📄 দুনিয়ার চোরাবালি থেকে বাঁচার উপায়
ফুজাইল বিন ইয়াজ রহ. বলেন : 'দুনিয়ামত্ততায় প্রবেশ করা খুব সহজ। কিন্তু তা থেকে বের হওয়া অনেক কঠিন।'৩৮
দুনিয়ার মোহ-মায়া থেকে বেঁচে থাকা আসলেই অনেক কঠিন ব্যাপার। নতুবা এত চিন্তা-পেরেশানি সত্ত্বেও মানুষ দুনিয়ার পেছনে এত দৌড়াত না, উন্মাদ হয়ে এত প্রতিযোগিতা করত না।
কবি বলেন:
أَرَى الدُّنْيَا لِمَنْ هِيَ فِي يَدَيْهِ * هُمُوْمًا كُلَّمَا كَثُرَتْ لَدَيْهِ تُهِيْنُ الْمُكْرِمِينَ لَهَا بِصُغْرٍ * وَتُكْرِمُ كُلَّ مَنْ هَانَتْ عَلَيْهِ إِذَا اسْتَغْنَيْتَ عَنْ شَيْءٍ فَدَعْهُ * وَخُذْ مَا أَنْتَ مُحْتَاجُ إِلَيْهِ
'দুনিয়ার সমৃদ্ধি কেবল দুশ্চিন্তাই বয়ে আনে—কেড়ে নেয় মানসিক প্রশান্তি। সম্পদ বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে পেরেশানির মাত্রা। যে দুনিয়াকে সম্মান করে, দুনিয়া তাকে লাঞ্ছিত করে। আর যে তাকে তুচ্ছ জ্ঞান করে, সে তাকে সমীহ করে চলে। দুনিয়া থেকে তোমার যা প্রয়োজন, কেবল তা-ই গ্রহণ করো। অতিরিক্ত যা সামনে পড়ে, ছুঁড়ে ফেলো ময়লার ভাগাড়ে।'৩৯
প্রিয় ভাই, 'আখিরাতের সন্তান হও। দুনিয়ার সন্তান হয়ো না। কেননা, সন্তান তার মায়েরই অনুকরণ করে। দুনিয়ার জন্য তুমি যে এক পা পেছাবে, দুনিয়া তো এরও যোগ্য নয়! তাহলে কোন দুঃখে তুমি দুনিয়ার পেছনে ছুটবে?'৪০
হাবিব বিন মুহাম্মাদ রহ.-এর স্ত্রী বলেন, 'আমার স্বামী বলতেন :
“আমি যদি আজ মারা যাই, তবে আমাকে গোসল করানোর জন্য অমুকের কাছে পাঠানোর ব্যবস্থা কোরো। আর এই এই কাজ কোরো...।” তার স্ত্রীর কাছে জানতে চাওয়া হলো, “আপনার স্বামী কি কোনো স্বপ্ন দেখলে এরূপ বলতেন?” তিনি উত্তরে বললেন, “না, এটা তার প্রতিদিনেরই কথা ছিল।”৪১
কোথায় কল্যাণ? দুনিয়ার মধ্যে কোনো কল্যাণ নেই। দুনিয়ার বিত্তশালী ধনী নয়; আখিরাতের ধনীই আসল ধনী।
'মানুষ যদি দুনিয়ার সম্পদ অর্জন করে ধনী হয়, তুমি আল্লাহর নৈকট্যলাভ করে ধনী হও। তারা যদি আনন্দিত হয় দুনিয়াকে নিয়ে, তবে তুমি আনন্দিত হও আল্লাহকে নিয়ে (তাঁর আনুগত্য করে)। তারা যদি বন্ধুবান্ধব আর প্রিয়জনদের সঙ্গ পছন্দ করে, তবে তুমি আল্লাহর নৈকট্যশীল হওয়াকে ভালোবেসে নাও। তারা যদি সম্মান ও মর্যাদা লাভের আশায় দুনিয়ার রাজা-বাদশাহদের সাথে পরিচিত হয়ে তাদের নৈকট্য অর্জন করে, তবে তুমি পরিচিত হও আল্লাহ তাআলার সাথে, তাঁকে ভালোবাসতে শেখো, তাহলে তুমিই থাকবে সম্মান ও মর্যাদার উচ্চ আসনে।'৪২
একদা উমর বিন আব্দুল আজিজ রহ. তাঁর খুতবায় বলেন :
'প্রত্যেক সফরের জন্য পাথেয় প্রয়োজন। সুতরাং তোমরা দুনিয়া থেকে আখিরাতের সফরের জন্য তাকওয়ার পাথেয় সংগ্রহ করো। এমন হও, যেন তোমরা নিজ চোখে আল্লাহর প্রস্তুতকৃত শাস্তি ও পুরস্কার প্রত্যক্ষ করেছ। আর তোমরা পুরস্কার লাভের জন্য আগ্রহী এবং শাস্তি থেকে বাঁচার জন্য ভীত-সন্ত্রস্ত। তোমরা এমন হয়ে যাও। তোমাদের কামনা-বাসনা যেন অধিক না হয়। অন্যথায় তোমাদের অন্তর কঠোর হয়ে যাবে, তোমরা তোমাদের শত্রুদের অনুগত হয়ে পড়বে। সে ব্যক্তির আশা-আকাঙ্ক্ষা বিস্তৃত করে কী লাভ, যার জানা নেই, সকালের পর তার জীবনে সন্ধ্যা আর আসবে কি না, অথবা আসবে কি না সন্ধ্যার পর তার জীবনের পরবর্তী সকাল? এ দুইয়ের মাঝে তার জন্য ওত পেতে বসে আছে মৃত্যু। সে কী করে আশ্বস্ত হতে পারে, আল্লাহর আজাব ও কিয়ামত দিবসের ভয়াবহ অবস্থার ব্যাপারে। আর যে ব্যক্তি দুনিয়ার আঘাতের একটি ক্ষতের চিকিৎসা করতে না করতে অন্য দিক থেকে আবার আঘাতপ্রাপ্ত হয়, সে কীভাবে আশ্বস্ত হতে পারে?
আমি নিজে যে আমল করা থেকে বিরত রয়েছি, সে আমলের জন্য তোমাদের নির্দেশ দেওয়ার ব্যাপারে আমি মহান আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করছি। তাহলে আমার চুক্তি অলাভজনক প্রমাণিত হবে, বরবাদ হয়ে যাবে আমার ঘর (জান্নাত) এবং ওই দিন আমার নিঃস্বতা প্রকাশ পেয়ে যাবে, যেদিন ন্যায় ও সত্য ছাড়া কোনো কিছু দ্বারা উপকৃত হওয়া যাবে না। '৪৩
টিকাঃ
৩৮. আল-ইহইয়া: ৩/২২৪
৩৯. আল-ইহইয়া: ২/৪৪
৪০. আল-ফাওয়ায়িদ: ৬৮
৪১. সিফাতুস সাফওয়াহ: ৩/৩২০
৪২. আল-ফাওয়ায়িদ: ১৫২
৪৩. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৯/২৮৩
📄 তাওয়াক্কুল
মুহাম্মাদ বিন আবু ইমরান রহ. বলেন:
'হাতিম আল-আসাম রহ.-কে এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল, “আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করার ক্ষেত্রে কোন বিষয়কে আপনি ভিত্তি বানিয়েছেন?"
