📄 দুনিয়ার ব্যাপারে সাহাবায়ে কেরামের অবস্থান
আমীরুল মু'মিনীন উমার ইবনুল খাত্তাব র. অনেক ভালো খাবার-দাবার ও পানীয় গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকতেন এবং নিজেকে এসব থেকে দূরে রাখতেন। তিনি বলতেন, আমার ভয় হয়, আমি না আবার সেইসব লোকের অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়ি, যাদেরকে আল্লাহ তিরস্কার করেছেন এবং যাদের ব্যাপারে ইরশাদ করেছেন—
أَذْهَبْتُمْ طَيِّبَاتِكُمْ فِي حَيَاتِكُمُ الدُّنْيَا وَاسْتَمْتَعْتُمْ بِهَا
তোমরা তোমাদের সুখ পার্থিব জীবনেই নিঃশেষ করেছ এবং সেগুলো ভোগ করে ফেলেছ। [সূরা আহকাফ : ২০]
উমার র. যখন শামে এলেন, তখন তাঁর জন্য উন্নত খাবার তৈরি করা হল, যা তিনি ইতিপূর্বে কখনও দেখেননি। তা দেখে তিনি বললেন, এই খাবার যদি আমাদের জন্য হয়, তা হলে সেসকল দরিদ্র মুসলমানের জন্য কী থাকবে, যারা মৃত্যুর পূর্বে কোনোদিন যবের রুটি দিয়েও পেট পূর্ণ করতে পারেননি?!
এ সময় খালেদ ইবনে ওয়ালিদ র. বললেন, তাঁদের জন্য জান্নাত।
উমার র.-র চোখ অশ্রুতে ভেসে গেল। বললেন, আমাদের অংশে যদি থাকে খড়কুটা আর তারা যদি জান্নাত নিয়ে চলে যান, তা হলে তো তারা আমাদেরকে বহু দূরে ছেড়ে গেলেন! [তাফসীরে তাবারী : ২২/১২০]
উমার র. মাঝে মাঝে বলতেন, যদি আমি চাইতাম, তা হলে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে উৎকৃষ্ট খাদ্য ও সবচেয়ে কোমল পোশাকের অধিকারী হতে পারতাম। কিন্তু আমি আমার উৎকৃষ্ট বস্তুসমূহ [আখেরাতের জন্য] সঞ্চয় করে রেখে দিচ্ছি। [তাফসীরে তাবারী : ২২/১২০]
হাফস ইবনে আবুল আস র. অধিকহারে উমার র.-র সাক্ষাতে আসতেন। কিন্তু যখনই উমার র. তাঁর সামনে কোনো খাবার এগিয়ে দিতেন, তিনি তা গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকতেন। একদিন উমার র. জিজ্ঞাসা করলেন, আমাদের খাবারের ব্যাপারে তোমার কী আপত্তি?
হাফস ইবনে আবুল আস র. বললেন, আমীরুল মুমিনীন! আমার পরিবার আমার জন্য এর চেয়ে উৎকৃষ্ট ও নরম খাবার তৈরি করে। তাই এ খাবারের পরিবর্তে আমি তাদের খাবারই গ্রহণ করি।
উমার র. বললেন, তোমার মা তোমাকে হারাক! তুমি কি দেখ না, যদি আমি চাইতাম, তা হলে অল্প বয়স্ক হৃষ্টপুষ্ট একটি বকরি জবাই করার আদেশ দিতে পারতাম। অতঃপর তার চামড়া ও পশম পরিষ্কার করতাম। তারপর ময়দা তৈরির আদেশ দিতাম। অতঃপর তা কাপড়ে চেলে মিহি করে পাতলা রুটি বানানো হত। তারপর এক সা' কিশমিশ ঘি এর মধ্যে মিশিয়ে পাকানোর আদেশ করতাম।
উমার-র কথা শুনে হাফস ইবনে আবুল আস বললেন, আমীরুল মুমিনীন! আমি তো দেখছি আপনি উৎকৃষ্ট ও কোমল খাবার সম্পর্কে ভালো ধারণা রাখেন!
