📄 দুনিয়া তিন দিনের সমষ্টি মাত্র
দুনিয়া মাত্র তিনটা দিনের সমষ্টি।
১. বিগত দিন: যা আর কখনো ফিরে আসবে না।
২. আজকের দিন : যাকে কাজে লাগিয়ে মূল্যায়ন করা আবশ্যক।
৩. আগামী দিন : যা আসবে কিন্তু এ নিশ্চয়তা নেই যে, তুমি থাকবে কি না। সেদিন আসার আগেই হয়তো তুমি ওপারে চলে যাবে দুনিয়া ছেড়ে।
তাই দুনিয়াতে তুমি যে পরিশ্রম বা প্রচেষ্টাই চালাও, তা যেন হয় আখিরাতের জন্য। কেননা, দুনিয়া থেকে তোমার কৃত আমল ছাড়া আখিরাতে আর কিছুই পৌঁছবে না। সুতরাং এখানে অধিক সম্পদ জমা করার চিন্তায় বিভোর হয়ো না। যা তোমার সাথে যাবে না, তার জন্য কেন করবে এত কষ্ট-সাধনা? এমন কিছুর পেছনে পড়ো না। এর চেয়ে বরং আখিরাতের জন্য পাথেয় অর্জনে অধিক মনোযোগী হও। ১৪২
‘একান্ত বাধ্য হলেই তবে দুনিয়া অর্জন করবে। চিন্তা-চেতনায়, ধ্যান-ধারণায় সব সময় আখিরাতের স্মরণ রেখো। আখিরাতের কাজগুলো যেন হয় স্বেচ্ছায় ও স্বপ্রণোদিত হয়ে। তাই দুনিয়াতে জীবনযাপন করো একজন মুসাফিরের ন্যায়। মৃত্যু তোমাকে এমনভাবে নিয়ে যাবে, ওখান থেকে তুমি আর ফিরতে পারবে না।'১৪৩
হাসান রহ. বলেন: 'দুনিয়ার ব্যস্ততা থেকে বেঁচে থাকো। এ দুনিয়া ব্যস্ততায় জর্জরিত। ব্যস্ততার একটা দুয়ার খুললেই উন্মুক্ত হয়ে যাবে আরও দশটা দুয়ার।'১৪৪
আমরা কোনো দুনিয়াদার প্রভাবশালী ও নেতা গোছের মানুষ দেখলেই- যদিও সে বেনামাজি-তাকে খুব সম্মান করি। সভা-সমাবেশে তার জন্য আসন ছেড়ে দিই। কিন্তু এসব দুনিয়াদারের প্রতি হাসান রহ. এর মূল্যায়ন দেখুন-
'তার সামনে একজন দুনিয়াদার প্রভাবশালী ব্যক্তির আলোচনা করা হলো। এরপর তিনি বলেন, (তার আলোচনা এখানে করার কী প্রয়োজন? সে এমন কী হয়ে গেল?) না দুনিয়া তার জন্য বাকি থাকবে, না বাকি থাকবে সে দুনিয়ার জন্য। দুনিয়া থেকে সেও নিরাপদ নয়। একটু সমীহ করবে তো দূরের কথা; দুনিয়া তাকে গণনার মধ্যেও আনে না। জীবন-সময় শেষ হলে কাপড় পেঁচিয়ে দুনিয়া থেকে তাকে বের করে দেওয়া হবে...।'১৪৫
টিকাঃ
১৪২. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ২/১৩৮
১৪৩. আদাবুদ দুনিয়া ওয়াদ-দ্বীন: ১২২
১৪৪. আজ-জুহদ, ইবনুল মুবারক: ১৮৯
১৪৫. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ২/১৪৪
দুনিয়া মাত্র তিনটা দিনের সমষ্টি।
১. বিগত দিন: যা আর কখনো ফিরে আসবে না।
২. আজকের দিন : যাকে কাজে লাগিয়ে মূল্যায়ন করা আবশ্যক।
৩. আগামী দিন : যা আসবে কিন্তু এ নিশ্চয়তা নেই যে, তুমি থাকবে কি না। সেদিন আসার আগেই হয়তো তুমি ওপারে চলে যাবে দুনিয়া ছেড়ে।
তাই দুনিয়াতে তুমি যে পরিশ্রম বা প্রচেষ্টাই চালাও, তা যেন হয় আখিরাতের জন্য। কেননা, দুনিয়া থেকে তোমার কৃত আমল ছাড়া আখিরাতে আর কিছুই পৌঁছবে না। সুতরাং এখানে অধিক সম্পদ জমা করার চিন্তায় বিভোর হয়ো না। যা তোমার সাথে যাবে না, তার জন্য কেন করবে এত কষ্ট-সাধনা? এমন কিছুর পেছনে পড়ো না। এর চেয়ে বরং আখিরাতের জন্য পাথেয় অর্জনে অধিক মনোযোগী হও। ১৪২
‘একান্ত বাধ্য হলেই তবে দুনিয়া অর্জন করবে। চিন্তা-চেতনায়, ধ্যান-ধারণায় সব সময় আখিরাতের স্মরণ রেখো। আখিরাতের কাজগুলো যেন হয় স্বেচ্ছায় ও স্বপ্রণোদিত হয়ে। তাই দুনিয়াতে জীবনযাপন করো একজন মুসাফিরের ন্যায়। মৃত্যু তোমাকে এমনভাবে নিয়ে যাবে, ওখান থেকে তুমি আর ফিরতে পারবে না।'১৪৩
হাসান রহ. বলেন: 'দুনিয়ার ব্যস্ততা থেকে বেঁচে থাকো। এ দুনিয়া ব্যস্ততায় জর্জরিত। ব্যস্ততার একটা দুয়ার খুললেই উন্মুক্ত হয়ে যাবে আরও দশটা দুয়ার।'১৪৪
আমরা কোনো দুনিয়াদার প্রভাবশালী ও নেতা গোছের মানুষ দেখলেই- যদিও সে বেনামাজি-তাকে খুব সম্মান করি। সভা-সমাবেশে তার জন্য আসন ছেড়ে দিই। কিন্তু এসব দুনিয়াদারের প্রতি হাসান রহ. এর মূল্যায়ন দেখুন-
'তার সামনে একজন দুনিয়াদার প্রভাবশালী ব্যক্তির আলোচনা করা হলো। এরপর তিনি বলেন, (তার আলোচনা এখানে করার কী প্রয়োজন? সে এমন কী হয়ে গেল?) না দুনিয়া তার জন্য বাকি থাকবে, না বাকি থাকবে সে দুনিয়ার জন্য। দুনিয়া থেকে সেও নিরাপদ নয়। একটু সমীহ করবে তো দূরের কথা; দুনিয়া তাকে গণনার মধ্যেও আনে না। জীবন-সময় শেষ হলে কাপড় পেঁচিয়ে দুনিয়া থেকে তাকে বের করে দেওয়া হবে...।'১৪৫
টিকাঃ
১৪২. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ২/১৩৮
১৪৩. আদাবুদ দুনিয়া ওয়াদ-দ্বীন: ১২২
১৪৪. আজ-জুহদ, ইবনুল মুবারক: ১৮৯
১৪৫. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ২/১৪৪
📄 কোন চিন্তায় বিভোর হবো আমরা?
ইবনে আব্বাস রা. বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পরে কারও কথায় আমি এতটুকু উপকৃত হইনি, যতটুকু হয়েছি আলি বিন আবি তালিব রা.-এর কথায়। তিনি আমার নিকট চিঠি লিখলেন—
"সালাম নিবেদনের পর, মানুষ এমন জিনিস হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার কারণে দুঃখিত হয়, যা পেলে তার কোনো লাভ হতো না। আর এমন জিনিস পাওয়ার কারণে আনন্দ প্রকাশ করে, যা না পেলেও তার কোনো ক্ষতি হতো না। কিন্তু আপনি তখনই আনন্দিত হবেন, যখন আখিরাতের জন্য উপকারী হবে এমন কোনো বিষয় আপনি অর্জন করবেন। আর তখনই আফসোস করবেন, যখন আখিরাতের কোনো কিছু আপনার হাতছাড়া হয়ে যাবে। পার্থিব কোনো বস্তু অর্জিত হলে বেশি আনন্দিত হবেন না। আপনার সকল চিন্তাভাবনা যেন মৃত্যুপরবর্তী চিরন্তন জীবনের জন্য হয়।”১৪৬
কোন চিন্তায় বিভোর হবো আমরা?
