📘 দুনিয়া এক ধূসর মরীচিকা > 📄 দুনিয়া ধূসর মরীচিকা, নয় কোনো বাস্তবতা

📄 দুনিয়া ধূসর মরীচিকা, নয় কোনো বাস্তবতা


এই যে দুনিয়া, যার প্রতি আমাদের এত ভালোবাসা। কী তার শেষ পরিণতি? এই যে ধন-সম্পদ, যা আমরা জমা করছি। আসলে সেগুলোর পরিণাম কী?
জনৈক ব্যক্তি তার ভাইয়ের নিকট চিঠি লিখলেন—
'সালাম নিবেদনের পর, এই দুনিয়া হচ্ছে অলীক-কল্পনা। আখিরাত হলো বাস্তবতা। মৃত্যু হলো উভয়ের মধ্যে সীমারেখা। এখানে আমরা আছি কল্পনাপ্রসূত স্বপ্নের ঘোরে। ওয়াস সালাম।'
প্রিয় ভাই, তোমার জীবনের অতীত সময়গুলোর দিকে একটু তাকিয়ে দেখো! এসব কি আসলেই স্বপ্নের মতো নয়?... নিমিষেই তোমার জীবন থেকে কেটে গেল কান্নাহাসির কতগুলো বছর! কিন্তু ভাই, হিসাব-নিকাশের পর্বটা যে এখনো বাকি!
জিরার বিন মুররাহ রহ. বলেন:
'শয়তান বলে, বনি আদমের ভেতর যখন তিনটা বোধ সৃষ্টি হয়, তাদের বশে আনা তখন আমার জন্য খুব সহজ হয়ে যায়। ১. যখন সে নিজের কৃত পাপের কথা ভুলে যায়। ২. যখন সে মনে করে, আমি অনেক আমল করে ফেলেছি। ৩. যখন সে আপন সিদ্ধান্তে নিজেই মুগ্ধ হয়।'১০১
আমাদের অবস্থাটি আবু দারদা রা.-এর এ কথাটির মাঝে ফুটে ওঠে—
'প্রত্যেক মানুষের মাথায় একটু সমস্যা আছে মনে হয়। নাহলে তারা পার্থিব সম্পদ একটু বৃদ্ধি পেলেই কেন এত খুশিতে আত্মহারা হয়ে যায়? অথচ, সময়ের চাকা যত গড়াচ্ছে, ততই তো তাদের জীবন চলে যাচ্ছে শেষের দিকে। তার যে জীবন শেষ হয়ে যাচ্ছে, সেদিকে তার কোনো খেয়াল নেই। জীবন-সমাপ্তির পরে সম্পদের হ্রাস-বৃদ্ধি এমন কী কাজে আসবে তার?'১০২
অধিকাংশ মানুষই চিন্তায় ডুবে থাকে, নিজের পার্থিব জীবনের ব্যর্থতা ও জীবনমান অনুন্নত হওয়ার কারণে। কিন্তু নিজের জীবনকাল ক্রমশ ফুরিয়ে যাওয়া ও মৃত্যু নিকটে চলে আসার কারণ নিয়ে চিন্তিত হয়, এমন মানুষ খুব কমই আছে।
অধিকাংশ মানুষই বেমালুম ভুলে যায়, জীবনের ফেলে আসা সময় ও বছরগুলোর কথা। কিন্তু পার্থিব কোনো বিষয় (মৃত্যুর আগ পর্যন্ত) কখনো মুছেই না তাদের স্মৃতির খাতা থেকে! তাদের জীবনের লক্ষ্যই যেন শুধু দুনিয়া!
বস্তুত, মানুষের মানসিকতায় নেই সুষ্ঠু ভারসাম্য। কোনটি অগ্রাধিকারের উপযুক্ত আর কোনটি উপযুক্ত নয়; কীসের কারণে চিন্তিত হওয়া উচিত, আর কীসের কারণে নয়-এটা তারা বোঝে না।
ইয়াহইয়া বিন মুআজ রহ. বলেন:
'বড় আশ্চর্য লাগে যখন দেখি, সম্পদ কমে যাওয়ার কারণে কেউ চিন্তিত হয়। আসলে ধন-সম্পদ নিয়েই তার যত চিন্তা। এদিকে নিজের জীবনও যে ফুরিয়ে আসছে, তা নিয়ে তার কোনো মাথা ব্যথা নেই!'
জীবনকাল ফুরিয়ে আসছে, এ নিয়ে চিন্তিত হয়ে রাতে ঘুমাতে পারেনি, এমন মানুষ কখনো আমরা দেখেছি? সত্যিই কাউকে কি দেখা যায়, এমন চিন্তিত হতে? বর্তমান সময়ে এমন কোনো মানুষের কথা কি আমরা শুনেছি? তবে সম্পদ কমে যাচ্ছে আর এ কারণে চিন্তায় ঠিকমতো ঘুমাতে পারছে না, এমন মানুষের সংখ্যা অবশ্য গুনে শেষ করা যাবে না। একটু পরই যে তারা দুনিয়াকে বিদায় জানাবে, হিসাব-নিকাশের সম্মুখীন হবে-এটা নিয়ে তারা কী করে এতটা নির্লিপ্ত থাকে, বুঝে আসে না!

