📄 নয়. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ‘আহমদ’ ও ‘মুহাম্মাদ’ নামের তাৎপর্য ও ব্যুৎপত্তি
বিশ্বনবী মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ৯৯ টি গুণবাচক নাম রয়েছে। তন্মধ্যে মোহাম্মদ (مُحَمَّدٌ) নামটিই সর্বাধিক প্রসিদ্ধ, বিশ্বখ্যাত। মোহাম্মাদ শব্দটির উৎপত্তি حَمَّدٌ শব্দ থেকে। (حَمَّدٌ) 'হামদ' শব্দটি যে ব্যক্তি বা বস্তুর জন্য প্রয়োগ হবে সে محمود 'মাহমুদ' হিসেবে পরিগণিত হবে। مَحْمُودُ বা প্রশংসিত বস্তু বা ব্যক্তির যাবতীয় মান-সম্মান, ইজ্জত -আবরু, স্তুতি-প্রশংসা শব্দটির মধ্যে নিহিত। এরূপ অর্থই হামদের হাকীকত বা তত্ত্ব।
(مُحَمَّدٌ) মোহাম্মাদ শব্দটি مَفْعَلُ শব্দের ছন্দে গঠিত। যেমন- مُبَجَّلٌ - مُعَظَمَ - مُحَبَّبُ - مُسَود - مفْعَلُ মিত্রাক্ষর ছন্দে গঠিত। এরূপ ছন্দের শব্দ দ্বারা মৌলিক বস্তুর আধিক্য প্রকাশ পাওয়া বুঝায়। 'হামদু' শব্দটি যদি اِسْمِ فَاعِلُ (কর্তাকারক) রূপে ব্যবহৃত হয়, তাহলে কর্তা ব্যক্তি থেকে মৌল বস্তু বার বার অধিক পরিমাণে প্রকাশ পাওয়া বুঝা যাবে। যেমন- مُخْلِصُ - مُبِينٌ - مُفْهِمُ - مُحَكِّ শব্দাবলী ইলম, ফহম, বয়ান, ও খুলুছিয়াত এসব গুণাবলীর ধারক বাহকদের পক্ষ থেকে পর পর বেশি পরিমাণে প্রকাশ হওয়া বুঝায়। আর ইসমে মাফ'উল اِسم مفعول রূপে ব্যবহৃত হলে মৌলিক বস্তুর দাবি কিংবা বাস্তবায়নের পরিপ্রেক্ষিতে বার বার বাস্তবায়িত হওয়া বুঝায়। 'মোহাম্মদ' (مُحَمَّدٌ) اسم مَفْعُول এর রূপে ব্যবহৃত হওয়ায় শব্দটির অর্থ দাঁড়াবে, কোনো প্রশংসাকারী বাস্তবে বার বার যার প্রশংসা বেশি পরিমাণে করেন কিংবা যিনি বার বার উচ্চসিত প্রশংসার দাবি রাখেন।
আল্লাহর নামের মতো রাসূলেরও মৌলিক নামসমূহ রয়েছে। যুবাইর বিন মাতআম (রাঃ) বর্ণিত হাদীসে আছে, মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
إِنَّ لِي أَسْمَاءً أَنَا مُحَمَّدٌ، وَأَنَا أَحْمَدُ وَأَنَا الْمَاحِي الَّذِي يَمْحُو اللَّهُ بِي الْكُفْرَ *
"আমার কতিপয় নাম আছে আমি মোহাম্মাদু আমি আহমাদু এবং আমি 'আলমাহী' আমার দ্বারা আল্লাহ্ তায়ালা কুফরী মুছে দিয়েছেন।” (বুখারী: ফতহুল বারী: ৬/৪৮৯৬, মুসলিমঃ ২৩৫৪)
মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ নামগুলোর কথা স্পষ্ট করে উল্লেখ করেছেন। নামগুলো ফজিলতপূর্ণ, বহু অর্থবহ এবং আল্লাহর মনোনীত। এগুলো যদি শুধুমাত্র বিভক্তি আকারে হতো তাহলে নামগুলো অর্থবহ হতো না এবং প্রশ্নসূচক হওয়াও বুঝা যেতো না। এ কারণেই হাসান (রাঃ) বলেছেন-
وَشَقَّ لَهُ مِنَ اسْمِهِ لِيُجِلَّهُ - فَذُو الْعَرْشِ مَحْمُودُ وَهَذَا مُحَمَّدٌ *
“তাঁকে (মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মহিয়ান গরিয়ান করার উদ্দেশ্যে তিনি (আল্লাহ তায়ালা) তাঁর নামে ভগ্নাংশ করে ফেলেন। ফলে আরশের অধিপতি হলেন 'মাহমুদ' (আল্লাহ্)। আর ইনি হচ্ছেন 'মোহাম্মদ'।
মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নামের উৎপত্তি حَمْد শব্দ হওয়ায় তিনি مَحْمُود 'মাহমুদ' প্রশংসিত। তিনি 'মাহমুদ' আল্লাহর কাছে, তিনি 'মাহমুদ' ফেরেশতাদের কাছে, তিনি 'মাহমুদ' নবীগণের কাছে এবং তিনি 'মাহমুদ' বিশ্ববাসীর কাছে, যদিও কেউ অস্বীকার করে থাকে। বস্তুতঃ তাঁর মধ্যে যে পরিপূর্ণ ও উচ্চসিত বৈশিষ্ট্যের সমাহার ঘটেছে তাতে প্রতিটি জ্ঞানবানের কাছে তাঁর 'মাহমুদ' হওয়া যুক্তিগ্রাহ্য। যারা অজ্ঞতা, হিংসা বিরোধীতা ও বিদ্রোহ করার মানসে এ সত্যটি মানতে চায়না তাদের কথা স্বতন্ত্র।
ধাতুগত দিক থেকে 'হামদ' শব্দের সূত্র ধরে তিনি (أَحْمَدُ و مُحَمَّدٌ) 'মোহাম্মদ' এবং আহমাদ নামে অভিহিত। আর তাঁর উম্মতগণ হচ্ছেন حَمَّادُونَ 'হাম্মাদুন বা প্রশংসাকারীগণ অর্থাৎ সুখে-দুঃখে বিপদে-আপদে নবীর উম্মতগণ আল্লাহর 'হামদ' (প্রশংসা) করে থাকেন। উম্মতগণের 'সালাত' এর সূচনা হয় 'হামদ দিয়ে, খুৎবা শুরু করে 'হামদ' দিয়ে, কিতাবের শুরু হয় 'হামদ' এর মাধ্যমে। এমনিভাবে লাওহে মাহফুজে আল্লাহর কাছে লিখা আছে, তাঁর (রাসূল) খলিফা ও সাহাবাগণ কুরআন লিখা শুরু করেন 'হামদ' দিয়ে এরং হাশরের মাঠে 'হামদ' এর ঝাণ্ডা ধারণ করবেন মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে। বিচার দিনে নবী আলাইহিস সালাম উম্মতের শাফায়াতের জন্যে যখন মহান আল্লাহর সমীপে সিজদা করবেন তখন তাঁকে শাফায়াত করার অনুমতি দেয়া হবে এ বলে যে, তিনি মহান আল্লাহর প্রশংসা করবেন উচ্চসিতভাবে। তিনি হচ্ছেন 'মাকামে মাহমুদের' মালিক! মাকামে মাহমুদ বেহেশতের এমন একটি উচ্চসিত স্থান যা পাওয়ার জন্যে আগে-পরের সকলেই কামনা করেছেন। এ স্থানটি সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন-
وَمِنَ اللَّيْلِ فَتَهَجَّدْ بِهِ نَافِلَةٌ لَكَ عَسَى أَنْ يَبْعَثَكَ رَبِّكَ مَقَامًا مَّحْمُودًا *
“রাতের কিছু অংশ কুরআন পাঠসহ জাগ্রত থাকুন। এটা আপনার জন্যে অতিরিক্ত। হয়তোবা আপনার রব আপনাকে মাকামে মাহমুদে পৌছাবেন।” (আসরা: ৭৯)
'মাকামে মাহমুদ এর ফজিলত, মর্যাদা ও গুরুত্ব সম্পর্কে ইবনে উবাই হাতেম ইবনে জারীর আবদ বিন হুমাইদ প্রমুখ তাফসীর কারকগণের গ্রন্থে বিশদ বিবরণ রয়েছে। যিনি এমন উচ্চাসনে সমাসীন হতে সক্ষম তিনিই সত্যিকার অর্থে 'মাহমুদ' বা প্রশংসিত। মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ উচ্চাসনে অধিষ্ঠিত হওয়ার কথা হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। স্থানটি তাঁর জন্যে নির্ধারিত হওয়া যথার্থ হয়েছে। কেননা তাঁর হেদায়াত, ঈমান, ইলম, আমল ছিল অতুলনীয়। তাঁর আগমন ও প্রচেষ্টায় অন্ধকার দূরীভূত হয়। শয়তানের প্ররোচনা থেকে মানবজাতি মুক্তি লাভ করে। শিরক, কুফর, অন্যায় 'অবিচার' গোমরাহীর স্থলে তাওহীদ, ন্যায়পরায়ণতা, সম্প্রীতি ও সহানুভূতি প্রতিষ্ঠা হয়। অগ্নিপূজা, মূর্তিপূজা ও তারকা পূজার অবসান ঘটে। সারা বিশ্বের আরব অনারব সাম্রাজ্যে সঠিক ও বিশুদ্ধ দ্বীনের আলোড়ন সৃষ্টি হয়। অন্ধজনে আলো পায়, জ্ঞান প্রসারিত হয়, গরীব ধনী হয়। রোগী সেবা পায়, শত্রু মিত্র হয়। মারামারি হত্যা-লুঠতরাজ, চুরি-ডাকাতি বন্ধ হয়। উঁচু-নীচুর ভেদাভেদ মুছে যায়। মানুষের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব, সহানুভূতি, সম্প্রীতি দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। মানুষ তার সৃষ্টিকর্তাকে চিনতে সক্ষম হয়।