বলা হয়, জীবিত মানুষের চিন্তা পাঁচটিতে সীমাবদ্ধ। এবং এ পাঁচটিতে তাদের চিন্তা সীমাবদ্ধ হওয়া উচিত।
প্রথমত, অতীতের গুনাহসমূহের চিন্তা। কেননা, সে তো গুনাহ করে ফেলেছে। আর আল্লাহ তাআলা গুনাহসমূহ ক্ষমা করেছেন কি না, তা তার জানা নেই। তাই তার উচিত হবে, সব সময় গুনাহসমূহ নিয়ে চিন্তিত থাকা। আল্লাহর কাছে এ অতীত গুনাহ মাফ করে দেওয়ার ক্ষমা চাইতে থাকা।
দ্বিতীয়ত, অনেক ভালো আমল তো সে করেছে, কিন্তু আল্লাহর দরবারে তা কবুল হয়েছে কি না, তা তো আর জানা নেই। তাই আমল কবুল হওয়ার চিন্তায় চিন্তিত থাকা।
তৃতীয়ত, বিগত জীবন যেভাবে হোক কেটে গেছে। এখন সামনের জীবনটা কীভাবে কাটাবে, এ নিয়ে চিন্তিত থাকা।
চতুর্থত, আল্লাহ তাআলা দুটি আবাস সৃষ্টি করেছেন। একটি জান্নাত, আরেকটি জাহান্নام। এ দুটি থেকে তার আবাস কোনটি হবে, তা নিয়ে চিন্তা করা।
পঞ্চমত, আল্লাহ তাআলা তার প্রতি সন্তুষ্ট না অসন্তুষ্ট, এ নিয়ে চিন্তিত থাকা।
এই পাঁচটি বিষয় নিয়ে যে সব সময় চিন্তা করবে, তার মুখ ফুটে হাসি বেরোনো বড় দায়। ১৪৭
ইবরাহিম তাইমি রহ. বলেন:
'সালাফ ও তোমাদের মাঝে কতই না ব্যবধান! দুনিয়া তাদের নিকট আসতে চেয়েছে, কিন্তু তারা এর থেকে পালিয়ে গেছেন। পক্ষান্তরে, দুনিয়া তোমাদের পিঠ দেখিয়ে চলে যাচ্ছে, আর তোমরা তার পেছনেই ছুটছ...।'১৪৮
টিকাঃ
১৪৬. আল-ইকদুল ফারিদ : ৩/৮৪
১৪৭. তাম্বিহুল গাফিলিন: ১/২১৩
১৪৮. সিফাতুস সাফওয়াহ: ৩/৯০, আস-সিয়ার: ৫/৬১
ইবনে আব্বাস রা. বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পরে কারও কথায় আমি এতটুকু উপকৃত হইনি, যতটুকু হয়েছি আলি বিন আবি তালিব রা.-এর কথায়। তিনি আমার নিকট চিঠি লিখলেন—
"সালাম নিবেদনের পর, মানুষ এমন জিনিস হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার কারণে দুঃখিত হয়, যা পেলে তার কোনো লাভ হতো না। আর এমন জিনিস পাওয়ার কারণে আনন্দ প্রকাশ করে, যা না পেলেও তার কোনো ক্ষতি হতো না। কিন্তু আপনি তখনই আনন্দিত হবেন, যখন আখিরাতের জন্য উপকারী হবে এমন কোনো বিষয় আপনি অর্জন করবেন। আর তখনই আফসোস করবেন, যখন আখিরাতের কোনো কিছু আপনার হাতছাড়া হয়ে যাবে। পার্থিব কোনো বস্তু অর্জিত হলে বেশি আনন্দিত হবেন না। আপনার সকল চিন্তাভাবনা যেন মৃত্যুপরবর্তী চিরন্তন জীবনের জন্য হয়।”১৪৬
কোন চিন্তায় বিভোর হবো আমরা?
বলা হয়, জীবিত মানুষের চিন্তা পাঁচটিতে সীমাবদ্ধ। এবং এ পাঁচটিতে তাদের চিন্তা সীমাবদ্ধ হওয়া উচিত।
প্রথমত, অতীতের গুনাহসমূহের চিন্তা। কেননা, সে তো গুনাহ করে ফেলেছে। আর আল্লাহ তাআলা গুনাহসমূহ ক্ষমা করেছেন কি না, তা তার জানা নেই। তাই তার উচিত হবে, সব সময় গুনাহসমূহ নিয়ে চিন্তিত থাকা। আল্লাহর কাছে এ অতীত গুনাহ মাফ করে দেওয়ার ক্ষমা চাইতে থাকা।
দ্বিতীয়ত, অনেক ভালো আমল তো সে করেছে, কিন্তু আল্লাহর দরবারে তা কবুল হয়েছে কি না, তা তো আর জানা নেই। তাই আমল কবুল হওয়ার চিন্তায় চিন্তিত থাকা।
তৃতীয়ত, বিগত জীবন যেভাবে হোক কেটে গেছে। এখন সামনের জীবনটা কীভাবে কাটাবে, এ নিয়ে চিন্তিত থাকা।
চতুর্থত, আল্লাহ তাআলা দুটি আবাস সৃষ্টি করেছেন। একটি জান্নাত, আরেকটি জাহান্নام। এ দুটি থেকে তার আবাস কোনটি হবে, তা নিয়ে চিন্তা করা।
পঞ্চমত, আল্লাহ তাআলা তার প্রতি সন্তুষ্ট না অসন্তুষ্ট, এ নিয়ে চিন্তিত থাকা।
এই পাঁচটি বিষয় নিয়ে যে সব সময় চিন্তা করবে, তার মুখ ফুটে হাসি বেরোনো বড় দায়। ১৪৭
ইবরাহিম তাইমি রহ. বলেন:
'সালাফ ও তোমাদের মাঝে কতই না ব্যবধান! দুনিয়া তাদের নিকট আসতে চেয়েছে, কিন্তু তারা এর থেকে পালিয়ে গেছেন। পক্ষান্তরে, দুনিয়া তোমাদের পিঠ দেখিয়ে চলে যাচ্ছে, আর তোমরা তার পেছনেই ছুটছ...।'১৪৮
টিকাঃ
১৪৬. আল-ইকদুল ফারিদ : ৩/৮৪
১৪৭. তাম্বিহুল গাফিলিন: ১/২১৩
১৪৮. সিফাতুস সাফওয়াহ: ৩/৯০, আস-সিয়ার: ৫/৬১
📄 আবু জার গিফারির হৃদয় জাগানিয়া ভাষণ
আবু জার গিফারি রা. কাবার নিকট দাঁড়িয়ে বলেন:
'হে লোকসকল, আমি জুনদুব আল-গিফারি। তোমরা তোমাদের এ কল্যাণকামী ভাইয়ের নিকটে এসো!' তাঁর এ আহ্বান শুনে লোকেরা সমবেত হলো। অতঃপর তিনি বললেন, 'তোমাদের কেউ যখন কোথাও সফর করার ইচ্ছে করে, তখন এর জন্য প্রয়োজনীয় পাথেয় সংগ্রহ করে নেয় কি না?'
লোকেরা বলল:
'অবশ্যই নেয়।'
তিনি বললেন :
'আখিরাত তো তোমাদের চূড়ান্ত গন্তব্য। তাই আখিরাতের উদ্দেশ্যে তোমাদের এ সফরের জন্য যথার্থ পাথেয় সংগ্রহ করে নাও।'
লোকেরা বলল:
'যথার্থ পাথেয় কোনটি?'
তিনি বললেন :
'তোমরা হজ করো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদির জন্য। রোজা রাখো, যদিও গ্রীষ্মকালের দীর্ঘতম দিন হোক। কবরের ভয়ে রাতের অন্ধকারে দু'রাকআত নামাজ পড়ো। যেকোনো উত্তম কথা বলো। খারাপ কথা না বলে চুপ থাকো। তবেই তোমাদের আখিরাতের জন্য পাথেয় উত্তম হবে। তোমরা নিজেদের সম্পদ থেকে সদাকা দাও, এর মাধ্যমে বিপদ-মুসিবত ও কঠিন অবস্থা থেকে মুক্তি পাবে। দুনিয়াকে তোমরা দুটি কাজের স্থান বানাও :
১. হালাল রিজিক অর্জন করা।
২. আখিরাতের কল্যাণ অন্বেষণ করা।
এ দুটি ছাড়া অন্য বিষয়গুলো তোমাদের কোনো কাজে আসবে না, বরং অন্য বিষয়গুলো ক্ষতিরই কারণ হবে। তোমরা তোমাদের সম্পদকে দুভাগে ভাগ করবে। একভাগ ব্যয় করবে পরিবার-পরিজনের ভরণপোষণে, আরেকভাগ আখিরাতের জন্য পাঠিয়ে দেবে দ্বীনিকাজে ব্যয় করার মাধ্যমে।'
প্রিয় ভাই, সে ব্যক্তির প্রতি লক্ষ করো, দুনিয়াতে যে ছিল অঢেল সম্পদের মালিক। চিন্তা করে দেখো তো, দুনিয়া থেকে যাওয়ার সময় সে কি কিছু সঙ্গে নিয়ে যেতে পেরেছে?
