📘 দুনিয়ার মোহে পড়বেন না 📄 ৩. দুনিয়ার ক্ষণস্থায়িত্ব ও আখেরাতের আগমন নিয়ে ভাবা

📄 ৩. দুনিয়ার ক্ষণস্থায়িত্ব ও আখেরাতের আগমন নিয়ে ভাবা


দুনিয়ার মহব্বতের অন্যতম চিকিৎসা হচ্ছে, দুনিয়া খুব দ্রুতই ধ্বংস হয়ে যাবে এবং আখেরাত অতি নিকটে- এ বিষয়ে চিন্তা করা; এ ভাবনা সর্বদা অন্তরে জাগরুক রাখা।

ইবনুল কাইয়্যিম বলেন, যে দুনিয়া-প্রেমিক ও দুনিয়াকে মহব্বতকারী দুনিয়াকে আখেরাতের উপর প্রাধান্য দেয়, সে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বোকা ও নির্বোধ। কেননা, সে নিছক ধারণা ও কল্পনাকে প্রকৃত বাস্তবতার উপর প্রাধান্য দিয়েছে। নিদ্রাকে প্রাধান্য দিয়েছে জাগ্রত থাকার উপর। ক্ষণস্থায়ী হায়াতকে –যা কিছুক্ষণ পরই দূর হয়ে যাবে- প্রাধান্য দিয়েছে চিরস্থায়ী নেয়ামতের উপর। ক্ষয়শীল গৃহকে প্রাধান্য দিয়েছে স্থায়ী গৃহের উপর। সে সুখী-সাচ্ছন্দ্যময় স্বাধীন ও চিরস্থায়ী জীবনকে বিক্রি করে দিয়েছে এমন জীবনের বিনিময়ে, যাকে তুলনা করা যায় কেবল ঘুমন্ত ব্যক্তির সাময়িক সুখের সাথে কিংবা খুব দ্রুত সরে যাবে এমন কোনো ছায়ারের সাথে। কোনো জ্ঞানী ও বুদ্ধিমান লোক কখনোই এ ধরনের কাজ করতে পারে না; এভাবে ধোঁকায় পড়তে পারে না।

এর দৃষ্টান্ত হল ওই বেদুইনের ন্যায়, যে কোনো সম্প্রদায়ে অবতরণ করলে সম্প্রদায়ের লোকেরা তার সামনে খাবার পরিবেশন করল। সে খাবার খেয়ে তাদের কোনো এক তাঁবুর ছায়াকে স্থায়ী মনে করে বিশ্রাম নিতে শুরু করল এবং এক পর্যায়ে ঘুমিয়ে পড়ল। কিছুক্ষণ পর সম্প্রদায়ের লোকেরা তাদের তাঁবু খুলে ফেলল এবং সে প্রচণ্ড রৌদ্রতাপের শিকার হল। তখন সে জাগ্রত হয়ে বলল-
وَإِنِ امْرُؤٌ دُنْيَاهُ أَكْبَرُ هَمِّهِ • لَسَتَمْسِكُ مِنْهَا بِحَبْلِ غُرُورٍ

যদি কোনো ব্যক্তির দুনিয়াই হয় তার বড় চাওয়া-পাওয়ার বিষয়, [তা হলে জেনে রাখতে হবে] অবশ্যই সে একটি ধোঁকার রশি আঁকড়ে আছে।

আমাদের কোনো এক পূর্বসূরি এ কবিতার মতোই আরও একটি কবিতা বলেছিলেন-
يَا أَهْلَ الذُّلِ الْآنَ دُنْيَا لَا بَقَاءَ لَهَا ْ إِنَّ اغْتِرَارُ بِظِلٍ زَائِلٍ حَقُّ

হে দুনিয়ার মজা উপভোগকারীরা! এ দুনিয়ার কোনো স্থায়িত্ব নেই। সাময়িক ও ক্ষণস্থায়ী ছায়ায় ধোঁকা খাওয়া নিঃসন্দেহে নির্বুদ্ধিতা ও বোকামি।

