📘 দুনিয়া এক ধূসর মরীচিকা > 📄 উমর বিন আব্দুল আজিজ রহ.-এর প্রতি হাসান বসরি রহ.-এর চিঠি

📄 উমর বিন আব্দুল আজিজ রহ.-এর প্রতি হাসান বসরি রহ.-এর চিঠি


'সালাত ও সালামের পর,
দুনিয়া প্রস্থান করার স্থান, অবস্থান করার জায়গা নয়। আদম আ. পৃথিবীতে এসেছিলেন শাস্তিস্বরূপ। সুতরাং, দুনিয়া থেকে বেঁচে থাকুন, হে আমিরুল মুমিনিন, দুনিয়া থেকে সংগ্রহযোগ্য পাথেয় হলো, দুনিয়াবিমুখতা; দুনিয়াতে প্রাচুর্য হলো এর দারিদ্র্য। প্রতিটি মুহূর্তে তার কোলে কেউ না কেউ লাশ হচ্ছে। যে তাকে সম্মান করে, সে তাকে লাঞ্ছিত করে। যে তাকে সঞ্চয় করে, সে তাকে অভাবী বানায়। দুনিয়া বিষের মতো, মানুষ না জেনে সুস্থ হওয়ার জন্য খায়; অথচ এটা তার মৃত্যু। রোগী যেমন পথ্য খায়, আপনিও দুনিয়া থেকে ততটুকু গ্রহণ করুন। আর দুনিয়ার বিপদকে আপনার রোগের ওষুধ মনে করে সবর করুন—মানুষ যেমন রোগব্যাধি দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কায় তিক্ত ওষুধ খায়।
এই কপট, ধোঁকাবাজ, প্রতারক ও প্রবঞ্চক দুনিয়ার ব্যাপারে সতর্ক হোন। প্রতারণা দিয়েই দুনিয়া নিজেকে সজ্জিত করেছে। ধোঁকা দিয়েই সে মানুষকে ফিতনায় ফেলে এবং অন্তরে আশা জাগিয়ে প্রবঞ্চিত করে। সে সবার কামনা-বাসনার পাত্র হতে চায়। তাই সে বিয়ের কনের মতো সেজেগুজে বসে থাকে। তার দিকে দৃষ্টি আকর্ষিত হয়, অন্তর আসক্ত হয়। হৃদয় তাকে পেতে পাগলপারা হয়। সে তার সব স্বামীদের হত্যা করে। অবশিষ্টরা পূর্বের স্বামীদের পরিণতি দেখে শিক্ষা গ্রহণ করে না। আল্লাহর প্রিয় বান্দাকে যখন দুনিয়ার বাস্তবতা সম্পর্কে বলা হয়, সে নসিহত কবুল করে।
দুনিয়াসক্ত লোক দুনিয়ার সুখ পেয়ে বিভ্রান্ত হয়, নাফরমানিতে লিপ্ত হয় এবং আখিরাতকে ভুলে যায়। দুনিয়ার মোহে পড়ে তার আকল বিকল হয়ে যায়। ফলে তার পদস্খলন ঘটে। পরিণামে সে লজ্জিত হয়। আফসোস করা ছাড়া তার উপায় থাকে না। অবশেষে ভয়াল মৃত্যু তার সমূহ যন্ত্রণা নিয়ে হাজির হয়। দুনিয়া হারানোর বেদনা তাকে অতিষ্ঠ করে তোলে। হাজারো আশা-আকাঙ্ক্ষা ভারী করে তোলে তার বুক। আগামী জীবনে পথচলার কোনো পাথেয় তার হাতে থাকে না। ফলে নিঃস্ব অবস্থায় সে পরপারে পাড়ি জমায়।
দুনিয়ার ব্যাপারে সতর্ক হোন, হে আমিরুল মুমিনিন, দুনিয়া বেশ আনন্দের, আবার আশঙ্কারও। কেননা, যখনই আপনি প্রসন্ন হবেন, নতুন সমস্যা এসে আপনাকে বিষণ্ণ করে তুলবে। আজকের সুখী মানুষটির আগামীকালে দুঃখের শেষ থাকে না। দুঃখের পরেই এখানে সুখ পাওয়া যায়। এই স্থায়িত্ব খুব শীঘ্রই অস্থায়িত্বে রূপ নেয়। সুতরাং দুনিয়ার হাসি-আনন্দ নির্ভেজাল নয়—এতে দুঃখ-বেদনার মিশেল থাকে। দুনিয়াতে যা একবার হারিয়ে যায়, তা আর পাওয়া যায় না। যা ভবিষ্যতে পাওয়া হবে, তা তড়িঘড়ি করে চাইলে পাওয়া যায় না— অপেক্ষা করতে হয়। দুনিয়ার আকাঙ্ক্ষাগুলো মিথ্যে, প্রত্যাশাগুলো অর্থহীন। দুনিয়ার বিশুদ্ধতায়ও থাকে দূষণের উৎপাত, শান্তিতেও থাকে অশান্তির হা-হুতাশ।
আল্লাহ তাআলা যদি দুনিয়ার ব্যাপারে কিছু নাও বলতেন, কোনো উপমাও যদি পেশ না করতেন, তবুও তো দুনিয়ার নির্মম বাস্তবতা মানুষদের ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলত, গাফিলদের সতর্ক করে দিত। অথচ, আল্লাহ তাআলা কত সতর্ককারী পাঠিয়েছেন, কত নসিহতকারী প্রেরণ করেছেন!
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সামনে দুনিয়ার ধনভান্ডারের সমস্ত চাবি পেশ করা হয়েছিল, তিনি গ্রহণ করেননি। আল্লাহ তাআলা যা ঘৃণা করেন, তাকে ভালোবাসতে তিনি রাজি হননি। আল্লাহ তাআলা যাকে তুচ্ছ করেছেন, তাকে তিনি মর্যাদা দেননি। আল্লাহ তাআলা নেককারদের পরীক্ষাস্বরূপ সম্পদ থেকে বঞ্চিত করেন এবং তাঁর দুশমনদের জন্য তা বিস্তৃত করে দেন। তারা ভাবে, সম্পদ দিয়ে আল্লাহ তাআলা তাদের সম্মানিত করেছেন। তারা বুঝতে পারে না, সম্পদ তাদের প্রতারিত করছে। তারা ভুলে যায়, আল্লাহ তাআলার প্রিয় হাবিব পেটে পাথর বেঁধেছিলেন।
এখান থেকে স্পষ্ট হয়ে যায়, দুনিয়া আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের ভালোবাসার বস্তু নয়। তাঁর শত্রুরাই দুনিয়াকে ভালোবাসে। বর্ণিত আছে, আল্লাহ তাআলা মুসা আ.-কে বলেন :
يَا مُوسَى ، إِذَا رَأَيْتَ الْغِنَى مُقْبِلا فَقُلْ : ذَنْبُ عُجِّلَتْ عُقُوبَتُهُ وَإِذَا رَأَيْتَ الْفَقْرَ مُقْبِلا فَقُلْ مَرْحَبًا بِشِعَارِ الصَّالِحِينَ
'হে মুসা, যখন ধনাঢ্যতাকে তোমার দিকে আসতে দেখবে, তখন বলবে, “পাপ আমার শাস্তিকে ত্বরান্বিত করছে!” আর যখন দারিদ্র্যকে তোমার দিকে আসতে দেখবে, তখন বলবে, “স্বাগতম হে নেককারদের প্রতীক।””১৩৬
ভাই আমার, দুনিয়া তোমার সামনে কাউকে গিলে নিচ্ছে।...আর আখিরাতের সূর্য তোমাকে ভয় দেখিয়ে এগিয়ে আসছে।... কেমন অবস্থা এখন তোমার?
এ গমনাগমনকে তুমি কীভাবে দেখো?
আমরা সালমান রা.-এর অবস্থাটা দেখি। এমন মুহূর্তে কেমন ছিল তাঁর অবস্থা? মৃত্যুর আগ মুহূর্তে তিনি কাঁদতে লাগলেন। তাঁকে বলা হলো, 'রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাহাবি হয়েও মৃত্যুর সময় আপনি কাঁদছেন!'
তিনি বললেন:
'দুনিয়া হারানোর আফসোস কিংবা তার অনুরাগের কারণে আমি কাঁদছি না। আমি কাঁদছি এ কারণে যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের নিকট একটি অঙ্গীকার রেখেছিলেন। কিন্তু আমরা সে অঙ্গীকার রক্ষা করতে পারিনি। সে অঙ্গীকার ছিল, দুনিয়াতে আমাদের সম্পদ হবে একজন মুসাফিরের সম্পদের পরিমাণ। কিন্তু এগুলো...' এ বলে তিনি তাঁর সমুদয় সম্পত্তির দিকে তাকালেন। অথচ, তাঁর সেই সম্পত্তির পরিমাণ ছিল বিশ দিরহাম থেকে ত্রিশ দিরহামের সামান্য বেশি! ১৩৭ এ সামান্য সম্পদ থাকার কারণেও তাঁর এত ভয়!
'দুনিয়া এক ধূসর মরীচিকা। দুনিয়া এক অন্ধকার রাত্রি। দুনিয়া অন্বেষণকারী সমুদ্রের পানি পানকারীর ন্যায়—যতই সে পান করে, ততই তার তৃষ্ণা বৃদ্ধি পায়। '১৩৮
দুনিয়াভোগের কোনো সীমা-পরিসীমা নেই। নেই কোনো থামার স্থান। অল্পতুষ্টি, দুনিয়াবিমুখতা, আল্লাহর বণ্টনের ওপর সন্তুষ্টি ও রাত-দিন আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগি করা ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে দুনিয়াকে আয়ত্তে আনা সম্ভব নয়।
মালিক বিন দিনার রহ. বলেন:
'দুনিয়াদাররা দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছে, কিন্তু দুনিয়ার সবচেয়ে সুস্বাদু বস্তুটির স্বাদ তারা আস্বাদন করতে পারেনি।' জিজ্ঞেস করা হলো, 'সেই সুস্বাদু বস্তুটি কী?' তিনি উত্তরে বলেন, 'আল্লাহর পরিচয় লাভ করা। '১৩৯
মৃত্যুকালে নেককার বান্দাদের অনেক নিশ্চিন্ত ও প্রশান্ত দেখায়। কিন্তু যারা দুনিয়াতে হালাল-হারামের ব্যবধানের প্রতি কোনো তোয়াক্কা করে না, দুনিয়ার চাকচিক্যের পেছনে যারা দৌড়ায়, মৃত্যুকালে তারা খুব বিচলিত ও চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়ে।
আবু দারদা রা. বলেন:
'দুনিয়াতে যদি তিনটি বিষয় না থাকত, তবে আমি জমিনের ওপরে থাকার চেয়ে জমিনের নিচে চলে যাওয়াকে শ্রেয় মনে করতাম। ১. যদি এখানে এমন ভাইয়েরা না থাকত, যারা আমাকে উত্তম ও সুমিষ্ট কথা শোনায়। ২. যদি আল্লাহর সিজদা করতে গিয়ে আমার কপাল ধুলোমিশ্রিত হওয়া না থাকত। ৩. যদি জিহাদে একটি সকাল বা একটি সন্ধ্যা কাটানোর সুযোগ না থাকত। ১৪০
উহাইব বিন ওয়ারদ রহ. বলেন:
‘জুহদ হলো পার্থিব কোনো বস্তু হাতছাড়া হয়ে গেলে আফসোস না করা এবং পার্থিব কোনো বস্তু হাতে আসলে আনন্দিত না হওয়া। ১৪১

