📄 সাত. ‘সালাত’ এর হাদীসসমূহের রাবীগণ
মোহাম্মাদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর 'সালাত' বা দুরুদ পাঠের হাদীস গুলো যাঁরা রেওয়ায়েত করেছেন তাঁদের নামের একটি তালিকা নিম্নরূপ:
(১) আবু মাসউদ ওকবাহ বিন আমর আল আনসারী আল বদরী (রাঃ)
(২) কাব ইবনে ওযরাহ (রাঃ)
(৩) আবু হোমাইদ আস সায়াদিয়ী (রাঃ)
(৪) আবু সায়ীদ আল খুদরী (রাঃ)
(৫) তালহা বিন ওবাইদুল্লাহ (রাঃ)
(৬) যায়িদ বিন হারিসা (রাঃ) তাঁকে ইবনি খারিজাহ নামেও ডাকা হতো।
(৭) আলী ইবনে আবু তালিব (রাঃ)
(৮) আবু হোরাইরাহ (রাঃ)
(৯) বোরাইদাহ বিন আল হোছাইব (রাঃ)
(১০) মহল বিন সায়াদ আস সায়াদী (রাঃ)
(১১) আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ)
(১২) ফাদালাহ বিন ওবাইদ (রাঃ)
(১৩) আবু তালহা আনসারী (রাঃ)
(১৪) আনাস বিন মালিক (রাঃ)
(১৫) ওমর বিন খাত্তাব (রাঃ)
(১৬) আমির বিন রাবিয়্যাহ্ (রাঃ)
(১৭) আবদুর রহমান বিন আউফ (রাঃ)
(১৮) উবাই বিন কাব (রাঃ)
(১৯) আউস বিন আউস (রাঃ)
(২০) হাসান হোসেন বিন আলী (রাঃ)
(২১) ফাতিমা বিনতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (রাঃ)
(২২) আল বারা বিন আযিব (রাঃ)
(২৩) রুবাইফাআ বিন সাবিত আনসারী (রাঃ)
(২৪) যাবির বিন আবদুল্লাহ (রাঃ)
(২৫) আবু রাফি (মাওলা মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) (রাঃ)
(২৬) আবদুল্লাহ বিন আবু আউফা (রাঃ)
(২৭) আবু উমামাহ আল বাহিলী (রাঃ)
(২৮) আবদুর রহমান বিন বশীর বিন মাসউদ (রাঃ)
(২৯) আবু বোরদাহ বিন নিয়ার (রাঃ)
(৩০) আম্মার বিন ইয়াসীর (রাঃ)
(৩১) যাবির বিন সামুরাহ (রাঃ)
(৩২) আবু উমামাহ বিন সহল ইবনে হানীফ (রাঃ)
(৩৩) মালিক বিন হোবাইরাস (রাঃ)
(৩৪) আবদুল্লাহ বিন জাযায়িয যাবিদী (রাঃ)
(৩৫) আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ)
(৩৬) আবু যর (রাঃ)
(৩৭) ওয়াসিলাহ্ বিন্ আল আসকা (রাঃ)
(৩৮) আবুবকর সিদ্দীক (রাঃ)
(৩৯) আবদুল্লাহ বিন আমর (রাঃ)
(৪০) সায়ীদ বিন ওমাইর আনসারী (রাঃ)। তিনি বদর যুদ্ধে অংশ গ্রহণকারীদের অন্যতম ছিলেন।
(৪১) হিব্বান বিন মানকাজ (রাঃ)
📄 আট. ‘দুরূদ’ এ ব্যবহৃত শব্দাবলীর তাৎপর্য ও ব্যাখ্যা
বর্ণিত হাদীসগুলোতে মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর 'দুরূদ' পাঠের ব্যাপারে যেসব শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে সে সব শব্দ সম্ভারের অর্থ, তাৎপর্য, রহস্য, তত্ত্ব সম্পর্কে জানা থাকা দরকার। এসব বিষয়ের বিশেষজ্ঞগণ এ ব্যাপারে যেসব ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ দিয়েছেন সেগুলো পর্যায়ক্রমে তুলে ধরা হলো-
(ক) আল্লাহুম্মা : হাদীসের আলোকে প্রমাণিত হলো যে, মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর 'দুরূদ পাঠের সূচনা শব্দ হলো আল্লাহুম্মা (اَللّهُمَّ)। শব্দটির অর্থ “ইয়া আল্লাহ”। শব্দটি আবেদন-নিবেদন ও চাওয়া-পাওয়ার ক্ষেত্র ছাড়া অন্য কোথাও ব্যবহৃত হয়না। অতএব এরূপ বলা হয় না اللَّهُمَّ غَفُورُ رَّحِيمٌ )ইয়া আল্লাহ তুমি দয়ালু দয়াবান) বরং বলা হয় اَللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي وَارْحَمْنِي )ইয়া আল্লাহ! তুমি আমাকে মাফ করে দাও এবং আমার উপর দয়া কর) বাক্যের মধ্যে আল্লাহর কাছে ক্ষমা ও দয়ার জন্যে নিবেদন করা হয়েছে।
اَللّهُمَّ শব্দটির শেষ অক্ষর তাশদীদযুক্ত মিম অক্ষরটি يَا হরফে নিদার (সম্বোধন বোধক শব্দ) পরিবর্তে ব্যবহৃত হয়েছে। সুতরাং يَا اَللّهُمَّ )ইয়া আল্লাহম্মা) বলা ঠিক নয়। এমত ব্যক্ত করেছেন বিশিষ্ট ব্যাকরণবিদ সিবাবীয়াহ।
অন্য একজন বিশেষজ্ঞ বলেছেন, তাশদীদযুক্ত মীম অক্ষরটি একটি উহ্য বাক্যের পরিবর্তে ব্যবহৃত হয়েছে। উহ্য বাক্যটি হলো- يَا اللَّهُ أَمَنَّا بِخَيْرٍ পরবর্তীতে বাক্যটি পরিত্যক্ত হয়ে তাশদীদ যুক্ত মীম সংযোজিত হয়।
বসরার ব্যাকরণ ও অলংকার শাস্ত্রবিদগণ বলেছেন- তাশদীদ যুক্ত 'মীম' অক্ষরটি বিরাটত্ব ও মহত্ত্ব বুঝানোর জন্যে ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন- زرقَة (যিরকাতুন) শব্দটির শেষে মীম যুক্ত হয়েছে। এবং اِنَّ শব্দের শেষে মীম যুক্ত হয়ে اِمِّ হয়েছে। শব্দদ্বয় দ্বারা বস্তু বা ব্যক্তির আধিক্য বুঝানো হয়েছে। ইমাম ইবনে কাইয়িম (রাঃ) আদ্যাক্ষর মীম সম্পর্কে যা বলেছেন, সেটাও আধিক্য বুঝায়। যেমন- هُوَ একবচনের বহুবচন اَنتَ একবচনে এর বহুবচন اَنتُم একবচন ضَرَبْتَ এর বহুবচন ضَرَبْتُم একবচন اِيَّاکَ এর বহুবচন إِيَّاكُم একবচন إِيَّاهُ এর বহুবচন إِيَّاهُم শেষ অক্ষর মীমযুক্ত হয়ে ব্যক্তির আধিক্য বুঝানো হয়েছে।
