📘 দুনিয়া এক ধূসর মরীচিকা > 📄 চিরস্থায়ী আবাসস্থল

📄 চিরস্থায়ী আবাসস্থল


যে ব্যক্তি দুনিয়ার চিন্তাভাবনা থেকে নিজের অন্তরকে মুক্ত রাখে, আল্লাহর প্রতি মনোযোগ দেয় এবং প্রস্তুতি নেয় পুনরুত্থান দিবসের-সে মানসিক প্রশান্তি লাভ করে। হাম্মাদ বিন আবু সালামাহ রহ. কে যদি বলা হতো,
'আগামীকাল আপনি মারা যাবেন।' এ কথা শুনেও তিনি আমল বাড়াতে পারতেন না। কারণ, তাঁর সকল সময়ই কাটত আমলের মধ্যে। ১৭০
চিরস্থায়ী আবাসস্থল
'একটু গভীরভাবে চিন্তা করো, জান্নাত হচ্ছে চিরস্থায়ী। পবিত্র আবাসস্থল। তার সুখ ও স্বাদ অফুরন্ত। মন যা চাইবে, সেখানে তা-ই পাওয়া যাবে। এমন এমন নিয়ামত সেখানে রয়েছে, কোনো চোখ যা দেখেনি, কোনো কান যা শোনেনি, কোনো অন্তরেও আসেনি যার কল্পনা। এ নিয়ামতগুলো কখনো ফুরাবে না। এসবের মূল্যও কমবে না কোনোদিন। জান্নাতে বসবাসের সময়কাল হাজার হাজার বছর নয়, কোটি কোটি বছরও নয়, হাজার কোটি বছরও নয়! বরং সে জীবন যে অসীম, চিরন্তন ও চিরস্থায়ী; যার কোনো ইতি নেই।
তবে জান্নাত লাভ করতে হলে আগে এর মূল্য পরিশোধ করতে হবে। মূল্য হলো আমাদের এ দুনিয়ার জীবন। কত ছোট এই জীবন! একশ বছরের বেশি নয়। এই একশ বছরও কজনের হয়? একশ থেকে পনেরো কেটে যায় শৈশবের দুষ্টুমিতে। সত্তরের পরের ত্রিশ পেলেও, সে সময়টা শেষ হয়ে যায় বিছানায় কাতরাতে কাতরাতে। বাকি সময়টার অর্ধেক আবার চলে যায় ঘুমে ঘুমে। এরপর যতটুকু সময় থাকে, তাতেও আছে খাওয়া-দাওয়া ও জীবিকা অর্জনের দৌড়ঝাঁপ। সবকিছু বাদ দিয়ে অল্প যে সময়টা হাতে থাকে, এতটুকু সময় কি আমরা ইবাদতের জন্য উৎসর্গ করতে পারি না? এ অল্প সময়ের বিনিময়ে কি আমরা চিরস্থায়ী জান্নাত কিনে নিতে পারি না? তবে আফসোস, আমরা অল্প সে সময়টাও ব্যয় করি দুনিয়ার জন্য, নষ্ট করে ফেলি বিভিন্ন অশ্লীল ও পাপ কর্মে লিপ্ত হয়ে! এভাবে শরিয়াহবিরোধী কাজে লিপ্ত হয়ে আমরা লোকসান করে বসি মহালাভজনক ব্যবসায়। আসলে এটা আমাদের নির্বুদ্ধিতা ও আল্লাহর প্রতিশ্রুতির প্রতি পূর্ণ ইমান না থাকার কারণেই হয়। '১৭১
হাসান রহ. বলেন:
'দুনিয়া মুমিনের জন্য খুব উত্তম স্থান। কারণ, সে এখানে দুনিয়ার জন্য অল্প কাজ করে এবং জান্নাতলাভের জন্য অধিক পরিমাণে পুণ্য সংগ্রহ করে নেয়। পক্ষান্তরে, কাফির ও মুনাফিকের জন্য এ দুনিয়া খুবই খারাপ স্থান। তারা এখানে দুনিয়ার জন্য রাতদিন পরিশ্রম করতে থাকে, কিন্তু অবশেষে জাহান্নামের পাথেয় নিয়ে এখান থেকে বিদায় নেয়। '১৭২
ভাই আমার, কোথায় আমরা, আর কোথায় তাঁরা?
আনাস বিন ইয়াজ রহ. বলেন:
'আমি সাফওয়ানকে কাছ থেকে দেখেছি। যদি তাকে বলা হতো, আগামীকাল কিয়ামত সংঘটিত হবে। তবুও তার বৃদ্ধি করার মতো কোনো আমল অবশিষ্ট থাকত না। '১৭৩
তিনি প্রায় সকল ইবাদতই নিয়মিত করতেন। তাই কিয়ামতের কথা বলা হলে অতিরিক্ত কোনো ইবাদত করার মতো সময় ও সুযোগ পেতেন না।
আমরা এমন এক দুনিয়ার মধ্যে বসবাস করি, যার বয়স সীমিত। যার আনন্দ দুঃখভারাক্রান্ত। যার নিয়ামতগুলো নশ্বর, ধ্বংসশীল। আবু হাজিম রহ. দুনিয়ার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন:
'দুনিয়াতে যা অতীত হয়ে গেছে, সেগুলো ছিল স্বপ্ন। আর সামনে যা বাকি আছে, সেগুলো হলো বৃtha আশা।'১৭৪
يَا مَنْ تَمَتَّعَ بِالدُّنْيَا وَبَهْجَتِهَا * وَلَا تَنَامُ عَنِ اللَّذَّاتِ عَيْنَاهُ أَفْنَيْتَ عُمْرَكَ فِيْمَا لَسْتَ تُدْرِكُهُ * تَقُوْلُ لِلَّهِ مَاذَا حِيْنَ تَلْقَاهُ
'দুনিয়ার ভোগ-বিলাসে মত্ত হে মানব! সুখ ও সমৃদ্ধির উদগ্র বাসনা কেড়ে নিয়েছে তোমার ঘুম। জীবন তো বরবাদ করে দিলে ধূসর মরীচিকার পেছনে ছুটে। কাল যখন প্রভুর সামনে গিয়ে দাঁড়াবে-কী জবাব দেবে তাঁকে?'১৭৫
জনৈক বিজ্ঞ লোক বলেন: 'চারটি জিনিস খুঁজতে গিয়ে আমি ভুল পথ অবলম্বন করেছি। আমি ধন-সম্পদের মধ্যে প্রাচুর্য খুঁজেছি, কিন্তু তা আছে অল্পতুষ্টির মধ্যে। আমি আধিক্যের মধ্যে প্রশান্তি খুঁজেছি, কিন্তু তা আছে স্বল্পতার মধ্যে। আমি মাখলুকের কাছ থেকে সম্মান তলব করেছি, অথচ তা আছে তাকওয়া অবলম্বনে। আমি খাবার ও পোশাকে নিয়ামত অন্বেষণ করেছি, কিন্তু তা আছে গোপনীয়তা ও ইসলামের মধ্যে।'১৭৬
প্রিয় ভাই, তুমিও নিশ্চয় এ চারটি বিষয় খুঁজছ। কিন্তু খোঁজার ক্ষেত্রে কোন পথ ধরেছ? ভুল করছ না তো? ভুল পথে যাচ্ছে না তো তোমার পদক্ষেপ?
আতা খোরাসানি রহ. বলেন: 'আমি তোমাদের দুনিয়াবি কোনো বিষয়ের উপদেশ দেবো না। তোমরা আগ থেকে এ বিষয়ে উপদেশপ্রাপ্ত। দুনিয়ার প্রতি তোমাদের লোভাতুর দৃষ্টি তা-ই বলে। তবে আমি তোমাদের উপদেশ দেবো আখিরাতের ব্যাপারে, তোমরা এই ক্ষণস্থায়ী দুনিয়া থেকে চিরস্থায়ী আখিরাতের জন্য পাথেয় সংগ্রহ করে নাও। দুনিয়াকে এমনভাবে অনুভব করো, যেন তা থেকে তুমি বিদায় নিয়েছ। কেননা, আল্লাহর কসম, তুমি এখান থেকে অবশ্যই বিদায় নেবে। মৃত্যুকে এমনভাবে কল্পনা করো, যেন তার স্বাদ তুমি আস্বাদন করেছ। কেননা, আল্লাহর কসম, তুমি তার স্বাদ অবশ্যই আস্বাদন করবে। আখিরাতকে এমনভাবে দেখো, যেন তুমি তাতে উপনীত হয়েছ। কারণ, আল্লাহর কসম, তুমি অবশ্যই আখিরাতে উপনীত হবে।'১৭৭
শাকিক আল-বালখি রহ. বলেন:
'লোকেরা এমন তিনটি কথা বলে, যা তাদের কাজের সম্পূর্ণ বিপরীত। তারা বলে, আমরা আল্লাহর দাস; কিন্তু কাজ করে স্বাধীন মানুষের মতো, এটা তাদের কথার সম্পূর্ণ বিপরীত। তারা বলে, আল্লাহ আমাদের রিজিকের জিম্মাদার; কিন্তু তারা দুনিয়া ও তার তুচ্ছ বিষয়ের পেছনে ছোটা ছাড়া রিজিক নিয়ে নিশ্চিন্ত হতে পারে না, এটাও তাদের কথার বিপরীত। তারা বলে, একদিন তো অবশ্যই মরতে হবে; কিন্তু তারা কখনো মরবে না—এমন ভাব নিয়ে জীবন পার করে, এটাও তাদের কথার বিপরীত। '১৭৮
ইবরাহিম তাইমি রহ. বলেন:
'কল্পনায় আমি আমার মনকে জান্নাতে ঘুরিয়ে আনলাম। তাকে জান্নাতের ফল খাওয়ালাম, নদী থেকে পান করালাম, আলিঙ্গন করালাম জান্নাতি হুরদের সাথে। তারপর মনকে নিয়ে গেলাম জাহান্নামে। জাহান্নামের কাঁটাযুক্ত জাক্কুম ফল খাওয়ালাম, পুঁজ পান করালাম, জাহান্নামের শিকল ও বেড়ি দিয়ে বাঁধলাম। ... তারপর বললাম, এ মুহূর্তে কী চাও তুমি? সে বলল, আমি আবার দুনিয়াতে ফিরে যেতে চাই; যেন উত্তম আমল করে জান্নাতে আসতে পারি। তখন আমি বললাম, তাহলে তোমার আশা বাস্তবায়ন করার জন্য নেক আমল করো।'

টিকাঃ
১৭০. তাজকিরাতুল হুফফাজ : ১/২০৩
১৭১. সাইদুল খাতির: ৪৫২
১৭২. তাজকিয়াতুন নুফুস: ১২৮
১৭৩. সাইদুল খাতির: ২৫
১৭৪. আল-ইকদুল ফারিদ: ৩/১২০
১৭৫. আজ-জুহদ, বাইহাকি: ২৮২
১৭৬. তাম্বিহুল গাফিলিন: ১২৮
১৭৭. সিফাতুস সাফওয়াহ: ৪/১৫১
১৭৮. মুকাশাফাতুল কুলুব: ৩৫

