📄 ৬. আল্লাহ ﷻ-র যিকিরে স্বাদহীনতা
যে অন্তরে দুনিয়ার মহব্বত থাকে, সে অন্তর আল্লাহর যিকিরের স্বাদ অনুভব করতে পারে না।
ইবনে তাইমিয়া বলেন, অন্তরকে সৃষ্টি করা হয়েছে আল্লাহর যিকিরের জন্য। আর এ জন্যই আহলে শামের কোনো এক পূর্ববর্তী জ্ঞানী ব্যক্তি বলেছেন —আমার ধারণায় তাঁর নাম সুলাইমান আল- খাওয়াস— অন্তরের জন্য যিকির হচ্ছে দেহের জন্য খাদ্যের ন্যায়। সুতরাং, অসুস্থ শরীর যেমন খাদ্যের স্বাদ পায় না, তেমনি যে অন্তরে দুনিয়ার মহব্বত থাকে, সেই অন্তর যিকিরের স্বাদ ও মিষ্টতা অনুভব করতে পারে না। [মাজমুউল ফাতাওয়া : ৯/৩১২]
আবু ইমরান আল-মিসরী থেকে বর্ণিত, আল্লাহ দাউদ-র কাছে ওহী পাঠালেন– হে দাউদ! তুমি আমার মাঝে ও তোমার মাঝে এমন কোনো আলেমকে নির্বাচন করো না, যার অন্তরে দুনিয়ার মহব্বত জায়গা করে নিয়েছে। ... এ ধরনের আলেমদের আমি সর্বপ্রথম যে শাস্তি দেব, তা হচ্ছে তাদের অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে আমার সাথে মুনাজাতের স্বাদ কেড়ে নেব। [হাদীসে যইফাহ : ১৬৮]
📄 ৭. স্থায়ী দুশ্চিন্তা ও দারিদ্র্য
দুনিয়ার মহব্বত স্থায়ী দুশ্চিন্তা, অভাব-অনটন এবং কার্যক্রমে অস্থিরতা ও বিক্ষিপ্ততার কারণ।
নবী কারীম ইরশাদ করেছেন, যার জীবনে দুনিয়া উপার্জনই লক্ষ্য- উদ্দেশ্য হয়, আল্লাহ তার কার্যক্রমে অস্থিরতা ও বিক্ষিপ্ততা সৃষ্টি করে দেন। দারিদ্র্যকে তার চোখের সামনে প্রকট করে তোলেন। দুনিয়া সে ততটুকুই লাভ করতে পারে, যতটুকু আল্লাহ তার জন্য তার তাকদীরে লিখে রেখেছেন। পক্ষান্তরে যার জীবনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য হয় আখেরাত, আল্লাহ তার অন্তরে ধনাঢ্যতা ঢেলে দেন, তার অন্তরকে ধনী বানিয়ে দেন। তার যাবতীয় কাজকর্ম তার জন্য গুছিয়ে দেন। সুদূর দুনিয়া অপদস্থ হয়ে তার কাছে হাজির হয়।
ইবনুল কাইয়্যিম বলেন, এমনিভাবে যে ব্যক্তির যাবতীয় চিন্তা কিংবা বড় চিন্তা হচ্ছে দুনিয়া উপার্জন করা, তার অবস্থা হবে ঠিক তেমন, যেমনটা বর্ণিত হয়েছে সুনানে তিরমিযী ও অন্যান্য হাদীসগ্রন্থে উল্লিখিত আনাস ইবনে মালেক-র সূত্রে বর্ণিত হাদীসে। নবীজি ইরশাদ করেছেন-
مَنْ كَانَتِ الْآخِرَةُ هَمَّهُ جَعَلَ اللَّهُ غِنَاهُ فِي قَلْبِهِ وَجَمَعَ لَهُ شَمْلَهُ وَأَتَتْهُ الدُّنْيَا وَهِيَ رَاغِمَةٌ وَمَنْ كَانَتِ الدُّنْيَا هَمَّهُ جَعَلَ اللَّهُ فَقْرَهُ بَيْنَ عَيْنَيْهِ وَفَرَّقَ عَلَيْهِ শَمْلَهُ وَلَمْ يَأْتِهِ مِنَ الدُّنْيَا إِلَّا مَا قُدِّرَ لَهُ.