তাশদীদযুক্ত মীম অক্ষরটি আধিক্য, মহত্ত্ব, মৌলিকত্ব, তাৎপর্য বুঝানোর জন্যে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। উদাহরণতঃ বলা যায়, যখন বেশকিছু বস্তু একত্রিত করা হয় তখন বলা হয় لَمَّا الشَّيْنُ يَلُمْهُ কোরআনের (ফজরঃ ১৯) আয়াত اَكَلالَمَّا এর তাফসীরে বলা হয়েছে- নিজ অংশ এবং অপরের অংশ ভক্ষণ করলে অর্থাৎ পেটুক বা অতিলোভী লোকের বেলায় এ কথা বলা হয়েছে।
اُم শব্দটির শেষ অক্ষর মীমে তাশদীদ দ্বারা কোনো বস্তুর মৌলিকত্ব বুঝানো হয়েছে। মক্কা নগরীকে এ অর্থেই اُمُّ الْقُرئ বলা হবে। আল্লাহ্ তায়ালা মুহকাম আয়াতকে বলেছেন- هُنَّ أَمَّ الْكِتَابِ যেমনিভাবে حُمّ رُمّ اُمّ প্রভৃতি শব্দে ব্যবহৃত মীমে তাশদীদ বিশেষ অর্থ ও তাৎপর্যমণ্ডিত।
আল্লাহর কাছে যে কোনো সময় যে কোন বস্তু চাওয়া-পাওয়ার ব্যাপারে এরূপ শব্দ যুক্ত করার রহস্য এটাই যে, আল্লাহর সমস্ত গুণ ও গুণবাচক নামের সাহায্যে চাওয়া, আবেদন-নিবেদন করা। বান্দাহ যখন বলে اللهم اَدْعُو (আল্লাহুম্মা ইন্নি আসয়ালুকা) তখন এর তাৎপর্য এটাই إِنِّى أَسْئَلُكَ اللَّهَ الَّذِي لَهُ الْأَسْمَاءُ الْحُسْنَى وَالصِّفَاتُ الْعُلى يَا سَمَائِهِ . وَصِفَاتِهِ অর্থাৎ আমি এমন আল্লাহর কাছে দোয়া করছি যাঁর অনেক সুন্দর নাম এবং উচ্চসিত গুণাবলী রয়েছে। সহীহ হাদীসে উল্লেখ আছে মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কেউ কখনো দুর্যোগ ও পেরেশানীতে পতিত হবেনা যদি সে দোয়া করে এভাবে-
اللَّهُمَّ إِنِّي عَبْدُكَ ابْنُ عَبْدِكَ ابْنُ آمَتِكَ، نَاصِيَتِي بِيَدِكَ، مَاضٍ فِي حُكْمِكَ، عَدْلٌ فِيَّ قَضَاؤُكَ - اسْتَلْكَ بِكُلِّ اسْمٍ هُوَ لَكَ سَمَّيْتَ بِهِ نَفْسَكَ، أَوْ أَنْزَلْتَهُ فِي كِتَابِكَ، أَوْ عَلَّمْتَهُ أَحَدًا مِنْ خَلْقِكَ، أَوِ اسْتَأْثَرْتَ بِهِ فِي عِلْمِ الْغَيْبِ عِنْدَكَ أَنْ تَجْعَلَ القرآن ربيع قلبي ، ونور صدري وجلاء حزني، وذهاب همي وَغَمِّى إِلَّا أَذْهَبَ اللَّهُ هَمَّهُ وَغَمَّهُ وَأَبْدَلَهُ مَكَانَهُ فَرْحًا )
(আল্লাহুম্মা ইন্নি আবদুকা ওয়া ইবনু আবদিকা ওয়া ইবনু উম্মাতিকা। নাসিয়াতী বি ইয়াদিকা মাদ্বিন ফিইয়া হুকমুকা, আদলুন ফিয়্যা কাদাউকা আসআলুকা বিকুল্লি ইসমিন হুয়া লাকা। সাম্মাইতা বিহি নাফসাকা আও আনযালতাহু ফি কিতাবিকা আও আল্লামতাহু আহাদান মিন খালকিকা আও ইসতাসারতা বিহি ফি ইলমিল গাইব, ইনদাকা আন তাজআলিল কুরআনা রাবিয়ী কালবী ওয়া নূরা সাদরী, ওয়া জালাআ হুযনী, ওয়া জাহাবা হাম্মী ওয়া গাম্মী, ইল্লা আযহাবাল্লাহু হাম্মাহু ওয়া গাম্মাহু, ওয়া আবদিলহু মাকানাহু ফারাহান।)
উপস্থিত সাহাবাগণ দোয়াটি শিখার জন্যে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন
بلى ينبغي لمن سمعهن ان يتعلمهن শিখা উচিত। (আহমদ: ৩৭১২, ইবনে মাজাহঃ ২৩৭২, হাকিম: ১/৫০৯)
অপর একটি দোয়া এরূপ:
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ بِأَنَّ لَكَ الْحَمْدُ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ الْحَنَّانُ المنان بديع السموت والأرض، ياذا الْجَلَالِ وَالْإِكْرَامِ يَا حَيُّ يَا قَيُّومُ * (আবু দাউদঃ ১৪৯৫, নাসায়ী : ৩/২৫, ইবনে মাজাহঃ ৩৮৫৮)
উপরোক্ত দোয়া দুটিতে আল্লাহর বিভিন্ন নাম ও উচ্চসিত গুণাবলীর মাধ্যমে আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করার কথা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে।
স্মর্তব্য যে, দোয়া তিন ধরনের:
প্রথমত: আল্লাহর কাছে তাঁর সুন্দর নাম ও উচ্চসিত গুণাবলীর মাধ্যমে নিবেদন করা। (আরাফ: ১৮০) وَلِلَّهِ الْأَسْمَاءُ الْحُسْنَى فَادْعُوهُ بِهَا ১ম প্রকারের দোয়ার মধ্যে এ আয়াতের প্রতিফলন হয়।
দ্বিতীয়ত: স্বীয় প্রয়োজনীয়তা নিজের দৈন্যতা ও অপারগতার কথা প্রকাশ করতঃ আকুতি মিনতি করা। যেমন এরূপ বলা- أَنَا الْعَبْدُ الْفَقِيرُ الْمِسْكِينُ الْبَاسُ الدَّلِيلُ الْمُسْتَجِيرُ .