টিকাঃ
১৩৬. উদ্দাতুস সাবিরিন: ৩৩১
১৩৭. আদাবুদ দুনিয়া ওয়াদ-দ্বীন: ১১৯
১৩৮. আস-সিয়ার: ৫/২৬৩
১৩৯. মাদারিজুস সালিকিন: ২/২৩৩
১৪০. আজ-জুহদ: ১৯৮
১৪১. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৮/১৪০

'সালাত ও সালামের পর,
দুনিয়া প্রস্থান করার স্থান, অবস্থান করার জায়গা নয়। আদম আ. পৃথিবীতে এসেছিলেন শাস্তিস্বরূপ। সুতরাং, দুনিয়া থেকে বেঁচে থাকুন, হে আমিরুল মুমিনিন, দুনিয়া থেকে সংগ্রহযোগ্য পাথেয় হলো, দুনিয়াবিমুখতা; দুনিয়াতে প্রাচুর্য হলো এর দারিদ্র্য। প্রতিটি মুহূর্তে তার কোলে কেউ না কেউ লাশ হচ্ছে। যে তাকে সম্মান করে, সে তাকে লাঞ্ছিত করে। যে তাকে সঞ্চয় করে, সে তাকে অভাবী বানায়। দুনিয়া বিষের মতো, মানুষ না জেনে সুস্থ হওয়ার জন্য খায়; অথচ এটা তার মৃত্যু। রোগী যেমন পথ্য খায়, আপনিও দুনিয়া থেকে ততটুকু গ্রহণ করুন। আর দুনিয়ার বিপদকে আপনার রোগের ওষুধ মনে করে সবর করুন—মানুষ যেমন রোগব্যাধি দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কায় তিক্ত ওষুধ খায়।
এই কপট, ধোঁকাবাজ, প্রতারক ও প্রবঞ্চক দুনিয়ার ব্যাপারে সতর্ক হোন। প্রতারণা দিয়েই দুনিয়া নিজেকে সজ্জিত করেছে। ধোঁকা দিয়েই সে মানুষকে ফিতনায় ফেলে এবং অন্তরে আশা জাগিয়ে প্রবঞ্চিত করে। সে সবার কামনা-বাসনার পাত্র হতে চায়। তাই সে বিয়ের কনের মতো সেজেগুজে বসে থাকে। তার দিকে দৃষ্টি আকর্ষিত হয়, অন্তর আসক্ত হয়। হৃদয় তাকে পেতে পাগলপারা হয়। সে তার সব স্বামীদের হত্যা করে। অবশিষ্টরা পূর্বের স্বামীদের পরিণতি দেখে শিক্ষা গ্রহণ করে না। আল্লাহর প্রিয় বান্দাকে যখন দুনিয়ার বাস্তবতা সম্পর্কে বলা হয়, সে নসিহত কবুল করে।
দুনিয়াসক্ত লোক দুনিয়ার সুখ পেয়ে বিভ্রান্ত হয়, নাফরমানিতে লিপ্ত হয় এবং আখিরাতকে ভুলে যায়। দুনিয়ার মোহে পড়ে তার আকল বিকল হয়ে যায়। ফলে তার পদস্খলন ঘটে। পরিণামে সে লজ্জিত হয়। আফসোস করা ছাড়া তার উপায় থাকে না। অবশেষে ভয়াল মৃত্যু তার সমূহ যন্ত্রণা নিয়ে হাজির হয়। দুনিয়া হারানোর বেদনা তাকে অতিষ্ঠ করে তোলে। হাজারো আশা-আকাঙ্ক্ষা ভারী করে তোলে তার বুক। আগামী জীবনে পথচলার কোনো পাথেয় তার হাতে থাকে না। ফলে নিঃস্ব অবস্থায় সে পরপারে পাড়ি জমায়।
দুনিয়ার ব্যাপারে সতর্ক হোন, হে আমিরুল মুমিনিন, দুনিয়া বেশ আনন্দের, আবার আশঙ্কারও। কেননা, যখনই আপনি প্রসন্ন হবেন, নতুন সমস্যা এসে আপনাকে বিষণ্ণ করে তুলবে। আজকের সুখী মানুষটির আগামীকালে দুঃখের শেষ থাকে না। দুঃখের পরেই এখানে সুখ পাওয়া যায়। এই স্থায়িত্ব খুব শীঘ্রই অস্থায়িত্বে রূপ নেয়। সুতরাং দুনিয়ার হাসি-আনন্দ নির্ভেজাল নয়—এতে দুঃখ-বেদনার মিশেল থাকে। দুনিয়াতে যা একবার হারিয়ে যায়, তা আর পাওয়া যায় না। যা ভবিষ্যতে পাওয়া হবে, তা তড়িঘড়ি করে চাইলে পাওয়া যায় না— অপেক্ষা করতে হয়। দুনিয়ার আকাঙ্ক্ষাগুলো মিথ্যে, প্রত্যাশাগুলো অর্থহীন। দুনিয়ার বিশুদ্ধতায়ও থাকে দূষণের উৎপাত, শান্তিতেও থাকে অশান্তির হা-হুতাশ।
আল্লাহ তাআলা যদি দুনিয়ার ব্যাপারে কিছু নাও বলতেন, কোনো উপমাও যদি পেশ না করতেন, তবুও তো দুনিয়ার নির্মম বাস্তবতা মানুষদের ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলত, গাফিলদের সতর্ক করে দিত। অথচ, আল্লাহ তাআলা কত সতর্ককারী পাঠিয়েছেন, কত নসিহতকারী প্রেরণ করেছেন!
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সামনে দুনিয়ার ধনভান্ডারের সমস্ত চাবি পেশ করা হয়েছিল, তিনি গ্রহণ করেননি। আল্লাহ তাআলা যা ঘৃণা করেন, তাকে ভালোবাসতে তিনি রাজি হননি। আল্লাহ তাআলা যাকে তুচ্ছ করেছেন, তাকে তিনি মর্যাদা দেননি। আল্লাহ তাআলা নেককারদের পরীক্ষাস্বরূপ সম্পদ থেকে বঞ্চিত করেন এবং তাঁর দুশমনদের জন্য তা বিস্তৃত করে দেন। তারা ভাবে, সম্পদ দিয়ে আল্লাহ তাআলা তাদের সম্মানিত করেছেন। তারা বুঝতে পারে না, সম্পদ তাদের প্রতারিত করছে। তারা ভুলে যায়, আল্লাহ তাআলার প্রিয় হাবিব পেটে পাথর বেঁধেছিলেন।
এখান থেকে স্পষ্ট হয়ে যায়, দুনিয়া আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের ভালোবাসার বস্তু নয়। তাঁর শত্রুরাই দুনিয়াকে ভালোবাসে। বর্ণিত আছে, আল্লাহ তাআলা মুসা আ.-কে বলেন :
يَا مُوسَى ، إِذَا رَأَيْتَ الْغِنَى مُقْبِلا فَقُلْ : ذَنْبُ عُجِّلَتْ عُقُوبَتُهُ وَإِذَا رَأَيْتَ الْفَقْرَ مُقْبِلا فَقُلْ مَرْحَبًا بِشِعَارِ الصَّالِحِينَ
'হে মুসা, যখন ধনাঢ্যতাকে তোমার দিকে আসতে দেখবে, তখন বলবে, “পাপ আমার শাস্তিকে ত্বরান্বিত করছে!” আর যখন দারিদ্র্যকে তোমার দিকে আসতে দেখবে, তখন বলবে, “স্বাগতম হে নেককারদের প্রতীক।””১৩৬
ভাই আমার, দুনিয়া তোমার সামনে কাউকে গিলে নিচ্ছে।...আর আখিরাতের সূর্য তোমাকে ভয় দেখিয়ে এগিয়ে আসছে।... কেমন অবস্থা এখন তোমার?
এ গমনাগমনকে তুমি কীভাবে দেখো?
আমরা সালমান রা.-এর অবস্থাটা দেখি। এমন মুহূর্তে কেমন ছিল তাঁর অবস্থা? মৃত্যুর আগ মুহূর্তে তিনি কাঁদতে লাগলেন। তাঁকে বলা হলো, 'রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাহাবি হয়েও মৃত্যুর সময় আপনি কাঁদছেন!'
তিনি বললেন:
'দুনিয়া হারানোর আফসোস কিংবা তার অনুরাগের কারণে আমি কাঁদছি না। আমি কাঁদছি এ কারণে যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের নিকট একটি অঙ্গীকার রেখেছিলেন। কিন্তু আমরা সে অঙ্গীকার রক্ষা করতে পারিনি। সে অঙ্গীকার ছিল, দুনিয়াতে আমাদের সম্পদ হবে একজন মুসাফিরের সম্পদের পরিমাণ। কিন্তু এগুলো...' এ বলে তিনি তাঁর সমুদয় সম্পত্তির দিকে তাকালেন। অথচ, তাঁর সেই সম্পত্তির পরিমাণ ছিল বিশ দিরহাম থেকে ত্রিশ দিরহামের সামান্য বেশি! ১৩৭ এ সামান্য সম্পদ থাকার কারণেও তাঁর এত ভয়!
'দুনিয়া এক ধূসর মরীচিকা। দুনিয়া এক অন্ধকার রাত্রি। দুনিয়া অন্বেষণকারী সমুদ্রের পানি পানকারীর ন্যায়—যতই সে পান করে, ততই তার তৃষ্ণা বৃদ্ধি পায়। '১৩৮
দুনিয়াভোগের কোনো সীমা-পরিসীমা নেই। নেই কোনো থামার স্থান। অল্পতুষ্টি, দুনিয়াবিমুখতা, আল্লাহর বণ্টনের ওপর সন্তুষ্টি ও রাত-দিন আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগি করা ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে দুনিয়াকে আয়ত্তে আনা সম্ভব নয়।
মালিক বিন দিনার রহ. বলেন:
'দুনিয়াদাররা দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছে, কিন্তু দুনিয়ার সবচেয়ে সুস্বাদু বস্তুটির স্বাদ তারা আস্বাদন করতে পারেনি।' জিজ্ঞেস করা হলো, 'সেই সুস্বাদু বস্তুটি কী?' তিনি উত্তরে বলেন, 'আল্লাহর পরিচয় লাভ করা। '১৩৯
মৃত্যুকালে নেককার বান্দাদের অনেক নিশ্চিন্ত ও প্রশান্ত দেখায়। কিন্তু যারা দুনিয়াতে হালাল-হারামের ব্যবধানের প্রতি কোনো তোয়াক্কা করে না, দুনিয়ার চাকচিক্যের পেছনে যারা দৌড়ায়, মৃত্যুকালে তারা খুব বিচলিত ও চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়ে।
আবু দারদা রা. বলেন:
'দুনিয়াতে যদি তিনটি বিষয় না থাকত, তবে আমি জমিনের ওপরে থাকার চেয়ে জমিনের নিচে চলে যাওয়াকে শ্রেয় মনে করতাম। ১. যদি এখানে এমন ভাইয়েরা না থাকত, যারা আমাকে উত্তম ও সুমিষ্ট কথা শোনায়। ২. যদি আল্লাহর সিজদা করতে গিয়ে আমার কপাল ধুলোমিশ্রিত হওয়া না থাকত। ৩. যদি জিহাদে একটি সকাল বা একটি সন্ধ্যা কাটানোর সুযোগ না থাকত। ১৪০
উহাইব বিন ওয়ারদ রহ. বলেন:
‘জুহদ হলো পার্থিব কোনো বস্তু হাতছাড়া হয়ে গেলে আফসোস না করা এবং পার্থিব কোনো বস্তু হাতে আসলে আনন্দিত না হওয়া। ১৪১