তিনি উত্তর দিলেন, “তাওয়াক্কুল অর্জনে আমি চারটি কাজ করি :
১. আমি বিশ্বাস করি, আমার রিজিক কেউ খেয়ে ফেলবে না; তাই এ ব্যাপারে আমি আশ্বস্ত থাকি।
২. আমি জানি, আমার কাজ আমাকেই করতে হবে, অন্য কেউ আমার কাজ করে দেবে না; তাই আমি আমার কাজ নিয়েই ব্যস্ত থাকি।
৩. আমি জানি, মৃত্যু সহসা এসে আমাকে পাকড়াও করবে; তাই সব সময় আমি তার আগমনের জন্য প্রস্তুত থাকি।
৪. আমি জানি, যেখানেই আমি থাকি না কেন, আল্লাহর দৃষ্টি থেকে আমি আড়ালে নই; তাই আমি সব সময় তাঁকে লজ্জা করি।'৪৪
আব্দুল্লাহ বিন মুবারক রহ. বলেন :
'হে আদমসন্তান, পরকালের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করো। আল্লাহর প্রতি তোমার যে পরিমাণ প্রয়োজন রয়েছে, সে পরিমাণ তুমি তাঁর আনুগত্য করো। আর যে পরিমাণ আগুনের তেজ তুমি সহ্য করতে পারবে বলে মনে করো, সে পরিমাণ তাঁর অবাধ্য হতে পারো।'৪৫
হে আল্লাহ, আপনি কত মহান ও পবিত্র! কখনো আমরা আপনার প্রশংসা করে শেষ করতে পারব না। আপনি তেমনই যেমনটি আপনি নিজের স্তুতি বর্ণনা করেছেন। আমরা না জেনে আপনার অবাধ্যতায় লিপ্ত হয়েছি। আর আপনি অনুগ্রহ করে আমাদের ক্ষমা করে চলেছেন।
ফুজাইল বিন ইয়াজ রহ. মুমিনের ইহজীবনের স্বরূপ বর্ণনা করে বলেন: 'দুনিয়াতে মুমিনগণ খুবই চিন্তিত থাকেন। তাদের একটাই চিন্তা, কীভাবে পরকালের পাথেয় অর্জন করা যায়। যাদের অন্তরে এমন মর্মবেদনা থাকে, প্রকৃত আবাসের জন্য উপকারী সম্বল অর্জনই হয় তাদের সার্বক্ষণিক চিন্তা। ক্ষণিকের সম্মান পাওয়ার পেছনে তারা ছোটেন না। তারা হন অপরিচিত-গুরাবা। দুনিয়ার নিন্দা-তিরস্কারের কোনো পরোয়া তারা করেন না।'৪৬
শাফিয়ি রহ. বলেন:
إِنَّمَا الدُّنْيَا فَنَاءُ * لَيْسَ لِلدُّنْيَا ثُبُوْتُ إِنَّمَا الدُّنْيَا كَبَيْتِ * نَسَجَتْهُ الْعَنْكَبُوْتُ
টিকাঃ
৪৪. সিফাতুস সাফওয়াহ: ২/৩৪০
৪৫. আজ-জাহরুল ফায়িহ ফি জিকরি মিনাত তানাজজুহি আনিজ জুনুবি ওয়াল কাবায়িহ: ১/৯৫
৪৬. জামিউল উলুমি ওয়াল হিকাম: ৩৭৯
📄 দুনিয়া প্রতিযোগিতার ময়দান
‘দুনিয়া ধ্বংসশীল-এর কোনো স্থায়িত্ব নেই। এটি তো মাকড়সার দুর্বল জাল-হালকা বাতাসেই যা অস্তিত্ব হারায়।’ উহাইব বিন ওয়ারদ রহ. বলেন:
‘প্রকাশ্যে ইবলিসকে খুব গালমন্দ করো, কিন্তু গোপনে তার সাথে বন্ধুত্ব রাখো-বন্ধ করো এই লুকোচুরি।’৪৭
শয়তান ও প্রবৃত্তি একজন মুসলিমকে দ্বীন থেকে বিমুখ রাখতে সব সময়ই সর্বোচ্চ চেষ্টা করে। ভ্রষ্টতা-পদস্খলনকে সাজিয়ে-গুছিয়ে আকর্ষণীয়রূপে উপস্থাপন করে। সত্যের পথে মুমিনের অভিযাত্রায় বাধা হয়ে দাঁড়ায়, ঝলমলে করে তুলে ধরে পাপ-পঙ্কিলতাকে।
দুনিয়া প্রতিযোগিতার ময়দান
দুনিয়া প্রতিযোগিতার ময়দান। উড়ন্ত ধুলো যেমন আড়াল করে রাখে ঘোড়সওয়ারদের। তেমনই এখানে গোপন হয়ে আছে কত প্রতিযোগী। কে পদাতিক, কে ঘোড়সওয়ার আর কে উটে আরোহী, তার কিছুই বোঝা যাচ্ছে না এখানে। কিন্তু ধুলো যখন উড়ে যাবে, স্পষ্ট হয়ে যাবে সবই। দুনিয়াতে কার কেমন স্বরূপ তা স্পষ্ট বোঝা মুশকিল। তবে দুনিয়ার ওপারে স্পষ্ট হয়ে যাবে সবার আসল পরিচয়।
سَوْفَ تَرَى إِذَا الْجَلَى الْغُبَارُ أَفَرَسُ تَحْتَكَ أَمْ حِمَارُ
‘ধূলিঝড় যখন থেমে যাবে, খুঁজে পাবে তুমি আপন পরিচয়-কে তুমি? ঘোড়সওয়ার, না গাধায় আরোহী।’৪৮
পায়ে পায়ে মোরা এগিয়ে যাই পরম লক্ষ্যে। ক্ষয় হতে থাকে জীবনের আয়ু। নিকটতর হয়ে আসে ক্রমশ চূড়ান্ত গন্তব্য। মৃত্যু, এ যে দুনিয়ার আরেক প্রতিযোগী। সর্বদা আমরা এর সাথে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত আছি। সময় যত অতিবাহিত হচ্ছে, মৃত্যু ততই আমাদের নিকটে আসছে। কিন্তু আমরা যে ঘুমিয়ে আছি গাফিলতি আর অলসতার চাদর মুড়ি দিয়ে। একেবারে নিশ্চিন্ত আমরা। হাশরের দিন হিসাব-নিকাশের সম্মুখীন হতে হবে, এমন চিন্তা যেন আমাদের মধ্যে একেবারে নেই। মৃত্যু আসার আগেই তো আমাদের পাথেয় জোগাড় করতে হবে।
হাসান রহ. বলেন: 'তুমি নুহ আ.-এর মতো দীর্ঘ দিন বেঁচে থাকবে, এ আশা নিয়ে পড়ে আছ। অথচ, আল্লাহর আদেশ প্রতি রাতে কড়া নাড়ে তোমার দুয়ারে।'৪৯
আবু হাজিম সালামা বিন দিনার রহ. বলেন: 'পরিমিত সম্পদ যদি তোমাকে দুনিয়া থেকে সম্পর্কহীন করে; তবে তা-ই তোমার জন্য যথেষ্ট। পক্ষান্তরে, পরিমিত সম্পদ যদি তোমার জন্য যথেষ্ট না হয়; তবে দুনিয়ার সমুদয় সম্পদ এনে দিলেও তা তোমার জন্য যথেষ্ট হবে না।'৫০
আমাদের আশপাশের অবস্থার দিকে লক্ষ করি। দুনিয়াতে এক সময় কারও রাজত্ব ছিল, কেউ ছিল বিশাল রাজ্যের মালিক। অবশেষে একদিন সেও দুনিয়া থেকে বিদায় নেয় কাফন পরে। দুনিয়াতে যে একেবারে নিঃস্ব ছিল, সেও তো কাফন পরেই বিদায় নিয়েছে। আসলে এখানে এসে সবাই সমান। কবর নামক একটি গর্তে প্রবেশ করে সবাই। কিন্তু ভেতরে প্রবেশের পরই দেখে অবস্থা পরিবর্তন। কারও কবর জান্নাতের একটি বাগান। আর কারও কবর জাহান্নামের গর্ত।
আবু সাফওয়ান রুআইনি রহ.-কে জিজ্ঞেস করা হলো, 'দুনিয়া কেমন জিনিস—পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা যার নিন্দা করেছেন? যা থেকে জ্ঞানীদের দূরে থাকা উচিত?'