ইউনুস ইবনে আবদুল আ'লা বলেন, দুনিয়ার উপমা হচ্ছে ওই ব্যক্তির ন্যায়, যে ঘুমিয়ে কিছু পছন্দনীয় ও কিছু অপছন্দনীয় স্বপ্ন দেখল এবং এরই মধ্যে তার ঘুম ভেঙে গেল। [হিদায়াতুস সায়িরিন : ১১০]

ইবনে কাসীর বলেন, আল্লাহ ইরশাদ করেছেন- مَتَاعُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا 'এ সবই হচ্ছে পার্থিব জীবনের ভোগ বস্তু' –সূরা আলে ইমরান : ১৪’ অর্থাৎ এ সবই হচ্ছে পার্থিব জীবনের সাময়িক চাকচিক্য ও ক্ষণস্থায়ী সৌন্দর্য। তবে وَعِنْدَهُ حُسْنُ الْمَآبِ 'আল্লাহর নিকটই হল উত্তম আশ্রয়। –সূরা আলে ইমরান : ১৪’ অর্থাৎ আল্লাহর নিকটই হল তোমাদের উত্তম ও উৎকৃষ্ট প্রত্যাবর্তনস্থল।

ইবনে জারীর বলেন, আমাকে হাদীস বর্ণনা করেছেন ইবনে হামীদ, তিনি বলেন, আমাকে আতা থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন জারীর, আতা হাদীস বর্ণনা করেছেন আবূ বকর ইবনে হাফস ইবনে উমর ইবনে সা'দ থেকে, তিনি বলেন, যখন এই আয়াত নাযিল হয়- زُيِّنَ لِلنَّاسِ حُبُّ الشَّهَوَاتِ ‘মানুষের জন্য সুশোভিত করা হয়েছে প্রবৃত্তির ভালোবাসা। –সূরা আলে ইমরান : ১৪’ তখন উমর ইবনুল খাত্তাব বলেন, হে আল্লাহ! এখন আপনার এই বিধান, অথচ আপনিই তো আমাদের জন্য এই পার্থিব জীবনকে সুশোভিত করেছেন! তখন এই আয়াত নাযিল হয়- قُلْ أَؤُنَبِّئُكُمْ بِخَيْرٍ مِنْ ذَلِكُمْ ‘[হে নবী!] আপনি বলুন, আমি কি তোমাদেরকে এসবের চাইতেও উত্তম বিষয়ের সন্ধান দেব? – সূরা আলে ইমরান : ১৫’ অর্থাৎ হে মুহাম্মাদ! [ﷺ] আপনি মানুষদের বলুন, দুনিয়ার এ ক্ষণস্থায়ী জীবন, যে জীবনের চাকচিক্য, সৌন্দর্য ও যাবতীয় নেয়ামত অবশ্যই নিঃশেষ হয়ে যাবে, আমি কি তোমাদেরকে তা থেকে উত্তম ও চিরস্থায়ী জীবন সম্পর্কে সংবাদ দেব না?

তারপর আল্লাহ ইরশাদ করেছেন-
إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا عِنْدَ رَبِّهِمْ جَنَّاتٌ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا وَأَزْوَاجٌ مُّطَهَّرَةٌ وَرِضْوَانٌ مِّنَ اللَّهِ

যারা মুত্তাকী-পরহেজগার, আল্লাহর নিকট তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত, যার তলদেশ দিয়ে প্রবাহিত হয় নহরসমূহ। সেখানে তারা থাকবে অনন্তকাল। আর রয়েছে পরিছন্ন সঙ্গিনীগণ এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি। –সুরা আলে ইমরান : ১৫ [তাফসীরে ইবনে কাসীর : ১/২২]

