📄 দুনিয়াবিমুখতা
ইমাম আওজায়ি রহ. উপদেশ প্রদানের সময় বলতেন :
'তোমাদের যে নিয়ামতরাজি দান করা হয়েছে, সেগুলোর সাহায্যে তোমরা আল্লাহর প্রজ্বলিত অগ্নি-যা হৃদয় পর্যন্ত পৌঁছবে-তা থেকে বাঁচার চেষ্টা করো। কেননা, খুব অল্প সময় তোমরা এ দুনিয়াতে বসবাস করবে। এখান থেকে তোমাদের চলে যেতে হবে অতি শীঘ্রই। তোমাদের আগে অনেকেই এসেছিল এখানে। দুনিয়া নিজ সৌন্দর্য আর চাকচিক্য দেখিয়ে তাদের অভ্যর্থনা জানিয়েছিল। তাদের আয়ুষ্কাল ছিল তোমাদের চেয়ে দীর্ঘ, শারীরিক শক্তিতে তারা তোমাদের চেয়েও বেশি সবল ছিল, তোমাদের চেয়ে অধিক ছিল তাদের প্রতিপত্তি। পাহাড় খোদাই করে আর পাথর কেটে কেটে তারা গড়ে তুলত সুরম্য অট্টালিকা। পৃথিবীতে বিচরণ করত বিপুল দাপটে। খুঁটির মতো শক্ত ও দীর্ঘ দেহ ছিল তাদের। কিন্তু কোথায় আজ তাদের অস্তিত্ব? তারা নেই। থাকবে না তোমরাও। তাদের সময় ফুরিয়েছে, তারা চলে গেছে। তাদের এত সব নির্মাণ আজ কোথায়?! ধূলিস্যাৎ হয়ে গেছে তাদের সব অর্জন। এমনকি তাদের নামটুকও মুছে গেছে মানুষের মন থেকে। তুমি কি তাদের কারও আওয়াজ শুনতে পাও? তাদের সামান্য চাপা স্বরও কি তোমার কানে বাজে? মৃত্যু থেকে তারা নিজেদের খুব নিরাপদ ভেবেছিল। এমন আর কত বর্ণনার দরকার? যা শুনে দ্বীন থেকে গাফিল-উদাসীনরা সচেতন হবে! একটি সকালই কি যথেষ্ট নয় যে, গুনাহগাররা জাগ্রত হবে?!'৮৭
দুনিয়াবিমুখতার দ্বারা অন্তরে জাগ্রত হয় আখিরাতের প্রতি আগ্রহ। অবশ্য যথার্থরূপে দুনিয়াবিমুখতা অবলম্বনের জন্য দুটি সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি লালন করতে হবে।
প্রথম দৃষ্টিভঙ্গি
দুনিয়া অতি তুচ্ছ ও নিকৃষ্ট। দুনিয়া ধ্বংসশীল। দুনিয়া ক্ষণিকের। পার্থিব এ জীবন ফুরিয়ে যাবে খুব দ্রুতই। দুনিয়ার দুঃখ-দুর্দশা, কষ্ট-ক্লেশ যা কিছু ভোগ করতে হয়, তা স্থায়ী নয়। এমনিভাবে স্থায়ী নয় দুনিয়ার আনন্দ- সুখও। দুনিয়া অর্জনকারী দুনিয়ার পেছনেই পড়ে থাকে সব সময়। তবে কখনো সে অর্জনে সক্ষম হয়। কখনো হয় ব্যর্থ-বিফল। কিন্তু যে অর্জন করে, সে কিন্তু বিজয়ী হয়েও হয়ে যায় পরাজিত। কেননা, এ অর্জনের পরে আছে কি এর কোনো স্থায়িত্ব? দুনিয়ার ধন-সম্পদ কখনো হারিয়ে যাবে, কখনো চুরি বা নষ্ট হয়ে যাবে। অবশেষে সে যখন আস্বাদন করবে মৃত্যুর স্বাদ, পারবে কি তখন সাথে নিয়ে যেতে সেসব সম্পদ? তাই দুনিয়া অর্জনকারী বিজয়ী হয়েও পরাজিত।
দ্বিতীয় দৃষ্টিভঙ্গি
আখিরাত আসন্ন। আখিরাত চিরস্থায়ী। আখিরাতের মর্যাদাই সমুন্নত। নিয়ামত, খুশি, আনন্দ... সেখানে সবই চিরস্থায়ী। আল্লাহ তাআলা বলেন :
وَالْآخِرَةُ خَيْرٌ وَأَبْقَى
'আর আখিরাতের জীবন উৎকৃষ্ট ও স্থায়ী।৮৮
'আখিরাতের নিয়ামতই পূর্ণ নিয়ামত। কখনো তা ফুরাবে না। পক্ষান্তরে তার শাস্তিও ভীষণ ভয়ংকর। '৮৯
أَلَا كُلُّ شَيْءٍ مَا خَلَا اللَّهَ بَاطِلُ * وَكُلُّ نَعِيمٍ لَا مَحَالَةَ زَائِلُ
'জেনে রেখো, আল্লাহ ব্যতীত সবকিছু নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। মুছে যাবে সুখ ও সমৃদ্ধির শেষ রেশটুকুও।'
এবার দুনিয়াদারদের একটা ঘটনা শুনি। এতে বিচক্ষণদের জন্য রয়েছে উত্তম নসিহত।
বনি বুওয়াইহ-এর অন্যতম বাদশাহ ফখরুদ দাওলাহ আলি বিন রুকন বলতেন:
'আমার সন্তানদের জন্য আমি এত এত সম্পদ পুঞ্জীভূত করে রেখেছি যে, তারা ও তাদের সৈন্য-সামন্ত এসবের মাধ্যমে অনায়াসে পনেরো বছর কাটিয়ে দিতে পারবে!'