টিকাঃ
১৩৬. উদ্দাতুস সাবিরিন: ৩৩১
১৩৭. আদাবুদ দুনিয়া ওয়াদ-দ্বীন: ১১৯
১৩৮. আস-সিয়ার: ৫/২৬৩
১৩৯. মাদারিজুস সালিকিন: ২/২৩৩
১৪০. আজ-জুহদ: ১৯৮
১৪১. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৮/১৪০

📘 দুনিয়া এক ধূসর মরীচিকা > 📄 দুনিয়া তিন দিনের সমষ্টি মাত্র

📄 দুনিয়া তিন দিনের সমষ্টি মাত্র


দুনিয়া মাত্র তিনটা দিনের সমষ্টি।
১. বিগত দিন: যা আর কখনো ফিরে আসবে না।
২. আজকের দিন : যাকে কাজে লাগিয়ে মূল্যায়ন করা আবশ্যক।
৩. আগামী দিন : যা আসবে কিন্তু এ নিশ্চয়তা নেই যে, তুমি থাকবে কি না। সেদিন আসার আগেই হয়তো তুমি ওপারে চলে যাবে দুনিয়া ছেড়ে।
তাই দুনিয়াতে তুমি যে পরিশ্রম বা প্রচেষ্টাই চালাও, তা যেন হয় আখিরাতের জন্য। কেননা, দুনিয়া থেকে তোমার কৃত আমল ছাড়া আখিরাতে আর কিছুই পৌঁছবে না। সুতরাং এখানে অধিক সম্পদ জমা করার চিন্তায় বিভোর হয়ো না। যা তোমার সাথে যাবে না, তার জন্য কেন করবে এত কষ্ট-সাধনা? এমন কিছুর পেছনে পড়ো না। এর চেয়ে বরং আখিরাতের জন্য পাথেয় অর্জনে অধিক মনোযোগী হও। ১৪২
‘একান্ত বাধ্য হলেই তবে দুনিয়া অর্জন করবে। চিন্তা-চেতনায়, ধ্যান-ধারণায় সব সময় আখিরাতের স্মরণ রেখো। আখিরাতের কাজগুলো যেন হয় স্বেচ্ছায় ও স্বপ্রণোদিত হয়ে। তাই দুনিয়াতে জীবনযাপন করো একজন মুসাফিরের ন্যায়। মৃত্যু তোমাকে এমনভাবে নিয়ে যাবে, ওখান থেকে তুমি আর ফিরতে পারবে না।'১৪৩
হাসান রহ. বলেন: 'দুনিয়ার ব্যস্ততা থেকে বেঁচে থাকো। এ দুনিয়া ব্যস্ততায় জর্জরিত। ব্যস্ততার একটা দুয়ার খুললেই উন্মুক্ত হয়ে যাবে আরও দশটা দুয়ার।'১৪৪
আমরা কোনো দুনিয়াদার প্রভাবশালী ও নেতা গোছের মানুষ দেখলেই- যদিও সে বেনামাজি-তাকে খুব সম্মান করি। সভা-সমাবেশে তার জন্য আসন ছেড়ে দিই। কিন্তু এসব দুনিয়াদারের প্রতি হাসান রহ. এর মূল্যায়ন দেখুন-
'তার সামনে একজন দুনিয়াদার প্রভাবশালী ব্যক্তির আলোচনা করা হলো। এরপর তিনি বলেন, (তার আলোচনা এখানে করার কী প্রয়োজন? সে এমন কী হয়ে গেল?) না দুনিয়া তার জন্য বাকি থাকবে, না বাকি থাকবে সে দুনিয়ার জন্য। দুনিয়া থেকে সেও নিরাপদ নয়। একটু সমীহ করবে তো দূরের কথা; দুনিয়া তাকে গণনার মধ্যেও আনে না। জীবন-সময় শেষ হলে কাপড় পেঁচিয়ে দুনিয়া থেকে তাকে বের করে দেওয়া হবে...।'১৪৫

টিকাঃ
১৪২. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ২/১৩৮
১৪৩. আদাবুদ দুনিয়া ওয়াদ-দ্বীন: ১২২
১৪৪. আজ-জুহদ, ইবনুল মুবারক: ১৮৯
১৪৫. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ২/১৪৪