ইবনে কাসীর আরও বলেন, আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন- وَلَا تَشْتَرُوا بِعَهْدِ اللَّهِ ثَمَنًا قَلِيلًا ‘তোমরা আল্লাহর অঙ্গীকারের বিনিময়ে সামান্য মূল্য গ্রহণ করো না।’-সুরা নাহল : ৯৫ অর্থাৎ তোমরা ঈমানের বিনিময়ে দুনিয়ার ধন-সম্পদ ও সৌন্দর্যকে গ্রহণ করো না। কারণ, আখেরাতের তুলনায় দুনিয়া ও তার মধ্যে যা কিছু আছে তা খুবই নগণ্য। যদি আদম সন্তানকে দুনিয়া ও দুনিয়ার মধ্যে যা কিছু আছে তার সবই দিয়ে দেওয়া হয়, তা হলেও আল্লাহ তাআলার কাছে যা কিছু আছে তা তার জন্য উত্তম হবে। অর্থাৎ আল্লাহ তাআলার সাওয়াব ও প্রতিদান ওই ব্যক্তির জন্য উত্তম, যে আল্লাহ তাআলার প্রতি ঈমান আনে, তাঁর কাছে সাওয়াব ও প্রতিদান কামনা করে, প্রতিশ্রুত সাওয়াব ও প্রতিদানের আশায় আল্লাহ-র সঙ্গে কৃত অঙ্গীকার রক্ষা করে চলে। এ জন্যই আল্লাহ ইরশাদ করেছেন-
وَإِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُونَ
যদি তোমরা উপলব্ধি কর। [সুরা নাহল : ৯৫]

অতঃপর আল্লাহ ইরশাদ করেছেন-
مَا عِنْدَكُمْ يَنْفَدُ وَمَا عِنْدَ اللَّهِ بَاقٍ وَ لَنَجْزِيَنَّ الَّذِينَ صَبَرُوا أَجْرَهُمْ بِأَحْسَنِ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ

তোমাদের কাছে যা আছে তা নিঃশেষ হয়ে যাবে আর আল্লাহর কাছে যা আছে তা কখনও শেষ হবে না। যারা সবর করে, আমি তাদেরকে প্রাপ্য প্রতিদান দেব তাদের উত্তম কর্মের প্রতিদানস্বরূপ, যা তারা করত। [সুরা নাহল : ৯৬]

অর্থাৎ তোমাদের কাছে যা কিছু আছে, তা এক সময় নিঃশেষ ও বিলুপ্ত হয়ে যাবে। কেননা, তা তো নির্দিষ্ট একটি সময়ের জন্য প্রদত্ত। পক্ষান্তরে আল্লাহ-র কাছে যা কিছু রয়েছে, তা চিরস্থায়ী, চিরন্তন। তা কখনও শেষ হবে না, বিলুপ্ত হবে না, ফুরাবে না। অর্থাৎ জগতে তোমাদের নেক আমলসমূহের যে প্রতিদান ও পুরস্কার রয়েছে, তা কোনোদিনও বিলুপ্ত হবে না, নিঃশেষ হবে না। তা চিরন্তন, চিরস্থায়ী। তার কোনো পরিবর্তনও ঘটবে না।

আল্লাহর বাণী—
وَلَنَجْزِيَنَّ الَّذِينَ صَبَرُوا أَجْرَهُمْ بِأَحْسَنِ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ
যারা ধৈর্য ধারণ করে, আমি তাদেরকে প্রাপ্য প্রতিদান দেব তাদের উত্তম কর্মের প্রতিদানস্বরূপ, যা তারা করত। [সূরা নাহল : ৯৬]

এখানে আল্লাহ ‘লামে তাকীদ’ দ্বারা শপথ করে বলেছেন, তিনি ধৈর্যধারণকারীদের আমলের উত্তম বিনিময় দান করবেন এবং তাদের গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন। [তাফসীরে ইবনে কাসীর: ২/৭৭২]

📘 দুনিয়ার মোহে পড়বেন না 📄 ৪. অল্পে তুষ্টি

📄 ৪. অল্পে তুষ্টি


আল্লাহ পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন—
أَلْهَاكُمُ التَّكাসُرُ
প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা তোমাদেরকে গাফেল করে রাখে। [সূরা তাকাসুর: ১]