যে ব্যক্তি দুনিয়ার চিন্তাভাবনা থেকে নিজের অন্তরকে মুক্ত রাখে, আল্লাহর প্রতি মনোযোগ দেয় এবং প্রস্তুতি নেয় পুনরুত্থান দিবসের-সে মানসিক প্রশান্তি লাভ করে। হাম্মাদ বিন আবু সালামাহ রহ. কে যদি বলা হতো,
'আগামীকাল আপনি মারা যাবেন।' এ কথা শুনেও তিনি আমল বাড়াতে পারতেন না। কারণ, তাঁর সকল সময়ই কাটত আমলের মধ্যে। ১৭০
চিরস্থায়ী আবাসস্থল
'একটু গভীরভাবে চিন্তা করো, জান্নাত হচ্ছে চিরস্থায়ী। পবিত্র আবাসস্থল। তার সুখ ও স্বাদ অফুরন্ত। মন যা চাইবে, সেখানে তা-ই পাওয়া যাবে। এমন এমন নিয়ামত সেখানে রয়েছে, কোনো চোখ যা দেখেনি, কোনো কান যা শোনেনি, কোনো অন্তরেও আসেনি যার কল্পনা। এ নিয়ামতগুলো কখনো ফুরাবে না। এসবের মূল্যও কমবে না কোনোদিন। জান্নাতে বসবাসের সময়কাল হাজার হাজার বছর নয়, কোটি কোটি বছরও নয়, হাজার কোটি বছরও নয়! বরং সে জীবন যে অসীম, চিরন্তন ও চিরস্থায়ী; যার কোনো ইতি নেই।
তবে জান্নাত লাভ করতে হলে আগে এর মূল্য পরিশোধ করতে হবে। মূল্য হলো আমাদের এ দুনিয়ার জীবন। কত ছোট এই জীবন! একশ বছরের বেশি নয়। এই একশ বছরও কজনের হয়? একশ থেকে পনেরো কেটে যায় শৈশবের দুষ্টুমিতে। সত্তরের পরের ত্রিশ পেলেও, সে সময়টা শেষ হয়ে যায় বিছানায় কাতরাতে কাতরাতে। বাকি সময়টার অর্ধেক আবার চলে যায় ঘুমে ঘুমে। এরপর যতটুকু সময় থাকে, তাতেও আছে খাওয়া-দাওয়া ও জীবিকা অর্জনের দৌড়ঝাঁপ। সবকিছু বাদ দিয়ে অল্প যে সময়টা হাতে থাকে, এতটুকু সময় কি আমরা ইবাদতের জন্য উৎসর্গ করতে পারি না? এ অল্প সময়ের বিনিময়ে কি আমরা চিরস্থায়ী জান্নাত কিনে নিতে পারি না? তবে আফসোস, আমরা অল্প সে সময়টাও ব্যয় করি দুনিয়ার জন্য, নষ্ট করে ফেলি বিভিন্ন অশ্লীল ও পাপ কর্মে লিপ্ত হয়ে! এভাবে শরিয়াহবিরোধী কাজে লিপ্ত হয়ে আমরা লোকসান করে বসি মহালাভজনক ব্যবসায়। আসলে এটা আমাদের নির্বুদ্ধিতা ও আল্লাহর প্রতিশ্রুতির প্রতি পূর্ণ ইমান না থাকার কারণেই হয়। '১৭১
হাসান রহ. বলেন:
'দুনিয়া মুমিনের জন্য খুব উত্তম স্থান। কারণ, সে এখানে দুনিয়ার জন্য অল্প কাজ করে এবং জান্নাতলাভের জন্য অধিক পরিমাণে পুণ্য সংগ্রহ করে নেয়। পক্ষান্তরে, কাফির ও মুনাফিকের জন্য এ দুনিয়া খুবই খারাপ স্থান। তারা এখানে দুনিয়ার জন্য রাতদিন পরিশ্রম করতে থাকে, কিন্তু অবশেষে জাহান্নামের পাথেয় নিয়ে এখান থেকে বিদায় নেয়। '১৭২
ভাই আমার, কোথায় আমরা, আর কোথায় তাঁরা?
আনাস বিন ইয়াজ রহ. বলেন:
'আমি সাফওয়ানকে কাছ থেকে দেখেছি। যদি তাকে বলা হতো, আগামীকাল কিয়ামত সংঘটিত হবে। তবুও তার বৃদ্ধি করার মতো কোনো আমল অবশিষ্ট থাকত না। '১৭৩
তিনি প্রায় সকল ইবাদতই নিয়মিত করতেন। তাই কিয়ামতের কথা বলা হলে অতিরিক্ত কোনো ইবাদত করার মতো সময় ও সুযোগ পেতেন না।
আমরা এমন এক দুনিয়ার মধ্যে বসবাস করি, যার বয়স সীমিত। যার আনন্দ দুঃখভারাক্রান্ত। যার নিয়ামতগুলো নশ্বর, ধ্বংসশীল। আবু হাজিম রহ. দুনিয়ার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন:
'দুনিয়াতে যা অতীত হয়ে গেছে, সেগুলো ছিল স্বপ্ন। আর সামনে যা বাকি আছে, সেগুলো হলো বৃtha আশা।'১৭৪
يَا مَنْ تَمَتَّعَ بِالدُّنْيَا وَبَهْجَتِهَا * وَلَا تَنَامُ عَنِ اللَّذَّاتِ عَيْنَاهُ أَفْنَيْتَ عُمْرَكَ فِيْمَا لَسْتَ تُدْرِكُهُ * تَقُوْلُ لِلَّهِ مَاذَا حِيْنَ تَلْقَاهُ
'দুনিয়ার ভোগ-বিলাসে মত্ত হে মানব! সুখ ও সমৃদ্ধির উদগ্র বাসনা কেড়ে নিয়েছে তোমার ঘুম। জীবন তো বরবাদ করে দিলে ধূসর মরীচিকার পেছনে ছুটে। কাল যখন প্রভুর সামনে গিয়ে দাঁড়াবে-কী জবাব দেবে তাঁকে?'১৭৫
জনৈক বিজ্ঞ লোক বলেন: 'চারটি জিনিস খুঁজতে গিয়ে আমি ভুল পথ অবলম্বন করেছি। আমি ধন-সম্পদের মধ্যে প্রাচুর্য খুঁজেছি, কিন্তু তা আছে অল্পতুষ্টির মধ্যে। আমি আধিক্যের মধ্যে প্রশান্তি খুঁজেছি, কিন্তু তা আছে স্বল্পতার মধ্যে। আমি মাখলুকের কাছ থেকে সম্মান তলব করেছি, অথচ তা আছে তাকওয়া অবলম্বনে। আমি খাবার ও পোশাকে নিয়ামত অন্বেষণ করেছি, কিন্তু তা আছে গোপনীয়তা ও ইসলামের মধ্যে।'১৭৬
প্রিয় ভাই, তুমিও নিশ্চয় এ চারটি বিষয় খুঁজছ। কিন্তু খোঁজার ক্ষেত্রে কোন পথ ধরেছ? ভুল করছ না তো? ভুল পথে যাচ্ছে না তো তোমার পদক্ষেপ?
আতা খোরাসানি রহ. বলেন: 'আমি তোমাদের দুনিয়াবি কোনো বিষয়ের উপদেশ দেবো না। তোমরা আগ থেকে এ বিষয়ে উপদেশপ্রাপ্ত। দুনিয়ার প্রতি তোমাদের লোভাতুর দৃষ্টি তা-ই বলে। তবে আমি তোমাদের উপদেশ দেবো আখিরাতের ব্যাপারে, তোমরা এই ক্ষণস্থায়ী দুনিয়া থেকে চিরস্থায়ী আখিরাতের জন্য পাথেয় সংগ্রহ করে নাও। দুনিয়াকে এমনভাবে অনুভব করো, যেন তা থেকে তুমি বিদায় নিয়েছ। কেননা, আল্লাহর কসম, তুমি এখান থেকে অবশ্যই বিদায় নেবে। মৃত্যুকে এমনভাবে কল্পনা করো, যেন তার স্বাদ তুমি আস্বাদন করেছ। কেননা, আল্লাহর কসম, তুমি তার স্বাদ অবশ্যই আস্বাদন করবে। আখিরাতকে এমনভাবে দেখো, যেন তুমি তাতে উপনীত হয়েছ। কারণ, আল্লাহর কসম, তুমি অবশ্যই আখিরাতে উপনীত হবে।'১৭৭
শাকিক আল-বালখি রহ. বলেন:
'লোকেরা এমন তিনটি কথা বলে, যা তাদের কাজের সম্পূর্ণ বিপরীত। তারা বলে, আমরা আল্লাহর দাস; কিন্তু কাজ করে স্বাধীন মানুষের মতো, এটা তাদের কথার সম্পূর্ণ বিপরীত। তারা বলে, আল্লাহ আমাদের রিজিকের জিম্মাদার; কিন্তু তারা দুনিয়া ও তার তুচ্ছ বিষয়ের পেছনে ছোটা ছাড়া রিজিক নিয়ে নিশ্চিন্ত হতে পারে না, এটাও তাদের কথার বিপরীত। তারা বলে, একদিন তো অবশ্যই মরতে হবে; কিন্তু তারা কখনো মরবে না—এমন ভাব নিয়ে জীবন পার করে, এটাও তাদের কথার বিপরীত। '১৭৮
ইবরাহিম তাইমি রহ. বলেন:
'কল্পনায় আমি আমার মনকে জান্নাতে ঘুরিয়ে আনলাম। তাকে জান্নাতের ফল খাওয়ালাম, নদী থেকে পান করালাম, আলিঙ্গন করালাম জান্নাতি হুরদের সাথে। তারপর মনকে নিয়ে গেলাম জাহান্নামে। জাহান্নামের কাঁটাযুক্ত জাক্কুম ফল খাওয়ালাম, পুঁজ পান করালাম, জাহান্নামের শিকল ও বেড়ি দিয়ে বাঁধলাম। ... তারপর বললাম, এ মুহূর্তে কী চাও তুমি? সে বলল, আমি আবার দুনিয়াতে ফিরে যেতে চাই; যেন উত্তম আমল করে জান্নাতে আসতে পারি। তখন আমি বললাম, তাহলে তোমার আশা বাস্তবায়ন করার জন্য নেক আমল করো।'

টিকাঃ
১৭০. তাজকিরাতুল হুফফাজ : ১/২০৩
১৭১. সাইদুল খাতির: ৪৫২
১৭২. তাজকিয়াতুন নুফুস: ১২৮
১৭৩. সাইদুল খাতির: ২৫
১৭৪. আল-ইকদুল ফারিদ: ৩/১২০
১৭৫. আজ-জুহদ, বাইহাকি: ২৮২
১৭৬. তাম্বিহুল গাফিলিন: ১২৮
১৭৭. সিফাতুস সাফওয়াহ: ৪/১৫১
১৭৮. মুকাশাফাতুল কুলুব: ৩৫

