📘 দুর্নীতির পরিণাম ভয়াবহ 📄 এক. দুর্নীতির পরিণাম ভয়াবহ

📄 এক. দুর্নীতির পরিণাম ভয়াবহ


দুর্নীতি একটি সামাজিক অভিশাপ। কোন জাতির ধ্বংসের পূর্বে তাদের মধ্যে দুর্নীতি মহামারীর মত বিস্তার করে থাকে। আল্লাহ্ তা'আলা বিভিন্ন যুগে পৃথিবীর বিভিন্ন জাতিকে শাস্তি দেওয়ার প্রেক্ষাপট বর্ণনা করে আল-কুরআনে বলেন,
الَّذِينَ طَغَوْا فِي الْبِلَادِ ، فَأَكْثَرُوا فِيهَا الْفَسَادَ، فَصَبَّ عَلَيْهِمْ رَبُّكَ سَوْطَ عَذَابٍ ، إِنَّ رَبَّكَ لَبِالْمِرْصَادِ
"যারা দেশে সীমালঙ্ঘন করেছে এবং তাতে বড়বেশি দুর্নীতি করেছে, তখন তাদের ওপর তোমার প্রভু শাস্তির কষাঘাত হানলেন। নিশ্চয়ই তোমার প্রতিপালক পর্যবেক্ষণ করছেন” (আল-কুরআন, ৮৯:১১-১৪)।

এই আয়াতে, দেশে দেশে যারা আইন ও অধিকারের সীমা লঙ্ঘন করে, মহান আল্লাহর বিধানের বিরুদ্ধাচারণ করে এবং এই দুর্নীতি বিস্তারের ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করে অর্থাৎ তাদের কারণে দুর্নীতি সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়ে তখন আল্লাহ্ তা'আলা ওই দেশ ও জাতির ওপর রুষ্ট হয়ে তাদেরকে নানাভাবে শাস্তি দেন- আল্লাহ্র এই নীতির কথা বলা হয়েছে। সাধারণত পাপের পরিণাম সমাজের লোকদেরকে ভোগ করতে হয়, কিন্তু যখন কোন এক ধরনের পাপ প্রকাশ্যে সর্বত্র চর্চা হতে থাকে তখন আল্লাহ্ তা'আলা চাবুক মারার মত ভয়াবহ শাস্তি দিয়ে থাকেন। এ জন্যই আয়াতে বলা হয়েছে سَوْطَ عَذَابٍ বা শাস্তির চাবুক।

আজ সমাজের সর্বস্তরে দুর্নীতির দাপট দেখতে পাই। কোন কাজে নিয়ম-নীতি বা আইনের বিধি-বিধান না মেনে নিজের স্বার্থে বেপরোয়া কাজ করে যাওয়াকে এক কথায় দুর্নীতি বলা যায়। আইনকে ফাঁকি দিয়ে কখনও কখনও পেশীশক্তি বা প্রভাব খাটিয়ে নিজের মতলব হাসিল করা হচ্ছে। বর্তমানে আমরা দেখতে পাই, সিন্ডিকেট করে দ্রব্যমূল্য বাড়ানো হচ্ছে, খাদ্যে, অষুধে, নির্মাণ সামগ্রীতে অথবা প্রসাধনী ইত্যাদি প্রায় সকল ভোগ্যপণ্যে ভেজাল মিশিয়ে বিক্রি করা হচ্ছে। চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে অথবা সরকারি-বেসরকারি চাকরিতে কোন সুবিধা লাভের ক্ষেত্রে ঘুষের লেনদেন এখন অলিখিত নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরীক্ষায় নকল, ভোটে কারচুপি, দলিল-দস্তাবেজে জালিয়াতি, শিক্ষাকে বাণিজ্য বানানো, অবৈধ দখলদারী, অযোগ্য লোককে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব প্রদান, অসামাজিক কাজে উৎসাহিত করা, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, আর্থিক অনিয়ম ইত্যাদি সকল প্রকার দুর্নীতি হারাম। আল্লাহ্ তা'আলা আল-কুরআনে বহুবার অন্যের অধিকার নষ্ট করাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন সহজ সঠিক পথ অনুসরণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। আমরা প্রতি সালাতে সূরা ফাতিহা পাঠের সময় বলি, اِهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ "আমাদের সরল-সঠিক পথে পরিচালনা করুন।” মহান আল্লাহ্ বলেন,
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَنْ تُؤَدُّوا الْأَمَانَاتِ إِلَى أَهْلِهَا وَإِذَا حَكَمْتُمْ بَيْنَ النَّاسِ أَنْ تُحْكُمُوا بِالْعَدْلِ إِنَّ اللَّهَ نِعِمَّا يَعِظُكُمْ بِهِ إِنَّ اللَّهَ كَانَ سَمِيعاً بَصِيراً
"নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তোমদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন আমানত তার হকদারকে প্রত্যার্পণ করতে। আর তোমরা যখন মানুষের মধ্যে বিচার করবে তখন ন্যায়পরায়ণতার সাথে বিচার করবে। আল্লাহ্ তোমাদেরকে যে উপদেশ দেন তা কতই উৎকৃষ্ট! আল্লাহ্ সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা” (আল-কুরআন, ৪:৫৮)।

মহান আল্লাহ্ আরও বলেন, وَلَا تَلْبِسُوا الْحَقَّ بِالْبَاطِلِ وَتَكْتُمُوا الْحَقَّ وَأَنْتُمْ تَعْلَمُونَ
"তোমরা সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশ্রিত করো না এবং জেনে শুনে সত্য গোপন করো না” (আল-কুরআন, ২:৪২)। ভেজাল, জালিয়াতি ও সার্বিক সামাজিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে মহান আল্লাহ্ এ নিষেধাজ্ঞাকে আমাদের মেনে চলতেই হবে। কারণ, বহু আয়াতে অমান্যকারীদের জন্য শাস্তির বাণী উচ্চারিত হয়েছে।

মহান আল্লাহ্ বলেন, وَلَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُمْ بَيْنَكُمْ بِالْبَاطِلِ وَتُدُلُوا بِهَا إِلَى الْحُكَامِ لِتَأْكُلُوا فَرِيقًا مِنْ أَمْوَالِ النَّاسِ بِالْإِثْمِ وَأَنْتُمْ تَعْلَمُونَ
"তোমরা নিজেদের মধ্যে এক অন্যের অর্থ-সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না এবং মানুষের ধন-সম্পত্তির কিছু অংশ জেনে-শুনে অন্যায়ভাবে গ্রাস করার উদ্দেশ্যে তা বিচারকদের কাছে পেশ করো না” (আল-কুরআন, ২:১৮৮)।

আল্লাহ্ তা'আলা আরও বলেন, وَلَا تَعْتَدُوا ، إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْمُعْتَدِينَ "তোমরা সীমালঙ্ঘন করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ সীমালঙ্ঘনকারীদের ভালবাসেন না” (আল-কুরআন, ২:১৯০)।

এই সীমা আইনের সীমা, ধর্মের সীমা বা অধিকারের সীমা হতে পারে। হতে পারে তা ক্ষেতের আইল অথবা রাস্তার দুপাশের সীমানা, নদীর তীর অথবা বাড়ী-ঘর নির্মানের আইনানুগ সীমানা। ব্যক্তিগত ও সামাজিক আচরণেরও সীমা আছে।

এ জন্যই প্রত্যাশার সীমা ছাড়িয়ে লোভাতুর হয়ে হালাল রুজি ছেড়ে হারাম সম্পদ অর্জনও সীমালঙ্ঘন বটে। মহান আল্লাহ্ আরো বলেন, فَكُلُوا مِمَّا رَزَقَكُمُ اللهُ حَلَالًا طَيِّبًا وَاشْكُرُوا نِعْمَتَ اللَّهِ إِنْ كُنْتُمْ إِيَّاهُ تَعْبُدُونَ "আল্লাহ্ তোমাদেরকে হালাল ও পবিত্র যা দিয়েছেন তা থেকে আহার কর এবং আল্লাহ্র অনুগ্রহ ও নি'আমতের জন্য শোকর কর। যদি তোমরা কেবল তাঁরই 'ইবাদত করে থাক” (আল-কুরআন, ১৬:১১৪)। দেখুন, এখানে মহান আল্লাহ্র একনিষ্ঠ ইবাদতের সাথে হালাল রুজির সম্পর্ক কীভাবে বেঁধে দেওয়া হয়েছে। মহান আল্লাহ্ যা কিছু নি'আমত হিসেবে আমাদেরকে দিয়েছেন তাতে সন্তুষ্ট থেকে তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ না করলে যে তা এক আল্লাহ্ ইবাদতেরই পরিপন্থী তা এ আয়াতে মহান আল্লাহ্ সতর্ক করে দিয়েছেন। পেশীশক্তি প্রদর্শন বা ঔদ্ধত্য-অহঙ্কারবশত মানুষের অধিকার ছিনিয়ে নিয়ে যারা বীরদর্প করে তাদের উদ্দেশে মহান আল্লাহ্ বলেন, وَلَا تَمْشِ فِي الْأَرْضِ মَرَحًا إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ كُلَّ مُخْتَالٍ فَخُورٍ "অহঙ্কারবশে তুমি মানুষকে অবজ্ঞা করো না এবং পৃথিবীতে উদ্ধতভাবে বিচরণ করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ কোন উদ্ধত, অহঙ্কারীকে পছন্দ করেন না” (আল-কুরআন, ৩১:১৮)।