তৃতীয়ত: আল্লাহর কাছে প্রয়োজন পূরণের যাচনা করা। তিন প্রকারের দোয়া একত্রিত হলে তবেই সেটা পূর্ণতা লাভ করে। অর্থাৎ প্রত্যেক প্রকার দোয়াই পারস্পরিকভাবে সম্পূরক।
হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর দোয়ার মধ্যে এই ৩ ধরনের দোয়ার সমন্বয় দেখা যায়। তিনি প্রথমত বলতেন اللَّهُمَّ إِنِّي ظَلَمْتُ نَفْسِي ظُلْمًا كَثِيرًاً আল্লাহ আমি আমার উপর অনেক জুলুম করেছি। তারপর আছে وَأَنَّهُ لَا يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا أَنْتَ তুমি ছাড়া আর কেউ গুনাহ মাফ করতে পারে না। তারপর বলতেন- فَاغْفِرْلِی সুতরাং তুমি আমাকে ক্ষমা কর। (বুখারী, ফাতহুল বারী: ২/৮৩৪, মুসলিমঃ ২৭০৫)
দোয়া শেষ করা হয় আল্লাহর দুটি গুণবাচক নাম দিয়ে।
হাসান বসরী (রাঃ) বলেছেন: اللَّهُمَّ শব্দটি দোয়ার সমাবেশস্থল (Acadamy)
আবু রিফা আতারাদী বলেছেন- দোয়ার প্রারম্ভিক اللَّهُمَّ শব্দটি আল্লাহর ৯৯ টি নামের সমাহার।
নদর বিন শুমাইল বলেছেন- مَنْ قَالَ : اللَّهُمَّ، فَقَدْ دَعَا اللَّهَ بِجَمِيعِ أَسْمَائِهِ যে 'আল্লাহুম্মা' বললো সে যেন আল্লাহর সমস্ত নাম নিয়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করলো।
📄 নয়. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ‘আহমদ’ ও ‘মুহাম্মাদ’ নামের তাৎপর্য ও ব্যুৎপত্তি
বিশ্বনবী মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ৯৯ টি গুণবাচক নাম রয়েছে। তন্মধ্যে মোহাম্মদ (مُحَمَّدٌ) নামটিই সর্বাধিক প্রসিদ্ধ, বিশ্বখ্যাত। মোহাম্মাদ শব্দটির উৎপত্তি حَمَّدٌ শব্দ থেকে। (حَمَّدٌ) 'হামদ' শব্দটি যে ব্যক্তি বা বস্তুর জন্য প্রয়োগ হবে সে محمود 'মাহমুদ' হিসেবে পরিগণিত হবে। مَحْمُودُ বা প্রশংসিত বস্তু বা ব্যক্তির যাবতীয় মান-সম্মান, ইজ্জত -আবরু, স্তুতি-প্রশংসা শব্দটির মধ্যে নিহিত। এরূপ অর্থই হামদের হাকীকত বা তত্ত্ব।
(مُحَمَّدٌ) মোহাম্মাদ শব্দটি مَفْعَلُ শব্দের ছন্দে গঠিত। যেমন- مُبَجَّلٌ - مُعَظَمَ - مُحَبَّبُ - مُسَود - مفْعَلُ মিত্রাক্ষর ছন্দে গঠিত। এরূপ ছন্দের শব্দ দ্বারা মৌলিক বস্তুর আধিক্য প্রকাশ পাওয়া বুঝায়। 'হামদু' শব্দটি যদি اِسْمِ فَاعِلُ (কর্তাকারক) রূপে ব্যবহৃত হয়, তাহলে কর্তা ব্যক্তি থেকে মৌল বস্তু বার বার অধিক পরিমাণে প্রকাশ পাওয়া বুঝা যাবে। যেমন- مُخْلِصُ - مُبِينٌ - مُفْهِمُ - مُحَكِّ শব্দাবলী ইলম, ফহম, বয়ান, ও খুলুছিয়াত এসব গুণাবলীর ধারক বাহকদের পক্ষ থেকে পর পর বেশি পরিমাণে প্রকাশ হওয়া বুঝায়। আর ইসমে মাফ'উল اِسم مفعول রূপে ব্যবহৃত হলে মৌলিক বস্তুর দাবি কিংবা বাস্তবায়নের পরিপ্রেক্ষিতে বার বার বাস্তবায়িত হওয়া বুঝায়। 'মোহাম্মদ' (مُحَمَّدٌ) اسم مَفْعُول এর রূপে ব্যবহৃত হওয়ায় শব্দটির অর্থ দাঁড়াবে, কোনো প্রশংসাকারী বাস্তবে বার বার যার প্রশংসা বেশি পরিমাণে করেন কিংবা যিনি বার বার উচ্চসিত প্রশংসার দাবি রাখেন।
আল্লাহর নামের মতো রাসূলেরও মৌলিক নামসমূহ রয়েছে। যুবাইর বিন মাতআম (রাঃ) বর্ণিত হাদীসে আছে, মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
إِنَّ لِي أَسْمَاءً أَنَا مُحَمَّدٌ، وَأَنَا أَحْمَدُ وَأَنَا الْمَاحِي الَّذِي يَمْحُو اللَّهُ بِي الْكُفْرَ *
"আমার কতিপয় নাম আছে আমি মোহাম্মাদু আমি আহমাদু এবং আমি 'আলমাহী' আমার দ্বারা আল্লাহ্ তায়ালা কুফরী মুছে দিয়েছেন।” (বুখারী: ফতহুল বারী: ৬/৪৮৯৬, মুসলিমঃ ২৩৫৪)
মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ নামগুলোর কথা স্পষ্ট করে উল্লেখ করেছেন। নামগুলো ফজিলতপূর্ণ, বহু অর্থবহ এবং আল্লাহর মনোনীত। এগুলো যদি শুধুমাত্র বিভক্তি আকারে হতো তাহলে নামগুলো অর্থবহ হতো না এবং প্রশ্নসূচক হওয়াও বুঝা যেতো না। এ কারণেই হাসান (রাঃ) বলেছেন-
وَشَقَّ لَهُ مِنَ اسْمِهِ لِيُجِلَّهُ - فَذُو الْعَرْشِ مَحْمُودُ وَهَذَا مُحَمَّدٌ *
“তাঁকে (মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মহিয়ান গরিয়ান করার উদ্দেশ্যে তিনি (আল্লাহ তায়ালা) তাঁর নামে ভগ্নাংশ করে ফেলেন। ফলে আরশের অধিপতি হলেন 'মাহমুদ' (আল্লাহ্)। আর ইনি হচ্ছেন 'মোহাম্মদ'।
মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নামের উৎপত্তি حَمْد শব্দ হওয়ায় তিনি مَحْمُود 'মাহমুদ' প্রশংসিত। তিনি 'মাহমুদ' আল্লাহর কাছে, তিনি 'মাহমুদ' ফেরেশতাদের কাছে, তিনি 'মাহমুদ' নবীগণের কাছে এবং তিনি 'মাহমুদ' বিশ্ববাসীর কাছে, যদিও কেউ অস্বীকার করে থাকে। বস্তুতঃ তাঁর মধ্যে যে পরিপূর্ণ ও উচ্চসিত বৈশিষ্ট্যের সমাহার ঘটেছে তাতে প্রতিটি জ্ঞানবানের কাছে তাঁর 'মাহমুদ' হওয়া যুক্তিগ্রাহ্য। যারা অজ্ঞতা, হিংসা বিরোধীতা ও বিদ্রোহ করার মানসে এ সত্যটি মানতে চায়না তাদের কথা স্বতন্ত্র।