মানুষ তার দায়িত্ব কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন হয়। মানব সৃষ্টির রহস্য উদ্দেশ্য কি? তার গন্তব্যস্থল কোথায় এসব সম্পর্কে সজাগ হয়। রাসূলের আগমনে মানুষ আরো জানতে পারলো খারাপ কাজের ভয়াবহ পরিণতি এবং ভালো কাজের অনাবিল শান্তি ও পুরস্কারের কথা। সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ্ সম্পর্কে তাঁদের ধারণা হলো স্বচ্ছ ও পরিচ্ছন্ন।
নবী আলাইহিস সালাতু ওয়া সাল্লাম 'মাহমুদ' তিনি 'মোহাম্মদ' তিনি 'আহমদ' আল্লাহ তায়ালা তাঁকে 'মাহমুদ' বা প্রশংসিত হওয়ার উপাদান দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ কুরআনে বলেছেন- أَوَلَمْ يَكْفِهِمْ أَنَّا أَنْزَلْنَا عَلَيْكَ الْكِتَابَ يُتْلَى عَلَيْهِمْ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَرَحْمَةً وَذِكْرَى لِقَوْمٍ يُؤْمِنُونَ *
“এটা কি তাদের জন্যে যথেষ্ট নয় যে, আমি আপনার উপর কিতাব নাযিল করেছি যা তাদের কাছে পাঠ করা হয়। এতে নিশ্চয়ই বিশ্বাসী লোকদের জন্যে রহমত ও উপদেশ রয়েছে।" (আনকাবুত : ৫১)
কুরআনের লিখিত কথাগুলো মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর জীবনের শেষ লগ্ন পর্যন্ত প্রাণান্তকর প্রচেষ্টার মাধ্যমে বাস্তবায়িত করেছেন। যে পদ্ধতিতে আল্লাহর সন্তুষ্টি পাওয়া যাবে সে পদ্ধতির পুংখানুপুংখ ব্যাখ্যা তিনি করেছেন। এমন কোনো সৎ কাজ নেই যার নির্দেশ তিনি দেননি। আবার এমন কোনো অসৎ কাজ নেই যা থেকে তিনি বিরত রাখেননি। তিনি নিজেই বলেছেন- مَا تَرَكْتُ مِنْ شَيْءٍ يُقَرِّبُكُمْ إِلَى الْجَنَّةِ إِلَّا وَقَدْ أَمَرْتُكُمْ بِهِ، وَلَا مِنْ شَيْءٍ يُقَرِّبُكُمْ مِنَ النَّارِ إِلَّا وَقَدْ نَهَيْتُكُمْ عَنْهُ
“যে জিনিস তোমাদের জান্নাতের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দেয় সেগুলো সম্পর্কে আমি তোমাদেরকে অবশ্যই নির্দেশ দিয়েছি; আর যে কাজ তোমাদেরকে জাহান্নামের অগ্নিতে নিক্ষেপ করবে সেগুলো সম্পর্কে আমি তোমাদের অবশ্যই নিষেধ করেছি....। (মাজমাআঃ ৮/২৬৩, ২৬৪)
হযরত আবু যর (রাঃ) বলেছেন- عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَلَا طَائِرٌ يَقْلِبُ لَقَدْ تُونِي رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ جَنَاحَيْهِ فِي السَّمَاءِ إِلَّا ذَكَرْنَا عَنْهُ عِلْمًا *
“একথা সত্য যে, মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের কাছ থেকে চির দিনের জন্যে চলে গেছেন। কিন্তু আকাশে পাখী তার ডানা মেলে কেমন করে উড়ে বেড়ায় সে রহস্য সম্পর্কেও তিনি আমাদেরকে জ্ঞান দান করেছেন। (মুসনাদ : ৫/১৬২)
ফলে পরিচয় মিলে গাছের। রাসূলের কর্ম তৎপতায় জানা যায় তাঁর নাম কি হওয়া উচিত। তিনি চরিত্রে ছিলেন সর্বোচ্চ, আমানতদারীতে ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ, কথায় ছিলেন মহাসত্য, ধৈর্যধারণে ছিলেন একান্ত, দান-সদকায় ছিলেন উদার, শৌর্য-বীর্যে ছিলেন কালজয়ী, ক্ষমায় ছিলেন মহান, সহনশীলতায় ছিলেন দৃঢ়। এ সম্পর্কে হযরত আব্দুল্লাহ বিন ওমরের (রাঃ) হাদীসটি প্রণিধানযোগ্য। তিনি তাওরাত কিতাবে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রশংসায় বর্ণিত কথাগুলো বললেন এভাবে-
مُحَمَّدُ عَبْدِي وَرَسُولِي، سَمَّيْتُهُ الْمُتَوَكِّلَ لَيْسَ بِفَظِّ وَلَا غَلِيظٌ وَلَا صَحَابِ بِالْأَسْوَاقِ، وَلَا يَجْزِي السَّيِّئَةَ بِالسَّيِّئَةِ وَلَكِن يَعْفُو وَيَصْفَحُ، وَلَنْ أَقْبِضَهُ حَتَّى أَقِيمَ بِهِ الْمِلَّةُ الْعَوْجَاءُ بِأَنْ يَقُولُوا : لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَافْتَحَ بِهِ أَعْيُنَا عُمْيًا وَإِذَا نَا صُمَّا وَقُلُوباً غُلْفاً *
“মোহাম্মদ আমার বান্দাহ, আমার রাসূল। আমি তাঁর নাম রেখেছি মুতাওয়াক্কিল। তার মধ্যে কঠোরতা নেই, নেই কোনো রূঢ়তা ও হিংস্রতা। তিনি নিরব, বাজারের হৈ-হোল্লোড় তাঁর মধ্যে নেই। তিনি বড়ই সহনশীল, ক্ষমা মার্জনাকারী, কারো খারাপ কাজের মুকাবিলায় তিনি খারাপ করেন না। তাঁর পঠিত لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ লাইলাহা ইল্লাল্লাহু এ বাক্যের মুর্ছনায় বক্র ও বিভ্রান্ত জাতি সহজ-সরল হয়ে যায়। তাঁর সান্নিধ্যে অন্ধ দেখতে পায়, বধির শুনতে পায়, বোবা কথা বলতে সক্ষম হয়, নির্দয় লোক দয়াদ্র হয় এবং চেতনা বিহীন ব্যক্তি সচেতন হয়ে উঠে। (বুখারী, ফতহুল বারী: ৮/৪৮৩৮)
দয়া ও স্নেহ মমতায় তিনি ছিলেন শ্রেষ্ঠতম, দ্বীন ও দুনিয়াবী কল্যাণে তিনি ছিলেন মহান, ভাষার অলংকারে, বাগ্মীতার আকর্ষণে তিনি ছিলেন অদ্বিতীয়। সবর, সহনশীলতা ও পরোপকারে তাঁর কোনো জুড়ি ছিল না।
জিম্মাদারী, আমানতদারী, ওয়াদা রক্ষায় তিনি ছিলেন অনন্য। বিনয়, নম্রতা, ভদ্রতা, শালীনতায় তিনি ছিলেন অপূর্ব। প্রতিরক্ষা ও প্রতিরোধের ব্যাপারে তিনি ছিলেন দূরদর্শী।
বিশ্বনবীর উপরোক্ত বৈশিষ্ট্যগুলোর অধিকারী হওয়া কেবলমাত্র কথার ফুলঝুড়ি নয়। যেসব সৌভাগ্যবান ব্যক্তি তাঁর জীবদ্দশায় তাঁর সান্নিধ্য লাভে ধন্য হয়েছিলেন খুবই কাছ থেকে, তাদের অন্যতম হলেন হযরত আলী (রাঃ)। তিনি বলেছেন-
كَانَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَجْوَدَ النَّاسِ صَدْرًا وأصدَقَهُمْ لَهْجَةً وَالْيَنَهُمْ عَرِيكَةً وَأَكْرَمَهُمْ عِشْرَةٌ، مَنْ رَأَهُ بَدِيهَةٌ هَابَهُ وَمَنْ خَالَطَهُ مَعْرِفَةً أَحَبَّهُ يَقُولُ فاعته : لَمْ أَرَى قَبْلَهُ وَلَا بَعْدَهُ مِثْلَهُ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ * (শামায়িলি তিরমিযি: ৬, সুনান: ৩৬৪২)
"রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন মানুষের মধ্যে সর্বাপেক্ষা প্রশস্ত বক্ষের ধারক। অর্থাৎ তাঁর হৃদয় ছিল আকাশের মতো বিশাল, সাগরের মতো অথৈ, মানব দানব, পশু-পাখি, গাছ তরু, লতা-পাতা সবকিছুর কল্যাণের ব্যাপারে তাঁর হৃদয় ছিল অবারিত, বিস্তীর্ণ। মনে হয় যেনো দুনিয়ার সমগ্র মংগল ও কল্যাণের আঁধার হচ্ছে রাসূলের হৃদয়মন।
কথায় ছিলেন তিনি সর্বাপেক্ষা সত্যবাদী। এমনকি তাঁর শত্রুগণও একথা অকপটে স্বীকার করেছে যে, রাসূল তাঁর ৬৩ বৎসর জীবন সায়াহ্নে একটিবারও অসত্য বা মিথ্যা কথা বলেননি। ৬৩ বৎসরের দীর্ঘ জীবনে অনেক ঘাত-প্রতিঘাত এসেছে, প্রতিকূল-প্রতিরোধ বিদ্রোহের মুখোমুখি হতে হয়েছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত কেউ তাঁর বিরুদ্ধে ছোট-বড় কোনো ধরনের মিথ্যা বলার আপবাদ দিতে পারেনি।
একবার আবু জাহিলের ভাগীনা মুসাউর বিন মাখরামাহ তাকে জিজ্ঞেস করলেন মামুজান! মোহাম্মদকে (রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের) তোমরা কখনো মিথ্যা বলার অপবাদ দিয়েছো কি? উত্তরে সে বললো--
وَالله يَا ابْنَ أُخْتِى لَقَدْ كَانَ مُحَمَّd وَهُوَ شَابٌ فِينَا الآمين .......