দুনিয়া মাত্র তিনটা দিনের সমষ্টি।
১. বিগত দিন: যা আর কখনো ফিরে আসবে না।
২. আজকের দিন : যাকে কাজে লাগিয়ে মূল্যায়ন করা আবশ্যক।
৩. আগামী দিন : যা আসবে কিন্তু এ নিশ্চয়তা নেই যে, তুমি থাকবে কি না। সেদিন আসার আগেই হয়তো তুমি ওপারে চলে যাবে দুনিয়া ছেড়ে।
তাই দুনিয়াতে তুমি যে পরিশ্রম বা প্রচেষ্টাই চালাও, তা যেন হয় আখিরাতের জন্য। কেননা, দুনিয়া থেকে তোমার কৃত আমল ছাড়া আখিরাতে আর কিছুই পৌঁছবে না। সুতরাং এখানে অধিক সম্পদ জমা করার চিন্তায় বিভোর হয়ো না। যা তোমার সাথে যাবে না, তার জন্য কেন করবে এত কষ্ট-সাধনা? এমন কিছুর পেছনে পড়ো না। এর চেয়ে বরং আখিরাতের জন্য পাথেয় অর্জনে অধিক মনোযোগী হও। ১৪২
‘একান্ত বাধ্য হলেই তবে দুনিয়া অর্জন করবে। চিন্তা-চেতনায়, ধ্যান-ধারণায় সব সময় আখিরাতের স্মরণ রেখো। আখিরাতের কাজগুলো যেন হয় স্বেচ্ছায় ও স্বপ্রণোদিত হয়ে। তাই দুনিয়াতে জীবনযাপন করো একজন মুসাফিরের ন্যায়। মৃত্যু তোমাকে এমনভাবে নিয়ে যাবে, ওখান থেকে তুমি আর ফিরতে পারবে না।'১৪৩
হাসান রহ. বলেন: 'দুনিয়ার ব্যস্ততা থেকে বেঁচে থাকো। এ দুনিয়া ব্যস্ততায় জর্জরিত। ব্যস্ততার একটা দুয়ার খুললেই উন্মুক্ত হয়ে যাবে আরও দশটা দুয়ার।'১৪৪
আমরা কোনো দুনিয়াদার প্রভাবশালী ও নেতা গোছের মানুষ দেখলেই- যদিও সে বেনামাজি-তাকে খুব সম্মান করি। সভা-সমাবেশে তার জন্য আসন ছেড়ে দিই। কিন্তু এসব দুনিয়াদারের প্রতি হাসান রহ. এর মূল্যায়ন দেখুন-
'তার সামনে একজন দুনিয়াদার প্রভাবশালী ব্যক্তির আলোচনা করা হলো। এরপর তিনি বলেন, (তার আলোচনা এখানে করার কী প্রয়োজন? সে এমন কী হয়ে গেল?) না দুনিয়া তার জন্য বাকি থাকবে, না বাকি থাকবে সে দুনিয়ার জন্য। দুনিয়া থেকে সেও নিরাপদ নয়। একটু সমীহ করবে তো দূরের কথা; দুনিয়া তাকে গণনার মধ্যেও আনে না। জীবন-সময় শেষ হলে কাপড় পেঁচিয়ে দুনিয়া থেকে তাকে বের করে দেওয়া হবে...।'১৪৫

টিকাঃ
১৪২. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ২/১৩৮
১৪৩. আদাবুদ দুনিয়া ওয়াদ-দ্বীন: ১২২
১৪৪. আজ-জুহদ, ইবনুল মুবারক: ১৮৯
১৪৫. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ২/১৪৪

📘 দুনিয়া এক ধূসর মরীচিকা > 📄 কোন চিন্তায় বিভোর হবো আমরা?

📄 কোন চিন্তায় বিভোর হবো আমরা?


ইবনে আব্বাস রা. বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পরে কারও কথায় আমি এতটুকু উপকৃত হইনি, যতটুকু হয়েছি আলি বিন আবি তালিব রা.-এর কথায়। তিনি আমার নিকট চিঠি লিখলেন—
"সালাম নিবেদনের পর, মানুষ এমন জিনিস হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার কারণে দুঃখিত হয়, যা পেলে তার কোনো লাভ হতো না। আর এমন জিনিস পাওয়ার কারণে আনন্দ প্রকাশ করে, যা না পেলেও তার কোনো ক্ষতি হতো না। কিন্তু আপনি তখনই আনন্দিত হবেন, যখন আখিরাতের জন্য উপকারী হবে এমন কোনো বিষয় আপনি অর্জন করবেন। আর তখনই আফসোস করবেন, যখন আখিরাতের কোনো কিছু আপনার হাতছাড়া হয়ে যাবে। পার্থিব কোনো বস্তু অর্জিত হলে বেশি আনন্দিত হবেন না। আপনার সকল চিন্তাভাবনা যেন মৃত্যুপরবর্তী চিরন্তন জীবনের জন্য হয়।”১৪৬
কোন চিন্তায় বিভোর হবো আমরা?
বলা হয়, জীবিত মানুষের চিন্তা পাঁচটিতে সীমাবদ্ধ। এবং এ পাঁচটিতে তাদের চিন্তা সীমাবদ্ধ হওয়া উচিত।
প্রথমত, অতীতের গুনাহসমূহের চিন্তা। কেননা, সে তো গুনাহ করে ফেলেছে। আর আল্লাহ তাআলা গুনাহসমূহ ক্ষমা করেছেন কি না, তা তার জানা নেই। তাই তার উচিত হবে, সব সময় গুনাহসমূহ নিয়ে চিন্তিত থাকা। আল্লাহর কাছে এ অতীত গুনাহ মাফ করে দেওয়ার ক্ষমা চাইতে থাকা।
দ্বিতীয়ত, অনেক ভালো আমল তো সে করেছে, কিন্তু আল্লাহর দরবারে তা কবুল হয়েছে কি না, তা তো আর জানা নেই। তাই আমল কবুল হওয়ার চিন্তায় চিন্তিত থাকা।
তৃতীয়ত, বিগত জীবন যেভাবে হোক কেটে গেছে। এখন সামনের জীবনটা কীভাবে কাটাবে, এ নিয়ে চিন্তিত থাকা।
চতুর্থত, আল্লাহ তাআলা দুটি আবাস সৃষ্টি করেছেন। একটি জান্নাত, আরেকটি জাহান্নام। এ দুটি থেকে তার আবাস কোনটি হবে, তা নিয়ে চিন্তা করা।
পঞ্চমত, আল্লাহ তাআলা তার প্রতি সন্তুষ্ট না অসন্তুষ্ট, এ নিয়ে চিন্তিত থাকা।
এই পাঁচটি বিষয় নিয়ে যে সব সময় চিন্তা করবে, তার মুখ ফুটে হাসি বেরোনো বড় দায়। ১৪৭
ইবরাহিম তাইমি রহ. বলেন:
'সালাফ ও তোমাদের মাঝে কতই না ব্যবধান! দুনিয়া তাদের নিকট আসতে চেয়েছে, কিন্তু তারা এর থেকে পালিয়ে গেছেন। পক্ষান্তরে, দুনিয়া তোমাদের পিঠ দেখিয়ে চলে যাচ্ছে, আর তোমরা তার পেছনেই ছুটছ...।'১৪৮

টিকাঃ
১৪৬. আল-ইকদুল ফারিদ : ৩/৮৪
১৪৭. তাম্বিহুল গাফিলিন: ১/২১৩
১৪৮. সিফাতুস সাফওয়াহ: ৩/৯০, আস-সিয়ার: ৫/৬১