সহসা একদিন ফখরুদ দাওলাহ রায় শহরের একটি দুর্গে মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুর সময় ধনভান্ডারের চাবিগুলো তার সন্তানদের হাতে ছিল। বাবার মৃত্যুর পর তারা দুর্গে আসার অবকাশটুকু পায়নি। কাফন হিসেবে তাকে পরানোর জন্য পাওয়া যায়নি এক টুকরো কাপড়। শেষ পর্যন্ত দুর্গের নিচের অংশে স্থাপিত মসজিদের তত্ত্বাবধায়ক থেকে মসজিদের পেছনের একটি পুরাতন কাপড় কিনে আনা হয়। ওদিকে তার সন্তান ও সৈন্য-সামন্তরা ব্যস্ত সম্পদ ভাগ-বাটোয়ারায়। বাবার জানাজা যে পড়বে, এতটুকু ফুরসতও তারা পাচ্ছে না।
এক সময় পচন ধরে তার মৃতদেহে। বেরোতে থাকে বিচ্ছিরি দুর্গন্ধ। এমনকি পড়ে থাকা লাশটির কাছে যাওয়াও আর সম্ভব হচ্ছিল না। অবশেষে একটি রশি বেঁধে সিঁড়ির ওপর দিয়ে টেনে টেনে নামানো হচ্ছিল তার দেহ। কিন্তু এভাবে টানার কিছুক্ষণ পর দেহটি ফেটে যায়। হায়রে, দুনিয়াদারদের এমনই দুরবস্থা!
মৃত্যুর সময় কেমন ছিল তার সম্পদের পরিমাণ! ২৮ লক্ষ ৬৫ হাজার দিরহাম। তার ধনভান্ডার স্বর্ণ, রৌপ্য, ইয়াকুত, মণি-মুক্তা, বলখশ৯০ ও হিরাতে ভরা ছিল। যার পরিমাণ ছিল প্রায় ১৪ হাজার ৫শ খণ্ড। যার মূল্য লক্ষ লক্ষ দিনার। তার ছিল অসংখ্য রৌপ্যের তৈরি পাত্র; যার ওজন ৩০ লক্ষ মন। বিবিধ সামগ্রী ছিল তিন হাজার বোঝা। বর্ম ছিল এক হাজার বোঝা। বিছানা প্রায় দুই হাজার পাঁচশ বোঝা।'৯১
কই! তার সম্পদ তো কম ছিল না। জীবিত অবস্থায় সে থাকত রাজার হালে। কিন্তু মৃত্যুর পর এ কেমন বেহাল দশা হলো তার! এত এত সম্পদ! অথচ, মৃত্যুর পর শেষ বিদায়ের সামান কাফনের কাপড়টুকু কিনতে হিমশিম খেতে হলো।
আবু দারদা রা. বলেন:
'দুনিয়ার প্রতি যে অমুখাপেক্ষী নয়, দুনিয়া তার কোনো উপকারে আসে না।'৯২
হাসান রহ. বলেন:
'দুনিয়া মুমিনদের জন্য অতি উত্তম স্থান। এখানেই তারা উত্তম আমল করে জান্নাতে যাওয়ার পাথেয় জোগাড় করে। পক্ষান্তরে দুনিয়া কাফির ও মুনাফিকদের জন্য ভীষণ খারাপ স্থান। এখানে তারা মন্দ কাজ করে জাহান্নামকে নিজেদের জন্য অবধারিত করে নেয়।'৯৩
কবি বলেন:
يَا مَنْ تَمَتَّعَ بِالدُّنْيَا وَبَهْجَتِهَا * وَلَا تَنَامُ عَنِ اللَّذَّاتِ عَيْنَاهُ أَفْنَيْتَ عُمْرَكَ فِيْمَا لَسْتَ تُدْرِكُهُ * تَقُوْلُ لِلَّهِ مَاذَا حِيْنَ تَلْقَاهُ
'দুনিয়ার ভোগ-বিলাসে মত্ত হে মানব! সুখ ও সমৃদ্ধির উদগ্র বাসনা কেড়ে নিয়েছে তোমার ঘুম। জীবন তো বরবাদ করে দিলে, ধূসর মরীচিকার পেছনে ছুটে। কাল যখন প্রভুর সামনে গিয়ে দাঁড়াবে—কী জবাব দেবে তাঁকে?'৯৪
এ দুনিয়ায় মুমিনের জীবনযাপন বেশ কঠিন। এখানে তাকে পথ চলতে হয় সাধনা করে। ধৈর্যধারণ করে অগ্রসর হতে হয় সম্মুখ পানে।
হাসান রহ. বলেন:
'দুনিয়াতে মুমিন ব্যক্তি একজন বন্দীর ন্যায়। মুক্তির জন্য আজীবন সে চেষ্টা চালিয়ে যায়। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কোনো বস্তু থেকেই সে নিরাপদ নয়।'৯৫