📘 দুনিয়া এক ধূসর মরীচিকা > 📄 আখিরাত আসন্ন

📄 আখিরাত আসন্ন


আলি রা. তাঁর এক খুতবায় বলেন :
'সতর্ক হও, দুনিয়া মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। ঘোষণা দিয়ে দিয়েছে বিদায়ের। আখিরাত আসন্ন। ঘোষণা দিয়েছে বরণ করে নেওয়ার। সতর্ক হও, আজকের দিনটা (বর্তমান সময়) হলো ঘোড়দৌড়ের ময়দান। আগামীকাল (সামনের সময়) হলো প্রতিযোগিতা। এ প্রতিযোগিতার পুরস্কার হচ্ছে জান্নাত। দৌড়ের শেষ গন্তব্য হচ্ছে মৃত্যু।
তোমরা এখন যে সময়ের মধ্যে আছ, এটাই সুযোগ। এর পেছনে আছে মৃত্যু, যা এ জীবনের একটি পরম সত্য। সুতরাং তোমাদের যে ব্যক্তি মৃত্যু আসার আগে আগে আমল করবে, তার সে আমল কাজে আসবে। আর যে ব্যক্তি মৃত্যু আসার আগে আগে সুযোগ কাজে লাগিয়ে আমল করেনি, বৃথা আশায় সে নিজেরই ক্ষতি করেছে; তার এ মন্দ আমল নিশ্চয় তার শত্রু হয়ে দাঁড়াবে।'১৭৯
দুনিয়া ও আখিরাতে মানুষের অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে ইয়াহইয়া বিন মুআজ রহ. বলেন:
'দুনিয়াতে আমাদের আশা-আকাঙ্ক্ষাগুলো পূরণ হচ্ছে না। আখিরাতের জন্যেও আমরা আমল করছি না। আর কিয়ামতের দিন আমাদের কী অবস্থা হবে, তাও জানি না। এই হলো আমাদের অবস্থা।'১৮০
আমরা দুনিয়ার নিয়ামত পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে আছি। যেভাবেই হোক, আমরা পেতে চাই দুনিয়াবি নিয়ামত। কিন্তু আবু হাজিম সালামা বিন দিনার রহ. কী বলেন দেখুন, তিনি বলেন :
'দুনিয়ার কোনো নিয়ামত পাওয়ার চেয়ে না পাওয়াকে-ই আমি আল্লাহর বড় নিয়ামত মনে করি। কেননা, আমি দেখেছি, যে জাতিকে দুনিয়ার নিয়ামত অধিক দেওয়া হয়েছে, তারা ধ্বংস হয়েছে।'১৮১
আমরা কি দুনিয়ার প্রাচুর্য দেখে আবু হাজিম রহ.-এর মতো ভীত হই—না খুশি হই? আমরা জানি না, আমাদের জন্য আখিরাতে কী প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে! অথচ, আমরা খুশিতে আত্মহারা হচ্ছি দুনিয়ার প্রাচুর্যে!
জুননুন মিসরি রহ. বলেন: ‘শরীর অসুস্থ হয় ব্যথা ও জখমে। অন্তর অসুস্থ হয় গুনাহ ও পাপে। সুতরাং শরীর অসুস্থ হলে যেমন খাবারের স্বাদ পাওয়া যায় না, তেমনই গুনাহ করলে অন্তরে ইবাদতের স্বাদ অনুভূত হয় না।
প্রিয় ভাই, দুনিয়া যখন তোমার প্রতি প্রসন্ন থাকবে, দুনিয়ার প্রতিটি ক্ষেত্রে তোমার অংশগ্রহণ থাকবে, প্রতিটি বিনিয়োগে তোমার অংশ থাকবে—তখন তোমার নামাজে খুশুখুজু কীভাবে আসবে? কখন পাবে সুন্নাতে মুয়াক্কাদাসমূহ আদায় করার সময়? জিকিরের মাধ্যমে তোমার জিহ্বা সিক্ত করার অবকাশই-বা মিলবে কীভাবে?
যারা দুনিয়াকে পেছনে ফেলে রেখেছেন, তাদের অবস্থা দেখো, তাদের জীবন কতটা ভারসাম্যপূর্ণ? তাদের প্রতি আল্লাহর নিয়ামত হলো দুশ্চিন্তামুক্ত জীবন। তুমিও এমন জীবন পাবে, যে জীবনে কোনো চিন্তা থাকবে না, থাকবে না কোনো উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। ইবাদত-বন্দেগির জন্য পাবে অখণ্ড অবসর।
মাদা বিন ইসা রহ. বলেন: ‘কেউ কোনো জিনিসের আশা করলে তা অন্বেষণ করে। কোনো জিনিসকে ভয় পেলে তা থেকে পলায়ন করে। আর কোনো বস্তুকে ভালোবাসলে তাকে অন্য বস্তুর ওপর প্রাধান্য দিয়ে থাকে।’
উবাই বিন কা'ব রা. বলেন: ‘জীবিত ব্যক্তির প্রতি কেবল সে বিষয়ে ঈর্ষান্বিত হবে, যে বিষয়ে তুমি ঈর্ষান্বিত হও মৃত ব্যক্তির প্রতি।’১৮২
মৃত ব্যক্তির প্রতি কোন বিষয়ে আমরা ঈর্ষা করে থাকি? মৃত ব্যক্তি নিজের সাথে কেবল নিয়ে যেতে পারে নিজের আমলটাই। তাই আমাদের ঈর্ষা হবে তার নেক আমল, উত্তম জিকির ও দীর্ঘ ইবাদত-বন্দেগি করার তাওফিকের প্রতি। সাধারণত আমরা এ বিষয়গুলোতে মৃতদের প্রতি ঈর্ষান্বিত হই। কা'ব রা.ও আমাদের উপদেশ দিয়েছেন, যেন আমরা জীবিতদের এ বিষয়গুলোর প্রতি ঈর্ষান্বিত হই।
একব্যক্তি মুআজ বিন জাবাল রা.-কে বলল, 'আমাকে ইলম শেখান।' তিনি বললেন, 'তুমি কি আমার অনুসরণ করবে?' লোকটি বলল, 'আমি আপনার অনুসরণ করতে উৎসাহী।' তিনি বললেন : 'তবে কিছু দিন রোজা রাখো, কিছু দিন রোজা ছাড়া কাটাও। নামাজ পড়বে। ঘুমাবে। হালাল উপার্জন করবে। তবে গুনাহ করবে না। পরিপূর্ণ মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ করবে না। আর সাবধান থাকবে মজলুমের বদদুআ থেকে।'১৮৩
বিশর বিন হারিস রহ. বলেন : 'যে ব্যক্তি দুনিয়াকে ভালোবাসে, সে অবশ্যই মৃত্যুকে অপছন্দ করে। আর যে ব্যক্তি জুহদ অবলম্বন করে, সে আল্লাহর সাক্ষাৎ পছন্দ করে।'১৮৪
সালমান ফারসি রা. বলেন: 'তিন ব্যক্তির অবস্থা দেখে আমি এতই আশ্চর্যান্বিত হয়েছি যে, আমার হাসি চলে এসেছে। আর তিনটা বিষয় আমাকে এতটা উদ্বিগ্ন করেছে যে, আমি কেঁদে ফেলেছি। যে তিন ব্যক্তির কাজে আমি আশ্চর্য হয়েছি, তারা হলো :
১. দুনিয়া নিয়ে যে চিন্তায় বিভোর, ওদিকে মৃত্যু তাকে খুঁজছে।
২. যে গাফিল হয়ে আছে, অথচ মৃত্যু তার থেকে গাফিল নয়।
৩. হাস্যোজ্জ্বল ব্যক্তি। সে হাসছে, অথচ সে জানে না—আল্লাহ তার উপর সন্তুষ্ট না অসন্তুষ্ট।
আর যে তিনটি বিষয় আমাকে উদ্বিগ্ন করেছে, সেগুলো হলো : ১. রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বিচ্ছিন্নতা। (তাঁর মৃত্যু।) ২. প্রিয়জনদের বিদায়।
৩. এমন অবস্থায় আল্লাহর সামনে দণ্ডায়মান হওয়া, যখন আমি জানি না যে, আমার ব্যাপারে কি জান্নাতের ফয়সালা হবে, না জাহান্নামের।'১৮৫
হারিম বিন হাইয়ান রহ.-কে বলা হলো, 'আমাকে অসিয়ত করুন।'
তিনি বললেন : 'অসিয়ত করার মতো কিছু আমার নেই, তবে তোমাকে সুরা নামলের শেষাংশের নসিহত করছি।'
সুরা নামলের শেষের কয়েকটি আয়াত হলো: مَنْ جَاءَ بِالْحَسَنَةِ فَلَهُ خَيْرٌ مِنْهَا وَهُمْ مِنْ فَزَعٍ يَوْمَئِذٍ آمِنُونَ . وَمَنْ جَاءَ بِالسَّيِّئَةِ فَكُبَّتْ وُجُوهُهُمْ فِي النَّارِ هَلْ تُجْزَوْنَ إِلَّا مَا كُنْتُمْ تَعْمَلُونَ * إِنَّمَا أُمِرْتُ أَنْ أَعْبُدَ رَبَّ هَذِهِ الْبَلْدَةِ الَّذِي حَرَّمَهَا وَلَهُ كُلُّ شَيْءٍ وَأُمِرْتُ أَنْ أَكُونَ مِنَ الْمُسْلِمِينَ * وَأَنْ أَتْلُوَ الْقُرْآنَ فَمَنِ اهْتَدَى فَإِنَّمَا يَهْتَدِي لِنَفْسِهِ وَمَنْ ضَلَّ فَقُلْ إِنَّمَا أَنَا مِنَ الْمُنْذِرِينَ • وَقُلِ الْحَمْدُ لِلَّهِ سَيُرِيكُمْ آيَاتِهِ فَتَعْرِفُونَهَا وَمَا رَبُّكَ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ ..
'যে কেউ সৎকর্ম নিয়ে আসবে, সে উৎকৃষ্টতর প্রতিদান পাবে এবং সেদিন তারা নিরাপদ থাকবে গুরুতর অস্থিরতা থেকে। আর যে মন্দ কাজ নিয়ে আসবে, তাকে অধোমুখে আগুনে নিক্ষেপ করা হবে। তোমরা যা করছিলে, তারই প্রতিফল তোমরা পাবে। আমি তো কেবল এই নগরীর প্রভুর ইবাদত করতে আদিষ্ট হয়েছি, যিনি একে সম্মানিত করেছেন। সবকিছু তাঁরই। আমি আরও আদিষ্ট হয়েছি, যেন আমি আত্মসমর্পণকারীদের একজন হই। এবং আমি যেন কুরআন পাঠ করে শোনাই। অতঃপর যে ব্যক্তি সৎপথে চলে, সে নিজের কল্যাণার্থেই সৎপথে চলে এবং কেউ পথভ্রষ্ট হলে আপনি বলে দিন, আমি তো কেবল একজন সতর্ককারী। আরও বলুন, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর। অচিরেই তিনি তাঁর নিদর্শনসমূহ তোমাদের দেখাবেন। তখন তোমরা তা চিনতে পারবে। এবং তোমরা যা করো, সে সম্পর্কে আপনার পালনকর্তা গাফিল নন।'১৮৬