পূর্ববর্তী ও পরবর্তীদের অবস্থার পার্থক্য বর্ণনা করে হাসান বসরি রহ. বলেন:
'আমি এমন লোকদের সান্নিধ্য লাভে ধন্য হয়েছি, যারা পার্থিব কোনো বস্তু অর্জিত হলে খুশি হতেন না। আবার পার্থিব কোনো বস্তু হাতছাড়া হয়ে গেলে সেটা অর্জন করার চেষ্টা করতেন না। দুনিয়াটা তাদের কাছে মাটির চেয়েও তুচ্ছ ছিল। তাদের কেউ কেউ তো পঞ্চাশ-ষাট বছর এভাবে কাটিয়ে দিয়েছিলেন যে, কখনো কোনো কাঁথা বা কম্বল গায়ে জড়াননি। চুলায় হাঁড়ি চড়াননি। শোয়ার সময় মাটি ও তার পিঠের মাঝে কোনো কিছুই ছিল না। সরাসরি মাটিই ছিল তাদের বিছানা। ঘরের কাউকে কোনো দিন খাবার তৈরি করতে তারা বলেননি। ভুলেননি রাতের বেলা নামাজে দাঁড়িয়ে রাত কাটিয়ে দিতে। তারা পায়ে ভর করে দাঁড়াতেন আর নিজ চেহারাকে মাটির সাথে বিছিয়ে দিতেন।
তাদের কপাল বেয়ে প্রবাহিত হতো অশ্রুধারা। আল্লাহর দরবারে নাজাতের দুআ করতে থাকতেন তারা। কোনো ভালো আমল করতে পারলেই তারা আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতেন। দুআ করতেন কবুল হওয়ার জন্য। আর কখনো গুনাহ করে ফেললে খুবই বিষণ্ণ হতেন এবং ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকতেন। কেননা, গুনাহ থেকে বাঁচা ও কৃত গুনাহ থেকে মুক্তি পাওয়ার একমাত্র মাধ্যম হলো মাগফিরাত (আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা)। আল্লাহ তাআলা সেসব পুণ্যবান লোকের ওপর রহম করুন এবং তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হোন। '১৪৯
আমার ভাই, কোথায় আমরা আর কোথায় তাঁরা!? তাদের সাথে কি আমাদের তুলনা চলে!?
আমরা দুনিয়ার মজাদার ও উপভোগ্য বিষয় তালাশ করি। কষ্টকর বিষয়সমূহ থেকে দূরে থাকি। এ যে চরম বেহাল দশা। আমরা এমনই। কিন্তু আবু দারদা রা. কেমন ছিলেন? তিনি বলেন :
'দারিদ্র্য আমাকে আল্লাহর প্রতি বিনম্র হতে শেখায়; তাই আমি দারিদ্র্যকে ভালোবাসি। মৃত্যু আমাকে আল্লাহর প্রতি আকাঙ্ক্ষী হতে শেখায়; আমি তাই মৃত্যুকে ভালোবাসি। রোগ আমার নিকট প্রিয়; কারণ, রোগ আমার গুনাহ মুছে দেয়। '১৫০
দুনিয়া, যদিও এটি তুচ্ছ ও নিকৃষ্ট; তবুও আখিরাতে যাওয়ার পথ তো এটিই। জান্নাত কিংবা জাহান্নাম, এ দুটির কোনো একটিতে প্রবেশের রাস্তা। সুতরাং দুনিয়াতে আমাদের এমন কাজ করতে হবে, যা আমাদের পৌছিয়ে দেবে জান্নাতে।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:
حوسبَ رَجُلٌ مِمَّنْ كَانَ قَبْلَكُمْ، فَلَمْ يُوجَدْ لَهُ مِنَ الْخَيْرِ شَيْءٌ، إِلَّا أَنَّهُ كَانَ يُخَالِطُ النَّاسَ، وَكَانَ مُوسِرًا، فَكَانَ يَأْمُرُ غِلْمَانَهُ أَنْ يَتَجَاوَزُوا عَنِ الْمُعْسِرِ، قَالَ : قَالَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ : نَحْنُ أَحَقُّ بِذَلِكَ مِنْهُ، تَجَاوَزُوا عَنْهُ
'তোমাদের আগের লোকদের মধ্যে এক লোকের হিসাব গ্রহণ করা হয়। তার কোনো ভালো আমল পাওয়া যায়নি। কিন্তু সে মানুষের সাথে লেনদেন করত। সে ছিল সচ্ছল, তাই দরিদ্র লোকদের ক্ষমা করে দেওয়ার জন্য নিজের কর্মচারীদের সে নির্দেশ দিত।' রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'আল্লাহ বললেন, “ক্ষমা করার ব্যাপারে আমি তার চেয়ে অধিক যোগ্য। একে ক্ষমা করে দাও।"'১৫১
ইমাম শাফিয়ি রহ. বলেন : 'তিনটি আমল খুবই কঠিন। ১. সম্পদ কম থাকাবস্থায় দান করা। ২. একাকী নির্জন সময় দ্বীনদারি রক্ষা করা। ৩. কারো প্রতি আশা ও ভয় থাকা সত্ত্বেও তার সামনে সত্য কথা বলা।'১৫২
হাসান বসরি রহ. বলেন : 'কিয়ামতের দিন সবাই ব্যস্ত থাকবে নিজ নিজ চিন্তায়। যে ব্যক্তি কোনো কিছু নিয়ে চিন্তিত থাকে, সে উক্ত বিষয়টিরই নাম নেয়। যার আখিরাত তৈরি হয়নি, তার দুনিয়াও বরবাদ হলো। যে দুনিয়াকে আখিরাতের ওপর অগ্রাধিকার দিয়েছে, তার দুনিয়াও বরবাদ হলো আখিরাতও বরবাদ হলো। '১৫৩
দুনিয়াতে তুমি সফরে আছ। একদিন এ সফরের ইতি ঘটবে। কাফেলা পৌছে যাবে গন্তব্যে। তখন তুমি দেখলে, পাথেয় যে সাথে আনা হয়নি!
অথচ কাফেলার অন্যরা ঠিকই এনেছে! তখন তোমার লজ্জিত-অনুতপ্ত হওয়া ছাড়া কিছুই করার থাকবে না। তাই সময় থাকতে তাকওয়ার পাথেয় অর্জনে মনোযোগ দাও।
ভাই আমার, তাঁরা কোথায় আর আমরা কোথায়!?
হাফস আল-জুফি রহ. বলেন: ‘দাউদ তায়ি রহ. তার মায়ের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে চারশ দিরহাম পেয়েছিলেন। সেগুলো দিয়ে তিনি ত্রিশ বছর জীবন কাটিয়েছেন। যখন তাও ফুরিয়ে গেল, তখন তার ছোট্ট ঘরটির ছাদ ভেঙে বিক্রি করতে শুরু করলেন।’১৫৪
উমর বিন আইয়ুব রহ. বলেন: ‘আবু শা'সা (জাবির বিন জায়িদ) রহ. বলেন, “হে উমর, দুনিয়ার সম্পদ হিসেবে আমার নিকট শুধু একটি গাধা আছে।”’১৫৫
সালাফে সালিহিন দুনিয়ার সম্পদ কম রাখতেন যেন হিসাব সহজ হয়। অথচ, আমরা নিজ জীবনকে শেষ করে ফেলি শুধু সম্পদ বাড়ানোর জন্য। কত আশা আমাদের মনে—আমার এ হবে, আমার সে হবে!