প্রিয় ভাই, এটাই হলো দুনিয়া—
فَإِنْ تَجْتَنِبْهَا كُنْتَ سِلْمًا لِأَهْلِهَا وَإِنْ تَجْتَذِبْهَا نَازَعَتْكَ كِلَابُهَا
'যদি মুখ ফিরিয়ে নাও দুনিয়া নামক এই পচা লাশ থেকে, তবে নিরাপদ তুমি। আর যদি আকৃষ্ট হও তার দিকে, তবে তুমিও লেগে যাও ঝগড়ায় কুকুরদের সাথে। '৯৬
ইবনে মাসউদ রা. বলেন:
'দুনিয়াতে প্রত্যেকটি মানুষ মেহমান। এসব ধন-সম্পদ তাদের নয়, এগুলো অপরজনের। মেহমান এক সময় চলে যায়। কিন্তু ধার করা সম্পদ নির্দিষ্ট সময় ফিরিয়ে দিতে হয়।'
আবু হাজিম সালামা বিন দিনার রহ. বলেন:
'তোমাদের মাঝে আখিরাতের সম্বলের ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। তাই এ ঘাটতি পূরণে তোমরা বেশি বেশি আমল করে নাও। কেননা, এমন এক সময় আসবে, যখন আখিরাতের সম্বল জমা করার একটুও সুযোগ পাবে না।'৯৭
কেননা, কিয়ামত দিবস হিসাব-নিকাশ ও প্রতিদানের দিন। আখিরাতের সূর্য উদিত হলেই শুরু হবে হিসাব-নিকাশের পালা। ওই দিন আর আমল করার সুযোগ থাকবে না। যতদিন পর্যন্ত দুনিয়ার সূর্য উদিত হবে, ততদিন আখিরাতের হিসাব-নিকাশ হবে না; এ পুরো সময়টাই আমল করার সময়। সুতরাং এ সময় ফুরিয়ে যাবার আগে আগে অধিক পরিমাণ নেক আমল করে নিতে হবে। জবাবদিহির সম্মুখীন হবার আগেই গুছিয়ে রাখতে হবে সব হিসাব-নিকাশ।
সালাফ দুনিয়ার চাকচিক্য, ধন-সম্পদ, উঁচু উঁচু প্রাসাদ-এসবের প্রতি ভ্রুক্ষেপও করেননি। উমর রা. গোটা মুসলিমবিশ্বের শাসক। মিম্বরে উঠে খুতবা দিলেন। গায়ে তার বারোটি তালিযুক্ত চাদর!
ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা মিম্বারে দাঁড়িয়ে। গায়ে তালিযুক্ত পোশাক। অথচ আমরা? কাপড় খানিকটা ছিঁড়ে গেলেই হলো, 'লজ্জায়' মসজিদে যাওয়ার নাম করি না। অনেকে তো দেখা যায়, এর চেয়েও তুচ্ছ অজুহাতে জামাআত ত্যাগ করে।
ইসা আ. তাঁর সঙ্গীদের উপদেশ দিতেন—
'দুনিয়ার সময়টি কাটিয়ে দাও। স্থায়ী আবাস গড়ার জন্য এখানে ঘর নির্মাণ কোরো না।' তিনি আরও বলতেন, 'সাগরের ঢেউয়ের ওপর ঘর নির্মাণ করার মতো বোকামি কি কেউ করতে পারে? তেমনই এটা হচ্ছে ক্ষণস্থায়ী দুনিয়া। এটাকে স্থায়ী আবাসস্থল মনে করে ধোঁকায় পড়ো না।'৯৮
মাসরুক বিন আজদা রহ. তার এক ভ্রাতুষ্পুত্রকে কুফার একটি আবর্জনা স্তূপের নিকট নিয়ে গেলেন। তারপর বললেন :
'চলো, তোমাকে দুনিয়া দেখাই। এই হলো দুনিয়া। লোকেরা যাকে খেয়ে ফুরিয়ে ফেলেছে। পরিধান করে পুরাতন করেছে। তার ওপর সওয়ার হয়ে দুর্বল করে দিয়েছে। এখানে তারা রক্তপাত ঘটায়। হারাম বিষয়সমূহকে হালাল সাব্যস্ত করে। বিনষ্ট করে আত্মীয়তার সম্পর্ক।'৯৯
হাসান রহ. পুণ্যবানদের পার্থিব অবস্থার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন:
