📄 ৫. আল্লাহ ﷻ-র মহব্বতে প্রতিবন্ধকতা
দুনিয়ার মহব্বত বান্দার মাঝে ও আখেরাতের উপকারী কর্মসমূহের মাঝে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে- বান্দা আখেরাতের কর্ম ছেড়ে দুনিয়ার মহব্বতে ডুবে থাকার কারণে। দুনিয়ার মহব্বতের ক্ষেত্রে মানুষের স্তর ও শ্রেণি ভিন্ন ভিন্ন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ আছে এমন, যাদেরকে দুনিয়ার মহব্বত ঈমান ও শরীয়াত থেকেই দূরে রাখে। আবার কেউ কেউ আছে, যাদেরকে তাদের দুনিয়ার মহব্বত সমস্ত ওয়াজিব ও অবশ্য পালনীয় কর্তব্য থেকে বিরত রাখে, যা আল্লাহর সন্তুষ্টিলাভ ও তাঁর মাখলুকের খেদমতোর জন্য পালন করা তার জন্য ওয়াজিব, আবশ্যক। কিন্তু সে না সেগুলোকে বাহ্যিকভাবে পালন করে, না গোপনে পালন করে। আবার কেউ কেউ আছে এমন, যাদেরকে তাদের দুনিয়ার মহব্বত বহু করণীয় কাজ থেকে বিরত রাখে। কেউ কেউ আছে, যাদেরকে তাদের দুনিয়ার মহব্বত ওই ওয়াজিব থেকে বিরত রাখে, যা তার দুনিয়াদারির পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে, যদিও সে অন্যান্য ওয়াজিব সঠিকভাবে পালন করে। আবার কেউ কেউ আছে, যাদেরকে তাদের দুনিয়ার মহব্বত কোনো ওয়াজিব যে সময় যেভাবে আদায় করা ওয়াজিব, তা সে সময় সেভাবে আদায় করা থেকে বিরত রাখে। ফলে সে উক্ত কর্তব্য সময় মতো আদায় করে না; যথাযথভাবে হক আদায় করে পালন করে না। আবার কেউ কেউ আছে, যাদেরকে তাদের দুনিয়ার মহব্বত কোনো ওয়াজিবকে অন্তর দিয়ে এবং একনিষ্ঠভাবে কেবল আল্লাহরই জন্য আদায় করা থেকে বিরত রাখে। ফলে সে যদিও তা বাহ্যিকভাবে আদায় করে, কিন্তু অন্তর দিয়ে অন্তর থেকে আদায় করে না। দুনিয়ার মহব্বতের সর্বনিম্ন স্তর হল, এটা বান্দাকে সৌভাগ্য লাভ করা থেকে বিরত রাখে। আর তা হচ্ছে— অন্তরকে একমাত্র আল্লাহর জন্য খালি করে দেওয়া, জিহ্বাকে তাঁর যিকিরে ব্যস্ত রাখা, তার অন্তরকে জ্ঞানের উপর একত্র করা এবং তার জবান ও অন্তরকে তাঁর রবের জন্য একত্র করা। সুতরাং, দুনিয়ার মোহ ও ভালোবাসা বান্দার আখিরাতকে সন্দেহাতীতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে, যেমন বান্দার আখিরাতের ভালোবাসা তার দুনিয়া অর্জনকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। যেমন, পবিত্র হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, আবু মূসা আশআরী থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন— مَنْ أَحَبَّ دُنْيَاهُ أَضَرَّ بِآخِرَتِهِ وَمَنْ أَحَبَّ آخِرَتَهُ أَضَرَّ بِدُنْيَاهُ فَآثِرُوا مَا يَبْقَى عَلَى مَا يَفْنَى
যে ব্যক্তি দুনিয়াকে ভালোবাসবে সে তার আখিরাতের ব্যাপারে ক্ষতির সম্মুখীন হবে, আর যে ব্যক্তি আখিরাতকে ভালোবাসবে সে তার দুনিয়ার ব্যাপারে ক্ষতির সম্মুখীন হবে। সুতরাং, যা কিছু স্থায়ী তাকে তোমরা ক্ষণস্থায়ী বিষয়ের উপর প্রাধান্য দাও। [মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ১৬৬৯৭ ও ১৬৬৯৮] [ইদ্দাতুস সাবিরীন : ৮৮]
দুনিয়ার মোহ ও ভালোবাসা বান্দার অন্তরে আল্লাহর মহব্বত সৃষ্টিতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।
