَظَمَ সম্মানিত, মহিমান্বিত। খলিল বিন আহমদ বলেছেন- تَبَارَكَ শব্দের অর্থ مَجْدٌ অর্থাৎ গৌরবান্বিত, উচ্চ প্রশংসিত। হোসাইন বিন ফজল بَارَكَ فِي ذَاتِهِ অর্থাৎ তিনি আপন সত্তায় বরকতময়, وَبَارَكَ مِنْ شَاءَ مِنْ خَلْقِهِ এবং তাঁর সৃষ্ট জীবের মধ্যে যাকে ইচ্ছা বরকত দান করেন। বস্তুতঃ تَبَارَكَ শব্দের এ ব্যাখ্যাটি সবচে সুন্দর। ইবনে আতীয়াহ বলেছেন- تَبَارَكَ শব্দের অর্থ হলো عَظَمَ অর্থাৎ বরকত ও মংগল অধিক পরিমাণে হওয়া। আল্লাহ্ ছাড়া আর কারো জন্যে تَبَارَكَ শব্দের ব্যবহার জায়েয নেই।
রাসূলুল্লাহু সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মতে মোহাম্মদীকে যে দুরূদ বা সালাত পাঠের কথা বলেছেন সে দুরূদের শেষাংশে রয়েছে- وَبَارِكْ عَلَى مُحَمَّd، وَعَلَى آلِ مُحَمَّd كَمَا بَارَكْتَ عَلَى آلِ A إبراهيم * অর্থাৎ, “বরকত ও মংগল নাযিল কর মোহাম্মদ ও তাঁর বংশধরদের উপর যেমন তুমি বরকত ও মংগলে আপ্লুত করেছিলে ইব্রাহীমের বংশধরদেরকে।”
কথাগুলো আমাদের নবী এবং তাঁর বংশধরদের মংগল ও বরকতের জন্য বিশেষ দোয়া। ইব্রাহীম (আঃ) ও তাঁর বংশধরদের জন্যে আল্লাহ্ তায়ালা যে ধরনের মংগল, কল্যাণ, দয়া ও রহমত নাযিল করেছিলেন সে ধরনের বরকত যেন অধিক পরিমাণে সব সময়ের জন্যে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর বংশধরদের জন্যে নাযিল করেন।
ইব্রাহীম আলাইহিস্ সালাম ও তাঁর বংশধরদের জন্যে আল্লাহ্ তায়ালা কি ধরনের বরকত ও মংগল করেছেন তা ইতিপূর্বে কুরআনের উদ্ধৃতিসহ আলোচনা করা হয়েছে। বরকত নাযিল হওয়ার আরো আয়াত হলো-
وَبَشَّرْنَاهُ بِإِسْحَاقَ نَبِيًّا مِنَ الصَّالِحِينَ وَبَارَكْنَا عَلَيْهِ وَعَلَى إِسْحَاقَ *
আমি তাঁকে সুসংবাদ দিয়েছি ইসহাকের, তিনি সৎকর্মীদের মধ্য থেকে একজন নবী। তাঁকে এবং ইসহাককে আমি বরকত দান করেছি। (সাফফাত: ১১২, ১১৩)
আল্লাহ্ ইব্রাহীম (আঃ) ও তাঁর আহল সম্পর্কে আরো বলেছেন- رَحْمَةُ اللهِ وَبَرَكَاتُهُ عَلَيْكُمْ أَهْلَ الْبَيْتِ إِنَّهُ حَمِيدٌ مَجِيدٌ *
আল্লাহর রহমত ও বরকত যা তোমাদের উপর হে গৃহবাসী! নিশ্চয়ই তিনি প্রশংসিত ও মহিমাময়। (হুদ: ৭৩)
সূরায়ে বাকারার ১২৩ আয়াতে ইব্রাহীম (আঃ) নবী প্রেরণের وَابْعَثْ )فِيهِمْ رَسُولًا) যে দোয়া করেছিলেন তারই সর্বশেষ বাস্তবায়ন ছিল নবী আলাইহিস্ সালামের আগমন। ইতিমধ্যে ইব্রাহীম আলাইহিস্ সালামের বংশধরদের মধ্য থেকে কয়েকজন নবীরূপে আগমন করেছেন। আমরা উম্মতে মোহাম্মদীর জন্য সকল প্রেরিত নবী-রাসূলগণের উপর ঈমান রাখা, তাঁদের কার্যাবলী ও হুকুম আহকামের স্বীকৃতি দেয়া ঈমানী দায়িত্ব কর্তব্য।