হাম্মাদ রহ. দাউদ তায়ি রহ.-কে বলেন:
'হে আবু সুলাইমান, আমি দুনিয়ার অল্প সম্পদের ওপর সন্তুষ্ট। তিনি বললেন, “আমি কি আপনাকে এমন ব্যক্তি সম্পর্কে জানিয়ে দেবো না, যিনি এর চেয়ে কম সম্পদের ওপর সন্তুষ্ট? তিনি হলেন সে ব্যক্তি, যিনি দুনিয়াকে আখিরাতের বিনিময়ে উৎসর্গ করে দিয়েছেন।”১৮৭
প্রিয় ভাই, সালাফে সালিহিন এমনই ছিলেন, আর আমাদের অবস্থা কেমন!
আবু দাউদ সিজিসতানি রহ. বলেন:
'আমি ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল রহ.-এর মুখ থেকে দুনিয়াবি কোনো আলোচনা কখনো শুনিনি।'
কিন্তু আমাদের অবস্থা হচ্ছে, সর্বদা দুনিয়াই হয়ে থাকে আমাদের আলোচনা ও চিন্তাভাবনার কেন্দ্রবিন্দু। দুনিয়াই আমাদের ধ্যান-জ্ঞান। দুনিয়া আমাদের অন্তরে গেড়ে বসেছে। কী করলে এবং কোন পন্থা অবলম্বন করলে লাভ বেশি হবে, এই একটা ভাবনাই আছে আমাদের! কোথাও পার্থিব কোনো বস্তু দেওয়ার ঘোষণা আসলে সকাল সকালই আমরা সেদিকে চলে যাই। হাসি হাসি মুখ নিয়ে জটলা বেঁধে দাঁড়িয়ে যাই ঘোষণাকারীর দরজায়। আমাদের অন্তরে আখিরাতের জন্য সামান্য জায়গাও নেই। মসজিদের মাইকে যখন আজান ধ্বনিত হয়, রাস্তার দিকে তাকালে তখন দেখা যায়, আজানের প্রতি লোকদের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। ব্যস্ততম সড়কে দ্রুতগতিতে তারা ছুটছেই ছুটছে। দুনিয়াকে পাবার আশায়। আখিরাতকে অবহেলা করে। দুনিয়ার পিছু পিছু। তারা ছুটছেই ছুটছে...
সাইদ বিন আব্দুল আজিজ রহ. বলেন:
'যে উত্তম আমল করে, সে প্রতিদান লাভের আশা করতে পারে। তবে যে মন্দ আমল করে, সে যেন শাস্তিকে ঘৃণা না করে। যে অন্যায়ভাবে সম্মান অর্জন করে, আল্লাহ তাআলা ন্যায়সংগতভাবে তাকে লাঞ্ছিত করেন। যে ব্যক্তি জুলুম করে সম্পদের পাহাড় গড়ে, আল্লাহ তাআলা জুলুম না করেই তাকে দারিদ্র্যে জর্জরিত করবেন।'
হাসান বসরি রহ. বলেন:
'ফকিহ হলেন তিনি, যিনি দুনিয়াবিমুখ, আখিরাতের প্রতি যার আগ্রহ অত্যধিক, দ্বীনের ব্যাপারে দূরদৃষ্টিসম্পন্ন, আল্লাহর ইবাদতের ওপর অটল, মুসলমানদের ইজ্জত-আব্রুর ব্যাপারে যথেষ্ট সতর্ক, মুসলিমদের সম্পদের ব্যাপারে স্বচ্ছ এবং সর্বোপরি তাদের কল্যাণকামী। ১৮৮
পার্থিব সম্পদ কম হওয়া বা বেশি হওয়া আখিরাতের সফলতা ও জান্নাতলাভের মানদণ্ড নয়। এ বিষয়টা আপেক্ষিক। অনেক সম্পদশালী ব্যক্তি হালাল পন্থায় সম্পদ অর্জন করে এবং হালাল ক্ষেত্রে ব্যয় করে আখিরাতের সফলতা ও জান্নাত লাভ করতে পারে। আবার অনেক দরিদ্র লোক আল্লাহর অবাধ্যতায় লিপ্ত হয়ে হারিয়ে ফেলতে পারে আখিরাতের সাফল্য। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে যাদের ধন-সম্পদ বেশি হয়, চিন্তা-উদ্বেগ তাদেরই বেশি হয়। অন্যদিকে দরিদ্রদের অবস্থা হলো এমন, তার কাছে কেবল প্রয়োজন পূরণ করার মতো অর্থ-সম্পদ থাকে। তবুও কারও কাছে হাতপাতা থেকে সে দূরে থাকে, কারও কাছে অভিযোগও করে না নিজের অভাব-অনটনের।
জীবনে এমন অনেক জীবন্ত উদাহরণ আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। সেসব ঘটনার সাক্ষীও বহাল তবিয়তে আছেন এখনো। একটা ঘটনা বলি। এক ব্যক্তি অঢেল সম্পত্তির মালিক ছিলেন। তার এ সম্পদের জাকাতই হাজার হাজার পরিবারের জন্য যথেষ্ট হতো। কিন্তু তিনি আমার কাছে অভিযোগ করে বলেন, তিনি বড় উদ্বেগে আছেন। এই চিন্তা, সেই চিন্তা! ব্যস্ততায় জীবনটা জরাজীর্ণ একেবারে। বড় বিষণ্ণ হয়ে আছে তার মন। দুর্ভাগ্যে ভরা তার জীবন।
অন্যদিকে, একজন মুআজ্জিনের সাথে আমার দীর্ঘদিন সম্পর্ক ছিল। কোনো দিন সম্পদ কম হওয়ার অভিযোগ করতে তাকে দেখিনি। পরিবার ও সন্তানদের নিয়ে আনন্দেই কাটত তার সময়। আল্লাহর নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করতেন তিনি। যদিও তার নিজের ঘর ছিল না। থাকতেন মসজিদের পাশে একটি ঘরে। সুবহানাল্লাহ! অনেক সন্তানসন্ততি নিয়ে গড়ে ওঠা তার বড় সংসার কোনো অভিযোগ ছাড়া এবং কোনো ধরনের চিন্তার বহিঃপ্রকাশ ছাড়া তার জীবন সুন্দরভাবে চলত। ইবাদত ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের সাধনাও চলত সুন্দররূপে। অল্পতুষ্টি ও আল্লাহর ফয়সালার প্রতি সন্তুষ্টির এমন নজির আমি খুব কমই দেখেছি।
প্রাজ্ঞজন বলেন:
'আমার আশ্চর্য লাগে, যখন কাউকে সম্পদে ক্ষতি হওয়ার কারণে চিন্তিত হতে দেখি। কিন্তু তার যে সময় ফুরিয়ে আসছে, সেটা নিয়ে তার কোনো চিন্তা নেই! দুনিয়া অতীতে হারিয়ে যাচ্ছে আর আখিরাত ভবিষ্যৎ হয়ে সামনে আসছে। বড়ই আশ্চর্য লাগে যখন দেখি, মানুষ ভবিষ্যতের চিন্তা বাদ দিয়ে অতীত হয়ে গেছে ও অতীত হয়ে যাবে— এমন এক দুনিয়ার জন্য নিজের সকল ব্যস্ততাকে উৎসর্গ করছে।'
দুনিয়া এক ধূসর মরিচীকা
'যখন অন্তরে জান্নাত-জাহান্নামের লক্ষ্য থাকে না, যখন জান্নাতের প্রতি আগ্রহ কম থাকে ও জাহান্নাম থেকে ভয় কম হয়, তখন জান্নাত অর্জনের প্রচেষ্টা ও জাহান্নাম থেকে বাঁচার চেষ্টা দুর্বল থেকে দুর্বলতর হতে থাকে। এটাই মূল কারণ। কেননা, যখনই কারও জান্নাতের প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি পায়, জান্নাতকে উদ্দেশ্য করে তার আমল বাড়তে থাকে। তার ইবাদত করার ও মন্দ থেকে বেঁচে থাকার কারণটা তখন মজবুত হয়। তার সাহস ও চেষ্টা-প্রচেষ্টা আগের তুলনায় পূর্ণতা প্রাপ্ত হয়। আর এ বিষয়টি তার অভিরুচি, তার ঝোঁক ও প্রবণতা থেকে বোঝা যায়।'১৮৯
দুনিয়াতে সবাই সুখের সন্ধানে আছে। কিন্তু অধিকাংশ লোকই সুখ খোঁজার জন্য বেছে নিয়েছে ভুল পথ। দুনিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বেশি সুখ ও স্বাদ কোথায় আছে, সে সম্পর্কে মালিক বিন দিনার রহ. বলেন:
'দুনিয়াদাররা দুনিয়া থেকে চলে গেল, কিন্তু তারা দুনিয়ার সবচেয়ে সুস্বাদু বস্তুটির স্বাদ আস্বাদন করতে পারল না। জানতে চাওয়া হলো, সেটি কী? তিনি উত্তর দিলেন, আল্লাহর পরিচয় লাভ।'১৯০
দাউদ আত-তায়ি রহ. বলেন:
'দুনিয়াতে এমনভাবে থাকো, যেন তুমি রোজাদার আর মৃত্যু হচ্ছে তোমার সে রোজার ইফতার।'১৯১
একব্যক্তি হাসান রহ.-কে প্রশ্ন করল, 'হে আবু সাঈদ, ফকিহ কে?'
তিনি উত্তর দিলেন, 'যে ব্যক্তি দুনিয়াবিমুখ, আখিরাতপ্রত্যাশী, দ্বীনের বিষয়ে যার দূরদৃষ্টি আছে, ইবাদত-বন্দেগিতে যে সাধনাকারী—সে-ই হলো প্রকৃত ফকিহ।'
প্রিয় ভাই, দুনিয়া, দুনিয়ার চাকচিক্য ও তার ভোগ-বিলাস সবই ধোঁকা। কবির ভাষায় :
أَحْلَامُ نَوْمٍ أَوْ كَظِلَّ زَائِلٍ إِنَّ النَّبِيبَ بِمِثْلِهَا لَا يُخْدَعُ
'ক্ষণিকের সুখস্বপ্ন আর বিলীয়মান ছায়া দেখে বুদ্ধিমান প্রতারিত হয় না। '১৯২
আমাদের বর্তমান কাজকর্ম ও সালাফে সালিহিনের কাজকর্মের মাঝে রয়েছে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। বোধ করি, তাদের জীবনীতে একবার দৃষ্টি দিলেই তা আমাদের নিকট স্পষ্ট হয়ে যাবে।
মুহাম্মাদ বিন ফুজাইল রহ. বলেন:
'গত চল্লিশ বছর যাবৎ যতটা কদম আমি হেঁটেছি, তার সবটাই ছিল আল্লাহ তাআলার জন্য। গত চল্লিশ বছর যাবৎ আল্লাহর প্রতি লজ্জাবশত কভু নিষিদ্ধ বস্তুর প্রতি আমি দৃষ্টিপাত করিনি। গত ত্রিশ বছর যাবৎ আমার দুই ফেরেশতাকে লিখতে হয় এমন কোনো পাপকর্ম আমি করিনি। যদি কখনো কদাচিৎ করেও থাকি, তবুও তাদের দুজনকে লজ্জা পেয়েছি।'১৯৩