'আল্লাহ সেসব লোকের ওপর রহমত বর্ষণ করুন, যাদের কাছে দুনিয়াটা আমানতের ন্যায়। তারপর যার আমানত তাকে বুঝিয়ে দিয়ে দুনিয়া থেকে তারা বিদায় নেন খালি হাতে।'১০০
টিকাঃ
৮৭. আশ-শুকর: ১৫
৮৮. সুরা আল-আ'লা: ১৭
৮৯. আল-ফাওয়ায়িদ: ১২৩
৯০. এক ধরনের দামি পাথর, যা বলখশানে পাওয়া যেত। বলখশান তুর্কিতে অবস্থিত।
৯১. শাজারাতুজ জাহাব : ৩/১২৪
৯২. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ১/২১০
৯৩. জামিউল উলুম ওয়াল হিকাম: ৩৬০
৯৪. আজ-জুহদ, বাইহাকি: ২৮২
৯৫. জামিউল উলুম ওয়াল হিকাম: ২৬৯
৯৬. শাজারাতুজ জাহাব: ২/১০
৯৭. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৩/২৪২
৯৮. জামিউল উলুম ওয়াল হিকাম: ৩৭৯
৯৯. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ২/৯৭
১০০. আল-ইহইয়া: ৩/২২১
📄 দুনিয়া ধূসর মরীচিকা, নয় কোনো বাস্তবতা
এই যে দুনিয়া, যার প্রতি আমাদের এত ভালোবাসা। কী তার শেষ পরিণতি? এই যে ধন-সম্পদ, যা আমরা জমা করছি। আসলে সেগুলোর পরিণাম কী?
জনৈক ব্যক্তি তার ভাইয়ের নিকট চিঠি লিখলেন—
'সালাম নিবেদনের পর, এই দুনিয়া হচ্ছে অলীক-কল্পনা। আখিরাত হলো বাস্তবতা। মৃত্যু হলো উভয়ের মধ্যে সীমারেখা। এখানে আমরা আছি কল্পনাপ্রসূত স্বপ্নের ঘোরে। ওয়াস সালাম।'
প্রিয় ভাই, তোমার জীবনের অতীত সময়গুলোর দিকে একটু তাকিয়ে দেখো! এসব কি আসলেই স্বপ্নের মতো নয়?... নিমিষেই তোমার জীবন থেকে কেটে গেল কান্নাহাসির কতগুলো বছর! কিন্তু ভাই, হিসাব-নিকাশের পর্বটা যে এখনো বাকি!
জিরার বিন মুররাহ রহ. বলেন:
'শয়তান বলে, বনি আদমের ভেতর যখন তিনটা বোধ সৃষ্টি হয়, তাদের বশে আনা তখন আমার জন্য খুব সহজ হয়ে যায়। ১. যখন সে নিজের কৃত পাপের কথা ভুলে যায়। ২. যখন সে মনে করে, আমি অনেক আমল করে ফেলেছি। ৩. যখন সে আপন সিদ্ধান্তে নিজেই মুগ্ধ হয়।'১০১
আমাদের অবস্থাটি আবু দারদা রা.-এর এ কথাটির মাঝে ফুটে ওঠে—
'প্রত্যেক মানুষের মাথায় একটু সমস্যা আছে মনে হয়। নাহলে তারা পার্থিব সম্পদ একটু বৃদ্ধি পেলেই কেন এত খুশিতে আত্মহারা হয়ে যায়? অথচ, সময়ের চাকা যত গড়াচ্ছে, ততই তো তাদের জীবন চলে যাচ্ছে শেষের দিকে। তার যে জীবন শেষ হয়ে যাচ্ছে, সেদিকে তার কোনো খেয়াল নেই। জীবন-সমাপ্তির পরে সম্পদের হ্রাস-বৃদ্ধি এমন কী কাজে আসবে তার?'১০২
অধিকাংশ মানুষই চিন্তায় ডুবে থাকে, নিজের পার্থিব জীবনের ব্যর্থতা ও জীবনমান অনুন্নত হওয়ার কারণে। কিন্তু নিজের জীবনকাল ক্রমশ ফুরিয়ে যাওয়া ও মৃত্যু নিকটে চলে আসার কারণ নিয়ে চিন্তিত হয়, এমন মানুষ খুব কমই আছে।
অধিকাংশ মানুষই বেমালুম ভুলে যায়, জীবনের ফেলে আসা সময় ও বছরগুলোর কথা। কিন্তু পার্থিব কোনো বিষয় (মৃত্যুর আগ পর্যন্ত) কখনো মুছেই না তাদের স্মৃতির খাতা থেকে! তাদের জীবনের লক্ষ্যই যেন শুধু দুনিয়া!
