📄 চার. ঘুষ
ক্ষমতার অপব্যবহারের আরেক নাম ঘুষ। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল পদে থেকে অবৈধ অর্থ গ্রহণের মাধ্যমে এক জনের হক অপর কাউকে দিয়ে দেওয়াই হচ্ছে ঘুষ। এই ঘুষ যারা দেয় তারাও সমান অপরাধী। বেআইনী সুবিধা পাওয়ার জন্য যারা কর্তাব্যক্তিদেরকে বিভিন্ন সুবিধা বা টাকা পয়সা দিয়ে প্রভাবিত করতে চেষ্টা করে তারাও এই অপরাধ সংঘটনের অন্যতম শরীক। যারা ঘুষকে অঘোষিত একটি সিস্টেম হিসেবে প্রশ্রয় দেয় তারাও অপরাধী। দেখা যায় মাঝে মধ্যে "বেড়ায় খেত খায়", রক্ষকই হয় ভক্ষক। যারা ন্যায়কে লালন করবে তারাই অন্যায়কে ধারণ করে। এভাবে দুর্নীতির ডালপালা বিস্তার হয়। বিচারের বাণী নিরবে নিভৃতে কাঁদে।
ঘুষ বা উৎকোচ আসে উপহারের রূপ ধরে। একবার এক গভর্ণরকে হযরত উমার (রা) বলেছিলেন- তুমি যে বললে এগুলো বায়তুল মালের আর এগুলো আমার উপহার। তুমি এই পদ ছেড়ে বাপের ঘরে বসে থাক, দেখ তো কে তোমার জন্য উপহার নিয়ে আসে?" প্রাজ্ঞ প্রশাসক উমার (রা) এর সত্য-মিথ্যার পার্থক্য করার জ্ঞান ও সাহসের জন্য তাঁকে উপাধি দেওয়া হয়েছিল "আল্-ফারূক"। কবি ফররুখ আহমদ বলেছেন,
আজকে উমর-পন্থী পথিক দিকে দিকে প্রয়োজন
পিঠে বোঝা নিয়ে পাড়ি দেবে যারা প্রান্তর প্রাণপন।
কিন্তু হায়! এখন মুসলিম অধ্যুষিত বাংলাদেশের এই সমাজের চিত্র দেখলে মনে হতে পারে ইসলামের শিক্ষার প্রতিফলন কোথায়? এ জন্যেই কবি নজরুল বলেছেন-
ইসলাম সে তো পরশ মানিক তারে কে পেয়েছে খুঁজি
পরশে তাহার ধন্য যারা তাদেরই মোরা বুঝি।
ইসলামের পরশ আমাদের মন-মনন ও অনুভবে পৌঁছেনি বলেই আজ আমরা ঘুষকে উপহার ভাবি। অফিসের ফাইল স্পিড-মানি না পেলে সামনে চলে না। সার্বিকভাবে জাতীয় উন্নতি ব্যাহত হয়। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে মেধাহীনদের রাজত্ব চলে। ঘুষ দিয়ে যে চাকরি পেতে হয় সেই চাকরিকে সেবা মনে করার কোন কারণ নেই। আর তাই ঘুষ দিয়ে শিক্ষকের চাকরি পাওয়া লোকটির কাছে তার ছাত্র মনুষ্যত্ব শিক্ষা লাভ করবে এটা আশা করা যায় না।
এই ঘুষের লাইনে পাকা দড়িবাজরা তরতর করে উপরে উঠে যাচ্ছে দেখে সৎ লোকেরা মাঝে মাঝে ভাবে, তবে কি সততার কোন দাম নেই। এটা কি বোকামি? কিন্তু তিক্ত ফলের চারা লাগিয়ে যেমন সুমিষ্ট ফলের আশা করা যায় না তেমনি দুর্নীতির মাধ্যমে গড়ে উঠা সিস্টেমের কাছে কোন কল্যাণ আশা করা যায় না। তাই ঘুষ সম্পর্কে মহান আল্লাহ্ বলেন,
فَبَدَّلَ الَّذِينَ ظَلَمُوا قَوْلًا غَيْرَ الَّذِي قِيلَ لَهُمْ فَأَنْزَلْنَا عَلَى الَّذِينَ ظَلَمُوا رِجْزًا مِنَ السَّمَاءِ بِمَا كَانُوا يَفْسُقُونَ
"এরপর যালিমরা বদলে দিল যা তাদের বলা হয়েছিল। তার পরিবর্তে অন্য কথা। এ কারণে যারা যুলম করল তাদের উপর নাযিল করলাম আকাশ থেকে এক মহাশাস্তি। কারণ, তারা অধর্ম-অন্যায় কাজ করছিলো” (আল-কুরআন, ২:৫৯)।
এ আয়াতে সত্যকে বদলে দেওয়ার শাস্তির উল্লেখ আছে। ঘুষও সত্যকে বদলে দেয়। পাশকে ফেল দেখিয়ে দেয়। একজনের প্রাপ্য অধিকার বদলে দিয়ে অন্যকে অন্যায়ভাবে দেওয়া হয়।
অতীত যামানায় যারা ঘুষ খেয়ে, দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে ধর্মের বাণীতে জালিয়াতি করত তাদের সম্পর্কে আল-কুরআনে বলা হয়েছে:
فَوَيْلٌ لِلَّذِينَ يَكْتُبُونَ الْكِتَابَ بِأَيْدِيهِمْ ثُمَّ يَقُولُونَ هُذَا مِنْ عِنْدِ اللَّهِ لِيَشْتَرُوا بِهِ ثَمَنًا قَلِيلًا فَوَيْلٌ لَّهُمْ مِمَّا كَتَبَتْ أَيْدِيهِمْ وَوَيْلٌ لَّهُمْ مِمَّا يَكْسِبُونَ
"সুতরাং দুর্ভোগ তাদের জন্য যারা নিজ হাতে কিতাব রচনা করে এবং তুচ্ছ মূল্য প্রাপ্তির জন্য বলে- এটি আল্লাহ্র নিকট হতে এসেছে। তাদের হাত যা রচনা করেছে তার জন্য শাস্তি তাদের এবং যা তারা উপার্জন করে তার জন্য শাস্তি তাদের" (আল-কুরআন, ২:৭৯)।
তুচ্ছমূল্য হচ্ছে ঘুষ। যদিও ঘুষখোর এটাকে তুচ্ছ মনে করে না। আয়াতে ঘুষ খেয়ে ধর্মের বাণী বদলে দেওয়ার কথা বলা হলেও সকল জালিয়াতির জন্যই শাস্তি প্রযোজ্য।
ঘুষ সব সময় টাকা-পয়সা হয় না। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নানান বস্তু ও বিষয় হতে পারে। এ জন্যই হাদীসের ভাষায় এটিকে বলে "রিশওয়াহ (رشوة)" বা দড়ি। দড়ি দিয়ে কূপের ভেতর থেকে বালতি টেনে উঠাবার মত ঘুষ অন্যের হক নিজের ঘরে নিয়ে আসে। এজন্য এই প্রক্রিয়ায় তিনটি পক্ষ থাকে। (১) রাশী (রাশি) যে ঘুষ প্রদান করে, (২) মুরতাশী (مرতশি) যে ঘুষ গ্রহণ করে এবং (৩) রায়েশ (رائش) যে অনুঘটক হয়ে কাজ করে। আল্লামা সান'আনী তার বিখ্যাত গ্রন্থ 'সুবুলুস সালাম শারহু বুলূগিল মুরাম' গ্রন্থে বলেন- "রায়েশ” বা ঘুষের ঘটক হচ্ছে ওই ব্যক্তি যে ঘুষখোর ও ঘুষদাতার মধ্যে দূতিয়ালী করে থাকে” (সুবুলুস সালাম, খ.৪, পৃ.১২৪)। তবে যেহেতু মূলপক্ষ হচ্ছে দুটি: যে ঘুষ দেয় ও যে ঘুষ খায়। তাই রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
الرَّاشِي وَالْمُرْتَشِي فِي النَّارِ "ঘুষ প্রদানকারী ও ঘুষ গ্রহণকারী দু'জনই জাহান্নামে যাবে”। (তারগীব গ্রন্থে হাদীসটি বর্ণনা করেন আবু সালামাহ ইবন আব্দুর রহমান)। 'আব্দুল্লাহ ইবন 'উমার (রা) বর্ণনা করেন যে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন:
لَعْنَةُ اللَّهِ عَلَى الرَّاشِي وَالْمُرْتَشِيْ "ঘুষদাতা ও গ্রহীতা উভয়ের ওপর আল্লাহ্র লা'নত"। (ইবন হিবরান)
عَنْ ثَوْبَانَ قَالَ : لَعَنَ رَسُولُ اللهِ الرَّاشِيَ، وَالْمُرْتَشِيَ، وَالرَّائِشَ، يَعْنِي الَّذِي يَمْشِي بَيْنَهُمَا "ছাওবান (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা) অভিশাপ দিয়েছেন ঘুষদাতা, গ্রহীতা ও উভয়ের মধ্যে যে দালালী করে বেড়ায়” (মুসনাদ ইমাম আহমাদ ও তাবরানী)
ইমাম তাবারানী তার আল-মু'জাম আস্-সগীর গ্রন্থে একটি হাদীস সংকলন করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন:
الرِّشْوَةُ فِي الْحُكْمِ كُفْرٌ وَهِيَ بَيْنَ النَّاسِ سُحْتْ "রিশওয়াহ বিচারের ক্ষেত্রে কুফরি। লোকেরা নিজেদের মধ্যে এ কাজ করা সুত্ব"। আগেই বলা হয়েছে রিশওয়াহ অর্থ ঘুষ। তাহলে "সুহ্ত” অর্থ কি? এ প্রশ্নের উত্তর পাই রাসূলুল্লাহ (সা) এর একটি হাদীসে:
كُلُّ لَحْمٍ أَنْبَتَتْهُ السُّحْتُ فَالنَّارُ أَوْلى بِهِ ، قِيلَ مَا السُّحْتُ؟ قَالَ الرِّشْوَةُ فِي الْحَكَمِ "যে গোশত উদগত হয়েছে "সুহত” থেকে তার জন্য জাহান্নামের আগুনই বেশী উপযোগী। একজন জিজ্ঞেস করলো, সুত্ব কী? তিনি বললেন, বিচার বা শাসনকার্যে ঘুষ গ্রহণ” (কানযুল 'উম্মাল, খ.৩।
তাহলে দেখা যায় যে, ঘুষের অর্থে যে নিজে পানাহার করে এবং তার পোষ্যদের পানাহার করায় সকলের জন্যই তা খুবই মন্দ কাজ। এই ঘুষ-লালিত দেহের ইবাদত আল্লাহ্ কবুল তো করবেনই না বরং তাদের জন্য লাঞ্ছনা, আখেরাতে আগুন অপেক্ষা করছে।
ইহুদীদের দুর্গতির কারণ হিসেবে আল্লাহ্ তা'আলা বলেন, سَمَّاعُونَ لِلْكَذِبِ أَكَالُونَ لِلسُّحْتِ
"তারা মিথ্যা শ্রবণে অত্যন্ত আগ্রহশীল এবং অবৈধ (ঘুষ) ভক্ষণে অত্যন্ত আসক্ত” (আল-কুরআন, ৫:৪২)।
