📘 দুরুদ কি ও কেন দুরুদ পাঠের হাদীস ভিত্তিক পদ্ধতি > 📄 এক. ‘দুরূদ’ বলতে কি বুঝায়

📄 এক. ‘দুরূদ’ বলতে কি বুঝায়


'দুরূদ' একটি ফার্সী শব্দ। এর আরবী শব্দ হলো 'সালাত' (صَلَاةَ)। 'সালাত' শব্দটির বেশ কয়েকটি আভিধানিক অর্থ রয়েছে।
প্রথমতঃ দোয়া ও বরকত অর্থে। যেমন কুরআনে আছে- خُذْ مِنْ أَمْوَالِهِمْ صَدَقَةً تُطَهِّرُهُمْ وَتُزَكِّيهِمْ بِهَا وَصَلَّ عَلَيْهِمْ * إِنَّ صَلَاتَكَ سَكَنُ لَهُمْ *
“তাদের মালামাল থেকে যাকাত গ্রহণ কর, যাতে সেগুলোকে পবিত্র করতে এবং সেগুলোকে বরকতময় করতে পার এর মাধ্যমে। আর তুমি তাদের জন্যে দোয়া কর; নিঃসন্দেহে তোমার দোয়া তাদের জন্যে শান্তনা স্বরূপ।” (সূরা তাওবা: ১০৩)
মুনাফিকদের সম্পর্কে কুরআনের ঘোষণা হলো- وَلَا تُصَلِّ عَلَى أَحَدٍ مِّنْهُمْ مَّاتَ أَبَدًا وَلَا تَقُمْ عَلَى قَبْرِهِ *
“আর তাদের মধ্য থেকে (মুনাফিক) কারো মৃত্যু হলে তার উপর কখনো সালাত (দোয়া) পড়বে না এবং তার কবরেও দাঁড়াবে না।” (সূরা তাওবা: ৮৪)
নবী মুহাম্মদ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- إِذَا دُعِيَ أَحَدُكُمْ إِلَى الطَّعَامِ فَلْيَسْتَجِبْ، فَإِنْ كَانَ صَائِمًا فَلْيُصَلِّ * :
"কেউ তোমাদেরকে খাওয়ার জন্যে আমন্ত্রণ জানালে তাতে সাড়া দেয়া উচিত। আমন্ত্রিত ব্যক্তি রোযাদার হলে আমন্ত্রণকারীর জন্যে বরকতের দোয়া করা জরুরী।" (মুসলিম: ১৪৩১, আহমদ: ২/৫০৭)
উপরোক্ত আয়াতদ্বয় এবং হাদীসে ব্যবহৃত 'সালাত' শব্দের অর্থ দোয়া এবং বরকত। বস্তুতঃ দোয়া করা, আল্লাহ্র কাছে প্রত্যাশা করা ইবাদতরূপে গণ্য। বরঞ্চ দোয়া ইবাদতের নির্যাস। দোয়া করা সম্পর্কে আল্লাহ নিজেই বলেছেন- ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ * "আমার কাছে চাও, আমি তোমাদেরকে দিব।” (গাফের: ৬০) তিনি আরো বলেছেন- أُجِيبُ دَعْوَةَ الدَّاعِ إِذَا دَعَانِ * "যখন কোনো বান্দাহ্ আমার কাছে প্রার্থনা করে তখন আমি তার প্রার্থনা কবুল করে থাকি।” (সূরা বাকারা: ১৮৬) তিনি দোয়া করার নির্দেশ দিয়েছেন এভাবে- ادْعُوا رَبَّكُمْ تَضَرُّعًا وَخُفْيَةً * “তোমাদের রবের কাছে কাকুতি-মিনতি ও সংগোপনে প্রার্থনা কর।” (সূরা আ'রাফ: ৫) এধরনের আরো একটি আয়াত হলো- وَادْعُوهُ خَوْفًا وَطَمَعًا * "তাঁর কাছে চাও ভয় ও আশা সহকারে।" (সূরা আ'রাফ: ৫৬)
উপরোক্ত আয়াতগুলো 'দোয়া করা' ইবাদত রূপে গণ্য হওয়ার সুস্পষ্ট দলীল। 'সালাত' শব্দটি বান্দার সাথে সংশ্লিষ্ট হওয়ায় দোয়া ও বরকত অর্থে প্রযোজ্য হলো।
নবী রাসূলগণ ও আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করতেন। তাঁদের দোয়া সম্পর্কে আল্লাহ্ বলেছেন- إِنَّهُمْ كَانُوا يُسَارِعُونَ فِي الْخَيْرَاتِ وَيَدْعُونَنَا رَغَبًا وَرَهَبًا وَكَانُوا لَنَا خَاشِعِينَ * তারা (নবীগণ) সৎপথে ঝাঁপিয়ে পড়তো, তারা আশা ও ভীতি সহকারে আমাকে ডাকত এবং তারা ছিল আমার কাছে বিনীত।” (সূরা আম্বিয়া: ৯০)
আয়াতটিতে নবীগণের আশা ও ভয়-ভীতিসহ দোয়া করার কথা ব্যক্ত হয়েছে।
'সালাত' শব্দটি 'দোয়া' এর অর্থে রূপক, কিংবা আসল ও রূপক উভয় ভাবে প্রযোজ্য হতে পারে। একজন সালাত পাঠকারী বান্দাহ যখন আল্লাহর সান্নিধ্যে কায়মনো বাক্যে আকুতি-মিনতি সহকারে আল্লাহ্র মহত্ত্ব, গৌরব ও মর্যাদার স্বীকৃতি দিয়ে দোয়ায় লিপ্ত হয়, তখন তার অবস্থা কেবলমাত্র রূপক অর্থে দোয়ায় মশগুল থাকা বুঝায় না বরং সে প্রকৃতই আত্মলীনে পৌছে সালাতের স্বাদ আস্বাদন করে থাকে। বান্দার সাথে 'সালাত' শব্দের সংশ্লিষ্টতায় উপরোক্ত মর্মার্থ বুঝায়।
দ্বিতীয়তঃ 'সালাত' শব্দটি আল্লাহ তায়ালার সাথে সংশ্লিষ্ট হলে। যেমন বলা হলো, সালাতুল্লাহ্ (صلوه الله)
এমতাবস্থায় শব্দটির তাৎপর্য সাধারণ ও বিশেষ এ দু'ভাগে বিভক্ত।
(১) সাধারণ হলো, আল্লাহ্র রহমত (সালাত) তাঁর মুমিন বান্দাদের জন্যে সাধারণভাবে প্রযোজ্য হওয়া। যেমন আল্লাহ্ বলেছেন- هُوَ الَّذِي يُصَلِّي عَلَيْكُمْ وَمَلَائِكَتُهُ *
"তিনিই তোমাদের উপর রহমত করেন এবং তাঁর ফেরেশতাগণ মাগফিরাতের দোয়া করেন। (সূরা আহযাব: ৪৩)
নবী করিম আলাইহি ওয়াসাল্লামও মুমিনদের জন্যে সাধারণভাবে দোয়া করতেন। তিনি দোয়া করলেন- اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى آلِ أَبِي أَوْفَى *
“আয় আল্লাহ! তুমি আবু আওফার বংশধরদের উপর রহমত কর।” (বুখারী: ৮/৪০৯) এমনিভাবে তিনি একজন মহিলা ও তাঁর স্বামীর জন্যে দোয়া করলেন- صَلَّ اللَّهُ عَلَيْكِ وَعَلَى زَوْجِكِ *
“আল্লাহ তায়ালা তোমার ও তোমার স্বামীর উপর রহমত নাযিল করুক।" (দারেমী: ১/২৪) দ্বিতীয় প্রকারের সালাত হলো, বিশেষভাবে প্রযোজ্য হওয়া। আল্লাহর এই 'সালাত' বা রহমত নবী-রাসূলগণ বিশেষতঃ সর্বশ্রেষ্ঠ নবী মুহাম্মদ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্যে বিশেষ ও নির্দিষ্টভাবে প্রযোজ্য হওয়া।
আল্লাহ্র সাথে 'সালাত' শব্দের সম্পৃক্ততায় শব্দটির একটি অর্থ হলো ‘রহমত’। যেমন দাহাক (রঃ) বলেছেন- صَلَاةُ اللهِ رَحْمَتُهُ এবং صَلَاةُ الْمَلَائِكَةِ الدُّعَاءُ অর্থাৎ, আল্লাহ্র 'সালাত' হলো তাঁর রহমত এবং ফেরেশতাদের 'সালাত' হলো দোয়া।
(ফজলুস সালাত: ৯৬)
মুবাররাদ বলেছেন, 'সালাত' শব্দের আসল অর্থ 'রহমত' বা দয়া। আর এ রহমত হচ্ছে আল্লাহর রহমত। 'সালাت' শব্দটি মালায়িকাহ বা ফেরেশতাদের সাথে সম্পৃক্ত হলে শব্দটির তাৎপর্য হবে رقة কোমলতা, নম্রতা, দয়া এবং اِسْتِدْعَاءُ لِلرَّحْمَةِ مِنَ اللَّهِ অর্থাৎ আল্লাহ্র কাছে রহমত নাযিল করার দোয়া করা। 'সালাত' শব্দটির উপরোক্ত তাৎপর্য সম্পর্কে প্রায় সকলেই একমত।
'সালাত' শব্দটির অপর অর্থ আল্লাহর মাগফিরাত লাভ করা। এ পর্যায়ে ইসমাঈল (রঃ) দাহাক থেকে বর্ণনা করে বলেছেন-
هُوَ الَّذِي يُصَلِّي عَلَيْكُمْ *
আয়াতে صَلَاةُ اللهِ বলতে আল্লাহ্ মাগফিরাত এবং صَلَاةُ الْمَلَائِكَةِ বলতে দোয়া বুঝানো হয়েছে। (বুখারী, মুসলিম)
ইমাম বুখারী (রঃ) আবুল আলীয়া থেকে বর্ণনা করে বলেছেন- صَلَاةُ اللَّهِ عَلَى رَسُولِهِ : ثَنَاؤُهُ عَلَيْهِ عِنْدَ الْمَلَائِكَةِ *
মহান আল্লাহ তাঁর রাসূলের উপর 'সালাত' পেশ করার অর্থ হলো, ফেরেশতাদের কাছে রাসূলের প্রশংসা ও স্তুতি-স্তবক তুলে ধরা।
ইমাম বুখারী (রঃ) তাঁর গ্রন্থ বুখারীতে উপরোক্ত কথাগুলো সনদসহ এভাবে বলেছেন- حَدَّثَنَا نَصْرُبْنُ عَلِيِّ، حَدَّثَنَا خَالِدُ بْنُ يَزِيدَ عَنْ أَبِي جَعْفَرٍ عَنِ الرَّبِيعِ بْنِ أَنَسٍ عَنْ أَبِي الْعَالِيَةِ إِنَّ اللَّهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : قَالَ : صَلَاةُ اللهِ عَزَّ وَجَلَّ : ثَنَاؤُهُ عَلَيْهِ وَصَلَاةُ الْمَلَائِكَةِ الدُّعَاءُ *