ইবনে আব্বাস রা. বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পরে কারও কথায় আমি এতটুকু উপকৃত হইনি, যতটুকু হয়েছি আলি বিন আবি তালিব রা.-এর কথায়। তিনি আমার নিকট চিঠি লিখলেন—
"সালাম নিবেদনের পর, মানুষ এমন জিনিস হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার কারণে দুঃখিত হয়, যা পেলে তার কোনো লাভ হতো না। আর এমন জিনিস পাওয়ার কারণে আনন্দ প্রকাশ করে, যা না পেলেও তার কোনো ক্ষতি হতো না। কিন্তু আপনি তখনই আনন্দিত হবেন, যখন আখিরাতের জন্য উপকারী হবে এমন কোনো বিষয় আপনি অর্জন করবেন। আর তখনই আফসোস করবেন, যখন আখিরাতের কোনো কিছু আপনার হাতছাড়া হয়ে যাবে। পার্থিব কোনো বস্তু অর্জিত হলে বেশি আনন্দিত হবেন না। আপনার সকল চিন্তাভাবনা যেন মৃত্যুপরবর্তী চিরন্তন জীবনের জন্য হয়।”১৪৬
কোন চিন্তায় বিভোর হবো আমরা?
বলা হয়, জীবিত মানুষের চিন্তা পাঁচটিতে সীমাবদ্ধ। এবং এ পাঁচটিতে তাদের চিন্তা সীমাবদ্ধ হওয়া উচিত।
প্রথমত, অতীতের গুনাহসমূহের চিন্তা। কেননা, সে তো গুনাহ করে ফেলেছে। আর আল্লাহ তাআলা গুনাহসমূহ ক্ষমা করেছেন কি না, তা তার জানা নেই। তাই তার উচিত হবে, সব সময় গুনাহসমূহ নিয়ে চিন্তিত থাকা। আল্লাহর কাছে এ অতীত গুনাহ মাফ করে দেওয়ার ক্ষমা চাইতে থাকা।
দ্বিতীয়ত, অনেক ভালো আমল তো সে করেছে, কিন্তু আল্লাহর দরবারে তা কবুল হয়েছে কি না, তা তো আর জানা নেই। তাই আমল কবুল হওয়ার চিন্তায় চিন্তিত থাকা।
তৃতীয়ত, বিগত জীবন যেভাবে হোক কেটে গেছে। এখন সামনের জীবনটা কীভাবে কাটাবে, এ নিয়ে চিন্তিত থাকা।
চতুর্থত, আল্লাহ তাআলা দুটি আবাস সৃষ্টি করেছেন। একটি জান্নাত, আরেকটি জাহান্নام। এ দুটি থেকে তার আবাস কোনটি হবে, তা নিয়ে চিন্তা করা।
পঞ্চমত, আল্লাহ তাআলা তার প্রতি সন্তুষ্ট না অসন্তুষ্ট, এ নিয়ে চিন্তিত থাকা।
এই পাঁচটি বিষয় নিয়ে যে সব সময় চিন্তা করবে, তার মুখ ফুটে হাসি বেরোনো বড় দায়। ১৪৭
ইবরাহিম তাইমি রহ. বলেন:
'সালাফ ও তোমাদের মাঝে কতই না ব্যবধান! দুনিয়া তাদের নিকট আসতে চেয়েছে, কিন্তু তারা এর থেকে পালিয়ে গেছেন। পক্ষান্তরে, দুনিয়া তোমাদের পিঠ দেখিয়ে চলে যাচ্ছে, আর তোমরা তার পেছনেই ছুটছ...।'১৪৮

টিকাঃ
১৪৬. আল-ইকদুল ফারিদ : ৩/৮৪
১৪৭. তাম্বিহুল গাফিলিন: ১/২১৩
১৪৮. সিফাতুস সাফওয়াহ: ৩/৯০, আস-সিয়ার: ৫/৬১