কুরআনের অমোঘ বাণী এবং রাসূলের কথা- হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হলো যে, ইব্রাহীম আলাইহিস্ সালাম ও তাঁর বংশধরগণ পবিত্র, বরকতময় ও কল্যাণকর। বিশ্ব জুড়ে তাদের রয়েছে খ্যাতি, অবদান। যেসব আল্লাহ্ প্রদত্ত বৈশিষ্ট্যের দরুণ তাঁরা খ্যাত সেগুলোর পরিসংখ্যান এরূপ-
(১) মহান আল্লাহ এ ঘর থেকেই নবী মনোনীত করেছেন এবং তাদেরকে কিতাব দিয়েছেন। ইব্রাহীম আলাইহিস্ সালামের আগমনের পর তাঁর বংশ ছাড়া অন্য কোনো বংশ থেকে নবী প্রেরিত হয়নি।
(২) এ ঘর থেকেই আল্লাহ্ তায়ালা হিদায়াতের ইমামগণকে নির্ধারণ করেছেন। পরবর্তী পর্যায়ের সৎলোকগণ তাঁদের কাছে ঋণী এ কারণে যে, তাঁরা তাদেরই তরীকা অনুযায়ী চলার কারণে সৎলোক তথা জান্নাতবাসী হওয়ার সুযোগ পেয়েছে।
(৩) আল্লাহ্ তায়ালা এ ঘর থেকে দু'জন খলিল (অন্তরঙ্গ বন্ধু) গ্রহণ করেছেন, একজন ইব্রাহীম খলীলুল্লাহ অপরজন মোহাম্মদ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। এ পর্যায়ে আল্লাহ্ বলেছেন-
وَاتَّخَذَ اللَّهُ إِبْرَاهِيمَ خَلِيلًا * “এবং আল্লাহ্ তায়ালা ইব্রাহীমকে খলিল রূপে গ্রহণ করেছেন"। (নিসা: ১২৫)
অপরদিকে রাসূল (সঃ) বলেছেন-
إِنَّ اللَّهَ اتَّخَذَنِي خَلِيلًا كَمَا اتَّخَذَ إِبْرَاهِيمَ خَلِيلًا * আল্লাহ্ আমাকে খলিলরূপে গ্রহণ করেছেন যেমনি ইব্রাহীমকে খলিলরূপে গ্রহণ করেছিলেন।” (মুসলিম: ৫৩২)
(৪) আল্লাহ্ তায়ালা এ ঘরের মালিককে সারাবিশ্বের ইমামরূপে মনোনীত করেছেন। আল্লাহ্ বলেছেন-
وَإِذِ ابْتَلَى إِبْرَاهِيمَ رَبُّهُ بِكَلِمَاتٍ فَأَتَمَّهُنَّ - قَالَ إِنِّي جَاعِلُكَ لِلنَّاسِ إِمَامًا * “এবং যখন ইব্রাহীমকে কতিপয় ঘটনা দিয়ে তাঁর প্রভু তাকে পরীক্ষা করলেন, তখন তিনি সে পরীক্ষায় সফলতার সাথে উত্তীর্ণ হলেন। পরন্তু আল্লাহ বললেন- আমি তোমাকে মানবমণ্ডলীর জন্যে ইমাম নিযুক্ত করলাম।" (আহমদ, তিরমিযি)
(৫) হযরত ইব্রাহীমের (আঃ) হাতেই কাবা ঘরের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপিত হয়। পরবর্তীতে এই কাবা ঘর সারাবিশ্বের মুসলমানের জন্যে কিবলা রূপে পরিগণিত হয় এবং ইসলামের অন্যতম স্তম্ভ হজ্জ পালনের জন্যে এখানেই আসতে হয়।
(৬) আল্লাহ্ তায়ালা আহলে বাইতের উপর দুরূদ পড়ার যে আদেশ বান্দাদেরকে দিয়েছেন, সেরূপ আদেশ ইব্রাহীম আলাইহিস সালামের আহল এবং পরবর্তী বংশধরদের জন্যে দিয়েছেন। বস্তুতঃ এরূপ নির্দেশ অন্য কোনো নবীর বেলায় দেয়া হয়নি।
(৭) ইব্রাহীম আলাইহিস্ সালামের বংশধরদের থেকে দুটি নন্দিত উম্মত বিশ্বখ্যাত ও স্বীকৃত হয়। উম্মতে মুসা এবং উম্মতে মোহাম্মদী। আর উম্মতে মোহাম্মদীকে আল্লাহ্ তায়ালা ৭০ ধরনের উম্মতের চেয়েও বেশি মর্যাদা দিয়েছেন। (আহমদ, তিরমিযি)
উম্মতে মোহাম্মদী সম্পর্কে আল্লাহ্ বলেছেন-
كُنتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ *
“তোমরা সর্বোত্তম উম্মত; মানুষের মংগলের জন্যে তোমাদের আবির্ভাব।"
(৮) আল্লাহ্ তায়ালা ইব্রাহীম আলাইহিস্ সালাম ও তাঁর বংশধরদেরকে পৃথিবীতে সততা, পরোপকারী ও বদান্যরূপে স্মরণীয় করে রাখার ব্যবস্থা করেছেন। আজকের বিশ্বে তাঁর উপর সালাম ও সালাত ও প্রশংসা প্রদর্শন করে তাঁর কথা স্মরণ করা হয়।
এ সম্পর্কে আল্লাহ্ বলেছেন-
وَتَرَكْنَا عَلَيْهِ فِي الَّا خِرِينَ - سَلَامٌ عَلَى إِبْرَاهِيمَ - كَذَلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِينَ *
"আমি তাদের জন্যে এ বিষয়টি পরবর্তীদের মধ্য থেকে দিয়েছি যে, ইব্রাহীমের প্রতি সালাম বর্ষিত হোক। এমনিভাবে আমি সৎকর্মীদেরকে প্রতিদান দিয়ে থাকি।" (সাফফাত: ১০৮-১১০)
(৯) আল্লাহ তায়ালা এ ঘরকে লোকদের মধ্যে 'ফুরকান' বা পার্থক্যকারী রূপে নির্ণয় করেছেন। যারা এ ঘর তথা তাঁর অনুসৃত আদর্শ ও নীতিসমূহ অনুসরণ করেছে তাঁরা 'সায়ীদ' বা সত্যানুসারী রূপে পরিগণিত হয়ে জান্নাত লাভে ধন্য হবে। আর বিরুদ্ধাচারীগণ 'শাকী' বা হতভাগা রূপে চিহ্নিত হয়ে জাহান্নামের অনলে দগ্ধ হতে থাকবে।
(১০) আল্লাহ্ তায়ালা তাঁর নামের সাথে ইব্রাহীম আলাইহিস সালামের নামও সম্পৃক্ত করেছেন। সুতরাং বলা হয়, ইব্রাহীমু খলিলুল্লাহ্।
(১১) সারা বিশ্বের এটি একটি অনন্য পরিবার। আল্লাহকে চিনা জানা, মান্য করা এবং তাঁর ভয়ে সদা শংকিত থাকা, তাঁর নিয়ামতের আশায় বিনয়ী ও অনুগত হওয়ার ব্যাপারে বিশ্বজুড়ে আর কোনো ঘর পাওয়া যাবে না। সর্ববিদ জ্ঞান ও গুণের এটি একটি খনি।
(১২) আল্লাহ্ পাক এ পরিবারের লোকদের হাতেই খিলাফতের দায়িত্ব অর্পণ করেন। দুনিয়াবাসীর অধিকাংশ লোক তাদেরকে মান্য করে।
(১৩) শত্রুর উপর তারা এমন বিজয় লাভ করেন যা ইতিপূর্বে কারো ভাগ্যে ঘটেনি।
(১৪) মহান আল্লাহ্ তাঁদের গড়া কীর্তিসমূহ এমনভাবে মর্যাদাবান করেন যে, সেসব কীর্তি অবশিষ্ট থাকার উপর দুনিয়া টিকে থাকা নির্ভর করে। এ পর্যায়ে বলা যায় কাবা, কুরবানী, মিনা তথা হজ্জের কথা। এ সম্পর্কে হযরত ইবনে ............... (রাঃ) বলেছেন-
لَوْ تَرَكَ النَّاسُ كُلُّهُمُ الْحَجَّ لَوَقَعَتِ السَّمَاءُ عَلَى الْأَرْضِ * "অর্থাৎ যদি সমগ্র লোক হজ্জ পরিত্যাগ করে তাহলে আকাশ যমীনের উপর ভেংগে পড়বে।”
এ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
إِنَّ فِي آخِرِ الزَّمَانِ يَرْفَعُ اللَّهُ بَيْتَهُ مِنَ الْأَرْضِ وَكَلَامَهُ مِنَ الْمُصْحَفِ وَصُدُورِ الرِّجَالِ - فَلَا يَبْقَى لَهُ فِي الْأَرْضِ بَيْتُ يُحَجُّ وَلَا كَلَامُ يُتْلَى، فَحِينَئِذٍ يَقْرُبُ خَرَابُ الْعَالَمِ *
“শেষ যমানায় আল্লাহ্ তায়ালা তাঁর ঘর বাইতুল্লাহ্ দুনিয়া থেকে উঠিয়ে নিবেন এবং তাঁর বাণীসমূহ কুরআন এবং মানুষের মন-মগজ থেকে মুছে ফেলবেন। ফলে হজ্জ করার এবং কুরআন তিলাওয়াত করার আর কোনো সুযোগ থাকবে না। তখনই পৃথিবীর ধ্বংস হওয়া অত্যাসন্ন হয়ে দাঁড়াবে।” (ইবনে মাজাহ : ৪০৪৯)