বড়ই আশ্চর্য লাগে! মৃত্যু অনিবার্য সত্য জানার পরেও কী করে মানুষ এতটা আনন্দিত হতে পারে? জাহান্নাম সত্য—এ বিশ্বাস পোষণ করার পরেও কী করে মানুষ হাসতে পারে? দুনিয়া তার অধিবাসীদের সাথে এত ধোঁকাবাজি করে, তারপরও কী করে মানুষ তার মাঝে স্বস্তি অনুভব করে? তাকদির সত্য জানার পরেও কেন মানুষ অহেতুক এত কষ্ট করে? ১৫৬
رَأَيْتُ الدَّهْرَ مُخْتَلِفًا يَدُورُ * فَلَا حُزْنُ يَدُوْمُ وَلَا سُرُورُ وَقَدْ بَنَتِ الْمُلُوكُ بِهِ قُصُورًا * فَلَمْ تَبْقَ الْمُلُوْكُ وَلَا الْقُصُوْرُ
'কত চক্কর লাগিয়েছি আমি ইতিহাসের মোড়ে মোড়ে। কাছ থেকে দেখেছি মানুষের জীবন—না দুঃখ, না আনন্দ কিছুরই স্থায়িত্ব নেই। কত রাজ-রাজড়া তৈরি করেছে কত বিলাসী প্রাসাদ। কিন্তু আজ কোথায় সেই রাজা আর কোথায় সে প্রাসাদ!'১৫৭
দুনিয়াতে আমরা খেল-তামাশার মধ্যেই মত্ত হয়ে আছি। একটি বারও কি আমাদের কানে এসেছে বিলাল রহ.-এর এ কথাটুকু? তিনি বলেন:
'হে মুত্তাকিগণ, নিঃশেষ করার জন্য তোমাদের সৃষ্টি করা হয়নি। তোমাদের স্থানান্তর করা হবে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে। যেভাবে তোমরা এসেছ পিতার পৃষ্ঠ থেকে মায়ের গর্ভে, সেখান থেকে দুনিয়ার বুকে। একইভাবে তোমাদের দুনিয়া থেকে কবরে, কবর থেকে হাশরে, হাশর থেকে চিরস্থায়ী জান্নাত কিংবা জাহান্নামে নিয়ে যাওয়া হবে।'১৫৮
আমাদের জীবনের একেকটি স্তর এরকম। এমনই কয়েকটি স্তর ইতিপূর্বে আমরা অতিক্রম করে এসেছি। পিতার পৃষ্ঠ থেকে মায়ের গর্ভে। মায়ের গর্ভ থেকে দুনিয়ার বুকে। সফরের এ স্তরগুলো আমাদের শেষ হয়েছে। এখন আমরা পরবর্তী স্তরে পৌঁছার অপেক্ষায়। সে স্তরটির নাম কবর। তবে আফসোস! আমরা নিজের জীবনটাই ধ্বংস করে চলছি অলসতা, বিলাসিতা আর আরাম-আয়েশে ডুবে থেকে। অথচ, আমাদের সামনে প্রতীক্ষমাণ কবর ও হাশর! এরপর স্থায়ী একটি অবস্থানে প্রবেশ। সে অবস্থান হয়তো চিরসুখের নীড় জান্নাত, নয়তো চিরশাস্তির গর্ত জাহান্নাম। কী যে ভীষণ বিপদ আমাদের সামনে! অথচ আমরা ডুবে আছি নিশ্চিন্তে গাফিলতির মাঝে।
আবু বকর মাররুজি রহ. বলেন :
'একদিন আমি ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল রহ.-এর সান্নিধ্যে গিয়ে তাঁকে বললাম, “সকাল কেমন হলো?"
তিনি বললেন:
“কেমন হবে তার সকাল? যার প্রতিপালক ফরজ আদায়ের আদেশ দিচ্ছেন। যার নবি সুন্নাতের প্রতি যত্নবান হওয়ার গুরুত্বারোপ করছেন। যার দুই কাঁধের ফেরেশতা বিশুদ্ধ নিয়ত ও সহিহ পদ্ধতিতে আমল করার আহ্বান জানাচ্ছেন... কিন্তু তার নফস প্রবৃত্তির অনুসরণ করতে চাচ্ছে, ইবলিস চাইছে অশ্লীলতায় ডুবাতে, মালাকুল মাওত তার দুয়ারে দাঁড়িয়ে আছে। পরিবার-পরিজন ভরণপোষণ চাইছে। এমন অবস্থায় সকাল কেমন আর হবে?”১৫৯
আবু দামরাহ রহ. সাফওয়ান বিন সুলাইম রহ. সম্পর্কে বলেন: 'আমি সাফওয়ানকে কাছ থেকে দেখেছি। যদি তাকে বলা হতো, আগামীকাল কিয়ামত সংঘটিত হবে। তবুও বৃদ্ধি করার মতো তার কোনো আমল অবশিষ্ট থাকত না।'১৬০
জনৈক সালাফ বলেন: 'যে ব্যক্তি দুনিয়াকে অপছন্দ করার দাবি করে, ততক্ষণ পর্যন্ত সে মিথ্যাবাদী, যতক্ষণ না নিজ দাবিকে সে সত্য প্রমাণ করে। অতঃপর দাবি সত্য প্রমাণিত করলেও সে পাগল।'১৬১
সালাফের এমন উক্তির কারণ হলো, দুনিয়া আখিরাতের শস্যখেত। এখান থেকেই ইবাদত ও নেক আমল করে নিতে হয়। এখন যদি সে দুনিয়া অন্বেষণকারী হয়, তবে তার দুনিয়াকে অপছন্দ করার দাবিটা মিথ্যা প্রমাণিত হয়। আর যদি সে আখিরাত অন্বেষণকারী হয়, তবে যে জায়গাটা আখিরাতের জন্য পাথেয় সংগ্রহ ও আমলের স্থান, সেটাকে অপছন্দ করা পাগলামি নয় কি?
টিকাঃ
১৪৯. আল-ইহইয়া: ৪/২৩৯
১৫০. আজ-জুহদ: ২১৭
১৫১. সহিহুল বুখারি, সহিহু মুসলিম : হাদিস নং ১৫৬১; শব্দ সহিহু মুসলিমের।
১৫২. সিফাতুস সাফওয়াহ : ২/২৫১
১৫৩. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ২/১৪৪
১৫৪. আস-সিয়ার: ৭/৪২৪
১৫৫. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৩/৮৯
১৫৬. আল-ইহইয়া: ৩/২২৪
১৫৭. দিয়ানুল ইমাম আলি: ১০০
১৫৮. আস-সিয়ার: ৫/৯১
১৫৯. মানাকিবুল ইমাম আহমাদ: ৩৫৫
১৬০. তাজকিরাতুল হুফফাজ: ১/১৩৪
১৬১. সাইদুল খাতির: ২১২
আবু জার গিফারি রা. কাবার নিকট দাঁড়িয়ে বলেন:
'হে লোকসকল, আমি জুনদুব আল-গিফারি। তোমরা তোমাদের এ কল্যাণকামী ভাইয়ের নিকটে এসো!' তাঁর এ আহ্বান শুনে লোকেরা সমবেত হলো। অতঃপর তিনি বললেন, 'তোমাদের কেউ যখন কোথাও সফর করার ইচ্ছে করে, তখন এর জন্য প্রয়োজনীয় পাথেয় সংগ্রহ করে নেয় কি না?'
লোকেরা বলল:
'অবশ্যই নেয়।'
তিনি বললেন :
'আখিরাত তো তোমাদের চূড়ান্ত গন্তব্য। তাই আখিরাতের উদ্দেশ্যে তোমাদের এ সফরের জন্য যথার্থ পাথেয় সংগ্রহ করে নাও।'
লোকেরা বলল:
'যথার্থ পাথেয় কোনটি?'
তিনি বললেন :
'তোমরা হজ করো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদির জন্য। রোজা রাখো, যদিও গ্রীষ্মকালের দীর্ঘতম দিন হোক। কবরের ভয়ে রাতের অন্ধকারে দু'রাকআত নামাজ পড়ো। যেকোনো উত্তম কথা বলো। খারাপ কথা না বলে চুপ থাকো। তবেই তোমাদের আখিরাতের জন্য পাথেয় উত্তম হবে। তোমরা নিজেদের সম্পদ থেকে সদাকা দাও, এর মাধ্যমে বিপদ-মুসিবত ও কঠিন অবস্থা থেকে মুক্তি পাবে। দুনিয়াকে তোমরা দুটি কাজের স্থান বানাও :
১. হালাল রিজিক অর্জন করা।
২. আখিরাতের কল্যাণ অন্বেষণ করা।
এ দুটি ছাড়া অন্য বিষয়গুলো তোমাদের কোনো কাজে আসবে না, বরং অন্য বিষয়গুলো ক্ষতিরই কারণ হবে। তোমরা তোমাদের সম্পদকে দুভাগে ভাগ করবে। একভাগ ব্যয় করবে পরিবার-পরিজনের ভরণপোষণে, আরেকভাগ আখিরাতের জন্য পাঠিয়ে দেবে দ্বীনিকাজে ব্যয় করার মাধ্যমে।'
প্রিয় ভাই, সে ব্যক্তির প্রতি লক্ষ করো, দুনিয়াতে যে ছিল অঢেল সম্পদের মালিক। চিন্তা করে দেখো তো, দুনিয়া থেকে যাওয়ার সময় সে কি কিছু সঙ্গে নিয়ে যেতে পেরেছে?