📘 দুনিয়া এক ধূসর মরীচিকা > 📄 আবু জার গিফারির হৃদয় জাগানিয়া ভাষণ

📄 আবু জার গিফারির হৃদয় জাগানিয়া ভাষণ


আবু জার গিফারি রা. কাবার নিকট দাঁড়িয়ে বলেন:
'হে লোকসকল, আমি জুনদুব আল-গিফারি। তোমরা তোমাদের এ কল্যাণকামী ভাইয়ের নিকটে এসো!' তাঁর এ আহ্বান শুনে লোকেরা সমবেত হলো। অতঃপর তিনি বললেন, 'তোমাদের কেউ যখন কোথাও সফর করার ইচ্ছে করে, তখন এর জন্য প্রয়োজনীয় পাথেয় সংগ্রহ করে নেয় কি না?'
লোকেরা বলল:
'অবশ্যই নেয়।'
তিনি বললেন :
'আখিরাত তো তোমাদের চূড়ান্ত গন্তব্য। তাই আখিরাতের উদ্দেশ্যে তোমাদের এ সফরের জন্য যথার্থ পাথেয় সংগ্রহ করে নাও।'
লোকেরা বলল:
'যথার্থ পাথেয় কোনটি?'
তিনি বললেন :
'তোমরা হজ করো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদির জন্য। রোজা রাখো, যদিও গ্রীষ্মকালের দীর্ঘতম দিন হোক। কবরের ভয়ে রাতের অন্ধকারে দু'রাকআত নামাজ পড়ো। যেকোনো উত্তম কথা বলো। খারাপ কথা না বলে চুপ থাকো। তবেই তোমাদের আখিরাতের জন্য পাথেয় উত্তম হবে। তোমরা নিজেদের সম্পদ থেকে সদাকা দাও, এর মাধ্যমে বিপদ-মুসিবত ও কঠিন অবস্থা থেকে মুক্তি পাবে। দুনিয়াকে তোমরা দুটি কাজের স্থান বানাও :
১. হালাল রিজিক অর্জন করা।
২. আখিরাতের কল্যাণ অন্বেষণ করা।
এ দুটি ছাড়া অন্য বিষয়গুলো তোমাদের কোনো কাজে আসবে না, বরং অন্য বিষয়গুলো ক্ষতিরই কারণ হবে। তোমরা তোমাদের সম্পদকে দুভাগে ভাগ করবে। একভাগ ব্যয় করবে পরিবার-পরিজনের ভরণপোষণে, আরেকভাগ আখিরাতের জন্য পাঠিয়ে দেবে দ্বীনিকাজে ব্যয় করার মাধ্যমে।'
প্রিয় ভাই, সে ব্যক্তির প্রতি লক্ষ করো, দুনিয়াতে যে ছিল অঢেল সম্পদের মালিক। চিন্তা করে দেখো তো, দুনিয়া থেকে যাওয়ার সময় সে কি কিছু সঙ্গে নিয়ে যেতে পেরেছে?
পূর্ববর্তী ও পরবর্তীদের অবস্থার পার্থক্য বর্ণনা করে হাসান বসরি রহ. বলেন:
'আমি এমন লোকদের সান্নিধ্য লাভে ধন্য হয়েছি, যারা পার্থিব কোনো বস্তু অর্জিত হলে খুশি হতেন না। আবার পার্থিব কোনো বস্তু হাতছাড়া হয়ে গেলে সেটা অর্জন করার চেষ্টা করতেন না। দুনিয়াটা তাদের কাছে মাটির চেয়েও তুচ্ছ ছিল। তাদের কেউ কেউ তো পঞ্চাশ-ষাট বছর এভাবে কাটিয়ে দিয়েছিলেন যে, কখনো কোনো কাঁথা বা কম্বল গায়ে জড়াননি। চুলায় হাঁড়ি চড়াননি। শোয়ার সময় মাটি ও তার পিঠের মাঝে কোনো কিছুই ছিল না। সরাসরি মাটিই ছিল তাদের বিছানা। ঘরের কাউকে কোনো দিন খাবার তৈরি করতে তারা বলেননি। ভুলেননি রাতের বেলা নামাজে দাঁড়িয়ে রাত কাটিয়ে দিতে। তারা পায়ে ভর করে দাঁড়াতেন আর নিজ চেহারাকে মাটির সাথে বিছিয়ে দিতেন।
তাদের কপাল বেয়ে প্রবাহিত হতো অশ্রুধারা। আল্লাহর দরবারে নাজাতের দুআ করতে থাকতেন তারা। কোনো ভালো আমল করতে পারলেই তারা আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতেন। দুআ করতেন কবুল হওয়ার জন্য। আর কখনো গুনাহ করে ফেললে খুবই বিষণ্ণ হতেন এবং ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকতেন। কেননা, গুনাহ থেকে বাঁচা ও কৃত গুনাহ থেকে মুক্তি পাওয়ার একমাত্র মাধ্যম হলো মাগফিরাত (আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা)। আল্লাহ তাআলা সেসব পুণ্যবান লোকের ওপর রহম করুন এবং তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হোন। '১৪৯
আমার ভাই, কোথায় আমরা আর কোথায় তাঁরা!? তাদের সাথে কি আমাদের তুলনা চলে!?
আমরা দুনিয়ার মজাদার ও উপভোগ্য বিষয় তালাশ করি। কষ্টকর বিষয়সমূহ থেকে দূরে থাকি। এ যে চরম বেহাল দশা। আমরা এমনই। কিন্তু আবু দারদা রা. কেমন ছিলেন? তিনি বলেন :
'দারিদ্র্য আমাকে আল্লাহর প্রতি বিনম্র হতে শেখায়; তাই আমি দারিদ্র্যকে ভালোবাসি। মৃত্যু আমাকে আল্লাহর প্রতি আকাঙ্ক্ষী হতে শেখায়; আমি তাই মৃত্যুকে ভালোবাসি। রোগ আমার নিকট প্রিয়; কারণ, রোগ আমার গুনাহ মুছে দেয়। '১৫০
দুনিয়া, যদিও এটি তুচ্ছ ও নিকৃষ্ট; তবুও আখিরাতে যাওয়ার পথ তো এটিই। জান্নাত কিংবা জাহান্নাম, এ দুটির কোনো একটিতে প্রবেশের রাস্তা। সুতরাং দুনিয়াতে আমাদের এমন কাজ করতে হবে, যা আমাদের পৌছিয়ে দেবে জান্নাতে।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:
حوسبَ رَجُلٌ مِمَّنْ كَانَ قَبْلَكُمْ، فَلَمْ يُوجَدْ لَهُ مِنَ الْخَيْرِ شَيْءٌ، إِلَّا أَنَّهُ كَانَ يُخَالِطُ النَّاسَ، وَكَانَ مُوسِرًا، فَكَانَ يَأْمُرُ غِلْمَانَهُ أَنْ يَتَجَاوَزُوا عَنِ الْمُعْسِرِ، قَالَ : قَالَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ : نَحْنُ أَحَقُّ بِذَلِكَ مِنْهُ، تَجَاوَزُوا عَنْهُ
'তোমাদের আগের লোকদের মধ্যে এক লোকের হিসাব গ্রহণ করা হয়। তার কোনো ভালো আমল পাওয়া যায়নি। কিন্তু সে মানুষের সাথে লেনদেন করত। সে ছিল সচ্ছল, তাই দরিদ্র লোকদের ক্ষমা করে দেওয়ার জন্য নিজের কর্মচারীদের সে নির্দেশ দিত।' রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'আল্লাহ বললেন, “ক্ষমা করার ব্যাপারে আমি তার চেয়ে অধিক যোগ্য। একে ক্ষমা করে দাও।"'১৫১
ইমাম শাফিয়ি রহ. বলেন : 'তিনটি আমল খুবই কঠিন। ১. সম্পদ কম থাকাবস্থায় দান করা। ২. একাকী নির্জন সময় দ্বীনদারি রক্ষা করা। ৩. কারো প্রতি আশা ও ভয় থাকা সত্ত্বেও তার সামনে সত্য কথা বলা।'১৫২
হাসান বসরি রহ. বলেন : 'কিয়ামতের দিন সবাই ব্যস্ত থাকবে নিজ নিজ চিন্তায়। যে ব্যক্তি কোনো কিছু নিয়ে চিন্তিত থাকে, সে উক্ত বিষয়টিরই নাম নেয়। যার আখিরাত তৈরি হয়নি, তার দুনিয়াও বরবাদ হলো। যে দুনিয়াকে আখিরাতের ওপর অগ্রাধিকার দিয়েছে, তার দুনিয়াও বরবাদ হলো আখিরাতও বরবাদ হলো। '১৫৩
দুনিয়াতে তুমি সফরে আছ। একদিন এ সফরের ইতি ঘটবে। কাফেলা পৌছে যাবে গন্তব্যে। তখন তুমি দেখলে, পাথেয় যে সাথে আনা হয়নি!
অথচ কাফেলার অন্যরা ঠিকই এনেছে! তখন তোমার লজ্জিত-অনুতপ্ত হওয়া ছাড়া কিছুই করার থাকবে না। তাই সময় থাকতে তাকওয়ার পাথেয় অর্জনে মনোযোগ দাও।
ভাই আমার, তাঁরা কোথায় আর আমরা কোথায়!?
হাফস আল-জুফি রহ. বলেন: ‘দাউদ তায়ি রহ. তার মায়ের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে চারশ দিরহাম পেয়েছিলেন। সেগুলো দিয়ে তিনি ত্রিশ বছর জীবন কাটিয়েছেন। যখন তাও ফুরিয়ে গেল, তখন তার ছোট্ট ঘরটির ছাদ ভেঙে বিক্রি করতে শুরু করলেন।’১৫৪
উমর বিন আইয়ুব রহ. বলেন: ‘আবু শা'সা (জাবির বিন জায়িদ) রহ. বলেন, “হে উমর, দুনিয়ার সম্পদ হিসেবে আমার নিকট শুধু একটি গাধা আছে।”’১৫৫
সালাফে সালিহিন দুনিয়ার সম্পদ কম রাখতেন যেন হিসাব সহজ হয়। অথচ, আমরা নিজ জীবনকে শেষ করে ফেলি শুধু সম্পদ বাড়ানোর জন্য। কত আশা আমাদের মনে—আমার এ হবে, আমার সে হবে!
বড়ই আশ্চর্য লাগে! মৃত্যু অনিবার্য সত্য জানার পরেও কী করে মানুষ এতটা আনন্দিত হতে পারে? জাহান্নাম সত্য—এ বিশ্বাস পোষণ করার পরেও কী করে মানুষ হাসতে পারে? দুনিয়া তার অধিবাসীদের সাথে এত ধোঁকাবাজি করে, তারপরও কী করে মানুষ তার মাঝে স্বস্তি অনুভব করে? তাকদির সত্য জানার পরেও কেন মানুষ অহেতুক এত কষ্ট করে? ১৫৬
رَأَيْتُ الدَّهْرَ مُخْتَلِفًا يَدُورُ * فَلَا حُزْنُ يَدُوْمُ وَلَا سُرُورُ وَقَدْ بَنَتِ الْمُلُوكُ بِهِ قُصُورًا * فَلَمْ تَبْقَ الْمُلُوْكُ وَلَا الْقُصُوْرُ
'কত চক্কর লাগিয়েছি আমি ইতিহাসের মোড়ে মোড়ে। কাছ থেকে দেখেছি মানুষের জীবন—না দুঃখ, না আনন্দ কিছুরই স্থায়িত্ব নেই। কত রাজ-রাজড়া তৈরি করেছে কত বিলাসী প্রাসাদ। কিন্তু আজ কোথায় সেই রাজা আর কোথায় সে প্রাসাদ!'১৫৭
দুনিয়াতে আমরা খেল-তামাশার মধ্যেই মত্ত হয়ে আছি। একটি বারও কি আমাদের কানে এসেছে বিলাল রহ.-এর এ কথাটুকু? তিনি বলেন:
'হে মুত্তাকিগণ, নিঃশেষ করার জন্য তোমাদের সৃষ্টি করা হয়নি। তোমাদের স্থানান্তর করা হবে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে। যেভাবে তোমরা এসেছ পিতার পৃষ্ঠ থেকে মায়ের গর্ভে, সেখান থেকে দুনিয়ার বুকে। একইভাবে তোমাদের দুনিয়া থেকে কবরে, কবর থেকে হাশরে, হাশর থেকে চিরস্থায়ী জান্নাত কিংবা জাহান্নামে নিয়ে যাওয়া হবে।'১৫৮
আমাদের জীবনের একেকটি স্তর এরকম। এমনই কয়েকটি স্তর ইতিপূর্বে আমরা অতিক্রম করে এসেছি। পিতার পৃষ্ঠ থেকে মায়ের গর্ভে। মায়ের গর্ভ থেকে দুনিয়ার বুকে। সফরের এ স্তরগুলো আমাদের শেষ হয়েছে। এখন আমরা পরবর্তী স্তরে পৌঁছার অপেক্ষায়। সে স্তরটির নাম কবর। তবে আফসোস! আমরা নিজের জীবনটাই ধ্বংস করে চলছি অলসতা, বিলাসিতা আর আরাম-আয়েশে ডুবে থেকে। অথচ, আমাদের সামনে প্রতীক্ষমাণ কবর ও হাশর! এরপর স্থায়ী একটি অবস্থানে প্রবেশ। সে অবস্থান হয়তো চিরসুখের নীড় জান্নাত, নয়তো চিরশাস্তির গর্ত জাহান্নাম। কী যে ভীষণ বিপদ আমাদের সামনে! অথচ আমরা ডুবে আছি নিশ্চিন্তে গাফিলতির মাঝে।
আবু বকর মাররুজি রহ. বলেন :
'একদিন আমি ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল রহ.-এর সান্নিধ্যে গিয়ে তাঁকে বললাম, “সকাল কেমন হলো?"
তিনি বললেন:
“কেমন হবে তার সকাল? যার প্রতিপালক ফরজ আদায়ের আদেশ দিচ্ছেন। যার নবি সুন্নাতের প্রতি যত্নবান হওয়ার গুরুত্বারোপ করছেন। যার দুই কাঁধের ফেরেশতা বিশুদ্ধ নিয়ত ও সহিহ পদ্ধতিতে আমল করার আহ্বান জানাচ্ছেন... কিন্তু তার নফস প্রবৃত্তির অনুসরণ করতে চাচ্ছে, ইবলিস চাইছে অশ্লীলতায় ডুবাতে, মালাকুল মাওত তার দুয়ারে দাঁড়িয়ে আছে। পরিবার-পরিজন ভরণপোষণ চাইছে। এমন অবস্থায় সকাল কেমন আর হবে?”১৫৯
আবু দামরাহ রহ. সাফওয়ান বিন সুলাইম রহ. সম্পর্কে বলেন: 'আমি সাফওয়ানকে কাছ থেকে দেখেছি। যদি তাকে বলা হতো, আগামীকাল কিয়ামত সংঘটিত হবে। তবুও বৃদ্ধি করার মতো তার কোনো আমল অবশিষ্ট থাকত না।'১৬০
জনৈক সালাফ বলেন: 'যে ব্যক্তি দুনিয়াকে অপছন্দ করার দাবি করে, ততক্ষণ পর্যন্ত সে মিথ্যাবাদী, যতক্ষণ না নিজ দাবিকে সে সত্য প্রমাণ করে। অতঃপর দাবি সত্য প্রমাণিত করলেও সে পাগল।'১৬১
সালাফের এমন উক্তির কারণ হলো, দুনিয়া আখিরাতের শস্যখেত। এখান থেকেই ইবাদত ও নেক আমল করে নিতে হয়। এখন যদি সে দুনিয়া অন্বেষণকারী হয়, তবে তার দুনিয়াকে অপছন্দ করার দাবিটা মিথ্যা প্রমাণিত হয়। আর যদি সে আখিরাত অন্বেষণকারী হয়, তবে যে জায়গাটা আখিরাতের জন্য পাথেয় সংগ্রহ ও আমলের স্থান, সেটাকে অপছন্দ করা পাগলামি নয় কি?

