📘 দুনিয়ার মোহে পড়বেন না 📄 ১১. অবাধ্যতা

📄 ১১. অবাধ্যতা


দুনিয়ার মহব্বত সীমালঙ্ঘন ও অবাধ্যতার কারণ।

আল্লাহ পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন—
كَلَّا إِنَّ الْإِنْسَانَ لَيَطْغَىٰ أَنْ رَآهُ اسْتَغْنَىٰ
কখনো নয়; নিশ্চয় মানুষ সীমালঙ্ঘন করে; কারণ, সে নিজেকে অভাবমুক্ত মনে করে। [সূরা আলাক : ৬-৭]

ইবনে কাসীর রহ. বলেন, আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক বলেন, দুই লোভী ব্যক্তি, যাদের পেট কখনও ভরে না। আলেম ও দুনিয়াদার। এই দুই ব্যক্তির মাঝে বিস্তর ব্যবধান রয়েছে। [কারণ, আলেমের ইলম অন্বেষণের আগ্রহ কখনোই কমে না বা হ্রাস পায় না, আর দুনিয়াদারের দুনিয়া উপার্জনের ফিকির কখনোই তাকে ছাড়ে না।] আলেম ব্যক্তির আল্লাহর সন্তুষ্টি বৃদ্ধি পেতে থাকে আর দুনিয়াদারের বৃদ্ধি পায় অবাধ্যতা। অতঃপর তিনি বলেন, আল্লাহ দুনিয়াদারদের সম্পর্কে ইরশাদ করেছেন–
كَلَّا إِنَّ الْإِنْسَانَ لَيَطْغَى أَنْ رَآهُ اسْتَغْنَى
কখনও নয়; নিশ্চয় মানুষ সীমালঙ্ঘন করে; কারণ, সে নিজেকে অভাবমুক্ত মনে করে। [সূরা আলাক : ৬-৭]

আর আলেমদের সম্পর্কে বলা হয়েছে–
إِنَّمَا يَخشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ
আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে কেবল আলেমরাই [জ্ঞানীরাই] তাঁকে ভয় করে। [সূরা ফাতির : ২৮]

এই হাদীসটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে মারফু সনদে বর্ণিত আছে–
مَنْهُومَانِ لَا يَشْبَعَانِ صَاحِبُ الْعِلْمِ وَصَاحِبُ الدُّنْيَا.
দুই লোভী ব্যক্তি কখনও তৃপ্ত হয় না। [১] ইলম অন্বেষণকারী। [২] দুনিয়া অন্বেষণকারী। [সুনানে দারেমী : ৩৪১] [তাফসীরে ইবনে কাসীর : ৮/৪৩৭]

📘 দুনিয়ার মোহে পড়বেন না 📄 ১২. দুনিয়ার বিনিময়ে দ্বীন বিক্রি

📄 ১২. দুনিয়ার বিনিময়ে দ্বীন বিক্রি


আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন–
بَادِرُوا بِالْأَعْمَالِ فِتَنًا كَقِطَعِ اللَّيْلِ الْمُظْلِمِ يُصْبِحُ الرَّجُلُ مُؤْمِنًا وَيُمْسِي كَافِرًا وَيُمْسِي مُؤْمِنًا وَيُصْبِحُ كَافِرًا، يَبِيعُ دِينَهُ بِعَرَضِ مِنَ الدُّنْيَا.
আঁধার রাতের মতো ফিতনা আসার পূর্বেই তোমরা সৎ আমলের দিকে ধাবিত হও। সে সময় সকালে একজন মুমিন হলে বিকালে কাফের হয়ে যাবে। বিকালে মুমিন হলে সকালে কাফের হয়ে যাবে। দুনিয়ার সামান্য সম্পদের বিনিময়ে সে তার দ্বীন বিক্রি করে বসবে। [সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৩১৪, সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ২১৪৫, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ৪০০৩০]

📘 দুনিয়ার মোহে পড়বেন না 📄 ১৩. আল্লাহ ﷻ সম্পর্কে না-হক বলা

📄 ১৩. আল্লাহ ﷻ সম্পর্কে না-হক বলা


দুনিয়ার মহব্বতের কারণে মানুষ আল্লাহ সম্পর্কে না জেনে কথা বলে, দ্বীনের মধ্যে নতুন নতুন জিনিস আবিষ্কার করে তথা বিদআত সৃষ্টি করে।