অপর একটি আয়াতে আল্লাহ্ তা'আলা বলেন, وَتَرَى كَثِيرًا مِنْهُمْ يُসَارِعُونَ فِي الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ وَأَكْلِهِمُ السُّحْتَ لَبِئْسَ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ
“(হে নবী!) আপনি (আহলে কিতাবদের) অনেককেই দেখবেন পাপে, সীমালংঘনে ও অবৈধ ভক্ষণে (ঘুষ খাওয়াতে) তৎপর। তারা যা করে নিশ্চয় তা নিকৃষ্ট” (আল-কুরআন, ৫:৬২)।
আয়াতে অবৈধ ভক্ষণ তরজমা করা হলেও কোন হাদীসে এই সুহ্ত বা অবৈধ আয়কে ঘুষ হিসেবে তাফসীর করে দেওয়া হয়েছে। তবে সকল প্রকার দুর্নীতির মাধ্যমে উপার্জিত আয়ও এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
এই ঘুষের বিষয়টি পবিত্র কুরআনের একটি আয়াতে স্পষ্টতই এসেছে। বিচারের রায়কে প্রভাবিত করা এবং প্রশাসকদেরকে নিরপেক্ষতা ও ন্যায়নিষ্ঠতা থেকে বিচ্যুত করাই যে ঘুষের মূখ্য উদ্দেশ্য হয়ে থাকে তা প্রতিফলিত হয়েছে এই আয়াতে: وَلَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُمْ بَيْنَكُمْ بِالْبَاطِلِ وَتُدْلُوا بِهَا إِلَى الْحُكَّامِ لِتَأْكُلُوا فَرِيقًا مِنْ أَمْوَالِ النَّاسِ بِالْإِثْمِ وَأَنْتُمْ تَعْلَمُونَ
"তোমরা নিজেদের মধ্যে একে অন্যের অর্থ-সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না এবং মানুষের ধন-সম্পত্তির কিছু অংশ জেনে শুনে অন্যায়ভাবে গ্রাস করার উদ্দেশ্যে তা বিচারকদের বা প্রশাসকদের কাছে পেশ করো না" (আল-কুরআন, ২:১৮৮)।
এ আয়াতে হুক্কাম অর্থ শাসকগণ, প্রশাসকগণ, বিচারকগণ হতে পারে। আরবী ভাষায় হাকিম বা বহুবচনে হুক্কাম শব্দটি এইসব অর্থে সমভাবে ব্যবহৃত। এখানে বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের কথা বুঝানো হয়েছে যাদের সিদ্ধান্তে একজনের সম্পদে অন্য কেউ অন্যায়ভাবে ভাগ বসাতে পারে। উপর্যুক্ত আয়াতে وَتُدْلُوا بِهَا শব্দটি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। এর অর্থ হচ্ছে বালতি কূপে ফেলে তা টেনে উঠানো। ঠিক যেমনি ঘুষের রশিতে নিজের আরাধ্য বস্তু টেনে আনা হয়। এটি রূপক অর্থে এসেছে।
এ জন্যই আল্লামা আলুসী তার তাফসীর 'রুহুল মা'আনী'তে বলেন: أَيْ وَلَا تُلْقُوْا بَعْضَهَا إِلَى الْحُكَامِ السَّوْءِ عَلَى وَجْهِ الرَّشْوَةِ "অর্থাৎ তোমাদের সম্পদের কিছু অংশ অসাধু বিচারক বা প্রশাসকদেরকে ঘুষ হিসেবে দিও না।"
তাফসীরে মাদারেকেও এ আয়াতে وَتُدْلُوا بِهَا শব্দ দ্বারা ঘুষ বা রিশওয়াহ বুঝানো হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে (খ.১, পৃ.৭৬)। এতে প্রমাণিত হলো যে, পবিত্র কুরআনে ঘুষের বিরুদ্ধে স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
আজ আমাদের দেশ দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে তালিকার প্রথম দিকে রয়েছে। এই দুর্নীতির নানা রকম ফের রয়েছে। তবে ঘুষ হচ্ছে প্রধান ও সবচেয়ে ব্যাপক দুর্নীতি। ঘুষের এই ব্যাপকতা কেবল আখেরাতের জন্যই ভয়াবহ নয়; বরং আমাদের এই সামাজিক জীবনেও দুর্ভোগের কারণ। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: وَمَا مِنْ قَوْمِ يَظْهَرْ فِيهِمُ الرَّشَاءُ إِلَّا أُخِذُوا بِالرَّعْبِ “যে জাতির মধ্যে ঘুষ মহামারির মত দেখা দেয় তাদের মধ্যে ভীতি সঞ্চারিত হয়ে তাদেরকে পরাজিত করে ফেলে।"
ঘুষের বিষয়টি এখন ওপেন সিক্রেট। বাসে, লঞ্চে, পথে-ঘাটে মানুষ ঘুষের আলাপ করছে। পাশের লোকেরা শুনেও কোন প্রতিক্রিয়া বোধ করছে না। এ রকম অবস্থার কারণেই আমরা জাতি হিসেবে ক্রমশ অন্তসারশূন্য হয়ে পড়ছি এবং ভবিষ্যতের অজানা আশঙ্কায় অথবা দ্রব্যমূল্য অথবা সন্ত্রাসের আরও প্রকোপ দেখে এক বিরাট ভয় আমাদেরকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। কিন্তু ধর্মের বাণী আজ আমাদের জীবনে বাস্তব রূপধরে আসলেও ধর্মাচার করার প্রতি আমাদের আগ্রহ নেই। এ হচ্ছে এক ভয়াবহ অবস্থা।
ঘুষ আমাদের জাতীয় উন্নয়নকে ব্যাহত করছে। ঘুষের কারণে মানুষ যোগ্যতার মূল্যায়ন করছে না। ঘুষের চিন্তায় যখন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাথা ঘুরতে থাকে তখন হাতের কলম সিরাতুল মুস্তাকীমে চলে না। ঘুষ হচ্ছে সমাজদেহে নীরব মরণ-ব্যাধি। সকল নীতি-নৈতিকতা, সমস্ত আইন-কানুন, বিধি-বিধানকে বিধ্বস্ত করে দেওয়ার জন্য এই ভিলেনই দায়ী। এ হচ্ছে এক মরণ-ভাইরাস যা আমাদের সমাজের সকল প্রোগ্রামকে নাস্তানাবুদ করে দিচ্ছে। এই অভিশাপ থেকে মুক্ত হতে না পারলে কোন জাতির সামনে ভবিষ্যতের কোন সুখবর থাকবে না।
তাই আসুন! আমরা তাওবা করে ঘুষকে পরিত্যাগ করি, এর বিরুদ্ধাচারণ করি। একে ঘৃণা করি, একে প্রতিরোধ করি।।
📄 পাঁচ. ভোগ্যপণ্যে ভেজাল
আমরা জীবন ধারণের জন্য আহার গ্রহণ করি। এই খাদ্য-পানীয় আমাদের দেহে পুষ্টি জোগায়, রোগ প্রতিরোধ করে এবং সর্বোপরি আমাদের বেঁচে থাকতে সাহায্য করে। মহান আল্লাহ্ তাই আল কুরআনে বলেছেন, يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُلُوا مِنْ طَيِّبَاتِ مَا رَزَقْنَاكُمْ وَاشْكُرُوا اللَّهَ إِنْ كُنْتُمْ إِيَّاهُ تَعْبُدُونَ
“ওহে যারা ঈমান এনেছ! তোমাদেরকে আমি যেসব পবিত্র বস্তু দিয়েছি তা থেকে আহার কর এবং আল্লাহ্র নিকট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর যদি তোমরা শুধু তাঁরই 'ইবাদত করে থাকো" (আল কুরআন, ২:১৭২)।
কিন্তু বড়ই পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, কিছু লোকের দুর্নীতির কারণে এ খাদ্যই আজ বিষে পরিণত হয়েছে। খাদ্যে ভেজাল মেশানোর ফলে আজ ডায়াবেটিস মহামারির মত সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি বৈকল্য, চর্ম রোগ ইত্যাদি ব্যাধি মানুষের দেহে বাসা বেঁধে অকালে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
এ দেশে রেল ও বিদ্যুৎ ট্রান্সফরমারে ব্যবহৃত তেল কোথাও কোথাও সয়াবিন হিসেবে বিক্রি হচ্ছে। জীবন-রক্ষাকারী ওষুধে ভেজাল মেশানো হচ্ছে। ফরমালিনযুক্ত মাছ-গোশত খেয়ে অন্ত্রের পীড়া হচ্ছে। ট্যালকম পাউডার দিয়ে সর্দি-কাশির লজেন্স তৈরি হচ্ছে। মরা মুরগী দেদারছে হোটেলে খাওয়ানো হচ্ছে। বিষাক্ত রং মিশিয়ে পানীয় ও মিষ্টি খাওয়ানো হচ্ছে। বিষাক্ত ক্যামিকেল দিয়ে ফলের রং আনা হচ্ছে। গুঁড়া দুধ ও মেয়াদ উত্তীর্ণ কসমেটিক ব্যবহার করা হচ্ছে। বাসি খাবার, পঁচা ডিম দিয়ে নানান ফাস্টফুড পরিবেশন করা হচ্ছে। ইউরিয়া মেশানো মুড়ি বিক্রি হচ্ছে। ভেজালের কবলে পড়ে শিশু, গর্ভবতী মা সহ সকল বয়সী মানুষ আজ জীবন যুদ্ধে হেরে যাচ্ছে।
আগে আমরা শুনতাম যে, দুধের সাথে পানি মেশানো হতো। আর আজ কত অকল্পনীয় কৌশলে যে ভেজাল মেশানো হচ্ছে তা সাধারণ ক্রেতাদের বুঝার কোন উপায় নেই। মাঝে মধ্যে ভেজাল কারখানা, ভেজাল মেশানোর কৌশল ধরা পড়ছে বটে কিন্তু এত বিরাট জনগোষ্ঠীর মধ্যে মুখোশধারী ব্যবসায়ীদের পুরোপুরি চিহ্নিত করা বড়ই কঠিন।
