📘 দুরুদ কি ও কেন দুরুদ পাঠের হাদীস ভিত্তিক পদ্ধতি > 📄 তৃতীয় উপাদান- বাচনভংগীর কুশলতা

📄 তৃতীয় উপাদান- বাচনভংগীর কুশলতা


বাচনভংগীর কুশলতা আটটি বৈশিষ্ট্যের উপর নির্ভরশীল।
১ম বৈশিষ্ট্য : কথায় থাকবে কৌশল ও বুদ্ধিমত্তা। একথা সর্বজন বিদিত যে, আমাদের প্রিয় নবী ছিলেন উম্মি, নিরক্ষর। আক্ষরিক অর্থে লেখাপড়া না জানা সত্ত্বেও তিনি ছিলেন সর্বকালের সর্বযুগের শ্রেষ্ঠ শিক্ষাবিদ, ভাষাবিদ। তিনি কোথাও লেখা-পড়া করেননি, কোনো শিক্ষকের সংস্পর্শে আসেননি। কোনো পাঠ পড়েননি। তাঁর ছিল না কোনো উস্তাদ। এতদসত্ত্বেও তিনি ছিলেন ভাষার পণ্ডিত। তাঁর কথা ও বর্ণনায় ছিল আভিজাত্য ও শালীনতার ছাপ।
২য় বৈশিষ্ট্য: শ্রুত কথা কিংবা বর্ণিত বিবরণ সংরক্ষণে সক্ষম হওয়া। এ বৈশিষ্ট্যও ছিল আমাদের নবীর কথায় ও বর্ণনায়। আসলে আল্লাহ্ যাকে স্বীয় মনোনীত ও মনঃপুতরূপে সৃষ্টি করেন তাঁর বৈশিষ্ট্যের তুলনা হয় না। তাঁর মুখ নিঃসৃত হাজার হাজার বছরের আগের নবী-রাসূলগণের সুদীর্ঘ ইতিহাস, লক্ষ বছর আগে সংঘটিত ঘটনা শুনে সত্যিই আশ্চর্য হতে হয়। তাঁর মেধার তীক্ষ্মতা, মনের উদারতা ও অন্তকরণের বিশালতা কথায় ফুটে উঠতো।
৩য় বৈশিষ্ট্য: কথায় থাকবে ব্যাপকতা ও সার্বজনীনতা: রাসূলের কথায় ছিল ব্যাপকতা। তাঁর বলা কথা ছিল বাক্যের আকারে। কিন্তু অর্থ ও তাৎপর্য ছিল ব্যাপক ও সার্বজনীন। তাঁর অনুসৃত বাণীতে একথার প্রমাণ মিলে। তিনি বলেছেন أُوتِيْتُ جَوَامِعَ الْكَلِمِ অর্থাৎ “ব্যাপক অর্থবোধক কথামালার অধিকারী হয়ে আমি প্রেরিত হয়েছি।”
৪র্থ বৈশিষ্ট্য: কথায় থাকবে আবেশ-আবেগ, আকর্ষণ: আমাদের নবীর কথায় এ বৈশিষ্টগুলো ছিল পরিপূর্ণভাবে। তিনি কথা বললে রাগ করতেন না। তাঁর কথায় ছিল মমতা ও স্নেহ। এতীম, মিসকীন, বিধবা, অসহায় লোকজন তাঁর দয়াদ্র কথায় বিগলিত হয়ে যেতো। আর গুণীজনেরা হতেন আশ্চর্য।
৫ম বৈশিষ্ট্য : প্রশ্নবোধক কথায় থাকবে স্পষ্ট ও পরিচ্ছন্ন উত্তর বা সমাধান। এ বিষয়েও তিনি ছিলেন পরিপূর্ণ প্রতীক। কেউ প্রশ্ন করলে তার জবাব দিতেন অত্যন্ত স্পষ্ট ও পরিষ্কারভাবে। উত্তর দানে কোনো জড়তা, আড়ষ্টতা কিংবা জটিলতার লেশ মাত্র থাকত না।
৬ষ্ঠ বৈশিষ্ট্য: কথায় অতিরঞ্জন, প্রতারণা, তিক্ত কথা ও হঠকারিতা না থাকা। রাসূলের কথায় কেউ বিন্দুমাত্র প্রতারণা, হঠকারিতা কিংবা অসত্যায়নের লেশমাত্র প্রমাণ করতে পারবে না। বরং তিনি ছিলেন সারা বিশ্বের সত্য ভাষণ ও চিরন্তন বাণীর আদর্শ। তাঁর এরূপ সত্য ও সনাতন- ভাষণও বাচনই হাদীস নামে খ্যাত। শত সহস্র পরীক্ষায় উত্তীর্ণ এরূপ সহস্র সহস্র সত্য ভাষণ আজকের বিশ্বব্যাপী মুসলমান জাতির পথ নির্দেশনার উপাদান।
