📘 দুনিয়া এক ধূসর মরীচিকা > 📄 পার্থিব স্বার্থের মজলিস

📄 পার্থিব স্বার্থের মজলিস


আমরা কোথায় আর তাঁরা কোথায়? কেমন আমাদের দুনিয়ার জীবন আর কেমন ছিল সালাফে সালিহিনের দুনিয়ার জীবন?
হাসান রহ. বলেন:
'সেই সত্তার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ, আমি এমন মানুষদের সান্নিধ্য লাভে ধন্য হয়েছি, যাদের নিকট দুনিয়া পায়ের তলার মাটির চেয়েও তুচ্ছ ছিল।'১০৯
আল্লাহ তাআলা হাসান রহ.-এর ওপর রহমত বর্ষণ করুন। এ কথা তো তিনি তার বেঁচে থাকার সময়ে বলেছিলেন। আজ যদি তিনি আমাদের এ যুগের অবস্থা দেখতেন, যে যুগে মানুষ দুনিয়ার জন্য কুকুরের মতো একে অপরকে তাড়া করে। আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে। বিনষ্ট করে ভ্রৃত্বের সম্পর্ক। সম্পদের জন্য শত মিথ্যা বলতেও দ্বিধাবোধ করে না। এমন দুরবস্থা দেখলে কেমন মন্তব্য করতেন তিনি?
পার্থিব স্বার্থের মজলিস
পার্থিব সম্পদের আলাপ-আলোচনা নিয়ে এ যুগে অনেক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, দুনিয়া নিয়ে সেখানে কত বাক্যালাপ চলে; কিন্তু আল্লাহর নাম সেখানে নেওয়া হয় না। এসব বৈঠকে গিবত ও পরনিন্দার কর্মযজ্ঞ তো চলে, সে সাথে হারাম খাবারেরও মেলা বসে।
গুনাহ ও অপরাধই হয়ে থাকে তাদের আলোচনার বিষয়বস্তু। পার্থিব স্বার্থের জন্য আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করা, ভালোবাসার মজবুত ভিত্তি নড়বড়ে হওয়া, বছরের পর বছর ধরে ভাইয়ে ভাইয়ে কথা না বলা, ঋণ পরিশোধে গড়িমসি করা, এতিমের মাল ভক্ষণ করতে আল্লাহকে ভয় না করা, মিথ্যা বলে ও মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়ে অপরের জমিন অন্যায়ভাবে দখল করে নেওয়া-এ সবই হয় আসরের সারকথা।
তাদের যে এক সংকীর্ণ গর্তে প্রবেশ করতে হবে, তা তারা একদম ভুলে যায়। তাদের জন্য কী অপেক্ষা করছে সেখানে, ভালো না মন্দ?—এসবের তারা থোড়াই কেয়ার করে! কিয়ামতের কঠিন ভয়াবহতা যে তাদের সামনে, এ নিয়ে তাদের কোনো মাথাব্যথা নেই!
হাসান রহ. বলেন:
'আমার বড়ই আশ্চর্য লাগে এমন মানুষকে দেখলে। কী করে তার এত হাসি পায়! অথচ জাহান্নাম হা করে আছে তার পেছনে! আমি খুবই আশ্চর্যান্বিত হই আনন্দে আত্মহারা ব্যক্তিকে দেখলে। তার এত খুশির কারণ কী? তার পেছনেই যে দাঁড়িয়ে আছে মৃত্যু!'১১০
দুনিয়ার মোহে আচ্ছন্ন, পার্থিব ভোগ-বিলাসে মত্ত, সম্পদের ধোঁকায় পতিত—এমন কত মানুষকেই তো আমরা দেখি প্রতিনিয়ত। কিন্তু ভাই আমার, এখনো কি সময় হয়নি সঠিক পথে ফিরে আসার?
একটা প্রশ্ন সকাল-সন্ধ্যা আমাদের মুখে মুখে উচ্চারিত হয় :
তবে কি আমরা দুনিয়ার জন্য কোনো কাজ করব না?... কেন করব না? অবশ্যই কাজ করব। ইসলাম তো আমাদের কাজের কথা বলে। তবে দুনিয়ার জন্য কাজ করার ক্ষেত্রে এ অসিয়তটা একটু স্মরণ রাখবেন:
সুফইয়ান সাওরি রহ.-কে একব্যক্তি বলল, 'আমাকে অসিয়ত করুন।' তিনি বললেন:
'দুনিয়ার জন্য সে পরিমাণ কাজ করো, যে পরিমাণ সময় তুমি দুনিয়াতে থাকবে। আখিরাতের জন্য সে পরিমাণ আমল করো, যে পরিমাণ সময় তোমাকে সেখানে থাকতে হবে। ব্যস, এটাই তোমার প্রতি অসিয়ত। ওয়াস-সালাম।'১১১
এবার হিসাব মিলিয়ে দেখো। দুনিয়াতে তোমাকে কতদিন থাকতে হবে আর কতদিন থাকতে হবে আখিরাতে? মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উম্মাহর গড় বয়স তো ষাট থেকে সত্তর বৎসর। এর চেয়ে অল্প বয়সেও কত মানুষ মারা যায়! এখানে আমরা বয়সের একটা সাধারণ সংখ্যা ধরলাম। এবার আখিরাতের একটি দিন নিয়ে চিন্তা করে দেখি।
কেমন হবে আখিরাতের একটি দিনের দৈর্ঘ্য? প্রশ্নের উত্তর তো আমাদের জানা নেই। কিন্তু কুরআন আমাদের জানাচ্ছে—
﴿وَإِنَّ يَوْمًا عِنْدَ رَبِّكَ كَأَلْفِ سَنَةٍ مِّمَّا تَعُدُّونَ ﴾
'আপনার পালনকর্তার কাছে একদিন তোমাদের গণনার এক হাজার বছরের সমান।' ১১২
আখিরাতের একদিন আর দুনিয়ার পুরো জীবন। তুলনা করে দেখো। সমান? নাকি তুলনা করাটাই বোকামি? এবার তুমি নিজেই ঠিক করে নাও, দুনিয়ার জন্য কতটুকু কাজ করা দরকার আর কতটুকু আমল করা দরকার আখিরাতের জন্য? আল্লাহ আমাদের তাঁর রহমতপ্রাপ্ত বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করুন। তাঁর অনুগ্রহে আমাদের জান্নাতে প্রবেশ করান। তাওফিক দান করুন তাঁর সন্তুষ্টি লাভের।
ভাই আমার,
কোনো কর্মচারী সুলতানের নিকট সম্মান ও গ্রহণযোগ্যতা পাওয়ার আশা করলে, তখন সে লক্ষ করে, কোন কাজটি সুলতানের নিকট পছন্দনীয়? আর সে ওই কাজটিই করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ১১৩
একইভাবে আমরাও যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভ করতে চাই, তবে তো আমাদের আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগিই করতে হবে। সুতরাং আমরা যারা এখন তাঁর ইবাদত-বন্দেগি করছি, তাদের জন্য আছে নাজাতের সুসংবাদ। আর যারা ইবাদত করছি না, তাদের জন্যও কিন্তু একটা সুযোগ আছে। তাওবা। হ্যাঁ, তাওবা। তাই দ্রুতই তাওবা করে আল্লাহর ইবাদতে মশগুল হয়ে যাই। বস্তুত, আমাদের যিনি সৃষ্টি করেছেন, যিনি আমাদের রিজিক দান করেন, যিনি আমাদের সুন্দর আকৃতি দিয়ে সৃষ্টি করেছেন এবং অগণিত নিয়ামত দান করেছেন—তিনিই আমাদের ইলাহ। আমাদের একমাত্র উপাস্য। আমাদের অন্তরে তাঁর প্রতি লজ্জাবোধ ও ভালোবাসা অবশ্যই থাকতে হবে।

টিকাঃ
১০৯. তাসলিয়াতু আহলিল মাসায়িব: ২৪৫
১১০. তাম্বিহুল গাফিলিন: ১/২১২
১১১. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৭/৫৬
১১২. সুরা আল-হজ: ৪৭
১১৩. আল-ফাওয়ায়িদ: ৬৮

