📄 বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গি ও তার অর্থ
বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গি হল, মানুষের সমস্ত চিন্তা-চেতঁনা পার্থিব ও তাৎক্ষণিক ভোগ-বিলাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা এবং সকল চেষ্টা সাধনা ও পরিশ্রম কেবল এ উদ্দেশ্যেই ব্যয় করা। এসবের পরিণাম কী হতে পারে সে ব্যাপারে তার কোনোই চিন্তা-ভাবনা থাকে না এবং সে জন্য সে কোনো কাজও করে না। এদিকে তার কোনো ভ্রুক্ষেপই থাকে না। সে এ-ও জানে না যে, আল্লাহ দুনিয়ার এ জীবনকে আখেরাতের ফসলক্ষেত্র হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। দুনিয়াকে তিনি করেছেন আমলের স্থান এবং আখেরাতকে করেছেন প্রতিদান দেওয়ার স্থান। অতএব, যে ব্যক্তি সৎ ও পুণ্য কাজ দ্বারা পার্থিব জীবনের এ সুযোগ গ্রহণ করেছে, সে দুনিয়া-আখেরাত উভয় জগতে লাভবান হয়েছে। আর যে দুনিয়ার এ সুযোগ নষ্ট করেছে, সে তার আখেরাতকেও হারিয়েছে।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ ইরশাদ করেছেন–
خَسِرَ الدُّنْيَا وَالْآخِرَةَ ذَلِكَ هُوَ الْخُسْرَانُ الْمُبِينُ
সে দুনিয়া ও আখেরাতে ক্ষতিগ্রস্ত। এটাই তো সুস্পষ্ট ক্ষতি। [সুরা হজ : ১১]
আল্লাহ এই দুনিয়া অনর্থক সৃষ্টি করেননি। বরং এক মহান উদ্দেশ্যে তিনি একে সৃষ্টি করেছেন। তিনি ইরশাদ করেন–
الَّذِي خَلَقَ الْمَوْتَ وَالْحَيَاةَ لِيَبْلُوَكُمْ أَيُّكُمْ أَحْسَنُ عَمَلًا
যিনি সৃষ্টি করেছেন মৃত্যু ও জীবন, যাতে তোমাদের পরীক্ষা করেন– কে তোমাদের মধ্যে কর্মে শ্রেষ্ঠ! [সুরা মুলক : ২]
অন্যত্র তিনি ইরশাদ করেন–
إِنَّا جَعَلْنَا مَا عَلَى الْأَرْضِ زِينَةً لَّهَا لِنَبْلُوَهُمْ أَيُّهُمْ أَحْسَنُ عَمَلًا
ভূ-পৃষ্ঠের সব কিছুই আমি পৃথিবীর শোভা করেছি, মানুষকে পরীক্ষা করার জন্য যে, তাদের মধ্যে কে কর্মে শ্রেষ্ঠ! [সুরা কাহফ : ৭]
আল্লাহ এ জীবনে ধন-সম্পদ, সন্তান-সন্ততি, মান-ইজ্জত, নেতৃত্ব এবং অন্যান্য এমন উপভোগ্য ক্ষণস্থায়ী ও প্রকাশ্য শোভা বর্ণনাকারী বস্তু সৃষ্টি করেছেন, যা সূক্ষ্ম তিনি ছাড়া আর কেউ জানে না। অধিকাংশ লোকের দৃষ্টিই এসব বাহ্যিক চাকচিক্য ও সৌন্দর্যের প্রতি সীমাবদ্ধ। তারা এ সবের গোপন তত্ত্ব ও রহস্য সম্পর্কে কোনো চিন্তা- ভাবনা করে না। ফলে শেষ পরিণাম কী হবে সে সম্পর্কে তারা কোনো ফিকির করে না এবং সে সম্পর্কে কোনোরূপ চিন্তা-ভাবনা না করেই তারা দুনিয়ার এসব ধন-দৌলত অর্জন, সঞ্চয়করণ ও উপভোগে মত্ত হয়ে পড়ে। এমনকি অবস্থা এত দূর পর্যন্ত গড়ায় যে, এ দুনিয়ার জীবন ছাড়াও আরেক জীবন যে আছে তা-ও তারা অস্বীকার করে বসে। যেমন, আল্লাহ ইরশাদ করেন–
وَقَالُوا إِنْ হِيَ إِلَّا حَيَاتُنَا الدُّنْيَا وَمَا نَحْنُ بِمَبْعُوثِينَ
আর তারা বলে, আমাদের এ পার্থিব জীবনই একমাত্র জীবন এবং আমরা পুনরুত্থিত হব না। [সূরা আনআম : ২৯]
জীবনের প্রতি যারা এ রকম দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে, তাদের প্রতি আল্লাহ কঠিন শাস্তির ভয় প্রদর্শন করেছেন। যেমন, তিনি ইরশাদ করেছেন-
إِنَّ الَّذِينَ لَا يَرْجُونَ لِقَاءَنَا وَرَضُوا بِالْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَاطْمَأَنُّوا بِهَا وَالَّذِينَ هُمْ عَنْ آيَاتِنَا غَافِلُونَ ۙ أُولَئِكَ مَأْوَاهُمُ النَّارُ بِمَا كَانُوا يَكْسِبُونَ
নিশ্চয়ই যেসব লোক আমার সাক্ষাৎ লাভের আশা রাখে না এবং পার্থিব জীবন নিয়ে সন্তুষ্ট ও তা নিয়েই পরিতৃপ্ত থাকে এবং যারা আমার নিদর্শনসমূহ সম্পর্কে গাফেল, এমন লোকদের আবাস হল [জাহান্নামের] আগুন, তাদের কৃতকর্মের বদলাস্বরূপ। [সূরা ইউনুস : ৭-৮]