টিকাঃ
১০১. সিফাতুস সাফওয়াহ : ৩/১১৬
১০২. আস-সিয়ার: ১৯/৪৮৩

📘 দুনিয়া এক ধূসর মরীচিকা > 📄 প্রকৃত সফলতার গূঢ় তত্ত্ব

📄 প্রকৃত সফলতার গূঢ় তত্ত্ব


শুনুন, মুক্তো ঝরা সে কথা। হাসান বসরি রহ. বলেন :
'যার সম্পদ বেশি, তার গুনাহ বেশি। যে বেশি কথা বলে, সে মিথ্যা বলে বেশি। যার চরিত্র খারাপ, সে নিজেই নিজের শত্রু।'১০৩
প্রকৃত সফলতার গূঢ় তত্ত্ব
পার্থিব সমৃদ্ধি আর সফলতা লাভের আশায় আমরা সম্পদ অর্জন করি। সে সমৃদ্ধি আর সফলতা অর্জনের জন্য আবার টাকা-পয়সাও ব্যয় করি। আত্মিক প্রশান্তির জন্য নির্মাণ করি বিলাসবহুল প্রাসাদ আর সুউচ্চ দালানকোঠা। ভ্রমণে বের হয়ে পড়ি দুঃশ্চিন্তা দূর করে প্রফুল্ল হতে। এভাবে কত পন্থাই না আমরা অবলম্বন করি!... জীবনের একটা পর্যায়ে এসে আমরা কিছুটা তুষ্ট হই নিজেদের অবস্থা অবলোকন করে। ভাবি, এই বুঝি সফলতা হাতে স্পর্শ করতে পেরেছি। আসলে এসব কি সফলতা?
অতীতের কত লোকই তো এসব করে দেখেছেন সফলতা অর্জনের জন্য। নানান অভিজ্ঞতায় তারা নিজেদের সমৃদ্ধ করেছেন, ঋদ্ধ হয়েছেন। কিন্তু শেষমেশ সবাই একই সুরে বলেছেন, সমৃদ্ধি, সৌভাগ্য ও সফলতা—সবই মূলত আল্লাহর ইবাদত ও তাঁর নৈকট্য অর্জনের মধ্যেই নিহিত। মহান প্রতিপালকের আনুগত্যের মাধ্যমেই সুখ ও স্বপ্নের আবাস জান্নাত লাভ করা যায়। আল্লাহর আনুগত্যেই রয়েছে চিরস্থায়ী সমৃদ্ধি। তাঁর ইবাদত ও আনুগত্যই সকল সফলতার গূঢ়তত্ত্ব।
ওয়াহাব বিন মুনাব্বিহ রহ. বলেন :
'দুনিয়া ও আখিরাতের উদাহরণ দু'সতিনের ন্যায়। একজনকে খুশি করতে গেলে অপরজন নিশ্চয় নারাজ হবে।'১০৪
প্রিয় ভাই, আমাদের উচিত ছিল, আমরা হবো আল্লাহর পথের পথিক। অথচ, আমাদের অবস্থা! তার বর্ণনা কি এটাই, যেটা হাসান বসরি রহ. বলেন :
'আমি খুবই আশ্চর্যান্বিত হই লোকদের দেখে। তাদের পাথেয় সংগ্রহ করার জন্য আদেশ করা হয়েছে। অথচ, তারা খেলাধুলায় মত্ত হয়ে আছে! তাদের অন্তিম সফরের সময় এসে গেছে। কিন্তু এখনো তারা উন্মাদ খেল-তামাশায়!'
এ দুনিয়ার ভালো-মন্দের পরিমাপক কী? কীসের ভিত্তিতে নির্ণয় করা হবে দুনিয়ার কল্যাণ ও অকল্যাণ? এ প্রশ্নের উত্তরে আলি বিন আবি তালিব রা. বলেন:
'তোমার ধন-সম্পদ ও সন্তানসন্ততি বৃদ্ধি পেল। মনে করো না এর মাঝেই তোমার কল্যাণ। বরং কল্যাণ তো নিহিত আমল বৃদ্ধি পাওয়া ও ধৈর্যধারণের মাঝে। দুনিয়াতে শুধু দু'ব্যক্তির জন্য কল্যাণ রয়েছে : ১. ওই ব্যক্তি, যে অনেক গুনাহ করেছে; কিন্তু পরে তাওবার মাধ্যমে নিজের সব গুনাহ মাফ করে নিয়েছে। ২. ওই ব্যক্তি, যে ভালো কাজে অগ্রগামী থাকে; আমলে তাকওয়ার কোনো কমতি রাখে না।
বস্তুত, যে আমল কবুল হবে, তার মাঝে তাকওয়ার কমতি কেন থাকবে?'১০৫
দুনিয়া যাকে তার সবটুকু দিয়েছে, পূর্ণ ঝলক নিয়ে তার দিকে চোখ মেলে তাকিয়েছে; সে যেন হাসান রহ.-এর এ উক্তিটি নিয়ে একটু ভাবে-