তিনি আরও বলেন,
وَلَا تَمْشِ فِي الْأَرْضِ مَرَحًا إِنَّكَ لَنْ تَخْرِقَ الْأَرْضَ وَلَنْ تَبْلُغَ الْجِبَالَ طُولاً "ভূ-পৃষ্ঠে দম্ভভরে বিচরণ করো না: তুমি তো কখনই পদভারে ভূ-পৃষ্ঠ বিদীর্ণ করতে পারবে না এবং উচ্চতায় তুমি কখনই পর্বত প্রমাণ হতে পারবে না” (আল-কুরআন, ১৭:৩৭)।

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
مَنْ غَشَّ فَلَيْسَ مِنَّا "যে ব্যক্তি জালিয়াতি বা সঠিক তথ্য গোপন করল সে আমাদের সমাজভুক্ত নয়।"

তিনি আরও বলেছেন,
لا يَرْحَمُ اللَّهُ مَنْ لَا يُرْحَمُ النَّاسِ "যে লোক মানুষের প্রতি দয়া করে না আল্লাহ্ তার ওপর দয়া করেন না" (হাদীসটি জাবির ইবন আব্দুল্লাহ থেকে বর্ণিত, ইমাম আল্-বুখারী, আল্- আদাবুল মুফরাদ, অনুচ্ছেদ: ৫৩)।

রাসূলুল্লাহ (সা) আরও বলেন,
المُؤْمِنُ غِزُّ كَرِيمٌ وَالْفَاجِرِ خِب لثيم "মু'মিন ব্যক্তি প্রসন্ন ও ভদ্র স্বভাবের হয়ে থাকে আর পাপীষ্ঠ ব্যক্তি প্রতারক ও নীচ প্রকৃতির হয়ে থাকে” (আবু হুরায়রাহ্ (রা.) থেকে বর্ণিত, ইমাম আল- বুখারী, আল্-আদাবুল মুফরাদ, অনুচ্ছেদ: ১৯৭)।

দুর্নীতিও এক ধরনের ধোকাবাজি যা মানুষের অধিকার নষ্ট করে প্রকৃত হকদারকে প্রতারিত করা। তাই দুর্নীতি করা নীচ প্রকৃতির ও ঘৃণীত লোকদেরই কাজ।

রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,
الرَّاشِي وَالْمُرْتَشِي كِلَاهُمَا فِي النَّارِ "ঘুষ প্রদানকারী ও গ্রহণকারী (উভয়ই জাহান্নামে যাবে)।”

আনাস (রা) বর্ণনা করেন,
نُدِينَا أَنْ يَبِيعَ حَاضِرُ لِبَادٍ "আমাদেরকে মফস্বলের উৎপাদিত পণ্য একচ্ছত্রভাবে খরিদ করে নিয়ে শহুরেদের কাছে বিক্রয় (সিন্ডিকেট) ব্যবস্থা নিষেধ করা হয়েছে।” (মুসলিম, কিতাবুল বুয়ু', খ.২, পৃ.৪)। অপর হাদীসে বর্ণিত আছে,
لَا يَبِيعُ حَاضِرٌ لِبَادٍ دَعُوا النَّاسَ يَرْزُقُ اللَّهُ بَعْضَهُمْ فِي بَعْضٍ "কোন শহরবাসী (এককভাবে বা সিন্ডিকেট করে) গ্রামবাসীর পণ্য বিক্রি করবে না। মানুষকে ফ্রি ছেড়ে দাও, যাতে তারা একে অপরের মধ্যে স্বাধীন লেনদেন করে রিযিক হাসিল করতে পারে।” (প্রাগুক্ত) এ ছাড়া সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম শরীফে বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) নাজাশ (نجش) বা দালালী করে পণ্যের দাম উঠানোকে প্রতারণামূলক কাজ বলে নিষিদ্ধ করেছেন। অনুরূপভাবে সিমসার (سمسار) বা দালালের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে কৃষককে ঠকানোও নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন (ইমাম মুসলিম, সহীহ মুসলিম, খ.১০, পৃ.১৬৪ ইবন আব্বাস (রা) বর্ণিত হাদীস। বস্তুত দুর্নীতি একটি বিরাট পাপ। এ থেকে ফিরে আসার একমাত্র পথ হচ্ছে আখিরাতের চিন্তা করে মহান আল্লাহ্র সতর্কবাণী ও রাসূলুল্লাহ (সা) কর্তৃক যে সতর্কবাণী উচ্চারিত হয়েছে তা মনে ধারণ করে দেশের ভাল মানুষ তথা মহান আল্লাহ্ ভাল বান্দা হওয়ার চেষ্টা করা সকলেরই দায়িত্ব। মহান আল্লাহ্ বলেছেন,
بَلَى مَنْ أَسْلَمَ وَجْهَهُ لِلَّهِ وَهُوَ مُحْسِنٌ فَلَهُ أَجْرُهُ عِندَ رَبِّهِ وَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ "হ্যাঁ, যে কেউ আল্লাহ্র নিকট সম্পূর্ণভাবে আত্মসমর্পণ করে এবং সৎকর্মপরায়ণ হয় তার বিনিময় তার প্রতিপালকের নিকট রয়েছে এবং তাদের কোন ভয় নেই এবং তারা দুঃখিতও হবে না" (আল-কুরআন, ২:১১২)।

📘 দুর্নীতির পরিণাম ভয়াবহ 📄 দুই. হালাল রুজি

📄 দুই. হালাল রুজি


এখানে আমরা এমন একটি বিষয় আলোচনা করব যা দুনিয়া ও আখিরাতের সাফল্যের জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ।
হালাল রুজি অর্জন সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, طَلَبُ الْحَلَالِ فَرِيضَةٌ بَعْضَ الْفَرِيضَةِ “হালাল রোজগার হচ্ছে ফরযের পরে আরেক ফরয” (তাবারানী ও বায়হাকী; দেখুন, আত-তাবারী, খ.৩, পৃ.১৬)। পবিত্র কুরআনেও আল্লাহ্ তা'আলা বলেছেন,
فَإِذَا قُضِيَتِ الصَّلَاةُ فَانْتَشِرُوا فِي الْأَرْضِ وَابْتَغُوا مِن فَضْلِ اللَّهِ "সালাত আদায় শেষে যমীনে ছড়িয়ে পড় এবং আল্লাহ্র অনুগ্রহ অন্বেষণ কর" (আল-কুরআন, ৬২:১০)।

এখানে ফাদলুল্লাহ্ বা আল্লাহ্র অনুগ্রহ বলতে রোজগার বা রিযিক বুঝানো হয়েছে। মহান আল্লাহ্ আমাদের রব, আমাদের প্রতিপালক। তিনি বলেছেন,
وَمَا مِن دَابَّةٍ فِي الْأَرْضِ إِلَّا عَلَى اللَّهِ رِزْقُهَا “পৃথিবীপৃষ্ঠে বিচরণকারী সকলের রিযিকের দায়িত্ব আল্লাহ্রই" (আল-কুরআন, ১১:৬)। কিন্তু এই রিযিক আল্লাহ্ তা'আলা হালাল উপায়ে অর্জন করে নিতে বলেছেন,
وَأَنْ لَيْসَ لِلْإِنْسَانِ إِلَّا مَا সَعَى "মানুষের জন্য তা-ই যা সে চেষ্টা করে” (আল-কুরআন, ৫৩:৩৯)। এ জন্যই রিযিক সবাই সমানভাবে পায় না। তিনিই তা নির্ধারণ করে বলেন,
اللهُ يَبْسُطُ الرِّزْقَ لِمَنْ يَشَاءُ وَيَقْدِرُ "আল্লাহ্ তা'আলা যাকে ইচ্ছা রিযিক প্রসারিত করে দেন আবার যাকে ইচ্ছা সীমিতভাবে নির্ধারণ করে দিয়ে থাকেন” (আল-কুরআন, ১৩:২৬)।

তিনি অনেক লোককে বেহিসাব রিযিকও দিয়ে থাকেন। কিন্তু বেশী ধন-সম্পদই মানুষের সুখ ও শান্তির মাপকাঠি নয়। সে জন্যই হালাল রুজির ওপর সন্তুষ্ট থেকে হালাল পথে উপার্জন বৃদ্ধির চেষ্টা করা প্রয়োজন। হারাম পথে ধনী হতে গেলে দুনিয়াতে লাঞ্ছনা ও আখিরাতে দোযখের আগুন অপেক্ষা করতে থাকে। আগে বা পরে হারামের অর্জন দুঃখের কারণ হয়েই থাকে। মহান আল্লাহ্ এই জন্য আল-কুরআনে বহুবার হালাল রুজির গুরুত্ব এবং হারাম উপার্জনের পরিণতির ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বলেন,
يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّاسُ كُلُوا۟ مِمَّا فِى ٱلْأَرْضِ حَلَٰلًا طَيِّبًا وَلَّا تَتَّبِعُوا۟ خُطُوَٰتِ ٱلشَّيْطَٰনِۚ إِنَّهُۥ لَكُمْ عَدُوٌّ মُّبِينٌ
“হে মানব জাতি! পৃথিবীতে যা কিছু হালাল ও পবিত্র খাদ্যবস্তু রয়েছে তা থেকে তোমরা আহার করো এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। নিশ্চয় সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু” (আল-কুরআন, ২:১৬৮)।