যে ব্যক্তির একমাত্র চিন্তার বিষয় হবে পরকাল, আল্লাহ সেই ব্যক্তির অন্তরকে অভাবমুক্ত করে দিবেন এবং তার যাবতীয় বিচ্ছিন্ন কাজ একত্র করে সুসংযত করে দিবেন। দুনিয়া অপদস্থ হয়ে তার কাছে হাজির হবে। আর যে ব্যক্তির একমাত্র চিন্তার বিষয় হবে দুনিয়া, আল্লাহ দারিদ্র্যকে তার চোখের সামনে তুলে ধরবেন এবং তার কাজকর্মকে বিচ্ছিন্ন ও বিক্ষিপ্ত করে দিবেন। আর দুনিয়া থেকে সে ততটুকুই লাভ করতে পারবে, যতটুকু তার তাকদীরে লিখে রাখা হয়েছে। [সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ২৪৬]
দুনিয়াতে তার সবচেয়ে বড় আযাব হল- তার কাজকর্মের বিচ্ছিন্নতা ও বিক্ষিপ্ততা, অন্তরের অশান্তি ও অস্থিরতা এবং চোখের সামনে সবসময় দারিদ্রতা ঝুলতে থাকা; যা থেকে সে কখনোই বিচ্ছিন্ন হতে পারবে না। দুনিয়াদার ও দুনিয়ার মহব্বতকারীদের যদি দুনিয়ার মহব্বতের নেশা না থাকত, তা হলে তারা এ আযাব থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য আল্লাহর দরবারে পানাহ চাইত। [ইগাসাতুল লাহফান : ১/৩৬]
📄 ৮. আল্লাহ ﷻ-র স্মরণ থেকে মাহরূমি
দুনিয়ার মহব্বত বান্দাকে আল্লাহর যিকির থেকে বিরত রাখে। তাকে আল্লাহর যিকির করতে দেয় না। সব সময় উদাসীনতা, গাফলতি ও দুনিয়ার ফিকিরে ডুবিয়ে রাখে।
ইবনুল কায়্যিম বলেন, দুনিয়ার মহব্বতের সবচেয়ে নিম্ন স্তরের যে ক্ষতি তা হচ্ছে— দুনিয়ার মহব্বত বান্দার অন্তরকে আল্লাহর ভালোবাসা ও তাঁর স্মরণ থেকে গাফেল করে দেয়। যার ধন-সম্পদ তাকে আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল করে দেয়, সে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত। আর কোনো অন্তর যখন আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল হয়ে যায়, শয়তান তখন সেখানে স্থান করে নেয় এবং যেদিকে ইচ্ছা অন্তরকে সেদিকেই নিয়ে যায়। [ইদাতুস সাবিরিন : ১৮৬]
ইবনুল জাওযী বলেন, আল্লাহর কসম! দুনিয়া যদি প্রত্যেক ত্বরীয়তের জন্য একদম সুস্থ ও পরিচ্ছন্ন হয়, প্রত্যেক অনুসন্ধানকারীর জন্য তা সহজলভ্য হয় এবং আমাদের জন্য তা স্থায়ী হয়, কোনো হিতাধিকারী একে আমাদের থেকে কখনও ছিনিয়ে না নেয়, তবুও দুনিয়া থেকে বিমুখ হওয়া এবং দুনিয়াকে এড়িয়ে চলা আমাদের জন্য ফরয; অবশ্য কর্তব্য। কেননা, দুনিয়া বান্দাকে আল্লাহ থেকে বিমুখ করে দেয়। আর কোনো নেয়ামত যখন নেয়ামতদাতা থেকে বিমুখ করে দেয়, তখন তা মসিবতেরই কারণ হয়। [আত-তাফসিরাতুল ফিল-ওয়াজ : ৭১]
📄 ৯. দুনিয়াই চূড়ান্ত লক্ষ্যে পরিণত হয়
দুনিয়ার মহব্বতকারীদের নিকট দুনিয়াই চূড়ান্ত লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যে পরিণত হয়।