'আল্লাহর শপথ, যে মুমিন ব্যক্তির জন্য দুনিয়া প্রশস্ত হয়েছে; দুনিয়া তাকে ধোঁকায় ফেলবে— এমন আশঙ্কাও তার মধ্যে নেই। প্রকৃতপক্ষে এমন মানসিকতাধারীর আমল ও বিবেচনাশক্তিই লোপ পেয়েছে। একইভাবে যে মুমিন ব্যক্তি থেকে আল্লাহ তাআলা দুনিয়াকে দূরে রেখেছেন; আর সে মনে করছে, দুনিয়ার মধ্যেই তার কল্যাণ নিহিত আছে। এ ব্যক্তিরও আমল ও বিবেচনাশক্তি লোপ পেয়েছে। '১০৬
দুনিয়ার দিনগুলো যেন ঘুমন্ত ব্যক্তির স্বপ্ন। বিলীয়মান ছায়ার মতো। চকচকে মরীচিকার ন্যায়। হাসির চেয়ে কান্নাই এখানে বেশি। সুখের চেয়ে দুখই অধিক। পাওয়ার চেয়ে না-পাওয়ার পাল্লাই ভারী। এখানে ক্ষণিকের সহানুভূতির মধ্যে রয়েছে দীর্ঘ সময়ের কষ্টের আভাস।
হিন্দ বিনতে নু'মান বলেন:
'আজ তোমরা দেখছ, আমরা সম্মান ও প্রভাব-প্রতিপত্তির অধিকারী। কিন্তু বেলা ডোবার আগেই আমরা চরম লাঞ্ছিত ও প্রভাব-প্রতিপত্তিহীন হয়ে যেতে পারি। বস্তুত, আল্লাহর হিকমত হলো, তিনি কোনো ঘরকে সুখ দ্বারা পরিপূর্ণ করলে কিছুদিন পর আবার সেখানে বয়ে দেন কষ্টাশ্রুর প্রবাহ।'
জনৈক ব্যক্তি হিন্দ বিনতে নু'মানের নিকট কুশলাদি জানতে চাইলে তিনি বলেন:
'এমন অবস্থায় আমরা সকালে উপনীত হই যে, আরবের প্রত্যেক লোক আমাদের থেকে কিছু পাওয়ার আশা রাখে। আবার যখন আমরা সন্ধ্যায় উপনীত হই, তখন অবস্থা এমন হয় যে, আরবের প্রত্যেক লোক (আমাদের অভাবের কারণে) আমাদের ওপর দয়া করে। অর্থাৎ, আমাদের অবস্থা কখনো ভালো থাকে, আবার কখনো আমরা খারাপ অবস্থার সম্মুখীন হই। অবশ্য এটাই হলো দুনিয়ার চিরাচরিত নিয়ম।'
একদিন তার বোন হিরকাহ কাঁদতে লাগলেন, অথচ ওই সময় তাদের অবস্থা বেশ ভালোই চলছিল। তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, 'আপনি যে কাঁদছেন?'
তিনি বললেন :
'আমি দেখছি, আমার পরিবার খুব আনন্দে আছে। আর এমন খুব কম ঘরই আছে, যেখানে সুখের পরে দুঃখ আসে না।'
ইসহাক বিন তালহা বলেন:
'আমি একদিন তার কাছে গিয়ে বললাম, “রাজা-বাদশাহদের চোখেও অশ্রু?"
তিনি বললেন:
“গতকাল যেমন ছিলাম, আজ সে অপেক্ষা ভালো আছি। তবে আমি কোনো বইতে এমন পড়েছি, কোনো ঘরের লোকেরা যখন সুখ- শান্তিতে বাস করে, তখন অচিরেই তাদের ঘরে নেমে আসে দুঃখের জলধারা। আর সময় কাউকে একটি পছন্দনীয় দিন উপহার দিলে এর মধ্যে লুকিয়ে রাখে অপছন্দনীয় একটি দিন।”১০৭
উমর বিন আব্দুল আজিজ রহ. খুতবায় বলেন :
'হে লোকসকল, এমন একটি বিষয়ের জন্য তোমাদের সৃষ্টি করা হয়েছে, যদি তোমরা তা বিশ্বাস করো, তবে তোমাদের নির্বোধ বলা হবে। আর যদি বিশ্বাস না করো, তবে তোমরা ধ্বংস হয়ে যাবে। তোমাদের সৃষ্টি করা হয়েছে চিরস্থায়ীভাবে থাকার জন্য। তোমাদের এক জায়গা (দুনিয়া) থেকে অন্য জায়গায় (আখিরাতে) স্থানান্তর করা হবে। হে আল্লাহর বান্দারা, তোমরা এমন এক জায়গায় বসবাস করছ, যেখানে তোমাদের খাদ্যদ্রব্য নষ্ট হয়ে যায়, পানীয় শুকিয়ে যায়। এখানে একটি নিয়ামত পেয়ে তোমরা খুশি হলে পরক্ষণে সে নিয়ামত হারিয়ে তোমরা আবার দুঃখে নিপতিত হও। তাই যেখানে তোমাদের প্রত্যাবর্তন, যেখানে থাকবে অনন্তকাল, জেনে নাও সে চিরস্থায়ী আবাস সম্পর্কে।' এতটুকু বলেই তিনি কান্নায় বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন। ১০৮