ধাতুগত দিক থেকে 'হামদ' শব্দের সূত্র ধরে তিনি (أَحْمَدُ و مُحَمَّدٌ) 'মোহাম্মদ' এবং আহমাদ নামে অভিহিত। আর তাঁর উম্মতগণ হচ্ছেন حَمَّادُونَ 'হাম্মাদুন বা প্রশংসাকারীগণ অর্থাৎ সুখে-দুঃখে বিপদে-আপদে নবীর উম্মতগণ আল্লাহর 'হামদ' (প্রশংসা) করে থাকেন। উম্মতগণের 'সালাত' এর সূচনা হয় 'হামদ দিয়ে, খুৎবা শুরু করে 'হামদ' দিয়ে, কিতাবের শুরু হয় 'হামদ' এর মাধ্যমে। এমনিভাবে লাওহে মাহফুজে আল্লাহর কাছে লিখা আছে, তাঁর (রাসূল) খলিফা ও সাহাবাগণ কুরআন লিখা শুরু করেন 'হামদ' দিয়ে এরং হাশরের মাঠে 'হামদ' এর ঝাণ্ডা ধারণ করবেন মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে। বিচার দিনে নবী আলাইহিস সালাম উম্মতের শাফায়াতের জন্যে যখন মহান আল্লাহর সমীপে সিজদা করবেন তখন তাঁকে শাফায়াত করার অনুমতি দেয়া হবে এ বলে যে, তিনি মহান আল্লাহর প্রশংসা করবেন উচ্চসিতভাবে। তিনি হচ্ছেন 'মাকামে মাহমুদের' মালিক! মাকামে মাহমুদ বেহেশতের এমন একটি উচ্চসিত স্থান যা পাওয়ার জন্যে আগে-পরের সকলেই কামনা করেছেন। এ স্থানটি সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন-
وَمِنَ اللَّيْلِ فَتَهَجَّدْ بِهِ نَافِلَةٌ لَكَ عَسَى أَنْ يَبْعَثَكَ رَبِّكَ مَقَامًا مَّحْمُودًا *
“রাতের কিছু অংশ কুরআন পাঠসহ জাগ্রত থাকুন। এটা আপনার জন্যে অতিরিক্ত। হয়তোবা আপনার রব আপনাকে মাকামে মাহমুদে পৌছাবেন।” (আসরা: ৭৯)
'মাকামে মাহমুদ এর ফজিলত, মর্যাদা ও গুরুত্ব সম্পর্কে ইবনে উবাই হাতেম ইবনে জারীর আবদ বিন হুমাইদ প্রমুখ তাফসীর কারকগণের গ্রন্থে বিশদ বিবরণ রয়েছে। যিনি এমন উচ্চাসনে সমাসীন হতে সক্ষম তিনিই সত্যিকার অর্থে 'মাহমুদ' বা প্রশংসিত। মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ উচ্চাসনে অধিষ্ঠিত হওয়ার কথা হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। স্থানটি তাঁর জন্যে নির্ধারিত হওয়া যথার্থ হয়েছে। কেননা তাঁর হেদায়াত, ঈমান, ইলম, আমল ছিল অতুলনীয়। তাঁর আগমন ও প্রচেষ্টায় অন্ধকার দূরীভূত হয়। শয়তানের প্ররোচনা থেকে মানবজাতি মুক্তি লাভ করে। শিরক, কুফর, অন্যায় 'অবিচার' গোমরাহীর স্থলে তাওহীদ, ন্যায়পরায়ণতা, সম্প্রীতি ও সহানুভূতি প্রতিষ্ঠা হয়। অগ্নিপূজা, মূর্তিপূজা ও তারকা পূজার অবসান ঘটে। সারা বিশ্বের আরব অনারব সাম্রাজ্যে সঠিক ও বিশুদ্ধ দ্বীনের আলোড়ন সৃষ্টি হয়। অন্ধজনে আলো পায়, জ্ঞান প্রসারিত হয়, গরীব ধনী হয়। রোগী সেবা পায়, শত্রু মিত্র হয়। মারামারি হত্যা-লুঠতরাজ, চুরি-ডাকাতি বন্ধ হয়। উঁচু-নীচুর ভেদাভেদ মুছে যায়। মানুষের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব, সহানুভূতি, সম্প্রীতি দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। মানুষ তার সৃষ্টিকর্তাকে চিনতে সক্ষম হয়।
মানুষ তার দায়িত্ব কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন হয়। মানব সৃষ্টির রহস্য উদ্দেশ্য কি? তার গন্তব্যস্থল কোথায় এসব সম্পর্কে সজাগ হয়। রাসূলের আগমনে মানুষ আরো জানতে পারলো খারাপ কাজের ভয়াবহ পরিণতি এবং ভালো কাজের অনাবিল শান্তি ও পুরস্কারের কথা। সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ্ সম্পর্কে তাঁদের ধারণা হলো স্বচ্ছ ও পরিচ্ছন্ন।
নবী আলাইহিস সালাতু ওয়া সাল্লাম 'মাহমুদ' তিনি 'মোহাম্মদ' তিনি 'আহমদ' আল্লাহ তায়ালা তাঁকে 'মাহমুদ' বা প্রশংসিত হওয়ার উপাদান দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ কুরআনে বলেছেন- أَوَلَمْ يَكْفِهِمْ أَنَّا أَنْزَلْنَا عَلَيْكَ الْكِتَابَ يُتْلَى عَلَيْهِمْ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَرَحْمَةً وَذِكْرَى لِقَوْمٍ يُؤْمِنُونَ *
“এটা কি তাদের জন্যে যথেষ্ট নয় যে, আমি আপনার উপর কিতাব নাযিল করেছি যা তাদের কাছে পাঠ করা হয়। এতে নিশ্চয়ই বিশ্বাসী লোকদের জন্যে রহমত ও উপদেশ রয়েছে।" (আনকাবুত : ৫১)
কুরআনের লিখিত কথাগুলো মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর জীবনের শেষ লগ্ন পর্যন্ত প্রাণান্তকর প্রচেষ্টার মাধ্যমে বাস্তবায়িত করেছেন। যে পদ্ধতিতে আল্লাহর সন্তুষ্টি পাওয়া যাবে সে পদ্ধতির পুংখানুপুংখ ব্যাখ্যা তিনি করেছেন। এমন কোনো সৎ কাজ নেই যার নির্দেশ তিনি দেননি। আবার এমন কোনো অসৎ কাজ নেই যা থেকে তিনি বিরত রাখেননি। তিনি নিজেই বলেছেন- مَا تَرَكْتُ مِنْ شَيْءٍ يُقَرِّبُكُمْ إِلَى الْجَنَّةِ إِلَّا وَقَدْ أَمَرْتُكُمْ بِهِ، وَلَا مِنْ شَيْءٍ يُقَرِّبُكُمْ مِنَ النَّارِ إِلَّا وَقَدْ نَهَيْتُكُمْ عَنْهُ
“যে জিনিস তোমাদের জান্নাতের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দেয় সেগুলো সম্পর্কে আমি তোমাদেরকে অবশ্যই নির্দেশ দিয়েছি; আর যে কাজ তোমাদেরকে জাহান্নামের অগ্নিতে নিক্ষেপ করবে সেগুলো সম্পর্কে আমি তোমাদের অবশ্যই নিষেধ করেছি....। (মাজমাআঃ ৮/২৬৩, ২৬৪)