অর্থাৎ হাদীসটিতে ১ শব্দটি রাসূলের শানে আল্লাহ্র সন্তুষ্টি প্রশংসা করা এবং ফেরেশতাগণ রাসূলের জন্যে দোয়া করার অর্থে প্রয়োগ হয়েছে। 'সালাত' শব্দটির অর্থ যদি হয় রাসূলের প্রশংসা করা, তাঁর প্রতি দয়া করা এবং তাঁর মহিমা, গৌরব, মর্যাদা প্রকাশ করা, তাহলে আয়াতের অন্তর্গত 'সালাত' শব্দটির একাধিক তাৎপর্য বহন করা প্রয়োজন হয় না। বরং একক তাৎপর্য অর্থাৎ শব্দটি আল্লাহ্র সাথে সম্পৃক্ত হওয়ার সাথে সাথেই রাসূলের উপরোক্ত বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলী স্বতঃই বিকশিত হয়ে উঠেছে।
إِنَّ اللَّهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى النَّبِيِّ - يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا صَلُّوا عَلَيْهِ وَسَلِّمُوا تَسْلِيمًا *
আয়াতটি 'সালাত' এর ব্যাপারে নির্দেশসূচক। অর্থাৎ মানুষ রাসূলের প্রশংসা, তাঁর সম্মান, ফজিলت, বৈশিষ্ট্য ও পরিচয় সম্পর্কে অবগত হওয়ার জন্যে আল্লাহ্র কাছে আরাধনা করলে আল্লাহ তায়ালা উপরোক্ত আয়াত দ্বারা অবগত করান যে, রাসূলের উপর আল্লাহ স্বয়ং রহমত বর্ষণ করেন এবং ফেরেশতাগণ তাঁর জন্যে মাগফিরাত কামনা করেন। সুতরাং ঈমানদারদের জন্যেও 'সালাত' ও 'সালাম' পেশ করার নির্দেশ দিলেন। বস্তুতঃ এরূপ 'সালাত' ও 'সালাম' পেশ করার মাধ্যমে রাসূলের মর্যাদা, ফজিলত ও সম্মানের স্বীকৃতি দেয়া হয়। আয়াতের صَلُّوا এবং سَلِّمُوا শব্দদ্বয় নির্দেশসূচক। صَلُّوا শব্দটি ঈমানদার লোকদের সাথে সংশ্লিষ্ট বিধায় এর অর্থ হবে- নবীর জন্যে দোয়া করা। ইবনে আব্বাস (রাঃ( يُصَلُّونَ শব্দের ব্যাখ্যা করেছেন يُبَارَكُونَ শব্দ দিয়ে। এরূপ ব্যাখ্যা অর্থাৎ রাসূলদেরকে বরকতময় করার কথা কুরআনেও উল্লেখ আছে। যেমন ফেরেশতাগণ ইব্রাহিম আলাইহিস সালামের ব্যাপারে বললেন- رَحْمَةُ اللَّهِ وَبَرَكَاتُهُ عَلَيْكُمْ أَهْلَ الْبَيْتِ (সূরা হুদ: ৭৩)
ঈসা আলাইহিস সালাম প্রার্থনা করলেন- وَجَعَلَنِي مُبَارَكًا أَيْنَمَا كُنتُ যেখানেই আমি অবস্থান করি না কেন আমাকে বরকতময় কর।” (সূরা মারয়াম : ৩১)
এমতাবস্থায় শব্দটির বস্তুতঃ বরকতময় হওয়া স্তুতি-স্তবক, গুণ-গান ও মহিমা, গৌরব, মাহাত্ম ও ফজিলত পূর্ণ হওয়ার বিপরীত নয়। কেননা, যার মধ্যে এসব গুণাবলীর সমাহার ঘটে তিনিই তো বরকতময়। এ কারণেই নবী-রাসূলগণ বরকতময় হওয়ার যাচনা করতেন। আর আমাদের নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বরকত, রহমত ও মাগফিরাতের আধার হওয়া তো বলাই বাহুল্য।

📘 দুরুদ কি ও কেন দুরুদ পাঠের হাদীস ভিত্তিক পদ্ধতি > 📄 দুই. দুরূদ পাঠের আহকাম

📄 দুই. দুরূদ পাঠের আহকাম


রাসূলের উপর 'সালাত' পেশ করার তিনটি পর্যায়। ওয়াজিব, সুন্নত ও মুস্তাহাব।
রাসূলের উপর 'সালাত' ও 'সালাম' পেশ করা শরিয়ত সম্মত একটি বিধান হওয়ার ব্যাপারে কোনো দ্বিমত নেই। তবে ওয়াজিব, সুন্নত ও মুস্তাহাব হওয়ার ব্যাপারে দ্বিমত রয়েছে।
ওয়াজিব : সময়, কাল নির্ঘণ্ট নির্ধারণ না করে জীবনব্যাপী ন্যূনতম পরিমাণ দুরূদ পাঠ প্রত্যেক ঈমানদার ব্যক্তির জন্যে ওয়াজিব। কেননা কুরআনের আছে- يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا صَلُّوا عَلَيْهِ وَسَلِّمُوا تَسْلِيمًا * “হে ঈমানদারগণ। তোমরা তাঁর (নবীর) উপর সালাত ও সালাম পেশ কর।" (আহযাব: ৫৬)
এ আয়াতের صَلُّوا এবং سَلِّمُوا শব্দদ্বয় اَمْر বা নির্দেশ সূচক শব্দ। উসূলে ফিকাহর মতে اَمْر নির্দেশ দু'ধরনের হয়ে থাকে। اَمْرُ لِلْوُجُوبِ অর্থাৎ ওয়াজিব সূচক এবং اَمُرُ لِلنُّدُوبِ অর্থাৎ ইচ্ছা সূচক। এ আয়াতের اَمْر ওয়াজিব সূচক হওয়ার ব্যাপারে প্রায় সকল ফিকাহবিদগণ একমত পোষণ করেছেন। সুতরাং রাসূলের উপর সালাত ও সালাম পেশ করা ওয়াজিব। তাছাড়া রাসূলের নাম স্মরণ করলে রাসূলের উপর সালাত পাঠ করা শ্রবনকারীদের জন্যে ওয়াজিব হয়ে যায়। একটি হাদীসে উল্লেখ আছে, রাসূলের নাম উচ্চারিত হওয়ার পর কেউ 'সালাত' পেশ না করলে তাকে অভিশপ্ত, বখীল, হতভাগা ও দুর্ভাগা বলা হয়েছে। বস্তুতঃ ওয়াজিব জাতীয় হুকুমের বরখেলাফ করলেই এরূপ শাস্তিযোগ্য পরিণামের কথা বলা হয়ে থাকে। অবশ্য কেউ কেউ বলেছেন, তাশাহুদে 'সালাত' পাঠ করা ওয়াজিব।
সুন্নত: নামাযের শেষ বৈঠকে তাশাহুদের পর 'দুরূদ' পাঠ করা সুন্নত হওয়ার ব্যাপারে অধিকাংশ ফিকাহবিদ ঐকমত্য হয়েছেন। ইমাম তাহাবী কাযী আয়ায, খাত্তাবী এ মত পোষণ করেছেন। ইমাম শাফেয়ী (রঃ) এ সময়ে দুরূদ পড়া ওয়াজিব বলেছেন। আবদুল্লাহ্ ইবনে ওমর (রাঃ) থেকে একটি মারফু হাদীস বর্ণিত হয়েছে এভাবে-
لَا تَكُونُ صَلَاةٌ إِلَّا بِقِرَاءَةٍ وَتَشَهُدٍ وَصَلَاةٍ عَلَى * “কিরাত, তাশাহুদ এবং আমার উপর সালাত পেশ ছাড়া নামায শুদ্ধ হবে না।" (আবু দাউদ, তিরমিজি, নাসায়ী: ৩/৪৪)
দুরূদ ছাড়া নামায শুদ্ধ না হওয়া দুরূদ পড়া ওয়াজিব হওয়ার প্রমাণ। এমনিভাবে জানাযার নামাযে দুরূদ পাঠ করা সুন্নত। সাঈদ বিন মুসাইয়‍্যাব (রঃ) থেকে বর্ণিত আছে, জানাযার নামাযে সুন্নত হলো-
أَنْ يَقْرَاء بِفَاتِحَةِ الْكِتَابِ وَيُصَلِّى عَلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عليه وسلم * “সূরায়ে ফাতিহা পড়া এবং নবীর উপর দুরূদ পাঠ করা।” (মুসতদরিকে হাকেম : ১/৩৬০)
হযরত আবু হোরাইরাহ (রাঃ) এবং আবু উমামাহ বিন সাহল (রাঃ) থেকেও অনুরূপ একটি হাদীস বর্ণিত আছে।
খুৎবা দানের প্রারম্ভে, আযানের পর, মসজিদে প্রবেশ ও বাহির হওয়ার সময়, সাফা-মারওয়ায় উঠে, জুমআর দিন রাতে, কুরআন খতম করার সাথে, মুসিবত ও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হলে দুরূদ পড়া সুন্নত।
দোয়া করার আগে, মাঝখানে এবং শেষে দুরুদ পাঠ করা সুন্নত। কেউ এরূপ দুরূদ পাঠ করা মুস্তাহাব বললেও হাদীস দ্বারা সুন্নত হিসেবেই প্রমাণিত। যেমন হযরত আলী (রাঃ) থেকে বর্ণিত হাদীসে আছে, দোয়ার সময় প্রার্থনাকারী ও আল্লাহ্ মাঝখানে দুরূদ না পড়া পর্যন্ত আড়ালের সৃষ্টি হয়। দুরূদ পাঠ করলে আড়ালটি উঠে যায় এবং দোয়া কবুল করা হয়। আর দুরূদ না পড়লে পর্দা উঠানো হয় না, দোয়াও কবুল হয় না। (তারগীব ও তারহীব)

📘 দুরুদ কি ও কেন দুরুদ পাঠের হাদীস ভিত্তিক পদ্ধতি > 📄 চার. দুরূদ পাঠের ফায়দা ও উপকারিতা

📄 চার. দুরূদ পাঠের ফায়দা ও উপকারিতা


রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর দুরূদ পাঠ করলে কুরআন হাদীসের ভিত্তিতে পাঠকারী যেসব বিষয়ে উপকৃত হবেন সেগুলো সম্পর্কে নিম্নে আলোচনা করা হলোঃ
(১) আল্লাহ তায়ালা কুরআনে নবীর উপর দুরূদ পাঠের যে নির্দেশ দিয়েছেন তা পালন করা হয়।
(২) 'সালাত' পেশ করার মাধ্যমে দুরূদ পাঠকারী এবং আল্লাহর সাথে একটি বন্ধন সৃষ্টি হয়। অর্থাৎ আল্লাহ্ নবীর উপর 'সালাত' (রহমত) বর্ষণ করেন এবং বান্দাহ নবীর জন্যে 'সালাত' (দোয়া) করেন।
(৩) 'সালাত' পেশ করার ব্যাপারে দুরূদ পাঠকারী এবং ফেরেশতাদের সাথেও একটি সেতুবন্ধন সৃষ্টি হয়। কেননা কুরআনে ফেরেশতাগণ নবীর উপর সালাত (মাগফিরাত ও বরকত কামনা) পেশ করার কথা উল্লেখ আছে।
(৪) একবার মাত্র দুরূদ পাঠের বিনিময়ে ১০টি আল্লাহর রহমত লাভ হয়।