এই আয়াতে গোটা মানবজাতিকে সমগ্র পৃথিবীর অগণতি হালাল খাদ্য বস্তু থেকে পছন্দ ও প্রয়োজন মত গ্রহণ করার জন্য এক উদাত্ত আহবান জানান। পৃথিবীতে বেঁচে থাকার জন্য কোন হারামের প্রয়োজন নেই তাও এখানে পরোক্ষভাবে ঘোষিত হয়েছে। কিন্তু শয়তান মানুষের মনে ওয়াসওয়াসাহ বা কুমন্ত্রণা দিয়ে যায় যে আরও সুখী হতে হলে আরও সম্পদ প্রয়োজন, তাই যে কোনভাবেই তা অর্জন কর। শয়তান হারাম জিনিসকে মানুষের মনে সুন্দর ও আকর্ষণীয় করে তাকে প্রলুব্ধ করে চলেছে। এ কারণে হালাল খাবারের প্রসঙ্গে একই আয়াতে আমাদের প্রকাশ্য শত্রু শয়তানের পদাঙ্ক অনসরণ না করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন।

অনেক সময় জিন জাতীয় শয়তানের সাথে মানুষ জাতীয় শয়তান মিলিত হয়ে মানুষকে হারাম পথে নিয়ে যাবার জন্য মনের মধ্যে আবেদন সৃষ্টি করে। এই খান্নাস থেকে আল্লাহ্ আশ্রয় গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। সূরা নাস-এ মহান আল্লাহ্ বলেন,
قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ ٱلنَّاسِ مَلِكِ ٱلنَّاسِ إِلَٰهِ ٱلنَّاسِ مِن شَرِّ ٱلْوَسْوَاسِ ٱلْخَنَّاسِ ٱلَّذِى يُوَسْوِسُ فِى صُدُورِ ٱلنَّاسِ مِنَ ٱلْجِنَّةِ وَٱلنَّاسِ
"বলুন (হে রাসূল!) আমি আশ্রয় প্রার্থনা করছি মানুষের প্রতিপালকের, মানুষের অধিপতির, মানুষের মা'বুদ এর নিকট আত্মগোপনকারী কুমন্ত্রণাদাতার অনিষ্ট থেকে; যে কুমন্ত্রণা দেয় মানুষের অন্তরে জিন্নের মধ্য থেকে এবং মানুষের মধ্য থেকে" (আল-কুরআন, ১১৪:১-৬)।

এই কুমন্ত্রণার স্বরূপ অন্য আয়াতে এসেছে, الشَّيْطَانُ يَعِدُكُمُ الْفَقْرَ وَيَأْمُرُكُمْ بِالْفَحْشَاءِ وَاللَّهُ يَعِدُكُمْ مَّغْفِرَةً مِّنْهُ وَفَضْلاً وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ
"শয়তান তোমাদেরকে দারিদ্র্যের ভয় দেখায় এবং অশ্লীলতার নির্দেশ দেয়। আর আল্লাহ্ তোমাদেরকে তাঁর ক্ষমা ও অনুগ্রহের প্রতিশ্রুতি প্রদান করেন। আর আল্লাহ্ প্রাচুর্যময় ও সর্বজ্ঞ” (আল-কুরআন, ২:২৬৮)।

এখানে শয়তান ভয় দেখায় যে, তুমি দুর্নীতি করে উপার্জন না করলে দরিদ্র হয়ে যাবে এবং অনেক অর্থ-বিত্ত থাকলে অনেক স্ফূর্তি করতে পারবে। ঠিক এর বিপরীতে মহান আল্লাহ্ ওয়াদা করেছেন যে, তিনি বান্দাহকে ক্ষমা করে দেবেন যাতে সে পবিত্র হয়ে যায় এবং অনুগ্রহ তথা হালাল রুজি দেবেন যাতে সে দরিদ্র হয়ে না যায়। আয়াতের শেষে মহান আল্লাহ্ নিজেকে "প্রাচুর্যময়” বলে বুঝিয়েছেন যে, আল্লাহ্র ভাণ্ডারে কোন কিছুর অভাব নেই। তিনি হালাল উপার্জনের মাধ্যমে প্রচুর অর্থবিত্তের অধিকারী করে কাউকে বাদশাও বানাতে পারেন। এরপর তিনি নিজেকে "আলীম" বা সর্বজ্ঞ বলে জানিয়ে দিয়েছেন, কে কীভাবে বিত্তবান হয় আল্লাহ্ সবই জানেন। তিনি জানেন, হালাল রুজিতে যে কী বরকত!

কাজেই সৎ উপার্জনে আল্লাহর অনুগ্রহ থাকে। আর অসৎপথে উপার্জন দুনিয়া ও আখিরাতে লাঞ্ছনা, অপমান ও দুঃখ বয়ে নিয়ে আসে। মহান আল্লাহ্ ওয়াদা ফেলে কোন মু'মিন শয়তানের ভয়ে মিথ্যে ওয়াদার পথে পা বাড়াতে পারে না।

রাসূলুল্লাহ (সা.) দরিদ্র ও ঋণগ্রস্ত লোকদেরকে এই দু'আ করার জন্য শিখিয়ে দিয়েছেন: اللَّهُمَّ اكْفِنِي بِحَلَالِكَ عَنْ حَرَامِكَ وَأَغْنِنِي بِفَضْلِكَ عَمَّنْ سِوَاكَ
"হে আল্লাহ্! আপনার হালাল দিয়ে আপনার হারাম থেকে বেঁচে থাকার যথেষ্ট উপকরণ দিন এবং আপনার অনুগ্রহের মাধ্যমে আপনি ভিন্ন কারও কাছে ধর্ণা দেওয়া থেকে আমাকে স্বচ্ছল করে দিন" (সহীহ হাদীস)

মহান আল্লাহ্ বলেন,
وَمَنْ يَتَّقِ اللهَ يَجْعَلْ لَّهُ مَخْرَجًا ، وَيَرْزُقُهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ وَمَن يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ إِنَّ اللَّهَ بَالِغُ أَمْرِهِ قَدْ جَعَلَ اللَّهُ لِكُلِّ شَيْءٍ قَدْراً
"যে কেউ আল্লাহকে ভয় করে আল্লাহ্ তার বের হবার পথ করে দেন এবং তাকে রিযিক দিয়ে থাকেন এমন উৎস থেকে যা সে ভাবতেও পারেনি। যে ব্যক্তি আল্লাহ্র ওপর নির্ভর করবে তার জন্য তিনিই যথেষ্ট। আল্লাহ্ তার ইচ্ছা পূরণ করবেনই। আল্লাহ্ সমস্ত কিছুর জন্য স্থির করেছেন নির্ধারিত মাত্রা” (আল- কুরআন, ৬৫:২-৩)।

মহান আল্লাহ্র অঙ্গীকার হচ্ছে তিনি আল্লাহকে ভয় করে ইসলামী অনুশাসন মেনে চলা লোকদের তিনি অভাবী রাখবেন না। কিন্তু আমাদের ঈমানের দূর্বলতার কারণেই আমরা হতাশায় ভোগী। তাছাড়া আল্লাহ্ ওপর তাওয়াক্কুল মানে চেষ্টাহীন বসে থাকা নয়। সাধ্যমত চেষ্টা করে ফল লাভের জন্য তার ওপর নির্ভরতা হচ্ছে তাওয়াক্কুল। সে জন্যই পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ্ বলেন,
وَقُلِ اعْمَلُوا فَسَيَرَى اللَّهُ عَمَلَكُمْ وَرَسُولُهُ وَالْمُؤْمِنُونَ
"আপনি বলুন, তোমরা কাজ করে যাও, অচিরেই আল্লাহ্ তোমাদের কাজ দেখবেন এবং তাঁর রাসূল ও মু'মিনগণও দেখবেন” (আল-কুরআন, ৯:১০৫)।

এখানে 'দেখবেন' অর্থ-দেখে এর বিনিময় দেবেন। একজন শ্রমিকের নিবেদিত প্রাণ কর্মোদ্যম দেখে তার আশে-পাশের মু'মিনগণ তাকে সমর্থন করেন, কর্তাব্যক্তিগণ আরও ভাল কাজে নিয়োগ দেন এবং সর্বোপরি মহান আল্লাহ্ তার হালাল রুজি লাভের প্রচেষ্টা দেখে তার প্রতি রহমত করে থাকেন। এক হাদীসে আছে প্রতি জুমাবার ও সোমবার রাসূলুল্লাহ (সা.) এর নিকট উম্মতের কর্মকাণ্ড উপস্থাপিত হয়। (হাফেয আল্ হায়ছামী তার মাজমাউয যাওয়ায়েদ, মুহাদ্দিস কুস্তলানী তার শরহে বুখারীতে বলেন, এ হাদীসের সনদের বর্ণনাকারীগণ সব সহীহ্ পর্যায়ের লোক। 'রাসূলুল্লাহর মর্যাদা' ইফা, পৃ.১৪৬)।

উক্ত আয়াতে হালাল পথে উপার্জন করার তাকিদ এসেছে এবং এরপর বিষয়টি আল্লাহ্ ওপর ন্যস্ত আছে বলে সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে। সৎকর্মশীলদের কর্ম আল্লাহ্, তাঁর রাসূল ও মু'মিনগণ কালে কালে দেশে দেশে দেখে রাখবেন, এর চেয়ে মর্যাদার কী হতে পারে!

