📄 ২. দুনিয়ার প্রতি ঝোঁক
আল্লাহ পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন- زُيِّنَ لِلনَّاسِ حُبُّ الشَّهَوَاتِ مِنَ النِّسَاءِ وَالْبَنِينَ وَالْقَنَاطِيرِ الْمُقَنْطَرَةِ مِنَ الذَّهَبِ وَالْفِضَّةِ وَالْخَيْلِ الْمُسَوَّمَةِ وَالْأَنْعَامِ وَالْحَرْثِ ۗ ذَٰلِكَ مَتَاعُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَاللَّهُ عِندَهُ حُسْنُ الْمَآبِ
মানুষের জন্য সুশোভিত করা হয়েছে নারী, সন্তান-সন্ততি, রাশিষ্কৃত স্বর্ণ-রৌপ্য, চিহ্নিত অশ্ব, গবাদি পশুপাল ও ক্ষেত্র-খামারের মতো আকর্ষণীয় বস্তুসমাগ্রী। এ সবই হচ্ছে পার্থিব জীবনের ভোগ্য বস্তু। আল্লাহর নিকটেই হল উত্তম আশ্রয়। [সূরা আলে ইমরান : ১৪]
আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবীজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেছেন-
قَلْبُ الشَّيْخِ شَابٌّ عَلَى حُبِّ اثْنَتَيْنِ حُবিِّ الْعَيْشِ وَالْمَالِ.
বৃদ্ধ মানুষের অন্তর দু'টি জিনিসের মহব্বতের ক্ষেত্রে যুবক। তা হচ্ছে বেঁচে থাকার মায়া ও ধন-সম্পদের মহব্বত। [সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৪৫৭, সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ২০৬৬, সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ৪২৩৩, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ৮৬৯৯]
আনাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-র সূত্রে বর্ণিত অপর বর্ণনায় এসেছে, নবীজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেছেন-
يَهْرَمُ ابْنُ آدَمَ وَتَشِبُّ مِنْهُ اثْنَتَانِ الْحِرْصُ عَلَى الْمَالِ وَالْحِرْصُ عَلَى الْعُمُرِ.
আদম সন্তান বার্ধক্যে পৌঁছে যায়, কিন্তু দু'টি ব্যাপারে তার আকাঙ্ক্ষা যৌবনে বিরাজ করে- সম্পদের লালসা এবং বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা। [সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৪৫৯, সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ২০৬৬, সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ৪২৩৪, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ১২৯৯৭]
আনাস থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবীজি ইরশাদ করেছেন— আদম সন্তানের যদি দু’টি মাঠ ভর্তি সম্পদ থাকে, তা হলে সে তৃতীয় মাঠ ভর্তি সম্পদ খুঁজে বেড়াবে। আদম সন্তানের পেট মাটি ছাড়া কোনো কিছুই ভরাতে পারে না। যে ব্যক্তি তাওবা করে, আল্লাহ তার তাওবা কবুল করেন। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৪৩৬, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৪৬২, তাহা মুসলিমের; সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ২৬৭৭, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ১২১২৬]
অপর এক বর্ণনায় এসেছে, আনাস ইবনে মালেক বলেন, রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন— যদি বনী আদমের স্বর্ণ ভরা একটি উপত্যকা থাকে, তথাপি সে তার জন্য দু’টি উপত্যকা হওয়ার কামনা করবে। তার মুখ মাটি ব্যতীত অন্য কিছুতেই ভরবে না। তবে যে ব্যক্তি তাওবা করবে, আল্লাহ তার তাওবা কবুল করবেন। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৪৩৬, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ১২৭১৭]
📄 ৩. দুনিয়াকে প্রাধান্য দেওয়া