📘 দুনিয়া এক ধূসর মরীচিকা > 📄 দুনিয়া ধোঁকার সামগ্রী

📄 দুনিয়া ধোঁকার সামগ্রী


শাদ্দাদ বিন আমর বলেন :
'আখিরাত সত্য। সেখানে সর্বশক্তিমান বাদশাহ বিচার করবেন। দুনিয়া অস্থায়ী আবাস। মানুষ ভালো-খারাপ উভয় সুবিধা ভোগ করতে পারে দুনিয়া থেকে। দুনিয়া আনুগত্যশীলদের বিপক্ষেও নয়, অবাধ্যদের পক্ষেও নয়। তোমরা দুনিয়ার জন্য মরিয়া হয়ো না, অথবা দুনিয়া ক্ষণস্থায়ী। এটা কারও হাতে বেশিক্ষণ থাকতেও না। আবার দুনিয়াকে একেবারে পরিত্যাগও কোরো না। কেননা, দুনিয়া ছাড়া আখিরাতের পুঁজি অর্জন করা যায় না।'
উবাইদ বিন উমাইর রহ. দুনিয়ার প্রতি আসক্তি ও দুনিয়া গ্রহণের ক্ষতি সম্পর্কে বলেন :
'বান্দার সম্পদ যত বৃদ্ধি পাবে, তার হিসাবও হবে তত কঠিন। যার অনুসরণকারী বেশি হবে, তার সাথে শয়তানের সংখ্যাও বেশি হবে। দুনিয়ার রাজা-বাদশাহদের সাথে সম্পর্ক যত গভীর হয়, আল্লাহর সাথে সম্পর্ক তত শিথিল হতে থাকে।'
এ ওয়াইস মাসরুক রহ. বলতেন :
'মুমিনের জন্য প্রিয় উপহার হলো তার কবর।'
দুনিয়া ধোঁকার সামগ্রী
পার্থিব জীবন ক্ষণিকের সুখস্বপ্ন কিংবা ছলনা-বিলাস বৈ কিছু নয়। কামনা-বাসনায় ঘেরা এই জগতের সর্বত্রই ভোগ-বিলাসের নিরন্তর হাতছানি। আর আখিরাত পরিণামফল লাভের অনন্ত এক জগৎ। আল্লাহ তা'আলা বলেন :
هُوَ لِلنَّاسِ حُبُّ الشَّهَوَاتِ مِنَ النِّسَاءِ وَالْبَنِينَ وَالْقَنَاطِيرِ الْمُقَنْطَرَةِ مِنَ الذَّهَبِ وَالْفِضَّةِ وَالْخَيْلِ الْمُسَوَّمَةِ وَالْأَنْعَامِ وَالْحَرْثِ ذَلِكَ مَتَاعُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَاللَّهُ عِنْدَهُ حُسْنُ الْمَآبِ
'নারী, সন্তান, রাশিকৃত স্বর্ণরৌপ্য আর চিহ্নিত অশ্বরাজি, গবাদিপশু এবং খেত-খামারের প্রতি আকর্ষণ মানুষের জন্য সুশোভিত করা হয়েছে। এসব ইহজীবনের ভোগ্যবস্তু। আর আল্লাহর নিকটই রয়েছে উত্তম আশ্রয়। '১১৪
যেসব মায়া ও মোহ দিয়ে থরে থরে সাজিয়ে তোলা হয়েছে পৃথিবী ও পার্থিব জীবন আর যেসব কামনা-বাসনা দুনিয়াবিলাসী ও আখিরাতবিমুখ মানুষের পরম আরাধ্য, সেগুলো মৌলিকভাবে সাতটি বস্তুতে সীমাবদ্ধ:
• নারীদের বিমুগ্ধ রূপলাবণ্য ও মোহিনী আকর্ষণ মানুষকে ফেলে দেয় ফিতনার জটিল আবর্তে।
• সন্তান-সন্ততি-পুরুষের সৌন্দর্য, গর্ব ও সম্মানের প্রতীক।
• স্বর্ণরৌপ্য-কামনা-বাসনার মূল চালিকাশক্তি।
• চিহ্নিত অশ্বরাজি-মালিকের মর্যাদা ও গর্বের সম্পদ। শত্রুকে ধাওয়া ও আক্রমণ এবং আত্মরক্ষা ও নিরাপত্তার মোক্ষম হাতিয়ার।
• গবাদি পশু-সফরের বাহন ও মালপত্র পরিবহনে ব্যবহার্য। দুধ, গোশত, কাঁচামাল ইত্যাদির উৎস।
খেত-খামার-মানুষ ও গবাদি পশুর আহার্য, ফলমূল ও ভেষজদ্রব্যের অকৃত্রিম উৎস।
এই ক্ষণস্থায়ী পার্থিব জীবনোপকরণগুলো বর্ণনা করার পর আল্লাহ তাআলা আখিরাতের অন্তহীন সুখ ও অনুপম শান্তির দিকে বান্দাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন:
قُلْ أَؤُنَبِّئُكُمْ بِخَيْرٍ مِنْ ذَلِكُمْ لِلَّذِينَ اتَّقَوْا عِنْدَ رَبِّهِمْ جَنَّاتُ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا وَأَزْوَاجُ مُطَهَّرَةٌ وَرِضْوَانُ مِنَ اللَّهِ وَاللَّهُ بَصِيرٌ بِالْعِبَادِ )
'বলুন, আমি কি তোমাদের এসব বস্তুর চেয়ে উৎকৃষ্টতর কোনো কিছুর সংবাদ দেবো? যারা তাকওয়া অবলম্বন করে চলে, তাদের জন্য তাদের রবের নিকট রয়েছে উদ্যানরাজি-যার পাদদেশ দিয়ে বয়ে যায় স্রোতস্বিনী। আর তারা সেখানকার চিরস্থায়ী বাসিন্দা-তাদের জন্য রয়েছে শুচিশুভ্র সহচরী আর আল্লাহর পক্ষ থেকে সন্তুষ্টি। আল্লাহ বান্দাদের সম্বন্ধে সম্যক দ্রষ্টা।'১১৫
তারপর আল্লাহ তাআলা সেসব বান্দার কথা আলোচনা করেন, যারা আখিরাতে এই অনুপম নিয়ামত ও অনুপমেয় শান্তির অধিকারী হবে। আল্লাহ বলেন :
الَّذِينَ يَقُولُونَ رَبَّنَا إِنَّنَا آمَنَّا فَاغْفِرْ لَنَا ذُنُوبَنَا وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ الصَّابِرِينَ وَالصَّادِقِينَ وَالْقَانِتِينَ وَالْمُنْفِقِينَ وَالْمُسْتَغْفِرِينَ بِالأَسْحَارِ
'যাঁরা বলে, “হে আমার রব, আমরা ইমান এনেছি; সুতরাং তুমি আমাদের পাপ মার্জনা করো এবং আমাদের আগুনের আজাব থেকে রক্ষা করো।” তাঁরা ধৈর্যশীল, সত্যবাদী, অনুগত, দানশীল এবং শেষ রাত্রে ক্ষমাপ্রার্থী। '১১৬ [১১৭]
