📄 ১. সকল অনিষ্টের মূল
দুনিয়ার মহব্বত সকল অনিষ্টের মূল।
ইবনুল কাইয়িম বলেন, আখেরাতের জন্য প্রস্তুতির চাবি হচ্ছে আশা-আকাঙ্ক্ষা খাটো করা। সকল কল্যাণ ও মঙ্গলের চাবি হচ্ছে আল্লাহর ও আখেরাতের প্রতি আকাঙ্ক্ষী হওয়া। সকল কল্যাণ ও ক্ষতির চাবি হচ্ছে দুনিয়ার মহব্বত ও দীর্ঘ আশা-আকাঙ্ক্ষা। এটা ইলমের দরজাসমূহের অনেক বড় ও মহান দরজা। অর্থাৎ কল্যাণ ও অকল্যাণের চাবি সম্পর্কে সম্যক অবগতি লাভ করা। এই ইলম ও অবগতি কেবল তারাই লাভ করতে পারে, আল্লাহ যাদের তাওফীক দান করেন। আল্লাহ প্রত্যেক কল্যাণ ও অকল্যাণের জন্য চাবি ও দরজা নির্ধারণ করে রেখেছেন। মানুষ তা দিয়েই কল্যাণ বা অকল্যাণের ভেতর প্রবেশ করে। [হাদিল আরওয়াহ: ৪৮]
📄 ২. নাফরমানি ও কুফরির কারণ
দুনিয়ার মহব্বত নাফরমানি ও কুফরিতে লিপ্ত হওয়ার কারণ। আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী কারীম ইরশাদ করেছেন—
يُصْبِحُ الرَّجُلُ مُؤْمِنًا وَيُمْسِي كَافِرًا أَوْ يُمْسِي مُؤْمِنًا وَيُصْبِحُ كَافِرًا يَبِيعُ دِينَهُ بِعَرَضٍ مِّنَ الدُّنْيَا.
[সে সময়] সকালে একজন মুমিন হলে বিকালে কাফের হয়ে যাবে, বিকালে মুমিন হলে সকালে কাফের হয়ে যাবে। দুনিয়ার সামগ্রীর বিনিময়ে সে তার দ্বীন বিক্রি করে বসবে। [সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৩২৬, সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ২১৯৬, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ৭৭৪৮]
ইবনে তাইমিয়া বলেন, একজন কাফের সে-ও কুফরির ক্ষতি সম্পর্কে জানে। কিন্তু দুনিয়ার মহব্বত তাকে কুফরিতে উদ্বুদ্ধ করে। যেমন, আল্লাহ পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন—
مَنْ كَفَرَ بِاللَّهِ مِنْ بَعْدِ إِيمَانِهِ إِلَّا مَنْ أُكْرِهَ وَقَلْبُهُ مُطْمَئِنٌّ بِالْإِيمَانِ وَلَكِنْ مَنْ شَرَحَ بِالْكُفْرِ صَدْرًا فَعَلَيْهِمْ غَضَبٌ مِّنَ اللَّهِ وَلَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ ذَلِكَ بِأَنَّهُمُ اسْتَحَبُّوا الْحَيَاةَ الدُّنْيَا عَلَى الْآخِرَةِ وَأَنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْكَافِرِينَ أُولَئِكَ الَّذِينَ طَبَعَ اللَّهُ عَلَى قُلُوبِهِمْ وَسَمْعِهِمْ وَأَبْصَارِهِمْ وَأُولَئِكَ هُمُ الْغَافِلُونَ لَا جَرَمَ أَنَّهُمْ فِي الْآخِرَةِ هُمُ الْخَاسِرُونَ