ইবনুল কাইয়িম বলেন, মহা মূল্যবান বাণী- যে সকল আলেম দুনিয়াকে প্রাধান্য দেয়, দুনিয়াকে ভালোবাসে অতি অবশ্যই তারা তাদের ফতোয়া, আদেশ, সংবাদপ্রদান ও আবশ্যককরণে আল্লাহর ব্যাপারে না-হক কথা বলে। কেননা, আল্লাহর হুকুম-আহকাম ও বিধি-বিধান অধিকাংশ মানুষের দুনিয়াবি স্বার্থ ও নফসানি চাহিদার বিরোধী হয়। বিশেষত নেতৃত্ব ও ক্ষমতার অধিকারীদের এবং যারা প্রবৃত্তির পূজারী, তাদের। কেননা, আল্লাহর আদেশ-নিষেধের বিরোধিতা ও বিভিন্ন হুকুম-আহকাম লঙ্ঘন না করে তাদের স্বার্থ হাসিল হয় না। সুতরাং, কোনো আলেম বা শাসক যখন ক্ষমতার লোভ করে, নেতৃত্বকে ভালোবাসে এবং প্রবৃত্তির অনুসরণ করে, তখন তাদের স্বার্থের বিরোধী সত্যকে প্রত্যাখ্যান না করে নিজেদের উদ্দেশ্য সাধন করতে পারে না। বিশেষ করে যখন কোথাও কোনো বিষয়ে হক-না-হকের অস্পষ্টতা সৃষ্টি হয়, তখন তাদের প্রবৃত্তির কাম্য দিকটিই প্রাধান্য পায়। তাদের ভেতরের প্রবৃত্তি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। সত্য তখন আড়ালে পড়ে যায়। সত্যের চেহারা অন্ধকারে হারিয়ে যায়। আর যদি সত্য একেবারেই প্রকাশ্য ও সুস্পষ্ট হয়, যাতে কোনো ধরনের অস্পষ্টতা ও সন্দেহের অবকাশ থাকে না, তা হলে সে সরাসরি সত্যের বিরোধিতায় লিপ্ত হয় এবং বলে- তাওবা করে আমি মুক্তি পেয়ে যাব; এ থেকে বেরিয়ে যাবে। এদের ব্যাপারে এবং এদের মতো অন্যান্যদের ব্যাপারেই আল্লাহ পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন-

فَخَلَفَ مِنْ بَعْدِهِمْ خَلْفٌ أَضَاعُوا الصَّلوةَ وَاتَّبَعُوا الشَّهَوَاتِ فَسَوْفَ يَلْقَوْنَ غَيًّا
অতঃপর তাদের পরে এল অপদার্থ পরবর্তী। তারা নামায নষ্ট করল এবং কুপ্রবৃত্তির অনুবর্তী হল। সুতরাং, অচিরেই তারা কুকর্মের শাস্তি প্রত্যক্ষ করবে। [সুরা মারইয়াম : ৫৯]

অপর এক আয়াতে তিনি ইরশাদ করেছেন-
ফখলফা مِنْ بَعْدِهِمْ خَلْفٌ وَرِثُوا الْكِتَبَ يَأْخُذُونَ عَرَضَ هَذَا الْأَدْنَىٰ وَيَقُولُونَ سَيُغْفَرُ لَنَا ۚ وَإِنْ يَأْتِهِمْ عَرَضٌ مِثْلُهُ يَأْخُذُوهُ ۚ أَلَمْ يُؤْخَذْ عَلَيْهِمْ مِيثَقُ الْكِتَبِ أَنْ لَا يَقُولُوا عَلَى اللَّهِ إِلَّا الْحَقَّ وَدَرَسُوا مَا فِيهِ ۚ وَالدَّارُ الْآخِرَةُ خَيْرٌ لِلَّذِينَ يَتَّقُونَ ۗ أَفَلَا تَعْقِلُونَ

