📄 ৭. আল্লাহ ﷻ-র সন্তুষ্টিকে প্রাধান্য দেওয়া
নিজের নফস ও প্রবৃত্তি যা চায়, তার বিপরীতে আল্লাহর সন্তুষ্টিকে প্রাধান্য দেওয়া।
ইবনে রজব বলেন, আমাদের পূর্বসূরিদের কোনো কোনো কিতাবে আছে- যে ব্যক্তি আল্লাহকে মহব্বত করে, তার কাছে আল্লাহর সন্তুষ্টির চেয়ে অধিক প্রিয় আর কোনো কিছু হতে পারে না। আর যে ব্যক্তি দুনিয়াকে ভালোবাসে, তার কাছে স্বীয় নফস ও প্রবৃত্তির অনুসরণ থেকে অধিক প্রিয় আর কোনো কিছুই হতে পারে না।
ইবনে আবিদ-দুনিয়া স্বীয় সনদে হাসান রহ. থেকে বর্ণনা করেন, হাসান বলেছেন, আমি আমার চোখ দিয়ে কোনোকিছু দেখিনি, আমার জবান দিয়ে কোনোকিছু বলিনি, আমার হাত দিয়ে কোনোকিছু ধরিনি এবং আমি আমার পা দিয়ে কোনোকিছু মাড়ায়নি, যতক্ষণ না আমি চিন্তা করে দেখেছি তাতে কি আল্লাহর আনুগত্য রয়েছে না তাঁর নাফরমানি! যদি তাতে তাঁর আনুগত্য থাকত, তা হলে আমি অগ্রসর হতাম। আর যদি নাফরমানি ও অবাধ্যতা থাকত, তা হলে আমি তা থেকে বিরত থাকতাম। [কালিমাতুল ইখলাস : ৩৫]
আবু হুরায়রাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন-
يَقُولُ اللَّهُ سُبْحَانَهُ يَا ابْنَ آدَمَ تَفَرَّغْ لِعِبَادَتِي أَمْلَأْ صَدْرَكَ غِنًى وَأَسُدَّ فَقْرَكَ وَإِنْ لَمْ تَفْعَلْ مَلَأْتُ صَدْرَكَ شُغْلًا وَلَمْ أَسُدَّ فَقْرَكَ.
মহাপবিত্র আল্লাহ বলেন, হে আদম সন্তান! আমার ইবাদতে মগ্ন হও। আমি তোমার অন্তরকে ঐশ্বর্যমণ্ডিত করে দেব এবং দারিদ্র্যকে দূর করে দেব। আর যদি তুমি তা না কর, তা হলে আমি তোমার অন্তর কর্মব্যস্ততা [ও পেরেশানি] দিয়ে পূর্ণ করে দেব এবং তোমার দারিদ্র্যকে দূর করব না। [সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ৪১০৭, সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ২৪৬৬, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ৮৬৬৬]
📄 ৮. জান্নাতের নেয়ামত নিয়ে ভাবা
ইবনে রজব বলেন, [সাহল ইবনে সা'দ —র সূত্রে বর্ণিত হাদীসে] নবীজি ইরশাদ করেছেন—
اَللَّهُمَّ لَا عَيْشَ إِلَّا عَيْشُ الْآخِرَةِ
হে আল্লাহ! আখিরাতের জীবনই একমাত্র জীবন। [তাবরানী, হাদীস নং ৪৮৯১]
কারণ, বনী আদমকে সৃষ্টি করা হয়েছে দেহ ও আত্মার সমন্বয়ে। দেহ ও আত্মা প্রত্যেকটি এমন জিনিসের প্রতি মুখাপেক্ষী, যা দ্বারা সে বেঁচে থাকবে এবং শক্তি সঞ্চয় করবে। আর এটাই হচ্ছে তার খাদ্য ও জীবিকা। সুতরাং, দেহের জীবিকা হচ্ছে খাদ্য, পানীয়, বিবাহ-শাদি, পোশাক-পরিচ্ছদ, সুগন্ধি ইত্যাদি আর অন্যান্য ইন্দ্রিয় সুখানুভূতি। দৈহিক দিক বিবেচনায় এ সকল গুণের ক্ষেত্রে জীবজন্তুর সাথে মানুষের ঘনিষ্ঠ সামঞ্জস্য রয়েছে। অপরদিকে মানুষের রুহ খুবই সূক্ষ্ম জিনিস এবং বিষয়টি পুরোপুরিই আত্মিক; যা ফেরেশতাদের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। সুতরাং, এর শান্তি, সুখ, আনন্দ ও প্রফুল্লতা এর সৃষ্টিকর্তা, পালনকারী ও পরিচালনাকারীর মারিফাত ও পরিচর্যালাভের মধ্যে নিহিত; তাঁর