একটি মাত্র পথ খোলা আছে, তা হচ্ছে মানুষের মন-মানসিকতা পরিবর্তন। আপাত লাভ যে কত বড় সর্বনাশ ডেকে আনছে তা বুঝানো যাচ্ছে না। ভেজালকারী তার একটি পণ্যে প্রতারণা করে তো আত্মশ্লাঘা বোধ করছে। কিন্তু সে আর দশটি পণ্য ভোগ করার জন্য যখন খরিদ করছে তখন তো ঠকছে।
সবচেয়ে বড় কথা এ জীবনের দিনগুলো ফুরিয়ে যাবার পর যখন আখেরাতে আল্লাহ্র সম্মুখীন হবে তখন তার কী উপায় হবে। আল্লাহ্ তা'আলা বলেন,
وَلَا تَلْبِسُوا الْحَقَّ بِالْبَاطِلِ وَتَكْتُمُوا الْحَقَّ وَأَنْتُمْ تَعْلَمُونَ "তোমরা সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশ্রিত করো না এবং জেনে শুনে সত্য গোপন করো না” (আল-কুরআন, ২:৪২)।
রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, وَمَنْ غَشَّنَا فَلَيْسَ مِنَّا "যে ব্যক্তি আমাদের সাথে প্রতারণা ও জালিয়াতি করবে সে আমাদের সমাজভুক্ত নয়” (সহীহ মুসলিমে সঙ্কলিত)।
وَعَنْ ابْنِ عُمَرَ قَالَ: مَرَّ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّم بِطَعَامٍ وَقَدْ حَسَّنَهُ صَاحِبُهُ فَأَدْخَلَ يَدَهُ فِيْهِ ، فَإِذَا طَعَامٌ رَدِيٌّ ، فَقَالَ: بِعْ هَذَا عَلَى حِدَةٍ ، وَهَذَا عَلَى حِدَةٍ، فَمَنْ غَشَّنَا فَلَيْسَ مِنَّا
"আব্দুল্লাহ ইবন উমার (রা) বলেছেন, একবার রাসূলুল্লাহ (সা) কিছু খাবারের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, বিক্রেতা তা বেশ সাজিয়ে সুন্দর অবস্থায় রেখে দিয়েছে। তখন রাসূলুল্লাহ (সা) তার ভিতরে হাত ঢুকিয়ে দিলেন, তিনি ভেতর থেকে বৃষ্টি ভেজা খাবার তুলে আনলেন। দোকানীকে বললেন, এটা আলাদা বিক্রি কর, আর ভালটা আলাদা বিক্রি করবে। যে আমাদের সাথে তথ্য গোপন করবে, প্রতারণা করবে সে আমাদের মুসলিম সমাজভুক্ত নয়।” (হাদীসটি বর্ণনা করেছেন ইমাম আহমদ, বায্যার, তাবারানী ও আবু দাউদ)।
এখানে সরকারের সতর্কতা ও দায়িত্ববোধের বিষয়টি স্পষ্টভাবে এসেছে। অপর এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,
مَنْ غَشَّنَا فَلَيْسَ مِنَّا وَالْمَكْرُ وَالْخِدَاعُ فِي النَّارِ
"যে আমাদের সাথে ধোকাবাজী করবে সে আমাদের নয়। কুট-কৌশল ও প্রতারণা জাহান্নামে যাবে।” (তাবারানী, ইবন হেব্বান)।
এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর একটি হাদীস আমাদের লোভী মনকে ভেজালমুক্ত করতে সহায়ক হবে বলে আশা করি। হাদীসটি বর্ণনা করেছেন ইমাম বায়হাকী। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, لا تشبوا اللبن للبيع "তোমরা বিক্রির উদ্দেশ্যে দুধের সাথে পানি মেশাবে না"। এরপর তিনি বলেন- أَلَّا وَإِنَّ رَجُلًا مِمَّنْ كَانَ قَبْلَكُمْ جَلَبَ خَمْرًا إِلَى قَرْيَةٍ فَشَابَّهَا بِالْمَاءِ فَأَضْعَفَ أَضْعَافًا فَاشْتَرى قِرْدًا فَرَكِبَ الْبَحْرَ حَتَّى إِذَا لَجَّ فِيهِ أَلْهَمَ اللَّهُ الْقِرْدَ صُرَّةَ الدَّنَانِيرِ فَأَخَذَهَا فَصَعِدَ الدِّقْلَ وَفَتَحَ الصُّرَّةَ وَصَاحِبُهَا يَنْظُرْ إِلَيْهِ فَأَخَذَ دِيْنَارًا فَرَمِي بِهِ فِي الْبَحْرِ ، وَدِيْنَارًا فِي السَّفِينَةِ حَتَّى قَسَمَهَا نِصْفَيْنِ
"জেনে রাখ! তোমাদের পূর্বেকার যামানায় এক ব্যক্তি কোন গ্রামে শরাব বিক্রি করতে গিয়ে তাতে কয়েকগুণ পানি মিশিয়েছিলো। ওই অর্থ দিয়ে সে একটি বানর খরিদ করলো। এরপর সমুদ্র পথে জাহাজে করে পাড়ি দিল। যখন সমুদ্রের গভীরে চলে গেল এ সময় আল্লাহ্ ওই বানরের মনে ঢেলে দিলেন যেন দীনারের ব্যাগটি নিয়ে আসে। বানরটি দীনারের থলিটি নিয়ে মাস্তুলের ওপর চড়ে বসল। সেখানে বসে থলিটি খুলে ফেললো। দীনারের মালিক ওদিকে তাকিয়ে রইল। বানরটি থলে থেকে একটি দীনার বের করে সমুদ্রে নিক্ষেপ করছে আরেকটি দীনার জাহাজে ফেলছে। এভাবে সে দু'ভাগ করে দিল।"
এ হাদীসটিতে অনেক শিক্ষণীয় বিষয় আছে। অপরকে ঠকানো পয়সা দিয়ে কেউ সুখী হতে পারে না। বরং কোন না কোন উছিলায় তা ধ্বংস হয়ে যায় অথবা দুঃখ-দুর্ভোগ ডেকে আনে। রাসূলুল্লাহ (সা)-এর আরেকটি হাদীস এ প্রসঙ্গে খুবই গুরুত্বপূর্ণ: مَنْ بَاعَ عَيْبًا لَمْ يُبَيِّنُهُ لَمْ يَزَلْ فِي مَقْتِ اللَّهِ وَلَمْ تَزَلَ الْمَلَائِكَةُ تَلْعَنُهُ
"যে ব্যক্তি কোন ত্রুটিসহ কোন দ্রব্য বিক্রি করল অথচ ক্রেতাকে তা জানালো না সে অব্যাহতভাবে আল্লাহ্ গজবে পড়ে থাকবে এবং ফেরেস্তাগণ তাকে অভিশাপ দিতে থাকবে” (ইবন মাজাহ)।
আজ আমরা যখন দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির নানা অর্থনৈতিক কারণ খুঁজে হয়রান হচ্ছি তখন একবার রাসূলুল্লাহ (সা)-এর একটি হাদীসের দিকে লক্ষ্য করলে এ সব প্রশ্নের জবাব মিলে যায়।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
وَلَمْ يَنْقُضُوا الْمِكْيَالَ وَالْمِيزَانَ إِلَّا أَخَذُوا بِالسِّنِينَ وَشِدَّةِ الْمَؤْنَةِ وَجَوْرِ السُّلطَانِ عَلَيْهِمْ
"কোন জাতির মধ্যে ওজনে ফাঁকি দেওয়ার প্রবণতা দেখা দিলে অবশ্যই তাদের মধ্যে দুর্ভিক্ষ, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও সরকারের নিপীড়ন এসে পড়বে” (ইবন মাযাহ, আত-তারগীব, খ.৩, পৃ.৩৩।)
অপর হাদীসে আছে- "ওজনে ফাঁকি তথা উপাদান সঠিক মাত্রায় না দিলে আল্লাহ্ সে সমাজের জীবিকা সঙ্কুচিত করে দেন” (আত-তারগীব, খ.৩, পৃ.৩০)।
ভেজালের প্রসঙ্গে নকল ও জালিয়াতির বিষয়টিও উঠে আসে। পরীক্ষায় নকল করে বেশি নম্বর পাওয়ার চেষ্টা এবং নকলের মাধ্যমে পাশ করে যারা সার্টিফিকেট লাভ করে এবং পরবর্তীতে এদেরই কেউ কেউ শিক্ষক হয়। তারা নিশ্চয়ই উপযুক্ত শিক্ষক হন না। এইসব অযোগ্য শিক্ষকদের ছাত্ররাও কাঙ্খিত যোগ্যতা লাভে ব্যর্থ হয়। এভাবেই জ্ঞান অর্জন না করেই সার্টিফিকেটের জোরে এবং তার সাথে তদবীর ও ঘুষের সহযোগে যারা চাকরি বাগিয়ে নেন তারা নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে মেধা ও যোগ্যতার পরিচয় দিতে ব্যর্থ হন। এভাবেই যেমন মুরগী তেমন ডিম। আবার যেমন ডিম তেমন মুরগী- এই দুর্বল আবর্তন চলতে থাকে। ফলে জাতীয় উন্নতি ও অগ্রগতি ব্যাহত হচ্ছে।
আবার ধরা যাক, যারা টাকায় ভেজাল দিচ্ছে। জাল টাকা দিয়ে পণ্য সামগ্রী ক্রয় করছে। আধুনিক মুদ্রণ কৌশল রপ্ত করে জাল টাকা বানিয়ে তা দিয়ে সম্পদের মালিক হচ্ছে। তারা মূলত অন্যের পরিশ্রমকে বিনে পয়সায় নিজের করে নিচ্ছে। অন্যকে ঠকাচ্ছে। এটি মারাত্মক জালিয়াতি। এইসব নোট বাজারে আসার পর মুদ্রাস্ফীতিসহ নানান অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। মুদ্রা জালিয়াতি হচ্ছে ঘরে বসে পরস্ব অপহরণ। এটি চুরি-ডাকাতিকেও হার মানায়। অথচ সমাজে এই জাল টাকা নিয়ে কত সহজ-সরল মানুষ খুবই অনাকাঙ্ক্ষিত বিব্রতকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হচ্ছে।
দেখা যায়, বিভিন্ন ধরনের সনদ, সার্টিফিকেট, পাসপোর্ট-ভিসা জালিয়াতি করে। যারা ধরা খাচ্ছে তারা দেশ-বিদেশে খুবই বিপদে পড়ছে। যারা এ কাজটি করে দিয়েছে তারা টাকা নিয়ে সরে পড়েছে। যে উপকারভোগী সে একসময় ধরা পড়ে সামাজিকভাবে হেয়-প্রতিপন্ন হচ্ছে এবং আর্থিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার শিকার হচ্ছে।