পূর্ববর্তী ও পরবর্তীদের অবস্থার পার্থক্য বর্ণনা করে হাসান বসরি রহ. বলেন:
'আমি এমন লোকদের সান্নিধ্য লাভে ধন্য হয়েছি, যারা পার্থিব কোনো বস্তু অর্জিত হলে খুশি হতেন না। আবার পার্থিব কোনো বস্তু হাতছাড়া হয়ে গেলে সেটা অর্জন করার চেষ্টা করতেন না। দুনিয়াটা তাদের কাছে মাটির চেয়েও তুচ্ছ ছিল। তাদের কেউ কেউ তো পঞ্চাশ-ষাট বছর এভাবে কাটিয়ে দিয়েছিলেন যে, কখনো কোনো কাঁথা বা কম্বল গায়ে জড়াননি। চুলায় হাঁড়ি চড়াননি। শোয়ার সময় মাটি ও তার পিঠের মাঝে কোনো কিছুই ছিল না। সরাসরি মাটিই ছিল তাদের বিছানা। ঘরের কাউকে কোনো দিন খাবার তৈরি করতে তারা বলেননি। ভুলেননি রাতের বেলা নামাজে দাঁড়িয়ে রাত কাটিয়ে দিতে। তারা পায়ে ভর করে দাঁড়াতেন আর নিজ চেহারাকে মাটির সাথে বিছিয়ে দিতেন।
তাদের কপাল বেয়ে প্রবাহিত হতো অশ্রুধারা। আল্লাহর দরবারে নাজাতের দুআ করতে থাকতেন তারা। কোনো ভালো আমল করতে পারলেই তারা আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতেন। দুআ করতেন কবুল হওয়ার জন্য। আর কখনো গুনাহ করে ফেললে খুবই বিষণ্ণ হতেন এবং ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকতেন। কেননা, গুনাহ থেকে বাঁচা ও কৃত গুনাহ থেকে মুক্তি পাওয়ার একমাত্র মাধ্যম হলো মাগফিরাত (আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা)। আল্লাহ তাআলা সেসব পুণ্যবান লোকের ওপর রহম করুন এবং তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হোন। '১৪৯
আমার ভাই, কোথায় আমরা আর কোথায় তাঁরা!? তাদের সাথে কি আমাদের তুলনা চলে!?
আমরা দুনিয়ার মজাদার ও উপভোগ্য বিষয় তালাশ করি। কষ্টকর বিষয়সমূহ থেকে দূরে থাকি। এ যে চরম বেহাল দশা। আমরা এমনই। কিন্তু আবু দারদা রা. কেমন ছিলেন? তিনি বলেন :
'দারিদ্র্য আমাকে আল্লাহর প্রতি বিনম্র হতে শেখায়; তাই আমি দারিদ্র্যকে ভালোবাসি। মৃত্যু আমাকে আল্লাহর প্রতি আকাঙ্ক্ষী হতে শেখায়; আমি তাই মৃত্যুকে ভালোবাসি। রোগ আমার নিকট প্রিয়; কারণ, রোগ আমার গুনাহ মুছে দেয়। '১৫০
দুনিয়া, যদিও এটি তুচ্ছ ও নিকৃষ্ট; তবুও আখিরাতে যাওয়ার পথ তো এটিই। জান্নাত কিংবা জাহান্নাম, এ দুটির কোনো একটিতে প্রবেশের রাস্তা। সুতরাং দুনিয়াতে আমাদের এমন কাজ করতে হবে, যা আমাদের পৌছিয়ে দেবে জান্নাতে।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:
حوسبَ رَجُلٌ مِمَّنْ كَانَ قَبْلَكُمْ، فَلَمْ يُوجَدْ لَهُ مِنَ الْخَيْرِ شَيْءٌ، إِلَّا أَنَّهُ كَانَ يُخَالِطُ النَّاسَ، وَكَانَ مُوسِرًا، فَكَانَ يَأْمُرُ غِلْمَانَهُ أَنْ يَتَجَاوَزُوا عَنِ الْمُعْسِرِ، قَالَ : قَالَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ : نَحْنُ أَحَقُّ بِذَلِكَ مِنْهُ، تَجَاوَزُوا عَنْهُ
'তোমাদের আগের লোকদের মধ্যে এক লোকের হিসাব গ্রহণ করা হয়। তার কোনো ভালো আমল পাওয়া যায়নি। কিন্তু সে মানুষের সাথে লেনদেন করত। সে ছিল সচ্ছল, তাই দরিদ্র লোকদের ক্ষমা করে দেওয়ার জন্য নিজের কর্মচারীদের সে নির্দেশ দিত।' রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'আল্লাহ বললেন, “ক্ষমা করার ব্যাপারে আমি তার চেয়ে অধিক যোগ্য। একে ক্ষমা করে দাও।"'১৫১
ইমাম শাফিয়ি রহ. বলেন : 'তিনটি আমল খুবই কঠিন। ১. সম্পদ কম থাকাবস্থায় দান করা। ২. একাকী নির্জন সময় দ্বীনদারি রক্ষা করা। ৩. কারো প্রতি আশা ও ভয় থাকা সত্ত্বেও তার সামনে সত্য কথা বলা।'১৫২
হাসান বসরি রহ. বলেন : 'কিয়ামতের দিন সবাই ব্যস্ত থাকবে নিজ নিজ চিন্তায়। যে ব্যক্তি কোনো কিছু নিয়ে চিন্তিত থাকে, সে উক্ত বিষয়টিরই নাম নেয়। যার আখিরাত তৈরি হয়নি, তার দুনিয়াও বরবাদ হলো। যে দুনিয়াকে আখিরাতের ওপর অগ্রাধিকার দিয়েছে, তার দুনিয়াও বরবাদ হলো আখিরাতও বরবাদ হলো। '১৫৩
দুনিয়াতে তুমি সফরে আছ। একদিন এ সফরের ইতি ঘটবে। কাফেলা পৌছে যাবে গন্তব্যে। তখন তুমি দেখলে, পাথেয় যে সাথে আনা হয়নি!
অথচ কাফেলার অন্যরা ঠিকই এনেছে! তখন তোমার লজ্জিত-অনুতপ্ত হওয়া ছাড়া কিছুই করার থাকবে না। তাই সময় থাকতে তাকওয়ার পাথেয় অর্জনে মনোযোগ দাও।
ভাই আমার, তাঁরা কোথায় আর আমরা কোথায়!?
হাফস আল-জুফি রহ. বলেন: ‘দাউদ তায়ি রহ. তার মায়ের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে চারশ দিরহাম পেয়েছিলেন। সেগুলো দিয়ে তিনি ত্রিশ বছর জীবন কাটিয়েছেন। যখন তাও ফুরিয়ে গেল, তখন তার ছোট্ট ঘরটির ছাদ ভেঙে বিক্রি করতে শুরু করলেন।’১৫৪
উমর বিন আইয়ুব রহ. বলেন: ‘আবু শা'সা (জাবির বিন জায়িদ) রহ. বলেন, “হে উমর, দুনিয়ার সম্পদ হিসেবে আমার নিকট শুধু একটি গাধা আছে।”’১৫৫
সালাফে সালিহিন দুনিয়ার সম্পদ কম রাখতেন যেন হিসাব সহজ হয়। অথচ, আমরা নিজ জীবনকে শেষ করে ফেলি শুধু সম্পদ বাড়ানোর জন্য। কত আশা আমাদের মনে—আমার এ হবে, আমার সে হবে!
বড়ই আশ্চর্য লাগে! মৃত্যু অনিবার্য সত্য জানার পরেও কী করে মানুষ এতটা আনন্দিত হতে পারে? জাহান্নাম সত্য—এ বিশ্বাস পোষণ করার পরেও কী করে মানুষ হাসতে পারে? দুনিয়া তার অধিবাসীদের সাথে এত ধোঁকাবাজি করে, তারপরও কী করে মানুষ তার মাঝে স্বস্তি অনুভব করে? তাকদির সত্য জানার পরেও কেন মানুষ অহেতুক এত কষ্ট করে? ১৫৬
رَأَيْتُ الدَّهْرَ مُخْتَلِفًا يَدُورُ * فَلَا حُزْنُ يَدُوْمُ وَلَا سُرُورُ وَقَدْ بَنَتِ الْمُلُوكُ بِهِ قُصُورًا * فَلَمْ تَبْقَ الْمُلُوْكُ وَلَا الْقُصُوْرُ
'কত চক্কর লাগিয়েছি আমি ইতিহাসের মোড়ে মোড়ে। কাছ থেকে দেখেছি মানুষের জীবন—না দুঃখ, না আনন্দ কিছুরই স্থায়িত্ব নেই। কত রাজ-রাজড়া তৈরি করেছে কত বিলাসী প্রাসাদ। কিন্তু আজ কোথায় সেই রাজা আর কোথায় সে প্রাসাদ!'১৫৭
দুনিয়াতে আমরা খেল-তামাশার মধ্যেই মত্ত হয়ে আছি। একটি বারও কি আমাদের কানে এসেছে বিলাল রহ.-এর এ কথাটুকু? তিনি বলেন:
'হে মুত্তাকিগণ, নিঃশেষ করার জন্য তোমাদের সৃষ্টি করা হয়নি। তোমাদের স্থানান্তর করা হবে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে। যেভাবে তোমরা এসেছ পিতার পৃষ্ঠ থেকে মায়ের গর্ভে, সেখান থেকে দুনিয়ার বুকে। একইভাবে তোমাদের দুনিয়া থেকে কবরে, কবর থেকে হাশরে, হাশর থেকে চিরস্থায়ী জান্নাত কিংবা জাহান্নামে নিয়ে যাওয়া হবে।'১৫৮
আমাদের জীবনের একেকটি স্তর এরকম। এমনই কয়েকটি স্তর ইতিপূর্বে আমরা অতিক্রম করে এসেছি। পিতার পৃষ্ঠ থেকে মায়ের গর্ভে। মায়ের গর্ভ থেকে দুনিয়ার বুকে। সফরের এ স্তরগুলো আমাদের শেষ হয়েছে। এখন আমরা পরবর্তী স্তরে পৌঁছার অপেক্ষায়। সে স্তরটির নাম কবর। তবে আফসোস! আমরা নিজের জীবনটাই ধ্বংস করে চলছি অলসতা, বিলাসিতা আর আরাম-আয়েশে ডুবে থেকে। অথচ, আমাদের সামনে প্রতীক্ষমাণ কবর ও হাশর! এরপর স্থায়ী একটি অবস্থানে প্রবেশ। সে অবস্থান হয়তো চিরসুখের নীড় জান্নাত, নয়তো চিরশাস্তির গর্ত জাহান্নাম। কী যে ভীষণ বিপদ আমাদের সামনে! অথচ আমরা ডুবে আছি নিশ্চিন্তে গাফিলতির মাঝে।
আবু বকর মাররুজি রহ. বলেন :
'একদিন আমি ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল রহ.-এর সান্নিধ্যে গিয়ে তাঁকে বললাম, “সকাল কেমন হলো?"