পক্ষান্তরে হারাম উপার্জন এমনকি ভাল কাজেও আল্লাহ্ গ্রহণ তো করেনই না বরং তিনি তার প্রতি ক্ষিপ্ত হন। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,
أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّ اللَّهَ طَيِّبٌ لَا يَقْبَلُ إِلَّا طَيِّبًا وَإِنَّ اللَّهَ أَمَرَ الْمُؤْمِنِينَ بِمَا أَمَرَ بِهِ الْمُرْسَلِينَ فَقَالَ يَا أَيُّهَا الرُّسُلُ كُلُوا مِنَ الطَّيِّبَاتِ وَاعْمَلُوا صَالِحًا إِنِّي بِمَا تَعْمَلُوْنَ عَلِيْمٌ وَقَالَ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُلُوا مِنْ طَيِّبَاتِ مَا رَزَقْنَاكُمْ ثُمَّ ذَكَرَ الرَّجُلَ يُطِيلُ السَّفَرَ أَشْعَثَ أَغْبَرَ يَمُدُّ يَدَيْهِ إِلَى السَّمَاءِ يَا رَبِّ يَا رَبِّ وَمَطْعَمُهُ حَرَامٌ وَمَشْرَبُهُ حَرَামٌ وَمَلْبَسُهُ حَرَامٌ وَغُذِيَ بِالْحَرَامِ فَأَنَّى يُسْتَجَابُ لِذَلِكَ
"হে লোকসকল! আল্লাহ্ পবিত্র, তিনি পবিত্র ছাড়া কিছু গ্রহণ করেন না। আল্লাহ্ মু'মিনদেরকে সেই নির্দেশ দিয়েছেন যা করতে তিনি তার রাসূলগণকেও নির্দেশ দিয়েছেন: “হে রাসূলগণ! পবিত্র বস্তু থেকে আহার করবে এবং নেক আমল করবে, তোমরা যা করছ, আমি তা সম্পর্কে সম্যক অবগত আছি।” তিনি আরও বলেছেন: "হে মুমিনগণ! তোমাদেরকে আমি যে রিযিক দিয়েছি তার থেকে পবিত্র বস্তু আহার কর।" এরপর রাসূলুল্লাহ (সা) ঐ ব্যক্তির উল্লেখ করলেন যার দীর্ঘ সফরের কারণে উসকো খুশকো ধূলি-ধুসরিত চেহারা অথচ তার খাবার হচ্ছে হারাম, পোশাক-পরিচ্ছদ হারাম এবং হারাম খাবার খেয়ে জীবন ধারণ করছে, এ অবস্থায় আসমানের দিকে হাত প্রসারিত করে বলছে, ইয়া রব, ইয়া রব! তাহলে তাঁর দু'আ কিভাবে কবুল হবে? (ইমাম আহমাদ, মুসনাদ, সহীহ মুসলিম, আস্-সায়্যিদ সাবিক, ফিকহুস সুন্নাহ, খ.২, পৃ.৯৭)।

আত্মার পরিশুদ্ধির জন্য দেহ পরিশুদ্ধ থাকতে হয়। হালাল রুজি বা সৎ উপার্জনকারী আল্লাহ্র বন্ধু বলে রাসূলুল্লাহ (সা) ঘোষণা করেছেন। পক্ষান্তরে অসৎ উপার্জন করে অতি তাড়াতাড়ি সুখের সন্ধান করা আসলে বৃথা। অনেকেই অর্থ উপার্জনে সুবিধাজনক বিষয়ে লেখাপড়া শেষ করেই তার পেশায় এমনভাবে মগ্ন হয় যেন সে পারে তো দুদিনেই বিশাল বিত্ত-বৈভবের মালিক হয়ে যায়। লোকের সেবা করা এবং এজন্য ত্যাগী মনোভাব নিয়ে কাজ করার কোন লক্ষণই দেখা যায় না। রাসূলুল্লাহ (সা) এক হাদীসে এই তাড়াহুড়া করে অসৎভাবে উপার্জন করা থেকে বিরত থাকতে বলেছেন:
عَنِ ابْنِ مَسْعُودٍ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللهِ صلىُ اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَن نَفْسًا لَنْ تَمُوْتَ حَتَّى تَسْتَكْمِلَ رِزْقُهَا أَلَّا فَاتَقُوا اللهَ وَأَجْمَلُوا فِي الطَلَبِ وَلَا يَحْمِلَنَكُمُ اسْتِبْطَاءِ الرِّزْقَ أَنْ تَطْلُبُوهُ بِمَعَاصِي اللَّهِ فَإِنَّهُ لَا يَدْرِكْ مَا عِنْدَهُ إِلَّا بِطَاعَتِهِ
"ইবন মাসউদ (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, কোন প্রাণী তার রিযিক পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত কখনও মরবে না। সাবধান! আল্লাহকে ভয় করো এবং আবেদনে সৌন্দর্য বজায় রেখো। 'তোমার রিযিক ধীরগতিতে আসার কারণে তা আল্লাহ্র নাফরমানির মাধ্যমে পেতে চেয়ো না। কারণ তাঁর নিকট যা আছে তা লাভ করতে হলে তাঁর আনুগত্যের মাধ্যমেই লাভ করতে হবে” (ইবন মাযাহ্)।

তবে কেউ যদি অন্যের সম্পদ গ্রাস করে তবে তার পরিণতি সম্পর্কে আল্লাহ্ তা'আলা বলেন: فَبِظُلْمٍ মِّنَ الَّذِينَ هَادُوا حَرَّمْنَا عَلَيْهِمْ طَيِّبَاتٍ أُحِلَّتْ لَهُمْ وَبِصَدِّهِمْ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ كَثِيرًا ، وَأَخْذِهِمُ الرِّبَا وَقَدْ نُهُوا عَنْهُ وَأَكْلِهِمْ أَمْوَالَ النَّاسِ بِالْبَاطِلِ وَأَعْتَدْنَا لِلْكَافِرِيْنَ مِنْهُمْ عَذَابًا أَلِيمًا
"যারা ইহুদী ছিল, তাদের জুলুমের কারণে আমি তাদের ওপর এমন সব পবিত্র বস্তু হারাম করে দিয়েছি, যা ছিল তাদের জন্য হালাল। এছাড়াও আল্লাহর পথে অনেক বাধা দেওয়ার জন্য তা করেছিলাম। এবং তারা সূদ গ্রহণের কারণে- যা তাদেরকে নিষেধ করা হয়েছিল, এবং অন্যায়ভাবে লোকের ধনসম্পদ গ্রাস করার জন্য। কাফিরদের জন্য মর্মন্তুদ শাস্তি প্রস্তুত রেখেছি” (আল-কুরআন, ৪:১৬০-১৬১)।

অবৈধ দখল সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, أَيُّمَا رَجُلٍ ظَلَمَ شِبْرًا مِنْ الْأَرْضِ كَلَّفَهُ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ أَنْ يَحْفِرَهُ حَتَّى يَبْلُغَ آخِرَ سَبْعِ أَرَضِينَ ثُمَّ يُطَوَّقَهُ إِلَى يَوْমِ الْقِيَامَةِ حَتَّى يُقْضَى بَيْنَ النَّاسِ
"কোন ব্যক্তি যদি জোর জুলুম করে এক বিঘত পরিমাণ জায়গাও গ্রাস করে আল্লাহ্ তা সাত তবক যমীন পর্যন্ত করতে বাধ্য করবেন এরপর তা গলায় বেষ্টন করে রোজ কেয়ামতে উঠে অপেক্ষা করতে থাকবে যতক্ষণ না আল্লাহ্ মানুষের বিচার শেষ করেন।” (হাদীসটি বর্ণনা করেছেন আহমাদ ও তাবরানী; ইবন হিব্বান হাদীসটিকে সহীহ বলে সাব্যস্ত করেছেন)। (হাফেয আব্দুল আযীম আল্-মুনযেরী, আত-তারগীব ওয়াত তারহীব, (কায়রো: দারুল হাদীস), খ.৩, পৃ.৭০)।

عَنْ عَائِشَةَ أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: مَنْ ظَلَمَ قِيْدَ شِبْرٍ مِنْ الْأَرْضِ طُوقَهُ مِنْ سَبْعِ أَرَضِينَ
"আয়েশা (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, যে ব্যক্তি এক বিঘত পরিমাণ ভূমিও জুলুম করে নেয়, সাত তবক জমিন তার গলায় বেঁধে দেওয়া হবে” (বুখারী ও মুসলিম, প্রাগুক্ত)।

যারা অন্যের জমির আইল ঠেলে, অন্যের জমি অবৈধ দখল করে অথবা রাস্তার ওপর বাসা, দোকান ইত্যাদি নির্মাণ করে অবৈধ উপার্জনের ধান্ধা করে তাদের জন্য এ হাদীসসমূহ কি যথেষ্ট নয়?

