📄 রাত ও দিন সফরের একেকটি মনজিল
প্রতিটি রাত ও দিন পরকালের পথে যাত্রার একেকটি মনজিল। তাই সুযোগ হলে পাথেয় সংগ্রহ করে নেওয়া উচিত প্রতিটি মনজিল থেকে। যা কিছু করার, তা সময় হাতে থাকতেই করে নিতে হবে। কেননা, কখন যে কার সফরের ইতি ঘটবে, তা আমাদের কারোই জানা নেই। বলা যায় না, মৃত্যু কখন এসে পরিসমাপ্তি ঘটায় এ জীবন সফরের।
জনৈক সালাফ তার ভাইয়ের উদ্দেশে চিঠি লিখে তাকে সর্তক করেন—
'হে ভাই, তুমি কি ধারণা করে আছ, তুমি দুনিয়ার স্থায়ী বাসিন্দা? আসলে তা নয়। এ দুনিয়ায় তুমি তো একজন মুসাফির মাত্র। তোমার সফরের ইতি ঘটবে অতি শীঘ্রই। মৃত্যু তাকিয়ে আছে তোমার দিকে। দুনিয়া তোমার জন্য ক্রমশ সংকীর্ণ হয়ে আসছে। জীবনের যে সময়গুলো অতিবাহিত হয়েছে, কখনো তা আর ফিরে আসবে না।'৫৭
আমাদের চারপাশে দুনিয়াবিমুখ ও দ্বীনদার লোকও কিন্তু বসবাস করে। আমাদের উচিত, তাদের থেকে দুনিয়া ও আখিরাতের সঠিক মূল্যবোধ জেনে নেওয়া এবং তাদের থেকে সবক নেওয়া দুনিয়াবিমুখতা ও অল্পতুষ্টির।
আলি বিন ফুজাইল রহ. বলেন:
'আমার পিতা ফুজাইল একবার ইবনে মুবারক রহ.-কে প্রশ্ন করলেন, “আপনি আমাদের দুনিয়াবিমুখতা ও অল্পতুষ্টির নসিহত করেন, কিন্তু আপনি যে প্রচুর সম্পদ উপার্জন করেন! এ কেমন উপদেশ?” তিনি বললেন, “হে আবু আলি, আমি এ সম্পদ অর্জন করি, যেন তা নিজের মান-মর্যাদা রক্ষা ও ইবাদতে সহায়ক হয়।” তখন আমার পিতা বললেন, “হে ইবনে মুবারক, কতই না উত্তম আপনার কাজ!””৫৮
দুনিয়া সম্পর্কে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি কেমন?! আমি কিন্তু দুনিয়ার সম্পদ অর্জন করতে নিষেধ করছি না। আমি বরং উদ্বুদ্ধ করছি, হালাল উপায়ে সম্পদ অর্জন করে হালাল ক্ষেত্রে তা ব্যয় করার প্রতি। কারণ, হালাল উপায়ে উপার্জিত সম্পদ ব্যয় করে অনেক নেক আমল করা যায়। যেমন: সদাকা করা, অসহায়কে সাহায্য করা, বিপদগ্রস্তের পাশে দাঁড়ানো, এতিমের অভিভাবকত্ব গ্রহণ করা ইত্যাদি।
সুফইয়ান রহ. বলেন :
'তিনটি বিষয়ে আল্লাহর ক্রোধ থেকে বেঁচে থাকো-
১. আল্লাহর আদেশ পালনে শিথিলতা করা।
২. তাকদিরের প্রতি নারাজ থাকা।
৩. আল্লাহর নিকট দুনিয়ার কিছু চেয়ে, তা না পেলে তাঁর প্রতি অসন্তুষ্ট হওয়া।'৫৯