"আল্লাহর কসম! হে ভাগিনেয়, মোহাম্মদ এমন একজন যুবক, যে আমাদের মাঝে 'আল আমিন' বিশ্বাসী বলে অভিহিত হতো। ভাগীনা বললেন, তাহলে সত্যবাদীকে অনুসরণ করছেন না কেন? আবু জাহিল বললেন, কুরাইশ গোত্রের একটি শাখা 'বনী কুসাই' আগত হাজীদেরকে পানি পান করায়, কাবা ঘরের চাবি তাদের হাতে, বাইতুল্লাহর রক্ষণাবেক্ষণ তারাই করছে। এমতাবস্থায় নবুয়্যাতও যদি তাদের অধীনে চলে যায়, তাহলে আমরা তো একেবারে রিক্তহস্ত হয়ে যাই।
অপর একটি বর্ণনায় আছে, একবার আবু জাহিল স্বয়ং রাসূলুল্লাহু সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললো- তুমি মিথ্যাবাদী এরূপ ধারণা আমরা কখনো করি না। তবে তোমার ধর্মগ্রন্থকে অসত্য মনে করি।
কুরআনের কতিপয় জায়গায় كِذَّبُ মিথ্যা অপবাদের যে কথার উল্লেখ আছে তা স্বয়ং রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মিথ্যা বলা নয়। বরং আল্লাহর নিদর্শনাবলীকে (آيَاتِ) মিথ্যা বলা। (আনআম : ৩৩ আয়াতের ব্যাখ্যা)
তিনি ছিলেন সবচে মোলায়েম ও নম্র স্বভাবের ব্যক্তিত্ব। ঘনিষ্ঠের চেয়েও ঘনিষ্ঠ, আপনের চেয়েও আপন ছিলেন তিনি। কেউ ডাকলে দৌড়ে যেতেন, কারো প্রয়োজন পূরণে ব্যস্ত হয়ে উঠতেন। কেউ চাইলে তিনি কখনো 'না' বলতেন না। পরামর্শ ভিত্তিক কাজে সকলের পরামর্শ শুনতেন। কল্যাণ ও গঠনমূলক পরামর্শ গ্রহণ করতেন। দুষ্ট প্রকৃতি ও স্বার্থ প্রণোদিত লোকদেরকে ক্ষমা করতেন। যে একবার তাঁর সাথে কথা বলেছে সে মুগ্ধ হয়েছে।
তিনি ছিলেন সংগ ও সম্পর্ক স্থাপনে অদ্বিতীয়। যে কেউ তাঁর সংস্পর্শে এসেছে, তাঁর সংগ লাভ করতে সমর্থ হয়েছে, সে মুগ্ধ ও পরিতৃপ্ত হয়েছে। তিনি কখনো কাউকে কটু কথা বলেননি, কারো প্রতি ভ্রুকুটি করেননি। কাউকে দেখে তাঁর চেহারা মলিন হয়নি। বরং সংগী সাথীদের সাথে তাঁর আচরণ ছিল অসাধারণ। তাঁর সহনশীলতা ছিল অনন্য।
হোসাইন (রাঃ) বলেছেন, আমার পিতাকে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সাথীদের সাথে আচরণের কথা জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন-
كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ دَائِمَ الْبِشْرِ ، سَهُلَ الْخُلُقِ، لِينَ الْجَانِبِ، لَيْسَ بِفَظ وَلَا غَلِيظ، وَلَا صَحَابِ، وَلَا فَحَاشِ، وَلَا عَيَّابِ، وَلَا مَدَاحِ
"তিনি ছিলেন সদা প্রফুল্ল, কোমল মতি, সহজ প্রকৃতির। রূঢ়তা, কঠোরতা, নিষ্ঠুরতা কখনো তাঁকে স্পর্শ করেনি। কটুকথা, অনর্থক বাক্যালাপ, হৈ-হুল্লোড়, শোরগোল ইত্যাকার সহজাত ত্রুটি থেকে তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ মুক্ত। তিনি যখন কথা বলতেন উপস্থিত শ্রোতামণ্ডলী মন্ত্র মুগ্ধের মতো তাঁর কথা শুনতেন। মনে হচ্ছিল, যেনো তাদের মাথায় রয়েছে একটি উড়ন্ত পাখি। তিনি ৩টি বস্তুকে পরিহার করে চলতেন, নারী, অযথা বাক্যালাপ এবং অধিক পরিমাণে জমা করা। তিনি কথা বলার পর অন্যরা কথা বলতেন। অনুমতি ছাড়া কেউ সামনে কথা বলতো না। অর্থাৎ, কথা বলার শালীনতা, ভদ্রতা, সৌজন্য সবই তাঁর মধ্যে ছিল পরিপূর্ণরূপে।
আল্লাহ তায়ালা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আরো দুটি গুণে গুণান্বিত করেন। গুণ দুটি হলো الْإِجْلَالُ وَالْمَحَبَّةُ প্রভাব ও মহব্বত। যে কেউ তাঁর দিকে আচমকা তাকালেই সে তাঁর প্রতি প্রভাবিত হয়ে পড়ে। তাঁর প্রভাব ও সম্মানে এমনকি শত্রুর হৃদয় মনও ভরে উঠত। তিনি মানুষকে ভালোবাসতেন হৃদয় দিয়ে। আর তাঁর অনুসারী সাহাবাগণও তাকে ভালবাসতেন সম্মানও প্রভাব দিয়ে। তাঁকে ভালবাসা এবং তাঁর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করার মধ্যে নেই কোনো কৃত্রিমতা, স্বার্থপরতা। এরূপ অকৃত্রিম ও নিখাঁদ সম্মান ও প্রীতি কেবলমাত্র সেই ব্যক্তিই লাভ করতে সক্ষম যার মধ্যে প্রভাব প্রতিপত্তি, মান সম্মান ও প্রেম-প্রীতির উপাদান ষোলকলায় বিদ্যমান। আর তিনি হচ্ছেন একক ব্যক্তি আমাদের নবী রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।
এখানে একথা স্মরণ রাখা দরকার যে, মানুষকে ভালবাসা, মানুষকে সম্মান করা একটি ধর্মীয় নির্দেশ। তবে এ ভালবাসা ও সম্মান প্রদর্শন হতে হবে আল্লাহকে ভালবাসা ও তাঁকে সম্মান প্রদর্শন করার অধীন। আল্লাহ্ তায়ালা ও তাঁর মাগফিরাত লাভের জন্যে তাঁর রাসূলকে অনুসরণ করার কথা বলেছেন। বস্তুত প্রত্যেক নবীর উম্মতগণই তাদের নবীগণকে আল্লাহর ভালবাসা ও সম্মানের অধীন হয়ে সম্মান করতেন, ভালবাসতেন।
হাসান বসরী (রঃ) বলেছেন- 'একজন মুমিনের ঈমানী জীবিকা হলো চরিত্র মাধুর্য ও স্বাভাবিক প্রভাব'। অর্থাৎ মহান আল্লাহ যাকে মহব্বত সম্মান ও প্রভাবের সমন্বয়ে তৈরী ঈমানের লেবাস পরিধান করিয়েছেন, তিনি নিজেও অপরের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবেন এবং অপরগণও স্বাভাবিক ভাবেই তাকে সম্মান করবেন, ভালবাসবেন। এ কারণেই দেখা যায় যে, সাহাবায়ে কিরামগণের রাসূলের প্রতি সম্মান ও ভালোবাসার যে নজির স্থাপন করেছেন তা বিরল, ইতিহাস খ্যাত। তাঁদের আনুগত্য ও ভালোবাসার রেকর্ড আজ অবধি কেউ ভংগ করতে পারেনি।
উরওয়াহ বিন মাসউদ কুরাইশদেরকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন-
يَا قَوْمٌ وَاللَّهِ لَقَدْ أَفَدْتُ عَلَى كِسْرَى وَقَيْصَرَ وَالْمُلُوكِ فَمَا رَأَيْتُ مَلِكًا يُعَظِمُهُ أَصْحَابُهُ مَا يُعَظِمُ أَصْحَابُ مُحَمَّd صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، مَا يَحُدُّونَ النَّظْرَ إِلَيْهِ تَعْظِيمًا لَهُ، وَمَا تَخْتِمُ تَحَامَةٌ إِلَّا وَقَعَتْ فِي كَفَّ رَجُلٍ مِنْهُمْ فَيَدْلُكَ بِهَا وَجْهَهُ وَصَدْرَهُ - وَإِذَا تَوَضَّأَ كَادُوا يَقْتَتِلُونَ وَضُوءَهُ *
“হে কুরাইশ সম্প্রদায়! আল্লাহর কসম করে বলছি, আমি পারস্য ইরানসহ অনেক দেশের রাজা বাদশাদের সাথে রাজ প্রতিনিধি হিসেবে দেখা করেছি। কিন্তু মোহাম্মদ (রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর সাথীরা তাঁকে যেভাবে সম্মান প্রদর্শন করেন, এমন অপূর্ব সম্মান আর কোনো রাজ দরবারে আমি দেখিনি। তাঁর সম্মানার্থে কোনো সাহাবী তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকে না, সবাই আনত চোখ নিশ্চুপ হয়ে থাকে। তিনি থু থু ফেললে সে থু থু উপস্থিত সাহাবীগণের কেউ না কেউ হাতে ধারণ করতঃ তা বক্ষে ও চেহারায় মর্দন করেন। তিনি অযু করার ইচ্ছা করলে অযুর পানি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় বস্তু যোগান দেয়ার জন্যে সাহাবীদের মধ্যে প্রতিযোগিতার দ্বন্দ্ব শুরু হয়ে যায়।
(বুখারী ফতহুল বারী : ৫/২৭৩১ দীর্ঘ হাদীসের অংশ) যেসব উপাদান থাকলে একজন ব্যক্তির বার বার প্রশংসা করতে হয় সেসব মৌলিক উপাদান রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মধ্যে পরিপূর্ণভাবে বিদ্যমান থাকায় তাঁর নাম 'মোহাম্মদ' হওয়া সার্থক হয়েছে। কেননা নাম ও কাজের মধ্যে রয়েছে পরিপূর্ণ সমন্বয় ও সামঞ্জস্যতা।
'মোহাম্মদ' ও 'আহমদ' নামদ্বয়ের মধ্যে দুদিক থেকে পার্থক্য রয়েছে।
প্রথমত : 'মোহাম্মদ যিনি তিনিই 'মাহমুদ' অর্থাৎ যিনি বার বার প্রশংসিত। 'মোহাম্মদ' শব্দটি দ্বারা প্রশংসাকারীদের (حَامِدُ) সংখ্যা বেশি পরিমাণে হওয়া বুঝায়। আর 'আহমদ' শব্দটি اِسْمِ تَفْضِيل (Superlative degree) হওয়ায় শব্দটি একথার প্রমাণ যে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চেয়ে অধিক অন্য কোনো ব্যক্তিত্ব প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য নয়। প্রশংসা পাওয়ার তিনিই হচ্ছেন যোগ্যতর ও সর্বোত্তম ব্যক্তি। 'মোহাম্মদ' শব্দের মধ্যে নিহিত সংখ্যার আধিক্য (Quantity) আর আহমাদ শব্দের মধ্যে রয়েছে মানগত ও গুণগত আধিক্য (Quality).