তারপর তাদের পেছনে এসেছে কিছু অপদার্থ, যারা উত্তরাধিকারী হয়েছে কিতাবের; তারা নিকৃষ্ট পার্থিব উপকরণ আহরণ করছে এবং বলছে, আমাদের ক্ষমা করে দেওয়া হবে। বস্তুত, এমনই ধরনের উপকরণ যদি আবারও তাদের সামনে উপস্থিত হয়, তবে তাও তুলে নেবে। তাদের কাছ থেকে কিতাবে কি অঙ্গীকার নেওয়া হয়নি যে, আল্লাহর প্রতি সত্য ছাড়া কিছু বলবে না? অথচ তারা সে সবই পাঠ করেছে, যা তাতে লেখা রয়েছে। বস্তুত আখেরাতের আলয় মুত্তাকীদের জন্য উত্তম, তোমরা কি তা বোঝ না? [সুরা আ'রাফ : ১৬৯]

আল্লাহ জানিয়ে দিচ্ছেন, তারা দুনিয়ার সামান্য ও তুচ্ছ বস্তু গ্রহণ করেছে সেগুলো তাদের জন্য হারাম হওয়ার জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও। আর তারা বলেছে, অচিরেই আমাদের ক্ষমা করে দেওয়া হবে। যদি এ জাতীয় বস্তু আবারও তাদের সামনে আসে, তা হলে তাও তারা গ্রহণ করে নেবে। এ ব্যাপারে তারা সংকটকারী, হঠকারী। আর এটাই তাদেরকে আল্লাহর ব্যাপারে অসত্য ও অন্যায় কথা বলতে উৎসাহিত করে। ফলে তারা বলে, এটাই আল্লাহর হুকুম, এটাই তাঁর শরীয়ত ও দ্বীন। অথচ তারা খুব ভালোভাবেই জানে, আল্লাহর দ্বীন, শরীয়ত ও হুকুম এর সম্পূর্ণ বিপরীত। তারা কি জানে না, আল্লাহর দ্বীন শরীয়ত ও হুকুম কী? কখনও তারা আল্লাহর ব্যাপারে এমন কথা বলে, যার কোনো জ্ঞান তাদের নেই। আবার কখনও এমন কথা বলে, যা বাতিল হওয়ার স্পষ্ট জ্ঞান তাদের আছে।

পক্ষান্তরে যারা মুত্তাকী, যারা আল্লাহকে ভয় করে, তারা জানে আখেরাত দুনিয়া থেকে উত্তম। ফলে নেতৃত্বের ভালোবাসা ও প্রবৃত্তি তাদেরকে দুনিয়াকে আখেরাতের উপর প্রাধান্য দিতে উদ্বুদ্ধ করতে পারে না। আর তাদের পথ হল, তারা কুরআন ও সুন্নাহকে মজবুতভাবে আঁকড়ে থাকে। ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করে। দুনিয়া ও দুনিয়ার তুচ্ছতা এবং নশ্বরশীলতা নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করে। আখেরাত, আখেরাতের অনিবার্য আগমন ও তার স্থায়িত্ব নিয়ে ফিকির করে।

পক্ষান্তরে দুনিয়ালোভী ও ক্ষমতার মোহগ্রস্তরা আমলের ক্ষেত্রে অন্যায়-পাপাচারের সাথে সাথে অবশ্যম্ভাবীরূপে দীনের মধ্যে বিদআতেরও সৃষ্টি করে। এভাবে তাদের ক্ষেত্রে দু’টি মন্দ বিষয় একসঙ্গে জমা হয়। কেননা, প্রবৃত্তিপূজা মানুষের অন্তরের চোখকে অন্ধ বানিয়ে দেয়। ফলে সে সুন্নাত ও বিদআতের মধ্যে পার্থক্য করতে পারে না। কিংবা উল্টো বোঝে। তখন বিদআতকে মনে করে সুন্নাত আর সুন্নাতকে মনে করে বিদআত। এই হচ্ছে আলেমদের বিপদ- যখন তারা দুনিয়াকে প্রাধান্য দেয়, নেতৃত্বকে ভালোবাসে এবং প্রবৃত্তির অনুসরণ করে। নিম্নোক্ত আয়াতে আল্লাহ তাদের কথাই আলোচনা করেছেন–