মহব্বত, আনুগত্য, যিকির-স্মরণ, তাঁর সাথে সম্পর্ক কায়েম ও তাঁর সংগে সাক্ষাতের আগ্রহ ইত্যাদিসহ যেসকল আমল তাঁর নৈকট্য হাসিলে সহায়ক, সেসবের মাঝে নিহিত। এ-ই হচ্ছে আত্মার জীবিকা ও শক্তির উৎস। আত্মা যখনই এসব থেকে বঞ্চিত হয়, তখনই সে অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং হালাক হয়ে যায়। মানুষের দেহ যেমন খাদ্য- পানীয় ইত্যাদির অভাবে অসুস্থ ও হালাক হয়ে যায়, উপরোক্ত বিষয়গুলোর অভাবে মানুষের আত্মা তার চেয়েও বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং এক পর্যায়ে ধ্বংস হয়ে যায়।
এ জন্যই অনেক ধনী ও সম্পদশালী লোককে দেখা যায়, দেহকে তার প্রয়োজনীয় খাদ্য-পানীয় ও আরাম-আয়েশের পর্যাপ্ত উপকরণ সরবরাহ করা সত্ত্বেও অন্তরে দুঃখ-বেদনা ও অশান্তি অনুভব করে। এ পর্যায়ে নির্দেশনা মনে করে তার খাদ্য-পানীয় ও আরাম-আয়েশের উপকরণ বাড়িয়ে দিলে তার অন্তরের সেই দুঃখ-বেদনা ও অশান্তি দূর হয়ে যাবে। আবার কেউ কেউ মনে করে, নেশা খেয়ে মাতাল হলে এসব দূর হয়ে যাবে। অথচ এ সবই দুঃখ-বেদনা ও অশান্তি দূর করার পরিবর্তে উত্তরোত্তর বৃদ্ধিই করে যায়; তার অসুস্থতা গভীর থেকে গভীরতরই হতে থাকে। কেননা, আত্মা তো তার জীবিকা ও শক্তির উৎস হারিয়ে ফেলেছে। ফলে সে অসুস্থ ও যন্ত্রণাকাতর হয়ে পড়েছে। [‘হাদীসে লাব্বাইক’ এর ব্যাখ্যা: ৫৮]
📄 ৯. দুই সুখ একত্র হয় না
অন্তরে দৃঢ়ভাবে এই বিশ্বাস লালন করতে হবে যে, দুনিয়ার আরাম- আয়েশ ও আখেরাতের আরাম-আয়েশ একত্র করা অত্যন্ত কঠিন। সুতরাং, আখেরাতের জীবনকেই প্রাধান্য দিতে হবে দুনিয়ার জীবনের উপর।
ইবনে রজব বলেন, জেনে রাখা উচিত, দুনিয়ার জীবনে উভয় জগতের জীবন একত্র করা সম্ভব নয়। সুতরাং, যে ব্যক্তি তার আত্মা ও অন্তরের জীবন নিয়ে লিপ্ত হয় এবং তা থেকে বড় একটি অংশ হাসিল হয়ে যায়, সে তার দেহ ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গের আরাম-আয়েশ থেকে গাফেল হয়ে যায়। সে তার দেহ ও শরীরের সব চাহিদা পূরণ করতে পারে না। তার দ্বারা তার মানবিক সব চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হয় না। কেবল যতটুকু প্রয়োজন ততটুকুই পূরণ করতে পারে। এতে করে তার দৈহিক জীবন ও শারীরিক চাহিদা পূরণে কিছুটা ক্ষতি হতে পারে। নবী-রাসূলগণ ও তাঁদের অনুসারীদের জীবন এমনই ছিল। আল্লাহ তাআলা তাঁদের দৈহিক জীবনের সুখোপকরণগুলো কমিয়ে দিতেই পছন্দ করেছেন। তবে তাঁদের অন্তর ও আত্মিক জীবনের সুখোপকরণগুলো দিয়েছেন যথেষ্ট পরিমাণে।
সাহল আত-তাসতুরী বলেন, আল্লাহ তাঁর কোনো বান্দাকে যে পরিমাণ নিজের নৈকট্য ও মা’রিফাত দান করেন, সেই পরিমাণ দুনিয়া তার থেকে কমিয়ে দেন। দুনিয়া তার যে পরিমাণ লাভ হয়, সেই পরিমাণ মা’রিফাত ও নৈকট্য কমিয়ে দেন। [‘হাদীসে লাব্বাইক’ এর ব্যাখ্যা: ৬২]
📄 ১০. দুনিয়ার ত্বরিত ধ্বংস নিয়ে ভাবা
দুনিয়া স্থায়ী নয়, দুনিয়া ক্ষণস্থায়ী, দুনিয়া অতি দ্রুতই ধ্বংস হয়ে যাবে- এ বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা ও ফিকির করা।