এভাবে ভেজাল, নকল, জালিয়াতি ইত্যকার ধোঁকাবাজির মাধ্যমে সমাজের কাঠামো নড়বড়ে হয়ে যাচ্ছে। অথচ যারা এ কাজগুলো করছে তাদের নামগুলোর অর্থ কতই না ইসলামী ভাবধারায় ব্যঞ্জনাময়। কেবল নামে মুসলিম হলে তো চলবে না। মুনাফিকদের নামগুলোও মুসলিম নামে অনুরূপ ছিল। এ জন্যই রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,
الْمُسْلِمُ مَنْ سَلِمَ الْمُسْلِمُونَ مِنْ لِسَانِهِ وَيَدِهِ “প্রকৃত মুসলিম হচ্ছে সে, যার যবান ও হাত থেকে মুসলিমগণ নিরাপদে থাকে”। কিন্তু আফসোস! নামের মুসলমান কোটি কোটি আছে, প্রকৃত ইসলামী চরিত্রে উজ্জীবিত মুসলিম কতজন আছে? ভেজাল আলেম, ভেজাল পীর, ভেজাল শিক্ষক, ভেজাল বিচারক, ভেজাল দোকানদার, ভেজাল লেখক, ভেজাল শিল্পপতি, ভেজাল সমাজসেবক, আর ভেজাল জনদরদীতে ভরে গেছে দেশ। কারণ, ভাল জিনিসেরই নকল হয়। বাজারে চালু ব্রান্ডটিই নকল হয়। ওতেই ভেজাল দেওয়া হয়। তেমনি ভাল লোকের মুখোশ পরে তারা মানুষ ঠকাচ্ছে। কিন্তু প্রকৃত হক্কানী আলেম, পীর-মাশায়েখ, নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক, ন্যায়নিষ্ঠ বিচারক, দিক নির্দেশনাকারী লেখক, শুভ উদ্যোক্তা শিল্পপতি, স্বেচ্ছাসেবী সমাজকর্মী এরাই তো জনগণের প্রকৃত বন্ধু ও অভিভাবক। তাই মহান আল্লাহ্ তা'আলা বলেছেন:
وَلَا تَلْبِسُوا الْحَقَّ بِالْبَاطِلِ وَتَكْتُمُوا الْحَقَّ وَأَنْتُمْ تَعْلَمُوْنَ "আর তোমরা সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশিয়ে ফেলো না এবং জেনে শুনে সত্য গোপন করো না” (আল-কুরআন, ২:৪২)।
একটি উন্নত জাতি প্রতিষ্ঠিত হবার জন্য তার সমাজের সম্পর্কের সূতোগুলো থাকতে হবে অটুট, সমাজদেহ থাকতে হবে সুস্থ। জনগণের আচার-আচরণ হবে অনাবিল ও কল্যাণকামী। মুসলিম হয়েও যদি আমরা ইসলামের মহান আদর্শকে ভুলে যাই অথবা সুন্দর সুন্দর নামের লোকগুলো প্রতিনিয়ত অসুন্দর কাজ করে যাই, তাহলে এটি আমাদের জন্য খুবই লজ্জাজনক হবে।
মহান আল্লাহ্ আমাদেরকে পুতঃপবিত্র চরিত্রের মুসলিম এবং সুনাগরিক হিসেবে কবুল করুন। আমীন।
📄 ছয়. ব্যবসায়িক সততা
সততা জীবনের সর্বক্ষেত্রেই প্রয়োজন। তবে আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন উর্ধ্বগতিতে ক্রেতা সাধারণের যে নাভিশ্বাস ওঠে এবং দুর্নীতি ব্যবসা-বাণিজ্যের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়ে সে দিকে লক্ষ্য রেখে এ বিষয়টি বেছে নিয়েছি।
হাটে-বাজারে যখন অযৌক্তিকভাবে ভোগ্যপণ্যের দাম চড়ে যায় তখন খরিদ্দার মাথায় হাত দেয়, খুচরা বিক্রেতা বলে, আমরা বেশি দামে কিনেছি, পাইকাররা বলে পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় অথবা সরবরাহ কমে যাওয়ায়।
মূল্য বৃদ্ধি ছাড়াও অনেক ক্ষেত্রে দ্রব্যাদির গুণগতমান থাকে খুবই খারাপ। ভেজাল উপাদান দিয়ে তৈরী, অথবা বাসি-পঁচা, আবার রাসায়নিক দ্রব্যের মিশ্রণ থাকে। যেমন, মাছে ফরমালিন, কাঁচা কলা পাকানোর জন্য ব্যবহার করা হয় ক্যালসিয়াম কারবাইট। আবার গায়ে যে ওজন লেখা থাকে আসলে থাকে তার চেয়ে কম।
এছাড়া আমদানীর ক্ষেত্রে সিন্ডিকেট ব্যবস্থা করে মনোপলি বা একচেটিয়া ব্যবসা করা হয়। তাদের কাছে সরকারও অসহায় হয়ে পড়ে। মজুদদারী, মুনাফাখোরী তো আছেই। এছাড়াও শেয়ার বাজারে কেলেঙ্কারী, বন্যা-খরার সুযোগ গ্রহণ করা ইত্যাকার অসৎ কারবারের অসহায় শিকার হয় ক্রেতা বা ভোক্তাগণ। হতদরিদ্র লোকেরা নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসও কিনতে না পেরে চরম অপুষ্টিতে ভোগে এবং দুর্বিষহ জীবন যাপন করতে বাধ্য হয়।
দেশের প্রচলিত আইনকে ফাঁকি দিয়ে এবং নীতি-নৈতিকতাকে বিসর্জন দিয়ে এক শ্রেণীর অসৎ ব্যবসায়ী মুনাফা লুটার জন্য এই জঘণ্য কাজ করে থাকে। দুর্নীতির মাধ্যমে ম্যানেজ করে ফেলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে।
এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য এখন সবচেয়ে বড় পথ হচ্ছে মানুষের নৈতিক চরিত্রকে উন্নত করার প্রয়াস। মানুষের মনে যদি পরিবর্তন ঘটে তাহলে কর্মেও তা প্রতিফলিত হবে বলে আশা করা যায়। এ দেশের মানুষ যত পাপাচারই করুক অবচেতন মনে তার মধ্যে ধর্মের কিছুটা হলেও প্রভাব থেকে যায়। তাই মহান আল্লাহ্ বাণী ও রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পবিত্র সুন্নাহর উপস্থাপনার মাধ্যমে আমরা বিভ্রান্ত ব্যবসায়িক সিস্টেমে শুভ পরিবর্তন আনার প্রয়াস পাব।
ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে লাভ ও অতিলাভের দোলাচলে বহু লোক বেপথু হয়ে যায়। ব্যবসার খোলসে সুদ খেতে খেতে একসময় তাকে আর সুদ বা হারাম মনে করে না। বরং এটিকে ব্যবসায়ায়ের পলিসি মনে করে থাকে। অথচ এটি হচ্ছে যুলুমের হাতিয়ার। ঋণ গ্রহীতাকে নিঃস্ব করে দেওয়ার এক আর্থিক শোষণ। এ জন্যই মহান আল্লাহ্ বলেন,
الَّذِينَ يَأْكُلُونَ الرِّبَا لَا يَقُومُونَ إِلَّا كَمَا يَقُوْمُ الَّذِي يَتَخَبَّطُهُ الشَّيْطَانُ مِنَ الْمَسِ ذلِكَ بِأَنَّهُمْ قَالُوا إِنَّمَا الْبَيْعُ مِثْلُ الرِّبَا وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا فَمَنْ جَاءَةً مَوْعِظَةٌ مِنْ رَبِّهِ فَانْتَهَى فَلَهُ مَا سَلَفَ وَأَمْرُهُ إِلَى اللَّهِ وَمَنْ عَادَ فَأُولَئِكَ أَصْحَابُ النَّارِ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ
"যারা সুদ খায় তারা সেই ব্যক্তিরই ন্যায় দাঁড়াবে যাকে শয়তান স্পর্শ দ্বারা পাগল করে। এটা এ জন্য যে, তারা বলে, 'ক্রয়-বিক্রয় তো সুদের মত'। অথচ আল্লাহ্ ক্রয়-বিক্রয়কে হালাল ও সুদকে হারাম করেছেন। যার নিকট তার প্রতিপালকের উপদেশ এসেছে এবং সে বিরত হয়েছে, তবে অতীতে যা হয়েছে তা তারই এবং তার ব্যাপার আল্লাহ্র ইখতিয়ারে। আর যারা পুনরায় আরম্ভ করবে তারাই অগ্নিবাসী, সেখানে তারা স্থায়ী হবে" (আল-কুরআন, ২:২৭৫)। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, كُلُّ ظُلْمٍ رِبًا “প্রতিটি আর্থিক যুলুমই সুদ” (সুবুলুস সালাম)।
আজকাল বিভিন্ন অর্থ-লগ্নি প্রতিষ্ঠান যেমন ব্যাংক, লিজিং কোম্পানী, মাইক্রোক্রেডিট সিস্টেম, ঋণের বিপরীতে সুদ ছাড়া নানা রকম অজুহাতে দুর্বোধ্য ভাষায় বিভিন্ন চার্জ নিয়ে থাকে, যা ঋণ গ্রহীতাকে অন্ধকারে রেখে বা তার অসহায়ত্বের সুযোগ গ্রহণ করে আদায় করা হয়ে থাকে। এ সবই "রিবা” বা সুদ। এই সুদী কারবার এত জঘণ্য যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন:
الرِّبَا سَبْعُونَ بَابًا أَدْنَاهَا كَالَّذِي يَقَعُ عَلَى أُمِّهِ
"সুদের সত্তরটি শাখা রয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে লঘুটি হচ্ছে মায়ের সাথে যেনা করার সমতুল্য” (এটি বর্ণনা করেছেন, বায়হাকী, দেখুন, আত-তারগীব, খ.৩, পৃ.৬৫)।
তবে যারা এই সুদী কারবার করে আপাতত বড়লোক হয়েছে বলে মনে হয় তাদের উদ্দেশে আল্লাহ্ তা'আলার সতর্কবাণী হচ্ছে,