টিকাঃ
১৪৯. আল-ইহইয়া: ৪/২৩৯
১৫০. আজ-জুহদ: ২১৭
১৫১. সহিহুল বুখারি, সহিহু মুসলিম : হাদিস নং ১৫৬১; শব্দ সহিহু মুসলিমের।
১৫২. সিফাতুস সাফওয়াহ : ২/২৫১
১৫৩. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ২/১৪৪
১৫৪. আস-সিয়ার: ৭/৪২৪
১৫৫. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৩/৮৯
১৫৬. আল-ইহইয়া: ৩/২২৪
১৫৭. দিয়ানুল ইমাম আলি: ১০০
১৫৮. আস-সিয়ার: ৫/৯১
১৫৯. মানাকিবুল ইমাম আহমাদ: ৩৫৫
১৬০. তাজকিরাতুল হুফফাজ: ১/১৩৪
১৬১. সাইদুল খাতির: ২১২

আবু জার গিফারি রা. কাবার নিকট দাঁড়িয়ে বলেন:
'হে লোকসকল, আমি জুনদুব আল-গিফারি। তোমরা তোমাদের এ কল্যাণকামী ভাইয়ের নিকটে এসো!' তাঁর এ আহ্বান শুনে লোকেরা সমবেত হলো। অতঃপর তিনি বললেন, 'তোমাদের কেউ যখন কোথাও সফর করার ইচ্ছে করে, তখন এর জন্য প্রয়োজনীয় পাথেয় সংগ্রহ করে নেয় কি না?'
লোকেরা বলল:
'অবশ্যই নেয়।'
তিনি বললেন :
'আখিরাত তো তোমাদের চূড়ান্ত গন্তব্য। তাই আখিরাতের উদ্দেশ্যে তোমাদের এ সফরের জন্য যথার্থ পাথেয় সংগ্রহ করে নাও।'
লোকেরা বলল:
'যথার্থ পাথেয় কোনটি?'
তিনি বললেন :
'তোমরা হজ করো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদির জন্য। রোজা রাখো, যদিও গ্রীষ্মকালের দীর্ঘতম দিন হোক। কবরের ভয়ে রাতের অন্ধকারে দু'রাকআত নামাজ পড়ো। যেকোনো উত্তম কথা বলো। খারাপ কথা না বলে চুপ থাকো। তবেই তোমাদের আখিরাতের জন্য পাথেয় উত্তম হবে। তোমরা নিজেদের সম্পদ থেকে সদাকা দাও, এর মাধ্যমে বিপদ-মুসিবত ও কঠিন অবস্থা থেকে মুক্তি পাবে। দুনিয়াকে তোমরা দুটি কাজের স্থান বানাও :
১. হালাল রিজিক অর্জন করা।
২. আখিরাতের কল্যাণ অন্বেষণ করা।
এ দুটি ছাড়া অন্য বিষয়গুলো তোমাদের কোনো কাজে আসবে না, বরং অন্য বিষয়গুলো ক্ষতিরই কারণ হবে। তোমরা তোমাদের সম্পদকে দুভাগে ভাগ করবে। একভাগ ব্যয় করবে পরিবার-পরিজনের ভরণপোষণে, আরেকভাগ আখিরাতের জন্য পাঠিয়ে দেবে দ্বীনিকাজে ব্যয় করার মাধ্যমে।'
প্রিয় ভাই, সে ব্যক্তির প্রতি লক্ষ করো, দুনিয়াতে যে ছিল অঢেল সম্পদের মালিক। চিন্তা করে দেখো তো, দুনিয়া থেকে যাওয়ার সময় সে কি কিছু সঙ্গে নিয়ে যেতে পেরেছে?
পূর্ববর্তী ও পরবর্তীদের অবস্থার পার্থক্য বর্ণনা করে হাসান বসরি রহ. বলেন:
'আমি এমন লোকদের সান্নিধ্য লাভে ধন্য হয়েছি, যারা পার্থিব কোনো বস্তু অর্জিত হলে খুশি হতেন না। আবার পার্থিব কোনো বস্তু হাতছাড়া হয়ে গেলে সেটা অর্জন করার চেষ্টা করতেন না। দুনিয়াটা তাদের কাছে মাটির চেয়েও তুচ্ছ ছিল। তাদের কেউ কেউ তো পঞ্চাশ-ষাট বছর এভাবে কাটিয়ে দিয়েছিলেন যে, কখনো কোনো কাঁথা বা কম্বল গায়ে জড়াননি। চুলায় হাঁড়ি চড়াননি। শোয়ার সময় মাটি ও তার পিঠের মাঝে কোনো কিছুই ছিল না। সরাসরি মাটিই ছিল তাদের বিছানা। ঘরের কাউকে কোনো দিন খাবার তৈরি করতে তারা বলেননি। ভুলেননি রাতের বেলা নামাজে দাঁড়িয়ে রাত কাটিয়ে দিতে। তারা পায়ে ভর করে দাঁড়াতেন আর নিজ চেহারাকে মাটির সাথে বিছিয়ে দিতেন।
তাদের কপাল বেয়ে প্রবাহিত হতো অশ্রুধারা। আল্লাহর দরবারে নাজাতের দুআ করতে থাকতেন তারা। কোনো ভালো আমল করতে পারলেই তারা আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতেন। দুআ করতেন কবুল হওয়ার জন্য। আর কখনো গুনাহ করে ফেললে খুবই বিষণ্ণ হতেন এবং ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকতেন। কেননা, গুনাহ থেকে বাঁচা ও কৃত গুনাহ থেকে মুক্তি পাওয়ার একমাত্র মাধ্যম হলো মাগফিরাত (আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা)। আল্লাহ তাআলা সেসব পুণ্যবান লোকের ওপর রহম করুন এবং তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হোন। '১৪৯
আমার ভাই, কোথায় আমরা আর কোথায় তাঁরা!? তাদের সাথে কি আমাদের তুলনা চলে!?
আমরা দুনিয়ার মজাদার ও উপভোগ্য বিষয় তালাশ করি। কষ্টকর বিষয়সমূহ থেকে দূরে থাকি। এ যে চরম বেহাল দশা। আমরা এমনই। কিন্তু আবু দারদা রা. কেমন ছিলেন? তিনি বলেন :
'দারিদ্র্য আমাকে আল্লাহর প্রতি বিনম্র হতে শেখায়; তাই আমি দারিদ্র্যকে ভালোবাসি। মৃত্যু আমাকে আল্লাহর প্রতি আকাঙ্ক্ষী হতে শেখায়; আমি তাই মৃত্যুকে ভালোবাসি। রোগ আমার নিকট প্রিয়; কারণ, রোগ আমার গুনাহ মুছে দেয়। '১৫০
দুনিয়া, যদিও এটি তুচ্ছ ও নিকৃষ্ট; তবুও আখিরাতে যাওয়ার পথ তো এটিই। জান্নাত কিংবা জাহান্নাম, এ দুটির কোনো একটিতে প্রবেশের রাস্তা। সুতরাং দুনিয়াতে আমাদের এমন কাজ করতে হবে, যা আমাদের পৌছিয়ে দেবে জান্নাতে।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:
حوسبَ رَجُلٌ مِمَّنْ كَانَ قَبْلَكُمْ، فَلَمْ يُوجَدْ لَهُ مِنَ الْخَيْرِ شَيْءٌ، إِلَّا أَنَّهُ كَانَ يُخَالِطُ النَّاسَ، وَكَانَ مُوسِرًا، فَكَانَ يَأْمُرُ غِلْمَانَهُ أَنْ يَتَجَاوَزُوا عَنِ الْمُعْسِرِ، قَالَ : قَالَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ : نَحْنُ أَحَقُّ بِذَلِكَ مِنْهُ، تَجَاوَزُوا عَنْهُ
'তোমাদের আগের লোকদের মধ্যে এক লোকের হিসাব গ্রহণ করা হয়। তার কোনো ভালো আমল পাওয়া যায়নি। কিন্তু সে মানুষের সাথে লেনদেন করত। সে ছিল সচ্ছল, তাই দরিদ্র লোকদের ক্ষমা করে দেওয়ার জন্য নিজের কর্মচারীদের সে নির্দেশ দিত।' রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'আল্লাহ বললেন, “ক্ষমা করার ব্যাপারে আমি তার চেয়ে অধিক যোগ্য। একে ক্ষমা করে দাও।"'১৫১
ইমাম শাফিয়ি রহ. বলেন : 'তিনটি আমল খুবই কঠিন। ১. সম্পদ কম থাকাবস্থায় দান করা। ২. একাকী নির্জন সময় দ্বীনদারি রক্ষা করা। ৩. কারো প্রতি আশা ও ভয় থাকা সত্ত্বেও তার সামনে সত্য কথা বলা।'১৫২