ইবনুল কায়্যিম বলেন, যখন কেউ দুনিয়াকে মহব্বত করে, তখন দুনিয়াই তার চূড়ান্ত লক্ষ্য-উদ্দেশ্যে পরিণত হয়। আল্লাহ যেসব আমলকে তাঁর সন্তুষ্টি ও আখেরাত লাভের জন্য নির্ধারণ করেছেন, সেসব আমলকে সে দুনিয়া উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে। এভাবে বিষয়টি সম্পূর্ণ পাল্টে যায় এবং তার হিকমত ওলট-পালট হয়ে যায়। পরিণতিতে তার অন্তরও সম্পূর্ণরূপে উল্টে যায় এবং সে তার বক্র অন্তরের অনুসরণ করে এবং তার পিছনে পিছনে চলতে থাকে। এখানে দু'টি মন্দ বিষয় একত্র হয়েছে। প্রথমত, সে মাধ্যমকেই লক্ষ্য বানিয়ে নিয়েছে। দ্বিতীয়ত, আখেরাতের আমলকে দুনিয়া উপার্জনের মাধ্যমরূপে গ্রহণ করেছে। এটা সর্ব দিক থেকে সর্বাধিক নিকৃষ্ট ওলট-পালট। এভাবে তার অন্তরও মন্দভাবে উল্টে গেছে। এদের ব্যাপারেই আল্লাহ পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন–
مَنْ كَانَتْ يُرِيدُ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا وَزِينَتَهَا نُوَفِّ إِلَيْهِمْ أَعْمَالَهُمْ فِيهَا وَهُمْ فِيهَا لَا يُبْخَسُونَ أُولَئِكَ الَّذِينَ لَيْسَ لَهُمْ فِي الْآخِرَةِ إِلَّا النَّارُ ۖ وَحَبِطَ مَا صَنَعُوا فِيهَا وَبَاطِلٌ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ
যারা পার্থিব জীবন ও তার চাকচিক্যই কামনা করে, আমি তাদের দুনিয়াতেই তাদের আমলের পূর্ণ প্রতিফল ভোগ করিয়ে দেব এবং তাতে তাদের প্রতি কিছুমাত্র কমতি করা হবে না। এরাই হল সেসব লোক, আখেরাতে যাদের জন্য আগুন ছাড়া আর কিছুই নেই। তারা এখানে যা কিছু করেছিল সবই বরবাদ করেছে; আর যা কিছু উপার্জন করেছিল, সবই বিনষ্ট হল। [সুরা হুদ : ১৫-১৬]
আরেক আয়াতে তিনি ইরশাদ করেছেন–
مَنْ كَانَتْ يُرِيدُ الْعَاجِلَةَ عَجَّلْنَا لَهُ فِيهَا مَا نَشَاءُ لِمَنْ نُرِيدُ ثُمَّ جَعَلْنَا لَهُ جَهَنَّمَ ۖ يَصْلَاهَا مَذْمُومًا مَّدْحُورًا
যে কেউ দুনিয়া কামনা করে, আমি সেসব লোককে যা ইচ্ছা এখানেই দিয়ে দিই। অতঃপর তাদের জন্য জাহান্নাম নির্ধারণ করি। ওরা তাতে প্রবেশ করবে নিন্দিত-বিতাড়িত অবস্থায়। [সুরা বনী ইসরাঈল : ১৮]
অপর এক আয়াতে তিনি ইরশাদ করেছেন–
مَنْ كَانَتْ يُرِيدُ حَرْثَ الْآخِرَةِ نَزِدْ لَهُ فِي حَرْثِهِ ۖ وَمَنْ كَانَتْ يُرِيدُ حَرْثَ الدُّنْيَا نُؤْتِهِ مِنْهَا وَمَا لَهُ فِي الْآخِرَةِ مِنْ نَصِيبٍ
যে কেউ পরকালের ফসল কামনা করে, আমি তার জন্য সেই ফসল বাড়িয়ে দিই। আর যে ইহকালের ফসল কামনা করে, আমি তাকে তার কিছু দিয়ে দিই এবং পরকালে তার কোনো অংশ থাকবে না। [সূরা শূরা : ২০]
এখানে তিনটি আয়াত উল্লেখ করা হয়েছে, যার একটি অপরটির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তিনটি আয়াতই প্রায় একই রকম অর্থ প্রদান করে। অর্থাৎ যে ব্যক্তি তার আমলের দ্বারা আল্লাহ ও আখেরাতের পরিবর্তে দুনিয়া ও দুনিয়ার সৌন্দর্য কামনা করে, সে তা-ই পাবে যা সে কামনা করে। তা ব্যতীত সে আর কিছুই পাবে না। আখেরাতে তার কোনো অংশ থাকবে না। এ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ-র বহু হাদীস বর্ণিত আছে, যা এ আয়াতগুলোর অর্থকে সমর্থন করে এবং এগুলোর ব্যাখ্যান্বরূপ। [ইদ্দাতুস সাবিরীন : ১৮৬]