বস্তুত, মানুষের মানসিকতায় নেই সুষ্ঠু ভারসাম্য। কোনটি অগ্রাধিকারের উপযুক্ত আর কোনটি উপযুক্ত নয়; কীসের কারণে চিন্তিত হওয়া উচিত, আর কীসের কারণে নয়-এটা তারা বোঝে না।
ইয়াহইয়া বিন মুআজ রহ. বলেন:
'বড় আশ্চর্য লাগে যখন দেখি, সম্পদ কমে যাওয়ার কারণে কেউ চিন্তিত হয়। আসলে ধন-সম্পদ নিয়েই তার যত চিন্তা। এদিকে নিজের জীবনও যে ফুরিয়ে আসছে, তা নিয়ে তার কোনো মাথা ব্যথা নেই!'
জীবনকাল ফুরিয়ে আসছে, এ নিয়ে চিন্তিত হয়ে রাতে ঘুমাতে পারেনি, এমন মানুষ কখনো আমরা দেখেছি? সত্যিই কাউকে কি দেখা যায়, এমন চিন্তিত হতে? বর্তমান সময়ে এমন কোনো মানুষের কথা কি আমরা শুনেছি? তবে সম্পদ কমে যাচ্ছে আর এ কারণে চিন্তায় ঠিকমতো ঘুমাতে পারছে না, এমন মানুষের সংখ্যা অবশ্য গুনে শেষ করা যাবে না। একটু পরই যে তারা দুনিয়াকে বিদায় জানাবে, হিসাব-নিকাশের সম্মুখীন হবে-এটা নিয়ে তারা কী করে এতটা নির্লিপ্ত থাকে, বুঝে আসে না!
টিকাঃ
১০১. সিফাতুস সাফওয়াহ : ৩/১১৬
১০২. আস-সিয়ার: ১৯/৪৮৩
📄 প্রকৃত সফলতার গূঢ় তত্ত্ব
শুনুন, মুক্তো ঝরা সে কথা। হাসান বসরি রহ. বলেন :
'যার সম্পদ বেশি, তার গুনাহ বেশি। যে বেশি কথা বলে, সে মিথ্যা বলে বেশি। যার চরিত্র খারাপ, সে নিজেই নিজের শত্রু।'১০৩
প্রকৃত সফলতার গূঢ় তত্ত্ব
পার্থিব সমৃদ্ধি আর সফলতা লাভের আশায় আমরা সম্পদ অর্জন করি। সে সমৃদ্ধি আর সফলতা অর্জনের জন্য আবার টাকা-পয়সাও ব্যয় করি। আত্মিক প্রশান্তির জন্য নির্মাণ করি বিলাসবহুল প্রাসাদ আর সুউচ্চ দালানকোঠা। ভ্রমণে বের হয়ে পড়ি দুঃশ্চিন্তা দূর করে প্রফুল্ল হতে। এভাবে কত পন্থাই না আমরা অবলম্বন করি!... জীবনের একটা পর্যায়ে এসে আমরা কিছুটা তুষ্ট হই নিজেদের অবস্থা অবলোকন করে। ভাবি, এই বুঝি সফলতা হাতে স্পর্শ করতে পেরেছি। আসলে এসব কি সফলতা?
অতীতের কত লোকই তো এসব করে দেখেছেন সফলতা অর্জনের জন্য। নানান অভিজ্ঞতায় তারা নিজেদের সমৃদ্ধ করেছেন, ঋদ্ধ হয়েছেন। কিন্তু শেষমেশ সবাই একই সুরে বলেছেন, সমৃদ্ধি, সৌভাগ্য ও সফলতা—সবই মূলত আল্লাহর ইবাদত ও তাঁর নৈকট্য অর্জনের মধ্যেই নিহিত। মহান প্রতিপালকের আনুগত্যের মাধ্যমেই সুখ ও স্বপ্নের আবাস জান্নাত লাভ করা যায়। আল্লাহর আনুগত্যেই রয়েছে চিরস্থায়ী সমৃদ্ধি। তাঁর ইবাদত ও আনুগত্যই সকল সফলতার গূঢ়তত্ত্ব।
ওয়াহাব বিন মুনাব্বিহ রহ. বলেন :
'দুনিয়া ও আখিরাতের উদাহরণ দু'সতিনের ন্যায়। একজনকে খুশি করতে গেলে অপরজন নিশ্চয় নারাজ হবে।'১০৪
প্রিয় ভাই, আমাদের উচিত ছিল, আমরা হবো আল্লাহর পথের পথিক। অথচ, আমাদের অবস্থা! তার বর্ণনা কি এটাই, যেটা হাসান বসরি রহ. বলেন :
'আমি খুবই আশ্চর্যান্বিত হই লোকদের দেখে। তাদের পাথেয় সংগ্রহ করার জন্য আদেশ করা হয়েছে। অথচ, তারা খেলাধুলায় মত্ত হয়ে আছে! তাদের অন্তিম সফরের সময় এসে গেছে। কিন্তু এখনো তারা উন্মাদ খেল-তামাশায়!'