وَاتْلُ عَلَيْهِمْ نَبَأَ الَّذِي آتَيْنَاهُ آيَاتِنَا فَانْسَلَخَ مِنْهَا فَأَتْبَعَهُ الشَّيْطَانُ فَكَانَ مِنَ الْغَاوِينَ ۝ وَلَوْ شِئْنَا لَرَفَعْنَاهُ بِهَا وَلَكِنَّهُ أَخْلَدَ إِلَى الْأَرْضِ وَاتَّبَعَ هَوَاهُ

আর আপনি তাদেরকে শুনিয়ে দিন, সে লোকের অবস্থা, যাকে আমি নিজের নিদর্শনসমূহ দান করেছিলাম, অথচ সে তা পরিহার করে বেরিয়ে গেছে। আর তার পেছনে লেগেছে শয়তান, ফলে সে পথভ্রষ্টদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়েছে। অবশ্য আমি ইচ্ছা করলে তার মর্যাদা বাড়িয়ে দিতাম উক্ত নিদর্শনসমূহের বদৌলতে। কিন্তু সে পৃথিবীর প্রতি ঝুঁকে পড়েছে এবং নিজ প্রবৃত্তির অনুসরণ করেছে। [সূরা আ'রাফ : ১৭৫-১৭৬]

এ হচ্ছে নিকৃষ্ট আলেমের উদাহরণ, যে স্বীয় ইলমের বিপরীত আমল করে। [আল-ফাওয়াইদ: ১০০-১০১]

📘 দুনিয়ার মোহে পড়বেন না 📄 ১৪. পুণ্যকর্ম ছেড়ে দেওয়া

📄 ১৪. পুণ্যকর্ম ছেড়ে দেওয়া


দুনিয়ার মহব্বতের ফলে মানুষ সৎ কাজের আদেশ, অসৎ কাজের নিষেধ এবং আল্লাহর পথের জিহাদ ছেড়ে দেয়।

আল্লাহ পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন–
يٰۤاَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰমَنُوْا مَا لَكُمْ اِذَا قِيْلَ لَكُمُ انْفِرُوْا فِيْ سَبِيْلِ اللّٰهِ اثَّاقَلْتُمْ اِلَى الْاَرْضِ اَرَضِيْتُمْ بِالْحَيٰوةِ الدُّنْيَا مِنَ الْآخِرَةِ فَمَا مَتَاعُ الْحَيٰوةِ الدُّنْيَا فِي الْآخِرَةِ اِلَّا قَلِيْلٌ

হে ঈমানদারগণ! তোমাদের কী হল, যখন আল্লাহর পথে বের হওয়ার জন্য তোমাদের বলা হয়, তখন মাটি জড়িয়ে ধর, তোমরা কি আখেরাতের পরিবর্তে দুনিয়ার জীবনে পরিতুষ্ট হয়ে গেলে? অথচ আখেরাতের তুলনায় দুনিয়ার জীবনের উপকরণ অতি অল্প। [সুরা তাওবা : ৩৮]

আবু সাঈদ খুদরী থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন–
«أَلَا لَا يَمْنَعَنَّ أَحَدَكُمْ رَهْبَةُ النَّاسِ أَنْ يَقُولَ بِحَقٍّ إِذَا رَآهُ أَوْ شَهِدَهُ فَإِنَّهُ لَا يُقَرِّبُ مِنْ أَجَلٍ وَلَا يُبَاعِدُ مِنْ رِزْقٍ أَنْ يَقُولَ بِحَقٍّ أَوْ يُذَكِّرَ بِعَظِيمٍ.

সাবধান! মানুষের ভয় যেন তোমাদের কাউকে সত্য কথা বলা থেকে বিরত না রাখে, যখন সে সত্যটি জানে বা প্রত্যক্ষ করে। কেননা, কারও সত্য কথা বলা বা মহান কোনো কাজকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া তাকে তার মৃত্যুর কাছাকাছি টেনে নেয় না এবং তার রিযিক থেকে দূরে সরিয়েও দেয় না। [মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ১১৪৮৪]

ফন্ট সাইজ
15px
17px