يَمْحَقُ اللَّهُ الرِّبَا وَيُرْبِي الصَّدَقَاتِ وَاللَّهُ لَا يُحبُّ كُلَّ كَفَّارٍ أَثِيمٍ “আল্লাহ্ সুদকে নিশ্চিহ্ন করেন এবং দানকে লালন করে বৃদ্ধি করেন। আল্লাহ্ কোন অকৃতজ্ঞ পাপীকে ভালবাসেন না” (আল-কুরআন, ২:২৭৬)।
সুদ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনায় না গিয়ে কেবল যদি আমরা মহান আল্লাহ্ বাণী অনুধাবনের চেষ্টা করি তা-ই যথেষ্ট। তিনি বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَذَرُوا مَا بَقِيَ مِنَ الرِّبَا إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ “ওহে যারা ঈমান এনেছ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সুদের যা কিছু বকেয়া আছে তা ছেড়ে দাও, যদি তোমরা মু'মিন হয়ে থাক” (আল-কুরআন, ২:২৭৮)।
فَإِنْ لَمْ تَفْعَلُوا فَأْذَنُوا بِحَرْبٍ مِنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ وَإِنْ تُبْتُمْ فَلَكُمْ رُءُوسُ أَمْوَالِكُمْ لَا تَظْلِمُونَ وَلَا تُظْلَمُونَ -যদি তোমরা তা না কর তবে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের সাথে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাক। কিন্তু যদি তোমরা তাওবাহ কর, তবে তোমাদের মূলধন তোমাদেরই। এতে তোমরা অত্যাচার করবে না এবং অত্যাচারিতও হবে না" (আল-কুরআন, ২:২৭৯)।
ব্যবসায় যথাসম্ভব সুদকে এড়িয়ে হালাল পন্থায় কারবার করাই ঈমানের দাবী। যে যেভাবেই এই সুদী কারবারে জড়িত থাকুক তাকে এ থেকে বেরিয়ে আসতেই হবে।
মজুদদারী-মুনাফাখোরী: মজুদদারী সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
مَنِ احْتَكَرَ طَعَامًا أَرْبَعِينَ لَيْلَةً، فَقَدْ بَرِئَ مِنَ اللَّهِ تَعَالَى، وَبَرِيَّ اللَّهُ تَعَالَى مِنْهُ وَأَيُّمَا أَهْلُ عَرْصَةٍ أَصْبَحَ فِيهِمُ امْرُؤٌ جَائِعٌ، فَقَدْ بَرِئَتْ مِنْهُمْ ذِمَّةُ اللَّهِ تَعَالَى “যে ব্যক্তি চল্লিশ রাত কোন খাদ্যদ্রব্য মজুদ করে রাখে সে আল্লাহ্ থেকে বিচ্ছিন্ন-বিমুখ হয়ে যায়। আল্লাহ্ তার থেকে বিমুখ হয়ে যান। কোন মহল্লায় যদি কোন ব্যক্তি অভুক্ত থাকে তাহলে তাদের ওপর থেকে আল্লাহ্ তা'আলার দায়-দায়িত্ব উঠে যায়”। (হাদীসটি বর্ণনা করেছেন ইমাম আহমাদ, দেখুন, আল্-মুনযেরী, আত-তারগীব, (কায়রো: ১৯৯৪খৃ.), খ.৩, পৃ.৩৪)।
রাসূলুল্লাহ (সা) আরও বলেছেন, لَا يَحْتَكِرْ الا خاطئ "পাপিষ্ঠ ব্যক্তিই মজুদদারী করে থাকে” (প্রাগুক্ত)।
وَعَنْ عُمَرَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ الله صَلَى عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْجَالِبُ مَرْزُوقٌ وَالْمُحْتَكِرُ مَلْعُون "উমার (রা) বর্ণন করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, "সরবরাহকারী রিযিকপ্রাপ্ত আর মজুদদার হচ্ছে অভিশপ্ত” (ইবন মাজাহ ও হাকেম, দেখুন, প্রাগুক্ত)।
'উমার (রা) বলেছেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা) কে বলতে শুনেছি, مَنِ احْتَكَرَ عَلَى الْمُسْلِمِينَ طَعَامَهُمْ ضَرَبَهُ اللَّهُ بِالْجُذَامِ وَالْإِفْلَاسِ "যে ব্যক্তি মুসলিমদের খাদ্যদ্রব্য মজুদ করে রাখে আল্লাহ্ তাকে শ্বেতরোগ ও নিঃস্ব অবস্থা দিয়ে শাস্তি দেন" (ইমাম ইস্পাহানী ও ইবন মাজাহ, দেখুন, আল্-মুনযেরী, আত-তারগীব, (কায়রো: ১৯৯৪খৃ.), খ.৩, পৃ.৩৬)।
মজুদদারীর উদ্দেশ্য মূলত পণ্যের দাম বাড়িয়ে ফায়দা লুটা। মজুদদারী ছাড়াও বিভিন্ন কলা-কৌশলে, যেমন সিন্ডিকেট করে অথবা কাঁচামালের সরবরাহে বিঘ্ন সৃষ্টি করে অথবা পরিবহনের ক্ষেত্রে ব্যাঘাত সৃষ্টি করে অথবা অন্য কোন উপায়ে কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধি ঘটানো অনেক বড় পাপ। আল্লাহ্ তা'আলা তাদেরকে এই জীবনে এবং আখেরাতে কঠিন আযাব দিয়ে থাকেন।
এ প্রসঙ্গে মা'কাল ইবন ইয়াসার (রা) বলেন, আমি বহুবার রাসূলুল্লাহ (সা)-কে বলতে শুনেছি: مَنْ دَخَلَ فِي شَيْءٍ مِنْ أَسْعَارِ الْمُسْلِمِينَ لِيُغْلِيَهُ عَلَيْهِمْ فَإِنَّ حَقًّا عَلَى اللَّهِ تَبَارَكَ وَتَعَالَى أَنْ يُقْعِدَهُ بِعُظْمٍ مِنَ النَّارِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ ، وَفِي رِوَايَةٍ : أَنْ يَقْذِفَهُ فِي مَعْظَمِ النَّارِ “যে ব্যক্তি মুসলিমদের দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে কোন কিছু ভূমিকা রাখে তাকে কেয়ামতের দিন জাহান্নামের অগ্নি-শলাকায় বসানো হবে, অন্য বর্ণনায় এসেছে-তাকে জাহান্নামের মধ্যখানে নিক্ষেপ করা আল্লাহ্ হক হয়ে যাবে” (প্রাগুক্ত)।
ব্যবসায়ের মধ্যে যখন সততা ও সত্যবাদিতা এবং সদাচরণ না থাকে তখন তা থেকে বরকত, রহমত ও আল্লাহ্ তা'আলার সহায়তার হাত উঠে যায়। এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,
عَنْ أَبِي سَعِيدِ الْخُدْرِيِّ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمْ قَالَ: التَّاجِرُ الصَّادِقُ الْأَمِينُ مَعَ النَّبِيِّينَ وَالصِّدِّيقِينَ وَالشُّهَدَاءِ
"আবু সাঈদ আল্-খুদরী (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: সৎ ও বিশ্বস্ত ব্যবসায়ী (পরকালে) নবীগণ, সিদ্দীকীন ও শহীদগণের সাথে থাকবে" (তিরমিযী)।
এ হাদীসে ব্যবসায়ীদের কিছু গুণাবলীর উল্লেখ করা হয়েছে যা না থাকলে তিনি উল্লিখিত সৌভাগ্য লাভ করবেন না। এমনকি রাসূলুল্লাহ (সা) প্রতারক ব্যবসায়ীকে ইসলামী সমাজচ্যুত বলে ঘোষণা করেছেন,
مَنْ غَشَّ الْمُسْلِمِينَ فَلَيْسَ مِنْهُمْ
"যে ব্যক্তি মুসলিমদের ধোঁকা দেবে সে তাদের অন্তর্ভুক্ত নয়” (আল্-মুনযেরী, আত-তারগীব, (কায়রো: ১৯৯৪খৃ.), খ.৩, পৃ.৩৭)।
ব্যবসায়িক সততা না থাকলে যে বরকত থাকে না এ সম্পর্কে একটি হাদীসে কুদসী রয়েছে,
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمْ إِنَّ اللَّهَ يَقُولُ أَنَا ثَالِثُ الشَّرِيكَيْنِ مَا لَمْ يَخُنُ أَحَدُهُمَا صَاحِبَهُ فَإِذَا خَانَهُ خَرَجْتُ مِنْ بَيْنِهِمَا
"আবু হুরায়রা (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, আল্লাহ্ তা'আলা বলেন- আমি দুই শরীকের তৃতীয়জন, যতক্ষণ না তারা একে অপরসঙ্গীর খেয়ানত করে। যখনই উভয়ের কোন একজন খেয়ানত করে বসে, আমি তাদের মাঝখান থেকে সরে যাই। ওই স্থানে শয়তান এসে যায়” (আবু দাউদ ও হাকিম)।
কাজেই ব্যবসায়িক সততা আখেরাতে মুক্তি এবং দুনিয়ায় সফলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ্ আমাদেরকে সৎ ব্যবসায়ী হিসেবে মহান আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের প্রিয়ভাজন হওয়ার তাওফীক দিন। আমীন।
📄 সাত. যৌতুক একটি সামাজিক দুর্নীতি
যৌতুক নিয়ে কৌতুকের অভাব নেই। একজন পাত্রের অভিভাবক মেয়ের বাবাকে বলেছিল, বেয়াই সাহে আমাদের কোন দাবী নেই। কেবল ধরুন, ছেলে মেয়ের থাকার জন্য যে ক'টা ফার্নিচার দরকার তা তো দিবেনই। সংসারে একটি টেলিভিশন বা ফ্রিজ তো ওদেরই প্রতিদিনকার প্রয়োজন। আর বাইরে বের হয়ে প্রয়োজনীয় কাজ সারতে একটি মটর সাইকেল হলে ভাল হয়। আর একটি কথা রাখবেন। আরে আরে, বলুন! হাজারটা বলুন, সেটা হচ্ছে গিয়ে মেয়ের গয়না কিন্তু দশ ভরি সোনার কম দেবেন না। এবার মেয়ের বাবা বললেন, আচ্ছা বেয়াই সাব! আমার একটা কথা রাখবেন? বললেন: তা'একটি কথা, রাখবো না! বলুন বলুন। কনের বাবা বললেন, ওই একটা কথা হচ্ছে, আমি কোন যৌতুক দিতে পারবো না।