এ দুনিয়ার ভালো-মন্দের পরিমাপক কী? কীসের ভিত্তিতে নির্ণয় করা হবে দুনিয়ার কল্যাণ ও অকল্যাণ? এ প্রশ্নের উত্তরে আলি বিন আবি তালিব রা. বলেন:
'তোমার ধন-সম্পদ ও সন্তানসন্ততি বৃদ্ধি পেল। মনে করো না এর মাঝেই তোমার কল্যাণ। বরং কল্যাণ তো নিহিত আমল বৃদ্ধি পাওয়া ও ধৈর্যধারণের মাঝে। দুনিয়াতে শুধু দু'ব্যক্তির জন্য কল্যাণ রয়েছে : ১. ওই ব্যক্তি, যে অনেক গুনাহ করেছে; কিন্তু পরে তাওবার মাধ্যমে নিজের সব গুনাহ মাফ করে নিয়েছে। ২. ওই ব্যক্তি, যে ভালো কাজে অগ্রগামী থাকে; আমলে তাকওয়ার কোনো কমতি রাখে না।
বস্তুত, যে আমল কবুল হবে, তার মাঝে তাকওয়ার কমতি কেন থাকবে?'১০৫
দুনিয়া যাকে তার সবটুকু দিয়েছে, পূর্ণ ঝলক নিয়ে তার দিকে চোখ মেলে তাকিয়েছে; সে যেন হাসান রহ.-এর এ উক্তিটি নিয়ে একটু ভাবে-
'আল্লাহর শপথ, যে মুমিন ব্যক্তির জন্য দুনিয়া প্রশস্ত হয়েছে; দুনিয়া তাকে ধোঁকায় ফেলবে— এমন আশঙ্কাও তার মধ্যে নেই। প্রকৃতপক্ষে এমন মানসিকতাধারীর আমল ও বিবেচনাশক্তিই লোপ পেয়েছে। একইভাবে যে মুমিন ব্যক্তি থেকে আল্লাহ তাআলা দুনিয়াকে দূরে রেখেছেন; আর সে মনে করছে, দুনিয়ার মধ্যেই তার কল্যাণ নিহিত আছে। এ ব্যক্তিরও আমল ও বিবেচনাশক্তি লোপ পেয়েছে। '১০৬
দুনিয়ার দিনগুলো যেন ঘুমন্ত ব্যক্তির স্বপ্ন। বিলীয়মান ছায়ার মতো। চকচকে মরীচিকার ন্যায়। হাসির চেয়ে কান্নাই এখানে বেশি। সুখের চেয়ে দুখই অধিক। পাওয়ার চেয়ে না-পাওয়ার পাল্লাই ভারী। এখানে ক্ষণিকের সহানুভূতির মধ্যে রয়েছে দীর্ঘ সময়ের কষ্টের আভাস।
হিন্দ বিনতে নু'মান বলেন:
'আজ তোমরা দেখছ, আমরা সম্মান ও প্রভাব-প্রতিপত্তির অধিকারী। কিন্তু বেলা ডোবার আগেই আমরা চরম লাঞ্ছিত ও প্রভাব-প্রতিপত্তিহীন হয়ে যেতে পারি। বস্তুত, আল্লাহর হিকমত হলো, তিনি কোনো ঘরকে সুখ দ্বারা পরিপূর্ণ করলে কিছুদিন পর আবার সেখানে বয়ে দেন কষ্টাশ্রুর প্রবাহ।'
জনৈক ব্যক্তি হিন্দ বিনতে নু'মানের নিকট কুশলাদি জানতে চাইলে তিনি বলেন:
'এমন অবস্থায় আমরা সকালে উপনীত হই যে, আরবের প্রত্যেক লোক আমাদের থেকে কিছু পাওয়ার আশা রাখে। আবার যখন আমরা সন্ধ্যায় উপনীত হই, তখন অবস্থা এমন হয় যে, আরবের প্রত্যেক লোক (আমাদের অভাবের কারণে) আমাদের ওপর দয়া করে। অর্থাৎ, আমাদের অবস্থা কখনো ভালো থাকে, আবার কখনো আমরা খারাপ অবস্থার সম্মুখীন হই। অবশ্য এটাই হলো দুনিয়ার চিরাচরিত নিয়ম।'
একদিন তার বোন হিরকাহ কাঁদতে লাগলেন, অথচ ওই সময় তাদের অবস্থা বেশ ভালোই চলছিল। তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, 'আপনি যে কাঁদছেন?'
তিনি বললেন :
'আমি দেখছি, আমার পরিবার খুব আনন্দে আছে। আর এমন খুব কম ঘরই আছে, যেখানে সুখের পরে দুঃখ আসে না।'
ইসহাক বিন তালহা বলেন:
'আমি একদিন তার কাছে গিয়ে বললাম, “রাজা-বাদশাহদের চোখেও অশ্রু?"
