📄 ৫. পরিণতি সম্পর্কে ভাবা
দুনিয়ার মহব্বতের পরিণতি সম্পর্কে ভাবা। ইবনুল কায়্যিম বলেন, অন্তরে দুনিয়ার মহব্বত তেমন, পাকস্থলির জন্য খাদ্যের চাহিদা যেমন। অচিরেই মৃত্যুর সময় বান্দা তার অন্তরে দুনিয়ার মহব্বতের কষ্ট, দুর্ভোগ ও দুর্দশা অনুভব করবে, যেমন সুস্বাদু খাবার পাকস্থলিতে গিয়ে হজম হওয়ার পর পঁচা, নষ্ট, দূষিত ও দুর্গন্ধযুক্ত জিনিসে পরিণত হয়। খাবার যত উন্নত, সুস্বাদু ও সুগন্ধময় হয়, হজম হওয়ার পর তার পরিণতি হয় তত বেশি ঘৃণিত, পঁচা ও দুর্গন্ধময়। ঠিক তদ্রূপ মানুষের কাছে তার প্রবৃত্তির চাহিদা ও কামনা যতবেশি শক্তিশালী, আনন্দদায়ক ও মজাদার হয়, মৃত্যুর সময় তার কষ্ট ও পরিণতিও ততবেশি শক্ত, কষ্টকর ও যন্ত্রণাদায়ক হয়। যেমন, মানুষ তার ভালোবাসার মানুষকে হারালে কষ্ট অনুভব করে। এ কষ্ট হয় তার ভালোবাসার গভীরতা ও তীব্রতার অনুপাতে।
ইয়াহহাক ইবনে সুফিয়ান (রহঃ)-র সূত্রে মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে– أَنَّ রَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّমَ قَالَ لَهُ يَا ضَحَاكَ مَا طَعَامُكَ؟ قَالَ يَا রَسُولَ اللَّهِ اللَّحْمُ وَاللَّبَنُ. قَالَ ثُمَّ يَصِيرُ إِلَى مَاذَا؟ قَالَ إِلَى مَا قَدْ عَلِمْتَ. قَالَ فَإِنَّ اللَّهَ تَبَارَكَ وَتَعَالَى ضَرَبَ مَا يَخْرُجُ مِنْ ابْنِ آدَمَ مَثَلًا لِلدُّنْيَا. রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাকে [ইয়াহহাক ইবনে সুফিয়ান (রহঃ)-কে] বললেন, হে ইয়াহহাক! তোমার খাদ্য কী? তিনি উত্তরে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! গোশত ও দুধ। নবীজি পুনরায় বললেন, তারপর সেগুলো কীসে রূপান্তরিত হয়? ইয়াহহাক (রহঃ) বললেন, আপনি তা জানেন। এরপর নবীজি (সাঃ) ইরশাদ করলেন, আদম সন্তানের পেট থেকে যা বের হয়, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) সেগুলোকে দুনিয়ার উপমা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। [মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং- ১৫৭৪৭; সহীহ ইবনে হিব্বানে এ হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে এভাবে– إِنَّ مَطْعَمَ ابْنِ آدَمَ ضُرِبَ لِلدُّنْيَا مَثَلًا بِمَا خَرَجَ مِنْ ابْنِ آدَمَ وَإِنْ فَرْحَةَ وَمُلْحَةَ فَانْظُرُوا إِلَى مَا يَصِيرُ. – সহীহ ইবনে হিব্বান: ৭৩২]
আমাদের কোনো কোনো পূর্বসূরি তার সাথি-সঙ্গীদের বলতেন, চলো! আমি তোমাদের দুনিয়া দেখাব। তারপর তিনি তাদের পায়খানার স্তূপে নিয়ে যেতেন এবং বলতেন, দেখ তোমাদের ফলফলাদি, গোশত, মধু ও ঘিয়ের পরিণতি!