টিকাঃ
১০৩. কিতাবুস সামত: ৮৫
১০৪. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৪/৫১
১০৫. সিফাতুস সাফওয়াহ: ১/৩২১
১০৬. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৬/২৭২
১০৭. উদ্দাতুস সাবিরিন: ৩২৬
১০৮. আল-ইহইয়া: ৩/২৮৮

📘 দুনিয়া এক ধূসর মরীচিকা > 📄 পার্থিব স্বার্থের মজলিস

📄 পার্থিব স্বার্থের মজলিস


আমরা কোথায় আর তাঁরা কোথায়? কেমন আমাদের দুনিয়ার জীবন আর কেমন ছিল সালাফে সালিহিনের দুনিয়ার জীবন?
হাসান রহ. বলেন:
'সেই সত্তার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ, আমি এমন মানুষদের সান্নিধ্য লাভে ধন্য হয়েছি, যাদের নিকট দুনিয়া পায়ের তলার মাটির চেয়েও তুচ্ছ ছিল।'১০৯
আল্লাহ তাআলা হাসান রহ.-এর ওপর রহমত বর্ষণ করুন। এ কথা তো তিনি তার বেঁচে থাকার সময়ে বলেছিলেন। আজ যদি তিনি আমাদের এ যুগের অবস্থা দেখতেন, যে যুগে মানুষ দুনিয়ার জন্য কুকুরের মতো একে অপরকে তাড়া করে। আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে। বিনষ্ট করে ভ্রৃত্বের সম্পর্ক। সম্পদের জন্য শত মিথ্যা বলতেও দ্বিধাবোধ করে না। এমন দুরবস্থা দেখলে কেমন মন্তব্য করতেন তিনি?
পার্থিব স্বার্থের মজলিস
পার্থিব সম্পদের আলাপ-আলোচনা নিয়ে এ যুগে অনেক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, দুনিয়া নিয়ে সেখানে কত বাক্যালাপ চলে; কিন্তু আল্লাহর নাম সেখানে নেওয়া হয় না। এসব বৈঠকে গিবত ও পরনিন্দার কর্মযজ্ঞ তো চলে, সে সাথে হারাম খাবারেরও মেলা বসে।
গুনাহ ও অপরাধই হয়ে থাকে তাদের আলোচনার বিষয়বস্তু। পার্থিব স্বার্থের জন্য আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করা, ভালোবাসার মজবুত ভিত্তি নড়বড়ে হওয়া, বছরের পর বছর ধরে ভাইয়ে ভাইয়ে কথা না বলা, ঋণ পরিশোধে গড়িমসি করা, এতিমের মাল ভক্ষণ করতে আল্লাহকে ভয় না করা, মিথ্যা বলে ও মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়ে অপরের জমিন অন্যায়ভাবে দখল করে নেওয়া-এ সবই হয় আসরের সারকথা।
তাদের যে এক সংকীর্ণ গর্তে প্রবেশ করতে হবে, তা তারা একদম ভুলে যায়। তাদের জন্য কী অপেক্ষা করছে সেখানে, ভালো না মন্দ?—এসবের তারা থোড়াই কেয়ার করে! কিয়ামতের কঠিন ভয়াবহতা যে তাদের সামনে, এ নিয়ে তাদের কোনো মাথাব্যথা নেই!
হাসান রহ. বলেন:
'আমার বড়ই আশ্চর্য লাগে এমন মানুষকে দেখলে। কী করে তার এত হাসি পায়! অথচ জাহান্নাম হা করে আছে তার পেছনে! আমি খুবই আশ্চর্যান্বিত হই আনন্দে আত্মহারা ব্যক্তিকে দেখলে। তার এত খুশির কারণ কী? তার পেছনেই যে দাঁড়িয়ে আছে মৃত্যু!'১১০
দুনিয়ার মোহে আচ্ছন্ন, পার্থিব ভোগ-বিলাসে মত্ত, সম্পদের ধোঁকায় পতিত—এমন কত মানুষকেই তো আমরা দেখি প্রতিনিয়ত। কিন্তু ভাই আমার, এখনো কি সময় হয়নি সঠিক পথে ফিরে আসার?
একটা প্রশ্ন সকাল-সন্ধ্যা আমাদের মুখে মুখে উচ্চারিত হয় :
তবে কি আমরা দুনিয়ার জন্য কোনো কাজ করব না?... কেন করব না? অবশ্যই কাজ করব। ইসলাম তো আমাদের কাজের কথা বলে। তবে দুনিয়ার জন্য কাজ করার ক্ষেত্রে এ অসিয়তটা একটু স্মরণ রাখবেন:
সুফইয়ান সাওরি রহ.-কে একব্যক্তি বলল, 'আমাকে অসিয়ত করুন।' তিনি বললেন:
'দুনিয়ার জন্য সে পরিমাণ কাজ করো, যে পরিমাণ সময় তুমি দুনিয়াতে থাকবে। আখিরাতের জন্য সে পরিমাণ আমল করো, যে পরিমাণ সময় তোমাকে সেখানে থাকতে হবে। ব্যস, এটাই তোমার প্রতি অসিয়ত। ওয়াস-সালাম।'১১১
এবার হিসাব মিলিয়ে দেখো। দুনিয়াতে তোমাকে কতদিন থাকতে হবে আর কতদিন থাকতে হবে আখিরাতে? মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উম্মাহর গড় বয়স তো ষাট থেকে সত্তর বৎসর। এর চেয়ে অল্প বয়সেও কত মানুষ মারা যায়! এখানে আমরা বয়সের একটা সাধারণ সংখ্যা ধরলাম। এবার আখিরাতের একটি দিন নিয়ে চিন্তা করে দেখি।
কেমন হবে আখিরাতের একটি দিনের দৈর্ঘ্য? প্রশ্নের উত্তর তো আমাদের জানা নেই। কিন্তু কুরআন আমাদের জানাচ্ছে—
﴿وَإِنَّ يَوْمًا عِنْدَ رَبِّكَ كَأَلْفِ سَنَةٍ مِّمَّا تَعُدُّونَ ﴾
'আপনার পালনকর্তার কাছে একদিন তোমাদের গণনার এক হাজার বছরের সমান।' ১১২
আখিরাতের একদিন আর দুনিয়ার পুরো জীবন। তুলনা করে দেখো। সমান? নাকি তুলনা করাটাই বোকামি? এবার তুমি নিজেই ঠিক করে নাও, দুনিয়ার জন্য কতটুকু কাজ করা দরকার আর কতটুকু আমল করা দরকার আখিরাতের জন্য? আল্লাহ আমাদের তাঁর রহমতপ্রাপ্ত বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করুন। তাঁর অনুগ্রহে আমাদের জান্নাতে প্রবেশ করান। তাওফিক দান করুন তাঁর সন্তুষ্টি লাভের।
ভাই আমার,
কোনো কর্মচারী সুলতানের নিকট সম্মান ও গ্রহণযোগ্যতা পাওয়ার আশা করলে, তখন সে লক্ষ করে, কোন কাজটি সুলতানের নিকট পছন্দনীয়? আর সে ওই কাজটিই করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ১১৩
একইভাবে আমরাও যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভ করতে চাই, তবে তো আমাদের আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগিই করতে হবে। সুতরাং আমরা যারা এখন তাঁর ইবাদত-বন্দেগি করছি, তাদের জন্য আছে নাজাতের সুসংবাদ। আর যারা ইবাদত করছি না, তাদের জন্যও কিন্তু একটা সুযোগ আছে। তাওবা। হ্যাঁ, তাওবা। তাই দ্রুতই তাওবা করে আল্লাহর ইবাদতে মশগুল হয়ে যাই। বস্তুত, আমাদের যিনি সৃষ্টি করেছেন, যিনি আমাদের রিজিক দান করেন, যিনি আমাদের সুন্দর আকৃতি দিয়ে সৃষ্টি করেছেন এবং অগণিত নিয়ামত দান করেছেন—তিনিই আমাদের ইলাহ। আমাদের একমাত্র উপাস্য। আমাদের অন্তরে তাঁর প্রতি লজ্জাবোধ ও ভালোবাসা অবশ্যই থাকতে হবে।