দ্বিতীয়ত: 'মোহাম্মদ' শব্দটি দ্বারা বার বার প্রতিবার প্রশংসা করা বুঝায়, যে কারণে তিনি 'মাহমুদ' নামেও অভিহিত। আর 'আহমদ' শব্দটি এ কথার ইংগিত যে, তিনি সৃষ্টিকর্তা মহান প্রভু দয়াময় আল্লাহ্ তায়ালা স্বয়ং তাঁর প্রশংসা করেন। দুনিয়াবাসীর যারা তাঁর প্রশংসা করেন তাদের চেয়ে মহান আল্লাহ্ শ্রেষ্ঠ হওয়া সহজেই অনুমেয়।
মোটকথা 'মোহাম্মদ' ও 'আহমদ' উভয় শব্দ একথার সুস্পষ্ট প্রমাণ যে, একজন আদর্শ লোকের জীবনের কিংবা মানব জীবনের যতোগুলো দিক ও ক্ষেত্র আছে প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি প্রশংসা পাওয়ার যোগ্যতম ব্যক্তি। উম্মতে মোহাম্মদীর স্বীয় কথায় ও কাজে তাঁর প্রশংসা করা উচিত।
📄 দশ. ‘আল শব্দের ব্যুৎপত্তি ও আহকাম
Ji (আল) শব্দটির উৎপত্তিস্থল সম্পর্কে দু'ধরনের কথা আছে।
A )১) ১। শব্দটির মূল হলো أمل পরবর্তীতে "এ" অক্ষরটি "ء" হামযায় রূপান্তরিত হয়ে "" হয়। পরিশেষে "" হামযা অক্ষরটি সহজীকরণের উদ্দেশ্যে "।" খাড়া যবর বা মদে রূপান্তরিত হয়ে "J" এ পরিণত হয়। শব্দটিকে تصغير এ প্রকাশ করতে চাইলে মূল শব্দ ফিরিয়ে আনতে হয় এবং এর রূপ হয় "أمل"
"J" শব্দটি স্থান কাল কিংবা জাতি- প্রজাতির সাথে সম্পৃক্ত হয় না। যেমন- একথা বলা ঠিক নয় যে 'আলে রাজুল' )آل رجل( পুরুষ জাতির আহল। আলে ইমরাতুন )لِ اِإمراة( স্ত্রীজাতির আহল। বংশীয় শাখা- প্রশাখাগত ব্যাপারে বংশীয় কোনো বিশিষ্ট ও সম্মানিত নামের সাথে শব্দটি 1 সম্পৃক্ত হয়ে থাকে। যেমন- বলা হয়ে থাকে 'আলে ইমরান )أَلُ عِمْرَانَ( আলে ইব্রাহীম )أَلْ إِبْرَاهِيمَ(।
'সিহাহ্' এর প্রণেতা (২) কারো মতে, "J" শব্দটির মূলধাতু হলো একথা বলেছেন। এরূপ মৌলিক অর্থবোধক হলে "JI" শব্দটি জাতির সাথে হতে পারে। তখন এর অর্থ হবে- ব্যক্তির পরিবার সম্পৃক্ত হয়ে ال الرجل পরিজন কিংবা তার অনুসরণীয়গণ।
"J" শব্দটির উৎপত্তিস্থল যদি হয় يَؤُولُاَلَ ফিরে আসা অর্থে, তাহলে الرَّجُلِ এর অর্থ দাঁড়াবে, যারা ঐ ব্যক্তির দিকে প্রত্যাবর্তন করবে, যারা তার সাথে সম্পৃক্ত হবে এবং যারা ঐ ব্যক্তিকে নিজেদের নেতা বানাবে।
কারো মতে, "১" শব্দটির "الأول" শব্দ থেকে নির্গত। শব্দটির অর্থ প্রথম বা একক। বস্তুতঃ সংখ্যার ভিত্তি ও মূল হলো এই একক বা প্রথম সংখ্যা। প্রথম সংখ্যা থেকে অবশিষ্ট শত শত সংখ্যার উৎপত্তি। এক বা প্রথমকে বাদ দিয়ে কোন সংখ্যার অস্তিত্ব চিন্তা করা যায় না। সুতরাং الرَّجُلِ বাক্যের অর্থ হবে- প্রথম বা মূল ব্যক্তির ধারা।
"آل" শব্দটির অর্থঃ (ক) স্বয়ং ব্যক্তি (খ) ব্যক্তিকে যারা অনুসরণ করে (গ) বংশ ও আত্মীয়-স্বজন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণীতে প্রথম অর্থের প্রমাণ পাওয়া যায়। তিনি সদকাসহ আগত হযরত আবু আওফা (রাঃ)-এর জন্যে দোয়া করলেন- اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى آلِ إِبِى أَوْفَى এখানে آل أبي أوفى বলতে স্বয়ং আবু আওফাকে (রাঃ) বুঝানো হয়েছে।
আল্লাহর বাণী- سَلَامُ عَلَى إِلْ يَأْسِينِ 'আলে ইয়াসীনের উপর সালাম।' (সাফফাত: ১৩০) রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّd وَعَلَى آلِ مُحَمَّd كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى الِ إِبْرَاهِيمَ
এ হাদীসে آلِ إِبْرَاهِيمَ বলতে খোদ ইব্রাহীম (আঃ)-কে বুঝানো হয়েছে। এবং إِلْ يَأْسِين বলতে ইয়াসিন (আঃ) বুঝানো হয়েছে।
অন্যান্য চিন্তাবিদগণ বলেছেন- آل শব্দটি "অনুসরণকারী” (الإتباع) এবং আত্মীয়-স্বজনগণ (الأقارب) শব্দদ্বয়ের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে থাকে।
উপরোল্লিখিত কুরআনের আয়াত এবং হাদীসে যে آل শব্দের ব্যবহার হয়েছে তদ্বারা যাদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে তাদের অনুসরণকারী ও আত্মীয়-স্বজনদেরকে বুঝানো হয়েছে।
হাদীসের كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ এ বাক্যের অর্থ সমস্ত নবীগণ উদ্দেশ্য। সমস্ত নবীগণসহ ইব্রাহীম (আঃ) সন্তানগণের উপর যেভাবে রহমত নাযিল করা হয়েছে, সেভাবে যেনো নবী আলাইহিস সালামের উপর রহমত নাযিল হয়। এখানে কেবলমাত্র ইব্রাহীম (আঃ) উদ্দেশ্য নয়।
سَلَامٌ عَلَى إِلْ يَأْسِينِ আয়াতে ال ياسين বলতে 'ইয়াসীন' হওয়ার ব্যাপারে দু'টি মত আছে। একটি মতে, ال يَاسين একটি শব্দ, অপর মতে اِلْ يَأْسِيس দু'টি শব্দ। সুতরাং এক শব্দ হলে ইয়াসীনের বংশ বা পরিবার-পরিজন হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।
"ال" শব্দটি যদি একক হয় তাহলে শব্দটির সাথে সম্পৃক্ত শব্দ (مُضَافُ إِلَيْهِ) এর অন্তর্ভুক্ত হবে। যেমন কুরআনে আছে- أَدْخِلُوا آلَ فِرْعَوْنَ إِلَى أَشَدَّ الْعَذَابِ * 'ফেরাউনের অনুসারীদেরকে ভয়ানক শাস্তির মধ্যে নিক্ষেপ করুন।' (গাফের : ৪৬)
অপর আয়াতে আছে- * وَلَقَدْ أَخَذْنَا آلَ فِرْعَوْنَ بِالسِّنِينَ এবং আমরা ফেরাউনের অনুসারীদেরকে পাকড়াও করেছি কয়েক (আরাফ : ১৩০) বৎসরের দুর্ভিক্ষের মাধ্যমে...
