📘 দুনিয়ার মোহে পড়বেন না 📄 দুনিয়ার হাকিকত

📄 দুনিয়ার হাকিকত


আল্লাহ পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন-
اِعْلَمُوْا أَنَّمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا لَعِبٌ وَّ لَهْوٌ وَّ زِيْنَةٌ وَّ تَفَاخُرٌ بَيْنَكُمْ وَتَكَاثُرٌ فِي الْأَمْوَالِ وَالْأَوْلَادِ ؕ كَمَثَلِ غَيْثٍ اَعْجَبَ الْكُفَّارَ نَبَاتُهُ ثُمَّ يَهِيْجُ فَتَرَاهُ مُصْفَرًّا ثُمَّ يَكُوْنُ حُطَامًا ؕ وَفِي الْاٰخِرَةِ عَذَابٌ شَدِيْدٌ وَّ মَغْفِرَةٌ মِّنَ اللهِ وَرِضْوَانٌ ؕ وَمَا الْحَيٰوةُ الدُّنْيَا إِلَّا مَتَاعُ الْغُرُوْরِ

তোমরা জেনে রাখো! পার্থিব জীবন ক্রীড়া-কৌতুক, সাজ-সজ্জা, পারস্পরিক অহমিকা এবং ধন ও জনের প্রাচুর্য ব্যতীত আর কিছু নয়; যেমন এক বৃষ্টির অবস্থা, যার সবুজ ফসল কৃষকদের চমতকৃত করে, এরপর তা শুকিয়ে যায়, ফলে আপনি তাকে পীতবর্ণ দেখতে পান, এরপর তা খড়কুটো হয়ে যায়। আর পরকালে আছে কঠিন শাস্তি এবং আল্লাহর ক্ষমা ও সন্তুষ্টি। পার্থিব জীবন প্রতারণার উপকরণ বৈ কিছু নয়। [সূরা হাদীদ : ২০]

ক্বুরতুবী বলেন, আয়াতে বর্ণিত لا শব্দটি ‘সিলা’ তথা সম্পর্ক স্থাপনকারী। এর অর্থ হচ্ছে- তোমরা জেনে রাখো! পার্থিব জীবন কেবলই বাতিল খেলাধুলা ও [সাময়িক] আনন্দদায়ক ক্রীড়া-কৌতুক। অতঃপর অচিরেই তা নিঃশেষ হয়ে যাবে।

ক্বাতাদা বলেন, ক্রীড়া ও কৌতুক বলে এখানে খাওয়া ও পান করা বোঝানো হয়েছে।

আবার কেউ কেউ বলেন, এখানে এ শব্দদ্বয় তাদের নিজস্ব অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে।

মুজাহিদ বলেন, যেকোনো ধরনের খেল-তামাশাই এর অন্তর্ভুক্ত। [তাফসীরে ক্বুরতুবী: ১৭/২৫৪]

ইবনে কাসীর বলেন, আল্লাহ দুনিয়ার জীবনকে তুচ্ছ ও নিকট আখ্যায়িত করে বলেন-
اِعْلَمُوا أَنَّمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا لَعِبٌ وَلَهْوٌ وَزِينَةٌ وَتَفَاخُرٌ بَيْنَكُمْ وَتَكَاثُرٌ فِي الْأَمْوَالِ وَالْأَوْلَادِ ۖ

পার্থিব জীবন ক্রীড়া-কৌতুক, সাজ-সজ্জা, পারস্পরিক অহমিকা এবং ধন ও জনের প্রাচুর্য ব্যতীত আর কিছু নয়। [সূরা হাদীদ : ২০]

অর্থাৎ পার্থিব জীবনের ফলাফল ক্রীড়া-কৌতুক, জাঁকজমক, পারস্পরিক আহংকারিতা আর ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে প্রাচুর্য লাভের প্রতিযোগিতা ছাড়া আর কিছুই নয়। এককথায়, দুনিয়ার বিষয়টি দুনিয়াদারদের নিকট ঠিক তেমনই, যেমনটা আল্লাহ তার নিম্নোক্ত আয়াতে বর্ণনা করেছেন-
زُيِّنَ لِلنَّاسِ حُبُّ الشَّهَوَاتِ مِنَ النِّسَاءِ وَالْبَنِينَ وَالْقَنَاطِيرِ الْمُقَنْطَرَةِ مِنَ الذَّهَبِ وَالْفِضَّةِ وَالْخَيْلِ الْمُسَوَّمَةِ وَالْأَنْعَامِ وَالْحَرْثِ ۗ ذَلِكَ مَتَاعُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَاللَّهُ عِنْدَهُ حُسْنُ الْمَآبِ

মানুষের জন্য সুশোভিত করা হয়েছে নারী, সন্তান-সন্ততি, রাশীকৃত স্বর্ণ-রৌপ্য, চিহ্নিত অশ্ব, গবাদি পশুরাজি এবং ক্ষেত- খামারের মতো আকর্ষণীয় বস্তুসামগ্রী। এ সবই হচ্ছে পার্থিব জীবনের ভোগ বস্তু। আল্লাহর নিকটই হল উত্তম আশ্রয়। [সূরা আলে ইমরান : ১৪]

এরপর আল্লাহ পার্থিব জীবনের একটি উপমা দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, দুনিয়ার জীবন হল সাময়িক চাকচিক্য, ক্ষণস্থায়ী সৌন্দর্য ও ধ্বংসশীল নেয়ামত। আল্লাহ দুনিয়ার ক্ষণস্থায়িত্ব ও অনিত্যতার উপমা প্রদান করে ইরশাদ করেছেন-
كَمَثَلِ غَيْثٍ أَعْجَبَ الْكُفَّارَ نَبَاتُهُ ثُمَّ يَهِيجُ فَتَرَاهُ مُصْفَرًّا ثُمَّ يَكُونُ حُطَامًا