তিনি বললেন :
'দুনিয়ার যেসব প্রিয় বস্তু তুমি অর্জন করো দুনিয়ার জন্যই, সেগুলো নিন্দনীয়। আর দুনিয়ার যেসব প্রিয় বস্তু তুমি অর্জন করো আখিরাতের কল্যাণে, তা নিন্দিত দুনিয়ার অন্তর্ভুক্ত নয়।' ৫১
দুনিয়ার বর্ণনা দিতে গিয়ে আলি রা. বলেন :
'দুনিয়ার বৈধ বিষয়গুলো সম্পর্কে হিসাব নেওয়া হবে। আর অবৈধ বিষয়গুলো সোজা জাহান্নামে নিয়ে যাবে।' ৫২
কথিত আছে—
'আল্লাহ তাআলা দাউদ আ.-এর প্রতি ওহি নাজিল করেন, “হে দাউদ, প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যায় বৃদ্ধ লোকটির প্রতি দৃষ্টিপাত করে আমি বলি, হে আমার বান্দা, তোমার বয়স হয়েছে। চামড়া পাতলা হয়ে গেছে। শরীরের হাড় জীর্ণ হয়েছে। সময় হয়েছে আমার নিকট ফিরে আসার। তাই আমাকে তুমি লজ্জা করো। কেননা, আমি তোমাকে লজ্জা করি।”' ৫৩
আমরা কেউ জানি না, মৃত্যু কখন এসে কেড়ে নেবে আমাদের জীবন। তাই আমাদের উচিত উত্তমরূপে পাথেয় সংগ্রহ করা এবং এমনভাবে আমল করা; যেন মৃত্যু এসে আমাদের পার্থিব জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটালেও আমরা বিজয়ী থাকতে পারি।
মানুষের জীবন দিনকয়েকের সমষ্টি
হাসান রা. বলেন:
'হে আদমসন্তান, তোমার জীবন তো মাত্র কয়েকটি দিনের সমষ্টি। একটি দিন অতীত হওয়া মানে তোমার জীবনের একটি অংশ কমে যাওয়া।' ৫৪
হে ভাই, ক্ষণিকের এ দুনিয়া নিয়ে আমরা কত চিন্তিত! অবিরাম ছুটে চলছি দুনিয়ার পেছনে। দারিদ্র্যের ভীষণ ভয় আমাদের মাঝে। লোভাতুর হয়ে আছি দুনিয়ার তুচ্ছ-নগণ্য বস্তু অর্জনে। আমাদের দৌড়ঝাঁপ দেখে মনে হয়, যেন আমরা চিরকাল দুনিয়াতেই থাকব। দারিদ্র্যকে কত ভয় পাই আমরা, কিন্তু কিয়ামত দিবসের হিসাব-নিকাশের ভয় আমাদের মনে উদিত হয় না। ক্ষুধাকে আমরা ভয় পাই, কিন্তু পরকালের কঠিন শাস্তিকে ভয় করি না।
ইয়াহইয়া বিন মুআজ রহ. বলেন:
'দারিদ্র্যকে যেভাবে মানুষ ভয় করে, এভাবে যদি জাহান্নামকে ভয় পেত; তাহলে খুব সহজে তারা জান্নাতে প্রবেশ করত।' ৫৫
হাসান বসরি রহ. বলেন:
'সে মহান সত্তার শপথ, যাঁর হাতে আমার প্রাণ। এমন লোকদের সান্নিধ্যে আমি ছিলাম, যারা দুনিয়াকে পায়ের তলার মাটির চেয়েও তুচ্ছ মনে করতেন।'
ফুজাইল রহ. বলেন :
'গতকাল তো অতীত। আজ আমলের সময়। আর ভবিষ্যৎ হলো আশা-আকাঙ্ক্ষার স্থান। ভবিষ্যতে কল্যাণের আশা তো আমরা তখনই করতে পারব, যখন আমরা আমাদের আজকের সময়কে নেক আমলে ব্যয় করব।' ৫৬
বস্তুত, এ দুনিয়া কয়েকটি দিনের সমষ্টি মাত্র। আর সেদিনগুলো হলো- গতকাল, আজ ও আগামীকাল। এ কয়েকটি দিনের জন্যই আমাদের কত পরিশ্রম আর প্রচেষ্টা! কিন্তু এ দিনগুলো যখন অতিক্রান্ত হবে, তখন আমরা ঠিকই বুঝতে পারব, আমাদের এসব প্রচেষ্টা আসলে পরিশ্রম ছিল না; এ ছিল পণ্ডশ্রম।
রাত ও দিন সফরের একেকটি মনজিল
প্রতিটি রাত ও দিন পরকালের পথে যাত্রার একেকটি মনজিল। তাই সুযোগ হলে পাথেয় সংগ্রহ করে নেওয়া উচিত প্রতিটি মনজিল থেকে। যা কিছু করার, তা সময় হাতে থাকতেই করে নিতে হবে। কেননা, কখন যে কার সফরের ইতি ঘটবে, তা আমাদের কারোই জানা নেই। বলা যায় না, মৃত্যু কখন এসে পরিসমাপ্তি ঘটায় এ জীবন সফরের।
জনৈক সালাফ তার ভাইয়ের উদ্দেশে চিঠি লিখে তাকে সর্তক করেন—
'হে ভাই, তুমি কি ধারণা করে আছ, তুমি দুনিয়ার স্থায়ী বাসিন্দা? আসলে তা নয়। এ দুনিয়ায় তুমি তো একজন মুসাফির মাত্র। তোমার সফরের ইতি ঘটবে অতি শীঘ্রই। মৃত্যু তাকিয়ে আছে তোমার দিকে। দুনিয়া তোমার জন্য ক্রমশ সংকীর্ণ হয়ে আসছে। জীবনের যে সময়গুলো অতিবাহিত হয়েছে, কখনো তা আর ফিরে আসবে না।'৫৭
আমাদের চারপাশে দুনিয়াবিমুখ ও দ্বীনদার লোকও কিন্তু বসবাস করে। আমাদের উচিত, তাদের থেকে দুনিয়া ও আখিরাতের সঠিক মূল্যবোধ জেনে নেওয়া এবং তাদের থেকে সবক নেওয়া দুনিয়াবিমুখতা ও অল্পতুষ্টির।
আলি বিন ফুজাইল রহ. বলেন:
'আমার পিতা ফুজাইল একবার ইবনে মুবারক রহ.-কে প্রশ্ন করলেন, “আপনি আমাদের দুনিয়াবিমুখতা ও অল্পতুষ্টির নসিহত করেন, কিন্তু আপনি যে প্রচুর সম্পদ উপার্জন করেন! এ কেমন উপদেশ?” তিনি বললেন, “হে আবু আলি, আমি এ সম্পদ অর্জন করি, যেন তা নিজের মান-মর্যাদা রক্ষা ও ইবাদতে সহায়ক হয়।” তখন আমার পিতা বললেন, “হে ইবনে মুবারক, কতই না উত্তম আপনার কাজ!””৫৮
দুনিয়া সম্পর্কে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি কেমন?! আমি কিন্তু দুনিয়ার সম্পদ অর্জন করতে নিষেধ করছি না। আমি বরং উদ্বুদ্ধ করছি, হালাল উপায়ে সম্পদ অর্জন করে হালাল ক্ষেত্রে তা ব্যয় করার প্রতি। কারণ, হালাল উপায়ে উপার্জিত সম্পদ ব্যয় করে অনেক নেক আমল করা যায়। যেমন: সদাকা করা, অসহায়কে সাহায্য করা, বিপদগ্রস্তের পাশে দাঁড়ানো, এতিমের অভিভাবকত্ব গ্রহণ করা ইত্যাদি।