দুনিয়াতে আমরা যে রিজিক পেয়ে থাকি, এগুলো আল্লাহ তাআলা-ই আমাদের জন্য নির্ধারণ করে রেখেছেন। সুতরাং কম-বেশি যা-ই আমরা লাভ করি, এর ওপর আমাদের সন্তুষ্ট থাকা আবশ্যক। কাকে দুনিয়ার ধন-সম্পদ বেশি দেওয়া হয়েছে, আর কাকে কম দেওয়া হয়েছে—এ নিয়ে মোটেও ভাববে না। তোমাকে যতটুকু দেওয়া হয়েছে, তা নিয়েই তুমি সন্তুষ্ট থেকো। আল্লাহর পুণ্যবান বান্দারা আল্লাহ যা দান করেন, তার ওপরই সন্তুষ্ট থাকেন।
কবি বলেন:
مَنْ شَاءَ عَيْشًا رَحِيبًا يَسْتَطِيلُ بِهِ فِي دِينِهِ ثُمَّ فِي دُنْيَاهُ إِقْبَالاً فَلْيَنْظُرَنَّ إِلَى مَنْ فَوْقَهُ وَرَعًا وَلْيَنْظُرَنَّ إِلَى مَنْ دُوْنَهُ مَالًا
'যে ব্যক্তি সুখী ও সমৃদ্ধ জীবন কামনা করে এবং নিজের দ্বীন ও দুনিয়া দুটিকেই সার্থক করে তুলতে চায়, সে যেন দুই শ্রেণির লোকের দিকে নজর রাখে— তাকওয়ার বিচারে যারা তার চেয়ে উঁচু স্তরের এবং অর্থবিত্তের দিক দিয়ে যারা তার চেয়ে নিম্ন স্তরের। '৬০
এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন : ﴿ وَلَا تَمُدَّنَّ عَيْنَيْكَ إِلَى مَا مَتَّعْنَا بِهِ أَزْوَاجًا مِنْهُمْ زَهْرَةَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا لِنَفْتِنَهُمْ فِيهِ ﴾
'আমি এদের বিভিন্ন প্রকার লোককে পরীক্ষা করার জন্য পার্থিব জীবনের সৌন্দর্যস্বরূপ ভোগ-বিলাসের যে উপকরণ দিয়েছি, আপনি সেই সব বস্তুর প্রতি ভ্রুক্ষেপ করবেন না।'৬১
ইবরাহিম আল-আশআস রহ. বলেন, আমি ফুজাইল রহ.-কে বলতে শুনেছি—
'বান্দা আল্লাহকে ওই পরিমাণ ভয় করে, আল্লাহ তাআলা সম্পর্কে যে পরিমাণ ইলম তার আছে। বান্দা দুনিয়া থেকে ততটুকু বিমুখ হয়, আখিরাতের প্রতি যতটুকু আগ্রহ তার মধ্যে আছে। যে ব্যক্তি যা জানে, সে অনুযায়ী আমল করে, তার অতিরিক্ত ইলমের প্রয়োজন পড়ে না। তবে ইলম অনুযায়ী আমল করলে আল্লাহ তাআলা তাকে আরও অধিক ইলম অর্জন করার তাওফিক দান করেন। যার চরিত্র খারাপ—তার দ্বীন, বংশগৌরব ও পুরুষত্ব সবই প্রশ্নবিদ্ধ। '৬২
জনৈক দুনিয়াবিমুখ সালাফ বলেন :
'এমন মানুষ আছে বলে আমার বিশ্বাস হয় না, যে জান্নাত ও জাহান্নাম সম্পর্কে জানে, অথচ সে সব সময় (নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, জিকির, সদাচরণ ইত্যাদির মাধ্যমে) আল্লাহর ইবাদতে মশগুল থাকে না। এক ব্যক্তি তাকে বলল, “আমি অনেক কান্নাকাটি করি।” তিনি বললেন, “নিজের কৃত আমল নিয়ে অহংকারকারী ব্যক্তির কান্নার চেয়ে গুনাহ স্বীকারকারী