আমাদের দেশের যৌতুক নিয়ে সবচেয়ে বড় কৌতুক করেন বিদেশীরা। কৌতূহলের অন্ত নেই তাদের। কীভাবে একটি মেয়ে, বরকে অনেক টাকা পয়সা ও স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি দিয়ে তবে বিয়ে বসতে হবে।
এই যৌতুক শ্রেণিভেদে রকমফের হয়। কেউ বাই সাইকেল চায়, কেউ মটর সাইকেল। আবার কেউ মটর কার। প্লেন চেয়েছে বলে শুনিনি। সম্ভবত গরীবের হাতি পোষার মত বলে আকাশের দিকে এখনও চোখ যায়নি। তবে একটা জিনিস বরাবর লক্ষ করা গেছে-যৌতুকটা মেয়ের বাবার সাধ্যের চেয়ে কিছুটা বেশি হতে হবে। না হয় যৌতুক হবে কি করে। বাংলাদেশে এটা কোন কৌতুক নয়। একেবারেই বাস্তব।
সৌদী আরবসহ উপসাগরীয় দেশসমূহে মোহরানা নগদ এমনকি আকদের পূর্বেই কনের পিতার হাতে জমা করে দিতে হয়। বাসা ফার্নিচার এবং অলিমার খরচের টাকা আগেই প্রদান করতে হয়। মোহরানার জন্য ঐসব ধনীদেশের যুবকরা বিয়ে করতে হিমশিম খায়। সরকার মোহরানার জন্য ঋণ সুবিধা রেখেছে। সেখানে কনের অনেক দাম। সেটাও স্বাভাবিক অবস্থা নয়। তবে দায়িত্ব বরের ওপর বলে শরীয়াতের ধারা ঠিক আছে, কেবল যদি বাড়াবাড়িটুকু না থাকতো। মিসরে বিয়ে করতে হলে আগে নিজ নামে বাসা, ফ্ল্যাট আছে কিনা তা প্রমাণ করতে হয়। বাপের বাসা থাকলে হবে না। নিজের কোন বাসা বা ফ্ল্যাট থাকলে তবেই বিয়ে রেজিস্ট্রি হবে। নইলে নয়। সেখানেও যুবকেরা কনে পক্ষ থেকে কিছু নেওয়ার চিন্তাও করতে পারে না। বরং কনেকে দেবার জন্য প্রাণান্তকর চেষ্টা করে যায়। কিন্তু বাংলাদেশে কনে এত সস্তা হলো কেন? ছেলের চেয়ে মেয়ের সংখ্যা বেশি বলে? আদমশুমারীতে তো নারী ও পুরুষের সংখ্যা সমান বলেই তথ্য বেরিয়ে এসেছে। তবে কেন নারীকে যৌতুক আদায় করতে হচ্ছে। কারা নারীকে এত সস্তা করেছে? প্রথা ভাল হোক আর মন্দ তাতো সমাজেরই সৃষ্টি। কুপ্রথা প্রশ্রয় না পেলে তা আগাছার মত বাড়তো না। কে তাকে আশ্রয় ও প্রশ্রয় দেয়? এর উত্তর হচ্ছে মানুষের লোভ। কারণ অন্যেরটা নেবেন, কিন্তু অন্যকে দেবেন না? মেয়ে বিয়ে দিতে যৌতুকের আহার যোগাতে যে পিতা চিন্তাক্লিষ্ট তিনিই আবার নিজের পুত্রধনকে ভাল দামে যৌতুক আমদানীর পুঁজি হিসেবে ধরে রাখেন। বরের পিতা ভুলে যান যে, তার পুত্রের এই লিঙ্গভেদে তার কোন হাত ছিল না। বরং "তিনিই সেই সত্তা যিনি মায়ের পেটে তোমাদের সুরত নির্ধারণ করেন, যেভাবে তিনি চান"। "সন্তান" পুত্র বা কন্যা হওয়ার মধ্যে পিতার কোন কৃতিত্ব নেই। অথচ বিয়ের সময় পুত্রের জন্য বাড়তি সুবিধা আদায় করতে যে ভাবসাব দেখান তাতে মনে হয় তিনি অনেক পরিশ্রম ও সাধনা করে এই সন্তান অর্জন করেছেন। এটা হলো কৃতজ্ঞতার পরিবর্তে কৃতঘ্নতা।
মহান আল্লাহ বলেন : وَاشْكُرُوا لِي وَلَا تَكْفُرُونَ "(আর আমার শোকর কর, অস্বীকার কর না)।"
যদি যৌতুক লোভী পিতা একবার ভাবতেন যে, সে কনের বাপ হলে কি চাইতেন তাহলে নিশ্চয়ই অনধিকার চর্চা করে যৌতুক চাইতেন না। মহানবী (সা) বলেছেন : أُحِبَّ لِأَخِيْكَ مَا تُحِبُّ لِنَفْسِكَ "তোমরা নিজের জন্য যা পছন্দ কর তা তোমার ভাইয়ের জন্য পছন্দ কর (আল আদাবুল মুফরাদ)।"
কেবল এ হাদীসটি আমল করলে এই মুসলিম সমাজে যৌতুকের অভিশাপ থাকতো না। যৌতুকের মত অন্যায়ের সাথে যুক্ত নির্দয় লোভী লোকদের যদি সামাজিকভাবে বয়কট করা হয়, তাহলে এ অপকর্ম থেকে তারা বেরিয়ে আসতে বাধ্য।
আল্লাহ তা'আলা বলেন: وَلا تَعَاوَنُوا عَلَي الْأَثْمِ وَالْعُدْوَانِ "পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে একে অপরকে সহযোগিতা করো না (আল কুরআন, ৫:২)।"
আমরা বলি কন্যা দায়গ্রস্ত পিতা। এ কথাটি বা এই ধারণাটি হচ্ছে আইয়্যামে জাহেলিয়াতের ধারণা। তখন কন্যাকে দায় বা অভিশাপ মনে করা হতো। আমাদের মুসলমান সমাজে আজ নারীকে সে রকম দায় মনে করা হচ্ছে বলেই আপদ বিদায় ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে। এ থেকে বের হয়ে আসতে হলে মুসলমান যুবক-যুবতীদের কান পেতে শুনতে হবে কুরআনের সেই আহবান।
কু-প্রথা একবার হয়ে গেলে তা থেকে বের হয়ে আসা সহজ নয়। তবে অসাধ্যও নয়। অশিক্ষিত ও অদক্ষ মেয়েকে চালাতে গেলে ঘুষের মত যৌতুক ছাড় তার মানবিক গুণের উৎকর্ষ সাধন করা যায় তাহলে সে সস্তায় যৌতুকের বলি হবে না। গার্মেন্টস-এর নারী শ্রমিক মেয়েটিও এখন অনেক আত্মবিশ্বাসী। তার পেশাগত দক্ষতা তার জীবন চলার হাতিয়ার। গুণ ও দক্ষতা বাড়াতে পারলে যৌতুক আপনা থেকেই অপসৃত হবে।
মুসলিম যুবকদের আমরা স্মরণ করিয়ে দিতে পারি মহানবীর (সা)-এর অমূল্য বাণী : الْحَرِيصُ মَحْرُومٌ "অতি লোভী বঞ্চিত থাকে (আত্ তারগীব)।"
যৌতুক নিয়ে কেউ কোনদিন বড়লোক হতে পারেনি। সে দাম্পত্য জীবনে সুখী হয়নি। কারণ বিবাহ একটি পবিত্র সম্পর্ক যা একটি বাক্য দিয়ে গড়া তার মধ্যে এই বিদ্'আত সম্পৃক্ত হলে বরকত উঠে যায়। কারণ অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়, যৌতুক না দেওয়ার জন্য নয় বরং আরও বেশি কেন দেওয়া হলো না সে জন্যই দাম্পত্য কলহ লেগে থাকে। কারণ যৌতুক যে নৌকার চড়নদার তার মাঝি হয় শয়তান।
যৌতুকের বিরুদ্ধে এখন কড়া আইন আছে। কিন্তু আইনের চৌকাঠে পৌঁছতে পারে কয়জন, বিচারের বাণী নিভৃতে কাঁদে। আইন ও বিচার শেষ আশ্রয়। তবে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গী বদলে গেলে যৌতুকের শিকার বধুটির সাহায্যে এগিয়ে আসবে তারই পড়শী। এভাবেই লোকাল ট্রিটমেন্ট হয়ে যাবে।
যৌতুকের কারণ হচ্ছে, আমরা নারীকে সস্তা পণ্য বানিয়ে ফেলেছি। নারী যদি সমাজে তার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে পারে তাহলে অন্যান্য মুসলিম দেশের মত আমাদের দেশেও যৌতুক থাকবে না। মূলত এই যৌতুকটা এদেশে সংক্রমিত হয়েছে সহাবস্থানকারী হিন্দুধর্ম থেকে। হিন্দু কন্যা সন্তান বাবার সম্পত্তিতে ভাগ পায় না। তাই যা দেবার বিয়ের সময় দিয়ে দেয়। ঘটিবাটি, আয়না-চিরুনী কোন কিছু বাদ যায় না। এজন্যই অভিধানে 'যৌতুক' বলতেই হিন্দুকন্যার সহযোগী সহযাত্রী সম্পদকে বুঝায়। কিন্তু ইসলামী সমাজে কন্যা সন্তানও মাতাপিতার সম্পত্তিতে ন্যায্য হিসসা পায়। কাজেই এখানে যৌতুক না থাকাটাই ছিল স্বাভাবিক। যৌতুক নেওয়া একটি সুস্পষ্ট যুলুম। আল্লাহ অত্যাচারীদের ভালবাসেন না। এটি একটি সামাজিক অনাচার।
মহানবী (সা) বলেছেন: “যদি কেউ কোন গর্হিত কাজ হতে দেখে সে যেন শক্তি দিয়ে বাধা দেয়, তা না পারলে বক্তব্যের মাধ্যমে তাকে বাধাদানের চেষ্টা করবে। আর তাও না পারলে অন্তরে ঘৃণা করবে। এটাতো ঈমানের দুর্বলতম স্তর।” (সহীহ আল-বুখারী) আমরা যদি ঘৃনাও করতাম তাহলে কখনও ঐ বিয়েতে কোনভাবেই অংশগ্রহণ করতাম না। তাহলে বুঝতে হবে আমাদের ঈমানের অবস্থান কোন জায়গায়?