রাসূলুল্লাহ (সা) আরও বলেছেন:
مَنْ أَخَذَ مِنْ طَرِيقِ الْمُسْلِمِينَ شِبْرًا جَاءَ بِهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ يَحْمِلُهُ مِنْ سَبْعِ أَرَضِينَ (رواه الطبراني)
"যে ব্যক্তি মুসলিমদের পথ থেকে এক বিঘত জায়গাও দখল করল সে কিয়ামতের দিন সাত তবক জমিন বহন করে উপস্থিত হবে" (বর্ণনা করেছেন তবরানী, আল-কাবীর-এ, প্রাগুক্ত)।

এমনিভাবে অসৎ উপার্জন করে গাড়ি-বাড়ি, বিত্ত-বেভব, প্রভাব-প্রতিপত্তি লাভ করার যে তীব্র আকাঙ্ক্ষা মানুষের মনে জাগে এবং শয়তান এইসব অপকর্মকে আকর্ষণীয় ও লোভনীয় করে সামনে তুলে ধরে এর পরিণতি দুনিয়া ও আখেরাতে ভয়াবহ।

মহান আল্লাহ্ আমাদেরকে সব ধরনের অন্যায় ও অনৈতিক উপার্জন থেকে হেদায়েত করে হালাল রুজি দিয়ে দুঃশ্চিন্তাহীন পবিত্র জীবন যাপনের তৌফিক দিন। আমীন।

টিকাঃ
১. হাফেয আব্দুল আযীম আল্-মুনযেরী, আত-তারগীব ওয়াত তারহীব, খ.৩, পৃ.১৬।

📘 দুর্নীতির পরিণাম ভয়াবহ 📄 তিন. লোভ নিয়ন্ত্রণ

📄 তিন. লোভ নিয়ন্ত্রণ


লোভ মানুষের ফিতরাত বা প্রকৃতিতে জন্মগতভাবেই থাকে। কিন্তু তা যখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় তখন মানুষ লোভের বশবর্তী হয়ে পাপ করে বসে। এই পাপ তাকে আরও বড় পাপের দিকে ধাবিত করে। এর যেন কোন শেষ নেই। কেবল মৃত্যু এসে তার পরিসমাপ্তি ঘটায়। সে জন্য কথায় বলে, “লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু”। কিন্তু মৃত্যুই শেষ নয়। এরপর কবরে, হাশরে, মিজানে, পুলসিরাতে- ঘাটে ঘাটে লাঞ্ছনা এবং অবশেষে জাহান্নামের অগ্নি শিখায় নিক্ষিপ্ত হবে। এ জন্যই আল্লাহ্ তা'আলা মানুষকে এই সব মানসিক রোগ বা কলুষ থেকে পরিশুদ্ধ করার জন্য যুগে যুগে নবী-রাসূল পাঠিয়েছেন। পবিত্র কুরআনে রয়েছে- ইবরাহীম (আ.) আমাদের নবীকে প্রেরণের জন্য এভাবে দু'আ করেছেন-
رَبَّنَا وَابْعَثْ فِيهِمْ رَسُولًا مِنْهُمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِكَ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَيُزَكِّيهِمْ إِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ
"হে আমাদের প্রতিপালক! তাদের মধ্য হতে তাদের নিকট এক রাসূল প্রেরণ করো যে তোমার আয়াতসমূহ তাদের নিকট তিলাওয়াত করবে, তাদেরকে কিতাব ও বিজ্ঞান-হেকমত শিক্ষা দিবে এবং তাদেরকে পবিত্র করবে। তুমি তো পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়” (আল-কুরআন, ২:১২৯)।

এই পবিত্র করার জন্যই রাসূলুল্লাহ (সা) বিভিন্ন রিপু ও প্রবৃত্তি থেকে আত্মাকে পরিশুদ্ধ করার জন্য বহু হাদীস রেখে গেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি হাদীস হচ্ছে, তিনি বলেছেন,
الْحَرِيصُ مَحْرُومٌ “লোভী ব্যক্তি বঞ্চিত হয়”

কত সংক্ষিপ্ত অথচ তাৎপর্যপূর্ণ তাঁর এ বাণী। অতিলোভীরা যে শেষ পর্যন্ত তা ভোগ করতে পারে না বরং বঞ্চিতই থেকে যায় তার ভুরিভুরি প্রমাণ আছে।

পক্ষান্তরে অল্পেতুষ্টি হচ্ছে হতাশাবিহীন সুখী জীবনের চাবিকাঠি। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, الْقَنَاعَةُ غِنَى “অল্পেতুষ্টি হচ্ছে প্রকৃত স্বচ্ছলতা”। তিনি আরও বলেন, لَيْসَ الْغِنَى مِنْ كَثْرَةِ الْعِرْضِ إِنَّمَا الْغِنَى غِنَى النَّفْسِ “অনেক অর্থবিত্ত নয়, মনের ধনীই প্রকৃত ধনী” (হাদীসটি বর্ণনা করেছেন আবু হুরায়রা (রা)। দেখুন, ইমাম কুরতুবী, জামি' বায়ানিল ইলমি ও ফাদলিহ্, খ.২, পৃ.২০।)। কবি বাক্স ইবন 'উয়ায়নাহ বলেন,
كَمْ مِنْ فَقِيْرٍ غَنِيٌّ النَّفْسِ تَعْرِفُهُ وَمِنْ غَنِي فَقِيرُ النَّفْسِ مِسْكِينُ
-কত দরিদ্র অথচ মনের ধনীকে তুমি তো চেন আর কত ধনী-মনের দরিদ্র, মিসকীন যেন।” (ইমাম কুরতুবী, জামি' বায়ানিল 'ইলম ও ফাদলিহ্, খ.২, পৃ.২০১)

কিন্তু মানুষ আরও চায়। এমনকি তার লোভাতুর আচরণ দেখে মনে হয় সে কখনও মরবে না। তার ভোগে কোনদিন ছেদ পড়বে না। মহান আল্লাহ্ বলেন, وَلَتَجِدَنَّهُمْ أَحْرَصَ النَّاسِ عَلَى حَيَاةٍ وَمِنَ الَّذِينَ أَشْرَكُوا يَوَدُّ أَحَدُهُمْ لَوْ يُعَمَّرُ أَلْفَ سَنَةٍ وَمَا هُوَ بِمُزَحْزِ حِهِ مِنَ الْعَذَابِ أَنْ يُعَمَّرَ وَاللَّهُ بَصِيرٌ بِمَا يَعْمَلُونَ "আপনি নিশ্চয়ই তাদের দেখতে পাবেন জীবনের প্রতি সমস্ত মানুষ এমনকি মুশরিকদের চেয়েও বেশি লোভী। তাদের প্রত্যেকে আকাঙ্ক্ষা করে যদি হাজার বছর আয়ু দেওয়া হতো! কিন্তু দীর্ঘায়ু তাকে শাস্তি থেকে দূরে রাখতে পারবে না। তারা যা করে আল্লাহ্ তার দ্রষ্টা” (আল-কুরআন, ২:৯৬)।

এ আয়াতে মানুষের লোভ যে কতদূর ছাড়িয়ে যেতে পারে তা বর্ণনা করা হয়েছে। সত্যিই মানুষ যদি জীবনের ক্ষণস্থায়িত্বের কথা ভাবতো তাহলে অর্থ-বিত্তের এত লোভ করতো না।

এই লোভ থেকে মানুষের মনকে আযাদ করার জন্য আল্লাহ্ তা'আলা এ দুনিয়ার ভোগ-বিলাস যে তুচ্ছ তা বারবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। পার্থিব ধন-সম্পদ অর্জনের প্রতিযোগিতা ছেড়ে আখেরাতে চিরস্থায়ী সুখ লাভের চেষ্টা করার প্রতি আহবান জানিয়েছেন।