তিনি বললেন:
“কেমন হবে তার সকাল? যার প্রতিপালক ফরজ আদায়ের আদেশ দিচ্ছেন। যার নবি সুন্নাতের প্রতি যত্নবান হওয়ার গুরুত্বারোপ করছেন। যার দুই কাঁধের ফেরেশতা বিশুদ্ধ নিয়ত ও সহিহ পদ্ধতিতে আমল করার আহ্বান জানাচ্ছেন... কিন্তু তার নফস প্রবৃত্তির অনুসরণ করতে চাচ্ছে, ইবলিস চাইছে অশ্লীলতায় ডুবাতে, মালাকুল মাওত তার দুয়ারে দাঁড়িয়ে আছে। পরিবার-পরিজন ভরণপোষণ চাইছে। এমন অবস্থায় সকাল কেমন আর হবে?”১৫৯
আবু দামরাহ রহ. সাফওয়ান বিন সুলাইম রহ. সম্পর্কে বলেন: 'আমি সাফওয়ানকে কাছ থেকে দেখেছি। যদি তাকে বলা হতো, আগামীকাল কিয়ামত সংঘটিত হবে। তবুও বৃদ্ধি করার মতো তার কোনো আমল অবশিষ্ট থাকত না।'১৬০
জনৈক সালাফ বলেন: 'যে ব্যক্তি দুনিয়াকে অপছন্দ করার দাবি করে, ততক্ষণ পর্যন্ত সে মিথ্যাবাদী, যতক্ষণ না নিজ দাবিকে সে সত্য প্রমাণ করে। অতঃপর দাবি সত্য প্রমাণিত করলেও সে পাগল।'১৬১
সালাফের এমন উক্তির কারণ হলো, দুনিয়া আখিরাতের শস্যখেত। এখান থেকেই ইবাদত ও নেক আমল করে নিতে হয়। এখন যদি সে দুনিয়া অন্বেষণকারী হয়, তবে তার দুনিয়াকে অপছন্দ করার দাবিটা মিথ্যা প্রমাণিত হয়। আর যদি সে আখিরাত অন্বেষণকারী হয়, তবে যে জায়গাটা আখিরাতের জন্য পাথেয় সংগ্রহ ও আমলের স্থান, সেটাকে অপছন্দ করা পাগলামি নয় কি?
টিকাঃ
১৪৯. আল-ইহইয়া: ৪/২৩৯
১৫০. আজ-জুহদ: ২১৭
১৫১. সহিহুল বুখারি, সহিহু মুসলিম : হাদিস নং ১৫৬১; শব্দ সহিহু মুসলিমের।
১৫২. সিফাতুস সাফওয়াহ : ২/২৫১
১৫৩. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ২/১৪৪
১৫৪. আস-সিয়ার: ৭/৪২৪
১৫৫. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৩/৮৯
১৫৬. আল-ইহইয়া: ৩/২২৪
১৫৭. দিয়ানুল ইমাম আলি: ১০০
১৫৮. আস-সিয়ার: ৫/৯১
১৫৯. মানাকিবুল ইমাম আহমাদ: ৩৫৫
১৬০. তাজকিরাতুল হুফফাজ: ১/১৩৪
১৬১. সাইদুল খাতির: ২১২
📄 মুমিনের চিন্তাভাবনা
'মুমিনমাত্রই সকল চিন্তাভাবনা হবে আখিরাতের জীবন নিয়ে। আখিরাতকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হবে তার সকল কর্ম। এমন হলেই তবে মুমিনের দুনিয়ার বিষয়গুলো তাকে স্মরণ করিয়ে দেবে আখিরাতের কথা। যে ব্যক্তি যে কাজ করে, সর্বত্র সেই কাজের চিন্তাই তার মাথায় ঘুরপাক খায়।
উদাহরণস্বরূপ, কোনো ঘরে যদি একজন কাপড়-ব্যবসায়ী প্রবেশ করে, প্রথমেই তার নজর যাবে ঘরের বিছানাপত্রে। কত দামে এগুলো কেনা হলো? এগুলোর মান কেমন?-এসব বিষয়েই সে প্রশ্ন করবে। এভাবে সেখানে কাঠমিস্ত্রি প্রবেশ করলে তার নজর যাবে ঘরের ছাদে। রাজমিস্ত্রি লক্ষ করবে দেয়ালের দিকে। আর তাঁতি দৃষ্টিপাত করবে ঘরের বিভিন্ন সুতি কাপড়চোপড়ের দিকে। একইভাবে মুমিন যখন কোনো অন্ধকার দেখে, তখন তার মনে পড়ে যায় কবরের অন্ধকারের কথা। দুর্দশাগ্রস্ত কাউকে দেখলে মনে পড়ে আখিরাতের শান্তির কথা। কর্কশ কোনো শব্দ শুনলে শিঙায় ফুৎকারের কথা চিন্তা করে। কাউকে ঘুমোতে দেখলে মনে পড়ে কবরের মৃত ব্যক্তিদের বিষয়। সুন্দর-মজাদার কিছু দেখলে জান্নাতের নিয়ামত সম্পর্কে ভাবে। মোটকথা, যে যেটা নিয়ে ব্যস্ত, সব জায়গায় সে উক্ত বিষয়টির চিন্তায় থাকে। মুমিনের ব্যস্ততা যেহেতু আখিরাত নিয়ে, তাই আখিরাতের কথাই তার মনে পড়ে সবখানে।'১৬৬
আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রা. বলেন:
'রাতদিন তোমরা আখিরাতের উদ্দেশে সফরের মধ্যে আছ। হাতে সময় তোমাদের খুবই কম আর তোমরা যে আমল করছ, তার পরিমাণও বেশি নয়। যেকোনো মুহূর্তে সহসা মৃত্যু তোমাদের নিকট এসে যেতে পারে। দুনিয়াতে যে ভালো আমলের চাষ করবে, আখিরাতে সে ভালো ফসল (প্রতিদান) পাবে। আর যে খারাপ আমলের চাষ করবে, আখিরাতে সে ফসল হিসেবে লজ্জাই পাবে। কারণ, চাষী যা চাষ করে, সে ফসলই সে পায়।
অলস-অকর্মণ্য লোক কিছুই অর্জন করতে পারে না। আর লোভী ব্যক্তি শত লোভ করলেও যা তার তাকদিরে নেই, তা কখনোই লাভ করতে পারবে না। (তাই অলস বসে থেকে শুধু শুধু লোভ আর আশা করলে কিছু পাওয়া যাবে না।) যে আল্লাহর জন্য উত্তম আমল করে, আল্লাহ তাকে ভালো প্রতিদান দেন। যে মন্দ কাজ থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করে, আল্লাহ তাকে বিরত থাকার তাওফিক দান করেন। মুত্তাকিগণ সর্দার আর ফকিহগণ নেতা। তাদের সান্নিধ্যে ইমান-আমল বৃদ্ধি পায়।’১৬৭
আলি রা.-কে দুনিয়া সম্পর্কে বর্ণনা করতে বলা হলে তিনি বলেন: 'সংক্ষেপে বলব, না বিস্তারিত?'