যেমন এক বৃষ্টির অবস্থা, যার সবুজ ফসল কৃষকদের চমৎকৃত করে, এরপর তা শুকিয়ে যায়, ফলে আপনি তাকে পীতবর্ণ দেখতে পান, এরপর তা খড়কুটো হয়ে যায়। [সূরা হাদীদ : ২০]

অর্থাৎ সেই বৃষ্টির মতো, যার অপেক্ষা করতে করতে এক সময় মানুষ হতাশ হয়ে যায়, অতঃপর হঠাৎই এক সময় বৃষ্টি এসে পড়ে।

যেমন, অন্য এক আয়াতে আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন–
وَهُوَ الَّذِي يُنَزِّلُ الْغَيْثَ مِنْ بَعْدِ مَا قَنَطُوا
মানুষ নিরাশ হয়ে যাওয়ার পর তিনিই বৃষ্টি বর্ষণ করেন। [সূরা শুরা : ২৮]

আল্লাহ্-র বাণী- أَعْجَبَ الْكُفَّارَ ‘যার সবুজ ফসল কৃষকদের চমৎকৃত করে।’ অর্থাৎ বৃষ্টি দ্বারা উৎপন্ন ফসল যেমন কৃষকদের চমৎকৃত করে, তেমনি দুনিয়ার এ জীবন ও তার ক্ষণস্থায়ী আনন্দ-উপভোগ কাফেরদের আনন্দিত ও খুশি করে। তারা কেবল দুনিয়া নিয়েই মেতে থাকে। কারণ, তারা দুনিয়ার প্রতি সর্বাধিক আসক্ত ও লোভী। মানুষের মধ্যে তারাই দুনিয়ার প্রতি সবচেয়ে বেশি ধাবিত।

অতঃপর আল্লাহ্ বলেন– ثُمَّ يَهِيجُ فَتَرَاهُ مُصْفَرًّا ثُمَّ يَكُونُ حُطَامًا ‘এরপর তা শুকিয়ে যায়, ফলে আপনি তাকে পীতবর্ণ দেখতে পান, এরপর তা খড়কুটা হয়ে যায়।’ অর্থাৎ যে ফসল কৃষকদের চমৎকৃত করেছিল, তা এক সময় শুকিয়ে যায়। তখন আপনি সেগুলোকে পীতবর্ণের দেখতে পান। অথচ কিছু সময় পূর্বেও এগুলো সবুজ-শ্যামল ও তরতাজা ছিল। এরপর এ সবগুলোই খড়কুটোয় পরিণত হয়। অর্থাৎ একদম শুকনো খড়কুটোয় পরিণত হয়ে যায়। এ-ই হচ্ছে দুনিয়ার উপমা। প্রথমে দুনিয়া থাকে তরতাজা ও যুবক। তারপর ধীরে ধীরে তা দুর্বল হতে থাকে। এক সময় সে অতিশয় দুর্বল ও বৃদ্ধ হয়ে যায়।

মানুষও ঠিক তেমনই। মানুষের জীবনের শুরুটা থাকে তরতাজা ও প্রাণচঞ্চল। তারপর আসে টগবগে যৌবন। সুন্দর সুদর্শন ও দৃষ্টিনন্দন। তারপর এক সময় ধীরে ধীরে সে দুর্বল হতে শুরু করে। তার শক্তি-সামর্থ্য ও রঙ পরিবর্তন হতে থাকে। হতে হতে এক সময় সে শরীরের কিছু শক্তি হারিয়ে ফেলে। তারপর বৃদ্ধ হতে থাকে। এক পর্যায়ে সে শীর্ণ, ক্ষীণকায় ও অতিশয় দুর্বল বৃদ্ধে পরিণত হয়। তার শক্তি প্রায় নিঃশেষ হয়ে যায়। নাড়াচাড়াও করতে পারে না। ক্ষুদ্র জিনিসই তাকে দুর্বল, কাহিল ও অক্ষম করে দেয়। যেমন, আল্লাহ ইরশাদ করেছেন—
اللَّهُ الَّذِي خَلَقَكُمْ مِنْ ضَعْفٍ ثُمَّ جَعَلَ مِنْ بَعْدِ ضَعْفٍ قُوَّةً ثُمَّ جَعَلَ مِنْ بَعْدِ قُوَّةٍ ضَعْفًا وَشَيْبَةً يَخْلُقُ مَا يَشَاءُ وَهُوَ الْعَلِيمُ الْقَدِيرُ

আল্লাহ, যিনি দুর্বল অবস্থায় তোমাদের সৃষ্টি করেন, অতঃপর দুর্বলতার পর শক্তিদান করেন, অতঃপর শক্তির পর দেন দুর্বলতা ও বার্ধক্য। তিনি যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন এবং তিনি সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান। [সূরা রূম : ৫৪]