イবনে তাইমিয়া বলেন, এটা কীভাবে হতে পারে [ওই অন্তরে আল্লাহর মহব্বত কীভাবে থাকতে পারে], যে অন্তরের উপর এমনসব জিনিস বিজয় লাভ করেছে, যা অন্তরকে দাসে পরিণত করতে দিনার-দিরহামের চেয়েও অগ্রগামী?! আর তা হচ্ছে— আসক্তি, প্রবৃত্তিপূজা ও নফসের প্রিয় বস্তুসমূহের মহব্বত। যা বান্দাকে আল্লাহর পরিপূর্ণ মহব্বত ও তাঁর ইবাদত থেকে বিরত রাখে; দূরে সরিয়ে দেয়। কেননা, তার অন্তরে তো আল্লাহর মহব্বতের প্রতিদ্বন্দ্বী বিষয়সমূহ এবং মাখলুকের সঙ্গে শিরক বিদ্যমান। এ সকল বিষয় কত প্রচণ্ডভাবেই না বান্দার অন্তরকে তার রবের পরিপূর্ণ মহব্বত, তাঁর ভয়-ভর ও ইবাদত থেকে দূরে সরিয়ে দেয়! বস্তু বানিয়ে দেয়! কেননা, প্রত্যেক প্রেমাস্পদ তার প্রেমিকের অন্তর কেবল নিজের দিকেই আকর্ষণ করে এবং সে ছাড়া অন্য কাউকে মহব্বত করা থেকে বিরত রাখে। [আয-যুহদ ওয়াল-ওরা : ৩৮]
📄 ৬. আল্লাহ ﷻ-র যিকিরে স্বাদহীনতা
যে অন্তরে দুনিয়ার মহব্বত থাকে, সে অন্তর আল্লাহর যিকিরের স্বাদ অনুভব করতে পারে না।
ইবনে তাইমিয়া বলেন, অন্তরকে সৃষ্টি করা হয়েছে আল্লাহর যিকিরের জন্য। আর এ জন্যই আহলে শামের কোনো এক পূর্ববর্তী জ্ঞানী ব্যক্তি বলেছেন —আমার ধারণায় তাঁর নাম সুলাইমান আল- খাওয়াস— অন্তরের জন্য যিকির হচ্ছে দেহের জন্য খাদ্যের ন্যায়। সুতরাং, অসুস্থ শরীর যেমন খাদ্যের স্বাদ পায় না, তেমনি যে অন্তরে দুনিয়ার মহব্বত থাকে, সেই অন্তর যিকিরের স্বাদ ও মিষ্টতা অনুভব করতে পারে না। [মাজমুউল ফাতাওয়া : ৯/৩১২]
আবু ইমরান আল-মিসরী থেকে বর্ণিত, আল্লাহ দাউদ-র কাছে ওহী পাঠালেন– হে দাউদ! তুমি আমার মাঝে ও তোমার মাঝে এমন কোনো আলেমকে নির্বাচন করো না, যার অন্তরে দুনিয়ার মহব্বত জায়গা করে নিয়েছে। ... এ ধরনের আলেমদের আমি সর্বপ্রথম যে শাস্তি দেব, তা হচ্ছে তাদের অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে আমার সাথে মুনাজাতের স্বাদ কেড়ে নেব। [হাদীসে যইফাহ : ১৬৮]
📄 ৭. স্থায়ী দুশ্চিন্তা ও দারিদ্র্য
দুনিয়ার মহব্বত স্থায়ী দুশ্চিন্তা, অভাব-অনটন এবং কার্যক্রমে অস্থিরতা ও বিক্ষিপ্ততার কারণ।
নবী কারীম ইরশাদ করেছেন, যার জীবনে দুনিয়া উপার্জনই লক্ষ্য- উদ্দেশ্য হয়, আল্লাহ তার কার্যক্রমে অস্থিরতা ও বিক্ষিপ্ততা সৃষ্টি করে দেন। দারিদ্র্যকে তার চোখের সামনে প্রকট করে তোলেন। দুনিয়া সে ততটুকুই লাভ করতে পারে, যতটুকু আল্লাহ তার জন্য তার তাকদীরে লিখে রেখেছেন। পক্ষান্তরে যার জীবনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য হয় আখেরাত, আল্লাহ তার অন্তরে ধনাঢ্যতা ঢেলে দেন, তার অন্তরকে ধনী বানিয়ে দেন। তার যাবতীয় কাজকর্ম তার জন্য গুছিয়ে দেন। সুদূর দুনিয়া অপদস্থ হয়ে তার কাছে হাজির হয়।
ইবনুল কাইয়্যিম বলেন, এমনিভাবে যে ব্যক্তির যাবতীয় চিন্তা কিংবা বড় চিন্তা হচ্ছে দুনিয়া উপার্জন করা, তার অবস্থা হবে ঠিক তেমন, যেমনটা বর্ণিত হয়েছে সুনানে তিরমিযী ও অন্যান্য হাদীসগ্রন্থে উল্লিখিত আনাস ইবনে মালেক-র সূত্রে বর্ণিত হাদীসে। নবীজি ইরশাদ করেছেন-
مَنْ كَانَتِ الْآخِرَةُ هَمَّهُ جَعَلَ اللَّهُ غِنَاهُ فِي قَلْبِهِ وَجَمَعَ لَهُ شَمْلَهُ وَأَتَتْهُ الدُّنْيَا وَهِيَ رَاغِمَةٌ وَمَنْ كَانَتِ الدُّنْيَا هَمَّهُ جَعَلَ اللَّهُ فَقْرَهُ بَيْنَ عَيْنَيْهِ وَفَرَّقَ عَلَيْهِ শَمْلَهُ وَلَمْ يَأْتِهِ مِنَ الدُّنْيَا إِلَّا مَا قُدِّرَ لَهُ.