আয়াতদ্বয়ে ال শব্দের সাথে সম্পৃক্ত শব্দ فرعون শব্দটি আয়াতের নির্দেশের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। এমনিভাবে রাসূলের বাণীর صَلِّ عَلَى مُحَمَّd وَعَلَى آلِ مُحَمَّd ، والُ أَبِى أوفى এবং كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ 'মোহাম্মদ' ইব্রাহীম শব্দগুলো ال শব্দের অন্তর্গত হওয়ার ব্যাপারে সকলেই একমত।
অবশ্য যদি ال শব্দের পূর্বে ব্যক্তির উল্লেখ থাকে, তারপর ال শব্দের ব্যবহার হয়, তাহলে সেক্ষেত্রে শব্দটির একক ও সংমিশ্রন (مُجَرَّدٌ) (ومَقْرُونٌ) ব্যবহারের উপর সম্পৃক্ত শব্দটির অন্তর্ভুক্তি হওয়া না হওয়া নির্ভর করবে। যেমন বলা হলো- أَعْطِ لِزَيْدٍ وَآلِ زَيْدٍ অর্থাৎ যায়েদকে দাও এবং যায়েদের বংশধরদেরকে দাও। এ ক্ষেত্রে ل زيد এর মধ্যে যায়েদ অন্তর্ভুক্ত হবে না। আর যদি বলা হয় أَعْطِهِ لَالِ زَيْدٍ যায়েদের আলকে দাও। এ ক্ষেত্রে দেওয়ার নির্দেশের মধ্যে যায়েদ ও তার বংশ আত্মীয় বা অনুসরণকারীগণ শামিল হবে।
📄 এগার. নবী আলাইহিস সালামের ‘আল’ (বংশ)-এর পরিচয়
'মোহাম্মাদ' মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের (আল) বংশ বা আত্মীয় সম্পর্কে ৪টি অভিমত পাওয়া যায় :
(১) যাদের জন্যে সদকাহ, দান-খয়রাত, অনুদান হারাম করা হয়েছে তারাই রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বংশধর। এ ব্যাপারে ও আলেমগণের ৩টি মত পরিদৃষ্ট হয়। (ক) ইমাম শাফেয়ী (রঃ) ও ইমাম আহমদ (রঃ) প্রমুখ বলেছেন, তারা হচ্ছেন বনী হাশেম এবং বনী আবদুল মোতালিব।
(খ) ইমাম আবু হানীফা (রঃ) এবং ইমাম আহমদের (রঃ)-এর অপর মতানুযায়ী শুধুমাত্র বনী হাশেম হলো 'আলে মোহাম্মদ। ইমাম মালেকের (রঃ)-এর অনুসারী ইবনুল কাশেম এ মতটি সমর্থন করেছেন।
(গ) ইমাম মালেকের (রঃ) শিষ্যগণের মধ্যে 'আশহাব' এবং الْجَوَاهِرُ গ্রন্থ প্রণেতা এবং تَبْصِرَةُ( তাবসিরায় বর্ণিত আল লাখমীর মতে, আলে মোহাম্মদ হলো, বনী হাশেম থেকে আরম্ভ করে উর্ধ্বতন বনী গালিব পর্যন্ত। বনি মোতালিব, বনি উমাইয়াহ, বনি নাওফিল, বনি গালিব এসকল গোত্রসমূহ বনি হাশেমের অন্তর্গত।
(২) আলে মোহাম্মদ হচ্ছেন তাঁর সন্তান-সন্ততি এবং তাঁর বিবিগণ هُمْ ذُرِّيَّتَهُ وَأَزْوَاجُه( اَلتَّمْهِيدُ) গ্রন্থে আবু হুমাইদ আসআদীর হাদীসের ব্যাখ্যায় এ কথা বলেছেন। কতিপয় আলেম مُحَمَّd হাদীসের এ অংশ দ্বারা هُمْ ذُرِّيَّتَهُ وَأَزْوَاجُهُ আলে মোহাম্মাদ বলতে তাঁর সন্তান ও বিবিগণ হওয়ার ব্যাপারে দলিল পেশ করেছেন- اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّd وَعَلَى آلِ مُحَمَّd
এ হাদীসটির ব্যাখ্যা হলো আবু হোমাইদের বর্ণিত হাদীস'। হাদীসটি হলো اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّd وَأَزْوَاجِهِ وَذُرِّيَّتِهِ
আল্লাহ্! তুমি রহমত বর্ষণ কর মোহাম্মদ এবং তার সন্তান-সন্ততি ও তাঁর বিবিগণের উপর।”
الال এবং الأَهْلُ শব্দদ্বয় সমভাবাপন্ন। আল ও আহল হচ্ছেন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সন্তান এবং বিবিগণ। প্রায় সকল ইমামগণের মতে এরূপ দোয়া করা জায়েয।
(৩) 'আলে মোহাম্মাদ' হচ্ছেন কিয়ামত অবধি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসরণ ও অনুকরণকারীগণ। এ মতের সমর্থনকারীগণ হচ্ছেন-
ইবনে আবদুল বার। তিনি বিজ্ঞ লোকদের উদ্ধৃতিসহ একথা বলেছেন। যায়েদ বিন আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে এ সম্পর্কে হাদীস বর্ণিত আছে। বায়হাকী তাঁর থেকে এগুলোর উল্লেখ করেছেন। সুফিয়ান সাওরী (রঃ) তার থেকে রেওয়ায়াত করেছেন। ইমাম মালেকের (রঃ) কতিপয় শাগরিদ একথার সমর্থন দিয়েছেন। আবু তাইয়েব তাবারী তার تَعْلِيق গ্রন্থে এ কথার উল্লেখ করেছেন। ইমাম নববী (রঃ) 'শরহে মুসলিম' এ একথার গুরুত্ব দিয়েছেন এবং আল আযহারী একথা গ্রহণ ও সমর্থন করেছেন।
(৪) 'আলে মোহাম্মদ' হচ্ছেন নবী আলাইহিস সালামের উম্মতগণের মধ্যে যারা মোত্তাকী, পরহেজগার, আল্লাহভীরু তারা। যাঁদের হৃদয় আল্লাহর ভয় ও রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাস্তব ও অকৃত্রিম প্রেম-প্রীতি ও ভালোবাসায় আপ্লুত তারাই হচ্ছেন আলে রাসূল। এ মত পোষণ করেছেন কাযী হোসাইন, রাগিব এবং একদল বিশেষ আলেম।
📄 বার. রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিবিগণ
উপরে বলা হয়েছে যে, দুরূদে পঠিত (اَل ) শব্দটির দ্বারা (اَزْوَاجُهٗ) রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিবিগণ উদ্দেশ্য। এবার তাঁর বিবিগণের বৈশিষ্ট্য ও ফজিলত সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধরা হলো।
(১) খাদীজাহ্ বিনতু খুওয়াইলিদ (রাঃ) ঃ উর্ধ্বতন বংশ ও পিতৃ পরিচয়ে তাঁর নাম ছিল খাদীজাহ্ বিন্তু খুওয়াইলিদ বিন আসাদ বিন আবদুল ওজ্জা বিন কুসাই বিন কিলাব। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ২৫ বৎসর বয়স কালে তাঁকে বিবাহ করেন। তখন খাদীজার (রাঃ)-এর বয়স ছিল ৪০ বৎসর। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মদীনায় হিজরতের ৩ বৎসর মতান্তরে ৪/৫ আগে খাদীজাহ্ (রাঃ) ইন্তেকাল করেন। জীবনের শেষ লগ্ন পর্যন্ত তিনি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সংগে ছিলেন। চরম দুর্দিনে তিনি ছিলেন রাসূলের জীবন সঙ্গীনি, সাহায্যকারী, পরামর্শদাতা, এবং সান্তনা দানকারী। ৬৫ বৎসর তিনি বেঁচে ছিলেন।
তাঁর মর্যাদা: * তাঁর জীবিতাবস্থায় রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আর কাউকে বিবাহ করেননি। * নবী তনয় একমাত্র ইব্রাহীম ছাড়া আর সব ছেলে-মেয়ে খাদীজার (রঃ) ঔরসে জন্মলাভ করেন। ইব্রাহীম (রাঃ) মারীয়ার (রাঃ) ঔরসে জন্ম নেন। * উম্মতে মোহাম্মাদীর তিনি হচ্ছেন শ্রেষ্ঠ নারী। * আল্লাহ্ তায়ালা জিব্রাইল (আঃ)-এর মারফতে হযরত খাদীজার (রাঃ) কাছে 'সালাম' পাঠিয়েছেন। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর 'সালাম' পৌছে দেন। * হযরত আবু হোরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেন- أَتَى جِبْرِيلُ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ : يَا رَسُولَ اللَّهِ هُذِهِ خَدِيجَةُ قَدْ أَتَتْ مَعَهَا إِنَاءٍ فِيهِ إِدَامُ أَوْ طَعَامُ أَوْ شَرَابٌ .