সুফইয়ান রহ. বলেন :
'তিনটি বিষয়ে আল্লাহর ক্রোধ থেকে বেঁচে থাকো-
১. আল্লাহর আদেশ পালনে শিথিলতা করা।
২. তাকদিরের প্রতি নারাজ থাকা।
৩. আল্লাহর নিকট দুনিয়ার কিছু চেয়ে, তা না পেলে তাঁর প্রতি অসন্তুষ্ট হওয়া।'৫৯
দুনিয়াতে আমরা যে রিজিক পেয়ে থাকি, এগুলো আল্লাহ তাআলা-ই আমাদের জন্য নির্ধারণ করে রেখেছেন। সুতরাং কম-বেশি যা-ই আমরা লাভ করি, এর ওপর আমাদের সন্তুষ্ট থাকা আবশ্যক। কাকে দুনিয়ার ধন-সম্পদ বেশি দেওয়া হয়েছে, আর কাকে কম দেওয়া হয়েছে—এ নিয়ে মোটেও ভাববে না। তোমাকে যতটুকু দেওয়া হয়েছে, তা নিয়েই তুমি সন্তুষ্ট থেকো। আল্লাহর পুণ্যবান বান্দারা আল্লাহ যা দান করেন, তার ওপরই সন্তুষ্ট থাকেন।
কবি বলেন:
مَنْ شَاءَ عَيْشًا رَحِيبًا يَسْتَطِيلُ بِهِ فِي دِينِهِ ثُمَّ فِي دُنْيَاهُ إِقْبَالاً فَلْيَنْظُرَنَّ إِلَى مَنْ فَوْقَهُ وَرَعًا وَلْيَنْظُرَنَّ إِلَى مَنْ دُوْنَهُ مَالًا
'যে ব্যক্তি সুখী ও সমৃদ্ধ জীবন কামনা করে এবং নিজের দ্বীন ও দুনিয়া দুটিকেই সার্থক করে তুলতে চায়, সে যেন দুই শ্রেণির লোকের দিকে নজর রাখে— তাকওয়ার বিচারে যারা তার চেয়ে উঁচু স্তরের এবং অর্থবিত্তের দিক দিয়ে যারা তার চেয়ে নিম্ন স্তরের। '৬০
এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন : ﴿ وَلَا تَمُدَّنَّ عَيْنَيْكَ إِلَى مَا مَتَّعْنَا بِهِ أَزْوَاجًا مِنْهُمْ زَهْرَةَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا لِنَفْتِنَهُمْ فِيهِ ﴾
'আমি এদের বিভিন্ন প্রকার লোককে পরীক্ষা করার জন্য পার্থিব জীবনের সৌন্দর্যস্বরূপ ভোগ-বিলাসের যে উপকরণ দিয়েছি, আপনি সেই সব বস্তুর প্রতি ভ্রুক্ষেপ করবেন না।'৬১
ইবরাহিম আল-আশআস রহ. বলেন, আমি ফুজাইল রহ.-কে বলতে শুনেছি—
'বান্দা আল্লাহকে ওই পরিমাণ ভয় করে, আল্লাহ তাআলা সম্পর্কে যে পরিমাণ ইলম তার আছে। বান্দা দুনিয়া থেকে ততটুকু বিমুখ হয়, আখিরাতের প্রতি যতটুকু আগ্রহ তার মধ্যে আছে। যে ব্যক্তি যা জানে, সে অনুযায়ী আমল করে, তার অতিরিক্ত ইলমের প্রয়োজন পড়ে না। তবে ইলম অনুযায়ী আমল করলে আল্লাহ তাআলা তাকে আরও অধিক ইলম অর্জন করার তাওফিক দান করেন। যার চরিত্র খারাপ—তার দ্বীন, বংশগৌরব ও পুরুষত্ব সবই প্রশ্নবিদ্ধ। '৬২
জনৈক দুনিয়াবিমুখ সালাফ বলেন :
'এমন মানুষ আছে বলে আমার বিশ্বাস হয় না, যে জান্নাত ও জাহান্নাম সম্পর্কে জানে, অথচ সে সব সময় (নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, জিকির, সদাচরণ ইত্যাদির মাধ্যমে) আল্লাহর ইবাদতে মশগুল থাকে না। এক ব্যক্তি তাকে বলল, “আমি অনেক কান্নাকাটি করি।” তিনি বললেন, “নিজের কৃত আমল নিয়ে অহংকারকারী ব্যক্তির কান্নার চেয়ে গুনাহ স্বীকারকারী ব্যক্তির হাসি অনেক উত্তম। কারণ, অহংকারীর আমল আল্লাহর দরবারে পৌঁছায় না।” ওই ব্যক্তি বলল, “আমাকে নসিহত করুন।” তিনি বললেন, “দুনিয়াকে দুনিয়াদারদের জন্য ছেড়ে দাও, যেমন তারা আখিরাতকে ছেড়ে দিয়েছে আখিরাতের কল্যাণপ্রত্যাশীদের জন্য। আর দুনিয়াতে জীবনযাপন করো মৌমাছির ন্যায়, যে নিজেও পবিত্র খাবার খায় এবং অপরের জন্যেও পবিত্র খাবার জমা করে। আর কোনো বস্তুর ওপর বসলে তা ভেঙে ফেলে না এবং সেখানে একটি দাগও পড়তে দেয় না।”৬৩
দুনিয়াকে তুচ্ছজ্ঞান করা
মৃত্যুর কথা স্মরণ করলে দুনিয়াকে খুবই তুচ্ছ মনে হয়। যখন কেউ দুনিয়ার এ তুচ্ছতা নিয়ে চিন্তা করবে, তখন তার দৃষ্টির ওপর থেকে পার্থিব মোহের পর্দা সরে যাবে। খুব সহজে সে উপলব্ধি করতে পারবে, এ দুনিয়া তো নির্দিষ্ট কয়েকটি বছর কিংবা দিনের সমষ্টি। এর পরেই নিশ্চিত মৃত্যু। এভাবে সে পরকালের প্রস্তুতি ও ওপারের পাথেয় সংগ্রহের প্রতি মনোযোগী হয়।
হাসান রহ. বলেন:
'মৃত্যু উন্মোচন করে দিয়েছে দুনিয়ার রহস্য। মৃত্যু প্রকৃত জ্ঞানীদের জন্য আনন্দ-ফুর্তির কোনো পথই খোলা রাখেনি।'৬৪
কবি বলেন:
قَدْ نَادَتِ الدُّنْيَا عَلَى نَفْسِهَا * لَوْ كَانَ فِي الْعَالَمِ مَنْ يَسْمَعُ كَمْ وَائِقِ بِالعُمْرِ أَفْنَيْتُهُ * وَجَامِعٍ بَدَّدْتُ مَا يَجْمَعُ
'দুনিয়া ডেকে বলে তার বাসিন্দাদের, কেউ আছো কি আমার উপদেশ শোনার? মনে রেখো, যারা ভরসা করেছিল জীবনের ওপর, সবাইকে আমি ছুঁড়ে ফেলেছি কবরের গর্তে আর এদিক ওদিক ছড়িয়ে দিয়েছি তাদের জমানো অর্থবিত্ত। '৬৫
আবু উবাইদা নাজি রহ. বলেন:
'হাসান বসরি রহ. যখন মৃত্যুর দুয়ারে উপনীত হলেন, আমরা তাঁর নিকটে উপস্থিত হলাম। তিনি আমাদের অভ্যর্থনা জানালেন এবং আমাদের জন্য দুআ করে অনেক বাক্য উচ্চারণের পর বললেন, "সত্য বলা ও বিপদাপদে ধৈর্যধারণ করা স্পষ্ট নেক আমল। কানে যা শোনো, তার সবটুকু মুখ দিয়ে বের কোরো না। প্রথমে এর সত্যাসত্য যাচাই করবে, তারপর বলার প্রয়োজন হলে বলবে। কেননা, যাঁরা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে দেখেছেন, তাঁদের জন্য যেকোনো বিষয়ে সরাসরি তাঁর শরণাপন্ন হবার সুযোগ ছিল। কিন্তু এখন তিনি নেই। তাই যেকোনো বিষয় খুব চিন্তা-ভাবনা করে করতে হবে। আল্লাহর শপথ করে বলছি, দুনিয়ার এ জীবন নিয়ে তোমরা প্রতারিত হোয়ো না। মৃত্যু তোমাদের অতি নিকটে। আল্লাহ তাআলা ওই বান্দার প্রতি রহম করেন, যে নির্ভেজালভাবে দুনিয়াতে জীবনযাপন করে এবং যথাযথভাবে আল্লাহর ইবাদত করে; কখনো যদি সে কোনো গুনাহ করে ফেলে, পরক্ষণে খুব কান্নাকাটি করে তা থেকে তাওবা করে নেয়; আল্লাহর শান্তি থেকে বাঁচার জন্য সে যথাসাধ্য চেষ্টা করে এবং তাঁর রহমত তালাশ করতে থাকে—আর এ অবস্থায় তার মৃত্যু চলে আসে। "'৬৬
দুনিয়া ও এর অবস্থানকারী লোকদের অবস্থা জানান দিয়ে কবি নাবিগা জা'দি বলেন:
المرءُ يَرغَبُ فِي الْحَيَاةِ * وَطُوْلُ عَيْشٍ قَدْ يَضُرُّهُ تَفْنَى بَشَاشَتُهُ وَيَبْقَى * بَعْدَ حُلُوَ الْعَيْشِ مُرُّهُ وَتَسُوْؤُهُ الأَيَّامُ حَتَّى * مَا يَرَى شَيْئًا يَسُرُّهُ
'মানুষ দীর্ঘ হায়াতের তামান্না রাখে-অথচ জীবনের দৈর্ঘ্য তাকে কেবল কষ্টই দেয়। চোখের পলকেই হারিয়ে যায় মধুময় যৌবনের অমিত সুখ-বার্ধক্যের তিক্ততায় চেহারায় ফুটে ওঠে বয়সের জ্যামিতিক রেখা। জীবনের সেই বিষণ্ণ বিকেলে বুকজুড়ে কেবল হতাশার হাহাকারই শোনা যায়।'
আবু কাবশা রা. বর্ণনা করেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
إِنَّمَا الدُّنْيَا أَرْبَعَةُ نَفَرٍ : عَبْدُ رَزَقَهُ اللَّهُ مَالًا وَعِلْمًا، فَهُوَ يَتَّقِيْ فَيْهِ رَبَّهُ، وَيَصِلُ فِيْهِ رَحِمَهُ، وَيَعْلَمُ لِلَّهِ فِيْهِ حَقًّا، فَهَذَا بِأَفْضَلِ الْمَنَازِلِ، وَعَبْدُ رَزَقَهُ اللَّهُ عِلْمًا، وَلَمْ يَرْزُقُهُ مَالًا؛ فَهُوَ صَادِقُ النِّيَّةِ، فَيَقُوْلُ : لَوْ أَنَّ لِي مَالًا لَعَمِلْتُ بِعَمَلِ فُلَانٍ، فَهُوَ بِنِيَّتِهِ فَأَجْرُهُمَا سَوَاءٌ، وَعَبْدُ رَزَقَهُ اللَّهُ مَالًا وَلَمْ يَرْزُقْهُ عِلْمًا فَهُوَ يَتَخَبَّطُ فِي مَالِهِ بِغَيْرِ عِلْمٍ، وَلَا يَتَّقِي فِيْهِ رَبَّهُ، وَلَا يَصِلُ فِيْهِ رَحِمَهُ، وَلَا يَعْلَمُ فِيْهِ لِلَّهِ حَقًّا، فَهَذَا بِأَخْبَثِ الْمَنَازِلِ، وَعَبْدُ لَمْ يَرْزُقُهُ اللَّهُ مَالًا وَلَا عِلْمًا، وَهُوَ يَقُوْلُ لَوْ أَنَّ لِي مَالًا لَعَمِلْتُ فِيْهِ بِعَمَلِ فُلَانٍ، فَهُوَ بِنِيَّتِهِ فَوِزْرُهُمَا سَوَاءٌ
'এই দুনিয়া চার শ্রেণির মানুষের জন্য। এক. এমন বান্দা, যাকে আল্লাহ তাআলা যে ধন-সম্পদ ও ইলম দান করেছেন; এ ক্ষেত্রে সে আপন প্রতিপালককে ভয় করে, এর সাহায্যে আত্মীয়তার সম্পর্ক অটুট রাখে এবং এতে আল্লাহ তাআলারও হক আছে বলে সে জানে। এমন বান্দার মর্যাদা সর্বোচ্চ।
দুই. এমন বান্দা, যাকে আল্লাহ তাআলা ইলম দান করেছেন, কিন্তু ধন-সম্পদের মালিক বানাননি। সে সৎ নিয়তের অধিকারী। সে বলে, আমার যদি ধন-সম্পদ থাকত, তবে আমি অমুকের মতো ভালো কাজ করতাম। এমন বান্দার মর্যাদা নির্ধারিত হবে তার নিয়ত অনুযায়ী। এ দুজনের প্রতিদান সমান হবে।
তিন. এমন বান্দা, যাকে আল্লাহ তাআলা ধন-সম্পদ দান করেছেন, কিন্তু ইলম দান করেননি। আর ইলম না থাকায় সে নিজের ধন-সম্পদ প্রবৃত্তির চাহিদামতো খরচ করে। এ ব্যাপারে সে তার প্রতিপালককেও ভয় করে না। আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করে না। আর এতে যে আল্লাহ তাআলারও হক আছে, তা সে জানে না। এ লোক সর্বাধিক নিকৃষ্ট স্তরের।
চার. এমন বান্দা, যাকে আল্লাহ তাআলা ধন-সম্পদও দান করেননি এবং ইলমও দান করেননি। সে বলে, আমার যদি ধন-সম্পদ থাকত, তাহলে অমুক ব্যক্তির মতো (যে ব্যক্তি প্রবৃত্তির চাহিদামতো খরচ করে) কাজ করতাম। তারও স্থান নির্ধারিত হবে তার নিয়ত অনুযায়ী। এরা দুজন পাপের দিক থেকে সমান হবে।'৬৭
হে ভাই, দুনিয়া আখিরাতের শস্যখেত। ইহজীবন ইবাদত করার সময়। এখানেই আনুগত্য করতে হয়। ইবাদত-বন্দেগি করে পরকালের পুঁজি অর্জন করার জন্যই আমাদের দুনিয়াতে পাঠানো হয়েছে।
ফুজাইল রহ. বলেন:
'আল্লাহ তাআলা সকল অকল্যাণ ও অনিষ্টকে একটি ঘরের মধ্যে রেখেছেন। আর সে ঘর খোলার একটি চাবি বানিয়েছেন। সে চাবির নাম দুনিয়াপ্রীতি। তেমনই তিনি সকল কল্যাণকে একটি ঘরে রেখেছেন। আর সে ঘরের চাবি হলো দুনিয়াবিমুখতা।'৬৮
যখন তাঁদের বয়স চল্লিশ হতো
একটু লক্ষ করো, সালাফের সাথে আমাদের কেমন ব্যবধান? কোথায় তাঁরা আর কোথায় আমরা!