যৌতুকের জন্য বর, তার পিতা, তার মাতা প্রমুখ আত্মীয়রাই কনের ওপর চাপ দিয়ে থাকে। এক্ষেত্রে আমাদের মধ্যে এক উম্মাহ চেতনা সৃষ্টি করতে হবে। মুসলমান এক অন্যের ভাই বা বোন। ভ্রতৃত্বের আবেদন হচ্ছে পরম্পরকে দায়মুক্ত রাখা। কন্যা দায়গ্রস্ত পিতার অসহায় আকুতি দেখে আমাদের বিত্তবানদের এগিয়ে আসা উচিৎ। সমাজে অনেকে আছে অতি সাধারণ খরচও করতে না পারার কারণে মেয়ে বিবাহ দিতে পারছে না।
পরিশেষে একটি মানবিক বিষয়ের কথা বলতে চাই। বর-কনের বিবাহ সাধারণত যে বয়সে হয় তখন তারা সবেমাত্র লেখাপড়া শেষ করে চাকরি তালাশ করছে অথবা চাকরিতে ঢুকেছে। এ সময় তাদের হাতে পর্যাপ্ত টাকা থাকার কথা নয়। অথচ দাম্পত্য জীবন শুরু করতে ঘর গ্রহস্থালির অনেক জিনিস উপহার দিলে তাদের সুবিধা হয়। মাতাপিতা বা উপযুক্ত বড় ভাইবোন বা দায়িত্বশীল আত্মীয়গণ এ সময় দু'একটা করে প্রয়োজনীয় জিনিস উপহার দিলে বরকনের উপকার হয় এবং যুবক-যুবতীর বিবাহের ধকল কমে যায়। কিন্তু যদি এটা জবরদস্তিমূলক বা সাধ্যের উপর বোঝা চাপানো হয় তাহলে সেটা না জায়িয। সহজ সরল জায়িযের পথ বন্ধ হলেই নাজায়িযের পথে ডুব মারে।
হযরত আলী (রা) ও হযরত ফাতিমা (রা)-এর অভিভাবক হিসেবে মহানবী (সা) হযরত আলী (রা)-এর বর্ম বিক্রি করা অর্থ দিয়ে বিবাহের যে ইন্তিজাম করেছিলেন, তার মধ্যে কয়েকটি প্রয়োজনীয় গৃহস্থালী জিনিসও ছিল।
কাজেই অতি নিরামিষভোজী হয়ে মেয়েকে কিছুই না দিয়ে পিতা যদি তৃপ্তির ঢেকুর ছেড়ে বলেন যে, আমার মেয়ের বিয়েতে 'তুচ্ছাও' দেয়নি-এই আত্মশ্লাঘা ঠিক নয়। অথবা অনেক কিছু দিয়ে সমাজে যদি বলে বেড়ায় যে, আমার মেয়েকে হাজারটা জিনিস বোঝাই করে দিয়েছি। এই আহ্লাদি হওয়াটাও বেহায়াপনা ছাড়া কিছু নয়। কিছু না দিলেও বিয়ে হবে, স্বেচ্ছায় অনেক কিছু দিলেও দোষ নেই। কুরআন হাদীসে কোথাও বলা নেই যে, কেউ তার মেয়েকে বা মেয়ের জামাইকে অত পরিমাণের চেয়ে বেশি দিতে পারবে না।
বর্তমানে আমাদের সমাজে প্রচলিত যৌতুক হলো একটি কুপ্রথা। এটি একদিনে সৃষ্টি হয়নি। একদিনে যাবেও না। দেখতে হবে এর কুফল কি, এর থেকে বাঁচার উপায় কি? যেমন ধরুন, কারো কোন কারণে কোন সমস্যা হলে তার উপসর্গ হিসাবে জ্বর দেখা দেয়। জ্বর কী অসুবিধার কারণে দেখা দিয়েছে তার এলাজ করাই রোগ নিরাময়ের সঠিক পন্থা।
এক্ষেত্রে দারিদ্য, লোভ, নারীর প্রতি অবজ্ঞা, সামাজিক অবিচার ইত্যাদি আর্থসামাজিক কারণে যৌতুকের জ্বর দেখা দিয়েছে। জ্বর হলে যেমন বমি হয়, গায়ে ব্যথা হয় ইত্যাদি। তেমনি যৌতুকের জ্বরের কারণে কনে নির্যাতিত হয়, বিবাহ বিচ্ছেদ হয়, অনেক কনে আত্মহত্যা করে, কন্যাপক্ষ সমাজে হেয় প্রতিপন্ন হয় ইত্যাদি।
এবার আমরা পবিত্র কুরআন ও হাদীসের আলোকে যৌতুককে বিশ্লেষণ করার প্রয়াস পাব:
যে কারণে যৌতুক হয় দারিদ্র: দারিদ্র পরিবারের মেয়েকে বিয়ে করতে যুবকেরা কোন আকর্ষণ অনুভব করে না। অথচ মহানবী (সা) বলেছেন: تُنْكَحُ الْمَرْأَةُ لِأَرْبَعٍ لِمَالِهَا وَلِجَمَالِهَا وَلِنَسَبِهَا وَلِدِينِهَا فَاظْفَرْ بِذَاتِ الدِّينِ
"সাধারণত যুবতীদের বিয়ে হয় তার সম্পদ দেখে, তার সৌন্দর্য ও বংশ দেখে। তবে যদি তার দীনদারী পাও তাহলে দীনদার মহিলাকে অগ্রাধিকার দেবে (আবু দাউদ)।"
মহানবী (সা) বলেছেন: الْفَقْرُ فَخْرِي “দারিদ্র্য আমার অহঙ্কার (তিরমিযী)।"
মহান আল্লাহ বলেন, إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِنْدَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ "তোমাদের মধ্যে সে সবচেয়ে সম্মানিত যে সবচেয়ে আল্লাহভীরু (আল কুরআন, ৪৯: ১৩)।"
ধনী বা গরীব হওয়া কোন স্থায়ী বিষয় নয়। ধনীও গরীব হতে পারে, গরীবও আবার ধনী হয়ে যেতে পারে।
কাজেই কোন যুবক যদি দারিদ্র্যের কারণে কোন মেয়েকে বিয়ে করার জন্য যৌতুক চায় তাহলে সেটা মরার উপর খাঁড়ার ঘা হবে। দারিদ্র্যের মত অস্থায়ী বিষয়ের প্রতি না তাকিয়ে স্থায়ী গুণাবলির দিকে তাকাতে হবে। মহানবী (সা) বলেছেন: "বিবাহ করলে রিযিক বাড়িয়ে দেওয়া হয়।"
অশিক্ষিত থাকা কনের দাম কম থাকে যখন সে অশিক্ষিত হয়। কাজেই অভিভাবক যদি তার কন্যাকে লেখাপড়া শেখায়, বৃত্তিমূলক ট্রেনিং দেয় এবং স্বাবলম্বী হতে শেখায়, তাহলে সেই কনেকে সম্পদ মনে করে যৌতুক ছাড়াই বিবাহ করতে যোগ্য বর এগিয়ে আসবে বৈকি। শিক্ষা ও প্রশিক্ষণই হতে পারে সবচেয়ে ভাল যৌতুক। মহানবী (সা) একবার এক দরিদ্র সাহাবীকে উপদেশ দেন যেন আত্মকর্মসংস্থান আছে এমন পাত্রী বিবাহ করে। তখন ঐ সাহাবী হাতের নকশী কাজ জানা একজন মহিলাকে বিয়ে করেন এবং তার দারিদ্র্য দূর হয়ে যায়। (সূত্র: বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসে একজন আল-আযহারী মুহাদ্দিস শিক্ষকের বক্তব্য) যারা নারী শিক্ষার বিরোধী তারা ইসলামের শত্রু।
যুবকদের বেকারত্ব যুবকটি বেকার। তাই সে বিয়ের খরচাপাতি মেয়ের বাবা থেকে নিতে চায়। সে দরিদ্র তাই ঘরের চাল টিনের করার জন্য কয়েক বান টিন চান। তার চাকরি নেই, তাই সে কিছু নগদ টাকা চায়। চাইলে পায়, তাই চায়। মূল কারণ তার চাকরি বা কর্ম নেই। যুবকটি বেকার কেন? কারণ, সে বি.এ., এম.এ. পাশ করে সরকারি চাকরির অপেক্ষা করছে। তার চোখ বেসরকারি চাকরি, আত্মকর্মসংস্থান মূলক কাজের দিকে নিবদ্ধ নয়। সে নিজেকে বিশেষ কোন কাজের উপযুক্ত করে গড়ে তোলেনি। দ্বিধাগ্রস্থ-বিদেশে পাড়ি জমাবে, না কি দেশে চাকরি জোগাড় করবে। এদিকে মেঘে মেঘে অনেক বেলা। বিয়ের বয়স হয়ে গেছে বেশ ক'বছর আগে। এ সময় তার কানে ওয়াসওয়াসার ফিসফিসানী আসতে শুরু করছে, অমুকখানে অমুকের একটি মেয়ে আছে। 'দেখতে বড়ই সুন্দরী'। যৌতুকও দেবে এত এত। তখনই কর্মীর হাত হয়ে যায় যৌতুকের হাত (ভিক্ষার হাত)।
মু'মিনদের প্রতি আল্লাহর নির্দেশ: وَقُلِ اعْمَلُوا فَسَيَرَى اللَّهُ عَمَلَكُمْ وَرَسُولُهُ وَالْمُؤْمِنُونَ
"আর আপনি বলুন (হে রাসূল!) কাজ করে যাও, অচিরেই আল্লাহ তোমাদের কাজকে দেখবেন। তাঁর রাসূল ও মু'মিনগণও দেখবেন, (আল কুরআন, ৯: ১০৫)।"