فَإِذَا هِيَ أَتَتْكَ فَاقْرَأْ عَلَيْهَا السَّلَامَ مِنْ رَبِّهَا وَمِنِّي - وَبَشِّرْهَا بَيْتًا فِي الْجَنَّةِ مِنْ قَصَبِ لَا صَخَبَ فِيهِ وَلَا نَصَبَ *
জিব্রাইল (আঃ) রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে বললেন- ইয়া রাসূলাল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! খাদীজাহ (রাঃ) আপনার কাছে পাত্রভর্তি কিছু খাদ্য নিয়ে আসতেছেন। তিনি আসলে তাঁর রব এবং আমার পক্ষ থেকে তাকে সালাম বলবেন এবং তাঁকে এমন মনিমুক্তা খচিত জান্নাতের শুভসংবাদ দিবেন যেখানে সুখ আর সুখ। অসুস্থ ও অশান্তির লেশ মাত্র নেই।" (বুখারী, মুসলিম: ۱۴۶۳)
* তিনি ছিলেন প্রথমা ঈমানদার মহিলা সাহাবী, প্রথমা উম্মুল মুমিনীন, প্রথমা গর্ভধারিনী মুমিনীন জননী।
(২) সাওদাহ বিনতে যামআ (রাঃ): হযরত খাদীজা (রাঃ) মৃত্যুর পর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত সাওদাহ্ বিনতে যামআকে (রাঃ) বিবাহ করেন। খাদীজার (রাঃ) মৃত্যু হলে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিষন্ন হয়ে পড়েন। মাতৃহারা সন্তানদের লালন-পালন ও সাংসারিক কাজ-কর্ম গুছানোর কাজ করা দুরূহ হয়ে উঠে। এ অবস্থা দর্শনে ইবনে মাযউনের স্ত্রী খাওলাহ (রাঃ) বিনতে হাকীম সাকরান ইবনে আমরের (রাঃ) বিধবা স্ত্রী সাওদাহকে (রাঃ) বিবাহের প্রস্তাব দিলে তিনি তা গ্রহণ করেন। পিতা-মাতা মেয়ে সাওদাহকে (রাঃ) ৪শ দিরহাম মহরানার বিনিময়ে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে বিয়ে দেন।
সাওদাহ (রাঃ) ছিলেন দীর্ঘদেহী। রাগ একটু বেশি হওয়ার দরূণ মেজাজ একটু কড়া থাকলেও উদারতা ও দানশীলতায় তা ঢাকা পড়ে যায়। তিনি গরীবদেরকে অকাতরে বিলিয়ে দিতেন। খাদ্য টাকা-পয়সা কখনো তিনি জমা করতেন না। তাঁর মধ্যে হিংসা দ্বেষ, পরশ্রীকাতরতার লেশমাত্র ছিল না।
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে বিবাহের পর তার ঔরশে কোনো সন্তান হয়নি। সাকরানের (রাঃ) ঔরশজাত একটি পুত্র সন্তান ছিল। নাম ছিল আবদুর রহমান (রাঃ)। তিনি হযরত ওমরের (রাঃ) শাসনামলে জালুলার যুদ্ধে বীরত্বের সাথে লড়াই করে শাহাদত বরণ করেন। ২য় খলীফা হযরত ওমরের (রাঃ) শাসনামলের শেষদিকে তিনি ইন্তিকাল করেন।
(৩) হযরত আয়েশা বিনতে আবু বকর (রাঃ):
হযরত আবুবকরের (রাঃ) কন্যা হযরত আয়েশার (রাঃ) মায়ের নাম ছিল উম্মে রূম্মান। চরম বর্বরতার পরিবেশেও আবু বকরের (রাঃ) পরিবার ছিল জাহিলিয়াত মুক্ত, স্বচ্ছ ও পরিচ্ছন্ন। এ পরিবেশেই লালিত হয়েছিলেন হযরত আয়েশা (রাঃ)।
৬ বৎসর বয়সকালে নবীর সাথে তাঁর বিয়ে হয়। বিয়ের ৩ বৎসর পর তিনি মদিনায় হিযরত করেন। পিতা আবুবকর (রাঃ) মেয়েকে নবীর সাথে বিবাহ দিতে সক্ষম হওয়ায় খুবই তৃপ্ত হোন। এ সম্পর্ক ছিল তার জন্যে একটি গৌরব ও মর্যাদার ব্যাপার।
বৈশিষ্ট্যসমূহ:
(ক) হযরত আয়েশা (রাঃ) ছিলেন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একমাত্র কুমারী পত্নি। অন্যান্য সকলেই ছিলেন বিধবা।
(খ) তাঁর পবিত্রতা ও নিষ্কলুতার ব্যাপারে কুরআনের আয়াত নাযিল হয়। ইফক বা মিথ্যা অপবাদের কাহিনী একথার স্বাক্ষর।
(গ) তাঁর ঘরে আবস্থানকালে রাসূলের কাছে ওহী আসতো। অন্য বিবিদের বেলায় এরূপ হতো না।
(ঘ) তাঁর কোলেই রাসূলের ওফাত হয়।
(ঙ) তাঁর গৃহেই রাসূলের দাফন কাজ সম্পন্ন হয়। মদীনায় আজকের রওজা মুবারক হযরত আয়েশার (রাঃ) গৃহ ছিল।
(চ) রাসূলের সাথে তাঁর বিবাহ হয়েছিল স্বাপ্নিক নির্দেশে। ইফকের ঘটনা, তাহরীমের ব্যাপার এবং তাখয়ীরের প্রসঙ্গে যেসব আয়াত নাযিল হয়েছে, সেগুলো তাঁকে কিয়ামত পর্যন্ত অমর করে রাখবে।
তাঁর স্বভাব প্রকৃতি :
অতিথি পরায়ণতা, দানশীলতা ও দরিদ্র সেবায় তিনি ছিলেন সমধিক প্রসিদ্ধ। রাসূলের অনুপস্থিতিতে বনু শফক গোত্রের প্রতিনিধি দলের মেহমানদারী করার ঘটনা ছিল তাঁর অতিথি পরায়ণতার স্বাক্ষর। এমনিভাবে তাঁর কাছে আসা ৭০ হাজার দিরহাম এক নাগাড়ে গরীবের মাঝে বিলিয়ে দিয়ে তিনি দানশীলতার নজীর স্থাপন করেন। ইফতারের পূর্ব মূহুর্তে মিসকীনের হাঁকে ঘরে থাকা সমুদয় খাদ্য তাকে দান করে দরিদ্র সেবার পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছেন। বোনের পুত্র হযরত আবদুল্লাহ বিন যোবায়ের খালাম্মার এরূপ বদান্যতায় ও উদারতায় বিরক্ত হওয়ার খবর পেলে তিনি ভাগীনের সাথে কথা না বলার কসম করেন। পরে তিনি ৪০টি গোলাম আযাদ করে এ কসম ভংগ করে ভাগিনার সাথে কথা বলেন।
জ্ঞানের ক্ষেত্রে হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর অবদানঃ
হযরত আয়েশা (রাঃ) ছিলেন অসাধারণ জ্ঞানের অধিকারী। তাঁর মেধা ছিল তীক্ষ্ণ, বুদ্ধি ছিল প্রখর। কুরআনে করিমের অনেক আয়াতের তিনি অত্যন্ত যুক্তিগ্রাহ্য ব্যাখ্যা দিয়েছেন। একটি হাদীসে কুরআন সম্পর্কে তাঁর অগাধ জ্ঞানের কথা প্রমাণিত হয়।
মাসরূক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বললেন- আয়েশা (রাঃ) বলেছেন- এমন তিনটি কথা আছে যা বললে আল্লাহ্র উপর মিথ্যারোপ করা বুঝায়। প্রথমতঃ রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহকে প্রত্যক্ষ দেখার কথা বলা। কেননা কুরআনে আছে-
وَمَا كَانَ لِبَشَرٍ أَنْ يُكَلِّمَهُ اللهُ إِلَّا وَحْيًا أَوْ مِنْ وَرَاءِ حِجَابٍ أو يُرْسِلَ رَسُولاً فَيُوحِي بِإِذْنِهِ مَا يَشَاءُ - إِنَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ -
“কোনো মানুষের জন্যে এটা সম্ভব নয় যে, অহী অথবা পর্দার আড়াল কিংবা আল্লাহরই কোনো প্রেরিত দূত- যে তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী ওহী নিয়ে আসবে, এ ছাড়া আল্লাহ্ অন্য কারো সাথে কথা বলবেন। নিশ্চয়ই তিনি মহান ও বিজ্ঞ।” (সূরা শুরা: ৫১)
উপরোক্ত আয়াতের পরিপ্রেক্ষিতে নিম্নোক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় তিনি বলেন- এ আয়াতের মর্মার্থ সম্পর্কে আমিই সর্বপ্রথম নবীকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। তিনি বলেছেন, আমি যাকে দেখেছি তিনি ছিলেন জিব্রাইল (আঃ)। আমি তাঁকে তাঁর আসল আকৃতিতে দুবার দেখেছি। আয়াতটি হলো-
وَلَقَدْ رَاهُ بِالْأُفُقِ الْمُبِينِ - وَلَقَدْ رَاَهُ نَزْلَةً أُخْرَى *
“নিশ্চয়ই সে সমুজ্জল দিগন্তে তাকে দেখেছে এবং নিশ্চয়ই সে আর একবার তাকে প্রত্যক্ষ করেছে।" (নাজম: ১৩, ১৫)
দ্বিতীয় কথা হলো, যে ব্যক্তি মনে করে, আল্লাহ্র রাসূল কোনো কিছু গোপন করেছেন। এরূপ ধারণা পোষণ করা আল্লাহ্র উপর দোষ আরোপ করার নামান্তর। কারণ আল্লাহ বলেছেন-
يَا أَيُّهَا الرَّسُولُ بَلِّغْ مَا أُنْزِلَ إِلَيْكَ مِنْ رَّبِّكَ وَإِنْ لَّمْ تَفْعَلْ فَمَا بَلَّغْتَ رِسَالَتَهُ *
“হে রাসূল! আপনার কাছে আপনার রবের পক্ষ থেকে যা কিছু অবতীর্ণ করা হয়েছে তার সবটুকুই মানুষের কাছে পৌঁছে দিন। আপনি যদি এরূপ না করেন, তাহলে আল্লাহর রিসালাত আপনি পৌছে দিতে পারলেন না।” (মায়িদা: ৬৭)