আব্দুল্লাহ বিন দাউদ রহ. বলেন:
'সালাফে সালিহিন যখন চল্লিশ বছরে উপনীত হতেন, তখন তারা আপন বিছানাকে গুটিয়ে নিতেন।'৬৯ সারা রাত না ঘুমিয়ে নামাজ, তাসবিহ ও ইসতিগফারের আমলে মশগুল থাকতেন... সময়কে কাটাতেন ইবাদত-বন্দেগির কাজে। নিজেদের পেছনের যেসব আমলে কোনো অপূর্ণতা বা ত্রুটি থেকে গেছে, সেসব আমলের ক্ষতিপূরণ করতেন। প্রস্তুতি নিতেন ভবিষ্যৎ জীবনে উত্তম ও পরিপূর্ণ আমলের।'
তাদের সে অবস্থার কথাই উঠে এসেছে কবিতার পঙ্ক্তিতে :
إِنَّ لِلَّهِ رِجَالًا فُطَنًا * طَلَّقُوْا الدُّنْيَا وَخَافُوْا الْفِتَنَا نَظَرُوْا فِيْهَا فَلَمَّا عَلِمُوا * أَنَّهَا لَيْسَتْ لِحَيَّ وَطَنَا جَعَلُوْهَا حُجَةٌ وَاتَّخَذُوا * صَالِحَ الْأَعْمَالِ فِيْهَا سُفُنَا
'আল্লাহর অনেক প্রাজ্ঞ বান্দা আছেন, যারা ফিতনার আশঙ্কায় দুনিয়াকে তালাক দিয়েছেন। তারা উপলব্ধি করতে পেরেছেন, দুনিয়া স্থায়ী আবাস নয়। পার্থিব জীবনকে তারা মনে করেছেন ঝঞ্ঝাবিক্ষুদ্ধ উত্তাল সমুদ্র আর তাই এটি পাড়ি দিতে তারা নেক আমলের নৌকা নির্মাণে ব্যস্ত।'
আব্দুল্লাহ বিন সা'লাবাহ রহ. বলতেন :
'এত হাসাহাসি করো কেন, হে মানুষ! এমনও তো হতে পারে, তোমার কাফনের কাপড় এসে গেছে ধোপার হাতে!'৭০
হে মুসলিম, তোমার সফরের ঘোষণা তো হয়ে গেছে। এখনো যে তুমি ঘুমে বিভোর! তুমি যে ঘর নির্মাণ করছ স্রোতের ওপর! সতর্ক হও, জীবন শেষ হওয়ার আগে আগে আমল করে নাও ওপারের জন্য। ভুলে যেয়ো না সে সত্তাকে, যাঁর সাথে নির্ধারণ করা আছে তোমার সাক্ষাতের সময়। প্রিয় ভাই,
خُذْ مِنَ الرِّزْقِ مَا كَفَا * وَمِنَ الْعَيْشِ مَا صَفَا كُلُّ هَذَا سَيَنْقَضِيْ * كَسِرَاجٍ إِذَا انْطَفَا
'প্রয়োজন-পরিমাণ জীবনোপকরণ সংগ্রহ করেই ক্ষান্ত হও। নিজের জন্য বেছে নাও স্বচ্ছ জীবনধারা। কেননা, সবকিছু হারিয়ে যাবে একদিন—নিভে যাওয়া প্রদীপের ন্যায় তলিয়ে যাবে নিকষ আঁধারে।' ৭১
ইয়াহইয়া বিন মুআজ রহ. বলেন: 'দুনিয়া ব্যস্ততার। আখিরাত আতঙ্কের। বান্দা ততক্ষণ পর্যন্ত এ ব্যস্ততা ও বিপদাশঙ্কার মধ্যে থাকবে; যতক্ষণ না সে স্থির হচ্ছে কোনো স্থায়ী আবাসে। বিচার-ফয়সালা শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত ভীতি থাকবে। এরপর হয়তো সে প্রবেশ করবে চিরসুখের আবাস জান্নাতে অথবা চির অশান্তির স্থান জাহান্নামে।' ৭২
কেউ যদি গভীরভাবে চিন্তা করে, সে অবশ্যই বুঝতে পারবে, আসলে দুনিয়ার এ জীবন মানুষের চলমান সফরের একটি অংশ। পিতার পৃষ্ঠদেশ থেকে মায়ের পেটে আসার মাধ্যমে যে সফরের সূচনা। তারপর দুনিয়া, কবর ও হাশর পাড়ি দিয়ে সে পৌঁছে যাবে চিরস্থায়ী আবাসে—চিরসুখের জান্নাত বা চিরকষ্টের জাহান্নামে গিয়েই ঘটবে সফরের অবসান।
শয়তান চায়, দুনিয়ার মায়াজালে আমাদের বন্দী করে রাখতে। যদি সে এখানে আমাদের বন্দী করতে পারে, তবে আমাদের নির্ঘাত জাহান্নামে নিয়ে ছেড়ে দেবে। তাই চলমান এ সফরে শয়তানের বন্দীদশা থেকে মুক্ত থাকার সংগ্রাম আমাদের অবশ্যই করতে হবে।
দুনিয়ার এ সফর নিতান্ত ক্ষণিকের। নিশ্বাস বন্ধ হয়ে গেলেই এর সমাপ্তি। এই সফর এমন, যেন কেউ বসে আছে নৌকাতে। আর নৌকাটি চলছে গন্তব্যের পানে। যাত্রী সেখানে বসে আছে; কিন্তু সে বুঝতে পারছে না, সে সফর করছে।
'সফরের জন্য অবশ্যই পাথেয় প্রয়োজন। আখিরাতের সফরের পাথেয় হলো তাকওয়া। তাই, কষ্ট যতই হোক, তাকওয়া আমাদের অবশ্যই অর্জন করতে হবে। যেন আবার ওপারে গিয়ে বলতে না হয় رَبِّ ارْجِعُونِ “হে প্রভু, আমাকে পুনরায় ফেরত পাঠান।” যার উত্তরে বলা হবে, كَلَّا “কক্ষনো না।” তাই গাফিল থাকা যাবে না। যা করার করতে হবে সময় থাকতে।
বান্দা যেন তাকওয়াকে নিজের সম্বল হিসেবে গ্রহণ করে, এ জন্য আল্লাহ তাআলা বান্দার এ সফরে অনেক ভীতিকর নিদর্শন দেখান। যেন বান্দারা ভীত হয়, সঠিক পথ থেকে সরে না যায়। সঠিক পথ থেকে যে আপন বাহনকে ভুল পথে ঘুরিয়ে নেবে, সেখানে সে তা-ই পাবে, যা থেকে আল্লাহ তাকে ভয় দেখিয়েছেন। এমন বক্রতার অনুগামী যারা হয়, তারা যেন পাপের সে পথ থেকে প্রতিপালকের পথে অবশ্যই প্রত্যাবর্তন করে। নিজেদের গুনাহের কারণে তাঁর কাছে তাওবা করে।'৭৩
দুনিয়াতে কেমন আমাদের অবস্থা? কেমন আমাদের সার্বিক পরিস্থিতি? এমনই এক প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন রাবি' বিন খুসাইম রহ.। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো, কীরূপ অবস্থায় আপনার সকাল হয়? তিনি বললেন:
'আমাদের সকাল হয় দুর্বল ও গুনাহগার অবস্থায়। তাকদিরে থাকা রিজিক ভক্ষণ করি আর প্রহর গুনি মৃত্যুর অপেক্ষায়।'৭৪
শুমাইত বিন আজলান রহ. দুনিয়াদারদের বর্ণনা দিতেন এভাবে-
'দুনিয়াদাররা উন্মাদ, মাতাল। এখানে সবল-দুর্বল সবাই ছুটে চলে দুনিয়ার পেছনে। সবলরা চলে দৌড়ে দৌড়ে। আর দুর্বলরা হেঁটে হেঁটে হলেও দুনিয়ার পেছনে ছুটে চলে। ধনী বা গরিব দুনিয়ার যত সম্পদই তারা অর্জন করুক না কেন, এ নিয়ে কেউই সন্তুষ্ট হয় না। '৭৫
ভাই আমার,
خُذِ الْقَنَاعَةَ مِنْ دُنْيَاكَ وَارْضَ بِهَا لَوْ لَمْ يَكُنْ لَكَ فِيْهَا إِلَّا رَاحَةُ البَدَنِ