হযরত আবু যর (রাঃ) বলেছেন- عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَلَا طَائِرٌ يَقْلِبُ لَقَدْ تُونِي رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ جَنَاحَيْهِ فِي السَّمَاءِ إِلَّا ذَكَرْنَا عَنْهُ عِلْمًا *
“একথা সত্য যে, মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের কাছ থেকে চির দিনের জন্যে চলে গেছেন। কিন্তু আকাশে পাখী তার ডানা মেলে কেমন করে উড়ে বেড়ায় সে রহস্য সম্পর্কেও তিনি আমাদেরকে জ্ঞান দান করেছেন। (মুসনাদ : ৫/১৬২)
ফলে পরিচয় মিলে গাছের। রাসূলের কর্ম তৎপতায় জানা যায় তাঁর নাম কি হওয়া উচিত। তিনি চরিত্রে ছিলেন সর্বোচ্চ, আমানতদারীতে ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ, কথায় ছিলেন মহাসত্য, ধৈর্যধারণে ছিলেন একান্ত, দান-সদকায় ছিলেন উদার, শৌর্য-বীর্যে ছিলেন কালজয়ী, ক্ষমায় ছিলেন মহান, সহনশীলতায় ছিলেন দৃঢ়। এ সম্পর্কে হযরত আব্দুল্লাহ বিন ওমরের (রাঃ) হাদীসটি প্রণিধানযোগ্য। তিনি তাওরাত কিতাবে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রশংসায় বর্ণিত কথাগুলো বললেন এভাবে-
مُحَمَّدُ عَبْدِي وَرَسُولِي، سَمَّيْتُهُ الْمُتَوَكِّلَ لَيْسَ بِفَظِّ وَلَا غَلِيظٌ وَلَا صَحَابِ بِالْأَسْوَاقِ، وَلَا يَجْزِي السَّيِّئَةَ بِالسَّيِّئَةِ وَلَكِن يَعْفُو وَيَصْفَحُ، وَلَنْ أَقْبِضَهُ حَتَّى أَقِيمَ بِهِ الْمِلَّةُ الْعَوْجَاءُ بِأَنْ يَقُولُوا : لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَافْتَحَ بِهِ أَعْيُنَا عُمْيًا وَإِذَا نَا صُمَّا وَقُلُوباً غُلْفاً *
“মোহাম্মদ আমার বান্দাহ, আমার রাসূল। আমি তাঁর নাম রেখেছি মুতাওয়াক্কিল। তার মধ্যে কঠোরতা নেই, নেই কোনো রূঢ়তা ও হিংস্রতা। তিনি নিরব, বাজারের হৈ-হোল্লোড় তাঁর মধ্যে নেই। তিনি বড়ই সহনশীল, ক্ষমা মার্জনাকারী, কারো খারাপ কাজের মুকাবিলায় তিনি খারাপ করেন না। তাঁর পঠিত لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ লাইলাহা ইল্লাল্লাহু এ বাক্যের মুর্ছনায় বক্র ও বিভ্রান্ত জাতি সহজ-সরল হয়ে যায়। তাঁর সান্নিধ্যে অন্ধ দেখতে পায়, বধির শুনতে পায়, বোবা কথা বলতে সক্ষম হয়, নির্দয় লোক দয়াদ্র হয় এবং চেতনা বিহীন ব্যক্তি সচেতন হয়ে উঠে। (বুখারী, ফতহুল বারী: ৮/৪৮৩৮)
দয়া ও স্নেহ মমতায় তিনি ছিলেন শ্রেষ্ঠতম, দ্বীন ও দুনিয়াবী কল্যাণে তিনি ছিলেন মহান, ভাষার অলংকারে, বাগ্মীতার আকর্ষণে তিনি ছিলেন অদ্বিতীয়। সবর, সহনশীলতা ও পরোপকারে তাঁর কোনো জুড়ি ছিল না।
জিম্মাদারী, আমানতদারী, ওয়াদা রক্ষায় তিনি ছিলেন অনন্য। বিনয়, নম্রতা, ভদ্রতা, শালীনতায় তিনি ছিলেন অপূর্ব। প্রতিরক্ষা ও প্রতিরোধের ব্যাপারে তিনি ছিলেন দূরদর্শী।
বিশ্বনবীর উপরোক্ত বৈশিষ্ট্যগুলোর অধিকারী হওয়া কেবলমাত্র কথার ফুলঝুড়ি নয়। যেসব সৌভাগ্যবান ব্যক্তি তাঁর জীবদ্দশায় তাঁর সান্নিধ্য লাভে ধন্য হয়েছিলেন খুবই কাছ থেকে, তাদের অন্যতম হলেন হযরত আলী (রাঃ)। তিনি বলেছেন-
كَانَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَجْوَدَ النَّاسِ صَدْرًا وأصدَقَهُمْ لَهْجَةً وَالْيَنَهُمْ عَرِيكَةً وَأَكْرَمَهُمْ عِشْرَةٌ، مَنْ رَأَهُ بَدِيهَةٌ هَابَهُ وَمَنْ خَالَطَهُ مَعْرِفَةً أَحَبَّهُ يَقُولُ فاعته : لَمْ أَرَى قَبْلَهُ وَلَا بَعْدَهُ مِثْلَهُ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ * (শামায়িলি তিরমিযি: ৬, সুনান: ৩৬৪২)
"রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন মানুষের মধ্যে সর্বাপেক্ষা প্রশস্ত বক্ষের ধারক। অর্থাৎ তাঁর হৃদয় ছিল আকাশের মতো বিশাল, সাগরের মতো অথৈ, মানব দানব, পশু-পাখি, গাছ তরু, লতা-পাতা সবকিছুর কল্যাণের ব্যাপারে তাঁর হৃদয় ছিল অবারিত, বিস্তীর্ণ। মনে হয় যেনো দুনিয়ার সমগ্র মংগল ও কল্যাণের আঁধার হচ্ছে রাসূলের হৃদয়মন।
কথায় ছিলেন তিনি সর্বাপেক্ষা সত্যবাদী। এমনকি তাঁর শত্রুগণও একথা অকপটে স্বীকার করেছে যে, রাসূল তাঁর ৬৩ বৎসর জীবন সায়াহ্নে একটিবারও অসত্য বা মিথ্যা কথা বলেননি। ৬৩ বৎসরের দীর্ঘ জীবনে অনেক ঘাত-প্রতিঘাত এসেছে, প্রতিকূল-প্রতিরোধ বিদ্রোহের মুখোমুখি হতে হয়েছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত কেউ তাঁর বিরুদ্ধে ছোট-বড় কোনো ধরনের মিথ্যা বলার আপবাদ দিতে পারেনি।
একবার আবু জাহিলের ভাগীনা মুসাউর বিন মাখরামাহ তাকে জিজ্ঞেস করলেন মামুজান! মোহাম্মদকে (রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের) তোমরা কখনো মিথ্যা বলার অপবাদ দিয়েছো কি? উত্তরে সে বললো--
وَالله يَا ابْنَ أُخْتِى لَقَدْ كَانَ مُحَمَّd وَهُوَ شَابٌ فِينَا الآمين .......