📄 ৬. কিমত বুঝে কদর করা
সত্যিকারের সাদ ও আনন্দের উপকরণ অর্জনে লিপ্ত থাকা, অনর্থক- মিছে জিনিসের পেছনে না পড়া।
ইবনুল কাইয়িম বলেন, দুনিয়ার সবচেয়ে মজার ও উপভোগ্য বিষয় হল আল্লাহর মারেফাত ও তাঁর মহব্বতের সাদ। কেননা, এটাই দুনিয়ার প্রকৃত সাদ ও সুমহান নেয়ামত। এর বিপরীতে ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার সাময়িক সাদ-আনন্দের উপমা হচ্ছে সুবিশাল সমুদ্রে ক্ষুদ্র খড়- কুটোর মতো। কেননা, মানুষের আত্মা, অন্তর ও দেহ- এ সবকিছুই সৃষ্টি করা হয়েছে আল্লাহর মহব্বত ও ভালোবাসার উদ্দেশ্যে। সুতরাং, দুনিয়াতে যা কিছু আছে তার মধ্যে সবচেয়ে আনন্দের, সবচেয়ে সাদের ও সবচেয়ে উপভোগের বিষয় হচ্ছে আল্লাহর মারেফাত ও তাঁর মহব্বত। আর জান্নাতের সবচেয়ে মজা ও উপভোগের বিষয় হচ্ছে তাঁর দীদার ও সাক্ষাৎ। অর্থাৎ আল্লাহকে সুচক্ষে দেখা। অতএব, তাঁর মহব্বত ও মারেফাত হচ্ছে চোখের শীতলতা, আত্মার প্রশান্তি ও অন্তরের প্রফুল্লতা। পক্ষান্তরে দুনিয়ার যাবতীয় নেয়ামত ও মজা-আনন্দ হচ্ছে ক্ষণস্থায়ী বিষয়, যা এক সময় দুঃখ ও আযাবে পরিণত হয়। তার অধিকারী এক সময় সংকীর্ণ জীবনে পতিত হয়। অতএব, সুখী-সমৃদ্ধ ও পবিত্র জীবন একমাত্র আল্লাহর সাথে সম্পর্ক কায়েম করার মাধ্যমেই হাসিল হয়।
কোনো এক পূর্বসুরি বলেছেন, আমরা এখন যে নেয়ামত ও সুখে আছি, যদি জান্নাতবাসীরা এমন সুখে থাকে, তা হলে তারা অত্যন্ত সুখী ও পবিত্র জীবন যাপন করছে।
অন্য একজন বলেছেন, আমরা যে সুখে ও শান্তিতে আছি, যদি রাজা- বাদশাহ ও শাহজাদারা তা উপলব্ধি করতে পারত, তা হলে অবশ্যই তারা তরবারি নিয়ে আমাদের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে যেত। [আল- জাওয়াবুল কাফী : ১৬৮]
📄 ৭. আল্লাহ ﷻ-র সন্তুষ্টিকে প্রাধান্য দেওয়া
নিজের নফস ও প্রবৃত্তি যা চায়, তার বিপরীতে আল্লাহর সন্তুষ্টিকে প্রাধান্য দেওয়া।
ইবনে রজব বলেন, আমাদের পূর্বসূরিদের কোনো কোনো কিতাবে আছে- যে ব্যক্তি আল্লাহকে মহব্বত করে, তার কাছে আল্লাহর সন্তুষ্টির চেয়ে অধিক প্রিয় আর কোনো কিছু হতে পারে না। আর যে ব্যক্তি দুনিয়াকে ভালোবাসে, তার কাছে স্বীয় নফস ও প্রবৃত্তির অনুসরণ থেকে অধিক প্রিয় আর কোনো কিছুই হতে পারে না।
ইবনে আবিদ-দুনিয়া স্বীয় সনদে হাসান রহ. থেকে বর্ণনা করেন, হাসান বলেছেন, আমি আমার চোখ দিয়ে কোনোকিছু দেখিনি, আমার জবান দিয়ে কোনোকিছু বলিনি, আমার হাত দিয়ে কোনোকিছু ধরিনি এবং আমি আমার পা দিয়ে কোনোকিছু মাড়ায়নি, যতক্ষণ না আমি চিন্তা করে দেখেছি তাতে কি আল্লাহর আনুগত্য রয়েছে না তাঁর নাফরমানি! যদি তাতে তাঁর আনুগত্য থাকত, তা হলে আমি অগ্রসর হতাম। আর যদি নাফরমানি ও অবাধ্যতা থাকত, তা হলে আমি তা থেকে বিরত থাকতাম। [কালিমাতুল ইখলাস : ৩৫]
আবু হুরায়রাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন-
يَقُولُ اللَّهُ سُبْحَانَهُ يَا ابْنَ آدَمَ تَفَرَّغْ لِعِبَادَتِي أَمْلَأْ صَدْرَكَ غِنًى وَأَسُدَّ فَقْرَكَ وَإِنْ لَمْ تَفْعَلْ مَلَأْتُ صَدْرَكَ شُغْلًا وَلَمْ أَسُدَّ فَقْرَكَ.
