📄 ১৫. সাহায্যে বিলম্ব ও প্রভাব বিলুপ্তি
দুনিয়ার মহব্বতের কারণে আল্লাহর পক্ষ থেকে সাহায্য আসতে দেরি হয় এবং মানুষের অন্তর থেকে মুমিনদের ভয়-ভীতি ও প্রভাব- প্রতিপত্তি দূর হয়ে যায়।
সাওবান রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন-
يُوشِكُ الْأُمَمُ أَنْ تَدَاعَىٰ عَلَيْكُمْ كَمَا تَدَاعَىٰ الْأَكَلَةُ إِلَىٰ قَصْعَتِهَا. فَقَالَ قَائِلٌ وَمِنْ قِلَّةٍ نَحْنُ يَوْمَئِذٍ؟ قَالَ بَلْ أَنْتُمْ يَوْمَئِذٍ كَثِيرٌ وَلَكِنَّكُمْ غُثَاءٌ كَغُثَاءِ السَّيْلِ وَلَيَنْزِعَنَّ اللَّهُ مِنْ صُدُورِ عَدُوِّكُمُ الْمَهَابَةَ مِنْكُمْ وَلَيَقْذِفَنَّ اللَّهُ فِي قُلُوبِكُمُ الْوَهْنَ. فَقَالَ قَائِلٌ يَا رَسُولَ اللَّهِ وَمَا الْوَهْنُ؟ قَالَ حُبُّ الدُّنْيَا وَكَرَاهِيَةُ الْمَوْتِ.
অচিরেই এই উম্মতের লোকদের উপর এমন একটি সময় আসবে, যখন বিজাতিরা তোমাদের বিরুদ্ধে একে অপরকে এমনভাবে ডাকবে, যেভাবে খাদ্য গ্রহণকারীরা খাবারের পাত্রের দিকে একে অপরকে ডাকে। এক ব্যক্তি বলল, সেদিন আমাদের সংখ্যা কম হওয়ার কারণে কি এরূপ হবে? নবীজি বললেন, তোমরা বরং সেদিন সংখ্যায় অনেক হবে; কিন্তু তোমরা হবে শ্রাবণের স্রোতে ভেসে যাওয়া আবর্জনার মতো। আর আল্লাহ তোমাদের শত্রুদের অন্তর থেকে তোমাদের ভীতি দূর করে দেবেন এবং তিনি তোমাদের অন্তরে ‘ওয়াহান’ ঢেলে দেবেন। এক ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহর রাসূল! ‘ওয়াহান’ কী? নবীজি বললেন, দুনিয়ার ভালোবাসা ও মৃত্যুকে অপখন্দ করা। [সুনানে আবূ দাউদ, হাদীস নং ৪২৩৯, মুসনাদে আহমদ, হাদীস নং ২২০৯৭]
📄 ১৬. উভয় জগতের বরবাদি
দুনিয়ার মহব্বতের কারণে দুনিয়া-আখেরাতও উভয় জগতে ক্ষতি ও বরবাদির সম্মুখীন হতে হয়।
আল্লাহ পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন—
وَمِنَ النَّاسِ مَن يَعْبُدُ اللَّهَ عَلَىٰ حَرْفٍ فَإِنْ أَصَابَهُ خَيْرٌ اطْمَأَنَّ بِهِ ۖ وَإِنْ أَصَابَتْهُ فِتْنَةٌ انقَلَبَ عَلَىٰ وَجْهِهِ خَسِرَ الدُّنْيَا وَالْآخِرَةَ ۚ ذَٰلِكَ هُوَ الْخُسْرَانُ الْمُبِينُ
মানুষের মধ্যে কেউ কেউ দ্বিধা-দ্বন্দ্বে জড়িত হয় আল্লাহর ইবাদত করে। যদি সে কল্যাণ প্রাপ্ত হয়, তবে ইবাদতের উপর কায়েম থাকে আর যদি কোনো পরীক্ষায় পতিত হয়, তবে পূর্বাবস্থায় ফিরে যায়। সে ইহকালে ও পরকালে ক্ষতিগ্রস্ত। এটাই প্রকাশ্য ক্ষতি। [সূরা হজ্ব: ১১]
হাসান বলেন, অবস্থা এমন হয়েছে যে, প্রত্যেক মানুষ ওই জিনিসেই লিপ্ত, যা তার নিজের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। আর মানুষ কোনো জিনিসের ইচ্ছা করলে, মানুষের মস্তিষ্কে কোনো কিছুর চিন্তা সওয়ার হলে সে ওই জিনিসের আলোচনাই বেশি বেশি করে। নিশ্চয় যার আখেরাতও নেই, তার বর্তমানও নেই। আর যে ব্যক্তি দুনিয়াকে আখেরাতের উপর প্রাধান্য দেয়, তার দুনিয়াও নেই, আখেরাতও নেই। [আয-যুহদ লি-আহমাদ ইবনি হাম্বল রহ. : ২৮৫]
বনূ আমের ইবনে লুওয়াই এর দুশ্চিন্তা মিত্র আমার ইবনে আওফ রাদিয়াল্লাহু আনহু, যিনি রাসূলুল্লাহ-র সাথে বদর যুদ্ধে শরিক ছিলেন, তিনি জানিয়েছেন, [দীর্ঘ এক হাদীসের শেষাংশে] রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন—
ফওয়াল্লাহি مَا الْفَقْرَ أَخْشَى عَلَيْكُمْ، وَلَكِنِّي أَخْشَى عَلَيْكُمْ أَنْ تُبْسَطَ الدُّنْيَا عَلَيْكُمْ كَمَا بُسِطَتْ عَلَى مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ، فَتَنَافَسُوهَا كَمَا تَنَافَسُوهَا وَيُهْلِكُكُمْ كَمَا أَهْلَكَتْهُمْ.