(৫) দুরূদ পাঠকারী ১০টি পদমর্যাদায় অধিষ্ঠিত হোন।
(৬) তাকে ১০টি নেকী দেয়া হয়।
(৮) দুরূদ পাঠকারীর দোয়া কবুল হওয়ার আশা করা যায়। কেননা পঠিত দুরূদ বান্দাহর মনের বাসনা আল্লাহর কাছে পৌঁছে দিতে সহায়তা করে।
(৯) 'ওসীলা' নামীয় বেহেশতের উচ্চাসন লাভের ব্যাপারে রাসূলের জন্যে দোয়া করলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর শাফায়াত লাভ করা যাবে।
(১০) দুরূদ গুনাহ মাফের উপায়। সুতরাং পাঠকারী ক্ষমাপ্রাপ্ত ব্যক্তি হিসেবে গণ্য হতে পারে।
(১১) একজন দুরূদ পাঠকারী আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পিত ব্যক্তি রূপে প্রমাণিত হতে পারে।
(১২) কিয়ামত দিবসে রাসূলের নৈকট্য লাভের উপাদান।
(১৩) পাঠকারী ব্যক্তির কঠিন ও দুর্বোধ ব্যাপার সহজ-সরল হয়।
(১৪) দুরূদ মনোবাঞ্ছা পূরণের অন্যতম উপাদান।
(১৫) আল্লাহর রহমত এবং ফেরেশতাদের মাগফিরাতের দোয়া পাওয়ার উপায়।
(১৬) দুরূদ মানুষের আত্মা ও দেহকে পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন করে।
(১৭) দুরূদ পাঠকারীকে তার মৃত্যুর আগেই বেহেশতের শুভসংবাদ প্রদান করে।
(১৮) দুরূদ কিয়ামতের বিভীষিকা থেকে নাজাত পেতে সাহায্য করে।
(১৯) 'সালাম' ও 'সালাত' পেশকারী ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের 'সালাম' ও দোয়া ফিরে পেয়ে থাকে। (তারগীব তারহীব)
(২০) 'দুরূদ' ভুলে যাওয়া বস্তু স্মরণ করতে সহায়তা করে।
(২১) জনগণের সভা সমাবেশ, বৈঠক, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম বরকতময় ও সুশৃংখল হতে সাহায্য করে।
(২২) দারিদ্র্য বিমোচনে দুরুদের ভূমিকা রয়েছে।
(২৩) একজন ব্যক্তি কৃপণ অভিধায় থেকে বাঁচতে পারে যদি সে রাসূলের নাম শ্রবণ করার সাথে সাথে তাঁর উপর দুরূদ পাঠ করে।
(২৪) বেহেশত লাভের রাস্তা দুরূদ পাঠকারীর জন্যে প্রশস্ত হয়ে যায়।
(২৫) দুরূদ জন সমাবেশ পুঁতিদুর্গন্ধময় ও আবর্জনাসম না হতে সাহায্য করে। কেননা যে সমাবেশে আল্লাহতায়ালার গুণ-গান এবং রাসূলের উপর সালাম ও সালাত পেশ করা হয় না, সে সমাবেশ পুঁতি দুর্গন্ধময় আবর্জনা সদৃশ্য হয়ে থাকে।
(২৬) বাক্যালাপ তথা যাবতীয় কথাবার্তা ও কাজ-কর্ম ব্যাপক ও সঠিক হতে সাহায্য করে। কেননা, যে কাজ বা কথা আল্লাহ্র স্তুতি ও রাসূলের উপর সালাত পাঠের মাধ্যমে শুরু হয় সে কাজ ব্যাপক হয়ে থাকে।
(২৭) 'দুরূদ' পুলসিরাত দ্রুত অতিক্রম করতে সাহায্য করবে।
(২৮) 'দুরূদ' বান্দাহকে নিষ্ঠুরতা ও কঠোরতা থেকে রক্ষা করে।
(২৯) দুরূদ পাঠকারী আসমান ও যমীনে বসবাসকারীদের কাছে স্মরণীয় ও বরণীয় হয়ে থাকেন। কেননা ঐ ব্যক্তি দুরূদের মাধ্যমে রাসূলের মান-সম্মান, ইজ্জত ও মর্যাদার জন্যে আল্লাহ্র কাছে প্রার্থনা করে থাকে। আল্লাহ্ তায়ালাও তাঁকে ঐভাবে প্রতিদান দিয়ে থাকেন।
(৩০) দুরূদের ওসীলায় দুরূদ পাঠকারী নিজের, তার কাজ, বয়স এবং কল্যাণমুখী তৎপরতায় বরকত হয়। কেননা পাঠকারী দুরূদের মাধ্যমে রাসূল ও তাঁর পরিবার পরিজনের উপর বরকত নাযিল করার জন্যে আল্লাহ্র কাছে দোয়া করে থাকে। ফলে আল্লাহও তাকে ঐরূপ বরকতের প্রতিদান দিবেন।
(৩১) 'দুরূদ' আল্লাহ্র রহমত পাওয়ার উপাদান। রাসূল নিজেই বলেছেন, তাঁর উপর সালাত পেশ করলে বিনিময়ে আল্লাহ্ তায়ালা তাঁকে রহমত করবেন।
(৩২) রাসূলের মহব্বতের সাথে বান্দাহর মহব্বতের স্থায়িত্ব সৃষ্টি করে দুরূদ। রাসূলের প্রতি আকর্ষণ বৃদ্ধি ও স্থীতিশীল করতে সহায়তা করে দুরূদ। মহব্বতে রাসূল ঈমানী শক্তি ও গ্রন্থির অন্যতম উপাদান। একথা সহজাত যে, আকর্ষিত ব্যক্তি বা বস্তুকে বেশী পরিমাণে স্মরণ করা হয়ে থাকে। একজন উম্মত তাঁর নবীর উপর দুরূদ পাঠ করার মাধ্যমে তাঁকে স্মরণ করে। স্মরণ করার সময় তার সামনে ভেসে উঠে নবীর সৌমকান্তি, সুমহান আদর্শ, বিশ্বব্যাপী যুগোপযোগী কর্মধারা। ফলে নবীর প্রতি শ্রদ্ধা, আকর্ষণ, আনুগত্য বৃদ্ধি পায়। শ্রদ্ধা ও আকর্ষণ বৃদ্ধি পেলে নবীর প্রদর্শিত পথ অনুসরণ করা সহজ ও স্বতঃস্ফূর্ত হয়।
(৩৩) নবীর মহব্বত অর্জন করার ব্যাপারে দুরূদ অন্যতম উপায়। কেননা দুরূদ পাঠকারী নবীর মহব্বতে যখন সালাত পাঠ করে, তখন নবী আলাইহিস সালামও তাকে মহব্বত করেন।
(৩৪) দুরূদ বান্দাহর হিদায়াত ও জীবন্ত রাখার মোক্ষম উপায়। দুরূদ পাঠকারী যত বেশি পরিমাণে দুরূদ পাঠ করবে, রাসূলের প্রতি মহব্বত ও আকর্ষণ তার অন্তরে ততোধিক পরিমাণে বদ্ধমূল হতে থাকবে। ফলে তার হৃদয় রাজ্য আল্লাহ ও রাসূলের আদর্শ, শিক্ষা ও নীতিতে উজ্জীবিত হতে বাধ্য। আর কারো মন-মানসিকতা, চরিত্র, অভ্যাস, নবীর আদর্শে রঞ্জিত হলে তাকে কোনো ধরনের অপকর্ম স্পর্শ করতে পারে না। শত বাধা, ঝড়-যঞ্ঝা তাকে টলাতে পারে না। হৃদয় রাজ্যে সে অনুভব করে এক অনাবিল শান্তি ও অনুপম সুখ।
(৩৫) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে দুরূদ পাঠকারীর নাম পেশ করার মিডিয়া হলো পঠিত দুরূদ। ফেরেশতাগণ পাঠকারীর নাম তাঁর কাছে পৌছে দেয়ার কথা হাদীসে বর্ণিত হয়েছে।
(৩৬) 'সালাত' অর্থাৎ 'দুরূদ' নির্ভয়ে পুলছিরাত অতিক্রম করতে সাহায্য করে। হাদীসে আছে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বপ্নে দেখলেন, তাঁর একজন উম্মত পুলছিরাতের উপর হামাগুড়ি দিচ্ছিল। সে কখনো ঝুলতেছিল আবার কখনো পড়ে যাওয়ার উপক্রম হচ্ছিল। এমতাবস্থায় আমার উপর তার পঠিত দুরূদ মূর্ত প্রতীকরূপে হাজির হয়ে তাকে পুলছিরাত অতিক্রম করায় সহায়তা করে।
(৩৭) মহান আল্লাহ তায়ালা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বান্দাহর কাছে নবীরূপে প্রেরণ করে মানব জাতির উপর যে ইহসান করেছেন এবং রাসূল আল্লাহ্ প্রদত্ত নির্দেশাবলী বাস্তবায়ন করে উম্মতকে যে উপকার করেছেন সেগুলো অগনিত, অসহস্র। এ অবারিত ইহসান ও ঋণের হক যথার্থভাবে আদায় করা সহজ নয়। আল্লাহ্ তায়ালা স্বীয় নবীর মর্যাদার কারণে কোনো বান্দাহর দুরূদ পাঠকে ন্যূনতম হক আদায় করা হিসেবে গ্রহণ করে থাকেন।
(৩৮) 'দুরূদ' আল্লাহর যিকর, শুকর এবং বান্দার জন্যে তাঁর অগনিত নেয়ামতের সাথে পরিচয় লাভের মাধ্যম। বস্তুতঃ 'দুরূদ' রাসূলের প্রতি সম্মান প্রদর্শন, তাঁর অনুসৃত নীতির অনুকরণ এবং তাঁর প্রদর্শিত পথের অনুকরণ করা বুঝায়। রাসূলের পদাঙ্ক অনুসরণ করা প্রকারান্তে আল্লাহ্ মাগফিরাত ও মহব্বত পাওয়ার নামান্তর। আল্লাহ নিজেই বলেছেন, আমার মহব্বত পেতে চাইলে আমার নবীকে অনুসরণ অনুকরণ করতে হবে। সুতরাং দুরূদ পাঠকারী আল্লাহকে স্মরণ করে তাঁর শুকরিয়া আদায় করার দায়িত্ব বহন করে থাকে। আল্লাহ্র যিকর ও শুকর ঈমানের একটি মৌলিক অংশ। দুরূদের মৌলিক গঠন এবং তদানুযায়ী আমলের পরিমাণ যতই বাড়বে ঈমানী শক্তিও ততো বাড়তে থাকবে।
(৩৯) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর সালাত পেশ করার অর্থ দোয়া করা। আল্লাহর কাছে বান্দাহর চাওয়া-পাওয়া দু'ধরনের হয়ে থাকে।