মহান আল্লাহ্ আরো বলেন,
اعْلَمُوا أَنَّمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا لَعِبٌ وَلَهُمْ وَزِينَةٌ وَتَفَاخُرٌ بَيْنَكُمْ وَتَكَاثُرُ فِي الْأَمْوَالِ وَالْأَوْلَادِ كَمَثَلِ غَيْثٍ أَعْجَبَ الْكُفَّارَ نَبَاتُهُ ثُمَّ يَهِيجُ فَتَرَاهُ مُصْفَرًّا ثُمَّ يَكُونُ حُطَامًا وَفِي الْآخِرَةِ عَذَابٌ شَدِيدٌ وَمَغْفِرَةٌ مِنَ اللَّهِ وَرِضْوَانٌ وَمَا الْحَيَاةُ الدُّنْইা إِلَّا مَتَاعُ الْغُرُورِ
-তোমরা জেনে রাখ, পার্থিব জীবন তো ক্রীড়া-কৌতুক, জাঁকজমক, পারস্পরিক অহঙ্কার প্রদর্শন, ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে প্রাচুর্য লাভের প্রতিযোগিতা ছাড়া কিছুই নয়। এর উপমা হচ্ছে বৃষ্টি, যা দিয়ে উৎপন্ন শস্য সম্ভার কৃষকদেরকে চমৎকৃত করে। এরপর তা শুকিয়ে যায়, এতে তুমি তা পীতবর্ণে দেখতে পাও। অবশেষে তা খড়-কুটায় পরিণত হয়। পরকালে রয়েছে কঠিন শাস্তি এবং আল্লাহ্ ক্ষমা ও সন্তুষ্টি। পার্থিব জীবন আসলে প্রতারণার সামগ্রী বৈ কিছু নয়” (আল-কুরআন, ৫৭:২০)।

এই আয়াতে একটি উপমার মাধ্যমে এই জীবনের পরিণতি বুঝানো হয়েছে। যাতে মানুষ ক্ষণস্থায়ী জীবনের জন্য লোভের বশবর্তী না হয়। কারণ, লোভ চরিতার্থ করার জন্য অসৎ ও দুর্নীতির পথে পা বাড়াতে হয়। একটি অপরাধ আরও বহু অপরাধ ডেকে আনে। কেবল লোভ সংবরণ করতে পারলে মানুষ বহু পাপ থেকে মুক্ত থাকতে পারে।

আল-কুরআনে মধ্যমমানের জীবন যাপনকে উৎসাহিত করা হয়েছে। আল্লাহ্ তা'আলা বলেন,
وَلَا تَجْعَلْ يَدَكَ مَغْلُولَةً إِلَى عُنُقِكَ وَلَا تَبْسُطُهَا كُلَّ الْبَسْطِ فَتَقْعُدَ مَلُومًا مَحْسُوْرًا "তুমি তোমার হাত তোমার গর্দানে আবদ্ধ করে রেখো না এবং তা সম্পূর্ণ প্রসারিত করো না। তাহলে তুমি তিরস্কৃত ও আফসোসকারী হয়ে পড়বে” (আল-কুরআন, ১৭:২৯)।

মানুষের নফ্স সব সময় লোভের প্রবৃত্তিকে উসকে দেয়। সকল মন্দ কাজে প্ররোচিত করে। আল্লাহ্ বলেন,
إِنَّ النَّفْسَ لَأَمَّارَةٌ بِالسُّوْءِ
"নিশ্চয়ই মানুষের মন মন্দ কর্মে অতিশয় প্ররোচণাদানকারী” (আল-কুরআন, ১২:৫৩)। এই নক্সকে যে পরিশুদ্ধ রাখতে পারে সেই সফল। আল্লাহ্ তা'আলা বলেছেন,
قَدْ أَفْلَحَ مَنْ زَكَّاهَا
"সে-ই সফলকাম যে তার নক্সকে পরিশুদ্ধ করেছে” (আল-কুরআন, ৯২:৯)।

মনকে পরিশুদ্ধ করতে হলে, বিশেষ করে নির্লোভ, নির্মোহ থাকতে হলে বিত্ত-বেভবের প্রতিযোগিতা ত্যাগ করতে হবে। প্রাভাব-প্রতিপত্তি, যশ-খ্যাতির পেছনে ছুটা বন্ধ করতে হবে। এমনকি অভাবের সময়ও পরস্ব অপহরণ থেকে নিজেকে সংবরণ করতে হবে। এটিই হচ্ছে সবর। মহান আল্লাহ্ বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اصْبِرُوا وَصَابِرُوا وَرَابِطُوا وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
"হে ঈমানদারগণ! তোমরা ধৈর্য ধারণ কর, ধৈর্যে প্রতিযোগিতা কর এবং সদা সংঘবদ্ধ থাক, আল্লাহকে ভয় কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার" (আল-কুরআন, ৩:২০০)।

প্রকৃতপক্ষে, সফলকাম হতে হলে ধৈর্য ধারণ করতে হয়। উন্নতির প্রতিটি সিঁড়িতে পা রেখে উপরে উঠতে হয়। কিন্তু অনেকের এ ধৈর্যটুকু নেই। সে চায় অন্যকে ঠকিয়ে, দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে অতি সত্ত্বর নিজের লোভ ও উচ্চাকাঙ্খা চরিতার্থ করতে। তখনই সামাজিক ভারসাম্যহীনতা দেখা দেয়। ব্যক্তি তার চরিত্র হারায়। লোভ তাকে সীমাহীন লক্ষ্যের দিকে ধাবিত করতে থাকে। হঠাৎ একদিন কোন আইন-শৃঙ্খলার দড়িতে বাঁধা পড়ে যায় অথবা কোন বিপর্যয় বা মৃত্যু এসে তাকে থামিয়ে দেয়।

কিন্তু মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি হচ্ছে ধন-দৌলতের প্রতিযোগিতা করা। মহান আল্লাহ্ এর কুফল বর্ণনা করেন, أَلْهَاكُمُ التَّكَاثُرُ "প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা তোমাদের মোহাচ্ছন্ন করে রাখে” (আল-কুরআন, ১০২:১)। মহান আল্লাহ্ আরও বলেন,
وَتُحِبُّونَ الْمَالَ حُبًّا جَمَّا "আর তোমরা ধন-সম্পদ অতিশয় ভালবাস" (আল-কুরআন, ৮৯:২০)।

এই মাল-দৌলত বিপর্যয়ের কারণ হয়। মহান আল্লাহ্ বলেন,
إِنَّمَا أَمْوَالُكُمْ وَأَوْلَادُكُمْ فِتْنَةٌ وَاللَّهُ عِنْدَهُ أَجْرٌ عَظِيمٌ
"তোমাদের সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তো পরীক্ষা বিশেষ, আর আল্লাহ্, তারই নিকট রয়েছে মহাপুরস্কার" (আল-কুরআন, ৬৪:১৫)।

সন্তানের সুখের জন্য যারা সাধ্যাতীত প্রচেষ্টায় রত হয় এবং অনৈতিকভাবে উপার্জন করে তারা তাদের আখেরাতকে বরবাদ করে ফেলে। অসৎ উপার্জনের মাধ্যমে লোভ ও উচ্চাকাঙ্খা চরিতার্থ করার এই প্রাণপণ চেষ্টা আখেরে বিফলে যায়।

আজ আমাদের সমাজে দেখা যায়, কেউ কোন পদে অধিষ্ঠিত হলেই জনগণের অর্থ আত্মসাৎ করার নানা ফন্দি করে থাকে। বহু ক্ষেত্রে তা দেখা গেছে। যদিও সৎলোকও রয়েছেন। তবে এই লোভ তাদেরকে সেবক এর বদলে শোষকে পরিণত করে। অথচ আমাদের মহান সাহাবীদের জীবনী পড়লে দেখা যায় তারা শাসনকর্তা হয়েও খুবই সামান্য সুবিধা নিতেন।

এ প্রসঙ্গে দু'টি উদাহরণ পেশ করি,
'ইতাব ইবন উসায়দ (রা) কে রাসূলুল্লাহ (সা) মক্কার গভর্ণর নিযুক্ত করেছিলেন। খলীফা আবু বকর (রা) ও তাঁকে ওই পদে বহাল রাখেন। রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁকে প্রতিদিন ভাতা হিসেবে দু' দিরহাম বরাদ্দ করেছিলেন। তিনি এতেই সন্তুষ্ট ছিলেন। তিনি বলতেন, যে পেট দু' দিরহাম দিয়ে পূর্ণ হয় না, আল্লাহ্ সে পেটকে যেন পরিপূর্ণ না করেন।

খলীফা উমার (রা) মাদায়েন এর গভর্ণর হিসেবে হুজাইফা (রা) কে নিয়োগ করলে তিনি সেখানে গিয়ে আদেশনামা পড়ে শোনান। এতে তার বেতন-ভাতার কথা উল্লেখ না থাকায় জনতা বললো, আমরা আপনার প্রয়োজন মেটাব। উত্তরে তিনি বলেছিলেন, "আমার নিজের পেটের জন্য খাদ্য চাই। আমার গাধার জন্য আহার চাই। যতদিন আমি এখানে থাকি এর চেয়ে বেশি কিছু আমাকে দিতে হবে না।"

একবার তিনি পানি চাইলে একজন ধনী ব্যক্তি তাকে রূপার পাত্রে পানি দিলো। তিনি পাত্রটি ছুঁড়ে মারেন। কারণ, ইসলামে সোনা-রূপার পাত্রে পানাহার নিষেধ।

সত্যিই, আমরা যদি অল্পে তুষ্ট থাকি, কমপক্ষে কাউকে ঠকিয়ে বাড়তি সুবিধা নিতে চেষ্টা না করি এবং লোভকে নিয়ন্ত্রণে রাখি তাহলে নিশ্চয়ই আমরা দুনিয়া ও আখিরাতে সুখী হব। আল্লাহ্ তা'আলা আমাদেরকে লোভ-লালসার উর্ধ্বে উঠে সৎ জীবন যাপন করার তৌফিক দিন।