বর্তমান উপস্থিত দুনিয়াকে অফুরন্ত আখেরাতের উপর প্রাধান্য দেওয়া মানুষের দুনিয়ার প্রতি ধাবিত হওয়া ও দুনিয়ার মোহে পড়ার অন্যতম কারণ। যেমন, আল্লাহ পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন— بَلْ تُؤْثِرُونَ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا وَالْآخِرَةُ خَيْرٌ وَأَبْقَىٰ বস্তুত, তোমরা পার্থিব জীবনকে অগ্রাধিকার দাও; অথচ পরকালের জীবন উৎকৃষ্ট ও স্থায়ী। [সূরা আ’লা : ১৬-১৭]
ইবনুল কাইয়িম বলেন, বরং আল্লাহ তাদের কাছে স্বীয় নবী- রাসূলগণকে পাঠিয়েছেন, তাদের উপর কিতাবসমূহ নাযিল করেছেন এবং তিনি স্পষ্টভাবে বর্ণনা করে দিয়েছেন- কীসে তিনি সন্তুষ্ট হন আর কীসে তিনি অসন্তুষ্ট ও রাগান্বিত হন। তিনি তাদেরকে স্বীয় নফস, তরিয়ত ও প্রবৃত্তিপূজার বিরুদ্ধাচরণের বিনিময়ে চিরস্থায়ী নিবাসে [জান্নাতে] পরিপূর্ণ সুখ-শান্তি ও অফুরন্ত নেয়ামতের ওয়াদা করেছেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও অধিকাংশ মানুষের আকল ও বিবেক-বুদ্ধি নগদ দুনিয়ার উপর অপেক্ষমান আখিরাতকে প্রাধান্য দিতে প্রস্তুত নয়; যে আখিরাত এই নগদ ও দৃশ্যমান দুনিয়া ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর আসবে। তারা বলে, কীভাবে আমরা আমাদের এ নগদ দুনিয়াকে —যা আমাদের কব্জায় রয়েছে— এমন বাকি জিনিসের বিনিময়ে বিক্রি করে দেব, যা হাসিল হওয়ার ওয়াদা করা হয়েছে দুনিয়ার সুদীর্ঘ পথপরিক্রমা শেষ হওয়ার ও পুরো পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর।
তাদের অধিকাংশের অবস্থা যেন বলে- এখন তুমি যা কিছু দেখছ এবং সামনে উপস্থিত পাচ্ছ, তা গ্রহণ কর আর যা কিছু শুনছ তা ছাড়। আল্লাহ যাকে তাওফীক দেন, সে-ই বুঝতে পারে আখিরাতের হাকিকত-বাস্তবতা ও স্থায়িত্ব। সে তার ঈমানের নূর ও দূরদর্শিতার মাধ্যমে বুঝতে পারে আখিরাতের মূল্য ও প্রকৃত মর্ম। সে বুঝতে পারে আল্লাহ তাঁর আনুগত্যশীল বান্দাদের জন্য কী কী নেয়ামত সৃষ্টি করে রেখেছেন এবং তাঁর অবাধ্য বান্দাদের জন্য কী কী আযাব ও শাস্তি প্রস্তুত করে রেখেছেন। সে আরও বুঝতে পারে দুনিয়ার হাকিকত, বাস্তবতা, অল্প সময়ে নিঃশেষ হয়ে যাওয়া, দুনিয়ার ধোঁকা ও অত্যাচার-অনাচার সবই। দুনিয়া তো হল ঠিক তেমন, যেমনটা আল্লাহ ইরশাদ করেছেন- খেলাধুলা, ক্রীড়া-কৌতুক, পারস্পরিক গর্ব-অহংকার, ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্তুতি নিয়ে প্রতিযোগিতা করা। আরও বলেছেন, দুনিয়া হল বৃষ্টি দ্বারা উৎপন্ন ফসলের মতো; যা কৃষককে চমৎকৃত করে ও আনন্দ দেয়। অতঃপর সেগুলো শুকিয়ে হলুদ বর্ণের হয়ে যায়। তারপর সেগুলো পরিণত হয় খড়-কুটোয়। বাতাস সেগুলোকে এদিক-সেদিক উড়িয়ে নিয়ে যায়। মূলত আমরা জন্মগ্রহণ করেছি এ দুনিয়ায় এবং আমরা তারই সন্তান। তাই আমরা এর বাইরে কিছু বুঝি না বা বুঝতে চাই না। আমাদের অভ্যাস হয়ে গেছে আমাদের বিচারক, প্রবৃত্তি হয়েছে আমাদের বাদশাহ। প্রবৃত্তির পূজা আমাদের পরাভূত করে ফেলেছে। এর সঙ্গে আমাদের অভ্যাস ও নফসের চাহিদাসমূহও দুনিয়ার প্রতি ধাবিত ও ঝুঁকে পড়তে সহযোগিতা করছে। আমাদের জ্ঞানের উপর ইন্দ্রিয় শক্তি বিজয় লাভ করেছে এবং সে-ই রাজত্ব করছে। [শিফাউল আলীল : ২৬]
সারকথা : দুনিয়ার মোহ ও মহব্বত এবং দুনিয়াকে আখেরাতের উপর প্রাধান্য দেওয়ার কারণ মূলত দু’টি। যথা-
১. দ্বীন ও ঈমান নষ্ট হয়ে যাওয়া।
২. আকল ও বুদ্ধি নষ্ট হয়ে যাওয়া।