(ক) মানুষ আল্লাহর কাছে দিবা নিশি অহর্নিষ নিজের প্রয়োজনীয় সুখ-শান্তি কিংবা বালা-মুছিবত থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যে দোয়া করে থাকে।
(খ) মানুষের অন্য ধরনের দোয়া নিজের জন্যে নয়। বরং আত্মীয়-স্বজন, পরিবার-পরিজন এবং অন্তরঙ্গ বন্ধু-বান্ধব ও শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিবর্গের জন্য। 'দুরূদ' এ ধরনের দোয়া। অর্থাৎ নিজের জন্যে, রাসূলের জন্যে দোয়া করা। রাসূল হচ্ছেন সারা বিশ্বের একক ও অনন্য বরণীয় পূজনীয় ব্যক্তিত্ব। তাঁর জন্যে দোয়া করা তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ এবং তাকে পরম শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করার নামান্তর। অতএব, আল্লাহ তায়ালাও যে দোয়া করা ব্যক্তিকে ঐরূপ প্রতিদানে আপ্লুত করবেন তা সহজেই অনুমেয়।

📘 দুরুদ কি ও কেন দুরুদ পাঠের হাদীস ভিত্তিক পদ্ধতি > 📄 পাঁচ. কোন কোন জায়গায় ‘দুরূদ’ পড়া উচিত

📄 পাঁচ. কোন কোন জায়গায় ‘দুরূদ’ পড়া উচিত


আমাদের সমাজে যত্র-তত্র এমনকি সিনেমার বই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তথাকথিত মিলাদের মাধ্যমে 'সালাত' পেশ করা হয়ে থাকে। কোথায় কেমন করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর দুরূদ পাঠ করতে হবে তা তিনি স্বয়ং বলেছেন। এসব স্থান ও সময়গুলো আমাদের জানা থাকা দরকার। স্থানগুলো হলোঃ
(১) নামাযে তাশাহুদের পর: তাশাহুদের পর দুরূদ পাঠ করা কারো মতে ওয়াজিব হলেও ঐকমত্য হলো সুন্নত। রাসূলের উপর সালাত পাঠ ব্যতীত নামায পূর্ণ হয় না। এ পর্যায়ে আবু মাসউদ ওকবা বিন আমর আনসারী (রাঃ) ফাদালাহ ইবনে ওবাইদ (রাঃ) এবং আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ) প্রমুখ সাহাবীগণ থেকে বর্ণিত হাদীসে আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তাঁর উপর সালাত পেশ করার পদ্ধতি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন:
قُولُوا : اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ وَبَارِكْ عَلَى مُحَمَّd وَعَلَى آلِ مُحَمَّd كَمَا بَارَكْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ * (আহমদ)
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর থেকে বর্ণিত আছে, নবী আলাইহিস সালাম বলেছেনঃ
لَا تَكُونُ صَلَاةُ الأَبْقِرَاةِ وَتَشَهْدٍ وَصَلَاةٍ عَلَى * কিরাত, তাশাহুদ এবং আমার উপর দুরূদ পেশ ছাড়া নামায (পূর্ণ) হবে না। (ফাতহে কাদীর: ১১/১৬৯)
(২) জানাযার নামায : সালাতুল জানাযার সুন্নত নিয়ম হলো, ইমাম তাকবীর বলার পর সূরা ফাতেহা পড়বেন এবং তৃতীয় তাকবীরে রাসূলের উপর দুরূদ পাঠ করবেন। (ইবনে কাসীর: ৩/৫২১)
একবার আবু সাঈদ মাকবারী (রাঃ) আবু হোরাইরাহ (রাঃ)-কে জানাযার নামায আদায় করার পদ্ধতি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন: জানাযার তাকবীর বলার পর আল্লাহর তারীফ করলাম (আলহামদু সূরা পড়া) তারপর রাসূলের উপর দুরূদ পাঠ করলাম, অতঃপর বললামঃ
اللَّهُمَّ إِنَّهُ عَبْدُكَ وَابْنُ عَبْدِكَ وَابْنُ آمَتِكَ كَانَ يَشْهَدُ أَنْ لَا إلهَ إِلَّا أَنْتَ وَأَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُكَ وَرَسُولُكَ وَأَنْتَ أَعْلَمُ بِهِ *
(মুসান্নাফ: ৬৪২৫)
(৩) জুমআ এবং দুই ঈদের খুতবাঃ আউন বিন ওবাই জুহাইফাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। ওবাই ছিলেন হযরত আলীর (রাঃ) শাসনামলের একজন প্রতিরক্ষা সৈনিক। তিনি বলেছেন: হযরত আলী (রাঃ) খুৎবা দানের উদ্দেশ্যে মিম্বরে আরোহণ করে হামদ ও ছানার পর নবী আলাইহিস সালামের উপর দুরূদ পাঠের পর বলতেন:
خَيْرُ هَذِهِ الْأُمَّةِ بَعْدَ نَبِيِّهَا أَبُو بَكْرٍ ، ثُمَّ يَجْعَلُ اللهُ الْخَيْرَ حَيْثُ شَاءَ ، وَالثَّانِي عُمَرُ
আল্লাহ যেভাবে ইচ্ছা করতেন সেভাবে কল্যাণ ও মঙ্গল দান করতেন। (আহমাদ: ১/১০৬)
ইবনে মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি সালাতের খুৎবা শেষ করে রাসূলের উপর সালাত পেশ করার পর বলতেন:
اللَّهُمَّ حَبِّبُ إِلَيْنَا الْإِيمَانَ وَزَيَّنَهُ فِي قُلُوبِنَا وَكَرَهُ إِلَيْنَا الْكُفْرَ وَالْفُسُوقَ وَالْعِصْيَانَ أُولَئِكَ هُمُ الرَّاشِدُونَ اللَّهُمَّ بَارِكْ لَنَا فِي أَسْمَاعِنَا وَأَبْصَارِنَا وَأَزْوَاجِنَا وَقُلُوبِنَا وَذُرِّيَّتِنَا *
(৪) আযানের পর: এ পর্যায়ে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে। তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছেনঃ
إذَا سَمِعْتُمُ الْمُؤَذِّنَ فَقُولُوا مِثْلَ مَا يَقُولُ، ثُمَّ صَلُّوا عَلَى فَإِنَّهُ مَنْ صَلَّى صَلَاةٌ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ بِهَا عَشْرًا ، ثُمَّ سَلُوا اللَّهُمَّ لِي الْوَسِيلَةَ فَإِنَّهَا مَنْزِلَةٌ فِي الْجَنَّةِ لَا تَبْغِي إِلَّا لِعَبْدِ مِنْ عِبَادِ اللهِ وَارْجُوَانِ أَكُونَ أَنَا هُوَ فَمَنْ سَأَلَ لِي الوَسِيلَةَ حَلَّتْ لَهُ الشَّفَاعَةُ *
“মুয়ায্যিনের আযান শ্রবন করার সময় তোমরা তার অনুরূপ অর্থাৎ আযানের জবাব দাও। তারপর আমার উপর দুরূদ পাঠ কর। যে আমার উপর দুরূদ পাঠ করবে বিনিময়ে আল্লাহ তাকে ১০টি রহমত দান করবেন। তারপর আল্লাহর কাছে আমার জন্যে ওসীলাহ এর প্রার্থনা কর 'ওসীলাহ' জান্নাতের একটি উচ্চাসনের নাম। আল্লাহর বিশেষ বান্দাদের জন্যে এ আসন সংরক্ষিত। বিশেষ ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত হওয়া আমার বাসনা। যে আমার জন্যে ওসীলাহ পাওয়ার ব্যাপারে প্রার্থনা করে তার জন্যে আমি অবশ্যই সুপারিশ করবো। (মুসলিম: ৩৮৪)
এ জন্যেই আযানের পর দোয়া করতে হয়। দোয়াটি হলো-
اللَّهُمَّ رَبَّ هَذِهِ الدَّعْوَةِ التَّامَّةِ وَالصَّلَاةِ الْقَائِمَةِ أَتِ مُحَمَّدَنِ الْوَسِيلَةَ وَالْفَضِيلَةَ وَالدَّرَجَةَ الرَّفِيعَةَ وَابْعَثْهُ مَقَامًا مَحْمُودَنِ الَّذِي وَعَدْتَهُ إِنَّكَ لَا تُخْلِفُ الْمِيعَادَ *
বস্তুতঃ এ দোয়ার মাধ্যমে রাসূলের জন্যে 'ওসীলাহ' নামীয় উচ্চাসন পাওয়ার জন্যে প্রার্থনা করা হয়।
(৫) আল্লাহর কাছে মুনাজাত করার সময় : মুনাজাত করার সময় দুরূদ পাঠের ৩টি স্তর রয়েছেঃ
(ক) আল্লাহ তায়ালার হামদ ও প্রশংসা করার পরই দুরূদ পাঠ করার মাধ্যমে দোয়া করা। (খ) মুনাজাত করার প্রারম্ভে, মধ্যভাগে এবং শেষাংশে দুরূদ পাঠ করা। (গ) মুনাজাত করার প্রথমে এবং শেষে দুরূদ পাঠ করা। এ পর্যায়ে ফাদালাহ বিন ওবাইদ (রাঃ) বললেন: নবী আলাইহিস সালাম একজন লোককে তার উপর দুরূদ পাঠ না করে মুনাজাত করার কথা শুনতে পেয়ে বললেন : هُذَا عَجْلٌ এটা তাড়াহুড়া। তারপর তিনি ডেকে তাকে ও অন্যান্যদেরকে বললেন:
إِذَا صَلَّى أَحَدُكُمْ فَلْيَبْدَاءُ بِتَحْمِيدِ اللَّهِ وَالثَّنَاءِ عَلَيْهِ ثُمَّ لِيُصَلِّ عَلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ثُمَّ لِيَدْعُ بَعْدُ بِمَا شَاءَ *