উমার বললেন, তোমার মা তোমাকে হারাক! কসম সেই সত্তার, যাঁর হাতে আমার প্রাণ! যদি কেয়ামতের দিন আমার নেকী ও পুণ্য কমে যাওয়া অপছন্দ না করতাম, তা হলে অবশ্যই আমি তোমাদের সঙ্গে তোমাদের নরম-কোমল খাবারে অংশগ্রহণ করতাম। [আদ্দুররুল মানহুর: ৭/৪৪৭]
হাফসা বিনতে উমার থেকে বর্ণিত, তিনি একবার তাঁর পিতা [উমার]-কে উদ্দেশ্য করে বললেন, আমীরুল মুমিনীন! আপনার এমন কী ক্ষতি হয়, যদি আপনি আপনার এই কাপড়ের তুলনায় আরেকটু নরম-কোমল কাপড় পরিধান করেন? আপনার এই খাবারের তুলনায় আরেকটু উৎকৃষ্ট খাবার গ্রহণ করেন? আল্লাহ তো পৃথিবীর বহু অঞ্চল আপনার অধীনস্থ করেছেন! বহু অঞ্চলের বিষয় দান করেছেন! আল্লাহ তো আপনার জন্য প্রশস্ত রিযিকের ব্যবস্থা করেছেন!
উমার বললেন, তুমি কি জান না, রাসূলুল্লাহ ﷺ কত কষ্টকর জীবন যাপন করেছেন! এরপর তিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ জীবনে সে সকল কষ্ট ও কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছেন, তার কিছুর বিবরণ দিলেন। এক পর্যায়ে হাফসা -কে কাঁদিয়ে ফেললেন। তারপর বললেন, আমি তোমাকে বলেছি, আমার দু’জন বন্ধু আছেন। যদি আমি তাদের পথ ছেড়ে ভিন্ন পথে চলি, তা হলে তাঁদের সঙ্গে যে আচরণ করা হবে তার ব্যতিক্রম আচরণ করা হবে আমার সঙ্গে। আল্লাহর কসম! অবশ্যই আমি কষ্টকর জীবন যাপনে তাঁদের অনুসরণ করব। যাতে [আখেরাতে] তাঁদের আনন্দময় জীবনেও আমি তাঁদের সঙ্গে থাকতে পারি।
উমার তার দুই বন্ধু বলে রাসূলুল্লাহ ও আবু বকর সিদ্দীক -কে বুঝিয়েছেন। [মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, হাদীস নং ০৪৪৩৪]
জাবের ইবনে আবদুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদিন উমার আমাকে গোশত বহন করে নিয়ে যেতে দেখে জিজ্ঞাসা করলেন, জাবের! এগুলো কী?
আমি বললাম, এগুলো গোশত। এক দিরহাম দিয়ে কিনেছি। ঘরের নারীরা গোশতের আগ্রহ করেছে।
আমার জওয়াব শুনে উমার বললেন, তোমাদের কেউ কোনো কিছু চাইলেই কি তা পূরণ করা হয়? তোমাদের কেউ কি তার পেটে গুটিয়ে রাখতে পারে না তার প্রতিবেশী ও চাচাতো ভাইদের জন্য? [এই যদি হয় তোমাদের অবস্থা] তা হলে এই আয়াত যাবে কোথায়– أَذْهَبْتُمْ طَيِّبَاتِكُمْ فِي حَيَاتِكُمُ الدُّنْيَا
‘তোমরা তো তোমাদের সুখ পার্থিব জীবনেই নিঃশেষ করে ফেলেছ!’ [আদ্দুররুল মানছূর : ৭/৪৪৭]
আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন– رَأَيْتُ سَبْعِينَ مِنْ أَصْحَابِ الصُّفَّةِ مَا مِنْهُمْ রَجُلٌ عَلَيْهِ রِدَاءٌ إِمَّا إِزَارٌ وَإِمَّا كِسَاءٌ قَدْ রَبَطُوا فِي أَعْنَاقِهِمْ فَمِنْهَا مَا يَبْلُغُ نِصْفَ السَّاقَيْنِ وَمِنْهَا مَا يَبْلُغُ الْكَعْبَيْنِ فَيَجْمَعُهُ بِيَدِهِ كَرَاهِيَةَ أَنْ تُرى عَوْرَتُهُ.