ব্যক্তির হাসি অনেক উত্তম। কারণ, অহংকারীর আমল আল্লাহর দরবারে পৌঁছায় না।” ওই ব্যক্তি বলল, “আমাকে নসিহত করুন।” তিনি বললেন, “দুনিয়াকে দুনিয়াদারদের জন্য ছেড়ে দাও, যেমন তারা আখিরাতকে ছেড়ে দিয়েছে আখিরাতের কল্যাণপ্রত্যাশীদের জন্য। আর দুনিয়াতে জীবনযাপন করো মৌমাছির ন্যায়, যে নিজেও পবিত্র খাবার খায় এবং অপরের জন্যেও পবিত্র খাবার জমা করে। আর কোনো বস্তুর ওপর বসলে তা ভেঙে ফেলে না এবং সেখানে একটি দাগও পড়তে দেয় না।”৬৩
টিকাঃ
৫৭. জামিউল উলুমি ওয়াল হিকাম : ৩৮১
৫৮. তাহজিবুল কামাল ফি আসমাইর রিজাল: ১৬/২০
৫৯. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৬/৬৩০
৬০. আল-ইহইয়া: ৪/১৩১
৬১. সুরা তহা: ১৩১
৬২. আস-সিয়ার: ৮/৪২৬
৬৩. আল-ফাওয়ায়িদ: ১৫৩
📄 দুনিয়াকে তুচ্ছজ্ঞান করা
মৃত্যুর কথা স্মরণ করলে দুনিয়াকে খুবই তুচ্ছ মনে হয়। যখন কেউ দুনিয়ার এ তুচ্ছতা নিয়ে চিন্তা করবে, তখন তার দৃষ্টির ওপর থেকে পার্থিব মোহের পর্দা সরে যাবে। খুব সহজে সে উপলব্ধি করতে পারবে, এ দুনিয়া তো নির্দিষ্ট কয়েকটি বছর কিংবা দিনের সমষ্টি। এর পরেই নিশ্চিত মৃত্যু। এভাবে সে পরকালের প্রস্তুতি ও ওপারের পাথেয় সংগ্রহের প্রতি মনোযোগী হয়।
হাসান রহ. বলেন:
'মৃত্যু উন্মোচন করে দিয়েছে দুনিয়ার রহস্য। মৃত্যু প্রকৃত জ্ঞানীদের জন্য আনন্দ-ফুর্তির কোনো পথই খোলা রাখেনি।'৬৪
কবি বলেন:
قَدْ نَادَتِ الدُّنْيَا عَلَى نَفْسِهَا * لَوْ كَانَ فِي الْعَالَمِ مَنْ يَسْمَعُ كَمْ وَائِقِ بِالعُمْرِ أَفْنَيْتُهُ * وَجَامِعٍ بَدَّدْتُ مَا يَجْمَعُ
'দুনিয়া ডেকে বলে তার বাসিন্দাদের, কেউ আছো কি আমার উপদেশ শোনার? মনে রেখো, যারা ভরসা করেছিল জীবনের ওপর, সবাইকে আমি ছুঁড়ে ফেলেছি কবরের গর্তে আর এদিক ওদিক ছড়িয়ে দিয়েছি তাদের জমানো অর্থবিত্ত। '৬৫
আবু উবাইদা নাজি রহ. বলেন:
'হাসান বসরি রহ. যখন মৃত্যুর দুয়ারে উপনীত হলেন, আমরা তাঁর নিকটে উপস্থিত হলাম। তিনি আমাদের অভ্যর্থনা জানালেন এবং আমাদের জন্য দুআ করে অনেক বাক্য উচ্চারণের পর বললেন, "সত্য বলা ও বিপদাপদে ধৈর্যধারণ করা স্পষ্ট নেক আমল। কানে যা শোনো, তার সবটুকু মুখ দিয়ে বের কোরো না। প্রথমে এর সত্যাসত্য যাচাই করবে, তারপর বলার প্রয়োজন হলে বলবে। কেননা, যাঁরা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে দেখেছেন, তাঁদের জন্য যেকোনো বিষয়ে সরাসরি তাঁর শরণাপন্ন হবার সুযোগ ছিল। কিন্তু এখন তিনি নেই। তাই যেকোনো বিষয় খুব চিন্তা-ভাবনা করে করতে হবে। আল্লাহর শপথ করে বলছি, দুনিয়ার এ জীবন নিয়ে তোমরা প্রতারিত হোয়ো না। মৃত্যু তোমাদের অতি নিকটে। আল্লাহ তাআলা ওই বান্দার প্রতি রহম করেন, যে নির্ভেজালভাবে দুনিয়াতে জীবনযাপন করে এবং যথাযথভাবে আল্লাহর ইবাদত করে; কখনো যদি সে কোনো গুনাহ করে ফেলে, পরক্ষণে খুব কান্নাকাটি করে তা থেকে তাওবা করে নেয়; আল্লাহর শান্তি থেকে বাঁচার জন্য সে যথাসাধ্য চেষ্টা করে এবং তাঁর রহমত তালাশ করতে থাকে—আর এ অবস্থায় তার মৃত্যু চলে আসে। "'৬৬
দুনিয়া ও এর অবস্থানকারী লোকদের অবস্থা জানান দিয়ে কবি নাবিগা জা'দি বলেন:
المرءُ يَرغَبُ فِي الْحَيَاةِ * وَطُوْلُ عَيْشٍ قَدْ يَضُرُّهُ تَفْنَى بَشَاشَتُهُ وَيَبْقَى * بَعْدَ حُلُوَ الْعَيْشِ مُرُّهُ وَتَسُوْؤُهُ الأَيَّامُ حَتَّى * مَا يَرَى شَيْئًا يَسُرُّهُ
'মানুষ দীর্ঘ হায়াতের তামান্না রাখে-অথচ জীবনের দৈর্ঘ্য তাকে কেবল কষ্টই দেয়। চোখের পলকেই হারিয়ে যায় মধুময় যৌবনের অমিত সুখ-বার্ধক্যের তিক্ততায় চেহারায় ফুটে ওঠে বয়সের জ্যামিতিক রেখা। জীবনের সেই বিষণ্ণ বিকেলে বুকজুড়ে কেবল হতাশার হাহাকারই শোনা যায়।'
আবু কাবশা রা. বর্ণনা করেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
إِنَّمَا الدُّنْيَا أَرْبَعَةُ نَفَرٍ : عَبْدُ رَزَقَهُ اللَّهُ مَالًا وَعِلْمًا، فَهُوَ يَتَّقِيْ فَيْهِ رَبَّهُ، وَيَصِلُ فِيْهِ رَحِمَهُ، وَيَعْلَمُ لِلَّهِ فِيْهِ حَقًّا، فَهَذَا بِأَفْضَلِ الْمَنَازِلِ، وَعَبْدُ رَزَقَهُ اللَّهُ عِلْمًا، وَلَمْ يَرْزُقُهُ مَالًا؛ فَهُوَ صَادِقُ النِّيَّةِ، فَيَقُوْلُ : لَوْ أَنَّ لِي مَالًا لَعَمِلْتُ بِعَمَلِ فُلَانٍ، فَهُوَ بِنِيَّتِهِ فَأَجْرُهُمَا سَوَاءٌ، وَعَبْدُ رَزَقَهُ اللَّهُ مَالًا وَلَمْ يَرْزُقْهُ عِلْمًا فَهُوَ يَتَخَبَّطُ فِي مَالِهِ بِغَيْرِ عِلْمٍ، وَلَا يَتَّقِي فِيْهِ رَبَّهُ، وَلَا يَصِلُ فِيْهِ رَحِمَهُ، وَلَا يَعْلَمُ فِيْهِ لِلَّهِ حَقًّا، فَهَذَا بِأَخْبَثِ الْمَنَازِلِ، وَعَبْدُ لَمْ يَرْزُقُهُ اللَّهُ مَالًا وَلَا عِلْمًا، وَهُوَ يَقُوْلُ لَوْ أَنَّ لِي مَالًا لَعَمِلْتُ فِيْهِ بِعَمَلِ فُلَانٍ، فَهُوَ بِنِيَّتِهِ فَوِزْرُهُمَا سَوَاءٌ
