📘 দুনিয়ার মোহে পড়বেন না 📄 ৮. আল্লাহ ﷻ-র স্মরণ থেকে মাহরূমি

📄 ৮. আল্লাহ ﷻ-র স্মরণ থেকে মাহরূমি


দুনিয়ার মহব্বত বান্দাকে আল্লাহর যিকির থেকে বিরত রাখে। তাকে আল্লাহর যিকির করতে দেয় না। সব সময় উদাসীনতা, গাফলতি ও দুনিয়ার ফিকিরে ডুবিয়ে রাখে।

ইবনুল কায়্যিম বলেন, দুনিয়ার মহব্বতের সবচেয়ে নিম্ন স্তরের যে ক্ষতি তা হচ্ছে— দুনিয়ার মহব্বত বান্দার অন্তরকে আল্লাহর ভালোবাসা ও তাঁর স্মরণ থেকে গাফেল করে দেয়। যার ধন-সম্পদ তাকে আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল করে দেয়, সে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত। আর কোনো অন্তর যখন আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল হয়ে যায়, শয়তান তখন সেখানে স্থান করে নেয় এবং যেদিকে ইচ্ছা অন্তরকে সেদিকেই নিয়ে যায়। [ইদাতুস সাবিরিন : ১৮৬]

ইবনুল জাওযী বলেন, আল্লাহর কসম! দুনিয়া যদি প্রত্যেক ত্বরীয়তের জন্য একদম সুস্থ ও পরিচ্ছন্ন হয়, প্রত্যেক অনুসন্ধানকারীর জন্য তা সহজলভ্য হয় এবং আমাদের জন্য তা স্থায়ী হয়, কোনো হিতাধিকারী একে আমাদের থেকে কখনও ছিনিয়ে না নেয়, তবুও দুনিয়া থেকে বিমুখ হওয়া এবং দুনিয়াকে এড়িয়ে চলা আমাদের জন্য ফরয; অবশ্য কর্তব্য। কেননা, দুনিয়া বান্দাকে আল্লাহ থেকে বিমুখ করে দেয়। আর কোনো নেয়ামত যখন নেয়ামতদাতা থেকে বিমুখ করে দেয়, তখন তা মসিবতেরই কারণ হয়। [আত-তাফসিরাতুল ফিল-ওয়াজ : ৭১]

📘 দুনিয়ার মোহে পড়বেন না 📄 ৯. দুনিয়াই চূড়ান্ত লক্ষ্যে পরিণত হয়

📄 ৯. দুনিয়াই চূড়ান্ত লক্ষ্যে পরিণত হয়


দুনিয়ার মহব্বতকারীদের নিকট দুনিয়াই চূড়ান্ত লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যে পরিণত হয়।

ইবনুল কায়্যিম বলেন, যখন কেউ দুনিয়াকে মহব্বত করে, তখন দুনিয়াই তার চূড়ান্ত লক্ষ্য-উদ্দেশ্যে পরিণত হয়। আল্লাহ যেসব আমলকে তাঁর সন্তুষ্টি ও আখেরাত লাভের জন্য নির্ধারণ করেছেন, সেসব আমলকে সে দুনিয়া উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে। এভাবে বিষয়টি সম্পূর্ণ পাল্টে যায় এবং তার হিকমত ওলট-পালট হয়ে যায়। পরিণতিতে তার অন্তরও সম্পূর্ণরূপে উল্টে যায় এবং সে তার বক্র অন্তরের অনুসরণ করে এবং তার পিছনে পিছনে চলতে থাকে। এখানে দু'টি মন্দ বিষয় একত্র হয়েছে। প্রথমত, সে মাধ্যমকেই লক্ষ্য বানিয়ে নিয়েছে। দ্বিতীয়ত, আখেরাতের আমলকে দুনিয়া উপার্জনের মাধ্যমরূপে গ্রহণ করেছে। এটা সর্ব দিক থেকে সর্বাধিক নিকৃষ্ট ওলট-পালট। এভাবে তার অন্তরও মন্দভাবে উল্টে গেছে। এদের ব্যাপারেই আল্লাহ পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন–
مَنْ كَانَتْ يُرِيدُ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا وَزِينَتَهَا نُوَفِّ إِلَيْهِمْ أَعْمَالَهُمْ فِيهَا وَهُمْ فِيهَا لَا يُبْخَسُونَ ۝ أُولَئِكَ الَّذِينَ لَيْسَ لَهُمْ فِي الْآخِرَةِ إِلَّا النَّارُ ۖ وَحَبِطَ مَا صَنَعُوا فِيهَا وَبَاطِلٌ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ

যারা পার্থিব জীবন ও তার চাকচিক্যই কামনা করে, আমি তাদের দুনিয়াতেই তাদের আমলের পূর্ণ প্রতিফল ভোগ করিয়ে দেব এবং তাতে তাদের প্রতি কিছুমাত্র কমতি করা হবে না। এরাই হল সেসব লোক, আখেরাতে যাদের জন্য আগুন ছাড়া আর কিছুই নেই। তারা এখানে যা কিছু করেছিল সবই বরবাদ করেছে; আর যা কিছু উপার্জন করেছিল, সবই বিনষ্ট হল। [সুরা হুদ : ১৫-১৬]

আরেক আয়াতে তিনি ইরশাদ করেছেন–
مَنْ كَانَتْ يُرِيدُ الْعَاجِلَةَ عَجَّلْنَا لَهُ فِيهَا مَا نَشَاءُ لِمَنْ نُرِيدُ ثُمَّ جَعَلْنَا لَهُ جَهَنَّمَ ۖ يَصْلَاهَا مَذْمُومًا مَّدْحُورًا