আমি সত্তরজন আসহাবে সুফফাকে দেখেছি, তাঁদের কারও গায়ে বড় চাদর ছিল না। হয়তো ছিল কেবল লুঙ্গি কিংবা ছোট চাদর, যা তাঁদের ঘাড়ে বেঁধে রাখতেন। [নিচের দিকে] কারোটা নিসফে সাক বা হাঁটু পর্যন্ত আর কারোটা টাখনু পর্যন্ত ছিল। লজ্জাস্থান দেখা যাবার ভয়ে তারা হাত দিয়ে কাপড় ধরে রাখতেন। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৪৪২]
আবদুল্লাহ ইবনে উমার থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন– أَخَذَ রَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِمَنْكِبِي فَقَالَ كُنْ فِي الدُّنْيَا كَأَنَّكَ غَرِيبٌ أَوْ عَابِرُ سَبِيلٍ. রাসূলুল্লাহ ﷺ আমার উভয় কাঁধ ধরে বললেন, তুমি দুনিয়াতে এমনভাবে বসবাস করো, যেন কোনো ভিনদেশী মুসাফির কিংবা একজন পথিক। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৪১৬]
আর ইবনে উমার বলতেন- إِذَا أَمْسَيْتَ فَلَا تَنْتَظِرِ الصَّبَاحَ وَإِذَا أَصْبَحْتَ فَلَا تَنْتَظِرِ الْمَسَاءَ وَخُذْ مِنْ صِحَّتِكَ لِمَرَضِكَ وَمِنْ حَيَاتِكَ لِمَوْتِكَ.
তুমি সন্ধ্যায় উপনীত হলে ভোরের অপেক্ষা করো না আর ভোরে উপনীত হলে সন্ধ্যার অপেক্ষা করো না। তোমার সুস্থতার সময় তোমার অসুস্থ অবস্থার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করো, আর তোমার জীবিত অবস্থায় তোমার মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করো।
উরাওয়া থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার আয়েশা তাঁকে বলেছেন- إِنْ كُنَّا لَنَنْظُرُ إِلَى الْهِلَالِ ثَلَاثَةَ أَهِلَّةٍ فِي شَهْرَيْنِ وَمَا أُوقِدَتْ فِي أَبْيَاتِ রَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّমَ نَارٌ ফকুলতু مَا كَانَ يُعَيِّشُكُمْ قَالَتْ الْأَسْوَدَانِ التَّمْرُ وَالْمَاءُ إِلَّا أَنَّهُ قَدْ كَانَ لِرَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّমَ جِيرَانٌ مِنْ الْأَنْصَارِ كَانَ لَهُمْ مَنَائِحُ وَكَانُوا يَمْنَحُونَ রَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَসَلَّمَ مِنْ أَلْبَانِهِمْ فَيَسْقِينَا.
[হে ভাগ্নে] আমরা দু’ মাসে তিনটি নতুন চাঁদ দেখতাম। কিন্তু [এর মধ্যে] রাসূলুল্লাহ ﷺ-র ঘরগুলোতে আগুন জ্বলত না। আমি বললাম, তা হলে আপনারা দিনাতিপাত করতেন কীভাবে? তিনি [আয়েশা] বললেন, কালো দু’টি বস্তু; খেজুর আর পানি [দিয়ে]। অবশ্য রাসূলুল্লাহ ﷺ-র কিছু আনসার প্রতিবেশীর কতগুলো দুগ্ধওয়ালা প্রাণী ছিল, তাঁরা রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে তা দিত। আমরা তা-ই পান করতাম। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৪৫৯]
হাক্স ইবনে সুলাইমান র. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার এক ব্যক্তি আবু যার র.-র ঘরে প্রবেশ করে ঘরের এদিক-সেদিক চোখ ঘোরাতে লাগল। এক পর্যায়ে জিজ্ঞাসা করল, আবু যার! আপনার ঘরের আসবাবপত্র কোথায়?