আনাস ইবনে মালেক থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী কারীম ইরশাদ করেছেন—
مَنْ كَانَتِ الْآخِرَةُ هَمَّهُ جَعَلَ اللَّهُ غِنَاهُ فِي قَلْبِهِ وَجَمَعَ لَهُ شَمْلَهُ وَأَتَتْهُ الدُّنْيَا وَهِيَ رَاغِمَةٌ وَمَنْ كَانَتِ الدُّنْيَا هَمَّهُ جَعَلَ اللَّهُ فَقْرَهُ بَيْنَ عَيْنَيْهِ وَفَرَّقَ عَلَيْهِ شَمْلَهُ وَلَمْ يَأْتِهِ مِنَ الدُّنْيَا إِلَّا مَا قُدِّرَ لَهُ.

যে ব্যক্তির একমাত্র চিন্তার বিষয় হবে পরকাল, আল্লাহ সেই ব্যক্তির অন্তরকে অভাবমুক্ত করে দেবেন এবং তার যাবতীয় বিচ্ছিন্ন কাজ একত্র করে সুসংযত করে দেবেন। দুনিয়া অপদস্থ হয়ে তার কাছে হাজির হবে। আর যে ব্যক্তির একমাত্র চিন্তার বিষয় হবে দুনিয়া, আল্লাহ দারিদ্র্যতাকে তার চোখের সামনে তুলে ধরবেন এবং তার কাজকর্মকে বিচ্ছিন্ন ও বিক্ষিপ্ত করে দেবেন। আর দুনিয়া থেকে সে ততটুকুই লাভ করতে পারবে, যতটুকু তার তকদীরে লিখে রাখা হয়েছে। [সুনানে তিরমিযি, হাদীস নং ২৪৩৫]

ইবনুল কায়্যিম বলেন, হাসান রহ. আরও বলেছেন, হে আদম সন্তান! তুমি দুনিয়ার সাথে তোমার অন্তরকে সম্পৃক্ত করো না। যদি তুমি তা কর, তা হলে তুমি অত্যন্ত মন্দ জিনিসের সাথে তোমার অন্তরকে সম্পৃক্ত করলে। তুমি তার সাথে সম্পর্কের রশি কেটে দাও, তার দরজা বন্ধ করে দাও। হে আদম সন্তান! তোমার জন্য ততটুকুই যথেষ্ট, যা তোমাকে তোমার গন্তব্যে পৌঁছে দেবে। [ইহাতুস সাবিরীন : ১১০]

আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন-
إِذَا نَظَرَ أَحَدُكُمْ إِلَى مَنْ فُضِّلَ عَلَيْهِ فِي الْمَالِ وَالْخَلْقِ فَلْيَنْظُرْ إِلَى مَنْ هُوَ أَسْفَلَ مِنْهُ.

তোমাদের কারও নজর যদি এমন লোকের উপর পড়ে, যাকে ধন-সম্পদ ও দৈহিক গঠনে অধিক মর্যাদা দেওয়া হয়েছে, তবে সে যেন এমন লোকের দিকে নজর দেয়, যে তার চেয়ে নিম্ন স্তরে রয়েছে। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৪৮০, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৭৬৯৭]

অপর এক বর্ণনায় এসেছে, আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন-
انْظُرُوا إِلَى مَنْ أَسْفَلَ مِنْكُمْ وَلَا تَنْظُرُوا إِلَى مَنْ هُوَ فَوْقَكُمْ فَهُوَ أَجْدَرُ أَنْ لَا تَزْدَرُوا نِعْمَةَ اللَّهِ.