যে কেউ দুনিয়া কামনা করে, আমি সেসব লোককে যা ইচ্ছা এখানেই দিয়ে দিই। অতঃপর তাদের জন্য জাহান্নাম নির্ধারণ করি। ওরা তাতে প্রবেশ করবে নিন্দিত-বিতাড়িত অবস্থায়। [সুরা বনী ইসরাঈল : ১৮]

অপর এক আয়াতে তিনি ইরশাদ করেছেন–
مَنْ كَانَتْ يُرِيدُ حَرْثَ الْآخِرَةِ نَزِدْ لَهُ فِي حَرْثِهِ ۖ وَمَنْ كَانَتْ يُرِيدُ حَرْثَ الدُّنْيَا نُؤْتِهِ مِنْهَا وَمَا لَهُ فِي الْآخِرَةِ مِنْ نَصِيبٍ

যে কেউ পরকালের ফসল কামনা করে, আমি তার জন্য সেই ফসল বাড়িয়ে দিই। আর যে ইহকালের ফসল কামনা করে, আমি তাকে তার কিছু দিয়ে দিই এবং পরকালে তার কোনো অংশ থাকবে না। [সূরা শূরা : ২০]

এখানে তিনটি আয়াত উল্লেখ করা হয়েছে, যার একটি অপরটির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তিনটি আয়াতই প্রায় একই রকম অর্থ প্রদান করে। অর্থাৎ যে ব্যক্তি তার আমলের দ্বারা আল্লাহ ও আখেরাতের পরিবর্তে দুনিয়া ও দুনিয়ার সৌন্দর্য কামনা করে, সে তা-ই পাবে যা সে কামনা করে। তা ব্যতীত সে আর কিছুই পাবে না। আখেরাতে তার কোনো অংশ থাকবে না। এ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ-র বহু হাদীস বর্ণিত আছে, যা এ আয়াতগুলোর অর্থকে সমর্থন করে এবং এগুলোর ব্যাখ্যান্বরূপ। [ইদ্দাতুস সাবিরীন : ১৮৬]

📘 দুনিয়ার মোহে পড়বেন না 📄 ১০. সওয়াব অর্জন থেকে বঞ্চিত হওয়া

📄 ১০. সওয়াব অর্জন থেকে বঞ্চিত হওয়া


দুনিয়ার মহব্বতের কারণে বান্দা সাওয়াব অর্জন থেকে বঞ্চিত হয় এবং তার আমল বিনষ্ট হয়।

ইবনুল কাইয়িম বলেন, লক্ষ করে দেখ, দুনিয়ার মহব্বত মুজাহিদের মধ্যে ওই মুজাহিদের পুণ্য ও সাওয়াবকে কীভাবে ধ্বংস করে দিয়েছে, [যে দুনিয়ার জন্য জিহাদ করেছে!] কীভাবে দুনিয়ার মহব্বত তার আমলসমূহকে বিনষ্ট করে ফেলেছে এবং তাকে সর্বপ্রথম জাহান্নামে প্রবেশকারীদের অন্তর্ভুক্ত করে দিয়েছে! [ইদ্দাতুস সাবিরীন : ১৮৮]

📘 দুনিয়ার মোহে পড়বেন না 📄 ১১. অবাধ্যতা

📄 ১১. অবাধ্যতা


দুনিয়ার মহব্বত সীমালঙ্ঘন ও অবাধ্যতার কারণ।

আল্লাহ পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন—
كَلَّا إِنَّ الْإِنْسَانَ لَيَطْغَىٰ أَنْ رَآهُ اسْتَغْنَىٰ
কখনো নয়; নিশ্চয় মানুষ সীমালঙ্ঘন করে; কারণ, সে নিজেকে অভাবমুক্ত মনে করে। [সূরা আলাক : ৬-৭]

ইবনে কাসীর রহ. বলেন, আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক বলেন, দুই লোভী ব্যক্তি, যাদের পেট কখনও ভরে না। আলেম ও দুনিয়াদার। এই দুই ব্যক্তির মাঝে বিস্তর ব্যবধান রয়েছে। [কারণ, আলেমের ইলম অন্বেষণের আগ্রহ কখনোই কমে না বা হ্রাস পায় না, আর দুনিয়াদারের দুনিয়া উপার্জনের ফিকির কখনোই তাকে ছাড়ে না।] আলেম ব্যক্তির আল্লাহর সন্তুষ্টি বৃদ্ধি পেতে থাকে আর দুনিয়াদারের বৃদ্ধি পায় অবাধ্যতা। অতঃপর তিনি বলেন, আল্লাহ দুনিয়াদারদের সম্পর্কে ইরশাদ করেছেন–
كَلَّا إِنَّ الْإِنْسَانَ لَيَطْغَى أَنْ رَآهُ اسْتَغْنَى
কখনও নয়; নিশ্চয় মানুষ সীমালঙ্ঘন করে; কারণ, সে নিজেকে অভাবমুক্ত মনে করে। [সূরা আলাক : ৬-৭]

আর আলেমদের সম্পর্কে বলা হয়েছে–
إِنَّمَا يَخشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ
আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে কেবল আলেমরাই [জ্ঞানীরাই] তাঁকে ভয় করে। [সূরা ফাতির : ২৮]

এই হাদীসটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে মারফু সনদে বর্ণিত আছে–
مَنْهُومَانِ لَا يَشْبَعَانِ صَاحِبُ الْعِلْمِ وَصَاحِبُ الدُّنْيَا.
দুই লোভী ব্যক্তি কখনও তৃপ্ত হয় না। [১] ইলম অন্বেষণকারী। [২] দুনিয়া অন্বেষণকারী। [সুনানে দারেমী : ৩৪১] [তাফসীরে ইবনে কাসীর : ৮/৪৩৭]

ফন্ট সাইজ
15px
17px