অন্যত্র আল্লাহ বলেন-
مَنْ كَانَ يُرِيدُ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا وَزِينَتَهَا نُوَفِّ إِلَيْهِمْ أَعْمَالَهُمْ ফীহা وَهُمْ فِيهَا لَا يُبْخَسُونَ ۙ أُولَئِكَ الَّذِينَ لَيْسَ لَهُمْ فِي الْآخِرَةِ إِلَّا النَّارُ ۖ وَحَبِطَ مَا صَنَعُوا ফীহা وَبَاطِلٌ মَّا كَانُوا يَعْمَلُونَ
যে ব্যক্তি পার্থিব জীবন ও এর চাকচিক্য কামনা করে, আমি তাদেরকে দুনিয়াতেই তাদের আমলের পূর্ণ প্রতিফল প্রদান করি এবং এখানে তাদেরকে কম দেওয়া হবে না। এদেরই জন্য আখিরাতে জাহান্নামের আগুন ব্যতীত অন্য কিছুই নেই এবং তারা এখানে যা করে, আখিরাতে তা নিষ্ফল হয়ে যাবে। আর তারা যে সব কাজ-কর্ম করে সবই নিরর্থক। [সূরা হুদ : ১৫-১৬]
শাস্তির এই বাণী উল্লিখিত দৃষ্টিভঙ্গি পোষণকারীদের শামিল করছে। চাই তারা ওই ধরনের লোক হোক, যারা দুনিয়া অর্জনের উদ্দেশ্যে আখিরাতের কাজ করে থাকে, যেমন মুনাফিক, রিয়াকারী, অথবা হোক তারা কাফের, পুনরুত্থান ও হিসাবদিবসের অস্বীকারকারী। যেমন, জাহেলী যুগের লোকদের অবস্থা এবং বর্তমান জামানার নাস্তিক্যবাদী ও ধর্মহীন সম্প্রদায়ের লোকদের অবস্থা। জীবনের প্রকৃত কদর এরা বুঝতে পারেনি এবং জীবনের প্রতি এদের দৃষ্টিভঙ্গি পশুর দৃষ্টিভঙ্গিকে অতিক্রম করে যেতে পারেনি। বরং এরা তো পশুর চেয়েও অধম। কেননা, তারা তাদের বিবেক-বুদ্ধিকে অকার্যকর করে সমস্ত বস্ত্তবাদের প্রতি নিয়োজিত করেছে। আর এমন জিনিসের পেছনে তারা তাদের সমস্ত সময় ব্যয় করে দিচ্ছে, যা তাদের জন্য স্থায়ী নয় এবং তারাও তা স্থায়ীভাবে ভোগ করতে পারবে না। আর নিজেদের সেই অবশ্যম্ভাবী পরিণামের জন্য তারা কিছুই করছে না, যা তাদের জন্য অপেক্ষা করছে। তারা পশুর চেয়েও অধম এজন্য যে, পশুর শেষ পরিণাম বলতে কিছু নেই এবং এমন কোনো বিবেক-বুদ্ধিও নেই যার দ্বারা তারা চিন্তা-ভাবনা করতে পারে। অথচ এ দু'টি বস্ত্তই ওই লোকদের রয়েছে।
আল্লাহ তাদের সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন—
أَمْ تَحْسَبُ أَنَّ أَكْثَرَهُمْ يَسْمَعُونَ أَوْ يَعْقِلُونَ إِنْ هُمْ إِلَّا كَالْأَنْعَامِ بَلْ هُمْ أَضَلُّ سَبِيلًا
আপনি কি মনে করেন যে, তাদের অধিকাংশ শুনে ও বোঝে? তারা তো পশুর মতোই, বরং আরও অধিক পথভ্রষ্ট। [সূরা ফুরকান : ৪৪]
📄 ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি ও তার অর্থ
জীবনের প্রতি সঠিক ও ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি হল, এ দুনিয়ায় যত সম্পদ, কর্তৃত্ব-নেতৃত্ব ও বৈষয়িক শক্তি-সামর্থ্য রয়েছে, সব কিছুকেই আখিরাতের কাজের সহায়ক মাধ্যম হিসেবে গণ্য করা। প্রকৃত অর্থে দুনিয়া সুদূর নির্দিষ্ট বস্ত্ত নয়। বরং প্রশংসা ও নিন্দা উভয়ই দুনিয়ায় বান্দার কাজের প্রতি প্রযোজ্য। দুনিয়া আখিরাতের সেতু এবং পারাপারের রাস্তা। দুনিয়া থেকেই জান্নাতের পাথেয় সংগ্রহ করতে হয়। জান্নাতবাসীগণ যে উত্তম জীবন লাভ করবে, তা মূলত দুনিয়ায় তাদের পুণ্যকর্ম ও উত্তম বপন-কার্যের বিনিময়েই অর্জিত হবে। অতএব, দুনিয়া হল জিহাদের স্থান, সালাত, সাওম ও আল্লাহর পথে অর্থবিত্তের স্থান এবং কল্যাণমূলক কাজে প্রতিযোগিতার সাথে ধাবিত হওয়ার স্থান।
আল্লাহ জান্নাতবাসীদের উদ্দেশ্যে বলেন-
كُلُوا وَاشْرَبُوا هَنِيئًا بِمَا أَسْلَفْتُمْ فِي الْأَيَّامِ الْخَالِيَةِ
তোমরা পানাহার কর তৃপ্তি সহকারে; অতীত দিনে যা করেছিলে তার বিনিময়ে। [সূরা হাক্কাহ : ২৪]