'এই দুনিয়া চার শ্রেণির মানুষের জন্য। এক. এমন বান্দা, যাকে আল্লাহ তাআলা যে ধন-সম্পদ ও ইলম দান করেছেন; এ ক্ষেত্রে সে আপন প্রতিপালককে ভয় করে, এর সাহায্যে আত্মীয়তার সম্পর্ক অটুট রাখে এবং এতে আল্লাহ তাআলারও হক আছে বলে সে জানে। এমন বান্দার মর্যাদা সর্বোচ্চ।
দুই. এমন বান্দা, যাকে আল্লাহ তাআলা ইলম দান করেছেন, কিন্তু ধন-সম্পদের মালিক বানাননি। সে সৎ নিয়তের অধিকারী। সে বলে, আমার যদি ধন-সম্পদ থাকত, তবে আমি অমুকের মতো ভালো কাজ করতাম। এমন বান্দার মর্যাদা নির্ধারিত হবে তার নিয়ত অনুযায়ী। এ দুজনের প্রতিদান সমান হবে।
তিন. এমন বান্দা, যাকে আল্লাহ তাআলা ধন-সম্পদ দান করেছেন, কিন্তু ইলম দান করেননি। আর ইলম না থাকায় সে নিজের ধন-সম্পদ প্রবৃত্তির চাহিদামতো খরচ করে। এ ব্যাপারে সে তার প্রতিপালককেও ভয় করে না। আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করে না। আর এতে যে আল্লাহ তাআলারও হক আছে, তা সে জানে না। এ লোক সর্বাধিক নিকৃষ্ট স্তরের।
চার. এমন বান্দা, যাকে আল্লাহ তাআলা ধন-সম্পদও দান করেননি এবং ইলমও দান করেননি। সে বলে, আমার যদি ধন-সম্পদ থাকত, তাহলে অমুক ব্যক্তির মতো (যে ব্যক্তি প্রবৃত্তির চাহিদামতো খরচ করে) কাজ করতাম। তারও স্থান নির্ধারিত হবে তার নিয়ত অনুযায়ী। এরা দুজন পাপের দিক থেকে সমান হবে।'৬৭
হে ভাই, দুনিয়া আখিরাতের শস্যখেত। ইহজীবন ইবাদত করার সময়। এখানেই আনুগত্য করতে হয়। ইবাদত-বন্দেগি করে পরকালের পুঁজি অর্জন করার জন্যই আমাদের দুনিয়াতে পাঠানো হয়েছে।
ফুজাইল রহ. বলেন:
'আল্লাহ তাআলা সকল অকল্যাণ ও অনিষ্টকে একটি ঘরের মধ্যে রেখেছেন। আর সে ঘর খোলার একটি চাবি বানিয়েছেন। সে চাবির নাম দুনিয়াপ্রীতি। তেমনই তিনি সকল কল্যাণকে একটি ঘরে রেখেছেন। আর সে ঘরের চাবি হলো দুনিয়াবিমুখতা।'৬৮
টিকাঃ
৬৪. তারিখু বাগদাদ: ১৪/৪৪৪
৬৫. তবাকাতুশ শাফিয়িয়্যাহ: ৬/৭৮
৬৬. আল-আকিবাহ: ৮৯
৬৭. জামিউল উলুমি ওয়াল হিকাম: ৪২৯, হাদিসটি সহিহ। সুনানুত তিরমিজির শরাহ তুহফাতুল আহওয়াজি: ৬/১৬১৫ : ইমাম তিরমিজি বলেন, হাদিসটি হাসান সহিহ।
৬৮. আল-ইহইয়া: ৪/২৫৭
📄 যখন তাঁদের বয়স চল্লিশ হতো
একটু লক্ষ করো, সালাফের সাথে আমাদের কেমন ব্যবধান? কোথায় তাঁরা আর কোথায় আমরা!