টিকাঃ
১০৯. তাসলিয়াতু আহলিল মাসায়িব: ২৪৫
১১০. তাম্বিহুল গাফিলিন: ১/২১২
১১১. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৭/৫৬
১১২. সুরা আল-হজ: ৪৭
১১৩. আল-ফাওয়ায়িদ: ৬৮

📘 দুনিয়া এক ধূসর মরীচিকা > 📄 দুনিয়া ধোঁকার সামগ্রী

📄 দুনিয়া ধোঁকার সামগ্রী


শাদ্দাদ বিন আমর বলেন :
'আখিরাত সত্য। সেখানে সর্বশক্তিমান বাদশাহ বিচার করবেন। দুনিয়া অস্থায়ী আবাস। মানুষ ভালো-খারাপ উভয় সুবিধা ভোগ করতে পারে দুনিয়া থেকে। দুনিয়া আনুগত্যশীলদের বিপক্ষেও নয়, অবাধ্যদের পক্ষেও নয়। তোমরা দুনিয়ার জন্য মরিয়া হয়ো না, অথবা দুনিয়া ক্ষণস্থায়ী। এটা কারও হাতে বেশিক্ষণ থাকতেও না। আবার দুনিয়াকে একেবারে পরিত্যাগও কোরো না। কেননা, দুনিয়া ছাড়া আখিরাতের পুঁজি অর্জন করা যায় না।'
উবাইদ বিন উমাইর রহ. দুনিয়ার প্রতি আসক্তি ও দুনিয়া গ্রহণের ক্ষতি সম্পর্কে বলেন :
'বান্দার সম্পদ যত বৃদ্ধি পাবে, তার হিসাবও হবে তত কঠিন। যার অনুসরণকারী বেশি হবে, তার সাথে শয়তানের সংখ্যাও বেশি হবে। দুনিয়ার রাজা-বাদশাহদের সাথে সম্পর্ক যত গভীর হয়, আল্লাহর সাথে সম্পর্ক তত শিথিল হতে থাকে।'
এ ওয়াইস মাসরুক রহ. বলতেন :
'মুমিনের জন্য প্রিয় উপহার হলো তার কবর।'
দুনিয়া ধোঁকার সামগ্রী
পার্থিব জীবন ক্ষণিকের সুখস্বপ্ন কিংবা ছলনা-বিলাস বৈ কিছু নয়। কামনা-বাসনায় ঘেরা এই জগতের সর্বত্রই ভোগ-বিলাসের নিরন্তর হাতছানি। আর আখিরাত পরিণামফল লাভের অনন্ত এক জগৎ। আল্লাহ তা'আলা বলেন :
هُوَ لِلنَّاسِ حُبُّ الشَّهَوَاتِ مِنَ النِّسَاءِ وَالْبَنِينَ وَالْقَنَاطِيرِ الْمُقَنْطَرَةِ مِنَ الذَّهَبِ وَالْفِضَّةِ وَالْخَيْلِ الْمُسَوَّمَةِ وَالْأَنْعَامِ وَالْحَرْثِ ذَلِكَ مَتَاعُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَاللَّهُ عِنْدَهُ حُسْنُ الْمَآبِ
'নারী, সন্তান, রাশিকৃত স্বর্ণরৌপ্য আর চিহ্নিত অশ্বরাজি, গবাদিপশু এবং খেত-খামারের প্রতি আকর্ষণ মানুষের জন্য সুশোভিত করা হয়েছে। এসব ইহজীবনের ভোগ্যবস্তু। আর আল্লাহর নিকটই রয়েছে উত্তম আশ্রয়। '১১৪
যেসব মায়া ও মোহ দিয়ে থরে থরে সাজিয়ে তোলা হয়েছে পৃথিবী ও পার্থিব জীবন আর যেসব কামনা-বাসনা দুনিয়াবিলাসী ও আখিরাতবিমুখ মানুষের পরম আরাধ্য, সেগুলো মৌলিকভাবে সাতটি বস্তুতে সীমাবদ্ধ:
• নারীদের বিমুগ্ধ রূপলাবণ্য ও মোহিনী আকর্ষণ মানুষকে ফেলে দেয় ফিতনার জটিল আবর্তে।
• সন্তান-সন্ততি-পুরুষের সৌন্দর্য, গর্ব ও সম্মানের প্রতীক।
• স্বর্ণরৌপ্য-কামনা-বাসনার মূল চালিকাশক্তি।
• চিহ্নিত অশ্বরাজি-মালিকের মর্যাদা ও গর্বের সম্পদ। শত্রুকে ধাওয়া ও আক্রমণ এবং আত্মরক্ষা ও নিরাপত্তার মোক্ষম হাতিয়ার।
• গবাদি পশু-সফরের বাহন ও মালপত্র পরিবহনে ব্যবহার্য। দুধ, গোশত, কাঁচামাল ইত্যাদির উৎস।
খেত-খামার-মানুষ ও গবাদি পশুর আহার্য, ফলমূল ও ভেষজদ্রব্যের অকৃত্রিম উৎস।
এই ক্ষণস্থায়ী পার্থিব জীবনোপকরণগুলো বর্ণনা করার পর আল্লাহ তাআলা আখিরাতের অন্তহীন সুখ ও অনুপম শান্তির দিকে বান্দাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন:
قُلْ أَؤُنَبِّئُكُمْ بِخَيْرٍ مِنْ ذَلِكُمْ لِلَّذِينَ اتَّقَوْا عِنْدَ رَبِّهِمْ جَنَّاتُ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا وَأَزْوَاجُ مُطَهَّرَةٌ وَرِضْوَانُ مِنَ اللَّهِ وَاللَّهُ بَصِيرٌ بِالْعِبَادِ )