টিকাঃ
১৭৯. আল-আকিবাহ: ৬৪
১৮০. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ১০/৫৬
১৮১. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৩/২৩৩
১৮২. বুসতানুল আরিফিন: ১১১
১৮৩. সিফাতুস সাফওয়াহ: ১/৪৯৬
১৮৪. আস-সিয়ার: ১/৪৭৬
১৮৫. আল-আকিবাহ: ৬৪
১৮৬. সুরা আন-নামল: ৮৯-৯৩
১৮৭. সিফাতুস সাফওয়াহ : ৩/১৪১
১৮৮. মুখতাসারু মিনহাজিল কাসিদিন: ২১
১৮৯. মাদারিজুস সালিকিন: ২/৮২
১৯০. মাদারিজুস সালিকিন: ২/২৩৩
১৯১. আদাবুদ দুনিয়া ওয়াদ-দ্বীন: ৮১
১৯২. আল-ইহইয়া: ৩/২২৮
১৯৩. সিফাতুস সাফওয়াহ: ৪/১৬৫

আলি রা. তাঁর এক খুতবায় বলেন :
'সতর্ক হও, দুনিয়া মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। ঘোষণা দিয়ে দিয়েছে বিদায়ের। আখিরাত আসন্ন। ঘোষণা দিয়েছে বরণ করে নেওয়ার। সতর্ক হও, আজকের দিনটা (বর্তমান সময়) হলো ঘোড়দৌড়ের ময়দান। আগামীকাল (সামনের সময়) হলো প্রতিযোগিতা। এ প্রতিযোগিতার পুরস্কার হচ্ছে জান্নাত। দৌড়ের শেষ গন্তব্য হচ্ছে মৃত্যু।
তোমরা এখন যে সময়ের মধ্যে আছ, এটাই সুযোগ। এর পেছনে আছে মৃত্যু, যা এ জীবনের একটি পরম সত্য। সুতরাং তোমাদের যে ব্যক্তি মৃত্যু আসার আগে আগে আমল করবে, তার সে আমল কাজে আসবে। আর যে ব্যক্তি মৃত্যু আসার আগে আগে সুযোগ কাজে লাগিয়ে আমল করেনি, বৃথা আশায় সে নিজেরই ক্ষতি করেছে; তার এ মন্দ আমল নিশ্চয় তার শত্রু হয়ে দাঁড়াবে।'১৭৯
দুনিয়া ও আখিরাতে মানুষের অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে ইয়াহইয়া বিন মুআজ রহ. বলেন:
'দুনিয়াতে আমাদের আশা-আকাঙ্ক্ষাগুলো পূরণ হচ্ছে না। আখিরাতের জন্যেও আমরা আমল করছি না। আর কিয়ামতের দিন আমাদের কী অবস্থা হবে, তাও জানি না। এই হলো আমাদের অবস্থা।'১৮০
আমরা দুনিয়ার নিয়ামত পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে আছি। যেভাবেই হোক, আমরা পেতে চাই দুনিয়াবি নিয়ামত। কিন্তু আবু হাজিম সালামা বিন দিনার রহ. কী বলেন দেখুন, তিনি বলেন :
'দুনিয়ার কোনো নিয়ামত পাওয়ার চেয়ে না পাওয়াকে-ই আমি আল্লাহর বড় নিয়ামত মনে করি। কেননা, আমি দেখেছি, যে জাতিকে দুনিয়ার নিয়ামত অধিক দেওয়া হয়েছে, তারা ধ্বংস হয়েছে।'১৮১
আমরা কি দুনিয়ার প্রাচুর্য দেখে আবু হাজিম রহ.-এর মতো ভীত হই—না খুশি হই? আমরা জানি না, আমাদের জন্য আখিরাতে কী প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে! অথচ, আমরা খুশিতে আত্মহারা হচ্ছি দুনিয়ার প্রাচুর্যে!
জুননুন মিসরি রহ. বলেন: ‘শরীর অসুস্থ হয় ব্যথা ও জখমে। অন্তর অসুস্থ হয় গুনাহ ও পাপে। সুতরাং শরীর অসুস্থ হলে যেমন খাবারের স্বাদ পাওয়া যায় না, তেমনই গুনাহ করলে অন্তরে ইবাদতের স্বাদ অনুভূত হয় না।
প্রিয় ভাই, দুনিয়া যখন তোমার প্রতি প্রসন্ন থাকবে, দুনিয়ার প্রতিটি ক্ষেত্রে তোমার অংশগ্রহণ থাকবে, প্রতিটি বিনিয়োগে তোমার অংশ থাকবে—তখন তোমার নামাজে খুশুখুজু কীভাবে আসবে? কখন পাবে সুন্নাতে মুয়াক্কাদাসমূহ আদায় করার সময়? জিকিরের মাধ্যমে তোমার জিহ্বা সিক্ত করার অবকাশই-বা মিলবে কীভাবে?
যারা দুনিয়াকে পেছনে ফেলে রেখেছেন, তাদের অবস্থা দেখো, তাদের জীবন কতটা ভারসাম্যপূর্ণ? তাদের প্রতি আল্লাহর নিয়ামত হলো দুশ্চিন্তামুক্ত জীবন। তুমিও এমন জীবন পাবে, যে জীবনে কোনো চিন্তা থাকবে না, থাকবে না কোনো উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। ইবাদত-বন্দেগির জন্য পাবে অখণ্ড অবসর।
মাদা বিন ইসা রহ. বলেন: ‘কেউ কোনো জিনিসের আশা করলে তা অন্বেষণ করে। কোনো জিনিসকে ভয় পেলে তা থেকে পলায়ন করে। আর কোনো বস্তুকে ভালোবাসলে তাকে অন্য বস্তুর ওপর প্রাধান্য দিয়ে থাকে।’
উবাই বিন কা'ব রা. বলেন: ‘জীবিত ব্যক্তির প্রতি কেবল সে বিষয়ে ঈর্ষান্বিত হবে, যে বিষয়ে তুমি ঈর্ষান্বিত হও মৃত ব্যক্তির প্রতি।’১৮২
মৃত ব্যক্তির প্রতি কোন বিষয়ে আমরা ঈর্ষা করে থাকি? মৃত ব্যক্তি নিজের সাথে কেবল নিয়ে যেতে পারে নিজের আমলটাই। তাই আমাদের ঈর্ষা হবে তার নেক আমল, উত্তম জিকির ও দীর্ঘ ইবাদত-বন্দেগি করার তাওফিকের প্রতি। সাধারণত আমরা এ বিষয়গুলোতে মৃতদের প্রতি ঈর্ষান্বিত হই। কা'ব রা.ও আমাদের উপদেশ দিয়েছেন, যেন আমরা জীবিতদের এ বিষয়গুলোর প্রতি ঈর্ষান্বিত হই।
একব্যক্তি মুআজ বিন জাবাল রা.-কে বলল, 'আমাকে ইলম শেখান।' তিনি বললেন, 'তুমি কি আমার অনুসরণ করবে?' লোকটি বলল, 'আমি আপনার অনুসরণ করতে উৎসাহী।' তিনি বললেন : 'তবে কিছু দিন রোজা রাখো, কিছু দিন রোজা ছাড়া কাটাও। নামাজ পড়বে। ঘুমাবে। হালাল উপার্জন করবে। তবে গুনাহ করবে না। পরিপূর্ণ মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ করবে না। আর সাবধান থাকবে মজলুমের বদদুআ থেকে।'১৮৩
বিশর বিন হারিস রহ. বলেন : 'যে ব্যক্তি দুনিয়াকে ভালোবাসে, সে অবশ্যই মৃত্যুকে অপছন্দ করে। আর যে ব্যক্তি জুহদ অবলম্বন করে, সে আল্লাহর সাক্ষাৎ পছন্দ করে।'১৮৪
সালমান ফারসি রা. বলেন: 'তিন ব্যক্তির অবস্থা দেখে আমি এতই আশ্চর্যান্বিত হয়েছি যে, আমার হাসি চলে এসেছে। আর তিনটা বিষয় আমাকে এতটা উদ্বিগ্ন করেছে যে, আমি কেঁদে ফেলেছি। যে তিন ব্যক্তির কাজে আমি আশ্চর্য হয়েছি, তারা হলো :
১. দুনিয়া নিয়ে যে চিন্তায় বিভোর, ওদিকে মৃত্যু তাকে খুঁজছে।
২. যে গাফিল হয়ে আছে, অথচ মৃত্যু তার থেকে গাফিল নয়।
৩. হাস্যোজ্জ্বল ব্যক্তি। সে হাসছে, অথচ সে জানে না—আল্লাহ তার উপর সন্তুষ্ট না অসন্তুষ্ট।
আর যে তিনটি বিষয় আমাকে উদ্বিগ্ন করেছে, সেগুলো হলো : ১. রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বিচ্ছিন্নতা। (তাঁর মৃত্যু।) ২. প্রিয়জনদের বিদায়।
৩. এমন অবস্থায় আল্লাহর সামনে দণ্ডায়মান হওয়া, যখন আমি জানি না যে, আমার ব্যাপারে কি জান্নাতের ফয়সালা হবে, না জাহান্নামের।'১৮৫
হারিম বিন হাইয়ান রহ.-কে বলা হলো, 'আমাকে অসিয়ত করুন।'
তিনি বললেন : 'অসিয়ত করার মতো কিছু আমার নেই, তবে তোমাকে সুরা নামলের শেষাংশের নসিহত করছি।'
সুরা নামলের শেষের কয়েকটি আয়াত হলো: مَنْ جَاءَ بِالْحَسَنَةِ فَلَهُ خَيْرٌ مِنْهَا وَهُمْ مِنْ فَزَعٍ يَوْمَئِذٍ آمِنُونَ . وَمَنْ جَاءَ بِالسَّيِّئَةِ فَكُبَّتْ وُجُوهُهُمْ فِي النَّارِ هَلْ تُجْزَوْنَ إِلَّا مَا كُنْتُمْ تَعْمَلُونَ * إِنَّمَا أُمِرْتُ أَنْ أَعْبُدَ رَبَّ هَذِهِ الْبَلْدَةِ الَّذِي حَرَّمَهَا وَلَهُ كُلُّ شَيْءٍ وَأُمِرْتُ أَنْ أَكُونَ مِنَ الْمُسْلِمِينَ * وَأَنْ أَتْلُوَ الْقُرْآنَ فَمَنِ اهْتَدَى فَإِنَّمَا يَهْتَدِي لِنَفْسِهِ وَمَنْ ضَلَّ فَقُلْ إِنَّمَا أَنَا مِنَ الْمُنْذِرِينَ • وَقُلِ الْحَمْدُ لِلَّهِ سَيُرِيكُمْ آيَاتِهِ فَتَعْرِفُونَهَا وَمَا رَبُّكَ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ ..
'যে কেউ সৎকর্ম নিয়ে আসবে, সে উৎকৃষ্টতর প্রতিদান পাবে এবং সেদিন তারা নিরাপদ থাকবে গুরুতর অস্থিরতা থেকে। আর যে মন্দ কাজ নিয়ে আসবে, তাকে অধোমুখে আগুনে নিক্ষেপ করা হবে। তোমরা যা করছিলে, তারই প্রতিফল তোমরা পাবে। আমি তো কেবল এই নগরীর প্রভুর ইবাদত করতে আদিষ্ট হয়েছি, যিনি একে সম্মানিত করেছেন। সবকিছু তাঁরই। আমি আরও আদিষ্ট হয়েছি, যেন আমি আত্মসমর্পণকারীদের একজন হই। এবং আমি যেন কুরআন পাঠ করে শোনাই। অতঃপর যে ব্যক্তি সৎপথে চলে, সে নিজের কল্যাণার্থেই সৎপথে চলে এবং কেউ পথভ্রষ্ট হলে আপনি বলে দিন, আমি তো কেবল একজন সতর্ককারী। আরও বলুন, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর। অচিরেই তিনি তাঁর নিদর্শনসমূহ তোমাদের দেখাবেন। তখন তোমরা তা চিনতে পারবে। এবং তোমরা যা করো, সে সম্পর্কে আপনার পালনকর্তা গাফিল নন।'১৮৬