যার উপর জবরদস্তি করা হয় এবং তার অন্তর বিশ্বাসে অটল থাকে সে ব্যতীত যে কেউ বিশ্বাসী হওয়ার পর আল্লাহতে অবিশ্বাসী হয় এবং কুফরির জন্য মন উন্মুক্ত করে দেয়, তাদের উপর আপতিত হবে আল্লাহর গযব এবং তাদের জন্য রয়েছে শাস্তি। এটা এ জন্য যে, তারা পার্থিব জীবনকে পরকালের তুলনায় পছন্দ করেছে; আর আল্লাহ অবিশ্বাসীদের পথ প্রদর্শন করেন না। এরাই তারা, আল্লাহ যাদেরই অন্তর, কর্ণ ও চক্ষুর উপর মোহর মেরে দিয়েছেন এবং এরাই কাণ্ড-জ্ঞানহীন। বলাবাহুল্য, পরকালে এরাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। [সূরা নাহল: ১০৬-১০৯]
এ আয়াতসমূহে আল্লাহ ওই সমস্ত লোকের কথা বর্ণনা করেছেন, যারা ঈমান গ্রহণের পর কাফের হয়ে গেছে। পাশাপাশি আখিরাতে তাদের জন্য শাস্তির ঘোষণাও দিয়েছেন। অতঃপর বলেছেন—
'ذٰلِكَ بِاَنَّهُمُ اسْتَحَبُّوا الْحَيٰوةَ الدُّنْيَا عَلَى الْاٰخِرَةِ'
এটা এ জন্য যে, তারা পার্থিব জীবনকে পরকালের তুলনায় পছন্দ করেছে। [সূরা নাহল: ১০৭]
আল্লাহ এ-ও বর্ণনা করে দিয়েছেন যে, এ সমস্ত লোক এই কারণেই আখিরাতে আল্লাহর আযাবের উপযুক্ত হবে। [মাজমুউল ফাতাওয়া: ৭/৫৫১]
📄 ৩. দুনিয়ার শাস্তি
আখিরাতের শাস্তির পূর্বে দুনিয়াতেই শাস্তির সম্মুখীন হওয়া।
ইবনুল কায়্যিম বলেন, দুনিয়ার মহব্বতকারী দুনিয়া দ্বারা সবচেয়ে বেশি কষ্ট ভোগ করবে। সে তিনটি স্তরে কষ্ট ভোগ করবে। সে দুনিয়াতে ধন-সম্পদ উপার্জন করতে গিয়ে কষ্ট করতে হবে এবং তা অর্জনের জন্য অন্যান্য দুনিয়াদারদের সাথে ঝগড়া-বিবাদে লিপ্ত হবে। আলমে বারযাখে সে কষ্ট পাবে তার ধন-সম্পদ হারানো ও হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার কারণে। তার কষ্টের কোনো সীমা থাকবে না, যখন সে বুঝতে পারবে তার মাঝে ও তার পরম প্রিয় ধন-সম্পদের মাঝে অলঙ্ঘনীয় একটি প্রাচীর দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়েছে। যে প্রাচীরের কারণে কখনোই আর সে তার ধন-সম্পদের দেখা পাবে না। তা ছাড়া সেখানে সে বিনিময়স্বরূপ তার এমন কোনো প্রিয় বস্তুও পাবে না, যা তার ধন-সম্পদের বদলা হতে পারে। সে তার কবরে মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আযাবের সম্মুখীন হবে। আত্মিকভাবে সে তার ধন- সম্পদ হারানোর বেদনা, চিন্তা-পেরেশানি ও আক্ষেপ-অনুশোচনা ভোগ করবে, যেমন দৈহিকভাবে সাপ-বিচ্ছু ও পোকা-মাকড় তাকে আযাব দিতে থাকবে। [ইদ্দাতুস সাবিরীন : ১৮৯]
তিনি আরও বলেছেন, দুনিয়ার মহব্বতকারীকে তার কবরে তো শাস্তি দেওয়া হবেই, আরও শাস্তি দেওয়া হবে সেই দিন, যেদিন সে তার প্রভুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে।
আল্লাহ পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন–
وَلَا تُعْجِبْكَ أَمْوَالُهُمْ وَلَا أَوْلَادُهُمْ ۚ إِنَّمَا يُرِيدُ اللَّهُ لِيُعَذِّبَهُمْ بِهَا فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَتَزْهَقَ أَنفُسُهُمْ وَهُمْ كَافِرُونَ