"আল্লাহর কসম! হে ভাগিনেয়, মোহাম্মদ এমন একজন যুবক, যে আমাদের মাঝে 'আল আমিন' বিশ্বাসী বলে অভিহিত হতো। ভাগীনা বললেন, তাহলে সত্যবাদীকে অনুসরণ করছেন না কেন? আবু জাহিল বললেন, কুরাইশ গোত্রের একটি শাখা 'বনী কুসাই' আগত হাজীদেরকে পানি পান করায়, কাবা ঘরের চাবি তাদের হাতে, বাইতুল্লাহর রক্ষণাবেক্ষণ তারাই করছে। এমতাবস্থায় নবুয়্যাতও যদি তাদের অধীনে চলে যায়, তাহলে আমরা তো একেবারে রিক্তহস্ত হয়ে যাই।
অপর একটি বর্ণনায় আছে, একবার আবু জাহিল স্বয়ং রাসূলুল্লাহু সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললো- তুমি মিথ্যাবাদী এরূপ ধারণা আমরা কখনো করি না। তবে তোমার ধর্মগ্রন্থকে অসত্য মনে করি।
কুরআনের কতিপয় জায়গায় كِذَّبُ মিথ্যা অপবাদের যে কথার উল্লেখ আছে তা স্বয়ং রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মিথ্যা বলা নয়। বরং আল্লাহর নিদর্শনাবলীকে (آيَاتِ) মিথ্যা বলা। (আনআম : ৩৩ আয়াতের ব্যাখ্যা)
তিনি ছিলেন সবচে মোলায়েম ও নম্র স্বভাবের ব্যক্তিত্ব। ঘনিষ্ঠের চেয়েও ঘনিষ্ঠ, আপনের চেয়েও আপন ছিলেন তিনি। কেউ ডাকলে দৌড়ে যেতেন, কারো প্রয়োজন পূরণে ব্যস্ত হয়ে উঠতেন। কেউ চাইলে তিনি কখনো 'না' বলতেন না। পরামর্শ ভিত্তিক কাজে সকলের পরামর্শ শুনতেন। কল্যাণ ও গঠনমূলক পরামর্শ গ্রহণ করতেন। দুষ্ট প্রকৃতি ও স্বার্থ প্রণোদিত লোকদেরকে ক্ষমা করতেন। যে একবার তাঁর সাথে কথা বলেছে সে মুগ্ধ হয়েছে।
তিনি ছিলেন সংগ ও সম্পর্ক স্থাপনে অদ্বিতীয়। যে কেউ তাঁর সংস্পর্শে এসেছে, তাঁর সংগ লাভ করতে সমর্থ হয়েছে, সে মুগ্ধ ও পরিতৃপ্ত হয়েছে। তিনি কখনো কাউকে কটু কথা বলেননি, কারো প্রতি ভ্রুকুটি করেননি। কাউকে দেখে তাঁর চেহারা মলিন হয়নি। বরং সংগী সাথীদের সাথে তাঁর আচরণ ছিল অসাধারণ। তাঁর সহনশীলতা ছিল অনন্য।
হোসাইন (রাঃ) বলেছেন, আমার পিতাকে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সাথীদের সাথে আচরণের কথা জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন-
كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ دَائِمَ الْبِشْرِ ، سَهُلَ الْخُلُقِ، لِينَ الْجَانِبِ، لَيْسَ بِفَظ وَلَا غَلِيظ، وَلَا صَحَابِ، وَلَا فَحَاشِ، وَلَا عَيَّابِ، وَلَا مَدَاحِ
"তিনি ছিলেন সদা প্রফুল্ল, কোমল মতি, সহজ প্রকৃতির। রূঢ়তা, কঠোরতা, নিষ্ঠুরতা কখনো তাঁকে স্পর্শ করেনি। কটুকথা, অনর্থক বাক্যালাপ, হৈ-হুল্লোড়, শোরগোল ইত্যাকার সহজাত ত্রুটি থেকে তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ মুক্ত। তিনি যখন কথা বলতেন উপস্থিত শ্রোতামণ্ডলী মন্ত্র মুগ্ধের মতো তাঁর কথা শুনতেন। মনে হচ্ছিল, যেনো তাদের মাথায় রয়েছে একটি উড়ন্ত পাখি। তিনি ৩টি বস্তুকে পরিহার করে চলতেন, নারী, অযথা বাক্যালাপ এবং অধিক পরিমাণে জমা করা। তিনি কথা বলার পর অন্যরা কথা বলতেন। অনুমতি ছাড়া কেউ সামনে কথা বলতো না। অর্থাৎ, কথা বলার শালীনতা, ভদ্রতা, সৌজন্য সবই তাঁর মধ্যে ছিল পরিপূর্ণরূপে।
আল্লাহ তায়ালা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আরো দুটি গুণে গুণান্বিত করেন। গুণ দুটি হলো الْإِجْلَالُ وَالْمَحَبَّةُ প্রভাব ও মহব্বত। যে কেউ তাঁর দিকে আচমকা তাকালেই সে তাঁর প্রতি প্রভাবিত হয়ে পড়ে। তাঁর প্রভাব ও সম্মানে এমনকি শত্রুর হৃদয় মনও ভরে উঠত। তিনি মানুষকে ভালোবাসতেন হৃদয় দিয়ে। আর তাঁর অনুসারী সাহাবাগণও তাকে ভালবাসতেন সম্মানও প্রভাব দিয়ে। তাঁকে ভালবাসা এবং তাঁর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করার মধ্যে নেই কোনো কৃত্রিমতা, স্বার্থপরতা। এরূপ অকৃত্রিম ও নিখাঁদ সম্মান ও প্রীতি কেবলমাত্র সেই ব্যক্তিই লাভ করতে সক্ষম যার মধ্যে প্রভাব প্রতিপত্তি, মান সম্মান ও প্রেম-প্রীতির উপাদান ষোলকলায় বিদ্যমান। আর তিনি হচ্ছেন একক ব্যক্তি আমাদের নবী রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।
এখানে একথা স্মরণ রাখা দরকার যে, মানুষকে ভালবাসা, মানুষকে সম্মান করা একটি ধর্মীয় নির্দেশ। তবে এ ভালবাসা ও সম্মান প্রদর্শন হতে হবে আল্লাহকে ভালবাসা ও তাঁকে সম্মান প্রদর্শন করার অধীন। আল্লাহ্ তায়ালা ও তাঁর মাগফিরাত লাভের জন্যে তাঁর রাসূলকে অনুসরণ করার কথা বলেছেন। বস্তুত প্রত্যেক নবীর উম্মতগণই তাদের নবীগণকে আল্লাহর ভালবাসা ও সম্মানের অধীন হয়ে সম্মান করতেন, ভালবাসতেন।