"এখানে দেখবেন অর্থ কর্মের প্রতিদান দেবেন। যুবকদের চাকরির পেছনে না ঘুরে হাতে যেকোন কাজকে উৎসাহিত করার জন্য মহানবী (সা) বলেছেন: "যে হাত কর্মময়, আল্লাহ সে হাতকে ভালবাসেন।” ভিক্ষাপ্রার্থী সাহাবীকে মহানবী (সা) তাঁর কম্বল বেঁচে কুঠার কিনতে বলেন। নিজের শেষ সম্বল কম্বলখানা বেচা পয়সার প্রতি মায়া হবে। কাঠের হাতল মহানবী (সা) নিজে সরবরাহ করেছেন। এটা সরকারি সাহায্য। কোন যুবক যদি কাজ করতে চায়, কাজের অভাব নেই। অভাব শুধু মনোবল ও দৃষ্টিভঙ্গির। শ্রমের মর্যাদা উপলব্ধি করতে পারলে যুবক বেকার থাকবে না এবং অন্যের কামাইকে যৌতুকের মোড়কে ভোগ করতেও ঘৃণাবোধ করবে। কারণ কর্মজীবি মানুষের আত্মসম্মানবোধ থাকে, যা বেকার যুবকের থাকে না। শ্রমের মর্যাদা উপলব্ধি করতে পারলে যুবক বেকার থাকবে না। অধিকাংশ বেকার যুবক মিথ্যা আত্মঅহমিকায় ভোগে। আর যে ব্যক্তি উভয় প্রকারের সন্তানের জন্য সমভাবে খুশী হয় সে কখনও অন্যের মেয়ের নিকট যৌতুক দাবী করে তাকে ছোট করতে পারে না।
আমাদের সমাজে একটি বিকৃত মানসিকতা জেঁকে বসেছে। কন্যা হলেই তাকে বিবাহ দেওয়ার সময় যৌতুক দিতে হবে-এই ভাবনায় ছোটবেলা থেকেই তার জন্য মা-বাবার আর্থিক প্রস্তুতি চলে। অথচ এটা মু'মিনের ঈমানের আবেদনের বিপরীত। যার ঈমান ও আমল উত্তম সে-ই উত্তম। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
فَلَا تَهِنُوا وَلَا تَحْزَنُوا وَأَنْتُمُ الْأَعْلَوْنَ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ
"তোমরা হতবল হয়ো না, চিন্তাক্লিষ্ট হয়ো না। আর তোমরাই তো বিজয়ী যদি তোমরা মু'মিন হয়ে থাক, (আল কুরআন, ৩:১৩৯)।"
সব কনের বাপেরা যদি শিরদাঁড়া সোজা করে থাকে তাহলে বরের বাপেরা যাবে কই?
বিদ'আত
মহানবী (সা) আমাদের আদর্শ। এক সাহাবী বলেছেন:
"মহানবী (সা) আমাদেরকে এক উজ্জ্বল প্রমাণিত সত্যের ওপর রেখে গেছেন, যার রাতও দিনের মত। তিনি আমাদের সব শিখিয়ে গেছেন, এমনকি কিভাবে পায়খানা-পেশাব করতে হবে।"
তাই বিবাহের ব্যাপারেও মহানবী (সা)-এর সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। ইসলামী শরীয়াতে কেবল স্বামী মোহর দিবে স্ত্রীকে। কিন্তু আমাদের দেশে একটা নামকা ওয়াস্তে মোহরানা ধার্য করা হয়। কিন্তু নগদে যৌতুক আদায় করতে হয় কন্যাপক্ষ থেকে। এটা সুস্পষ্ট একটি বিদ'আত। মহানবী (সা) বলেছেন:
مَنْ أَحْدَثَ فِي أَمْرِنَا لَيْسَ مِنْهُ فَهُوَ رَدُّ
"যা আমাদের এই ধর্ম থেকে উৎসারিত নয় এমন অভিনব কিছু প্রথার অনুপ্রবেশ হলে তা প্রত্যাখ্যাত, (সহীহ বুখারী)।” তিনি আরও বলেন:
كُلُّ بِدْعَةٍ ضَلَالَةٌ وَكُلُّ ضَلَالَةٍ فِي النَّارِ
"সব কুপ্রথা হচ্ছে বিভ্রান্তি। আর সব বিভ্রান্তির শেষ ঠিকানা হচ্ছে দোযখ, (সহীহ মুসলিম)।"
যৌতুক একটি বিদ'আত। কোন মুসলমান তাতে কোনভাবেই সম্পৃক্ত হতে পারেন না। বর হিসেবে এ বিয়ে কবুল করবে না, কনে হিসেবে সম্মতি দেবে না। কাজী হিসেবে বিবাহ পড়াবে না এবং দাওয়াতী হিসাবে এ বিয়ের অলিমা খাবে না। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَى وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ "তোমরা পরস্পরকে ভাল ও সংযমের কাজে সহযোগিতা কর, তবে পাপ বা সীমালঙ্গনের কাজে সহযোগিতা করো না, (আল কুরআন, ৫:২)।"
যুলুম যৌতুক যুলুমের হাতিয়ার। যেমন সুদ হচ্ছে শোষণের হাতিয়ার। যৌতুক কোন স্বাভাবিক আচরণ নয়। এটা বরের পক্ষ থেকে কনের ওপর এক আর্থিক ও মানসিক নির্যাতন। মহানবী (সা) বলেছেন।
كُلُّ ظُلْمٍ حَرَامٌ "যে কোন যুলমই হারাম।" আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَمَنْ يَّتَعَدَّ حُدُودَ اللَّهِ فَقَدْ ظَلَمَ نَفْسَهُ "যে আল্লাহর সীমালঙ্ঘন করে সে তো নিজের উপরই যুলুম করে।" কথায় বলে, ব্যবহারে বংশের পরিচয়। যৌতুক বিষয়টি হচ্ছে-আত্মীয়তা ও মিলনের পথে এক অনাকাঙ্ক্ষিত ছন্দপতন। যে মুহূর্তে কেবল একটি কালেমা পড়ে সম্পূর্ণ অপরিচিতি দু'টি পরিবার আত্মীয় হতে যাচ্ছে এবং প্রত্যেকে নিজের ভাল দিকটা দেখাবার জন্য ব্যস্ত। দূরকে কাছে টানার প্রতিযোগিতা সম্পর্ককে গভীর থেকে আরও গভীরে নিয়ে যাওয়ার জন্য চেষ্টা। ঠিক সে সময় যৌতুক যেন ১ মণ দুধে ১ ফোটা চনা (গো-মূত্র)। অনুরাগের সূচনায় বিরাগের বিউগল। শাদী মুবারকের শুরুতেই অসৌজন্যমূলক কাজ। এ হচ্ছে ভদ্রতার মজলিসে অভদ্রতার বেয়াড়া আচরণ। ভদ্রলোক যৌতুকের কথা মুখেই আনতে পারেন না। তাই যৌতুক অভদ্রতার কলঙ্ক তিলক।
অন্য ধর্মের অনুকরণ
যৌতুকের উদ্ভব হয়েছে এ জনপদের অন্য ধর্মের প্রথা থেকে। সে ধর্মে পিতার সম্পত্তিকে কন্যার অধিকার না থাকায় বিয়ের সময় যৌতুক দিয়ে তা পুষিয়ে দেয়ার একটা চেষ্টা থাকে। এখানে মুসলমানরা অন্য জাতির অনুকরণ করতে গিয়ে যৌতুকের কারবার করছে। মহানবী (সা) বলেছেন:
مَنْ تَشَبَّهَ بِقَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُمْ "যে ব্যক্তি কোন বিজাতির অনুকরণ করবে সে তাদেরই অন্তর্ভূক্ত (আস সিহাহ)।” নিজধর্মের বিধি বিধান ও এর সৌন্দর্য যে উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয় সে-ই অন্যের অন্ধ অনুকরণ করে থাকে। নানা অপসংস্কৃতির মত এই যৌতুকও আমাদের সমাজ দেহে অনুপ্রবেশ করেছে।
মিল-মহব্বতের অন্তরায়
যৌতুক হচ্ছে ভালবাসার চাদরে তুষের আগুন। ক্ষণে যৌতুকের ধুমায়িত আগুন ভালবাসার মায়াবী জালকে জ্বালিয়ে দেয়। এ জন্যই বিবাহ-বিচ্ছেদ, আত্মহত্যার মত দুঃখজনক পরিণতি নেমে আসে দম্পতির জীবনে। সন্তানের উপরও এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয়।
সঠিক পাত্রী নির্বাচনে বিভ্রান্তি
পাত্রী নির্বাচনে বিভিন্ন মানদন্ড থাকে। শিক্ষা, সৌন্দর্য, বংশ পরিচয়, সম্পদ ইত্যাদি বিবেচনায় আনার কথা থাকলেও যৌতুক যখন প্রধান বিবেচ্য বিষয় হয়ে যায় তখন পাত্রীর গুণগত মান বজায় রাখা সম্ভব হয় না।
অথচ মহানবী (সা) বলেছেন: "তোমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পাত্রী নির্বাচন কর, (ইবনে মাজাহ)।” কিন্তু এসব বাদ দিয়ে কেবল যৌতুকের দিকে তাকানোর ফলে বাস্তব জীবনে মিল হয় না এবং দাম্পত্য কলহ লেগে থাকে।
তাই যৌতুক একটি অভিশাপ। অবশ্যই পরিত্যাজ্য।