মহাপবিত্র আল্লাহ বলেন, হে আদম সন্তান! আমার ইবাদতে মগ্ন হও। আমি তোমার অন্তরকে ঐশ্বর্যমণ্ডিত করে দেব এবং দারিদ্র্যকে দূর করে দেব। আর যদি তুমি তা না কর, তা হলে আমি তোমার অন্তর কর্মব্যস্ততা [ও পেরেশানি] দিয়ে পূর্ণ করে দেব এবং তোমার দারিদ্র্যকে দূর করব না। [সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ৪১০৭, সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ২৪৬৬, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ৮৬৬৬]
📄 ৮. জান্নাতের নেয়ামত নিয়ে ভাবা
ইবনে রজব বলেন, [সাহল ইবনে সা'দ —র সূত্রে বর্ণিত হাদীসে] নবীজি ইরশাদ করেছেন—
اَللَّهُمَّ لَا عَيْشَ إِلَّا عَيْشُ الْآخِرَةِ
হে আল্লাহ! আখিরাতের জীবনই একমাত্র জীবন। [তাবরানী, হাদীস নং ৪৮৯১]
কারণ, বনী আদমকে সৃষ্টি করা হয়েছে দেহ ও আত্মার সমন্বয়ে। দেহ ও আত্মা প্রত্যেকটি এমন জিনিসের প্রতি মুখাপেক্ষী, যা দ্বারা সে বেঁচে থাকবে এবং শক্তি সঞ্চয় করবে। আর এটাই হচ্ছে তার খাদ্য ও জীবিকা। সুতরাং, দেহের জীবিকা হচ্ছে খাদ্য, পানীয়, বিবাহ-শাদি, পোশাক-পরিচ্ছদ, সুগন্ধি ইত্যাদি আর অন্যান্য ইন্দ্রিয় সুখানুভূতি। দৈহিক দিক বিবেচনায় এ সকল গুণের ক্ষেত্রে জীবজন্তুর সাথে মানুষের ঘনিষ্ঠ সামঞ্জস্য রয়েছে। অপরদিকে মানুষের রুহ খুবই সূক্ষ্ম জিনিস এবং বিষয়টি পুরোপুরিই আত্মিক; যা ফেরেশতাদের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। সুতরাং, এর শান্তি, সুখ, আনন্দ ও প্রফুল্লতা এর সৃষ্টিকর্তা, পালনকারী ও পরিচালনাকারীর মারিফাত ও পরিচর্যালাভের মধ্যে নিহিত; তাঁর মহব্বত, আনুগত্য, যিকির-স্মরণ, তাঁর সাথে সম্পর্ক কায়েম ও তাঁর সংগে সাক্ষাতের আগ্রহ ইত্যাদিসহ যেসকল আমল তাঁর নৈকট্য হাসিলে সহায়ক, সেসবের মাঝে নিহিত। এ-ই হচ্ছে আত্মার জীবিকা ও শক্তির উৎস। আত্মা যখনই এসব থেকে বঞ্চিত হয়, তখনই সে অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং হালাক হয়ে যায়। মানুষের দেহ যেমন খাদ্য- পানীয় ইত্যাদির অভাবে অসুস্থ ও হালাক হয়ে যায়, উপরোক্ত বিষয়গুলোর অভাবে মানুষের আত্মা তার চেয়েও বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং এক পর্যায়ে ধ্বংস হয়ে যায়।
এ জন্যই অনেক ধনী ও সম্পদশালী লোককে দেখা যায়, দেহকে তার প্রয়োজনীয় খাদ্য-পানীয় ও আরাম-আয়েশের পর্যাপ্ত উপকরণ সরবরাহ করা সত্ত্বেও অন্তরে দুঃখ-বেদনা ও অশান্তি অনুভব করে। এ পর্যায়ে নির্দেশনা মনে করে তার খাদ্য-পানীয় ও আরাম-আয়েশের উপকরণ বাড়িয়ে দিলে তার অন্তরের সেই দুঃখ-বেদনা ও অশান্তি দূর হয়ে যাবে। আবার কেউ কেউ মনে করে, নেশা খেয়ে মাতাল হলে এসব দূর হয়ে যাবে। অথচ এ সবই দুঃখ-বেদনা ও অশান্তি দূর করার পরিবর্তে উত্তরোত্তর বৃদ্ধিই করে যায়; তার অসুস্থতা গভীর থেকে গভীরতরই হতে থাকে। কেননা, আত্মা তো তার জীবিকা ও শক্তির উৎস হারিয়ে ফেলেছে। ফলে সে অসুস্থ ও যন্ত্রণাকাতর হয়ে পড়েছে। [‘হাদীসে লাব্বাইক’ এর ব্যাখ্যা: ৫৮]