📘 দুর্নীতির পরিণাম ভয়াবহ 📄 চার. ঘুষ

📄 চার. ঘুষ


ক্ষমতার অপব্যবহারের আরেক নাম ঘুষ। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল পদে থেকে অবৈধ অর্থ গ্রহণের মাধ্যমে এক জনের হক অপর কাউকে দিয়ে দেওয়াই হচ্ছে ঘুষ। এই ঘুষ যারা দেয় তারাও সমান অপরাধী। বেআইনী সুবিধা পাওয়ার জন্য যারা কর্তাব্যক্তিদেরকে বিভিন্ন সুবিধা বা টাকা পয়সা দিয়ে প্রভাবিত করতে চেষ্টা করে তারাও এই অপরাধ সংঘটনের অন্যতম শরীক। যারা ঘুষকে অঘোষিত একটি সিস্টেম হিসেবে প্রশ্রয় দেয় তারাও অপরাধী। দেখা যায় মাঝে মধ্যে "বেড়ায় খেত খায়", রক্ষকই হয় ভক্ষক। যারা ন্যায়কে লালন করবে তারাই অন্যায়কে ধারণ করে। এভাবে দুর্নীতির ডালপালা বিস্তার হয়। বিচারের বাণী নিরবে নিভৃতে কাঁদে।

ঘুষ বা উৎকোচ আসে উপহারের রূপ ধরে। একবার এক গভর্ণরকে হযরত উমার (রা) বলেছিলেন- তুমি যে বললে এগুলো বায়তুল মালের আর এগুলো আমার উপহার। তুমি এই পদ ছেড়ে বাপের ঘরে বসে থাক, দেখ তো কে তোমার জন্য উপহার নিয়ে আসে?" প্রাজ্ঞ প্রশাসক উমার (রা) এর সত্য-মিথ্যার পার্থক্য করার জ্ঞান ও সাহসের জন্য তাঁকে উপাধি দেওয়া হয়েছিল "আল্-ফারূক"। কবি ফররুখ আহমদ বলেছেন,

আজকে উমর-পন্থী পথিক দিকে দিকে প্রয়োজন
পিঠে বোঝা নিয়ে পাড়ি দেবে যারা প্রান্তর প্রাণপন।

কিন্তু হায়! এখন মুসলিম অধ্যুষিত বাংলাদেশের এই সমাজের চিত্র দেখলে মনে হতে পারে ইসলামের শিক্ষার প্রতিফলন কোথায়? এ জন্যেই কবি নজরুল বলেছেন-

ইসলাম সে তো পরশ মানিক তারে কে পেয়েছে খুঁজি
পরশে তাহার ধন্য যারা তাদেরই মোরা বুঝি।

ইসলামের পরশ আমাদের মন-মনন ও অনুভবে পৌঁছেনি বলেই আজ আমরা ঘুষকে উপহার ভাবি। অফিসের ফাইল স্পিড-মানি না পেলে সামনে চলে না। সার্বিকভাবে জাতীয় উন্নতি ব্যাহত হয়। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে মেধাহীনদের রাজত্ব চলে। ঘুষ দিয়ে যে চাকরি পেতে হয় সেই চাকরিকে সেবা মনে করার কোন কারণ নেই। আর তাই ঘুষ দিয়ে শিক্ষকের চাকরি পাওয়া লোকটির কাছে তার ছাত্র মনুষ্যত্ব শিক্ষা লাভ করবে এটা আশা করা যায় না।

এই ঘুষের লাইনে পাকা দড়িবাজরা তরতর করে উপরে উঠে যাচ্ছে দেখে সৎ লোকেরা মাঝে মাঝে ভাবে, তবে কি সততার কোন দাম নেই। এটা কি বোকামি? কিন্তু তিক্ত ফলের চারা লাগিয়ে যেমন সুমিষ্ট ফলের আশা করা যায় না তেমনি দুর্নীতির মাধ্যমে গড়ে উঠা সিস্টেমের কাছে কোন কল্যাণ আশা করা যায় না। তাই ঘুষ সম্পর্কে মহান আল্লাহ্ বলেন,

فَبَدَّلَ الَّذِينَ ظَلَمُوا قَوْلًا غَيْرَ الَّذِي قِيلَ لَهُمْ فَأَنْزَلْنَا عَلَى الَّذِينَ ظَلَمُوا رِجْزًا مِنَ السَّمَاءِ بِمَا كَانُوا يَفْسُقُونَ
"এরপর যালিমরা বদলে দিল যা তাদের বলা হয়েছিল। তার পরিবর্তে অন্য কথা। এ কারণে যারা যুলম করল তাদের উপর নাযিল করলাম আকাশ থেকে এক মহাশাস্তি। কারণ, তারা অধর্ম-অন্যায় কাজ করছিলো” (আল-কুরআন, ২:৫৯)।

এ আয়াতে সত্যকে বদলে দেওয়ার শাস্তির উল্লেখ আছে। ঘুষও সত্যকে বদলে দেয়। পাশকে ফেল দেখিয়ে দেয়। একজনের প্রাপ্য অধিকার বদলে দিয়ে অন্যকে অন্যায়ভাবে দেওয়া হয়।

অতীত যামানায় যারা ঘুষ খেয়ে, দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে ধর্মের বাণীতে জালিয়াতি করত তাদের সম্পর্কে আল-কুরআনে বলা হয়েছে:

فَوَيْلٌ لِلَّذِينَ يَكْتُبُونَ الْكِتَابَ بِأَيْدِيهِمْ ثُمَّ يَقُولُونَ هُذَا مِنْ عِنْدِ اللَّهِ لِيَشْتَرُوا بِهِ ثَمَنًا قَلِيلًا فَوَيْلٌ لَّهُمْ مِمَّا كَتَبَتْ أَيْدِيهِمْ وَوَيْلٌ لَّهُمْ مِمَّا يَكْسِبُونَ
"সুতরাং দুর্ভোগ তাদের জন্য যারা নিজ হাতে কিতাব রচনা করে এবং তুচ্ছ মূল্য প্রাপ্তির জন্য বলে- এটি আল্লাহ্র নিকট হতে এসেছে। তাদের হাত যা রচনা করেছে তার জন্য শাস্তি তাদের এবং যা তারা উপার্জন করে তার জন্য শাস্তি তাদের" (আল-কুরআন, ২:৭৯)।

তুচ্ছমূল্য হচ্ছে ঘুষ। যদিও ঘুষখোর এটাকে তুচ্ছ মনে করে না। আয়াতে ঘুষ খেয়ে ধর্মের বাণী বদলে দেওয়ার কথা বলা হলেও সকল জালিয়াতির জন্যই শাস্তি প্রযোজ্য।

ঘুষ সব সময় টাকা-পয়সা হয় না। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নানান বস্তু ও বিষয় হতে পারে। এ জন্যই হাদীসের ভাষায় এটিকে বলে "রিশওয়াহ (رشوة)" বা দড়ি। দড়ি দিয়ে কূপের ভেতর থেকে বালতি টেনে উঠাবার মত ঘুষ অন্যের হক নিজের ঘরে নিয়ে আসে। এজন্য এই প্রক্রিয়ায় তিনটি পক্ষ থাকে। (১) রাশী (রাশি) যে ঘুষ প্রদান করে, (২) মুরতাশী (مرতশি) যে ঘুষ গ্রহণ করে এবং (৩) রায়েশ (رائش) যে অনুঘটক হয়ে কাজ করে। আল্লামা সান'আনী তার বিখ্যাত গ্রন্থ 'সুবুলুস সালাম শারহু বুলূগিল মুরাম' গ্রন্থে বলেন- "রায়েশ” বা ঘুষের ঘটক হচ্ছে ওই ব্যক্তি যে ঘুষখোর ও ঘুষদাতার মধ্যে দূতিয়ালী করে থাকে” (সুবুলুস সালাম, খ.৪, পৃ.১২৪)। তবে যেহেতু মূলপক্ষ হচ্ছে দুটি: যে ঘুষ দেয় ও যে ঘুষ খায়। তাই রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,

الرَّاشِي وَالْمُرْتَشِي فِي النَّارِ "ঘুষ প্রদানকারী ও ঘুষ গ্রহণকারী দু'জনই জাহান্নামে যাবে”। (তারগীব গ্রন্থে হাদীসটি বর্ণনা করেন আবু সালামাহ ইবন আব্দুর রহমান)। 'আব্দুল্লাহ ইবন 'উমার (রা) বর্ণনা করেন যে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন:

لَعْنَةُ اللَّهِ عَلَى الرَّاشِي وَالْمُرْتَشِيْ "ঘুষদাতা ও গ্রহীতা উভয়ের ওপর আল্লাহ্র লা'নত"। (ইবন হিবরান)

عَنْ ثَوْبَانَ قَالَ : لَعَنَ رَسُولُ اللهِ الرَّاشِيَ، وَالْمُرْتَشِيَ، وَالرَّائِشَ، يَعْنِي الَّذِي يَمْشِي بَيْنَهُمَا "ছাওবান (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা) অভিশাপ দিয়েছেন ঘুষদাতা, গ্রহীতা ও উভয়ের মধ্যে যে দালালী করে বেড়ায়” (মুসনাদ ইমাম আহমাদ ও তাবরানী)