তোমাদের চেয়ে নিম্ন স্তরের লোকদের প্রতি দৃষ্টি দাও। তোমাদের চেয়ে উঁচু স্তরের লোকেদের দিকে দৃষ্টি দিয়ো না। কেননা, আল্লাহর নিয়ামতকে তুচ্ছ না ভাবার এটাই উত্তম পন্থা। [সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৭৬১৯]

সিমাক থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নুমান ইবনে বাশীর-কে বলতে শুনেছি— أَلَسْتُمْ فِي طَعَامٍ وَشَرَابٍ مَا شِئْتُمْ لَقَدْ রَأَيْتُ نَبِيَّكُمْ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَمَا يَجِدُ مِنَ الدَّقَلِ مَا يَمْلَأُ بِهِ بَطْنَهُ. তোমরা কি চাহিদা মতো পর্যাপ্ত খাদ্য ও পানীয় পাচ্ছ না? অথচ আমি তোমাদের নবী ﷺ কে দেখেছি যে, তিনি ক্ষুধা নিবারণের জন্য নিম্নমানের খুরমাও পাননি। [সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৭৬৫০]

আবু আবদুর রহমান আল-হুবুলী থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন— سَمِعْتُ عَبْدَ اللَّهِ بْنَ عَمْرِو بْنِ الْعَاصِ রَجُلٌ فَقَالَ أَلَسْنَا مِن فُقَرَاءِ الْمُهَاجِرِينَ؟ فَقَالَ لَهُ عَبْدُ اللَّهِ أَلَكَ امْرَأَةٌ تَأْوِي إِلَيْهَا؟ قَالَ نَعَمْ. قَالَ أَلَكَ مَسْكَنٌ تَسْكُنُهُ؟ قَالَ نَعَمْ. قَالَ فَأَنْتَ مِنَ الْأَغْنِيَاءِ. قَالَ فَإِنَّ لِي خَادِمًا، قَالَ فَأَنْتَ مِنَ الْمُلُوكِ. আমি আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস-কে বলতে শুনেছি, এক ব্যক্তি তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছেন, আমরা কি মুহাজির দরিদ্রদের অন্তর্ভুক্ত নই? এ কথা শুনে আবদুল্লাহ তাকে বললেন, তোমার কি সহধর্মিণী নেই, যার কাছে তুমি গিয়ে থাক? উত্তরে লোকটি বললেন, হাঁ আছে। অতঃপর তিনি বললেন, বসবাস করার জন্য তোমার কি আবাসস্থল নেই? লোকটি জওয়াব দিলেন, হাঁ আছে। তখন তিনি বললেন, তবে তো তুমি ধনীদের পর্যায়ভুক্ত। তারপর লোকটি বললেন, আমার একজন খাদেমও আছে। এ কথা শুনে আবদুল্লাহ বললেন, তা হলে তো তুমিই বাদশাহ! [সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৭৬৫০]

সাহল ইবনে সা'দ আস-সায়িদী থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন— أَيُّهَا النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ রَجُلٌ فَقَالَ يَا রَسُولَ اللَّهِ! دُلَّنِي عَلَى عَمَلٍ إِذَا عَمِلْتُهُ أَحَبَّنِي اللَّهُ وَأَحَبَّنِي النَّاسُ. فَقَالَ রَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَ سَلَّمَ ازْهَدْ فِي الدُّنْيَا يُحِبَّكَ اللَّهُ، وَازْهَدْ فِيمَا فِي أَيْدِي النَّاسِ يُحِبُّوكَ. এক ব্যক্তি নবী ﷺ-র কাছে এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে এমন একটি আমলের কথা বলে দিন, যা আমি করলে আল্লাহ আমাকে ভালোবাসবেন এবং লোকেরাও আমাকে ভালোবাসবে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, তুমি দুনিয়ার প্রতি অনাসক্তি অবলম্বন কর, তা হলে আল্লাহ তোমাকে ভালোবাসবেন। আর মানুষের কাছে যা আছে, তুমি তার প্রতি অনাসক্ত হয়ে যাও, তা হলে তারাও তোমাকে ভালোবাসবে। [সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ৪১০২]

হারেস ইবনে ওয়াহাব আল-খুযায়ী থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবীজি ﷺ-কে বলতে শুনেছি—
أَلَا أُخْبِرُكُمْ بِأَهْلِ الْجَنَّةِ كُلُّ ضَعِيفٍ مُتَضَعِّفٍ لَوْ أَقْسَمَ عَلَى اللَّهِ لَأَبَرَّهُ أَلَا أُخْبِرُكُمْ بِأَهْلِ النَّارِ كُلُّ عُتُلٍّ جَوَّاظٍ مُسْتَكْبِرٍ.