প্রিয় ভাই,
চলো, উমর রা.-এর এ বাণীটি নিয়ে একটু ভাবি-
'ধ্বংস তার জন্য, দুনিয়া নিয়েই যার আশা। গুনাহ করে যাওয়াই যার কাজ। যে শুধু খাই খাই করে, হারাম-হালাল সব সাবাড় করে পেট মোটা করে। যার বুদ্ধিসুদ্ধি কম। ধ্বংস তার জন্য, দুনিয়া সম্পর্কে যে খুব ভালোই জ্ঞান রাখে; কিন্তু আখিরাত সম্পর্কে সে একেবারে মূর্খ- গাফিল। '১১৮
উমর রা. আবু মুসা রা.-এর নিকট প্রেরিত চিঠিতে লেখেন-
'আখিরাতের জন্য দুনিয়াবিমুখতার চেয়ে উত্তম কোনো আমল আপনি পাবেন না।'
دَعِ الْحِرْصَ عَلَى الدُّنْيَا * وَفِي الْعَيْشِ فَلَا تَطْمَعُ فَلَا تَجْمَعْ مِنَ الْمَالِ * فَمَا تَدْرِي لِمَنْ تَجْمَعْ فَإِنَّ الرِّزْقَ مَقْسُوْمُ * وَسُوْءُ الظَّنَّ لَا يَنْفَعُ فَقِيرٌ كُلُّ ذِي حِرْصٍ * وَغَنِيٌّ كُلُّ مَنْ يَقْنَعْ
'ত্যাগ করো দুনিয়ার যত লোভ, যত লালসা—ঝেটিয়ে বিদায় করো মন থেকে ভোগ-বিলাসের আকাঙ্ক্ষা। ধন সঞ্চয়ের ধান্দা ছাড়ো। কার জন্য গড়ছ সম্পদের এই পাহাড়? রিজিক তো বণ্টন হয়ে গেছে। বাজে চিন্তায় কী লাভ হবে তোমার? মনে রেখো, লোভীরা চিরকাল ফকিরই থেকে যায় আর অল্পে তুষ্ট লোক কখনই দরিদ্র হয় না।'১১৯
মানুষ দুনিয়া পরিত্যাগ করতে চায় না। জুহদ অবলম্বন করতে আগ্রহী হয় না। ভাবখানা যেন এমন—'আমি দুনিয়ার সবই গ্রহণ করব। পাশাপাশি সময় পেলে আখিরাতের জন্য কিছু আমল করে নেব। তাহলে তো আমি জান্নাতে প্রবেশ করব।' এ যে তাদের ভীষণ ভয়ংকর এক চিন্তাধারা।
আবু হাজিম রহ. বলেন:
'দুনিয়ার সকল পছন্দনীয় কর্ম ও প্রিয় বস্তু তুমি পরিত্যাগ করলে। এবার কি তুমি দুনিয়ার হবে? যদি এমনই হয়, তবে তো হয়ে গেল। যদি এমনটা না হয়, তবে দুনিয়াদারিঁর হাজার ভাগ হতে এক ভাগ ছেড়ে দিলেই কীভাবে তুমি জান্নাতে যাবে বলে আশা করো? তোমার নিকট জান্নাতের আমল কষ্টকর মনে হয়, তাই হাজার করণীয় হতে একটি করেই জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবার কীভাবে আশা করো?'১২০
দুনিয়ার হাজার ভাগের এক ভাগ গ্রহণ করলে যেমন কাউকে দুনিয়াদার বলা হয় না, তেমনই জান্নাত লাভের জন্য করণীয় কর্মের হাজার ভাগের এক ভাগ করলেও জান্নাতে যাওয়ার আশা করা যায় না।'
ফুজাইল বিন ইয়াজ রহ. বলেন: 'আল্লাহর প্রতি বান্দার ভয় ততটুকু হবে, আল্লাহ সম্পর্কে যতটুকু তার জ্ঞান থাকবে। আখিরাতের প্রতি তার আগ্রহ ততটুকু হবে, দুনিয়ার প্রতি যতটুকু তার অনাগ্রহ থাকবে। '১২১
হাসান রা. বলেন: 'দুনিয়াতে যারা নিজেদের আমলের হিসাব নেয়, চিন্তা ও কর্মের বিশুদ্ধতা যাচাই করে; তারপর যেগুলো আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হয় সেগুলোকে বহাল রাখে, যেগুলো আল্লাহর অসন্তুষ্টির কারণ হয়, সেগুলো পরিত্যাগ করে-আখিরাতে তাদের হিসাব সবচেয়ে সহজ হবে। আর যারা দুনিয়ায় যথেচ্ছভাবে চলে, আমলের কোনো পরোয়া করে না-কিয়ামতের দিন তাদের হিসাব খুব কঠিন হবে। আল্লাহর দরবারে তারা নিজেদের পাপের বড় স্তূপ দেখতে পাবে।' এরপর হাসান রা. তিলাওয়াত করলেন-
وَيَقُولُونَ يَا وَيْلَتَنَا مَالِ هَذَا الْكِتَابِ لَا يُغَادِرُ صَغِيرَةً وَلَا كَبِيرَةً إِلَّا أَحْصَاهَا وَوَجَدُوا مَا عَمِلُوا حَاضِرًا وَلَا يَظْلِمُ رَبُّكَ أَحَدًا )
'তারা বলবে, “হায় আফসোস, এ কেমন আমলনামা। এ যে ছোট-বড় কোনো কিছুই বাদ দেওয়া হয়নি, সবই তো এতে রয়েছে।” তারা তাদের কৃতকর্মকে সামনে উপস্থিত পাবে। আপনার পালনকর্তা কারও প্রতি জুলুম করবেন না।'১২২
ফসল কাটার সময় হলে চাষী অনুভব করে, এগুলো তার চেষ্টা-মেহনতের ফল, এমনিতে আসেনি। সে নিজের মেহনতকে ফসলের মাঝে দেখতে পায়। তেমনিভাবে আমরা এখানে আখিরাতের জন্য যে আমলগুলো করি, সেগুলো কিয়ামতের দিন-যেদিনটি পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান হবে, যেদিন দুগ্ধদানকারিণী মা তার দুগ্ধপোষ্য সন্তানকে ভুলে যাবে, গর্ভবর্তী তার গর্ভপাত ঘটাবে, আমলনামা আকাশে উড়বে-সে ভীষণ ভয়ের দিনে সে নিজের আমলনামা দেখতে পাবে। যদি কেউ পাপী হয়, তবে সে ভীত হবে তার পাপের বিশাল পাহাড় দেখে। যদি কেউ সৎ হয়, তবে সে আনন্দিত হবে তার নেকির বিশাল পাহাড় দেখে।