'বলুন, আমি কি তোমাদের এসব বস্তুর চেয়ে উৎকৃষ্টতর কোনো কিছুর সংবাদ দেবো? যারা তাকওয়া অবলম্বন করে চলে, তাদের জন্য তাদের রবের নিকট রয়েছে উদ্যানরাজি-যার পাদদেশ দিয়ে বয়ে যায় স্রোতস্বিনী। আর তারা সেখানকার চিরস্থায়ী বাসিন্দা-তাদের জন্য রয়েছে শুচিশুভ্র সহচরী আর আল্লাহর পক্ষ থেকে সন্তুষ্টি। আল্লাহ বান্দাদের সম্বন্ধে সম্যক দ্রষ্টা।'১১৫
তারপর আল্লাহ তাআলা সেসব বান্দার কথা আলোচনা করেন, যারা আখিরাতে এই অনুপম নিয়ামত ও অনুপমেয় শান্তির অধিকারী হবে। আল্লাহ বলেন :
الَّذِينَ يَقُولُونَ رَبَّنَا إِنَّنَا آمَنَّا فَاغْفِرْ لَنَا ذُنُوبَنَا وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ الصَّابِرِينَ وَالصَّادِقِينَ وَالْقَانِتِينَ وَالْمُنْفِقِينَ وَالْمُسْتَغْفِرِينَ بِالأَسْحَارِ
'যাঁরা বলে, “হে আমার রব, আমরা ইমান এনেছি; সুতরাং তুমি আমাদের পাপ মার্জনা করো এবং আমাদের আগুনের আজাব থেকে রক্ষা করো।” তাঁরা ধৈর্যশীল, সত্যবাদী, অনুগত, দানশীল এবং শেষ রাত্রে ক্ষমাপ্রার্থী। '১১৬ [১১৭]
প্রিয় ভাই,
চলো, উমর রা.-এর এ বাণীটি নিয়ে একটু ভাবি-
'ধ্বংস তার জন্য, দুনিয়া নিয়েই যার আশা। গুনাহ করে যাওয়াই যার কাজ। যে শুধু খাই খাই করে, হারাম-হালাল সব সাবাড় করে পেট মোটা করে। যার বুদ্ধিসুদ্ধি কম। ধ্বংস তার জন্য, দুনিয়া সম্পর্কে যে খুব ভালোই জ্ঞান রাখে; কিন্তু আখিরাত সম্পর্কে সে একেবারে মূর্খ- গাফিল। '১১৮
উমর রা. আবু মুসা রা.-এর নিকট প্রেরিত চিঠিতে লেখেন-
'আখিরাতের জন্য দুনিয়াবিমুখতার চেয়ে উত্তম কোনো আমল আপনি পাবেন না।'
دَعِ الْحِرْصَ عَلَى الدُّنْيَا * وَفِي الْعَيْشِ فَلَا تَطْمَعُ فَلَا تَجْمَعْ مِنَ الْمَالِ * فَمَا تَدْرِي لِمَنْ تَجْمَعْ فَإِنَّ الرِّزْقَ مَقْسُوْمُ * وَسُوْءُ الظَّنَّ لَا يَنْفَعُ فَقِيرٌ كُلُّ ذِي حِرْصٍ * وَغَنِيٌّ كُلُّ مَنْ يَقْنَعْ
'ত্যাগ করো দুনিয়ার যত লোভ, যত লালসা—ঝেটিয়ে বিদায় করো মন থেকে ভোগ-বিলাসের আকাঙ্ক্ষা। ধন সঞ্চয়ের ধান্দা ছাড়ো। কার জন্য গড়ছ সম্পদের এই পাহাড়? রিজিক তো বণ্টন হয়ে গেছে। বাজে চিন্তায় কী লাভ হবে তোমার? মনে রেখো, লোভীরা চিরকাল ফকিরই থেকে যায় আর অল্পে তুষ্ট লোক কখনই দরিদ্র হয় না।'১১৯
মানুষ দুনিয়া পরিত্যাগ করতে চায় না। জুহদ অবলম্বন করতে আগ্রহী হয় না। ভাবখানা যেন এমন—'আমি দুনিয়ার সবই গ্রহণ করব। পাশাপাশি সময় পেলে আখিরাতের জন্য কিছু আমল করে নেব। তাহলে তো আমি জান্নাতে প্রবেশ করব।' এ যে তাদের ভীষণ ভয়ংকর এক চিন্তাধারা।
আবু হাজিম রহ. বলেন:
'দুনিয়ার সকল পছন্দনীয় কর্ম ও প্রিয় বস্তু তুমি পরিত্যাগ করলে। এবার কি তুমি দুনিয়ার হবে? যদি এমনই হয়, তবে তো হয়ে গেল। যদি এমনটা না হয়, তবে দুনিয়াদারিঁর হাজার ভাগ হতে এক ভাগ ছেড়ে দিলেই কীভাবে তুমি জান্নাতে যাবে বলে আশা করো? তোমার নিকট জান্নাতের আমল কষ্টকর মনে হয়, তাই হাজার করণীয় হতে একটি করেই জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবার কীভাবে আশা করো?'১২০
দুনিয়ার হাজার ভাগের এক ভাগ গ্রহণ করলে যেমন কাউকে দুনিয়াদার বলা হয় না, তেমনই জান্নাত লাভের জন্য করণীয় কর্মের হাজার ভাগের এক ভাগ করলেও জান্নাতে যাওয়ার আশা করা যায় না।'