আবু যার র. বললেন, আমাদের আরেকটি ঘর আছে। সে ঘরে আমরা আমাদের উৎকৃষ্ট আসবাবগুলো রেখে দিয়েছি। [এ বলে তিনি আখেরাতের ঘরের কথা বুঝিয়েছেন]
আগন্তুক বলল, তা ঠিক। কিন্তু যতদিন আপনি এখানে [দুনিয়ায়] থাকবেন, ততদিন তো আপনার এখানকার কিছু সামানাদিরও প্রয়োজন রয়েছে!
আবু যার র. বললেন, ঘরের মালিক আমাদেরকে এখানে চিরকাল ছেড়ে রাখবেন না। [শুয়াবুল ঈমান: ৭/৩৩৮]
আবু মিজলায র. বলেন, কেয়ামতের দিন কিছু মানুষ তাদের নেক আমলসমূহের কোনো প্রতিদান দেখতে পাবে না। তখন তাদের বলা হবে, তোমরা তো তোমাদের নেক আমল ও পুণ্যসমূহের বিনিময় দুনিয়ার জীবনেই সুখ-সত্ত্বার ভোগ করে নিঃশেষ করে ফেলেছ। [তাফসীরে ইবনে কাসীর: ৭/২৫৪]
অর্থাৎ কেয়ামতের দিন হিসাব-নিকাশের সময় বহু মানুষ পার্থিব জীবনে কৃত তাদের পুণ্যকর্ম ও নেক আমল সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবে, সেগুলোর কোনো প্রতিদান তারা দেখতে পাবে না। তখন তাদের জানানো হবে— দুনিয়ার জীবনে তোমরা আরাম-আয়েশ, সুখ-আনন্দ ও বিভিন্ন নেয়ামত-ভোগের মাধ্যমে তোমাদের কর্মফল নিঃশেষ করে ফেলেছ!
এ জন্যই সাহাবায়ে কেরাম ও তাঁদের উত্তরসূরিগণ পার্থিব জীবনের সুখ-সত্ত্বার ও নেয়ামতরাজি কম ভোগ করেন। যেন এর বিনিময় ও প্রতিদান তাঁরা পূর্ণরূপে আখেরাতে লাভ করতে পারেন। আপনি মুসআব ইবনে উমাইর র.-র কথাই ধরুন না। যাঁকে দিয়ে কুরাইশরা বিলাসিতার উপমা দিত। তাঁর পোশাক-পরিচ্ছেদ-সুগন্ধি ও চালচলনে তার সমকক্ষ কেউ ছিল না। এক সময় [ইসলাম গ্রহণ করে] বিলাসিতার জীবন ছেড়ে দুনিয়ামুখী ব্যক্তিদের কাতারে এসে শামিল হলেন। [শুধু বিলাসিতা ছাড়েননি, বরং শেষ জীবনে তাঁর অবস্থা হয়েছিল এমন] তিনি মারা যাওয়ার পর কাফন পরানোর মতো কাপড়ও তার ছিল না। ছিল শুধু একটি চাদর। যা দিয়ে মাথা ঢাকলে পা বেরিয়ে যেত, পা ঢাকলে মাথা উন্মুক্ত হয়ে যেত। [আহ্-হিকাতু লি-ইবনি হিব্বান : ১/২০৪]
উমর ইবনে আবদুল আযীয (রহ.)। বিলাসিতার জীবন ছেড়ে সাদাসিধে জীবন গ্রহণের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
হাাজ্জাজ আস-সাওওয়াফ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার উমর ইবনে আবদুল আযীয (রহ.) আমাকে তাঁর জন্য কিছু কাপড় কিনে আনতে বললেন। তিনি তখন মদীনার শাসক। আমি তাঁর জন্য কয়েকটি কাপড় কিনে আনলাম। সেগুলোর মধ্যে একটি কাপড়ের মূল্য ছিল চার শ’ দিরহাম। কাপড়টি কেটে তাঁর জন্য জামা বানানো হলে তিনি তাতে হাত দিয়ে বললেন- কত মোটা ও খসখসে কাপড় এটা!