সালমান বিন দিনার রহ. বলেন: 'যে আমলটি তোমার সাথে আখিরাতে থাকাকে তুমি পছন্দ করো, তা আজই পাঠিয়ে দাও। আর যে কর্মটি তোমার সাথে আখিরাতে থাকাকে তুমি অপছন্দ করো, তা আজই পরিত্যাগ করো। '১২৩
এ দুনিয়া আমলের স্থান। কিন্তু আগামীকাল দুনিয়ার সূর্য অস্তমিত থাকবে। উদিত হবে কিয়ামত দিবসের সূর্য। আখিরাত হলো হিসাব গ্রহণ ও বিনিময় দেবার স্থান। যে পাপ করেছে, তাকে তার হিসেব দিতে হবে। যে উত্তম কাজ করেছে, তাকে তার হিসেব দিতে হবে। কিন্তু আমরা নিশ্চয় উত্তমটাই চাইব, তাই আমাদের উচিত-নিজেদের সংকল্পকে দৃঢ় করা, পরিপূর্ণ প্রস্তুতি নেওয়া এবং পাথেয় সংগ্রহ করা।
ইয়াহইয়া বিন মুআজ রহ. অসিয়ত করে বলেন : 'রাত অনেক দীর্ঘ। বেঘোরে ঘুমিয়ে সেটাকে খাটো করে ফেলো না। বরং আমলে তার সদ্ব্যবহার করো। দিন অনেক স্বচ্ছ। গুনাহ দিয়ে এ স্বচ্ছতাকে নোংরা করে ফেলো না।'
দুনিয়াতে তেমনই হও, যেমন হয় মুসাফির। দুনিয়াতে আমাদের অবস্থানের চেয়ে মৃত্যুর সফর অধিক সত্য। মৃত্যুর আগ মুহূর্তে কোনো অবকাশ থাকে না, সংবাদ দেওয়া হয় না আগে থেকে।
শুমাইত বিন আজলান রহ. বলেন:
'মৃত্যু যার চোখের সামনে থাকে, যে সর্বদা মৃত্যুর কথা স্মরণে রাখে—দুনিয়ার সচ্ছলতা বা অসচ্ছলতার পরোয়া সে করে না।'১২৪
মুহাম্মাদ বিন সুকাহ রহ. বলেন :
'আমরা এমন দুটি কাজ করি, যদিও অনেক সময় আল্লাহ তাআলা দয়া করে আমাদের আজাব দেন না; তবুও তা করে আমরা আজাবের উপযুক্ত হয়ে পড়ি। কাজ দুটি হলো :
১. পার্থিব কোনো বিষয়ে প্রবৃদ্ধি ঘটলে আমরা যতটা খুশি হই, দ্বীনি উন্নতিতে ততটা খুশি কখনো হই না।
২. পার্থিব কোনো ক্ষতি হলে আমরা কত চিন্তিতই না হয়ে পড়ি, অথচ দ্বীনি কোনো ক্ষতিতে এতটা চিন্তিত হই না।'১২৫
আমাদের অবস্থা হলো, টাকা-পয়সা ও ধন-দৌলতে একটু ঘাটতি আসলে আমরা খুবই চিন্তিত ও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ি। কিন্তু নামাজের জামাআত ছুটে গেলে একটুও চিন্তিত হই না। একটু মাথা নেড়ে ভুলে যাওয়ার কথা বলে আফসোসও যে করব, সে মূল্যবোধও আমাদের হৃদয়ে জাগ্রত হয় না।
মুহাম্মাদ বিন ওয়াসি' রহ. একজনকে বললেন :
'জান্নাতে কাউকে কাঁদতে দেখলে তুমি কি খুব আশ্চর্য হবে না?'
- হ্যাঁ, তা তো অবশ্যই।
'যে ব্যক্তি দুনিয়াতে হাসে আর আখিরাতের কথা ভুলে যায়, তার অবস্থা এর চেয়ে বেশি আশ্চর্যজনক।'১২৬
সাঈদ বিন মাসউদ রহ.-এর কথাটি আজ অনেকের ক্ষেত্রে ফলে যাচ্ছে, তিনি বলেন:
'যখন তুমি কাউকে দেখবে—তার দুনিয়া বৃদ্ধি পাচ্ছে, কিন্তু আখিরাত হ্রাস পাচ্ছে, আর সে তাতে সন্তুষ্টও; তবে সে চরম প্রতারণার শিকার। তার চোখের সামনেই তাকে নিয়ে খেলা চলছে, অথচ সে টেরই পাচ্ছে না!'১২৭
تَزَوَّدْ مِنَ الدُّنْيَا فَإِنَّكَ لَا تَدْرِي إِذَا جَنَّ لَيْلٌ هَلْ تَعِيْشُ إِلَى الْفَجْرِ فَكَمْ مِنْ فَتَى أَضْحَى وَأَمْسَى ضَاحَكًا وَقَدْ نُسِجَتْ أَكْفَانُهُ وَهُوَ لَا يَدْرِي وَكَمْ مِّنْ صِغَارٍ يُرْتَجَى طُولُ عُمْرِهِمْ وَقَدْ أُدْخِلَتْ أَجْسَادُهُمْ ظُلْمَةَ الْقَبْرِ وَكَمْ مِّنْ عَرُوسٍ زَيَّنُوْهَا لِزَوْجِهَا وَقَدْ قُبِضَتْ أَرْوَاحُهُمْ لَيْلَةَ الْعُرْسِ
'যত দ্রুত পারো গুছিয়ে নাও তোমার পাথেয়। জানো না তুমি, আগামীকালের সূর্যোদয় তুমি দেখবে কি না। কত যুবক হেসে-খেলে পাড়ি জমায় সকাল থেকে সন্ধ্যায়। এদিকে বোনা হয়ে গেছে তার কাফন, সে তার কিছুই জানে না। কত কিশোর স্বপ্ন দেখে দীর্ঘ জীবনের। কত শিশুর দেহ মিশে যায় কবরের ধুলোয়। কত নববধূ সেজেগুজে আসে স্বামীর গৃহে—ভোর না হতেই হারিয়ে যায় সে চির অজানার দেশে।'
'দুনিয়াটা এমনই। চারদিকে ধোঁকার ছড়াছড়ি। তাই যথাসম্ভব বেঁচে থাকতে হবে প্রতারণা থেকে। দুনিয়ার নিরাপত্তায়ও লুকিয়ে থাকে বিপদের শঙ্কা। দুনিয়ার আশাগুলো মরুভূমির ধূসর মরীচিকা। পার্থিব জীবন বড়ই তুচ্ছ।
এর স্বচ্ছতায়ও মিশে থাকে পঙ্কিলতা। মাথার ওপর সর্বক্ষণ ঝুলে থাকে আশঙ্কার তরবারি। বিপদে পতিত হওয়ার দৃশ্য এখানে খুবই স্বাভাবিক। যেকোনো সময় নিঃশেষ হয়ে যেতে পারে যেকোনো নিয়ামত কিংবা দুয়ারে কড়া নাড়তে পারে মৃত্যুর ফেরেশতা সফরের পরোয়ানা হাতে। '১২৮