তোমাদের কেউ মুনাজাত করতে চাইলে আল্লাহর প্রশংসা-স্তুতি দিয়ে আরম্ভ করা উচিত। তারপর নবী আলাইহিস সালামের উপর দুরূদ পাঠ করা জরুরী। এরপর তোমাদের ইচ্ছানুযায়ী আল্লাহর কাছে প্রার্থনা কর। (আবু দাউদ : ১৪৮১, তিরমিজি: ৩৪৭৭, নাসায়ী: ৩/৪৪, আহমদ: ৬/১৮, মুসতাদরাক: ১/২৩০)
(খ) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) থেকে অপর একটি হাদীস বর্ণিত আছে। তিনি বলেনঃ كُنْتُ أَصْلِ وَالنَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَأَبُو بَكْرٍ وَعُمَرُ مَعَهُ - فَلَمَّا جَلَسْتُ بَدَأْتُ بِالثَّنَاءِ عَلَى اللهِ تَعَالَى . ثمَّ بِالصَّلَاةِ عَلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ثُمَّ دَعَوْتُ لِنَفْسِي فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ - سَلْ تُعْطَهُ، سل تعطه *
আমি নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং আবু বকর (রাঃ) ও ওমর (রাঃ) সমভিব্যহারে নামায পড়তেছিলেন। নামাযান্তে বসে আল্লাহর প্রশংসা করলাম। তারপর নবীর উপর দুরূদ পাঠ করতঃ মনে মনে মুনাজাত করলাম। এরূপ করাতে নবী আলাইহিস সালাম বললেন: এবার তুমি চাও, দেয়া হবে। (তিরমিজি: ৪/১৫৬)
(গ) আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) থেকে অপর একটি হাদীস বর্ণিত আছে। তিনি বলেছেন: إِذَا أَرَادَ أَحَدُكُمْ أَنْ يَسْأَلَ اللَّهَ تَعَالَى فَلْيَبْدَأَ بِحَمْدِهِ وَالثَّنَاءِ عَلَيْهِ بِمَا هُوَ أَهْلُهُ، ثُمَّ يُصَلِّى عَلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ثُمَّ يَسْأَلُ بَعْدُ، فَإِنَّهُ أَجْدَرُ أَنْ يَنْجُ أَوْ يُصِيبُ *
তোমাদের কেউ আল্লাহর কাছে মুনাজাত করতে চাইলে আল্লাহর যথাযথ প্রশংসা ও গুণগান দিয়ে মুনাজাত আরম্ভ করা উচিত। অতঃপর নবীর উপর সালাত পাঠ করার পর দোয়া করবে। এভাবে মুনাজাত করা অধিকতর উপযোগী ও গ্রহণীয়। (জালাউল আস্হাম: পৃঃ ৩০৭)
(ঘ) হযরত আলী (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে- مَا مِنْ دُعَاءِ الأَبَيْنَهُ وَبَيْنَ اللَّهِ حِجَابُ حَتَّى يُصَلِّى عَلَى مُحَمَّدٍ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَإِذَا صَلَّى عَلَى النَّبِيِّ صلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، إِنْخَرَقَ الْحِجَابُ وَاسْتَجِيبَ الدُّعَاءُ، وَإِذَا لَمْ يُصَلِّ عَلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَمْ يُسْتَجَبِ الدُّعَاءُ *
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর দুরূদ পাঠ না করা পর্যন্ত মুনাজাতকারী এবং আল্লাহর মাঝখানে একটি পর্দার সৃষ্টি হয়। মুনাজাতকারী রাসূলের উপর দুরূদ পাঠ করলে পর্দা ফেটে যায় এবং দোয়া কবুল করা হয়। আর নবীর উপর দুরূদ পাঠ না করলে দোয়া কবুল করা হয় না। (তারগীব ও তারহীব: ৩/১৬৫)
মোটকথা, পবিত্রতা (طَهَارَةٌ) (যেমন নামাযের জন্য (مِفْتَاحُ الصَّلَاةِ) চাবি স্বরূপ। তেমনি দুরূদ পাঠ দোয়া কবুলের জন্যে চাবি সাদৃশ। পবিত্রতা অর্থাৎ অযু ছাড়া যেমন নামায শুদ্ধ হয় না, তেমনি দুরূদ পাঠ ছাড়া দোয়া কবুল হয় না।
এ ব্যাপারে আহমদ ইবনে আবুল হাওয়াবী বলেছেন, আমি আবু সোলাইমান দারানীকে একথা বলতে শুনেছিঃ مَنْ أَرَادَ أَنْ يَسْأَلَ اللَّهَ حَاجَتَهُ فَلْيَبْدَأَ بِالصَّلَاةِ عَلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَلْيَسْأَلُ حَاجَتَهُ وَلْيَخْتِمُ بِالصَّلَاةِ عَلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ - فَإِنَّ الصَّلَاةَ عَلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَقْبُولَةٌ وَاللَّهُ أَكْرَمُ أَنْ يَرُدَّ مَا بَيْنَهُمَا *
যে তার প্রয়োজন পূরণের জন্যে আল্লাহর কাছে মুনাজাত করার ইচ্ছা করে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর দুরূদ পাঠ করার মাধ্যমে তার মুনাজাত শুরু করা এবং শেষ করা উচিত। কেননা দুরূদ পাঠ আল্লাহর নিকট গ্রহণীয় ও স্বীকৃত কাজ।
(৬) মসজিদে প্রবেশ করা ও বাহির হওয়ার সময়: এ পর্যায়ের হাদীস হলো: (ক) হযরত আবু হোরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
إِذَا دَخَلَ أَحَدُكُمُ الْمَسْجِدَ فَلْيُسَلِّمْ عَلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَلْيَقُلْ : اللَّهُمَّ افْتَحْ لِي أَبْوَابَ رَحْمَتِكَ - وَإِذَا خَرَجَ فَلْيُسَلِّمْ عَلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَلْيَقُلْ : اللَّهُمَّ أَجِرْنِي مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّحِيمِ *
তোমাদের কেউ মসজিদে প্রবেশ করলে নবী আলাইহিস সালামকে সালাম দিবে এবং বলতে হবে; আল্লাহুম্মাফ তাহলী আবওয়াবা রাহমাতিকা (আয় আল্লাহ! তোমার রহমতের দরজাসমূহ আমার জন্যে খুলে দাও) এবং বাহির হওয়ার সময় বলবে: আল্লাহুমা আজিরনী মিনাশ শাইতানির রাজীম (আল্লাহ, অভিশপ্ত শয়তান থেকে আমাকে রক্ষা কর) (ইবনে খুযাইমা : ৪৫৩, ইবনে হাব্বان: ৩২১)
(খ) ফাতেমা বিনতে হোসাইন (রাঃ) তাঁর দাদী ফাতিমাতুল কুবরা (রাঃ) থেকে রেওয়ায়েত করে বলেছেনঃ
كَانَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا دَخَلَ الْمَسْجِدَ قالَ : اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَسَلِّمُ اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي ذُنُوبِي وَافْتَحْ لِي أَبْوَابَ رَحْمَتِكَ - وَإِذَا خَرَجَ قَالَ مِثْلَ ذَلِكَ إِلَّا أَنَّهُ يَقُولُ : أَبْوَابَ فَضْلِكَ وَلَفْظُ التَّرْمِذِيّ : كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا دَخَلَ الْمَسْجِدَ صَلَّى عَلَى مُحَمَّدٍ *
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন মসজিদে প্রবেশ করতেন, তখন বলতেন: আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা 'মোহাম্মাদিন ওয়া সাল্লাম, আল্লাহুম্মাগফিরলী জুনুবী, ওয়াফতাহলী আবওয়াবা রাহমাতিকা (আয় আল্লাহ মুহাম্মদের উপর রহমত ও শান্তি দাও; আয় আল্লাহ আমার অপরাধ মাফ কর এবং তোমার রহমতের দ্বারসমূহ আমার জন্যে খুলে দাও) এবং বাহির হওয়ার সময় অনুরূপ কথা বলতেন। তবে আবওয়াবা ফাদলিকা (তোমার ফজিলতের দরজাসমূহ) এর স্থলে বলতেন (আবওয়াবা রাহমাতিকা)।
তিরমিজিতে আছে : হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে প্রবেশকালে বলতেন : صَلَّى عَلَى مُحَمَّدٍ وَسَلَّمَ )সাল্লা আলা মোহাম্মাদীন ওয়া সাল্লামা)। (আবু দাউদঃ ৪৬৫, তিরমিজিঃ ৩০৪, ইবনে মাজাহঃ ৭১১, ইবনে সুন্নী : ৮৭)