ফুজাইল বিন ইয়াজ রহ. বলেন: 'আল্লাহর প্রতি বান্দার ভয় ততটুকু হবে, আল্লাহ সম্পর্কে যতটুকু তার জ্ঞান থাকবে। আখিরাতের প্রতি তার আগ্রহ ততটুকু হবে, দুনিয়ার প্রতি যতটুকু তার অনাগ্রহ থাকবে। '১২১
হাসান রা. বলেন: 'দুনিয়াতে যারা নিজেদের আমলের হিসাব নেয়, চিন্তা ও কর্মের বিশুদ্ধতা যাচাই করে; তারপর যেগুলো আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হয় সেগুলোকে বহাল রাখে, যেগুলো আল্লাহর অসন্তুষ্টির কারণ হয়, সেগুলো পরিত্যাগ করে-আখিরাতে তাদের হিসাব সবচেয়ে সহজ হবে। আর যারা দুনিয়ায় যথেচ্ছভাবে চলে, আমলের কোনো পরোয়া করে না-কিয়ামতের দিন তাদের হিসাব খুব কঠিন হবে। আল্লাহর দরবারে তারা নিজেদের পাপের বড় স্তূপ দেখতে পাবে।' এরপর হাসান রা. তিলাওয়াত করলেন-
وَيَقُولُونَ يَا وَيْلَتَنَا مَالِ هَذَا الْكِتَابِ لَا يُغَادِرُ صَغِيرَةً وَلَا كَبِيرَةً إِلَّا أَحْصَاهَا وَوَجَدُوا مَا عَمِلُوا حَاضِرًا وَلَا يَظْلِمُ رَبُّكَ أَحَدًا )
'তারা বলবে, “হায় আফসোস, এ কেমন আমলনামা। এ যে ছোট-বড় কোনো কিছুই বাদ দেওয়া হয়নি, সবই তো এতে রয়েছে।” তারা তাদের কৃতকর্মকে সামনে উপস্থিত পাবে। আপনার পালনকর্তা কারও প্রতি জুলুম করবেন না।'১২২
ফসল কাটার সময় হলে চাষী অনুভব করে, এগুলো তার চেষ্টা-মেহনতের ফল, এমনিতে আসেনি। সে নিজের মেহনতকে ফসলের মাঝে দেখতে পায়। তেমনিভাবে আমরা এখানে আখিরাতের জন্য যে আমলগুলো করি, সেগুলো কিয়ামতের দিন-যেদিনটি পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান হবে, যেদিন দুগ্ধদানকারিণী মা তার দুগ্ধপোষ্য সন্তানকে ভুলে যাবে, গর্ভবর্তী তার গর্ভপাত ঘটাবে, আমলনামা আকাশে উড়বে-সে ভীষণ ভয়ের দিনে সে নিজের আমলনামা দেখতে পাবে। যদি কেউ পাপী হয়, তবে সে ভীত হবে তার পাপের বিশাল পাহাড় দেখে। যদি কেউ সৎ হয়, তবে সে আনন্দিত হবে তার নেকির বিশাল পাহাড় দেখে।
সালমান বিন দিনার রহ. বলেন: 'যে আমলটি তোমার সাথে আখিরাতে থাকাকে তুমি পছন্দ করো, তা আজই পাঠিয়ে দাও। আর যে কর্মটি তোমার সাথে আখিরাতে থাকাকে তুমি অপছন্দ করো, তা আজই পরিত্যাগ করো। '১২৩
এ দুনিয়া আমলের স্থান। কিন্তু আগামীকাল দুনিয়ার সূর্য অস্তমিত থাকবে। উদিত হবে কিয়ামত দিবসের সূর্য। আখিরাত হলো হিসাব গ্রহণ ও বিনিময় দেবার স্থান। যে পাপ করেছে, তাকে তার হিসেব দিতে হবে। যে উত্তম কাজ করেছে, তাকে তার হিসেব দিতে হবে। কিন্তু আমরা নিশ্চয় উত্তমটাই চাইব, তাই আমাদের উচিত-নিজেদের সংকল্পকে দৃঢ় করা, পরিপূর্ণ প্রস্তুতি নেওয়া এবং পাথেয় সংগ্রহ করা।
ইয়াহইয়া বিন মুআজ রহ. অসিয়ত করে বলেন : 'রাত অনেক দীর্ঘ। বেঘোরে ঘুমিয়ে সেটাকে খাটো করে ফেলো না। বরং আমলে তার সদ্ব্যবহার করো। দিন অনেক স্বচ্ছ। গুনাহ দিয়ে এ স্বচ্ছতাকে নোংরা করে ফেলো না।'
দুনিয়াতে তেমনই হও, যেমন হয় মুসাফির। দুনিয়াতে আমাদের অবস্থানের চেয়ে মৃত্যুর সফর অধিক সত্য। মৃত্যুর আগ মুহূর্তে কোনো অবকাশ থাকে না, সংবাদ দেওয়া হয় না আগে থেকে।
শুমাইত বিন আজলান রহ. বলেন:
'মৃত্যু যার চোখের সামনে থাকে, যে সর্বদা মৃত্যুর কথা স্মরণে রাখে—দুনিয়ার সচ্ছলতা বা অসচ্ছলতার পরোয়া সে করে না।'১২৪
মুহাম্মাদ বিন সুকাহ রহ. বলেন :
'আমরা এমন দুটি কাজ করি, যদিও অনেক সময় আল্লাহ তাআলা দয়া করে আমাদের আজাব দেন না; তবুও তা করে আমরা আজাবের উপযুক্ত হয়ে পড়ি। কাজ দুটি হলো :