লোকেরা বলল: 'সংক্ষেপেই বলুন।'
তখন তিনি বললেন : 'দুনিয়া হলো এমন, যার হালাল ও বৈধ বিষয়সমূহ সম্পর্কে হিসাব নেওয়া হবে। আর হারাম ও অবৈধ বিষয়গুলো সোজা জাহান্নামে নিয়ে ছাড়বে। '১৬৮
সিয়ার আবুল হিকাম বলেন: 'দুনিয়া নিয়ে আনন্দ করা ও আখিরাত নিয়ে চিন্তা করা, এ দুটি কোনো বান্দার অন্তরে একত্রিত হয় না। বান্দা যখন এর একটিকে অন্তরে স্থান দেয়, অন্যটি তখন চলে যায়।'
আবু দারদা রা. তাঁর জাহিলি জীবন ও ইসলামি জীবনের অবস্থার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন: 'জাহিলি যুগে আমি একজন ব্যবসায়ী ছিলাম। যখন ইসলামের আবির্ভাব হলো, ইবাদতের পাশাপাশি আমি ব্যবসা চালিয়ে গেলাম।
কিন্তু দুটিকে একত্র করা আর সম্ভব হলো না। তাই যখন ইবাদত ও ব্যবসার মাঝে সংঘর্ষ বাধল, তখন ইবাদতের প্রতি আমি মনোনিবেশ করে ব্যবসাকে পরিত্যাগ করলাম।'
নিঃসন্দেহে তিনি কামিয়াব। ক্ষণস্থায়ী দুনিয়াকে তিনি কুরবান করে দিয়েছিলেন, আল্লাহর রহমত ও চিরস্থায়ী সম্মানের ঘর জান্নাত লাভের আশায়।
তবে এর অর্থ এটা নয় যে, জীবনোপকরণ অর্জন করা একেবারে বাদ দিয়ে দিতে হবে। বরং এর অর্থ হলো, দুনিয়া অর্জনই যেন একমাত্র ধ্যান-জ্ঞান না হয়। ইসলাম বৈধ জাগতিক কাজকর্মের প্রতি উৎসাহিত করে। তবে এর জন্য শর্ত হলো, নিয়ত বিশুদ্ধ হতে হবে এবং আমানত, ইখলাস-সহ অন্যান্য শর্ত বিদ্যমান থাকতে হবে।
আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রা. বলেন :
'যে দুনিয়া কামনা করে, তার আখিরাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আর যে আখিরাত কামনা করে, তার দুনিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হয়। হে মুসলিম জাতি, চিরস্থায়ী আখিরাতের জন্য ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার ক্ষতিকে বরদাস্ত করো।'
আজ আমাদের ভাবনা ও ব্যস্ততার সবটা জুড়ে আছে দুনিয়া। দুনিয়া নিয়েই আমাদের যত আয়োজন, যত আলোচনা। আমাদের পারস্পরিক ও সামাজিক সম্পর্কের ভিত্তিও এখন দুনিয়া। এর বাস্তব উদাহরণ হলো, আমার এক প্রতিবেশী—যিনি উচ্চপদস্থ একজন কর্মকর্তা। তার ঘরে যখন গানের আসর হয়, তখন দর্শনার্থীদের প্রচুর ভিড় জমে। কিন্তু যেদিন বিরতি থাকে, সেদিন হাতে-গোনা কয়েকজন ছাড়া কেউ তার সাক্ষাতে আসে না। এখানে প্রথম দিন যারা আসে, তারা দুনিয়ার স্বার্থেই আসে। আর বিরতির দিন যারা আসে, তারা আসে দ্বীনের স্বার্থে। সত্যিকারের ভালোবাসার স্বার্থে তারা এ লোকের সাথে সম্পর্ক রাখে; কিন্তু এমন লোকদের সংখ্যা খুব বেশি নয়।
বস্তুত, দুনিয়াপ্রীতি হলো এক ধরনের বস্তুবাদী চেতনা। যা বর্তমানকালের অন্যতম সামাজিক ব্যাধি। মৌখিকভাবে যদিও আমরা অনেকে দুনিয়ার নিন্দা করি, কিন্তু আমাদের কাজকর্মে ঠিকই দুনিয়ার ভালোবাসা প্রকাশ পায়। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাশে ঘেঁষার প্রবণতা অনেকের মধ্যে আছে; অথচ তারা জানতেও পারে না, উপলব্ধি করতে পারে না যে, খানিক আগে তারাই কিন্তু উপদেশ দিয়েছিল দুনিয়াবিমুখতার, এখন সেই তারাই দুনিয়ার ভালোবাসায় দুনিয়া ধরে ঝুলে আছে।
হাসসান বিন আবু সিনান রহ. সম্পর্কে বর্ণিত আছে,
তিনি একটি কক্ষের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বললেন, 'এটা কখন বানানো হয়েছে?' এই প্রশ্নটি করার পরপরই তিনি নিজেকে উদ্দেশ্য করে বললেন, 'কী প্রয়োজন ছিল এ বেহুদা প্রশ্ন করার? দাঁড়াও, এর জন্য তোমার শাস্তি হলো, এক বছরের রোজা।' এরপর তিনি এক বছর রোজা রেখেছেন। আহ! আমাদের সালাফে সালিহিন অতি সাধারণ একটি প্রশ্নের জন্যও কত আফসোস করতেন! আর আমরা কত অনর্থক-অপ্রয়োজনীয় কাজ করে যাচ্ছি প্রতিদিন, প্রতিটি মুহূর্তে! আমরা যদি নিজেদের কল্যাণই চাই, তবে তো হাসসান রহ.-এর মতোই নিজেদের শাস্তি দেওয়া উচিত। তবে এবার তো গুনে দেখতে হবে, এক বছরে এ জন্য কয়টা রোজা রাখতে হবে আমাদের। কিন্তু একটা রোজা রেখেও হয়তো আমরা নিজেদের শাস্তি দেবো না বা দেবার মানসিকতাও কেউ রাখি না। যাহোক, এটা না পারলেও অন্তত অনথর্ক কথা ও কাজ থেকে বিরত থাকার শিক্ষা নিয়ে এগুলোকে আমরা বর্জন করি।
আমরা সালাফে সালিহিনের জীবনীর দিকে লক্ষ করি না। আমাদের দৃষ্টি পড়ে আছে দুনিয়াদারদের দিকে! অথচ, আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
وَلَا تَمُدَّنَّ عَيْنَيْكَ إِلَى مَا مَتَّعْنَا بِهِ أَزْوَاجًا مِنْهُمْ زَهْرَةَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا لِنَفْتِنَهُمْ فِيهِ ﴾
'আমি এদের বিভিন্ন প্রকার লোককে পরীক্ষা করার জন্য পার্থিব জীবনের সৌন্দর্যস্বরূপ ভোগ-বিলাসের যে উপকরণ দিয়েছি, আপনি সেই সব বস্তুর প্রতি ভ্রুক্ষেপ করবেন না। '১৬৯
টিকাঃ
১৬৬. সাইদুল খাতির: ৫২১
১৬৭. আস-সিয়ার: ১/৪৯৭
১৬৮. তাসলিয়াতু আহলিল মাসায়িব: ২৪৩
১৬৯. সুরা তহা: ১৩১
'মুমিনমাত্রই সকল চিন্তাভাবনা হবে আখিরাতের জীবন নিয়ে। আখিরাতকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হবে তার সকল কর্ম। এমন হলেই তবে মুমিনের দুনিয়ার বিষয়গুলো তাকে স্মরণ করিয়ে দেবে আখিরাতের কথা। যে ব্যক্তি যে কাজ করে, সর্বত্র সেই কাজের চিন্তাই তার মাথায় ঘুরপাক খায়।
উদাহরণস্বরূপ, কোনো ঘরে যদি একজন কাপড়-ব্যবসায়ী প্রবেশ করে, প্রথমেই তার নজর যাবে ঘরের বিছানাপত্রে। কত দামে এগুলো কেনা হলো? এগুলোর মান কেমন?-এসব বিষয়েই সে প্রশ্ন করবে। এভাবে সেখানে কাঠমিস্ত্রি প্রবেশ করলে তার নজর যাবে ঘরের ছাদে। রাজমিস্ত্রি লক্ষ করবে দেয়ালের দিকে। আর তাঁতি দৃষ্টিপাত করবে ঘরের বিভিন্ন সুতি কাপড়চোপড়ের দিকে। একইভাবে মুমিন যখন কোনো অন্ধকার দেখে, তখন তার মনে পড়ে যায় কবরের অন্ধকারের কথা। দুর্দশাগ্রস্ত কাউকে দেখলে মনে পড়ে আখিরাতের শান্তির কথা। কর্কশ কোনো শব্দ শুনলে শিঙায় ফুৎকারের কথা চিন্তা করে। কাউকে ঘুমোতে দেখলে মনে পড়ে কবরের মৃত ব্যক্তিদের বিষয়। সুন্দর-মজাদার কিছু দেখলে জান্নাতের নিয়ামত সম্পর্কে ভাবে। মোটকথা, যে যেটা নিয়ে ব্যস্ত, সব জায়গায় সে উক্ত বিষয়টির চিন্তায় থাকে। মুমিনের ব্যস্ততা যেহেতু আখিরাত নিয়ে, তাই আখিরাতের কথাই তার মনে পড়ে সবখানে।'১৬৬
আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রা. বলেন:
'রাতদিন তোমরা আখিরাতের উদ্দেশে সফরের মধ্যে আছ। হাতে সময় তোমাদের খুবই কম আর তোমরা যে আমল করছ, তার পরিমাণও বেশি নয়। যেকোনো মুহূর্তে সহসা মৃত্যু তোমাদের নিকট এসে যেতে পারে। দুনিয়াতে যে ভালো আমলের চাষ করবে, আখিরাতে সে ভালো ফসল (প্রতিদান) পাবে। আর যে খারাপ আমলের চাষ করবে, আখিরাতে সে ফসল হিসেবে লজ্জাই পাবে। কারণ, চাষী যা চাষ করে, সে ফসলই সে পায়।
অলস-অকর্মণ্য লোক কিছুই অর্জন করতে পারে না। আর লোভী ব্যক্তি শত লোভ করলেও যা তার তাকদিরে নেই, তা কখনোই লাভ করতে পারবে না। (তাই অলস বসে থেকে শুধু শুধু লোভ আর আশা করলে কিছু পাওয়া যাবে না।) যে আল্লাহর জন্য উত্তম আমল করে, আল্লাহ তাকে ভালো প্রতিদান দেন। যে মন্দ কাজ থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করে, আল্লাহ তাকে বিরত থাকার তাওফিক দান করেন। মুত্তাকিগণ সর্দার আর ফকিহগণ নেতা। তাদের সান্নিধ্যে ইমান-আমল বৃদ্ধি পায়।’১৬৭
আলি রা.-কে দুনিয়া সম্পর্কে বর্ণনা করতে বলা হলে তিনি বলেন: 'সংক্ষেপে বলব, না বিস্তারিত?'