টিকাঃ
১১৪. সুরা আলি ইমরান: ১১৪
১১৫. সুরা আলি ইমরান: ১৫
১১৬. সুরা আলি ইমরান: ১৬-১৭
১১৭. উদ্দাতুস সাবিরিন: ২০৯
১১৮. আল-আকিবাহ: ৯০
১১৯. বুসতানুল আরিফিন: ১৫
১২০. তাম্বিহুল গাফিলিন: ১/৮৫
১২১. আস-সিয়ার: ৮/৪২৬
১২২. সুরা আল-কাহফ: ৪৯
১২৩. সিফাতুস সাফওয়াহ: ২/১৬৬
১২৪. সিফাতুস সাফওয়াহ: ৩/৩৪২
১২৫. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৫/৪
১২৬. আল-ইহইয়া: ৩/১৩৭
১২৭. মুকাশাফাতুল কুলুব: ১৫৭
১২৮. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ২/১৩৬

📘 দুনিয়া এক ধূসর মরীচিকা > 📄 দুনিয়া কষ্টের আর আখিরাত প্রতিদানের

📄 দুনিয়া কষ্টের আর আখিরাত প্রতিদানের


আবু হুরাইরা রা. আমাদের অবস্থার যথাযথ বিবরণ দিয়েছেন। তিনি বলেন: 'তোমরা নিজেদের বিরুদ্ধে ক্ষতিকর কর্মযজ্ঞে লিপ্ত হয়েছ। তোমরা এমন বিষয়ের আশা করছ, যা পাওয়ার নয়। এমন খাবারের স্তূপ করছ—যা খেতে পারবে না। এমন দালানকোঠা নির্মাণ করছ, যাতে তোমরা বসবাস করতে পারবে না।'১২৯
আবু হাজিম রহ. বলেন: 'আমাকে যা দান করা হয়েছে তার অনিষ্ট থেকে যদি আমাকে নিরাপদ রাখা হয়, তাহলে আমাকে যা দেওয়া হয়নি, তা না থাকার কারণে আমি অসন্তোষ বোধ করি না।'১৩০
আবু মিহরাজ আত-তাফাবি রহ. বলেন: 'যুবক বয়সে আমাদের এক দাসীকে আমি আমার স্বল্প আয়ের অভিযোগ করেছিলাম। সে আমাকে বলেছিল, "দুনিয়া তালাশের চাইতে অল্পতুষ্টির গুণ অবলম্বন করুন। অনেককেই দুনিয়ার পেছনে পড়তে দেখেছি; তবে খুব কমই সুস্থ অবস্থায় ফিরে এসেছে।” আবু মিহরাজ রহ. বলেন, “অল্পতুষ্টির গুণ অবলম্বন করার ক্ষেত্রে তার কথার বরকত আমি এখনো অনুভব করি।"'
শুআইব বিন হারব রহ. বলেন:
'যে ব্যক্তি দুনিয়া কামনা করে, সে যেন লাঞ্ছনা বরণ করার জন্য প্রস্তুত থাকে। আর যে লাঞ্ছনা বরণ করার জন্য প্রস্তুত থাকে, সে লাগামহীন হয়ে পড়ে। তার দৃষ্টিতে হালাল-হারামের পার্থক্য থাকে না। সে হয়ে পড়ে পুরোদস্তুর বস্তুবাদী। দুনিয়াই হয় তার একমাত্র ধ্যান-জ্ঞান।'
দুনিয়ার প্রতি মানুষের প্রবল আসক্তি দেখে আবু হাজিম রহ. বলেন :
'তোমরা জুতা ছিঁড়ে যাওয়াকে যেভাবে ভয় করো, সেভাবে যদি দ্বীনের ক্ষতি হওয়াকে ভয় করতে! তবুও তা আমার প্রিয় ছিল।'
দুনিয়া কষ্টের আর আখিরাত প্রতিদানের
'মহানিয়ন্ত্রক প্রভু আল্লাহ তাআলা আখিরাতকে বানিয়েছেন প্রতিদান দেওয়ার স্থান। সেখানে কেউ ভালো প্রতিদান পাবে, কেউ-বা কাতর হবে শাস্তির যন্ত্রণায়। অন্যদিকে আল্লাহ তাআলা দুনিয়াকে বানিয়েছেন ধৈর্যধারণ, পাথেয় অর্জন ও প্রস্তুতি গ্রহণের স্থান। প্রস্তুতি গ্রহণ করা মানে কেবল পুনরুত্থানের জন্য প্রস্তুতি নয়; বরং জীবনের জন্যও কিছু প্রস্তুতি নিতে হয়। কারণ, এ জীবনই আখিরাতের মুক্তি ও শান্তি অর্জনের মাধ্যম। দুনিয়া আখিরাতের শস্যখেত।' ১৩১
ইয়াহইয়া বিন মুআজ রহ. বলেন :
'হে আদমসন্তান, তুমি দুনিয়াকে এমনভাবে কামনা করছ, যেন দুনিয়া ছাড়া তোমার কোনো উপায় নেই। আর আখিরাতকে এমন ভঙ্গিতে তলব করছ, যেন আখিরাতের খুব একটা দরকার নেই। অথচ, তুমি না চাইলেও দুনিয়া তোমার প্রয়োজনমাফিক পেয়ে যাবে। কিন্তু আখিরাতকে অবশ্যই চেয়ে নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে কি একটু বুদ্ধি খাটাতে পারো না?' ১৩২
ইয়াহইয়া রহ. বলেন:
'দুনিয়া পরিত্যাগ করা কঠিন। জান্নাত অর্জন করা আরও বেশি কঠিন। আর জান্নাতের মোহরানা হলো দুনিয়া পরিত্যাগ করা।'১৩০
আমরা কি এই মোহরানা জোগাড় করেছি? আমরা তো এই দুনিয়ার মাঝেই মত্ত হয়ে আছি! অথচ আমরা জানি, সুখের পরে দুঃখ আসে, শান্তির পরে অশান্তি।
আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রা. বলেন:
'প্রত্যেক আনন্দের পরে দুঃখ আছে। কোনো ঘর যখন খুশি-আনন্দে ভরপুর হয়, কিছুদিন পর সে ঘরে হানা দেয় দুঃখ-কষ্ট।'১৩৪
জনৈক সালাফ বলেন:
'হে আদমসন্তান, দুনিয়ায় তোমার অংশের প্রতি তুমি মুখাপেক্ষী হলেও আখিরাতে তোমার অংশের প্রতি তুমি এর চেয়েও বেশি মুখাপেক্ষী। যদি দুনিয়ার অংশের প্রতি বেশি গুরুত্ব দাও, তাহলে আখিরাতের অংশ হারিয়ে ফেলবে। তার সাথে আশঙ্কা আছে দুনিয়ার অংশটাও হারিয়ে ফেলার। তখন হারাবে একূল-ওকূল সবটাই। পক্ষান্তরে, যদি আখিরাতের অংশের প্রতি গুরুত্ব দাও, তখন দেখবে—দুনিয়ার অংশও তোমার পক্ষে চলে এসেছে। তাই দুনিয়া ও আখিরাতকে এভাবে বিন্যাস করে নাও।'১৩৫