আল্লাহ রব্বুল আলামীন প্রথমে এই উপমার মাধ্যমে বুঝিয়েছেন যে, এই দুনিয়া ও তার যাবতীয় নেয়ামত নশ্বর ও ধ্বংসশীল। দুনিয়া চিরস্থায়ী নয়, এখানে কেউ চিরদিন থাকবে না। অবশ্যই একদিন না একদিন সকলকে এখান থেকে বিদায় নিয়ে চলে যেতে হবে। পক্ষান্তরে আখেরাতের কোনো শেষ নেই। আখেরাত স্থায়ী। তার জীবন অনন্ত, নেয়ামত অফুরন্ত। আখেরাতের জীবন কখনও শেষ হবে না। তাই তিনি আমাদের দুনিয়ার জীবন সম্পর্কে সতর্ক করেছেন, এর সঙ্গে সম্পর্ক হতে নিষেধ করেছেন। বরং আখেরাতমুখী হতে বলেছেন এবং আখেরাতের কল্যাণ অর্জনে উৎসাহিত করেছেন। এই মর্মে তিনি ইরশাদ করেছেন—
ফِي الْآخِرَةِ عَذَابٌ شَدِيدٌ وَمَغْفِرَةٌ মِّنَ اللَّهِ وَرِضْوَانٌ وَمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلَّا مَتَاعُ الْغُرُورِ

আর পরকালে আছে কঠিন শাস্তি এবং আল্লাহর ক্ষমা ও সন্তুষ্টি। পার্থিব জীবন প্রতারণার উপকরণ বৈ কিছু নয়। [সূরা হাদীদ : ২০]

অর্থাৎ অবশ্যম্ভাবীরূপে আগত আখেরাতের এ দু'টি ব্যতীত আর কোনো বিষয় থাকবে না। হয়তো এটি, নয়তো সেটি। হয়তো মর্মন্তুদ শাস্তি, নয়তো মহান রবের পক্ষ থেকে ক্ষমা ও সন্তুষ্টি।

আল্লাহর বাণী– وَمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلَّا مَتَاعُ الْغُرُورِ – ‘পার্থিব জীবন তো প্রতারণার উপকরণ বৈ কিছু নয়।’ অর্থাৎ এই দুনিয়ার জীবন ক্ষণস্থায়ী ও ধ্বংসশীল এবং এর প্রতি যাবতীয় আসক্তির জন্য এক ধোঁকার উপকরণ। কেননা, তারা এ দুনিয়া নিয়ে ধোঁকায় লিপ্ত এবং দুনিয়া নিয়েই তারা মত্ত ও সন্তুষ্ট। এমনকি তারা বিশ্বাস করতে শুরু করে যে, এই দুনিয়া ছাড়া আর কোনো জীবন নেই; এর আড়ালে কোনো প্রত্যাবর্তনস্থল নেই। অথচ আখেরাত ও আখেরাতের স্থায়ী জীবনের তুলনায় দুনিয়া ও দুনিয়ার জীবন খুবই নগণ্য ও তুচ্ছ। যাদের মাঝে কখনও তুলনা করা চলে না। [তাফসীরে ইবনে কাসীর: ৮/২৪]

আল্লাহ ইরশাদ করেছেন—
وَاضْرِبْ لَهُمْ মَثَلَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا كَمَاءٍ أَنْزَلْنَاهُ مِنَ السَّمَاءِ فَاخْتَلَطَ بِهِ نَبَاتُ الْأَرْضِ فَأَصْبَحَ هَشِيمًا تَذْرُوهُ الرِّيَاحُ وَكَانَ اللَّهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ مُقْتَدِرًا

তাদের কাছে পার্থিব জীবনের উপমা বর্ণনা করুন। তা পানির ন্যায়, যা আমি আকাশ থেকে নাযিল করি। অতঃপর এর সমিশ্ৰণে শ্যামল সবুজ ভূমিজ লতা-পাতা নির্গত হয়; অতঃপর তা এমন শুষ্ক চূর্ণ-বিচূর্ণ হয় যে, বাতাসে উড়ে যায়। আর আল্লাহ সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান। [সূরা কাহ্ফ : ৪৫]

আয়াতের ব্যাখ্যায় তাবারী বলেন, সম্পদশালীরা যেন তাদের সম্পদের আধিক্যের কারণে অহংকার না করে। অন্যদের উপর যেন বড়াই না করে। দুনিয়াদাররা যেন তাদের দুনিয়া নিয়ে ধোঁকায় লিপ্ত ও প্রবঞ্চিত না হয়। কেননা, দুনিয়ার উপমা হচ্ছে এইসব ফসলের ন্যায়, যা বৃষ্টির কারণে সতেজ-সুফলা, সবুজ-শ্যামল ও দৃষ্টিনন্দন হয়। কিন্তু যখনই বৃষ্টি বন্ধ হয়ে যায়, তখন তা শুকিয়ে যায়। তখন আর তার সেই সজীবতা ও সৌন্দর্য অবশিষ্ট থাকে না। বরং তা পরিণত হয়ে যায় শুষ্ক খড়-কুটোয়। বাতাস যাকে উড়িয়ে এদিক-সেদিক নিয়ে যায়। তখন আর মানুষের দৃষ্টিও সেগুলোর দিকে আকৃষ্ট হয় না। দুনিয়ার জীবনও ঠিক এসব ফসলের মতো। অতএব, যে জীবনের বাস্তবতা, ফলাফল ও পরিণতি এমন, সে জীবনের জন্য ব্যস্ত না হয়ে আমাদের এমন এক জীবনের জন্য কাজ করা উচিত, যা চিরস্থায়ী ও অপরিবর্তনীয়। যা কোনোদিন পরিবর্তন, বিবর্তন ও বৃথা হবে না। [তাফসীরে তাবারী : ১৮/৩০]