আব্দুল্লাহ বিন দাউদ রহ. বলেন:
'সালাফে সালিহিন যখন চল্লিশ বছরে উপনীত হতেন, তখন তারা আপন বিছানাকে গুটিয়ে নিতেন।'৬৯ সারা রাত না ঘুমিয়ে নামাজ, তাসবিহ ও ইসতিগফারের আমলে মশগুল থাকতেন... সময়কে কাটাতেন ইবাদত-বন্দেগির কাজে। নিজেদের পেছনের যেসব আমলে কোনো অপূর্ণতা বা ত্রুটি থেকে গেছে, সেসব আমলের ক্ষতিপূরণ করতেন। প্রস্তুতি নিতেন ভবিষ্যৎ জীবনে উত্তম ও পরিপূর্ণ আমলের।'
তাদের সে অবস্থার কথাই উঠে এসেছে কবিতার পঙ্ক্তিতে :
إِنَّ لِلَّهِ رِجَالًا فُطَنًا * طَلَّقُوْا الدُّنْيَا وَخَافُوْا الْفِتَنَا نَظَرُوْا فِيْهَا فَلَمَّا عَلِمُوا * أَنَّهَا لَيْسَتْ لِحَيَّ وَطَنَا جَعَلُوْهَا حُجَةٌ وَاتَّخَذُوا * صَالِحَ الْأَعْمَالِ فِيْهَا سُفُنَا
'আল্লাহর অনেক প্রাজ্ঞ বান্দা আছেন, যারা ফিতনার আশঙ্কায় দুনিয়াকে তালাক দিয়েছেন। তারা উপলব্ধি করতে পেরেছেন, দুনিয়া স্থায়ী আবাস নয়। পার্থিব জীবনকে তারা মনে করেছেন ঝঞ্ঝাবিক্ষুদ্ধ উত্তাল সমুদ্র আর তাই এটি পাড়ি দিতে তারা নেক আমলের নৌকা নির্মাণে ব্যস্ত।'
আব্দুল্লাহ বিন সা'লাবাহ রহ. বলতেন :
'এত হাসাহাসি করো কেন, হে মানুষ! এমনও তো হতে পারে, তোমার কাফনের কাপড় এসে গেছে ধোপার হাতে!'৭০
হে মুসলিম, তোমার সফরের ঘোষণা তো হয়ে গেছে। এখনো যে তুমি ঘুমে বিভোর! তুমি যে ঘর নির্মাণ করছ স্রোতের ওপর! সতর্ক হও, জীবন শেষ হওয়ার আগে আগে আমল করে নাও ওপারের জন্য। ভুলে যেয়ো না সে সত্তাকে, যাঁর সাথে নির্ধারণ করা আছে তোমার সাক্ষাতের সময়। প্রিয় ভাই,
خُذْ مِنَ الرِّزْقِ مَا كَفَا * وَمِنَ الْعَيْشِ مَا صَفَا كُلُّ هَذَا سَيَنْقَضِيْ * كَسِرَاجٍ إِذَا انْطَفَا
'প্রয়োজন-পরিমাণ জীবনোপকরণ সংগ্রহ করেই ক্ষান্ত হও। নিজের জন্য বেছে নাও স্বচ্ছ জীবনধারা। কেননা, সবকিছু হারিয়ে যাবে একদিন—নিভে যাওয়া প্রদীপের ন্যায় তলিয়ে যাবে নিকষ আঁধারে।' ৭১
ইয়াহইয়া বিন মুআজ রহ. বলেন: 'দুনিয়া ব্যস্ততার। আখিরাত আতঙ্কের। বান্দা ততক্ষণ পর্যন্ত এ ব্যস্ততা ও বিপদাশঙ্কার মধ্যে থাকবে; যতক্ষণ না সে স্থির হচ্ছে কোনো স্থায়ী আবাসে। বিচার-ফয়সালা শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত ভীতি থাকবে। এরপর হয়তো সে প্রবেশ করবে চিরসুখের আবাস জান্নাতে অথবা চির অশান্তির স্থান জাহান্নামে।' ৭২
কেউ যদি গভীরভাবে চিন্তা করে, সে অবশ্যই বুঝতে পারবে, আসলে দুনিয়ার এ জীবন মানুষের চলমান সফরের একটি অংশ। পিতার পৃষ্ঠদেশ থেকে মায়ের পেটে আসার মাধ্যমে যে সফরের সূচনা। তারপর দুনিয়া, কবর ও হাশর পাড়ি দিয়ে সে পৌঁছে যাবে চিরস্থায়ী আবাসে—চিরসুখের জান্নাত বা চিরকষ্টের জাহান্নামে গিয়েই ঘটবে সফরের অবসান।