(৭) সাফা ও মারওয়া পাহাড়ে চড়া অবস্থায়: এ পর্যায়ে ইবনে ওমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাফায় চড়ে তিনবার বলতেনঃ لَّا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ * (লাইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা-শরিকালাহু, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন ক্বাদীর) তারপর নবী আলাইহিস সালামের উপর দুরূদ পাঠ করতঃ দীর্ঘক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়ে দোয়া করতেন। অতঃপর মারওয়ায় চড়ে অনুরূপভাবে দোয়া করতেন। (কাযী ইসহাক: ৮৭) (অবশ্য এরূপ করা দোয়া করার অন্তর্ভুক্ত।)
এ বিষয়ে ওহাব বিন আজদাআ থেকে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, আমি ওমর বিন খাত্তাব (রাঃ)-কে পবিত্র নগরী মক্কায় লোকদেরকে উদ্দেশ্য করে খুৎবা দিতে শুনেছি। তিনি বলেছেন:
إِذَا قَدِمَ الرَّجُلُ مِنْكُمْ حَاجًا فَلْيَطُفْ بِالْبَيْتِ سَبْعًا ، وَلْيُصَلِّ عِنْدَ الْمَقَامِ، رَكْعَتَيْنِ ثُمَّ يَسْتَلِمُ الْحَجْرَ الْأَسْوَدَ ، ثُمَّ يَبْدَأُ بِالصَّفَا فَيَقُومُ عَلَيْهَا وَيَسْتَقْبِلُ الْبَيْتَ فَيُكَبِّرُ سَبْعَ تكبِيرَاتٍ، بَيْنَ كُلِّ تَكْبِيرَةٍ حَمْدُ اللهَ عَزَّ وَجَلَّ وَتَنَاوُهُ عَلَيْهِ وَصَلَاةٌ عَلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَمَسْأَلَةٌ لِنَفْسِهِ، وَعَلَى الْمَرْوَةِ مِثْلُ ذَلِكَ *
কেউ হজ্জের উদ্দেশ্যে মক্কায় আসলে তার ৭ বার বাইতুল্লাহর তাওয়াফ করা, মাকামে ইব্রাহীমে ২ রাকায়াত নামায পড়া, তারপর হাজরে আসওয়াদকে চুমু দেয়া উচিত। অতঃপর সাফা থেকে সাঈ শুরু করতে হবে। সাফায় কিছু সময় অবস্থান করতঃ বাইতুল্লাহ মুখী হয়ে ৭ বার তাকবীর বলতে হবে। প্রত্যেক তাকবীরের মধ্যে হামদ ও ছানার পর নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর দুরূদ পাঠ করতে হবে। তারপর নিজের চাওয়া-পাওয়ার জন্যে মিনতি জানাবে। মারওয়ায় অনুরূপ কাজ (কাযী ইসহাক: ৭১) করবে।
(৮) জনগণের একত্রিত হওয়ার এবং বিচ্ছিন্ন হওয়ার প্রাক্কালে : এ বিষয়ের হাদীসগুলো হলো:
(ক) হযরত জাবের (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
مَا اجْتَمَعَ قَوْمٌ ثُمَّ تَفَرَّقُوا عَنْ غَيْرِ ذِكْرِ اللَّهِ وَصَلَاةٍ عَلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِلَّا قَامُوا عَنْ أَنْتَنِ مِنْ جِيفَةٍ *
কিছু লোক একত্রিত হওয়ার পর আল্লাহর যিকর এবং নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর সালাত পেশ করা ব্যতিরেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লে তারা যেনো ডাষ্টবিনের দুর্গন্ধ নিয়ে ফিরে আসলো। (আবু দাউদ তাইয়ালেমী: ১৭৫৬, বায়হাকী, নাসায়ী: ৪১১)
(খ) হযরত আবু হোরাইরাহ (রাঃ) নবী আলাইহিস সালামের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন:
مَا جَلَسَ قَوْمٌ مَجْلِسًا لَمْ يَذْكُرُوا اللَّهَ فِيْهِ وَلَمْ يُصَلُّوا عَلَى نَبِيِّهِمْ إِلَّا كَانَ عَلَيْهِِمْ تِرَةٌ فَإِنْ شَاءَ عَذَّبَهُمْ وَإِنْ شَاءَ غَفَرَ لَهُمْ * যে সমাগমে আল্লাহর যিকর এবং নবীর উপর সালাত পেশ করা হয় না তাদের জন্যে আফসুস ও অনুশোচনা। আল্লাহ ইচ্ছা করলে তাদেরকে শাস্তি দিতে পারেন। আবার ইচ্ছা করলে ক্ষমা করে দিতে পারেন। (মাসনাদঃ ২/৪৪৬, ৪৫২, ৪৮১, তিরমিজিঃ ৩৩৮০, মুসতাদরাক: ১/৪৯৬)
হযরত আবু হোরাইরাহ (রাঃ) হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করে বলেন:
مَا قَعَدَ قَوْمٌ مَقْعَدًا لَا يَذْكُرُونَ اللهَ عَزَّ وَجَلَّ وَيُصَلُّونَ عَـ لى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِلَّا كَانَ عَلَيْهِمْ حَسْرَةٌ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَإِنْ دَخَلُوا الْجَنَّةَ لِلثَّوَابِ * যে মজলিশে আল্লাহর যিকর এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর সালাত পেশ করা হয় না কিয়ামত দিবসে তাদের জন্যে আফসোস, যদিও তারা নেক আমলের দরুন বেহেশতে প্রবেশ করবে। (মাসনাদ : ২/৪৬৩, ইবনে হাব্বান: ২৩২২, হাকেম: ১/৪৯২, মুসতাদরাক: ১/৪৯৬)
(৯) রাসূলের নাম উচ্চারণের সময়ঃ এ পর্যায়ের হাদীস হলো: (ক) হযরত আনাস বিন মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ
مَنْ ذُكِرْتُ عِنْدَهُ فَلْيُصَلِّ عَلَى فَإِنَّهُ مَنْ صَلَّى عَلَيْهِ مَرَّةٌ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ عَشْرًا * যার কাছে আমার নাম উচ্চারণ করা হয়, তখন আমার উপর তার সালাত পেশ করা উচিত। যে আমার উপর একবার সালাت পেশ করবে আল্লাহ তায়ালা বিনিময়ে তাকে ১০টি নেকী দান করবেন। (নাসায়ী: ৬০, ইবনে সুন্নী : ৩৮৩, বুখারী, আদাবুল মুফরাদ: ৬৪৩)
(খ) হযরত কাব বিন ওজরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ
أَحْضُرُوا الْمِنْبَرَ فَحَضَرْنَا - فَلَمَّا ارْتَقَى دَرَجَةً قَالَ : أَمِينَ فَلَمَّا ارتقى الثَّانِيَةَ قَالَ أَمِينَ فَلَمَّا ارْتَقَى الدَّرَجَةَ الثَّالِثَةَ قَالَ : أَمِينَ فَلَمَّا نَزَلَ قُلْنَا يَا رَسُولَ اللَّهِ لَقَدْ سَمِعْنَا مِنْكَ الْيَوْمَ شَيْئًا مَا كُنَّا نَسْمَعُ قَالَ : إِنَّ جِبْرِيلَ عَرَضَ لِي، فَقَالَ : بعد منْ أَدْرَكَ رَمَضَانَ فَلَمْ يَغْفِرْ لَهُ - قُلْتُ أَمِينَ فَلَمَّا رَقَيْتُ الثَّانِيَةَ : قَالَ : بَعْدَ مَنْ ذُكِرْتُ عِنْدَهُ فَلَمْ يُصَلَّ عَلَيْكَ، فَقُلْتُ أمِينَ، فَلَمَّا رَقَيْتُ الثَّالِثَةَ، قَالَ : بَعْدَ مَنْ أَدْرَكَ أَبَوَيْهِ الْكِبَرَ عِندَهُ أَوْ أَحَدَهُمَا فَلَمْ يُدْخِلَاهُ الْجَنَّةَ قُلْتُ : أَمِينَ *
তোমরা মিম্বরের কাছাকাছি এসো। আমরা কাছাকাছি আসলাম। যখন তিনি মিম্বরের ১ম সিঁড়িতে চড়লেন তখন বললেন: আমীন (কবুল করুন)। ২য় এবং ৩য় সিঁড়িতে চড়েও আমীন বললেন। মিম্বর থেকে নামার পর আমরা তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা আপনার কাছে আজকে এমন কিছু শুনতে পেলাম যা ইতিপূর্বে আর কখনো শুনিনি। তিনি বললেন : জিব্রাইল (আঃ) আমার কাছে এসে বললেন: সে ব্যক্তি নিগৃহীত হোক যে রমযান মাস পেয়েও গুনাহ মাফ করতে সক্ষম হয়নি। আমি বললাম : আমীন! ২য় ধাপে দাঁড়াবার পর জিব্রাইল (আঃ) বললেন, আপনার নাম উচ্চারিত হওয়ার পর যে আপনার উপর সালাত পেশ করল না সে ব্যক্তি নিগৃহীত হোক। আমি বললাম : আমীন! আমি যখন ৩য় ধাপে চড়লাম তিনি বললেন, যে তার বাবা-মাকে কিংবা উভয়ের একজনকে বৃদ্ধাবস্থায় পাওয়ার পরও তাদের খেদমত করে নিজের স্থান বেহেশতে সংকুলান করতে সক্ষম হয়নি, সে ব্যক্তিও বিতাড়িত ও নিগৃহীত হোক। আমি বললাম আমীন।
(মুসতাদরাক: ৪/১৫৩,১৫৪)
(গ) হযরত আবু হোরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
رَغِمَ أَنْفُ رَجُلٍ ذُكِرْتُ عِنْدَهُ فَلَمْ يُصَلِّ عَلَى رَغِمَ أَنْفُ رَجُلٍ دَخَلَ عَلَيْهِ رَمَضَانُ ثُمَّ انْسَلَخَ قَبْلَ أَنْ يَغْفِرَ لَهُ، وَرَغمَ أَنْفُ رَجُلٍ أَدْرَكَ عَنْهُ أَبَوَاهُ الْكِبَرَ فَلَمْ يُدْخِلَاهُ الْجَنَّةَ *