আগামীকাল কিছু হওয়ার আগাম কথা জানা থাকার ধারণা পোষণ করা আল্লাহর উপর মিথ্যারোপের তৃতীয় কথা। কারণ কুরআনে আল্লাহ বলেছেন-
قُلْ لَا يَعْلَمُ مَنْ فِي السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ الْغَيْبَ إِلَّا اللَّهُ *
“হে নবী! আপনি বলে দিন, আল্লাহ্ ছাড়া আসমান-যমীনের কেহই অদৃশ্যের জ্ঞান রাখে না।” (নামল: ৬৫)
হাদীস সংরক্ষণ ও সংকলনে তাঁর অবদানঃ রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তেকালের পর হযরত আয়েশা (রাঃ) দীর্ঘ ৩৯ বছর বেঁচে ছিলেন। ফলে তিনি অনেক হাদীস সংরক্ষণ সংকলন করার সুযোগ পান। বহু সংখ্যক সাহাবী ও তাবেয়ী তাঁর থেকে হাদীস রেওয়ায়েত ও সংগ্রহ করেন।
ইমাম যুহরী (রঃ) লিখেছেন- لَوْ جُمِعَ عِلْمُ النَّاسِ كُلِّهِمْ وَعِلْمُ أَزْوَاجِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَكَانَتْ عَائِشَةُ أَوْسَعُهُمْ عِلْمًا *
“সকল মানুষের এবং উম্মুল মুমিনীনের সকল ইলম যদি একত্র করা হয়, তাহলে হযরত আয়েশার (রাঃ) ইলম হবে তাদের চেয়ে বেশি।”
হাদীস বর্ণনা করার সংখ্যার দিক থেকে প্রথম ছিলেন হযরত আবু হোরাইরাহ্ (রাঃ)। ২য় ছিলেন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ)।
তৃতীয় স্থান ছিল হযরত আয়েশা (রাঃ)-র। তাঁর সূত্রে বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা হলো ২২১০টি। ১৭৪ টি হাদীস আছে বুখারী, মুসলিমে। আলাদাভাবে বুখারীতে আছে ৫৪টি এবং মুসলিম শরিফে আছে ৫৮টি।
শ্রেষ্ঠ উম্মত হযরত আবু বকরের (রাঃ) আদরের দুলারী সাইয়্যেদুল মুরসালীন শ্রেষ্ঠ নবী মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভাগ্যবতী পত্নী বিশ্বখ্যাত মু'মেনীন জননী হযরত আয়েশা সিদ্দীকাহ্ (রাঃ) ৫৭ মতান্তরে ৫৮ হিজরী সনের ১৭ই রমযান মঙ্গলবার দিবাগত রাতে ৬৭ বৎসর বয়সে ইহধাম ত্যাগ করেন। তাঁর কোনো সন্তান ছিল না। হযরত আবু হোরাইরাহ (রাঃ) তাঁর নামাযে জানাযার ইমামতি করেন। তৎকালীন সময়ে অন্য কারো জানাযায় এতো লোকের সমাগম হয়নি।
(৪) হযরত হাফসা বিনতে ওমর (রাঃ): মুসলিম জাহানের ২য় খলীফা হযরত ওমরের (রাঃ) কন্যা হাফসা (রাঃ) ছিলেন উম্মুল মুমিনীনদের একজন। তাঁর প্রথম স্বামী ছিলেন খুনাইস (রাঃ)। ওহুদের যুদ্ধে বীর বিক্রমের মতো লড়াই করতে গিয়ে তিনি মারাত্মকভাবে আহত হন। এই আহতের কারণে তিনি কয়েকদিন পর ইহধাম ত্যাগ করেন।
হাফসা (রাঃ) বিধবা হলে হযরত ওমর (রাঃ) তাঁকে পুনরায় বিবাহ দেয়ার চিন্তা করেন। এ সুবাদে হযরত আবুবকর (রাঃ) এবং ওসমান (রাঃ)-এর সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক স্থাপন করার মহৎ উদ্দেশ্যে তিনি তাদেরকে পর্যায়ক্রমে কন্যা হাফসাকে (রাঃ) বিবাহ করার প্রস্তাব দেন। তাঁরা অপারগতা প্রকাশ করলে তিনি মনঃক্ষুন্ন হয়ে রাসূলের দরবারে গিয়ে মনের কথা খুলে বললেন। ওমরের (রাঃ) সব কথা শুনে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হাফসার (রাঃ) বিয়ে আবু বকর (রাঃ) এবং ওসমানের (রাঃ) উভয় থেকে উত্তম ব্যক্তির সংগে হবে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বিয়ে করেন। এদিকে ওসমানের (রাঃ) স্ত্রী রাসূল তনয়া রোকাইয়াহ্ (রাঃ) ইন্তেকাল করলে রাসূলের তনয় ২য় কন্যা হযরত উম্মে কুলসুমকে (রাঃ) হযরত ওসমানের (রাঃ) সাথে বিয়ে দেন।
চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যঃ সহীহ বুখারীর বর্ণনা মতে, হযরত হাফসাহ (রাঃ)-এর মেজাজ কিছুটা কড়া ছিল এবং মাঝে মধ্যে চড়া ভাষায় নবীর সাথে কথা বলতেন। একথা শুনার পর হযরত ওমর (রাঃ) স্বীয় কন্যাকে ধমকের সুরে বললেন- হে হাফসাহ! সাবধান! আমি তোমাকে আল্লাহর ভয় দেখাচ্ছি। আয়েশার (রাঃ) সমকক্ষ হতে চেষ্টা কর।
তিনি ছিলেন আল্লাহ্ ভীরু। বেশীর ভাগ সময় ইবাদতে কাটাতেন। বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সামনে হযরত জিব্রাইল (আঃ) হাফসাহ (রাঃ) সম্পর্কে বলেছেন- সে খুব ইবাদতকারী, রোযাদার। তিনি জান্নাতেও আপনার স্ত্রী হওয়ার সৌভাগ্যবতী হবেন। হিজরী ৪৫ সনের শাবান মাসে মদীনায় ইন্তেকাল করেন। জান্নাতুল বাকীতে তাঁকে দাফন করা হয়। তিনি ছিলেন নিঃসন্তান।
(৫) হযরত যয়নব বিনতে খোযাইমাহ (রাঃ): ওহুদের প্রান্তরে শাহাদত বরণকারী উঁচু দরজার সাহাবী আব্দুল্লাহ্ বিন জাহাশের (রাঃ) সাথে যয়নব বিনতে খোযাইমার (রাঃ) প্রথম বিবাহ হয়। আবদুল্লাহ ছিলেন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ফুফাতো ভাই। যুদ্ধে যাওয়ার প্রাক্কালে তিনি আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করলেন এভাবে- 'হে আল্লাহ! আমাকে এমন বাহাদুর শত্রুর মুকাবিলা কর যার সাথে আমি যুদ্ধ করবো অত্যন্ত তীব্র গতিতে। আমি যুদ্ধে শহীদ হলে সে রাগে রোষে আমার নাক, কান ঠোঁট কেটে ফেলবে। আর আমি এ অবস্থাতেই হাশরের মাঠে তোমার সাথে সাক্ষাৎ করতে চাই। হে আল্লাহ! তুমি আমার এ অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে আমি আরজ করবো, তোমার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সন্তুষ্টির জন্যে। বস্তুতঃ তাকে এ অবস্থাতেই যুদ্ধের ময়দানে পাওয়া যায়।'
হযরত আবদুল্লাহ বিন জাহাশের (রাঃ) শাহাদতের পর ঐ বৎসরই রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিধবা যয়নবকে (রাঃ) ৫ দিরহাম মহরানা ধার্য করে বিবাহ করেন। তখন তাঁর বয়স ছিল ৩০ বসর। বিবাহের ২/৩ মাসের মধ্যেই তিনি ইন্তেকাল করেন। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর জানাযার ইমামতি করেন। জান্নাতুল বাকীতে তিনি চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন।
ফকীর-মিসকীন অভাবগ্রস্তদেরকে উদারহস্তে দান করতেন বলে তিনি উম্মুল মাসাকীন বা গরীবের জননী রূপে খ্যাত ছিলেন।
(৬) হযরত উম্মে সালমাহ (রাঃ): আবু উমাইয়ার কন্যা নবীপত্নি হযরত উম্মে সালমাহ (রাঃ) ছিলেন কুরাইশের বনী মাখযুম গোত্রের সাথে সম্পৃক্ত। মাতা ছিলেন আতিকা বিনতে আমের (রাঃ)।
উম্মে সালমার (রাঃ) ১ম বিয়ে হয় আপন চাচাতো ভাই আবদুল্লাহর সাথে। স্বামী-স্ত্রী উভয়েই হাবশায় হিজরত করেছিলেন। বদর ও ওহুদ যুদ্ধে হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) অংশগ্রহণ করেন। ওহুদ যুদ্ধে আহত হয়ে তিনি শহীদ হন।
স্বামীর শহীদ হওয়ার পর তাঁর অসহায়ত্বের কথা বিবেচনা করে হযরত আবু বকর (রাঃ) তাঁকে বিবাহের প্রস্তাব দেন। তিনি অমত প্রকাশ করলে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওমর ফারুকের (রাঃ) মারফতে তাঁকে বিবাহের প্রস্তাব দিলে তিনি সম্মত হোন। ৪র্থ হিজরীর শাওয়াল মাসে বিবাহ হয়।
উম্মে সালমাহ (রাঃ) ছিলেন সাহিত্যিক, বাকপটু, তীক্ষ্ম মেধার অধিকারিণী। ৮৪ বছর বয়সে ৭৩ হিজরীতে তিনি ইন্তেকাল করেন। হযরত আবু হোরাইরাহ (রাঃ) তাঁর সালাতুল জানাযায় ইমামতি করেন।