শয়তান চায়, দুনিয়ার মায়াজালে আমাদের বন্দী করে রাখতে। যদি সে এখানে আমাদের বন্দী করতে পারে, তবে আমাদের নির্ঘাত জাহান্নামে নিয়ে ছেড়ে দেবে। তাই চলমান এ সফরে শয়তানের বন্দীদশা থেকে মুক্ত থাকার সংগ্রাম আমাদের অবশ্যই করতে হবে।
দুনিয়ার এ সফর নিতান্ত ক্ষণিকের। নিশ্বাস বন্ধ হয়ে গেলেই এর সমাপ্তি। এই সফর এমন, যেন কেউ বসে আছে নৌকাতে। আর নৌকাটি চলছে গন্তব্যের পানে। যাত্রী সেখানে বসে আছে; কিন্তু সে বুঝতে পারছে না, সে সফর করছে।
'সফরের জন্য অবশ্যই পাথেয় প্রয়োজন। আখিরাতের সফরের পাথেয় হলো তাকওয়া। তাই, কষ্ট যতই হোক, তাকওয়া আমাদের অবশ্যই অর্জন করতে হবে। যেন আবার ওপারে গিয়ে বলতে না হয় رَبِّ ارْجِعُونِ “হে প্রভু, আমাকে পুনরায় ফেরত পাঠান।” যার উত্তরে বলা হবে, كَلَّا “কক্ষনো না।” তাই গাফিল থাকা যাবে না। যা করার করতে হবে সময় থাকতে।
বান্দা যেন তাকওয়াকে নিজের সম্বল হিসেবে গ্রহণ করে, এ জন্য আল্লাহ তাআলা বান্দার এ সফরে অনেক ভীতিকর নিদর্শন দেখান। যেন বান্দারা ভীত হয়, সঠিক পথ থেকে সরে না যায়। সঠিক পথ থেকে যে আপন বাহনকে ভুল পথে ঘুরিয়ে নেবে, সেখানে সে তা-ই পাবে, যা থেকে আল্লাহ তাকে ভয় দেখিয়েছেন। এমন বক্রতার অনুগামী যারা হয়, তারা যেন পাপের সে পথ থেকে প্রতিপালকের পথে অবশ্যই প্রত্যাবর্তন করে। নিজেদের গুনাহের কারণে তাঁর কাছে তাওবা করে।'৭৩
দুনিয়াতে কেমন আমাদের অবস্থা? কেমন আমাদের সার্বিক পরিস্থিতি? এমনই এক প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন রাবি' বিন খুসাইম রহ.। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো, কীরূপ অবস্থায় আপনার সকাল হয়? তিনি বললেন:
'আমাদের সকাল হয় দুর্বল ও গুনাহগার অবস্থায়। তাকদিরে থাকা রিজিক ভক্ষণ করি আর প্রহর গুনি মৃত্যুর অপেক্ষায়।'৭৪
টিকাঃ
৬৯. আল-ইহইয়া: ৪/৪৩৫
৭০. আল-আকিবাহ: ৮৮
৭১. ইবনু রজব রহ. কৃত লাতায়িফুল মাআরিফ: ১/৩১০
৭২. আজ-জুহদ, বাইহাকি: ২৪৮
৭৩. উদ্দাতুস সাবিরিন: ৩৩০
৭৪. সিফাতুস সাফওয়াহ: ৩/৬৮
📄 দুনিয়া যেমন
এটা বড়ই আশ্চর্যের বিষয় যে, বান্দা চিরস্থায়ী আখিরাতকে ঠিকই সত্যায়ন করে, কিন্তু অস্থায়ী দুনিয়ার জন্যই ব্যয় করে নিজের সব প্রচেষ্টা! অবশ্য আল্লাহ তাআলা যাকে ভালোবাসেন, তাকে দুনিয়ার ফিতনা থেকে বাঁচিয়ে রাখেন; যেমনিভাবে অসুস্থ ব্যক্তিকে তোমরা পানি থেকে দূরে রাখো। মারফু' সনদে হাদিসে এসেছে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:
إِنَّ اللَّهَ جَلَّ ثَنَاؤُهُ لَمْ يَخْلُقُ خَلْقًا هُوَ أَبْغَضُ إِلَيْهِ مِنَ الدُّنْيَا، وَإِنَّهُ مُنْذُ خَلَقَهَا لَمْ يَنْظُرُ إِلَيْهَا