৭ম বৈশিষ্ট্য: স্থান-কাল ও পাত্রভেদে কথা ও বক্তব্য উপস্থাপন করা: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বক্তব্যে এধরনের বৈশিষ্ট্য বিশেষিত ছিল। যেখানে যার সাথে যেরূপ কথা বা বক্তব্য পেশ করা দরকার তিনি সেখানে তার সাথে সেরূপ বক্তব্য প্রদান করতেন। তাঁর কথায় বুদ্ধিমত্তা, দূরদর্শীতা ও বিচক্ষণতার ছাপ ফুটে উঠতো।
৮ম বৈশিষ্ট্য: কথা ও বক্তব্যে থাকবে লালিত্য, অলংকারিত্ব, বাগ্মীতা : রাসূলের কথা ও বক্তব্য এসব গুণাবলীতে সমৃদ্ধশালী ছিল। তৎকালীন আরবীয় কবি, সাহিত্যিক ও পণ্ডিতগণ অলংকার শাস্ত্রে খ্যাত থাকা সত্ত্বেও রাসূলের বাণী ও বক্তব্যের সাথে তুলনীয় ছিল না। অলংকার ও লালিত্যের দৃষ্টিকোণ থেকে তাঁর বক্তব্যকে সহজেই নির্ণয় করা যেতো। তিনি তখনকার সময়ে এভাবে পরিচিত হতেন- اَنَّهُ اَفْصَحُ النَّاسِ لِسَانًا وَاَوْضَحُهُمْ بَيَانًا وَاَوْجَرُهُمْ كَلَامًا * “ভাষার লালিত্যে তিনি ছিলেন অনন্য, বিবৃতিদানে তিনি ছিলেন সবচে সুস্পষ্ট এবং তাঁর কথা ছিল ব্যাপক ও যথেষ্ট।”

📘 দুরুদ কি ও কেন দুরুদ পাঠের হাদীস ভিত্তিক পদ্ধতি > 📄 চতুর্থ উপাদান : কর্মের নিপুণতা

📄 চতুর্থ উপাদান : কর্মের নিপুণতা


কর্মের নিপুণতা নির্ণীত হয়ে থাকে কিছু বৈশিষ্ট্যের উপর। ১ম বৈশিষ্ট্য: কর্ম পদ্ধতিতে থাকবে হীত-অহীত, মঙ্গল-অঙ্গলের স্পষ্ট নির্দেশনা। আমাদের নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আল্লাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সারা জীবনের কর্ম পদ্ধতিতে এই পার্থক্যটি স্পষ্টভাবে প্রদর্শন করেছেন। কোন কাজ আমাদের জন্যে মঙ্গলময় আর কোনটি অমঙ্গলজনক তা তিনি কাজে ও কথায় দেখিয়েছেন এবং বলেছেন। অধিকন্তু মংগলময় কাজ করার জন্যে নির্দেশ দিয়েছেন এবং অমঙ্গলজনক কাজ থেকে বিরত থাকার আদেশ করেছেন।
২য় বৈশিষ্ট্য: কাজের মধ্যে আকর্ষণ ও বিকর্ষণের সমন্বয় ঘটবে। কিংবা শত্রু-মিত্রের মধ্যে একটি সমন্বয় সৃষ্টি হয়ে উভয়ের মিলন ঘটে। কোনো কাজে দ্বন্দু বিরোধ কিংবা কলহ দেখা দিলে মধ্যস্থতাকারীর কর্মপদ্ধতি এমন নিপুণ হওয়া দরকার যাতে দ্বন্দের অবসান ঘটে এবং উভয়ের মধ্যে সম্প্রীতি ও সহানুভূতির সম্পর্ক গড়ে উঠে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কর্মপদ্ধতি এ ধারায় প্রবাহিত ছিল। যুদ্ধ অনিবার্য এমন শত সহস্র দ্বন্দের তিনি যে সমাধান দিয়েছেন তা তাঁর কর্মকুশলতার মূর্ত প্রতীক হয়ে থাকবে।