যে ব্যক্তির একমাত্র চিন্তার বিষয় হবে পরকাল, আল্লাহ সেই ব্যক্তির অন্তরকে অভাবমুক্ত করে দিবেন এবং তার যাবতীয় বিচ্ছিন্ন কাজ একত্র করে সুসংযত করে দিবেন। দুনিয়া অপদস্থ হয়ে তার কাছে হাজির হবে। আর যে ব্যক্তির একমাত্র চিন্তার বিষয় হবে দুনিয়া, আল্লাহ দারিদ্র্যকে তার চোখের সামনে তুলে ধরবেন এবং তার কাজকর্মকে বিচ্ছিন্ন ও বিক্ষিপ্ত করে দিবেন। আর দুনিয়া থেকে সে ততটুকুই লাভ করতে পারবে, যতটুকু তার তাকদীরে লিখে রাখা হয়েছে। [সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ২৪৬]
দুনিয়াতে তার সবচেয়ে বড় আযাব হল- তার কাজকর্মের বিচ্ছিন্নতা ও বিক্ষিপ্ততা, অন্তরের অশান্তি ও অস্থিরতা এবং চোখের সামনে সবসময় দারিদ্রতা ঝুলতে থাকা; যা থেকে সে কখনোই বিচ্ছিন্ন হতে পারবে না। দুনিয়াদার ও দুনিয়ার মহব্বতকারীদের যদি দুনিয়ার মহব্বতের নেশা না থাকত, তা হলে তারা এ আযাব থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য আল্লাহর দরবারে পানাহ চাইত। [ইগাসাতুল লাহফান : ১/৩৬]
📄 ৮. আল্লাহ ﷻ-র স্মরণ থেকে মাহরূমি
দুনিয়ার মহব্বত বান্দাকে আল্লাহর যিকির থেকে বিরত রাখে। তাকে আল্লাহর যিকির করতে দেয় না। সব সময় উদাসীনতা, গাফলতি ও দুনিয়ার ফিকিরে ডুবিয়ে রাখে।
ইবনুল কায়্যিম বলেন, দুনিয়ার মহব্বতের সবচেয়ে নিম্ন স্তরের যে ক্ষতি তা হচ্ছে— দুনিয়ার মহব্বত বান্দার অন্তরকে আল্লাহর ভালোবাসা ও তাঁর স্মরণ থেকে গাফেল করে দেয়। যার ধন-সম্পদ তাকে আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল করে দেয়, সে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত। আর কোনো অন্তর যখন আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল হয়ে যায়, শয়তান তখন সেখানে স্থান করে নেয় এবং যেদিকে ইচ্ছা অন্তরকে সেদিকেই নিয়ে যায়। [ইদাতুস সাবিরিন : ১৮৬]
ইবনুল জাওযী বলেন, আল্লাহর কসম! দুনিয়া যদি প্রত্যেক ত্বরীয়তের জন্য একদম সুস্থ ও পরিচ্ছন্ন হয়, প্রত্যেক অনুসন্ধানকারীর জন্য তা সহজলভ্য হয় এবং আমাদের জন্য তা স্থায়ী হয়, কোনো হিতাধিকারী একে আমাদের থেকে কখনও ছিনিয়ে না নেয়, তবুও দুনিয়া থেকে বিমুখ হওয়া এবং দুনিয়াকে এড়িয়ে চলা আমাদের জন্য ফরয; অবশ্য কর্তব্য। কেননা, দুনিয়া বান্দাকে আল্লাহ থেকে বিমুখ করে দেয়। আর কোনো নেয়ামত যখন নেয়ামতদাতা থেকে বিমুখ করে দেয়, তখন তা মসিবতেরই কারণ হয়। [আত-তাফসিরাতুল ফিল-ওয়াজ : ৭১]