ইবনে কাসীর রহ. বলেন, আল্লাহ তা'আলা তাঁর প্রিয় হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সম্বোধন করে ইরশাদ করেন, হে নবী! আপনি মানুষের জন্য পার্থিব জীবনের ক্ষণস্থায়িত্ব ও বিলুপ্তির উপমা বর্ণনা করুন। পার্থিব জীবন তো হল সেই পানির মতো, যা আমি আকাশ থেকে অবতীর্ণ করেছি। অতঃপর সেই পানির সাথে ভূমির বীজ মিশ্রিত হয়ে চারা গজিয়েছে এবং তা থেকে সবুজ-শ্যামল লতা-পাতা উৎপন্ন হয়েছে। অতঃপর শুষ্ক হয়ে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেছে; যা ডানে-বামে বাতাস উড়িয়ে নিয়ে গেছে। আর আল্লাহ সকল বস্তুর উপর ক্ষমতাবান। তিনি শ্যামল- সবুজও করতে পারেন আবার তাকে শুষ্ক করে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে বিলুপ্তও করে দিতে পারেন। আল্লাহ বহুত স্থানে পার্থিব জীবনকে এই উপমা দ্বারা বর্ণনা করেছেন। [তাফসীরে ইবনে কাসীর : ৪/১৬১]

আল্লাহ ইরশাদ করেছেন–
إِنَّمَا মَثَلُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا كَمَاءٍ أَنْزَلْنَاهُ مِنَ السَّمَاءِ فَاخْتَلَطَ بِهِ نَبَاتُ الْأَرْضِ মِمَّا يَأْكُلُ النَّاسُ وَالْأَنْعَامُ ۖ حَتَّى إِذَا أَخَذَتِ الْأَرْضُ زُخْرُفَهَا وَازَّيَّنَتْ وَظَنَّ أَهْلُهَا أَنَّهُمْ قَادِرُونَ عَلَيْهَا أَتَاهَا أَمْرُنَا لَيْلًا أَوْ نَهَارًا فَجَعَلْنَاهَا حَصِيدًا كَأَنْ لَمْ تَغْنَ بِالْأَمْسِ ۚ كَذَلِكَ نُفَصِّلُ الْآيَاتِ لِقَوْمٍ يَتَفَكَّرُونَ

পার্থিব জীবনের উদাহরণ তেমনি, যেমনি আমি আসমান থেকে পানি বর্ষলাম, পরে তা মিলিত সংমিশ্রিত হয়ে তা থেকে জমিনের শ্যামল উদ্ভিদ বেরিয়ে এল, যা মানুষ ও জীব-জন্তুরা খেয়ে থাকে। এমনকি জমিন যখন সৌন্দর্য-সুষমায় ভরে উঠল আর জমিনের অধিকারীরা ভাবতে লাগল, এগুলো আমাদের হাতে আসবে, হঠাৎ করে তার উপর আমার নির্দেশ এল রাতে কিংবা দিনে, তখন সেগুলোকে কেটে স্তূপাকার করে দিল যেন গতকালও এখানে কোনো আবাদ ছিল না। এমনিভাবে আমি খোলাখুলি বর্ণনা করে থাকি নিদর্শনসমূহ, সে সমস্ত লোকের জন্য যারা চিন্তা-ভাবনা করে। [সূরা ইউনুস : ২৪]

ইবনুল কাইয়িম রহ. বলেন, আল্লাহ দুনিয়ার জীবনের স্বরূপ বর্ণনা করার জন্য একটি উপমা দিয়ে বলেন যে, দুনিয়ার জীবন একজন পরিদর্শকের দৃষ্টিতে খুবই সুন্দর ও দৃষ্টিনন্দন। সে এর সৌন্দর্য-শোভা মেখে বিস্মিত হয়, মুগ্ধ হয়। অতঃপর সে দুনিয়ার প্রতি ঝুঁকে পড়ে এবং প্রবঞ্চিত হয়ে দুনিয়াকেই কামনা করে। এমনকি এক পর্যায়ে সে ভাবতে থাকে, এ জীবনের মালিক সে নিজেই এবং সে একে ধরে রাখতে সক্ষম। এরপর হঠাৎই তার থেকে তার জীবনকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়, যে জীবনের প্রতি সে খুব বেশি আকৃষ্ট ও নির্ভরশীল ছিল। তার মাঝে ও তার জীবনের মাঝে এক মহাপ্রাচীর দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়। আল্লাহ দুনিয়ার এ জীবনের উপমা দিয়েছেন ওই ভূমির সাথে, যাতে আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষিত হয়। অতঃপর তা উর্বর হয়ে উদ্ভিদ উৎপন্ন করে। ফসলের সৌন্দর্য মানুষের দৃষ্টি কাড়ে। এই দৃশ্য দর্শকেরা অন্তরে আনন্দের ঢেউ তোলে এবং সে মনে করতে থাকে, সে নিজেই ফসল উৎপন্ন করতে সক্ষম এবং সে নিজেই এর মালিক। অতঃপর হঠাৎই তাতে আল্লাহর আদেশ চলে আসে এবং আক্রান্ত হয় ফসলের জমি। ফলে তা এমন হয়ে যায়, যেন গতকালও এখানে কোনো ফসলি জমি ছিল না। তখন তার ধারণা ও বিশ্বাস একেবারেই পাল্টে যায় এবং সে একদম নিঃস্ব ও রিক্তহস্ত হয়ে যায়। দুনিয়ার জীবনের অবস্থা আর যারা দুনিয়ার জীবনকে আঁকড়ে থাকে, তাদের অবস্থা এমনই। এ দৃষ্টান্ত দুনিয়ার জীবনের সর্বোৎকৃষ্ট ও সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত। [ই'লামুল মুয়াক্কিঈন : ১/১৮০]

আল্লাহ ইরশাদ করেছেন- وَমَا هَذِهِ الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلَّا لَهْوٌ وَلَعِبٌ وَإِنَّ الدَّارَ الْآخِرَةَ لَهِيَ الْحَيَوَانُ لَوْ كَانُوا يَعْلَمُونَ