টিকাঃ
১২৯. আহমাদ রহ. কৃত আজ-জুহদ: হাদিস নং ৬১৮
১৩০. আদাবুদ দুনিয়া ওয়াদ দ্বীন: ১২১
১৩১. আল-ইহইয়া: ২/৬৯
১৩২. সিফাতুস সাফওয়াহ: ৪/৯৩
১৩৩. তাম্বিহুল গাফিলিন: ১/৮৫
১৩৪. তাসলিয়াতু আহলিল মাসায়িব: ১৫
১৩৫. ফাজায়িলুজ জিকর, ইবনুল জাওজি রহ. : ১৯

আবু হুরাইরা রা. আমাদের অবস্থার যথাযথ বিবরণ দিয়েছেন। তিনি বলেন: 'তোমরা নিজেদের বিরুদ্ধে ক্ষতিকর কর্মযজ্ঞে লিপ্ত হয়েছ। তোমরা এমন বিষয়ের আশা করছ, যা পাওয়ার নয়। এমন খাবারের স্তূপ করছ—যা খেতে পারবে না। এমন দালানকোঠা নির্মাণ করছ, যাতে তোমরা বসবাস করতে পারবে না।'১২৯
আবু হাজিম রহ. বলেন: 'আমাকে যা দান করা হয়েছে তার অনিষ্ট থেকে যদি আমাকে নিরাপদ রাখা হয়, তাহলে আমাকে যা দেওয়া হয়নি, তা না থাকার কারণে আমি অসন্তোষ বোধ করি না।'১৩০
আবু মিহরাজ আত-তাফাবি রহ. বলেন: 'যুবক বয়সে আমাদের এক দাসীকে আমি আমার স্বল্প আয়ের অভিযোগ করেছিলাম। সে আমাকে বলেছিল, "দুনিয়া তালাশের চাইতে অল্পতুষ্টির গুণ অবলম্বন করুন। অনেককেই দুনিয়ার পেছনে পড়তে দেখেছি; তবে খুব কমই সুস্থ অবস্থায় ফিরে এসেছে।” আবু মিহরাজ রহ. বলেন, “অল্পতুষ্টির গুণ অবলম্বন করার ক্ষেত্রে তার কথার বরকত আমি এখনো অনুভব করি।"'
শুআইব বিন হারব রহ. বলেন:
'যে ব্যক্তি দুনিয়া কামনা করে, সে যেন লাঞ্ছনা বরণ করার জন্য প্রস্তুত থাকে। আর যে লাঞ্ছনা বরণ করার জন্য প্রস্তুত থাকে, সে লাগামহীন হয়ে পড়ে। তার দৃষ্টিতে হালাল-হারামের পার্থক্য থাকে না। সে হয়ে পড়ে পুরোদস্তুর বস্তুবাদী। দুনিয়াই হয় তার একমাত্র ধ্যান-জ্ঞান।'
দুনিয়ার প্রতি মানুষের প্রবল আসক্তি দেখে আবু হাজিম রহ. বলেন :
'তোমরা জুতা ছিঁড়ে যাওয়াকে যেভাবে ভয় করো, সেভাবে যদি দ্বীনের ক্ষতি হওয়াকে ভয় করতে! তবুও তা আমার প্রিয় ছিল।'
দুনিয়া কষ্টের আর আখিরাত প্রতিদানের
'মহানিয়ন্ত্রক প্রভু আল্লাহ তাআলা আখিরাতকে বানিয়েছেন প্রতিদান দেওয়ার স্থান। সেখানে কেউ ভালো প্রতিদান পাবে, কেউ-বা কাতর হবে শাস্তির যন্ত্রণায়। অন্যদিকে আল্লাহ তাআলা দুনিয়াকে বানিয়েছেন ধৈর্যধারণ, পাথেয় অর্জন ও প্রস্তুতি গ্রহণের স্থান। প্রস্তুতি গ্রহণ করা মানে কেবল পুনরুত্থানের জন্য প্রস্তুতি নয়; বরং জীবনের জন্যও কিছু প্রস্তুতি নিতে হয়। কারণ, এ জীবনই আখিরাতের মুক্তি ও শান্তি অর্জনের মাধ্যম। দুনিয়া আখিরাতের শস্যখেত।' ১৩১
ইয়াহইয়া বিন মুআজ রহ. বলেন :
'হে আদমসন্তান, তুমি দুনিয়াকে এমনভাবে কামনা করছ, যেন দুনিয়া ছাড়া তোমার কোনো উপায় নেই। আর আখিরাতকে এমন ভঙ্গিতে তলব করছ, যেন আখিরাতের খুব একটা দরকার নেই। অথচ, তুমি না চাইলেও দুনিয়া তোমার প্রয়োজনমাফিক পেয়ে যাবে। কিন্তু আখিরাতকে অবশ্যই চেয়ে নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে কি একটু বুদ্ধি খাটাতে পারো না?' ১৩২
ইয়াহইয়া রহ. বলেন:
'দুনিয়া পরিত্যাগ করা কঠিন। জান্নাত অর্জন করা আরও বেশি কঠিন। আর জান্নাতের মোহরানা হলো দুনিয়া পরিত্যাগ করা।'১৩০
আমরা কি এই মোহরানা জোগাড় করেছি? আমরা তো এই দুনিয়ার মাঝেই মত্ত হয়ে আছি! অথচ আমরা জানি, সুখের পরে দুঃখ আসে, শান্তির পরে অশান্তি।
আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রা. বলেন:
'প্রত্যেক আনন্দের পরে দুঃখ আছে। কোনো ঘর যখন খুশি-আনন্দে ভরপুর হয়, কিছুদিন পর সে ঘরে হানা দেয় দুঃখ-কষ্ট।'১৩৪
জনৈক সালাফ বলেন:
'হে আদমসন্তান, দুনিয়ায় তোমার অংশের প্রতি তুমি মুখাপেক্ষী হলেও আখিরাতে তোমার অংশের প্রতি তুমি এর চেয়েও বেশি মুখাপেক্ষী। যদি দুনিয়ার অংশের প্রতি বেশি গুরুত্ব দাও, তাহলে আখিরাতের অংশ হারিয়ে ফেলবে। তার সাথে আশঙ্কা আছে দুনিয়ার অংশটাও হারিয়ে ফেলার। তখন হারাবে একূল-ওকূল সবটাই। পক্ষান্তরে, যদি আখিরাতের অংশের প্রতি গুরুত্ব দাও, তখন দেখবে—দুনিয়ার অংশও তোমার পক্ষে চলে এসেছে। তাই দুনিয়া ও আখিরাতকে এভাবে বিন্যাস করে নাও।'১৩৫