'মহান আল্লাহ যা কিছু সৃষ্টি করেছেন, এর মধ্যে দুনিয়াই তাঁর নিকট সবচেয়ে অপছন্দনীয়। দুনিয়া সৃষ্টি করার পর থেকে আজ পর্যন্ত তিনি তার দিকে দৃষ্টিপাত করেননি।'৮২
আলি রা.-কে জিজ্ঞেস করা হলো, হে আমিরুল মুমিনিন, দুনিয়া কেমন? তিনি বললেন:
'এমন স্থান সম্পর্কে কী বলব, যেখানে কেউ সুস্থ থাকলে নিরাপদ থাকে, অসুস্থ হলে লজ্জিত হয়, গরিব হলে চিন্তিত থাকে আর ধনী হলে ফিতনায় পতিত হয়। যার হালাল ও বৈধ বিষয় সম্পর্কে হিসাব নেওয়া হবে। আর হারাম ও অবৈধ বিষয়সমূহ সোজা জাহান্নামে নিয়ে ছাড়বে।'
ইউনুস বিন উবাইদ রহ. দুনিয়ার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন:
'দুনিয়ার সঠিক উপমা হলো যেন একজন ঘুমন্ত ব্যক্তি। স্বপ্নে সে পছন্দনীয় ও অপছন্দনীয় উভয়ই দেখতে পায়। কিন্তু সহসা তার স্বপ্নভঙ্গ হয়ে যায়।'৮৩
শুমাইত বিন আজলান রহ. বলেন :
'দুজন মানুষ দুনিয়াতে শাস্তিপ্রাপ্ত হয়। এক. এমন ধনী লোক, যাকে আল্লাহ তাআলা দুনিয়ার ধন-সম্পদ দান করেছেন, অথচ সে দুনিয়া নিয়েই একদম ব্যস্ত হয়ে আছে। দুই. এমন দরিদ্র লোক, যাকে আল্লাহ তাআলা দুনিয়ার ধন-সম্পদ দান করেননি, কিন্তু সে দুনিয়া অর্জনের লক্ষ্যে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে যাচ্ছে।'৮৪
আলি রা.-এর সামনে কেউ একজন দুনিয়ার নিন্দা করলে তিনি বললেন:
'দুনিয়াকে ঢালাওভাবে নিন্দা করো না। কেননা, দুনিয়া ওই ব্যক্তির জন্য সততার স্থান, যে এখানে সৎ উপায়ে জীবনযাপন করে। এমন ব্যক্তির জন্য মুক্তির জায়গা, যে এখানে বুঝে-শুনে জীবনযাপন করে। দুনিয়া ওই ব্যক্তির জন্য প্রাচুর্যের স্থান, যে এখানে আখিরাতের পাথেয় সংগ্রহ করে।'৮৫
দুনিয়াকে অনেকে ঢালাওভাবে তিরস্কার করতে থাকে, অথচ দুনিয়া তখনই তিরস্কারের যোগ্য হয়, যখন তা আল্লাহর অবাধ্যতার কারণ ও তাঁর ইবাদতের প্রতিবন্ধক হয়। তাদের আসলে জানা নেই যে, দুনিয়া হলো আখিরাতের পাথেয় সংগ্রহের স্থান, যে পাথেয় দ্বারা সুগম হয় জান্নাতের পথ। কিন্তু,
يَعِيبُ النَّاسُ كُلُّهُمُ الزَّمَانَا * وَمَا لِزَمَانِنَا عَيْبُ سِوَانًا نَعِيْبُ زَمَانَنَا وَالْعَيْبُ فِيْنَا * فَلَوْ نَطَقَ الزَّمَانُ بِهِ رَمَانَا
'সবাই বলে বেড়ায়—জমানা খারাপ যাচ্ছে, খারাপ যুগ চলছে। অথচ জমানার কী দোষ? সব কুকীর্তি তো আমাদের। আমাদের দোষগুলোই আমরা চাপিয়ে দিয়েছি জমানার ঘাড়ে। সে যদি কথা বলত, তবে খুলে যেত আমাদের মুখোশ।'৮৬
টিকাঃ
৮২. ইবনু আবিদ দুনিয়া কৃত আজ-জুহদ, হাদিস নং ৪০
৮৩. উদ্দাতুস সাবিরিন: ৩৫৫
৮৪. সিফাতুস সাফওয়াহ: ৩/৩৪৭
৮৫. আদাবুদ দুনিয়া ওয়াদ-দ্বীন: ১৩৪
৮৬. আজ-জুহদ, বাইহাকি: ১৫৭