হাম্মাদ রহ. দাউদ তায়ি রহ.-কে বলেন:
'হে আবু সুলাইমান, আমি দুনিয়ার অল্প সম্পদের ওপর সন্তুষ্ট। তিনি বললেন, “আমি কি আপনাকে এমন ব্যক্তি সম্পর্কে জানিয়ে দেবো না, যিনি এর চেয়ে কম সম্পদের ওপর সন্তুষ্ট? তিনি হলেন সে ব্যক্তি, যিনি দুনিয়াকে আখিরাতের বিনিময়ে উৎসর্গ করে দিয়েছেন।”১৮৭
প্রিয় ভাই, সালাফে সালিহিন এমনই ছিলেন, আর আমাদের অবস্থা কেমন!
আবু দাউদ সিজিসতানি রহ. বলেন:
'আমি ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল রহ.-এর মুখ থেকে দুনিয়াবি কোনো আলোচনা কখনো শুনিনি।'
কিন্তু আমাদের অবস্থা হচ্ছে, সর্বদা দুনিয়াই হয়ে থাকে আমাদের আলোচনা ও চিন্তাভাবনার কেন্দ্রবিন্দু। দুনিয়াই আমাদের ধ্যান-জ্ঞান। দুনিয়া আমাদের অন্তরে গেড়ে বসেছে। কী করলে এবং কোন পন্থা অবলম্বন করলে লাভ বেশি হবে, এই একটা ভাবনাই আছে আমাদের! কোথাও পার্থিব কোনো বস্তু দেওয়ার ঘোষণা আসলে সকাল সকালই আমরা সেদিকে চলে যাই। হাসি হাসি মুখ নিয়ে জটলা বেঁধে দাঁড়িয়ে যাই ঘোষণাকারীর দরজায়। আমাদের অন্তরে আখিরাতের জন্য সামান্য জায়গাও নেই। মসজিদের মাইকে যখন আজান ধ্বনিত হয়, রাস্তার দিকে তাকালে তখন দেখা যায়, আজানের প্রতি লোকদের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। ব্যস্ততম সড়কে দ্রুতগতিতে তারা ছুটছেই ছুটছে। দুনিয়াকে পাবার আশায়। আখিরাতকে অবহেলা করে। দুনিয়ার পিছু পিছু। তারা ছুটছেই ছুটছে...
সাইদ বিন আব্দুল আজিজ রহ. বলেন:
'যে উত্তম আমল করে, সে প্রতিদান লাভের আশা করতে পারে। তবে যে মন্দ আমল করে, সে যেন শাস্তিকে ঘৃণা না করে। যে অন্যায়ভাবে সম্মান অর্জন করে, আল্লাহ তাআলা ন্যায়সংগতভাবে তাকে লাঞ্ছিত করেন। যে ব্যক্তি জুলুম করে সম্পদের পাহাড় গড়ে, আল্লাহ তাআলা জুলুম না করেই তাকে দারিদ্র্যে জর্জরিত করবেন।'
হাসান বসরি রহ. বলেন:
'ফকিহ হলেন তিনি, যিনি দুনিয়াবিমুখ, আখিরাতের প্রতি যার আগ্রহ অত্যধিক, দ্বীনের ব্যাপারে দূরদৃষ্টিসম্পন্ন, আল্লাহর ইবাদতের ওপর অটল, মুসলমানদের ইজ্জত-আব্রুর ব্যাপারে যথেষ্ট সতর্ক, মুসলিমদের সম্পদের ব্যাপারে স্বচ্ছ এবং সর্বোপরি তাদের কল্যাণকামী। ১৮৮
পার্থিব সম্পদ কম হওয়া বা বেশি হওয়া আখিরাতের সফলতা ও জান্নাতলাভের মানদণ্ড নয়। এ বিষয়টা আপেক্ষিক। অনেক সম্পদশালী ব্যক্তি হালাল পন্থায় সম্পদ অর্জন করে এবং হালাল ক্ষেত্রে ব্যয় করে আখিরাতের সফলতা ও জান্নাত লাভ করতে পারে। আবার অনেক দরিদ্র লোক আল্লাহর অবাধ্যতায় লিপ্ত হয়ে হারিয়ে ফেলতে পারে আখিরাতের সাফল্য। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে যাদের ধন-সম্পদ বেশি হয়, চিন্তা-উদ্বেগ তাদেরই বেশি হয়। অন্যদিকে দরিদ্রদের অবস্থা হলো এমন, তার কাছে কেবল প্রয়োজন পূরণ করার মতো অর্থ-সম্পদ থাকে। তবুও কারও কাছে হাতপাতা থেকে সে দূরে থাকে, কারও কাছে অভিযোগও করে না নিজের অভাব-অনটনের।
জীবনে এমন অনেক জীবন্ত উদাহরণ আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। সেসব ঘটনার সাক্ষীও বহাল তবিয়তে আছেন এখনো। একটা ঘটনা বলি। এক ব্যক্তি অঢেল সম্পত্তির মালিক ছিলেন। তার এ সম্পদের জাকাতই হাজার হাজার পরিবারের জন্য যথেষ্ট হতো। কিন্তু তিনি আমার কাছে অভিযোগ করে বলেন, তিনি বড় উদ্বেগে আছেন। এই চিন্তা, সেই চিন্তা! ব্যস্ততায় জীবনটা জরাজীর্ণ একেবারে। বড় বিষণ্ণ হয়ে আছে তার মন। দুর্ভাগ্যে ভরা তার জীবন।
অন্যদিকে, একজন মুআজ্জিনের সাথে আমার দীর্ঘদিন সম্পর্ক ছিল। কোনো দিন সম্পদ কম হওয়ার অভিযোগ করতে তাকে দেখিনি। পরিবার ও সন্তানদের নিয়ে আনন্দেই কাটত তার সময়। আল্লাহর নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করতেন তিনি। যদিও তার নিজের ঘর ছিল না। থাকতেন মসজিদের পাশে একটি ঘরে। সুবহানাল্লাহ! অনেক সন্তানসন্ততি নিয়ে গড়ে ওঠা তার বড় সংসার কোনো অভিযোগ ছাড়া এবং কোনো ধরনের চিন্তার বহিঃপ্রকাশ ছাড়া তার জীবন সুন্দরভাবে চলত। ইবাদত ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের সাধনাও চলত সুন্দররূপে। অল্পতুষ্টি ও আল্লাহর ফয়সালার প্রতি সন্তুষ্টির এমন নজির আমি খুব কমই দেখেছি।
প্রাজ্ঞজন বলেন:
'আমার আশ্চর্য লাগে, যখন কাউকে সম্পদে ক্ষতি হওয়ার কারণে চিন্তিত হতে দেখি। কিন্তু তার যে সময় ফুরিয়ে আসছে, সেটা নিয়ে তার কোনো চিন্তা নেই! দুনিয়া অতীতে হারিয়ে যাচ্ছে আর আখিরাত ভবিষ্যৎ হয়ে সামনে আসছে। বড়ই আশ্চর্য লাগে যখন দেখি, মানুষ ভবিষ্যতের চিন্তা বাদ দিয়ে অতীত হয়ে গেছে ও অতীত হয়ে যাবে— এমন এক দুনিয়ার জন্য নিজের সকল ব্যস্ততাকে উৎসর্গ করছে।'
দুনিয়া এক ধূসর মরিচীকা
'যখন অন্তরে জান্নাত-জাহান্নামের লক্ষ্য থাকে না, যখন জান্নাতের প্রতি আগ্রহ কম থাকে ও জাহান্নাম থেকে ভয় কম হয়, তখন জান্নাত অর্জনের প্রচেষ্টা ও জাহান্নাম থেকে বাঁচার চেষ্টা দুর্বল থেকে দুর্বলতর হতে থাকে। এটাই মূল কারণ। কেননা, যখনই কারও জান্নাতের প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি পায়, জান্নাতকে উদ্দেশ্য করে তার আমল বাড়তে থাকে। তার ইবাদত করার ও মন্দ থেকে বেঁচে থাকার কারণটা তখন মজবুত হয়। তার সাহস ও চেষ্টা-প্রচেষ্টা আগের তুলনায় পূর্ণতা প্রাপ্ত হয়। আর এ বিষয়টি তার অভিরুচি, তার ঝোঁক ও প্রবণতা থেকে বোঝা যায়।'১৮৯
দুনিয়াতে সবাই সুখের সন্ধানে আছে। কিন্তু অধিকাংশ লোকই সুখ খোঁজার জন্য বেছে নিয়েছে ভুল পথ। দুনিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বেশি সুখ ও স্বাদ কোথায় আছে, সে সম্পর্কে মালিক বিন দিনার রহ. বলেন:
'দুনিয়াদাররা দুনিয়া থেকে চলে গেল, কিন্তু তারা দুনিয়ার সবচেয়ে সুস্বাদু বস্তুটির স্বাদ আস্বাদন করতে পারল না। জানতে চাওয়া হলো, সেটি কী? তিনি উত্তর দিলেন, আল্লাহর পরিচয় লাভ।'১৯০
দাউদ আত-তায়ি রহ. বলেন:
'দুনিয়াতে এমনভাবে থাকো, যেন তুমি রোজাদার আর মৃত্যু হচ্ছে তোমার সে রোজার ইফতার।'১৯১
একব্যক্তি হাসান রহ.-কে প্রশ্ন করল, 'হে আবু সাঈদ, ফকিহ কে?'
তিনি উত্তর দিলেন, 'যে ব্যক্তি দুনিয়াবিমুখ, আখিরাতপ্রত্যাশী, দ্বীনের বিষয়ে যার দূরদৃষ্টি আছে, ইবাদত-বন্দেগিতে যে সাধনাকারী—সে-ই হলো প্রকৃত ফকিহ।'
প্রিয় ভাই, দুনিয়া, দুনিয়ার চাকচিক্য ও তার ভোগ-বিলাস সবই ধোঁকা। কবির ভাষায় :
أَحْلَامُ نَوْمٍ أَوْ كَظِلَّ زَائِلٍ إِنَّ النَّبِيبَ بِمِثْلِهَا لَا يُخْدَعُ
'ক্ষণিকের সুখস্বপ্ন আর বিলীয়মান ছায়া দেখে বুদ্ধিমান প্রতারিত হয় না। '১৯২
আমাদের বর্তমান কাজকর্ম ও সালাফে সালিহিনের কাজকর্মের মাঝে রয়েছে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। বোধ করি, তাদের জীবনীতে একবার দৃষ্টি দিলেই তা আমাদের নিকট স্পষ্ট হয়ে যাবে।
মুহাম্মাদ বিন ফুজাইল রহ. বলেন:
'গত চল্লিশ বছর যাবৎ যতটা কদম আমি হেঁটেছি, তার সবটাই ছিল আল্লাহ তাআলার জন্য। গত চল্লিশ বছর যাবৎ আল্লাহর প্রতি লজ্জাবশত কভু নিষিদ্ধ বস্তুর প্রতি আমি দৃষ্টিপাত করিনি। গত ত্রিশ বছর যাবৎ আমার দুই ফেরেশতাকে লিখতে হয় এমন কোনো পাপকর্ম আমি করিনি। যদি কখনো কদাচিৎ করেও থাকি, তবুও তাদের দুজনকে লজ্জা পেয়েছি।'১৯৩