সুতরাং, তাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি যেন আপনাকে বিস্মিত না করে। আল্লাহর ইচ্ছা হল এগুলো দ্বারা দুনিয়ার জীবনে তাদেরকে আযাবে নিপতিত রাখা এবং প্রাণবিয়োগ হওয়া কাফের অবস্থায়। [সূরা তাওবা : ৫৫]
আমাদের কোনো কোনো পূর্বসূরি বলেছেন, তাদেরকে তাদের ধন- সম্পদ জমা করার কারণে শাস্তি দেওয়া হবে, তাদের ধন-সম্পদের মহব্বতে তাদের প্রাণবিয়োগ হবে এবং এই ধন-সম্পদে আল্লাহর হক আদায়ে অস্বীকৃতির মাধ্যমে তারা কাফের সাব্যস্ত হবে। [ইদ্দাতুস সাবিরীন : ১৮৯]
তিনি আরও বলেন, কতিপয় সালাফে সালেহীন বলেছেন, ধন-সম্পদ দ্বারা তাদেরকে দুনিয়াতে এভাবে শাস্তি দেওয়া হবে যে, তাদের ধন- সম্পদ তাদের কুফরির কারণে গণিমতের সম্পদ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাদের সন্তানাদি বন্দী হয়ে গোলামে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। যদিও এ বিধানটি কাফেরদের জন্য, কিন্তু বাতেনিভাবে তথা ভিতরগতভাবে দুনিয়ার মহব্বতকারীদের অবস্থাও তাদের মতোহই। ...ধন-সম্পদ উপার্জন ও জমা করতে দুনিয়ার মহতাকাঙ্ক্ষীদের যারপরনাই কষ্ট করতে হয়। তুমি দুনিয়াতে ওই ব্যক্তির চাইতে অধিক কষ্ট স্বীকারকারী ও ক্লান্ত আর কাউকে পাবে না, যার একমাত্র লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হচ্ছে দুনিয়া উপার্জন করা। সে তার সর্বাত্মক চেষ্টা ও শ্রম ব্যয় করে দুনিয়া উপার্জনে লালায়িত। আর এখানে দুনিয়ার আযাব বলতে দুঃখ, কষ্ট ও ক্লান্তি উদ্দেশ্য। [ইগাসাতুল লাহফান: ১/৩৮]
📄 ৪. অন্তরের গাফলতি
আখেরাতের ব্যাপারে অন্তর গাফেল ও উদাসীন থাকা এবং নেক আমল করতে ত্রুটি করা।
আবু মুসা আশআরী থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন—
مَنْ أَحَبَّ دُنْيَاهُ أَضَرَّ بِآخِرَتِهِ وَمَنْ أَحَبَّ آخِرَتَهُ أَضَرَّ بِدُنْيَاهُ فَآثِرُوا مَا يَبْقَى عَلَى مَا يَفْنَى.
যে ব্যক্তি দুনিয়াকে ভালোবাসে সে তার আখেরাতের ব্যাপারে ক্ষতির সম্মুখীন হবে, আর যে ব্যক্তি আখেরাতকে ভালোবাসবে সে তার দুনিয়ার ব্যাপারে ক্ষতির সম্মুখীন হবে। সুতরাং, যা কিছু স্থায়ী থাকে তোমরা ক্ষণস্থায়ী বিষয়ের উপর প্রাধান্য দাও। [মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ১৯৯৬৭ ও ১৯৯৬৮]
ইবনে তাইমিয়া বলেন, আল্লাহ ইরশাদ করেছেন—
قُتِلَ الْخَرَّاصُونَ. الَّذِينَ هُمْ فِي غَمْرَةٍ سَاهُونَ
অনুমানকারীরা ধ্বংস হোক; যারা উদাসীন, ভ্রান্ত। [সূরা যারিয়াতে : ১০-১১]
অর্থাৎ আখেরাতের বিষয়ে তারা উদাসীন। তারা আখেরাতকে সম্পূর্ণরূপে ভুলে গেছে। অর্থাৎ দুনিয়ার মহব্বত ও তার সাজ-সজ্জা ও সৌন্দর্য তাদের অন্তরসমূহকে ঢেকে নিয়েছে। ফলে তারা আখেরাত ও যে উদ্দেশ্যে তাদের সৃষ্টি করা হয়েছে, তা ভুলে গেছে। তাদের উপমা ও অবস্থা হচ্ছে আল্লাহর এই আয়াতের মতো—