'দুনিয়ার পেছনে এত দৌড়ঝাঁপ না করে অল্পতুষ্টি অবলম্বন করো। এতে আর কিছু পাও না পাও, শারীরিক প্রশান্তি তো অন্তত পাবে।'
যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের আশায় প্রস্তুত থাকে এবং আখিরাতের জন্য উপকারী আমলে মশগুল থেকে সময়কে মূল্যায়ন করে, অচিরেই সে কিয়ামত দিবসে অনেক খুশিতে থাকবে; যেদিন না কোনো ধন-সম্পদ কারও কাজে আসবে, আর না কোনো সন্তানসন্ততি। আমলনামা খুলে দেখা হবে। অন্তরগুলো কাঁপতে থাকবে। পরিবর্তন হয়ে যাবে মানুষের অন্তরের অবস্থা। আজ যাকে ভাবছ, তোমার অতি দরদি বন্ধু; কাল সে তোমার শুভাকাঙ্ক্ষীও হবে না। লোকদের দেখাবে মাতাল-মত্তের ন্যায়, অথচ তারা মদ স্পর্শ পর্যন্ত করেনি। বস্তুত, তাদের অন্তরের এ পরিবর্তন, এ অস্থিরতা, এ মাতাল-উন্মত্ততা—এসবই হবে আল্লাহর আজাবের ভীষণ ভয়ের কারণে।
আনাস বিন ইয়াজ রহ. বলেন:
'সাফওয়ান বিন সুলাইম রহ.-কে যদি বলা হতো, “আগামীকাল কিয়ামত সংঘটিত হবে।” এমন অবস্থায়ও অতিরিক্ত ইবাদত করার জন্য তিনি কোনো ইবাদত পেতেন না। '৭৬ অর্থাৎ তিনি প্রায় সকল ইবাদতে সর্বদা মশগুল থাকতেন। তাই কিয়ামতের কথা বলা হলেও অতিরিক্ত কোনো ইবাদত করার মতো সময় ও সুযোগ তার হতো না।
সালাফে সালিহিন এমনই ছিলেন, প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে সর্বদা তারা লড়াই করেছেন। বিভোর থেকেছেন সব সময় আখিরাতের চিন্তায়। দুনিয়া থেকে তারা বিদায় নিয়েছেন কিয়ামত দিবসের যথাযথ প্রস্তুতি নিয়ে।
মুহাম্মাদ বিন হানাফিয়্যাহ রহ. বলেন :
'সবকিছুই ধ্বংস হয়ে যায়। কেবল তা-ই অস্তিত্বে থাকে, যা দ্বারা উদ্দেশ্য হয় আল্লাহর সন্তুষ্টি। '৭৭
সুতরাং দুনিয়াকে যে অর্জন করে পার্থিব স্বার্থে, একসময় দুনিয়াই তার থেকে দূরে সরে যায়। জীবনের কঠিন মুহূর্তেও দুনিয়াকে সে নিজের পাশে পায় না। পক্ষান্তরে, যে ব্যক্তি দুনিয়া অর্জন করে আখিরাতের স্বার্থে ও জান্নাত লাভের লক্ষ্যে, উদ্দেশ্য পূরণে দুনিয়াকে সে সহায়ক হিসেবে পায়।
এই যে দ্বীনদার ও পুণ্যবান লোকগুলো, তারাও কিন্তু আমাদের মতোই মানুষ। দুনিয়া ও তার চাকচিক্যকে তারাও পছন্দ করেন। তবে তারা ক্ষণিকের এ দুনিয়াকে চিরস্থায়ী আখিরাতের ওপর কখনোই প্রাধান্য দেন না। এ জন্যই আল্লাহ তাআলা তাদের জন্য সুগম করে দেন কল্যাণের পথ, রুদ্ধ করে দেন অকল্যাণের দ্বার।
একব্যক্তি সকালে এসে ফুজাইল বিন ইয়াজ রহ.-কে জিজ্ঞেস করল- 'কেমন আছেন, হে আবু আলি?' মানুষের এ প্রশ্নটি তাঁর কাছে কষ্টকর লাগত, কেউ সকালে এসে বলল, কেমন আছেন? কেউ রাতে এসে বলল, কেমন আছেন? কষ্টকর মনে হলেও তিনি উত্তর দিতেন, 'সুস্থ আছি।' আজ একব্যক্তি এসে জিজ্ঞেস করল, 'কী অবস্থা আপনার?'
তিনি বললেন:
'কোন অবস্থার কথা জানতে চেয়েছ? দুনিয়ার না আখিরাতের? যদি দুনিয়ার অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাও, তাহলে বলব—দুনিয়া আমাদের ওপর পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে। পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছে আমাদের। আর যদি জানতে চাও আখিরাতের খবর, তবে শোনো—গুনাহের আধিক্য, আমলের দুর্বলতা, কিয়ামত দিবসের পাথেয়-স্বল্পতা, পাথেয় জোগাড়ের আগেই মৃত্যু উপস্থিত হবার ভয় ও আখিরাতের জন্য প্রস্তুতিহীনতা, আমলের অভাব, উদ্যমশূন্যতা এবং দুনিয়ার জীবনকে সুশোভিত করার মগ্নতা আমাকে পরিবেষ্টন করে আছে। বহুমুখী সমস্যায় নাজেহাল এরূপ ব্যক্তি সম্পর্কে তোমার মতামত কী? তার অবস্থা কি শোচনীয় নয়?'৭৮
আজকের বেশির ভাগ মানুষের অবস্থা এমনই, যেমনটি আওন বিন আব্দুল্লাহ রহ. বলেছেন:
'তোমাদের পূর্ববর্তী লোকেরা আখিরাতের কাজ করার পর যে অবশিষ্ট সময় হাতে থাকত, তা দুনিয়ার প্রয়োজনে কাটাত। আর তোমাদের অবস্থা এর সম্পূর্ণ উল্টো। দুনিয়ার কাজ করার পর যে অতিরিক্ত সময় তোমাদের থাকে, সে সময়টা তোমরা ব্যয় করো আখিরাতের কাজে!'৭৯
বড়ই আশ্চর্য লাগে আমাদের বর্তমান অবস্থা দেখে। আমাদের সময়, পরিশ্রম, প্রচেষ্টা, জ্ঞান-বুদ্ধি... সবকিছু ব্যয় হচ্ছে দুনিয়ার জন্য। দুনিয়ার তুচ্ছ বস্তুর জন্য আমরা কত মূল্যবান সময় নষ্ট করছি! সামান্য কাজে দোকানপাটে গিয়ে নষ্ট করে ফেলি ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময়। অথচ, নামাজে দাঁড়ালে মুরগির ঠোকর মারার মতো দ্রুত নামাজ শেষ করে ফেলি। রুকু, সিজদা ঠিকমতো আদায় হচ্ছে কি না, সেদিকে খেয়াল করা বারণ! পারলে তো ইমামের আগে আগেই নামাজ পড়ে মসজিদ থেকে বেরিয়ে হাঁফ ছেড়ে বাঁচি। আমাদের নামাজে একাগ্রতা নেই, চোখে নেই তাকওয়ার অশ্রু।
আজকের অধিকাংশ মানুষ শুধু দুনিয়া নিয়ে বিভোর হয়ে আছে। জীবনের সময়গুলো যে আমলবিহীন নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে, এদিকে তাদের কোনো ভ্রক্ষেপই নেই। অমনোযোগ-উদাসীনতায় এমনভাবে সময়গুলো খেল-তামাশায় পার করছে, যেন তা আবার ফিরে আসবে! যেন এ মাস আবার ফিরে আসবে! এ দিন আবার তারা ফিরে পাবে! ফিরে আসবে আবার এ ঘণ্টা, এ মিনিট, এ সেকেন্ড!