এরপর। যখন তিনি খলীফাতুল মুসলিমীন। আবার তার জন্য কিছু কাপড় কিনে আনার জন্য বললেন। লোকেরা মাত্র চৌদ্দ দিরহাম দিয়ে একটি কাপড় কিনে আনল। সেই কাপড়ে হাত দিয়ে তিনি বললেন- সুবহানাল্লাহ! কত কোমল ও মিহি কাপড় এটি! [আত-তবকাতুল কুবরা লি-ইবনি সা’দ : ৫/৩০৪]
উমর ইবনে আবদুল আযীয (রহ.) এর ছেলে আবদুল্লাহ ইবনে উমর ইবনে আবদুল আযীয একদিন তাঁর পিতার কাছে এসে পোশাক চাইল। তখন তিনি খলীফাতুল মুসলিমীন।
উমর ইবনে আবদুল আযীয (রহ.) বললেন, তুমি যিয়্যার ইবনে রিয়াহ আল-বসরীর কাছে যাও। তার কাছে আমার কিছু কাপড় আছে। সেখান থেকে যেটা তোমার পছন্দ হয় নিয়ে নিয়ো। বর্ণনাকারী বলেন, এরপর সে যিয়্যার ইবনে রিয়াহ এর কাছে গিয়ে বলল, আমি আমার পিতার কাছে পোশাক চেয়েছিলাম। তিনি আমাকে আপনার কাছে পাঠিয়েছেন। আমাকে বলে দিয়েছেন, ‘থিয়্যার ইবনে রিয়াহ এর কাছে আমার কিছু কাপড় আছে। সেখান থেকে যেটা তোমার পছন্দ হয় নিয়ে নিয়ো।’
থিয়্যার ইবনে রিয়াহ বললেন, আমীরুল মুমিনীন সত্য বলেছেন। এ বলে তিনি নিম্নমানের কিছু কাপড় বের করে দিলেন এবং বললেন, আমার কাছে আমীরুল মুমিনীন এর কাপড়গুলোই আছে। এখান থেকে তোমার যেটা পছন্দ হয় নিয়ে নাও।
আব্দুল্লাহ ইবনে উমর ইবনে আব্দুল আযীয কোনো কাপড় না নিয়ে সোজা চলে এল তার পিতার কাছে। বলল, পিতা! আমি আপনার কাছে পোশাক চেয়েছিলাম। আপনি আমাকে পাঠালেন থিয়্যার ইবনে রিয়াহ এর কাছে। তিনি আমাকে এমন কতগুলো কাপড় দেখালেন, যা আমার নয় এবং আমার কমেরও নয়। [এ কাপড় পরিধান করা কীভাবে সম্ভব?]
ছেলের কথা শুনে উমর ইবনে আব্দুল আযীয বললেন, লোকটির কাছে আমার এ কাপড়গুলোই আছে।
পিতার কথা শুনে ছেলে বেরিয়ে যেতে লাগল। যখন সে দরজা অতিক্রম করার উপক্রম করল, তখন উমর ইবনে আব্দুল আযীয তাকে ডেকে বললেন, আমি কি [বাইতুল মাল থেকে সাধারণ নাগরিকদের যে ভাতা প্রদান করা হয়, তা থেকে] তোমার ভাতার এক শ’ দিরহাম অগ্রিম দিয়ে দিব?