আমি কি তোমাদের জান্নাতী লোকদের পরিচয় বলব না? তারা দুর্বল এবং অসহায়; তারা যদি কোনো ব্যাপারে আল্লাহর নামে কসম করে বসেন, তা হলে তা পূরণ করে দেন। আমি কি তোমাদের জাহান্নামী লোকদের পরিচয় বলব না? তারা হচ্ছে প্রত্যেক রূঢ় স্বভাববিশিষ্ট, অধিক মোটা ও অহংকারী। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৪৯১৮, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৭৬৮, সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ২৬০৪, সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ৪১১৬, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ৬৮৭৬]

📘 দুনিয়ার মোহে পড়বেন না 📄 ৫. পরিণতি সম্পর্কে ভাবা

📄 ৫. পরিণতি সম্পর্কে ভাবা


দুনিয়ার মহব্বতের পরিণতি সম্পর্কে ভাবা। ইবনুল কায়্যিম বলেন, অন্তরে দুনিয়ার মহব্বত তেমন, পাকস্থলির জন্য খাদ্যের চাহিদা যেমন। অচিরেই মৃত্যুর সময় বান্দা তার অন্তরে দুনিয়ার মহব্বতের কষ্ট, দুর্ভোগ ও দুর্দশা অনুভব করবে, যেমন সুস্বাদু খাবার পাকস্থলিতে গিয়ে হজম হওয়ার পর পঁচা, নষ্ট, দূষিত ও দুর্গন্ধযুক্ত জিনিসে পরিণত হয়। খাবার যত উন্নত, সুস্বাদু ও সুগন্ধময় হয়, হজম হওয়ার পর তার পরিণতি হয় তত বেশি ঘৃণিত, পঁচা ও দুর্গন্ধময়। ঠিক তদ্রূপ মানুষের কাছে তার প্রবৃত্তির চাহিদা ও কামনা যতবেশি শক্তিশালী, আনন্দদায়ক ও মজাদার হয়, মৃত্যুর সময় তার কষ্ট ও পরিণতিও ততবেশি শক্ত, কষ্টকর ও যন্ত্রণাদায়ক হয়। যেমন, মানুষ তার ভালোবাসার মানুষকে হারালে কষ্ট অনুভব করে। এ কষ্ট হয় তার ভালোবাসার গভীরতা ও তীব্রতার অনুপাতে।

ইয়াহহাক ইবনে সুফিয়ান (রহঃ)-র সূত্রে মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে– أَنَّ রَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّমَ قَالَ لَهُ يَا ضَحَاكَ مَا طَعَامُكَ؟ قَالَ يَا রَسُولَ اللَّهِ اللَّحْمُ وَاللَّبَنُ. قَالَ ثُمَّ يَصِيرُ إِلَى مَاذَا؟ قَالَ إِلَى مَا قَدْ عَلِمْتَ. قَالَ فَإِنَّ اللَّهَ تَبَارَكَ وَتَعَالَى ضَرَبَ مَا يَخْرُجُ مِنْ ابْنِ آدَمَ مَثَلًا لِلدُّنْيَا. রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাকে [ইয়াহহাক ইবনে সুফিয়ান (রহঃ)-কে] বললেন, হে ইয়াহহাক! তোমার খাদ্য কী? তিনি উত্তরে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! গোশত ও দুধ। নবীজি পুনরায় বললেন, তারপর সেগুলো কীসে রূপান্তরিত হয়? ইয়াহহাক (রহঃ) বললেন, আপনি তা জানেন। এরপর নবীজি (সাঃ) ইরশাদ করলেন, আদম সন্তানের পেট থেকে যা বের হয়, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) সেগুলোকে দুনিয়ার উপমা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। [মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং- ১৫৭৪৭; সহীহ ইবনে হিব্বানে এ হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে এভাবে– إِنَّ مَطْعَمَ ابْنِ آدَمَ ضُرِبَ لِلدُّنْيَا مَثَلًا بِمَا خَرَجَ مِنْ ابْنِ آدَمَ وَإِنْ فَرْحَةَ وَمُلْحَةَ فَانْظُرُوا إِلَى مَا يَصِيرُ. – সহীহ ইবনে হিব্বান: ৭৩২]