৩য় বৈশিষ্ট্য: কর্মপদ্ধতি নরম বা চরম না হয়ে মধ্যম হওয়া। কোনো কাজে কোনো ব্যাপারে বিশেষতঃ জটিল ও দুরূহ বিষয়ে চরমপন্থা পরিহার করা বরং মধ্যমপন্থা অবলম্বন করা উচিত। মধ্যমপন্থা অবলম্বন করার পরিণতি ভালো ও শুভ হওয়ার ভুরি ভুরি নজীর আছে। এধরনের হাজারো নজীর রয়েছে তাঁর কর্মপদ্ধতিতে।
৪র্থ বৈশিষ্ট্য : কাজে আসক্তি ও অনাসক্তি থাকা। পারলৌকিক জীবনকাল পরিহার করতঃ পার্থিব জীবনের প্রতি আসক্ত হওয়া আবার পার্থিব জীবন বিসর্জন দিয়ে শুধুমাত্র পারলৌকিক জীবনের প্রতি আসক্ত হওয়া স্বীকৃত কিংবা সুদূর প্রসারী কর্মপদ্ধতি নয়।
আখিরাত বিমুখ দুনিয়াদারী কাজ এবং দুনিয়া বিবর্জিত আখিরাতের কাজ স্বীকৃত কর্ম নয়। উভয়ের মধ্যে সমন্বয় সম্যক কাজই স্বীকৃত কাজ। রাসূলের কর্মপদ্ধতি এরূপ স্বীকৃত কাজের সাক্ষ্য। তিনি এ পর্যায়ে বলেছেনঃ خَيْرُكُمْ مَنْ لَمْ يَتْرُكْ دُنْيَاهُ لِأَخِرَتِهِ وَلَا أُخِرَتَهُ لِدُنْيَاهُ وَلَكِنْ خَيْرُكُمْ لِمَنْ أَخَذَ مِنْ هَذِهِ وَهُذِهِ * “তোমাদের মধ্যে সে ব্যক্তি উত্তম যে আখিরাতে সফলতার আশায় দুনিয়াদারী কাজ পরিত্যাগ করে না এবং দুনিয়ার সফলতার জন্যে আখিরাতমুখী কর্ম ছেড়ে দেয় না। পরন্তু সে লোকটি উত্তম যে উভয়ের মধ্যে সমন্বয় সাধন পূর্বক কর্মতৎপরতায় লিপ্ত থাকে।” তিনি আরো বলেছেন-- نِعْمَ الْمَطِيَّةُ الدُّنْيَا فَارْتَحِلُوهَا تَبْلُغُكُمُ الْآخِرَةَ * “দুনিয়ার বাহন কতই না উত্তম, এ বাহনকে চালিয়ে নিতে পারলে আখিরাতে পৌঁছা সম্ভব।” অর্থাৎ পার্থিব জীবন ব্যবস্থা পরিহার করে আখিরাতের সফলতা সম্ভব নয়। বরং পার্থিব জীবন প্রবাহে এমন অনেক উপাদান আছে যেগুলোর আখিরাতে সফল হওয়ার নিশ্চিত গ্যারান্টি রয়েছে।
আজকের বিশ্বের বস্তুবাদী লোকগণ পার্থিব জীবনের সফলতাকে প্রকৃত সফলতা মনে করে থাকে। কিন্তু রাসূলের কর্মপদ্ধতির দীক্ষায় এরূপ দুনিয়াবী সফলতা চুড়ান্ত ও পরম সফলতা নয়। পারলৌকিক সমন্বিত সফলতাই প্রকৃত ও আসল সফলতা।