ঐ ব্যক্তি লজ্জিত হোক যার কাছে আমার নাম উচ্চারণ করার পরও আমার উপর 'সালাত' পেশ করে না। ঐ ব্যক্তি নিগৃহীত হোক যার গুনাহ মাফ হওয়ার আগেই রমযান অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। এবং ঐ ব্যক্তিও অভিশপ্ত হোক যে পিতা-মাতাকে বৃদ্ধাবস্থায় পাওয়ার পরও (তাদের সেবা যত্নের অভাবে অসন্তুষ্টির কারণে) বেহেশতে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়নি। (তিরমিজি: ৩৫৩৯, সহীহুল জামে: ৩৬০৪)
(ঘ) হযরত হোসাইন বিন আলী ইবনে আবু তালেব (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
بَخِيلُ مَنْ ذُكِرْتُ عِنْدَهُ فَلَمْ يُصَلِّ عَلَيْهِ *
“সে ব্যক্তি বখীল যার কাছে আমার নাম উচ্চারিত হওয়ার পরও আমার উপর দুরূদ পাঠ করে না।” (সহীহুল জামে: ৩৫৪৬ মাসনাদ: ১/২০১)
(১০) সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সময়: এ পর্যায়ে হযরত আবু দারদা (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
مَنْ صَلَّى عَلَى حِينَ يُصْبِحُ عَشْرًا وَحِينَ يُمْسِي عَشْرًا . ادركتهُ شَفَاعَتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ *
“যে সকালে ১০ বার এবং সন্ধ্যায় ১০ বার আমার উপর দুরূদ পাঠ করবে, কিয়ামতের সংকটময় কালে সে আমার সুপারিশ লাভ করবে। (তিবরানী, জামে সগীর-৫২৩৩)
(১১) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রওজা মুবারকে অবস্থান কালে : এ পর্যায়ে আবদুল্লাহ বিন দিনার থেকে বর্ণিত আছে। তিনি বলেছেন-
رَأَيْتُ عَبْدَ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ يَقِفُ عَلَى قَبْرِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَيُصَلِّى عَلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ - وَيَدْعُو لِأَبِي بَكْرٍ وَعُمَرَ رَضِيَ اللَّهُ تَعَالَى عَنْهُمَا *
আমি আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ)-কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রওজা মুবারকে অবস্থান করত: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপর 'সালাত' পেশ করতে দেখলাম। আরো দেখলাম, তিনি আবুবকর (রাঃ) ও ওমরের (রাঃ) জন্যে দোয়া করছেন।" (তিবরানী, মুয়াত্তা: ১/১৬৬)
(১২) বাজারে যাওয়ার জন্যে বের হওয়ার সময় কিংবা দাওয়াত ও তাবলীগ জাতীয় কাজে বের হওয়ার প্রাক্কালে : আবু ওয়ায়েল থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে আছে-
مَا رَأَيْتُ عَبْدَ اللهِ جَلَسَ فِي مَادُبَةٍ وَلَا جَنَازَةٍ وَلَا غَيْرَ ذَلِكَ، فَيَقُومُ حَتَّى يَحْمَدَ اللهَ وَيُتَنِي عَلَيْهِ وَيُصَلِّي عَلَى النَّبِيِّ صلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَيَدْعُو بِدَعْوَاتٍ - وَإِنْ كَانَ يَخْرُجُ إِلَى السُّوقِ، فَيَأْتِي أَغْفَلَهَا مَكَانًا ، فَيَجْلِسُ ، فَيَحْمَدُ اللهَ وَيُصَلِّى عَلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَيَدْعُ بِدَعْوَاتٍ *
আল্লাহ্ হামদ ও ছানা এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর 'সালাত' পেশ এবং মানুষকে দ্বীনের প্রতি আহ্বান না করা পর্যন্ত আবদুল্লাহকে আমি কোনো খাবার খাওয়ার জন্যে, জানাযার জন্যে কিংবা অন্য কোনো কাজের জন্যে বসতে দেখিনি। যদি তিনি বাজারের উদ্দেশ্যে বের হতেন তাহলে বাজারের কোনো একটি নিভৃত জায়গায় এসে বসতেন। তারপর আল্লাহর হামদ করতেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপর 'সালাত' পেশ করতেন এবং মানুষদেরকে দ্বীনের দাওয়াত দিতেন। (সাখাবী: ২১৭)
(১৩) ঈদের নামাযঃ এ বিষয়ে হযরত আলকামাহ (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত হাদীসে দেখা যায়- একদিন ইবনে মাসউদ, আবু মুসা এবং হোযাইফা (রাঃ) প্রমুখ সাহাবীগণের কাছে ওলীদ ইবনে ওকবা ঈদের আগে এসে জিজ্ঞেস করলেন-
إِنَّ هَذَا الْعِيدَ قَدْ دَنَا ، فَكَيْفَ التَّكْبِيرُ فِيهِ؟ قَالَ عَبْدُ اللَّهِ : تَبْدَاءُ فَتُكَبِّرُ تَكْبِيرَةً تَفْتَحُ بِهَا الصَّلَاةَ وَتَحْمَدُ رَبَّكَ وَتُصَلِّي عَلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، ثُمَّ تَدْعُو وَتُكَبِّرُو تَفْعَلُ مِثْلَ ذَلِكَ *
"ঈদ তো অত্যাসন্ন। ঈদের নামাযে তাকবীর বলার পদ্ধতি কি? হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বললেন: তাকবীর বলে নামায শুরু কর এবং তোমার রবের প্রশংসা সূচক বাক্য বল এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর 'সালাত' পেশ কর। তারপর দোয়া কর, তাকবীর দাও এবং এরূপ করতে থাক....... কথাগুলো (হুযাইফা (রাঃ) ও আবু মুসা (রাঃ) সমর্থন করে বললেন- صَدَقَ أَبُو عَبْدِ الرَّحْمَنِ “আবু আবদুর রহমান সত্য বলেছেন।” (ইসমাঈল কাজীঃ৭৫৭৬, ইবনে কাসীরঃ৩/৫২১)
(১৪) জুমআ বারের দিন রাত: এ সম্পর্কিত হাদীস হলো- (ক) হযরত আউস বিন আউস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
إِنَّ مِنْ أَفْضَلِ أَيَّامِكُمْ يَوْمُ الْجُمُعَةِ : فِيْهِ خُلِقَ آدَمُ، وَفِيهِ قبِضَ وَفِيهِ النَّفَخَةُ، وَفِيهِ الصَّعِقَةُ، فَأَكْثِرُوا عَلَيَّ مِنَ الصَّلَاةِ فِيهِ، فَإِنَّ صَلَاتَكُمْ مَعْرُوضَةٌ عَلَى - قَالَ : قَالُوا يَا رَسُولَ اللهِ، وَكَيْفَ تُعْرَضُ صَلَاتُنَا عَلَيْكَ وَقَدْ أَرَمْتَ ؟ يَقُولُونَ بَلِيْتَ، فَقَالَ إِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ حَرَّمَ عَلَى الْأَرْضِ أَجْسَادَ الْأَنْبِيَاءِ *
"তোমাদের জন্যে সর্বোত্তম দিবস হচ্ছে জুমাবার। এদিনে আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি করা হয়েছে। এদিনে তার মৃত্যু হয়েছে, এদিনে ফুৎকার দেয়া হবে এবং এ জুমআর দিনেই কিয়ামত সংঘটিত হবে। সুতরাং শুক্রবারে তোমরা বেশি পরিমাণে আমার উপর 'দুরূদ' পাঠ কর। কেননা, তোমাদের পঠিত দুরূদ সমূহ আমার কাছে পেশ করা হয়। সাহাবাগণ জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আপনার শরীর তো জীর্ণ হয়ে যাবে, তাহলে আমাদের পঠিত 'সালাত' কেমন করে আপনার সমীপে পেশ করা হবে? তিনি জবাবে বললেন- পরম দয়ালু আল্লাহ্ তায়ালা নবীগণের শরীর ভক্ষণ বা ক্ষতি করা মাটির জন্যে হারাম করে দিয়েছেন। (আবু দাউদ: ১০৪৭, নাসায়ী: ৩/১৯, ইবনে মাজাহঃ ১০৮৫ মাসনাদ: ৪/৮ মুসতাদরাক: ৪/৫৬০)
(খ) হযরত আনাস (রাঃ) থেতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- اكثرُوا الصَّلَاةَ عَلَى يَوْمَ الْجُمُعَةِ وَلَيْلَةَ الْجُمُعَةِ - فَمَنْ صَلَّى عَلَى صَلَاةَ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ بِهَا عَشْرًا *
“তোমরা শুক্রবারের দিনে ও রাতে বেশি পরিমাণে আমার উপর দুরূদ পাঠ কর। কেননা যে ব্যক্তি আমার উপর একবার 'সালাত' পেশ করে, আল্লাহ্ তায়ালা বিনিময়ে তাকে ১০টি নেকী দেন।” (বায়হাকী: ৩/২৪৯)
(গ) আবু মাসউদ আনসারী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- اكْثِرُوا الصَّلَاةَ عَلَى فِي يَوْمِ الْجُمُعَةِ - فَإِنَّهُ لَيْسَ أَحَدٌ يُصَلِّى عَلَى يَوْمَ الْجُمُعَةِ الْأَعْرِضَتْ عَلَى صَلَاتَهُ *