এই পার্থিব জীবন ক্রীড়া-কৌতুক বৈ তো কিছুই নয়। পরকালের গৃহই তো প্রকৃত জীবন; যদি তারা জানত। [সূরা আনকাবূত : ৬৪]

আবু সাঈদ খুদরী থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী কারীম ইরশাদ করেছেন- নিশ্চয় দুনিয়া মিষ্টি সবুজ [সুস্বাদু, দর্শনীয়]। আল্লাহ তাআলা সেখানে তোমাদের প্রতিনিধি হিসাবে পাঠিয়েছেন। তিনি দেখতে চান, তোমরা কী কর! অতএব, দুনিয়া ও নারী থেকে তোমরা সাবধান থেকো। কেননা, বনী ইসরাঈলের মধ্যে প্রথম যে ফেতনা দেখা দিয়েছিল, তা ছিল নারীকে কেন্দ্র করে। অপর এক বর্ণনায় এসেছে, যাতে তিনি দেখেন তোমরা কেমন আমল কর। [সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৭৪২, মুসনাদে আহমদ, হাদীস নং ১১১৬২]

আব্দুল্লাহ ইবনে আমর থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন— দুনিয়া উপভোগের উপকরণ, আর দুনিয়ার উত্তম উপভোগ্য উপকরণ পূণ্যবতী নারী। [সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৬৭১৬, সুনানে নাসায়ী, হাদীস নং ৩২৩২, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ৬৪৮৭]

সাহল ইবনে সা’দ আস-সা‘য়িদী থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবীজি ইরশাদ করেছেন— আল্লাহর নিকট যদি এই পৃথিবীর মূল্য মশার একটি পাখার সমানও হত, তা হলে তিনি কোনো কাফেরকে এখানাকার পানির একটি ঢোঁকও পান করাতেন না। [সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ২৩২০, সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ১০৭৭]

আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন— একদিন রাসূলুল্লাহ একটি মৃত বকরির পাশ দিয়ে অতিক্রম করলেন, যে বকরিটিকে তার মালিক [রাস্তায়] ফেলে দিয়েছিল। তখন তিনি বললেন, যে সত্তার হাতে আমার প্রাণ, তার শপথ! নিশ্চয় এই মৃত বকরীটি তার মালিকের কাছে যতটা মূল্যবান, আল্লাহর কাছে দুনিয়া তার চেয়েও অধিক মূল্যবান। [মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ০৩৭৫]

আমাদের কেউ যদি দুনিয়ার প্রকৃত বাস্তবতা নিয়ে একটু গভীরভাবে ভেবে দেখে, তা হলে সে অবশ্যই এই দুনিয়া ও দুনিয়ার যাবতীয় কিছুকে অত্যন্ত নগণ্য ও তুচ্ছ পাবে; যার জন্য এত কষ্ট করা এবং যার পিছনে ছুটে চলার কোনো অর্থ হয় না। যেমন, জাবের ইবনে আবদুল্লাহ-র সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- একদিন রাসূলুল্লাহ 'আলিয়া' অঞ্চল থেকে মদীনায় আসার পথে বাজার দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। এ সময় রাসূলুল্লাহ-র উভয় পাশে বেশ লোকজন ছিল। যেতে যেতে তিনি ক্ষুদ্র কান বিশিষ্ট একটি মৃত বকরির বাচ্চার কাছে পৌঁছলেন। অতঃপর তিনি তার কান ধরে বললেন, তোমাদের কেউ কি এক দিরহাম দিয়ে এটা কিনতে আগ্রহী? তখন উপস্থিত লোকেরা বললেন, কোনো কিছুরই বিনিময়ে এটা আমরা নিতে আগ্রহী নই; আর এটা নিয়ে আমরা কী করব?! তখন রাসূলুল্লাহ বললেন, [বিনা পয়সায়] তোমরা কি তা নিতে আগ্রহী? তারা বললেন, এ যদি জীবিত হত তবুও তো এটা দোষী। কেননা, এর কানগুলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র। আর এখন তো এটা মৃত! আমরা কীভাবে এটা গ্রহণ করব? তখন নবীজি ইরশাদ করলেন, আল্লাহর কসম! এটা তোমাদের কাছে যতটা মূল্যবান, আল্লাহর কাছে দুনিয়া এর চেয়ে আরও বেশি মূল্যবান। [সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৯৫৭]

আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবীজি এরশাদ করেছেন— দুনিয়া মুমিনের জন্য জেলখানা আর কাফেরের জন্য জান্নাততুল্য। [সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৭৬০৬, সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ৪১১৩, সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ২৩২৪]

মুসতাওরিদ ইবনে শাদ্দাদ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ এরশাদ করেছেন— আল্লাহর কসম! দুনিয়ার জীবন আখেরাতের জীবনের তুলনায় এমন, যেমন তোমাদের কেউ তার এ আঙুলটি —বর্ণনাকারী ইয়াহইয়া শাহাদাত আঙুল দ্বারা ইশারা করলেন— সমুদ্রের পানিতে ভেজাল। অতঃপর সে দেখুক কতটুকু পরিমাণ [পানি] এতে লেগেছে। [সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৭৩৭৬, সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ৪১০৮, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ১৮০০৮]

এ দুনিয়ার কোনো নেয়ামত এ পর্যায়ের নয়, যা পেলে আনন্দিত হওয়া যায় কিংবা হাতছাড়া হয়ে গেলে পেরেশান হতে হয়।