হাসান বসরী (রঃ) বলেছেন- 'একজন মুমিনের ঈমানী জীবিকা হলো চরিত্র মাধুর্য ও স্বাভাবিক প্রভাব'। অর্থাৎ মহান আল্লাহ যাকে মহব্বত সম্মান ও প্রভাবের সমন্বয়ে তৈরী ঈমানের লেবাস পরিধান করিয়েছেন, তিনি নিজেও অপরের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবেন এবং অপরগণও স্বাভাবিক ভাবেই তাকে সম্মান করবেন, ভালবাসবেন। এ কারণেই দেখা যায় যে, সাহাবায়ে কিরামগণের রাসূলের প্রতি সম্মান ও ভালোবাসার যে নজির স্থাপন করেছেন তা বিরল, ইতিহাস খ্যাত। তাঁদের আনুগত্য ও ভালোবাসার রেকর্ড আজ অবধি কেউ ভংগ করতে পারেনি।
উরওয়াহ বিন মাসউদ কুরাইশদেরকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন-
يَا قَوْمٌ وَاللَّهِ لَقَدْ أَفَدْتُ عَلَى كِسْرَى وَقَيْصَرَ وَالْمُلُوكِ فَمَا رَأَيْتُ مَلِكًا يُعَظِمُهُ أَصْحَابُهُ مَا يُعَظِمُ أَصْحَابُ مُحَمَّd صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، مَا يَحُدُّونَ النَّظْرَ إِلَيْهِ تَعْظِيمًا لَهُ، وَمَا تَخْتِمُ تَحَامَةٌ إِلَّا وَقَعَتْ فِي كَفَّ رَجُلٍ مِنْهُمْ فَيَدْلُكَ بِهَا وَجْهَهُ وَصَدْرَهُ - وَإِذَا تَوَضَّأَ كَادُوا يَقْتَتِلُونَ وَضُوءَهُ *
“হে কুরাইশ সম্প্রদায়! আল্লাহর কসম করে বলছি, আমি পারস্য ইরানসহ অনেক দেশের রাজা বাদশাদের সাথে রাজ প্রতিনিধি হিসেবে দেখা করেছি। কিন্তু মোহাম্মদ (রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর সাথীরা তাঁকে যেভাবে সম্মান প্রদর্শন করেন, এমন অপূর্ব সম্মান আর কোনো রাজ দরবারে আমি দেখিনি। তাঁর সম্মানার্থে কোনো সাহাবী তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকে না, সবাই আনত চোখ নিশ্চুপ হয়ে থাকে। তিনি থু থু ফেললে সে থু থু উপস্থিত সাহাবীগণের কেউ না কেউ হাতে ধারণ করতঃ তা বক্ষে ও চেহারায় মর্দন করেন। তিনি অযু করার ইচ্ছা করলে অযুর পানি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় বস্তু যোগান দেয়ার জন্যে সাহাবীদের মধ্যে প্রতিযোগিতার দ্বন্দ্ব শুরু হয়ে যায়।
(বুখারী ফতহুল বারী : ৫/২৭৩১ দীর্ঘ হাদীসের অংশ) যেসব উপাদান থাকলে একজন ব্যক্তির বার বার প্রশংসা করতে হয় সেসব মৌলিক উপাদান রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মধ্যে পরিপূর্ণভাবে বিদ্যমান থাকায় তাঁর নাম 'মোহাম্মদ' হওয়া সার্থক হয়েছে। কেননা নাম ও কাজের মধ্যে রয়েছে পরিপূর্ণ সমন্বয় ও সামঞ্জস্যতা।
'মোহাম্মদ' ও 'আহমদ' নামদ্বয়ের মধ্যে দুদিক থেকে পার্থক্য রয়েছে।
প্রথমত : 'মোহাম্মদ যিনি তিনিই 'মাহমুদ' অর্থাৎ যিনি বার বার প্রশংসিত। 'মোহাম্মদ' শব্দটি দ্বারা প্রশংসাকারীদের (حَامِدُ) সংখ্যা বেশি পরিমাণে হওয়া বুঝায়। আর 'আহমদ' শব্দটি اِسْمِ تَفْضِيل (Superlative degree) হওয়ায় শব্দটি একথার প্রমাণ যে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চেয়ে অধিক অন্য কোনো ব্যক্তিত্ব প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য নয়। প্রশংসা পাওয়ার তিনিই হচ্ছেন যোগ্যতর ও সর্বোত্তম ব্যক্তি। 'মোহাম্মদ' শব্দের মধ্যে নিহিত সংখ্যার আধিক্য (Quantity) আর আহমাদ শব্দের মধ্যে রয়েছে মানগত ও গুণগত আধিক্য (Quality).
দ্বিতীয়ত: 'মোহাম্মদ' শব্দটি দ্বারা বার বার প্রতিবার প্রশংসা করা বুঝায়, যে কারণে তিনি 'মাহমুদ' নামেও অভিহিত। আর 'আহমদ' শব্দটি এ কথার ইংগিত যে, তিনি সৃষ্টিকর্তা মহান প্রভু দয়াময় আল্লাহ্ তায়ালা স্বয়ং তাঁর প্রশংসা করেন। দুনিয়াবাসীর যারা তাঁর প্রশংসা করেন তাদের চেয়ে মহান আল্লাহ্ শ্রেষ্ঠ হওয়া সহজেই অনুমেয়।
মোটকথা 'মোহাম্মদ' ও 'আহমদ' উভয় শব্দ একথার সুস্পষ্ট প্রমাণ যে, একজন আদর্শ লোকের জীবনের কিংবা মানব জীবনের যতোগুলো দিক ও ক্ষেত্র আছে প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি প্রশংসা পাওয়ার যোগ্যতম ব্যক্তি। উম্মতে মোহাম্মদীর স্বীয় কথায় ও কাজে তাঁর প্রশংসা করা উচিত।
📄 দশ. ‘আল শব্দের ব্যুৎপত্তি ও আহকাম
Ji (আল) শব্দটির উৎপত্তিস্থল সম্পর্কে দু'ধরনের কথা আছে।
A )১) ১। শব্দটির মূল হলো أمل পরবর্তীতে "এ" অক্ষরটি "ء" হামযায় রূপান্তরিত হয়ে "" হয়। পরিশেষে "" হামযা অক্ষরটি সহজীকরণের উদ্দেশ্যে "।" খাড়া যবর বা মদে রূপান্তরিত হয়ে "J" এ পরিণত হয়। শব্দটিকে تصغير এ প্রকাশ করতে চাইলে মূল শব্দ ফিরিয়ে আনতে হয় এবং এর রূপ হয় "أمل"
"J" শব্দটি স্থান কাল কিংবা জাতি- প্রজাতির সাথে সম্পৃক্ত হয় না। যেমন- একথা বলা ঠিক নয় যে 'আলে রাজুল' )آل رجل( পুরুষ জাতির আহল। আলে ইমরাতুন )لِ اِإمراة( স্ত্রীজাতির আহল। বংশীয় শাখা- প্রশাখাগত ব্যাপারে বংশীয় কোনো বিশিষ্ট ও সম্মানিত নামের সাথে শব্দটি 1 সম্পৃক্ত হয়ে থাকে। যেমন- বলা হয়ে থাকে 'আলে ইমরান )أَلُ عِمْرَانَ( আলে ইব্রাহীম )أَلْ إِبْرَاهِيمَ(।