আল্লাহর কসম! আমি তোমাদের উপর দারিদ্র্য ও অভাব- অনটনের আশঙ্কা করি না। আমি তোমাদের ব্যাপারে এ আশঙ্কা করি যে, তোমাদের উপরও তেমনিভাবে দুনিয়ার প্রাচুর্য ও ঐশ্বর্য ঢেলে দেওয়া হবে, যেমনিভাবে ঢেলে দেওয়া হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর। অতঃপর তোমরা তেমনিভাবে প্রতিযোগিতা করবে যেমনিভাবে তারা প্রতিযোগিতা করেছে। পরিশেষে তোমাদেরকেও ধ্বংস করে দেবে যেমনিভাবে তাদেরকে ধ্বংস করে দিয়েছে। [সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৭৮৬৪, সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ২৪৬২, সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ৩৫৯৭]
📄 ১৭. পেটপূজা ও অন্তরের মৃত্যু
ইবনুল জাউযী বলেন, দুনিয়ার মহব্বতকারীর উপমা হচ্ছে, -যদিও সে ইবাদত করতে ক্লান্ত হয়ে গেছে- ধান রোপণকারীর ন্যায়। যে তার এক পা ওঠায় তো আরেক পা রাখে, কিন্তু নিজের জায়গা থেকে একটুও সরে না। ঠিক তদ্রূপ যার অন্তর দুনিয়ার মহব্বতে লিপ্ত আর তার অপ্রাপ্যতার ইবাদতে লিপ্ত, তুমি দেখবে, সে তার দীর্ঘ জীবনে বাহ্যিকভাবে [অজ্ঞাতোজ্ঞার মাধ্যমে ইবাদত করে] আল্লাহর নৈকট্য লাভ (!) করে যাচ্ছে, আর অন্তরের দিক থেকে সে কেবল আল্লাহ থেকে দূরেই সরে যাচ্ছে। [আছ-তাইফাক্বিরাতু ফিল ওয়াজ: ৩৬]
📄 ১৮. মন্দ পরিণতি
হাফেয আবু মুহাম্মাদ আব্দুল হক ইবনে আবদুর রহমান আল-ইশবীলী বলেন, জেনে রেখো! মন্দ পরিণতির -আল্লাহ আমাদের সকলকে হেফাজত করুন- অনেকগুলি কারণ রয়েছে এবং তার জন্য অনেকগুলো দরজা ও মাধ্যম রয়েছে। তার মধ্যে সবচেয়ে বড় হচ্ছে- দুনিয়ার প্রতি ঝুঁকে পড়া, কেবল দুনিয়া অন্বেষণ করা এবং দুনিয়ার প্রতি লোভী হওয়া; আখেরাত থেকে বিমুখ হয়ে পড়া এবং আল্লাহর নাফরমানি ও অবাধ্যতার দিকে অগ্রসর হওয়া। অনেক সময় এমনও হয় যে, মানুষের উপর কোনো ক্লান্তি ও কোনো শ্রেণির গুনাহ বিজয় লাভ করে এবং তার মাঝে অবাধ্যতা, অন্যায়-অপরাধের প্রতি দুঃসাহসিকতা ও অগ্রগামিতা প্রবল হয়ে ওঠে এবং তা তার অন্তরকে পরিপূর্ণরূপে আচ্ছন্ন করে ফেলে; তার বিবেক-বুদ্ধিকে বন্দি করে ফেলে, তার অন্তরের নূরকে নিভিয়ে দেয়, তার উপর পর্দা ফেলে দেয়, তখন আর কোনো ওয়াজ-নসিহত ও উপদেশ তার কোনো উপকারে আসে না, তার কোনো কল্যাণ সাধন করতে পারে না। কখনও কখনও এমতাবস্থায় তার মৃত্যুও এসে যায়। তখন সে দূরবর্তী কোনো স্থান থেকে কোনো আহ্বানকারীর আহ্বান শুনতে পায়, কিন্তু সে আহ্বানের মর্ম ও উদ্দেশ্য তার কাছে স্পষ্ট হয় না। সে বুঝতে পারে না আহ্বানকারীর কী উদ্দেশ্য! যদিও আহ্বানকারী বার বার আহ্বান করে এবং পুনঃপুন ডাকতে থাকে। [আল-জাওয়াবুল কাফী: ১১৮]