তিনি বললেন:
“গতকাল যেমন ছিলাম, আজ সে অপেক্ষা ভালো আছি। তবে আমি কোনো বইতে এমন পড়েছি, কোনো ঘরের লোকেরা যখন সুখ- শান্তিতে বাস করে, তখন অচিরেই তাদের ঘরে নেমে আসে দুঃখের জলধারা। আর সময় কাউকে একটি পছন্দনীয় দিন উপহার দিলে এর মধ্যে লুকিয়ে রাখে অপছন্দনীয় একটি দিন।”১০৭
উমর বিন আব্দুল আজিজ রহ. খুতবায় বলেন :
'হে লোকসকল, এমন একটি বিষয়ের জন্য তোমাদের সৃষ্টি করা হয়েছে, যদি তোমরা তা বিশ্বাস করো, তবে তোমাদের নির্বোধ বলা হবে। আর যদি বিশ্বাস না করো, তবে তোমরা ধ্বংস হয়ে যাবে। তোমাদের সৃষ্টি করা হয়েছে চিরস্থায়ীভাবে থাকার জন্য। তোমাদের এক জায়গা (দুনিয়া) থেকে অন্য জায়গায় (আখিরাতে) স্থানান্তর করা হবে। হে আল্লাহর বান্দারা, তোমরা এমন এক জায়গায় বসবাস করছ, যেখানে তোমাদের খাদ্যদ্রব্য নষ্ট হয়ে যায়, পানীয় শুকিয়ে যায়। এখানে একটি নিয়ামত পেয়ে তোমরা খুশি হলে পরক্ষণে সে নিয়ামত হারিয়ে তোমরা আবার দুঃখে নিপতিত হও। তাই যেখানে তোমাদের প্রত্যাবর্তন, যেখানে থাকবে অনন্তকাল, জেনে নাও সে চিরস্থায়ী আবাস সম্পর্কে।' এতটুকু বলেই তিনি কান্নায় বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন। ১০৮
টিকাঃ
১০৩. কিতাবুস সামত: ৮৫
১০৪. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৪/৫১
১০৫. সিফাতুস সাফওয়াহ: ১/৩২১
১০৬. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৬/২৭২
১০৭. উদ্দাতুস সাবিরিন: ৩২৬
১০৮. আল-ইহইয়া: ৩/২৮৮
📄 পার্থিব স্বার্থের মজলিস
আমরা কোথায় আর তাঁরা কোথায়? কেমন আমাদের দুনিয়ার জীবন আর কেমন ছিল সালাফে সালিহিনের দুনিয়ার জীবন?
হাসান রহ. বলেন:
'সেই সত্তার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ, আমি এমন মানুষদের সান্নিধ্য লাভে ধন্য হয়েছি, যাদের নিকট দুনিয়া পায়ের তলার মাটির চেয়েও তুচ্ছ ছিল।'১০৯
আল্লাহ তাআলা হাসান রহ.-এর ওপর রহমত বর্ষণ করুন। এ কথা তো তিনি তার বেঁচে থাকার সময়ে বলেছিলেন। আজ যদি তিনি আমাদের এ যুগের অবস্থা দেখতেন, যে যুগে মানুষ দুনিয়ার জন্য কুকুরের মতো একে অপরকে তাড়া করে। আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে। বিনষ্ট করে ভ্রৃত্বের সম্পর্ক। সম্পদের জন্য শত মিথ্যা বলতেও দ্বিধাবোধ করে না। এমন দুরবস্থা দেখলে কেমন মন্তব্য করতেন তিনি?
পার্থিব স্বার্থের মজলিস
পার্থিব সম্পদের আলাপ-আলোচনা নিয়ে এ যুগে অনেক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, দুনিয়া নিয়ে সেখানে কত বাক্যালাপ চলে; কিন্তু আল্লাহর নাম সেখানে নেওয়া হয় না। এসব বৈঠকে গিবত ও পরনিন্দার কর্মযজ্ঞ তো চলে, সে সাথে হারাম খাবারেরও মেলা বসে।
গুনাহ ও অপরাধই হয়ে থাকে তাদের আলোচনার বিষয়বস্তু। পার্থিব স্বার্থের জন্য আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করা, ভালোবাসার মজবুত ভিত্তি নড়বড়ে হওয়া, বছরের পর বছর ধরে ভাইয়ে ভাইয়ে কথা না বলা, ঋণ পরিশোধে গড়িমসি করা, এতিমের মাল ভক্ষণ করতে আল্লাহকে ভয় না করা, মিথ্যা বলে ও মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়ে অপরের জমিন অন্যায়ভাবে দখল করে নেওয়া-এ সবই হয় আসরের সারকথা।
তাদের যে এক সংকীর্ণ গর্তে প্রবেশ করতে হবে, তা তারা একদম ভুলে যায়। তাদের জন্য কী অপেক্ষা করছে সেখানে, ভালো না মন্দ?—এসবের তারা থোড়াই কেয়ার করে! কিয়ামতের কঠিন ভয়াবহতা যে তাদের সামনে, এ নিয়ে তাদের কোনো মাথাব্যথা নেই!