ছেলে জবাব দিল, হাঁ, দিয়ে দিন।
উমর ইবনে আব্দুল আযীয ছেলেকে ভাতার এক শ’ দিরহাম অগ্রিম দিয়ে দিলেন। অতঃপর নাগরিকদের ভাতা দেওয়ার সময় হলে তার ভাতা হিসাব করে কেটে রেখে দেওয়া হলো। [তারীখে দিমাশক : ১৭/৬৬-৬৭]
উমর ইবনে আব্দুল আযীয ছিলেন অত্যন্ত উঁচু মাপের যাহেদ; দুনিয়াবিমুখ। মালেক ইবনে দীনার রহ. বলতেন- মানুষ বলে মালেক ইবনে দীনার রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আবু যায়েদ তো হচ্ছে উমর ইবনে আব্দুল আযীয। তাঁর কাছে দুনিয়া এসেছিল, কিন্তু তিনি দুনিয়াকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। [আস-সুয়াহ লি-আবদিহিমাহ ইবনে আহমাদ: ১/১১৯]
ইবনে জারীর রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আমাকে হাদীস বর্ণনা করেছেন হুমাইদ, তিনি বলেন আমাকে হাদীস বর্ণনা করেছেন ইয়াহইয়া ইবনে ওয়াসিফ, তিনি বলেন, আমাকে হাদীস বর্ণনা করেছেন আবূ হামযাহ, তিনি আতা থেকে, তিনি আরফাজ্জা আস-সাকাফী থেকে, আরফাজ্জা আস- সাকাফী বলেন, একদিন আমি আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু-র মুখে সূরা আ'লার তেলাওয়াত শুনছিলাম। بَلْ تُؤْثِرُونَ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا পর্যন্ত পৌঁছে তিনি তেলাওয়াত বন্ধ করে সাজদাদের দিকে মুখ করে বললেন, 'বাস্তবিকভাবে আমরা দুনিয়াকে আখেরাতের উপর প্রাধান্য দিয়েছি। এ কথা শুনে সকলেই নীরব হয়ে বসে রইল। তিনি পুনরায় বললেন, সত্যিই দুনিয়ার সাজ-সজ্জা, নারী, খাদ্য-পানীয় ইত্যাদির মোহে পড়ে আমরা দুনিয়াকে আখেরাতের উপর প্রাধান্য দিয়ে বসেছি এবং আখেরাতও আমাদের চোখের আড়ালে চলে গেছে। ফলে পরকালকে ছেড়ে আমরা নগদ দুনিয়াকেই গ্রহণ করেছি।'
উল্লেখ যে, ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বিনয়বশত ও নিজেকে ছোট মনে করে এই কথাগুলো বলেছেন, অথবা মানুষের সার্বিক অবস্থার প্রেক্ষিতে তিনি এ কথাগুলো বলেছেন। আল্লাহ তা'আলাই ভালো জানেন। [তাফসীরে ইবনে কাসীর: ৬/৩৬২]
আহনাফ ইবনে কাইস থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন- অত:পর আমি মাদীনায় এলাম। একদিন কুরাইশদের একটি মজলিসে বসা ছিলাম। সেখানে তাদের সরদাররাও উপস্থিত ছিল। এমন সময় মোটা কাপড় পরিহিত সুঠাম দেহের অধিকারী রুক্ষ চেহারার এক ব্যক্তি আগমন করলেন। এসে দাঁড়িয়ে তিনি বললেন, সম্পদ কুক্ষিগতকারীদের সুসংবাদ দাও যে, একটি পাথর জাহান্নামের আগুনে উত্তপ্ত করে তাদের কারো স্তনের বোঁটার উপর রাখা হবে। এমনকি তা তার কাঁধের হাড় ভেদ করে বেরিয়ে যাবে এবং কাঁধের হাড়ের উপর রাখা হলে তা স্তনের বোঁটা ভেদ করে বেরিয়ে যাবে এবং পাথরটি [আগুনের উত্তাপের ফলে] কাঁপতে থাকবে। বর্ণনাকারী বলেন, উপস্থিত লোকেরা সবাই