১. পার্থিব কোনো বিষয়ে প্রবৃদ্ধি ঘটলে আমরা যতটা খুশি হই, দ্বীনি উন্নতিতে ততটা খুশি কখনো হই না।
২. পার্থিব কোনো ক্ষতি হলে আমরা কত চিন্তিতই না হয়ে পড়ি, অথচ দ্বীনি কোনো ক্ষতিতে এতটা চিন্তিত হই না।'১২৫
আমাদের অবস্থা হলো, টাকা-পয়সা ও ধন-দৌলতে একটু ঘাটতি আসলে আমরা খুবই চিন্তিত ও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ি। কিন্তু নামাজের জামাআত ছুটে গেলে একটুও চিন্তিত হই না। একটু মাথা নেড়ে ভুলে যাওয়ার কথা বলে আফসোসও যে করব, সে মূল্যবোধও আমাদের হৃদয়ে জাগ্রত হয় না।
মুহাম্মাদ বিন ওয়াসি' রহ. একজনকে বললেন :
'জান্নাতে কাউকে কাঁদতে দেখলে তুমি কি খুব আশ্চর্য হবে না?'
- হ্যাঁ, তা তো অবশ্যই।
'যে ব্যক্তি দুনিয়াতে হাসে আর আখিরাতের কথা ভুলে যায়, তার অবস্থা এর চেয়ে বেশি আশ্চর্যজনক।'১২৬
সাঈদ বিন মাসউদ রহ.-এর কথাটি আজ অনেকের ক্ষেত্রে ফলে যাচ্ছে, তিনি বলেন:
'যখন তুমি কাউকে দেখবে—তার দুনিয়া বৃদ্ধি পাচ্ছে, কিন্তু আখিরাত হ্রাস পাচ্ছে, আর সে তাতে সন্তুষ্টও; তবে সে চরম প্রতারণার শিকার। তার চোখের সামনেই তাকে নিয়ে খেলা চলছে, অথচ সে টেরই পাচ্ছে না!'১২৭
تَزَوَّدْ مِنَ الدُّنْيَا فَإِنَّكَ لَا تَدْرِي إِذَا جَنَّ لَيْلٌ هَلْ تَعِيْشُ إِلَى الْفَجْرِ فَكَمْ مِنْ فَتَى أَضْحَى وَأَمْسَى ضَاحَكًا وَقَدْ نُسِجَتْ أَكْفَانُهُ وَهُوَ لَا يَدْرِي وَكَمْ مِّنْ صِغَارٍ يُرْتَجَى طُولُ عُمْرِهِمْ وَقَدْ أُدْخِلَتْ أَجْسَادُهُمْ ظُلْمَةَ الْقَبْرِ وَكَمْ مِّنْ عَرُوسٍ زَيَّنُوْهَا لِزَوْجِهَا وَقَدْ قُبِضَتْ أَرْوَاحُهُمْ لَيْلَةَ الْعُرْسِ
'যত দ্রুত পারো গুছিয়ে নাও তোমার পাথেয়। জানো না তুমি, আগামীকালের সূর্যোদয় তুমি দেখবে কি না। কত যুবক হেসে-খেলে পাড়ি জমায় সকাল থেকে সন্ধ্যায়। এদিকে বোনা হয়ে গেছে তার কাফন, সে তার কিছুই জানে না। কত কিশোর স্বপ্ন দেখে দীর্ঘ জীবনের। কত শিশুর দেহ মিশে যায় কবরের ধুলোয়। কত নববধূ সেজেগুজে আসে স্বামীর গৃহে—ভোর না হতেই হারিয়ে যায় সে চির অজানার দেশে।'
'দুনিয়াটা এমনই। চারদিকে ধোঁকার ছড়াছড়ি। তাই যথাসম্ভব বেঁচে থাকতে হবে প্রতারণা থেকে। দুনিয়ার নিরাপত্তায়ও লুকিয়ে থাকে বিপদের শঙ্কা। দুনিয়ার আশাগুলো মরুভূমির ধূসর মরীচিকা। পার্থিব জীবন বড়ই তুচ্ছ।
এর স্বচ্ছতায়ও মিশে থাকে পঙ্কিলতা। মাথার ওপর সর্বক্ষণ ঝুলে থাকে আশঙ্কার তরবারি। বিপদে পতিত হওয়ার দৃশ্য এখানে খুবই স্বাভাবিক। যেকোনো সময় নিঃশেষ হয়ে যেতে পারে যেকোনো নিয়ামত কিংবা দুয়ারে কড়া নাড়তে পারে মৃত্যুর ফেরেশতা সফরের পরোয়ানা হাতে। '১২৮

টিকাঃ
১১৪. সুরা আলি ইমরান: ১১৪
১১৫. সুরা আলি ইমরান: ১৫
১১৬. সুরা আলি ইমরান: ১৬-১৭
১১৭. উদ্দাতুস সাবিরিন: ২০৯
১১৮. আল-আকিবাহ: ৯০
১১৯. বুসতানুল আরিফিন: ১৫
১২০. তাম্বিহুল গাফিলিন: ১/৮৫
১২১. আস-সিয়ার: ৮/৪২৬
১২২. সুরা আল-কাহফ: ৪৯
১২৩. সিফাতুস সাফওয়াহ: ২/১৬৬
১২৪. সিফাতুস সাফওয়াহ: ৩/৩৪২
১২৫. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৫/৪
১২৬. আল-ইহইয়া: ৩/১৩৭
১২৭. মুকাশাফাতুল কুলুব: ১৫৭
১২৮. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ২/১৩৬

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00