“তোমরা জুমাবারে আমার উপর বেশি পরিমাণে দুরূদ পাঠ কর। কেননা এমন কেউ নেই যার শুক্রবারে আমার উপর পঠিত দুরূদ আমার সমীপে পেশ করা না হয়।” (হাকিম: ২/৪২১, জামে সগীরঃ ১২১৬)
(১৫) খতমে কুরআনের সময়: এ ব্যাপারে ইমাম ইবনে কাইউম (রঃ) বলেছেন, কুরআন পাঠের সমাপ্তিতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপর দুরূদ পেশ করা একটি মোক্ষম ও সময়োপযোগী স্থান ও কাল। এ সময়টি দোয়া কবুলের ক্ষণ। খতমে কুরআনের পর দোয়া করা আর দোয়ার পূর্বে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ্ আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর দুরূদ পড়া সোনায় সোহাগা। আবুল হারিছ থেকে বর্ণিত আছে, হযরত আনাস (রাঃ) কুরআনের খতম অনুষ্ঠানে পরিবার পরিজন ও সন্তান-সন্ততিদেরকে একত্রিত করতেন। খতমে কুরআন দোয়া কবুলের যথার্থ ক্ষণ হওয়ায় সে লগ্নটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর সালাতের সওগাত পেশ করাও যথোপযোগী হওয়া সহজেই অনুমেয়। (জালাউল আফহাম: ৩৩০, ৩৩১)
(১৬) আয়াত পাঠের সময় : ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রঃ) বলেছেন-
إِذَا مَرَّ الْمُصَلِّي بِآيَةٍ فِيهَا ذِكْرُ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَإِنْ كَانَ فِي نَفْلٍ صَلَّى عَلَيْهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ *
"নামাযে পঠিত আয়াতের মধ্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উল্লেখ আসলে নামায যদি নফল জাতীয় হয় তাহলে সে নবীর উপর দুরূদ পাঠ করবে। (জালাউল আফহাম: ৩৫৫) ইবনে সিনান বলেছেন, আব্বাস আল আম্বরী এবং আলী ইবনে মাদিনী বলেছেন-
مَا تَرَكْنَا الصَّلَاةَ عَلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي كُلِّ حَدِيثٍ سَمِعْنَاهُ *
“আমরা যখনই হাদীস শুনেছি তখন প্রতিটি হাদীস শুনার সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপর দুরূদ পাঠ করা পরিত্যাগ করিনি।” (ঐঃ ৩৩৮)
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ) বলেছেন- আমার জনৈক বিশ্বস্ত বন্ধু আমার কাছে বর্ণনা দিয়ে বললেন, আমি স্বপ্নযোগে একজন আহলে হাদীস লোক দেখলাম, আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম-
مَاذَا فَعَلَ اللَّهُ ذَاكَ، قَالَ : رَحِمَنِي أَوْ غَفَرَ لِي، قُلْتُ بِمَا ذلِكَ ؟ قَالَ : إِنِّي كُنْتُ إِذَا أَتَيْتُ عَلَى إِسْمِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَتَبْتُ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ *
"আল্লাহ্ তোমার সাথে কেমন ব্যবহার করেছেন? সে বললো- (আল্লাহ্) আমাকে রহমত করেছেন কিংবা আমাকে ক্ষমা করেছেন। আমি বললাম কেন? সে বললো- যখনই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নাম আমার সামনে আসতো তখনই আমি লিখতাম “সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম” সুফিয়ান সাওরী (রঃ) বলেছেন- একজন হাদীস চর্চাকারীর অন্য কোনো ফায়দা যদি না থাকে তাহলে এতোটুকু ফায়দাই যথেষ্ট যে, তিনি তাঁর হাদীস চর্চা করার সময় একথা লিখা 'সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।” (ঐ ৩৩৭)
(১৭) বালা-মুছিবত সংকট মুহুর্তে এবং মাগফিরাত কামনার সময় : এ পর্যায়ে উবাই বিন কাব (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতের শেষ প্রহরে জাগ্রত হয়ে বলতেন- يَا أَيُّهَا النَّاسُ، أَذْكُرُوا اللهَ، جَانَتِ الرَّاجِفَةُ تَتْبَعُهَا الرَّادِفَةُ جَانَتِ الْمَوْتُ بِمَا فِيهِ، جَانَتِ الْمَوْتُ بِمَا فِيهِ * 'হে লোকসকল! আল্লাহর যিকর কর, কিয়ামত আসবে, পরবর্তিতে প্রাসংগিক সব কিছুই তাকে অনুসরণ করবে, মৃত্যু এসব কিছুকে গ্রাস করে ফেলবে।”
ওবাই (রাঃ) বললেন- يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّ أَكْثَرَ الصَّلَاةِ عَلَيْكَ - فَكَمْ أَجْعَلُ لَكَ فِي صَلَاتِي ؟ فَقَالَ : مَا شِئْتَ - قُلْتُ : الرُّبُعُ ؟ قَالَ : مَا شِئْتَ - فَإِنْ زِدْتَ فَهُوَ خَيْرٌ لَكَ *
ইয়া রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমি আপনার উপর অধিক পরিমাণে 'সালাত' পেশ করে থাকি। আমার এ সালাতের কত অংশ আপনার জন্যে নির্ধারিত করব? তিনি বললেন- তুমি যতোটুকু ইচ্ছা কর? আমি বললাম- এক চতুর্থাংশ। তিনি বললেন- তোমার ইচ্ছা। যদি পরিমাণ বাড়াও সেটা তোমার জন্যে কল্যাণকর। এভাবে আমি দুই তৃতীয়াংশ এবং পরিশেষে সবটুকুই নবীর জন্যে নির্ধারণ করলে তিনি বললেন- إذَا تُكْفَى هَمَّكَ وَيَغْفِرُ لَكَ ذَنْبَكَ *
“তাহলে এটাতো তোমার সংকট দূরীকরণ ও তোমার গুণাহ মাপের জন্যে যথেষ্ট হবে।” (তিরমিজি: ২৪৫৭ মাসনাদ ৫/১৩৬ মুসতাদরাক: ২/৪২১)
(১৮) বিবাহের খুৎবায়: বিশ্বনন্দিত তাফসীরকার আবদুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস (রাঃ) আল্লাহর إِنَّ اللَّهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى النَّبِيِّ (নিশ্চই আল্লাহ্) তাঁর ফেরেশতাগণ নবীর উপর 'সালাত' পেশ করেন----) এ বাণীর তাফসীর প্রসংগে বলেছেন- মহান আল্লাহ্ তোমাদের নবীর প্রশংসা করেন এবং তাঁকে ক্ষমা করেন এবং ফেরেশতাদেরকে তাঁর জন্যে মাগফিরাত কামনা করার নির্দেশ দেন। যেমন- يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا صَلُّوا عَلَيْهِ
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা তোমাদের সালাতে, মসজিদে, প্রতি জায়গায় এবং বিবাহের পয়গামে তাঁর সন্তুষ্টি ও প্রশংসা কর। এরূপ সালাত পেশ করতে ভুলে যেয়ো না।
(১৯) প্রতি জায়গায়ই 'সালাত' পড়া: এ পর্যায়ে হযরত আবু হোরাইরাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- لَا تَجْعَلُوا بُيُوتَكُمْ قُبُوراً ، وَلَا تَجْعَلُوا قَبْرِى عِيدًا - وَصَلُّوا عَلَى : فَإِنَّ صَلَاتَكُمْ مَعْرُوضَةٌ تُبلَغُنِي حَيْثُ كُنْتُم *
“তোমরা তোমাদের ঘরকে কবর বানিয়োনা এবং আমার কবরকে মেলায় রূপান্তরিত করো না। আমার উপর 'সালাত' পেশ কর! তোমরা যেখানেই থাক, তোমাদের পঠিত 'সালাত' আমার সমীপে পেশ করা হয়।” (আবু দাউদ: ২০৪২, মসনাদ: ২/৩৬৭)
(২০) দোয়ায়ে কুনুতের শেষভাগ : এ পর্যায়ে আবদুল্লাহ বিন হারিস বর্ণনা করেন যে, আবু হালীমাহ মোয়াজ দোয়ায়ে কুনুতের মধ্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর সালাত পেশ করতেন।” (ওমর বিন খাত্তাব (রাঃ) হযরত মুয়ায (রাঃ)-কে রমযানে তারাবীহ পড়ানোর জন্যে ইমামরূপে নিয়োগ দিয়েছিলেন)। (كَانَ يُصَلِّى عَلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي الْقُنُوتِ )
ইবনে কাইয়িম (র) বলেছেন, “রমযান মাসে পঠিত দোয়ায়ে কুনুতের মধ্যে 'সালাত' পড়া মোস্তাহাব।”

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00