(৭) হযরত যয়নব বিনতে জাহাশ (রাঃ): হযরত যয়নবের (রাঃ) পিতা ছিলেন জাহাশ বিন রিয়াব। আর মাতা ছিলেন উমাইয়া বিনতে আবদুল মোত্তালিব। তাঁর ১ম বিবাহ হয়েছিল রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আযাদকৃত গোলাম যায়েদ বিন হারিসের (রাঃ) সাথে। নবীর নির্দেশে বিবাহ সম্পন্ন হলেও অসমতা ও গোত্রীয় কৈলন্যবোধের কারণে বিবাহ বেশীদিন স্থায়ী হয়নি। যায়েদ (রাঃ) তাঁকে তালাক দেন।
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মনঃক্ষুন্ন তালাক প্রাপ্তা যয়নবকে (রাঃ) বিবাহ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। এ বিবাহের উদ্দেশ্য ছিল দু'টি (ক) হযরত যয়নবের (রাঃ) ক্ষোভ ও ক্ষেদের অবসান (খ) দত্তক পুত্র ঔরশজাত পুত্র হওয়ার ভ্রান্ত ধারণা নিরসন।
সেকালে পালক পুত্রকে আপন পুত্র মনে করা হতো। এটা ছিল কাহিনী ও ভ্রান্ত ধারণা। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পালক পুত্রের তালাক প্রাপ্তা স্ত্রীকে বিবাহ করে এ ধারণা বিলোপ করেন। কেননা আপন পুত্র হলে তাঁকে বিবাহ করা জায়েজ হতো না। এ পর্যায়ে আয়াত নাযিল হয়-
مَا كَانَ مُحَمَّd أَبَا أَحَدٍ مِنْ رِجَالِكُمْ وَلَكِنْ رَسُولَ اللَّهِ وَخَاتَمَ النَّبِيِّينَ *
“তোমাদের পুরুষদের মধ্যে মুহাম্মদ কারো পিতা নন বরং তিনি আল্লাহর রাসূল এবং শেষ নবী।” 66
মহান আল্লাহ আরো বলেছেন-
فَلَمَّا قَضَى زَيْدٌ مِنْهَا وَطَراً زَوَّجْنَكَهَا لِكَيْ لَا يَكُونَ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ حَرَجٌ فِي أَزْوَاجِ أَدْعِيَائِهِمْ إِذَا قَضَوْ مِنْهُنَّ وَطَرًا - وَكَانَ أَمْرُ اللَّهِ مَفْعُولاً *
“অতঃপর যায়েদ যখন তার কাছ যায় না থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করে নিল, তখন আমি তাকে তোমার কাছে বিয়ে দিলাম। যাতে প্রয়োজন পূরণ করার পর মুখ ডাকা পুত্রের স্ত্রীদের ব্যাপারে মুমিনদের উপর কোনো দোষারোপ করা না চলে। আল্লাহ্র ইচ্ছা তো পূর্ণ হবেই। (আহযাব: ৩৭)
হযরত ওমর (রাঃ)-এর শাসনামলে ২০ হিজরী সনে ৫৩ বৎসর বয়স কালে হযরত যয়নব বিনতে জাহাশ (রাঃ) ইহধام ত্যাগ করেন। হযরত ওমর (রাঃ) তাঁর সালাতুল জানাযায় ইমামতি করেন। জান্নাতুল বাকিতে তিনি শুয়ে আছেন। ১১টি হাদীস তাঁর থেকে বর্ণিত আছে।
(৮) হযরত যুবাইরিয়াহ বিনতে হারিস (রাঃ)ঃ নবীপত্নী যুবাইরিয়াহর (রাঃ) নাম ছিল বারা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ নাম পরিবর্তন করে রাখেন যুবাইরিয়াহ। তিনি গোত্র নেতার কন্যা ছিলেন। ৫ হিজরী সনে বনু মোস্তালিক যুদ্ধে গনীমতের মাল হিসেবে বন্দী হয়ে নীত হন। বন্টনে তিনি সাবিত বিন কয়েসের ভাগে পড়েন। দাসত্ব জীবন ছিল তাঁর জন্যে অপমানজনক। তাই তিনি মুদ্রার বিনিময়ে মুক্ত হতে চাইলেন। রাসূল তাঁকে ক্রয় করতঃ মুক্ত করে দেন এবং স্বীয় স্ত্রীরূপে গ্রহণ করেন।
এদিকে যুবাইরিয়ার (রাঃ) গোত্র নেতা বারা কন্যার বন্দী হওয়ার কথা শুনে কয়েকটি উট বোঝাই সম্পদ নিয়ে মদীনায় উপস্থিত হোন। কন্যা নবী পত্নি হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছেন এবং পথিমধ্যে নবীর আশ্চর্যজনক ঘটনায় অভিভূত হয়ে তিনি ইসলাম গ্রহণ করে কন্যাকে দেখে খুশি মনে গৃহে ফিরে যান।
হযরত যুবাইরিয়াহ (রাঃ) লাজুক প্রকৃতির ও সুন্দর আকৃতি সম্পন্ন ছিলেন। দৈহিক গড়ন ছিল চমৎকার, স্বভাব ছিল নমনীয়। চেহারা ছিল শ্রদ্ধা মিশ্রিত কান্তিময়। অধিকাংশ সময় ইবাদতে কাটাতেন। হিজরী ৫০ সনে ৬৫ বৎসর বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন। মদীনার তৎকালীন শাসক মারওয়ান ইবনুল হাকام তাঁর সালাতুল জানাযায় ইমামতি করেন। জান্নাতুল বাকিতে তিনি চিরনিদ্রায় শুয়ে আছেন।
(৯) হযরত উম্মে হাবীবাহ (রাঃ):
আবু সুফিয়ানের (রাঃ) কন্যা উম্মে হাবীবাহর (রাঃ) আসল নাম 'রামলা'। তবে তিনি 'উম্মে হাবীবাহ' উপনামে খ্যাত ছিলেন।
উম্মে হাবীবাহ (রাঃ) প্রথমতঃ যয়নব বিনতে জাহাশের (রাঃ) ভাই ওবায়দুল্লাহর সাথে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হোন। তারা উভয়েই হাবশায় হিজরত করেন। পরবর্তিতে ওবায়দুল্লাহ ধর্মান্তরিত হয়ে খৃষ্টান হয়ে যায়। ফলে স্বামীর সাথে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
উম্মে হাবীবাহর (রাঃ) নিঃসগ্ন জীবনে সঙ্গ দেয়ার উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বিবাহ করার প্রস্তাব দিলে তিনি সানন্দে গ্রহণ করেন। ৪শ দিনার মহরানা ধার্য করে বিবাহ সম্পন্ন করা হয়।
তিনি খুব নরম স্বভাবের লোক হওয়া সত্ত্বেও ঈমানী চেতনায় ছিলেন প্রদীপ্ত। পিতা আবু সুফিয়ানকে ইসলাম গ্রহণের আগ পর্যন্ত রাসূলের বিছানায় বসার সময় বিছানা উল্টে দিতেন। কারণটা তিনি নিজেই বললেন: একজন মুশরিকের (স্বীয় পিতা) নবীর বিছানায় বসা আমি পছন্দ করি না। ঈমানী চেতনায় তেজোদীপ্ত একটি হৃদয় থেকে এরূপ কথারই বহিপ্রকাশ ঘটে থাকে। হিজরী ৫৪ সালে ৭৩ বৎসর বয়স কালে তিনি ইহধাম ত্যাগ করেন।
(১০) হযরত সাফিয়াহ বিনতে হুইয়াহ (রাঃ):
সাফিয়াহর পিতা ছিলেন হুইয়াহ বিন আখতাব। পিতা ও দাদা ইহুদী সম্প্রদায়ের শীর্ষস্থানীয় নেতা ছিলেন। খায়বার যুদ্ধে মুসলমানদের কাছে ইহুদী ও মুশরিকগণ পরাজিত হলে অন্যান্যদের ন্যায় হযরত সাফিয়াহ বন্দী হোন। এ যুদ্ধে তার পূর্ব স্বামী কিনান বিন অকাল নিহত হয়।
যুদ্ধলব্ধ মালামাল বণ্টনের সময় দাহিয়া কালবী (রাঃ) একজন দাসীর প্রয়োজনীয়তার কথা রাসূলের কাছে ব্যক্ত করলে তিনি তার পছন্দ মতো একজনকে বেছে নেয়ার অনুমতি প্রদান করেন। দাহিয়া (রাঃ) সাফিয়াকে পছন্দ করেন। সাফিয়াহ (রাঃ) কৌলিন্য ও মর্যাদার দিক থেকে দাহিয়া (রাঃ) সাথে সামঞ্জস্যশীল না হওয়ার কথা উপস্থিত সাহাবাগণ ব্যক্ত করলেন এবং তাঁকে খোদ রাসূলের জন্যই মানানসই বলে অভিমত প্রকাশ করেন। সাহাবাগণের পরামর্শের ভিত্তিতে হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বিবাহ করেন। তিনি ছিলেন বুদ্ধিমতী, মর্যাদাবান ও ধৈর্য্যশীলা। ৬০ বৎসর বয়সে ৫০ হিজরী সনে তিনি ইন্তেকাল করেন। জান্নাতুল বাকীতে তাকে দাফন করা হয়।
(১১) হযরত মাইমুনাহ বিনতে হারিস (রাঃ)ঃ
হযরত মাইমুনাহ (রাঃ) ছিলেন হারিস বিন হামযার কন্যা। তাঁর ১ম বিবাহ হয় মাসউদ বিন আমরের সাথে। কোন কারণে তাদের মধ্যে ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। ২য় বিবাহ হয় আবু রেহেমের সাথে। ৭ম হিজরী সনে ২য় স্বামীর মৃত্যু হয়।
৭ম হিজরীতে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওমরার উদ্দেশ্যে মদীনা থেকে মক্কায় রওয়ানা হোন। এ সময় চাচা আব্বাসের (রাঃ) অনুরোধক্রমে তিনি মাইমুনাকে বিবাহ করেন। এটাই ছিল রাসূলের শেষ বিবাহ।
তিনি আল্লাহর আদেশ নিষেধ পালনে ছিলেন খুবই হুশিয়ার। এ ব্যাপারে তিনি কখনো কাউকে ছাড় দিতেন না। আত্মীয়-স্বজনদের সাথে তিনি সদ্ভাব বজায় রেখে চলতেন।
৫১ হিজরী সনে তিনি ইহলোক ত্যাগ করেন। যে স্থানে তাঁর বিয়ের অনুষ্ঠান হয়েছিল সেখানেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।