মাথা নত করে থাকল এবং তার বক্তব্যের প্রত্যুত্তরে কাউকে কিছু বলতে দেখলাম না। অত:পর তিনি পিছন ফিরে এসে একটি খুঁটির কাছে বসে পড়লেন। আমিও তাকে অনুসরণ করলাম। অর্থাৎ তার কাছে এসে বসলাম। তারপর আমি তাকে বললাম, আমি তো দেখলাম, এরা আপনি তাদের যা বলেছেন তা অপছন্দই করেছে। তিনি উত্তরে বললেন, এরা [দ্বীন সম্পর্কে] কিছুই বোঝে না বা জ্ঞান রাখে না। আমার বন্ধু আবুল কাসেম [ﷺ] একবার আমাকে ডাকলেন এবং আমি তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে উপস্থিত হলাম। অতঃপর তিনি বললেন, তুমি উহুদ পাহাড় দেখতে পাচ্ছ? তখন আমি লক্ষ করলাম, আমার উপর সূর্যের আর কতটুকু অবশিষ্ট আছে এবং আমি ধারণা করলাম তিনি হয়তো আমাকে কোনো কাজে পাঠাবেন। আমি বললাম, হাঁ দেখতে পাচ্ছি। তিনি বললেন, ‘আমাকে এটা আনন্দিত করবে না যে, এর সমপরিমাণ স্বর্ণ আমার হোক আর [প্রয়োজন পূরণের জন্য] তিন দিনার বাদে সবটাই আমি খরচ করে দিব।’ অতঃপর এরা শুধু দুনিয়া সঞ্চয় করেছে আর কিছুই বুঝছে না। বর্ণনাকারী বলেন, আমি তাকে বললাম, আপনার কুরাইশী ভাইদের সাথে আপনার কী হয়েছে? আপনি তাদের সাথে মেলামেশা করেন না, তাদের কাছে যান না, তাদের কাছ থেকে কোনো কিছু গ্রহণ করেন না? উত্তরে তিনি বললেন, তোমার রবের কসম! আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাক্ষাতের পূর্বে [মৃত্যু পর্যন্ত] তাদের কাছে পার্থিব কোনো কিছু চাইব না এবং দ্বীন সম্পর্কেও কোনো কিছু জিজ্ঞাসা করব না। [সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২০৫০]
এটা আমাকে আনন্দিত করবে না যে, আমার জন্য উহুদ পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণ হোক এবং তিন দিন এ অবস্থায় অতিবাহিত হোক যে, সে স্বর্ণ থেকে আমার কাছে একটি দিনার অবশিষ্ট থেকে যাবে; তবে সে দিনার ব্যতীত, যা আমি কারও ঋণ পরিশোধ করার জন্য প্রস্তুত রাখি। [সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২০৪৮]
এক ব্যক্তি ইবনে উমার র-কে জিজ্ঞেস করল, আমি কি বাইতুল্লাহ তাওয়াফ করব, অথচ আমি হজের ইহরাম বেঁধেছি? তিনি বললেন, কিসে তোমাকে বাধা দিচ্ছে? সে বলল, আমি অমুকের পুত্রকে দেখেছি, তিনি তা পছন্দ করেন না, কিন্তু তার তুলনায় আপনি আমাদের নিকট অধিক প্রিয়। আমরা লক্ষ করেছি যে, দুনিয়া তাকে ফেতনায় ফেলেছে। এ কথা শুনে ইবনে উমার বললেন, তোমাদের মধ্যে এমন কে আছে –অথবা তিনি বলেছেন- আমাদের মধ্যে এমন কে আছে যাকে দুনিয়ার ফেতনা আক্রমণ করেনি? [সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৩০৫৭]