টিকাঃ
১৭৯. আল-আকিবাহ: ৬৪
১৮০. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ১০/৫৬
১৮১. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৩/২৩৩
১৮২. বুসতানুল আরিফিন: ১১১
১৮৩. সিফাতুস সাফওয়াহ: ১/৪৯৬
১৮৪. আস-সিয়ার: ১/৪৭৬
১৮৫. আল-আকিবাহ: ৬৪
১৮৬. সুরা আন-নামল: ৮৯-৯৩
১৮৭. সিফাতুস সাফওয়াহ : ৩/১৪১
১৮৮. মুখতাসারু মিনহাজিল কাসিদিন: ২১
১৮৯. মাদারিজুস সালিকিন: ২/৮২
১৯০. মাদারিজুস সালিকিন: ২/২৩৩
১৯১. আদাবুদ দুনিয়া ওয়াদ-দ্বীন: ৮১
১৯২. আল-ইহইয়া: ৩/২২৮
১৯৩. সিফাতুস সাফওয়াহ: ৪/১৬৫

📘 দুনিয়া এক ধূসর মরীচিকা > 📄 সাহাবিদের পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ববোধ

📄 সাহাবিদের পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ববোধ


সালাফের অবস্থা কেমন ছিল, আর আমাদের আজ কেমন দশা!? আমরা দুনিয়া অর্জন করার জন্য কী না করি! দুনিয়ার বস্তু হাতে এলেও তাঁরা কী করতেন দেখুন।
মালিক আদ-দারি রহ. বলেন:
أَنَّ عُمَرَ بْنَ الْخَطَابِ أَخَذَ أَرْبَعَ مِائَةِ دِينَارٍ فَجَعَلَهَا فِي صُرَّةٍ ، ثُمَّ قَالَ لِلْغُلَامِ : اذْهَبْ بِهَا إِلَى أَبِي عُبَيْدَةَ بْنِ الْجَرَّاحِ، ثُمَّ تَلَّهَ سَاعَةً فِي الْبَيْتِ حَتَّى تَنْظُرَ مَا يَصْنَعُ، فَذَهَبَ الْغُلَامُ، فَقَالَ : يَقُولُ لَكَ أَمِيرُ الْمُؤْمِنِينَ : اجْعَلْ هَذِهِ فِي بَعْضِ حَوَائِجِكَ، فَقَالَ : وَصَلَهُ اللَّهُ وَرَحِمَهُ ثُمَّ قَالَ : تَعَالَيْ يَا جَارِيَةُ ، اذْهَبِي بِهَذِهِ السَّبْعَةِ إِلَى فُلَانٍ، وَبِهَذِهِ الْخَمْسَةِ إِلَى فُلَانٍ، وَبِهَذِهِ الْخَمْسَةِ إِلَى فُلَانٍ، وَبِهَذِهِ الْخَمْسَةِ إِلَى فُلَانٍ، حَتَّى أَنْفَدَهَا، فَرَجَعَ الْغُلَامُ إِلَى عُمَرَ، فَأَخْبَرَهُ، فَوَجَدَهُ قَدْ أَعَدَّ مِثْلَهَا لِمُعَاذِ بْنِ جَبَلٍ ، فَقَالَ : اذْهَبْ بِهَا إِلَى مُعَاذِ بْنِ جَبَلٍ، وَتَلَّهَ فِي الْبَيْتِ سَاعَةً، حَتَّى تَنْظُرَ إِلَى مَا يَصْنَعُ، فَذَهَبَ بِهَا إِلَيْهِ، فَقَالَ : يَقُولُ لَكَ أَمِيرُ الْمُؤْمِنِينَ : اجْعَلْ هَذَا فِي حَاجَتِكَ، فَقَالَ : رحِمَهُ وَوَصَلَهُ، تَعَالَيْ يَا جَارِيَةُ، اذْهَبِي إِلَى بَيْتِ فُلَانٍ بِكَذَا، وَ اذْهَبِي إِلَى بَيْتِ فُلَانٍ بِكَذَا، فَاطَّلَعَتِ امْرَأَتُهُ، فَقَالَتْ : وَنَحْنُ وَاللَّهِ مَسَاكِينُ، فَأَعْطِنَا، وَلَمْ يَبْقَ فِي الْخِرْقَةِ إِلَّا دِينَارَانِ، فَدَحَا بِهِمَا إِلَيْهَا، فَرَجَعَ الْغُلَامُ إِلَى عُمَرَ فَأَخْبَرَهُ بِذَلِكَ، فَقَالَ : إِنَّهُمْ إِخْوَةٌ بَعْضُهُمْ مِنْ بَعْضٍ
'একদিন উমর রা. চারশ স্বর্ণমুদ্রা একটি থলেতে পুরে তাঁর গোলামকে বললেন, "এগুলো আবু উবাইদার কাছে নিয়ে যাও। সেখানে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে তিনি এগুলো কী করেন, একটু দেখে এসো।” গোলামটি আবু উবাইদার নিকট গিয়ে বলল, "আমিরুল মুমিনিন আপনাকে এগুলো আপনার প্রয়োজনে খরচ করার জন্য পাঠিয়েছেন।” তখন তিনি বললেন, “আল্লাহ তাঁকে করুণায় সিক্ত করুন—তাঁর ওপর স্বীয় অনুগ্রহ বর্ষণ করুন।” অতঃপর তিনি দাসীকে ডাক দিলেন, “ওহে, এদিকে এসো। এখান থেকে সাতটি অমুককে, পাঁচটি অমুককে, এ পাঁচটি অমুককে, আর এ পাঁচটি অমুককে দিয়ে আসো।” এভাবে তিনি সবকিছুই বণ্টন করে দিলেন। নিজের জন্য কিছুই রাখলেন না। গোলাম ফিরে এসে উমর রা.-কে এ ঘটনা জানালেন। ততক্ষণে একই পরিমাণ স্বর্ণমুদ্রার আরেকটি পুঁটলি তিনি প্রস্তুত করে রেখেছিলেন মুআজ বিন জাবাল রা.-এর জন্য। গোলামের হাতে দিয়ে বললেন, "এগুলো নিয়ে মুআজের নিকট যাও। তিনি কী করেন, তা দেখে এসো।" গোলাম যথারীতি তা মুআজ রা.-এর হাতে দিয়ে বললেন, "আমিরুল মুমিনিন এগুলো আপনার প্রয়োজনে খরচ করার জন্য পাঠিয়েছেন।" তিনি বললেন, "আল্লাহ তাঁকে নিজ দয়ায় ও অনুগ্রহে সিক্ত করুন।" তারপর দাসীকে ডেকে বললেন, “ওহে, এদিকে আসো। অমুকের ঘরে এ পরিমাণ দিয়ে আসো, অমুকের ঘরে কিছু দিয়ে আসো।"... এদিকে তার স্ত্রী জানতে পেরে বললেন, “আল্লাহর কসম, আমরাও তো মিসকিন, আমাদের জন্য কিছু অন্তত রাখুন!” ততক্ষণে থলের মধ্যে অবশিষ্ট ছিল মাত্র দুটি দিনার। সেগুলো তিনি তাঁর স্ত্রীর দিকে ছুঁড়ে মারলেন। গোলামটি উমর রা.-এর কাছে গিয়ে ঘটনার বিবরণ শোনালে তিনি বললেন, “তাঁরা একে অপরের ভাই।”
দুনিয়া পরিত্যাগ করার ফলস্বরূপ অন্য কোনো পুরস্কার যদি নাও পাওয়া যায়, অন্তত মৃত্যুর সময় যে প্রশান্তি লাভ হয় এবং মৃত্যুপরবর্তী সময়ের জন্য যে প্রস্তুতি নেওয়া হয়; তা-ই দুনিয়াত্যাগের পুরস্কারস্বরূপ যথেষ্ট ছিল। কোনো এক দুনিয়াবিমুখ সালাফকে বলা হলো, 'আপনি কি আমাকে কিছু অসিয়ত করবেন না?'
তিনি বললেন, 'কীসের অসিয়ত করব আমি? আমার নিজের কাছে যে কিছু নেই, অন্যের নিকটও আমার কোনো পাওনা নেই এবং আমার কাছেও অন্য কারোর কোনো পাওনা নেই।'... হে ভাই, লক্ষ করো, এ আল্লাহপ্রেমিকের মাঝে থাকা শান্তির প্রতি। কীভাবে তিনি এ আত্মপ্রশান্তি অর্জন করলেন? কীভাবে তিনি লাভ করলেন এ মুক্ততা? এ জুহদ, এ দুনিয়াবিমুখতাই তার শান্তি ও মুক্তির কারণ। ১৯৪
মুহাম্মাদ বিন সুকাহ রহ. বলেন:
'আমরা এমন দুটি কাজ করি, যদিও অনেক সময় আল্লাহ তাআলা দয়া করে আজাব দেন না, তবুও তা করে আমরা আজাবের উপযুক্ত হয়ে পড়ি। কাজদুটি হলো:
১. পার্থিব কোনো বিষয় বৃদ্ধি পেলে আমরা যতটা খুশি হই, দ্বীনি উন্নতিতে ততটা খুশি কখনো হই না।
২. পার্থিব কোনো ক্ষতি হলে কতই না চিন্তিত হয়ে পড়ি আমরা, অথচ দ্বীনি কোনো ক্ষতিতে এতটা চিন্তিত হই না।'১৯৫
আব্দুল্লাহ বিন খুবাইক রহ. বলেন :
'কেবল এমন বিষয়ের ক্ষেত্রে পেরেশান হবে, যা তোমার আখিরাতের জন্য ক্ষতিকর। আর এমন কোনো বিষয়ে আনন্দিত হবে না, যা তোমার আখিরাতে তোমার জন্য উপকারী হবে না। সবচেয়ে উপকারী ভয় হলো, যে ভয় তোমাকে গুনাহ থেকে বাধা প্রদান করে, যে ভয় আমল হাতছাড়া হয়ে গেলে তোমাকে পেরেশান হতে বাধ্য করে এবং ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে ভবিষ্যৎ জীবন নিয়ে।'
দুনিয়ার পানিতে ডুব দেওয়া ও তার মসৃণ নিম্ন ভূমিতে সফর করা খুবই সহজ। কিন্তু এ যে এক বিপজ্জনক চোরাবালি। এখান থেকে বের হওয়া অত্যন্ত কঠিন। মৃত্যুযন্ত্রণা দুনিয়ার হাসি-আনন্দকে নিঃশেষ করতে করতে এগিয়ে আসছে! আর মৃত্যুর পরের যন্ত্রণার তুলনায় মৃত্যুযন্ত্রণাও যে তুচ্ছ! কিন্তু কোথায় আমাদের সতর্কতা!?
হাসান রা. বলেন:
'আল্লাহ তাআলা ইবাদতের নির্দেশ দেন—আবার ইবাদত করতে বান্দাকে সাহায্যও করেন। আর গুনাহ করতে নিষেধ করেন—আবার গুনাহমুক্ত থাকতে সাহায্যও তিনি করেন। তাই জাহান্নামের আগুন যতটুকু সহ্য করতে পারবে বলে মনে হয়, ততটুকু গুনাহ করো। কিন্তু যখন তোমাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে, এরপর তোমার আর কিছুই করার থাকবে না।'১৯৬

টিকাঃ
১৯৪. আদাবুদ দুনিয়া ওয়াদ-দ্বীন: ১২০
১৯৫. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৫/৪
১৯৬. আজ-জাহরুল ফায়িহ: ৯৫

সালাফের অবস্থা কেমন ছিল, আর আমাদের আজ কেমন দশা!? আমরা দুনিয়া অর্জন করার জন্য কী না করি! দুনিয়ার বস্তু হাতে এলেও তাঁরা কী করতেন দেখুন।
মালিক আদ-দারি রহ. বলেন:
أَنَّ عُمَرَ بْنَ الْخَطَابِ أَخَذَ أَرْبَعَ مِائَةِ دِينَارٍ فَجَعَلَهَا فِي صُرَّةٍ ، ثُمَّ قَالَ لِلْغُلَامِ : اذْهَبْ بِهَا إِلَى أَبِي عُبَيْدَةَ بْنِ الْجَرَّاحِ، ثُمَّ تَلَّهَ سَاعَةً فِي الْبَيْتِ حَتَّى تَنْظُرَ مَا يَصْنَعُ، فَذَهَبَ الْغُلَامُ، فَقَالَ : يَقُولُ لَكَ أَمِيرُ الْمُؤْمِنِينَ : اجْعَلْ هَذِهِ فِي بَعْضِ حَوَائِجِكَ، فَقَالَ : وَصَلَهُ اللَّهُ وَرَحِمَهُ ثُمَّ قَالَ : تَعَالَيْ يَا جَارِيَةُ ، اذْهَبِي بِهَذِهِ السَّبْعَةِ إِلَى فُلَانٍ، وَبِهَذِهِ الْخَمْسَةِ إِلَى فُلَانٍ، وَبِهَذِهِ الْخَمْسَةِ إِلَى فُلَانٍ، وَبِهَذِهِ الْخَمْسَةِ إِلَى فُلَانٍ، حَتَّى أَنْفَدَهَا، فَرَجَعَ الْغُلَامُ إِلَى عُمَرَ، فَأَخْبَرَهُ، فَوَجَدَهُ قَدْ أَعَدَّ مِثْلَهَا لِمُعَاذِ بْنِ جَبَلٍ ، فَقَالَ : اذْهَبْ بِهَا إِلَى مُعَاذِ بْنِ جَبَلٍ، وَتَلَّهَ فِي الْبَيْتِ سَاعَةً، حَتَّى تَنْظُرَ إِلَى مَا يَصْنَعُ، فَذَهَبَ بِهَا إِلَيْهِ، فَقَالَ : يَقُولُ لَكَ أَمِيرُ الْمُؤْمِنِينَ : اجْعَلْ هَذَا فِي حَاجَتِكَ، فَقَالَ : رحِمَهُ وَوَصَلَهُ، تَعَالَيْ يَا جَارِيَةُ، اذْهَبِي إِلَى بَيْتِ فُلَانٍ بِكَذَا، وَ اذْهَبِي إِلَى بَيْتِ فُلَانٍ بِكَذَا، فَاطَّلَعَتِ امْرَأَتُهُ، فَقَالَتْ : وَنَحْنُ وَاللَّهِ مَسَاكِينُ، فَأَعْطِنَا، وَلَمْ يَبْقَ فِي الْخِرْقَةِ إِلَّا دِينَارَانِ، فَدَحَا بِهِمَا إِلَيْهَا، فَرَجَعَ الْغُلَامُ إِلَى عُمَرَ فَأَخْبَرَهُ بِذَلِكَ، فَقَالَ : إِنَّهُمْ إِخْوَةٌ بَعْضُهُمْ مِنْ بَعْضٍ
'একদিন উমর রা. চারশ স্বর্ণমুদ্রা একটি থলেতে পুরে তাঁর গোলামকে বললেন, "এগুলো আবু উবাইদার কাছে নিয়ে যাও। সেখানে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে তিনি এগুলো কী করেন, একটু দেখে এসো।” গোলামটি আবু উবাইদার নিকট গিয়ে বলল, "আমিরুল মুমিনিন আপনাকে এগুলো আপনার প্রয়োজনে খরচ করার জন্য পাঠিয়েছেন।” তখন তিনি বললেন, “আল্লাহ তাঁকে করুণায় সিক্ত করুন—তাঁর ওপর স্বীয় অনুগ্রহ বর্ষণ করুন।” অতঃপর তিনি দাসীকে ডাক দিলেন, “ওহে, এদিকে এসো। এখান থেকে সাতটি অমুককে, পাঁচটি অমুককে, এ পাঁচটি অমুককে, আর এ পাঁচটি অমুককে দিয়ে আসো।” এভাবে তিনি সবকিছুই বণ্টন করে দিলেন। নিজের জন্য কিছুই রাখলেন না। গোলাম ফিরে এসে উমর রা.-কে এ ঘটনা জানালেন। ততক্ষণে একই পরিমাণ স্বর্ণমুদ্রার আরেকটি পুঁটলি তিনি প্রস্তুত করে রেখেছিলেন মুআজ বিন জাবাল রা.-এর জন্য। গোলামের হাতে দিয়ে বললেন, "এগুলো নিয়ে মুআজের নিকট যাও। তিনি কী করেন, তা দেখে এসো।" গোলাম যথারীতি তা মুআজ রা.-এর হাতে দিয়ে বললেন, "আমিরুল মুমিনিন এগুলো আপনার প্রয়োজনে খরচ করার জন্য পাঠিয়েছেন।" তিনি বললেন, "আল্লাহ তাঁকে নিজ দয়ায় ও অনুগ্রহে সিক্ত করুন।" তারপর দাসীকে ডেকে বললেন, “ওহে, এদিকে আসো। অমুকের ঘরে এ পরিমাণ দিয়ে আসো, অমুকের ঘরে কিছু দিয়ে আসো।"... এদিকে তার স্ত্রী জানতে পেরে বললেন, “আল্লাহর কসম, আমরাও তো মিসকিন, আমাদের জন্য কিছু অন্তত রাখুন!” ততক্ষণে থলের মধ্যে অবশিষ্ট ছিল মাত্র দুটি দিনার। সেগুলো তিনি তাঁর স্ত্রীর দিকে ছুঁড়ে মারলেন। গোলামটি উমর রা.-এর কাছে গিয়ে ঘটনার বিবরণ শোনালে তিনি বললেন, “তাঁরা একে অপরের ভাই।”
দুনিয়া পরিত্যাগ করার ফলস্বরূপ অন্য কোনো পুরস্কার যদি নাও পাওয়া যায়, অন্তত মৃত্যুর সময় যে প্রশান্তি লাভ হয় এবং মৃত্যুপরবর্তী সময়ের জন্য যে প্রস্তুতি নেওয়া হয়; তা-ই দুনিয়াত্যাগের পুরস্কারস্বরূপ যথেষ্ট ছিল। কোনো এক দুনিয়াবিমুখ সালাফকে বলা হলো, 'আপনি কি আমাকে কিছু অসিয়ত করবেন না?'
তিনি বললেন, 'কীসের অসিয়ত করব আমি? আমার নিজের কাছে যে কিছু নেই, অন্যের নিকটও আমার কোনো পাওনা নেই এবং আমার কাছেও অন্য কারোর কোনো পাওনা নেই।'... হে ভাই, লক্ষ করো, এ আল্লাহপ্রেমিকের মাঝে থাকা শান্তির প্রতি। কীভাবে তিনি এ আত্মপ্রশান্তি অর্জন করলেন? কীভাবে তিনি লাভ করলেন এ মুক্ততা? এ জুহদ, এ দুনিয়াবিমুখতাই তার শান্তি ও মুক্তির কারণ। ১৯৪
মুহাম্মাদ বিন সুকাহ রহ. বলেন:
'আমরা এমন দুটি কাজ করি, যদিও অনেক সময় আল্লাহ তাআলা দয়া করে আজাব দেন না, তবুও তা করে আমরা আজাবের উপযুক্ত হয়ে পড়ি। কাজদুটি হলো:
১. পার্থিব কোনো বিষয় বৃদ্ধি পেলে আমরা যতটা খুশি হই, দ্বীনি উন্নতিতে ততটা খুশি কখনো হই না।
২. পার্থিব কোনো ক্ষতি হলে কতই না চিন্তিত হয়ে পড়ি আমরা, অথচ দ্বীনি কোনো ক্ষতিতে এতটা চিন্তিত হই না।'১৯৫
আব্দুল্লাহ বিন খুবাইক রহ. বলেন :
'কেবল এমন বিষয়ের ক্ষেত্রে পেরেশান হবে, যা তোমার আখিরাতের জন্য ক্ষতিকর। আর এমন কোনো বিষয়ে আনন্দিত হবে না, যা তোমার আখিরাতে তোমার জন্য উপকারী হবে না। সবচেয়ে উপকারী ভয় হলো, যে ভয় তোমাকে গুনাহ থেকে বাধা প্রদান করে, যে ভয় আমল হাতছাড়া হয়ে গেলে তোমাকে পেরেশান হতে বাধ্য করে এবং ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে ভবিষ্যৎ জীবন নিয়ে।'
দুনিয়ার পানিতে ডুব দেওয়া ও তার মসৃণ নিম্ন ভূমিতে সফর করা খুবই সহজ। কিন্তু এ যে এক বিপজ্জনক চোরাবালি। এখান থেকে বের হওয়া অত্যন্ত কঠিন। মৃত্যুযন্ত্রণা দুনিয়ার হাসি-আনন্দকে নিঃশেষ করতে করতে এগিয়ে আসছে! আর মৃত্যুর পরের যন্ত্রণার তুলনায় মৃত্যুযন্ত্রণাও যে তুচ্ছ! কিন্তু কোথায় আমাদের সতর্কতা!?
হাসান রা. বলেন:
'আল্লাহ তাআলা ইবাদতের নির্দেশ দেন—আবার ইবাদত করতে বান্দাকে সাহায্যও করেন। আর গুনাহ করতে নিষেধ করেন—আবার গুনাহমুক্ত থাকতে সাহায্যও তিনি করেন। তাই জাহান্নামের আগুন যতটুকু সহ্য করতে পারবে বলে মনে হয়, ততটুকু গুনাহ করো। কিন্তু যখন তোমাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে, এরপর তোমার আর কিছুই করার থাকবে না।'১৯৬