'সিহাহ্' এর প্রণেতা (২) কারো মতে, "J" শব্দটির মূলধাতু হলো একথা বলেছেন। এরূপ মৌলিক অর্থবোধক হলে "JI" শব্দটি জাতির সাথে হতে পারে। তখন এর অর্থ হবে- ব্যক্তির পরিবার সম্পৃক্ত হয়ে ال الرجل পরিজন কিংবা তার অনুসরণীয়গণ।
"J" শব্দটির উৎপত্তিস্থল যদি হয় يَؤُولُاَلَ ফিরে আসা অর্থে, তাহলে الرَّجُلِ এর অর্থ দাঁড়াবে, যারা ঐ ব্যক্তির দিকে প্রত্যাবর্তন করবে, যারা তার সাথে সম্পৃক্ত হবে এবং যারা ঐ ব্যক্তিকে নিজেদের নেতা বানাবে।
কারো মতে, "১" শব্দটির "الأول" শব্দ থেকে নির্গত। শব্দটির অর্থ প্রথম বা একক। বস্তুতঃ সংখ্যার ভিত্তি ও মূল হলো এই একক বা প্রথম সংখ্যা। প্রথম সংখ্যা থেকে অবশিষ্ট শত শত সংখ্যার উৎপত্তি। এক বা প্রথমকে বাদ দিয়ে কোন সংখ্যার অস্তিত্ব চিন্তা করা যায় না। সুতরাং الرَّجُلِ বাক্যের অর্থ হবে- প্রথম বা মূল ব্যক্তির ধারা।
"آل" শব্দটির অর্থঃ (ক) স্বয়ং ব্যক্তি (খ) ব্যক্তিকে যারা অনুসরণ করে (গ) বংশ ও আত্মীয়-স্বজন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণীতে প্রথম অর্থের প্রমাণ পাওয়া যায়। তিনি সদকাসহ আগত হযরত আবু আওফা (রাঃ)-এর জন্যে দোয়া করলেন- اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى آلِ إِبِى أَوْفَى এখানে آل أبي أوفى বলতে স্বয়ং আবু আওফাকে (রাঃ) বুঝানো হয়েছে।
আল্লাহর বাণী- سَلَامُ عَلَى إِلْ يَأْسِينِ 'আলে ইয়াসীনের উপর সালাম।' (সাফফাত: ১৩০) রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّd وَعَلَى آلِ مُحَمَّd كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى الِ إِبْرَاهِيمَ
এ হাদীসে آلِ إِبْرَاهِيمَ বলতে খোদ ইব্রাহীম (আঃ)-কে বুঝানো হয়েছে। এবং إِلْ يَأْسِين বলতে ইয়াসিন (আঃ) বুঝানো হয়েছে।
অন্যান্য চিন্তাবিদগণ বলেছেন- آل শব্দটি "অনুসরণকারী” (الإتباع) এবং আত্মীয়-স্বজনগণ (الأقارب) শব্দদ্বয়ের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে থাকে।
উপরোল্লিখিত কুরআনের আয়াত এবং হাদীসে যে آل শব্দের ব্যবহার হয়েছে তদ্বারা যাদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে তাদের অনুসরণকারী ও আত্মীয়-স্বজনদেরকে বুঝানো হয়েছে।
হাদীসের كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ এ বাক্যের অর্থ সমস্ত নবীগণ উদ্দেশ্য। সমস্ত নবীগণসহ ইব্রাহীম (আঃ) সন্তানগণের উপর যেভাবে রহমত নাযিল করা হয়েছে, সেভাবে যেনো নবী আলাইহিস সালামের উপর রহমত নাযিল হয়। এখানে কেবলমাত্র ইব্রাহীম (আঃ) উদ্দেশ্য নয়।
سَلَامٌ عَلَى إِلْ يَأْسِينِ আয়াতে ال ياسين বলতে 'ইয়াসীন' হওয়ার ব্যাপারে দু'টি মত আছে। একটি মতে, ال يَاسين একটি শব্দ, অপর মতে اِلْ يَأْسِيس দু'টি শব্দ। সুতরাং এক শব্দ হলে ইয়াসীনের বংশ বা পরিবার-পরিজন হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।
"ال" শব্দটি যদি একক হয় তাহলে শব্দটির সাথে সম্পৃক্ত শব্দ (مُضَافُ إِلَيْهِ) এর অন্তর্ভুক্ত হবে। যেমন কুরআনে আছে- أَدْخِلُوا آلَ فِرْعَوْنَ إِلَى أَشَدَّ الْعَذَابِ * 'ফেরাউনের অনুসারীদেরকে ভয়ানক শাস্তির মধ্যে নিক্ষেপ করুন।' (গাফের : ৪৬)
অপর আয়াতে আছে- * وَلَقَدْ أَخَذْنَا آلَ فِرْعَوْنَ بِالسِّنِينَ এবং আমরা ফেরাউনের অনুসারীদেরকে পাকড়াও করেছি কয়েক (আরাফ : ১৩০) বৎসরের দুর্ভিক্ষের মাধ্যমে...
আয়াতদ্বয়ে ال শব্দের সাথে সম্পৃক্ত শব্দ فرعون শব্দটি আয়াতের নির্দেশের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। এমনিভাবে রাসূলের বাণীর صَلِّ عَلَى مُحَمَّd وَعَلَى آلِ مُحَمَّd ، والُ أَبِى أوفى এবং كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ 'মোহাম্মদ' ইব্রাহীম শব্দগুলো ال শব্দের অন্তর্গত হওয়ার ব্যাপারে সকলেই একমত।
অবশ্য যদি ال শব্দের পূর্বে ব্যক্তির উল্লেখ থাকে, তারপর ال শব্দের ব্যবহার হয়, তাহলে সেক্ষেত্রে শব্দটির একক ও সংমিশ্রন (مُجَرَّدٌ) (ومَقْرُونٌ) ব্যবহারের উপর সম্পৃক্ত শব্দটির অন্তর্ভুক্তি হওয়া না হওয়া নির্ভর করবে। যেমন বলা হলো- أَعْطِ لِزَيْدٍ وَآلِ زَيْدٍ অর্থাৎ যায়েদকে দাও এবং যায়েদের বংশধরদেরকে দাও। এ ক্ষেত্রে ل زيد এর মধ্যে যায়েদ অন্তর্ভুক্ত হবে না। আর যদি বলা হয় أَعْطِهِ لَالِ زَيْدٍ যায়েদের আলকে দাও। এ ক্ষেত্রে দেওয়ার নির্দেশের মধ্যে যায়েদ ও তার বংশ আত্মীয় বা অনুসরণকারীগণ শামিল হবে।