ইমাম আহমাদ ইবনে হান্বাল কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল– যে ব্যক্তির কাছে এক হাজার দিনার আছে, সে কি ‘যাহেদ’ [দুনিয়াবিমুখ ও দুনিয়ার প্রতি অনাসক্ত] হতে পারে? তিনি জবাব দিয়েছিলেন– হাঁ, যদি সে ওই পরিমাণে বৃদ্ধি ঘটলে আনন্দিত না হয় এবং হ্রাস পেলে দুঃখিতও না হয়। [মাদারিজুস সালিকীন : ১/৪৬৮, ফয়যুল কদীর : ৪/৭২]

মিহসান আল-আনসারী থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ এরশাদ করেছেন— তোমাদের মধ্যে যে লোক পরিবার-পরিজনসহ সকালে উপনীত হয়, শরীর সুস্থ থাকে এবং তার কাছে এক দিনের খোরাক থাকে, তা হলে যেন তার জন্য গোটা দুনিয়াটাই একত্র করা হল। [সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ২৩৪৬]

অতএব, মানুষের উচিত, দুনিয়া ও দুনিয়ার উপার্জনকে মানসিক প্রফুল্লতা ও উদারতার সাথে গ্রহণ করা। একদিকে যেমন সম্পদ উপার্জন করবে, অন্যদিকে এ সম্পদ একজনকে হাদিয়া দিবে, আরেকজনকে সাহায্য করবে, অপরজনকে দান করবে। এভাবে কেমন যেন মানুষের সম্পদই তার কাছে গচ্ছিত রয়েছে।

📘 দুনিয়ার মোহে পড়বেন না 📄 দুনিয়ার মোহ ও ভালোবাসার কারণ

📄 দুনিয়ার মোহ ও ভালোবাসার কারণ


দুনিয়ার মোহ ও ভালোবাসার অনেকগুলো কারণ রয়েছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি নিম্নরূপ-

১. দুনিয়ার সৌন্দর্য ও বাহ্যিক চাকচিক্য
আল্লাহ পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন- الْمَالُ وَ الْبَنُونَ زِينَةُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَالْبَاقِيَاتُ الصَّالِحَاتُ خَيْرٌ عِنْدَ رَبِّكَ ثَوَابًا وَخَيْرٌ أَمَلًا
ধনসম্পদ ও সন্তান-সন্ততি পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য; আর স্থায়ী সৎকর্মসমূহ আপনার পালনকর্তার কাছে প্রতিদানপ্রাপ্তি ও আশা লাভের জন্য উত্তম। [সূরা কাহাফ : ৪৬]

আবু সাঈদ খুদরী থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন- إِنَّ الدُّنْيَا حُلْوَةٌ خَضِرَةٌ وَإِنَّ اللَّهَ مُسْتَخْلِفُكُمْ فِيهَا فَيَنْظُرُ كَيْفَ تَعْمَلُونَ فَاتَّقُوا الدُّنْيَا وَاتَّقُوا النِّسَاءَ فَإِنَّ أَوَّلَ فِتْنَةٍ بَنِي إِسْرَائِيلَ كَانَتْ فِي النِّসَاءِ. নিশ্চয় দুনিয়া মিষ্টি সবুজ [সুস্বাদু, দর্শনীয়]। আল্লাহ সেখানে তোমাদের প্রতিনিধি হিসেবে পাঠিয়েছেন। তিনি দেখতে চান, তোমরা কী কর! অতএব, দুনিয়া ও নারী থেকে তোমরা সাবধান থেকো। কেননা, বনী ইসরাঈলের মাঝে সর্বপ্রথম ফেতনা ছিল নারীকে কেন্দ্র করে। [সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৭৪২]

২. দুনিয়ার প্রতি ঝোঁক
আল্লাহ পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন- زُيِّنَ لِلنَّاسِ حُبُّ الشَّهَوَاتِ مِنَ النِّসَاءِ وَالْبَنِينَ وَالْقَنَاطِيرِ الْمُقَنْطَرَةِ مِنَ الذَّهَبِ وَالْفِضَّةِ وَالْخَيْلِ الْمُসَوَّمَةِ وَالْأَنْعَامِ وَالْحَرْثِ ۚ ذَٰلِكَ মَتَاعُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَاللَّهُ عِندَهُ حُسْنُ الْمَآبِ
মানুষের জন্য সুশোভিত করা হয়েছে নারী, সন্তান-সন্ততি, রাশিষ্কৃত স্বর্ণ-রৌপ্য, চিহ্নিত অশ্ব, গবাদি পশুপাল ও ক্ষেত্র-খামারের মতো আকর্ষণীয় বস্তুসমাগ্রী। এ সবই হচ্ছে পার্থিব জীবনের ভোগ্য বস্তু। আল্লাহর নিকটেই হল উত্তম আশ্রয়। [সূরা আলে ইমরান : ১৪]

আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবীজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেছেন-
قَلْبُ الشَّيْخِ شَابٌّ عَلَى حُبِّ اثْنَتَيْنِ حُبِّ الْعَيْشِ وَالْمَالِ.
বৃদ্ধ মানুষের অন্তর দু'টি জিনিসের মহব্বতের ক্ষেত্রে যুবক। তা হচ্ছে বেঁচে থাকার মায়া ও ধন-সম্পদের মহব্বত। [সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৪৫৭, সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ২০৬৬, সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ৪২৩৩, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ৮৬৯৯]

আনাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-র সূত্রে বর্ণিত অপর বর্ণনায় এসেছে, নবীজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেছেন-
يَهْرَمُ ابْنُ آدَمَ وَتَشِبُّ مِنْهُ اثْنَتَانِ الْحِرْصُ عَلَى الْمَالِ وَالْحِرْصُ عَلَى الْعُمُرِ.
আদম সন্তান বার্ধক্যে পৌঁছে যায়, কিন্তু দু'টি ব্যাপারে তার আকাঙ্ক্ষা যৌবনে বিরাজ করে- সম্পদের লালসা এবং বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা। [সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৪৫৯, সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ২০৬৬, সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ৪২৩৪, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ১২৯৯৭]

আনাস থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবীজি ইরশাদ করেছেন— لَوْ كَانَ لِابْنِ آدَمَ وَادِيَانِ مِنْ মَالٍ لَابْتَغَى وَادِيًا ثَالِثًا وَلَا يَمْلَأُ جَوْفَ ابْنِ آدَمَ إِلَّا التُّرَابُ وَيَتُوبُ اللَّهُ عَلَى মَنْ تَابَ. আদম সন্তানের যদি দু’টি মাঠ ভর্তি সম্পদ থাকে, তা হলে সে তৃতীয় মাঠ ভর্তি সম্পদ খুঁজে বেড়াবে। আদম সন্তানের পেট মাটি ছাড়া কোনো কিছুই ভরাতে পারে না। যে ব্যক্তি তাওবা করে, আল্লাহ তার তাওবা কবুল করেন। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৪৩৬, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৪৬২, তাহা মুসলিমের; সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ২৬৭৭, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ১২১২৬]

অপর এক বর্ণনায় এসেছে, আনাস ইবনে মালেক বলেন, রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন— لَوْ أَنَّ لِابْنِ آدَمَ وَادِيًا مِنْ ذَهَبٍ أَحَبَّ أَنْ يَكُونَ لَهُ وَادِيَانِ وَلَنْ يَمْلَأَ فَاهُ إِلَّا التُّرَابُ وَيَتُوبُ اللَّهُ عَلَى মَنْ تَابَ. যদি বনী আদমের স্বর্ণ ভরা একটি উপত্যকা থাকে, তথাপি সে তার জন্য দু’টি উপত্যকা হওয়ার কামনা করবে। তার মুখ মাটি ব্যতীত অন্য কিছুতেই ভরবে না। তবে যে ব্যক্তি তাওবা করবে, আল্লাহ তার তাওবা কবুল করবেন। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৪৩৬, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ১২৭১৭]

৩. দুনিয়াকে প্রাধান্য দেওয়া
বর্তমান উপস্থিত দুনিয়াকে অফুরন্ত আখেরাতের উপর প্রাধান্য দেওয়া মানুষের দুনিয়ার প্রতি ধাবিত হওয়া ও দুনিয়ার মোহে পড়ার অন্যতম কারণ। যেমন, আল্লাহ পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন— بَلْ تُؤْثِرُونَ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا ۝ وَالْآخِرَةُ خَيْرٌ وَأَبْقَىٰ বস্তুত, তোমরা পার্থিব জীবনকে অগ্রাধিকার দাও; অথচ পরকালের জীবন উৎকৃষ্ট ও স্থায়ী। [সূরা আ’লা : ১৬-১৭]

ইবনুল কাইয়িম বলেন, বরং আল্লাহ তাদের কাছে স্বীয় নবী- রাসূলগণকে পাঠিয়েছেন, তাদের উপর কিতাবসমূহ নাযিল করেছেন এবং তিনি স্পষ্টভাবে বর্ণনা করে দিয়েছেন- কীসে তিনি সন্তুষ্ট হন আর কীসে তিনি অসন্তুষ্ট ও রাগান্বিত হন। তিনি তাদেরকে স্বীয় নফস, তরিয়ত ও প্রবৃত্তিপূজার বিরুদ্ধাচরণের বিনিময়ে চিরস্থায়ী নিবাসে [জান্নাতে] পরিপূর্ণ সুখ-শান্তি ও অফুরন্ত নেয়ামতের ওয়াদা করেছেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও অধিকাংশ মানুষের আকল ও বিবেক-বুদ্ধি নগদ দুনিয়ার উপর অপেক্ষমান আখিরাতকে প্রাধান্য দিতে প্রস্তুত নয়; যে আখিরাত এই নগদ ও দৃশ্যমান দুনিয়া ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর আসবে। তারা বলে, কীভাবে আমরা আমাদের এ নগদ দুনিয়াকে —যা আমাদের কব্জায় রয়েছে— এমন বাকি জিনিসের বিনিময়ে বিক্রি করে দেব, যা হাসিল হওয়ার ওয়াদা করা হয়েছে দুনিয়ার সুদীর্ঘ পথপরিক্রমা শেষ হওয়ার ও পুরো পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর।