টিকাঃ
১২৯. আহমাদ রহ. কৃত আজ-জুহদ: হাদিস নং ৬১৮
১৩০. আদাবুদ দুনিয়া ওয়াদ দ্বীন: ১২১
১৩১. আল-ইহইয়া: ২/৬৯
১৩২. সিফাতুস সাফওয়াহ: ৪/৯৩
১৩৩. তাম্বিহুল গাফিলিন: ১/৮৫
১৩৪. তাসলিয়াতু আহলিল মাসায়িব: ১৫
১৩৫. ফাজায়িলুজ জিকর, ইবনুল জাওজি রহ. : ১৯

📘 দুনিয়া এক ধূসর মরীচিকা > 📄 উমর বিন আব্দুল আজিজ রহ.-এর প্রতি হাসান বসরি রহ.-এর চিঠি

📄 উমর বিন আব্দুল আজিজ রহ.-এর প্রতি হাসান বসরি রহ.-এর চিঠি


'সালাত ও সালামের পর,
দুনিয়া প্রস্থান করার স্থান, অবস্থান করার জায়গা নয়। আদম আ. পৃথিবীতে এসেছিলেন শাস্তিস্বরূপ। সুতরাং, দুনিয়া থেকে বেঁচে থাকুন, হে আমিরুল মুমিনিন, দুনিয়া থেকে সংগ্রহযোগ্য পাথেয় হলো, দুনিয়াবিমুখতা; দুনিয়াতে প্রাচুর্য হলো এর দারিদ্র্য। প্রতিটি মুহূর্তে তার কোলে কেউ না কেউ লাশ হচ্ছে। যে তাকে সম্মান করে, সে তাকে লাঞ্ছিত করে। যে তাকে সঞ্চয় করে, সে তাকে অভাবী বানায়। দুনিয়া বিষের মতো, মানুষ না জেনে সুস্থ হওয়ার জন্য খায়; অথচ এটা তার মৃত্যু। রোগী যেমন পথ্য খায়, আপনিও দুনিয়া থেকে ততটুকু গ্রহণ করুন। আর দুনিয়ার বিপদকে আপনার রোগের ওষুধ মনে করে সবর করুন—মানুষ যেমন রোগব্যাধি দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কায় তিক্ত ওষুধ খায়।
এই কপট, ধোঁকাবাজ, প্রতারক ও প্রবঞ্চক দুনিয়ার ব্যাপারে সতর্ক হোন। প্রতারণা দিয়েই দুনিয়া নিজেকে সজ্জিত করেছে। ধোঁকা দিয়েই সে মানুষকে ফিতনায় ফেলে এবং অন্তরে আশা জাগিয়ে প্রবঞ্চিত করে। সে সবার কামনা-বাসনার পাত্র হতে চায়। তাই সে বিয়ের কনের মতো সেজেগুজে বসে থাকে। তার দিকে দৃষ্টি আকর্ষিত হয়, অন্তর আসক্ত হয়। হৃদয় তাকে পেতে পাগলপারা হয়। সে তার সব স্বামীদের হত্যা করে। অবশিষ্টরা পূর্বের স্বামীদের পরিণতি দেখে শিক্ষা গ্রহণ করে না। আল্লাহর প্রিয় বান্দাকে যখন দুনিয়ার বাস্তবতা সম্পর্কে বলা হয়, সে নসিহত কবুল করে।
দুনিয়াসক্ত লোক দুনিয়ার সুখ পেয়ে বিভ্রান্ত হয়, নাফরমানিতে লিপ্ত হয় এবং আখিরাতকে ভুলে যায়। দুনিয়ার মোহে পড়ে তার আকল বিকল হয়ে যায়। ফলে তার পদস্খলন ঘটে। পরিণামে সে লজ্জিত হয়। আফসোস করা ছাড়া তার উপায় থাকে না। অবশেষে ভয়াল মৃত্যু তার সমূহ যন্ত্রণা নিয়ে হাজির হয়। দুনিয়া হারানোর বেদনা তাকে অতিষ্ঠ করে তোলে। হাজারো আশা-আকাঙ্ক্ষা ভারী করে তোলে তার বুক। আগামী জীবনে পথচলার কোনো পাথেয় তার হাতে থাকে না। ফলে নিঃস্ব অবস্থায় সে পরপারে পাড়ি জমায়।
দুনিয়ার ব্যাপারে সতর্ক হোন, হে আমিরুল মুমিনিন, দুনিয়া বেশ আনন্দের, আবার আশঙ্কারও। কেননা, যখনই আপনি প্রসন্ন হবেন, নতুন সমস্যা এসে আপনাকে বিষণ্ণ করে তুলবে। আজকের সুখী মানুষটির আগামীকালে দুঃখের শেষ থাকে না। দুঃখের পরেই এখানে সুখ পাওয়া যায়। এই স্থায়িত্ব খুব শীঘ্রই অস্থায়িত্বে রূপ নেয়। সুতরাং দুনিয়ার হাসি-আনন্দ নির্ভেজাল নয়—এতে দুঃখ-বেদনার মিশেল থাকে। দুনিয়াতে যা একবার হারিয়ে যায়, তা আর পাওয়া যায় না। যা ভবিষ্যতে পাওয়া হবে, তা তড়িঘড়ি করে চাইলে পাওয়া যায় না— অপেক্ষা করতে হয়। দুনিয়ার আকাঙ্ক্ষাগুলো মিথ্যে, প্রত্যাশাগুলো অর্থহীন। দুনিয়ার বিশুদ্ধতায়ও থাকে দূষণের উৎপাত, শান্তিতেও থাকে অশান্তির হা-হুতাশ।
আল্লাহ তাআলা যদি দুনিয়ার ব্যাপারে কিছু নাও বলতেন, কোনো উপমাও যদি পেশ না করতেন, তবুও তো দুনিয়ার নির্মম বাস্তবতা মানুষদের ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলত, গাফিলদের সতর্ক করে দিত। অথচ, আল্লাহ তাআলা কত সতর্ককারী পাঠিয়েছেন, কত নসিহতকারী প্রেরণ করেছেন!
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সামনে দুনিয়ার ধনভান্ডারের সমস্ত চাবি পেশ করা হয়েছিল, তিনি গ্রহণ করেননি। আল্লাহ তাআলা যা ঘৃণা করেন, তাকে ভালোবাসতে তিনি রাজি হননি। আল্লাহ তাআলা যাকে তুচ্ছ করেছেন, তাকে তিনি মর্যাদা দেননি। আল্লাহ তাআলা নেককারদের পরীক্ষাস্বরূপ সম্পদ থেকে বঞ্চিত করেন এবং তাঁর দুশমনদের জন্য তা বিস্তৃত করে দেন। তারা ভাবে, সম্পদ দিয়ে আল্লাহ তাআলা তাদের সম্মানিত করেছেন। তারা বুঝতে পারে না, সম্পদ তাদের প্রতারিত করছে। তারা ভুলে যায়, আল্লাহ তাআলার প্রিয় হাবিব পেটে পাথর বেঁধেছিলেন।
এখান থেকে স্পষ্ট হয়ে যায়, দুনিয়া আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের ভালোবাসার বস্তু নয়। তাঁর শত্রুরাই দুনিয়াকে ভালোবাসে। বর্ণিত আছে, আল্লাহ তাআলা মুসা আ.-কে বলেন :
يَا مُوسَى ، إِذَا رَأَيْتَ الْغِنَى مُقْبِلا فَقُلْ : ذَنْبُ عُجِّلَتْ عُقُوبَتُهُ وَإِذَا رَأَيْتَ الْفَقْرَ مُقْبِلا فَقُلْ مَرْحَبًا بِشِعَارِ الصَّالِحِينَ
'হে মুসা, যখন ধনাঢ্যতাকে তোমার দিকে আসতে দেখবে, তখন বলবে, “পাপ আমার শাস্তিকে ত্বরান্বিত করছে!” আর যখন দারিদ্র্যকে তোমার দিকে আসতে দেখবে, তখন বলবে, “স্বাগতম হে নেককারদের প্রতীক।””১৩৬
ভাই আমার, দুনিয়া তোমার সামনে কাউকে গিলে নিচ্ছে।...আর আখিরাতের সূর্য তোমাকে ভয় দেখিয়ে এগিয়ে আসছে।... কেমন অবস্থা এখন তোমার?
এ গমনাগমনকে তুমি কীভাবে দেখো?
আমরা সালমান রা.-এর অবস্থাটা দেখি। এমন মুহূর্তে কেমন ছিল তাঁর অবস্থা? মৃত্যুর আগ মুহূর্তে তিনি কাঁদতে লাগলেন। তাঁকে বলা হলো, 'রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাহাবি হয়েও মৃত্যুর সময় আপনি কাঁদছেন!'
তিনি বললেন:
'দুনিয়া হারানোর আফসোস কিংবা তার অনুরাগের কারণে আমি কাঁদছি না। আমি কাঁদছি এ কারণে যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের নিকট একটি অঙ্গীকার রেখেছিলেন। কিন্তু আমরা সে অঙ্গীকার রক্ষা করতে পারিনি। সে অঙ্গীকার ছিল, দুনিয়াতে আমাদের সম্পদ হবে একজন মুসাফিরের সম্পদের পরিমাণ। কিন্তু এগুলো...' এ বলে তিনি তাঁর সমুদয় সম্পত্তির দিকে তাকালেন। অথচ, তাঁর সেই সম্পত্তির পরিমাণ ছিল বিশ দিরহাম থেকে ত্রিশ দিরহামের সামান্য বেশি! ১৩৭ এ সামান্য সম্পদ থাকার কারণেও তাঁর এত ভয়!
'দুনিয়া এক ধূসর মরীচিকা। দুনিয়া এক অন্ধকার রাত্রি। দুনিয়া অন্বেষণকারী সমুদ্রের পানি পানকারীর ন্যায়—যতই সে পান করে, ততই তার তৃষ্ণা বৃদ্ধি পায়। '১৩৮
দুনিয়াভোগের কোনো সীমা-পরিসীমা নেই। নেই কোনো থামার স্থান। অল্পতুষ্টি, দুনিয়াবিমুখতা, আল্লাহর বণ্টনের ওপর সন্তুষ্টি ও রাত-দিন আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগি করা ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে দুনিয়াকে আয়ত্তে আনা সম্ভব নয়।
মালিক বিন দিনার রহ. বলেন:
'দুনিয়াদাররা দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছে, কিন্তু দুনিয়ার সবচেয়ে সুস্বাদু বস্তুটির স্বাদ তারা আস্বাদন করতে পারেনি।' জিজ্ঞেস করা হলো, 'সেই সুস্বাদু বস্তুটি কী?' তিনি উত্তরে বলেন, 'আল্লাহর পরিচয় লাভ করা। '১৩৯
মৃত্যুকালে নেককার বান্দাদের অনেক নিশ্চিন্ত ও প্রশান্ত দেখায়। কিন্তু যারা দুনিয়াতে হালাল-হারামের ব্যবধানের প্রতি কোনো তোয়াক্কা করে না, দুনিয়ার চাকচিক্যের পেছনে যারা দৌড়ায়, মৃত্যুকালে তারা খুব বিচলিত ও চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়ে।
আবু দারদা রা. বলেন:
'দুনিয়াতে যদি তিনটি বিষয় না থাকত, তবে আমি জমিনের ওপরে থাকার চেয়ে জমিনের নিচে চলে যাওয়াকে শ্রেয় মনে করতাম। ১. যদি এখানে এমন ভাইয়েরা না থাকত, যারা আমাকে উত্তম ও সুমিষ্ট কথা শোনায়। ২. যদি আল্লাহর সিজদা করতে গিয়ে আমার কপাল ধুলোমিশ্রিত হওয়া না থাকত। ৩. যদি জিহাদে একটি সকাল বা একটি সন্ধ্যা কাটানোর সুযোগ না থাকত। ১৪০
উহাইব বিন ওয়ারদ রহ. বলেন:
‘জুহদ হলো পার্থিব কোনো বস্তু হাতছাড়া হয়ে গেলে আফসোস না করা এবং পার্থিব কোনো বস্তু হাতে আসলে আনন্দিত না হওয়া। ১৪১