হাসান বসরি রহ. বলেন : 'কিয়ামতের দিন সবাই ব্যস্ত থাকবে নিজ নিজ চিন্তায়। যে ব্যক্তি কোনো কিছু নিয়ে চিন্তিত থাকে, সে উক্ত বিষয়টিরই নাম নেয়। যার আখিরাত তৈরি হয়নি, তার দুনিয়াও বরবাদ হলো। যে দুনিয়াকে আখিরাতের ওপর অগ্রাধিকার দিয়েছে, তার দুনিয়াও বরবাদ হলো আখিরাতও বরবাদ হলো। '১৫৩
দুনিয়াতে তুমি সফরে আছ। একদিন এ সফরের ইতি ঘটবে। কাফেলা পৌছে যাবে গন্তব্যে। তখন তুমি দেখলে, পাথেয় যে সাথে আনা হয়নি!
অথচ কাফেলার অন্যরা ঠিকই এনেছে! তখন তোমার লজ্জিত-অনুতপ্ত হওয়া ছাড়া কিছুই করার থাকবে না। তাই সময় থাকতে তাকওয়ার পাথেয় অর্জনে মনোযোগ দাও।
ভাই আমার, তাঁরা কোথায় আর আমরা কোথায়!?
হাফস আল-জুফি রহ. বলেন: ‘দাউদ তায়ি রহ. তার মায়ের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে চারশ দিরহাম পেয়েছিলেন। সেগুলো দিয়ে তিনি ত্রিশ বছর জীবন কাটিয়েছেন। যখন তাও ফুরিয়ে গেল, তখন তার ছোট্ট ঘরটির ছাদ ভেঙে বিক্রি করতে শুরু করলেন।’১৫৪
উমর বিন আইয়ুব রহ. বলেন: ‘আবু শা'সা (জাবির বিন জায়িদ) রহ. বলেন, “হে উমর, দুনিয়ার সম্পদ হিসেবে আমার নিকট শুধু একটি গাধা আছে।”’১৫৫
সালাফে সালিহিন দুনিয়ার সম্পদ কম রাখতেন যেন হিসাব সহজ হয়। অথচ, আমরা নিজ জীবনকে শেষ করে ফেলি শুধু সম্পদ বাড়ানোর জন্য। কত আশা আমাদের মনে—আমার এ হবে, আমার সে হবে!
বড়ই আশ্চর্য লাগে! মৃত্যু অনিবার্য সত্য জানার পরেও কী করে মানুষ এতটা আনন্দিত হতে পারে? জাহান্নাম সত্য—এ বিশ্বাস পোষণ করার পরেও কী করে মানুষ হাসতে পারে? দুনিয়া তার অধিবাসীদের সাথে এত ধোঁকাবাজি করে, তারপরও কী করে মানুষ তার মাঝে স্বস্তি অনুভব করে? তাকদির সত্য জানার পরেও কেন মানুষ অহেতুক এত কষ্ট করে? ১৫৬
رَأَيْتُ الدَّهْرَ مُخْتَلِفًا يَدُورُ * فَلَا حُزْنُ يَدُوْمُ وَلَا سُرُورُ وَقَدْ بَنَتِ الْمُلُوكُ بِهِ قُصُورًا * فَلَمْ تَبْقَ الْمُلُوْكُ وَلَا الْقُصُوْرُ
'কত চক্কর লাগিয়েছি আমি ইতিহাসের মোড়ে মোড়ে। কাছ থেকে দেখেছি মানুষের জীবন—না দুঃখ, না আনন্দ কিছুরই স্থায়িত্ব নেই। কত রাজ-রাজড়া তৈরি করেছে কত বিলাসী প্রাসাদ। কিন্তু আজ কোথায় সেই রাজা আর কোথায় সে প্রাসাদ!'১৫৭
দুনিয়াতে আমরা খেল-তামাশার মধ্যেই মত্ত হয়ে আছি। একটি বারও কি আমাদের কানে এসেছে বিলাল রহ.-এর এ কথাটুকু? তিনি বলেন:
'হে মুত্তাকিগণ, নিঃশেষ করার জন্য তোমাদের সৃষ্টি করা হয়নি। তোমাদের স্থানান্তর করা হবে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে। যেভাবে তোমরা এসেছ পিতার পৃষ্ঠ থেকে মায়ের গর্ভে, সেখান থেকে দুনিয়ার বুকে। একইভাবে তোমাদের দুনিয়া থেকে কবরে, কবর থেকে হাশরে, হাশর থেকে চিরস্থায়ী জান্নাত কিংবা জাহান্নামে নিয়ে যাওয়া হবে।'১৫৮
আমাদের জীবনের একেকটি স্তর এরকম। এমনই কয়েকটি স্তর ইতিপূর্বে আমরা অতিক্রম করে এসেছি। পিতার পৃষ্ঠ থেকে মায়ের গর্ভে। মায়ের গর্ভ থেকে দুনিয়ার বুকে। সফরের এ স্তরগুলো আমাদের শেষ হয়েছে। এখন আমরা পরবর্তী স্তরে পৌঁছার অপেক্ষায়। সে স্তরটির নাম কবর। তবে আফসোস! আমরা নিজের জীবনটাই ধ্বংস করে চলছি অলসতা, বিলাসিতা আর আরাম-আয়েশে ডুবে থেকে। অথচ, আমাদের সামনে প্রতীক্ষমাণ কবর ও হাশর! এরপর স্থায়ী একটি অবস্থানে প্রবেশ। সে অবস্থান হয়তো চিরসুখের নীড় জান্নাত, নয়তো চিরশাস্তির গর্ত জাহান্নাম। কী যে ভীষণ বিপদ আমাদের সামনে! অথচ আমরা ডুবে আছি নিশ্চিন্তে গাফিলতির মাঝে।
আবু বকর মাররুজি রহ. বলেন :
'একদিন আমি ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল রহ.-এর সান্নিধ্যে গিয়ে তাঁকে বললাম, “সকাল কেমন হলো?"
তিনি বললেন:
“কেমন হবে তার সকাল? যার প্রতিপালক ফরজ আদায়ের আদেশ দিচ্ছেন। যার নবি সুন্নাতের প্রতি যত্নবান হওয়ার গুরুত্বারোপ করছেন। যার দুই কাঁধের ফেরেশতা বিশুদ্ধ নিয়ত ও সহিহ পদ্ধতিতে আমল করার আহ্বান জানাচ্ছেন... কিন্তু তার নফস প্রবৃত্তির অনুসরণ করতে চাচ্ছে, ইবলিস চাইছে অশ্লীলতায় ডুবাতে, মালাকুল মাওত তার দুয়ারে দাঁড়িয়ে আছে। পরিবার-পরিজন ভরণপোষণ চাইছে। এমন অবস্থায় সকাল কেমন আর হবে?”১৫৯
আবু দামরাহ রহ. সাফওয়ান বিন সুলাইম রহ. সম্পর্কে বলেন: 'আমি সাফওয়ানকে কাছ থেকে দেখেছি। যদি তাকে বলা হতো, আগামীকাল কিয়ামত সংঘটিত হবে। তবুও বৃদ্ধি করার মতো তার কোনো আমল অবশিষ্ট থাকত না।'১৬০
জনৈক সালাফ বলেন: 'যে ব্যক্তি দুনিয়াকে অপছন্দ করার দাবি করে, ততক্ষণ পর্যন্ত সে মিথ্যাবাদী, যতক্ষণ না নিজ দাবিকে সে সত্য প্রমাণ করে। অতঃপর দাবি সত্য প্রমাণিত করলেও সে পাগল।'১৬১
সালাফের এমন উক্তির কারণ হলো, দুনিয়া আখিরাতের শস্যখেত। এখান থেকেই ইবাদত ও নেক আমল করে নিতে হয়। এখন যদি সে দুনিয়া অন্বেষণকারী হয়, তবে তার দুনিয়াকে অপছন্দ করার দাবিটা মিথ্যা প্রমাণিত হয়। আর যদি সে আখিরাত অন্বেষণকারী হয়, তবে যে জায়গাটা আখিরাতের জন্য পাথেয় সংগ্রহ ও আমলের স্থান, সেটাকে অপছন্দ করা পাগলামি নয় কি?

টিকাঃ
১৪৯. আল-ইহইয়া: ৪/২৩৯
১৫০. আজ-জুহদ: ২১৭
১৫১. সহিহুল বুখারি, সহিহু মুসলিম : হাদিস নং ১৫৬১; শব্দ সহিহু মুসলিমের।
১৫২. সিফাতুস সাফওয়াহ : ২/২৫১
১৫৩. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ২/১৪৪
১৫৪. আস-সিয়ার: ৭/৪২৪
১৫৫. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৩/৮৯
১৫৬. আল-ইহইয়া: ৩/২২৪
১৫৭. দিয়ানুল ইমাম আলি: ১০০
১৫৮. আস-সিয়ার: ৫/৯১
১৫৯. মানাকিবুল ইমাম আহমাদ: ৩৫৫
১৬০. তাজকিরাতুল হুফফাজ: ১/১৩৪
১৬১. সাইদুল খাতির: ২১২

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00