তাদের অধিকাংশের অবস্থা যেন বলে- এখন তুমি যা কিছু দেখছ এবং সামনে উপস্থিত পাচ্ছ, তা গ্রহণ কর আর যা কিছু শুনছ তা ছাড়। আল্লাহ যাকে তাওফীক দেন, সে-ই বুঝতে পারে আখিরাতের হাকিকত-বাস্তবতা ও স্থায়িত্ব। সে তার ঈমানের নূর ও দূরদর্শিতার মাধ্যমে বুঝতে পারে আখিরাতের মূল্য ও প্রকৃত মর্ম। সে বুঝতে পারে আল্লাহ তাঁর আনুগত্যশীল বান্দাদের জন্য কী কী নেয়ামত সৃষ্টি করে রেখেছেন এবং তাঁর অবাধ্য বান্দাদের জন্য কী কী আযাব ও শাস্তি প্রস্তুত করে রেখেছেন। সে আরও বুঝতে পারে দুনিয়ার হাকিকত, বাস্তবতা, অল্প সময়ে নিঃশেষ হয়ে যাওয়া, দুনিয়ার ধোঁকা ও অত্যাচার-অনাচার সবই। দুনিয়া তো হল ঠিক তেমন, যেমনটা আল্লাহ ইরশাদ করেছেন- খেলাধুলা, ক্রীড়া-কৌতুক, পারস্পরিক গর্ব-অহংকার, ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্তুতি নিয়ে প্রতিযোগিতা করা। আরও বলেছেন, দুনিয়া হল বৃষ্টি দ্বারা উৎপন্ন ফসলের মতো; যা কৃষককে চমৎকৃত করে ও আনন্দ দেয়। অতঃপর সেগুলো শুকিয়ে হলুদ বর্ণের হয়ে যায়। তারপর সেগুলো পরিণত হয় খড়-কুটোয়। বাতাস সেগুলোকে এদিক-সেদিক উড়িয়ে নিয়ে যায়। মূলত আমরা জন্মগ্রহণ করেছি এ দুনিয়ায় এবং আমরা তারই সন্তান। তাই আমরা এর বাইরে কিছু বুঝি না বা বুঝতে চাই না। আমাদের অভ্যাস হয়ে গেছে আমাদের বিচারক, প্রবৃত্তি হয়েছে আমাদের বাদশাহ। প্রবৃত্তির পূজা আমাদের পরাভূত করে ফেলেছে। এর সঙ্গে আমাদের অভ্যাস ও নফসের চাহিদাসমূহও দুনিয়ার প্রতি ধাবিত ও ঝুঁকে পড়তে সহযোগিতা করছে। আমাদের জ্ঞানের উপর ইন্দ্রিয় শক্তি বিজয় লাভ করেছে এবং সে-ই রাজত্ব করছে। [শিফাউল আলীল : ২৬]

সারকথা : দুনিয়ার মোহ ও মহব্বত এবং দুনিয়াকে আখেরাতের উপর প্রাধান্য দেওয়ার কারণ মূলত দু’টি। যথা-
১. দ্বীন ও ঈমান নষ্ট হয়ে যাওয়া।
২. আকল ও বুদ্ধি নষ্ট হয়ে যাওয়া।

📘 দুনিয়ার মোহে পড়বেন না 📄 পরিশিষ্ট

📄 পরিশিষ্ট


তুমি দুনিয়ার ব্যাপারে ভেবে দেখ, এ দুনিয়া তোমার পূর্বে কতজনকে বিদায় করেছে! তুমি স্মরণ করে দেখ, এ দুনিয়া তোমার বন্ধু- বান্ধব ও নিকটজনদের সঙ্গে কী আচরণ করেছে! তুমি সর্বদা এ দুনিয়াকে ভয় করে চল। কেননা, সে তোমাকে তোমার বহু অত্যাবশ্যকীয় কর্ম থেকে বিরত রেখেছে। তোমাকে গাফলত ও উদাসীনতায় ডুবিয়ে রেখেছে। তুমি এই দুনিয়াতে বসবাসের ব্যাপারে সতর্ক থেকো।

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন- مَرَّ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِشَاةٍ مَيْتَةٍ قَدْ أَلْقَاهَا أَهْلُهَا فَقَالَ وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَلدُّنْيَا أَهْوَنُ عَلَى اللَّهِ مِنْ هَذِهِ عَلَى أَهْلِهَا. একদিন রাসূলুল্লাহ একটি মৃত বকরির পাশ দিয়ে অতিক্রম করলেন, যে বকরিটিকে তার মালিক [রাস্তায়] ফেলে দিয়েছিল। তখন তিনি বললেন, যে সত্তার হাতে আমার প্রাণ, তাঁর শপথ! নিশ্চয় এই মৃত বকরিটি তার মালিকের কাছে যতটা মূল্যহীন, আল্লাহর কাছে দুনিয়া তার চেয়েও অধিক মূল্যহীন। [মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ৩০৪৭]

মুসতাওরিদ ইবনে শাদ্দাদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ইরশাদ করেছেন- "وَاللَّهِ مَا الدُّنْيَا فِي الْآخِرَةِ إِلَّا مِثْلُ مَا يَجْعَلُ أَحَدُكُمْ إِصْبَعَهُ هَذِهِ - وَأَشَارَ يَحْيَى بِالسَّبَّابَةِ - فِي الْيَمِّ فَلْيَنْظُرْ بِمَ يَرْجِعُ"

আল্লাহর কসম! দুনিয়ার জীবন আখেরাতের জীবনের তুলনায় এমন, যেমন তোমাদের কেউ তার এ আঙ্গুলটি –বর্ণনাকারী ইয়াহইয়া শাহাদাত আঙ্গুল দ্বারা ইশারা করলেন– সমুদ্রের পানিতে ডোবাল। অতঃপর সে দেখুক কতটুকু পরিমাণ [পানি] এতে লেগেছে। [সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৭০৭৬, সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ৪১০৮, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ১৮০০৮]

পরিশেষে আমরা আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদের সকলকে সেসব নেককার বান্দার অন্তর্ভুক্ত করেন, যারা এ ধোঁকার দুনিয়া থেকে দূরে থাকেন এবং চিরস্থায়ী ও চিরন্তন সুখের জীবন আখেরাতের প্রতি ধাবিত হন।

وَصَلَّى اللَّهُ وَسَلَّمَ عَلَى نَبِيِّنَا مُحَمَّদٍ وَعَلَى آلِهِ وَصَحْبِهِ أَجْمَعِينَ.

– মুহাম্মাদ সালেহ আল মুনাজ্জিদ

ফন্ট সাইজ
15px
17px