টিকাঃ
১৩৬. উদ্দাতুস সাবিরিন: ৩৩১
১৩৭. আদাবুদ দুনিয়া ওয়াদ-দ্বীন: ১১৯
১৩৮. আস-সিয়ার: ৫/২৬৩
১৩৯. মাদারিজুস সালিকিন: ২/২৩৩
১৪০. আজ-জুহদ: ১৯৮
১৪১. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৮/১৪০

'সালাত ও সালামের পর,
দুনিয়া প্রস্থান করার স্থান, অবস্থান করার জায়গা নয়। আদম আ. পৃথিবীতে এসেছিলেন শাস্তিস্বরূপ। সুতরাং, দুনিয়া থেকে বেঁচে থাকুন, হে আমিরুল মুমিনিন, দুনিয়া থেকে সংগ্রহযোগ্য পাথেয় হলো, দুনিয়াবিমুখতা; দুনিয়াতে প্রাচুর্য হলো এর দারিদ্র্য। প্রতিটি মুহূর্তে তার কোলে কেউ না কেউ লাশ হচ্ছে। যে তাকে সম্মান করে, সে তাকে লাঞ্ছিত করে। যে তাকে সঞ্চয় করে, সে তাকে অভাবী বানায়। দুনিয়া বিষের মতো, মানুষ না জেনে সুস্থ হওয়ার জন্য খায়; অথচ এটা তার মৃত্যু। রোগী যেমন পথ্য খায়, আপনিও দুনিয়া থেকে ততটুকু গ্রহণ করুন। আর দুনিয়ার বিপদকে আপনার রোগের ওষুধ মনে করে সবর করুন—মানুষ যেমন রোগব্যাধি দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কায় তিক্ত ওষুধ খায়।
এই কপট, ধোঁকাবাজ, প্রতারক ও প্রবঞ্চক দুনিয়ার ব্যাপারে সতর্ক হোন। প্রতারণা দিয়েই দুনিয়া নিজেকে সজ্জিত করেছে। ধোঁকা দিয়েই সে মানুষকে ফিতনায় ফেলে এবং অন্তরে আশা জাগিয়ে প্রবঞ্চিত করে। সে সবার কামনা-বাসনার পাত্র হতে চায়। তাই সে বিয়ের কনের মতো সেজেগুজে বসে থাকে। তার দিকে দৃষ্টি আকর্ষিত হয়, অন্তর আসক্ত হয়। হৃদয় তাকে পেতে পাগলপারা হয়। সে তার সব স্বামীদের হত্যা করে। অবশিষ্টরা পূর্বের স্বামীদের পরিণতি দেখে শিক্ষা গ্রহণ করে না। আল্লাহর প্রিয় বান্দাকে যখন দুনিয়ার বাস্তবতা সম্পর্কে বলা হয়, সে নসিহত কবুল করে।
দুনিয়াসক্ত লোক দুনিয়ার সুখ পেয়ে বিভ্রান্ত হয়, নাফরমানিতে লিপ্ত হয় এবং আখিরাতকে ভুলে যায়। দুনিয়ার মোহে পড়ে তার আকল বিকল হয়ে যায়। ফলে তার পদস্খলন ঘটে। পরিণামে সে লজ্জিত হয়। আফসোস করা ছাড়া তার উপায় থাকে না। অবশেষে ভয়াল মৃত্যু তার সমূহ যন্ত্রণা নিয়ে হাজির হয়। দুনিয়া হারানোর বেদনা তাকে অতিষ্ঠ করে তোলে। হাজারো আশা-আকাঙ্ক্ষা ভারী করে তোলে তার বুক। আগামী জীবনে পথচলার কোনো পাথেয় তার হাতে থাকে না। ফলে নিঃস্ব অবস্থায় সে পরপারে পাড়ি জমায়।
দুনিয়ার ব্যাপারে সতর্ক হোন, হে আমিরুল মুমিনিন, দুনিয়া বেশ আনন্দের, আবার আশঙ্কারও। কেননা, যখনই আপনি প্রসন্ন হবেন, নতুন সমস্যা এসে আপনাকে বিষণ্ণ করে তুলবে। আজকের সুখী মানুষটির আগামীকালে দুঃখের শেষ থাকে না। দুঃখের পরেই এখানে সুখ পাওয়া যায়। এই স্থায়িত্ব খুব শীঘ্রই অস্থায়িত্বে রূপ নেয়। সুতরাং দুনিয়ার হাসি-আনন্দ নির্ভেজাল নয়—এতে দুঃখ-বেদনার মিশেল থাকে। দুনিয়াতে যা একবার হারিয়ে যায়, তা আর পাওয়া যায় না। যা ভবিষ্যতে পাওয়া হবে, তা তড়িঘড়ি করে চাইলে পাওয়া যায় না— অপেক্ষা করতে হয়। দুনিয়ার আকাঙ্ক্ষাগুলো মিথ্যে, প্রত্যাশাগুলো অর্থহীন। দুনিয়ার বিশুদ্ধতায়ও থাকে দূষণের উৎপাত, শান্তিতেও থাকে অশান্তির হা-হুতাশ।
আল্লাহ তাআলা যদি দুনিয়ার ব্যাপারে কিছু নাও বলতেন, কোনো উপমাও যদি পেশ না করতেন, তবুও তো দুনিয়ার নির্মম বাস্তবতা মানুষদের ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলত, গাফিলদের সতর্ক করে দিত। অথচ, আল্লাহ তাআলা কত সতর্ককারী পাঠিয়েছেন, কত নসিহতকারী প্রেরণ করেছেন!
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সামনে দুনিয়ার ধনভান্ডারের সমস্ত চাবি পেশ করা হয়েছিল, তিনি গ্রহণ করেননি। আল্লাহ তাআলা যা ঘৃণা করেন, তাকে ভালোবাসতে তিনি রাজি হননি। আল্লাহ তাআলা যাকে তুচ্ছ করেছেন, তাকে তিনি মর্যাদা দেননি। আল্লাহ তাআলা নেককারদের পরীক্ষাস্বরূপ সম্পদ থেকে বঞ্চিত করেন এবং তাঁর দুশমনদের জন্য তা বিস্তৃত করে দেন। তারা ভাবে, সম্পদ দিয়ে আল্লাহ তাআলা তাদের সম্মানিত করেছেন। তারা বুঝতে পারে না, সম্পদ তাদের প্রতারিত করছে। তারা ভুলে যায়, আল্লাহ তাআলার প্রিয় হাবিব পেটে পাথর বেঁধেছিলেন।
এখান থেকে স্পষ্ট হয়ে যায়, দুনিয়া আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের ভালোবাসার বস্তু নয়। তাঁর শত্রুরাই দুনিয়াকে ভালোবাসে। বর্ণিত আছে, আল্লাহ তাআলা মুসা আ.-কে বলেন :
يَا مُوسَى ، إِذَا رَأَيْتَ الْغِنَى مُقْبِلا فَقُلْ : ذَنْبُ عُجِّلَتْ عُقُوبَتُهُ وَإِذَا رَأَيْتَ الْفَقْرَ مُقْبِلا فَقُلْ مَرْحَبًا بِشِعَارِ الصَّالِحِينَ
'হে মুসা, যখন ধনাঢ্যতাকে তোমার দিকে আসতে দেখবে, তখন বলবে, “পাপ আমার শাস্তিকে ত্বরান্বিত করছে!” আর যখন দারিদ্র্যকে তোমার দিকে আসতে দেখবে, তখন বলবে, “স্বাগতম হে নেককারদের প্রতীক।””১৩৬
ভাই আমার, দুনিয়া তোমার সামনে কাউকে গিলে নিচ্ছে।...আর আখিরাতের সূর্য তোমাকে ভয় দেখিয়ে এগিয়ে আসছে।... কেমন অবস্থা এখন তোমার?
এ গমনাগমনকে তুমি কীভাবে দেখো?
আমরা সালমান রা.-এর অবস্থাটা দেখি। এমন মুহূর্তে কেমন ছিল তাঁর অবস্থা? মৃত্যুর আগ মুহূর্তে তিনি কাঁদতে লাগলেন। তাঁকে বলা হলো, 'রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাহাবি হয়েও মৃত্যুর সময় আপনি কাঁদছেন!'
তিনি বললেন:
'দুনিয়া হারানোর আফসোস কিংবা তার অনুরাগের কারণে আমি কাঁদছি না। আমি কাঁদছি এ কারণে যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের নিকট একটি অঙ্গীকার রেখেছিলেন। কিন্তু আমরা সে অঙ্গীকার রক্ষা করতে পারিনি। সে অঙ্গীকার ছিল, দুনিয়াতে আমাদের সম্পদ হবে একজন মুসাফিরের সম্পদের পরিমাণ। কিন্তু এগুলো...' এ বলে তিনি তাঁর সমুদয় সম্পত্তির দিকে তাকালেন। অথচ, তাঁর সেই সম্পত্তির পরিমাণ ছিল বিশ দিরহাম থেকে ত্রিশ দিরহামের সামান্য বেশি! ১৩৭ এ সামান্য সম্পদ থাকার কারণেও তাঁর এত ভয়!
'দুনিয়া এক ধূসর মরীচিকা। দুনিয়া এক অন্ধকার রাত্রি। দুনিয়া অন্বেষণকারী সমুদ্রের পানি পানকারীর ন্যায়—যতই সে পান করে, ততই তার তৃষ্ণা বৃদ্ধি পায়। '১৩৮
দুনিয়াভোগের কোনো সীমা-পরিসীমা নেই। নেই কোনো থামার স্থান। অল্পতুষ্টি, দুনিয়াবিমুখতা, আল্লাহর বণ্টনের ওপর সন্তুষ্টি ও রাত-দিন আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগি করা ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে দুনিয়াকে আয়ত্তে আনা সম্ভব নয়।
মালিক বিন দিনার রহ. বলেন:
'দুনিয়াদাররা দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছে, কিন্তু দুনিয়ার সবচেয়ে সুস্বাদু বস্তুটির স্বাদ তারা আস্বাদন করতে পারেনি।' জিজ্ঞেস করা হলো, 'সেই সুস্বাদু বস্তুটি কী?' তিনি উত্তরে বলেন, 'আল্লাহর পরিচয় লাভ করা। '১৩৯
মৃত্যুকালে নেককার বান্দাদের অনেক নিশ্চিন্ত ও প্রশান্ত দেখায়। কিন্তু যারা দুনিয়াতে হালাল-হারামের ব্যবধানের প্রতি কোনো তোয়াক্কা করে না, দুনিয়ার চাকচিক্যের পেছনে যারা দৌড়ায়, মৃত্যুকালে তারা খুব বিচলিত ও চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়ে।
আবু দারদা রা. বলেন:
'দুনিয়াতে যদি তিনটি বিষয় না থাকত, তবে আমি জমিনের ওপরে থাকার চেয়ে জমিনের নিচে চলে যাওয়াকে শ্রেয় মনে করতাম। ১. যদি এখানে এমন ভাইয়েরা না থাকত, যারা আমাকে উত্তম ও সুমিষ্ট কথা শোনায়। ২. যদি আল্লাহর সিজদা করতে গিয়ে আমার কপাল ধুলোমিশ্রিত হওয়া না থাকত। ৩. যদি জিহাদে একটি সকাল বা একটি সন্ধ্যা কাটানোর সুযোগ না থাকত। ১৪০
উহাইব বিন ওয়ারদ রহ. বলেন:
‘জুহদ হলো পার্থিব কোনো বস্তু হাতছাড়া হয়ে গেলে আফসোস না করা এবং পার্থিব কোনো বস্তু হাতে আসলে আনন্দিত না হওয়া। ১৪১

টিকাঃ
১৩৬. উদ্দাতুস সাবিরিন: ৩৩১
১৩৭. আদাবুদ দুনিয়া ওয়াদ-দ্বীন: ১১৯
১৩৮. আস-সিয়ার: ৫/২৬৩
১৩৯. মাদারিজুস সালিকিন: ২/২৩৩
১৪০. আজ-জুহদ: ১৯৮
১৪১. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৮/১৪০

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00