আহমার ইবনে কাইস থেকে বর্ণিত, এক লোক তার কাছে মুয়ায ইবনে জাবাল থেকে হাদীস বর্ণনা করে বলেন, যখন তাঁর মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এল, মৃত্যু তার কাছে এসে উপস্থিত হল, তখন তিনি বললেন, হে মৃত্যু! হে অদৃশ্য যিয়ারতকারী! তোমাকে স্বাগতম! এমন বস্তু এসেছে যে সচরাচর আসে না! হে আল্লাহ! আমি আপনাকে ভয় করতাম। কিন্তু আজ আমি আপনার রহমতের আকাঙ্ক্ষা করছি। হে আল্লাহ! আপনি জানেন, আমি দুনিয়াকে এবং দুনিয়াতে অবস্থান করাকে এ জন্য পছন্দ করতাম না যে, আমি তাতে নহর প্রবাহিত করব কিংবা গাছপালা রোপণ করব। বরং এজন্য যে, [রোযা রেখে] প্রচন্ড গরমের পিপাসা সহ্য করব, সময়ের কষ্ট ও কঠোরতা সহ করব এবং উলামায়ে কেরামের মজলিস ও যিকিরের হালাকায় বেশি বেশি অংশগ্রহণ করব। [আহ-দুয়াতু ইনদাল মামাত : ১১৯-১২০]
📄 দুনিয়ার ব্যাপারে তাবেয়ীগণের অবস্থান
বর্ণনাকারী বলেন, আমরা মালেক ইবনে দীনার এর ঘরে প্রবেশ করলাম। তখন তিনি মৃত্যুশয্যায় শায়িত। তিনি স্বীয় নফসের সঙ্গে লড়াই করছেন। এমতাবস্থায় তিনি আসমানের দিকে মাথা উঠিয়ে বললেন, হে আল্লাহ! আপনি জানেন, দুনিয়াতে আমার বেঁচে থাকার প্রতি মহব্বত আমার উদরপূর্তি কিংবা যৌবনের তাড়নায় নয়। [আহ-দুয়াতু ইনদাল মামাত : ১৪৮]
আবু মুসলিম খাওলানী একবার এক মসজিদে প্রবেশ করলেন। দেখলেন কিছু লোক এক জায়গায় একত্র হয়ে বসে আছে। তিনি ভাবলেন হয়তো তারা যিকির করছেন কিংবা অন্য কোনো কল্যাণকর কাজে মজলিস করছেন। তাই তিনি তাদের দিকে এগিয়ে গেলেন এবং তাদের মজলিসে বসে পড়লেন। তিনি লক্ষ করলেন, তাদের একজন বলছে- আমার গোলাম ফিরে এসেছে; তার এমন এমন হয়েছে।
অন্যজন বলল- আমি আমার গোলামকে প্রস্তুত করেছি। তার জন্য যাবতীয় ব্যবস্থা সম্পন্ন করেছি।
এ অবস্থা লক্ষ করে আবু মুসলিম খাওলানী তাদের দিকে তাকালেন এবং বললেন, সুবহানাল্লাহ! হে লোকসকল! তোমরা কি জান তোমাদের ও আমার উপমা কেমন? আমার ও তোমাদের উপমা হচ্ছে ওই ব্যক্তির ন্যায়, যে মুষলধার বৃষ্টির সম্মুখীন হলো। ফলে সে আত্মরক্ষার জন্য এদিক-সেদিক তাকাতে লাগল। হঠাৎ সে দু'টি বড় [দরজার] কপাট দেখতে পেল। তা দেখে সে বলল, যদি আমি এই ঘরে প্রবেশ করতে পারি, তা হলে হয়তো বৃষ্টির হাত থেকে রক্ষা পেতে পারি। এই ভেবে লোকটি কপাট ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করল। ভেতরে প্রবেশ করে দেখল ঘরের উপর কোনো ছাদ নেই। তদ্রূপ আমিও তোমাদের নিকট বসেছিলাম এই আশায় যে, তোমরা হয়তো যিকির কিংবা অন্য কোনো কল্যাণকর মজলিসে বসে আছ! কিন্তু না; আমি যখন তোমাদের মজলিসে বসলাম, তখন দেখলাম তোমরা মূলত দুনিয়াদার। এ বলে তিনি দাঁড়ালেন এবং তাদের থেকে চলে গেলেন। [আয-যুহদ লি-ইবনিল মুবারক : ৩০৯]
এ হল আমাদের পূর্ববর্তীদের জীবনের কিছু নমুনা। এ বিষয়ে কেউ যদি আরও অধিক জানতে চান, তা হলে তিনি এ প্রসঙ্গে উলামায়ে কেরাম যেসকল কিতাবাদি রচনা করেছেন, সেগুলো অধ্যয়ন করতে পারেন।