এসব হাদীস এ কথার প্রমাণ যে, হযরত ইব্রাহীম (আঃ) তথা তাঁর বংশধরগণ যে অমর কীর্তি রেখে গেছেন তা সৃষ্টির লয় পর্যন্ত অক্ষুন্ন থাকবে। আর এগুলো ধ্বংসের সাথে সাথে দুনিয়ার আয়ু শেষ হয়ে যাবে। এরূপ অমর কীর্তি স্থাপন করা অন্য কারো জন্যে সম্ভব হয়নি।
উপরোক্ত অবদান, বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলীর কারণে আমাদের নবী মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস্ সাল্লাম ও তাঁর বংশধরদের জন্যে আল্লাহর কাছে বরকত ও মঙ্গল কামনা করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং কিভাবে কামনা করতে হবে সে কথাও তিনি আমাদেরকে শিখিয়েছেন। তাই আমরা বলি-
اللَّهُمَّ بَارِكْ عَلَى مُحَمَّd وَعَلَى آلِ مُحَمَّd كَمَا بَارَكْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ *
হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস্ সালামের অপর বৈশিষ্ট হলো, তাঁর ও তাঁর বংশধরদের আগমনের কারণে আল্লাহ্ তায়ালা দুনিয়াবাসীদের অপরাধের শাস্তি প্রদান সাধারণভাবে মুলতবি রাখেন। ইব্রাহীম আলাইহিস্ সালামের আগমনের আগে মানুষ অপরাধ করলে সাথে সাথেই অপরাধের শাস্তি ভোগ করতে হতো। যেমন নূহ (আঃ) হুদ (আঃ) সালিহ (আঃ) লুত (আঃ) প্রমুখ নবীগণের সম্প্রদায়ের ব্যাপারে ঘটেছিল। এসব সম্প্রদায়ের কাউকে অপরাধের শাস্তি স্বরূপ বানর জাতীয় পশুতে রূপান্তরিত করা হয়। আবার কাউকে ধ্বংস করে দেয়া হয়। কোনো সম্প্রদায়কে অপরাধের দরুন বিলীন ও নিশ্চিহ্ন করা হয়। কিন্তু হযরত ইব্রাহীম (আঃ) ও তাঁর বংশের মনীষীদের আগমণের পর তাৎক্ষণিক শাস্তি রহিত করে অপরাধ ক্ষমা চাওয়ার অবকাশ দেয়া হয়। কেউ যে কোনো ধরনের অপরাধ করলে সে অনুতপ্ত হলে কিংবা আল্লাহ্র কাছে কায়মনোবাক্যে ক্ষমা চাইলে দয়াময় আল্লাহ্ তাঁকে ক্ষমা করে দেন। কেউ নবী-রাসূলগণের প্রদর্শিত পথে চলতে বাধা দিলে কিংবা নবীগণের নীতি ও আদর্শ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অন্তরায় সৃষ্টি করলে তাকে বুঝাবার চেষ্টা করার অবকাশ রয়েছে। এসব চেষ্টা-প্রচেষ্টা বিফল হলে সেক্ষেত্রে অপশক্তির বিরুদ্ধাচরণ করতঃ জিহাদে অংশগ্রহণ করে শাহাদত বরণ করা কিংবা বিজয়ের মালা পড়ে 'গাযী' উপাধি ধারণ করার অবকাশ রয়েছে। শহীদ কিংবা 'গাযী' হওয়ার এরূপ কোনো সুযোগ সেকালে ছিল না।
এসব সংগত কারণে হযরত ইব্রাহীম (আঃ) তাঁর বংশধর এবং পরিবার-পরিজনদের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা থাকা, তাদের জন্যে দোয়া করা আমাদের নৈতিক, ধর্মীয় ও সাংবিধানিক দায়িত্ব ও কর্তব্য।