আমাদের কোনো কোনো পূর্বসূরি তার সাথি-সঙ্গীদের বলতেন, চলো! আমি তোমাদের দুনিয়া দেখাব। তারপর তিনি তাদের পায়খানার স্তূপে নিয়ে যেতেন এবং বলতেন, দেখ তোমাদের ফলফলাদি, গোশত, মধু ও ঘিয়ের পরিণতি!

📘 দুনিয়ার মোহে পড়বেন না 📄 ৬. কিমত বুঝে কদর করা

📄 ৬. কিমত বুঝে কদর করা


সত্যিকারের সাদ ও আনন্দের উপকরণ অর্জনে লিপ্ত থাকা, অনর্থক- মিছে জিনিসের পেছনে না পড়া।

ইবনুল কাইয়িম বলেন, দুনিয়ার সবচেয়ে মজার ও উপভোগ্য বিষয় হল আল্লাহর মারেফাত ও তাঁর মহব্বতের সাদ। কেননা, এটাই দুনিয়ার প্রকৃত সাদ ও সুমহান নেয়ামত। এর বিপরীতে ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার সাময়িক সাদ-আনন্দের উপমা হচ্ছে সুবিশাল সমুদ্রে ক্ষুদ্র খড়- কুটোর মতো। কেননা, মানুষের আত্মা, অন্তর ও দেহ- এ সবকিছুই সৃষ্টি করা হয়েছে আল্লাহর মহব্বত ও ভালোবাসার উদ্দেশ্যে। সুতরাং, দুনিয়াতে যা কিছু আছে তার মধ্যে সবচেয়ে আনন্দের, সবচেয়ে সাদের ও সবচেয়ে উপভোগের বিষয় হচ্ছে আল্লাহর মারেফাত ও তাঁর মহব্বত। আর জান্নাতের সবচেয়ে মজা ও উপভোগের বিষয় হচ্ছে তাঁর দীদার ও সাক্ষাৎ। অর্থাৎ আল্লাহকে সুচক্ষে দেখা। অতএব, তাঁর মহব্বত ও মারেফাত হচ্ছে চোখের শীতলতা, আত্মার প্রশান্তি ও অন্তরের প্রফুল্লতা। পক্ষান্তরে দুনিয়ার যাবতীয় নেয়ামত ও মজা-আনন্দ হচ্ছে ক্ষণস্থায়ী বিষয়, যা এক সময় দুঃখ ও আযাবে পরিণত হয়। তার অধিকারী এক সময় সংকীর্ণ জীবনে পতিত হয়। অতএব, সুখী-সমৃদ্ধ ও পবিত্র জীবন একমাত্র আল্লাহর সাথে সম্পর্ক কায়েম করার মাধ্যমেই হাসিল হয়।

কোনো এক পূর্বসুরি বলেছেন, আমরা এখন যে নেয়ামত ও সুখে আছি, যদি জান্নাতবাসীরা এমন সুখে থাকে, তা হলে তারা অত্যন্ত সুখী ও পবিত্র জীবন যাপন করছে।

অন্য একজন বলেছেন, আমরা যে সুখে ও শান্তিতে আছি, যদি রাজা- বাদশাহ ও শাহজাদারা তা উপলব্ধি করতে পারত, তা হলে অবশ্যই তারা তরবারি নিয়ে আমাদের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে যেত। [আল- জাওয়াবুল কাফী : ১৬৮]

ফন্ট সাইজ
15px
17px