৫ম বৈশিষ্ট্য: কর্ম পদ্ধতিতে থাকবে বৈধ-অবৈধের সীমারেখা। এ দৃষ্টিকোণ থেকেও রাসূলের কর্মপদ্ধতি ছিল অনুপম ও অতুলনীয়। তৎকালীন আরব সমাজে যখন বৈধ-অবৈধের কোনো পরিচয় কিংবা মাপকাঠি ছিল না, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্ম পদ্ধতির যে রূপ রেখা পেশ করেন তা আজও অম্লান হয়ে আছে। একজন ব্যক্তি একটি সমাজ, একটি রাষ্ট্র, একটি জাতির জন্য কিরূপ কর্মপদ্ধতি হওয়া উচিত, কোন ধরনের কর্মপদ্ধতি অবলম্বন করলে উন্নত হওয়া যায়, এগুলোর দিক নির্দেশনা রয়েছে তাঁর কর্মধারায়। কি কাজ হালাল আর কোন ধরনের কাজ হারাম, এ বিষয়ে তৎকালীন লোকজন ছিল সম্পূর্ণ অজ্ঞ। রাসূলের আগমনের পর তাঁর গৃহীত নীতিমালা হারাম-হালালের সীমারেখা টানে, জনগণ বৈধ ও অবৈধ কর্ম ধারার সাথে পরিচিত হোন। তিনি ব্যক্তি ও সমাজগত জীবন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় ও জাতিগতভাবে সম্পৃক্ত সব ধরনের কর্মধারার যে রূপরেখা প্রদান করেন তা আজকের কম্পিউটার যুগেও সমপ্রযোজ্য।
৬ষ্ঠ বৈশিষ্ট্য: শত্রুকে বশীভূত করা এবং মিত্রকে আরো অন্তরঙ্গ করার প্রবণতা থাকা কর্মপদ্ধতি গ্রহণীয় ও স্বীকৃত হওয়ার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
স্থান ও কালের ভেদে রাসূলের কর্মপদ্ধতি এরূপ বৈশিষ্ট্যে সমৃদ্ধশালী। কতিপয় যুদ্ধ ক্ষেত্রে এবং কিছু কিছু সিদ্ধান্তের ব্যাপারে তিনি কর্মসূচীতে এমন কৌশল অবলম্বন করেন যদ্দ্বারা শত্রুগণ পরাভূত এমনকি মিত্রে পরিণত হয়, আর মিত্রগণ আরো ঘনিষ্ঠ হয়।
৭ম বৈশিষ্ট্য : কর্মে সৌর্য-বীর্য ও সহনশীলতার সংমিশ্রন থাকবে।
যুদ্ধক্ষেত্র যেখানে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে প্রাণপণ লড়তে হয়, সে ক্ষেত্রে যেমন সৌর্য-বীর্য, সাহসিকতা ও শক্তির প্রদর্শনী দরকার এবং কোনো অবস্থাতেই সহনশীলতা কিংবা শিথিলতার আশ্রয় নেয়া যায় না। ঠিক তেমনি আপোষ মিমাংসা কিংবা সন্ধি বা চুক্তিপত্র সম্পাদনের বেলায় শক্তি প্রয়োগ কিংবা অসহনশীলতার আশ্রয় নেয়া যায় না। বরং সেক্ষেত্রে চরম ধৈর্য ও সহনশীলতার প্রদর্শন করতে না পারলে কাজের সুফল লাভ করার পরিবর্তে বিপরীতই হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। রাসূল কর্তৃক কর্ম নির্ধারণে এরূপ বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়। যুদ্ধ-বিগ্রহ, হানাহানি, রক্তারক্তি, হৈ-হাংগামার মতো জটিল ও কুটিল ব্যাপারে রাসূলের এরূপ বৈশিষ্ট্যপূর্ণ কর্মসূচী তাঁর কর্মকুশলতা ও নিপুণতার উজ্জ্বল স্বাক্ষর।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00