লোকেরা বলল: 'সংক্ষেপেই বলুন।'
তখন তিনি বললেন : 'দুনিয়া হলো এমন, যার হালাল ও বৈধ বিষয়সমূহ সম্পর্কে হিসাব নেওয়া হবে। আর হারাম ও অবৈধ বিষয়গুলো সোজা জাহান্নামে নিয়ে ছাড়বে। '১৬৮
সিয়ার আবুল হিকাম বলেন: 'দুনিয়া নিয়ে আনন্দ করা ও আখিরাত নিয়ে চিন্তা করা, এ দুটি কোনো বান্দার অন্তরে একত্রিত হয় না। বান্দা যখন এর একটিকে অন্তরে স্থান দেয়, অন্যটি তখন চলে যায়।'
আবু দারদা রা. তাঁর জাহিলি জীবন ও ইসলামি জীবনের অবস্থার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন: 'জাহিলি যুগে আমি একজন ব্যবসায়ী ছিলাম। যখন ইসলামের আবির্ভাব হলো, ইবাদতের পাশাপাশি আমি ব্যবসা চালিয়ে গেলাম।
কিন্তু দুটিকে একত্র করা আর সম্ভব হলো না। তাই যখন ইবাদত ও ব্যবসার মাঝে সংঘর্ষ বাধল, তখন ইবাদতের প্রতি আমি মনোনিবেশ করে ব্যবসাকে পরিত্যাগ করলাম।'
নিঃসন্দেহে তিনি কামিয়াব। ক্ষণস্থায়ী দুনিয়াকে তিনি কুরবান করে দিয়েছিলেন, আল্লাহর রহমত ও চিরস্থায়ী সম্মানের ঘর জান্নাত লাভের আশায়।
তবে এর অর্থ এটা নয় যে, জীবনোপকরণ অর্জন করা একেবারে বাদ দিয়ে দিতে হবে। বরং এর অর্থ হলো, দুনিয়া অর্জনই যেন একমাত্র ধ্যান-জ্ঞান না হয়। ইসলাম বৈধ জাগতিক কাজকর্মের প্রতি উৎসাহিত করে। তবে এর জন্য শর্ত হলো, নিয়ত বিশুদ্ধ হতে হবে এবং আমানত, ইখলাস-সহ অন্যান্য শর্ত বিদ্যমান থাকতে হবে।
আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রা. বলেন :
'যে দুনিয়া কামনা করে, তার আখিরাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আর যে আখিরাত কামনা করে, তার দুনিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হয়। হে মুসলিম জাতি, চিরস্থায়ী আখিরাতের জন্য ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার ক্ষতিকে বরদাস্ত করো।'
আজ আমাদের ভাবনা ও ব্যস্ততার সবটা জুড়ে আছে দুনিয়া। দুনিয়া নিয়েই আমাদের যত আয়োজন, যত আলোচনা। আমাদের পারস্পরিক ও সামাজিক সম্পর্কের ভিত্তিও এখন দুনিয়া। এর বাস্তব উদাহরণ হলো, আমার এক প্রতিবেশী—যিনি উচ্চপদস্থ একজন কর্মকর্তা। তার ঘরে যখন গানের আসর হয়, তখন দর্শনার্থীদের প্রচুর ভিড় জমে। কিন্তু যেদিন বিরতি থাকে, সেদিন হাতে-গোনা কয়েকজন ছাড়া কেউ তার সাক্ষাতে আসে না। এখানে প্রথম দিন যারা আসে, তারা দুনিয়ার স্বার্থেই আসে। আর বিরতির দিন যারা আসে, তারা আসে দ্বীনের স্বার্থে। সত্যিকারের ভালোবাসার স্বার্থে তারা এ লোকের সাথে সম্পর্ক রাখে; কিন্তু এমন লোকদের সংখ্যা খুব বেশি নয়।
বস্তুত, দুনিয়াপ্রীতি হলো এক ধরনের বস্তুবাদী চেতনা। যা বর্তমানকালের অন্যতম সামাজিক ব্যাধি। মৌখিকভাবে যদিও আমরা অনেকে দুনিয়ার নিন্দা করি, কিন্তু আমাদের কাজকর্মে ঠিকই দুনিয়ার ভালোবাসা প্রকাশ পায়। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাশে ঘেঁষার প্রবণতা অনেকের মধ্যে আছে; অথচ তারা জানতেও পারে না, উপলব্ধি করতে পারে না যে, খানিক আগে তারাই কিন্তু উপদেশ দিয়েছিল দুনিয়াবিমুখতার, এখন সেই তারাই দুনিয়ার ভালোবাসায় দুনিয়া ধরে ঝুলে আছে।
হাসসান বিন আবু সিনান রহ. সম্পর্কে বর্ণিত আছে,
তিনি একটি কক্ষের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বললেন, 'এটা কখন বানানো হয়েছে?' এই প্রশ্নটি করার পরপরই তিনি নিজেকে উদ্দেশ্য করে বললেন, 'কী প্রয়োজন ছিল এ বেহুদা প্রশ্ন করার? দাঁড়াও, এর জন্য তোমার শাস্তি হলো, এক বছরের রোজা।' এরপর তিনি এক বছর রোজা রেখেছেন। আহ! আমাদের সালাফে সালিহিন অতি সাধারণ একটি প্রশ্নের জন্যও কত আফসোস করতেন! আর আমরা কত অনর্থক-অপ্রয়োজনীয় কাজ করে যাচ্ছি প্রতিদিন, প্রতিটি মুহূর্তে! আমরা যদি নিজেদের কল্যাণই চাই, তবে তো হাসসান রহ.-এর মতোই নিজেদের শাস্তি দেওয়া উচিত। তবে এবার তো গুনে দেখতে হবে, এক বছরে এ জন্য কয়টা রোজা রাখতে হবে আমাদের। কিন্তু একটা রোজা রেখেও হয়তো আমরা নিজেদের শাস্তি দেবো না বা দেবার মানসিকতাও কেউ রাখি না। যাহোক, এটা না পারলেও অন্তত অনথর্ক কথা ও কাজ থেকে বিরত থাকার শিক্ষা নিয়ে এগুলোকে আমরা বর্জন করি।
আমরা সালাফে সালিহিনের জীবনীর দিকে লক্ষ করি না। আমাদের দৃষ্টি পড়ে আছে দুনিয়াদারদের দিকে! অথচ, আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
وَلَا تَمُدَّنَّ عَيْنَيْكَ إِلَى مَا مَتَّعْنَا بِهِ أَزْوَاجًا مِنْهُمْ زَهْرَةَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا لِنَفْتِنَهُمْ فِيهِ ﴾
'আমি এদের বিভিন্ন প্রকার লোককে পরীক্ষা করার জন্য পার্থিব জীবনের সৌন্দর্যস্বরূপ ভোগ-বিলাসের যে উপকরণ দিয়েছি, আপনি সেই সব বস্তুর প্রতি ভ্রুক্ষেপ করবেন না। '১৬৯
টিকাঃ
১৬৬. সাইদুল খাতির: ৫২১
১৬৭. আস-সিয়ার: ১/৪৯৭
১৬৮. তাসলিয়াতু আহলিল মাসায়িব: ২৪৩
১৬৯. সুরা তহা: ১৩১