প্রতিনিয়ত আমরা নাফরমানির সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছি। অনেকে কোনো না কোনো অপরাধে লিপ্ত আছি। কেউ যদি একটু নেক কাজ করে, পরক্ষণে আবার গুনাহে লিপ্ত হয়ে পড়ে। ইয়াহইয়া বিন সাইদ রহ. সম্পর্কে বুন্দার রহ. বলেন:
'বিশ বছর ধরে তার নিকট আমার আসা-যাওয়া। কখনো তিনি আল্লাহর অবাধ্য হয়েছেন, এমনটা আমার মনে পড়ে না।'৮০
ইয়াহইয়া বিন মুআজ রহ. বলেন:
'হে আদমসন্তান, দুনিয়ার কামনা তোমার মাঝে এতই প্রবল যে, দুনিয়া ছাড়া যেন তোমার কোনো উপায় নেই। আর তুমি আখিরাতের প্রত্যাশা এমনভাবে করছ, যেন আখিরাতের খুব একটা প্রয়োজন তোমার নেই। অথচ, তুমি না চাইলেও দুনিয়াতে তা-ই পাবে, যা তোমার প্রয়োজন। তোমার জন্য যা কিছু নির্ধারিত, এর চেয়ে বেশি তুমি কখনোই পাবে না। দুনিয়ার প্রয়োজন তুমি চাওয়া ব্যতীতই পাবে। কিন্তু আখিরাতের মুক্তি চাওয়া ব্যতীত মিলবে না। এ ক্ষেত্রে কি তুমি একটু বুদ্ধি খাটাতে পারো না?'৮১
টিকাঃ
৪৭. সিফাতুস সাফওয়াহ: ১/৪২২
৪৮. মিরকাতুল মাফাতিহ শারহুল মিশকাতুল মাসাবিহ: ৫৪৭২, ৮/৩৪৫৪। জাহরুল আকামি ফিল আমছালি ওয়াল হিকামি: ৩/৭৭
৪৯. হাসান বসরি রহ. কৃত আজ-জুহদ
৫০. সিফাতুস সাফওয়াহ: ২/১৫৮
৫১. তাজকিয়াতুন নুফুস: ১২৮
৫২. ইবনু আবিদ দুনিয়া রহ. কৃত আজ-জুহদ: ১৭ : ১/২৯
৫৩. আজ-জাহরুল ফায়িহ: ১/৪২
৫৪. আজ-জাহরুল ফায়িহ: ১/৯৯
৫৫. আল-ইহইয়া: ৪/১৭০
৫৬. আস-সিয়ার: ৮/৪২৭
৫৭. জামিউল উলুমি ওয়াল হিকাম : ৩৮১
৫৮. তাহজিবুল কামাল ফি আসমাইর রিজাল: ১৬/২০
৫৯. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৬/৬৩০
৬০. আল-ইহইয়া: ৪/১৩১
৬১. সুরা তহা: ১৩১
৬২. আস-সিয়ার: ৮/৪২৬
৬৩. আল-ফাওয়ায়িদ: ১৫৩
৬৪. তারিখু বাগদাদ: ১৪/৪৪৪
৬৫. তবাকাতুশ শাফিয়িয়্যাহ: ৬/৭৮
৬৬. আল-আকিবাহ: ৮৯
৬৭. জামিউল উলুমি ওয়াল হিকাম: ৪২৯, হাদিসটি সহিহ। সুনানুত তিরমিজির শরাহ তুহফাতুল আহওয়াজি: ৬/১৬১৫ : ইমাম তিরমিজি বলেন, হাদিসটি হাসান সহিহ।
৬৮. আল-ইহইয়া: ৪/২৫৭
৬৯. আল-ইহইয়া: ৪/৪৩৫
৭০. আল-আকিবাহ: ৮৮
৭১. ইবনু রজব রহ. কৃত লাতায়িফুল মাআরিফ: ১/৩১০
৭২. আজ-জুহদ, বাইহাকি: ২৪৮
৭৩. উদ্দাতুস সাবিরিন: ৩৩০
৭৪. সিফাতুস সাফওয়াহ: ৩/৬৮
৭৫. সিফাতুস সাফওয়াহ : ৩/৩৪৬
৭৬. সিফাতুস সাফওয়াহ: ৪/১১৪
৭৭. সিফাতুস সাফওয়াহ: ৪/১১৪
৭৮. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৮/৮৬
৭৯. তাজকিরাতুল হুফফাজ : ১/২৯৯
৮০. মাওয়ারিদুজ জামআন: ৩/২৮৬
৮১. সিফাতুস সাফওয়াহ: ২/২৯৪
📄 মানুষের জীবন দিনকয়েকের সমষ্টি
হাসান রা. বলেন:
'হে আদমসন্তান, তোমার জীবন তো মাত্র কয়েকটি দিনের সমষ্টি। একটি দিন অতীত হওয়া মানে তোমার জীবনের একটি অংশ কমে যাওয়া।' ৫৪
হে ভাই, ক্ষণিকের এ দুনিয়া নিয়ে আমরা কত চিন্তিত! অবিরাম ছুটে চলছি দুনিয়ার পেছনে। দারিদ্র্যের ভীষণ ভয় আমাদের মাঝে। লোভাতুর হয়ে আছি দুনিয়ার তুচ্ছ-নগণ্য বস্তু অর্জনে। আমাদের দৌড়ঝাঁপ দেখে মনে হয়, যেন আমরা চিরকাল দুনিয়াতেই থাকব। দারিদ্র্যকে কত ভয় পাই আমরা, কিন্তু কিয়ামত দিবসের হিসাব-নিকাশের ভয় আমাদের মনে উদিত হয় না। ক্ষুধাকে আমরা ভয় পাই, কিন্তু পরকালের কঠিন শাস্তিকে ভয় করি না।
ইয়াহইয়া বিন মুআজ রহ. বলেন:
'দারিদ্র্যকে যেভাবে মানুষ ভয় করে, এভাবে যদি জাহান্নামকে ভয় পেত; তাহলে খুব সহজে তারা জান্নাতে প্রবেশ করত।' ৫৫
হাসান বসরি রহ. বলেন:
'সে মহান সত্তার শপথ, যাঁর হাতে আমার প্রাণ। এমন লোকদের সান্নিধ্যে আমি ছিলাম, যারা দুনিয়াকে পায়ের তলার মাটির চেয়েও তুচ্ছ মনে করতেন।'
ফুজাইল রহ. বলেন :
'গতকাল তো অতীত। আজ আমলের সময়। আর ভবিষ্যৎ হলো আশা-আকাঙ্ক্ষার স্থান। ভবিষ্যতে কল্যাণের আশা তো আমরা তখনই করতে পারব, যখন আমরা আমাদের আজকের সময়কে নেক আমলে ব্যয় করব।' ৫৬
বস্তুত, এ দুনিয়া কয়েকটি দিনের সমষ্টি মাত্র। আর সেদিনগুলো হলো- গতকাল, আজ ও আগামীকাল। এ কয়েকটি দিনের জন্যই আমাদের কত পরিশ্রম আর প্রচেষ্টা! কিন্তু এ দিনগুলো যখন অতিক্রান্ত হবে, তখন আমরা ঠিকই বুঝতে পারব, আমাদের এসব প্রচেষ্টা আসলে পরিশ্রম ছিল না; এ ছিল পণ্ডশ্রম।
টিকাঃ
৫৪. আজ-জাহরুল ফায়িহ: ১/৯৯
৫৫. আল-ইহইয়া: ৪/১৭০
৫৬. আস-সিয়ার: ৮/৪২৭