হাসান রহ. বলেন:
'আমার বড়ই আশ্চর্য লাগে এমন মানুষকে দেখলে। কী করে তার এত হাসি পায়! অথচ জাহান্নাম হা করে আছে তার পেছনে! আমি খুবই আশ্চর্যান্বিত হই আনন্দে আত্মহারা ব্যক্তিকে দেখলে। তার এত খুশির কারণ কী? তার পেছনেই যে দাঁড়িয়ে আছে মৃত্যু!'১১০
দুনিয়ার মোহে আচ্ছন্ন, পার্থিব ভোগ-বিলাসে মত্ত, সম্পদের ধোঁকায় পতিত—এমন কত মানুষকেই তো আমরা দেখি প্রতিনিয়ত। কিন্তু ভাই আমার, এখনো কি সময় হয়নি সঠিক পথে ফিরে আসার?
একটা প্রশ্ন সকাল-সন্ধ্যা আমাদের মুখে মুখে উচ্চারিত হয় :
তবে কি আমরা দুনিয়ার জন্য কোনো কাজ করব না?... কেন করব না? অবশ্যই কাজ করব। ইসলাম তো আমাদের কাজের কথা বলে। তবে দুনিয়ার জন্য কাজ করার ক্ষেত্রে এ অসিয়তটা একটু স্মরণ রাখবেন:
সুফইয়ান সাওরি রহ.-কে একব্যক্তি বলল, 'আমাকে অসিয়ত করুন।' তিনি বললেন:
'দুনিয়ার জন্য সে পরিমাণ কাজ করো, যে পরিমাণ সময় তুমি দুনিয়াতে থাকবে। আখিরাতের জন্য সে পরিমাণ আমল করো, যে পরিমাণ সময় তোমাকে সেখানে থাকতে হবে। ব্যস, এটাই তোমার প্রতি অসিয়ত। ওয়াস-সালাম।'১১১
এবার হিসাব মিলিয়ে দেখো। দুনিয়াতে তোমাকে কতদিন থাকতে হবে আর কতদিন থাকতে হবে আখিরাতে? মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উম্মাহর গড় বয়স তো ষাট থেকে সত্তর বৎসর। এর চেয়ে অল্প বয়সেও কত মানুষ মারা যায়! এখানে আমরা বয়সের একটা সাধারণ সংখ্যা ধরলাম। এবার আখিরাতের একটি দিন নিয়ে চিন্তা করে দেখি।
কেমন হবে আখিরাতের একটি দিনের দৈর্ঘ্য? প্রশ্নের উত্তর তো আমাদের জানা নেই। কিন্তু কুরআন আমাদের জানাচ্ছে—
﴿وَإِنَّ يَوْمًا عِنْدَ رَبِّكَ كَأَلْفِ سَنَةٍ مِّمَّا تَعُدُّونَ ﴾
'আপনার পালনকর্তার কাছে একদিন তোমাদের গণনার এক হাজার বছরের সমান।' ১১২
আখিরাতের একদিন আর দুনিয়ার পুরো জীবন। তুলনা করে দেখো। সমান? নাকি তুলনা করাটাই বোকামি? এবার তুমি নিজেই ঠিক করে নাও, দুনিয়ার জন্য কতটুকু কাজ করা দরকার আর কতটুকু আমল করা দরকার আখিরাতের জন্য? আল্লাহ আমাদের তাঁর রহমতপ্রাপ্ত বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করুন। তাঁর অনুগ্রহে আমাদের জান্নাতে প্রবেশ করান। তাওফিক দান করুন তাঁর সন্তুষ্টি লাভের।
ভাই আমার,
কোনো কর্মচারী সুলতানের নিকট সম্মান ও গ্রহণযোগ্যতা পাওয়ার আশা করলে, তখন সে লক্ষ করে, কোন কাজটি সুলতানের নিকট পছন্দনীয়? আর সে ওই কাজটিই করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ১১৩
একইভাবে আমরাও যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভ করতে চাই, তবে তো আমাদের আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগিই করতে হবে। সুতরাং আমরা যারা এখন তাঁর ইবাদত-বন্দেগি করছি, তাদের জন্য আছে নাজাতের সুসংবাদ। আর যারা ইবাদত করছি না, তাদের জন্যও কিন্তু একটা সুযোগ আছে। তাওবা। হ্যাঁ, তাওবা। তাই দ্রুতই তাওবা করে আল্লাহর ইবাদতে মশগুল হয়ে যাই। বস্তুত, আমাদের যিনি সৃষ্টি করেছেন, যিনি আমাদের রিজিক দান করেন, যিনি আমাদের সুন্দর আকৃতি দিয়ে সৃষ্টি করেছেন এবং অগণিত নিয়ামত দান করেছেন—তিনিই আমাদের ইলাহ। আমাদের একমাত্র উপাস্য। আমাদের অন্তরে তাঁর প্রতি লজ্জাবোধ ও ভালোবাসা অবশ্যই থাকতে হবে।
টিকাঃ
১০৯. তাসলিয়াতু আহলিল মাসায়িব: ২৪৫
১১০. তাম্বিহুল গাফিলিন: ১/২১২
১১১. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৭/৫৬
১১২. সুরা আল-হজ: ৪৭
১১৩. আল-ফাওয়ায়িদ: ৬৮