টিকাঃ
১৯৪. আদাবুদ দুনিয়া ওয়াদ-দ্বীন: ১২০
১৯৫. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৫/৪
১৯৬. আজ-জাহরুল ফায়িহ: ৯৫

📘 দুনিয়া এক ধূসর মরীচিকা > 📄 কিয়ামতের দিন সবচেয়ে বেশি আফসোস কার হবে?

📄 কিয়ামতের দিন সবচেয়ে বেশি আফসোস কার হবে?


আত-তাইমি রহ. বলেন:
'দুটি জিনিস আমাকে দুনিয়ার আনন্দ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। এক. মৃত্যুর স্মরণ। দুই. আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর ভয়।'১৯৭
কিয়ামতের দিন সবচেয়ে বেশি আফসোস কার হবে?
সুফইয়ান সাওরি রহ. বলেন:
'কিয়ামতের দিন সবচেয়ে বেশি আফসোস করবে তিন ব্যক্তি :
১. এক শ্রেণির মনিব, যার একটা গোলাম ছিল। ওই গোলাম তার চেয়েও উত্তম আমল নিয়ে কিয়ামতের দিন উপস্থিত হয়েছে। এ মনিবের তখন আফসোস হবে।
২. এক শ্রেণির সম্পদশালী ব্যক্তি, যে সম্পদ থেকে সদাকা করেনি। একসময় সে মৃত্যুবরণ করেছে। পরে অন্যরা উত্তরাধিকার সূত্রে তার সম্পদের মালিক হয়ে তা থেকে সদাকা করেছে। এ সম্পদশালী ব্যক্তি সেদিন আফসোস করবে।
৩. এক শ্রেণির আলিম, যার ইলম ছিল কিন্তু ইলম দ্বারা সে নিজে উপকৃত হননি, ইলম অনুযায়ী আমল করেননি। কিন্তু তার থেকে ইলম শিক্ষা করে অন্যরা তা থেকে উপকৃত হয়েছে এবং তদনুযায়ী আমল করেছে। এ আলিম সেদিন আফসোস করবেন।'
প্রিয় ভাই,
দুনিয়া আমাদের দিকে কষ্টের তির নিক্ষেপ করছে। এখানে আমরা খুবই দুর্বল ও অসহায় হয়ে আছি—এ চিন্তায় বিভোর হয়ো না। ধৈর্যধারণ করো। অচিরেই আল্লাহ আমাদের ওপর দয়া করবেন। তিনি দয়াময় প্রভু। পরম ক্ষমাকারী, করুণাময়।
কথিত আছে, শিবলি রহ.-কে কেউ স্বপ্নে দেখে জিজ্ঞেস করল, 'আল্লাহ আপনার সঙ্গে কেমন আচরণ করেছেন?'
তিনি উত্তর দিলেন:
'হিসাব-নিকাশ করে আমাকে একেবারে হতাশ করে দিয়েছিলেন তিনি। যখন আমার হতাশা ও অসহায় ভাব দেখতে পেলেন, তখন রহমতের চাদরে আমাকে জড়িয়ে নিলেন। '১৯৮
ইয়াহইয়া বিন মুআজ রহ. বলেন:
'যদি আমাকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়, তাহলে আল্লাহ তাআলা দয়ালু। আর যদি আজাব দেওয়া হয়, তাহলে তিনি ন্যায়পরায়ণ। '১৯৯
পরিশেষে আল্লাহর নিকট কায়মনোবাক্যে আমরা প্রার্থনা করছি, আল্লাহ তাআলা যেন এই দুনিয়াতে আমাদের এমন পথের ওপর অটল রাখেন, যে পথ জান্নাতে গিয়ে মিশেছে। তিনি যেন আমাদের সেসব লোকের অন্তর্ভুক্ত করেন, যারা ক্ষণস্থায়ী এই দুনিয়া থেকে চিরস্থায়ী জান্নাতের জন্য পাথেয় সংগ্রহ করেছেন।
আল্লাহ তাআলা আমাদের, আমাদের পিতা-মাতা ও আত্মীয়-স্বজনদের তাঁর চিরস্থায়ী রহমতের ছায়াতলে একত্রিত করুন। আমাদের অন্তর্ভুক্ত করুন তাদের দলে, যাদের কোনো ভয় নেই, নেই কোনো উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা।
وصلى الله على نبينا محمد وآله وصحبه وسلم

টিকাঃ
১৯৭. আল-আকিবাহ: ৩৯
১৯৮. আজ-জাহরুল ফায়িহ: ৪১
১৯৯. সিফাতুস সাফওয়াহ: ৪/৯৬

আত-তাইমি রহ. বলেন:
'দুটি জিনিস আমাকে দুনিয়ার আনন্দ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। এক. মৃত্যুর স্মরণ। দুই. আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর ভয়।'১৯৭
কিয়ামতের দিন সবচেয়ে বেশি আফসোস কার হবে?
সুফইয়ান সাওরি রহ. বলেন:
'কিয়ামতের দিন সবচেয়ে বেশি আফসোস করবে তিন ব্যক্তি :
১. এক শ্রেণির মনিব, যার একটা গোলাম ছিল। ওই গোলাম তার চেয়েও উত্তম আমল নিয়ে কিয়ামতের দিন উপস্থিত হয়েছে। এ মনিবের তখন আফসোস হবে।
২. এক শ্রেণির সম্পদশালী ব্যক্তি, যে সম্পদ থেকে সদাকা করেনি। একসময় সে মৃত্যুবরণ করেছে। পরে অন্যরা উত্তরাধিকার সূত্রে তার সম্পদের মালিক হয়ে তা থেকে সদাকা করেছে। এ সম্পদশালী ব্যক্তি সেদিন আফসোস করবে।
৩. এক শ্রেণির আলিম, যার ইলম ছিল কিন্তু ইলম দ্বারা সে নিজে উপকৃত হননি, ইলম অনুযায়ী আমল করেননি। কিন্তু তার থেকে ইলম শিক্ষা করে অন্যরা তা থেকে উপকৃত হয়েছে এবং তদনুযায়ী আমল করেছে। এ আলিম সেদিন আফসোস করবেন।'
প্রিয় ভাই,
দুনিয়া আমাদের দিকে কষ্টের তির নিক্ষেপ করছে। এখানে আমরা খুবই দুর্বল ও অসহায় হয়ে আছি—এ চিন্তায় বিভোর হয়ো না। ধৈর্যধারণ করো। অচিরেই আল্লাহ আমাদের ওপর দয়া করবেন। তিনি দয়াময় প্রভু। পরম ক্ষমাকারী, করুণাময়।
কথিত আছে, শিবলি রহ.-কে কেউ স্বপ্নে দেখে জিজ্ঞেস করল, 'আল্লাহ আপনার সঙ্গে কেমন আচরণ করেছেন?'
তিনি উত্তর দিলেন:
'হিসাব-নিকাশ করে আমাকে একেবারে হতাশ করে দিয়েছিলেন তিনি। যখন আমার হতাশা ও অসহায় ভাব দেখতে পেলেন, তখন রহমতের চাদরে আমাকে জড়িয়ে নিলেন। '১৯৮
ইয়াহইয়া বিন মুআজ রহ. বলেন:
'যদি আমাকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়, তাহলে আল্লাহ তাআলা দয়ালু। আর যদি আজাব দেওয়া হয়, তাহলে তিনি ন্যায়পরায়ণ। '১৯৯
পরিশেষে আল্লাহর নিকট কায়মনোবাক্যে আমরা প্রার্থনা করছি, আল্লাহ তাআলা যেন এই দুনিয়াতে আমাদের এমন পথের ওপর অটল রাখেন, যে পথ জান্নাতে গিয়ে মিশেছে। তিনি যেন আমাদের সেসব লোকের অন্তর্ভুক্ত করেন, যারা ক্ষণস্থায়ী এই দুনিয়া থেকে চিরস্থায়ী জান্নাতের জন্য পাথেয় সংগ্রহ করেছেন।
আল্লাহ তাআলা আমাদের, আমাদের পিতা-মাতা ও আত্মীয়-স্বজনদের তাঁর চিরস্থায়ী রহমতের ছায়াতলে একত্রিত করুন। আমাদের অন্তর্ভুক্ত করুন তাদের দলে, যাদের কোনো ভয় নেই, নেই কোনো উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা।
وصلى الله على نبينا محمد وآله وصحبه وسلم

টিকাঃ
১৯৭. আল-আকিবাহ: ৩৯
১৯৮. আজ-জাহরুল ফায়িহ: ৪১
১৯৯. সিফাতুস সাফওয়াহ: ৪/৯৬

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00