ইবনুল কাইয়্যিম বলেন, দুনিয়াদারদের উপমা হল ওই সম্প্রদায়ের মতো যারা একটি নৌকায় আরোহণ করল। নৌকাটি তাদের নিয়ে একটি দ্বীপের কিনারে ভিড়ল। মাঝি সকলকে দ্বীপে অবতরণ করে প্রাকৃতিক প্রয়োজন ও অন্যান্য জরুরি কাজ সেরে নিতে বলল। অবতরণের সময় মাঝি সকলকে বেশি দেরি না করার কথা বলে দিল। এমনকি দেরি করলে নৌকা হারাবার কথাও স্মরণ করিয়ে দিল।
যাত্রীরা সকলে নেমে দ্বীপের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ল। তাদের কেউ কেউ দ্রুত নিজেদের প্রয়োজন সেরে নৌকায় ফিরে এল। তারা ফিরে এসে দেখল নৌকা পুরোটাই ফাঁকা ও খালি। তাই তারা বসার জন্য প্রশস্ত স্থান ও মনোরম আসন পেল। আবার কেউ কেউ প্রয়োজন সারার পরও কিছু সময় দ্বীপে অবস্থান করল। এ সময় তারা দ্বীপের বিভিন্ন ফল-ফুল ও সৌন্দর্য উপভোগ করল। সুন্দর সুন্দর পাথরের দৃশ্য ও পাখিদের গান উপভোগ করল। অতঃপর হঠাৎই তাদের মনে পড়ে গেল নৌকায় ফিরে যাওয়ার কথা। মনে পড়ে গেল দেরি করলে নৌকা হারাতে হবে; নৌকা তাদের রেখে চলে যাবে। বিধায় তারা দ্রুত নৌকায় প্রত্যাবর্তন করল। কিন্তু সেখানে পৌঁছে তারা নিজেদের জন্য সংকীর্ণ জায়গা পেল এবং সেখানেই বসে পড়ল।
আর কেউ কেউ দ্বীপের ফল-ফুলের সৌন্দর্য ও সুন্দর সুন্দর পাথরের উপর আসক্ত হয়ে পড়ল। ফলে তারা সেখান থেকে কিছু পাথর ও ফুল বহন করে নিয়ে এল। যখন তারা নৌকায় ফিরে এল, তখন তারা এতটাই সংকীর্ণ জায়গা পেল, যাতে নিজেরাই বসতে পারবে না, পাথর ও ফুল রাখা তো পরের কথা। ফলে ফুল-পাথরগুলো বহন করে নিয়ে আসাটা তাদের জন্য এক ধরনের শাস্তি ও বিপদের কারণ হয়ে দেখা দিল। আবার এগুলোতে লজ্জার কারণে ফেলেও দিতে পারছে না। তাই বাধ্য হয়ে সেগুলো নিজেদের কাঁধে বহন করল এবং এগুলো আনার কারণে লজ্জিত হতে লাগল। কিন্তু তাদের লজ্জা তাদের কোনো উপকার করল না। কিছু সময় পর ফুলগুলো পচে নষ্ট হয়ে গেল। সেগুলোর রঙও বদলে গেল। দুর্গন্ধ বের হয়ে অন্যদের কষ্টের কারণ হলো।
আর কেউ কেউ দ্বীপের সৌন্দর্য ও মনোরম দৃশ্যে একেবারেই ডুবে গেল। তারা নৌকার কথা বেমালুম ভুলে গেল। দ্বীপের সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে এক সময় অনেক দূরে চলে গেল। এমনকি নৌকা ছেড়ে চলে যাওয়ার সময় মাঝি যখন উচ্চ সুরে ডাক দিল, তখন তারা আনন্দ-বিনোদন ও উপভোগে লিপ্ত থাকার ফলে মাঝির ডাক তাদের কানে পড়ল না। বরং তারা কখনও গাছ থেকে ফল পারছে, কখনও ফুলের ঘ্রাণ নিচ্ছে, কখনও গাছগাছালির সৌন্দর্যে মুগ্ধ ও আশ্চর্যান্বিত হচ্ছে। এক পর্যায়ে তারা এই ভয়ও করতে লাগল— কোনো হিংস্র প্রাণী না আবার কোথাও থেকে বেরিয়ে এসে তাদের উপর আক্রমণ করে বসে, কোনো কাঁটাদার গাছের কাঁটা লেগে না আবার তাদের কাপড়-চোপড় ছিঁড়ে যায় কিংবা তাদের পায়ে বিঁধে যায় অথবা কোনো কাঁটাদার গাছের শাখায় তাদের শরীর জখম হয়ে যায়! [ইদ্দাতুস সাবিরীন : ১১৫-১১৬]