ইমাম তাবারানী তার আল-মু'জাম আস্-সগীর গ্রন্থে একটি হাদীস সংকলন করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন:

الرِّشْوَةُ فِي الْحُكْمِ كُفْرٌ وَهِيَ بَيْنَ النَّاسِ سُحْتْ "রিশওয়াহ বিচারের ক্ষেত্রে কুফরি। লোকেরা নিজেদের মধ্যে এ কাজ করা সুত্ব"। আগেই বলা হয়েছে রিশওয়াহ অর্থ ঘুষ। তাহলে "সুহ্ত” অর্থ কি? এ প্রশ্নের উত্তর পাই রাসূলুল্লাহ (সা) এর একটি হাদীসে:

كُلُّ لَحْمٍ أَنْبَتَتْهُ السُّحْتُ فَالنَّارُ أَوْلى بِهِ ، قِيلَ مَا السُّحْتُ؟ قَالَ الرِّشْوَةُ فِي الْحَكَمِ "যে গোশত উদগত হয়েছে "সুহত” থেকে তার জন্য জাহান্নামের আগুনই বেশী উপযোগী। একজন জিজ্ঞেস করলো, সুত্ব কী? তিনি বললেন, বিচার বা শাসনকার্যে ঘুষ গ্রহণ” (কানযুল 'উম্মাল, খ.৩।

তাহলে দেখা যায় যে, ঘুষের অর্থে যে নিজে পানাহার করে এবং তার পোষ্যদের পানাহার করায় সকলের জন্যই তা খুবই মন্দ কাজ। এই ঘুষ-লালিত দেহের ইবাদত আল্লাহ্ কবুল তো করবেনই না বরং তাদের জন্য লাঞ্ছনা, আখেরাতে আগুন অপেক্ষা করছে।

ইহুদীদের দুর্গতির কারণ হিসেবে আল্লাহ্ তা'আলা বলেন, سَمَّاعُونَ لِلْكَذِبِ أَكَالُونَ لِلسُّحْتِ
"তারা মিথ্যা শ্রবণে অত্যন্ত আগ্রহশীল এবং অবৈধ (ঘুষ) ভক্ষণে অত্যন্ত আসক্ত” (আল-কুরআন, ৫:৪২)।

অপর একটি আয়াতে আল্লাহ্ তা'আলা বলেন, وَتَرَى كَثِيرًا مِنْهُمْ يُসَارِعُونَ فِي الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ وَأَكْلِهِمُ السُّحْتَ لَبِئْسَ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ
“(হে নবী!) আপনি (আহলে কিতাবদের) অনেককেই দেখবেন পাপে, সীমালংঘনে ও অবৈধ ভক্ষণে (ঘুষ খাওয়াতে) তৎপর। তারা যা করে নিশ্চয় তা নিকৃষ্ট” (আল-কুরআন, ৫:৬২)।

আয়াতে অবৈধ ভক্ষণ তরজমা করা হলেও কোন হাদীসে এই সুহ্‌ত বা অবৈধ আয়কে ঘুষ হিসেবে তাফসীর করে দেওয়া হয়েছে। তবে সকল প্রকার দুর্নীতির মাধ্যমে উপার্জিত আয়ও এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।

এই ঘুষের বিষয়টি পবিত্র কুরআনের একটি আয়াতে স্পষ্টতই এসেছে। বিচারের রায়কে প্রভাবিত করা এবং প্রশাসকদেরকে নিরপেক্ষতা ও ন্যায়নিষ্ঠতা থেকে বিচ্যুত করাই যে ঘুষের মূখ্য উদ্দেশ্য হয়ে থাকে তা প্রতিফলিত হয়েছে এই আয়াতে: وَلَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُمْ بَيْنَكُمْ بِالْبَاطِلِ وَتُدْلُوا بِهَا إِلَى الْحُكَّامِ لِتَأْكُلُوا فَرِيقًا مِنْ أَمْوَالِ النَّاسِ بِالْإِثْمِ وَأَنْتُمْ تَعْلَمُونَ
"তোমরা নিজেদের মধ্যে একে অন্যের অর্থ-সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না এবং মানুষের ধন-সম্পত্তির কিছু অংশ জেনে শুনে অন্যায়ভাবে গ্রাস করার উদ্দেশ্যে তা বিচারকদের বা প্রশাসকদের কাছে পেশ করো না" (আল-কুরআন, ২:১৮৮)।

এ আয়াতে হুক্কাম অর্থ শাসকগণ, প্রশাসকগণ, বিচারকগণ হতে পারে। আরবী ভাষায় হাকিম বা বহুবচনে হুক্কাম শব্দটি এইসব অর্থে সমভাবে ব্যবহৃত। এখানে বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের কথা বুঝানো হয়েছে যাদের সিদ্ধান্তে একজনের সম্পদে অন্য কেউ অন্যায়ভাবে ভাগ বসাতে পারে। উপর্যুক্ত আয়াতে وَتُدْلُوا بِهَا শব্দটি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। এর অর্থ হচ্ছে বালতি কূপে ফেলে তা টেনে উঠানো। ঠিক যেমনি ঘুষের রশিতে নিজের আরাধ্য বস্তু টেনে আনা হয়। এটি রূপক অর্থে এসেছে।

এ জন্যই আল্লামা আলুসী তার তাফসীর 'রুহুল মা'আনী'তে বলেন: أَيْ وَلَا تُلْقُوْا بَعْضَهَا إِلَى الْحُكَامِ السَّوْءِ عَلَى وَجْهِ الرَّشْوَةِ "অর্থাৎ তোমাদের সম্পদের কিছু অংশ অসাধু বিচারক বা প্রশাসকদেরকে ঘুষ হিসেবে দিও না।"

তাফসীরে মাদারেকেও এ আয়াতে وَتُدْلُوا بِهَا শব্দ দ্বারা ঘুষ বা রিশওয়াহ বুঝানো হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে (খ.১, পৃ.৭৬)। এতে প্রমাণিত হলো যে, পবিত্র কুরআনে ঘুষের বিরুদ্ধে স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

আজ আমাদের দেশ দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে তালিকার প্রথম দিকে রয়েছে। এই দুর্নীতির নানা রকম ফের রয়েছে। তবে ঘুষ হচ্ছে প্রধান ও সবচেয়ে ব্যাপক দুর্নীতি। ঘুষের এই ব্যাপকতা কেবল আখেরাতের জন্যই ভয়াবহ নয়; বরং আমাদের এই সামাজিক জীবনেও দুর্ভোগের কারণ। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: وَمَا مِنْ قَوْمِ يَظْهَرْ فِيهِمُ الرَّشَاءُ إِلَّا أُخِذُوا بِالرَّعْبِ “যে জাতির মধ্যে ঘুষ মহামারির মত দেখা দেয় তাদের মধ্যে ভীতি সঞ্চারিত হয়ে তাদেরকে পরাজিত করে ফেলে।"

ঘুষের বিষয়টি এখন ওপেন সিক্রেট। বাসে, লঞ্চে, পথে-ঘাটে মানুষ ঘুষের আলাপ করছে। পাশের লোকেরা শুনেও কোন প্রতিক্রিয়া বোধ করছে না। এ রকম অবস্থার কারণেই আমরা জাতি হিসেবে ক্রমশ অন্তসারশূন্য হয়ে পড়ছি এবং ভবিষ্যতের অজানা আশঙ্কায় অথবা দ্রব্যমূল্য অথবা সন্ত্রাসের আরও প্রকোপ দেখে এক বিরাট ভয় আমাদেরকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। কিন্তু ধর্মের বাণী আজ আমাদের জীবনে বাস্তব রূপধরে আসলেও ধর্মাচার করার প্রতি আমাদের আগ্রহ নেই। এ হচ্ছে এক ভয়াবহ অবস্থা।

ঘুষ আমাদের জাতীয় উন্নয়নকে ব্যাহত করছে। ঘুষের কারণে মানুষ যোগ্যতার মূল্যায়ন করছে না। ঘুষের চিন্তায় যখন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাথা ঘুরতে থাকে তখন হাতের কলম সিরাতুল মুস্তাকীমে চলে না। ঘুষ হচ্ছে সমাজদেহে নীরব মরণ-ব্যাধি। সকল নীতি-নৈতিকতা, সমস্ত আইন-কানুন, বিধি-বিধানকে বিধ্বস্ত করে দেওয়ার জন্য এই ভিলেনই দায়ী। এ হচ্ছে এক মরণ-ভাইরাস যা আমাদের সমাজের সকল প্রোগ্রামকে নাস্তানাবুদ করে দিচ্ছে। এই অভিশাপ থেকে মুক্ত হতে না পারলে কোন জাতির সামনে ভবিষ্যতের কোন সুখবর থাকবে না।

তাই আসুন! আমরা তাওবা করে ঘুষকে পরিত্যাগ করি, এর বিরুদ্ধাচারণ করি। একে ঘৃণা করি, একে প্রতিরোধ করি।।

ফন্ট সাইজ
15px
17px