وَلَا تُطِعْ مَنْ أَغْفَلْنَا قَلْبَهُ عَنْ ذِכْرِنَا وَاتَّبَعَ هَوَاهُ وَكَانَ أَمْرُهُ فُرُطًا
আর আপনি তার অনুসরণ করবেন না, যার অন্তরকে আমি আমার স্মরণ থেকে গাফেল করে দিয়েছি এবং যে নিজের প্রবৃত্তির অনুসরণ করে এবং যার কার্য-কলাপ হচ্ছে সীমা অতিক্রম করা। [সুরা কাহফ: ২৮]
সুতরাং, الْغَفْلَةُ তথা অজ্ঞতা ও গাফলতের এ পর্দা সৃষ্টি হয় প্রবৃত্তিপূজার কারণে। আর السَّهُোু তথা ভুলে যাওয়াও এক ধরনের গাফলতি। এ জন্যই বলা হয়- عَنِ الشَّيْءِ وَذَهَابُ الْقَلْبِ عَنْهُ الْغَفْلَةُ অর্থাৎ السَّهُোু তথা ভুলে যাওয়া বলা হয়, কোনো বস্তু থেকে গাফেল হয়ে যাওয়া ও তার থেকে মনোযোগ ছুটে যাওয়াকে। আর সমস্ত অনিষ্টের মূল ও কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে গাফলত ও কুপ্রবৃত্তি। সুতরাং, আল্লাহ ও আখেরাতের ব্যাপারে গাফলতি কল্যাণের দরজাকে বন্ধ করে দেয়। সেই কল্যাণ হচ্ছে আল্লাহর যিকির ও স্মরণ এবং জাগরণ তথা তাঁর ইবাদতকরণ। আর কুপ্রবৃত্তি যাবতীয় অকল্যাণ, ভুলে যাওয়া ও ভয়ের দরজা খুলে দেয়। ফলে তার অন্তর সবসময় সেই জিনিসেই ডুবে থাকে, যা তার নফস কামনা করে। সে আল্লাহ থেকে সম্পূর্ণরূপে গাফেল থাকে এবং গাইরুল্লাহর প্রতি ধাবিত থাকে। আল্লাহর যিকির ও স্মরণ থেকে থাকে সম্পূর্ণ উদাসীন। তার অন্তর ডুবে থাকে গাইরুল্লাহকে নিয়ে। ফলে গাইরুল্লাহ তার অন্তরে স্থায়ীভাবে স্থান করে নেয়। দুনিয়ার মহব্বত তার অন্তরে মরিচা ফেলে দেয়।
সহীহ বুখারী ও হাদীসের অন্যান্য কিতাবে বর্ণিত হয়েছে, আবূ হুরায়রা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবীজি ইরশাদ করেছেন- تَعِسَ عَبْدُ الدِّینَارِ وَعَبْدُ الدِّرْهَمِ وَعَبْدُ الْخَمِيصَةِ إِنْ أُعْطِيَ رَضِيَ وَإِنْ لَمْ يُعْطَ سَخِطَ تَعِسَ وَانْتَكَسَ وَإِذَا شِيْكَ فَلَا انْتَقَشَ. লাঞ্ছিত হোক দিনারের গোলাম, দিরহামের গোলাম এবং শালের গোলাম। তাকে দেওয়া হলে সন্তুষ্ট হয়, না দেওয়া হলে অসন্তুষ্ট হয়। এরা লাঞ্ছিত হোক, অপমানিত হোক। [তাদের পায়ে] কাঁটা বিদ্ধ হলে কেউ তুলে দেবে না। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২৮৮৭]
এ হাদীসে [দুনিয়ার মহব্বতকারী] মানুষকে ওই বস্তুর গোলাম ও দাস বলা হয়েছে, যা পেলে সে সন্তুষ্ট হয় এবং যা হাতছাড়া হয়ে গেলে সে অসন্তুষ্ট হয়। এমনকি তাকে দিরহামের দাস বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে এবং সেসব জিনিসের দাস বলেও আখ্যায়িত করা হয়েছে, যেগুলোর আলোচনা এ হাদীসে করা হয়েছে। [আয-যুহদ ওয়াল-ওরা ওয়াল-ইবাদাহ : ৩৫]